বাস থেকে নেবে রিকশা, তারপর খানিকদূর পায়ে হাঁটা। তাড়াহুড়া কামালের। সময়ের সাথে যুদ্ধে জয়ী না হলে চলবে না। হাতে অনেক কাজ। পেড্রো ডি সুজা রোড পর্যন্ত গিয়েছিল বাসে। তারপর বাস নেই, কাঁচা রাস্তা। খানিকটা রিকশায় গিয়ে বাকিটা হাঁটতে হলো।
আকাশ মেঘলা। কখন বৃষ্টি শুরু হবে ঠিক নেই। ঠান্ডা কন্কনে হাওয়ায় তারই আভাস।
পাঁচটায় আসতে বলেছেন পড়–য়া ছাত্রের বাবা। নিজে বসে থেকে যাচাই করে নেবেন। ইংরাজি, অঙ্ক আর ইতিহাসের দখল দেখবেন। হয়ত অভিজ্ঞতাও জিজ্ঞেস করবেন। ভালো করে দেখে নিল পকেটটা, বি. এ-র সার্টিফিকেট আছে তো। হৃদয়ের পর্দা থরথর করে কাঁপছে। হৃদয়ও কি কাঁপছে, কে জানে? বিচিত্র নয়। প্রথম চাকরি, প্রথম অভিজ্ঞতা, সবকিছুরই বোধহয় এমনি দশা।
আরেকটু হলেই পা গিয়ে পড়েছিল আর কি। কিন্তু তার আগেই দু’পাটি দাঁত বিকশিত হয়ে উঠল।
কোথায় ছুটছ এই ভরা বিকেলে?
সুধাকর ভদ্রের সেই হাসি। এক একটা হাসির পেছনে নাকি এক একটা ইতিহাস। কোনো হাসিতে কান্না, কোনোটায় অভিমান, আবার কোনোটায় হতাশা। সুধাকর ভদ্রের হাসিতে কী? ভালো করে কথাটা আজও বুঝতে পারেনি। বুঝতে কি চেষ্টাও করেছে কোনোদিন। আসলে ওই হাসি তো আর সুধাকর ভদ্রের নয়। ওটা ছায়া, আরেক হাসির। কার?
হাত দুটো এমন চেপে ধরল সুধাকর, না করতে পারল না কামাল। তবু আমতা আমতা করে বলতে হলো, ‘না ভাই আজ তো কোথাও যাওয়া হবে না। বড্ড জরুরি কাজ।’
আকাশের রঙের মতো মেঘ নাবল সুধাকরের চেহারায়। মিলিয়ে গেল হাসি। হাত ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘বেশ তবে থাক আরেকদিন হবে, কি বলো।’
কথা বেরোয় না কামালের মুখে। সুধাকরের সাথে এর আগে আরও কতদিন দেখা। তখন যেতে বলেনি ওদের বাড়ি। আজকাল কী যেন হয়েছে। দেখলেই ধরে বসে। নিশ্চয়ই চাকরি খুঁইয়ে বড্ড একা মনে হয় তার।
সুধাকর চলে যাচ্ছিল। কামালই কথা বলল, ‘হ্যাঁ যাব একদিন। সব ভালো তো?
বলেই অনুভব করল, ‘সব’ না বলে ‘সবাই’ বলা উচিত ছিল।
‘ভালো’।
হাতে ঘড়ি না থাকলেও স্পষ্ট বোঝা যায় সময় হয়ে আসছে। চাকরির তাড়না বলছে, সময় হয়ে আসছে। জীবনের সব ব্যর্থতা ঘড়ি হয়ে চোখ রাঙায়, সময় বয়ে যায়। পা চালিয়ে হাঁটো।
পেছন ফিরে আরেকবার তাকাল। না, সুধাকর ভদ্র নেই, তার হাসিও নেই। বোধহয় পাশের গলিটা দিয়ে মোড় নিয়েছে।
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি নাবছে। কোথাও গিয়ে দাঁড়ান দরকার। তার আগেই লাল সুরকির আস্তরণ দেওয়া বাড়িটার দিকে তাকিয়ে পুলকিত হয়ে ওঠে। বিজ্ঞাপনের দেওয়া নম্বর। ভুল নেই। থার্টি ওয়ান বাই টু ডিনশ লেন।
অনেকক্ষণ কড়া নেড়েও কারও সাড়া পাওয়া গেল না। বড়লোকের বাড়ি। দেরি হওয়া স্বাভাবিক। সামনে ছোট্টমতো একটা লন। কোনো সৌখিন এককালে বাগান করে থাকবেন। এখনও দু’একটা নাম না জানা ফুল ফুটে আছে পরম অবহেলায়। সেটুকু পেরুলেই ছোট্ট মতো বারান্দা। একটা বেঞ্চি পাতা। বসবার আকুতিও নেই। না বসবার নিষেধাজ্ঞাও নেই। কামাল বসল।
বছর বাইশেকের একটি লোক বেরিয়ে এলো। পোশাক আশাকে ঠিক বোঝা গেল না লোকটা কে। হাত গোটানো ফুল আস্তিনের শার্ট। ময়লা পাতলুন আর খাকি ক্যানভাস জুতো পরনে। কামালকে দেখেই একটু প্রসন্ন মনে হলো। বলল, ‘এসে গেছেন, বসুন।’
বলেই সঙ্গে সঙ্গে পর্দা ফাঁক করে মিলিয়ে গেল ভেতরে। মুহূর্তের উন্মোচনে কয়েকটা পুলকিত চোখের তারা দেখল কামাল। চোখের তারারা এমনি জ্বলে। নীল, গাঢ় নীল তারা। পলকেই মূর্ত হয়ে ওঠে তাদের জিজ্ঞাসা।
কোলের ওপর হাত ঠেকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে কামাল। এখুনি ডাক আসবে ভেতর থেকে। গাঢ় নীল চোখের বদলে চুরুট খাওয়া বয়সের পোড় খাওয়া এক জোড়া চোখ। সে চোখে নীরব হুঙ্কার আর গর্জন। সে চোখ প্রেম দেয় না, চাকরি দেয়।
লোকটি আবার ফিরে এলো। এবার মৃদু হাসি ওর চোখে মুখে। অভ্যাগতের প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরা।
বলল, ‘আপনাকে ডাক্তার সাহেব পাঠালেন বুঝি?’
কোনো কথা সরল না কামালের মুখে। বিমূঢ়ের মতো চেয়ে রইলো।
একটা এ্যাম্পুল বার করে দেখাল, ‘এটাই তো চেয়েছিলেন ডাক্তার সাহেব, না। সিরিঞ্জ আছে তো?’
আকাশ থেকে পড়ল কামাল। চাকরির উমেদারীর এ ধরনের নাটকীয় পরিণতির কথা ভাবতে পারেনি।
ব্যাপারটার নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া ভালো। কোথাও নিশ্চয়ই মস্তবড় ভুল হয়ে থাকবে।
লোকটিকে এবার নিজেই ডেকে বলল, ‘দেখুন আপনি কোনো ডাক্তারের কথা বলছেন বুঝতে পারছি না। আমি সাবের সাহেবের সাথে –
সাবের সাহেব মানে গৃহকর্তা।
‘সাবের সাহেব’, ভ্রƒ-র ধনুক বেঁকে উঠল কুঞ্চনে। তারপর একটু থেমে বলল লোকটি, ‘তার সঙ্গে তো দেখা হবে না। তিনি ভয়ানক ব্যস্ত। কী কাজ বলুন।’
পকেটে হাত দিয়ে কাগজের কাটিং বার করে দেখাল। গৃহশিক্ষকের চাকরির বিজ্ঞাপন।
হাতে না নিয়েই এক পলক দেখে লোকটি ঠোঁট উল্টে বলল, ‘তাই বলুন। উঃ, এ নিয়ে সাতজন। কাকে পড়াবেন সায়েব। যাকে পড়ানোর কথা তার জীবন নিয়েই টানাটানি।’
স্বাভাবিক কারণেই কৌতূহল হচ্ছিল। কিন্তু চাকরির উমেদার হয়ে এত কথা বলা যায় না।
লোকটি চলে যাচ্ছিল। কী মনে করে একবার ফিরে এসে বলল, ‘আপনি কোনদিক দিয়ে যাচ্ছেন?’
‘কেন?’
‘না থাক। এ নিয়ে তিনবার ডাক্তারের বাড়ি লোক পাঠান হলো। কি যে দায়িত্বজ্ঞান। ভাবছিলাম পপুলার ফার্মেসির ওদিক দিয়ে গেলে –
যন্ত্রচালিতের মতো বলল কামাল, ‘নিশ্চয়ই, কী করতে হবে বলুন?’
‘বলবেন মণির জ্ঞান ফিরছে না। টেমপারেচার বেড়েই চলেছে। একটা ইঞ্জেকশনের কথা বলেছিলেন তার –
কথা শেষ না হতেই এসে ঢুকলেন আধা কাঁচা-পাকা চুলওয়ালা মাঝামাঝি বয়সের একটি লোক। বোধহয় সেই বহু-ইপ্সিত ডাক্তার। হাতে কালো পোর্টফোলিও ব্যাগ। চশমা নামিয়ে বললেন, ‘রোগী কই?’
মনে মনে একটু ক্ষুব্ধই হলো কামাল। এরকম মহা কাজের সুযোগ মাঠে মারা গেল। কে বলতে পারে এরই সূত্র ধরে হয়তো একদিন –
লোকটি ব্যস্ত হয়ে ছুটে এলো কামালের দিকে। বলল, ‘নাম করতেই ডাক্তার এসে গেল। আপনাকে আর যেতে হলো না।’
তারপর কি ভেবে নিয়ে আবার বলল, ‘দেখছেন তো কারও মরবারও ফুরসৎ নেই। বরং আরেকদিন আসুন।’
হতাশার কালো মেঘে ওইটুকুই আশার সোনালি রোদ।
কোথায় বড় ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা বাজার শব্দ। এত আয়োজন উদ্দীপনা সব শেষ। ভাগ্যের চরকিটা যেন লাগ লাগ করেও ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছে হাত থেকে। পথ হাঁটাই শুধু সার।
জীবনের প্রথম চাকরির অভিজ্ঞতা। চাকরি না বলে চাকরি খোঁজা বলাই ঠিক হবে।
সুধাকর ভদ্রের ওখানে গেলে হতো। অন্তত আজকের এই ব্যর্থ চেষ্টার পুরো কাহিনীটা শুনিয়ে কিছুটা দুঃখ লাঘব করা যেত। কিন্তু ওকেই বা পাওয়া যাবে কোথায়। কোথায় কোন আড্ডায় বসেছে কে জানে।
সামনেই পার্ক। একটা খালি বেঞ্চিতে গিয়ে বসল। দু’আনা দিয়ে এক ঠোঙ্গা চিনেবাদাম কিনল। অসম্ভব ক্লান্তির পর যেন পরম ভালোলাগা। অন্তত কয়েক মুহূর্তের জন্য সময়ের উদ্দাম গতিকে ভুলে গিয়ে পাথর হয়ে যাওয়া। এতেও সুখ, এতেও আনন্দ। কিন্তু বুদ্ধিমান আর তথ্যপ্রিয় মানুষদের সে কথা বোঝাবে কে?
পার্মানেন্ট ব্লু-ব্ল্যাকে ছেয়ে গেছে আকাশ। খানিকক্ষণের মধ্যেই এই আকাশের বুক চিরে হীরের মতো সুতো ঝরবে, পড়বে, গুঞ্জন উঠবে। কাব্যও কম হবে না এ নিয়ে।
এমন কাব্য সেও করেছে মাঝে-সাজে। ফার্নান্ডেজ ম্যানসনের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থেকেছে আকাশের দিকে অনেক দিন। দিন নয়, সন্ধ্যা। সন্ধ্যাও নয়, রাত।
নিচে থেকে তাকালে দানবীয় মনে হয় বাড়িটাকে। চারতলা বাড়ি। বাস থেকে নেবে যন্ত্রচালিতের মতো চলে গেছে প্রিন্সেস স্ট্রিট বরাবর। কিছুদূর এগিয়েই রাস্তা দু’ভাগ। ডান দিকে এগুলেই ফ্লাওয়ার লেন। সেখানেই ফার্নান্ডেজ ম্যানসন। তিনতলা উঠতে ভয়ই করে। লিফট আছে। কিন্তু কোনোদিন সাহস করে ওঠেনি। মনকে প্রবোধ দিয়েছে, ও তো কাজের মানুষ নয়। ওর কি দরকার লিফটের। সময় বন্ধক দিয়ে আসেনি। সময়ের পাহাড় ক্ষইয়ে দেবে বলেই তো এত আয়োজন।
সুধাকর ভদ্র কেবল একদিন বলেছিল, যেও। সে থেকেই এর সূত্রপাত।
খবরের কাগজের অফিসে সুধাকরের সঙ্গে আলাপ। সবেমাত্র একটু হাত মকস করছে। তবু একটা দুটো লেখা নিয়ে প্রায়ই হাজির ‘দৈনিক যুগবাণী’ কাগজের আপিসে। সেখানেই সাক্ষাৎ সুধাকর ভদ্রের সঙ্গে।
একদিন আচ্ছা বিপদেই পড়েছিল। সম্পাদক ছিলেন না। নিউজরুমে ঢুকতেই ঝাঁকড়া মাথা মতো একটি ছেলে বলে বসল, ‘গত রোববারের ‘সাত সমুদ্র’ লেখাটা কি আপনারই?’
কাচুমাচু করে জবাব দিয়ে বলেছিল, ‘হ্যাঁ।’
খানিকক্ষণ কি ভেবে নিয়ে বলেছিল, ‘ছেলেটি লেখেন ভালোই। তবে –
বুক ধুক্ ধুক্ করছিল কামালের। নিশ্চয়ই কোনো কঠোর সমালোচনা শুনতে হবে।
অথচ খুব মামুলি সুরেই বলল তার সমালোচক, ‘আপনার লেখায় স্টেনবেকের খুব প্রভাব পাওয়া যায়। ওর লেখা ‘পার্ল’ বইটা নিশ্চয়ই পড়েছেন। ঘটনাটা প্রায় সেরকমই। অবশ্যি কিছু এসে যায় না। তবে হ্যাঁ অদ্ভুত হাত আপনার। লুসিও সে কথাই বলে।’
অদ্ভুত হাতের প্রশংসায় এতটা মুগ্ধ হতো না যতটা পুলকিত হলো ‘লুসি’ নামের উল্লেখে। সেদিন অবশ্যি সাহস করে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারেনি, তার এই অচেনা অনুরাগিণীটি কে?
হাতে কোনো কাজ ছিল না। একটা লেখা বাবদ কিছু টাকা পাওনা ছিল। ম্যানেজার আসেনি। সুতরাং পেমেন্ট বন্ধ। নিরাশ হয়ে উঠে যাবার উপক্রম করছিল কামাল।
সুধাকর ভদ্র উঠে দাঁড়াল।
বলল, ‘কোনদিকে যাবেন?’
যাবার কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নেই। কাজেই বলতে হলো, ‘ভাবছি মেসেই ফিরে যাব।’
‘মেসে ফিরে যাবেন, কেন? তার চেয়ে চলুন সেন্ট অগাস্টিন চার্চে। কার্ডিন্যাল গোমেশের ফিউন্যারাল মাস।’
কথাটা শুনে রীতিমতো অবাক হয়েছিল কামাল। সুধাকরের সঙ্গে সেন্ট অগাস্টিন চার্চের যোগসূত্র কী করে হতে পারে ভেবে পেল না।
প্রায় না বুঝেই বলল, ‘চার্চে আপনি যান নাকি?’
সুধাকর জবাব দেবার আগেই পাশের এক ভদ্রলোক কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ‘বুঝতে পারছেন না ওরা খ্রিষ্টান। ইন্ডিয়ান খ্রিষ্টান।’
আপত্তি ছিল না কনফুসিয়াস হলেও। হাতে কোনো কাজ নেই। বরং এ সুযোগে একটা চক্কর দিয়ে এলে সময়টা কাটবে।
গেটের কাছে এসে সুধাকর ভদ্র মত বদলালো। বলল, ‘না থাক আপনাকে ওসব জায়গায় নিয়ে লাভ নেই। প্রথম পরিচয়েই মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে যেতে রাজি নই আপনাকে। তার চেয়ে আমি একাই চলি। পরে আবার দেখা হবে, কি বলেন।’
বলার আর কি থাকবে। মনে মনে একটু রাগই হলো। কোথাকার কোন সুধাকর ভদ্রের কথায় নেচে উঠেছিল। তাও আবার ফিউন্যারাল মাসে। গোড়াতেই যদি না করে বসত তবে ভালো হতো।
এরপর আরো আনেক দিন দেখা হয়েছে সুধাকর ভদ্রের সঙ্গে। কখনও দুপুরে, কখনও বিকেলে, কখনও বা বেশ রাত করেই। বন্ধুবান্ধবও জুটল। দেখা হলেই তারা বলে, ‘আপনার গেল হপ্তার লেখা কিন্তু হয়েছিল বেশ। কিন্তু আপনার ট্র্যাজেডির দিকে বড় ঝোঁক – না?’
সুধাকর ভদ্র মাঝখান দিয়ে কথা বলে ওঠে। একচ্ছত্র প্রশংসার সবটা কিছুতেই যেন পেতে দেবে না। কখনও বলে ওঠে, ‘লেখা ভালোই তবে ডেপ্থ নেই।’
আবার কখনও, ‘চরিত্রগুলো আপনার ভালো করে ডেভেলাপ হয় না, এই যা দোষ।’
কথা বলতে বলতে ছবি আঁকতে থাকে প্যাডের ওপর। হাতে মেলা নিউজ।
সহকর্মীদের কেউ কেউ চটেই যায়। বলে, ‘একটু হাত চালিয়ে যান। ছ’কলম ভরতে হবে, খেয়াল আছে।’
পকেট থেকে চুরুট বার করে দেখিয়ে বলে, ‘আগ ধরিয়ে নি। মাথাটা ভারি হয়ে এসেছে। ধোঁওয়ায় মগজের খালি জায়গাটা ভরেনি।’
রহমান সাতবছরের পুরোন লোক। রাত জাগার ক্লান্তিতে চোখ কোটরাগত। সবসময়ই আক্ষেপ, এত করেও শিফটের চার্জ পাচ্ছে না। দেখতে দেখতে নতুন ছোকরারা আসে। দু’দিন না যেতেই তাকে টপকে উঠে যায়। সুধাকর ভদ্রের ওপরও তার রাগ সেজন্যেই।
কলম থামিয়ে রেখে বলল রহমান, ‘এসব পান কোথায়?’
‘বলব? এন্টনির বদৌলতে। অবশ্যি ঠিক এন্টনি নয়,’ স্বরটা বদলে বলে, ‘বরং বলতে পারেন লুসির বদৌলতে। আমি তো উপলক্ষ।’
কী করে যে হঠাৎ কথাটা জিজ্ঞেস করে ফেলছিল মনে নেই। এখন ভাবলে হাসি পায় কামালের।
একেবারে অতর্কিত প্রশ্ন, ‘লুসি কে?’
রহমান রহস্যপূর্ণ ইঙ্গিত করে কি যেন বোঝাতে চাইল।
সুধাকর হেসে বলল, ‘মানুষ।’ তারপর আরেকটু থেমে বলল, ‘মেয়েমানুষ।’
প্রসঙ্গটা হয়তো সেখানেই চাপা থাকত।
কিন্তু –
সেই কিন্তু দিয়েই এ গপ্পের অবতারণা।
পত্রিকার মালিকপক্ষ হঠাৎ হৃদয়ঙ্গম করলেন, খরচে কমাতে হবে। ব্যয়ের পরিমাণে আয় তাদের কিছুই হচ্ছে না। বাজারে লাখদেড়েক বাকি।
আশ্চর্য পদচ্যুতির প্রথম শানিত অস্ত্র পড়ল রহমানের ওপর। তারপর সুধাকর ভদ্র। জনা দু’চার আরো ডানা কাটা কবুতরের মতো তড়পাচ্ছে।
যাবার আগে সুধাকর নাকি জোর করে একটা চুরুট খাইয়েছিল রহমানকে।
চুরুট ধরিয়ে বাপান্ত করল রহমান, ‘অ্যাঁ, এ কি মানুষ খায়!’
কি একটা কাজে ঠিক তখুনি এসে ঢুকলেন চিফ এডিটর। রহমান চুরুট বুজিয়ে ফেলল। উঠে দাঁড়াল সবাই। সুধাকর বসে বসে তেমনি চুরুট ফুঁকছে।
গোলগাল চেহারা সম্পাদকের। ভুঁড়ির ওপর পাতলুন ঠিক রাখতে প্রাণান্ত হতে হয়।
এ কাগজ ও কাগজ দেখার পর চোখ পড়ল সুধাকরের ওপর। কিন্তু সেদিকে না দেখার ভান করেই বললেন, ‘আপিসে চুরুট খাওয়া আমি পছন্দ করি না।’
আরেক মুখ ধোঁওয়া ছেড়ে বলল সুধাকর, ‘আমিও আপনার চেহারা পছন্দ করি না। কিন্তু পছন্দ-অপছন্দে কি এসে যায় বলুন।’
কাঁপতে থাকেন চিফ এডিটর, ‘এটা ডিসিপ্লিনের প্রশ্ন।’
তেমনি কাটা জবাব সুধাকরের, ‘ফাঁসির আসামিকে ডিসিপ্লিন শিখিয়ে লাভ?’
দুম্দাম আওয়াজ করে বেরিয়ে পড়েন চিফ এডিটর।
কিছুক্ষণ বাদেই আসে কড়া নোট, সম্পাদকের সই করা : যারা আপিসের মৌলিকনীতি লঙ্ঘন করবে তাদের বিরুদ্ধে কড়া ‘ডিসিপ্লিনারি এ্যাকশান’ নেওয়া হবে।
সুধাকর ছাড়বার পাত্র নয়। ওটার ওপর লিখল, ‘আমি তব মালঞ্চের হব মালাকর’।
রহমান হাত থেকে কাগজ কেড়ে নিয়ে বলে, ‘কি ছেলেমানুষী করছ বলো তো। মাইনে নিতে আসবে না।’
‘মাইনে? ওটা চুরুট সেবন ফান্ডে দিয়ে যাব ভাবছি। ভবিষ্যতে যাঁরা চুরুট খাবেন তাঁদের কল্যাণার্থে।
কথাটা সত্যি কিনা জানা যায়নি। তবে সুধাকর মাইনে নিতে আসেনি। এদিকটার ছায়া মাড়াতেও দেখেনি তাকে কেউ।
আমি ছাড়ার কিছুদিন পর দেখা হয়েছিল সুধাকরের সঙ্গে।
কে হঠাৎ পেছন থেকে চাপড় দিয়ে বলে উঠল, ‘কামাল সাহেব দেখছি।’ বলবার মতো কোনো কথা হঠাৎ খুঁজে পায়নি কামাল। মৃদু হাসল। হঠাৎ এক চলতি বাসে লাফিয়ে পড়ে সুধাকর। তারপর গলাটা বাড়িয়ে বলল, ‘আসুন না একদিন ফার্নান্ডেজ ম্যানসন। প্রিন্সেস স্ট্রিট বরাবর এগুলেই দেখবেন খানিকদূর গিয়ে রাস্তা দু’ভাগ। তারই বাঁ ধারেরটা ফ্লাওয়ার লেন। খুঁজতে হবে না। গেলেই দেখবেন মস্ত চারতলা বাড়ি।’
পরের কথাগুলো আর শোনা গেল না। বাস ছেড়ে দিলো।
সেদিন মনে মনে হেসেছিল কামাল। এ শুধু বলার জন্যেই বলা। জুতোর দোকানে গেলে দোকানিও বলে, আসবেন সার, আপনাদের সেবার জন্যেই তো –
অথচ কেমন করে একদিন ফ্লাওয়ার লেনের বাড়িটার কাছে এসে দাঁড়াল মনে নেই। কে টেনে নিয়েছিল। আড্ডার আমন্ত্রণ, সেও তো মাসখানেকের ঘটনা। নিছকই হৃদয়ের ইঙ্গিত না অনিবার্যতার টান। অনিবার্য বলে কিছু আছে নাকি?
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ঠিক সে কথাই ভাবছিল। প্রতি তলায় ডানে বামে দুটো করে ফ্ল্যাট। আর্ট লেদার কোম্পানির প্রোপাইটার হি-মা-চুন। কুইক্ লন্ড্রির ম্যানেজার এম. এম. আই. জব্বার। পরের ফ্ল্যাটে পদবী নেই। শুধু লেখা নেমপ্লেটে মিস্ রোজার্স। হয়তো লেখার মতো কোনো পেশা নেই। নামটাই সর্বস্ব। কি হবেন মিস্ রোজার্স। স্টাফ নার্স, বেকারির মালিক? কে জানে। তিনতলা উঠতে উঠতে পা টন্ টন্ করে ওঠে।
ভুল নেই। ছোট্ট টিনের প্লেটে যতœ করে লেখা ‘মণিকর ভদ্র।’ সুধাকর ভদ্রের আত্মীয় নিশ্চয়ই। পরে জেনেছিল শুধু আত্মীয় নন – পরমাত্মীয়, পিতা।
বুক ঢিপ্ ঢিপ্ করছে। যাব যাব আর সত্যি সত্যি যাওয়ার মধ্যে কত তফাৎ। পুরু কাঠের দরজা। কলিং বেল নেই। দরজার হাতল ধরে নাড়বে, না মৃদু টোকা দেবে? আস্তে করে তিনটে টোকা। ভদ্র, বিনয়ী, আগন্তুকের মতো। সাড়া শব্দ নেই। হাতল ধরে পেটান যায়। দুধওয়ালা, কাগজওয়ালার বৈষয়িক চিৎকারের মতো।
কিছুই করতে হলো না। ভেতর থেকে ছিটকিনি খোলার শব্দ। র্থ র্থ করে কাঁপছে কামাল। প্রয়োজনের গুরুত্ব সে কি পারবে বোঝাতে। মৃদু হাসবে, না গম্ভীর হবে, না চশমার কাচ মুছবে। অথবা আরেকটা জিনিস পারা যায়। মুখস্থ গৎ : সুধাকর ভদ্র বাড়ি আছেন?
যদি না থাকে।
একটি মেয়ে বেরিয়ে এলো। আপাদমস্তক দেখে নিল আগন্তুককে যেন।
পরিষ্কার টলটলে পানির মতো তৃপ্তি সে গলার আওয়াজে। টানা ভুরু। শুধু টানা বললে ভুল হবে। জ্যামিতির জ্যা-র মতো। কালো চেহারা। অথচ মনোরম দেহশ্রী। অন্তত তাই তো মনে হয়েছিল শাড়ি পরার ধরনে। বোধহয় সাধারণ বাঙালি মেয়েদের চেয়ে ধরনটাই একটু আলাদা। দেহের বাঁকা চোরা খাঁজের কোথাও নম্রতা, কোথাও স্পর্ধিত অহমিকা। মখমল মসৃণতা চুল জুড়ে। কিন্তু সব ছাড়িয়ে একজোড়া চোখ। মেহগিনি কাঠে স্পিরিট-পালিশের মতো চক্চকে। ছুঁতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তার আগেই যে পলক পড়ে। ‘কাউকে ডেকে দেবো।’
বরফগলা ঝর্ণার স্রোতে কয়েকটা নুড়ি পড়ল।
ওই একটা কথাই মনে এলো কামালের, ‘সুধাকর বাড়ি আছে?’
‘না, এখুনি আসবে বলে গেছে। বসুন না।’
লক্ষ করেনি দরজার বাইরে দুই ফ্ল্যাটের মাঝামাঝি খানিকটা খালি জায়গায় কিছু চেয়ার পাতা। তার একটাতে বসে পড়ল।
খুব আস্তে করে নাটকের একটা দৃশ্য শেষ হবার মতো বুজে এলো দরজাটা ভেতর থেকে। তাড়াহুড়া নেই। ব্যস্ততা নেই। দর্শককে বিব্রত করার ইচ্ছে নেই।
ভেতর থেকে শোনা গেল আরেক নারীকণ্ঠ। গলার আওয়াজে মনে হলো উত্তর-চল্লিশ।
‘এন্টনি এলো নাকি আবার –
ভারি অস্বস্তি। এত ধৈর্য আর তিতিক্ষার পরিচয় না দিলেই ভালো হতো। কি দরকার ছিল। করবার কিছু নেই। পাশের ফ্ল্যাটের পর্দা কেঁপে ওঠে বাতাসে থেকে থেকে। নির্লজ্জ চোখ নিয়ে তাকালে দেখা যায়, রেকর্ডের সুরে তাল মিলিয়ে একটি মেয়ের নাচের ভঙ্গিমা, চোখাচুখি হওয়ার ভয়ে চোখ সরিয়ে নিল।
ঘড়ির কাঁটা সরছে না। সময় সরছে না। শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে যেন কে।
উঠে যাওয়াই ঠিক করল। ‘বসুন’-এর আমন্ত্রণ উপেক্ষা করে নেবে পড়লেই হয়। পাশের ফ্ল্যাটে কে যেন এবার আড়চোখে চেয়ে দেখল। ঘেমে উঠছে কামাল। তবু ভদ্রতার জন্য পনেরো মিনিট দিতে হবে। আরো সাতমিনিট বাকি।
দরজা হাল্কা করে খুলে গেল। ধূমায়মান চায়ের কাপ হাতে এগিয়ে আসে তারই দিকে একটি ছেলে। চা দিয়েই উধাও। হয়তো সুধাকর ভদ্রের ভাই।
মেয়েটি দরজার ফাঁকে শুধু ঘাড় কাৎ করে জিজ্ঞেস করল, ‘চিনি দেবো আরেকটু?’
‘না, ধন্যবাদ।’
ইস্ এই সুযোগে কথাটা বলা উচিৎ ছিল। যাবার কথা। আর হয়তো সুবিধে হবে না।
চায়ের কাপের রং মনেও রং ধরাল যেন। সবুজ হাল্কা। আবছা হয়ে মিশেছে সাদা রং-এর সাথে। একটা বকের ডানায় হাল্কা সোনালি রোদের আভা।
আস্তে আস্তে চা শেষ করে কাপটা নাবিয়ে রাখল কামাল।
এবার উঠে দাঁড়াতে হয়। ভদ্রতার জন্য বরাদ্দ সময়ের ওপর আরো দশমিনিট উত্রে গেছে। সাহস করে দরজায় টোকা দিতে মেয়েটি না, একটি বাচ্চা ছেলে বেরিয়ে এল।
‘আমি তাহলে চলি। সুধাকার বাসায় এলে বলে দিও। আবার না হয় আসব অন্যদিন’, মুখস্থ করা ছড়ার মতো বলে যেতে লাগল কামাল।
ছেলেটি খানিকক্ষণ কি যেন ভেবে নিয়ে বলে, ‘আমি আপনাকে চিনি না তো – কী বলব।’
‘না না, বলতে হবে না কিচ্ছু।’
র্ত র্ত করে সিঁড়ি দিয়ে নাবতে গিয়ে মনে হলো এ যেন মোহমুক্তি। বাইরের ঠান্ডা হাওয়া এসে লাগছে গায়ে। বিরাট যুদ্ধজয়ের পর এ যেন বীর পদক্ষেপ। এ অপ্রয়োজনীয় সতেরো মিনিটের প্রতীক্ষার পর এ যেন নতুন পৃথিবীর বুকে পুনর্জন্ম।
তার এই নিরলস ব্যর্থতায় কেউ বিচলিত হলো কিনা তা জেনে কাজ কি। তার পরপরই ভাবল, সুধাকর ভদ্রের বাড়ির লোকেরা কেমন? অন্তত একটু মিষ্টি হেসে বলতে তো পারত, আরেক দিন আসবেন কিন্তু নিশ্চয়ই।
ফ্লাওয়ার লেন পেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে পড়ে। আশ্চর্য, লক্ষ করেনি সেখান থেকেও ফার্নান্ডেজ ম্যানসনের চারতলা দেখা যায়। নিজের অজান্তে তার দৃষ্টি চলে গেল সেদিকে। বারান্দার রোয়াকে দাঁড়িয়ে এক জোড়া মায়াবিনী চোখ কাকে যেন খুঁজছে। অগণিত পথচারীর একজন কাউকে। সেও পথচারী। হয়তো এন্টনিও। এন্টনিকে দেখেনি কামাল।
ঘরে ফিরে অবাক। ঘার কাৎ করা আর সোজা হয়ে বসার ভঙ্গি দেখেই বলে দিতে পারে, এ সুধাকর। অন্তহীন সিগারেটের ধোঁয়ায় ভর্তি ঘর।
কামালের পায়ের শব্দেও চেতনা নেই। কাগজের অফিসে কাজ করার সময়ও মাঝে মাঝে দেখেছে ভাবনার অথৈ সমুদ্রে ডুবে গেছে সুধাকর। সে সমুদ্রের স্বাদ কামাল জানে না। জানে না তার গভীরতা। তবু ডুবুরীর মতো কি খোঁজে সেখানে? ডুবুরীর মুক্তোর লোভ। কামালেরও লোভ আছে। তবে সুধাকর ভদ্র, তারও লোভ আছে নাকি।
হাল্কা করে হাতে বইটা টেবিলে রাখতেই সে শব্দে সচকিত হয়ে উঠল সুধাকর, ‘জানো কতক্ষণ বসে আছি?’
‘কতক্ষণ?’
‘পুরো ঘণ্টা তো হবেই।’
বলতে পারত তোমার সে পুরো ঘণ্টা কিছু নয়। সে সতেরো মিনিট যার প্রতি মুহূর্ত মনে হয়েছে এক যুগ, তার চেয়েও দীর্ঘ?
অথচ বলতে গিয়ে তেমন কিছু খুঁজে পেল না।
‘ভারি আশ্চর্য, তুমি এখানে বসে, আর আমি তোমার বাড়ি ঘুরে এলাম।’
‘তাই নাকি। তা আর কিছুক্ষণ বসলেই পারতে। চা-টা না খেয়েই ফিরে এলে?’
