চরিত্রলিপি :
আলিম যুবক (বাইশ থেকে পঁচিশ)
কবীর যুবক (তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশ)
শওকত যুবক (আলিমের সমবয়স্ক)
রোকেয়া আলিমের স্ত্রী
রানু আলিমের ছেলে
কুমকুম আলিমের মেয়ে
ভদ্রমহিলা যুবতী
(১) তৃতীয় ও চতুর্থ দৃশ্যে আলিম ও কবীরকে আরো বছর বারো বেশি বড় মনে হবে
(২) দ্বিতীয় দৃশ্যের পর আরো কয়েক বছর অতিবাহিত হয়েছে – এ ব্যাপারটি বোঝানোর জন্য ক্যামেরার সাহায্যে ক্যালেন্ডারের দ্রুত পরিবর্তনশীল তারিখ দেখানো যেতে পারে।
(৩) দ্বিতীয় দৃশ্যের পর আলিমের বয়স আরো বছর বারো বেড়েছে এটা বোঝানোর জন্য তার মেক-আপের দরকার হতে পারে। সে কারণে তৃতীয় দৃশ্য অবতারণার আগে সে মিনিট পাঁচেক সময় নেবে। সে সুযোগে মেক-আপ নেওয়া চলবে। কবীরের মেক-আপ নিতে অসুবিধে নেই।
(মেসঘর। মামুলি আসবাবপত্র। একখানা খাট ও তার গা-ঘেঁষে পড়ার টেবিল ও চেয়ার। টেবিলে বেশকিছু বইপত্র গাদা করা আর টুকিটাকি জিনিস :
যেমন তেলের শিশি, সাবানের কৌটা ও আয়না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় শেভ করা শেষ করে ফেলেছে কবীর। অ্যাশট্রেতে একখানা জ্বলন্ত সিগারেট। ফাঁকে ফাঁকে ওখানা ফুঁকে নেয়।
আলিম এসে ঢোকে। রীতিমতো পরিপাটি ও ধোপদুরস্ত। কবীরের পেছনে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে একফাঁকে আয়নায় চেহারাখানা যাচাই করে দেখে। ‘টাই’য়ের গেরোটা ঠিক আছে কিনা তদারক করে। কবীর আড়চোখে তাকায় মাত্র। আলিম একবার খাটে গিয়ে বসে। আবার উঠে দাঁড়ায়। টেবিলে রাখা খোলা সিগারেটের প্যাকেটের দিকে হাত বাড়ায়। তার দ্বিধাগ্রস্ততায় বোঝা যায় প্যাকেটটা কবিরের। কবীর আড়চোখে তাকায়, কিছু বলে না। একটা তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে কিছু পাউডার ঘষে নেয়। সে-অবসরে আলিম সিগারেট ধরায়। তারপর কী মনে হওয়ায় পকেটে হাত দেয়। একখানা চিরকুট বের করে বাড়িয়ে দেয় কবীরের দিকে।
আলিম : দেখ তো কটায় ইন্টারভিউ।
কবীর : (কাগজখানা হাতে নেয় না দেখে আলিমই ওখানা খুলে ধরে। কবীর ঝুঁকে দেখে।) ন’টা। অনেক দেরি। (টেবিলের ওপরে রাখা নিজের হাতঘড়িখানা তুলে নিয়ে) এখন তো সবে আটটা।
আলিম : তবু বলা যায় না। বাসের যা অবস্থা। আগেভাগে বেরিয়ে পড়াই ভালো।
কবীর : (একখানা খবরের কাগজ মেলে ধরে। তারপর চেয়ারখানা টেনে বসে) হুঁ – কিসের চাকরি?
আলিম : সেল্স অফিসার, গ্লোব কেমিক্যাল কোম্পানি –
কবীর : কী, অফিসার?
আলিম : দাঁড়াও! দাঁড়াও দেখে নিই। (কাগজখানা আবার বের করে নেয়) না, মানে অ্যাসিস্ট্যান্ট সেল্স অফিসার – ওই এক কথাই। (কাগজখানা আবার ভাঁজ করে পকেটে রেখে দেয়) হ্যাঁ ভালো কথা, কী জিজ্ঞেস করতে পারে বল তো?
কবীর : (খাটে গিয়ে বসে। কাগজের কোনো একটি খবরের প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। তাই প্রশ্নটা যেন শুনতে পায় না।) হুঁ Ñ কী বললে?
আলিম : (টেবিলের কাছে ঝুঁকে পড়ে) ইন্টারভিউতে কী জিজ্ঞেস করতে পারে বলে মনে হয় তোমার?
কবীর : (নিস্পৃহ) কী আবার। বয়স, অভিজ্ঞতা।
আলিম : অভিজ্ঞতা? তাহলে তো গেছি। আচ্ছা জেনারেল নলেজের কোনো কোশ্চেন?
কবীর : হ্যাঁ, হ্যাঁ নিশ্চয়ই। (কাগজখানা ভাঁজ করে রাখে) আজকালকার কথা জানিনে। হতো বটে ইন্টারভিউ আমাদের সময়। এই ধরো না প্রথম যে চাকরিতে ঢুকলাম – ছাঁকা দেড়শ ক্যানডিডেট।
আলিম : (উৎসাহিত হয়ে) কী জিজ্ঞেস করেছিল?
কবীর : (চিবুকে হাত বুলিয়ে) ওসব কি মনে আছে। হ্যাঁ, এক সাহেব ছিল। নাছোড়বান্দা।
আলিম : তারপর।
কবীর : তারপর আর কী, পটাপট প্রশ্ন। হাঙ্গর বড় না তিমিমাছ বড়। প্রোটোপ্লাজম কাকে বলে। বাসুতোল্যান্ড কোথায়? – ইত্যাদি।
আলিম : পেরেছিলে?
কবীর : কী মনে হয়। অমনি চাঁদ-মুখখানা দেখে চাকরি দিয়েছিল?
আলিম : ঠিকই বলেছ। আমারও একটু তৈরি হয়ে নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এখন তো আর সময়ও নেই। আচ্ছা ঠিক কী ধরনের প্রশ্ন করতে পারে বলে তোমার ধারণা।
কবীর : তা কি আর আগে থেকে বলা যায়। ওই যে বললাম – জেনারেল নলেজ। ধরো জিজ্ঞেস করল কয়লা থেকে কী করে হীরে হয়?
