উত্তাপ 

যেটা মনে হয়েছিল এক খ- কালো মেঘ দুপুর না গড়াতেই তা ঢেকে ফেলল সমস্ত আকাশ। চকচকে উজ্জ্বল দিনের গায়ে পা-ুর ক্লান্তি নিয়ে নাবল কপিল বর্ণের সন্ধ্যা। তার পরই এলো বৃষ্টি – অঝোরে গাছপালা কাঁপিয়ে, সহস্র বিদ্যুৎ রেখার আকাশের মানচিত্র বর্ণায়িত করে। ছন্দহীন অবারিত বৃষ্টি প্রথমে মেটাল দগ্ধক্লিষ্ট মাটির ক্ষুধা। কার কল্যাণ স্পর্শের মতো স্বচ্ছ শুভ্র একটা চাদর বিছিয়ে দিয়ে গেল আদিগন্ত মাঠে। ডোবা দিয়ে সুর সুর করে পানি এসে পড়ল ড্রেনে। সর্পিল বেণীর মতো আরও অগুনতি জলধারা এসে নাবল মাঠ বেয়ে পুকুরে। পুকুর ছাপিয়ে অন্ধ গলিতে। নিরুদ্দেশও হলো সেখানেই।

জানালার ছিটকিনিটা শক্ত করে এঁটে দিয়ে বাবর এসে বসল বিছানায়। গরমের ছুটিতে হোস্টেলটা খাঁ-খাঁ করছে। ছাত্রাবাসের গুঞ্জন-রহিত এমনি এক নিঃসহায় কামরায় বসে চোখ বাড়িয়ে দেখল – কী যেন ভাবনার ছেদ কাটিয়ে বৃষ্টি এলো।

বছরের প্রথম বৃষ্টি। আশ্চর্য, একে নিয়ে হবে কাব্য, কত কত দ্বিরুক্তি, কত অত্যুক্তি আর উচ্ছ্বাস।

বাড়ি যাওয়ার কথাই ঠিক ছিল। কিন্তু হোস্টেল ও দোকানের পাওনা শোধ করে প্রায় কিছুই থাকল না। অবশ্য ধার করলে চলত। দু’বছর ধরে একনাগাড়ে হোস্টেলের কাঠকড়ি গুনছে বাবর। মফস্বলের ভালো ছেলেটির মতো পাজামা তুলে চকচকে জুতো পরে এসেছিল সেই তখন। তারপর সে জুতোটাও নেই। পাজামাটার আয়ুষ্কালও শেষ। হয়তো অনেক কিছুই বদলেছে আরও।

পাশাপাশি তিনটে সিট। এক ভদ্রলোক ল’ পড়েন। দুপুরে চাকরি। সন্ধে নাগাদ কলেজ। লেখাপড়াটা যেন ফাওয়ের কারবার। হয়তো খানিকটা সঙ্গত কারণেই সবাই খানিকটা ঈর্ষা করে এদের। মাসকাবারে কড়কড়ে তাজা নোট তোষকের নিচে রেখে নাক ডেকে ঘুমোয়। টিপে টিপে খরচ করে। কেউ চাইতে এলে বলে, টাকা! ক্ষেপেছেন! টাকা পাব কোথায়। বেতনের কথা বলছেন। সে তো দু’তারিখেই ফাঁক্কা।

তবু কী করে যে দুর্জয় প্রসাধন, ক্রিমের কৌটো আর রকমারি তেলের শিশি টেবিলে এসে জড় হয়, ভাগ্যিস কেউ তা নিয়ে মাথায় ঘামায় না। কারণ টেবিলে যখন আসে তেলের শিশিতে শুধু থাকে তেলতেলে ভাবটা এবং কৌটোর শূন্য সৌরভ। মবিনের আরেকটা বাতিক আছে। সেটা কিছু নিন্দনীয় নয়। দু’হপ্তায় একটা করে সেন্টের শিশি শেষ করা চাই। মবিন আগে নামের আগে মিঞা লিখত। কেন জানিনে সেটা বেমালুম গায়েব হয়েছে আজকাল।

বাঁ-ধারের সিটটা মহবুবের। জানালার কাছে বলে ওই সিটটা নিয়ে বচসা হয়েছিল অনেক। কিন্তু শেষটায় ওর ভাগ্যেই বর্ত্তাল। বিজ্ঞানের ছাত্র – কেমন করে বিদ্যুতের দুটো তার এনে বিছানায় ঝুলিয়ে বলল, কাছে এলেই চারশো চল্লিশ ভোল্টের শক। ‘বিপজ্জনক চারশো চল্লিশ’ কেউ আর ঘাঁটাল না। সেই থেকে ওটা মহবুবের দখলে।

সবেমাত্র ভর্তি হয়ে এসেছে আলিম। এখন গায়ে সেই মফস্বল গন্ধ। তেমনি বাহার মাথায় তেরচা সিঁথির। সকাল-বিকেল সাবান দিয়ে হাতমুখ ধুয়ে জুতোর ফিতে টাইট করে চম্ চম্ করে হাওয়া খেতে বেরায়। ইদানীং নাকি আবার মেয়েদের কলেজের রাস্তা দিয়ে হোস্টেল ফেরে। কিন্তু এ দুর্নামের কথা বলতে গেলে লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে।

এরা দু’জনই ছিল ছুটিতে। মবিন হঠাৎ কাল এসে হাজির। বলল, ভাই মন একদম টেকে না। তাছাড়া দেখলাম পরীক্ষা যখন একটা রয়েছেই – বিছানার দড়ি খুলতে খুলতে আবার বলে, কাল থেকে কিন্তু পড়তে হবে বুঝলে। একঠায় বারো ঘণ্টা।

ঘুমুতে যাবার আগেও কথাটা কাল আরেকবার মকশ করেছিল মবিন, রুমমেট ঘুমিয়ে পড়লে। তা পড়ো। কাল থেকে কিন্তু তোমাকেও বসতে হবে। হালকা গল্পের বইটা হাত থেকে নাবিয়ে পাশ ফিরে তাকাল বাবর, কেন কিছু বলবে –

শালার লাইফটা এভাবেই গেল। তোমরা তো ভালো স্টুডেন্ট।

কথা কয়টা বলেই উৎকর্ণ আগ্রহে কান পেতে থাকে মবিন।

এ ধরনের উক্তির জবাব চিরকালই হৃদয়গ্রাহী। শ্রুতি মিষ্টি।

কী যে বলেন মাথামু-ু পাশ ফিরে বইটা তুলে নেয় আবার বাবর।

অনেকক্ষণ কথাবার্তা হয় না, একটা নিস্তেজ গানের কলি ভাঁজতে ভাঁজতে আরেকটা আর্র্জি জানিয়ে রাখে মবিন, কাল কিন্তু সকাল ছ’টায় তুলে দিও।

বাবর জানে এ অনুরোধ অর্থহীন। সে নিজেও ছ’টায় ওঠে না। তবে একটু আগে ওঠে।

কাল সারারাত মোষের মতো ঘুমিয়েছে মবিন। ঘুম থেকে উঠেই ঘড়ি দেখল। ন’টা বাজতে তখনও ছ’মিনিট। অনেক রাত করে ঘুম হওয়াতেই দেরি হয়ে গেল উঠতে, এ-কথাটা বার তিনেক শোনাল। তারপর সেই সকাল থেকে উধাও।

আজ আবার রাতের সেই অর্ধসমাপ্ত বইটারই জের টানছিল বাবর। বৃষ্টির দিনে মেজাজটা বড় নরম আর হালকা হয়ে আছে। বাইরে তাকিয়ে দেখল বৃষ্টির সমারোহ। দূরে হঠাৎ বড় রাস্তায় একটা-দুটো ট্রাক বা গাড়ি ছুটে চলেছে তীরবেগে। বৃষ্টির ছাঁট লেগে ল্যাম্পপোস্টের আলোটা খান খান হয়ে পড়ছে। পথচারীর সংখ্যাও কম। মাঝে মাঝে দেখা যায় ছাতি মাথায় কতকগুলো সরু লম্বা লম্বা পা। বইটা আর ভালো লাগলো না।

প্রাণ মাতানো ভেজার আনন্দে মনটা আগ্রহভরি। বৃষ্টিস্নান সবুজ পাতায় অসম্ভব একটা শুচিতা। বাড়িতে গেলে মন্দ হতো না। যাওয়াই উচিৎ ছিল।

পলাশপুরের কত আদল বদলেছে হয়তো এ দু’বছরে। তখন দেখে এসেছিল ছোট ছোট রাস্তা। লাল সুরকির খোয়া দিয়ে বাঁধানো। আজকাল নাকি একটা বাস রুটও হয়েছে এ রাস্তায়। সাত ঘণ্টা গরুর গাড়িতে বসে পাঁজরের হাড় ধরে আসবে না আর তাহলে।

পাশাপাশি তর্জ্জার বাড়ি। এ বাড়ি থেকে চিৎকার করলে সাতঘর শোনা যায়। কলাগাছের মুড়িটা একটু উঁচু। তারই পাশে একটা কুলগাছ। কুল পাড়ার নাম করে অনেক উঁচুতে তাকিয়ে দেখা যায়। দু’বাড়ির পরও আরেকটা বাড়িতে রোজই না হোক, অন্তত কখনও কখনও না হলেও মাঝে মাঝে নিশ্চয়ই দেখা যাবে একটা অনিন্দ্য সুন্দর মেয়ে ডান হাতের আঙুলে তেঁতুলের অম্লতার স্বাদ নিচ্ছে। হয়তো অন্যদিন মিহি ব্লাউজের ওপর জংলি ডিজাইনটা তুলবার আপ্রাণ চেষ্টায় মগ্ন। আবার কখনো ভোঁতা কলমটা চৌকষ দোয়াতের মুখে ঢুকিয়ে চোখ নাবিয়ে মাদুর পেতে কী যেন লিখছে। চোখাচোখি হতেই চোখ নাবিয়ে ফেলে। কি সাংঘাতিক দুষ্টু মেয়ে পারুল।

একগাদা পানিতে আকণ্ঠ ডুবিয়ে নিয়ে, ভয়ানক দ্রুতভাবে কড়া নাড়া শুরু করল মবিন। মোটাসোটা কালো। তার ওপর কালো রংয়ের চকচকে বর্ষাতি যেন তারপিন তেলে ঘষা। পায়ে গামবুট। এবোনাইটের বৃষ্টি ধোওয়া একটা মর্মর মূর্তিই মনে হতো যদি না মুখে থাকত খোঁচা খাঁচা দাড়ি। মাথার বাঁদর টুপিটা খুলে ফেলে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে করুণ সুরে বলল মবিন, খোলো হে খোলো, ভিজে একদম জাব হয়ে গেছি। শালার এমন বৃষ্টি।

চমৎকার ঘণীভূত একটা পরিবেশে নিজের সাম্রাজ্য পরিবৃত হয়েছিল বাবর। চারপাশে বই। লেপটা একপাশে গাদা করা। আরেকদিকে আড়াআড়ি টেবিল। এই নভোম-ল ত্যাগ করে আবার তেমনি জাঁকিয়ে বসা যাবে না। যদিও বিলাসব্যাসন ও আরাম যাপনের এই দুর্বোধ্য অবস্থাটা কাউকেই বুঝিয়ে বলা যাবে না।

স্যান্ডেলটা খুঁজে না পেয়ে খালি পায়েই দরজার ছিটকিনিটা খুলে দিলো। হু-হু করে একরাশ বাতাস এসে ঢুকলো ঘরে। আর সেইসঙ্গে স্বয়ং মবিন – একটা মূর্তিমান জলপি-। পকেট থেকে গুঁড়ো পয়সা কুড়িয়ে নিয়ে বলল, রুমমেট তিন আনা হবে?

বাইরে একটা রিকশা দাঁড়িয়ে।

বাবর দরজার খিল আঁটতে গিয়ে বলল, তিন আনা! সকাল থেকে তিনটে পয়সার সঙ্গে দেখা নেই।

আঃ, দেখো না ছাই। রিকশাটা বিদায় করতে হবে তো।

নাই, থাকলে আপনাকে না বলি।

যুক্তি অকাট্যই মনে হলো। ভাবগম্ভীর পরিবেশে সমাবৃত হয়ে বারান্দাটা পায়চারি করতে করতে মবিন বিড়বিড় করে নিজ থেকে, তিন আনা পয়সার জন্য ব্যাংকও তো বন্ধ।

পয়সার জন্য গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে রিকশাওয়ালা তখনও।

সুটকেস খুলে একটা খাম বার করল বাবর। ক’দিন আগে একটা টাকা রাখতে দিয়ে গেছে হোস্টেলের বয় আবদুল্লা। বলে, নিজের আছে থাকলে থাকে না। তাইতে একটাকা একটাকা করে জমাবে এই ইচ্ছে।

একটা টাকা দিতে পারি, কিন্তু একটা কথা। অন্যের টাকা। সময়মতো না দিতে পারলে বেইজ্জত হতে হবে কিন্তু।

কাল সকালেই পাবে। ব্যাংক খোলা থাকলে এতো হ্যাঙ্গামা পোহাতে হতো?

অত্যন্ত আগ্রহে টাকাটা হাতে তুলে নিল মবিন।

বাঃ বাকি পয়সা। তিন আনা দরকার বললে?

দোব, দোব একসঙ্গেই দোব। ওসব খুচরো হিসেব আমার মনে থাকে না। কাল নিও, একসঙ্গেই নিও। দরকার হয় একটা টাকা বেশিই নিও, হলো তো? মুহূর্তের মধ্যে রুমে কি যেন একটা তোলপাড় হয়ে গেল। আলিমের তোয়ালে, বাবরের চিরুনি, পাশের রুমের এক ভদ্রলোকের একটা ছেঁড়া স্যান্ডেল নিয়ে পড়ল টানাটানি। মবিনকে কেউ কিছু বলে না। সিনিয়র ছাত্র।

কোথায় বেরিয়েছিলে মবিন ভাই এই ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে।

মবিন হাঁপাচ্ছে তখনও।

পয়সা চুকানো থেকে শুরু করে খুঁটিনাটি সব কাজটা যে ভালোয় ভালোয় ম্যানেজ করা গেছে এটা চাট্টেখানি কথা নয়, মবিন অবশ্যি সব পারে। কার ঘরে একটা এক্সট্রা কম্বল, কার দুটো বালিশ, বৈয়মে কার কতটুকু চিনি এসব খোঁজ ওর জানা। শুধু জোগাড়যন্ত্র করে আনতে পারলেই হলো। এই অসাধ্য জোগাড়যন্ত্রের পর্বটাই হলো ‘ম্যানেজ’ করা। ম্যানেজ করেই মবিন হোস্টেলে ঢোকে। ম্যানেজ করে একটা পেপারে সে বছর কাচ্চা দশটা নম্বর বাড়াল। ম্যানেজ করে দুষ্টু ছেলেরা বলে – একটা কাজই কেবল পারেনি মবিন ভাই। সেটা হলো : ছ’বছর ম্যানেজ করেও একটা মেয়ের সঙ্গে প্রেমে পড়তে পারেনি।

ভাঁজ করা খবরের কাগজ নিয়ে হাওয়া করতে করতে বলে মবিন, কোথায় গিয়েছিলাম। সে আর বলো না ভাই। আরে সুরুজকে চেনো তো তুমি। আক্কেলপুরের সুরুজ।

হতভম্বের মতো তাকাল বাবর।

ও, তোমার না চেনারই কথা। চেনে, অনেকেই চেনে। আরে বাবা, হাতের তালুতে পিষে কচ্ছপ মারতে শুনেছ কাউকে?

না, তো।

সেই সুরুজ। তার এখন লাট-বেলাটের ব্যবসা। ছোটবেলায় মক্তবে পড়তাম। নকল সাপ্লাইও দিয়েছিলাম বৃত্তি পরীক্ষায়। কিন্তু কিছু করতে পারল না হতচ্ছাড়া।

ওর সঙ্গেই চক্কর দিলেন বুঝি।

না চক্কর আর কই। বললে, দোস্ত বায়স্কোপ দেখবি। ইচ্ছে ছিল না। তবু ভাবলাম। ব্যাটা এখন টাকার কাঁদি। ভাববে হয়তো দু’কলম লিখে পড়ে বিদ্যার জাহাজ বনে গেছি। বললাম, চল তোর ইচ্ছাই পূর্ণ হোক।

কী রকম দেখলেন?

রাবিশ। লাস্ট ইয়ারে কলকাতায় দেখেছিলাম হ্যামলেট। তারপর আর তেমন ছবি পেলাম না।

কাপড় জামা ছেড়ে হাত-পা ছড়িয়ে বিছানায় এসে বসল। পকেট থেকে একটা ভাঙ্গা সিগারেট বার করে বলল, কিছু মনে করো না ব্রাদার। একটাই ছিল কি-না।

ধূম্রকু-লীতে মবিনের মুখটা ক্রমশই অস্পষ্ট হয়ে আসে।

হঠাৎ মবিন লাফ দিয়ে উঠে বসল, তবে হ্যাঁ রুমমেট হীরোর ভূমিকায় প্রেমচাঁদের পাটটা এক্সলেন্ট। একটা শট আছে – অমন ক্যামেরা ওয়ার্ক বড় বেশি হয় না। গান ভালো, ঘ্যানঘ্যানি নেই। এন্টারটেনিং।

কথা বলতে বলতে মবিন ঘুমিয়ে পড়ে কখন।

বাইরে তখনও অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে।

ঝড়বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর থাকে এমন একটা থমথমে ভাব। হঠাৎ মৃদু হাওয়ার স্পর্শে গাছের পাতা থেকে সঞ্চিত ধারা কখনও কান্নার মতো ঝরে। ঘাসের চিবুকে রুপালি শুভ্রতা। আর সেইসব মিশে কখন হা-হুতাশের মতো ঠান্ডা, অনেক অনেক ঠান্ডা হাওয়া এসে যখন লাগে নাকেমুখে, কেমন আড়ষ্ট হয়ে যায় সবকিছু।

সকাল করেই বেড়াতে বেরুল বাবর। সকাল-সকাল বেড়ানোর অভ্যাসটা কেমন যেন সেকেলে। তবু অযাচিতভাবে ঘুমভাঙ্গা চোখ নিয়ে রাস্তায় টলতে মন্দ লাগে না। রাস্তার দু’ধারে বটগাছের ঔদার্য। তলায় সবুজ ঘাসের ওপর মোটা পেন্সিলের দাগকাটা এলোমেলো সব রাস্তা।

ফকির আলী ম-ল সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছে এই সাতসকালে। হ্যান্ডেলের দু’পাশে দুটো দুধের বালতি। হোস্টেলের শ’তিনেক ছেলের অন্তত পঞ্চাশ জনও শখ করে মাঝে মাঝে দুধের যোগান করে। দামদস্তুর করে, ভেজাল কিনা পরখ করবে বলে ভয় দেখায়। তবু ফকির আলী ম-লের ব্যবসায় মন্দা ধরেনি। জমা-খরচের খাতাটা বগলদাবা করে যেদিন রুমে রুমে গিয়ে পায়চারি করে, সেদিন মনে হয় ভারত বিজেতা সিকান্দর শাহ্ তাঁর পরাভূত রাজ্য অতিক্রম করছেন। ক’জনই-বা সময় মতো টাকা দেয়; বরং বাকি পরিশোধের আশ্বাসটাই পাওয়া যায় শুধু। ছেলেরা সহজে কাছে ভিড়তে চায় না ম-লের। ফকির আলী নিজেই বলে, মার দুধ খেয়ে মাইনরে বৃত্তি পেতে পারো বাবা, তার বেশি তো নয়। আর এ দুধ? এ দুধ জজিয়তি মুন্সিফীর দুধ। ওর চোখের সামনে কত গ-াকে গ-া ছেলে দেখতে দেখতে পেশকার মুন্সেফ বনে গেল।

বাবরও কিছু ধারে। টাকার অঙ্কটা যদিও সামান্য। তবু বাকি শোধের কথা মনে হলেই গায়ে জ্বর আসে।

কি আশ্চর্য, বাবর ভেবেছিল অন্য রাস্তা দিয়ে যাবে। সাইকেলটা গা ঘেঁষেই গেল; কিন্তু কিছু বলল না তো ম-ল। কেমন মনে মনে একটু শ্রদ্ধাই হলো লোকটার প্রতি। তাহলে আদতে ছোটলোক নয় ম-ল। রাস্তাঘাটে বেজ্জত করবার লোক নয়।

বেশকিছু দূর চলে এসেছে হাঁটতে হাঁটতে। কান্তিপুরের সড়কটা পর্যন্ত পেরিয়ে এসেছে। শহরের পিচ করা রাস্তা এখানেই শেষ। তারপর লাল সুরকির পথ। কিছুদূর এগুলেই রাণু আপার ওখানে যাওয়া যায়। কিন্তু যাবে কী উপলক্ষ করে। কিছু তো একটা চাই।

পাশেই একটা চায়ের দোকান। সেখানেই বসে পড়ল। পেয়ালা আর রেকাবির চাইতে এখানে বাসনের শব্দটাই বেশি। এককাপ চা খেল। মাত্র চার পয়সা। কেমন অদ্ভুত মাদকতা সকালবেলার এই উষ্ণ বিলাসী এককাপ চায়ে। কেউ আবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খায়। চিনি চায়, বলে দুধ কম। অনুযোগ করে লিকার বেশি। জ্যান্ত মাছি দেখেও বলে, এটা কী?