‘আপ্যায়নের সুযোগটা কি তোমার একচেটিয়া। তুমি না থাকলেও চা দেবার লোকের অভাব হয়নি।’
বলেই মনে হলো প্রতি-সমাদরে সুধাকরকেও অন্তত এককাপ চা খাওয়াতে হয়। রেস্তোরাঁ থেকে আনতে হবে। কেটলি হাতে নিয়ে বলল কামাল, ‘তাছাড়া তোমার ভাইটি কিন্তু বেশ। লোক দেখলে ছাড়তে চায় না।’
কথাটা বোধহয় সুধাকরের নিজেরও বিশ্বাস হয়নি। ভ্রাতৃ-চরিত্র সম্পর্কে আর যার কাছেই হোক, কামালের কাছে শুনতে হবে কেন।
হাতের সিগারেট বুজিয়ে দিয়ে বলে সুধাকর, ‘তাহলে তোমার কপাল ভালোই বলতে হবে। এন্টনিকে তো দু’চোখে দেখতে পারে না।’
কামাল না হয় বানিয়ে বলেছে, সাহসের অভাব। দরজার ফাঁকে গলা বার করা মেয়েটির পরম নিবিড়তাকে চাপিয়েছে অন্যের ঘাড়ে। এ মিথ্যে বলতেও যে সুখ। মনের কাছে মানুষ যে ঠিকই চেনা। বলার সময় না হয় একটু ভেল পাল্টে দিলো। ‘চিনি দেবো’ বলার মতো মিষ্টি গলার অধিকারিণী সম্পর্কে এটুকু মিথ্যে ভাষণে দোষ নেই।
বলেছে বটে সুধাকর, ওর ছোটভাই এন্টনিকে দেখতে পারে না। কল্পনার আমেজ মেশানো দৃষ্টিতে এও হয়তো ছোট ভাই-এর ছদ্মবেশে ওই মেয়েটির মনের কথা লুকিয়ে বলেছে সুধাকর। আর কোনো কথায় এমন বুঝিয়ে বলতে পারত না বোধহয়, তাই।
কামাল মনে মনে হাসল।
বলল, ‘আচ্ছা সুধাকর, মানুষের ভালো লাগালাগির ব্যাপারটা কি আশ্চর্য, না?’
অন্যদিন হলে সুধাকর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ত। এমন করে তাকতো নিজের বোকামির জন্য লজ্জা হতো।
সুধাকর হাসল না। একটু যেন কাঁপল তার চোখের পাতা কিম্বা ভুরু।
মুখে বলল, ‘বটে, আজকেই তা মনে হলো নাকি?’
কিন্তু মনে মনে এ যেন এক তির্যক জিজ্ঞাসা।
‘না না, আজ বলে নয়। প্রায়ই ভাবি।’
এত জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করেও মনে হলো অবিশ্বাসের ধোঁওয়া যায়নি সুধাকরের মন থেকে।
কেটলি নিয়ে বেরুতে দেখে সুধাকর হেসে বলে, ‘ভালো লাগালাগি নিয়ে কিন্তু অতটা বাড়াবাড়ি করতে নেই।’
লজ্জায় চোখ মুখ লাল হয়ে আসে। রাগও হয়। তবে কি লুসিকে খুশি করার জন্যই ওর মনোরঞ্জন, এ কথা ভেবেছে নাকি সুধাকর। অবশ্যি সুধাকর সব পারে।
কামালের বিচলিত ভাব দেখে খপ্ করে হাতটা ধরে ফেলে সুধাকর।
বলে, ‘বললাম বলে রাগ করলে নাকি। না, এক কাপ চা আমার সত্যি দরকার। দাঁড়িয়ে দেখছ কি, যাও।’
এর চেয়ে নির্মম দ- আর কিছু ছিল না। সুধাকর আজ তার দুর্বলতার ময়ূরকে হাতের মুঠোয় ধরে ফেলেছে। যেমন খুশি এবার সে তাকে নাচাবে। যখন খুশি পেখম তুলে ধরে দেখবে, দেখাবে।
তাদের দু’জনের বন্ধুত্বে যেন একটা বিচ্ছেদ আসন্ন। যেতে যেতে ভাবে, সে যদি সুধাকর ভদ্র হতে পারত। তার জন্য খালি চুরুট খাওয়া শিখলে হতো না। চারতলা বাড়ির তিনতলা ফ্ল্যাটে থাকবার জায়গা নিলেই চলত না। তার জন্যে –
কামালকে আসতে দেখে তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে সুধাকর, ‘এসে গেছ। ভালোই হলো। দেরি দেখে ভাবছিলাম পথ হারিয়ে ফেলনি তো।’
পেয়ালা একটাই ছিল। অর্ধেকটা গেলাশে ঢেলে পেয়ালা বাড়িয়ে দিলো সুধাকরের দিকে।
সোজা হয়ে বসল সুধাকর।
বলল, ‘না থাক, গেলাশটাই আমাকে দাও।’
কামাল আপত্তি করল, ‘তাও কখনও হয়। হাজার হলেও তুমি গেস্ট। অমন নক্সা করা পেয়ালা নাই বা থাকল’ – বলে কী মনে করে থেমে গেল।
সুধাকর পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বলল, ‘কিছু একটা করো। এমন করে আর ক’দিন চলবে।’
কিছু মানে আরো চায়ের পেয়ালা রাখো। আরো ভালো ছিমছাম গুছিয়ে নাও। ভাঙা বেতের চেয়ারের বদলে আসুক সুন্দর সোফা সেট। আর সবশেষে যিনি এ প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু আনো তাকে।
সুধাকরের ওই কথাটার এতগুলো মানে হয়।
আড়চোখে তাকাল সুধাকরের দিকে।
কী ভাবছে কে জানে। তার ফ্লাওয়ার লেনে যাওয়ার ব্যাপার কেন্দ্র করে হয়তো যত আকাশকুসুম ভাবনা সুধাকরের মনে।
চায়ের কাপ নাবিয়ে রেখে বলে সুধাকর, ‘ক্রিমিন্যালের মতো তাকাচ্ছ কেন?’
‘ক্রিমিন্যাল?’ রেগে ওঠে কামাল, ‘ক্রাইম করলে তো ক্রিমিন্যাল মনে হবে।’
‘কে কবে ক’টা ক্রাইম করেছে বুকে হাত দিয়ে তা বলতে পারে কেউ। আসলে আমরা সকলেই এক একটা ক্রিমিন্যাল। তুমিও।’
রীতিমতো অস্বস্তি বোধ করে কামাল। দর্শনের যত মারপ্যাঁচই থাক, কথাটার প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত বুঝতে অসুবিধে হয় না। একই ব্যাপারকে কেন্দ্র করে বার বার কটাক্ষ।
ধৈর্যের চরম পরীক্ষা দিচ্ছে কামাল। নইলে আস্ত কেটলিটা তুলে মাথায় মারতে পারছে না কেন সুধাকরের। সব অপমান, কটাক্ষ মেনে নেওয়ার দুর্জয় সাহস আর সহিষ্ণুতা ফ্লাওয়ার লেনের ওই মেয়েটির কি শুধু চোখের একটি ইঙ্গিত। মেয়েটির নীল চোখ মেল ট্রেনের লাল বাতির মতো জ্বলে বলছে, তিষ্ঠ। উত্তেজিত হলে চলবে না। আশা করে বসে আছ। মনে মনে স্বপ্নের জাল বুনছ। হয়তো কত অবস্থায় কত নিবিড়তায় কল্পনা করেছ আমাকে। কই আমি তো কিছু বলছি না। শুধু হেসে ঘাড় কাৎ করে জিজ্ঞেস করেছি, আরেকটু চিনি দেবো।
সুধাকর উঠে পড়ার উপক্রম করে।
বলে, ‘চলি। অনেকক্ষণ হলো।’
নকল ভদ্রতার সুরে বলে কামাল, ‘চলি মানে। বসো না। তাড়াহুড়ো কিসের? তা আজকাল কিছু করছ নাকি?’
‘না, তেমন কিছু নয় একটা ট্যুশনি ছাড়া। তা-ও ছেড়ে দেবো ভাবছি।’
‘কেন, পয়সার কুলাচ্ছে না বুঝি।’
হঠাৎ গম্ভীর দেখাল সুধাকরকে।
বলল, ‘না ঠিক তা নয়। তবে বেশ বুঝতে পারছি ওখানে পোষাবে না বেশিদিন। অনর্থক ঝন্ঝাট বাড়িয়ে –
ঝঞ্ঝাটের কারণ জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে ছিল। সাহস হলো না। সুধাকরও নিজে থেকে প্রসঙ্গটা চেপে গেল মনে হলো।
দরজার কাছে এসে শুধু বলল, ‘তোমার কাছে একটা কাজেও এসেছিলাম।’
সব রাগ স্তিমিত। সহানুভূতির সুর কামালের গলায়, ‘বলো না যদি কিছু করতে পারি।’
‘না, এখন আর বলা যায় না। চা খাইয়ে তার পথ বন্ধ করে দিয়েছ। ইচ্ছে ছিল ঋণ করার। এসেই আপ্যায়িত হলাম। বিবেকে বাধছে।’
‘আহা, তার জন্য কি। অবশ্যি আমার কাছে তেমন নেই। যদি গোটা বিশেকে হয় –
ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল সুধাকর, ‘না না, তা আর হয় না। ক্ষেপেছ। আরেকদিন হবে বরং। চালিয়ে নেব একরকম করে। ভালো কথা। এসো না আরেক দিন। রোববার সকালে কিংবা বিকেলে। লুসির জন্মদিন।’
সুধাকরের চরিত্রের এদিকটা এখনও অজ্ঞাত। হাল্কা ডানায় তার কথার পায়রা যখন যেমন খুশি উড়ে বেড়ায়। কখনও সে পাখার ঝাপটায় নির্মম কটাক্ষের আগুন ঝরে। আবার কখনও তাতে স্বাগতম-এর আহ্বান।
মনে মনে রাগও হলো সুধাকরের ওপর। তার ভাসা ভাসা স্বপ্নের অনেকখানি জেনে নিয়েছে সুধাকর। অনেক স্বপ্নের আমেজ ধরে ফেলেছে। তার মনটা যেন আর নিজের নেই।
তবু ‘লুসি’ নামের উল্লেখ কেমন যেন মোহ জন্মাল। এর আগে কোনোদিন শোনেনি। শোনার অবকাশ হয়নি।
ফ্লাওয়ার লেনের বাড়িতে সেদিন ঢুকেই মনে হলো রীতিমতো হৈচৈ। কড়া নাড়ার দরকার হলো না। উত্তেজিত অবস্থায় বেরিয়ে এলো সুধাকর। তার পেছন পেছন আরেকটি ছেলে। ডোরা কাটা টি-শার্ট। টাইট পাতলুন পরনে। মেয়েদের খোপার মতো সামনে এক বোঝা চুল। উত্তাল তরঙ্গের মতো একটা বাঁক নিয়ে চুলের গুচ্ছ মিশেছে পেছনে গিয়ে আর ক’টি ছোট তরঙ্গের সঙ্গে। লম্বা। টানা নাক চোখ। অনবরত চোয়াল নড়ছে। বোধহয় মুখে চুইংগাম।
সুধাকরের দৃষ্টিতে আগুন।
ছেলেটির আস্তিন ধরে বলল, ‘মানি অর নো মানি ইউ মাস্ট নট কাম। ইজ দ্যাট আন্ডারস্টুড, এন্টনি?’
আগে এন্টনি নামটা শুনেছিল, এবার দেখল। জানাশোনা নেই। তবু ভাবল কামাল, এন্টনি আর সে দু’জনই ভাসছে স্রোতের মুখে। এন্টনি ভাসছে না। সে ছুটছে।
এতক্ষণ কামালের দিকে তাকাবার অবকাশ পায়নি সুধাকর। চোখ পড়তেই কষ্টকৃত হাসি হেসে বলল, ‘ভালোই হলো এসে গেছ।’
অস্বস্তি বোধ করে কামাল।
বলে, ‘যাক্। আজ বরং চলি। অন্যদিন আসব।’
কাঁধে হাত রেখে বলে সুধাকর, ‘ক্ষেপেছ। খুব ঘাবড়ে গেছ বুঝি। এরকম ব্যাপার রোজই ঘটে।’
তারপর ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ইউ ফুল মিট মাই ফ্রেন্ড, কামাল।’
কামালের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আর এ হলো এন্টনি। ফিলিপ এন্টনি।’
এন্টনি পাতলুনে হাত মুছে নিয়ে সুধাকরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অলরাইট। ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট।’
তারপর হাত মেলাল কামালের সঙ্গে।
লক্ষ করল, কেমন সন্দেহ আর কৌতুকের হাসি এন্টনির চোখ ছাপিয়ে। তবে কি সেও সন্দেহ করছে।
খোলা দরজার পর্দা বাতাসে নড়ছে। যথেচ্ছ দৃষ্টি চলে যায়। একটা পানসে গোলাপি রঙের কোট ঝুলছে। তারই তলায় ড্রেসিং টেবিলে চুল ছেড়ে দিয়ে পরিচর্যায় ব্যস্ত একটি মেয়ে।
কে যেন ডেকে উঠল ভেতর থেকে, ‘লুসি –
ভালো করে দেখল প্রথমবারের মতো। একটু লজ্জাও হলো। শ্লথ বিপর্যস্ত কেশ বাস। দাঁতের ফাঁকে চুলের কাঁটা কামড়ে ধরে উঠে দাঁড়ায় লুসি। একটু চোখাচোখি হতেই কেমন মৃদু হাসি। তির্যক সন্ধানী একটু দৃষ্টি। তারপর বোধহয় কোনো গানের পঙ্ক্তি গুন্ গুন্ করতে করতে চলে গেল পাশের কামরায় : ‘ইফ্ ইউ লাভ্ মি।’
সতর্ক-দৃষ্টি নারী এসে দরজা ভিড়িয়ে দিলো।
অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে সুধাকর।
গলাটা নাবিয়ে কামালের কাছে এসে বলে, ‘জন্মদিনের আয়োজনটা বাতিল করে দিলাম।’
খপ্ করে কথাটা ধরে নিয়ে বলে এন্টনি, ‘হু সেড্ ক্যানসেলড্। আমি হোটেল ম্যাডোরিনায় যে ডিনারের ব্যবস্থা করেছি তার কি হবে?’
এ সুযোগে একটা সিগারেট ধরিয়ে নেয় এন্টনি। তারপর সিগারেট কেসটা বাড়িয়ে দিলো কামালের দিকে। কামাল প্রত্যাখ্যান করল।
কোনো চেতনা নেই এন্টনির।
বলল, ‘অলরাইট। যেন তোমাদের ইচ্ছে। কিন্তু যার জন্যে আয়োজন তাকে জিজ্ঞেস করবে না একবার?’
বলে নিজেই ডাকতে শুরু করে, ‘লুসি –
হাল্কা সবুজ রঙের শাড়ি। পায়ে দু’স্ট্রাপের স্যান্ডেল। খাটো ব্লাউজ, পুষ্ট দেহের প্রতিটি খাঁজ ধরে তুলেছে যেন।
কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা এন্টনির কাছে গিয়ে বলল, ‘হ্যালো।’
প্রতি সম্ভাষণ করে বলে এন্টনি, ‘দেরি কিসের চলো। সাড়ে সাতটা বাজে।’
স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে খুশিতে জ্বল্জ্বল্ করছে ওর চোখমুখ। ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে। চকিত হরিণীর মতো কামালের দিকে একবার আর সুধাকরের দিকে আরেকবার দৃষ্টি দিয়ে বলে, ‘এঁরা কেউ যাবেন না?’
দু’জনের হয়েই জবাব দেয় সুধাকর, ‘না।’
কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা হলো না। অর্থহীনভাবে বসে থাকা একটা একটা করে হাতের আঙুল ভাঙছে সুধাকর। দৃষ্টি তার কোনো লক্ষ্যহীন সুদূরে।
কড়া সেন্টের গন্ধে বাতাস ভারি। এন্টনি উঠে দাঁড়াল। হাল্কা আওয়াজ তুলে সামনে এসে দাঁড়ায় লুসি। শাড়ির এক প্রান্ত কামালের কানের ডগা ছুঁয়ে গেল। মোলায়েম। মসৃণ।
এন্টনি আর লুসি। সিঁড়িতে দু’জনের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে। ব্যর্থতার একটা নীরব কশাঘাত বুকের পাঁজরে এসে লাগে।
পরাজয় সুধাকরেরও। বাড়ির লোকদের ওপর ওর প্রভাব ক্ষয়ে আসছে। একদিন যেমন খুশি চোখ রাঙাতে পারত। বাড়িসুদ্ধ লোক থরথর কম্পমান। কথা হতো ফিস্ ফিস্ সুরে। কিন্তু তখন সুধাকরের ভালো চাকরি। মাসকাবারে কড়কড়ে তাজা নোট। লুসিকেও বকেছে, গাল দিয়েছে, ধমক দিয়েছে। আনতে বলেছে চিরুনি। খুঁজে নিতে বলেছে জুতো, হাতঘড়ি। সে নির্দেশ উপেক্ষিত হয়নি। কি অপূর্ব এক সান্ত¡না। জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে নিজেই ভেবেছে, এমন শক্ত গেরোয় চিরকাল বেঁধে রাখবে বাড়ির লোকদের। সে হবে সিংহদ্বার, জাগ্রত প্রহরী। ছাড়পত্র দেবার, কেড়ে নেবার একচ্ছত্র মালিক।
কখনও চুরুটের কড়া ধোঁওয়ায় ঘর আচ্ছন্ন করে হঠাৎ ডেকেছে, ‘লুসি –
জবাবও এসেছে সঙ্গে সঙ্গে, ‘এই যে আসি।’
চোখেমুখে ত্রস্তভাব। কোথাও পান থেকে চুন খসে যায়নি তো।
তার আগেই পাঁচটা দশ টাকার নোট আলগোছে লুসির হাতে তুলে দিয়ে বলেছে, ‘আপাতত এতেই চলুক।’
সতর্ক কয়েক জোড়া চোখে নাবে আনন্দ আর কৃতজ্ঞতা। কোথায় কাদের চালাতে হবে তার ইঙ্গিত নেই। তবু মণিকর ভদ্র, এখন বয়সে পঁয়ষট্টি, চশমাটা ভালো করে মুছে নিয়ে কখন পেছনে এসে দাঁড়াল।
ধমকের সুরে বলে লুসি, ‘কী দেখছ, বাবা।’
মণিকর ভদ্র কথা বলেন না। একদিন কত বছর আগে এমন কত টাকা এনে দিয়েছেন তাঁর পবিত্রতা স্ত্রী চিত্রা ভদ্রকে। কত টাকা আনা পাই। সে কথা সবাই ভুলে গেল নাকি। পেনশনের টাকা আসে বটে, কিন্তু তাতে মণিকর ভদ্রের কোনো হাত নেই।
মনের দুঃখে আবার ফিরেন নিজের জায়গায়। মানবসভ্যতার বিবর্তনের ওপর যে বইটা পড়ছিলেন তার কয়েকটা পরিচ্ছেদ এখনও বাকি।
চিত্রা ভদ্র হাসেন না। তাকানও না কোনোদিকে। টাকা ক’টা মেয়ের হাত থেকে তুলে নিয়ে চিরাচরিত অনুযোগের সুরে বলেন, ‘এ বাড়িতে খরচের সংসারে এ দুটো পয়সায় কি হবে।’
বলেন বটে। তবু মুখে কেমন তৃপ্তির ছায়া। স্থূল দেহটার যেনটা সবচেয়ে প্রথমে চোখে পড়ে তা একজোড়া চোখ। চক্চক্ করে ওঠে। থুত্নির নিচের মাংসপেশির রুক্ষতা মিলিয়ে যায়। সবকিছুর পেছনে পঞ্চাশ টাকা। তার পেছনে সুধাকর। সেজন্যে তার এত সমাদর।
কতদিন সুধাকরকে বাইরে যেতে দেখে ছুটে এসে জিজ্ঞেস করেছে লুসি, ‘না খেয়েই যাবে।’
গুরুত্বের লিস্টিতে আরেকটা ওজন চাপাবার জন্যে ভুরু কুঁচকে বলে, ‘খাওয়া অসম্ভব। এখুনি ছুটতে হবে প্রেস কনফারেন্সে।’
মিথ্যে কথা, জানে সুধাকর। তবু সে মিথ্যের ইটপাথরে তৈরি জগৎ মন্দ ছিল না। তার খেসারত দিতে হয়েছে সস্তা হোটেলে দুটো টোস্ট খেয়ে। তবু কি প্রশান্তি। নিজের কল্পিত রাজ্যে কি চমৎকার মান-অভিমানের খেলা।
বাড়িতে সে সম্রাট। অজেয় তার আধিপত্য। ইতিহাসের ভঙ্গিতে বলতে পারত, মণিকর ভদ্রের মৃত্যুর পর তার সিংহাসনে –
ছি ছি, এসব কী ভাবছে।
মণিকর ভদ্র এখনও বেঁচে। যদিও অসামর্থ্যরে তারকাঁটায় নজরবন্দি। সে জায়গায় নৃপতি সুধাকর।
সেই সুধাকর ভদ্রকে আজ প্রথমবারের মতো তার সিংহাসন থেকে মাটিতে ফেলে দিলো কে?
লুসি।
শুনেছে এন্টনিও আজকাল নানা অজুহাতে পয়সা দেয়। চিত্রা ভদ্র প্রথম প্রথম আপত্তি করেছেন। তারপর কেমন করে ব্যাপারটা যেন তারও গা-সহা হয়ে যায়। মনে মনে যুক্তি দিয়েছেন, তাতে কি, এন্টনির টাকা তো রইলই। হিসেব তো রয়েছেই। ওর যখন দরকার দিয়ে দিলেই হবে।
আজ কথা কাটাকাটি হতে হতে এন্টনি সে কথাই শুনিয়েছিল, ‘অত যে দেমাক দেখাচ্ছ, আমার টাকা নেবার বেলায় সে বড়াই কোথায় থাকে। নিজে তো একটা পয়সা কামাই করে আনতে পার না।’
কথাটা হয়তো ঠিকই। সেজন্যেই বেশি কিছু বলতে সাহস পায়নি সুধাকর। টাকাটাই বড় কথা। মান-সম্ভ্রমের যুদ্ধে এটাই যে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
কতক্ষণ এভাবে বসে কাটল মনে নেই।
সুধাকরই বলল, ‘চলো ঘুরে আসি।’
পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে তাদের জন্য। সুধাকর ভদ্রের জন্য। এ ভাবনাটাকে এড়াতে গিয়েই বুঝি বলতে হলো সুধাকরকে, ‘ভালো কথা তোমার ট্যুশনির কি হলো।’
‘কই কিচ্ছু না। কোনো খবর দিলো না।’
‘আচ্ছা কোথায় গিয়েছিল ট্যুশনির খোঁজে?’
কামাল বাড়ির ঠিকানা ও নম্বর বলল।
হঠাৎ গম্ভীর দেখাল সুধাকরকে। তবু কষ্টকৃত হাসির চেষ্টা করে বলল, ‘তাই বলো।’
একটা হোটেলের সামনে এসে থামল ওরা।
কামাল অবাক, ‘এখানে যে?
‘আহা চেঁচামিচি করছ কেন। চলোই না।’
তার ক্ষীণ প্রতিবাদ শোনাল আর্তনাদের মতো। একরকম তাকে হেঁচড়ে নিয়েই চলল সুধাকর।
খোলা লনে সারি সারি টেবিল পাতা। সেগুলো জুড়ে মৌচাকের মতো একদল বুভুক্ষু।
শব্দ করে একটা বোতল এসে নাবল সুধাকরের সামনে। গ্লাস দুটোই ছিল। সশব্দে ছিপি খুলে খানিকটা ঢালল বেয়ারা সুধাকরের গ্লাসে। বাকিটা অন্য গ্লাসে ঢালবার আগেই হাত দিয়ে বারণ করল কামাল।
বেয়ারা চলে যাবার পর শুধু বোতলটা ঘুরিয়ে দেখল। মারি বিয়ার। সদ্য রিফ্রেজারেটার থেকে বার করা। ফেনার ফেনায় ফেঁপে আসে সুধাকরের গ্লাস।
আরেকবার প্রগাঢ় তৃপ্তির চুমুক বসিয়ে চোখদুটো ছোট করে বলে সুধাকর, ‘একেবারেই চলবে না?’
‘না।’
‘বেশ, তাহলে অন্যকিছু, চা?’
‘না।’
‘কফি?’
‘না।’
‘অরেঞ্জ স্কোয়াশ?’
ক্ষাণিকক্ষণ ভাবতে হলো কামালকে। তারপর বলল, ‘ফ্রেশ লাইম উইথ সোডা।’
একটা চুরুট ধরিয়ে মুন্সিয়ানা চালে বলতে থাকে সুধাকর, ‘মাঝে মাঝে একটু গলা ভিজিয়ে নেওয়া আর কি। তাই বলে ভেবো না রোজ আসি।’
এ কৈফিয়তের দরকার ছিল না। অন্তত সে তো চায়নি।
সুধাকরের দিকে তাকিয়ে মনে হল ওর যেন মাথা টলছে। চোখদুটো ফোলা। সব মিলিয়ে মনে মনে আরেক সুধাকরকে কল্পনা করে রীতিমতো ভীত হয়ে পড়ে।
কিন্তু কামাল কিছু বলার আগেই তার কথা বুঝতে পেরে সুধাকর বলে, ‘ভাবছ মাতাল হয়েছি। পাগল, এক বোতলে কি হয়। নিরেট তিনটে হলে হ্যাঁ –
ম্যাডোরিনা বার অ্যান্ড রেস্তোরাঁ। মনে মনে একটা রোমাঞ্চ ছিল। এই কি সেই। তেমন কিছুই চোখে পড়ছে না। মাতাল বলে মনে হয় না ঠিক কাউকে। দু’একজন একটু উচ্ছ্বসিত। এদের কেউ কেউ আবার বয়েসে মণিকর ভদ্রের মতো।
কোণের একটা টেবিলে দু’জনের চড়া গলা শোনা যায়। বোধহয় অনেকক্ষণ টেনেছে। মাঝে মাঝে দু’একটা কথা ভেসে আসে কানে। কামালে মনে হয় কি ছেলেমানুষী।
: ‘গিভ্ মি মাই কি?’
: ‘হোয়াট কি?’
: ‘আই সেড্, মাই কি।’
: ‘আই হ্যাভ ওনলি দি কিজ টু দি কিংডাম্। হাউ ক্যান্ আই গিভ্ ম্যান?’
গ্লাস ঠোকাঠুকি। আরেক গ্লাস করে সোমরস নাবল দু’জনের গলা বেয়ে।
শুধু কথা বলছে না সুধাকর। থেকে থেকে পোড়া চুরুটটা আরেকবার করে ধরিয়ে নেয়।
‘গুড্ গড!’
চেরা করাতের মতো এক তীক্ষè স্বর ভেসে আসে কামালের কানে। কাঁধ ফিরিয়ে দেখল বাঁ ধারে এক সার কেবিন। তার একটার পর্দা কাঁপছে বাতাসে।
ভূত দেখলেও এতটা অবাক হতো না।
এন্টনি আর লুসি। এন্টনির গ্লাসে লাল পানীয়। লুসির দিকটা চোখে পড়ছে না, নতুন শিক্ষানবিশীর মতো তারও সামনে রাখা বড়জোর একটা ফ্রেম লাইম উইথ্ সোডা।
ডেকে ওঠে কামাল, ‘সুধাকর –
গভীর তন্ময় ভেঙ্গে জবাব আসে, ‘অ্যাঁ।’
কথাটা বলতে গিয়ে কোথায় যেন আটকে গেল। এন্টনির চোখের কোণে একটি ইঙ্গিত। বোধহয় সবিনয় নিবেদন : বিপদে ফেলো না। জেনেশুনে আমাদের অপদস্ত করে তোমার লাভ? কোনো ক্ষতি তো করিনি আমরা।
এবার চোখ পড়ে লুসির ওপর। কবুতরের মতো কাঁপছে। লিপস্টিক-মাখা ঠোঁট কাল্চে হয়ে এসেছে। তারও চোখে আকুতি-মিনতি। যেন হাতে পায়ে ধরা।
সুধাকর কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, ‘কী যেন বলতে চেয়েছিল –
‘কই না।’
‘তবে চেঁচিয়ে উঠলে যে।’
‘হঠাৎ বুকের কাছটায় কেমন মোচড় দিয়ে উঠছিল, চলো ওঠা যাক।’
কথাটা বলেই ভাবল, মাতাল আর মিথ্যুক কতটুকু তফাৎ। সুধাকর ওঠার আয়োজন করে।
যাবার সময় আরেকবার সেদিকে চোখ না ফিরিয়ে পারে না কামাল। এন্টনির চোখে মুখে স্বস্তির পুলক। সে পুলকের অনেকখানি লুসিরও চোখের তারায়।
যেতে যেতে সুধাকর বলে, ‘এত তাড়াতাড়ি ফিরে কী করবে। তারচেয়ে পার্কেই বসা যাক খানিকক্ষণ।’
কোনো কথাই যেন কানে যাচ্ছে না কামালের। কেবলি ভাবছে আজকের মহানুভবতার জন্যে মনে রাখা উচিত তাকে ওদের। কিন্তু সবাই তা করে না। লুসিও করবে না হয়তো। মহানুভবতাকে মনে করে থাকবে নিছক ভদ্রতা। ভাববে ভদ্রতার তাড়নাতেই এটুকু করেছে।
মুখের চুরুট ফেলে দিয়ে বলে সুধাকর, ‘তাহলে বাড়িই ফিরবে ঠিক করেছ নাকি। বলছিলাম একটু কোথাও বসে খানিকক্ষণ হাওয়া খেলে হতো না?’
‘হ্যাঁ। মাফ করো। আজ আর নয়।’
হাওয়া খাওয়ার মানে মনকে আরেক ভাবনার পালে তুলে দেওয়া। আজকের ছোটখাট ঘটনার ঢেউ এসে ঘা খাবে সেই পালতোলা নৌকোর কাছে। মন বিক্ষিপ্ত করে তুলবে সহস্র বেদনায়। বেশ তো আছে এমনি।
প্রথমবারের মতো সুধাকরকে ঠকিয়েছে। মিথ্যে বলেছে। অথচ এ মিথ্যে বলে বাঁচাল সে কাদের?
একটা টানা রিকশায় উঠে পড়ল সুধাকর। বাঁক ফিরতেই তার চেহারা ছোট থেকে ছোট হয়ে আসছে। সুঁচের মতো। করুণাবিগলিত মুখের ওপর দূরের ল্যাম্পপোস্টের আলো কেমন মায়া জন্মায়।
আরেকবার ফিরে গেলে হতো সেখানে। এখনও হয়তো দেখতে পাবে এন্টনি আর লুসি বাহুবন্ধনে। চিত্তের সব উত্তাপ কামালের কথা ভেবে। তাকে মনে করেছে আকাশের সহস্র তারার ভিড়ে একা অর্থহীন উল্কা। তার সহৃদয়তাকে মনে করেছে মধ্যযুগীয় শিভ্যালরি।
লুসির গালে মৃদু টোকা দিয়ে হয়ত বলেই ফেলেছে এন্টনি, ‘কি গো বড় দরদ দেখছি তোমার জন্যে।’
বিদ্রƒপের শানিত অস্ত্রে ঝলমল করে উঠেছে লুসির জবাব, ‘ছেড়ে দাও ওর কথা। মেয়েদের দেখলেই, ওই এক ধরনের ছেলে আছে না –
হয়তো এ সবই মনগড়া। কিন্তু মনের ক্ষেত্রে মনগড়া কাহিনীরই কি মূল্য কম।
যেতে পারে। এখনও গিয়ে আওয়াজ করে বসতে পারে তাদের মুখোমুখি। ওই রেস্তোরাঁয়। ওই কেবিন না হোক ধারেকাছে কোথাও।
কান ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল একটা চলন্ত ট্রাক। আরেকটু হলেই গিয়েছিল। বড় বাঁচা বেঁচেছে। এমনি বেঁচে যাওয়া আর কতদিন চলবে। একটুর জন্য বেঁচে যাওয়া। একটুর জন্যে জীবনের মেয়াদ আর কিছুদিনের জন্য বাড়ানো। এর চেয়ে ট্রাকটা সোজা চাপা দিয়ে গেলেই বা কী হতো। পঙ্গু হয়ে বাঁচার তুলনায় মৃত্যু কি খুবই খারাপ?