আলিম : সেটা জানলে কি আর চাকরি নিতে যেতাম। তুমিও যেমন।
কবীর : তারপর মনে করো বোরিয়ালিস মানে কী?
আলিম : মানে তোমার – ওই মরুদেশে আলোকচ্ছটার কথা বলছ তো?
কবীর : ওভাবে বললে তো হবে না।
আলিম : তবে?
কবীর : তোতাপাখির মতো কলকলিয়ে বললে তো হবে না। জবাবটা এমন করে দিতে হবে –
আলিম : ইস্, এসব আগে কেন বলোনি। (টেবিল থেকে একখানা বই নিয়ে সেটা খুলে) আচ্ছা War of Roses সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করবে না তো?
কবীর : তাও পারে।
আলিম : তাহলে পারব। ইতিহাসে ভালোই ছিলাম বরাবর।
কবীর : তা তো পারবে। ধরো, যদি জিজ্ঞেস করে War of Blood-
আলিম : ওটা আবার কবে হয়েছিল?
কবীর : তা কি আর আমি জানি। যুদ্ধ কী আর এক-আধটা হয়েছে যে, হুট করে বলে দেব। বললাম আর কী। ‘ডধৎ ড়ভ জড়ংবং’ হতে পারে,War of Blood’ হতে বাধা কী –
আলিম : তা ঠিক, আমার রীতিমতো ভয়ই করছে। ভালো কথা, দেখ তো কটা বাজে?
কবীর : সোয়া আট।
আলিম : তাহলে তো যেতে হয়। সার্টিফিকেটগুলো নিয়েছি তো। (পকেট হাতড়ে দেখে এবং ওগুলো সঙ্গে আছে মনে হওয়ায় আশ্বস্ত হয়। তারপর একমুহূর্ত থেমে) ভালো কথা, তোমার ঘড়িটা দেবে?
কবীর : ঘড়ি?
আলিম : হ্যাঁ, একটা ঘড়ি সঙ্গে থাকা ভালো।
কবীর : আচ্ছা নাও, হারিও না কিন্তু।
আলিম : (ঘড়িখানা পকেটে পুরে নিয়ে) না না, হারাব কেন? পকেটেই রাখছি। বলা তো যায় না, যদি হাত থেকে খুলে পড়ে।
কবীর : এ ঘড়ি আর পাবে না। তখুনি কিনেছিলাম চারশো পঁচাশি টাকা দিয়ে, সেন্টার সেকেন্ড, সেভেন্টিন্ জুয়েলের সুইস্ ঘড়ি।
আলিম : ইন্টারভিউর পরই ফেরত দেব।
কবীর : আচ্ছা এসো। ঘাবড়ে-টাবড়ে যেও না আবার। পারো আর না পারো একধারসে বলে যাবে।
(আলিমের প্রস্থান। কিন্তু আবার একটু পরেই ফিরে আসে।)
আলিম : শোন –
কবীর : কী ব্যাপার, আবার ফিরে এলে যে।
আলিম : মানে হঠাৎ মনে পড়ে গেল – সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব কত যেন। বলো তো চট করে।
কবীর : তা কয়েকশ মাইল তো হবেই।
আলিম : (টেবিলের কাছে যায়। একটা বই খুঁজে বের করার চেষ্টা করে) ন’ কোটি কত, কত যেন। আরে বইটা কোথায় গেল। দেখছি না। যাকগে (ঘড়ি দেখে) সময়ও নেই। চলি।
আলিমের প্রস্থান। কবীর আবার কাগজখানা মেলে ধরে। দরজায় টোকার শব্দ।
কবীর : কে?
পোস্টম্যান : টেলিগ্রাম।
খবরের কাগজখানা ভাঁজ করে উঠে দাঁড়ায় কবীর। বাইরে গিয়ে টেলিগ্রামখানা আনে। হতভম্বের মতো ওখানার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর এক সময় টেবিলে হাত রেখে মাথা ঝুঁকে থাকে।
কবীর : একি সর্বনাশ হলো।
শওকতের প্রবেশ। পেছনে গিয়ে কবীরের কাঁধে হাত রাখে।
শওকত : কী ব্যাপার। তোমাকে এমন –
(কবীর কিছু বলে না। টেলিগ্রামখানা বাড়িয়ে দেয়। শওকত পড়ে)
Father seriously ill, all hope given up. Come sharp.
হুঁ, তাই তো। তাহলে তো আর দেরি করা উচিত নয়। আমি বলি কী পরের ট্রেনটাই ধরে ফেলো।
কবীর বেশ অভিভূত। হঠাৎ শওকতকে জড়িয়ে ধরে।
কবীর : আমার কী হবে বলো তো। সংসারে –
কথা শেষ হয় না। কবীর আবেগে ভেঙে পড়ে।
শওকত : ছি ছি, মুষড়ে পড়লে কি চলে? কিন্তু কী হয়েছিল তাঁর? মানে এর আগে কোনো অসুখ-বিসুখের খবর পাওনি?
কবীর : (মাথা নাড়ে) শওকত তেমন যদি ঘটে, আর বোধহয় ফিরে আসতে পারব না। এ বিপুল সংসারের সমস্ত দায়িত্বই নিতে হবে আমাকে।
শওকত : আঃ, এসব কী অলক্ষুণে কথা ভাবছ।
কবীর : না না, সত্যি বলছি। বাবা ছিলেন বলেই এতদিন হেসেখেলে বেড়িয়েছি। কোনোকিছু ভাবতে হয়নি।
শওকত : যাকগে। তুমি বসো। আমি বরং তোমার জিনিসপত্র গুছিয়ে দিই।
(শওকত নিজেই খাটের তলা থেকে ওর সুটকেশ বের করে। কবীর চেয়ারে বসে।) – কটা বাজে?
কবীর : কী জানি?
শওকত : কী জানি মানে? তোমার ঘড়ি কী হলো?
কবীর : ওটা তো আলিম নিয়ে গেল। ওর ইন্টারভিউ।
শওকত : ও (জিনিসপত্র গুছাতে ব্যস্ত। খাটের ওপর রাখা ভাঁজ করা শার্টের একখানা তুলে নিয়ে। এখানা তোমার তো?
কবীর : হ্যাঁ।
শওকত : আর কী কী নেবে ঠিক করে নাও। চলো তোমাকে স্টেশনে ছেড়ে আসি।
(কবীর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।)
Fade out
Fade in
দ্বিতীয় দৃশ্য
একই দৃশ্য। কোনো পরিবর্তন নেই। দেখা যাবে শওকত কাত হয়ে একখানা বই পড়ছে আর মাঝে মাঝে হাই তুলছে। এমন সময় আলিমের প্রবেশ।
শওকত : (পায়ের শব্দ শুনে) আয়, আয় তোরই অপেক্ষা করছি। কী, হয়ে গেল চাকরি?