হাবামুখো একটা ছেলে এসে চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে মালিকের কাছে এগিয়ে দেয়। অনেকক্ষণ সন্দিগ্ধ দৃষ্টি দেবার পর একটা স্নিগ্ধ হাসির বিচ্ছুরণে জবাব দেয় দোকানদার, চায়ের পাতা। কিছু নয়। আমাদের দোকানে ওসব পাবেন না। বলছেন পালটে দিচ্ছি।

কিন্তু শুধু চার পয়সার এককাপ চায়ের জন্য কি অসম্ভব পরিশ্রান্তি এ লোকগুলোর। কিন্তু শুধু কি এ লোকগুলোরই? সকালবেলা এতটা পথ হেঁটে এসে এককাপ দুর্লভ চা পানের পেছনে ওর নিজেরই কোনো যুক্তি আছে কি? হোস্টেলের ক্যান্টিনে গেল আড়াই মাস এক পয়সাও দিতে পারেনি। অবশ্যি খেলে কেউ কিছু বলত না। কিন্তু তবু কেমন লাগে। এমনকি ক্যান্টিনের সামনে দিয়ে যেতেও লজ্জা করে। একটু ঘুরে বরং পাশ কাটিয়েই যায় আজকাল। ফিরতে ফিরতে বেশ রোদ উঠে গেল। সকালবেলার নরম কাঁচা রোদ গোল হয়ে বসে চা-আন্তিক গল্পে মশগুল তখনও জনা দু’চার। নিজের নামটা উচ্চারিত হতে শুনে থমকে দাঁড়াল বাবর।

আরে এসো এসো। সকাল সকাল এতো হন্তদন্ত হয়ে এলে কোত্থেকে।

বেড়াতে বেরিয়েছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে বেশ অনেকদূর চলে গেলাম।

কাদের চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল।

তা ভালো কথা। স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দেওয়া ভালো। ব্যায়াম করা ভালো। মুক্ত অক্সিজেন সেবন করা ভালো। তিন তিনটে ভালো কাজই সেরে এসেছ তাহলে। কাদের চিরদিনই একটু বেশি কথা বলে। তবে মনটা একদমই সাদাসিদে, কোনো প্যাঁচ নেই। নিজেই বলে, আমি জীবনে জলপানিও পাইনি। ডবল প্রমোশনের ধাক্কাও সইতে হয়নি। কথাটা হয়তো সত্যি। তবু ছাত্র হিসেবে দুর্নাম নেই। ভালোয় ভালোয় উতড়ে গেছে এ পর্যন্ত সবগুলোতেই। মাঝখানে কিছুদিন প্রেমেও পড়েছিল, অন্তত সবাই সে কথা বলে। কাদের অস্বীকার করে না, বলে প্রেম নয় পরিচয়। মেয়েটা বয়েসে কম করে হলেও বছর তিনেক বড়। রসায়ন শাস্ত্রের ছাত্রী জোহরা।

ফিরোজ কাগজ পড়ছিল। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, দেখেছিস আজকের এ খবরটা। চোখা উত্তর কাদেরের! খবরের কাগজের খবরে আমার উৎসাহ নেই। আমার ব্লাড প্রেসার না ডায়বেটিস যে খবরের কাগজ নিয়ে চমৎকার সকালবেলাটা মাটি করব? সে খবরের কথা আমিও থোড়াই বলছি। শ্রীমতী কুতুব মিনার যে লন্ডন চলল তার খোঁজ রাখিস?

শ্রীমতী কুতুব মিনার অন্য অর্থে নয়। জোহরা দীর্ঘাঙ্গী। স্বল্পভাষী। বিদুষী, কিন্তু অনিন্দ্য সুন্দরী নয়। গম্ভীর অবয়বে হাসির বিকিকিনিটা কেমন যেন নিক্তি করেই মাপা। কেউ কেউ বলে, মেয়েটা সাইকোলজিক্যাল একটা পারভার্ট। কাদের কিন্তু অতদূর সহ্য করতে রাজি নয়। বলে পারভার্ট কথাটা যেন হাতের মোয়া। কিছু বলতে না পারলেই কথায় কথায় পারভার্ট। নিজে তোরা কি শুনি?

বাবর চুপ করেই ছিল। ফিরোজের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, দে দে হয়েছে আর না।

আরেকটা টান। নে গেল দু’বছর ধরে একটা আস্ত সিগারেট ভস্ম করতে পারলাম না। যা নে। কুতুব মিনারই চললেন, আর সিগ্রেটে তেমন নেশা নেই।

কথা কয়টা বলেই ফিরোজ আরেকবার তাকালো কাদেরের দিকে।

কাদের উঠে দাঁড়াল। একটা জরুরি কাজ বিপন্ন দেখিয়ে বলল, এখন উঠি।

ফিরোজ ডাকল, এখুনি কেন, শোনো শোনো।

কাদের সত্যি উঠে চলে গেল।

বাবর গম্ভীর হয়ে বলল, যা এরকম ভাবে হেস্তনেস্ত করা উচিত হয়নি তোদের, বেচারা রীতিমতো শক্ড।

অনেকদিন আগে কথাটা নিজেই একবার বলেছিল কাদের। রাত্রি এগারোটায় এমন কী জরুরি কথা থাকতে পারে ভেবেই পায়নি বাবর।

ঘটনাটা হয়তো সামান্যই।

সেশনের শুরুতে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস চলছে। বেশি ছেলের ভিড় নেই। তাছাড়া এমনিতেও এ গ্রুপে ছাত্রের সংখ্যা কম। কাদের টেস্টটিউবে নাইট্রিক এসিড ঢেলে ওটা মেশাচ্ছে ডিস্টিল্ড ওয়াটারের সঙ্গে।

পেছন থেকে কে যেন বলল, না না। অতটা নয়। অত ডাইল্যুট করছেন কেন। কমিয়ে দিন।

পেছনে তাকিয়ে দেখল ক্ষীণাঙ্গী একটা মেয়ে। মেয়েটাকে আরও একবার দেখেছে। চোহারাটায় ঔজ্জ্বল্য না হোক লাবণ্য নিশ্চয়ই আছে। বয়েসটা এককথায় আন্দাজ করা মুশকিল। হয়তো উচ্ছ্বাসের কোঠা পেরিয়ে ধৈর্যের পথে ভীরু যাত্রা এ বয়েসে।

অণুবীক্ষণ যন্ত্রে বীজাণু সন্ধানী পারদর্শী চোখ ডিমনস্ট্রেটরের। সবকিছুতেই সতর্ক দৃষ্টি। কাছে এসে বলল, লেডি তোমার ডেস্ক তো এটা নয়।

এরপর দু’চারবার কিছু বইপত্রও বিনিময় হয়েছে ওদের মধ্যে। মেয়েদের হোস্টেলে গিয়ে জোহরার সঙ্গে দেখাও করেছে একদিন। ব্যস ওই একদিনই। কাদেরই কথা বলল প্রথম, কি অত ঢুলুঢুলু চোখ যে। ঘুমুচ্ছিলেন বুঝি।

ঢুলুঢুলু চোখ দেখে শুধু কি ঘুমই বোঝা যায় আর কিছু না?

কাদের কিছু বলেনি।

বাবর হেসে বলল, তুই কি ভাবছিস প্রেম?

কাদের মুখ নিচু করে বলল, কী জানি।

ফিরোজ উঠে পড়ার উপক্রম করে, কি ক্লাস-টেলাস নেই। যাবি নে?

ক্যান্টিনের ম্যানেজার কালুমিয়া। টাকা-পয়সার সঙ্গে সুদর্শন চেহারার বৈরী ভাব যে অনিবার্য, কালুমিয়াকে দেখলেই তা বোঝা যায়।

ফিরোজ চলে গেল।

কালুমিয়া লাল একটা খাতার পৃষ্ঠা খুলে বলল, স্যার আপনারটা কিন্তু অনেক দিন হয়ে গেল।

কালুমিয়ার ওই একটা কথায় সমস্ত সকালটা যেন বিস্বাদময় হয়ে উঠল। তবু বাকির ব্যাপার। মেজাজ দেখান চলে না। বিনীতভাবেই বলল বাবর, নেবেন। ইচ্ছে করে আটকে রাখিনি।

দশটা টাকা আজ না দিলে চলছে না স্যার। আপনার তো প্রায় সাতাশ টাকার ওপর।

দশ টাকা। বিক্রি করলেও আমাকে দশটা পয়সা মিলবে না।

এই আন্তরিক স্বীকৃতি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে কিনা কালুমিয়া বলা মুশকিল। তবু কাঁধের আরবি রুমালটা দিয়ে ক্যাশবাক্সের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলে, আমরাও নগদ কিনে খাওয়াই স্যার। অত অ্যাকাউন্ট বাকি পড়লে দোকান চালাব কী করে। আপনারাই বিচার করুন।

বর্শার ফলকের মতো সুতীক্ষè একফালি রোদ এসে বিঁধল বাবরের চোখেমুখে। পৌনে ন’টার একটা মিষ্টি উত্তপ্ত দাহ নিয়ে পথ অতিক্রম করতে গিয়ে মনে হলো, এ যাওয়া যেন এক কাপ চা খাওয়ার তাড়না নয়। শুধু এক কাপ চা নয়। প্রলুব্ধকর এককাপ চায়ের তৃষ্ণা মেটাবার জন্য এ্যাদ্দুর রোজ না এলেও চলে। চায়ের দামটা মিটিয়ে দিয়ে পেছনে ফিরল না আজ। বাঁয়ের রাস্তা বরাবরই চলল। বুকটা কেমন ঢিপ্ ঢিপ্ করে। রাণু আপা কিছু মনে করবে না তো? দেড় বছরের পাতানো সম্পর্কটা এখনও কি আছে।

ছক কাটা দিনগুলোয় যন্ত্রচালিতের মতো কাজ করে যাওয়ার পরও হয়তো মনের খানিকটা দৈন্য থেকে যায়। একটা সুখী পরিবারের কোনো এক অনন্য সাধারণ মহিলার একটু অনাড়ম্বর আতিথেয়তা, একটু স্নেহ, একটু আদরের প্রত্যাশা নিছকই বিলাসিতা নয়। কথায় কথায় একদিন রাণু আপাই বলছিল বটে, তোর বোন মীনুর ছোটবেলার সখী। জিজ্ঞেস করিস তো.খেপুপাড়ার রাণু মনিকে মনে পড়ে কিনা – যদি দেখা হয়।

বাবর সে কথা জিজ্ঞেস করেনি কোনোদিন। দুয়োর খুলল এসে রাণু আপা নিজেই। এখনও সেই চেহারা। চমৎকার গড়ন। কাঁচা সোনায় গিল্টি করা যেন। মুখটা নির্ভুল জ্যামিতির বৃত্তের মতোই হতো। কিন্তু স্রষ্টার একটু কার্পণ্যের জন্যেই চিবুকটা চাপা। চোখদুটো এত সচল, কোথাও দৃষ্টি স্থির হওয়ার উপক্রম নেই। এই পরিক্রমণশীল আর অনুসন্ধিৎসু চোখের কাছে কতদিন ধরা পড়েছে শার্টের ভেতর যতেœ লুকানো ময়লা গেঞ্জি। জুতোর জোড়া দেওয়া ফিতে, কামিজের ঢিলে বুতাম। রাণু আপার বাঁ চোখের খানিকটা তলায় একটা নিখুঁত তিল। কেমন যেন একটা মায়া জন্মায়। তার ওপর বিধবা। পুরো একটি বছরও স্বামীর সংসার করতে পারল না বেচারি। কোহিনায় বোমা ফেলতে গিয়েছিল ক্যাপ্টেন শরীফ। আর ফিরে আসেনি। রাণু আপা এখনও বিশ্বাস করে সে হয়তো বেঁচে। হয়তো বর্মার জঙ্গলে আটকা পড়ে কোনো মগ্ মেয়েকে বিয়ে করে সুখের সংসার করছে। না আসুক। সুখে তো আছে। পল্টনে গেলে অনেকে ফিরে আসে না, শুনেছে রাণু আপা। তবু যদি কোনোদিন ও আসে, সেদিনের জন্য তোরঙ্গে তুলে রেখেছে সেই গোলাপি রঙের বুটোদার শাড়িটা। ক্যাপ্টেন একদিন উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিল, তোমার বিয়ের শাড়ি। তাই তোমাকে বিয়ের মতো সুন্দর দেখায় ওতে।

হাতে দু’গোছা চুড়ি ছাড়া প্রায় নিরাভরণ রাণু আপা।

এক পলক তাকিয়ে নিয়ে বলল রাণু আপা, আজব ছেলে দেড়মাস ধরে তোর টিকিটি দেখবার জো নেই। বস। ওপরে হা করে কাঠকড়ি গুনছিস?

না, বিনয়ের হাসি নিবেদন করে বলল বাবর, ভালো এমব্রয়ডরি তো! তোমার করা না?

খুব ঠাট্টা করা হচ্ছে! তা তোর বোনের মতো অত সুন্দর পারিনে এই তো। মীনুকে আমরা ছোট বেলায় বলতাম, কাঁথা বিশারদিনী। খুব চটতো জানিস। আমি তখন কতটুকই। ফ্রক পরি।

বড় ভালো লাগে স্মৃতির পেছন পাতার কথা, বলতে বলতে আমেজে রাণু আপার গলাটা তখন কেমন ভারী হয়ে আসে।

সাবানের ফেনায় ঝাঁকিয়ে একটা বৈয়াম পরিষ্কার করছিল রাণু আপা।

দু’গোছা চুড়ি কাচের বৈয়মে ঝাঁকুনি খেয়ে মিষ্টি শব্দ করে উঠল। কাচের চুড়ির একটা মিষ্টি শব্দ আছে এবং সেটা যে এদেশেরই মিষ্টি বাঁশির মতো প্রলুব্ধকর বাবর জানল সেদিন।

বাড়ি গেলি না যে –

এই একটু পড়াশুনো –

পড়াশুনা না হাতি। শহরে এসে খুব পাখা গজিয়েছে। দাঁড়া আমি চিঠিতে সব লিখব।

পাশেই একটা চেয়ারে বসতে যাচ্ছিল বাবর।

রাণু আপা ছুটে এলো। ওতে নয় – ওতে একগাদা ধুলো। বিছানায় বসো।

শুভ্র স্বচ্ছ বিছানায় বসে ক্লান্তির বন্যা নেবে এলো যেন। হোস্টেলের সেই অবিন্যস্ত বিছানা, জীর্ণ তোষক, আর কম্বলের সমারোহশূন্য একটা নিরাভরণ শয্যা। বালিশের ওয়াড়ে পাড়ের সুতোয় বোনা একটা জংলি ফুলের কাজ। এ যেন সেই নিবিড় পরিচ্ছন্ন ঔজ্জ্বল্য ও প্রশান্তিময়ী অনন্যা নারীর গার্হস্থ্য জীবনের মনোমুগ্ধকর প্রতিচ্ছবি।

কখন ঘুমিয়ে পড়ল মনে নেই।

বেলা করেই ঘুম ভাঙ্গলো। ঘুম যখন ভাঙ্গলো তখন বিকেল। একটা মিষ্টি সুর            ভেসে এলো। তন্দ্রাজড়িত অনুভূতি নিয়ে শুনল বাবর, ‘এখন আমার যাবার সময় হলো’ –

মেঝের একটা মাদুর পেতে উপুড় হয়ে গ্রামোফোনে চাবি দিচ্ছে রাণু আপা। একটা আনকোরা সাদা শাড়ি। সূক্ষ্ম মিহি কালো পাড় তাতে। চুলগুলো তেমনি অবিন্যস্ত। সামনে থেকে একবোঝা চুল সরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ঘুম নষ্ট করলাম বুঝি?

নিজেই কেমন একটু লজ্জিত বোধ করল যেন, না। যাই বড় বেলা হয়ে গেল।

ইস, বড় টনটনে তো তোর ভদ্রতা জ্ঞান। ওসব বাড়াবাড়ি যাক, খেয়ে যা।

কথাটা আপত্তি করবার মতো কিছু নয়। কিন্তু সৌজন্য বলে একটা কিছু আছে তো? স্যান্ডেল খুঁজতে খুঁজতে বলল, আরেকদিন হবে খন। থাক না। অনুনয়-বিনয় ঠেকানো গেল না শেষ পর্যন্ত। নিজের হাতেই ভাত বেড়ে দিলো রাণু আপা। নেমকটা পর্যন্ত দিলো পাতের কিনারে। এমন পরিতৃপ্তির সঙ্গে খাওয়া হয়নি যেন একযুগ।

খাবার সময় সারাক্ষণ চোখ নিচু করে রইল। কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। তন্ময় ভাঙল রাণু আপার কথায়, ঝাল বেশি হয়নি তো?

না।

বহু সঞ্চিত আবেগে ভেঙ্গে পড়ল বাবর, চমৎকার রান্না করো তুমি।

বটে! খাবার পর বাসন তুলতে তুলতে বলল রাণু আপা, এলেই পারিস ছুটির দিন। ছাইভস্ম খেয়ে কী লাভ? বাড়িও তো গেলিনে।

কথাটা বলেই ফেলল এবার, টাকা ছিল না রাণু আপা।

একেবারে মন্দও হয় না। কথাটা নিজে থেকেই পাড়ল, আচ্ছা ধরো যদি আমি এখানেই খাই। আর ধরো মেসেও তো দিতে হয়; তোমাকেই না হয় –

কথাটা শেষ করতে পারল না।

জংলা গাছের ঝাড় সরিয়ে রাণু আপা বাসন হাতে চলেছে পুকুর ঘাটের দিকে। কিছুক্ষণ বাদেই ফিরে এলো, কী বলছিলি?