কাপড় ছাড়তে গিয়ে চোখে পড়ল একটা পোস্টকার্ড। চিঠিপত্রের ব্যাপারে কামালের তেমন উৎসাহ নেই। ওর কাছে লেখার প্রেরণা শুধু টাকার তাড়না। অভাব আর অনটনের মর্মান্তিক কাহিনী। তবু এসব থাকে সামাজিকতার ধব্ধবে চাদরে ঢাকা। সেটুকু সরিয়ে ফেললেই আসল বক্তব্য। কুশল কামনা, ওর জন্যে আকুলতা, এসব ওই আসল কথা বলার ভূমিকা।
তবু পড়তে হয় মনোযোগ দিয়ে। তেমনি নিবদ্ধ অনুভূতির ঝড় তুলে ফেরৎ ডাকে না হোক অনেক বিগত ডাকের পরে তবু লিখতে হয় কি খুশিই যে হয়েছে চিঠি পেয়ে। তাই নাকি, লেবু তাহলে ক্লাস টেনে উঠল। মীনুর জ্বর। জ্বর বাধালো কি করে। আজকাল চারধারেই অসুখ-বিসুখ। একটু সাবধান থাকা উচিত। ভালো কথা, মীনুর ফরমায়েশের চোলি পিস্ পাওয়া যাচ্ছে না। পেলেই পাঠিয়ে দেবে।
ট্যুশনির কোনো খোঁজ পায়নি। আশা করেছে খবরের কাগজে একটা চাকরি জুটিয়ে নিতে পারবে। ভাবনার কোনো কারণ নেই। সামনের মাসে কিছু টাকা পাঠাতে পারবে বলে মনে হচ্ছে। না, একাই আছে মেসে। ওর রুমমেট দেশে লম্বা ছুটিতে। সে ভালোই আছে। সকলে শুভেচ্ছা ও প্রীতি নিক।
শুধু লেখাই নয়, পায়ে হেঁটে নিজে ডাকঘরে গিয়ে বড় বড় হরফে ঠিকানা লেখে। তারপর ডাকবাক্সে। কারও হাতে দিতে ভরসা হয় না। তার মনেও একটা আকুলতা এমনি আদত কথার ওপর তুলির রং চড়িয়ে সহস্র কথার জ্বাল বুনে যায়।
চিঠিটা তুলে নিয়ে অবাক হয়ে যায়। এ হাতের লেখা অন্য ধরনের। আগে দেখেনি। বাঁকা গোটা গোটা অক্ষর।
পড়–য়া ছাত্রের বাড়ি থেকে তাকে আরেকবার দেখা করার অনুরোধ। মনে মনে না হেসে পারে না। এমন ছোটাই ছুটেছিল সেদিন, কোনো তাড়না নেই এখন। শুধু খানিকটা কৌতূহল।
ধোপা বাড়ির শার্ট রাখা সুটকেশে। সেটা গায়ে না চাপিয়ে হাওয়াই শার্টটা পরেই চলল। আর সাবধানী হয়ে কাজ নেই। হলে এমনিতেই হবে। পাট করা কাপড় বরং অন্য কাজে আসুক। অতর্কিতে কোনো আমন্ত্রণ যদি এসেই পড়ে একদিন, সেদিন না হয় নেপথলিনের গন্ধে ভরপুর শার্টখানা গায়ে চাপিয়ে ভরা সন্ধ্যার আমেজ নিয়ে যেতে পারে ফ্লাওয়ার লেন। যেখানে চারতলা বাড়ি। ওঠার জন্য লিফ্ট আছে। অথচ কোনোদিন ব্যবহার করেনি।
ভয় ছিল সেদিনের মতো আজও হয়তো কোনো দুর্ভোগ পোহাতে হবে। সেদিনও কোনো এক অজ্ঞাতনামা মণির জ্বর ছাড়ছিল না। আজ আবার কি হলো কে জানে। অনেকক্ষণ কড়া নেড়েও কারো সাড়া পাওয়া গেল না।
অহেতুক ভয় হলো। ভাগ্যের বাকচটুল স্বপ্নরা যেন হঠাৎ তাকে দেখে নিথর হয় গেছে। ভয় পেয়েছে তারাও। ভয় পেয়েছে চোখের কাতর দৃষ্টি দেখে। একটা জাপানি রবারের বল এসে পড়ল সামনে। দৌড়–তে দৌড়–তে বেরিয়ে এলো ফ্রক পরা ছোট্ট একটি মেয়ে। বলটা নিয়ে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে চলে গেল ভেতরে পর্দা ঠেলে। স্পষ্ট বোঝা গেল তার আগমন বাণী প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। দু’একটা সাবধানি ফিসফিসে কথা। চাপা গলায় একটা দুটো স্বর।
পড়–য়া ছাত্রের বাবার চুরুট কি এখনও জ্বলছে। তার পোড় খাওয়া চোখ কি এখনও যত ভয়াবহ ততই নিষ্ঠুর। এসবই কল্পনা। কল্পনাও সত্যি হয়। কিন্তু সেবার হলো না।
বেরিয়ে এলেন মাঝবয়েসি এক ভদ্রলোক। কোনো কথা বলার আগেই চেয়ার টেনে নিয়ে বললেন, ‘আপনিই কামাল চৌধুরী?’
‘জি হ্যাঁ।’
‘হু।’
অভিজ্ঞতার চেয়ে নামের নির্বাচনও কম দরকারি নয় এমনি ভাব। মিনিট দু’এক কথা নেই কোনো পক্ষে।
সে অবসরে তাকিয়ে দেখল কামাল। আধপাকা চুল। অদ্ভুত সুন্দর গড়ন শরীরের। চেহারার রুক্ষতা পৌরুষের, না নিষ্ঠুরতার বোঝা গেল না। নাকের নিচের দিকটা একটু ফোলা। বয়েস চল্লিশের উর্ধ্বে।
আপাদমস্তক দেখে নিয়ে আবার প্রশ্ন, ‘মাস্টারি করেছেন কখনও?’
সাজানো উত্তর দেওয়া যায়। বলা যায়, নিশ্চয়ই। কিম্বা অল্প অল্প করেছে বইকি?
কিন্তু অত সহজ সাজানো কথাটা মনে আসেনি। উল্টো জবাব দিতে হলো, ‘না, ছাত্র পড়ানো যাকে বলে ঠিক তা করিনি। তবে –
‘তবে বলছেন দিলে পারবেন ঠিকই, এই তো।’
তাতো বটেই। এ কথাই বলতে চেয়েছে। কিন্তু মুখের কথা কেড়ে নেওয়ায় বলার আর কিছুই রইল না।
আবার চুপচাপ। ভদ্রলোক হাতের ভাঁজ করা কাগজখানায় খানিকক্ষণ চোখ বুলিয়ে মুখ না তুলেই বললেন, ‘দেখা যাক।’
পর্দা সরিয়ে আগের সেই বাচ্চা মেয়েটি কি বলতেই উঠে দাঁড়ান ভদ্রলোক। যেতে যেতে বললেন, ‘তাহলে ওই কথাই রইল। হ্যাঁ?’
কি কথা রইল সেটাই বুঝতে বাকি, কিন্তু বোঝাবার আর দ্বিতীয় প্রাণী চোখে পড়ল না। সুতরাং ওঠার আয়োজন করতে হয়।
গেট দিয়ে বেরুতে যাবে এমন সময় বাচ্চা মেয়েটি এসে ধরে বসে, ‘আপনার জন্য চা দিতে বলেছে যে।’
একরকম হাত ধরেই ফিরিয়ে আনল তাকে।
উদ্দেশ্যহীন ভাবে বসা। এ আরো অসহ্য, কোনোমতে হাতের ওপর ভর করে চা-টা এনে রাখল মেয়েটি, খানিকটা উপচে পড়ল প্লেটে।
আদর করে একবার বলতে ইচ্ছে করছিল, বাঃ! ভারি সুন্দর তো তুমি। অথবা অমন ফ্রকটা তৈরি করে দিলো কে। লাজুক মেয়ে। কিছু বলার আগেই নিরুদ্দেশ।
মনে আছে প্রথম যেদিন এ বাড়িতে এসেছিল সেদিন বাড়িতে হৈচৈ। অদ্ভুত ব্যস্ততা। সে তুলনায় আজ পাষাণপুরী। প্রয়োজনের বেশি কারও কথা নেই। কথার বেশি কাজ নেই। কাজেরও বেশি ভাবনা। সবকিছুতে মাপজোঁক। দানবীর ভীতি পেয়ে বসেছে বাড়িটাকে।
চায়ের কাপ শেষ করার আগেই ডাক পড়ল কামালের। এবার ভেতরের কামরায়। সেই প্রথমবারের মতো আবার বুক ঢিপ্ ঢিপ্ করতে থাকে। যন্ত্রচালিতের মতো সিল্কের হাল্কা পর্দা সরিয়ে পরপর দুটো কামরা ছেড়ে এসে দাঁড়াল একটা কামরার কাছে, ভেতর থেকে দরজা বন্ধ, ভদ্রলোক মৃদু টোকা দিলেন, নিজে থেকেই ডাকলেন, ‘মণি দরজা খোলো।’
চাপা কান্না জড়ানো আক্রোশ শোনা যায় ভেতরে থেকে, বিষধর সাপের লেজ ধরে নাড়া দিয়েছে যেন কে।
ভদ্রলোক আরেকবার ডাকলেন, ‘মণি, লক্ষ্মী দরজা খোলো।’ আরো বিনয়ী, আরো আর্দ্র কণ্ঠস্বর। কিছুটা অনুনয়, কিছুটা অনুরোধ আর কিছুটা আকুতির রসে ভেজা।
লক্ষ করেনি গুটিকয়েক সতর্ক সন্ধানী চোখ ইতিমধ্যে সার বেঁধে দাঁড়িয়েছে তার পেছনে। তাদেরও চোখে মুখে অমঙ্গলজনিত ভীতির ছায়া।
গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে ইচ্ছে করে কামালের : কে কে এই মণি। কিন্তু ভদ্রতায় বাধে। সামাজিকতায় বাধে।
তার আগেই আস্তে করে দরজা খুলে যায় ভেতর থেকে। অবাক হওয়ার মতো কিছুই চোখে পড়ে না। একটা বড়মতো পালংয়ে হেলান দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় বছর নয়ের সতেরো একটি কিশোর বালক। সাদা চাদরে বুক থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা। একমাত্র, চোখে কেমন করুণ বেদনার ছাপ। মাথাভরা কোঁকড়া কালো চুল। গোলগাল চেহারা। ছোট্ট হাসির ঢেউয়ে চোখের করুণ চাউনি আরো করুণতর হয়ে ওঠে।
দরজা খুলে দিয়ে বেরিয়ে এলো একটি লোক। প্রথম চাকরির দিন যাকে দেখেছিল সেই। বলল, ‘ব্যান্ডেজ বাঁধার সময় দরজা খোলা পছন্দ করে না মণি।’
এ কথার তাৎপর্য যাই হোক, অবাক কা- করে ফেলে মণি। হঠাৎ হিংস্র পশুর মতো ক্ষিপ্ত হয়ে লোকটার ওপর আছড়ে পড়তে চায়, শক্তিতে কুলালে যেন কুটি কুটি করে ছিঁড়ে ফেলে। কিন্তু কোমরের নিচের দিকটা পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে রইল। শুধু একটা হাত বাড়িয়ে ধরল ওর শার্টের আস্তিন। শব্দ করে ছিঁড়ে গেল খানিকটা।
হাত ছাড়িয়ে নিয়ে লোকটি বলল, ‘আমার কী দোষ। অন্যায় কী বলেছি বলুন।’
পেছনে যে ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে তিনি কথা বলে ওঠেন এবার। মেজাজের সুরে কথা বললেন বটে। কিন্তু কেঁপে ওঠে গলার স্বর।
কি জানি ছেলের এ গ্লানি সহ্য হয়নি তাঁরও বোধহয়। বললেন, ‘বাইরের লোকের কাছে এত কথা বলতেই বা যাও তুমি কোন আন্দাজে। জানো খোকা এসব পছন্দ করে না।’
সজোরে আঁচলে বাঁধা চাবির রিং কাঁধের ওপর ফেলে বেরিয়ে যান।
গৃহকর্তার সঙ্গে ভালো করে কথা হয়নি এতক্ষণ কামালের। এবার চোখাচোখি হতেই ভদ্রলোক মাথা ঝুঁকিয়ে নেন। ভয়ানক অপরাধ স্বীকার করতে যাচ্ছেন এমনিভাবে। নিচু গলায় আস্তে আস্তে বললেন, ‘বুঝতে পেরেছেন নিশ্চয়ই।’
কামাল মাথা হেঁট করে থাকে।
তারপর জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলতে থাকে, ‘সেজন্যেই অভিজ্ঞতার কথা জিজ্ঞেস করিনি। অভিজ্ঞতা দিয়ে কাজ নেই আমার। যা চাই তা একটু স্নেহশীল আর সহানুভূতিশীল মন। ছাত থেকে পড়ার পর আজ একবছর থেকে এই অবস্থা।’
তারপর কামালের কাঁধের ওপর হাত রেখে বলেন, ‘এ কথা সবাইকে বলা যায় না। সবাইকে আমি ডাকিনি। আর যে আপনার কথা বলেছে তার ওপর আমার অনেক ভরসা –
জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে ছিল সেই মহানুভব ব্যক্তিটি কে। কিন্তু তার আগেই ভদ্রলোক আবার বলতে শুরু করেছেন, ‘পারবেন বলুন, ভয়ের কি আছে? ও জানে, ভালো করে জানে। ডাক্তাররা কী বলে সব শুনেছে। দৈহিক পঙ্গুত্বকে আমার ভয় নেই মাস্টার –
জীবনে কে যেন প্রথমবার অচেনা নামে ডাকল তাকে, তখনও কথা বলে যাচ্ছেন ভদ্রলোক। তার কথার বেগবান অশ্বকে কে যেন ক্রমশ চাবুক দিয়ে তাড়া করছে।
‘কিন্তু মনের দিক থেকে ওর এতটুকু দৈন্য আমি সহ্য করতে পারব না।’
সন্ধে হয়ে আসে, কেউ আলো জ্বালেনি। মনে করে সুইচ টিপে দেয়নি কেউ, সেই বিকেলের ভীরু আলোর কোথায় নিজের প্রাণের বীণার একটি তার কথার কয়ে ওঠে। ছাত্র নয়, মাস্টারি নয়, চাকরি নয়, নিছক একটি পঙ্গু মানুষ। তার মানবিক দৈন্য ঘোচাবার ভার। আর কিছু না। বেতন দিয়ে মাপা সময়ের বেশি কাটাতে হবে। মর্মান্তিক সত্যকে করে তুলতে হবে চমৎকার হাসির ছদ্মবেশে অপরূপ।
পিতার করুণ আর্তনাদ, মায়ের কয়েকটা দীর্ঘশ্বাস, আর ওই ছোট্ট মেয়েটির কাঁপা কাঁপা হাতের চায়ের পেয়ালায় একটা জগৎ তৈরি হয়ে গেল যেন। যে জগৎ-এ সে বাঁধা পড়ছে। এখন আর না করার উপায় নেই।
হ্যাঁ-না কোনো কিছু না বলেই বেরিয়ে পড়ল সেদিনকার মতো। শুধু বলে গেল, ‘কাল আবার আসব।’
এ বলতে কোনো প্রতিশ্রতি নেই। প্রত্যাখানও যে নেই ভালো করেই বুঝল কামাল।
ওই নতুন অভিজ্ঞতার কথা বলতে ইচ্ছে করছে সুধাকরকে। অন্তত আর কিছু না। একটুখানি সান্ত¡না একটুখানি প্রবোধ।
রাতে ঘুম পেল না। সবকিছু মিলিয়ে কেমন অবাক লাগে নিজের কাছে। হঠাৎ উদর-সেবা থেকে মানব-সেবার গুরুভার সে যেন ইচ্ছে করেই নিচ্ছে নিজের ঘাড়ে। একদিন তার নিজের কাছেই অবাক লাগবে। সে মহর্ষি হয়ে যাবে। সবাই দেখবে শ্রদ্ধার চোখে। বলবে খাঁটি মানুষ ওই একটিই ছিল।
কিন্তু খাঁটি মানুষের কি দরকার। খাঁটি মানুষ সে তো হতে চায়নি। না না, কালই সে না করবে। আর যাই হোক ঠকাতে পারবে না এদের। নকল দিয়ে বলতে পারবে না আসল দিয়েছি। কক্ষনো পারবে না।
ইচ্ছে ছিল মনের এ দ্বন্দ্ব লাঘবের জন্য আরেকবার ফ্লাওয়ার লেনে যাওয়ার, সেখানে আরেকটি সুন্দর, শান্ত, সৌম্য চেহারার উজ্জ্বল আলো মনের সব ক্লেদ ধুইয়ে মুছে দেবে। এক একটি মুখের কি মহিমা! কি ক্ষমতা!
অন্যদিনের মতো হলো না সেদিন। আস্তে আস্তে ফার্নান্ডেজ ম্যানসনের সিঁড়ি ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে অনুভব করল রাত অনেক। হয়ত সাড়ে এগারো। অভদ্ররকমের দেরি হয়ে গেছে। এখন ফেরাই উচিত, যাবার তাড়নায় এসব মনে হয়নি, রাতের শেষ বাসে মাত্র দু’চারটে জনপ্রাণীর সঙ্গে সেও ছুটছিল, অন্যদের ছিল বাড়ি ফেরার তাড়না। তার বাড়ি ছাড়ার।
কিন্তু ফিরে যেতেই সিঁড়ির কাছে দেখা সুধাকরের সঙ্গে। লজ্জাই হলো। মনে হলো একটা কৈফিয়ৎ দেওয়া চাই। তাই বলল, ‘তোমার ওখানেই যাচ্ছিলাম। ফিরে এলাম রাত দেখে।’
‘কতক্ষণ এসেছ?’
জজের মতো জেরা করা কোনোদিন শেষ হবে না সুধাকরের।
‘গেলাম আর কই। যাব যাব ভাবছিলাম। তার আগেই ফিরে এলাম।’
সুধাকরও ফিরেছে খানিকক্ষণ হলো, নতুন কাগজে চাকরি পেয়েছে। মাইনে কম, আগের তুলনায় যথেষ্ট কম। তবু যে পাওয়া গেছে সেটাই বড়।
সুধাকরই বলল, ‘এরকম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আর কতক্ষণ চলবে। তারচেয়ে ওপরেই গিয়ে বসি চলো।’
এ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করবার নয়। কিন্তু সেদিন সংকল্প করল কেবল একটি লাল গোলাপের আশ্বাসেই সে আর প্রলুব্ধ হবে না। সে সস্তা হয়ে যাচ্ছে, সহজলভ্য হয়ে যাচ্ছে, এ ধারণা জন্মাতে দেবে না। সুদূর নক্ষত্রের মতো রোজই সে আকাশে উঠুক। তবু হাজার তারার ভিড়ে তাকে খুঁজে নেওয়া হোক।
তবু সুধাকর ছাড়ল না। টানতে টানতে নিয়ে এলো ওপরে। বলল, ‘বসো আমি কাপড় ছেড়ে আসি।’
কামালের ভীষণ সংকোচ।
‘এত রাতে সবাই কী ভাববে।’
‘ভাববে আবার কি। চুরি করতে এসেছ না ডাকাতি।’
মনের কথা খুলে বলে দুটোই। কিন্তু তা আর বলা যায় কই।
সুধাকর ভেতরে গেল। কামাল ভাবতে লাগল, একটি পঙ্গু ছেলেকে মানুষ করবার দায়িত্ব নিয়েছে সে। সিস্টার মিরান্ডার কথা মনে পড়ল। এমনি দায়িত্ব তিনিও নিয়েছিলেন আজ থেকে পনেরো বছর আগে। কর্তব্যচ্যুতির অভিযোগ আনতে পারে না কেউ তাঁর বিরুদ্ধে।
লুসিদের বাড়িতে শুধু একদিন দেখেছে সিস্টার মিরান্ডাকে। বয়েস হলেও, মুখের ওপরটা কেমন লালচে। লেপ্রোসি হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স। ধোপদুরস্ত ইউনিফর্ম পরে যখন কাজ করতে যান, কেউ বলবে না, অতীতের কোনো একটা ক্ষোভ থেকে থেকে এখনও তাঁর মনের ভেতর কাতরায়। কত সিস্টার ফ্যানি, সিস্টার মিরান্ডা পাতাঝরা গোছের মতো শুধু সংকল্পের শেকড় ধরে বেঁচে থাকে। জীবনে প্রেম, ভালোবাসা তাদেরও ছিল। হয়তো এখনও আছে। কিন্তু সময় নেই। সুযোগ নেই। সে মন নেই। সে মন এত সহানুভূতি ঢালে, নিজের জন্যে ধরে রাখতে পারে না কিছুই।
সুধাকরের মুখে শুনেছে, এই সিস্টার মিরান্ডা একদিন মণিকর ভদ্রকে ভালোবেসে ছিলেন। আজকাল তাঁকে দেখলে সে কথা মনে হয় না। মনে হয় কোনো প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাস। যার পাতা চারধারে সেলাই করা। সে সেলাই খুলে তার মর্মভেদ করতে পারবে না কেউ। হায়রে মিরান্ডা।
তবু সিস্টার মিরান্ডার সঙ্গে আসে ভালো কনফেকশনারি কেক। কেন আনেন, কেন বিলোন কেউ জানে না।
সিস্টার মিরান্ডার একবার বদলির খবর এসেছিল। রোগীরা সেদিন পণ করে ডায়েট্ খায়নি। পরে প্রত্যেক বেডে গিয়ে তাঁকে বলতে হয়েছে, ‘ও নো, নো। হু সেড্ আই এ্যাম লিভিং ইউ। ইউ সিলি চাইল্ড।’
সে কথাও শুনেছে কেমন করে বারান্দায় সারারাত বেলফুলের ঝাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে রাত কাটিয়েছেন সিস্টার মিরান্ডা।
কখন সুধাকর ফিরে এসেছে লক্ষ করেনি কামাল। এতক্ষণ ধরে সে এত তন্ময় লক্ষ করেনি বাড়ির দ্বিতীয় প্রাণীকে।
একটা ভালো সিগারেটের টিন বাড়িয়ে সুধাকর বলল, ‘নাও। একেবারে ভার্জিন। তোমার জন্যেই রাখা ছিল।’
আজকাল আর জিজ্ঞেস করার দরকার হয় না। এসব এমনি আসে না। এন্টনির বদৌলতে আসে। প্রথম প্রথম বাধত। বরাতকে তাহলে মেনে নিয়েছে সুধাকরও। এন্টনিকে সে ঠেকাতে পারবে না। তার দেওয়া টিন ঠেকাবে কোন শক্তিতে।
কথা বলতে বলতে রাত হয়ে আসে।
উঠে দাঁড়ায় কামাল।
‘আজ তাহলে চলি।’
‘চলি মানে,’ ঘড়ি দেখে আঁৎকে ওঠে সুধাকর, ‘রাত দেড়টায় গাড়ি পাবে কোথায়। তারচেয়ে এখানেই শুয়ে পড়। দু’জনে কাটিয়ে দেওয়া যাবে কোনোমতে।’
অবসাদ আর ক্লান্তিতে ভেঙ্গে আসছে পা। আবার তিন মাইল হেঁটে বাড়ি যাওয়ার চেয়ে ঢের বেশি লোভনীয় প্রস্তাব। অবশ্যি সংকোচে বাধে। এর আগে এমন করে কারও বাড়িতে রাত কাটায়নি। তাও আবার নিছক অনাহুত হয়ে। সবচেয়ে বড় ভয় সুধাকরকে নয়। তার বাড়িতে রাত কাটানোকে নয়। ভয়, একজোড়া শাণিত চোখকে, যাকে মাত্র দু’দিন আগে সে ক্ষমা করেছে, বাঁচিয়েছে। এন্টনির নিবিড় সান্নিধ্যের উত্তাপ পেতে দিয়েছে।
প্রতিবাদের সুরে বলল, ‘না, না, তা হয় না।’
‘হয় না মানে, আলবৎ হয়, ওই ঘরটাও খালি, মাটিতে বিছানা পেতে দেবো।’
তারপর কি ভেবে বলে, ‘ভয় নেই, বাড়িতে দ্বিতীয় প্রাণী কেউ নেই, বিয়েতে গিয়েছে, ফিরতে রাত হবে, ততক্ষণে তো আমরা ঘুমের রাজ্যে অচেতন।’
এ তো মন্দ নয়। চোখ খুললেই যন্ত্রণা। চোখের জন্যই যত সংকোচ, যত বাধা। অন্ধকারে সবই এক।
সেখানে হাজার হাজার লুসির ভ্রƒকুটি, উপেক্ষা তাকে স্পর্শও করতে পারবে না, তারপরে সকালবেলার আলোর প্রথম ছোঁয়া লাগার আগেই সে উঠে পড়বে সন্তর্পণে।
কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়ল কখন সুধাকর বাতিটা বুঁজিয়ে দিয়ে। ভেতরের কামরার দরজাটা খোলা, ইচ্ছে হলো একবার ভিড়িয়ে দেয়। কিন্তু সে হবে অনধিকার চর্চা। এতটা অধিকার সুধাকর ভদ্র তাকে নিশ্চই দেয়নি।
এপাশ ওপাশ করে ঘুম পেল না তবু। শূন্য মঞ্চে কালো পর্দা টেনে দেওয়ার মতো চোখের পর্দাটা বুঁজে পড়ে থাকল। রাত ফুরোবার আগেই বাড়িসুদ্ধ সবাই ফিরবে, সিঁড়ি ভেঙে উঠবে, দু’একটা মৃদু কলহাস্য, গুঞ্জন, তারপর বাথরুমে পানি ঢালার শব্দ, টুপ্ করে বাতি জ্বালানো আর নেভানো।
তবু ঘুম নাবল, তন্দ্রাজড়িত চোখেই অনুভব করল কয়েকটা পা আস্তে আস্তে সচকিতে ভেতরের দরজা দিয়ে চলে গেল, চেয়ে দেখার সময় নেই, সবাই ক্লান্ত, সেই ভাসা ভাসা কায়ার মাঝে আরেকটা মূর্তি মিলিয়ে গেল যেন ছায়ার মতো।
বাইরে দরজায় একটা চাপা গুঞ্জন কানে এলো, ‘নো, এন্টনি, প্লিজ। কেউ দেখবে।’
কে যেন আবার পুরোন তলওয়ারটা খাপ থেকে তুলে এনে তার বুকে বিঁধিয়ে দিল। আধবোঁজা চোখে অনুভব করল পাশের ঘরে।
নরম শেডের আলোয় গালের ওপর কঠিনভাবে রুমাল ঘসছে লুসি। জায়গাটা লাল হয়ে এসেছে যেন।
এন্টনি গ্রহের মতো ঘুরছে, এতদিন শুধু লুসির মানসজগতে। আস্তে আস্তে সারা বাড়িটাকে কুক্ষিগত করেছে। এই যে সুধাকর, সেও এন্টনির দেওয়া দামি সিগারেট ফোঁকে।
শব্দ করে একটা গাড়ি মিলিয়ে গেল, আজকের মতো এন্টনি নেই, লুসির দিগন্তে আজকের মতো এন্টনি অস্তাচলে গেল। সূর্যোদয়ের মতো আবার কাল দেখা দেবে।
কাউকে না বলেই সকালবেলা কেটে পড়বে ভেবেছিল, কোনোমতে প্রবোধ দিতে পারল না নিজেকে, রাত কাটাবার অনুরোধ ছিল, সে অনুরোধ রেখেছে। রাতের আবছা আলোয় সুধাকর ভদ্র ছিল উদার”িত্ত, রাতের গুচ্ছ গুচ্ছ অন্ধকারের মতো সহানুভূতির পাহাড় চোখ বুঁজে থেকেছে। চেয়ে দেখেনি, দিনের আলোয় তেমন মনে হবে না, সুধাকর ভালো করে তাকিয়ে দেখবে। তন্ন তন্ন করে দেখবে মুখের প্রতি ভাঁজ, ভাঁজের প্রতি রেখা। ভদ্রতা করে চা খাওয়াবে এক কাপ, কিন্তু সেটা নিছকই সৌজন্যতার দায়ে।
টুপ্ করে আওয়াজ হলো পাশের কামরায়, অক্লান্ত সেবার পর রাতের পাখার মুক্তি, বাথরুমে কল খোলার শব্দ। সকাল, প্রথম সূর্য আর প্রথম কলের পানি, এ তিনেরই অপূর্ব সুর। পালিয়ে যেতে পারে না কামাল, তার আগেই ধরা পড়ে গেল।
ফোলা ফোলা মুখের ওপর ফিকে লাল তোয়ালে ঘষতে ঘষতে সামনে এসে দাঁড়াল লুসি। ভালো করে দেখতে যাবার আগেই এক তুলির রং-এর মতো মিষ্টি হাসির রেখায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার মুখ, মুখের ওপর তেরচা হয়ে আসা চুলের গোছা সরিয়ে বলে, ‘কষ্ট হয়নি তো আপনার?’
প্রশ্নটায় নিজেই ভরসা পেল কামাল। তবু বাঁচা গেছে। আর কোনো কৈফিয়ৎ নেই। কোনো জবাবদিহি নেই, ব্যাপারটা দেশলাইয়ের কাঠিতে ফশ্ করে আগুন জ্বালানোর মতো সহজ আর স্বাভাবিক। কিন্তু দেশলাইয়ের আগুনের আরও যেটা স্বাভাবিক তার উত্তাপ, সেটা তার স্তিমিত গর্জন।
বলতে ইচ্ছে করছিল, এ কথা কেন, আমি তোমাদের পোষা কুকুর না পোষা চাকর, হঠাৎ করে থেকে যাওয়াকে তত আদিখ্যেতা মনে করছ কেন। কিন্তু বলল, ‘কষ্ট হবে কেন, আপনাদের না হলে আমারই হতে যাবে কেন?’
শেষের এ কথায় যেন বড় বেশি দরদের সুর, বড় বেশি ভেজানো গলা।
একটা দুটো আলোর রেখা হাল্কা সুতোর মতো এসে পড়ে লুসির ঠোঁটের ওপর। খানিকটা গালে ভালো করে চেয়ে দেখতে চায়। ভালো করে মন ভরে।
একটা আস্ত রাত কাটাবার পর লুসিকে দেখা, কল্পনার চোখে তো কত কিছুই দেখেছে। কিন্তু রক্ত মাংসের খাঁটি চোখে দেখার সুযোগ মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু যত দেখল, চোখে পড়ল চৌকুনো মার্বেল পাথর। থরে থরে সাজানো, লাল মোজাইক। তাকে চোখ নিচু করে থাকতে দেখে পাল্টা লুসিই বলল, ‘আপনাকে চা দিতে বলি?’
এই তো আলাপের স্রোত ভেঙ্গে পড়ছে। একে বাধা দাও, স্রোতের গায়ে ভেসে যাও। স্রোতের মুখে আরেকটা স্রোত হয়ে যাও। দেখবে তারপরে আরো কত স্রোত, কত ভাসা, কত চলা।
সুধাকর ঘুমিয়ে, অথবা ঘুমের ভান করে চোখ বুজে।
লুসি খুব কাছে এসে একবার নিচু হয়ে পরখ করে নিলে সুধাকরকে, তারপর নিজে নিজেই বলল, ‘বাবাঃ কি এক চাকরি। আপনিও তো খবরের কাগজে কাজ করেছেন। ওমনি রাত জাগতে হয় রোজ।’
‘না, তাছাড়া এখন তো সে কাজ নেই আর।’
একটা চেয়ার দেখিয়ে দিয়ে বলে, ‘কি আশ্চর্য আপনি তখন থেকে দাঁড়িয়ে, বসুন না।’
‘না, না, আমি কেন, আপনি বসুন।’
‘থাক, এ বাদানুবাদের শেষ নেই, আপনি বসুন আর দাঁড়িয়ে থাকুন, আমি আপনার চা করে আনছি।’
অপূর্ব কৃতজ্ঞতায় ভরে এলো মন। কে বলে এ মেয়ে স্বার্থপর, এমন হাল্কা আপন করে নিয়েছে, এমন ঘরোয়া করে ফেলেছে।
সেদিন এন্টনির বাহুলগ্ন হতে দেখে সে কথা বললে মস্ত অন্যায় হতো। ভালোই করেছে, খুশির বিপুল তরঙ্গে ভেসে যাওয়া কাগজের নৌকার মতো সে এখন হাল্কা, কিন্তু সেখানে সূঁচের মতো ধারালো কী যেন একটা আর সূক্ষ্ম অস্বস্তি। তার এই কাগজের নৌকাটা ফুটো করে ডুবিয়ে দিতে চায় এন্টনি।
কি মনে হলো ডাকল কামাল, ‘শুনুন।’
যেতে যেতে ঘাড় ফিরিয়ে বলল লুসি, ‘কিছু বলবেন।’
‘হ্যাঁ।’
তারপর কী মনে করে চেয়ারের দিকে তাকিয়ে বলে লুসি, ‘দেখি দেখি, উঃ, চেয়ারটায় এক রাজ্যের বই, দেখি সরিয়ে দিই। বসবেনই বা কোথায়।’
কাছাকাছি গা ছুঁয়ে গেল, তার পরিতৃপ্তির জন্য এত ভাবনা লুসির, ইচ্ছে হলো মুখের কথা মুখে না বলে অন্য কোনো ভাষায় বলতে, অথবা একেবারে ভাষাতেই নয়। শুধু –
এমন করে ঝুঁকে পড়ে লুসি যে, কথা বলতে গিয়ে দেখল প্রায় কানের কাছেই মুখ আনতে হলো, ‘এমন করে রাত কাটিয়ে গেলাম কেউ কিছু মনে করবে না তো।’
‘কেউ আবার কে?’
‘বাড়ির লোকজন।’
বিদ্রƒপের ভঙ্গিতে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, ‘বাড়ির লোকজন। কেন, যার জন্যে তাঁদের ভাবনা তার কোনো অসুবিধে না হলেই হলো।’
‘কি করে বুঝব তার অসুবিধে হয়নি।’ ভেবে নিজেই অবাক এত কথা তাকে শেখাল কে।
চুলের গোছাটা এবার পেছনে টেনে খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে বলল লুসি, ‘তা যে হয়নি, নিজের হাতে সুন্দর এক কাপ চা বানিয়ে প্রমাণ করে দিলে হবে তো?’
লক্ষ করছিল লুসির চলে যাওয়া। এর চেয়ে অনেক আস্তে, অনেক লাল আলোর রং দেখিয়ে, সামান্য একটু পেট্রলের বাষ্প ছাড়িয়ে শেভ্রলে গাড়িও যায় যেন পাখায় ভর করে। কিন্তু এ যাওয়ার সঙ্গে কোনো তুলনাই হয় না, ঘরের এক একটা পর্দা সরিয়ে যাচ্ছে না যেন লুসি, কামালের হৃদয়ের পর্দাও ছুঁয়ে যাচ্ছে, সরিয়ে সরিয়ে যাচ্ছে।
কামাল ভেতরের ঘরে ঢুকে দেখল সুধাকর তখনও ঘুমিয়ে। হঠাৎ পায়ের শব্দে আড়মোড়া দিয়ে ঘুম ভাঙ্গল। রক্তজবার মতো লাল টকটকে চোখ। হাত ধরে টেনে বসাল বিছানার কাছে। বলল, ‘ঘুমালে কেমন?’