আলিম : (পকেট থেকে সার্টিফিকেট ও অন্যান্য কাগজপত্র বের করে টেবিলে ছুড়ে মারে) দুঃ ছাই। আর বলিস না। চাকরি-টাকরি আমার কপালে নেই।
শওকত : সে কী। ইন্টারভিউ কেমন হলো?
আলিম : কী জানি।
শওকত : কী জানি মানে? কী বলল, কী জিজ্ঞেস করল বল না।
আলিম : (চেয়ারখানা টেনে নিয়ে ওর মুখোমুখি বসে) জিজ্ঞেস করাকরি আর কী। ঢুকলাম। বলল, বসো। বসলাম। নামধাম শুধাল, কোয়ালিফিকেশন জিজ্ঞেস করল – ব্যস।
শওকত : তারপর?
আলিম : তারপর আর কী? মুচকি হেসে বলল, ‘থ্যাংক ইউ’। ইউ মে গো।
শওকত : আসলে নিজেদের লোক আছে বুঝলি না। ইন্টারভিউ-ফিন্টারভিউ কিছু নয় –
আলিম : আরে তা-ও কী দেখা করতে দেয়। অফিসে ঢুকতেই বলে লেট। শেষটায় কোনোমতে বলেকয়ে –
শওকত : কেন, তুই যে ঘড়ি নিয়ে গেলি কবীরের কাছ থেকে।
আলিম : তাও গিয়েছিলাম। ওটাই সর্বনাশের মূল। যেতে বলেছিল কাঁটায় কাঁটায় ন’টায়। গিয়ে দেখি সাড়ে ন’টা।
শওকত : স্লো ছিল বোধহয়।
আলিম : স্লো বলে স্লো। দিব্যি হেলেদুলে যাচ্ছি। কবীরের ঘড়িতে তখন সাড়ে আটটা। অথচ –
শওকত : অথচ?
আলিম : আসলে তখন ন’টা। বল তো কী কেলেঙ্কারি কাণ্ড। তা ভালো কথা, কবীর কই?
শওকত : সেও এক দুঃসংবাদ। বেচারা এইমাত্র টেলিগ্রাম পেয়ে বাড়ি ছুটল। বাবার যায় যায় অবস্থা। এই তো স্টেশনে ছেড়ে দিয়ে এলাম।
আলিম : ও তাই নাকি। তাহলে ঘড়িটা –
শওকত : কেন?
আলিম : না মানে, আমার সঙ্গে হয়তো আর দেখা হবে না। কী করব বসে বসে। ভাবছি, যাই দেশের বাড়িতে আপাতত। এখানেও আর কপাল খুলল না। ফাইনাল পরীক্ষাও শেষ। তা ঘড়িটা ওকে ফেরত দেব কী করে। তোকে কিছু বলেছে?
শওকত : না বেচারার বলার ফুরসত থাকলে তো। কোনোমতে ঊর্ধ্বশ্বাসে স্টেশনে দৌড়াতে হলো। (একটু ভেবে) এক কাজ কর না, ওর যে এক মামা ছিল পাইন রোডে। ওঁকেই দিয়ে আয় না।
আলিম : তা মন্দ বলিসনি। তা এক কাজ করো না। তুইও যাবি ওপথ দিয়েই। খামোকা এই দুপুরে হেঁটে হেঁটে অদ্দুর যাব –
শওকত : তাহলে একটু ঘুরে যেতে হয়। আচ্ছা দে, বলছিস যখন –
(শওকত ওঠার উপক্রম করে)
আলিম : (হঠাৎ পকেটে হাত দিয়ে) আরে –
শওকত : কী হলো?
আলিম : ঘড়িটা পাচ্ছি না।
শওকত : পাচ্ছি না মানে?
আলিম : কী জানি। এ পকেটেই ছিল।
শওকত : পকেটে কেন?
আলিম : বড় হবে মনে করে হাতে পরিনি। পকেটে রেখেছিলাম। সাবধানের মার নেই ভেবে।
শওকত : বাসে চড়েছিলি?
আলিম : হ্যাঁ।
শওকত : তাহলেই হয়েছে। আর পেয়েছ ঘড়ি।
আলিম : অবশ্যি ভিড়ও ছিল অসম্ভব। প্রায় ঝুলতে ঝুলতে এসেছি। ওই বাসেই কেউ পকেট মেরেছে তাহলে। কী বিশ্রি কাণ্ড। কী হবে বল তো?
শওকত : কী আর হবে। আশা ছেড়ে দে। ভেবে আর লাভ নেই।
আলিম : না! আজ সবদিক দিয়েই দুর্ভোগ। বল তো কী বলে মুখ দেখাব ওর কাছে। অমন একখানা –
শওকত : তা তুই যা বলছিস, তাতে আমার ঘড়ির চাইতে পকেটমারের জন্য বেশি দুঃখ হচ্ছে।
আলিম : কেন?
শওকত : মানে, ও বেচারি যদি তোরই মতো ঘড়ি দেখে ইন্টারভিউ দিতে যায়, কপালে দুর্ভোগ আছে। আধঘণ্টা স্লো।
আলিম : তুই ব্যাপারটা হেসেই উড়িয়ে দিচ্ছিস। এটা ঠাট্টার কথা নয়।
শওকত : নে নে, হয়েছে। হারিয়ে গেলে আর কী করা যাবে। ইচ্ছে করে তো আর হারাসনি।
আলিম : না না, তবু। এ কেমন হলো। তাছাড়া ওর সঙ্গে আবার দেখাই কখন হবে কে জানে।
শওকত : বেশ তো আমার সঙ্গে দেখা হলে বলে দেব। না হয় কিনে দিস একখানা। তাহলেই সব চুকে যায়।
আলিম : তা নিশ্চয়ই দেব। যেমন করেই পারি। কিন্তু –
শওকত : আর কিন্তু কী?
আলিম : আর যদি দেখাই না হয় –
শওকত : কি যা-তা বকছিস। এ পৃথিবী বড্ড ছোট্ট। দেখা একদিন না একদিন হবেই। শোধবোধের হিসাবটাও না হয় সেদিন মিটিয়ে নিস। মন খারাপ করে কাজ নেই। চল কোথাও বসে এককাপ চা খাই। সেই থেকে গলাটা শুকিয়ে আছে।
আলিম : চল। তা যাচ্ছি। তোর কী মনে হয়। ও আর ফিরবে না?