না, কী আর বলব। বলছিলাম বড় দূরে পড়ে যায় কিনা।

তা থাকলেই পারিস। কেউ তো মানা করছে না। আমার তো সারাদিন স্কুল নিয়েই কাটে। তবু একজন ব্যাটাছেলে থাকলে ভরসা। লোক বলতে তো ওই এক লালু। তাও আজকাল সব কাজই করতে হয় আমাকে।

লালু এ বাড়ির চাকর।

দ্বিধাজড়িত কণ্ঠেই প্রশ্ন করল বাবর, তাহলে তুমি?

আমি মানে।

সাহস করে বলতে পারল না। ঘুরিয়েই বলল, আর কোনো কামরা তো দেখছি নে। মোটে তো দুটো।

রাণু আপার সন্ধানী মন যেন অনেক গভীরতায় এসে ডুবুরির মতো ওর মনের কথা জেনে ফেলেছে। একটু থেমে বলল, দেখ, ওসব উপন্যাসের ঢঙে কথা বলিসনে বাপু। তুই কি ভাবিস। আমি বয়সে তোর বড় নই।

লজ্জায় চোখমুখ লাল হয়ে এলো বাবরের। চোখ তুলে চাইতে পারল না। সে দৃষ্টির কাছে যেন এখুনি মোমের মতো গলে পড়বে।

রাণু আপা ব্যস্তত্রস্ত হয়ে ঘরে ঢুকল আবার, আমি একটু বেরুব। তুই বসবি?

কোথায় যাবে?

সামনে মেয়েদের পরীক্ষা। যাই দুটো ক্লাস নেব।

একটা আনন্দের উত্তাপ নিয়ে ফিরল বাবর। এ উত্তাপের কোনো দাহ নেই, শুধু আছে নিছকই একটা অনুভূতি। তা নিয়ে আর কোনো কথাই চলে না। কোনো গানের ভাঁজই তোলা যায় না।

হোস্টেলের দরজা ঠেলে ভেতরে এসে দেখল মবিন ঘুমুচ্ছে এলোপাথাড়ে হয়ে। ভাঙ্গা চিরুনি দিয়ে মাথা আঁচড়াচ্ছিল মহবুব। মুখ না ফিরিয়েই বলল, এলেন তাহলে?

এমন চরম বিরক্তিকর সম্ভাষণে বাবরের মনটা দমে গেল একদম। বলল, তার মানে?

মানে আমরা ভাবছিলাম বুঝি নিরুদ্দেশই হলেন না। বলে, কোথাও যেতে দেখিনে কিনা।

মনে মনে যদিও কি এক দুঃসহ কৈফিয়তের তাড়না বোধ করে তবুও একটু রূঢ় হয়েই মহবুবের কথার জবাব দিলো, তোমার দেখছি আজকাল আমার জন্যে ভারী মাথাব্যথা।

আপনার জন্যে আমার মাথাব্যথা, বিকৃত মুখভঙ্গি করল মহবুব, তা কেন। ওটা কি আর কারও হলেই ভালো দেখায় না?

আর কেউ মানে?

কী করে বলব বলুন। আপনার সুহৃদম-লীর খোঁজখবর জানা কি আমার সাধ্য। তবে নারী হৃদয় বলে একটা বস্তু আছে। শুনেছি বস্তুটা কারও কারও পক্ষে বড় পীড়াদায়ক।

মনে মনে রীতিমতো গর্জাচ্ছে বাবর।

একটু থেমে আবার বলল মহবুব, ও বস্তুতে একটু ঘা দিয়েছেন কি একেবারে আলোড়ন শিহরণ গোছের একটা কিছু ঘটবেই। আমার কথা নয়; এ কেতাবের লেখা।

মাথাটা বেদনা করছিল অসম্ভব। মহবুব সাধারণত এত কথা বলে না। বরং সিনিয়র বলে একটু সমীহই করে চলে।

মবিনের ঘুম ভাঙ্গল। বাবরের দিকে তাকিয়ে হাই তুলে বলল, এই যে রুমমেট দুপুরে যে ফিরলে না।

এক বাসায় গেলাম। সেখানে দেরি হয়ে গেল। আত্মীয়স্বজন খাওয়া-দাওয়া না করিয়ে ছাড়ল না।

মহবুব ফোঁড়ন কাটল মাঝখান থেকে, আত্মীয় না স্বজন কোনটা?

বাবর নিরুত্তর তবু।

বাবরের টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা তুলে নিয়ে বলল মহবুব, তবে তবে না – মাঝে মাঝে যদি বিকেলটা, দুপুরটা, অবশ্যি রাতের কথা বলছিনে, বেশ কাটিয়ে আসা যায় মন্দ কি মবিন সাহেব?

এবার সত্যি ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলল বাবর, প্লিজ একটাই আছে। অভ্যাস যখন করেছ দুটো পয়সা নিজে থেকেই খসাও। বিনে পয়সায় আর কদিন চলে?

ঘাবড়াচ্ছেন কেন, সিগ্রেট নেব না। তাছাড়া ফুঁকার অভ্যেস যখন করেছি, কিছু পয়সা পানিতে ফেলতে পারার মুরোদও ঠিকই আছে।

একটু থেমে আবার শুরু করল মহবুব, আপনার সামগ্রী তো সুরক্ষিতই থাকে। টুথব্রাশ থেকে টুথপেস্ট পর্যন্ত ট্রাঙ্কে বন্ধ করে রাখার অভ্যাস ছিল শুনেছি।

মুখের ওপরেই জবাব দিলো বাবর, ছিল কেন এখনও আছে।

ইকনমি?

যদি বলি তাই।

তাহলে বলব, ব্রাশটা মিছেই রাখছেন আগলে। ম’ম বলছেন একমাত্র সত্যিকার প্রেমিকারই তাদের প্রিয়জনদের টুথব্রাশ দাঁতে ধারণ করতে পারে। কথা কয়টা বলেই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে পড়ে মাহবুব শিশ দিতে দিতে।

মবিন মুখ-হাত ধুয়ে ঘরে ঢুকল। বাবরের তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল, কি আরম্ভ করলে হে। তুমি সিনিয়ার স্টুডেন্ট। তোমার এসব মাইন্ড করা সাজে। সকাল থেকেই মহবুবের মেজাজটা তিরিক্ষি। ক্লাস টেস্টে এক পেপারে নাকি একদম গাড্ডু মেরেছে।

একটা বই নিয়ে বসল বাবর। সত্যি মহবুবের কথায় অতটা রাগারাগি করা ভালো হয়নি হয়তো। কেমন একটু অনুতপ্ত হলো মনে মনে। কি আশ্চর্য, দশ মিনিট ধরে একটা পাতাই দেখছে অনর্গল। একটা পাতায় আঠারোটা লাইন। প্রতি লাইনে ষোলোটা শব্দ। সব মিলিয়ে কেমন একটা অদ্ভুত জটিলতা। মবিন কাপড়চোপড় পরে বাইরে যাবার উপক্রম করছিল। বাবরকে বসে থাকতে দেখে বলল, চলো হে ব্রাদার ঘুরে আসি। সন্ধেবেলা মিছিমিছি ঘরকুনো হয়ে বসে থাকবে কেন? ভালো কথা, আজকের মিটিংয়ে যাবে না।

তন্ময় ভাঙ্গল বাবরের, আজকেই নাকি?

হ্যাঁ বাবা, আজকেই। শুরুও হয়ে গেল বোধহয়। চলো চলো।

ক’দিন ধরে হোস্টেলে সুপারের অত্যাচারটা নতুন করে বেড়েছে। কলেজের প্রিন্সিপ্যালের গোঁ-ধরা লোক। উঠতে-বসতে ইয়েস স্যার, নো স্যার। ইদানীং, হোস্টেলের ছেলেদের ভালো করার শখটা ভদ্রলোককে অপ্রত্যাশিতরকম ভাবে পেয়ে বসেছে।

কর্তৃপক্ষের প্রথম চোটটা এসে পড়ল ফিরোজের ওপর। ওর অপরাধ কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়েই ও জালালপুরে এক জনসভায় বক্তৃতা করে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কঠোর সমালোচনা হয়েছে সে-সভায়। রিপোর্টটা সুপারই তুলল প্রিন্সিপ্যালের কানে।

তারপর গভর্নিং বডির হুকুমমাফিক এক কলমের খোঁচায় বেচারা এক বছর সাসপেন্ড।

কাল এই নিয়ে হইচইও হলো মেলা। ছাত্রদের এক প্রতিনিধিদল প্রিন্সিপ্যালের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। সঙ্গে বাবরও ছিল, প্রিন্সিপ্যাল কোনো কথা শুনতে নারাজ।

আজকের ছাত্রসভাটা মূলত এই নিয়েই। কলেজের নতুন বাচ্চা ছেলেদের তোখোড়টাই বেশি। বক্তৃতামঞ্চে দাঁড়িয়ে ফার্স্ট ইয়ারের একটি ছেলে কবিগুরুর একটা কবিতাই আবৃত্তি করে ফেলল, ‘অন্যায় যে সহে, অন্যায় যে করে’ – ইত্যাদি।

প্রস্তাবটা বাবরেরই ছিল। একটা ইউনিয়ন গঠন করা দরকার। ছাত্রদের ন্যায়সঙ্গত দাবি কর্তৃপক্ষকে মানতে বাধ্য করার উপায়ই হলো শক্তিশালী ইউনিয়ন গঠন করা। ইউনিয়ন হলে ছাত্রদের দাবিদাওয়া তার মারফতই জানানো হবে।

ভালো ছেলেদের দল প্রস্তাবটায় প্রথমত ঠিক সায় দিতে পারল না। তাদের কেউ কেউ আপত্তি তুলল, ইউনিয়ন হলেই বছর বছর চাঁদা তুলে সেই পয়সায় ফ্ল্যাশের আড্ডা বসবে। সুতরাং –

ভালো ছেলেদের ওজর আপত্তি টিকল না শেষ পর্যন্ত। ঠিক হলো এ সম্পর্কে আলোচনা চালাবার জন্যে চারজন ছেলে কাল আবার প্রিন্সিপ্যালের সঙ্গে দেখা করতে যাবে। নেতৃত্ব করবে বাবর। মবিনের নামটাই প্রস্তাব করা হয়েছিল গোড়ায়। কিন্তু মবিনের তাতে ঘোর আপত্তি। সামনে ল’ ফাইনাল। কাজেই –

মিটিং থেকে ফেরার পর বড় অবসন্ন মনে হলো। কাদিম বাজারের খোলা মাঠটায় এসে বসল খানিকক্ষণ। বর্ষার মরসুমে এখানে বড় ফুটবল ম্যাচ হয়। মফস্বল থেকে বাছাই করা টিম আসে। শিল্ডটা বগলদাবা করে নিয়ে চলে যায়। কলেজের টিম ফি বছরই হারে।

হোস্টেলের জীবনটা মাঝে মাঝে অসহ্য মনে হয়। সেই কেমন বর্বর, কর্কশ আর বিরক্তিকর। নানা ছাঁচের লোক। নানা ঢঙের লোকজন। বিচিত্র রুচি। মনের দিক থেকে একটা দ্বন্দ্বময় জগৎ যেন। ঠিক কি আবর্জনা স্তূপের মতো প্রচ্ছন্ন জীবন কাটিয়ে দেবে বাকি যদ্দিন আছে এখানে?

হোস্টেল ছেড়ে নতুন আস্তানায় গেলে স্বস্তি পাওয়া যাবে হয়তো। কিন্তু স্বস্তিটাই কি বড় কথা। এই একটু হালকা গম্ভীর, তিক্ততা বিদ্বেষ অভিমান আর ঈর্ষার বিকি-কিনিটা যদি নাই থাকে জীবনে তবে আর থাকে কী? জীবনটা কি শুধুই একটা পড়ার টেবিল, একটা নিরামিষ চৌকি আর তোষকের মতো অনিবার্য মিথ্যে হয়ে যায় না।

প্রিন্সিপ্যালের কাছে গেছল আজ সকালে দু’বার। কোনো কথাই শুনতে রাজি নন তিনি। ছেলেরা এসেছে পড়াশুনা করতে, ইউনিয়ন দিয়ে হবে কী? নিরন্তর বোঝাবার চেষ্টা করেও প্রিন্সিপ্যালকে রাজি করানো গেল না। ফিরোজের বহিষ্কার-আদেশ কোনোমতেই তুলে নেওয়া যাবে না। গভর্নিং বডির মত নিয়েই এসব করা হয়েছে।

বরং দুটো সদুপদেশ দিয়েই বিদায় করতে চাইল প্রিন্সিপ্যাল। নিজে তিনি মানুষ হয়েছেন অনেক দুঃখে-কষ্টে। দুবেলা ছাত্র পড়িয়ে কলেজের পড়াশুনা তৈরি করতে হতো। কিন্তু তখন আজকালকার মতো কথায় কথায় ছেলেরা মাস্টারদের মুখের ওপর তর্ক করত না। বুঁদ হয়ে বসে থাকত লাইব্রেরিতে চব্বিশ ঘণ্টা।

ছেলেরা উঠে পড়ল। যাবার মুখে বাবরের দিকে তাকিয়ে বললেন প্রিন্সিপ্যাল, তুমিই বুঝি রিং-লিডার এসবের?

তার মানে স্যার?

তার মানে কলেজের ছেলেদের ক্ষেপিয়ে বেড়াচ্ছ, সোজা কথা। তোমাকে ওয়াচ করা হবে। ক্লাস, রোল নম্বর?

বাবর ক্লাস ও রোল নম্বর বলল।

রাত এগারেটা পর্যন্ত ডাইনিং রুমে এ নিয়ে তুমুল তর্ক-বিতর্ক। কাল থেকে স্ট্রাইক, যতক্ষণ না ইউনিয়নের দাবি মেনে নেওয়া হচ্ছে।

বাবরকে আসতে দেখে চেঁচিয়ে উঠল মবিন, কাল স্ট্রাইক তো কমপ্লিট?

কমপ্লিট।

ডাইনিং রুমে খাবার উপকরণ নিয়ে রোজই একটা হাঙ্গামা হয়। আজ হলো না। হোস্টেলের দেয়ালে পোস্টার পড়েছে। আলোচনা সেটা নিয়েই।

একজন খাওয়া থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, ডাগর ডাগর হাতের লেখা কার রে?

মবিন চটে যায়, তোরা শালা বড় মীন। স্ট্রাইকের পোস্টার, তাও কে লিখেছে?

না বলছিলাম মেয়ে টেয়ের লেখা হবে হয়তো।

তাতে হয়েছে কী? তর না সয় ওখানটায় গিয়ে দেয়ালে মাথা খুঁটে মর। আর তা না হয় যেমন অভ্যেস আছে ব্লেড এনে অক্ষর কেটে নিয়ে গলা-তাবিজ করে ঘুরে বেড়াও।

ছেলেটা আর কোনো কথা বলল না।

মহবুব বসেছিল পাশাপাশি। খাবার ব্যাপারে ওর আগ্রহটা বরাবরই আন্তরিক। বাবরের মুখের কাছে ঝুঁকে এসে গলা নাবিয়ে মহবুবকে দেখিয়ে বলল মবিন, না ভালো মনে হলো না এ্যাটিচিউডটা ওদের।

প্লেট থেকে মুখ তুলে সবাই একবার করে তাকাল মবিনের দিকে।

বাকি কথা ক’টা চড়া গলাতেই বলল, অনেক ডেভেলপমেন্ট হয়েছে, খোঁজ রাখ?

কাদের কথা বলছ, এমন একটা উত্তেজনাময় প্রসঙ্গেও প্রায় উত্তেজনাশূন্য হয়ে জিজ্ঞেস করল বাবর।

প্রচুর পরিমাণ ভাতের সঙ্গে তরকারি ঢেলে নিয়ে মাখাতে মাখাতে বলল মবিন, একটা ক্লিক আছে ভাই। সায়েন্স গ্রুপ জয়েন করবে না বোধহয়।

কাদের চোখ বড় করে বলে, কী করবে না? আউট করে দাও। একদম আউট।

এপাশ-ওপাশ করেও ঘুম এলো না। রাণু আপার কথা ভাবছিল বাবর। আজ ও যাবে ভেবেছিল। সকালবেলা কাটল তুমুল উত্তেজনায়। অবসাদপূর্ণ বিকেল এলো। বৃষ্টি এলো এলো করে, তাও এলো না শেষটায়। আবার পাশ ফিরে ঘুমাল বাবর। তন্দ্রাজড়িত কানে যেন শুনল কোথায় কোন নগরে বন্দরে রেলইঞ্জিনগুলো মানুষের মতো পায়ে ভর করে বলছে, চাকা, বন্ধ – চাকা বন্ধ। সেলাই কলের হ্যান্ডেলটা ছোট বাচ্চা ছেলের মতো হোঁচট খেয়ে বলল, সেলাই হবো না, সেলাই হবো না। ওরে সাইকেল চেন খুলে দিস্ ঢিলে করে দিস্। আজ চাকা বন্ধ – আজ চাকা –

সকালবেলা কলেজের দেয়াল ছেয়ে গেল প্রচারপত্রে। ভালো ছেলেরা নাক সিঁটকে বলল, পেয়েছ বাবা স্বরাজ। মরিস সাহেবের আমলে আর যাই হোক ডিসিপ্লিন ছিল। আর এখন –

মরিস সাহেব এই কলেজেরই ভূতপূর্ব প্রিন্সিপ্যাল। কমনরুমে এখনও তার একটা তৈলচিত্র ঝুলছে। সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো। ভালো ছেলেরা সেশনের শুরুতে সেই ছবির তলায় কাষ্ঠফলকে খোদিত মরিস সাহেবের অমর উক্তি খাতায় টুকে নেয়। উক্তিটার বাংলা তরজমা এই, ‘প্রথমেই শৃঙ্খলা, দ্বিতীয়ত শৃঙ্খলা, শেষেও শৃঙ্খলা।’ মরিস সাহেবের আমলে এ কলেজ থেকে যারা বেরুত, তারা সব ছিল দিগ্গজ। জ্ঞানের বুক ডিপো হয়ে অনেকে থিসিসও লিখেছে। প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি পেয়ে কানেকটিকাটে চাকরি করতে গেছে। মরিস সাহেবের কড়াকড়ি ভালো লাগেনি কেবল একজনের। সে খগেন মিত্তির। ময়ূরভঞ্জের রাজপরিবারের সঙ্গে কী যেন ছিল তার দূর সম্পর্কের একটা আত্মীয়তা। মরিস সাহেবের অসন্তোষভাজন হয়ে সেই খগেন মিত্তির ফেল করল, কলেজ ছাড়ল। কিন্তু টাকা করল অঢেল। কেবল পেল না শান্তি। যে বছর ইংল্যান্ড যাবে সে বছর হলো স্ত্রী বিয়োগ। যে বছর সাগর পাড়ি দিয়ে ফিরে এলো সে বছর তার ছেলে কানাই বিয়ে করে ঘরে আনল এক বারবনিতা। খগেন মিত্তিরের খান্দানি রক্ত, মরিস সাহেবের রক্তচক্ষুকেও যে পরওয়া করেনি। সেই খগেন মিত্তির সত্যি সত্যি পরদিন টোটাভরা বন্দুক নিয়ে করল আত্মহত্যা। পরে অবশ্য কানাইয়ের মতি ফিরল। বাবার নামে একটা বড় ঘড়ি বসাল কলেজের পানির ট্যাঙ্কের ওপর। অবশ্য এসবই জনশ্রুতি। নয় কেবল ঘড়িটা। আজও সেটা তেমনি গুরুগম্ভীর মন্দ্রে বাজছে।

প্রচারপত্রে এক কথা – ইউনিয়ন মেনে নিতে হবে। এছাড়া কোনো আপোষ নেই। কাগজের অক্ষরে অক্ষরে উজাড় করা দাবির অঙ্ক।

প্রিন্সিপ্যাল ডক্টর কলিমের ভাঙাচোরা গাড়িটা এসে থামল কলেজের বারান্দায়। কেমন একটা থমথম উদাস ভাব। নাল লাগানো জুতোর শব্দটা আজ যেন বেড় বেশি করে শ্রুতিগোচর হলো। ড. কলিম শুষ্ক সিঁড়ি ভাঙ্গছে এক এক করে। প্রথমেই চোখ পড়ল একদল কর্তব্যপরায়ণ অধ্যাপক। কর্তব্যের তাগিদেই তাঁরা সকাল করে এসেছেন আর সব দিনের মতো। ছোকরা লেকচারার শওকতের চোখেমুখে কেমন একটা কুঞ্চন, একটা বিরক্তি। প্রিন্সিপ্যালকে অনুসরণ করতে করতে ফিসফিস গলায় বলল, খামাখা একটা হাঙ্গামার কী দরকার ছিল স্যার। মেনে নিলেই হতো।

ভাইস প্রিন্সিপ্যাল রক্তচক্ষু করে তাকালেন। বাকি কথাটা বলতেই পারল না শওকৎ। মাত্র চার মাস কাজে এসেছে, এখনও কনফার্ম হতে ঢের দেরি। অধ্যাপকদের মিছিলটা শেষ হলো গিয়ে প্রিন্সিপ্যালের খাস কামরায়। ওপরে পাখা ঘুরছে। সেই আদ্যিকালের মরিস সাহেবের শৃঙ্খলাপরায়ণ পাখা। যেটুকু না ঘোরে তার চেয়ে বেশি স্ফুলিঙ্গ ছড়ায়। পুরোন বলে কেমন একটা খসখস আওয়াজ সারাক্ষণ।

নাকের ডগা থেকে বিরক্তিকর চশমাটা খুলে নিয়ে প্রিন্সিপ্যালই বলল প্রথম, তাহলে সিচুয়েশনটা কী?