‘ভালো, তা উঠবে না। না, তোমাকে ছেড়েই স্বার্থপরের মতো চা খেতে হবে।’
‘স্বার্থপর’, কথাটা নিজের মনে আউড়ে নিয়েই সুধাকর বলল, ‘স্বার্থ যদি থাকে, স্বার্থপর হবেই।’
খুশির আলোয় মন ভরে গিয়েছিল, সুধাকরের একটি কথায় কালো মেঘ জমল তাতে, তবু প্রাণপণ চেষ্টা করে বলল, ‘স্বার্থপর দেখলে কিসে।’
‘লুক্, তোমাকে দেখে মনে হয় মূর্তমান অভিমান। সব কথার মানে জানা চাই। যাই মুখহাত ধুয়ে স্বার্থপরতা থেকে বাঁচাই তোমাকে।’
ছোট টেবিলে জাপানি মেয়ের ছবি আঁকা টেবিলক্লথ, যতœ করে বিছানো তাতে দুটো চায়ের কাপ, মাপজোঁক করে রাখা চামচ আর প্লেট, এক টুকরো স্নেহের মতো তুহীন শুভ্র মাখন, রুটিতে মাখন লাগিয়ে এগিয়ে দিতে লাগল লুসি।
চা ঢালতে গিয়ে চিনি একবার দিয়েই চামচ থামাল, কামালের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ক চামচ?’
‘দুই।’
তিন চামচ দিল লুসি, মুখে দুষ্টুমির হাসি।
কথাটা সুধাকরের সামনে জিজ্ঞেস করতে সাহস হয়নি। খবরের কাগজ হাতে নিয়ে উঠে পড়ল সুধাকর। যেতে যেতে মুখ না তুলেই বলল, ‘কোনদিকে যাবে?’
‘ভাবছি ওই ট্যুশনিটার খোঁজে যাবো একবার।’
‘ও ভালো ভালো, তাহলে তুমি বেরিয়ে পড়ো। আমার আবার দেখছি ছুটতে হবে কাগজের আপিসে, সম্পাদকের জরুরি তলব। তলব শুনলেই ভয় করে। জানো তো ওই ঘটনার পর থেকে –
সুধাকর বেরিয়ে যাবার পরও অনেকক্ষণ বসে রইল কামাল।
কি মনে করে ভেতরে গিয়ে এবার হাতে করে নিয়ে এলো লুসি এক তোড়া তাজা ফুল। ফুলদানিতে সাজাতে গিয়ে বলল, ‘কেমন চমৎকার না?’
সায় দিয়ে বলতে হলো, ‘তাতো বটেই।’
সেদিকে লোভাতুরের মতো তাকাতে দেখে বলল লুসি, ‘দেবো নাকি একটা। বাগানের ফুল, বাগান মানে ফ্ল্যাটের বাড়িতে টব আর কি। নেবেন? হাঁ করে চেয়ে আছেন কেন?’
কামাল দেখছিল ওর লিকলিকে আঙুলের দিকে। আর ভাবছিল কিরো এ হাতের কী বর্ণনা দিতেন, স্পেড, আর্টিস্টিক না আর কিছু।
লুসির কথায় হুঁশ হলো, ‘দিলে নিতে পারি।’
‘তবে নিন না যেটা খুশি।’
চেয়ে দেখল লাল, বেগুনি, হলদে ফুলের সমাহার। কোনটার কি নাম তাও জানে না।
লাল ফুলটা হাত বাড়িয়ে নিতেই হেসে বলল লুসি, ‘উহুঁ হুঁ ওটা কিন্তু প্রিয়জনদের জন্য।’
ওটার বোঁটা ছিঁড়ে নিয়েও কাঁপা হাতে একটা হলদে ফুলই শেষ পর্যন্ত তুলে নিল কামাল।
এক মুহূর্তে মুখটা কেমন বিবর্ণ দেখাল লুসির।
কিছুক্ষণ পরই বিদায় নিল কামাল।
অর্ধেক সিঁড়ি নাবতে গেছে এমন সময় পেছনে কার পায়ের শব্দ শোনা গেল। মন্দ, লঘু, ছন্দময়।
একটা মিষ্টি সুর কথা হয়ে উঠল, ‘শুনুন।’
ওই একটা শুনুনের নিমন্ত্রণ যেন তাকে যুগযুগ ধরে পাথরের মূর্তি বানিয়ে দিতে পারে।
‘কেন যে তিন চামচ চিনি দিলাম জিজ্ঞেস করলেন না যে।’
‘সুযোগ আর পেলাম কই।’
‘দু’চামচ আপনার কথামতো, আরেক চামচ সেদিনের সৃহৃদয়তার জন্য আমার কৃতজ্ঞতা। মনে নেই সেদিন আমি আর –
কথাটা বলতে গিয়ে আটকে এলো লুসির।
কিন্তু কামাল বুঝতে পারল, ‘আমি আর এন্টনি’, এই তো। একথাটা বলতে এত ভূমিকার কি আছে।
তবু মুখে বলল কামাল, ‘না না, সে আর আমি তেমনকি, হাজার হলেও আপনি – এরপর আর কিছু বলা উচিত কিনা ভেবে থেমে গেল।
তবে ভরসা এই ওর বাকি কথাটা হয়ত ঠিকই বুঝেছে লুসি। বাকি কথা মানে কামাল যা বলতে চেয়েছে হাজার হলেও আপনি আমার প্রিয়জন।
নইল আর একটা কথা না বলেও এমন পালিয়ে গেল কেন লুসি।
কী ভেবে সেদিন কামাল সোজা গিয়ে হাজির হলো মণিদের বাড়ি।
অনেক দির পর আসতে দেখে নিজেই বেরিয়ে বললেন, ‘আমরা তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। তবু ভালো এসে গেলেন শেষটায়।’
কোনো ধরাবাঁধা নিয়মের দরকার নেই। যতক্ষণ খুশি পড়াবে। সঙ্গটাই বড় কথা। বি.এ-এম.এ. পড়িয়ে লায়েক করবার বাসনাও নেই। শুধু চলিষ্ণু পৃথিবীর একটু রূপ, রস ও গন্ধের স্বাদ দিতে হবে তাকে। চার দেওয়ালের বাইরের পৃথিবী। সেখানে ফুল দেখতে পায়ে হেঁটে যেতে হয়, গিয়ে কুঁজো হয়ে তা শুঁকতে হয়। হাত বাড়িয়ে তুলতে হয়, যার কোনোটাই পারবে না মণি, সে পৃথিবীর খবর।
প্রথম প্রথম একটা বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলার মতো ব্যবহার করল মণি। কে যেন হঠাৎ তার নিরিবিলি একান্ত গোপন খবর জেনে নিচ্ছে। ধরা পড়ে যাচ্ছে খুনে আসামির মতো।
এ দায় তবু কেন যে ঘাড় পেতে নিল কামাল নিজেই জানে না। যেটুকু জানে সেটুকু শুধু এক জোড়া চোখের নীরব আকুতি। নিথর কান্না, ভাষা ভাষা স্বপ্ন সেখানে আছে মিশে।
কিন্তু বন্য ঘোড়াকেও পোষ মানাতে হয়। পায়ের খুর তারও ভোঁতা হয়। উদ্দাম রক্তে আগের সে তেজ থাকে না।
সন্দেহের চোখে হলেও তবু আগের তুলনায় অনেক সহজ মণি, সারাদিনের টুকরো ভাবনাকে নিয়ে তৈরি স্বপ্নের একটু আধটু জানতে ইচ্ছে করে। হৃদয় কথা বলে, নড়ে ওঠে ঠোঁট, আশায় জ্বলজ্বলে চোখ। অসহায় জীবনে একজন মানুষ – ঘরের মানুষ নয় – বাইরের একজন মানুষের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা লাভের লোভ আর যেন কোনোমতেই পারে না ঠেকাতে।
ঘরের মানুষরা তাকে বুঝে ফেলেছে। জেনে ফেলেছে। আক কিছু বাকি নেই। তন্নতন্ন করে তারা দেখেছে। তাদের কাছে মণি দয়া, করুণা আর দীর্ঘশ্বাস। বাইরের লোক কামাল। সহৃদয়তার দৃষ্টিতে করুণা হয়ত তারও থাকবে। কিন্তু সেসঙ্গে দু’একটা আশার বাণীও থাকতে পারে, একমাত্র এটাই সান্ত¡না।
সাবের সাহেব মাঝে মাঝে খোঁজখবর নেন। কথা বলেন কম। অপরাধের জন্য নিজেও তিনি যেন দায়ী। মাঝে মাঝে কী মনে করে মণির মাথায় হাত রাখেন। বুলিয়ে দেন নরম চুল। দু’একটা পড়াও জিজ্ঞেস করেন। সাধ্যমতো জবাব দেয় মণি।
তারপর কামালের দিকে তাকিয়ে নিজেকেই প্রবোধ দেওয়ার ছলে বলেন, ‘অদ্ভুত শার্প কী বলেন, এ বয়েসে –
নিঘাত খুনের আসামিকে বাঁচাবার জন্য জবরদস্ত ওকালতী। অন্তত সুরটা সেরকমই।
খানিকক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করতে করতে চলে যান, চশমা জোড়া কোথায় যে ফেলে এলাম।
পড়ানোর চাইতে গল্পতেই মণির বেশি আনন্দ। বিদ্বেষ আর সন্দেহের পাহাড় যতই ভাঙ্গছে, ততই মনের অনর্গল রুদ্ধদ্বার খুলে যায় এক এক করে।
পড়াশুনা শেষ করে বিদায় নিতে যাবে, মণি ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলে, ‘স্যার’ –
যেতে যেতে ফিরে দাঁড়ায় কামাল।
‘কিছু বলবে –
‘না, কিছু না।’
একখ- অন্ধকারে মেঘে ছেয়ে যায় চোখমুখ। গা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ে আবার বিছানায়।
‘বলো না ভয় কি –
চোখমুখ কিছু একটা বলতে চায়। ভয়ানক তাড়না। আগ্নেয়গিরিতে বিস্ফোরণের আগুন।
তারপর হাত দিয়ে চোখ ঢেকে ফেলে পাশ ফিরে বলে, ‘আপনাকে আমি ভরসা করি স্যার, সেজন্যেই –
বসতে হলো কামালকে।
‘বেশ তো বলেই দেখো না।’
‘বলব?’
অসহায় চাউনি।
‘নিশ্চয়ই বলবে। নইলে আমি ভীষণ রাগ করব।’
মুহূর্তে উজ্জ্বল হয়ে বলল, ‘কাউকে বলবেন না কথা দিন।’
কাঁপা হাতে বালিশের তলা থেকে বার হয় একটা নীল খাম। ওটা কামালের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘স্যার আপনার দোহাই, ঠিকানা দেখবেন না।’ একটু ডাকে ফেলে দেবেন? আর কাউকে ভরসা হয় না।’
কামালের সমস্ত উৎসাহ এক মুহূর্তে তরল হয়ে যায়। তবু জবানবন্দি আসামির মতো বলতে হলো, ‘না, দেখব না।’
চলতে চলতে নিজের মনের কাছেই ধমক খেল। অপরিণত বয়েসে কোনো একটা যদি কিছু ঘটে যায় তার দায়িত্ব তার নিজেরই হবে না। সাবের সাহেবের ভরসা, বাড়ির লোকদের ভরসা সে। কোনোদিন মাথা গলাতে আসেননি, জিজ্ঞেস করতে আসেননি। কিন্তু ভরসা যে সে মণিরও।
দুই পরস্পরবিরোধী ভরসার মধ্যে সমতা রাখা কঠিন।
চিঠিটা হয়তো ছিঁড়েই ফেলত। কিন্তু তখনি দেখা সুধাকরের সঙ্গে। মনে হলো বড় ব্যস্ত। হয়তো দেখেও না দেখার ভান করে থাকবে। মানুষটাকে নিয়ে যতই ভেবেছে ততো দেখেছে এ ভাবনার শেষ নেই। একেবারে ছাঁটাই করে দেওয়া যায় না মন থেকে। বারবার শত সহস্র পথ ঘুরে যে মানুষটি কথা কয়ে ওঠে সে সুধাকর।
ডাকবাক্সে চিঠি দুটো ফেলে হন্ হন্ করে হাঁটা শুরু করে। একবার ডাকলে হয়, ডেকে দুটো কথা, অথবা একটু আড্ডা।
সুধাকর বড় বড় কথা বলবে। হয়তো একদমই কিছু বলবে না। তবু পৃথিবীর সব কিছু চাওয়ার পর একজনের সঙ্গে দুটো সরস আলোচনায় কি অপূর্ব সুখ। বিশেষ করে মনটা যখন হয়ে পড়ে ছুটকো কথার গুদাম ঘর। ডানাকাটা কবুতরের মতো তারা কাতরে চিৎকার করে ওঠে, মুক্তি দাও, মুক্তি দাও।
চিঠিটা নিয়ে কী করবে। সুধাকরকে জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে ছিল। তাও হলো না।
শত নিষেধ সত্ত্বেও পকেটে হাত বুলিয়ে বার করল। না দেখার ভান করে তবু দেখতে হয়। শুধু ঠিকানাই দেখবে, নাম নয়। কিন্তু ক্ষুধাতুর চোখ ওইটুকু পড়েই তুষ্ট নয়, বাধার প্রাচীর পেরিয়ে পড়ে ফেলল আরো অনেকখানি। ডলি রহমান –
কী ভেবে হঠাৎ হাসি পেল। দু’অক্ষরের নামগুলো যেন প্রেমের জন্য তৈরি। তা নইলে ডলি না হয়ে ডালিয়া হলো না কেন, লুসি না হয়ে –
বেশ কল্পনা করা যায় কোনো এক ডলি স্কুলের বইয়ের ভেতর ডুবে তন্ময় হয়ে ভাবছে। পেন্সিলের ডগা দাঁতে আঁকড়ে। কড়ানাড়ার শব্দে সচকিতে ছুটে যাওয়া, একটুকরো নীল কাগজের প্রতীক্ষায় উৎকর্ণ হয়ে থাকা। নিরাশ করা চলে না তাকে।
প্রেমের রাজ্যে সে মাস্টার নয়, মণিও ছাত্র নয়। তারা দু’জন পুুরুষ, জীবনের এক মহা বুভুক্ষায় দু’জনই তৃষ্ণার্ত। এক্ষেত্রে একজনকে বাধিত করা যায়, যায় ঠিক। কিন্তু করা কি ঠিক হবে।
ডলি রহমানের প্রতি উদ্দেশিত হৃদয়ের একমুঠা ঝড়কে কখন যে ডাকবাক্স গলিয়ে ফেলে দিল বুঝতেও পারল না। এই ডলি রহমানের সঙ্গে লুসির চেহারাটা মিলিয়ে দেখলে হতো।
ভেবেছিল চিঠিটা কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলবে। তাহলে কি সুধাকর ভদ্র তার ভাবনার মোড় উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিলো। সুধাকর ভদ্র শুধু সুধাকর ভদ্র নয়। আরেকজনের ছায়া। তার হাসি আরেক হাসির প্রতিফলন। তার ব্যস্ততা আরেক দ্রুত হৃদয়ের স্পন্দন।
পরেরবার যেতেই মণি পড়া থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার ওটা ফেলেছিলেন?’
‘কোনটা?’
‘ওই যে আপনাকে দিয়েছিলাম।’ তারপর গলা নাবিয়ে বলল, ‘চিঠিটা।’
‘তবে কি ভেবেছ পকেটে নিয়ে পরম তৃপ্তিতে ঘুরে বেড়াচ্ছি।’
বলেই অনুভব করল অতিরিক্ত কড়া সুর।
কে যে তাকে একথা বলতে বলল ওই জানে, তবু জেরার সুরে বলল, ‘মেয়েটি কে?’
বিজলি চমকাল মণির চোখে। হাতদুটোকে ভর করে বিছানায় উঠে বসার নিষ্ফল চেষ্টা করে বলল, ‘কার কথা বলছেন স্যার?’
‘যাকে চিঠি লিখেছ।’
‘আপনি সে চিঠি দেখেছেন?’
‘না।’
কিন্তু সন্দেহের ছায়া যায় না। কোথায় ধূমায়িত অভিমান ফেটে পড়ে চোখদুটো স্ফুরিত, মাথার রগ কেঁপে উঠছে থেকে থেকে। পাদুটো নাড়া দিয়ে চাদরটা জোর করে মাটিতে ছুড়ে ফেলে মণি।
রীতিমতো ভয় পেয়ে যায় কামাল, ‘কী হলো তোমার? পাগলামী করছ কেন?’
তবু কোনো কথা নেই। পারলে ভাঙ্গা পাদু টাকে গুঁড়িয়ে গুঁড়িয়ে যেন আরো ভাঙ্গে। বেঁচে মরার চাইতে মরা ভালো। সাদা পাইনের বুকের মতো প্লাস্টার করা পাদুটো দেখে ভয় লাগে কামালের।
ধরতে গেল তাকে বিছানার কাছে। হাত ছিটকে সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনি যান তো স্যার, যান। আমি আজ পড়ব না।’
‘কী হলো খোকার।’ বলতে বলতে বেরিয়ে এলেন মণির মা। তরকারি কুটে এসেছেন, হাতে পেঁয়াজ রসুনের গন্ধ। কোনোদিন চোখাচোখি হয়নি মাস্টারের সঙ্গে, কিছুটা সম্ভ্রম আর কিছুটা আভিজাত্যের শিক্ষা।
আজ আর তার বালাই নেই। মাথার ঘোমটা টেনে নিয়ে বললেন, ‘ক’দিন ধরে মুখ ভার করে আছে। কি যে হয়েছে। কিছু বলেননি তো আপনি, কোনো কড়া কথা?’
রাগে জ্বলে যায় কামাল। তড়াক করে উঠে বলে, ‘জিজ্ঞেস করুন মণিকে।’
আরেকটি কণ্ঠ এবার কথা বলে উঠল। এতদিন এসেছে লক্ষ করেনি, অন্য দশজনের গলার স্বরের সঙ্গে একাত্ম হয়ে শুনেছে। আলাদা করে দেখেনি, দেখার সুযোগও হয়নি।
লম্বা গড়ন, অলিভ অয়েল মসৃণতা তার চামড়া জুড়ে। নাক থেকে শুরু করে গ্রীবাদেশের আগাগোড়া গড়নে যেন বড় বেশি গ্রীক চারুকলার প্রতি পক্ষপাতিত্ব। ভুরুর কুঞ্চনে আসল চেহারাটা লক্ষ করা গেল না। উত্তেজনার উত্তাল তরঙ্গ নেবে ভাটা পড়লে এ চেহারার জৌলুশ বোঝা যাবে, ভাবল কামাল।
ঝাঁঝাল সুরে মায়ের পক্ষ সমর্থন করে বলল সে, ‘তাকে জিজ্ঞেস করার আমরাই করব, আপনার কথাই মা শুনতে চেয়েছিলেন।’
অন্য সময় হলে চোখ বুজে এসব ক্ষমা করে দিতে পারত। কিন্তু কিছুতেই মনকে প্রবোধ দেওয়া গেল না। প্রতিবাদের একটা তীব্র আকাক্সক্ষা তাকে পাগল করে তুলছে।
বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘আমার কথা শুনে কাজ নেই, আর তাছাড়া আমি কৈফিয়ৎ দিতেও অভ্যস্ত নই।’
সে মেয়েটির – এবার শুনল নাম চম্পা – তেজ থামে মা, ‘যাবেন আপনার খুশি, পয়সা-কড়ির হিসেবটাও চুকিয়ে যান, মা –
ঠিক এতটার জন্য বোধহয় মণির মাও প্রস্তুত ছিলেন না। তবু মেয়ের মন রক্ষার জন্যে বলতেই হলো, ‘বেশ তো, মাসের প্রথমদিকে আসবেন। সাহেবের সঙ্গে হিসেবটা বুঝে নিয়ে –
চুলায় রাঁধা তরকারির বিপদ আসন্ন খবর পেয়ে তারপর কথা শেষ না করেই ছুটলেন রান্না ঘরে।
এক মুহূর্তের জন্য বিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে রইল কামাল। আরেক মর্মর মূর্তির মতো চম্পা। ভেতর থেকে করুণ ডাক এলো, ‘স্যার –
গাঢ় কান্না আর আকুতির রসে ভেজানো ভারি গলা।
‘স্যার একবার আসবেন – স্যার –
এক মুহূর্ত ভাবল। তারপর কি মনে করে আবার ফিরে এলো মণির কামরায়। কামালকে দেখেই ওর হাতদুটো দিয়ে মণি নিজের চোখ ঢেকে ফেলে। সে হাতে একটু চাপ দিতেই বন্যার ঢলের মতো সব অভিমান যেন কান্না হয়ে ঝরে পড়ে। কামাল অনুভব করছে হৃদয়ের একটা উষ্ণ প্রস্রবন হঠাৎ যেন যাবার পথ পেয়েছে।
‘আপনি চলে যাবেন স্যার –
‘তাই ভাবছি।’
‘আর কোনোদিন আসবেন না?’
তেমনি মামুলী জবাব কামালের, ‘কী করে বলি।’
তারপর একবার তাকাল চম্পার দিকে, কিন্তু চোখ ফেরাতেই দেখল সেই সবুজ পর্দা সরিয়ে আরেক অন্ধকার ঘুরে খুট্ করে সুইচ্ জ্বালাল চম্পা। হঠাৎ মাথার চুল ছেড়ে দিল ঘাড় বরাবর। গ্রীক ভাস্কর্যের ওপরে আষাঢ়ের ঢল নামল।
কান্না থামিয়ে পাশ ফিরে বলতে লাগে মণি, ‘রাগ করবেন না স্যার। আমারই অন্যায় হয়েছিল। আমাকে মাপ করুন। হঠাৎ ভারি কান্না পেয়ে গেল তাই।’
কামালের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় কিনা বোধহয় সেটা লক্ষ করে আবার গলা নাবিয়ে বলল, ‘স্যার একজন কাউকে বলতে হয় – নইলে –
‘কিসের কথা বলছ?’
কিসের কথা। আবার একটা ভীতি। আশঙ্কার চাউনি। সন্দেহের ধুক্ ধুক্ আলো।
‘ওই চিঠিটার কথা। আপনাকে না বলে পারব না স্যার।’
তারপর কল্পনার তুলি দিয়ে যা এঁকেছে তাই বলল স্বপ্নের রং দিয়ে। প্রথম সূর্যোদয়ের মতো বছরখানেক আগের একটি ঘটনা তার মনের আকাশে আবীর মাখিয়ে গেছে। বুঝেছে, এ কিছু নয়, নিছকই একটা খেয়াল। একটা দুঃস্বপ্ন।
পা চিন্ চিন্ করে ওঠে কখনও। ডাক্তার এসে দিয়ে যান ঘুমের ওষুধ। আরেক যন্ত্রণা সে যন্ত্রণাটাকেও তখন ছাড়িয়ে যায়। কার আঁচলের হাওয়ায় খুশির উত্তাপ তাকে পাগল করে তোলে।
সেই একবারই ভালো করে দেখেছে ডলিকে। ফুটবল খেলে ফিরছে। গ্রিন ইলেভেনকে তিন গোলে মোমিন মেমোরিয়াল ট্রফি হাতে নিয়ে। সেদিন তবু একটু দেখেছে।
রোয়াকে শাড়িটা আলগোছে নেড়ে দিতে গিয়ে একজোড়া চোখ সচকিত হয়ে দেখছে তাকে। হয়তো তাকে নয়। তার হাতের ট্রফিকে।
কিছুদিন পর যেতে হলো সেক্রেটারির বাসায়। ডিস্ট্রিক্ট জজ খেলাধুলায় উৎসাহী। নিজে থেকে একটা পার্কার কলম উপহার দেবেন। সেজেগুঁজে গিয়েছিল। জজ সাহেবের দেখা পাওয়া গেল না। জজ-তনয়া এলো। সেইদিনকার সেই রোয়াকে শাড়ি নাড়া মেয়েটি। সন্দেহ নেই। শেলফে বই খোঁজার ফাঁকে ফাঁকে সে ঘাড় ফিরিয়ে দেখছিল। সেদিন তাকেই দেখেছে নিশ্চয়ই। হাতে ট্রফি ছিল না।
পার্কার পেন আর নেওয়া হয়নি। ওইদিনের অভিজ্ঞতার পর আর যায়নি সে বাড়ি। আবারও যদি জজসাহেব বাইরে গিয়ে থাকেন আর তাকে অমনি বসে থাকতে হয় বোকার মতো –
ব্যস্ ঐটুকু। ওইটকু দিয়ে কোনো ভরসা করা চলে না। মনে মনে ধরে নেওয়া যায় না কোনো কিছুকে ধ্রুব বলে। তবু বিছানায় পড়ে থেকে কে যেন অহরহ রোয়াকে দাঁড়ানো মেয়েটির কথা মনে করিয়ে দেয়। যত চায় এড়াতে ততই আষ্টেপৃষ্ঠে ধরা পড়ে। কী যেন একটা অস্থিরতা পেয়ে বসে।
সাতদিন আগে লিখে রেখেছে। ভয়ে ভয়ে একটু একটু করে রাতে বাতি জ্বালিয়ে সকলের চোখ এড়িয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে। কিন্তু সে চিঠি ডলির হাতে গেলেই কি। বিজয়ীর বেশে যে জুলিয়াস সিজরকে নিয়ে হয়তো একদিন ছিল স্বপ্ন তাকে আজ এ অবস্থায় দেখে আত্মহত্যা করবে না ডলি!
একঠায় বসে কথা শুনছে কামাল। কি আশ্চর্য, আরেকজনের হৃদয়ের ঢেউ তাকেও নাড়া দিলো নাকি। এবার নিজ থেকেই ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘আমি সব বুঝি। একথা আমাকে আগে বলোনি কেন।’
মণি বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে।
থাক্। এসময়ে কিছু বলে লাভ নেই। ভেতরের চাপা আগুন যতক্ষণ জ্বলতে চায় জ্বলুক। মনের তীক্ষè ব্যথা আর বেদনার বিষকে পুড়িয়ে নেওয়াই ভালো।
বাতি বুজিয়ে দিয়ে পা টিপে টিপে বেরিয়ে এলো কামাল।
অন্ধকারে ছায়ামূর্তির মতো কে যেন সরে গেল। পাশের কোনো ঘরে আলো জ্বলতেই ধরা পড়ে যায় চম্পা। কামালের মুখোমুখি হতে চমকে উঠে। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে তাহলে সব শুনেছে।
ওর দিকে তাকিয়ে মনে হলো কামালের, হ্যাঁ সত্যি, এবার গ্রীক ভাস্কর্যে সহানুভূতির কমনীয়তা ছায়া ফেলেছে। অপূর্ব দেখাচ্ছে। মুখের রং নয়, এ মনের রং।
গেট পর্যন্ত ভীরু পায়ে তার পেছন পেছন এগিয়ে এসে বলে চম্পা, ‘আপনি কিন্তু ওকে ছেড়ে যাবেন না মাস্টার সাহেব। আপনাকে ছাড়া ও থাকতে পারবে না।’
সে কথায় কান না দিয়ে, কোনোদিকে না তাকিয়ে হন্ হন্ করে বড় রাস্তায় এসে ওঠে কামাল।
সেন্ট অগাস্টিন চার্চ বরাবর রাস্তাটা নিরিবিলি। বড় বড় গাছের ছাউনি দেওয়া ফুটপাত। বেরসিক ট্রাম-বাসের ভিড় ঠেলে, এখানে এলে নাম না জানা দুটো একটা পাখির ডাকও শোনা যায়। বিশেষ করে দুপুরে যখন শহরটা একটানা পরিশ্রমের ক্লান্তিতে ঘুম ঘুম। অনেক চিৎকারের পর বাক্রহিত।
রোববার। ভোর থেকেই চার্চে উপাসনাকারীদের ভিড়। নানা বয়সের ছেলে মেয়ে বুড়ো দল। কারও চোখে শনিবার রাতের ক্লান্তি। হার্ভেস্টবলের মিষ্টি মিষ্টি আমেজ। তবু চার্চে যখন গিয়ে বসবে আর নীল, সবুজ, রঙের নক্সা করা কাচ ভেদ করে কয়েকটা আলোর রেখা এসে পড়বে তখন, তখন পার্থিব এ মনটা তছ্নছ্ হয়ে আসে। ভাবগম্ভীর পরিবেশে মনে হবে এ পৃথিবীর পর আরেকটা পৃথিবী, পাপ পুণ্যের খতিয়ান আর সেসঙ্গে –
সবই শোনা কথা। অনেকবার শুনেছে সুধাকরের মুখে।
মাথায় কাল স্কার্ফ বাঁধা একদল মেয়ের ভিড় সেদিকেই আসছে। পেছনে পেছনে লুসি। এমন শান্ত সৌম্য বেশে আর কখনও দেখেনি তাকে।
পথ ছেড়ে দিল কামাল। মনে হলো ওকে দেখেও যেন দেখল না লুসি, বলল না একটা কথাও। পর মুহূর্তেই ভাবল, বলার কথা থাকলেই কেউ যে গায়ে পড়ে বলবে এমন কথা নেই। দেখা হলেই আবেগের ঝড়ে গলে বরফ হতে হবে কেন।
কেবল লুসির চোখটা যেন তাকে ছুঁয়ে গেল। কিন্তু বলে গেল না কিছুই। কিংবা একটু যেন হাসির দ্যুতি ফুটে উঠল তার চোখে, কিন্তু সে এমন অপরিসর আর এমন মৃদু যে, তার স্পন্দন হৃদয়ে কোনো সাড়া জাগাতে পারে না।
পা চালিয়ে হাঁটা শুরু করে কামাল। আপাতত কোনো কাজই নেই হাতে। ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া কোথায় যাবে। সবাই ব্যস্ত। তাদের যেমন সোমবার মঙ্গলবার তেমনি আছে রোববার। এমন লোকও আছে যাদের সময়ের অভাব নেই। বসবে গিয়ে কোথাও, অন্তহীন কথা বলবে। কেউ আবার কথা বলবে না। শুধু বসেই কৃপা করবে গৃহকর্তাকে। আর অনেকে হয়তো আসবেও না, বসবেও না। কয়েকটা নাম্বার ডায়াল করে বালিশে হেলান দিয়ে ভালোমন্দের ফিরিস্তি বলে যাবে। এ ধরনের মানুষ হতে পারলে তারও রোববারটা ভালোই কাটত।
হাঁটতে হাঁটতে সিনেমাহলের কাছে এসে দাঁড়াল। ভালোমন্দ ভেবে কাজ নেই। পৃথিবীর সব গল্পেরই এক কথা। নায়ক আর নায়িকা। প্রেম করাও আর ভাঙ্গাও। বক্স অফিস প্রযোজকরা অতটুকুতেই সন্তুষ্ট নন। ভাঙ্গবার পরে আবার জোড়া লাগাও। নইলে চলে না।
দু’টাকা সাড়ে বারো আনায় মাঝে মাঝে জীবনের একটি ছোট্ট আভিজাত্যকে কেনা যায়। মনে মনে একটু পুলক আর আত্মসন্তুষ্টি। নব্বই মিনিটের জন্য সর্বদর্শকদের লক্ষ্যস্থল এক। আর বাঁ পাশেই ঝলমলে শাড়ি। ডেক্রন আর নাইলন বুশসার্ট পরা যুবকের ভিড়। তার বেশভূষার দিকে তাকিয়ে নাক উঁচিয়ে তারা চট্ করে বলে ফেলতে পারছে না, উঠে যাও।
সভ্যতার বিবর্তন। গণতন্ত্রের নির্দেশ।
কে যেন পেছন থেকে ওর কাঁধে হাত রেখে চেঁচিয়ে উঠল। আরো দু’একজনের দৃষ্টি গেল সেদিকে।
অবাক কামালও কম হলো না। এন্টনি। রোববারের কাগজটা অনত্থক দুমড়ে নিয়ে কপালে হাওয়া করছে।
‘হ্যালো, তুমি এখানে?’
খুব একটা কড়া রসিকতা করার বাসনা ছিল। কিন্তু এন্টনির পার্শ্ববর্তিনীর দিকে তাকিয়ে সংযত হতে হলো। এন্টনির বাঁ হাত সিটের পেছনে ঘুরে মেয়েটির কাঁধের ওপর রাখা।
ঘাড় বাঁকিয়ে পেছন দিকে আলাপ করার অসুবিধে অনেক। তবু চোখ ফেরাবার আগে মেয়েটির দিকে না তাকিয়ে পারল না। স্কুলে পড়া মেয়ে নিশ্চয়ই। মামুলী চেহারা। দৈহিক সৌষ্ঠব বয়সের তুলনায় একটু বেশি।
শেষের ঘণ্টা পড়তেই পর্দার ছবি শুরু হয়ে যায়। বুকটা ঢিপ ঢিপ করতে থাকে। সমস্ত ব্যাপারটাই যেন তার কাছে কেমন ঠেকছে। লুসির সঙ্গে দেখা হবার পর থেকে এ পর্যন্ত যা যা দেখেছে তার কোনোটার সঙ্গে কোনোটার সঙ্গতি নেই। অথচ যুক্তির একটা সুতোয় সবগুলো বাঁধতে পারলে নিজেরাই যেন তৃপ্ত হতো।
ইচ্ছে ছিল, শো ভাঙ্গার পর একবার আলাপ ঝালিয়ে নেবে এন্টনির সঙ্গে। সাহস করে একবার কটাক্ষ করবে ওর নবলব্ধ বান্ধবীর প্রতি। তার সুযোগ মিলল না। খোলাছাতের একটা গাড়ি তৈরি। কে যেন এসে দরজা খুলে দিলো। হাওয়ার মতো মিলিয়ে গেল এন্টনি। খুব কাছে বসালো মেয়েটিকে। মনে হলো ইচ্ছে করে যেন এসব করছে এন্টনি। ইচ্ছে করে।
বলি বলি করেও কথাটা বলা হয়নি সুধাকরকে।
বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে নিজেই এসে হাজির সুধাকর। উস্কোখুস্কো চেহারা। আগের তুলনায় অনেক রুগ্ণ। ধোপদুরস্ত কাপড় চোপড়ের প্রতি বরাবরই প্রবল ঝোঁক। সেদিকেও লক্ষ নেই আজ।
ঘরে ঢুকেই সুধাকর বলল, ‘তোমার এখানে থাকবার জায়গা হবে?’