শওকত : আমার তাই মনে হয়। মানে টেলিগ্রাম দেখে সে কথাই মনে হলো।
আলিম : সত্যি আজ সবদিক দিয়েই বিপর্যয়। তা কবীরের বাড়িতে অসুখের কথা শুনেছিলাম বটে। কিন্তু এই সেদিন তো বাড়ি থেকে এলো –
শওকত : কী জানি। শুনেছি ওর বাবা ব্লাড প্রেসারের রোগী। তাছাড়া বয়স তো কম হলো না। ভালোয় ভালোয় চুকে গেলেই হয়। তা নইলে গোটা সংসারটা ওর ঘাড়ে এসে পড়বে।
আলিম : তাহলে, তাহলে বোধহয় সত্যি আর দেখা হচ্ছে না। কিন্তু এটা কেমন হলো?
শওকত : আবার সেই ঘড়ির কথা?
আলিম : না ভেবে কী করি বল। বেচারির অমন একখানা দামি ঘড়ি –
শওকত : হয়েছে, হয়েছে। ওর হাত থেকেও তো খোয়া যেতে পারত।
আলিম : সে আলাদা কথা। ছি ছি, না জানি কী ভাবছে।
শওকত : ওসব তোর মনগড়া। ও কিছুই ভাবছে না। আর ভাবলে বয়েই গেল।
আলিম : তা ও ভাবুক আর নাই ভাবুক। যার ঘড়ি তাকে ফেরত দিতে না পারলে শান্তি নেই।
শওকত : সেই পকেটমারকে ধাওয়া করবি নাকি?
আলিম : (একটু হেসে) তাও করতে পারি।
শওকত : তদ্দিনে পকেটমারের কাছে অচল ঘড়িও থাকতে পারে!
আলিম : না, না। হাসির কথা নয়। দেখিস, যেমন করে হোক, যতদিনই লাগুক ঘড়ি আমি ওর ফেরত দেবোই। সেজন্যে যদি না খেয়ে কাটাতে হয় তবুও –
শওকত : সত্যি অমন কষ্ট হবে তোর জানলে, নিজের ঘড়িটাই দিয়ে দিতাম। কিন্তু দুঃখের কথা কি জানিস?
আলিম : কী?
শওকত : আমারও কোনো ঘড়ি নেই।
আলিম : হোঃ হোঃ।
শওকত একমুহূর্ত নীরব থাকে। তারপর সেও হাসিতে ভেঙে পড়ে।
তৃতীয় দৃশ্য
বেশ কিছু বছর পর। আলিমের বাড়ি। মোটামুটি মধ্যবিত্ত পরিবেশ। দেয়ালঘেঁষে একটা আলনা ও সে-সঙ্গে ছোটমতো একটা শোকেস। তাতে কিছু মাটির পুতুল ও রকমারি খেলনা রাখা। চারিদিকে ইতস্তত ছড়ানো কয়েকখানা নিচু মোড়া। তারই একটায় সেলাইয়ের কাজ হাতে নিয়ে বসে আলিমের স্ত্রী রোকেয়া। ছেলে রানু ও মেয়ে কুমকুম একই সঙ্গে এসে ঘরে ঢোকে। কুমকুম শোকেসের ওপর থেকে চিরুনি খুঁজে নিয়ে মাথা আঁচড়াতে থাকে। রানুর হাতে একখানা জার্সি। ওখানা গায়ে চড়াতে যায়।
রোকেয়া : একি যাসনি?
রানু : কোথায়?
রোকেয়া : কোথায় আবার, স্কুলে।
রানু : যাব। আজ ক্লাস নেই।
রোকেয়া : স্কুল ফাঁকি দেবার মতলব, না? আমি একদম বিশ্বাস করিনে।
রানু : বাঃ, তোমাকে তখন যে চিঠি দেখালাম। আজ আমাদের স্পোর্টস। নিয়ে আসি চিঠি?
রোকেয়া : থাক থাক, হয়েছে। চিঠি এনে দেখাতে হবে না। বলছিস এই যথেষ্ট। আজকাল স্কুলগুলোও যে কী Ñ আজ স্পোর্টস, কাল পিকনিক, পরশু ছুটি।
রানু : মা।
রোকেয়া : আবার কী? পয়সা-টয়সা চাই বুঝি।
রানু : না। সে কথা নয়।
রোকেয়া : তবে আবার কী। নিশ্চয়ই নতুন কোনো বায়না।
রানু : তুমি রাগ করবে। (কুমকুমকে) বল না, তুই বল।
কুমকুম : আমার কী দায়। যার দরকার সেই বলুক।
রোকেয়া : যা বলার চটপট বল। অত আদর-আহ্লাদের সময় নেই। হাতে অনেক কাজ। এদিকে বাজার আসারও সময় হলো।
রানু : বলছিলাম কী, আজ আমাদের স্পোর্টস। একটু ঘড়িটা দাও না।
রোকেয়া : ঘড়ি? কোন ঘড়ি? আমাদের ঘরে আবার ঘড়ি এলো কোত্থেকে।
রানু : কেন? ওই যে আলমারিতে রাখা।
কুমকুম : না মা, ওকে দিয়ে কাজ নেই। ইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে কোথায় খারাপ করে নিয়ে আসবে। তার চেয়ে ওটা আমি নিয়ে যাব পরশু।
রানু : পরশু আবার কী?
কুমকুম : বারে, আমাদের টার্মিনাল পরীক্ষা। যেন কিছুই জানেন না।
রানু : ভারী তো টারমিনাল পরীক্ষা। তার জন্যে আবার ঘড়ি লাগে নাকি?
কুমকুম : আলবৎ লাগে। সময় দেখে প্রশ্ন লিখতে হয় না। সেবার ঘড়ি ছিল না বলে দশ নম্বরের প্রশ্ন লিখতে পারিনি। মনে নেই?
রানু : যা যা। ওটা কি মেয়েদের ঘড়ি?
কুমকুম : না হোক। আমি কি ওটা হাতে পরতে যাচ্ছি। শুধু সঙ্গে করে নিয়ে যাব। দেবে না মা?