সুপার কোটের পকেট থেকে একটা লম্বা কাগজের ফর্দ বার করল। কাগজটা বার দু’চারেক পড়ে নিয়ে বললেন, কাল বারোটায় একটু হইচই শুনলাম। কিন্তু তাতে করে তো তেমন কিছু হবে মনে করিনি।

পেপার ওয়েটটা টেবিলে ঠুঁকে বললেন প্রিন্সিপ্যাল, আপনাদের মতো ইয়াংম্যানদের ওপর আমার অশ্রদ্ধা জন্মে গেছে। কী করে সামান্য ক’টা ছেলেকে কন্ট্রোল করতে হয় তাও জানেন না।

সুপারের পক্ষ সমর্থনের আশাতেই হয়তো বলল শওকৎ, ওরকম সিচুয়েশনে সুপারই বা করবে কী?

চার ঘণ্টা একরোখা মিটিং চলল। মাথা ভাঙ্গাভাঙ্গি চিৎকার ও হই-হুল্লোড়ের পর প্রিন্সিপ্যালের ঘরের দরজা খুলল। শওকৎ রুমালে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বেরিয়ে এসে বলল, ননসেন্স। 

দু’চারটে ছেলে তাকেই এসে ঘেরাও করল, কী হলো স্যার। হোপ আছে?

ফিফ্টি ফিফ্টি।

শওকতের সঙ্গে মন খুলে আলাপ করায় অসুবিধে নেই। ফার্স্ট ইয়ারের একটা ছেলে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, মেজর ডিম্যান্ডগুলো মেনে নেবে তো?

ইন্ডিকেশান প্রায় সে-রকমই।

কথা ক’টা বলেই বারকয়েক এদিক-সেদিক তাকাল শওকৎ, যাও যাও ভিড় করো না এখানে, প্রিন্সিপ্যাল দেখলে বিচ্ছিরি ব্যাপার হবে।

সিঁড়ি দিয়ে নাবতে নাবতে ছেলেরা বলল, তাহলে আমরাই জিতে গেলাম।

থ্রি চিয়ার্স ফর –

সমস্বরে চিৎকার করে উঠল হিপ্ হিপ্ হুররে –

ত্বরিতগতিতে প্রিন্সিপ্যাল বেরিয়ে এলেন কামরা থেকে। শওকতের দিকে চোখ পড়তেই বললেন, আঃ একটু কমনসেন্স নেই।

কেউ যেন আর বাকি নেই। মেলা ছেলে এসে জড়ো হয়েছে বড় সিঁড়ির কাছে, কী হলো স্যার, কী হলো স্যার?

প্রিন্সিপ্যাল ব্যস্তকণ্ঠে বললেন, আঃ থামো না বাপু। সব এরকম নেকড়ের মতো আওয়াজ তুললে কেন?

ওপরে একটা ভেড়া রয়েছে যে স্যার –

মন্তব্যটা অবশ্যি নেপথ্যেই মনে হলো।

খাপ থেকে চশমা বার করে রুমালে মুখ মুছলেন ড. কলিম। হরিবাবু ফাইলটা এনে ধরল। ভাইস প্রিন্সিপ্যাল কলমটা দিলো বাড়িয়ে। পাঁচ মিনিট সতর্ক দৃষ্টির পর প্রিন্সিপ্যাল তার মন্তব্য জানালেন, তোমরা আমার ছেলের মতো। যেসব দাবি আমাকে জানাতে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো যথাসম্ভব সতর্কতার সঙ্গে আমরা বিবেচনা করে দেখেছি। আমরা তোমাদের শুভাশুভের অভিভাবক। তোমরা জানো, এই কলেজের সাঁইত্রিশ বছরের ব্রিলিয়েন্ট রেকর্ড। মরিসনের আমলে এ কলেজের সীতেশ দস্তিদার আই. সি. এসে প্রথম হলো। মীর্জা গোলাম আহমদের নাম তোমরা শুনেছ, তিনিও এ কলেজেরই ছাত্র। সুতরাং কলেজের সুনাম ও যশ ক্ষুণœ হতে পারে এমন কিছুতেই আমি রাজি হতে পারি না। তবে ছাত্রদের শৃঙ্খলাবোধের পরিচয় পেলে, তাদের ভুলত্রুটি তারা স্বীকার করে নিলে আমি ইউনিয়ন গঠনের প্রস্তাব বিবেচনা করে দেখব। তোমাদের মধ্যে থেকে দু’জন কাল আমার সঙ্গে অফিসে দেখা করো।

ছাত্রেরা উল্লসিত হয়ে উঠল। প্রতিবাদের সুর তুলল যারা, তাদের গুঞ্জন ছাপিয়ে সমস্বরে চিৎকার উঠল, ‘আওয়ার প্রিন্সিপ্যাল – হিপ্ হিপ্ হুররে।’

প্রিন্সিপ্যাল আবার উঠে দাঁড়ালেন। ছেলেরা চিৎকার বন্ধ করল।

আরেকটা কথা। শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য আমি হোস্টেলের কতগুলো পেশাদার ছেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব ঠিক করেছি। হরিবাবু, লিস্টটা পড়ে দিন।

এক এক করে সাতজনের নাম পড়া হলো। এদের আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে হোস্টেল ছাড়তে হবে। এক বছর এরা সাসপেন্ড।

বাবর বিশ্বাস করতে পারল না, এই সাতজনের একজন সেও কী করে হয়।

হোস্টেলে ফিরে এসে ধুপ করে বসল বিছানায়। হোস্টেল ছাড়তে হবে এ একদম পাকা কথা। টেবিলের ওপর চোখ বুলোতেই নজরে পড়ল, একগাদা বই, কাগজপত্তর, আয়না চিরুনি, গ্লাস, একটা সাবান। ধাঁধার ছাকের মতো ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। তোষকটা ওল্টালে দেখা যাবে একগাদা চিঠি, দরকারি-বেদরকারি কাগজের টুকরো, ধুলো জমে আছে হয়তো। এসব নিয়ে, এসব মিলিয়ে তার ছোট নিরপরাধ জগৎটা ছিল বশ মানিয়ে। কেমন পরিচিত একটা পরিবেশ। হাত দিলেই যেখানে দেয়ালের সুইচের নাগাল পাওয়া যায়, চেয়ারে হেলান দিলেই হাত বাড়িয়ে মহবুবের টেবিলের ওপর থেকে দেশলাইটা চেয়ে নেওয়া যায়। মাপজোক করা – প্রয়োজন অপ্রয়োজনের গ-ি চারপাশে।

এসিস্টেন্ট সুপার কেবল বয়েসেই কাঁচা তা নয়। কথাবার্তায়ও কেমন একটু বেসামাল। নতুন-চাকরি পাওয়াদের থাকে, যেমন একটা টনটনে কর্তব্যবোধ তেমনি একটা অতি সতর্ক সদা সাবধান মনোভাব। দরজা ঠেলে ঢুকেই বলল, আজই সন্ধ্যায় ভ্যাকেট করবেন কিন্তু। নইলে কৈফিয়ৎ দিতে আমার আবার প্রাণান্ত হবে।

বাবর কথা বলল না। শুধু একবার তাকাল।

আপাতত রাণু আপার ওখানে ওঠা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। একটা কথা মনে হতে কেমন একটু দমে গেল। বাক্স-পেটরা নিয়ে গবেটের মতো দরজায় হাঁ করে দাঁড়িয়ে থেকে করুণার সঞ্চার করবে। রাণু আপা, প্রথম বিস্ময়ের ধাক্কা কাটিয়ে উঠে হয়তো ভদ্রভাবেই বলবেন চলে এলি। ভালোই করেছিস।

বাবর হয়তো এরকম অকস্মাৎ আবির্ভূত হওয়ার কারণও দেখাবে এবং সেটা নিজকেই হবে একটা খোঁড়া অজুহাত। বলবে জায়গার সন্ধান আছে, পেলেই চলে যাবে।

চিঠিপত্তরের জঞ্জাল ঘাঁটতে গিয়ে হাত থেকে এক টুকরো কাগজ বেরিয়ে পড়ল। নীল চিরকুট। তুলে নিয়ে দেখল আঁকাবাকা হাতের লেখা। ইংরেজি সন তারিখটাও যদি লিখতে পারত ভালো করে। একযুগ আগে লিখে পাঠিয়েছে – পারুল, মাসিক ‘সাহিত্যসুধা’ পত্রিকার ‘গ্রাহীকা’ করে দেবার জন্যে। অনেক বলেও, কাগজের ঠিকানা জোগাড় করতে পারেনি। প্রথম যেন ষান্মাষিক করে। ‘টাকার জন্য চিন্তা করিবার কারণ নাই। লিখিলে ফেরৎ ডাকেই পাঠাবার বন্দবস্ত’, করবে।

কী মনে করে চিঠিটা একবার পকেটে পুরল। পরক্ষণেই আবার ওটা কুটি কুটি করে ছিঁড়ে ফেলে দিলো।

চুল ছেড়ে কাপড় নাড়ছিল রাণু আপা। মেয়েদের সৌন্দর্য যারা বলে শুধুমাত্র               স্নানে তারা ভুলই বলে। সারাটা দুপুর কাটে হেঁসেল ঘরে। দুপুরে গলদঘর্ম হয়ে আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে সোজা চলে পুকুরঘাটে। এক ঝলক স্নিগ্ধ হাওয়ায় দাঁড়ানোও হয় না। বেলা পড়ে আসে। সারাদিনের ব্যস্ততার পর যা একটু আলসেমি, তা যেন পুকুরঘাটেই। স্নানের পর চুলের বোঝা আলতো করে ঘাড় বরাবর নাবিয়ে মিহি পানির ছাঁটে এর-ওর নাকে চোখে ঝাপটা দিতে দেখেছে যে, সে অন্তত মনে মনে বলবে, এ সৌন্দর্য বাংলাদেশের আশ্চর্য দুপুরের এমনি এক ছবি, যাকে মনে তুলে রাখা যায় কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও ভুলে থাকা যায় না। কুঁজো হয়ে সাপের মতো জট পাকিয়ে নেয় শাড়িটা দু’হাতে। লম্বা শাড়ির গা ভেঙ্গে ভেঙ্গে ঝরে মুক্তোর মতো পানি।   

চোখাচোখি হতেই রাণু আপা বলল, বেশ করেছিস। এদ্দিন বললাম, ওসব হোস্টেল ফোস্টেল ছাড়, সে কথা কানে তুললে তো।

অপ্রত্যাশিত মনোরম ব্যবহারে উচ্ছ্বাসের একটা আতিশয্য আছে এবং এক্ষেত্রে সেটা ঝড় হয়েই নেবে এলো। ওভাবে আর খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে, বিনয়ে আর কৃতজ্ঞতায় ভেঙ্গে পড়ত বাবর।

রাণু আপা ঘরে ঢুকল। টুকটাক্ জিনিসপত্তর গুছিয়ে নিল। চৌকির ধূল ঝেড়ে তোষকটা বিছাতেই কী মনে করে জিজ্ঞেস করল, দক্ষিণে মাথা দিস্ তো?

ও একদিকে দিলেই হলো। আমার ওসব বাছবিচার নেই।

তা তো নেই; কিন্তু এই রাজ্যির ময়লা কাপড়। উঃ কি এক ভূতের কারখানা এই হোস্টেলগুলো।

ঘরে ঢুকে দেখল বাবর, ছোট্ট ত্কতকে একটা বিছানা। বারান্দার পেছনে যে কামরাটা সেখানেই ওর থাকবার ব্যবস্থা। ঘরে ঢুকে মনে হলো মাইকেল এ্যাঞ্জেলা যেন তাঁর তুলি বুলিয়ে গেছে একটা সদ্য নতুন ক্যানভাসে। টেবিলের ওপর বেলওয়ারির গ্লাসে ঠান্ডা পানি। কাপড়গুলো গুছানো আলনায়। আয়নাটা পর্যন্ত কাৎ করা – সামনেই চিরুনি।

ঢক্ ঢক্ করে খানিকটা পানি সাবাড় করল।

আঃ কী হচ্ছে, দুপুরবেলা। খাবিনে? যা তো ডুব দিয়ে আয় ততক্ষণ।

আমি খাবারটা দেখি।

বাবর স্নান করতে গেল।

নরম বিছানা আর দক্ষিণের জানালা খোলা বলেই হয়তো সারাটা দুপুর একটানা ঘুমুল। চোখ খুলল যখন, তখন সন্ধ্যা। রাণু আপার হাতে একটা লণ্ঠন। খুব ঘুমুলাম না?

বাবাঃ ঘুম বটে। না, খুব আর কই। মোটে তো সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা।

মনটা বেজায় হালকা বোধ হলো। ঘুমের ওপর দুঃস্বপ্নের একটা বোঝা নাবিয়ে, নতুন একটা সমারোহপূর্ণ সন্ধ্যার উদয় হলো যেন। ঠিক এমন সময় ভুলে যাওয়া যায়, কাল কী হবে, কাল কী হয়েছিল আর আজ কী হতে পারত? হাস্নাহেনার দিগন্তবিস্তারি মিষ্টি সৌরভ ভেসে এলো বাতাসে। একটু একটু করে আঁধার নাবছে। তারার মালায় সাজান আকাশ দেখাল হীরের বুতাম পরানো ব্লাউজের মতো। কবি হলে আরও বাড়িয়ে বলতে পারত পোশাকটা চতুর্দশী চাঁদের অর্ডার দেওয়া। অভিসারে যাবেন তিনি।

পাশেই রান্নাঘর। মাঝে মাঝে বিরতিহীন স্তব্ধতার বুক ফুঁড়ে অত্যাবশ্যকীয় কাজকর্মের নিস্তেজ কোলাহল, নইলে প্রাণের সাড়া নেই কোথাও; কড়ায় তেল ফুটছে, তেলে ডাল ঢালা হচ্ছে, এমনি প্রাত্যহিক প্রয়োজনে বেসুরো চিৎকার মাত্র।

এমন সন্ধ্যার কথা মনে করেই কি কল্পনা করেছিলেন কবিগুরু,

‘সন্ধ্যা রক্তরাগ তন্ত্রীতলে হয় হোক নীল

শুধু থাক একবিন্দু নয়নের জল’ –

বেশ খোলা হাওয়া। বারান্দায় বেতের চেয়ারটা টেনে নিয়ে সেখানে বসল। খোঁপায় ফুলের গুচ্ছ দিতে দেখেনি কোনোদিন রাণু আপাকে। বড় ভালো লাগলো আজ। বাবর ডাকল, রাণু আপা –

অতর্কিত নারীকণ্ঠে প্রত্যুত্তর এলো, আমাকে বলছেন।

বেশ খানিকক্ষণ বিরতি নিয়েই বলল বাবর, না, মাপ করবেন চিনতে ভুল করেছিলাম। ভেবেছিলাম বুঝি রাণু আপা –

তিনি রান্নাঘরে।

লজ্জায় লাল হয়ে গেল না, বিস্ময়ে ভেঙ্গে পড়ল না, অপ্রত্যাশিত রকম বিনয়ে নুয়ে পড়ল না, অথচ বাংলাদেশেরই মেয়ে। অবাক হবারই কথা।

অবাক হয়েই পরের কথাটা বলল বাবর, আপনি বুঝি প্রায়ই আসেন।

প্রায় আর সময় পাওয়া যায় কই বলুন। রাতদিন তো শুধু ক্লাস আর ক্লাস।

তাহলে আপনি –

বাবরের অনুমানের প্রতীক্ষা না রেখেই বলল মেয়েটি, ডাক্তারি পড়ি।

ডাক্তারি। হ্যাঁ ডাক্তারি পড়ার আমারও কিন্তু ভয়ানক ঝোঁক ছিল একসময়। কিসে গেল সে শখ?

না, শেষটায় হলো না আর কি। আর তাছাড়া পরিশ্রম করা আমার ধাতে বিলকুল সয় না।

মেয়েটা ঠিক অনুপম সুন্দরী না হলেও, সুন্দরী বটে। মেহেদি রঙের শাড়িতে মানিয়েছে অদ্ভুত। মুখটা জ্যামিতিক বৃত্তও নয়; আবার তেমন লম্বাটেও নয়। সুঠাম দেহ। কানে নকল পাথরের দুটো ইয়ারিং। হাত দিয়ে নাড়িয়ে দিলে গ্যালিলিও-র দোলকের মতোই দুলত।

অনেকক্ষণ কথা হয়নি দেখে বাবরই বরফ ভাঙ্গল, দাঁড়িয়ে যে, বসুন না।

ভালো লাগছে তাই।

কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না কিছু। কপালে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, জানেন আপনারা তো ডাক্তার মানুষ বলতে পারেন বিকেলটা হলেই গা’টা কেন ছম্ ছম্ করে। এখনও – হ্যাঁ – বেশ গরমই মনে হচ্ছে।

মৃদু হাসি হেসে বলল মেয়েটি, মাপ করবেন। সবেমাত্র হাতেখড়ি। নাড়ীর গতিচাঞ্চল্য দেখতে অনুরোধ করবেন না এরপর নিশ্চয়। মাত্র ফার্স্ট ইয়ার।

কী একটা বলতে যাচ্ছিল বাবর। রাণু আপা এসে গেল, কুঁজোর মতো ঘরে বসে আছিস এই ভরা সন্ধ্যায়। তারপর মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল, কে মুক্তা? কখন এলি…

এই তো খানিকক্ষণ।

আমি নিজেই যাবো ভেবেছিলাম একবার। তাহলে সেটা দেখলি?