রীতিমতো শঙ্কিত হয় কামাল।
‘থাকবার জায়গা – কেন ও বাড়ি ছেড়ে দিচ্ছ নাকি?’
লক্ষ করেনি। ওর হাতে একটা হ্যাভারস্যাক। বোধহয় সংসার বলতে যা বোঝায় তার সবটাই তাতে।
ওটা নাবিয়ে রেখে সুধাকর বলে, ‘বাড়ি, বাড়ি আবার কোনোকালে ছিল।’ একটু ভেবে নিয়ে আবার জুড়ে দেয়, ‘ছিল, একদিন ছিল, আজ ও বাড়ি আর বাড়ি নেই।’
ব্যাপারটা তাহলে যা আন্দাজ করেছিল তাই নাকি?
উৎকর্ণ আগ্রহে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কামাল। কিন্তু নিজে থেকে বলতে সাহস হয় না কিছু। শুধু বলল, ‘সবাইকে ছেড়ে এসে থাকতে পারবে?’
‘সবাই মানে? সবাই কোথায় দেখলে? অবিশ্যি তোমার অসুবিধে হয় অন্য কোথাও দেখব। মাথা গোঁজার একটা আশ্রয় মিলবেই।’
‘অসুবিধে নেই, দু’মাস পরে রুমমেট আসবে। তদ্দিন সিট খালি।’
এ নিয়ে আর কোনো কথা হলো না। পড়াতে যাবার তাগাদা বিকেলে। তারপর কাগজের অফিসে ইন্টারভিউ। বলে গেল, ‘ফিরতে দেরি হবে। এক কাগজের সম্পাদক দেখা করতে বলেছে।’
রাতের খাবার কি করবে সুধাকর কথাটা জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তাকে ঘুমিয়ে পড়তে দেখে কোনো কথা না বলেই বেরিয়ে পড়ল।
কোনোমতে পড়াটা বুঝিয়ে উঠে পড়ার উপক্রম করে কামাল। মণি হঠাৎ হাতটা ধরে ফেলে।
‘কি, কিছু বলবে?’
মাথা নেড়ে জানায় মণি, না। বলার কিছু নেই, তবু বসে পড়তে হয়।
একা পুরোন ম্যাগাজিনের পাতা নাড়ছিল কামাল।
হঠাৎ মণির কথায় চেতনা এলো।
‘স্যার ওই চিঠির কিন্তু জবাব পাইনি?’
ভাবটা এই, যেন জবাব আদায় করার দায়িত্ব গৃহশিক্ষকের। রাগের সুরেই বলল, ‘আমি তার কী করব বলো।’
একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস। আর প্রায় কানে না শোনা আওয়াজ।
‘না স্যার, আপনি আর কী করবেন!’
হঠাৎ দু’জনকে সচকিত করে ঢুকলেন প্রৌঢ় এক ভদ্রলোক। বোধহয় সাবের সাহেবের পরিচিত কোনো ভদ্রলোক, কিংবা বড়লোক আত্মীয়, বসবার জন্য চারিদিক তাকিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকাই সাব্যস্ত করলেন।
কালো মোটামতো। চোখে শেলের চশমা, গা বেঁয়ে দামি সিগারেটের গন্ধ বেরুচ্ছে। চেয়ারের ওপর একটা পা তুলে দিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন মণির দিকে।
তারপর মুখ দিয়ে চুক্ চুক্ শব্দ করে বললেন, ‘ল্যুকস মোর লাইক এন্ ইনোসেন্ট ক্রিমিনাল। স্যাড। ভেরি স্যাড। কী করবে, ভেবেছ কিছু?’
সাবের সাহেব ভীরু দৃষ্টি নিয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে বলেন, ‘না, করবার আর কি আছে। পড়াশুনা শিখছে। মাস্টার রেখেছি। আর তাছাড়া বয়েসই বা কি হয়েছে।’
‘বয়েস। বলতে চাও বয়েস হয়নি। গোঁফের রেখা দেখছি। আসল কথা কি জানো, ওকে একটু মাঝে মাঝে ড্রিংক করাও। দেখবে সব –
সাবের সাহেব লাফিয়ে ওঠেন, ‘ড্রিংক –
‘হ্যাঁ। অবাক হচ্ছো কেন। জীবনে এই হতাশা ভুলে থাকবে কী নিয়ে। আমার মামাত ভাই এরকম ভুগল বছর সাতেক। তারপর যা হয় এসব কেসে তাই, মেন্টাল ডিজঅর্ডার। তারপর সুইসাইড্।’
মণির চোখে সেই আদিম হিংস্রতা। হাতের আঙুল নানা ভাঁজে মুঠো পাকিয়ে আবার শ্লথ হয়ে যায়। মুখ ফিরিয়ে খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। কোনো কথা শুনছে না। কিছুই যেন তাকে স্পর্শ করছে না।
একবার হিংস্র দৃষ্টি নিয়ে তাকায় তথাকথিত বিলেত ফেরৎ ব্যারিস্টারের দিকে। তার মেদবহুল দেহের ভাঁজে ভাঁজে আলো চিক্চিক্ করছে। জীবনে অনেক পাওয়ার, অনেক পেয়ে ভালো থাকার খুশি। অনেক কিছু বলতে পারার আনন্দে উচ্ছ্বসিত অধর।
কিন্তু মণি কিছু বলল না। একদিন চরম অভদ্রতা করেছিল। সাবের সাহেব দুঃখ করেছিলেন। একতরফা দুঃখ। ছেলের ব্যবহারে তিনি কতখানি লজ্জিত সে কথাই বলেছেন। আর কিছু না।
ভালো মানুষ, সরল মানুষ, উদার মানুষ সাবের সাহেব। দীর্ঘদিন সরকারি চাকরির পর রিটায়ার করেছেন। এখন লোকজন আসে। তার বন্ধু-বান্ধব। অকৃত্রিম সুহৃদ। তাদের ধরে ধরে নিয়ে আসনে। সব ঘর দেখিয়ে, সব আলাপের শেষে – কোণের দরজাটি খুলে যখন বলেন, মণি দরজা খোল, মণিও বোঝে আরেকটা নতুন দর্শক আজ চিড়িয়াখানায় এসেছে। খুঁতিয়ে দেখবে। নানা মুখভঙ্গি করবে। তারপর সাহসে কুলোবে না বলেই কানের কাছে গিয়ে বলবে, শকিং, হরিবল্।
সাবের সাহেব কথার মোড় ঘোরাবার জন্য ব্যারিস্টারের দিকে তাকিয়ে বলেন, কিন্তু এমনিতে বড্ড শার্প মণি, বুঝলে জামান। কোনোকিছু একবার পড়লে আর ভুলবে না।
প্রতিবাদ না করেই কিছু গ্রহণ করার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত এই মি. জামান বার এট ল, তর্ক করে খাবেন বলে অনেক পয়সা খরচ করে বিলেতের ডিগ্রি এনেছেন।
বললেন, ‘ওটা ইনটেলিজেন্স নয়। মানে বুদ্ধির দীপ্তি নয়, বরং অভ্যাসের ক্রিয়া। অন্ধদের দেখেছ তো শ্রবণশক্তি কি প্রখর। আমি যখন লন্ডনে –
লন্ডনে যখন ছিলেন তখন তিনি ‘হোম ফরদি হ্যান্ডিক্যাপড্’-এ দেখেছেন এরকম ছেলেমেয়ে অনেক। কিন্তু হলে কি হবে। ‘বুঝলেন, এদের জন্য সমাজে কি আছে বলুন।’
একজন সমর্থক খোঁজার জন্য একবার চশমার কাচ ঘষতে ঘষতে কথা কটা বললেন কামালকে লক্ষ করে।
কামাল কোনোকিছু বলার আগেই ভদ্রলোক উৎসাহ দেখিয়ে বলেন, ‘এনিওয়ে। নিয়েই এলে যখন, তোমার ছেলেটাকে দেখে যাই ভালো করে।’
এতক্ষণ সরাসরি কথা হয়নি মণির সঙ্গে। সাবের সাহেব হেসে বলেন, ‘বেশ তো, কই মণি তোমার পায়ের প্লাস্টার দেখাও।’
হঠাৎ আলো নিবে গেল। চট্ করে বেড্ সুইচের বোতাম টিপে দিলো কে, বুঝতে কষ্ট হলো না কামালের। একটা হাত যেন অন্ধকার ছুঁয়ে ছুঁয়ে আশ্রয় চাইল তার কাছে অসম্ভব উষ্ণ। র্থ র্থ করে কাঁপছে।
মনে হয় এ মণির কান্না নয়। তার অক্ষমতা আর নির্জীবতার লজ্জা হাতের প্রতিটি পেশী কাঁপিয়ে তুলেছে।
আলগোছে একটুখানি চাপ দিলো সে হাতে। অন্ধকারেই বুঝল, এবার মণির মাথাটাও ওর হাতের ওপর ভর করে রাখা। এবার তরল অভিমানের দু’এক ফোঁটা তার হাত ভিজিয়ে তুলছে। কপালে হাত বুলিয়ে মাথাটা তুলে ধরতে চাইল। যতই চেষ্টা করল, ততই পাথরের মতো স্থির হয়ে থাকল।
জুতোয় মস মস আওয়াজ তুলে ব্যারিস্টার ভদ্রলোক বললেন, ‘বাড়ি ফিউজড নাকি, কি আশ্চর্য!’
নিজেকে বিশ্বাস করার জন্য একরকম জোর করেই যেন আউড়ে যেতে থাকেন, ‘নিশ্চয়ই ফিউজড। থাক, আরেকদিন হবে।’
অন্ধকারে বসে একটা জিনিস অনুভব করল কামাল, আলোর সামনাসামনি অনেক বেদনা হার মানে। অনেক বেদনার কমনীয়তা আলোর আগুনে পুড়ে যায়। অন্ধকারে তা হয় না। সেখানে সহানুভূতির স্রোত প্রবল, জোরদার। সাহস করে কথা বলার শক্তি বেশি। ভরসাও বেশি।
জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে কি বলছিলে তুমি।’
চোখের কান্না মুছে নিয়ে বলে মণি, ‘কি বলছিলাম সব ভুলে গেছি।’
‘আমার মনে আছে, চিঠির কথা। কিন্তু তার আগে একটা কথা বলো, লোকের কথায় এত কাতর হয়ে পড়ো কেন?’
কথার স্রোত খুলে যায়। এমন সব কথা যা কোনোদিনই বলেনি।
‘আমার কি মনে হয় জানেন স্যার। হঠাৎ যেন তারা সবাই আবিষ্কার করেছে আমাকে দেখতে হবে। তারা দল করে আসে। সোজা হয়ে, বেঁকে, কুঁজো হয়ে দেখে। তারা স্তম্ভিত হয়, দুঃখিত হয়। করুণা হয় তাদের। অনুকম্পা হয়। এমন কাতর হয়ে যায়, তাদের দেখে আমার নিজেরই ভয় করে –
‘লোকের কথায় বা সমালোচনায় ভয় পাবার কি আছে?’
‘এই চার দেয়ালের মাঝখানে লোকের কথা মানা ছাড়া আমার কিছু করবার নেই যে স্যার।’
‘এখন নেই। কোনোদিন যে হবে না কেমন করে জানো।’
‘কোনোদিন হবে না, আমি জানি।’
‘তুমি যেদিন পায়ে হেঁটে দাঁড়াবে সেদিন?’
মণির হাতটা ইচ্ছে করেই টেনে নিয়ে বলে কামাল, ‘নিছক অনুকম্পার বশবর্তী হলে তোমাকে পড়াতে আসতাম না।’
‘তাই এসেছেন স্যার।’
হাতটা নিজ থেকে সরিয়ে নেয় কামাল।
‘তা না হলে এক এক করে তাদের সবাই চলে যায় কেন? আপনিও তো চলে যাচ্ছেন।’
‘কার কথা বলছ?’
‘শুনবেন তাদের নাম। কিন্তু শুনে কি হবে। বাবা আপনাকে তাদের নাম বলেননি এ ভয়ে, শুনে আপনিও হয়তো থাকবেন না।’
তারপর থেমে বলল, ‘সুধাকর ভদ্রও একদিন এ কথাই বলত।’
‘কার কথা বললে, সুধাকর ভদ্র?’
‘হ্যাঁ, তিনিই আপনার কথা বলেছিলেন বাবাকে।’
এক মুহূর্তে কোনো কথা বেরুল না কামালের মুখে। তাহলে সমস্ত ব্যাপারটাই সুধাকর ভদ্রের ষড়যন্ত্র। মনে মনে ভয়ানক রাগ হলো।
‘যদি দয়া করে না এসে থাকেন তাহলে কেন এসেছেন।’ মণির প্রশ্নে সচকিত হয়ে ওঠে কামাল।
‘এসেছি তোমাকে পড়িয়ে পয়সা পাই বলে, যেমন আর সকলকে পড়িয়ে পাই।’
‘কিন্তু আমাকে কদিন সহ্য করতে পারবেন স্যার? আমার এই প্লাস্টার করা পায়ের দিকে তাকিয়ে আপনার গা ঘিন্ ঘিন্ করে উঠবে না?’
‘ওই একজোড়া পায়ের অভাবে তোমার সবটা হারিয়ে যায়নি। আমি ডাক্তার নই। বার. এট. ল’ নই। অতকথা জানিনে। একটা জিনিসের অভাব থাকলেই জীবন ব্যর্থ, এ কথা মানতে রাজি নই।’
মণি কথা বলল না, মনে হলো বহুদিন পর কে যেন একটা অতি সত্যি কথা সহজ করে তাকে বলতে পেরেছে। সেতারের মিষ্টি শব্দের মতো।
সত্যিই তো এই পায়ের উর্ধেও তার অর্ধেকটা দেহ জীবনের জানলায় উঁকি দিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। লতা গাছও সূর্যের মুখ চেয়ে শেকড়ের দৈন্য ভুলে থাকতে পারে।
‘তোমার চিঠির কথা কি বলছিলে যেন?’
মণি আবার ভেঙ্গে পড়ে, ‘না থাক স্যার। সত্যি ব্যাপারটা বোঝার বয়স হয়েছে এদ্দিনে আমার। আমাকে চিঠি লিখতে যাবে কোন দুঃখে। এখন ভাবলে হাসি পায়, এত বড় ছেলেমানুষী না করলেই হতো।’
‘ছেলেমানুষী? হৃদয়ের ব্যাপারে সবাই একরকম। সবাই ছেলেমানুষ।’
এক সাহসের ধাক্কায় আরেক সাহসের প্রশ্ন করে বসে মণি, ‘আপনিও স্যার –
হঠাৎ কোনো জবাব মনে এলো না। অন্ধকারে বেড সুইচটা খুঁজে নিয়ে মুহূর্তের জন্য মণি আলো জ্বালতেই কামাল বাধা দিয়ে বলে, ‘না না, বুজিয়ে দাও।’
বিনা প্রতিবাদে বাতি বুজিয়ে দেয় মণি।
মুহূর্তের আলোয় দেখেছিল মণির চোখ। কিন্তু সেই ছল্ ছল্ চোখের দিকে তাকাতে সাহস হয়নি। আলো নিবিয়ে ভালোই করেছে।
কামাল উঠে পড়ে। বলে, ‘এখন যাই, অনেক রাত হলো।’
খবরের কাগজের সম্পাদক পাক্কা দু’ঘণ্টা বসিয়ে তবে দেখা করলেন। একদম চট্ করে কিছু বলতে পারেন না তিনি। তবে আগামী মাসে একটা চাকরি খালি হবার কথা। তখন এলে কোথাও বন্দোবস্ত হতে পারে।
এরকম ছেঁড়া প্রতিশ্রুতির পাল তুলে আর কতদিন খেতে হবে নিজেই জানে না কামাল। পড়াশুনার পালা চুকিয়ে তদ্দিনে যদি একটা কিছু করতে পারে তাহলেই হয়, আরো তিনটে বছর।
ঘরে ঢুকেই দেখল একটা বই নিয়ে আছে ডুবে সুধাকর। কাপড় চোপড় ছেড়ে নিয়ে বসল পাশেই একটা চেয়ারে।
তারপর বলল, ‘চলো খেয়ে আসি।’
‘না, খাব না।’
‘তার মানে?’
‘মানে কিছু না। ক্ষিদে নেই।’
সুধাকরের সঙ্গে তর্ক করা বৃথা। এই একটা ব্যাপারে চিরকালই পরাজয় স্বীকার করেছে কামাল। আত্মসম্মান-জ্ঞান সুধাকরের চিরকালই টন্টনে বলে লাভ নেই।
সুধাকর হয়তো খায়নি। কিংবা এক কাপ চা গিলেই রাতের খাওয়া সেরে ফেলেছে।
কথাটা যে জিজ্ঞেস করবে তার উপায় নেই। কিন্তু সুধাকরের জন্য সমবেদনায় তার নিজের ক্ষিদেই যেন মরে এসেছে।
হঠাৎ কামাল বলে ওঠে, ‘পড়াতে গিয়ে অনেক কথা শুনে এলাম।’
বই থেকে মুখ না তুলেই প্রশ্ন করে সুধাকর ‘যথা –
‘যথা, চাকরিটা ষড়যন্ত্র করে তুমিই যোগাড় করে দিয়েছিলে।’
‘ষড়যন্ত্র করে নয়। তোমার প্রতি আস্থা ছিল বলেই।’
এমন একটা সামান্য প্রসঙ্গের রস গ্রহণ করতে পারল না বলে রীতিমতো রাগই হলো সুধাকরের ওপর।
কামাল বলল, ‘সে কথা বলোনি কেন তাহলে?’
সুধাকর জবাব দিলো না।
কামাল আবার জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি ছাড়লে কেন সে চাকরি?’
‘আমি?’ হাত থেকে বই নাবিয়ে রেখে কাৎ হয়ে বসে সুধাকর। ‘আমার কথা ছেড়ে দাও। আমি যে কোনটা ছেড়ে কোনটা ধরি নিজেই বুঝিনে। তবে। –
‘তবে কি?’
‘একটা পঙ্গু মানুষের পেছনে মানবতার টানে অশ্রু ঝরানো সহ্য হলো না।’
‘কী করে বুঝলে তোমার যা সহ্য হয় না, আমার তা হবে।’
‘তুমি সহ্যশীল। তুমি যা যা সহ্য করতে পার আমি তা পারিনে। তোমাকে তো দেখেছি।’
এই শেষের ‘তোমাকে তো দেখেছি’ কথাটার ভেতর অনেক কিছু বোঝাতে চাইল সুধাকর। কী দেখেছে? দেখেছে, এন্টনির সঙ্গে লড়াই-এ ফার্নান্ডেজ ম্যানসন থেকে। আর কী দেখেছে সুধাকর।
‘আর তাছাড়া’, বিদ্রƒপের সুরে বলে সুধাকর, ‘দেখলাম দুটো এক ধরনের চরিত্র মানাবে ভালো।’
‘এক ধরনের চরিত্র বলছ কেন? আমি তো পঙ্গু নই।’
এতে রেগে যাওয়ার কি আছে কে জানত। ক্রোধে ফেটে পড়ে সুধাকর, ‘কী করে জানো। তুমি কী করে জানো, প্লাস্টারে পা বাঁধা নেই বলে?’
তারপর আর একটু থেমে বলে, ‘পঙ্গুত্ব শুধু দেহের হয় না। মনেরও হয়।’
খাবার ডাক পড়ল। দশটার পর মেসে খাওয়া বন্ধ। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে খেতে চলল কামাল। একবারও সাহস হলো না সুধাকরকে ডাকতে। যদিও ইচ্ছে করছিল খুব।
ফিরে এসেই দেখে সুধাকরের আরেক মূর্তি। সহাস্য, স্ফূর্ত, খুশিতে টগ্বগ্।
সাজগোজ করতে দেখে ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করল কামাল, ‘কোথায় বেরুচ্ছ আবার?’
‘কোথায় আবার। সিনেমায়। চলো তৈরি হয়ে নাও।
‘আমি!’
‘তবে কি ভেবেছ একা একা যাব। মানুষ খুন করতে যাচ্ছিনে।’
অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে চাইল, কিন্তু কোনো সবল যুক্তি খুঁজে পেল না। কী বলবে, ক্লান্ত, অনিচ্ছুক? কোনোটাই শুনবে না সুধাকর।
সুধাকরের মুখের মাত্র একটি কথায় এমন নেচে উঠল। অথচ সে নিজে হাজার বলে কয়ে খাওয়াতে রাজি করতে পারেনি তাকে।
যেতে যেতে সুধাকর বলল, ‘ভেবে দেখলাম তোমার এখানে আর থাকা চলবে না।’
‘কেন, কোনো অসুবিধে হয়নি তো?’
‘সুবিধে অসুবিধের কথা নয়। দেখতে পাচ্ছ না কেমন ধরা পড়ে যাচ্ছি। মনের সবকিছু খুলে বলতে হচ্ছে। মনটাই যদি খুলে ধরো আকাশের মতো, তাহলে বাঁচবে কী নিয়ে।’ বলে সজোরে একটা চাপড় দিলো কামালের ঘাড়ে। কামাল অনুভব করল ব্যাথাটা মাংসপেশী বেয়ে র্ত র্ত করে নেবে আসছে বুকে। ব্যাথাটাও সেখানেই বেশি।
সকাল না হতেই সুধাকর জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে বলল, ‘যাই তাহলে কি বলো?’
রীতিমতো রেগে যায় কামাল। কিন্তু বলার মতো কিছু খুঁজে পায় না। ওঠার চেষ্টা না করে মুখ ফিরিয়ে ঘুমিয়ে থাকে অন্য পাশে।
সুধাকরের সেদিকে লক্ষ নেই। জুতো ফিতে বাঁধতে বাঁধতে বলে, ‘মাঝে মাঝে ওদিকে যেও।’
‘ওদিকে মানে?’
‘ফ্লাওয়ার লেনে।’
‘কেন, তুমি?’
‘আমি তো থাকছিনে। তেজগাঁ ধরে সোজা পশ্চিমে পাড়ি দেবার কথা ভাবছি।’
‘সেখানে গিয়ে করবে কী?’
‘কোথায় গিয়ে কী করব তা ভেবে বাড়ি থেকে বেরুইনি। কিছু যদি নাই জোটে অগত্যা, তোমার কাছেই ফিরে আসব। তখন থাকতে দেবে?’
শেষের কথা কটায় কেমন মায়ার সুর। পরাজিত স্পর্ধার প্রতিধ্বনি।
হঠাৎ কিছু মনে এলো না কামালের। শুধু বলল, ‘আমার কাছে এসে আশ্রয় চাইবে সে কল্পনারও অতীত। এমন কিছু লোক আছে যারা জীবনে কাউকে আপন করে নিতে পারে না। তুমি সে দলের।’
কি ভেবে হেসে ওঠে সুধাকর। যেন অবিশ্বাসের হাসি। তারপরেই তীক্ষè প্রশ্ন, ‘কী করে জানো?’
‘তোমাকে দেখে তাই মনে হয়?’
‘কতটুকু দেখছ আমাকে?’
সত্যি কথা। কতটুকু আর দেখেছে সুধাকরকে। মাত্র দু’একটা প্রহর কিংবা কয়েকটা অলস মুহূর্ত কাটিয়ে কিছু বলা যায় না। বলা যাবেও না। যেটুকু দেখেছে সেটুকু তার আসল জীবনের কতটুকু? বাইরের এ সুধাকরের মধ্যে হয়তো আছে আরেক সুধাকর। সে চট্ করে ধরা পড়ে না, একটা কুয়াশার জাল বুনে যায় শুধু। সে সুধাকর অজ্ঞাত, রহস্যময়।
তবু যাবার আগে সুধাকরকে দু’চারটে কথা বলার লোভ হলো। আর হয়তো সত্যি দেখা হবে না। তখন আলাদা জগতে দু’জন। মনটা তখনকার মতো আর থাকবে না করুণা-বিগলিত। সুতরাং আজকেই সব জেনে নেয়া ভালো।
হঠাৎ বাড়ি ছেড়ে যেতে হচ্ছে কেন সুধাকরকে। কথাটা জানা দরকার।
কিন্তু সে কথার জবাব না দিয়ে রসিকতা করে বলে সুধাকর, ‘অত উঁচু সিঁড়িতে উঠতে কষ্ট হয়।’
‘কেন, অনেকেই তো ওঠে’, বলল কামাল।
‘তাদের লোভ আছে। আশা আছে, বলার কথা আছে। আমার কিছু নেই।’
বুঝল তির্যক কটাক্ষের খানিকটা তারও প্রতি। কামাল চুপ করে থাকে।
আবার বলে সুধাকর, ‘এ বয়েসে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ায় কোনো পৌরুষ নেই, কোনো রোমাঞ্চ নেই, কিন্তু কোন কালেই বা তা ছিল!’
হঠাৎ কাতর হয়ে পড়ে সুধাকর। স্বীকারোক্তির সুরে বলে, ‘পারা গেল না, বুঝলে? মেজাজটাকে নিয়েই হয়েছে বিপদ। কি ক্ষতি ছিল বলো। কালের চাকা ঘুরছে ঘুরুক। আমি ঠেকাবার কে।’
না বোঝার ভান করে তাকিয়ে থাকে কামাল।
আবার বলতে থাকে সুধাকর, ‘আমার মনে হয় এসব সংস্কার।’
‘কি সবের কথা বলছ?’
‘প্রীতি-বন্ধন যাই বলো। নিজের চোখের সামনে কাহাতক সহ্য করা যেত। লুসির জন্যে ভাবনা নেই। ভাবছি কি অকৃতজ্ঞ এই চিত্রা ভদ্র!’
‘চিত্রা ভদ্র না তোমার মা?’
‘আত্মীয়তার বিচারে। মনুষ্যত্বের বিচারে শুধু চিত্রা ভদ্র।’
‘অকৃতজ্ঞ বলছ কেন?’
‘অকৃতজ্ঞই বা বলতে যাই কোন সাহসে। আর এন্টনির মতো ছেলে। একটি মাত্র মুখের কথায় যার পকেট থেকে পঞ্চাশ, একশ টাকা বেরিয়ে আসে, তার কাছে লোকে কৃতজ্ঞ হবে না তো হবে কার কাছে। ভাবছি, টাকাটা এমন বদলে দিল তাকে – আমার মাকে।’
বলতে বলতে গলা ধরে আসে।
কামাল বাধা দিয়ে বলে, ‘কি সব বলছ, ছিঃ!’
‘জানি এসব বলা উচিত নয়। উল্টো পরম সুখকর একটা ছবি এঁকে ধরলে সেটা মানাত। হাঁড়ির খবর বাইরে বলতে নেই। কিন্তু –
‘তোমার মাকে ভুল বুঝে থাকবে হয়তো।’
‘একদিন, দু’দিন তা হতে পারে। কিন্তু রোজ তা হতে যাবে কেন। শুধু আমার মা নন কামাল। মণিকর ভদ্রের তিনি স্ত্রীও। আমাদের বাড়িতে ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটা দেখেছ? ১৯২৯ সালে তোলা। মণিকর ভদ্রের সঙ্গে সলজ্জ ভঙ্গিতে দাঁড়ানো সেদিনকার চিত্রা ভদ্রের দিকে তাকিয়ে আজকের চিত্রা ভদ্রকে চেনাই যাবে না।’
‘বয়েসে সবকিছুই বদলায়।’
‘তা ঠিক। তা বলে মন আর রুচিও।’ আবার থেমে বলে সুধাকর, ‘সামান্য একটু প্রতিবাদ ছাড়া তো কিছু নয়। স্বাধীনতা বাবা আমাদের সবাইকেই দিয়েছেন। কিছু বলেননি। কিন্তু বাড়ির তিনিও একজন, এ কথা ভুলে গেলে চলবে কেন। শুধু একদিন এন্টনির কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন তার বাড়াবাড়ির কথা। তাতেই আগুন চিত্রা ভদ্র।’
সুধাকর কতক্ষণ কথা বলেছে মনে নেই। কোনোটা অসংলগ্ন, পূর্ণ ছেদ্ পড়ার আগেই কোনোটা শেষ। তার টুকরো কথার সব মিলিয়ে যা শুনল কামাল তা এই :
বাতের ব্যথায় কাতর হয়ে সেদিন গরম পানির ব্যাগটা দিতে বলেছিলেন মণিকর ভদ্র। অনুনয় করে করে বলেছিলেন, আজ বাইরে যেও না। শুধু পায়ে ধরতেই বাকি। চিত্রা ভদ্র সে কথা শোনেননি। বলেছেন, এন্টনিকে কথা দিয়েছেন। সে কি ভাববে।
এত কষ্টেও না হেসে পারেননি মণিকর ভদ্র, তার ভাবনাটা কি আমার ভাবার চেয়েও বড় হলো।
সে কথার জবাব না দিয়ে চিত্রা ভদ্র বলেছিলেন, তোমার বাতের ব্যথা তো রোজই হয়। এন্টনি তো রোজ আর ডিনারে যেতে বলে না। এন্টনির কথা রাখতেই হয়। যার নুন খাই তার গুণ গাই – এটা জগতের নিয়ম।
মর্মাহত হয়ে বলেছিলেন মণিকর ভদ্র, তারই পয়সাতে খেতে হচ্ছে নাকি আজকাল।
তবে কি পেনশনের ওই ক’টি টাকায় সংসার চলছে ভেবেছেন মণিকর ভদ্র? ছেলেও তো গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কি এক কাগজের চাকরি। দু’মাস মাইনের সঙ্গে দেখা নেই। পয়সা কি আকাশ থেকে পড়ে।
মণিকর ভদ্র কথা বলেননি। তাঁর সামনে রাখা খাবার প্লেটটা সরিয়ে বলেছিলেন, তাহলে এসব নিয়ে যাও। আমার ক্ষিদে নেই।
দুটো টোস্ট আর একটা স্যান্ডউইচ। চিত্রা ভদ্র পর্যন্ত এতটা আশা করেননি।
শুধু রাগে র্থ র্থ করে কেঁপেছে সুধাকর। জীবনে প্রথমবারের মতো অনুভব করেছে সে আজ এই ঝড়ে শেকড়-ভাঙ্গা গাছের মতো। মাথা তুলে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই। শক্তি নেই।
চিত্রা ভদ্র লুসিকে সঙ্গে করে বেরিয়ে পড়েন। যেতে যেতে সুধাকরকে দেখে বলেন, তোমার বাবার খাবারটা তুমিই খেয়ে নিও। আমরা চলি।
সুধাকর তা পারেনি। পারেনি এজন্যে যে, বুঝেছে এটা শুধু ইঙ্গিত নয় নির্দেশ। সে বাড়িতে সে অনাহুত, অনাকাক্সিক্ষত। সেখানে তার পাট উঠেছে।
খানিকক্ষণের জন্য সুধাকরকে কেমন আত্মমগ্ন মনে হয়। হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়, বলে, ‘যাই। শোনো, ও বাড়িতে পড়াতে যাও এখনও?’
‘হ্যাঁ, যাই। কেন?’
‘এমনি। আচ্ছা, ও বাড়ির লোকদের তোমার কেমন লাগে?’
‘ভালো।’
‘সবাইকে?’
‘হ্যাঁ, অবিশ্যি যাদের চিনি।’
‘ও।’
কেমন যেন অবিশ্বাসের হাসি সুধাকরের।
হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসে, ‘ও বাড়ির চম্পাকে কি মনে হয়?’
‘কী আবার মনে হবে।’
‘না না, বড্ড বদমেজাজী, না?’
কোনো জবাব না পেয়ে আবার বলে সুধাকর, ‘এক এক জনের ধাঁচটাই ওরকম না? কি মেজাজ, কি ঝাঁজ।’
হো হো করে হেসে ওঠে সুধাকর।
‘হাসছো যে।’
‘না, এমনি। বলছিলাম এক এক জনের স্বভাবটাই এমন। এই যে ধর না – ধর –
বলতে বলতে আবার নিজেই থেমে যায় সুধাকর।
গম্ভীর হয়ে বলে, ‘তুমি কি এখনও ফ্রেশলাইম্ ইউথ সোডার উর্ধে যাওনি?’
‘তার মানে?’
‘মানে সোমরস চলে না?’
কামাল বলল, ‘না, কিন্তু কেন?’
