উপন্যাস

ঐ রকম একজন

জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে দেখল কামাল মাটি দেখা যাচ্ছে। একটানা ছ’ঘণ্টা পঁয়ত্রিশ মিনিট চলার পর খানিকক্ষণের মধ্যেই জাম্বো বিমান রানওয়ে স্পর্শ করবে। দেশে ফেরার বাসনা তাহলে সত্যি সফল হলো সাড়ে পাঁচ বছর পর। যেমন ধাপে ধাপে উচ্চতা কমল, আকাশের গা থেকে তেমনি ক্রমশ ভূপৃষ্ঠের দিকে নেমে আসছে তারা। জানালা ছুঁয়ে যায় খ- মেঘ। খোলা থাকলে

লোকজন

রিপোর্ট খাতা সঙ্গে নিয়ে প্রায় আদ্ধেক পথ চলে এসেছে। এখন আবার ডাক্তারের চেম্বারে ফিরে যাবার মানে হয় না। নতুন কিছু জিজ্ঞেস করার নেই। তেমন মনে করলে তখুনিই বলতে পারত। অকাট্য যুক্তি। কিন্তু সবসময় যুক্তির শাসন চলে না। ফিরতি যাত্রায় কিছু না হোক খানিকটা সান্ত¡না মিলতে পারে। যেটার এ মুহূর্তে সে বড় কাঙ্গাল। ভরসার কথা নাইবা

মধুগড়

এক হুশ্ হুশ্ করে স্টেশনের বড় ছাউনির ভিতর ঢুকে পড়ে মেল ট্রেন। রাতজাগা ক্লান্ত-চোখে হেডলাইট জ্বলছে। ধুলোয় আর নভেম্বর-সকালের সলজ্জ কুয়াশার সেটা হারিকেনের ধীমে শলতের মতো। আকাশে রং-এর আভা। লাল গোলাপির মাখামাখি। কখন হুড়োহুড়ি সরে এক ঝাঁক পায়রা উড়ে যায় স্টেশনের ছাউনি থেকে। ট্রেনের আতঙ্কে, না আলোর নেশায় বোঝা যায় না। শেষবারের মতো সিটি বাজিয়ে

সৌরভ 

সেই মেহগিনি দরজা ঠেলে ভেতরে আসতেই এক প্রলুব্ধকর আমন্ত্রণ কথা বলে ওঠে, আসুন। দরজার হাল্কা পীতাভ পর্দা কেঁপে ওঠে। বাইরে তখন কোনো ফাল্গুন সন্ধের উদ্দাম হাওয়া। খোলা দরজায় তার দুরন্তপনাই এবার এলোমেলো পর্দার আড়ালে সরীসৃপের মতো জড়িয়ে ধরে কাকে। আড়াল করে রাখে। এবার দরজাটা ভেজিয়ে দেয় জাহেদী। আমন্ত্রণকারিণীর মুখোমুখি দাঁড়ায় এসে। আশ্চর্য নিটোল, ঢলঢলে একখানা

স্রোত

একটু একটু করে কুয়াশার ঘোর কাটছে। কিছুই দেখা যাচ্ছিল না এতক্ষণ। কাচের জানালার ওপর শিশির ঝরেছে সারারাত টুকরো টুকরো অভিমানের মতো। জানালা খুলে দিয়েও স্বস্তি নেই। কন্কনে হাওয়ার দৌরাত্ম। বোধহয় বাইরে টিপ্ টিপ্ বৃষ্টি। টেবিলের টাইমপিসখানা তখন থেকে বাজে বকছে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে সেটা যেন রীতিমতো ক্লান্ত।  সেই সকাল থেকে সোয়েটার চাপিয়ে গলায়

চোখের রঙ

সিঙ্গাপুর থেকে চিঠি এসেছে বড় ভাই মাসুদের। দেশে থেকে যখন সুবিধে হলো না, চলে আসুক এখানে। আর কিছু না জুটলে দোকান দেখাশোনা করতে পারে মাশুক। খেয়েপরেও দু’পয়সা হাতে থাকবে। চাকরির মোহ ততটা নয়, যত ওই নাম এবং দূরত্বের। স্বপ্নালু দূরপ্রাচ্য। এলাচি-দারুচিনি রাবার বন আর ইউক্যালিপটাসের প্রলোভন যেখানে হাতছানি দেয়। পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, চীনা, ইংরেজ দুনিয়ার সব

সরোবর

এক ছায়াঘন পাম রোডের এক প্রান্তে দেখা হলো তার সঙ্গে। প্রথমে চিনতে পারিনি। না চেনবারই কথা। সেই কবে দেখেছিলাম। তখন তার বয়েসই কত। সেদিনের চেহারার সঙ্গে আজ কোনো মিল নেই। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত একটি মূর্তি স্মৃতির জাদুঘর থেকে উঠে এসেছে। ধোঁয়াটে চশমার আড়ালে তার অসহায় চোখ জোড়া খুঁটে খুঁটে দেখছে আমাকে। তারপর একসময় দৃষ্টি স্থির হলো

শখের পুতুল

বাস থেকে নেবে রিকশা, তারপর খানিকদূর পায়ে হাঁটা। তাড়াহুড়া কামালের। সময়ের সাথে যুদ্ধে জয়ী না হলে চলবে না। হাতে অনেক কাজ। পেড্রো ডি সুজা রোড পর্যন্ত গিয়েছিল বাসে। তারপর বাস নেই, কাঁচা রাস্তা। খানিকটা রিকশায় গিয়ে বাকিটা হাঁটতে হলো। আকাশ মেঘলা। কখন বৃষ্টি শুরু হবে ঠিক নেই। ঠান্ডা কন্কনে হাওয়ায় তারই আভাস। পাঁচটায় আসতে বলেছেন

উত্তাপ 

যেটা মনে হয়েছিল এক খ- কালো মেঘ দুপুর না গড়াতেই তা ঢেকে ফেলল সমস্ত আকাশ। চকচকে উজ্জ্বল দিনের গায়ে পা-ুর ক্লান্তি নিয়ে নাবল কপিল বর্ণের সন্ধ্যা। তার পরই এলো বৃষ্টি – অঝোরে গাছপালা কাঁপিয়ে, সহস্র বিদ্যুৎ রেখার আকাশের মানচিত্র বর্ণায়িত করে। ছন্দহীন অবারিত বৃষ্টি প্রথমে মেটাল দগ্ধক্লিষ্ট মাটির ক্ষুধা। কার কল্যাণ স্পর্শের মতো স্বচ্ছ শুভ্র

প্রশ্ন জাগে

নাসিম বানুর হাতে তৈজসপত্র ভাঙ্গেনি একটাও, এটা সাতচল্লিশ বছর চার মাস সতেরো দিনের একটা চক্রবৃদ্ধি অহমিকা। জীবনটাকে তিনি ভেঙ্গেছেন খান খান করে কৈশোরে যৌবনে আর বয়োবৃদ্ধির বর্তমান সোপানে। রাইটার্স বিল্ডিংয়ের শেষকৃত্য হবার অপেক্ষমাণ ফাইলগুলোকেও লজ্জায় হার মানাতে পারতো নাসিম বানুর ডাইরি যা কিনা ছিল ছোট, বড়, মাঝারি, লাল, নীল, সবুজ, হলদে, মেরুন রঙের। ধূসর হয়ে