না রাণু আপা, ভুল তুমিই করেছ –

ঔৎসুক্যে জিজ্ঞেস করে বসল বাবর, কী ব্যাপার রাণু আপা –

না রে কিছু না, তুই বুঝবিনে ব্যাটা ছেলে। প্রজাপতি প্যাটার্ন তুলতে ক’টা ঘর বাদ দিতে হয়, তাই জিজ্ঞেস করছিলাম।

দু’জনের দিকে শুষ্ক করুণ দৃষ্টি নিয়ে বলল বাবর, ও।

কলেজে ঘুরে এলো আজও, কিছু হবে না। প্রিন্সিপ্যালের ধনুর্ভঙ্গপণ। কলেজকে পেশাদার রাজনীতির আখড়া করা হবে না। কলেজের লোহার গেটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখল বাবর, আশ্চর্য। ঝড়ের কোনো পূর্বাভাসই যেন নেই। তেমনি নিয়মের বন্ধন; হাতঘড়ি দেখে কলেজের সিঁড়ি বেয়ে যে যার ক্লাসে ঢুকে পড়ছে। সেনের ক্লাস না খানের ক্লাস, তা নিয়ে হয়তো সামান্য একটু বচসা। তাও খানিকক্ষণের জন্যে। ভালো ছেলেদের মলাটে রুটিন লেখা। তাদেরই একজন খাতা দেখে বলে দেয়, আজ মানডে সেনের ক্লাস আবার কই।

কলেজের পুরোন বটগাছটার বয়েস নাকি কম করে হলেও একশ বছর। মাটির বুকে একটা মস্তবড় জুতসই ছায়া ফেলার বাহাদুরি ছাড়া এ গাছটার জীবনের হয়তো আর কিছুই নেই। থাকলে বেচারা কাঠ হয়ে চুল্লির খোরাক হতে পারত। কিন্তু বটগাছটাই আছে। মাঝে মাঝে গাছের বল্কল সরানো। কোথাও একটা সতীক্ষè বাণবিদ্ধ হৃদয়ের প্রতিকৃতি। কতই আঁকা হয়েছে; মোছা হয়ে গেছে। ছায়ার নিচে বসল বাবর, থার্ড পিরিয়ডের পর কেউ কেউ ফিরবে। কথা বলে মনের                            ক্লান্তিটা নাবানো যায় যদি খানিকটা। হাল্কা হাল্কা হাওয়া এসে বুকের দাহ শীতল              করে দিয়ে যায়। ধৈর্যের বান ডেকে চোখদুটো বুজে আসতে চায়। তারপর ঘুমই হয়তো পায়; হঠাৎ চমকে উঠে পড়ে। গাছের গুঁড়িতে লাল পিঁপড়ে। কামড়ালে জ্বালা করে বড়।

বাবরের প্রথমবারের মতো মনে হলো একটা সেশন চলে যাচ্ছে। আর তিন মাস পর, আদোল বদলে যাবে আরও। পরীক্ষার সাফল্যের শীলমোহর নিয়ে কেউ প্রেমের বন্ধন দৃঢ় করবে। কেউ পাড়ি দেবার সংকল্পে বিভোর হয়ে যাবে। মাধুর্যময় এ জীবনকে রক্তচক্ষু দেখিয়ে বড় বড় তক্মা পরে কেউ হবে ভাগ্যের বরপুত্র। আরদালী চাপরাশির মাথায় তক্মা এঁটে বিকেলে একজন বাচ্চাকাচ্চার হাত ধরে ধুঁকতে ধুঁকতে যাবে। কেউ আবার হয়তো জীবনের চরম আভিজাত্যের লোভ কাটিয়ে উঠতে না পারার গ্লানিতে টি. বি. স্যানাটোরিয়ামে শুয়ে শুয়ে অমাবস্যার ক্ষয়িষ্ণু চাঁদের দিকে তাকাবে শঙ্কাগ্রস্ত হয়ে।

ইমতিয়াজ কখন এসে পাশে বসল। খাতাটা হাত থেকে নাবিয়ে বলল, কী ঠিক করলে?

ঠিক আবার কী করব। লেখাপড়ার কথা বলছ?

হ্যাঁ।

ভেবেছিলাম, হিমালয় অভিযানের কথা বলবে বোধহয়। লেখাপড়ার জন্যে অত দিকদারি আমার ভালো লাগে না।

একটা ভাঙ্গা ডাল হাতে নিয়ে মাটির ওপর দাগ কাটতে কাটতে বলল ইমতিয়াজ, না কিছু একটা করতে হবে তো। এমন করে ক’দিন চলবে?

প্রিন্সিপ্যালের সঙ্গে দেখা করলেও তো পারতে।

কিম্বার্লিতে গিয়ে হীরে তোলার ব্যবসায় করলেও তো পারতাম।

না, পারতে না। তার জন্য মূলধন চাই। আমি জানি সেটা তোমার নেই। থাকলে এমন করে কাটাতে না।

চোখের সামনে ভেসে উঠল; বাস্তব ছবি। রাণু আপার ওপর নির্ভরশীলতার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতই হয়তো ইমতিয়াজের কথায়। সত্যি কথা। আত্মীয়তার বন্ধনেও যেখানে দু’ সিঁড়ি এগুবার উপায় নেই সেখানেই মাদুর বিছিয়ে জীবন কাটানো – বিসদৃশ। রাণু আপা আজ করুণা করেন না। কিন্তু করতে তো পারেন। তার স্বভাবসুলভ হাসি মুখে কোনোদিনও একটা বিরক্তির কুঞ্চন উঠবে না, কে জানে? হয়তো মনে মনে ইতিমধ্যেই –

আমি বলছিলাম পারলে চেষ্টা চরিত্র করে সামনের সেশনে –

টাকা নেই। সংক্ষিপ্ত জবাব দিলো বাবর।

বাড়িতে লিখলেই হয়।

লিখলেই আসে না। যদি থাকে, না লিখলেও আসে।

কিছুক্ষণ কথা হলো না। একটা ক্লাস ছিল আধঘণ্টা পরেই। কেমন একটু সঙ্কোচ বোধ করল ইমতিয়াজ আজ এই প্রথমবার ওর কাছে ক্লাসের কথা বলতে গিয়ে। মুখ দিয়ে যেন বেরুল না।

কেন, যাবে না ক্লাসে। আসামির প্রতি জজের প্রত্যক্ষ প্রশ্নের মতোই শোনাল বাবরের তীক্ষè জিজ্ঞাসা।

তোমার সবই ছিল। সিগ্রেট?

থাক্।

বিকেলটা কাটলো ইমতিয়াজের সঙ্গেই। একরকম নিঃশব্দেই বড় রাস্তাটা ধরে চলল দু’জন পাশাপাশি নানা কথা বলল ইমতিয়াজ, জানো একসময় কিন্তু এ এলাকায় রাস্তাঘাট বড় বেশি একটা ছিল না।

আবার খানিকদূর এসে বলল, এখান থেকে রতœপুর যাওয়া যায় স্টিমারে করে। গত বছর যাবো সব ঠিক এমন সময় –

অসমাপ্তই রইল কথাটা।

বাবরও নিশ্চুপ।

নিস্তব্ধ মুহূর্ত অতিক্রান্ত হতে লাগল।

বাবর বলে ফেলল, ক’টা টাকা দিতে পার?

টাকা, ক’টা?

গোটা পাঁচেক।

কী করবে?

সেভিংস ব্যাংক একাউন্ট খুলব না, নিশ্চয়তা দিচ্ছি তোমাকে।

হোস্টেলের কাছে ইমতিয়াজকে বিদায় দিয়ে বাজারের রাস্তা বরাবর হাঁটা শুরু করল। আজ নিজে থেকে ক’টা জিনিস কিনে আনবে। ওর সামর্থ্যে রাণু আপার একটু বিশ্বাস হোক।

মাছের বাজার। ডাঁটা, পুঁইশাক, শাকসব্জির দোকান সবই আছে। জায়গাটা অপরিচ্ছন্ন। অবিরত ব্যস্তবাগিশ লোকদের আনাগোনা। দামদস্তরের হই হাঙ্গামায় মাথা খারাপ হবার জোগাড়। একটা বড় মাছ কিনবে ঠিক করল। অনেক দর কষাকষি করেও আড়াই টাকা থেকে সোয়া দু’টাকায় নাবান গেল না। টিমটিমে আলোয় জেলেরা আষ্টে হাত দিয়ে কড়া নোটগুলো গুনে রাখছে ট্যাঁকে। সামনে একটা ধারাল দা। মাছ কেন, মানুষও খুন করা যায়।

হঠাৎ মনে হলো, এই পাঁচটা টাকা ওর দুর্জয় সঞ্চয়। ধার করা টাকা। জীবনের অনভিপ্রেত সময়ের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ইমতিয়াজ টাকা ক’টা দিয়েছে। আবার কোনোদিন চাইলে আপত্তি দেখাবে হয়তো।

বাজারের রাস্তাটা দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে মনে হলো, থাক থাক – এ টাকা ক’টা থাক।

হাতের মুঠায় টাকা ক’টা দুমড়ে নিয়ে জোর পায়ে পথচলা শুরু করল বাবর।

চাকরিটা সুবিধের না হলেও, বেতনের আশ্বাসটা লোভনীয়। মাসে নব্বুই। খবরের কাগজে প্রুফ রিডারি। সন্ধে থেকে ছ’ঘণ্টা কাজ।

রাতে খেতে খেতে কথা বলল রাণু আপাকে, চাকরি নিলাম।

কেন?

কিছু একটা করতে হবে তো। এমনি বুঝি দিন কাটবে।

কিছু একটা করার জন্যে কেউ যেচে বলেছে তোকে – লেখাপড়া করগে।                 দু’ নৌকায় পা দিলে কোনোটাই হয় না।

বিদ্যের নৌকাটা বোধহয় বানের জলেই ভাসিয়ে দিলাম। চাকরিটাই থাক। ও ক’টা টাকার জন্যে ওসব ছাইভস্ম করে লাভ?

মনে মনে রীতিমতো আহত হলো বাবার চাকরিটার প্রতি মমত্ববোধের এই অনুর্বর ধারণা দেখে।

খাবার পাতে হাত তুলে বলল, বলতে চাও চাকরিটা করা উচিত হয়নি।

রাণু আপা জবাব দিলো না। তরকারির পেয়ালাটা ঠেলে দিয়ে বলল, নিয়ে খাস্, আমি যাই, মাথাটা বড় টন্ টন্ করছে রে।

রাণু আপার তৈরি খাবার আজ বিস্বাদ মনে হলো। তরকারিতে অসম্ভব ঝাল। অনধিকার সামগ্রীতে এই অনধিকার চর্চার জ্বালাটা ক্ষুরধার হয়ে উঠল।

মোটে তো বারোদিন হলো। পাতের ভাত ফেলে মুখ মুছে নিয়ে উঠে পড়ল। পকেট থেকে সেই দুর্জয় সম্পদ বার করে বেরিয়ে এলো বাবর। টাকাটা আজ হাতে হাতেই দিয়ে দেবে।

আগাগোড়া সমস্ত ধারণাটাই নকল রঙের ছোপ মনে হলো। রাণু আপার স্বাগত থেকে এ পর্যন্ত সব জিনিসের একটা কার্যকারণ ব্যাখ্যা পেল। সব সহ্য করবে সে, অনুকম্পায় নয়। তাছাড়া রাণু আপা ওর কেউ না।

টাকা ক’টা দিয়েই দেবে, হাতে হাতেই দেবে, যা থাকে কপালে।

উঠোনে একটা মাদুর বিছিয়ে রেকর্ড শুনছিল রাণু আপা তন্ময় হয়ে। রেকর্ডগুলো স্তূপাকার।

না তাকিয়েই বলল, একটা ভালো গান শোনাব তোকে। হাতটা আমার ব্যথা করে গেছে। দে-না একটু চাবিটা ঘুরিয়ে।

হাতের ভেতর নিপিষ্ট সেই পাঁচটা টাকা থরথর কেঁপে উঠল যেন।

বিনা প্রতিবাদে কাছে বসে চাবি দিলো।

কী যে খেলি কে জানে – আমারও ছাই দুপুর থেকে –

আত্মমর্যাদার সিংহদ্বারটা উন্মুক্ত হলো আবার। বাবর বলল, আপা –

কি রে –

পারল না। এই শেষের রে টানের দীর্ঘবিলম্বিত স্নেহ-বিজড়িত অভিভাষণের জন্যেই বোধহয়। বাক্রুদ্ধ হয়ে তাকাল একমুহূর্ত। সপ্তর্ষীম-ল চেনা যায়; কোথাও হয়তো ধ্রুবতারা। অন্ধকারের গা ঘেঁষে একটা বাদুড় উড়ে গেল আর্তনাদ করে। সব যেন গুলিয়ে গেল কেমন।

কপালের শিরের উপরে একটা আঙুল চেপে বসে রাণু আপা।

হাতের মুঠোয় টাকা ক’টা ঘর্মাক্ত হয়ে ওঠে।

থাক রেখে দে। কাজ নেই।

নতুন রেকর্ডটা শুনবে না?

দে, বলছিস যখন।

রাণু আপা তখনও ইস্কুলে। পরীক্ষার্থিনীদের কোচিং ক্লাস শেষ করে প্রায়ই সময়‘মতো ফেরা হয় না। কখনও বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যাই হয়।

রাণু আপা ফিরলেই বেরুতে হয় বাবরকে। সন্ধ্যায় কাজ। আবার ফেরে সেই রাত এগারোটা করে।

অফিসে সেদিন নেই তেমন কাজের তাড়া। বেতের চেয়ারে হেলান দিয়ে রহস্য গাঢ় আকাশের দিকে তাকিয়ে বাবর অপলক নেত্রে। সূর্যের রক্তিম চক্র ঢলে পড়ছে পশ্চিম দিগন্তে। আজকের মতো তারও কাজ শেষ। লোহিত আলোয় বন্যা ছেয়ে ফেলে আকাশ। ধূসর সন্ধ্যা নাবে। কোথায় কতদূর একটা যূথছিন্ন শালিকের করুণ আর্তনাদ। তারও দূরে ক্ষীণ ডানার ঝাঁক প্রচ্ছন্ন অন্ধকারে বিলীন হলো।

পায়ের শব্দ শুনে বাবর চোখ তুলে তাকাল। বই হাতে মুক্তা এঘর ওঘর করছে।

বলতে পারেন, রাণু আপার কত দেরি?

কি জানি এসে তো পড়েন এ সময়ই। বসুন না।

না থাক। বলল বটে; অথচ পাশের চেয়ারটা নিয়ে বসেই পড়ল মুক্তা।

হাতের বইগুলো নিয়ে যেন ভাবনার অন্ত নেই।

বলল, বসতে তো বললেন।

এসব আপদ কোথায় রাখি বলুন।

দরকারই বা কি এসব আপদ নিয়ে টহল দেওয়ার?

আপনার কি মনে হয় এ সবই অজুহাত।

বাবর কথা বলতে পারল না। বড় তির্যক অর্থের তীক্ষè ফলকে আবদ্ধ যেন প্রতিটি কথার অর্থ।

কথা ক’টা বলে নিজেই কেমন সংকোচবোধ করল পরে মুক্তা। কৈফিয়তের সুরেই বলল, বড় বেশি কথা বলি, না?

না বেশি আর কি? হৃদয়ের আবেগ মুখরিত এমন দু’চারটে সত্যি কথা মাঝে মাঝে না হয় বললেনই।

কেউ কথা বলল না। দেয়াল ঘড়িটার সেই ছন্দবদ্ধ শব্দ ছাড়া সব নিথর।              সন্ধ্যার ঝাঁঝাল হাওয়া এসে খেলা করে। কখন মুক্তার শাড়ির আঁচলটা পালের                মতো দেয় উড়িয়ে। অগুনতি চুলের রাজ্য করে বিদ্রোহ। কালো চুলের বৃষ্টি নাবে            যেন চোখেমুখে। স্নেহস্পর্শে সে চুলের প্রতিটি কুঞ্চন অনুভব করতে পারত                  বাবর। হয়তো বুকের খুব কাছে অনুভব করতে পারত ওর উদ্দাম দেহের উষ্ণতা। বেসুরো একটা বাঁশির ঝংকার শোনা যাচ্ছিল এতক্ষণ নেপথ্যে। হঠাৎ সেটাও               থেমে গেল।

পাশের ঘরের লণ্ঠন থেকে খানিকটা আলো এসে পড়ছে বারান্দায়। এতক্ষণ লক্ষই করেনি বাবর, সে-আলোর বিচ্ছুরণে অপূর্ব সুন্দর দেখাচ্ছিল মুক্তাকে। একটু নড়ে বসল মুক্তা, আচ্ছা মানুষ আপনি। কথা বলছেন না যে।

কী বলব?

কী বলবেন তা আমি জানি? বলুন না ছাই না হয় আপনার সেই হোস্টেলের গল্প।

সে তো প্রাচীন কালের কথা।

বর্তমানের কথাই বলুন।

সোজা হয়ে বসল বাবর। পা’টা ধরে এসেছিল। উঠে দাঁড়াল, জানেন আপনি লোকটা কিন্তু মন্দ নন।

অত তাড়াতাড়ি বুঝে ফেললেন। জাঁহাবাজ লোক বটে আপনি। কী ভালো লাগল শুনি।

যদি বলি সবকিছু।

বলব ডাহা মিথ্যে বলছেন।

আপনি মিথ্যে বলেন না।

না।

সত্যি করে বলুন তো, বইগুলো তো কোনোদিনই পড়া হয় না। তবু মিছি মিছি ওগুলো হাতে করে বয়ে লাভ?

তার মানে? সকৌতুক দৃষ্টি হেনে বলল মুক্তা, জানেন বাড়িতে বড় অসুবিধে, এক টেবিলে চারজন বসে পড়া যায় কখনো? ভাবি একটু নিরিবিলি – রাণু আপা এসে ঢুকল। কথা শেষ হলো না। হেসে বললেন, বাঃ তোরা বেশ গপ্প জুড়ে দিয়েছিস। এইবুঝি তোর পড়া মুক্তা। হারিকেন তো ছোট করা।

বাবর একটু অনুযোগের সুরেই বলল, তুমি জানো খালি পড়া পড়া আর বই পড়া।

মুক্তা উঠে দাঁড়াল। বসুন আপা। সেই থেকে বসে বসে আমার পা ধরে এসেছে।

বাবরের দিকে তাকিয়ে বলল, কি রে যাসনি অপিসে। আমি তো ভাবলাম তোর দেখাই পাব না। ভালোই হলো।

আজ আর গেলাম না। গল্প করতে করতে সন্ধ্যা উৎরে গেল। কী আর বলবে। দেবো একটা দরখাস্ত ঠুকে।

একটা দরখাস্ত ঠুকে দিলেই হলো। উঃ মিথ্যে কথা বলতে ছেলেরা কী ওস্তাদ। আমি কিন্তু একদম পারিনে ওসব।

বাবর এ কথাটাই খুঁজছিল। তোমরা মেয়েরা কম হলে কিসে? বই হাতে নিয়ে পড়ার নাম করে যখন এসে গল্প করো তখন?