‘ভাবছিলাম যাবার আগে একটা ফেয়ার ওয়েল টোস্ট। যাক্গে।
হ্যাভারস্যাকটা পিঠে ঝুলিয়ে কামালের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় সুধাকর, ‘সো লং।’
কামাল মেলাল। মৃদু কম্পনের সঙ্গে সঙ্গে মনটাও কেঁপে উঠল তার। এ শুধু সুধাকরের যাওয়া নয়। সুধাকরের সঙ্গে তারও চলে যাওয়া। ফ্লাওয়ার লেন থেকে। লুসির রাজ্য থেকে।
সুধাকর কোনোদিকে তাকাল না। সোজা গট্ গট্ করে চলে যেতে লাগল।
তবু আশা ছিল এ সুধাকরের সাময়িক উচ্ছ্বাস। সাময়িক চিত্তবিভ্রম। আবার সে কাটিয়ে নেবে এসব। ভালোমানুষের মতো সব দুঃখ বেদনার অপমান ভুলে গিয়ে কাজ করে যাবে। কিন্তু মাস তিনেক পরও সুধাকরের কোনো খবর না পেয়ে বুঝল, এ নিছক তার মনের খেয়াল নয়। এ তার ধনুর্ভঙ্গ সিদ্ধান্ত।
মণিকে সেদিন পড়াতে গিয়ে এক নতুন জিনিস আবিষ্কার করল কামাল। হঠাৎ তাকে দেখেই চম্পার মুখ যেন বিবর্ণ হয়ে গেল। পাশ কাটাতে চেয়েও পারল না। অকারণে মণির কোঠায় ঢুকে বলল, ‘পড়াশুনা এগুচ্ছে কেমন মণির –
মামুলি জবাব দিলো, ‘ভালোই।’
কি মনে করে দুধের গ্লাসটা রেখে দিয়ে আবার ওটা তুলে নিতেই মণি জিজ্ঞেস করে, ‘কি হলো, ওটা নিয়ে যাচ্ছো যে?’
‘একটু গরম করে আনি, ঠান্ডা হয়ে গেছে।’
গ্লাসটা আবার রাখল আগের জায়গায়, নিজে নিজেই তার কৈফিয়ৎ, ‘থাকগে, খুব বেশি ঠান্ডা হয়নি, খেয়ে নেন, আবার চুলো ধরাবে কে।’
মনটা শুধু বিপর্যস্ত তাই নয়। কেমন যেন হারিয়ে যাওয়ার তাড়না। পালং-এর কাছে এসে দাঁড়ায় চম্পা। একটু মিষ্টি হেসে বলে, ‘বাবা বললেন এ মাসে আপনার টাকা পেতে দেরি হবে।’
‘বেশ তো’, তার বেশি আর কিইবা বলতে পারে কামাল।
টাকা-পয়সার লেনদেন সবসময়ই চম্পা মারফৎ।
চম্পা যেতে চায় না তবু। কোনো একটা ছুতায় কে যেন তাকে ধরে রাখে।
এবার গলার স্বর নাবিয়ে বলে, ‘মাস্টার সাহেব আমি একটু বসব, ও ঘরে বড্ড গরম।’
‘বেশ তো বসুন না।’
‘না ভাবছি মণির পড়াশুনার অসুবিধে হবে না তো?’
বাড়ির লোকরা এড়িয়ে চলে মণিকে। সময় নেই দু’দ- মণির সাথে কাটাবার। মনে মনে তাই সে খুশি। চম্পার হাত ধরে জোর করে বসাল বিছানার পাশে।
‘বোস না, আমার সঙ্গে তোমারও পড়া হবে।’
হঠাৎ চম্পাকে দেখিয়ে নির্বোধের মতো প্রশ্ন করে বসে কামাল, ‘পড়েন নাকি উনিও?’
‘ধেৎ, আপা পড়বে কেন। বি. এ. পাশ করে বসে আছে দু’বছর। বাবা চাকরি করতে দেবেন না। বলেন, না খেয়ে মরছে নাকি বাড়িসুদ্ধ লোক যে ওকে চাকরি করে খেতে হবে।’
চম্পা শুধু হাসে। মণির মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘এত কথাও জানিস তুই।’
কিন্তু পড়াবার কিছু পেল না কামাল। কেমন ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। পা-িত্যের অপমৃত্যুর আশঙ্কা। আর যাই হোক বি. এ. পাশ মেয়ের সামনে একটা প্রিপজিশন ভুল করে ফেলা যায় না। কাজেই বলতে হলো, ‘আজ আর পড়িয়ে কী হবে, গপ্প করা যাক।’
প্রস্তাবটা রীতিমতো মণির মনঃপুত।
প্রথম প্রথম কেমন যেন বাধো বাধো ঠেকছিল। হঠাৎ আলাপের উৎসধারা ভেঙ্গে পড়ল। মেয়েমানুষের উপস্থিতি তা সে যেই হোক প্রচ্ছন্ন পৌরুষের অবলুপ্ত দুঃসাহসকে মাথাচাড়া দিয়ে তোলে। সামান্য তুচ্ছ ঘটনাও সেখানে নানা রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। হয়ে যায় বর্ণনা মুখর।
পনেরো মিনিটে যেন পনেরো হাজার কথা বলে ফেলল কামাল। তাকিয়ে দেখল অনুগত শ্রোতার মতো পালং-এর একপাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে চম্পা। বড় ভালো লাগল।
জীবনের কোনো একটা ছোট্ট ভুল, অহমিকা, আতঙ্ক আর উচ্ছ্বাসের রামধনু মেশান কত কথা। কথা বলার স্বাদও যেন বিচিত্র। কি মধুর!
মণির চোখে মুখে আনন্দের অনুভূতি। আজ প্রথমবারের মতো একজন নয়, দু’জন তার সঙ্গে আলাপরত। নির্লিপ্ত জীবনের অপমান অনেকখানি ধুয়ে মুছে গেছে। তারও যে প্রয়োজন আছে, সেও যে কাজের মানুষ – কথা বলার, শোনার মানুষ সেটা সত্যি সত্যি আজ প্রমাণ হয়ে গেল যেন।
অনেকক্ষণ হাঁ হয়ে শুনল কামালের কথা। কি মনে হতেই বলে উঠল মণি, ‘সুধাকর স্যার কিন্তু অমন মজার গপ্প করতে পারতেন না। সবসময়ই কেমন মুখ গোমড়া ভাব।’
লক্ষ করেনি, চম্পার দৃষ্টি কঠিন হয়ে এসেছে। কখন। আগের সেই বাৎসল্য আর করুণার সহজ আমেজ নেই সে চোখে। হঠাৎ সোজা হয়ে বসে বলে, ‘এত কথায় তোমার কি কাজ। ছেলেমানুষের মুখে এসব শুনতে আমার ভালো লাগে না।’
বলে মুখ ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে।
অবাক কামালও কম হলো না। ব্যাপারটায় এমন উত্তেজিত হবে চম্পার জানা ছিল না।
বাণবিদ্ধ হরিণশাবকের মতো কাতর দৃষ্টি নিয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়ে মণি। মনে ছিল না সে অনধিকার চর্চা করেছে। সমর্থ সবল মানুষের জগতে একি অন্যায় কথা বলে ফেলেছে সে।
চম্পা উঠে পড়ার আয়োজন করে।
‘একি উঠছেন নাকি’, ধরা গলায় জিজ্ঞেস করে কামাল।
‘তা নয়তো কি। পরচর্চা শুনতে আমি আসিনি।’
বলবে না কিনা ভাবছিল অনেকক্ষণ থেকে। শেষটায় বলেই ফেলল, মণির দিকে তাকিয়ে বলেই ফেলল কামাল, ‘সুধাকর ভদ্র সম্পর্কে এমন কথা বলো না। ও আমার বন্ধু, তাছাড়া ও যদি এখানে থাকত – তাহলে আলাদা কথা।’
একটু কাতরোক্তি। চম্পার। শোনার ভুলও হতে পারে। একটা উদ্যত নিশ্বাসকে চেপে ধরে রেখে প্রশ্ন করল, ‘তার মানে, এখানে থাকত মানে?’
‘কি জানি, বলল তো পশ্চিমে যাচ্ছে। তার বেশি কিছু বলে যায়নি।’
‘বলে যায়নি’, প্রতিধ্বনিত স্বর চম্পার কণ্ঠে।
‘না।’
জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে রইল চম্পা, পাষাণ মূর্তির মতো। তারপর কেমন শুকনো হাসি হেসে বলল, ‘ওর বোধহয় কিছু পাওনা ছিল। দু’মাস চারদিন পড়িয়েছে। তেরোদিনের পাওনা। ঠিকানা জানা থাকলে পাঠিয়ে দেওয়া যেত।’
পাওনা শুধু তেরোদিনের না বহুদিনের চম্পার দিকে তাকিয়ে সে প্রশ্নের মীমাংসা হয় না। এমনকি পাওনাটা নিছক শিক্ষকবৃত্তিরই না মনের দিকের, সে বিষয়েও যে খটকা থেকে যায়।
কিন্তু সে সম্পর্কে গবেষণার সুযোগ না দিয়ে চলে যায় চম্পা।
হঠাৎ মধুর পরিবেশে জট পাকিয়ে দিয়ে গেল একটা নাম, একজন লোক, একটি দুর্বোধ্য চরিত্র। সে আর কেউ নয়, সুধাকর ভদ্র।
কতক্ষণ এমন করে বসেছিল মনে নেই।
হামাগুড়ি দিয়ে এগুতে এগুতে বিছানার কাছে এসে গলা বাড়িয়ে চাপা গলায় বলল মণি – ‘স্যার!’
‘হুঁ, কি বলো।’
‘কাউকে বলবেন না তো।’
‘না।’
‘আমার মনে হয়,’ আবার চারিদিক চেয়ে বলে মণি, ‘আমার মনে হয় আপনার বড্ড লেগেছে। আপনি কেন বলতে গেলেন সুধাকর স্যারের কথা।’
‘কি জানি’, এতে অবাক হওয়ার কি আছে বোঝে না কামাল। মণি তখনও বলে যাচ্ছে, ‘আমার মনে হয়, মনে হয় স্যার –
কামাল ধমক দিয়ে বলে, ‘কী মনে হয়?’
কথাটা শেষ করার আগেই চম্পা এসে আবার উপস্থিত।
আলোটা বুজিয়ে দিয়ে বলে, ‘বড্ড বেশি ইঁচড়ে পাকা হয়েছিস আজকাল। এবার ঘুমোও অনেক রাত হতে চলল।’
অবিশ্যি কামালকে উঠতে বলার নির্দেশ নেই। তবু কামাল বুঝল উঠতে হবে। চম্পা আলোটা যে নিবিয়ে দিলো তাতেও বিচিত্র কিছু নেই। সব আলোই এমন করে নেবে। আলো না নিবলে যবনিকা পতন হবে কিসে।
হঠাৎ নিজেকে বড় একা মনে হয় কামালের, জীবনের সব ভালোলাগা অর্থহীন হয়ে পড়ে। ঠিক সুধাকরের অভাবই নয়, তার অভাবের চেয়েও নিজের কাছ নিজের ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়।
দরজা খুলে কাকে ঢুকতে দেখল। মণিকর ভদ্র নিজে, লাঠির ওপর ভয় করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসেছেন ভরা সকালে, নিশ্চয়ই ভীষণ কোনো প্রয়োজন।
বাতের রোগী মণিকর ভদ্র। ফার্নান্ডেজ ম্যানসনের সিঁড়ি বেয়ে ইদানীং কারও সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, শোনেনি।
একটা চেয়ার দেখিয়ে বসতে বলল কামাল। হাতের লাঠিটা কোলের ওপর আড়াআড়ি রেখে মণিকর ভদ্র পা-টা ছড়িয়ে বসার চেষ্টা করেন। তারপরেই বলেন, ‘এ সময়ে আপনাকে বিরক্ত করলাম, কিছু মনে করেননি তো।’
‘না না, মনে করব কেন। প্রয়োজন হলে আমাকেই ডেকে পাঠাতেন। আপনার নিজে থেকে আসার কি দরকার ছিল।’
কেমন অবিশ্বাসের হাসি। অন্তত এখনও পৃথিবীতে কিছু লোক আছে যারা মণিকর ভদ্রের প্রতি অভদ্র হতে পারে না। সম্মান করে কথা বলে, সমীহ করে। অবিশ্বাস না করে পারেন?
অনেকক্ষণ দু’পক্ষে কথা নেই। মণিকর ভদ্র দু’চারটে বই ঘাঁটাঘাঁটি করে শেষটায় বলেন, ‘কোনো খবর পাওয়া গেল?’
‘কার খবর?’
প্রশ্নটা জিজ্ঞেস না করলেও পারত। আর কার খবর নিতে আসবেন মণিকর। আর তাঁর রয়েছেই কে?
নিজেকে সামলে নিয়ে ত্রুটি সংশোধনের চেষ্টা করে বলে কামাল, ‘সুধাকরের কথা বলছেন? না কোনো খবর পাইনি।’
‘কবে পর্যন্ত আসবে আর কোনো আভাস – কিচ্ছু না।’
নিরাশ হৃদয় সামান্য একটু প্রবোধের আশা ছাড়ে না।
‘না।’
তবু বোঝেন না মণিকর ভদ্র্। হয়তো বোঝেন, শুধু পারেন না নিজের মনকে বোঝাতে। পকেট থেকে বার করেন একটা চিমসান কাগজের টুকরো। বড় যতœ করে ক’দিন পকেটে নিয়ে ঘুরেছেন, দেখলেই বোঝা যায়। ওটা কামালের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘কোনো খবর পেলে চিঠিটা পাঠিয়ে দেবেন কিন্তু। আপনাকে নিশ্চয় জানাবে। লিখবে দেখবেন।’
অদ্ভুত আবদার।
কামাল বোঝাবার চেষ্টা করে, ‘খবর পেলে আমি নিজ থেকেই জানাব। আপনি অধীর হচ্ছেন কেন?’
নিজকে সামলে নেন মণিকর ভদ্র, ‘অধীর, কে বললে অধীর হচ্ছি। আরে, এতে অধীর হওয়ার আছেই কি। বয়েস হয়েছে। যা ভালো মনে হয়েছে করেছে, কি বলেন।’
এমন একটা আপাতহৃদয়হীন যুক্তিতে সায় দেওয়া কঠিন। তবু বলতে হয়, ‘তা তো বটেই।’
মণিকর ভদ্র উঠতে চাইলেন, চা খেতে রাজি হলেন না। বললেন, ‘ডাক্তারের নিষেধ।’
একটাই প্রয়োজনে এসেছেন। সে প্রয়োজন ফুরিয়েছে। সুতরাং যাওয়ার আয়োজন করতে হয়। ওঠার উপক্রম করে বলেন, ‘যদি কিছু মনে না করেন একটা রিক্সা ডেকে দেবেন।’
‘নিশ্চয়ই। কোথায়, ফ্লাওয়ার লেনে তো। কত, বারো আনা বলব।’
‘না, না, জায়গা বলতে হবে না। আমিই দাম ঠিক করে নেব।’
মণিকর ভদ্রের যে আর কোথাও যাবার জায়গা আছে জানা ছিল না।
কিন্তু প্রতিবাদের সাহস হলো না।
কাঁপতে কাঁপতে লাঠিটা তুলে নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগুতে থাকেন। কামাল ধরতে এলে বাধা দিয়ে বলেন, ‘না না, এমনি বেশ চলে যাব।’
‘আমি যাব একদিন সময় করে।’
প্রস্তাবটায় খুব সায় দিতে পারলেন না মণিকর ভদ্র। শুধু হেসে বললেন, ‘নিশ্চয়ই যাবেন, যাবেন বৈকি।’
তাঁকে রিকশাতে তুলে দিয়ে কেবলই হাত নিশ্ পিশ্ করছিল। আবার চিঠি, এক চিঠির জন্যে অনেক ভোগান্তি হয়েছে। আবার চিঠি। পড়ে দেখবে নাকি। না থাক্। কাজ নেই। সেবারের মতো আরেক বিপদে পড়তে রাজি নয়।
মণিকর ভদ্রের হয়তো অনেক কিছু বলার ছিল। কিন্তু কিছুই বলা হলো না। শুধুমাত্র একটি চিঠি, তাও সুধাকরের কাছে পৌঁছবে কিনা না জেনেই এতটা কষ্ট করে সাত সকালে এসে হাজির। কিন্তু বলবার কথা আর কিইবা থাকতে পারে। মণিকর ভদ্র, যিনি কোনো অতীতে একবার সিস্টার মিরোন্ডার সঙ্গে প্রেম করেছেন। তারপর বাকি জীবন শুধু বই পড়েছেন, আর ধরে ধরে লোকজনকে শুনিয়েছেন। সেই মণিকর ভদ্রের এত কী বলার থাকতে পারে। একবার ইচ্ছে হলো তাঁর হাত ধরে বলে, বলুন সব কথা শুনব। সব কথা শুনব আমি।
মণিকর ভদ্রের কোনো কথাই কোনোদিন শোনা হয়নি।
কিছুদিন পরেই যেতে হলো ফ্লাওয়ার লেন। যেতে হলো বললে ভুল হবে। যাওয়ার সুযোগটা আবিষ্কার করল কামাল নিজেই। মনে পড়ল গত বছর এদিনটা লুসির জন্মদিন। সুধাকর ছিল। এন্টনি ছিল। সেই অপূর্ব সন্ধ্যাবেলায় বুক কাঁপছিল কামালের। কতকিছু মনে করে এসেছিল। কতকিছু ভেবে এসেছিল। কিন্তু তার কোনোটাই হলো না। হাতে করে কোনো উপহার নিয়ে যায়নি।
সে তুলনায় আজকের উপহার অত্যন্ত মামুলি। সাঁইত্রিশ টাকা দামের একজোড়া ফ্লাওয়ার ভাস। জাপানি কারুকার্য ভালো লাগবে। অপূর্ব লাগবে, লুসি যখন এই ফুলদানিতে একটা কি দুটো নাম না জানা ফুলের তোড়া সাজিয়ে রেখে তন্ময় হয়ে বসে থাকবে। অনেক কথা সে ভাববে। একটা ফুলের জন্ম থেকে মৃত্যু। তার মৃত্যু থেকে আরেকটা জন্ম, সে জন্ম থেকে আবার মৃত্যু। অনেক হৃদয়ের পাঁপড়িও এমনি জন্মায়, মরে। মরে, আবার জন্মায়। তার কোনোটার কথাও কি মনে পড়বে না তার তখন!
এবার বাড়িটা বড় নিস্তব্ধ, প্রথমবারের মতো হৈচৈ নেই। মাতামাতি নেই। নেই আগেকার প্রাণপ্রাচুর্য। রঙিন মোড়কে বাঁধা ফ্লাওয়ার ভাসের বাক্সটা নিয়ে ভাবনাতেই পড়ল।
আজকাল দরজায় টোকা দিয়ে বসে থাকতে হয় না। কেউ না কেউ আসেই। বসতে বলে, আদর যতœও হয়। আগের তুলনায় তেমন না হলেও বেশ।
লুসি বেরিয়ে এল একটু বাদেই। বেশভূষায় পারিপাট্য নেই। মামুলি, সাদাসিদে। দেখে মনেই হয় না কোনো বিশেষ উপলক্ষের স্পন্দন তার মনকে তাড়া দিয়েছে। চোখের করুণ দৃষ্টিতে কেবল বিভ্রান্তি আর বিস্ময়।
তারিখ ভুল করে এসে পড়েনি তো কামাল। তবে?
কামালের হাতে রাখা প্যাকেটটা দেখে কেমন অবাক হয়ে যাওয়ার ভান করে লুসি। প্রশ্ন করে, ‘কি জিনিস?’
‘খুলেই দেখো।’
‘খুলে দেখব। বারে, সে কেমন কথা। কার জন্যে এসব।’ বলতে বলতে প্যাকেটটা নিজেই ছিঁড়ে ফেলল। ফুলদানি জোড়া হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখে বলল, ‘বাঃ বেশ তো।’
‘পছন্দ হয়েছে জেনে খুশি হলাম।’
‘ভালো জিনিস পছন্দ হবে না। কেন? কিন্তু উপলক্ষটা শুনি।’
নিজের মুখেই তাহলে কথাটা বলতে হবে নাকি। বলা যায়, কিন্তু তারপর আর থাকে কি, আসল আনন্দটাই মাটি।
কি ভেবে নিয়ে হেসে কুটি কুটি হয়ে যায় লুসি, ‘ও তাই বলুন, আচ্ছা মানুষ আপনি, মনে করে রেখেছেন। কি করে অতসব মনে রাখেন। দেখুন তো আমি দিব্যি ভুলে আছি। কবেকার কি জন্মদিন। সুধাকরই নেই –
বলতে বলতে কথাটা আটকে এলো গলায়। সুধাকর নেই সেজন্যেই কি সব আয়োজন ব্যর্থ। না আরো কিছু।
হয়তো সারাদিন শখ করে সেজেছে। কাজল মেখেছে। কপালে পরেছে টিপ। বিনি করে বেঁধেছে চুল, বেশবসনও ছিল হয়তো মানানসই।
খুলে ফেলেছে মনের দুঃখে।
মিথ্যেটা ঢাকা দেবার অত চেষ্টা করেও পেরে উঠল না লুসি। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে নিজেই বলে ফেলল, ‘হা করে কি দেখছেন অমন।’
‘আপনাকে বেশ মানিয়েছে তো।’
কথাটা বলে একটুও খুশি করা গেল না। এমন কথা অনেক শুনেছে। সতেরোর বিপজ্জনক সীমানা পেরিয়ে এমন কত মধুর ভূরি ভূরি প্রশংসা শুনতে হয়। তার সবগুলো যদি সত্যি হতো। এমনকি অর্ধেকটাও যদি সত্যি হতো তাহলে এ পৃথিবীর চেহারাটাই যেত বদলে। তবু মনকে খুশি করবার জন্য বলা। বলে অন্যকে খুশি করানো। সনাতন পদ্ধতি এসব। এমন ঢের জানে লুসি। না বললেও বোঝে।
তার দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে থাকতে ভয় করছিল। যেন তার চোখের ভেতর থেকে এক মুঠো অগ্নিকণা ছিটকে এসে তার সব মিথ্যে চাটুবাক্যকে দাবানলে ঘিরে ধরবে।
তা হোক, তবু এই শখ করে কিনে আনা ফুলদানি জোড়াও কি মনে করেছে লুসি মিথ্যে। মনে করেছে মনকে ঠকাবার জন্যে এ আরেক নতুন উপাচার। এ আরেক নতুন প্রক্রিয়া।
খোলা দরজার আলোয় নীল কাচের তৈরি ফুলদানি কেমন হিংসুটে প্রহসনের মতো মনে হচ্ছিল।
অনেক কিছু বলতে পারে কামাল। বোধহয় যা খুশি তাই। এন্টনি নেই, সুধাকর নেই, মণিকর ভদ্র নেই। সুযোগের প্রয়াস। এমন যোগসাজশ আর হয়ত কোনো দিন হবে না।
কী বলতে চাইল, আর মুখ দিয়ে বেরুল কী! হিংসুটে মন তাকে দিয়ে কথা বলাল যেন, ‘এন্টনি একলা যে আজ।’
ছোট্ট একটা জবাব, গলন্ত লোহার হাতুড়ির ঘার মতো, ‘না’।
লক্ষ করেনি। একটা ফুলদানির গা ছুঁয়ে বারবার নেড়ে চেড়ে দেখছে লুসি। এ নাড়ার যেন শেষ নেই, যেন অন্ত নেই এ দেখার। তারপর বলল, ‘এন্টনির কথা কেন জিজ্ঞেস করলেন?’
সদুত্তর খুঁজে পেল না কামাল, বলল,‘না কোনো কারণ নেই, এমনি।’
‘এন্টনিকে আপনার খুব ভয় না?’
ভয়? আশ্চর্য! এমন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে গেলে কেন লুসি।
তবু পুরুষমানুষ ভয় পেলেও বুক কাঁপছে সে কথা বলতে পারে না। কাতর হয়ে যেতে পারে না কথা বলতে বলতে।
সিগারেটে আগুন জ্বালিয়ে নড়েচড়ে বসল কামাল। বলল, ‘ভয়ের কী আছে, এমনি।’
‘ভয় করেন না আপনি এন্টনিকে?’
বাচ্চা ছেলের কাছে জবাবদিহি করার মতো। পাল্টা প্রশ্ন করে বসে কামাল, ‘আপনিও বুঝি করেন।’
‘আমি করতে যাব কোন দুঃখে। কেন এর আগেরবার দেখেননি। কত আদর করে, সাধ করে রেস্টুরেন্টে খাইয়ে নিয়ে এলো, রাত বারোটা পর্যন্ত সিলিব্রেট করলাম। নাচতে নাচতে পায়ের গোড়ালি ব্যথা করে উঠেছিল। মনে নেই? না, সবটা তো আপনি দেখেননি?’
মুশকিল, লুসির মতো ঠিক উল্টো যুক্তি দিতে পারে না, কামাল ঠিক ওই কথাগুলোই ফেরত দিয়ে বলতে পারে না, ‘ভয় আমারই বা কি।’
কিন্তু কোনো কথাই সরল না।
মনে মনে একবার ভাবল চিত্রা ভদ্রেরই কী হলো, আজকাল মেয়েকে কি একদম শাসন করতে আসেন না? একবার চট্ করে হাঁক ছেড়ে ভেতরে ডেকে নিলেই পরিত্রাণ পেত এ যাত্রা কামাল।
অন্ধকার হয়ে আসছে। উঠে গিয়ে স্বচ্ছন্দে আলোটা জ্বালিয়ে দিতে পারে লুসি। কিন্তু তা করল না। ভাসা ভাসা আলোয় চিক্ চিক্ করে উঠল ওর কানের ইয়ারিং। কখনও বা নকল হীরের মতো দেখাত আংটিটা।
লুসি আজ পণ করেছে ওকে রেহাই দেবে না যেন। চুপ থাকতে দেখে বলল, ‘কী, কথা বলছেন না যে!’
‘না, বলার আর কী আছে।’
পাশের ফ্ল্যাটে কে যেন রেকর্ড প্লেয়ারে নতুন রেকর্ড চাপাল। জ্যাজের সুর। ইচ্ছে করে পা ঠুকে ঠুকে সুর মেলাতে। সাহস হয় না।
এ কথা সে কথায় আবার বলে ফেলে লুসি, ‘আপনি সত্যি অদ্ভুত মানুষ কামাল সাহেব। অনেকদিন ধরে ভাবছি একটা কথা। কিন্তু আপনাকে বলেই কী লাভ -।’
ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করে কামাল, ‘বলুনই না?’
‘বলব, আমার জন্মদিনের হিসেব তো খুব রাখেন। বয়সের হিসেবটা নিশ্চয়ই জানা নেই।’
‘বয়েস কত আর হবে আপনার।’
‘বলবেন, দেখে মেয়েদের বয়েস বোঝা যায় না। সত্যি, তা যায় না। এই দেখুন না। তিনবছর আগেকার আর এখনকার আপনি। কত তফাৎ। বা ধরুন আমারই কথা।’
‘শুধু বদলানোর কথা নয়। এর সঙ্গে আরো অনেক কিছু বদলাতে হয়। অনেক কিছু গড়তে হয়। ভাঙ্গতে হয়।’
‘তা তো হয়ই।’
‘আমাদের দেশে মেয়েদের জীবনের মেয়াদ অফুরন্ত নয়। তার একটা ছেদ্ টানতে হয়। তা না হলে –
ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমে কপাল জুড়ে। ঘন ঘন নিশ্বাসে ভারি হয়ে আসে আরো। স্পষ্ট কথা শুনতে চায় লুসি। আর তাকে ফুল দিয়ে রং দিয়ে কথা দিয়ে ভোলান যাবে না। সে যৌবনের সাহস দিয়ে আগামী দিনের জন্য একটা শেকড় খুঁজেছে। কিছু তাকে শোনাতে হবে। অন্য পাওনাদারের মতো আগামী আরেক দিনের জন্য অঙ্গীকার দিয়ে ফেরানো যাবে না।
কিন্তু কামালের হলো কি? লুসির আবেশ ও মাধুর্যে অনেক স্বপ্নজাল বুনতে চায় তার যে মন, সে মন সবই দিতে পারছে। শুধু ভরসা ছাড়া।
অন্ধকারে কার একটা হাত তাকে স্পর্শ করল। শুধু স্পর্শ নয়। উত্তাপ নিল। দিল। থাকল। এই হাত দিয়েই ভেবেছিল কিরো এর কী বর্ণনা দিয়েছেন?
অথচ তেমনি আগের মতো চেয়ে লুসি। কী দেখছে অমন করে। কী খুঁজছে।
কামাল বলল, ‘আজ তাহলে উঠি।’
ওই হাতটা যেন আরো ভারি হয়ে আসে, মৃদু একটা চাপ দিয়ে তার গতি রোধ করতে চায়।
ফিস্ ফিস্ গলায় বলে লুসি, ‘কেন যাবেন, রোজ চলে যান কেন?’
এতবড় প্রশ্নের জবাব এককথায় হয় না, হতেও পারে না।
অনেক যুক্তিতর্ক আর কাটাকুটি করে দেখল, এমনি একটি সদ্যস্নাত মনের অধিকারিণীকে চিরকাল কামনা করেছে কামাল। ফার্নান্ডেজ ম্যানসনে যেদিন থেকে এসেছে সেদিন থেকে তার ভীরু মন বারবার বলেছে সাহস করে চাও। চেয়েই দেখো না। পাওয়া যায় কিনা যায় সে পরের কথা।
আজ পাওয়ার সময়। কিন্তু সাহস আজ নিস্তব্ধ। কথা বলবে না। টলবে না। একতিল নড়বে না।
আলো জ্বেলে দিলো। চোখ ঝলসে গেল সে আলোয়। হাতটা সরে এলো জায়গা থেকে।
ওদের দুজনকে বসে থাকতে দেখে কম অবাক হয় না এন্টনি। তবু তার মুখের হাসি লেগেই থাকে। এসব সামান্য ঘটনা তাকে ছুঁতে পারে না এমনি ভাব।
হেসে বলে, ‘ওয়েল, ওয়েল, লস্ট ইন লাভ?’
তড়াক্ করে উঠে দাঁড়ায় কামাল। অপরাধীর মতো চেয়ারটা বাড়িয়ে বলে, ‘বসো।’
‘নো থ্যাংকস, বসব না, বেশ লাগছে দাঁড়িয়ে তোমাদের দু’জনকে দেখতে।’ হঠাৎ ফুলদানির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘প্রেটি নাইস, তোমার প্রেজেন্ট বুঝি। আমার আবার ওসব পোষায় না। ধৈর্য আছে বলতে হবে।’
তারপর লুসির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘যাও তো ডার্লিং দুটো তাজা ফুলের তোড়া নিয়ে এসো, ও দুটো মুখোমুখি করে সাজিয়ে রাখব।’
লুসি রেগে যায়। ফুলদানি হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বলে, ‘আমাকে তুমি ডার্লিং ডার্লিং বলো না।’
‘বেশ বেশ বলব না। মুখের বলায় আর কি এসে যায়। কী বলেন কামাল সাহেব?’
কামাল দরজার দিকে এগিয়ে যায়।
লুসি তাকিয়ে বলে, ‘একি যাচ্ছেন কোথায়, বসুন। আমি আপনার সঙ্গে গল্প করব।’
বলে ভেতরে গেল লুসি।
ঘাড়ে একটা চাপড় দিয়ে বলল এন্টনি, ‘সেদিনের সিনেমা হলের কথা বলেননি তো আবার লুসিকে।’
‘না।’
‘না, উঃ! সত্যিকার সাধুপুরুষ আপনি। বললেন না কেন। বলা উচিত ছিল। জানেন তো জেলাসি না হলে জেনুইন লাভ হয় না।’
পকেট থেকে একটা ফুটো পয়সা বার করে কামালের দিকে বাড়িয়ে বলে, ‘হেড র্অ টেল?’
কামাল ইতস্তত করে, ‘এবার কিসের বাজি?’
‘আঃ ধরুন না, বাজি হলেই হলো। বাজি সবসময়েই হার-জিতের।’
কামাল বলল, ‘বেশ হেড্।’
দুই আঙুলের ওপর রেখে টোকা দিয়ে পয়সাটা ফেলতেই ঝুঁকে পড়ে গম্ভীর হয়ে যায় এন্টনি।
কামাল বললো, ‘কী হলো।’
‘কি আর হবে। জয়। জয় আমার নয়, আপনার। ওই দেখলেন তো হেড্।’
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল, ‘আমি আবার ভয়ানক বিশ্বাস করি। কুসংস্কার বলতে পারেন। বুঝলেন মনের ব্যাপারে আপনিই জিতলেন। বলুন সরে পড়ি।’
লজ্জায় মাথা কাটা যায় কামালের। বলে, ‘কী আশ্চর্য। সরে পড়বেন কেন? বসুন বসুন, আমি যাই, অনেকক্ষণ বসেছি।’
‘শ্রীমতির সঙ্গে দেখা করে যাবেন না?’
‘না থাক, আরেক দিন।’
র্ত র্ত করে সিঁড়ি বেয়ে এল কামাল। হঠাৎ পায়ের কাছে শব্দ করে কী যেন পড়ল এসে, ওই ফুটো পয়সাটা। বোধহয় রাগ করে ছুড়ে ফেলেছে এন্টনি।
কি যেন মনে হলো। ঝুঁকে পড়ে প্যাসেজ লাইটের ম্রিয়মাণ আলোয় দেখল কামাল, এবার আর হেড্ নয়, টেল্।
মণিকর ভদ্রকে দেখে হাতের কাজ থামিয়ে ডা. হ্যারি এগিয়ে আসেন। হাত ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে বলেন, ‘কী ব্যাপার, মি. ভদ্র কী মনে করে এ্যাদ্দিন পর?’