রোকেয়া : ব্যস। ঝগড়া-ঝাটিতে কাজ নেই। কাউকেই নিতে হবে না।
কুমকুম : বেশ তো। দরকার নেই আমার। রানুকেই দাও।
রোকেয়া : এই দেখ, আমি কি সে কথা বলেছি। ছোট্ট কথাটা বুঝছিস না কেন? এ কি আমার ঘড়ি যে তোদের দেব।
রানু : বাবার ঘড়ি আর তোমার ঘড়ি কি আলাদা হলো।
রোকেয়া : ওটা আমার নয়, তোর বাবারও নয়।
রানু : বুঝেছি। তুমি আমাদের বিশ্বাস করো না।
রোকেয়া : ছিঃ ছিঃ। এমন কথা বলতে আছে। তোদের বিশ্বাস করব না, এমন কথা ভাবতে পারলি। কবে কোন জিনিস চেয়েছিস দিইনি।
কুমকুম : ঘড়িটা তো একেবারে চাইনি। শুধু একদিনের জন্যে চেয়েছিলাম রানু।
রোকেয়া : তা জানি।
রানু : আর আমাকে যদি এতোই ভয়, কুমকুমকে দিতেও কি তোমার আপত্তি।
কুমকুম : না মা, আমার দরকার নেই। আমি ঘড়ির নাম উচ্চারণ করব না।
(কুমকুম অভিমান করে বেরিয়ে যায়।)
রানু : আমিও না।
রোকেয়া : আবার সে কথা। ও ঘড়ি ধরলে আস্ত রাখবে না তোর বাবা।
রানু : থাক ওটা আলমারিতে পড়ে।
রোকেয়া : সে কি তিনি শুধু শুধু ফেলে রেখেছেন। এ তোর বাবার এক বন্ধুর জন্যে। অনেকদিন আগে তখন তোদের জন্মও হয়নি। এক বন্ধুর ঘড়ি নিয়ে হারিয়ে ফেলেছিলেন। সেই থেকে তিল তিল করে সর্বস্ব বাঁচিয়ে কিনেছেন ওই ঘড়ি।
(কুমকুমের প্রবেশ। যেন শেষের কথাটা শুনতে পেয়েছে তারই সূত্র ধরে -)
কুমকুম : সে তো পাঁচ বছর থেকে পড়ে আছে মা।
রোকেয়া : পাঁচ বছর কিছু নয়। সাত বছর ধরে পাই পাই করে করে সঞ্চয় করেছেন। তারপর ওই টাকা দিয়ে সত্যি সত্যি কিনে আনলেন ওই ঘড়ি।
রানু : তাহলে যার ঘড়ি তাকে দিয়ে দিলেই হয়।
রোকেয়া : সে কথাও আমি বলি। কোথায় তাঁর সে বন্ধু তার খোঁজ নেই। তবু তোর বাবার এক কথা – যতদিন ওর ঠিকানা না পাই ততদিন ওটা এভাবেই থাকবে। ওটার ওপর আমাদের কোনো অধিকার নেই।
কুমকুম : ওই ভদ্রলোক কি আর অতদিন মনে করে রেখেছেন।
রোকেয়া : সে তোর বাবা জানে। যাকগে ও ঘড়ি নিয়ে আমাদের মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই।
রানু মাথা নিচু করে বেরিয়ে পড়ে ধীরে ধীরে। কুমকুম মায়ের কাছঘেঁষে একটা মোড়ায় গিয়ে বসে। রোকেয়া হাতের সেলাই ফেলে আবার চিরুনিটা খুঁজে বার করেন।
রোকেয়া : এদিকে আয়। একি মাথা আঁচড়ানো হলো। আয়, জট খুলে দিই।
[কুমকুম মাথাটা বাড়িয়ে দেয়। রোকেয়া নিঃশব্দে চিরুনি চালাতে থাকেন। কিছুক্ষণ কাটে। দরজায় শব্দ] তোর বাবা এলো বুঝি। [কুমকুম উঠে পড়ে। আলিমের প্রবেশ] এতো দেরি যে?
আলিম : হ্যাঁ, তাই তো। একটু দেরিই হয়ে গেল বুঝি। তা কটা বাজল?
রোকেয়া : কটা বাজল কেমন করে জানব। এ বাড়িতে ঘড়ির মুখ কি আর কোনোদিন দেখেছি?
আলিম : না মানে ওই ঘড়িটা তো রয়েছে। সময় দেখতে তো বাধা নেই।
রোকেয়া : তোমার ছেলেমেয়েরা এতো আবদার করে একটু পরতে চাইল তাই দিতে পারিনি। আর সময় দেখব। ওখানা বিদায় হলেই বাঁচি।
আলিম : তা এবার বিদায় হবে ঠিকই, দেখে নিও।
আলিম শোকেসের ডালা খোলে। তারপর ঘড়ির বাক্সে তুলে নেয়। ঘড়িখানা বার করে কানে লাগিয়ে দেখে। তারপর নিজের অজান্তেই ওখানা হাতে পরে নেয়। রোকেয়া ও কুমকুম সন্তর্পণে ওর পেছনে এসে দাঁড়ায়।
কুমকুম : চমৎকার লাগছে না?
আলিম : যেন চমকে ওঠে। কী। ও, চমৎকার লাগছে বলছিল। তা লাগবে না। একি যেমন-তেমন ঘড়ি। সেন্টার সেকেন্ড, ষোলো জুয়েলের সুইস ঘড়ি। এবার হাতটাকে ঘুড়িয়ে-ফিরিয়ে দেখে। ভালোই লাগছে না?
রোকেয়া : সত্যি পুরুষ মানুষের হাতে ঘড়ি না থাকলে বড্ড খালি খালি লাগে।
তন্ময় হয়ে দেখে। সত্যিই তো, বেশ মানিয়েছে।
কুমকুমের প্রস্থান।
আলিম : একটু জং ধরে গেছে। কানের কাছে এনে। একি চলছে না মনে হয়। ঝাঁকুনি দিয়ে। না না, ঠিকই চলছে, অনেকদিন পড়ে আছে কিনা, অয়েলিং হয়নি। নিঃশব্দ কয়েকটি মুহূর্ত। ঘড়ির টিক-টিক শব্দ। না না, এ ঘড়ি পরবার আমার কোনো অধিকার নেই। হাত থেকে খুলে নিয়ে রোকেয়ার হাতে দেয়। যেখানে ছিল সেখানেই রেখে দাও। পরের জিনিস, মায়া বাড়িয়ে লাভ কী।
ঘড়িখানা খাপে ভরে রোকেয়া।
রোকেয়া : পেলে তোমার বন্ধুর দেখা?
আলিম : কী বলছো কবীরের কথা? হ্যাঁ হ্যাঁ, সে কথাই তোমাকে বলা হয়নি। এতদিন যার শ্বাসরুদ্ধ প্রতীক্ষা করেছি, তার সঙ্গে দেখা হলো আজ এতদিন পর। অপ্রত্যাশিতভাবেই বলতে পারো। প্রথমে কবীর আমাকে চিনতেই পারেনি। কী করেই পারবে। সে কবে শেষ দেখা মেসে।
রোকেয়া : তাহলে আর কী।
আলিম : কাল ওখানা ফিরিয়ে দেব ভাবছি। যক্ষের মতো যার ধন আগলে রেখেছি এতদিন, তার হাতেই তুলে দেব। তাহলেই আমার নিষ্কৃতি।
রোকেয়া : (যেন একটু ব্যথিত।) সত্যি সত্যি ফিরিয়ে দিতে হবে। তবু ঘরে একটা দামি জিনিস ছিল। ভালোই লাগতো। নিজের না হোক, তবু। মনে হতো আর দশজনের মতো অন্তত একটা দুর্মূল্য জিনিস আমাদেরও ছিল। কালকের পর তাও থাকবে না।
আলিম : যার জিনিস সেই নিক। এ নিয়ে অযথা দুঃখ করা কেন।
রোকেয়া : তোমার বন্ধুটি কি ঘড়ির কথা জিজ্ঞেস করেছিল?
আলিম : না না। কবীরের এদ্দিনে হয়তো সে কথা মনেই নেই।
রোকেয়া : তুমিই বুঝি যেচে মনে করিয়ে দিলে।
আলিম : না, তাও নয়। আমিও বলিনি কিছু। শুধু ঠিকানাটা চেয়ে নিলাম। বললাম কাল দেখা করব। ওর মনে না থাক, কিন্তু আমি যে আমার প্রতিশ্রুতির কথা ভুলিনি সেটা ও কাল জানবে। পকেটে হাত দিয়ে একটা কাগজের খোঁজ করে। কাগজটা মাটিতে পড়ে যায়। আরে ঠিকানাটা লিখে এনেছিলাম গেল কোথায়?
রোকেয়া : কাগজখানা তুলে নিয়ে। এটা নাকি?
আলিম : হ্যাঁ হ্যাঁ। বিউটি ওয়াচ কোম্পানি, থ্রি বাই ফাইভ চামেলী রোড।
রোকেয়া : ওয়াচ কোম্পানি মানে। তোমার বন্ধুটি ওখানে চাকরি করে নাকি?
আলিম : কী জানি, মালিকও হতে পারে। দেখেশুনে তো বেশ সচ্ছলই মনে হয়। বেশ অবাকই হবে কী বলো, ঘড়িটা যখন দিতে যাব?
রোকেয়া : তা হবে হয়তো। কিন্তু তুমি যে তিল তিল করে সর্বস্ব দিয়ে কিনেছ তা ও জানবে না হয়তো।
আলিম : নাই জানুক। তোমরা তো জানবে। (অন্যমনস্ক হয়ে) কই দেখি দেখি, দাও তো ঘড়িটা। (রোকেয়া ঘড়িটা দেয়) একটু মুছে নিই কাচটা। দেখেছ কেমন ঘোলাটে হয়ে আছে। একি পেছন দিকটায়ও জং ধরেছে দেখছি।
রোকেয়া : (যেন শুনতে পারেনি শেষের কথা।) ভালোই, ওখানা বিদেয় করো। পরের দায়িত্ব বয়ে বেড়ানো ভালো লাগে না আর। আজ পাঁচ বছর ধরে –
আলিম : ওকি তুমি মন খারাপ করছো? ঋণ পরিশোধের আনন্দটা কিছু নয়? (রোকেয়ার কাছে সরে এসে) জানো, এ হচ্ছে যাকে বলে নিষ্কৃতি। একটি বছর চলেছে তারই শ্বাসবন্ধ প্রতীক্ষা। প্রতিটি মুহূর্ত ভেবেছি, কবে কেমন করে এ গুরুদায়িত্বের হাত থেকে মুক্তি পাব। এ এক পরম পরিতৃপ্তি।
রোকেয়া : পরিতৃপ্তি। সে তোমার কাছে।
আলিম : কেন, কেন। আমার কাছে কেন শুধু।
রোকেয়া : দেখ, এ নিয়ে বড়াই করা সাজে না। যে সংসারে ছেলেমেয়েদের সামান্য একটা শখ পূরণের সাধ্য নেই, সে সংসারে আবার কিসের পরিতৃপ্তি।
আলিম : শখ। মানে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।
রোকেয়া : তোমার ছেলে বায়না ধরেছিল ঘড়িটা নিয়ে যাবে একটু। আজ ওদের স্কুলে স্পোর্টস।
আলিম : তাই নাকি, তা দিলেই পারতে।
রোকেয়া : যেটা আমাদের নয়, কোনোদিন হবে না, সেটা নিয়ে অনধিকার চর্চা কেন।
আলিম : জানি রোকেয়া, ঠিকই বলেছ তুমি। কিন্তু দেখো, এ আত্মত্যাগ ব্যর্থ হবে না।
রোকেয়া : আত্মত্যাগ, কিসের আত্মত্যাগ? তুমি বাহবা পাবে, সাধুবাদ পাবে, আমাদের কী হবে।
আলিম : (যেন মনঃক্ষুণ্ন হয়।) আমার এ আত্মত্যাগ তোমাদের কাছে কিছু নয়।
রোকেয়া : সে কথা বলিনি। কিন্তু তোমার নিজের আত্মত্যাগের পেছনে আমাদের যে বঞ্চনার ইতিহাস, সেটা ভুলে যেও না। এসব বড় বড় ফাঁকা বুলির কোনো মানে হয় না।
আলিম : হয়, রোকেয়া হয়। তুমি ভুল করছ। ওটাই ছিল আমাদের একমাত্র প্রতিবন্ধক। জাগ্রত প্রহরীর মতো শ্যেনদৃষ্টি নিয়ে বিদ্রুপ করেছে এতদিন। (তারপর হঠাৎ প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে) জানো, সত্যি যখন কবীরের ঘড়িটা ফিরিয়ে দেব, ও অবাকই হবে।
রোকেয়া : অবাক হবে কেন?
আলিম : ঘড়িখানা যখন ওর হাতে তুলে দেব, বিস্ময়ে কবীরের চোখের পলক পড়বে না, ভাববে, সত্যি বন্ধুত্বের মর্যাদা রেখেছি।
রোকেয়া : তুমিও যতসব আকাশকুসুম ভাবতে পারো।
আলিম : কেন, কেন?
রোকেয়া : তার হয়তো এসব কিছুই মনে হবে না। তোমার কাছে সর্বস্ব মনে হতে পারে। ওর কাছে ওটা তুচ্ছ ঘড়ি বই কিছু নয়।
আলিম : হ্যাঁ হ্যাঁ, তাও হতে পারে। তবু যার জিনিস তার হাতে তুলে দেব এটাই কি কম? তারপর আমার আর কোনো দুর্ভাবনা নেই। আমি নিশ্চিন্ত। (হঠাৎ রোকেয়ার দিকে তাকিয়ে স্বর পরিবর্তন করে) আর তারপর একদিন দেখো, আমাদেরও হবে –
রোকেয়া : কী হবে?
আলিম : আমাদেরও হবে। রাজুর, কুমকুমের, তোমার।
রোকেয়া : আর তোমার।
আলিম : হ্যাঁ হ্যাঁ। আমার হবে, দেখে নিও।
রোকেয়া : (যেন অবিশ্বাসের সুরে) কী জানি, যাক গে। বেলা অনেক হলো। খেতে এসো।
চতুর্থ দৃশ্য
ঘড়ির দোকান। দেখা যাবে কাচ-বসানো ছোটমতো একটা টেবিলে ঝুকে ঘড়ি পরীক্ষা করছে কবীর। এক চোখে ঘড়ি মেরামতের সনাতন আতস কাচ আঁটা। আলিম এসে ঢোকে। আতস কাচ সরিয়ে এক অবসরে তাকে লক্ষ করে কবীর। হাত নেড়ে স্বাগত জানায়। তারপর কাজে মন দেয়। বোধহয় দু-একটা খুচরো কাজ তাড়াহুড়ো করে শেষ করে নিতে চায়।
কবীর : কে এসো, এসো। অসুবিধে হয়নি খুঁজে বের করতে আশা করি। এক মিনিট – মানে এই হাতের কাজটা সেরে –
(জনৈকা মহিলা খদ্দেরের প্রবেশ। কবীর এবার কাজ ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়) আসুন, আসুন। (আলিমকে চেয়ার দেখিয়ে) একটু বসো, ভদ্রমহিলা কী চাইছেন দেখে নিই। রিস্টওয়াচ দেখাব? লেডিস?
ভদ্রমহিলা : অন্য একটি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে। না না, এটা নয়। ওভ্যাল শেপের ওটা দেখান তো।
কবীর ওখানা বার করে দেয়, আলিম বসে না। সতৃষ্ণ নয়নে সাজানো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে
কবীর : এটাও ভালো, জার্মান ঘড়ি।
ভদ্রমহিলা : সময় ঠিক দেবে তো?
কবীর : (ভদ্রমহিলাকে ঘড়ি পরতে দেখে) আপনাকে মানাবে ভালো।
ভদ্রমহিলা : কী বললেন?
কবীর : (যেন কথার মোড় ঘুড়িয়ে) আমরা খদ্দের চিনি। দেখেই বুঝেছি আজেবাজে জিনিসে আপনার মন উঠবে না।
ভদ্রমহিলা : আর ভালো আর মন্দ। একটা হলেই হলো। দু-দুখানা ঘড়ি বাড়িতে অচল হয়ে পড়ে আছে। আজকালকার জিনিসে ভরসা নেই।
কবীর : এখান থেকে কিনেছিলেন?
ভদ্রমহিলা : তা কি আর মনে আছে। জানি না, কোন দোকান থেকে।
কবীর : দেখুন, বললে বলবেন নিজের জিনিস গছাতে চায়। সে কথা নয়। আমরা আসলে হোল সেলার্স। আপনাদের মতো দু-একজনের সঙ্গে খুচরো কারবার। তা নইলে আজকাল যা কমিশন, আমাদের পোষায় না।
ভদ্রমহিলা : (ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে) আচ্ছা, আরেকটু চ্যাপ্টামতো হলে ভালো হতো না?
কবীর : (একমুহূর্ত কী যেন ভাবে। তারপর উজ্জ্বল হয়ে) থাকবে না কেন। সবরকমই পাবেন। আমরা হচ্ছি সরাসরি ইম্পোর্টার। এখানে যা নেই, অন্য কোথাও তা পাবেন না। (অর্থপূর্ণ হাসি) চান তো দিতে পারি। পয়সার জন্য বলছি নে দু-পয়সা বেশি দিয়ে না হয় গছিয়ে দিলাম। কিন্তু ব্যবসা তো একদিনের নয়। কাল মনে মনে বলবেন, দোকানদার আচ্ছা জালিয়াত। না, ওসব আমাদের এখানে পাবেন না। (একটু থেমে) আপনাকে যা দিয়েছি, আমাদের নতুন স্টক।
ভদ্রমহিলা : বেশ বলছেন যখন। তা দাম কত বললেন।…
কবীর : (কী মনে করে অন্য একখানা ঘড়ি দেখায়) দেখুন এ ঘড়ি দেখতেও ভালো, দামেও সস্তা; কিন্তু মিথ্যে কথা বলবো কেন, ওপরটাই যা, ভেতরে কিচ্ছু নেই, এসব আপনাকে দিতে যাব না। (ঘড়িখানা খাপে বন্ধ করে রেখে দেয়) (একটু থেমে) আপনাকে যেটা দিয়েছি, মানে ওটা খাঁটি জিনিস। ব্যবহার করে দেখুন। পছন্দ না হলে নিয়ে আসবেন।
ভদ্রমহিলা : (জার্মান ঘড়িটা নেড়েচড়ে দেখে) বেশ, বলছেন যখন। গ্যারান্টি দেবেন তো।
কবীর : গ্যারান্টি স্লিপ সঙ্গেই রয়েছে।
ভদ্রমহিলা : হুঁ, তা দাম কতো বললেন।
কবীর : দুশো পঁয়ত্রিশ, তা আপনি দুশো তিরিশই দিন। কেস দেব।
ভদ্রমহিলা : না, না তার দরকার নেই। আমি হাতেই পরে নেব।
কবীর ক্যাশমেমো লেখে। ভদ্রমহিলা টাকা দেন
কবীর : (ক্যাশমেমো বাড়িয়ে দিয়ে) কোনো অসুবিধা হলে নিয়ে আসবেন।
(ভদ্রমহিলার প্রস্থান। বাকি ঘড়িগুলো সাজিয়ে তাকে ঠিক করে রাখে কবীর। এবার আলিমের প্রতি দৃষ্টি দেয়) তারপর কী খবর বলো। তা ঠিক-ঠিক চিনে এসেছ দেখছি। কাল তোমাকে দেখে চিনতেই পারিনি।
আলিম : আমি কিন্তু ঠিকই চিনেছিলাম। তা এখানে কতদিন?