স্মিত হাসি হেসে রাণু আপা তাকালেন মুক্তার দিকে, বটে।

আমেজভরা কণ্ঠে বলল মুক্তা, জানো আপা ওসব মিথ্যে।

আমিও তো সে কথাই বলছি, ওসব আগাগোড়া সব মিথ্যে।

রাণী কোনো কথাই বলল না আর। বই ক’টা হাতে তুলে নিয়ে বলল, উঃ অনেক রাত হলো। আমি চলি।

সামনে একটা ছোটখাট ছুটি ছিল। বাবর ঠিক করল, এ ছুটিতেই বাড়ি ঘুরে আসবে একবার। অনেক দিন যাওয়া হয়নি। বাড়ি থেকে খানতিনেক চিঠি এসেছে এ পর্যন্ত। তার শুধু একটার জবাব দিয়েছে বাবর। ওই চিঠিতে লিখে পাঠিয়েছিল, বাড়ি একবার যাবে ঠিকই, তবে সময় জানাতে পারছে না। সবই নির্ভর করছে পরিস্থিতির ওপর। তারপর বাড়ি থেকে আর চিঠি আসেনি। বাবরও লেখেনি বহুদিন।

ইমতিয়াজের কাছ থেকেই ছোট এ্যাটাচি পাওয়া গেল। বেশি জিনিসপত্র আঁটে না।

কাপড়-চোপড় গুছিয়ে এ্যাটাচিটা বন্ধ করতে যাবে, এমন সময় রাণু আপা এসে উপস্থিত, বন্ধ করে দিলি।

একটা পুঁটলি নাবিয়ে বললেন, এসব নিবি কোথায়?

এসব আবার কী?

শোন ছেলের কথা। এ্যাদ্দিন পর বাড়ি যাচ্ছিস। ভাইবোনদের জন্য কিছু নিবিনে।

ও, তা খাম্খা তুমি পয়সা নষ্ট করতে গেলে কেন?

সে ভাবনায় তোর কাজ নেই। পয়সা তোরই। নে হলো তো। গেল মাসে পুরো চল্লিশ টাকাই তো রাখতে দিলি।

মনে মনে স্বস্তি পেল খানিকটা। ওর অর্জিত অর্থের প্রথম স্বীকৃতিটা তাহলে মিলল এ্যাদ্দিন পর।

বিকেলের গাড়িটা ধরতে হলে এখুনি স্টেশনে যাওয়া দরকার। সন্ধ্যা নাগাদ হয়তো পলাশপুরের বাস পাওয়া যাবে। নইলে মহা হাঙ্গামা।

যাই যাই করে আরো মিনিট পাঁচেক গেল।

বারবারই কী যেন একটা জিনিস ফেলে আসে মনে করে ঘরে ঢোকে বাবর।

কী হলো তোর। যাচ্ছিস তো এক বেলার জন্যে। তার অত কা–কারখানা। নে ওঠ, তোর ট্রেনের সময় হলো।

জোর পায়ে হেঁটে যাবো অমন তাড়া কিসের।

পোঁটলাটা শক্ত গেরোয় বাঁধতে বাঁধতে থামল রাণু আপা। বুঝেছি কার প্রতীক্ষা হচ্ছে বোধহয়।

বাবর কথা বলল না।

একটু থেমে রাণু আপা বললেন, মুক্তার অপেক্ষা করছিস। ও তো দেশে। আকাশ থেকে পড়ল যেন বাবর।

দেশে মানে?

মানে আবার কী। তোর না হয় চালচুলো নেই, আর সবার তো আছে। থাকে এখানে ভাইয়ের সঙ্গে তাও আপন হলে এক কথা ছিল। কাল এ বিকেলে। বলল, আবার চললাম। বাবা লিখেছেন যেতে। ব্যস ওইটুকুই। হবে কোনো কাজ।

নিষ্প্রাণের মতো সুটকেশটা হাতে তুলে স্টেশনের দিকে চলা শুরু করল বাবর, পা চলছে না কোনোক্রমেই, কোথায় যেন একটা কী এক অনুপম অনুভূতিতে পেছনে ফেলে শুধু জোর করে এ যাওয়া।

গাড়িতে অসম্ভব ভিড়। তবু রক্ষে একটু জায়গা পেল বসবার একজনের বেডিংয়ের ওপর। নইলে যেতে হতো সারা পথ দাঁড়িয়েই। মুক্তার কথা ছাড়াও মনে হলো যাবার আগে রাণু আপাকে কিছু বলে আসিনি। মনে মনে নিজেই কেমন অনুশোচনা বোধ করল বাবর। পূর্ণ বেগে ট্রেন ছুটে চলছে। মেল ট্রেন। জংশনে গিয়ে থামবে। সেখান থেকে আবার গাড়ি বদলের পালা। কনুইয়ের ওপর মাথা রেখে কখন ঘুমিয়ে পড়ল বাবর। ট্রেনের নিজস্ব একটা ছন্দ আছে। তন্দ্রাজড়িত কানে সে-শব্দটাই যেন ভেসে আসছিল বারবার মুক্তার কান্নার বেদনায় সম্পৃক্ত।

পলাশপুরের বাসটা ছেড়ে দিচ্ছিল। বাবরকে দেখে থামল খানিকক্ষণ। শহরের আগন্তুকদের ওপর বরাবরই একটু নেক নজর। কারণটা সুস্পষ্ট। পয়সার ব্যাপারে মেলা তক্ক করতে হয় না। অনেক সময় বাড়তি পয়সাও দিয়ে দেয় কেউ কেউ।

অত ভিড়েও খানিকটা জায়গা মিলল ঠিক বরাতগুণে নয়, পোশাক-আশাকের গৌরবে কিছুটা। আর কিছুটা বাবরের শহুরে মেজাজের দৌলতে।

দু’একজন চিনতেও পারল। মইনুদ্দীন মুন্সীর ছেলে। শহরে থেকে পড়ে। বাবর যে বছর বৃত্তি পেল গ্রামসুদ্ধ বলাবলি হলো, ছেলে তো নয় যেন হীরের টুকরো। অথচ এমন কত হীরের টুকরো কলেজে গড়াগড়ি যাচ্ছে সে খবরটা আজ কেউ জিজ্ঞেস করলে নিশ্চয়ই বলতে পারত বাবর।

খানিকটা মেটাল্ড রোডের পর কাঁচা রাস্তা। ধুলোয় আচ্ছন্ন চারদিক। তারই ভেতর গাড়ির হর্ন শুনে কোথাও হয়তো সচকিত একটা লোক সঙ্গের বাচ্চা ছেলেটাকে ধরে রাস্তার একধারে দাঁড়িয়ে পড়ে। গরুগাড়িটা খালের পার বরাবর নেবে আসে ঢালুতে। এমন করে সারাটা রাস্তা যেতে হয়। মাঝে একটা-দুটো স্টপ। বিষ্ণুপুর হয়ে যায়। হাটবার থাকলে থামে, পানি নেয়। জিরোয়। অন্যদিনে সোজা চলে গিয়ার ছুটিয়ে।

অনেক রাত না হলেও তখন রাত বারোটার কাছাকাছি। অতিপরিচিত পথ-ঘাটের বাঁক পেরিয়ে বাড়িতে এসে পৌঁছুল। ঘরটা দেখতে আগের মতোই। চালের ছাউনি থেকে শন সরে গেছে জায়গায় জায়গায়। একটা লাউ গাছের ঝাড় সামনেই মাচার ওপর। মাথা নিচু করে যেতে হয়।

মইনুদ্দীন নিজেই বেরিয়ে এলো। প্রথম দৃষ্টিতে কেমন আঁৎকে উঠল বাবর। চুলে পাক ধরেছে দেখে গিয়েছিল। সাদা ধবধবে চুল মাথায়। আগের মতো নেই সেই সুঠাম দেহ। কপালের কুঞ্চনগুলো আরও সুস্পষ্ট। লণ্ঠন উঁচু করে পথ দেখাতে দেখাতে বলল, ট্রেন লেট হলো নাকি?

না। তেমন লেট নেই। জংশনে সিগ্ন্যাল দিতে দেরি হয়েছিল।

একটাই লণ্ঠন। ঘরে আর দ্বিতীয়টি নেই। বোধহয় তেলের খরচ কমাবার জন্যই। বোধহয় কেরোসিন মেলে না – সেজন্যেই। কে জানে কোনটা। ঘরে ঢুকে বাবর, লণ্ঠনের স্তিমিত আলোয়, শুভ্র মর্মর প্রস্তরের মতো একটা মূর্তি। চিবুকে হাত ঠেকিয়ে মাকে বসে উদাস দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকতে দেখে যেন প্রায় চিৎকার করেই বলল বাবর, কী ভাবছো মা।

ভাবনার রাজ্যে আকস্মিক ঝড় সব কেমন বিশৃঙ্খল হয়ে গেল। দাঁড়িয়ে এসে বাবরের মুখটা নিজের বুকের কাছে টেনে এনে বারবারই মার কাঁপা কাঁপা হাতটা ওর চোখ-মুখটা স্পর্শ করে গেল। অপূর্ব অধ্যবসায়ে আপনাকে আবিষ্কার করবার দুর্বার নেশা যেন এ।

টুনু কাছেই ছিল। বয়েসে বছরসাতেকের ছোট। বাবরের এ্যাটাচিটা দেখে বলল, আমি রেখে দি। ভাঙ্গব না। কিচ্ছু ভাঙ্গব না।

ভারি এ্যাটাচিটা তুলতে না পেরে দমে গেল টুনু। মাথায় বুদ্ধি এলো, দড়ি দিয়ে টেনে আনলে হয় না।

দড়ি বেঁধে এ্যাটাচিটা টেনে পাশের ঘরে নেবার চেষ্টা করছিল টুনু।

এ্যাটাচির এই দুর্দশা দেখে মেজাজটা আর ঠিক রাখতে পারল না। জিনিসটা ইমতিয়াজের। চেয়ে এনেছে ক’দিনের জন্য।

ঠাস্ করে এক চড় লাগাল টুনুর গালে।

খাবার ঠিক করছিল আমিনা বানু। টুনু কেঁদে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরল।

হাতের গ্লাসটা নাবিয়ে রেখে বলল, কে বললি, বাবু?

বাবরের ডাকনাম বাবু।

বাবরের দিকে চেয়ে বলল, ছোট ভাইবোনদের একটু আদর করবি। তুই না বয়েসে বড়।

ভালো করে খাওয়াই হলো না রাতে। উপুড় হয়ে ঘুমুল, বালিশের ভেতর মুখ গুঁজে।

কথাটা গোপন থাকল না। বাবরই খুলে বলল সব। হোস্টেলে জায়গা দেবে না। আর তাছাড়া পেলেই বা কি। কলেজে তো ভর্তি হতে পারছে না। যেন আকাশ থেকে পড়লেন মইনুদ্দীন। এতদিন মনে মনে হিসাব করে এসেছে আর ক’টা বছর মাত্র। বাবর চাকরি করলে সংসারের এই জড়তা ঘুচে যাবে। রাজা-বাদশা হবার স্বপ্ন নেই। কিন্তু রোজকার মতো দুটো ডাল-ভাত জুটবে তো স্বস্তির সঙ্গে।

সান্ত¡না দেবার চেষ্টাতেই হয়তো বোঝতে চাইল বাবর, চাকরি যেমন-তেমন একটা করছে, আজ হোক কাল হোক টাকা পাঠাতে পারবে কিছু কিছু করে। সে যুক্তি মইনুদ্দীন শুনতে রাজি নয়। নিজের শখ ছিল বি.এ. পাশ করে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হবার। কপাল, সবই কপাল। তার সঙ্গের ছেলেরা বড় বড় চাকুরে আর মইনুদ্দীন নিজে প্রাইমারি স্কুলের ফোর্থ টিচার। তাও মাইনেটা পাওয়া যায় না কোনো মাসেই          সময়মতো।

টাকার অসুবিধে ছিল, আমাকে জানাসনি কেন?

আলোচনাটা নিছকই যখন অর্থনৈতিক শঙ্কার কোনো কারণ নেই, নইলে মইনুদ্দীনের সামনে মুখ খুলে কথা বলার সাহস ওর খুব কমই হয়েছে। বলল, তোমাদের অসুবিধেও তো দেখতে হবে।

মইনুদ্দীন কিছু বলল না, মাগরেবের নামাজের সময়। ওজু করতে চলে গেল।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা বসে আছে বাবর। নিজের অবস্থাটা কোনোমতেই বুঝিয়ে বলতে না পারার দুঃখটা একমুহূর্ত ভুলতে পারছে না। ঝিঁ ঝিঁ পোকার একটানা শব্দ। দু’একটা শেয়ালও হাঁক ছাড়া শুরু করেছে। রাত নাবছে। কিছুক্ষণ পর হয়তো সব খুলিয়ে যাবে।

এই ছোট্ট সব ঘরে আজীবনের দুঃখ-গ্লানি-বেদনা, মান-অভিমানের পালা শেষ করে ছেলে-বুড়ো সব ঘুমিয়ে পড়বে বাতিটা বুজিয়ে দিয়ে। জীবনকে নিয়ে অভিযোগ আছে মেলাই, অনুশোচনাও আছে হয়তো, তবু রাতের গাঢ় অন্ধকারে প্রতিদিনের সব ক্লেশ আর ক্লান্তি বিসর্জনের পালা। নতুন করে স্বপ্ন দেখে। আমন ধানের মিষ্টি সৌরভ পুলকিত নাক ভরে বুকে টেনে নেয়। কার ক্ষেতের ধান সে কথায় কাজ কি। সুরভীর আশ্বাস তো মিথ্যে নয়!

দু’দিন পর টুনু আজ প্রথম কথা বলল, টুনুকে কোলের কাছে টেনে এনে চেপে ধরল। এত কথা থাকতেও একটা কথা বেরুল না মুখ থেকে। আশ্চর্য। ওর গায়ের খসখসে শার্টের ওপর হাত বুলোতে বুলোতে অনুভব করল, পিঠের খানিকটা দিক ছেঁড়া।

আর শার্ট নেই তোর?

আর আবার কই।

ধ্রুবতারার নিষ্পাপ তীক্ষèতা টুনুর চোখে।

এটাও কি ছিল নাকি। বাবার পুরোন কামিজটা কেটে সেদিন তৈরি করেছি। ইস্কুলের ছেলেরা রাগায় বলে, দেখলেই বোঝা যায় পুরোন, নতুন ওরকম হয়?

দারিদ্র্যে একটা উর্বর ভূমিতে নেবে আসছে যেন বাবর। সে ভূমিতে শুধু ফসলই ফলে না। অকালে নষ্টও হয়। শুধু অভাবই থাকে না, সে অভাবের গ্লানিও হয়          মর্মান্তিক। গ্রামজুড়ে হয়তো এই একই কাহিনী। কিন্তু ক’বছর আগেও তো এমন ছিল না।

অন্তত খাবার জিনিসটা মিলত না। মনোহারি দোকানে দু’পয়সায় লাল চিরুনি মিলত। চার পয়সায় পাওয়া যেত মস্ত বড় জাপানি বেলুন। কী হলো এর মধ্যে?

টুনুর শীর্ণ হাতটা নিজের মুঠোয় শক্ত করে চেপে বলল বাবর অভিমান-সিক্ত কণ্ঠে, সেদিন মেরেছি বলে রাগ করিসনি?

মা তাই বললে?

কেন, আমি বুঝি আর জানি নে?

আমি কি কচি খোকা, রাগ করব। মারলেই কী হলো। তুমি তো বড় ভাই।

বিকেলের পড়ন্ত রোদ এসে পড়েছে দাওয়ায়। বেতের মোড়াটা টেনে নিয়ে বসল সেখানেই। আর মাত্র ক’টা দিন। ছুটিও শেষ। প্রথম মনে হয়েছিল, না জানি কী দুঃসহ হবে প্রতিটি মুহূর্ত। যাবার সময় ঘনিয়ে আসে যতই, মনটা কেমন করে ওঠে। যে সান্নিধ্য ও পরিবেশকে দূরে সরিয়ে ছিল এ্যাদ্দিন, সাধ করে তার আবর্তে এসে জটিল সুতোয় মনটা বাঁধা পড়ল যেন। হয়তো নিছকই পরিবারবদ্ধ একটা তৃপ্তির আমেজ চেয়েছে বাবর মনে মনে। বহু বছর এ তৃপ্তি অনাস্বাদিত। টুনু কানের কাছে ফিস্ফিস্ করে বলল, একটা কথা বলব।

বল না।

রাগ করবে না বলো।

শার্টের তলায় লুকান একটা বই বার করে বলল, নাম লিখে দিতে বলেছে। নাম, ক্লাস নাইনের বইয়ে তোর নাম কেন?

আমার না। –

তবে আবার কার?

মুচকি হেসে হাত বাড়িয়ে দেখাল, ওই যে –

লাউ গাছের মাচার নিচে সলজ্জভাবে দাঁড়িয়ে পারুল। পরনে বাসন্তি রঙের শাড়ি। দুরন্ত সতেরো বছরের উচ্ছ্বাস আর আবেগ সঞ্চারিত একটা নির্বাক হাসির বন্যা পারুলের চোখেমুখে। কাছে এগিয়ে এসে বলল, দাও না লিখে।

কী হবে শুনি।

জানি না, তবু দাও।

বাদ-প্রতিবাদ না করে নামটা লিখে দিলো বইয়ের মলাটে গোটা গোটা অক্ষরে। উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়ে দেখল পারুল, সেক্শন লিখলে না।

লিখতে হবে না। ওই নামে তো আর কেউ নেই। আর থাকলই বা। ক্লাসে ওরকম দুটো পারুলের ঠাঁই হয় কখন।

পারুল কথাটা ঠিক বুঝতে পারল মনে হলো না। বিমূঢ়ের মতো চেয়ে রইল খানিকক্ষণ।

কথাটা আমিনা বানু শুনল কিনা বোঝা গেল না। শিমগাছের গোড়ায় হাঁড়িভর্তি মাড় ঢালতে ঢালতে পারুলকে দেখে বলল, খামখা ফেলে দিতে হয়। মনে করে নিয়ে গেলেই পারিস। তবু তো গরুটা খেতে পারে।

আমিনা বানু চোখে ভালো দেখে না। টুনুর হাত থেকে বইটা তুলে নিয়ে বলল, কার বই?

পারু আপার।

পড়া বুঝতে এলি বুঝি।

পারুল তেমনি চুপ করেই দাঁড়িয়ে। আমিনা রান্নাঘরে ঢুকল।

বাবুভাই থাকবে না ক’দিন?

বড় আবেদনের সুর যেন পারুলের এই ক’টা কথায়।

থাকলে তুমি খুশি হও।

আমার কথা শুনছে কে?

কেন আমি?

কত না শোনো, সাহিত্য সুধা পাঠাতে বলেছিলাম, পাঠিয়েছ? তারপর ক্রশি কাঁটা এনে দিতে বললাম, খুব দিলে না?

যা তাড়াহুড়ো করে এলাম। মনে কিছু থাকে ছাই।

একটু থেমে বলল বাবর, আচ্ছা পারুল –

কী বলো।

আমি যদি দেশে আর না আসি।

কী আর হবে।

কিছুই হবে না।

কী জানি।

বুকের অসম্বৃত আঁচলটা ঠিক করে নিয়ে বলল, বড় ভূয়াদের মেজছেলে মামুনকে তো চেনো?