মণিকর ভদ্র কথা বললেন না, বা পারলেন না। লাঠিটা সরিয়ে রেখে আরাম করে বসলেন। বললেন, ‘কাজ করো ডাক্তার, রোগী দেখা শেষ হলে এসো। অনেক কথা আছে।’
ডা. হ্যারি সতেরো বছর ধরে সেন্ট ফ্রান্সিস হোম ফর ডেস্টিটিউস্টের পরিচালনা করে আসছেন। এর আগে আরেক ডাক্তার ছিলেন, সাগর পাড়ি দিয়েছেন। হোম প্রতিষ্ঠাতাদের উদ্দেশ্যই ছিল, পঙ্গু আর অসমর্থদের আশ্রয়দান, জীবনে যাদের ভরসার কেউ নেই তারাই এখানে খয়রাতি সেবায় বাকি দিনগুলো কাটায়। ছোট্ট কামরা, সেখানে বসে সেকেন্ড হ্যান্ড পত্রপত্রিকা পড়ে, হলঘরে রেডিওটায় কখনও গান শোনে। গান কি আর হয়, একটা দুটো ভালো অর্কেস্ট্রা, তাও দুর্লভ, এখন শুধু চা-চা আর রক্ অ্যান্ড রোল-এর যুগ।
কয়েকজন আগ্রহভরে তাকাল মনিকর ভদ্রের দিকে, তাহলে আরেকজন এসে জুটেছে তাদের দলে। চেহারা দেখে খুব ভরসা হয় না।
ডা. হ্যারি অনেক দিনের চেনা। এককথায় তার আগাগোড়া জীবনটাই মণিকর ভদ্রের কণ্ঠস্থ। কোলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্সে একসঙ্গে পড়েছেন, খেলেছেন। তাসের আড্ডায় কাটিয়েছেন। সেই ডা. হ্যারির আজ হলো কী! সমাজ সংসার সব ছেড়ে হোমের কাজে ব্যস্ত। ঝড়ের পিটুনি নেই। অভাব আর তাড়নার দুঃসহ যন্ত্রণায় চোখের মণি এখনও একেবারে ঘোলাটে মনে হয় না। বোধহয় শখ।
এর বাইরে কোনো জীবন ছিল, দেখে তা মনে হয় না। এখন সাদা আলখাল্লা আর স্টেথেসকোপের আড়ালে আসল হ্যারি যেন কবে নিখোঁজ।
কতক্ষণ বসে থাকতে হয়েছিল মনে নেই। পেছন থেকে ডা. হ্যারির গলা শোনা গেল, দু’একজন রোগীর পথ্য নির্দেশ করতে করতে এসে বসল।
‘তারপর কেমন আছ, মণিকর।’
মণিকর সে কথার জবাব দিতে পারলেন না। শুধু অসহায়ের মতো ওর হাতদুটি ধরে বললেন, ‘ডাঃ হ্যারি তোমার কাছে কোনোদিন কিছু চাইনি, আজ একটা জিনিস চাইতে এসেছি।’
আতঙ্কের ছায়া হ্যারির চোখে মুখে, আবার কি চাইতে এলো মণিকর। একদিন মিস্টার মিরান্ডার জীবনের একাধিপত্য চেয়ে মণিকর তেমনি বলেছিলেন : ডাঃ তুমি সরে না গেলে আমার কোনো চান্স নেই। এই একটি ব্যাপারে তোমাকে দয়া করতেই হবে।
তাও করেছিলেন হ্যারি।
নিজ থেকেই সরে গিয়েছিলেন, তারপর জীবনের খাতাটা ওখানেই বন্ধ, আর ওটা খুলে দেখেনি। তারপর এই ডেস্টিটিউট হোম। সকাল সন্ধ্যা কাজের তাড়নায় দেখতে দেখতে বেলা শেষ হয়ে আসে। তবু কাজ শেষ হয় না। ঘুমুতে গেলেও বুড়ো আরভিং দরজার কাছে টোকা দিয়ে বলে, ‘ডাঃ আমি বাঁচব তো।’
বড় শখ বাঁচার আরভিংয়ের।
গোড়া থেকেই এই হোমে আছে আরভিং। বাত বেদনায় কাতর মামুলি ভরসা দিয়ে বলতে হয় হ্যারিকে, ‘নিশ্চয়ই বাঁচবেন, বাঁচবেন না কেন। কিচ্ছু হয়নি আপনার।’
তারপর মণিকর ভদ্রের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘কী বলছিলে যেন।’
ভণিতা না করেই মনিকর ভদ্র বললেন, ‘তোমার এখানে থাকতে এসেছি।’
হঠাৎ কোনো জবাব দিতে পারলেন না হ্যারি। একবারে অপ্রত্যাশিত প্রস্তাব। তাছাড়া যে ধরনের লোকদের জন্য এ হোম, মণিকর ভদ্র তার আওতায় পড়েন না।
চিন্তাগ্রস্ত দেখাল হ্যারিকে, একটু থেমে নিয়ে বললেন, ‘ডেস্টিটিউট হোমে তুমি থাকতে যাবে কেন মণিকর ভদ্র?’
‘কেন সে বুঝবে না।’
‘না না, বলছিলাম, তোমার বাড়িঘর সবই রয়েছে। তোমার দুঃখ কিসের?’
মণিকর ভদ্রের চোয়াল কেঁপে উঠল, আবেগের বন্যাকে চেপে ধরে বললেন, ‘আমার কেউ নেই ডাক্তার। এসব তোমার কল্পনা।’
কল্পনা, হতেও পারে, আজকাল সুখী পরিবার এমনি ভাঙ্গছে, ভেঙ্গে তছ্নছ্ হয়ে যাচ্ছে। কালের ধর্ম। সৌরজগত থেকে উল্কার মতো ছিটকে পড়ে মণিকর ভদ্রও বলছেন, তাঁর কেউ নেই।
কেউ নেই হ্যারিরও। স্ত্রী, পরিবার, পরিজন কেউ নেই। ভালোই করেছেন।
‘কিন্তু মণিকর, তোমাকেও এখানে নিতে পারব না। ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদন লাগবে। তুমি যদি কিছুদিন অপেক্ষা করতে।’
‘আমি আর অপেক্ষা করতে পারব না, যদি তাড়িয়ে দাও, তাহলে ওই রাস্তায় আমাকে দাঁড়াতে হবে।’
আরোও অনেক কথা জিজ্ঞেস করার ছিল, কিছুই বলা হলো না, এমন গুরুতর প্রসঙ্গ আলোচনা করলে খামখা মনঃকষ্টই দেওয়া হবে। খানিকক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল হ্যারি, ‘বেশ আমার পাশের কামরায় থাক তদ্দিন, দেখি ম্যানেজিং কমিটি কী বলে।’
ব্যাপারটায় হ্যারি যে প্রসন্ন নন তার চোখমুখ দেখেই বেশ বোঝা যায়। পুরনো জীবনের যে ইতিহাস ভুলে থাকতে চেয়েছে আজ তা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে মণিকর। মনে করিয়ে দিচ্ছে সব ব্যর্থতা আর সব নৈরাশ্যের বেদনা। মাঝে মাঝে র্শি র্শি করে ওঠে দেহটা।
অথচ, ডাক্তার। স্নায়ু দৌর্বল্য থাকলে চলবে না, শক্ত হাতে ছুরি ধরতে হবে। অতীতের দুঃখে হাত কাঁপলে চলবে না, একটা ধমনী কাটা যেতে পারে। কালই একটা অপারেশন। এসব ভেবে চিত্ত-চাঞ্চল্য ঘটাতে পারেন না হ্যারি। এতকালের হাতযশ, এত সুনাম যার, সেই ডাঃ হ্যারি।
রাতে একবার বাতের কষ্টের কথা বলেছিলেন মণিকর ভদ্র। হ্যারি বাতি জ্বালিয়ে তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করেছেন। তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি।
শুধু বলেছিল, ‘হাটর্টা খুব উইক।’
আরো একবার ঘুমের মধ্যে ডেকে উঠেছিলেন মণিকর ভদ্র, এবার সুধাকর ভদ্রের নাম ধরে সজোরে।
ওপাশ ফিরে ডাঃ হ্যারি শুধালেন, ‘কী হলো আবার মণিকর?’
‘কেমন যেন করছে বুকের কাছটায়।’
‘ও একটু আধটু হবেই, নতুন জায়গা কিনা। হাসপাতালের খাটে ঘুমুলে ওরকম হবেই প্রথম প্রথম। সকালে ভালো করে দেখব, ঘুমিয়ে থাক, রাত অনেক হয়েছে।’
মণিকর ভদ্র ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, আর ওঠেননি।
সেদিন হ্যারি কাজে গেল না। লুসির প্রশ্নের জবাবে বারবার একটা কথাই বললেন, ‘কী জানি, ভালো করে দেখেছিলাম তো, তেমন কিছু মনে হয়নি, শুধু হার্টটা একটু দুর্বল।’
কালো ঘোমটা মাথায় চিত্রা ভদ্রও এসেছেন তাঁর মেদবহুল দেহ নিয়ে। স্বামীশোকে তিনিও কাতর।
হ্যারি অপরাধীর মতো ওদরে দু’জনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার করবার কিছু ছিল না, এটা বোঝেন না কেন।’
একটু প্রকৃতিস্থ হয়ে আবার বললেন, ‘লাশ কি এখানে থেকেই যাবে।’
চিত্রা ভদ্র বললেন, ‘আমরা গাড়ির ব্যবস্থা করেছি। কাউকে ধরতে বলুন।’
চিত্রা ভদ্র স্বামীকে ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন। শেষবারের মতো।
ডেস্টিটিউট হোমে পড়ে থেকে মারা গেছে লোকে শুনলে বলবে কি। সেই জন্যই ফার্নান্ডেজ ম্যানসনে আরেকবার ভালো করে আয়োজন করে, সেখানে আত্মীয়স্বজনদের খবর দিয়ে ভালো করে শোকপ্রকাশ করবেন চিত্রা ভদ্র। পরলোকগতের সমাধিতে কী ধরনের স্মৃতিফলক লেখা হবে তা বলে দেবেন। সতীসাধ্বী স্ত্রী। স্বামীর শেষকৃত্যের এতটুকু ত্রুটি হবে না।
ডাঃ হ্যারি দাঁড়িয়ে রইলেন বিমূঢ়ের মতো। বাদামি ধুলো উড়িয়ে আন্ডার টেকারের গাড়িটা রাস্তার বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
কে যেন এসে বলল, ‘ডক্টর, ওই পেসেন্টকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আপনি রেডি তো?’
‘হ্যাঁ, রেডি,’ বলে নার্সের পেছনে পেছনে চলতে থাকেন হ্যারি মাথা নিচু করে।
মেসে ফিরতেই শুনতে পেল কে একজন খুঁজতে এসেছিল তাকে। নাম বলে যায়নি, সন্ধেবেলা আবার আসবে। বর্ণনার মধ্যে, তার চেহারা মোটাসোটা। একটু কালোমতো। একটা নতুন গাড়ি চালিয়ে এসেছিল।
কোনো ভাগ্যবান স্বয়ং গাড়ি নিয়ে তার শরণাপন্ন হবে, ভাববার আগেই মাথার ফেল্ট হ্যাট খুলে নিয়ে কে এসে ঢুকল। প্রথমটা একটু খটকা লেগেছিল। কোথায় যেন দেখেছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ সেই তথাকথিত ব্যারিস্টার। একদিন দেখেছিল মণির কামরায়। ভালো আলাপ নেই।
কোনো ভূমিকা না করেই ভদ্রলোক বললেন, ‘আরেকবার এসেছিলাম।’
‘শুনেছি। বাইরে ছিলাম, এই মাত্র ফিরেছি।’
‘তা বেশ বেশ, দেখতে পাচ্ছি কাজের মানুষ।’
বলে প্যাকেট থেকে দামি সিগারেট বার করে বাড়িয়ে দিতে একটা তুলে নিল কামাল।
একটা চেয়ার টেনে নিয়ে মুখোমুখি বসে প্রস্তাব করলেন ভদ্রলোক, ‘চলুন না বসা যাক কোনো রেস্তোরাঁয়।’
কামাল আপত্তি করল। বলল, ‘খানিকক্ষণ আগে এসেছি। বড় ক্লান্ত। অবিশ্যি তেমন কোনো কথা থাকলে –
গলা পরিষ্কার করে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েন ব্যারিস্টার। মাথার মাঝে অর্ধচন্দ্রাকৃতি টাক।
বললেন, ‘এখানে ফ্রিলি আলাপ করতে পারি তো?’
‘নিশ্চয়ই, আমি ছাড়া বাকি সব পরীক্ষার্থী, তাও অন্য কামরায়। যা খুশি নির্বিচারে বলতে পারেন।’
‘দেখুন’, বলে পোড় খাওয়া সিগারেটটা এ্যাশট্রেতে বুজিয়ে দিয়ে বলেন, ‘ব্যাপারটা অবিশ্যি সাংঘাতিক কিছু নয়। তবে হ্যাঁ, আপনার কাছে আসা এজন্য যে, আপনি হয়তো একটা পরামর্শ দিতে পারবেন।’
‘পারি তো নিশ্চিয়ই দেবো, বলুন।’
ভদ্রলোক আবার খানিকটা ইতস্তত করে বলেন, ‘ব্যাপার কি জানেন; একটা মানুষ, একগাদা পয়সা পায়। খাবার কেউ নেই। আত্মীয়স্বজনও নেই যে বসে খাবে। তাই ভাবছিলাম সাতভূতে লোপাট করার আগে কিছু সদ্গতি করে যাই –
‘বেশ তো’ – উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আরেকটা সিগারেট নেবার জন্য হাত বাড়ায় কামাল।
‘নিন’, বলে কেসটা বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘ভাবছি বিয়ের কথা।’
সিগারেটে অগ্নিসংযোগের জন্য যেটুকু সময় দরকার সেটুকু থেমে আবার বলেন, ‘বিয়ের অবিশ্যি অনেক ভালো ভালো জায়গা থেকে প্রস্তাব এসেছিল –
‘আপনি রাজি হচ্ছেন না, এই তো?’
‘কতটা সেরকমই বলতে পারেন। তাছাড়া –
‘তাছাড়া কী?’
‘মানে, আমি আবার মানুষ দেখলেই চিনি, এতটুতেই আঁচ করতে পারি। মেয়েটা সব দিক দিয়ে ভালো।’
‘কোন মেয়ের কথা বলছেন?’
‘আহা, ওই হলো চম্পা আর কি।’
বজ্রহাত হলেও এতটা শক্ড্ হতো না কামাল। সাবের সাহেবের বন্ধু। অথচ –
তবু নিজেকে অবিচলিত রেখে বলল, ‘আমাকে কী করতে হবে, বলুন।’
‘না না, করার কিছু নেই। আমি এসব ব্যাপারে বড় আনাড়ি। বুঝলেন না, ভাবছিলাম আপনি তো প্রায়ই যান, আর সকলের ওপরে আপনার দেখলাম বেশ প্রভাব। যদি এ ব্যাপারে একটু আঁচ দিতে পারতেন।’
শেষের কথা ক’টায় একটা প্রচ্ছন্ন খোঁচা।
তবু বলল কামাল, ‘তা পারব না কেন। বলুন এক্ষুনি যেতে পারি।’
‘না, এখন না। পরে হবে। অবিশ্যি শুনেছি মেয়েটার একটু এদিক সেদিক – ইয়ে ছিল, অবিশ্যি সে আর আজকাল কার নেই বলুন। সেন্ট পারসেন্ট লয়ালিটি আজকাল পাওয়া ভার। যাক তো।’
‘কার কথা বলছেন?’
‘ওই আপনাকে যে চাকরিতে ঢোকালো। ঐ যে, কি নাম, ক্রিশ্চান ছেলেটির – সুধাকর না কি –
ধৈর্য সম্বরণ অসম্ভব হয়ে পড়ে কামালের। বলে, ‘শুনেছেন না দেখেছেন?’
‘শুনেছি।’
‘আপনার জ্ঞাতার্থে বলছি কিছুই হয়নি। আর তাছাড়া হৃদয়ের খবরে আপনার কাজ কি। ও মেয়ে প্রেমে পড়ে আর যাই হোক আপনাকে বিয়ে করবে না, সেও আপনি জানেন। সে বয়েসও নেই আপনার।’
মনে হলো মনক্ষুণœ হলেন ব্যারিস্টার। কিন্তু ওকালতি বিদ্যা করে বুঝেছেন মন খারাপ হলেই স্ট্র্যাটেজিতে ভুল করা চলে না। সাবধানে পা বাড়াতে হয়।
‘কিন্তু সুধাকর অমন করে চলে গেল কেন?’
‘তা দিয়ে এ প্রমাণ হয় না যে আপনার অভিযোগ সত্য।’
‘ভালোই হলো, জানেন এসব ভালো লাগালাগি টেকে না। থাকেও না। তা যা বলছিলাম, মেয়েটা একটু একগুঁয়ে। সেদিন কথা বলতে গিয়েছিলাম, এমন হাবভাব দেখাল যেন আমি ওর কত বছরের মুরুব্বি।’
‘ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে না দিয়ে আপনি নিজেই বলেন না কেন সাবের সাহেবকে।’
‘সাবেরকে বলা যায়। তবে হুট করে মনের আঁচ না করে বলা ঠিক হবে?
থেমে নিয়ে আবার ব্যারিস্টারকে বলতে শোনা যায়, ‘তাছাড়া মেয়ে সুখে থাকছে। পয়সাকড়ির কোনো কিছুর ভাবনা নেই। আর একটা পঙ্গু ভাইকে নিয়ে ঘর করা এ আর ক’দিন চলে। ওটা তো বাড়ি নয়, হাসপাতাল। মেয়েটাকে দেখে তাই দুঃখ হয়।’
‘বেশ বলে দেখব।’
এবার ভারি প্রসন্ন মনে হলো ব্যারিস্টারকে। বললেন, ‘জানতাম এ কাজ আপনাকে দিয়েই হবে। তাহলে উইশ্ ইউ গুড্ লাক।’
আরেকটা সিগারেট বাড়ালেন ভদ্রলোক।
কামাল প্রত্যাখান করে বলল, ‘না থাক্। অনেক হয়েছে, আর না।’
কথাটা বলতে গিয়ে যতটা বিপদে পড়বে ভেবেছিল তার কিছুই হলো না।
আকারে প্রকারে বুঝিয়ে বলতেই হেসে ওঠে চম্পা, ‘তাই নাকি, ভদ্রলোক আমার প্রেমে পড়েছেন বুঝি?’
‘তাই তো মনে হলো।’
‘কেন, আপনার সন্দেহ আছে নাকি?’
‘সন্দেহ হয়, ভাবছিলাম কথাটা কেমন করে বলি। এসব অপ্রিয় প্রসঙ্গ।’
‘অপ্রিয় প্রসঙ্গ বলছেন কেন? প্রিয়জনদের কথা বলতে অত দুর্ভাবনার কী আছে?’
এক মুহূর্ত কোনো কথা সরল না কামালের মুখে।
একটু থেমে বলল, ‘তাহলে তো ভালোই। আপনারও একটা কিছু হয়ে যায়।’
‘আমার একটা কিছু না হওয়াতে আপনার ঘুম হচ্ছে না নাকি।’
‘না, সে কথা নয়, বলছিলাম দুপক্ষের কারো যখন অমত নেই – ’
হঠাৎ রুক্ষ হয়ে ওঠে চম্পার কণ্ঠস্বর, ‘এসব নিয়ে ওকালতি করতে পাঠিয়েছে কে আপনাকে।’
‘ওকালতি।’
‘তবে আর কি।’
‘আপনি ব্যাপারটা ভুল বুঝেছেন। ওকালতি করিনি, শুধু আপনার ভবিষ্যতের কথা ভেবেই –
‘যার ভবিষ্যৎ ভাবার জন্য আপনাকে রাখা হয়েছিল তার ভবিষ্যৎ ঝাঁঝরা করে তুলছেন। এখন আবার আমাকে নিয়ে পড়লেন।’
কার কথা বলছে চম্পা। মণির কথা? কিন্তু কী করতে পারত? কী করা উচিত ছিল।
মনক্ষুণœ হয়ে বলল কামাল, ‘তেমন ধারণা হলে আমাকে জবাব দিতে পারেন। কথাটা নিজেই বলব ভাবছিলাম, তাছাড়া আমার নিজেরও আর পোষাচ্ছে না।’
‘রাখা না রাখার মালিক আমি নই, বাবা।’
‘বেশ তাঁর সঙ্গেই কথা বলব।’
চম্পা উঠে দাঁড়ায়।
বলে, ‘কিছু মনে করবেন না, এসব প্রসঙ্গ আলোচনায় একটু রুষ্ট ভাষণ হবেই। তার জন্য দায়ী আপনিও নন, আমিও নই। শুধু ভেবে অবাক হই –
কথাটা বলতে ভারি কষ্ট হলো যেন চম্পার। আঁচলে মুখ ঢেকে বলল, ‘কিছু মনে করবেন না, এসব বলতে চাইনি। জানেন তো এ মনের বাইরে আরেকটা মন আছে। সেই বলায়, সেই বলে। চেনা মনের তুলনায় অচেনা মন অনেকটা নিষ্ঠুর।’
‘একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করব?’
‘করুন।’
‘মনের দিক থেকে কোনো অভিযোগ নেই তো এ বিয়েতে?’
‘অভিযোগ? থাকতেও পারে। কিন্তু সে অভিযোগের কথা জানছে কে?’
অকারণ একটু হেসে বলল কামাল, ‘আপনাকে ঠিক কখনও বুঝতে পারিনি। এক এক সময় মনে হয়েছে আপনি চিরকালই মনের তাড়না আর অনুশাসনকে অগ্রাহ্য করে চলছেন। যেদিন আপনি সবচাইতে বেশি কাতর হবেন মনে করেছিলাম, সেদিন আপনি একটা কথাও বলেননি। আজ যখন দুঃখে ভেঙ্গে পড়বেন ভেবেছিলাম, দেখছি, সমস্ত ব্যাপারটা হাসিমুখে গ্রহণ করলেন। আশ্চর্য ক্ষমতা আপনার। মনের সঙ্গে এমন লড়াই ক’জন পারে।’
‘মনের সঙ্গে লড়াই নয়। প্রয়োজনের সঙ্গে তাল রেখে চলা। ওটুকু বুঝি বলেই আমার ওপর সকলের ভরসা। তাঁরা ঠিক জানতেন জোয়ারের মুখে আমার ধৈর্যের বাঁধ না ভাঙ্গুক, সময় বুঝে মৌসুমী হাওয়ার বুকে পাল তুলে আমি ঠিকই ভাসব। সময় এসেছে আমার।’
কামাল দুঃসাহসীর মতো প্রশ্ন করে বসল, ‘জীবনে কাউকে ভালোবাসেননি।
চম্পা গম্ভীর হলো না। শুধু উঠে দাঁড়াল। খানিক্ষণ পায়চারি করে বলল, ‘কীসব ছেলেমানুষের মতো কথা বলছেন। ভালোবাসা আর ভালোবাসা। আকাশে রকেট উঠছে, সৌরজগতে মানুষের তৈরি গ্রহ ঘুরছে। মনের ছিঁচকাদুনের সময় কই?’
আর কথা হলো না। চম্পা চলে গেল ভেতরে।
মণি খানিক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘শুনলাম স্যার আর পড়াতে আসবেন না।’
প্রথমে বলল, ‘হ্যাঁ।’
কথাটা রূঢ় মনে হতে পারে ভেবে আবার বলল, ‘এখন তুমি আর ছেলেমানুষ নও মণি, আমার যা কিছু দেবার, জানাবার তার যতটুকু পেরেছি তোমাকে দিয়েছি। বাকিটুকু খুঁজে নিতে হবে তোমাকে, অথবা আমার চেয়েও যিনি আরো প-িত ব্যক্তি তাঁর আসবার সময় হয়েছে এতক্ষণে।’
মণি কোনো কথাই শুনছিল না। অন্তত তার জবাবে সে কথাই মনে হলো, ‘তবু তো আসতেন স্যার, এরপর আর হয়তো দেখাই পাওয়া যাবে না।’
‘কে বলল পাওয়া যাবে না। নিশ্চয়ই আসব। বেশি করে আসব।’
কামাল চলে যাচ্ছিল।
মণি বলল, ‘দাঁড়ান স্যার।’
বিছানার তলা থেকে একটা মোড়ক বের করে বলল, ‘স্যার আপনাকে কোনোদিন কিছু দিতে পারব না। এটা রাখবেন?’
ফ্রেমে বাঁধা একটা ছবি, মণির নিজের। জার্সি গায়ে ফুটবল নিয়ে দাঁড়িয়ে। সুঠাম পায়ে এ্যাঙ্কেল পরানো, আজ থেকে পাঁচ বছর আগেকার মণি। স্কুলের তুখোড় খেলোয়াড়, কাপ্তান। যাকে একটা পার্কার পেন দেওয়ার জন্য তৈরিই ছিলেন জজসাহেব, কিন্তু সেটা আর দেওয়া হয়নি।
ছবিটার তলায় বড় করে লেখা – ‘মৃত্যুর আগে।’
‘মৃত্যুর আগে বলছ কেন?’
এই পঙ্গুত্বকে মৃত্যু মনে করে মণি।
একবার দ্বিধাগ্রস্ত চিত্তে যেতে যেতে ফিরে আসে কামাল। ‘কিন্তু তোমার ছবি নিয়ে আমি –
‘হ্যাঁ স্যার। ওটা দেখে দেখে আমার হিংসে হয়। স্বপ্নের মতো মনে হয়, কেমন যেন মায়া জন্মে গেছে। আমি নিজে ওটা ভাঙ্গতে পারিনি। ও যেন আরেকজন স্যার। আমি নই। যার সাথে আমার কোনোকালে মিতালী হবে না। ওটা আপনার কাছেই থাক।’
লুসি বারান্দায় বসে উল বুনছিল।
চিত্রা ভদ্র এসে দাঁড়ালেন। এক খিলি পান মুখে পুরে বললেন, ‘বিকেলের পড়ন্ত রোদে চোখের মাথা না খেলেই নয়।’
মায়ের দিকে আড়চোখে চেয়ে একটু মৃদু হাসে। হাসতে গিয়ে অবাক লাগে।
একমাস আগে মণিকর ভদ্র মারা গেছেন, অথচ এরই মধ্যে এমন করে হাসতে পারল কী করে। আশ্চর্য তো। মনে মনে ভেবেছিল কোনোদিন ক্ষমা করবে না তার জন্য চিত্রা ভদ্রকে। কিন্তু এত সহজে ভুলে গেল, সব ভুলে গেল।
কিন্তু তার কি দোষ, বোধহয় কালের স্রোত। বোধহয় যুগের ধর্ম। মৌসুমী ঋতুর প্রভাব সব ভুলিয়ে দেয়। তছ্নছ্ করে দেয় মনটাকে। নইলে কম কষ্ট দিয়েছে চিত্রা ভদ্র! শুধু ঘাড় ধরে বার করতেই বাকি। নইলে কোনো অপমান সহ্য করতে হয়নি মণিকর ভদ্রকে। আজ কি সে সবই ভুলে গেল লুসি। নইলে হাসল কেমন করে।
একটা কথা ভেবে তার বিস্ময় লাগে। এ বাড়ির সব মানুষ এত দুর্বল কেন। তারা রুখে দাঁড়াতে পারবে না কেন কোনোকিছুর বিরুদ্ধে। অথচ গায়ের শক্তি তাদের কম ছিল না। কম ছিল না মনের দৃঢ়তা। অনেক কষ্টে মানুষ হয়েছেন মণিকর ভদ্র। উত্তরাধিকার সূত্রে তার ধকল কিছু কম পোহাতে হয়নি সুধাকরকে। কিন্তু সুধাকরও যে কি। সহ্য করতে পারল না। এমন করে চলে গেল। রাগ করল কার ওপর। লুসির ওপর? এন্টনির ওপর?
রাগ যদি করলই বা, বলল না কেন বুক উঁচু করে। কেন র্তর্ত করে নেবে গেল সিঁড়ি বেয়ে।
এন্টনি, এন্টনি –
অথচ কোনো একটা নিয়ে থাকতেই হয়। আশ্রয় করে বাঁচতেই হয়। এটা বোঝেন সুধাকর, আরও কত কেউ বোঝে না।
বোঝে না কিন্তু তারা পারে কি! সুধাকর না হয় পারে না। কিন্তু –
সোয়েটার গুটিয়ে রেখে হাই তুলল লুসি। বলল, ‘মা কি চমৎকার সন্ধে না।’
‘যা না বেড়িয়ে আয় ঘরে। বসে বসে মাথা ধরবে।’
ইঙ্গিত সুস্পষ্ট।
মা-দের চিন্তাধারার উৎসটাই আলাদা, এতজনের মধ্যে শুধু একজনকেই চোখে পড়ল, এন্টনি, এন্টনি। পড়বেই বা না কেন। ভালো করে সবাইকে খাইয়েছিল চাইনিজ ডিস্। প্রেজেন্টেশনের নাম করে সত্যি এক জোড়া জামদানি শাড়ি এনে দিয়েছিল চিত্রা ভদ্রকে। লিখেও দিয়েছিল, ‘ডিয়ার আন্টি।’
তাছাড়া আরো কতকিছু করেছে।
টাকা এনে গছিয়ে দিয়ে বলেছে, ‘রাখুন আন্টি, তবু দুটো পয়সা জমবে। আমার তো স্বভাব জানেনই।’
প্রথম প্রথম সংকোচ। কিছুটা জড়তা। তারপর সে টাকায় হাত দিতে কসুর করেননি। হাজার হলেও এন্টনি কি পর।
এদের সবার ভালোলাগার এন্টনি। সে এন্টনির একমাত্র ভালোলাগা – লুসি। লুসি কেমন করে ব্যর্থ মনোরথ করবে।
মণিকর ভদ্র মারা গিয়েছিলেন। আন্ডারটেকারকে খবর দিয়েছিল কে? এন্টনি।
তাদের ভাড়া অনাদায়ে ফার্নিসাররা আসবাবপত্র ফেরত নেবার গাড়ি পাঠিয়েছিল, তাদের ঠেকাল কে? এন্টনি।
এন্টনি তাদের অভাবে, ধারে, আনন্দে, শোকে, তাদের সবকিছুতে।
তবু একবার মায়ের দিকে গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে দেখল লুসি। সে দেখায় অনেক জিজ্ঞাসা, অনেক সংশয়, অনেক অনুযোগ, অভিযোগ।
চিত্রা ভদ্র সোয়েটারখানা নিজে থেকেই হাতে নিয়ে বললেন, ‘কার মাপের করলি?’
‘করেছিলাম কামালের গায়ের মাপে। ভাবছি কয়েক ঘর খুলে ফেলব। এন্টনির মাপটা জানা আছে তোমার মা?’
এন্টনি কামালের তুলনায় দেহের পরিধিতে কৃশ, ক্ষীণকায়।
সঙ্কেতটা ভালো করেই বুঝলেন চিত্রা ভদ্র। খুশি হয়ে বললেন, ‘বাঃ তাড়াহুড়া কিসের। এন্টনি আসুক না, তখুনি দেখে নেয়া যাবে। শীতের এখনও দেরি আছে।’
‘কিন্তু আমাকে মনস্থির করে ফেলতে হবে মা, খামোখা সমস্ত সোয়েটার বোনার পর প-শ্রম করতে রাজি নই।’
কথাটা বুঝলেন কিনা চিত্রা ভদ্র বোঝা গেল না। কতকটা না বোঝারই ভান করলেন। বললেন, ‘তোর মাথায় একটা কিছু চড়লেই হলো, এমন মেয়ে দেখিনি, যা ভাববে তাই করতে হবে। কথায় কেউ কোনোদিন জিততে পারল না তোর সঙ্গে। এমন একগুঁয়ে। তুইও কি বাপের মতো হবি?’
কোনো জবাব মনে এলো না লুসির। সজল চোখে মায়ের হাতদুটো ধরে বলল, ‘তাই কি তোমার মনে হয়, জীবনে যা চাই তাই আঁকড়ে ধরে রাখতে পারি?’
চিত্রা ভদ্র তখনও পান চিবুচ্ছেন। কথাটা যেন তার কানে বেজে উঠল ঝনাৎ করে। নিজের মেয়ের মুখে তিনি কী যেন শুনে ফেলেছেন। বললেন,‘কি বললি।’
লুসি বারান্দায় রেলিং-এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মা চেয়ে দেখলেন চুল বাঁধা হয়নি, তেল দেওয়া হয়নি, নিজেই চিরুনি দিয়ে জট্ ছাড়াতে ছাড়াতে বলেন, ‘কি যে হয়েছিস। যা মুখে আসে তাই বলিস।’
চুলের জটে টান লাগায় উঁহু শব্দ করে উঠে লুসি। বলে, ‘অত জোরে নয়, একটু আস্তে আস্তে।’
চিত্রা ভদ্র কানের কাছে মুখ এনে বলেন, ‘মনে নেই ওর ছটায় আসবার কথা।’
এবার কিন্তু জিজ্ঞেস করল না লুসি, ওই ব্যক্তিটি কে?
যেমন জানেন চিত্রা ভদ্র, তেমনি জানে লুসি।
নিচে মোটরের হর্ন শোনা গেল, তাড়াতাড়ি মাথায় চিরুনি চালাতে চালাতে বললেন চিত্রা ভদ্র, ‘গাড়ি এসে গেল দেখছি।’
ক্লিফটন বিচের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে নেবে আসে গাড়ি। খানিকদূর গিয়ে বালির সমুদ্র, তারপর আসল সমুদ্র।
গাড়ি থামিয়ে বলল এন্টনি, ‘নাববে নাকি?’