কবীর : কতদিন মানে? এক যুগ বলতে পারো। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের পুরো দায়িত্বটা পড়ল ঘাড়ে।
আলিম : দোকানটা বুঝি তোমারই।
কবীর : তা একরকম বলতে পারো। দোকান আর কী। কোনোমতে দুটো অন্নের সংস্থান হয় এই যা। চা খাবে?
আলিম : না না থাক। বরং তোমাকে একদিন নিয়ে যাবো বাসায়।
কবীর : তা যাব নিশ্চয়ই। (একটু থেমে) যাব তো বলি। ছাই ফুরসত পেলে তো। তারপর, আর কী খবর বলো?
কবীর আবার কাচের টেবিলে রাখা ঘড়িটা নিয়ে বসে। চোখে আতস কাচ পরে
আলিম : অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম, কবে তোমার দেখা পাব।
কবীর : শেষ পর্যন্ত দেখা হয়েই গেল, তাই না?
আলিম : আর সত্যি কথা বলতে কী, তোমার সঙ্গে দেখা করে পরম স্বস্তি অনুভব করছি।
কবীর : তা তো হবেই। কতদিনের বন্ধুত্ব। তবু কী আশ্চর্য আমার স্মরণশক্তিটাই যেন কেমন। সেই মেস-জীবনের কিছুই মনে নেই।
আলিম : মনে নেই। শওকতের কথা মনে নেই?
কবীর : (আতসকাচ খুলে নেয়) কোন শওকত, তা কত বছর আগেকার কথা। হবে হয়তো বলছ যখন। ঠিক মনে পড়ছে না।
কবীর আবার কাজে মন দেয়, আলিম এবার পকেট থেকে ওর সঙ্গে আনা ঘড়ির কেসটা বার করে
আলিম : তুমি ব্যস্ত মানুষ, সময় নষ্ট না করে কাজের কথা বলি।
(কবীর আতস কাচ নামায়) ওর হাতের ঘড়িখানা লক্ষ্য করে।
কবীর : কী ঘড়ি ওখানা?
আলিম : (বাড়িয়ে দেয়) তোমাকে দিতেই এসেছি।
ব্যস্ত হয়ে কবীর আতসকাচ লাগিয়ে আলিমের ঘড়িখানা পরীক্ষা করতে শুরু করে –
কবীর : দেখি, দেখি, দাও তো।
আলিম : জানি না, এ ঘড়ি তোমার মনমতো হবে কিনা।
কবীর : (যেন সে কথা শোনেনি।) জং ধরে গেছে দেখছি। কতদিন আগে কিনেছিলে?
আলিম : বছর পাঁচেক তো হবেই।
কবীর : তাই বলো। এটার ব্যালেন্স স্টাফ খারাপ, হেয়ার ¯িপ্রংটাও বদলানো দরকার। অয়েলিং করাওনি বোধহয়। এ তো আর ঘড়ি নেই হে, শুধু লোহা-লক্কড়।
আলিম : কিন্তু আমি চারশো পঁচিশ টাকা দিয়ে –
কবীর : (তখনও ঘড়িটা পরীক্ষা করে দেখে) ঠকিয়েছে, ঠকিয়েছে, আমার কাছে সস্তায় পেতে –
আলিম : কিন্তু ওটা যে আমি তোমার জন্যেই –
কবীর : শোন শোন, যা হয়ে গেছে তার জন্যে আক্ষেপ করে লাভ নেই, এ বিজনেসে আছি এক যুগ, বহু কাস্টমার ঠকে, তুমিও ঠকেছো। আমি বলি এক কাজ করো –
আলিম : কী?
কবীর : এখানা মেরামত করে তোমার পোষাবে না, বরং আমার কাছে ছেড়ে যাও, কোনো মফস্বলে কাস্টমার পেলে চালিয়ে দেব।
আলিম : কিন্তু –
কবীর : কিন্তু-টিন্তু কী হে? অন্য কেউ হলে বলতাম চিজ চলবে না, কিন্তু তুমি বন্ধু মানুষ। তোমাকে তো আর ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।
(দেরাজে হাত দিয়ে টাকা বার করে) নাও –
আলিম : একি টাকা দিচ্ছ যে –
কবীর : ওই তোমাকে বলে তিরিশ টাকা দিচ্ছি। নইলে এ ঘড়ির এক কানাকড়িও মূল্য নেই। রাখ, রাখ। ঠকোনি, ঠকোনি, অন্য কেউ হলে দশ টাকা দিয়ে বিদেয় করত। তুমি বন্ধু মানুষ।
আলিম : কিন্তু এ কেমন হলো? আমি কী ভেবেছিলাম, আর এ কী হলো?
কবীর : তাই হয়, তাই হয় ভায়া। তুমি ভেবেছিলে একশো টাকা পাবে, তা –
আলিম : না না, সে কথা নয়, আমি –
(ভদ্রমহিলার পুনঃপ্রবেশ)
ভদ্রমহিলা : দেখুন, আমার একটু ভুল হয়ে গেছে, অন্য কোনো রঙের ব্যান্ড আছে? এ রংটা একদম পছন্দ হচ্ছে না।
কবীর : একখানা বার করে। এখানা নিন, স্টেনলেস স্টিলের, মানাবেও ভালো।
ভদ্রমহিলা : তাহলে তাই দিন। আচ্ছা বললেন না তো চাবি দেন কখন?
কবীর : (ভদ্রমহিলার ঘড়ি হাতে নিয়ে) দিন। এলেন যখন সময়টাও এডজাস্ট করে দিই। (আলিমের দিকে তাকিয়ে) দেখছ তো এ সময় ক্লায়েন্টের ভিড়। এখন তাহলে এসো – হ্যাঁ। আরেকদিন দেখা হবে।