বিলেত গেছল যে।

হ্যাঁ। আর ফিরে আসেনি। মেম সাহেব বিয়ে করে ওখানেই আছে। ছেলেগুলো এমন স্বার্থপর।

ছেলেদের ওপর তোমার বুঝি খুব অভক্তি।

আমার কেন হতে যাবে। বেলার কথা বলছি।

বেলাকে না দেখলে একরত্তি ঘুম হতো না যার, সে দিব্যি মেম নিয়ে ফুর্তি করছে।

বেচারি বেলা। দ্বোজবরের সঙ্গে ঘর করছে।

তোমার ভাগ্যে নিশ্চয়ই ওরকম কিছু হবে না।

আমি বিয়েই করব না, দেখে নিও।

পারুল বলে গেল। চলে যাওয়ার পর মনে হলো বাবরের, সেই সেদিনকার ছোট মেয়েটি আজ আর সে নেই। এরই মধ্যে অনেক অনেক দেখে ফেলেছে। অনেক শিখে ফেলেছে।

মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, ফিরে গিয়ে ওর নামে একটা সাহিত্য সুধা পাঠাবে। ক্রশি কাঁটাটা রেজিস্ট্রি করে পাঠাবে। তাতে খরচ অবিশ্যি একটু বেশি। তা হোক তবু।

বাবরকে কথা দিয়ে যেতে হলো, চাকরি ছেড়ে পড়াশুনায় মন দেবে। টাকা যেমন করেই হোক জোগাড় হবে।

অথচ যাবার ভাড়াটাই পুরো জোগাড় হলো না।

স্টেশনে আজ কোনো বাস চলবে না। একটাই সার্ভিস। হরমৎ আলীর।

ওর মেজছেলেটা মারা গেছে কাল কলেরায়, তাই রুটে বাস বন্ধ।

পৌনে ছ’মাইল পথ যেতে হবে হেঁটে। টুনু স্টেশন পর্যন্ত যাবে। টিকিট কেনার সময় মালের কাছে থাকবে। তারপর গাড়ি ছাড়লে ফিরে আসবে।

বাবর বোঝাবার চেষ্টা করে, ছোট ছেলে রাত করে একা একা ফিরতে হবে। তোর যাওয়ার কী দরকার?

ছ’সাত মাইল কিচ্ছু নয়। গল্প করতে করতে বারো মাইল হাঁটতে পারে ও। রোজ তো যাচ্ছে না। রাতে ভয়ের কী আছে।

সোজা রেললাইন বরাবর হেঁটে আসবে।

পথে যেতে যেতে টুনু বলল, ভাদ্র মাসে আসবে না আবার?

কেন তখন কিছু আছে নাকি?

মুরগির দুটো বাচ্ছা ও নিজের পয়সা দিয়ে কিনেছে। ওগুলো বড় হবে তদ্দিনে। কথাটা এই।

দেখি ছুটি পাই কিনা।

বাবার কাছে বললে চাকরি করবে না। ওসব ছেড়ে পড়াশুনায় মন দেবে।

কেমন উপদেশসুলভ শোনাল কথা ক’টা টুনুর মুখে।

সংযত হয়েই বলল, চাকরি না করলেও, ক্লাস থাকতে পারে তো?

টুনু থেমে গেল, ও।

ট্রেনে তেমন কিছু ভিড় নয়। শোবার জায়গা না পেলেও দিব্যি বসে যাওয়া যাবে।

সবুজ বাতি জ্বলে উঠল। গাড়ির হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে তখনও টুনু।

নেবে পড়। নে গাড়ি ছাড়বে এখুনি। গার্ডের গাড়ি ঠিক পেছনেই। সবুজ আলোটা দোলাতে দোলাতে হুইসেল পড়ল।

নি®প্রভ আলোয় দেখা গেল, টুনুর শার্টের পেছন দিকটা ছেঁড়া। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বসল বাবর।

গাড়ি ছেড়ে দিলো।

মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল পারুলের সাহিত্য সুধা, আর ক্রশি কাঁটা, আর টুনুর জন্য দু’জোড়া শার্ট নিশ্চয়ই পাঠাবে।

এসেই দেখল দরজাটা ভেড়ানো। বাইরে থেকে তালা দেওয়া। রাণু আপা নিশ্চয়ই বাইরে। গাড়ির ওপর থেকে জিনিসগুলো নাবাল। বিশ্রি গরম। ঘন ঘন রুমাল নাড়তে গিয়ে হাত ব্যথা করে উঠছে। অথচ রাণু আপার দেখা নেই তখনো। দরজার ফাঁকে চোখ গলিয়ে দেখল, উঠোনে একটা মাটির হাঁড়ি, ভাঙ্গা একটা বালতি। মনে হয়, এক যুগ কেউ এ বাড়ির ছায়া মাড়ায়নি। ঘাস গজিয়েছে উঠোন সুদ্ধ। লাউ গাছটা কুঁকড়ে গেছে রোদে। গোড়ায় পানি দেওয়া হয়নি অনেকদিন হয়তো।

সন্ধে হয়ে এলো। রাণু আপার দেখা নেই। অনিশ্চিত আশঙ্কায় অজান্তে বুকটা কেঁপে উঠল, ভালো-মন্দ কিছু হয়নি তো। কিন্তু লোকও নেই আশেপাশে একজন। জিজ্ঞেসই বা করবে কাকে।

মোড়ে একটা পানের দোকান। বহু বছর ধরে ব্যবসা, লোকটার বয়েস দেখলেই বোঝা যায়। রাতদিন শুধু ঢুলে ঢুলে বিড়ি বানায়। আর চোখবুজে পানের খিলি তৈরি করে দেয়। সাঁচি পান রাণু আপার খুব পছন্দ। মাঝেসাজে নিজেই কিনে খাইয়েছে বাবর কত।

সিগ্রেট ধরাতে গিয়ে বুড়োর কাছেই শুনল, রাণু আপা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। কোথায় ঠিক জানে না। তবে বুড়োর ধারণা, বদলি হয়েছে কোথাও, হয়তো। সরকারি ইস্কুলের চাকরি। আশ্চর্য কিছু নয়।

আকাশ থেকে পড়ল যেন বাবর। জীবনে সমস্যা যে কখন এমনি আকস্মিক এবং অযাচিতভাবে আসে, এ অভিজ্ঞতা এর আগে হয়নি। ছন্দবদ্ধ জীবনের একটা সুর খেই হারিয়ে ফেলল যেন। গাঢ় অভিমান হয়ে যেন ঝরে পড়ছে রাজ্যের আঁধার। দূরের ল্যাম্পপোস্টটা জ্বলে উঠেছে কখন।

মনে মনে রাণু আপার ওপর রাগই হয়তো হলো। একটা খবরও দিলো না যাবার আগে।

মেয়েমানুষরা কি এমনি স্বার্থপর হয়।

রাণু আপা হয়তো প্রয়োজন মনে করেনি। আসা-যাওয়ার ব্যাপারটা তার কাছে গুরুত্বহীন। যেদিন বাবর এলো বাড়িতে, সেদিনও তার কোনো ভাবচাঞ্চল্য ছিল না। যাবার বেলার অনুভূতিটাও হয়তো তাই তার কাছে অর্থহীন। এমন মানুষ তো অনেক থাকে, যারা বাস্তব অপ্রিয় সত্যকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না। চলে যখন সত্যি যেতে হয়, তখন চলে যাচ্ছি বলে বিদায়ের অমোঘ মুহূর্তকে অতীতের ছোটখাট সুখ-দুঃখের অনুযোগে অতিরঞ্জিত করে তুলতে ভালোবাসে না।

জিনিসগুলো সিগ্রেটের দোকানে রেখে বাবর ছুটল কাদেরের ওখানে। শুনেছে আজকাল চব্বিশ ঘণ্টাই বই নিয়ে কাটায়। ঠিক করে ফেলেছে, ইউনিভার্সিটিতে রিসার্চ করবে। তাতে করে যদি কেঁচো কুড়তে কুড়তে সাপ বেরোয় তবু।

কাদেরকে পাওয়া গেল হোস্টেলেই। বাংলা মাসিক কাগজের পৃষ্ঠা ওল্টাচ্ছিল দেখে অবাক হয়ে গেল বাবর।

অবাক হওয়ারই কথা।

বাবর ঢুকেই বলল, কী রে আবার মাথা বিগড়েছে নাকি।

কে, বাবর। আয় আয়। ওঃ মনে মনে ভাবছিলাম যদি ঠিক এসে যেতিস এ সময়। ভালোই হলো বস।

বসব না শোব। মানে আজকে রাতটা আমি নিরাশ্রয়।

মানে?

মানে বরাত। এসে দেখি রাণু আপা গায়েব। আমি পথে দাঁড়াই আর কি?

কেন কোথায় গেলেন, দেশের বাড়িতে।

না, এখান থেকে বদলি হয়েছে শুনেছি।

কোথায়?

জানিনে। যাক সে কথা। জায়গা আছে তো।

নিশ্চয়ই, জায়গা থাকবে না মানে। তা খাওয়া-দাওয়া করেছিস।

না, এই তো এলাম ঘণ্টাখানেক হলো। একটু জিরিয়ে নি।

ঘুমুতে ঘুমুতে কাদের বলল, জানিস মেয়ে জাতটা একদম স্বার্থপর।

বাবর জবাব দিলো না। ওর মনের কথাটা যেন বলে ফেলেছে কাদের।

কাদেরই কথা বলল আবার, কই ঘুমুলি নাকি?

না তো।

একটা কথা বলবি।

বল।

লুকোসনি কিন্তু। সত্যি করে বলতো, প্রেম করিস।

বাবর বামে পাশ ফিরে বলল, তোদের লাইট ক’টা অবধি থাকে রে?

বারোটা। সে কথা যাক। আমি যা বললাম তার জবাব দে।

হঠাৎ এ কথা কেন।

কাদের উঠে বসল, তাহলে বলি। এক শ্রীমতী রোজ তোর খোঁজ-খবরের জন্য প্রায় উত্যক্ত করে ফেলছে। বিস্মিত হয়ে বলল বাবর, আমার খোঁজ-খবর?

তবে আর বলছি কী? হাসপাতালে তোর কোনো সুহৃদ আছে নাকি?

কই জানি না তো।

ঘটনাটা খুলেই বলি। কালও একটা ছেলে এসেছিল চিরকুট নিয়ে। বলে গেছে এলেই যেন পাঠিয়ে দি। দু’নম্বর মেডিক্যাল, ষোলো নম্বর বেড।

মনটা অজানিত সন্দেহে দোলায়িত হয়ে উঠল। অসুখে পড়ল আবার কে? রাণু আপা নয় তো? কিন্তু রাণু আপা তো বদলি হয়েছে শুনেছে। তবে ইচ্ছে হলো কথাটা জিজ্ঞেস করে, কিন্তু পারল না। সামান্য একটি রহস্যের আবরণে থাক না আজকার এই ঔৎসুক্য অনিশ্চয়তার অচলায়তনে বাঁধা পড়া।

কাদের বলল, ঘুমুলি।

লাইটটা একটু জ্বালা। পানি খাব। আছে তো? না হেঁটে তিন ক্রোশ যেতে হবে।

টেবিলের ওপরই এক গ্লাস পানি রাখা ছিল। আধ গ্লাস খেয়ে বাকিটা নাকেমুখে ছিটিয়ে দিয়ে বলল বাবর, যা চোখটা জ্বলছে। ঘুম এলেই হয়।

হাসপাতালের বড় গেট দিয়ে ঢুকেই মনে হলো, এ যেন ব্লিচিং পাউডার আর টিংচার আয়োডিনের রাজ্য। কলাই করা বড় বড় স্টারিলাইজারে ছুরি, কাঁচি আর ইঞ্জেকশানের সিরিঞ্জ গরম হচ্ছে। টেবিলের মতো উঁচু অথচ বেঞ্চির মতো লম্বা খাটে চিৎ করে রাখা রোগীদের। তাবিজের মতো গলায় প্যাঁচানো স্টেথোসকোপটা বুকের ওপর পেটের ওপর রেখে, কখনও বা থার্মোমিটারের উষ্ণতা দেখে অভিজ্ঞ ডাক্তারদের মনে রোগীর রোগ নিরাময় সম্বন্ধে কেমন সন্দেহই হয়।

একজন নার্স এসে জিজ্ঞেস করল, স্যার কলিক্পেনের রোগীটা চেঁচাচ্ছে বড়। মরফিয়া দেবো।

ডাক্তার মাথা নাড়লেন। এদিকে চোখ পড়তেই জিজ্ঞেস করল, কাকে চাই!

দু’নম্বর মেডিক্যাল ষোলো নম্বর বেড –

এটা এমারজেন্সি। ওই বিল্ডিংয়ে বলে পাশের দালানটা দেখিয়ে দিলো। তারপর একটু থেমে বলল, কী কেস বলুন তো। মানেঞ্জাইটিস।

না।

কোনো কথা না বলে বাবর সোজা র্তর্ত করে সিঁড়ি দিয়ে নেবে পড়ল। বড় হল ঘর। মাছের মতো সারি করে রাখা সব রোগী।

ক্লান্ত, ফ্যাকাশে, বিমর্ষ। কেউ কাৎরাচ্ছে, নার্স নার্স করে কেউ বৃথাই চিৎকার করে গলা ফাটাচ্ছে। রোগীদের মধ্যে যারা প্রবীণ, মানে রোগে ভুগে ভুগে অভিজ্ঞ, তারা বেডের উপর থেকে চার্টটা নিজেই তুলে নেয়। দেখে নার্সকে পেলেই শুধোয়, কী বলেন একদম নরম্যাল টেম্প্রেচার। কাল থেকে ডায়েট পাব তো? কোনো ভাব-বিচ্যুতি ঘটে না নার্সদের। এসব কথা মেলাই শুনছে, তাই জবাব দেবার দরকার হয় না বড় একটা।

সামনের টেবিলে বসে একজন নার্স। আধা বয়েসি। ভাঁজ করা ত্রিকোণাকৃতি কাপড়ের টুকরো দেখে মনে হয়, এ রাজ্যের মুকুটপরিহিতা সম্রাজ্ঞী বোধহয় তিনিই।

কাছে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল বাবর, এটা দু’নম্বর মেডিক্যাল তো?

হ্যাঁ। আপনার পেশেন্ট?

ষোলো নম্বর বেড।

কী নাম। কাগজ বার করে বলে, নিলুফার?

হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইল বাবর।

নার্স বলল, তিনি তো স্টুডেন্টস কেবিনে।

মনে হলো, অজস্র সম্ভাবনার মতো এই নিলুফার যদি সেই মুক্তাই হয়।

একটা সাদা চাদরে আপাদমস্তক ঢেকে পাশফিরে শুয়ে মুক্তা। আরও দু’চারটে মেয়ে আশেপাশে। বাবরকে দেখে উঠে দাঁড়াল। রাণী চোখ খুলে চাইল, এলেন তাহলে?

কোথায় খানিকটা অভিমানের আতিশয্যে কথাই বলতে পারল না বাবর।

জানাওনি কেন?

বড় অপ্রত্যাশিতভাবে তুমি বেরিয়ে গেল মুখ দিয়ে।

ছোট একটা মিটসেফে রাখা দুটো কলা একটা গ্লুকোজের টিন। বিবর্ণ একটা মিক্সচারের শিশি।

বিছানার কাছ ঘেঁষেই বসল। বসবার একটাও চেয়ার ছিল না, ধারেকাছে মুক্তার হাতটা অনুভব করল। নিরানব্বই আতঙ্কজনক উত্তপ্ততা।

ক’দিন হলো?

অনেক দিন।

দুটো ছেলে গট্ গট্ করে এসে ঢুকল কেবিনে। বোধহয় ক্লাসেরই ছেলে। বাবরের দিকে তীক্ষèদৃষ্টি হেনে বলল একজন, ভিজিটিং আওয়ার্স তো শেষ।

মুক্তা প্রতিবাদ করল, আপনার তাতে কী?

আপনার টেম্প্রেচার নেওয়া হয়েছে?

থার্মোমিটারটা বার করে পারদ দেখছিল আরেকজন।

না। এখন দরকার নেই।

মুক্তার হাতটা কাঁপতে কাঁপতে যেন বাবরের মুঠায় এসে জিরুল। মুখে কিছুই বলল না। পাশ ফিরে রইল। চাদরটা টেনে ফোঁস ফোঁস করে কেঁদেই ফেলল।

পরিস্থিতিটা কারও পক্ষেই সুবিধেজনক নয়। ছেলেদুটো চলে গেল শেষ পর্যন্ত।

মুখের চাদরটা সরিয়ে বলল মুক্তা, গেছে?

হ্যাঁ।

অনেকক্ষণ কথা হলো না। হাসপাতালের টিম্ টিম্ পনেরো ওয়াটের বাতিটা জ্বলে উঠল তখন। করুণ দৃষ্টি নিয়ে তাকাল মুক্তা, যদি না বাঁচি –

কী যে বলো। কিছু হয়নি।

বাবর জানে। চিকিৎসাকেন্দ্রে অনভিজ্ঞ ব্যক্তির এ সান্ত¡না চিকিৎসাবিদ্যায় শিক্ষানবিশিনীর আত্মসন্তুষ্টির পক্ষে যথেষ্ট নয়।

মুক্তা প্রতিবাদ করে, তবু তো কত লোক মরে।

বাঁচেও তো।

অনেকক্ষণ থেমে আবার বলল মুক্তা, জানেন কী সাংঘাতিক সব মৃত্যু। কোনো উপসর্গ নেই, রোগ নেই। হঠাৎ হার্টফেল।

ডাক্তারি পড়ে কী যে হয়েছে তোমার।

আমার কথা নয়। বইয়ের। জানেন, বয়েডর বইয়ে পড়লাম সেদিন, স্ট্যাটাস থাইমিকো লিম্ফ্যটিকাস। অদ্ভুত রোগ। কোনো লক্ষণ নেই। অথচ –

যাক ওসব কচমচি শুনে লাভ নেই।

একটু মৃদু হাসির ঔজ্জ্বল্যে পরিতৃপ্ত হয়ে বলে মুক্তা, একটা কেস হিস্ট্রি বলি শুনুন। একটা ছেলে বল খেলতে খেলতে বুকে আঘাত পেল। ভাবছেন ছেলেটা মারা গেল না? মোটেই নয়। পাশেই একটা ছেলে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিল। মৃত্যু হলো তারই।

ম্যাট্রন এসে ঢুকল। বাবরের দিকে তাকিয়ে বলল, আর থাকা চলে না, আপনি বরং অন্যদিন আসুন।

উদ্বিগ্ন হয়ে বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করে মুক্তা, কাল আসবেন তো।

যেতে যেতে বলল বাবর, আসব।

হলঘরে একটা বেড সরানো হচ্ছিল। খানিকক্ষণ আগে একটা পেশেন্ট মারা গেছে।

এত করেও রাণু আপার খবরটা পাওয়া গেল না কোনোমতেই। ইস্কুলের কেরানি হরিহর বাবু বলল, কী জানি বদলি তো হয়েছিলেন সিংহগ্রাম। শুনেছি জয়েন করেননি। ছুটি আছে পাক্কা তিনমাস।

কাদেরের ঘাড় ভেঙ্গে আর ক’দিন চলে। অপিসে মাইনেটা নিয়মিতই পাওয়া যেত প্রথম প্রথম। আজকাল প্রায়ই বাকি পড়ছে। কলেজে ভর্তি হবার কথাও ভেবেছিল একবার। প্রিন্সিপ্যালের সেই এক কথা। সাসপেনশন অর্ডার তোলা যাবে না। শওকৎ অবশ্য পরামর্শ দিলো, ওসব করে কিছু হবে না। আজকাল নরম কথায় চিড়ে ভেজে না। মন্ত্রী-টন্ত্রীর কাছ থেকে প্রশংসাপত্র লিখিয়ে আন। সব ঠিক হয়ে যাবে। মন্ত্রীর নাম শুনলে প্রিন্সিপ্যালের তর্জনগর্জন থাকবে না।

কিন্তু মন্ত্রীদের যে চিনি না স্যার।

না চিনলে আর কী করবে। দেখো কী হয়।

মাঝখানে একদিন মনে মনে ভাবল বাবর। এসব মহাজনপন্থা ছেড়েছুড়ে বিজনেস করবে। দু’পয়সা লাভ হোক মন্দ কি। নিজের গতর খেটে যা কামাও, কেউ বলার নেই। আপিস নেই। সময়ের কড়াকড়ি নেই। কর্তৃপক্ষের বকুনি খাবার ভয় নেই।

প্রস্তাবটা কাদের কিন্তু হেসেই উড়িয়ে দিলো, তারচেয়ে বইয়ের রাজ্যে ডুবে থাক। দেখবি সে রাজ্যে আর সব তুচ্ছ।

কিন্তু সে রাজ্যে যাবার পাসপোর্ট?