লুসি সিটের ওপর মাথা হেলিয়ে বলে, ‘না।’
‘কেন, সমুদ্র ভালো লাগছে না।’
‘তার জন্য নয়, এমনিতে বেশ আছি।’
ফশ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে পায়চারি করে এন্টনি। বলে, ‘আজকাল তোমার যে কি হয়েছে বুঝিনে। সবকিছুতেই অরুচি।’
এবার দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলো লুসি, ‘অরুচি কে বলল এন্টনি। জীবনে অনেক কিছু পাওয়ার পর এমনি একটা ক্লান্তি আসে।’
সমুদ্রের ফেনার তীরভূমি ধুয়ে যাচ্ছে। একটা মৌচাকের আহত গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। দূরে দু’একটা জাহাজ চোখে পড়ে। বোধহয় সমুদ্র পাড়ি দেবার অপেক্ষা। কিংবা পোতাশ্রয়ে ফিরে যাবার ব্যাকুল প্রতীক্ষা। এন্টনির দৃষ্টি সেদিকেই।
এবার মুখোমুখি হয়ে প্রশ্ন করে এন্টনি, ‘তোমার কি তাই ধারণা, জীবনে অনেক কিছু পেয়েছ।’
‘হ্যাঁ।’
এই অনেক কিছু পাওয়া কাকে বলে এন্টনি ভেবে দেখেনি।
লুসি। কিন্তু বাতাসের গর্জনে তার জবাবে কী যেন একটা বলল হৃদয় বিগলিত স্বরে শোনা গেল না।
মাকরানীদের দু’একটা চায়ের দোকান। ভাঙ্গা টেবিল চেয়ার। সমুদ্র-দর্শকদের দেখলে ওদের চায়ের পেয়ালার টুং টুং শব্দটা বড় বেশি শোনা যায়। সকরুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কোনো সহৃদয় সমুদ্র পরিব্রাজক হয়তো দু’কাপ চা খেয়ে চার কাপের দিয়ে যায়। জীবনের মূল্যবান মুহূর্ত গুনতে এত ব্যস্ত, বিলের ফেরত খুচরো পয়সা গোনার অবকাশ হয় না তাদের।
ধূমায়িত চায়ের কাপ এনে ধরল এন্টনি। যন্ত্রচালিতের মতো সেটি হাতে তুলে ধরল লুসি।
চা শেষ হতেই এন্টানি ঘড়ি দেখে বলল, ‘এবার উঠতে হয়।’
‘কেন, এত তাড়াতাড়ি?’
‘হ্যাঁ, গাড়িটা ফেরত দিতে হবে।’
একটুকরো অন্ধকার ছুঁয়ে গেল লুসির চোখেমুখে। খানিকটা রেগেই বলল, ‘আমাকে পায়ে হাঁটিয়ে নিয়ে এলেই তো পারতেন এন্টনি। সময়ের সূক্ষ্ম মাপজোক নিয়ে মাথা ঘামাতে হতো না।’
কোনো জবাব পেল না তার কথার।
চায়ের কাপ নাবিয়ে রেখে বলে, ‘এসব কি আমাকে খুশি করার জন্যই করো?’
‘এসব মানে?
বলেই বুঝল এ কটাক্ষ এন্টনির ধার করা গাড়ির প্রতি। নিজে থেকেই একটা যুক্তি সংগ্রহ করে বলে, ‘মনোরঞ্জনের ব্যাপারে ভালো-মন্দের বিচার করে লাভ নেই।’
‘আছে’, প্রতিবাদ করে ওঠে লুসি, ‘আমাকে ছাড়াও তোমার মনোরঞ্জন হতে পারে। তোমার অনুরাগিণীর অন্ত নেই।’
‘তাদের ঠিক অনুরাগিণী বললে ভুল করা হবে। কে বলল, কামাল নিশ্চয়ই।’
‘না।’
গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বলল, ‘যেই বলুক, তারা আমাকে চেনে না। মানুষ হিসেবে আমি খাঁটি নই। সে দাবি আমি করিও না। কিন্তু এমন এক একজন থাকে যে অনেক ধোপের পরও তারা টিকে থাকে।’
লুসি বাধা দিয়ে বলে, ‘খাঁটি মানুষের বিচারে বসিনি। খাঁটি যেমন তুমি নও, আমি যে খাঁটি তাই বা তুমি কেমন করে জানো?
দুর্ভাবনার একটি স্ফুলিঙ্গ মুহূর্তের জন্য তাকে হতবাক করে দেয়। তারপর সামলে নিয়ে বলে, ‘এসব তোমার বানানো কথা, আমার কথা ছেড়ে দাও। একটু রূপ, রস আর গন্ধের ছোঁয়া পেলেই সেখানে গেছি বুভুক্ষুর মতো। তারপরেই ভেবেছি তোমার কথা, তবু আবার গেছি। আবার ভেবেছি তোমার কথা।’
‘সেজন্যে তোমার ওপর এতটুকু রাগ নেই আমার।’
‘নেই?’
‘না। যাওয়াটাই বড় কথা নয়, তোমাকেই আমি চিরকাল কামনা করেছি কী করে জানো। কী করে জানো এ মন নিয়ে ছিনিমিনি খেলিনি, খেলছি না।’
ওর হাতদুটো ধরে বলে, ‘না, এসব হতে পারে না। এসব আমাকে রাগাবার জন্য বলছ, এসব তোমার বানানো কথা।’
‘বানানো কথা’, বিদ্রƒপের সুরে বলল লুসি। ‘বানানো কথাও মন্দ নয় এন্টনি। বানানো জগতেরও একটা মোহ আছে। তাকে নিয়েও স্বপ্নের জাল বোনা যায়।’
কথাটা বুঝল না এন্টনি। কেমন সব যেন গোলমাল হয়ে আসে। লুসি যেন নিজে কথা বলছে না, কে যেন তাকে দিয়ে বলাচ্ছে। নিশ্চয়ই প্রকৃতিস্থ নয়।
‘তোমার শরীর ভালো নেই নাকি।’
হাসল লুসি, ‘উন্মাদ আর জরাগ্রস্ত ছাড়া আর কি কেউ সত্যি কথা বলতে পারে না। তাই কি তোমার বিশ্বাস এন্টনি।’
আরো জোরে গাড়ি হাঁকিয়ে চলে। এ পথ ফুরিয়ে যাক, মুহূর্তে নিঃশেষিত হোক, সমুদ্রের হাওয়ায় মাদকতা পেয়ে বসেছে লুসিকে। তার বিশ্রাম দরকার।
লুসির মনের বিপ্লবকে ঠেকাতে হবে। ওতে আগুন ধরার আগে প্রতিশ্রুতির স্নিগ্ধতা দিয়ে তাকে বাঁচতে হবে।
মনে মনে ঠিক করল লুসিকে পৌঁছে দিয়ে আরেকটু বাড়তি রাস্তা ঘুরে যাবে সোজা রিগ্যাল জুয়েলার্স। শোকেসে দেখেছিল পঁচাশি টাকার একটা এনগেজমেন্ট রিং!
মণিদের ওখানে যাওয়া হয়নি মাস তিনেকের ওপর। ট্যুশনির তাগিদ নেই। নেহায়েৎ পরিচয়ের তাড়না। ইদানীং খবরের কাগজে চাকরিও জুটেছে একটা। বিকেল আর সন্ধ্যা সেখানেই কাটে।
অনেকদিন পর মণিদের বাড়িতে ঢুকে মনে হলো আমূল পরিবর্তন হয়েছে এরই মধ্যে। বাইরে যতœ করে লাগানো লতাগাছগুলো মরে এসেছে। এখন রুক্ষ শেকড়ই চোখে পড়ে। সবুজ পাতার একটাও অবশিষ্ট নেই।
একটা বড়মতো গাড়ি দাঁড়িয়ে বাইরে। পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই প্রায় ঠোকাঠুকি হবার উপক্রম ব্যারিস্টারের সঙ্গে। দেখা হতেই বললেন, ‘হ্যালো, হ্যালো ম্যান। ছাত্র পড়াতে আজকাল কামাই করছেন মনে হয়।’
পেছন থেকে জবাব এলো, ‘কামাই কোথায়। পড়ানো ছেড়ে দিয়েছেন সে তো আজ তিনমাস। এমনি যে আসেন, তাই ভাগ্যের কথা।’
চেয়ে দেখল পেছনে চম্পা। জর্দা পাড়ের শাড়ি। সাজগোজও অন্যান্য দিনের তুলনায় একটুবেশি প্রলুব্ধকর। কপালে কাচের টিপ। এক বেণীতে চাবুকের মতো ঝুলিয়ে চুলের গুচ্ছ কখনও ডানে কখনও বামে দোল খায়।
কোনো কথা বলার আগেই বেরিয়ে যান ব্যারিস্টার। তার পেছন পেছন চম্পা।
অকারণেই ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে কামাল। মস্ত গাড়ির দরজা খুলে ধরেন ব্যারিস্টার। পাশে গিয়ে বসে চম্পা।
হঠাৎ ওকে অপ্রতিভ করে সামান্য একটু বাষ্পের হুঙ্কার তুলে গাড়িটা মুহূর্তে বেঁকে চুরে বেরিয়ে যায় চোখের সামনে দিয়ে।
কামালের মনে হলো, পৃথিবীর এক একটা সতেজ প্রাণ এমনি করে নিজেদের ঠাঁই করে নিচ্ছে। সেদিনের সেই বোকা উচ্ছ্বাসপ্রবণ চম্পাও বুঝেছে, পৃথিবীর সঙ্গে দৌড়–তে হলে বসে থাকা চলে না। ছুটতে হয়। ছোটার জন্যই এ পৃথিবী।
মণির দরজা পর্যন্ত এগুতে হলো না। তার আগেই ক্রাউচের ওপর ভর করে এসে দাঁড়ায় সে।
‘এ কি, আজকাল হাঁটতে শুরু করেছ নাকি?’
‘না করলে চলবে কেন। আর কদিন শুয়ে কাটবে বলুন। কিছু একটা করে খেতে হবে তো।’
সত্যি কথা। যুক্তি হিসেবে অকাট্য। কিছু একটা করতেই হবে। সবাই কিছু না কিছু করছে। নইলে চলবে কেন।
কোনো কথা না বলেই বেরিয়ে এলো কামাল।
হাল্কা লাল কোডের আলো জ্বলছে তখনও লুসির ঘরে। ঘুম আসছে না, চেতনা আর অর্ধচেতনার রাজ্যে দোল খাওয়া মন কোনোমতেই স্থির হতে পারছে না। ছোটখাট অভিজ্ঞতার ঝড় বিপুল নাড়া দিচ্ছে।
এমনকি আজ সন্ধ্যার এই মধুর সান্নিধ্য কেমন অসহ্য বিস্বাদ মনে হলো। এন্টনির ধার করা গাড়ির প্রতিটি চাকা সে কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে। সারা পথ ধার করা কি শুধু গাড়িটাই, এন্টনির মনটাই যে না তা কে জানে।
লুসি কিন্তু নিষ্ঠুর হতে পারল না। কারও ক্ষেত্রেই না। এক একজনের স্বভাবই তাই। যত খুশি তাকে ভাঙ্গাচোরা যায়, যেমন খুশি বাঁকানো যায়। কোনো নিষেধ নেই, কোনো প্রতিবাদ নেই।
সোয়েটারটা পড়েছিল বিছানার একধারে গোটানো। সোয়েটার নয়, তার ভবিষ্যৎ প্রিয়পুরুষের অবয়ব, যাকে সে তিলতিল করে গড়ে তুলছে। ডিসেম্বরের ঠান্ডা হাওয়ায় যার বুকের সমস্ত উত্তাপ জড়িয়ে থাকবে এই সোয়েটারে, সে কি এন্টনি, না আর কেউ?
ক্যালেন্ডারের পাতা ক্ষয়ে আসছে, সেসঙ্গে লুসির মনও। এ পাতা ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই মনস্থির করা চাই। আরেক আগামী বছরের জন্য প্রতীক্ষা সে করবে না, করে কি লাভ? এমন তো কতই করেছে।
ড্রয়ার থেকে হাল্কা নীল রঙের প্যাডটা নিয়ে বসল। কলমটা বুলিয়ে দেখল তাতে, ঠান্ডায় কালি জমে আসছে। তার ফল্গুধারা শুকিয়ে আসছে। জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে প্রকৃতিস্থ করে তুলতে হবে কলমটাকে।
কিন্তু কী লিখবে।
কী বলবে, মেয়েমানুষ হয়ে নিশ্চয়ই বলবে না আমাকে হাতে তুলে নাও। আমি যদি ফুলদানিতে সাজানো সেই লাল ফুলের পাঁপড়ি হয়ে থাকি, এবার সাহস করে আমাকেই তুলে নাও। এবার আর দ্বিধা করো না।
কিন্তু কামাল কি তা পারবে, সবকিছুতেই তার কুণ্ঠা ভয় আর কাতরতা।
লিখতে গিয়ে দেখল সম্বোধনটাও আসছে না। কি দিয়ে শুরু করবে, প্রিয় – প্রিয়তম না শুধু ডিয়ার মিঃ…। না তার কোনোটাই হয় না, প্রিয় আর প্রিয়তম লেখার অধিকার তাকে দিলে তো।
তবু কলমের গোড়ায় কতগুলো অক্ষর ঝরে গেল। লেখা হয়ে গেল কাগজের বুকে। পড়ে একবার হাসিই পেল। এ লেখার অর্থ দুর্বোধ্য কেউ বুঝবে না। কাউকে বোঝান যাবে না। সারা চিঠি জুড়ে একটা মর্মভেদী কান্না বার বার মাথা খুঁড়ে মরছে : আমি আর পারিনে – আর পারেনি –
কলমের ডগায় ভালো করে কেটে দিল লাইন কটি। জট পাকিয়ে কালির পোঁচ করে দিল আরও গভীর। আরও ঘন।
কাল সকালে উঠে সে আরেক মানুষ হয়ে যাবে। আরেক মানুষ, পুরো দিনের ছিঁচকাদুনে লুসি নয়। একটু হাওয়ার ফুৎকারে উড়ে যাওয়া ঝরা পাতা নয়, শক্ত শেকড়ে বাঁধা মহীরুহের মতো।
দেখেনি কখন চিত্রা ভদ্র এসে তার পেছনে দাঁড়িয়েছেন।
সরাসরি মেয়ের দিকে না তাকিয়ে বলেন, ‘মিস্টার মিরান্ডার সঙ্গে দেখা হয়েছিল রাস্তায়।’
‘তাই নাকি, কী বললেন।’
চিত্রা ভদ্র যেন ভরসা পেলেন। বললেন, ‘এন্টনি তাঁকে টেলিফোন করেছিল। ব্যাপারটা শিগগির সেরে ফেলাই তার ইচ্ছে। সামনের মাসে তাকে জয়েন করতে হবে লাহোরে, কোম্পানির রিপ্রেজেনটেটিভ। ভালো চাকরি, ফ্রি ফার্নিশড হাউস –
ঠিক এতটা আশা করেননি চিত্রা ভদ্র নিজেও।
লুসি উঠে দাঁড়াল। হঠাৎ চিত্রা ভদ্রকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘তুমি যা ভালো বোঝো মা।’
তারপর ফুঁপিয়ে কান্না জুড়ে দেয়।
জীবনে প্রথমবারের মতো অনুভব করেন চিত্রা ভদ্র, তাঁর মেয়ের কান্না তাঁকেও মর্মাহত করেছে। তাঁরও বুক কাঁপছে। নিজের মেয়ে আজ সেই ছোটবেলার মতো তাঁকে বুকে জড়িয়ে কাঁদছে। জীবনের সব অঙ্কুরিত আকাক্সক্ষার ব্যর্থতার কান্না।
এবার নিজেরই গলা ধরে আসে চিত্রা ভদ্রের, বলেন, ‘এ বিয়েতে তুই কি সুখী নয়?’
আরো নিবিড় করে জড়িয়ে ধরে লুসি। কান্নার এক একটা পাহাড় এসে যেন তার বুকে আঘাত করে।
আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে চিত্রা ভদ্র বলেন, ‘ছাড় তো যাই, মাথাটা কেমন করেছে।’
চিত্রা ভদ্র নিজে অনুরোধ করে চিঠি পাঠিয়েছিলেন কামালকে আসার জন্যে। বলেছেন, বিয়েতে তার অভাব সবাই অনুভব করেছে। কাকেই বলবেন আর। খবর পেয়ে অফিসের কোনো লোকের মারফৎ দুশো টাকা পাঠিয়েছিল সুধাকর একটা ওয়েডিং গাউনের জন্য। সে লোকের মুখেই শুনেছেন পেশোওয়ারে কোথায় চাকরি করছে সুধাকর। ঠিকানা জোগাড় করে চিঠিও দিয়েছিলেন। সে চিঠির কোনো জবাব পাননি চিত্রা ভদ্র।
গেলে বিকেল থাকতেই যেতে হয়। বিয়েতে যাওয়া নাই হোক, আজকে লাহোর যাবার আগে নবদম্পতিকে একবার অভিনন্দন জানান দরকার।
অনেক করে বোঝাল মনকে। এ রাগ, এ অভিমান কার ওপর? লুসি না এন্টনি।
পাটকরা শার্ট বার করল সুটকেস থেকে। অভিসারে যেতে পারেনি বলে বিদায়ের মুহূর্তকে বেদনাভারী করে তোলার ইচ্ছে নেই। মনের কথা থাক, সে রাজ্যে আকাক্সক্ষার পথ অনেকেই খুঁজে পায়নি। পৌঁছুতে পারেনি।
চট্পট্ করে বেরিয়ে একটা বাস ধরল। এম্প্রেস মার্কেট থেকে একতোড়া ফুল কিনবে। সবচেয়ে ভালো, সবচেয়ে তাজা।
হাতে দিয়েই চলে আসবে। তাকাবে না। লুসি খুশি হলো না দুঃখ পেল চেয়ে দেখবে না। শুধু চমৎকার হাসি হেসে বলবে, লাহোরের আবহাওয়া চমৎকার এসময়ে, আমি একবার গিয়েছিলাম।
এন্টনি ওর হাতটা ধরে বলেও ফেলতে পারে, ‘কবে আসছেন বলুন, ধরুন এই নভেম্বরে, তদ্দিনে ঘর গুছিয়ে নিতে পারব।’
তারপর সম্মতির অপেক্ষায় তাকাবে লুসির দিকে, ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে অনুভব করল অসম্ভব ভারি। বোঁটার দিকটা সোজা করে ধরে রাখতে হাত ব্যথা করে ওঠে।
ফ্লাওয়ার লেন – কোনো কাব্যরসিক নামটা দিয়েছিলেন?
সামনে একটা পার্কে বসে পড়ল কামাল। সমস্ত ব্যাপারটা মনে হলো তার কাছে অর্থহীন, এই একটা ফুলের তোড়া সমর্পণ করে লাভ। দু’দিন বাদেই তো শুকিয়ে যাবে। হয়তো বড় স্টেশনে মালবদলি করার সময় পড়েই থাকবে ঝুড়ির ওপর। মনেই থাকবে না। হাতে করে নিতে।
আবছা অন্ধকারে নিজেকে অদ্ভুত মনে হয়। হঠাৎ সেই অন্ধকারে নিজের ছায়া দেখে আঁৎকে ওঠা যায়। অল্প দূরে বসে একটি ছেলে আর মেয়ে। ভালোবাসার আগুন জ্বলছে তাদের চোখে। তাই অমন ফিস্ফিস্ েকথা, কথায় কথায় প্রচ্ছন্ন হাসি।
আগে কোনোদিন দেখেনি, পার্কে বসে নিজেকে একটা দ্বীপে বন্দি মনে হয়, চারধারে চলিষ্ণু জগৎ। এখানেই শুধু বিরতি। জীবন এখানে স্থবির।
ফুলের তোড়াটা নাবিয়ে রাখল ঘাসে। লাল, বেগুনি আর হলদে রংয়ের ভিড় যেন হাঁপিয়ে উঠেছে। শক্ত গেড়োর বাঁধনে। মুক্তি চায়, গেরোটা খুলে নিতেই বাতাসে উড়ে গেল দু’একটা পাঁপড়ি শুকনো পাতার মতো।
হঠাৎ আবিষ্কার করল কামাল সে একা, দু’একটা গ্যাসবাতি ছাড়া চারধারের আলো নেবানো।
রাত কত হলো কে জানে।
লুসি আর এন্টনি এখন কোথায়।
আর্দ্ধেক পথ পৌঁছে গেছে নিশ্চয়ই।
তারা কি একবারও তার অনুপস্থিতির কথা ভেবেছে। অন্তত লুসি, একবারও চারিদিকে চেয়ে দেখেনি?
তারপর?
তারপর কী বলেছে?
হয়তো বলেছে, কাপুরুষ!
এমনি আরেক সন্ধ্যায় ভাড়া করা ফ্ল্যাটে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে কে যেন পেছনে এসে দাঁড়াল।
প্রায় আচম্বিতে বলে ফেলল কামাল, ‘কে সুধাকর?’
আগন্তুক কম অপ্রস্তুত হলো না, ‘কী বললেন?’
কে একবার এমনি তার পেছনে ছায়ামূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকেছে বছর সাতেক আগে। কখনও না বলতেই চেয়ার টেনে বসে পড়েছে। কখনও অজস্র কথার ঝাঁপি খুলে ধরেছে। কখনও একটি কথাও বলেনি। যে স্মৃতি দিয়ে যাকে কল্পনা করা যায়, সাত বছর আগে সে সুধাকর হলেও এখন আর তা হতে পারে না। সবকিছু বদলাচ্ছে। মানুষের মন, এমনকি মানুষ পর্যন্ত।
তাকিয়ে দেখল ইউনাইটেড ইনসুরেন্স কোম্পানিতে তার সহকর্মী নওয়াজিশ্, আফিসের পর কখনও কখনও আসে, বসে গপ্প করে। আপিসী চক্রান্তের সর্বশেষ খবরটা জানাতে জানাতে বলে, ‘বুঝলেন প্রমোশন কবে হয়ে যেত, র্যাঙ্কিনই হলো সব নষ্টের মূল।
তবু সায় দিতে হয়, আর কোনোকিছুর কথা নয়। পার্থিব উন্নতি, প্রমোশন আর চাকরি। স্বার্থবুদ্ধির কথা।
নওয়াজিশ্, খানিকক্ষণ ওর চিন্তাক্লিষ্ট মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কার কথা যেন বলছিলেন।’
পরম লজ্জিত হয়ে বলে কামাল, ‘না, আমার একজন পুরোন বন্ধু, সে আপনারই মতো প্রায়ই আসত।’
অনেক কথা। এক ঘণ্টা ধরে বহু তর্ক-বিতর্ক, বহু সমস্যা। হঠাৎ নওয়াজিশ্ বলে ফেলল, ‘বাড়ি একটা পেয়ে গেলাম শেষটায়।’
শীতল ঔৎসুক্য দেখিয়ে বলে কামাল, ‘তাই নাকি, কোথায়?’
‘ফ্লাওয়ার লেন।’
‘কী বললেন?’ উঠে দাঁড়ায় কামাল।
নওয়াজিশ্ বোঝে না এতে আতঙ্কিত হওয়ার কী আছে। বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে থেকে বলে, ‘কেন ও বাড়িতে ছিলেন নাকি কখনও?’
‘না, না। সে কথা নয়।’
কথাটা যে কি তা আর বলা গেল না। বোধহয় আর কাউকেই কোন কালে বলা যাবে না। ফ্লাওয়ার লেন তর্জমা করলে কী হতো : পুষ্প গলি।
কোথায় একটা পরম বেদনার তীব্র অনুভূতিতে দাহ করতে চাইল নিজেকে। পারল না। আশ্চর্য কামাল নিজেও কম হলো না। মন কি তারও সত্যি বদলেছে, নইলে যতটা ভেবেছিল ততটা কাতর হয়নি হৃদয়ের কোনো তন্ত্রীতে চেনা সুরের মতো ফ্লাওয়ার লেনের উল্লেখ কেমন মিষ্টি শব্দ করে উঠল, কিন্তু সে শব্দ হৃদয়ের সব তন্ত্রী ছুঁতে পারার আগেই মিশে গেল বুদ্বুদ হয়ে।
সাতবছর অনেক জায়গা ঘুরেছে। চেনা অচেনা মানুষের ভিড়ে কারও দেখেছে লুসির মতো একজোড়া চোখ, কারও ঘাড় বরাবর তেমনি চুল, তেমনি চলার বলার ধরন। কিন্তু সবটা মিলিয়ে লুসি নয়। লুসির মতোও নয়। কতবার ভেবেছে ছুটে যাই। সব অভিমানের বরফ গলিয়ে দিয়ে স্রোতের মতো ভেসে যাই। আরেকবার, মাত্র একটিবার শুধু দেখা, কথা বলা। আর কিছু না।
এক অফিস থেকে অন্য অফিস। এক শহর থেকে অন্য শহর, শুধু চাকরি বলেই না। নিছক মানিয়ে নেওয়ার তাড়নাও এতে কম নেই।
ইচ্ছে ছিল নওয়াজিশ্কে জিজ্ঞেস করে, ‘ওই বাড়িটাই কি ভাড়া নিয়েছে সে। ফার্নান্ডেজ ম্যানসন, কিন্তু কী লাভ? ফার্নান্ডেজ ম্যানসনও যদি হয়, এমনকি সুধাকরদের ওই ফ্ল্যাটও যদি হয়, কি এসে যায়। আর তো সেখানে যাবার দরকার নেই।
কামালকে উঠে পড়তে দেখে বলে নওয়াজিশ্, ‘এই ভরা সন্ধ্যায় কোথায় চললেন আবার?’
গরম চাদরখানা গায়ে জড়িয়ে নিতে নিতে বলে কামাল, ‘যাই – মাথাটা ধরেছে। ঘুরে আসি।’
‘আমিও আসি তাহলে। আমারও আবার দু’চারটে জিনিস কিনতে হবে, নইলে বৌ আস্ত রাখবে না।’
একটু হাসবার চেষ্টা করল কামাল। পারল না। বৌ-রা থাকলে এমন আবদার করেই। কিন্তু ‘আস্ত রাখবে না’ শুধু সে ভয়েই কি? মনেরও খানিকটা সায় নেই কি তাতে। নওয়াজিশ্কে হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে দেখে মনে মনে সে কথাই ভাবছিল।
এতক্ষণ বেশ তো ছিল। ভেবেছিল আর কোনোকিছুই তাকে স্পর্শ ভিজে গেল নাকি। তার চিরাচরিত জীবনযাত্রার পদ্ধতিতে আকস্মিক পরিবর্তন লক্ষ করে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। সেই প্রিন্সেস স্ট্রিট বরাবর এসে থামল। সামনে রাস্তা দু’ভাগ হয়ে গেছে, বাঁ দিকে ফ্লাওয়ার লেন।
থমকে যায়, কী করবে, ফ্লাওয়ার লেন হেঁটে ফার্নান্ডেজ ম্যানসনে গিয়ে দাঁড়াবে আগের মতো? দরজায় টোকা দেবে? কিন্তু নিছক একটা পরাজিত স্মৃতিরোমন্থন ছাড়া আর কি মিলবে তাতে?
লক্ষ করেনি ক্রাউচে ভর করে কে যেন এগিয়ে আসছে তারই দিকে। এক মুহূর্ত নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করাতে পারল না, এই সেই মণি!
কিন্তু কোনো কথা বলার আগেই মণি বলে উঠে, ‘স্যার আপনি যে, অনেকদিন পরে দেখা।’
স্বাভাবিক সুরে জবাব দিয়ে বলল, ‘ছিলাম না কিনা। এখানকার আপিসে বদলি হয়ে এসেছি মাত্র মাসখানেক হলো।
এক হাতে ক্রাউচটা ধরে অন্য হাতে কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে কি যেন একটা বার করে ধরল মণি!
‘নিন না স্যার, গন্ধরাজ তেল, একবার মাখলে ভুলবেন না।’
কবে থেকে তেলের ক্যানভাস করছে জিজ্ঞেস করার ইচ্ছা ছিল। বোধহয় খানিকক্ষণ আগেও তেলের অপরাজেয় কর্মগুণের কথা বলে যাচ্ছিল মুখস্থ গৎ-এর মতো। কামালকে দেখেই থেমে গেছে।
খানিকক্ষণ তেলের শিশিটা নেড়ে চেড়ে বলল, ‘কী করব এটা দিয়ে।’
‘রাখুন না স্যার।’
বলতে কষ্ট হচ্ছিল, তবু অনেক কষ্টে উচ্চারণ করে বলল কামাল, ‘দাম?’
‘আপনাকে এর দাম দিতে হবে নাকি আবার। দু’চার বোতল স্যাম্পলেই চলে যায়।’
কোনো দরকার নেই তার গন্ধরাজ তেলের। পাট করে চুল আঁচড়াবার শখও নেই আজকাল। তবু মণির দেওয়া জিনিস প্রত্যাখ্যান করে কী করে। তার দেওয়া অনেক জিনিস অনেকেই প্রত্যাখ্যান করেছে। এমনকি সেই বিস্মৃত-প্রায় ডলি রহমান পর্যন্ত।
হঠাৎ নামটা মনে হয়ে গেল মণিকে দেখে।
অনেক ধরে কয়ে এনে বসাল কাছেই এক রেস্তোরাঁয়। অনেক কথাই শুনল। সাবের সাহেব মারা যাওয়ার পর থেকে তাদের অবস্থা আর আগের মতো নেই। অভাব অনটন লেগেই আছে। চম্পারা বরিশালে। কখনো কখনো চিঠি লেখে। খবর নেয়। ব্যস ওই পর্যন্তই।
আলোচনার মাঝখানেই উঠে দাঁড়ায় মণি। বলে, ‘যাই স্যার। আরেকদিন দেখা হবে, এসময় বিক্রিটা ভালো জমে।’
কাচের দরজা খুলে বেরিয়ে গেল মণি। কামাল চেয়ে দেখল, মনে হলো না ওই পঙ্গু অসাড় পা জোড়া নিয়ে আর কোনো দুর্ভাবনা আছে মণির। তার মতো মণিও বোধহয় জীবনের সঙ্গে সন্ধি করে ফেলেছে। তাদের দু’জনের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য লক্ষ করে খানিকটা পুলক অনুভব করে। না হয় ক্রাউচের ওপর ভর দিয়ে পা জোড়া টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছে মণি, তাতে কি। তার গভীরেও একটা অসাড় নিষ্কাম, পঙ্গুত্ব তেমনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চলছে। তবু সয়ে যাচ্ছে। ভুলে যাচ্ছে চাকরি, আপিস, ফাইল আর বদলির যাঁতাকলে পড়ে মনটা বদলেছে, বদলাচ্ছে। কই আগের মতো উচ্ছ্বাসে ভেঙ্গে পড়ছে না তো কামাল।
বিল চুকিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। দুটো তরুণী সিনেমার পত্রিকা নিয়ে মহাখুশিতে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। জনস্রোতে আরো কত মুখ লুকিয়ে। কত স্বপ্ন, কত কামনা, কত উচ্ছ্বাস। হতে পারে তাদেরই একজন ডলি রহমান। ভুল করে একটা তেলের শিশি সেও কিনে ফেলতে পারে মণির কাছ থেকে, কিন্তু ডলি রহমানের বুকটা ধুক্ ধুক্ করে উঠবে না। একটুও পয়সা চুকিয়ে গট্গট্ করে চলে যাবে তেমনি। দেখা হলেও সেই জনস্রোতে এদের ভেতর কে যে ডলি রহমান এতবছরে মণিও হয়তো তা মনে রাখাতে পারবে না। পারবে না বলেই সবাইকে তার মনে হবে প্রথম প্রণয়িনীর মতো। কিন্তু আর উচ্ছ্বাস নয়। চিত্তের কোনো দুর্বলতা নয়। আর সে কারও মন পাওয়ার জন্য কাঙ্গালপনা করবে না। যা কামনা করবে তা শুধু এক টাকা তেরো আনা, এক শিশি তেলের যা দাম।
শত ভুলে থাকার চেষ্টা সত্ত্বেও সবকিছু তার কে যেন তছ্নছ্ করে দেয়। বেশ ছিল। সব ভুলে ছিল। হঠাৎ স্মৃতির পাহাড় ধসে পড়ছে, আর তাকে ধরে রাখা যাবে না।
নিজের ঘরে এসে বৃথাই পায়চারি করতে থাকে কামাল, নিষ্কৃতি পাবার এ যেন একটা ছল।
হঠাৎ তার মনে হলো ট্রাঙ্কের ভেতর মণিকর ভদ্রের দেওয়া চিঠিটা রেখে দিয়েছিল, ওটা সুধাকরকে দেওয়া হয়নি। পড়েও দেখেনি কোনোদিন। তার রোমাঞ্চমুখর দিনের ওই একটা স্মৃতিই শুধু বাকি। যতদিন থাকবে শুধু কাঁটার মতো বিঁধবে তাকে। আলোর সামনে ধরে ভালো করে দেখবে আজ। আর কোনোদিন, আর কোনোদিন হয়তো দেখা হবে না সুধাকরের সঙ্গে, লুসির সঙ্গে। শেষবারের মতো দেখে নিতে ক্ষতি কি। চোখ রাঙাবার কেউ নেই। চিঠিটা পড়ে পুড়িয়ে ফেলবে আগুনে, তার গত জীবনের শেষ স্বাক্ষর মিলিয়ে যাক।
শব্দ করে খুলে গেল ট্রাঙ্ক। বইয়ের তলায় চাপা দেওয়া ছিল চিঠিখানা। বই তুলতে গিয়ে দেখে উইয়ে খেয়ে শেষ করেছে। কিছুই বাকি নেই চিঠিটার। চিঠির ভাঁজ খুলতে শুকনো পাতার মতো ঝরে পড়ল কয়েক টুকেরা। ছড়িয়ে পড়ল মাটিতে। আরেকবার সবগুলো জড় করে পড়তে চেষ্টা করল। পারল না।
ঝাঁঝরা বুকের মতো খালি কয়েক টুকরো কাগজ ছাড়া আর কিছুই নেই। দেশলাই এর একটা কাঠি ধরাল। পুড়িয়ে ফেলবে।
কিন্তু তার আগেই এক দমকা হাওয়া চিঠিখানা ঝড়ের মতো উড়িয়ে নিয়ে গেল। বিমূঢ়ের মতো সেদিকে তাকিয়ে দেখল কামাল। মনে হলো আঙুল পুড়ে আসছে। অসম্ভব দাহ স্নায়ুতে স্নায়ুতে। দেশলাই-এর কাঠি জ্বলে আঙুল পুড়িয়ে দিচ্ছে। শুধু অবচেতনের মতো খানিকক্ষণ সে জ্বালার মর্মপীড়ন সহ্য করতে থাকে। তারপর আর পারা যায় না।