মাসকাবারে যা পাচ্ছিস, তা চায়ের দোকানে না ঢেলে কলেজের কাউন্টারে জমা করিস। তাহলেই হলো।

কাদের পড়তে বসে গেল। গুছিয়ে গাছিয়ে জিরিয়ে বসে। হাতের কাছে রাখা ঠান্ডা পানিটা ঢক্ঢক্ করে গিলে ফেলে। বইয়ের ফাঁকে রাখা এ¯িপ্রনের বড়ি। যখন খুশি গ্লাসের পানির সঙ্গে মিশিয়ে খায়। হাত ঘড়িটার সময় মিলিয়ে দেখে। কানের কাছে নিয়ে স্পন্দন অনুভব করে। তারপর বই খুলে বসে। বারান্দায় চেয়ারে বসে বসে ভাবছিল বাবর, এ জীবনটা যারা পেল তারা ভালো করে পেল না কেন। অথবা একদম যদি নাই পেত, ক্ষতিই বা কী ছিল। কিন্তু এই কিছু কিছু পেলাম আর কিছু পেলাম না-র টানাপোড়েনে থাকতে হলো কেন? 

মাসকাবারে সামান্য ক’টা টাকা যদি পেত – পাঁচটা করেই না খেত সিগারেট। বিকেলে চা খাবার বাতিক নেই। এক বেলাতেই চলত। তাহলে সব মিলিয়ে আজকালকার বাজারে পঞ্চাশটা টাকা হলেই চলত।

মনি অর্ডারের তলার কুপনে কুশল কামনা করে কেউ কিছু না লিখতে চাইলে, নাই লিখত, না সামাজিক নিয়মে অর্থপ্রাপ্তিটা ঘটা উচিত পিতৃপক্ষের কল্যাণে। কিন্তু সে চিন্তাও নিরর্থক। অল্প আয়কারী পিতারা যদি অজস্র আয়কারী পিতাদের সঙ্গে ছেলে বদল করতেন, এ সমস্যা থাকত না তাহলে হয়তো। অবিশ্য নিছকই এসব চিন্তা।

মুক্তাকে একবার দেখে আসা উচিত। দিনচারেক ফাঁক পড়ল। জ্বরটা আবার বাড়ল কিনা কে জানে।

একটা কথা ভাবল। মুক্তার প্রসঙ্গ। সত্যি সত্যি মেয়েটার প্রতি ওর এই অনুপম স্নেহ-প্রীতির আসল মর্মটা কোথায়? বড় বেশি করে জড়িয়ে আসছে দিনকে দিন। সবাই না হয় মুখ ফুটে বলে না, তোমায় ভালোবাসি। কিন্তু কেউ কেউ তো এ কথাও বলে, তুমি আমার চক্ষুশূল। তাও তো বলেনি বাবর। তবে? উঠে দাঁড়াল। এককাপ চা খাবে। ক্যান্টিন বেশ ফাঁকা। রেডিওটা বিগড়ে যাওয়ায় আজ খদ্দের কম। চিন্তার মিছিল যেন আর শেষ হয় না। এতসব লোক এতকিছু করে দিন কাটাচ্ছে। বাসন যে মাজে তারও একটা ভবিষ্যৎ আছে। সতৃপ্ত না হোক ক্ষুণিœবৃত্তির জন্যে সামান্য একটু আহার নিশ্চয়ই মিলবে, যে লোকটা রাস্তায় বসে ইট ভাঙ্গছে, ভবিষ্যতে সে হয়তো পাথর ভাঙ্গবে। তাতে মজুরি বাড়বে। লন্ড্রির যে লোকটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কামিজ ইস্ত্রি করে সে হয়তো ডাইং ক্লিনিংয়ে বেশি মাইনের চাকরিতে আসবে একদিন। আসলে ভবিষ্যৎটাই আসল। এমনি একটা আছে পরিণতির কাজ, যদি সেও ভেবে নিতে পারত।

দূর থেকে হোস্টেলের ব্যারাকগুলো দেখা যায় স্বপ্নপুরীর মতো। আলো জ্বলছে সব ঘরে। নিস্তব্ধ নিষ্পলক রাত। হেবিয়াস কর্পাস স্ট্যাটুইট পড়তে পড়তে কেউ হতো রীতিমতো গলদঘর্ম। থিওরি ইকোয়েকালের চ্যাপ্টারটা কারও হয়তো মাথাতেই ঢুকছে না। তবু হয়তো এসবের মধ্যে একজন আছে কারণ, এতগুলো সাধারণ           স্তরের মানুষের মধ্যে উত্তম বুদ্ধির একজন কেউ থাকবেই। সবাই বোঝে। তার কিন্তু শখও অন্যরকম, গত সাত বছরের প্রশ্নপত্র দাগ কেটে কেটে পড়ছে, তবু তৃপ্তি নেই। ফার্স্ট ক্লাস পেতেই হবে।

পেছন থেকে কে ডেকে উঠল।

ক্যান্টিনের নিষ্প্রভ আলোয় চেহারাটা দেখা গেল না ভালো করে। বছর তেরো বয়েস। সামনে এগিয়ে আসতেই চিনতে পারল বাবর। অবাক হওয়ারই কথা। একা একা আসেনি এর আগে কখনও টুনু।

দেখেই কথাটা মনে হলো, বেচারির জন্য একটা শার্ট পাঠানো উচিত ছিল।

টুলের ওপর অবনত মুখে বসে টুনু।

কী রে, হঠাৎ।

টুনু কথা বলল না।

যখন বলল, বেশি করেই বলল। উচ্ছ্বাস আর কান্নায় আর স্বভাবসুলভ জড়তায় মিলিয়ে। বাবা মারা গেছে হার্টফেল হয়ে। কেউ জানত না। দিন দু’চার আগেও হেঁটে বেড়িয়েছে। হাট থেকে ফিরে এসেই সেদিন সটান শুয়ে পড়ল মঈনুদ্দীন। তারপর বুকের ব্যথার কথা একটু বলছিল বোধহয়। ওটা মাঝে মাঝে হয়। আগে প্রায়ই হতো। কিন্তু একরাতেই এতোবড় সর্বনেশে কা- হয়ে যাবার কথা বলতে কেমন একটু সঙ্কোচ বোধ করল টুনু। বাড়িতে যে এত প্রাণোচ্ছল, শহরের এই আনুষ্ঠানিক জীবনে ভুল ধরা পড়ার ভয়ে সে আড়ষ্ট। একটু একটু করে বিস্কুটটা কামড়ে খেল চায়ে ডুবিয়ে।

বলল, ক্ষিদে নেই। খাব না। সে রাতে কথা হলো না এ সম্পর্কে কিছুই।

মাটিতে একটা বাড়তি বিছানা করতে হলো।

কাদের বাধা দিলো, না না হয় কখনও। ওপরেই শোবে।

ওপরেই শোবে, জায়গা কোথায়। বালিশ যে একটা।

সে হবে তখন। তোর সব ব্যাপারে বাড়াবাড়ি। বেচারি বাচ্চা ছেলে। তোর মতোই চেহারা অবিকল। কী নাম খোকা।

টুনু ইস্কুলের খাতায় লেখানো মজলিশি নামটাই বলল।

কোন ক্লাসে পড়ো?

ভাইয়ের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি মেলে বলল, এখন পড়ি না।

কাদের বুঝল কিনা বোঝা গেল না। বাবর বুঝল, উজ্জ্বল আলোকে টুনুর সেই ছেঁড়া আর অপরিচ্ছন্ন শার্টটা দেখে কোথায় একটু সমবেদনা নিশ্চয়ই হচ্ছে ওর প্রতি কাদেরের।

টুনু ঘুমে অচেতন।

বাবর তখনও বসে।

কী হলো ঘুমুবিনে?

কথাটা খুলেই বলল বাবর।

ছি, ছি, এতক্ষণ এ কথা বলিসনি। আমি বই নিয়ে লাট সাহেবের মতো পড়ছি তখন থেকে। তোর আক্কেল বলে কিছু আছে।

একটু থেমেই আবার বলল, দেখ কী আবার বলে ফেললাম তোকে। এমনি তো তোর মন খারাপ।

চল বাইরে থেকে ঘুরে আসি। মনটা হাল্কা হবে তখন।

চল।

নিরুদ্বেগ জীবনের ছারপত্র শেষ হয়ে গেল। সব দায়িত্বই এখন ওর। অন্তত তিন তিনটে প্রাণীকে পেলে পুষে মানুষ করবার ভার ওকে নিজেই নিতে হবে। এ দায়িত্ব অনেকেরই। কিন্তু আকস্মিক বলেই বোধহয় প্রথমটায় দুঃসাধ্যই মনে হলো বাবরের।

টুনু চলে যাওয়ার পর দু’মাস কেটে গেছে। একটা চিঠি দিতে পারত। বোধহয় ভালোই আছে। একটা চিঠি লিখে রেখেছে বাবর। ক’দিন হলো ডাকে ফেলা হয়নি। কাল ফেলবে।

কাদেরের অনুগ্রহপুষ্ট হয়ে আর থাকা চলে না মনে করেই বাড়িটা ভাড়া নিয়েছে। শহরের একপ্রান্তে। বৃষ্টির সময় যাতায়াতের অসুবিধা। তা হোক। পনেরো টাকায় বাড়ি ভাড়া পাওয়া আজকালকার দিনে চাট্টিখানি কথা?

একটা রিকশা এসে দাঁড়াল গেটের সামনে। যখন নামল দেখল মুক্তার পরনে আসমানি রঙের শাড়ি। বিনি করে বাঁধা চুল। উঠোনটা পায়চারি করে বলল। চমৎকার তো!

কী চমৎকার?

বাবরের অতর্কিত প্রশ্নে কেমন একটু অপ্রতিভ হয়ে বলল মুক্তা, কেন ছোট্ট বাসা। প্রথমে ভাবলাম খুঁজেই পাব না। বেশ শহরের একপ্রান্তে। গাড়িঘোড়ার গোলমাল নেই।

তুমি যা যা বলবে, অসুবিধের ক্ষেত্রেও কিন্তু সেগুলো কম প্রযোজ্য নয়।

তা হোক। বক্তৃতার কাজ নেই। ভেতরে চলো বসিগে। রাস্তার ঝাঁকুনিতে পা’টা ধরে এসেছে।

চা খাবে?

আমি মেয়ে মানুষ চা খাব আর তুমি তা তৈরি করে খাওয়াবে, না।

কেন?

মেয়ে জাতটার পারদর্শিতায় তোমার এমন অবিশ্বাস হলো কবে থেকে? তারচেয়ে উনুনটা কোথায় বলো। আমিই কেটলিটা বসিয়ে দি।

আগ্রহের আতিশয্যেই হয়তো বলে ফেলল বাবর, কিন্তু রোজ রোজ তো আর উনুনে তুমি কেটলি বসাচ্ছ না?

লজ্জা পেল যেন মুক্তা। ঘুরিয়ে বলল, কেটলির হাতলটা দেড়মাইল লম্বা হলে কিন্তু রোজই পারা যেত।

কথা বলতে বলতে বাবরই বলল, সেরেছে পৌনে আটটা। ফিরবে কখন?

তাই নাকি। তাহলে তো বড্ড দেরি হয়ে গেল। হোস্টেলের গেট বন্ধ হলে তো মুশকিল।

আজকাল হোস্টেলে থাকছ নাকি?

নইলে বাসায় সব উদারপ্রাণ ব্যক্তিরা রয়েছেন কিনা। তোমার কথা বলতেই ছাড়পত্র দিয়ে দিলো, এই ভাবছো না?

হোস্টেলে কী অজুহাত দিলে।

জেনে লাভ?

মিথ্যায় তোমার পারদর্শিতার বহর দেখা যাবে তো?

সে গুণে আমি দক্ষ। সিনেমায় না গিয়েও গল্পটা চমৎকার বলে দেবো। কোথাও খুঁত থাকবে না।

কী বলবে?

কেন বলব, এই ছেলেটা মেয়েটাকে ভালোবাসল। তারপর মুশকিল…

মুশকিল আবার কী?

মুশকিল হলো মেয়ের বাবা নারাজ। নায়ক আর কী করে। না পেরে করল দেশত্যাগ।

কী ট্রেনে করে তো। ট্রেন যদি ফেল হয়। ছবি তো তুমি দেখোনি।

ট্রেন যদি ফেল করে। হেলিকপ্টারেই যাবে না হয়।

তা না হয় গেল, কিন্তু গল্পটা যে মাঠে মারা যাবে।

মাঠে মারা যাবে কী করে বলো। হিন্দি ছবি অথচ নায়ক-নায়িকার মিলন হবে না, এ কখনও হয়?

আচ্ছা মুক্তা ছবির কথা থাক। এমনকি বাংলা ছবিও থাক। এমনি মানুষের বেলায় তর্কের খাতিরে ধরো আমি…

পরের কথাটা সঙ্কোচেই বলল, আর তুমি, আমাদের কী হতে পারত?

হতে পারত কী জানিনে। কী হবে তা জানি।

কী হবে?

তুমি কোম্পানির মস্তবড় ম্যানেজার হয়ে বসবে। কী আর হবে। একদিন ভুলেই বসবে। মনে থাকবে না আমাদের কথা। আর আমি সেই একযুগ ধরে ধুঁকে ধুঁকে মরছি।

উলটোও তো হতে পারে।

পারে, কিন্তু হবে না।

প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলল মুক্তা, বউ ডাক্তার হলে স্বামীদের বড় কষ্ট না?

কেমন?

এমনি কথার খোঁচা তো আছেই। তার উপর জ্বরটর হলে সুচের খোঁচা। সইবে দুটো?

পাঁচ বছরে দুনিয়াটা বদলেছে অনেক। অন্তত বাবরের তো তাই মনে হয়। চাকরি জীবন সম্পর্কে আগে কেমন একটা বৈরাগ্য ছিল। অভিযোগ ছিল। সেটা সয়ে গেছে ক্রমে ক্রমে। জীবনটা কেমন থিতিয়ে এসেছে।

আজকাল হোস্টেলের দিকে বড় বেশি একটা যায় না। পরিচিত কেউ নেই। সব নতুন নতুন ছেলে। গোঁফ পর্যন্ত গজায়নি। গম্ভীর চালে বলে, সেকেন্ড ইয়ার।

তিন বছর হলো কাদের বিলেতে। শুনেছে ওখানেই রিসার্চ করছে। শ্রীমতী                  কুতুব মিনার স্বামীগৃহ করছেন। স্বামী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। বহরমপুরে দুটো                    বাড়ি ছিল। এক্সচেঞ্জ করে এখানেই আছে। মবিন মফস্বলে ওকালতি করছে।                পয়সা নাকি ভালোই পায়। যে বছর মনে করে একটা চিঠিও লিখেছিল। ক’টা           টাকাও ধারে বাবরের কাছে। মবিনের চৌকির নিচে পুরোন, ইংরেজি কাগজ গাদা করা। সের খানেক বিক্রি করে পয়সাটা যেন চুকিয়ে নেয় লিখেছিল মবিন ওই চিঠিতে।

রাণু আপা সিংহগ্রামে। চাকরি ছেড়ে দেবার কথা ভাবছে। লোকের মুখে শুনেছে, আজকাল সে মানুষটি আর নেই। শহরের এক ব্যাংকে কিছু টাকা খাটিয়ে দু’পয়সা পাচ্ছে। আজকাল ব্যাংকের কাগজ দেখতেই সময় কাটে। ইস্কুলে ছাত্রী পড়ানো আর বেশি হয় না।

সন্ধে করেই খাওয়া দাওয়ার পর্বটা সারল। আজ স্টেশনে যাবার কথা। ন’টার মধ্যে পৌঁছুতে হবে। আলনা থেকে আদ্দির পাঞ্জাবিটা নাবিয়ে গায়ে চাপাল। কাবলি চপ্পলটা পরল পায়ে। মোটামুটি ভালোই লাগল। সাধারণত পরিচর্যা বড়বেশি একটা করে না। তাই যখন করে নিজের কাছেই নিজেকে সঙ মনে হয় একটা।

মুক্তার সঙ্গে আরও জনা দু’চার। ছ’মাস ট্রেনিংয়ে থাকতে হবে হাসপাতালে। তারপর পোস্টিং। জানালায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলল বাবর, ছ’মাস পরে ঠিক ফিরবে তো?

বিশ্বেস হচ্ছে না? একটু কৌতুকের হাসি হেসে বলল, সত্যি যদি না ফিরি।

তুমি ভাবছ আমি আত্মহত্যা করব। পাগল হয়ে যাবো। কিছুই হবে না। কী মনে করে বলল মুক্তা, শোনো তোমার কলমটা দেবে, আমার নিবটা একদম কাল ভেঙ্গে দু’টুকরো।

মনে মনে বড় গর্ব অনুভব করল। সত্যিকারে এ্যাদ্দিন পর এমন একটা কিছু দিতে পারছে। যা মনে করে চেয়ে নিতে হচ্ছে ওর কাছ থেকে।

গাড়ি ছেড়ে দেবার প্রথম সঙ্কেত বাজল, কলমটা রইল তোমার কাছে। ভালোই হলো। শুধু কলমটাই বুঝি?

তবে?

ইঞ্জিনের গর্জনে কথা ক’টা শোনা গেল না। চিৎকার করে বলতে হলো পরের কথাগুলো। হাতল ধরে বলল বাবর, আগামী ছ’মাসের পরমায়ু তোমার জন্যেই জমা রইল কিন্তু। মুক্তা কিছু বলল না। কাচের জানালাটা টেনে মুখ ফিরিয়ে বসল। মনে হলো সারাক্ষণের এই নীরব উচ্ছ্বাস বন্যার মতো দু’কূল ছাপিয়ে উঠেছে ওর চোখে। জানালা দিয়ে মুখ বার করে দেখল। প্ল্যাটফর্মের মানুষগুলো অনেক ছোট হয়ে আসছে চেনা যায় না। পিঁপড়ের মতো। গাড়ির দ্রুতগতির সঙ্গে চলছে শুধু একটা আলো। নীল সঙ্কেত। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *