প্রশ্ন জাগে

নাসিম বানুর হাতে তৈজসপত্র ভাঙ্গেনি একটাও, এটা সাতচল্লিশ বছর চার মাস সতেরো দিনের একটা চক্রবৃদ্ধি অহমিকা। জীবনটাকে তিনি ভেঙ্গেছেন খান খান করে কৈশোরে যৌবনে আর বয়োবৃদ্ধির বর্তমান সোপানে। রাইটার্স বিল্ডিংয়ের শেষকৃত্য হবার অপেক্ষমাণ ফাইলগুলোকেও লজ্জায় হার মানাতে পারতো নাসিম বানুর ডাইরি যা কিনা ছিল ছোট, বড়, মাঝারি, লাল, নীল, সবুজ, হলদে, মেরুন রঙের। ধূসর হয়ে এসেছে কাগজের রং, চিম্সে গেছে তার আয়তন। ওই ডাইরিতে নাসিম বানুর সতেরো হাজার টাকার ডায়মন্ড রিংটা হারিয়ে যাবার ওপর হোমারের ওডেসি রচনা হয়ে আছে; হ্যারিংটন স্ট্রিটের সেই সাদা ফোর্ড গাড়িটার কাচ ভেঙ্গে যাবার দুঃখে এ্যালেন বেরি কোম্পানির মেরামতির চাতুর্যের বর্ণনা রয়েছে – নেই কেবল তাঁর তৈজসপত্র ভাঙ্গার একটারও উল্লেখ। এমন ঘটনা নাসিম বানুর জীবনে একেবারে অনুল্লেখযোগ্য নয় কারণ, তাঁর ডাইরির ঔদার্য স্থান দিতে কুণ্ঠা করেনি ১৯১২ সালের চিনামাটির গেলাশটার বর্ণনা; ১৯১৭ সালের টিংচার আয়োডিন সেবনের ধৃষ্টতার কথা।

একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল সেই ১২ই অক্টোবরের রোদ ঝলকানো বিকেল বেলা নাসিম বানুর হাত থেকে গড়িয়ে পড়লো দুধের গেলাশটা।

মেরুন রঙের গালিচার ওপর ভাঙ্গা গ্লাসের দুধ গড়িয়ে গেছে খানিকটা।

ইফতিখার চোখ তুলে চাইলেন। আজ থেকে কোনো সমস্যাই তাঁকে কুপোকাৎ করতে পারেনি। তিন তিনটে ইলেকশান জিতেছেন তিনি। চার চারবার দল বদলেছেন, দু’দুবার অ্যান্টি করাপ্শানের লোকজন তাঁর বাড়িখানার তল্লাশি নিয়েছে। কিন্তু ইফতিখারের গায়ে এতটুকু আঁচড় লাগেনি। বহু সমস্যার সমাধক তিনি – কেবল জ্যামিতির সমস্যাগুলো তাঁর মাথায় আঁটতো না। তাই ম্যাট্রিক পরীক্ষাটা পাশ করা যায়নি – আর যায়নি বলেই সরকারের কৃপাদৃষ্টিটা চিরদিনই তাঁর ওপর উর্দ্ধতম উষ্ণতায় ছিল পরিপুষ্ট।

‘সামান্য ঘটনা – কার্পেটটা ধুয়ে ফেলা যাবে।’

নাসিম বানুর একটু হাসি পেল, এমন হাসি তাঁর হামেশাই পায়। মেরুনের সাদা দুধ কি অদ্ভুত।

‘হাসছো যে -!’

‘কী যে বলো ছাই। হাসি পেল তাই –

‘আচ্ছা বেশ বেশ।’ ইফতিখার মেয়েদের ব্যাপারে বেশি কথা বলেন না।

দুজনকে খানিকটা অপ্রতিভ করে নিজাম পর্দা ফাঁক করে এসে দাঁড়ালো। ইফতিখার সোজা হয়ে বসলেন। নাসিম বানুরও কাজ জুটেছে ততক্ষণে একটা। ভাগ্যিস একটা চাকর সকালবেলা তাঁর কথার ওপর একটা কথা বলেছিল। অপরাধটার জন্যে যথেষ্ট শাস্তির ব্যবস্থাটা মুলতুবি ছিল মনে হওয়াতে নাসিম বানু তাঁর এলাজ শুরু করেছেন।

ইফতিখার চোখ তুললেন, ‘তোমাকে তো পাঁচটা পঁয়ত্রিশে আসতে বলেছিলাম। এখন তো ছ’টা।’

‘ঘড়ি নেই কিনা’, আবেগের সুরে কথাটা বলে নিজাম, ‘তাই সময় ঠিক রাখা যায়নি।’

‘চাকরি করতে এসেছো জানো?’

‘সেটা জানবার সুযোগ পেয়েই তো এলাম।’

‘পড়াতে পারবে।’

‘পারদর্শিতার কথা বলছেন?’ –

ইফতিখারের কপালের কুঞ্চন সুস্পষ্ট হয়ে উঠল। ‘সব কিছুরই কথা বলছি।’

‘ছাত্র আমি ভালো। একথা এই নিয়ে তিন তিনবার ইউনিভার্সিটি হেঁড়ে গলায় জাহির করেছে। আমাকে আর বলবার সুযোগই দিচ্ছে কই।’

‘কাল থেকে এসো।’

‘কাল পারব না, পরশু। মাইনে?’

‘এ মাসে চল্লিশ দেবো। তারপর দেখা যাবে।’

নিজামের উদ্ধত নির্ভীক কথাগুলো সজারুর কাঁটার মতো ইফতিখারের বক্ষের বীরত্বব্যঞ্জক পশমগুলো শিহরিত করে তুললো। ইফতিখার প্রসন্ন হয়েছেন।

ইতিহাসের একটা গল্পই জানতেন ইফতিখার বেশি ইতিহাস পড়েননি বলে। আলেকজান্ডার পুরুর কথাটা তাঁর মনে ছিল। সুবিধে মতো পুরুর সাক্ষাৎ পেলে আলেকজান্ডারের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে দেখা যেত ইফতিখারকে। কাজেই চাকরিটা পেয়ে গেলো নিজাম।

* * *

বৈষয়িক জীবনের প্রথম মহরৎ টিউশানির মহান পারদর্শিতায় নিজাম একটু খুশি হলো। ইফতিখারের সতেরো বছরের ছেলেটা বৈরাগ্য জন্মিয়েছে বই খাতার সঙ্গে। ষাট মিনিটের ঘণ্টাটা অতিক্রান্ত হবার পরক্ষণেই নিজাম ছুটি পেল। 

‘কালকে আসবেন না স্যার’, মামুলী নেতিয়ে পড়া ঢঙ্গে কথাগুলো বললো আমিন, ‘আমরা পিকনিকে যাব।’

অসুবিধের কথা নয় মোটেই। মাসের সাতাশ দিন পেরিয়ে গেছে। তিনটে দিনের অপেক্ষাই করবে নিজাম। বারো টাকা চার আনায় একটা মামুলী হাফ শার্ট পাওয়া যাবে আর বারো টাকা দিয়ে শোধ দিতে হবে মেসের বাকি। ধোপার হিসেবের খাতাটাও চুকিয়ে দেবে ওই দিন। আর মাত্র তিন দিন। সমস্ত পাওনাদারের দুর্জয় দাবিকে ঠেকিয়ে রাখবে বাহাত্তর ঘণ্টা। তারপর ওর কাছে জীবনটা শুরু হবে নতুন পরিখায়। আবার ধার করবে – সামনের মাসে চুকিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতিতে, সকালবেলার প্রাতরাশটা শুরু করবে সেই বারো বছর আগেকার মতো।

ইফতিখার টাকা ক’টা গছিয়ে দিলেন সযতেœ।

‘আমি তাহলে চলি’ –

‘না না বসো, বসো। আচ্ছা তুমি তো স্টুডেন্ট মহলে খুব ঘোরাফেরা করো।’

‘জী হ্যাঁ। তা তো একটু আধটু করতেই হয়।’

‘একটা কথা তোমাকে বলবো মাস্টার’, সোফায় একটু সিধিয়ে বসলো ইফতিখার, ‘একটা কথা ভাবছি বহুদিন থেকে। তোমাকে বলবো বলবো করে বলা হচ্ছে না।’

নিজাম নিরুত্তর।

‘একটা রিলিফ ফান্ড খুললে কেমন হয় বলো তো! মানে বন্যার্তদের জন্যে একটা রিলিফ ফান্ড।’

একটা মক্স করা হাসি হাসল নিজাম, ‘আমি ওতে বিশ্বাস করি না। তাছাড়া আপনি ফান্ড করবেন তা আমি কী করতে পারি বলুন।’

ইফতিখার ধমকের সুরে কথা বলতে পারেন, যদিও রাগের প্রকাশটা তাঁর সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে না কোনোদিন, ‘তোমার এ অভ্যাস বড় খারাপ। কথা না শুনেই –

‘তব লাগি মোর ভুবনে আজি কথার নিমন্ত্রণ’ – মনে মনে সঙ্কল্প নিল নিজাম, ‘বেশ তো বলুন।’

ইফতিখার বুঝিয়ে বললেন, আজ দেশের ভয়াবহ অবস্থা। ঈর্ষাকাতর সমাজ আজ মানবসেবাকে ঝেঁটিয়ে নিজের স্বার্থের দর কষাকষি করছে। নির্যাতিত মানুষের ওকালতি করবার লোক নেই। শুধু মুখেই বড় বড় কথা। ছাত্রসমাজের দিকে তিনি ইসপস ফেবল্সের শেয়ালের মতোই আশায় হাঁ করে তাকিয়ে থেকেছেন বহুদিন। কিন্তু সব তাকে নিরাশ করেছে। সুতরাং তিনি তাঁর কোমরবন্ধ মজবুত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

নিজাম পাঁচ মিনিট বিরতি দিলো। ইফতিখার তামাকের নলটায় মনোযোগ দিলেন।

তারপর বললো নিজাম, ‘কিন্তু আমার তো সময় নেই – আমি বরং দু’চার জন ডেকে দেবো। ওদের সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ করা যাবে।’

‘বেশ বেশ তাই করো – শোনো তুমি বরং ওদের কাল আমার এখানটায় চা খেতে বলো। চায়ের ওপর গল্পটা জমবে ভালো। বুঝলে না। তোমাকেই কিন্তু ব্যবস্থা করতে হবে।’

আপনার-ভবদীয়-গোছের একটা ভাব দেখিয়ে নিজাম বেরিয়ে এলো। যাবার আগে বলে গেল, ‘আচ্ছা বলে দেবো।’

*  * *

সূর্যস্নাতা অপ্সরী ক্লিওপেত্রার করুণা হয়েছিল রক্তাভ আকাশটার দিকে তাকিয়ে – তাঁর ঠোঁটের ঔজ্জ্বল্যের কাছে দিগ¦লয় হার মেনেছিল বলে। ইউফ্রেতিসের কলগুঞ্জন শুনে বাদশা হারুন অর রশিদ হাসলেন বিদ্রƒপের হাসি – বুরবক নদী বুঝলো না তার কবিতার মর্ম। যুগ ও কালের চাকায় থিঁতিয়ে গেছে সে স্মৃতি – অনুকম্পায় আর অনুরাগে সে কথা হয়ে রইলো নিস্পন্দ। যাকে বলা হলো ভাষা পেল না সে বুঝবার – যে বললো সে পেল না বোঝাবার।

যে প্রাণবন্ত দিনগুলো – প্রাচুর্যের স্মৃতিতে রহস্যঘন বৈচিত্র্যঘন যে দিনগুলো ফেলে এসেছে নিজাম, তার কাছেও একটা নালিশ ছিল ওর। বলবার অনেক কিছু ছিল – ও বলেনি। যতখানি সে রিক্ত হয়েছে ততখানিই হয়েছে রসসিক্ত।

দারিদ্র্যের ব্যাখ্যাটা ও যখন শেখেনি – তার বহু পূর্বে ওর জীবনে সে দেখেছে বিভীষিকা। যিশুকে একটু করুণা করেছিল নিজাম। দারিদ্র্য তাঁকে মহানই করেছে অথচ পাষাণ করে তোলেনি। খ্রিষ্টের সম্মানটা বাতিল করেছিল ও – কারণ জীবনটা ওর কাছে এসেছে সোজা হয়ে। দূরের আকাশে সূর্যের অন্তরাগ ও দেখেনি – বিদ্যুৎ-এর ধমকানিকে বরণ করে নিয়েছে জৈবিক সত্যের আভরণে।

ইফতিখারের ঘরে গানের জলসা। কথাটা আরেকবার উচ্চারণ করলো নিজাম।

নিজাম পৌঁছুলো জলসা ভাঙ্গা কারুণ্যের অমোঘ মুহূর্তে। রাত হয়েছে প্রচুর। জর্জেটের শাড়ি শোভিত মেয়েটা আকাশের দিকে পটলচেরা চোখ মেলে গান ধরেছে, ‘আমি যে বহ্নিশিখা’।

‘আ-হা ¬- এসে গেছো,’ ইফতিখারের সন্ধান-উন্মুখতায় ধরা পড়লো নিজাম।

‘রিলিফ ফান্ডে বেশ রেস্পন্ড পাওয়া গেল। দুশো উঠে গেছে ইতোমধ্যেই।’

আপনার সৌভাগ্যকে ঈর্ষা করি – সহানুভূতি জানাই হাতেম তাইদের। অবশ্যি কথাগুলোর একটাও উচ্চারণ করল না নিজাম।

বহ্নিশিখা উদ্দীপ্তকারী মেয়েটার এবার বিদায় নেবার পালা, ‘আমি চলি তাহলে।’

‘হ্যাঁ এসো – কিন্তু একা ফিরবে। কাউকে –

‘না না, তার দরকার নেই।’

‘তুমিও তো ওদিকেই যাবে নিজাম?’

‘উনি কোথায় থাকেন?’

‘বেলতলা।’

‘চলুন না’ – মেয়েটার মুখে একটা করুণ আবেদন।

‘মাপ করবেন, আপনার অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ যেখানে কাটাকুটি করেছে সেখান থেকে আমাকে আরও দু’মাইল যেতে হবে’ –

‘একটু না হয় কষ্ট করলেনই’, মেয়েটা হাসতে জানে আবিষ্কার করল নিজাম।

‘না না, তা কেন?’

‘তবে?’

‘ধরুন ভদ্রতার।’

* * *

বড় রাস্তা শেষ হয়ে এসেছে। পিচঢালা আলোকম-িত রাস্তার কৌলিন্যের কাছে নির্দয়ভাবে আহত ভাঙ্গাচোরা গলিটার ভেতর এসে পড়েছে ওরা। আশ্চর্য এখানেও মানুষ থাকে – জব চার্নকের বদৌলতে এখানটাতেও মাথাগুঁজে দিন গুজরান করছে প্রলুব্ধ নগরীর কর্মপ্রাণ নরনারী। ভাঙ্গা দেয়ালের ইটগুলোয় উপচে পড়েছে বড়          রাস্তার উদ্বৃত্ত খানিকটা আলো। ছোট ছোট ধীমে গ্যাসের আলো – নি®প্রভ করছে নিজেকে যেন এ এলাকার ভাগ্য বিড়ম্বনার সঙ্গে। একটা ল্যাম্প পোস্টের তলায় লাল রঙের পোঁচ। কেউ বলে না এ পানের পিক না গোরা সেপাইয়ের বুটের তলার রক্ত। ধার ধারে না কেউ।

‘কষ্ট হচ্ছে নাতো?’ রেকর্ডে পালা কীর্তনের মতো বড় নাটকীয় শোনাল কথাটা নিজামের কানে।

‘এই সাড়ে বত্রিশ মিনিট শুধু একথা বলবার অপেক্ষায় ওঁৎ পেতে ছিলেন বুঝি?’

একটু লজ্জা পেয়েছে মেয়েটা, ‘কী বললেন?’

‘না কিছু না – আপনার নামটা তো জানা গেলো না।’

‘জানতেও তো চাননি।’

‘মনে করেছিলাম – বহ্নিশিখা নামটাই হয়তো আপনার নিজস্ব।’

‘কেন?’

‘হারমোনিয়ামের রিডে টিপসই মেরে যেমন উঁচু গলায় বলছিলেন – আমি যে বহ্নিশিখা – ভাবছিলাম কেউ বুঝিবা ওই নামটায় সন্দেহ করেছে।’

‘আপনি বুঝি তাহলে নিজাম অব –

‘হ্যাঁ, অইটুকই জ্ঞানমতে ঠিক বলছেন। এরপর এগুতে গেলে আমাকে মুশকিলে ফেলবেন।’

‘দেখছেন ওই বাড়িটা – ওখানটায় থাকি।’

একটা ভাঙ্গা অট্টালিকার প্রাগৈতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ। বাইরে একটা চটের পর্দা। নিজাম আর একবার চোখ মেলে তাকালো মেয়েটার দিকে। বিচিত্র পরিবেশ – আর প্রতিকৃতি। মেয়েটা আর বসতবাটি, ব্যঙ্গ করছে যেন কেউ কাউকে। জর্জেটের দামি শাড়ি আর চটের শস্তা পর্দা – নির্মম বৈসাদৃশ্যের দুটো উঁচু পাহাড়।

‘আপনি তাহলে আসুন।’

‘বসতে বলবেন না।’

‘না নিজাম সাহেব। আমাদের এখানটায় কেউ বসে না। বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলে। একটা কামরায় আমাদের নাওয়া খাওয়া সব। আর একথা বলতে তো বাধা নেই আমরা সত্যি গরিব।’ 

‘আপনার আজকার রূপচ্ছটাকে সাক্ষী মানলে তা বোঝার কোনো উপায় থাকছে না।’

‘থাকে যদি সেই রূপচ্ছটার ভড়ং আপনাকে খুলে বলতাম।’

‘কিন্তু সে কথা যাক। আরেক দিন হবে।’

‘লুসি এসেছিস’, ভেতর থেকে ভাঙ্গা গলার আওয়াজ এসে পৌঁছায়। নিজাম তখন অনেকদূরে চলে এসেছে। আবার সেই আলোকদ্দীপ্ত জব চার্নকের অমর রূপায়ণ বৈভব বৈশাল্যে পরিপূর্ণ চৌরঙ্গীর ওপর।

* * *

কিন্তু বৈসাদৃশ্য তো একটা নয়। উপরের চারতলা বাড়ি বেসামাল ঠেকছে ভাঙ্গা আস্তাবলের টিটকারিতে গ্রেট ইস্টার্নের শ্বেতস্য রূপের চাম্চে কামড়ে ধরা মানুষগুলোর পায়ের ধুলো সাফ করতে গিয়ে অজস্র নোনা ঘাম ফেলেছে শ্যুশাইন বয়গুলো। নিউ মার্কেটের আপেল কিসমিসের দোকান থেকেও পচা সুঁটকি বিক্রেতাদের দুর্গন্ধ-ভারী নিশ্বাস রুখে দেয়া গেলো না। ভূগোলের পৃষ্ঠায় সাদৃশ্য ও অসাদৃশ্যের দীর্ঘ ফিরিস্তি মুখস্ত করেছিল নিজাম – জীবনের রোজনামচায় আজ তারই আনাগোনা।

কৌলিন্য আর মর্যাদা-রক্ষী সমাজের ইট-কাঠ-পাথরেও আজ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবার আওয়াজ তাল পাকিয়ে উঠেছে।

বাইরন কোম্পানির দিনমজুরদের ফিরতি পথে লাইট হাউসের বারান্দা পেরুতে দেখে দীর্ঘচুম্বি লৌহ মাস্তুলটা একদিনও কি আক্ষেপ করেনি – মাপ করবেন – মাপ করবেন মহাপ্রভু? এরা জানে না – এরা কী করেছে।

চৌরঙ্গী – ইতিহাস দেখেছে এ চৌরঙ্গী। কেউ খাতা খুলে হিসেব করেনি – এর অসংখ্য দেদীপ্যমান আলোর ঝলকানি – এর বিলাস-ব্যাসনের ব্যয়বরাদ্দ; পঞ্চাশের মন্বন্তরে কেউ গোনেনি সেই চিমসান হাড়ের জঞ্জাল। যা গেছে তা গেছে – কারও বিলাপ আক্ষেপ ভ্রƒক্ষেপ সব মিলিয়ে গেছে। যে ট্র্যাডেজি একবারই ঘটেছে সভ্যতার মুখে চুনকালি মেখে – সে ট্র্যাজেডি শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথের চাইতেও কি ছিল বেশি দামি? নিশ্চয়ই না। কারণ ১৩৫০ সালেও জ্ঞান-পিপাসুরা করড্রয়ের পাতলুনে হাত ঢুকিয়ে চকচকে টাকা বের করেছে আর শেক্সপিয়রের বই কিনেছে। মানুষ মরে গেলো – মরে যাক। ঐতিহ্য তো বেঁচে রইলো। একরত্তি ভাতের জন্যে যে চোখের পাতা বুজলো তাকে দেখে শোকাপ্লুত হয়নি চৌরঙ্গী। নিয়নের ঔজ্জ্বল্য বর্ণচ্ছটা ফেলেছে – রেস্তোরাঁয় কাঁটাচামচের বিরতি ছিল না মুহূর্তের জন্যেও। প্রাণবন্ত মানুষের মর্মান্তিক ইতিকথা ধুয়ে গেছে রাস্তার দুধারের ময়লা পাইপের পানিতে।

মার্কিন পদাতিক সেনার কুচকাওয়াজের তলায় মেহনতী মানুষের আর্তনাদ হয়েছে বিলীন। তারপর সব চুকে গেল। সময়ের বুলডেজার এসে থিতিয়ে দিলো সব – বিপুল বৈভবে ঝেঁটিয়ে নিয়ে গেলো সে ইতিহাস।

একশ ফুট চওড়া রাস্তার ইটের খাঁজেও এতটুকু ফাটল নেই যে, এক ফোঁটা রক্তের বীজাণু ইতিহাসের মহীরূহ রচনা করে যাবে। না – চৌরঙ্গীর নিখুঁত রাস্তায় তার অবকাশ নেই।

নৌ বিপ্লবের সময় যে আগুন জ্বলে উঠেছিল আরেকবার যে চিৎকার হয়ে উঠেছিল প্রাণবন্ত – অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে যে হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারত দুর্বার – সে ইতিহাসকে পিছয়ে দেয়া হলো। ব্রিটিশ জাহাজের চিমনীতে আবার ধোঁয়া গর্জে ওঠে – তার বয়লারে আবার আগুনের লেলিহান উত্তাপ।

এ চৌরঙ্গীর চৌমাথায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বেয়নেট উঁচিয়ে তুলল – বিক্ষুব্ধ মানুষের চিৎকার ওরা থামিয়ে দিয়েছে। স্বদেশপ্রেমিক নেতৃবৃন্দ দুঃখ প্রকাশ করেছে – অনুতপ্ত হয়েছে – ছত্রিশবার বিলেতের দিকে সেজদা দিয়ে কানমলা খেয়েছে।

চৌরঙ্গী নিথর হয়েছে আবার।

রশীদ আলী দিবসে বিপ্লবী মানুষের কণ্ঠস্বর উঠলো – লাল হয়ে গেলো ডালহৌসির নর্দমা। ইউনিয়ন জ্যাকের ধুলোপড়া পতাকা লালবাজারের সৌধ শীর্ষে ‘দেশপ্রেমিক পুলিশদের’ তলব করল। গোরা সেপাই এলো – হাত মকস করে নিল নিরপরাধ দুধের বাচ্চার ওপর। লাল রক্ত চুইয়ে চুইয়ে সোয়ারেজের তলা দিয়ে মিশে গেলো গঙ্গায়। আরেকটা অধ্যায় শেষ হয়েছে।

চৌরঙ্গীর মানুষগুলো কি বাঁদর নাচা নেচেছে সেই পনেরোই আগস্টে। জাতীয় পতাকার দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলেছে। দেশপ্রেমিকদের থ্যাবড়ানো মুখের প্রতিকৃতির দিকে তাকিয়ে বুকে ধরেছে চাঁদা করে হেজাক জ্বালিয়েছে, বিনি টিকিটে ট্রামে চড়েছে।

কিন্তু সে ছিল স্বপ্ন। চৌরঙ্গী – জানে। তাই গভর্নরের প্রাসাদ সৌধে রাজমুকুট সমাহিত পতাকাটা জাতীয় পতাকার পাশাপাশি থেকে আড়চোখে হেসেছে। স্বাধীনতা পেলাম আর তাই দিয়ে প্রমাণ করলাম সত্যি আমরা সাইনবোর্ড লিখতে জানি দুনিয়ার যে-কোনো দেশের চাইতে ভালো করে। ক্লাইভের নাম ঘষে মেজে নেতাজী স্ট্রিট বড় করে লেখা হলো। আমলা আপিসের পতাকাদ-ে জাতীয় পতাকা উঠলো মই বেয়ে। তলায় রইল সেই তলানি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পোষাপুত্রের দল মদ খেল বেশি করে – গ্রান্ড হোটেলে বসলো নাচের জলসা ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে-র আনন্দে।

চৌরঙ্গী হাসলো। কেউ বদলাতে পারলো না এ নাম। জব চার্নকের কলকাতা – যেখানে এখনও বাঙালকে হাইকোর্ট দেখান যায়।

অনেকদুর এসে পড়েছে নিজাম। পেছনে মোটরের হর্ন শুনে সচকিত হয়ে উঠল। এটা একটা ক্রসিং – সেই লাল আলোর হাতছানি – কে জানে কার? – পঞ্চাশের? নৌ বিপ্লবের? রশীদ আলী দিবসের?

* * *

অত রাত করে মেসে ফিরে এসে খাবার পাওয়া যাবে না। ইফতিখারের বাড়িটাই কাছে পড়ে। একটু সঙ্কোচে বাধলো – ওই বাড়িতে তার দাবি করবার মতো যা তা কেবল মাসের শেষে স্রেফ চল্লিশটা টাকা। বসবার যা কিছু জায়গা তা শুধু ওই একটা চেয়ারে – যেখানে বসে অন্যান্য মাস্টারেরা এ বাড়ির ছেলেদের ইতিপূর্বে মেধাবী করে গেছেন। আরেকটা অধিকার আছে ওর – পড়াবার সময় ইফতিখারের তকমা আঁটা চাকরদের দুটো একটা হুকুম সে করতে পারে – যা কিনা অন্যত্র সম্ভব ছিল না। দাবির খতিয়ানে আর কিছু লিস্টভুক্ত করতে ও সাহস পেল না।

বিচলিত হলো না নিজাম – যখন ও আবিষ্কার করল সত্যি সত্যি ইফতিখারের ইমারতের দরজায় ও কড়া নাড়ছে। এদ্দূর হাঁটতে গিয়ে পা’টা টন্ টন্ করে উঠেছে। এবার একটু জিরোবার মতো জায়গা খুঁজে পেলেই হয় – তার চাইতেও বড় কথা ক্ষিধে পেয়েছে। কিন্তু কথাটা কী করে পাড়বে। সামান্য দু’মুঠো খাবার – ইফতিখারের ডাইনিং টেবিলের উচ্ছিষ্ট আহারের কাছেও যা নিমিত্ত মাত্র। কড়া নাড়ার ডাক শুনে নাসিম বানু বেরিয়ে এলেন নিজ থেকে, ‘কে নিজাম – এসো,  এসো – এত রাত্তিরে।’

‘একটু বোসব –

নাসিম বানুর প্রশ্নের সদুত্তর যে এ নয় নিজাম তা বুঝেছে।

না আজ মাস্টারের বরাদ্দ শিশু কাঠের চেয়ারে নয় – নাসিম বানুর দামি কুশনে। নাসিম বানুর খাস কামরায় – দুটো বড় বড় শেডের আলো নিক্ষিপ্ত হয়েছে মোজাইক করা তক্তকে মেঝেয়। হাতের কাজ ভালোই জানেন নাসিম বানু। কবে কোন আমলে যে তিনি গৃহকর্মে সুনিপুণা ছিলেন তার টিপসই ওই কয়টি ফ্রেমে বাঁধানো, এমব্রয়ডারিতে পিয়ানোটায় ধুলো জমেছে অজস্র – একসময় গানের শখ ছিল হয়তো। শো-কেসে সাজানো রয়েছে দামি কাচের আসবাবপত্তর। কোনোদিন এগুলো কাজে এসেছিল কিনা কেউ হলফ করে বলতে পারে না।

এমন ছেলেমানুষের মতো করে কথা বলতে জানেন নাসিম বানু – এটা নিজামের কাছে সম্পূর্ণ অনাবিষ্কৃত, ‘কোথায় গিয়েছিলাম জানো?’

যে-কোনো জায়গায় যাওয়াই বিচিত্র নয়। সিনেমা থেকে সিঙ্গাপুর, যে-কোনোটাই হতে পারে। তবু আঁচ করে বললো নিজাম, ‘পিকনিকে হয়তো।’

‘না – না, তুমি একদম কি যে ভাবো। আমার কি ছাই ওসব করবার বয়েস আছে। তোমার জন্যে একটা জিনিস নিয়ে এলাম।’

একটু হাসি পেল। কিছু হাসি ওর কাছে এ সময়টায় বড় দুর্লভ। সারাদিনের     ক্লান্তিতে হাঁপিয়ে পড়েছে বড়। নাসিম বানুর কথাটা ওর কানের পর্দায় আর মনের পর্দায় ঘা খেল। কথাটা কি সত্যি নাসিম বানু বলছেন। জড়িয়ে আসা অনুপম বিস্ময়ে বলে উঠলো নিজাম, ‘আমার জন্যে?’

‘হ্যাঁ। একটা আংটি।’

‘কিন্তু আমি তো চাইনি।’

‘আমি জানি তুমি চাইবে না।’

‘উপলক্ষ তো থাকা চাই একটা।’

‘না, নিজাম আমি উপলক্ষের ধার ধারি না। আমার ইচ্ছেটাকেই তুমি উপলক্ষ আর উপলক্ষটাইকে আমার ইচ্ছে বলতে পার। আমি জানি তোমার আপন বলতে আর কেউ নেই – তাই কারও কাছে হাত পেতে কিছু চাইতে তোমার বাধে।’

একটু কাৎ হয়ে বসলো নিজাম – ‘কেউ নেই এটা আমার বড় অপরাধ নয় বেগম সাহেবা, বড় অপরাধ আমার সে জিনিস নেই যা থাকলে আপনার মতো আমার উপলক্ষটাও ইচ্ছে হয়ে উঠতে পারত।’

নাসিম বানু বেশি কথা বলা পছন্দ করেন না, কারণ কেউ তাকে তা পছন্দ করবার সুযোগ দেয়নি। ভ্রƒকুটি করে চাইলেন নিজামের দিকে শুধু একবার, ‘এত কথা তোমার কাছে আমি শুনতে চাইনি।’

ঠিক এতটা আশা করেনি নিজাম। নাসিম বানু পর্দাটা ফাঁক করে বেরিয়ে গেলেন পাশের কামরায়। যাবার আগে বলে গেলেন, ‘তুমি বসো।’

একটুখানি অমান্য হয়েছিল নাসিম বানুর কথার। নিজাম বসতে পারেনি ঘুমিয়ে পড়েছিল সেই সোফার ওপর।

* * *

পুলকভরা অবসাদ নিয়ে ঘুম ভাঙ্গল। কালকের রাতের রূপকথা নিজামের মন থেকে এক শতাব্দী পিছিয়ে গেছে। অনেক কিছু যা ঘটে গেলো তার দায়িত্ব থেকে ওর মুক্তি বিঘোষিত হয়েছে যেন আজকার নরম মিঠে রোদে। একটু হাওয়ায় কেঁপে ওঠে জানালার ওপর ভয়েলের পর্দাটা আর সেইসঙ্গে ওর মনের। কোনো কারণ নেই কোনো যুক্তি নেই কালকের স্বয়ংবিবর্তিত ঘটনার পশ্চাতে। তবু মনের মঞ্চে যবনিকাপাত হয়েছে সে সবকিছুর। আর নয়! সহস্র রাতের চাইতেও এই একটি রাত এসেছিল ওর জীবনে ওর উষ্ণ ভবিতব্যের তলবনামা নিয়ে। মহীয়সী নাসিম বানু প্রসন্ন হয়েছিল ওঁর ব্যথাকাতর জীবনের প্রতি হয়তো সহানুভূতিশীল হয়ে। আর ওরকম ভুল নাসিম বানু কখনো করবেন না – হয়তো এতক্ষণে তাঁর অনুশোচনা হয়েছে।

চোখ তুলে চাইতে পারছিল না নিজাম। কালকের নাসিম বানু এ নয়, রাতের অন্ধকারে একটা জিনিস ওর চোখে ধরা দেয়নি। নাসিম বানুর মুখেও ওই একটা তেরচা মাংশল ভাঁজ রয়েছে যেটা চোখের চত্বরের ঠিক তলায়। তাঁর ভুরুর সন্ধিক্ষণে চামড়াটা কুঁচকানো যায় অনায়াসে – কৌলিন্য-পরায়ণ ব্যক্তিদের যেটা বড় শীলমোহর। আরেকটা জিনিস ভুল করছে নিজাম – নাসিম বানুর জড়োয়া গয়নাগুলো দেখেনি – তাঁর মূল্য নির্ণয় করবার বহু আগেই যেগুলোর মূল্য নির্ণীত হওয়া উচিত ছিল। আরও একটা জিনিস লক্ষ করেনি নিজাম – ঝুলন্ত পিরামিডের মতো তার প্রগতিশীল নাক, যা কিনা ঠিক ততখানি এগিয়ে আছে যতখানি মুখটা গেছে পিছিয়ে। বড়শির আংটার মতো ছিনিয়ে আঁকড়ে নেবার মতো ক্ষমতালিপ্সার টিপসই।

নাসিম বানুর বয়েস কেউ জানে না। কারণ যে ভাগ্যবান পিতা, একসময় সে কথা বলতে পারতেন আজ তিনি বেঁচে নেই। এই বিরাট ইমারতের আট দশটা আসবাবপত্রের মতো মিশে গেছেন নাসিম বানু নিজে থেকে। আজ তাঁকে আলাদা করে নেওয়া যায় না। আলাদা করে রাখেও না কেউ। ধুলোপড়া পিয়ানোটা আর রং-ফ্যাকাসে এমব্রয়ডারিগুলোর দিকে তাকাতে গিয়ে তাই সবাই একবার করে তাকায় নাসিম বানুর দিকে। চাবির গোছায় যতগুলো চাবির বাহুল্য ততগুলো তরঙ্গ তাঁর আছে কিনা সে কথায় কেউ মাথা ঘামায় না। বাজার খরচের খাতায় দু’পয়সার পানের হিসেব লিখেও কেন নাসিম বানু করিম বক্সের মেয়ের বিয়েতে পাঁচশ টাকা বের করে দিলেন সেটা নিয়ে বাকবিত-া চলে না। আরও একটা জিনিসে এ বাড়ির কারও কোনো ঔৎসুক্য নেই – রাত বারোটা জেগে ডাইরি লেখার পেছনে তাঁর ঔদার্য নিঃশেষ হলো না কেন?

একথা ইফতিখারও বোঝেন যে স্বামী-স্ত্রী হলেও তাঁরা হাঙ্গেরির রাজধানীর বুডাপেস্টের মতো অসংলগ্নভাবে বুডা এবং পেস্ট। বিয়ের তক্তায় দুজনের মাঝখানকার ভেদাভেদটা জুড়ে দেয়া হয়েছে মাত্র। আপত্তি অবশ্যি জানাননি ইফতিখার। সম্রাট জাহাঙ্গীরের কথাটাও তিনি ক্লাস থ্রির ইতিহাসে পড়েছেন, তাই নাসিম বানুর প্রতি তাঁর ভরসা ছিল বরাবর। কথা কাটাকাটি হয়েছে খুব কমই। একটা সন্তানের জন্ম দিয়ে নাসিম বানু তাঁর শোবার ঘরটা আলাদা করে নিয়েছেন। নিষ্ঠাবান স্ত্রী হিসেবে স্বামীর প্রতি তাঁর কর্তব্য যথার্থ রক্ষিত হয়েছে একথাটা তিনি বুঝিয়েছেন ইফতিখারকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে। জীবনের দু’ধারে সোরগোল হলো না – বিপ্লব হলো না। দুটো জীবনের চৌহদ্দিতে ভিড় জমল, আনাগোনা হলো, কিন্তু তা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের কড়া যূপকাষ্ঠে। ইফতিখার ক’টা ব্যাংকের শেয়ার কিনেছেন, ক’গেলাস মদ খেয়েছেন সে কথা ভেবে অনিদ্রা হয়নি নাসিম বানুর। কেন করিম বক্সের মেয়ের বিয়েতে পাঁচশ টাকা দিলেন সেটা নিয়ে কোনোদিন কৈফিয়ৎ চাইতে আসেনি ইফতিখার। দুটো রেখা কাটাকুটি করল না – সমান্তরাল রয়ে গেল, এ যুক্তিটা দুজনের কাছেই বোধগম্য হয়ে গেছে। বাসর ঘরের শুভলগ্নে ইফতিখার কবিতা করে কথা কইতে পারেননি – মুষড়ে পড়া চৈত্রের দুপুরে নাসিম বানু মেঘ-মল্লার গাইতে চাননি, এ সামান্য দুটো ঘটনা নিয়ে মনকষাকষি চলতে পারত – কিন্তু চলেনি। অথচ অজস্র কবিতা পড়ে শুনিয়েছেন ইফতিখার আমিনকে কোলে নিয়ে। সেতারের মেঘ-মল্লার তুলেছেন নাসিম বানু তাঁর কপাটবদ্ধ কামরার বহু নিরলস দুপুরে। তবু কেটেছে দিন আর বছর। সন্ধের সময় ড্রয়িংরুমে পানের ডিবেটা নিয়ে বসেন নাসিম বানু – আর একটা বাংলা কাগজের ছোট লেখা মোটা চশমা নিয়ে পড়তে চেষ্টা করেন ইফতিখার। ইফতিখারের মতদ্বৈধ-মূলক চারটে ঘড়িতে কম বেশি দু’চার মিনিট আগে পরে বারোটা বাজে। ইফতিখার আর নাসিম বানু – বুডা আর পেস্ট; গা এলিয়ে উঠে পড়েন – মাঝখানে বিয়ের তক্তা।

* * *

নিজাম কথা কইল প্রথম, ‘আমি চলি বেগম সাহেবা। সারারাত তো কাল এখানেই কাটিয়ে দিলাম।’

নাসিম বানু দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সোনা বাঁধানো চশমার ফ্রেমটা সকালবেলার সোনালি রংটায় খেই হারিয়ে ফেলেছে যেন।

‘শোনো’ – নাসিম বানুর কথায় দুয়ার দিয়ে বেরুতে বেরুতে নিজাম পেছন ফিরে তাকাল।

‘গেলো মাসে সাতদিন কামাই করেছ – পড়াতে আসনি। বেতনটা কি পুরোই নেবে?’

কথাটা একেবারে অপ্রত্যাশিত। যা মুখে বেরিয়ে এলো তাই বললো নিজাম, ‘আমি আপনার দুধের জোগান নিইনি – প্রশ্নটা ওভাবে জিজ্ঞেস না করলেও পারতেন।’

‘তাহলে পুরোই নেবে’ – নাসিম বানু ভ্রƒকুটি করলেন, ‘আর কামাই করো না।’

টাকা কয়টা টেবিলের ওপর রেখে অন্তর্হিত হলেন নাসিম বানু।

যাবার আগে ফিরে এসে বললেন, ‘বাইরে খুব ঠান্ডা পড়েছে – শার্টের বুতোম লাগিয়ে বেরুবে – বুঝেছো?’

কাগজের চারটে নোট দুমড়ে নিয়ে পকেটে পুরল নিজাম।

* * *

যদি এ সময়টা কেউ এসে বলত নিজাম ওর সুদুর ভবিষ্যতের লিস্টি করছে – দোষ দেয়া যেত না তাকে। কুইনিনের মতো তেতো অতীতকে ও বরদাস্ত করতে পারেনি – পারেনি, কিন্তু একটা জিনিস পেরেছিল, ইফেল টাওয়ারের মতো দাঁড়িয়ে যেতে পেরেছিল পা ফাঁক করে তারই তলায় দলবেঁধে মিছিল করে গেছে ওর জীবনের       দ্বন্দ্বসঙ্কুল দিনগুলো। ওরই তলায় পথ করে নিয়েছে অনেকের কটাক্ষ, কলহ কলধ্বনি। বাতাবিনেবুর মতো চপকানো হয়েছিল ওর জীবন – কিন্তু রসহীন সে হয়নি। অভিযোগ করবার খাতায় ও যা লিখতে পারত তা দিয়ে দশটা এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা প্রসব করা যেত। কিন্তু নিজাম ভুল করে প্রতিজ্ঞা নিয়েছিল ওর জীবনের প্রতিটি পাঁজর যারা গুঁড়িয়েছে ও তাদের তেমনি করে গুঁড়িয়ে মারবে, প্রতিটি সম্ভাবনাময় দিন যারা লোকসান করেছে তাদের লাভের বিপণালয় থেকে এক কাঁচ্চা পটেসিয়াম সাইয়ানাইড জোগাড় করবার প্রয়োজন ঘটায়নি নিজাম ওর জীবনে।

কালকের রাত, আজকের সকাল। আর তার মাঝখানে ফাঁকা স্মৃতির আসর। নাসিম বানু, ইফতিখার, লুসি সমান্তরাল হয়ে দাঁড়িয়েছে ওর জীবেন। ঘটনার রঙ্গমঞ্চে ছড়িয়ে গেছে ও – দায়িত্ব ওর ছিল না যেমন, নিষ্কৃতিও ছিল না।

‘আপনি এখানটায় –

স্টিমফাটা কণ্ঠস্বরের সাড়া পেয়ে ফিরে তাকালো নিজাম, ‘গুরুতর অপরাধ হয়নি নিশ্চয়ই।’

‘না’, লুসির গালে টোল পড়ছে কেবল কথা কইতে গিয়ে, ‘ভাবছি এ সময়টা এ রাস্তার বাড়িগুলোর লৌহগরাদ শুঁকে বেড়াচ্ছেন কেন।’

‘রাস্তা একটা হলেই হলো –

‘আর তা’যদি রোম শহরে পৌঁছায় তা আরও ভালো কথা – কী বলেন?’

‘আপনার রোম শহরটা যে এত কাছাকাছি তা তো জানতাম না।’

‘বাঃ এরই মধ্যে ভুলে গেছেন, আচ্ছা লোক তো আপনি।’

নিজাম কতক্ষণ তাকিয়ে ছিল – হিসেব করে দেখেনি। কারণ একটা ঘড়ির দু®প্রাপ্যতা। তার জীবনে তখনও অনাবিল। লুসিকে সুন্দর দেখাচ্ছে – অথবা হয়তো সুন্দর চোখটা ওর পলক ফেলেছে ওর ওপর। কোনটা কে জানে। একটু থেমে কথা কইল নিজাম, ‘চলো লুসি একটু বসে কথাবার্তা বলবো – আপত্তি নেই তো।’

‘চলুন।’

* * *

আশ্চর্য। বড় রাস্তাটায় যত লোকের আনাগোনা এ এলাকার এই চা-ঘরটিতে ততো বেশি নিরিবিলি সন্দিগ্ধতা। দুটো চেয়ার বাদ দিয়ে বসেছে তিনজন; তার ভেতর দুজন চীনে। একজনের পকেট থেকে ছুঁচোর মতো জুতোর ডিজাইনটা ওৎ পেতে আছে। লোকটা গঁৎগঁৎ করে কফি গিলছে।

চীনের লোকটা জুতোর ঊর্ধ্বে উঠেছে তা পরিষ্কার বোঝা যায়। চীনের লড়াইয়ের তীব্রতার কথা আলোচনা হচ্ছিল। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরিজি কেবল আমরা বলি এ দুর্নামের হাত থেকে অব্যাহতি দিচ্ছিল লোকটা ওর চন্দ্রবিন্দুবহুল বাক্যাংশের আধিক্যে।

বিদেশী ভদ্রলোক মার্কিন হবে – কারণ মার্কিন ঐতিহ্যধারী চুইংগামটা চিবুচ্ছিল অনবরত। চিয়াং কাইশেকের ওপর লোকটার কারুণ্য প্রকাশ পেল একটুতেই – ‘এত রসদ দেয়া হলো – অথচ কিচ্ছু করতে পারলো না বেটা চিয়াং’।

কফির পেয়ালার বিরতি দিয়ে কথা কইল চীনে, ‘রসদ দিয়ে কী হবে, বিদেশীর কাছ থেকে ডলারে আর যাই হোক সংগ্রামী মানুষের লড়াই ঠেকিয়ে রাখা যায় না।’

‘চিয়াং-এর বিরুদ্ধে লড়ছে কেন শুনি।’

পাশের আরেকজন চীনা চুপ করেছিল। কাবাবের প্লেট থেকে একটা রুমালে হাত মুছে নিয়ে বলল, ‘বলতে পারত যদি আমার ছেলেটা বেঁচে থাকত।’

‘কেন, ছেলে তোমার যুদ্ধে মারা গেছে নাকি?’ জিজ্ঞাসুনেত্রে তাকালো মার্কিনি।

‘মারা গেছে সেটা আমার দুঃখ নয়। দুঃখ মরবার আগে চীনে দস্যু চিয়াংকে ও মেরে যেতে পারলো না। তুমি চীনাদের চেন না সায়েব। স্বাধীনতার জন্যে যে রক্ত ওরা ফেলেছে তাতে তোমাদের মার্কিন মুল্লুকের সব নদীগুলো ভরাট করে তোলা যেত।’

মার্কিনি খুশি হতে পারেনি তা স্পষ্ট বোঝা যায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হাতটা তুলে নিল; বিদায় নিয়ে বলল, ও বেরুচ্ছে – ওর একটা কাজ আছে। কাচের পর্দায় কর্মব্যস্ত মার্কিনিকে দেখল ওরা হনহন করে ছুটে চলেছে চৌরঙ্গীর মাথা বরাবর। চীনা দুজন হেসে উঠলো – তারপর গম্ভীর হয়ে গেল, পরস্পরের দিকে তাকিয়ে।

* * *

‘কথা বলছো না যে,’ অভিযোগটা মিথ্যে করেনি লুসি। আধঘণ্টা কাবার হয়ে গেছে ততক্ষণ।

‘কী বলব’, একটু মুষড়ে পড়া সুর নিজামের গলায়।

‘কিছুই কি নেই।’

‘আচ্ছা লুসি একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞেস করি কিছু মনে করবে না তো?’

‘আপাতত সে দুর্ভাবনা থেকে আপনাকে মুক্তি দিচ্ছি।’

‘কাউকে কোনোদিন ভালোবেসেছ তুমি,’ এক নিশ্বাসে কথাটা উচ্চারণ করল নিজাম।

লুসি নিরুত্তর। জুতোর তলায় নিপিষ্ট একটা বিস্কুটের টুকরোর দিকে তাকিয়ে মুখ নিচু করে আছে।

‘প্রশ্নটা বোধহয় না জিজ্ঞেস করলেই ভালো হতো – না?’ 

‘না, তা নয়। কিন্তু এ প্রশ্নের জবাব একজন মেয়ে কীই বা দিতে পারে বলুন।’

‘পারে বৈকি। অন্তত সে বিশ্বাসই তো আমার বরাবর ছিল।’

‘বেশ, এড়িয়ে আমি যাবো না – কথাটা তাহলে খুলেই বলি – দেখুন, কোনোদিন ভেবে দেখিনি – কারণ তার চেয়ে বড় ভাবনা আমার জীবনে অপ্রচুর নয়। জীবনটা আমার কাছে মখমলে মোড়া, জরির সুতোর পাক করা হয়ে আসেনি নিজাম সাহেব – তাই ভাবনাগুলো আমার একটু অন্যকরম। আর তাছাড়া এ কাজটা তো এত জরুরি নয় যে, যে-কোনোদিন শেষ করা যাবে না।’

‘অনেক কথা শিখেছ লুসি। বইয়ের উদ্ধৃতি মুখস্থ করেছ বুঝি।’

‘না, তাও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। পয়সা আমার বিলক্ষণ নেই কিনা।’

একটু থামলো নিজাম। নতুন লুসির পরিচয় সে পেয়েছে। এ সে ‘বহ্নিশিখা উদ্দীপ্তকারী’ লুসি নয় – তার অন্য সংস্করণ হয়তোবা।

‘বুঝেছি, এসব প্রশ্নের জবাব তোমার কাছে পাওয়া যাবে না। ব্যক্তিগত জীবনটাকে একেবারে নির্বিচারে নিজের কুক্ষিগত করে রাখতে চাইছ। তা ভালো – অহমিকা তোমার অমর হোক।’

‘আশীর্বাদ করতে কাউকে বলিনি। তবু থাক আপনি, নিজে থেকে যখন করেছেন বাদ সাধছিনে। তা শুনুন আপনাকে একটা কথা বলবো – শুনবেন? যত বড় দার্শনিক নিজেকে ভাবছেন তার কিছুই আপনি নন। প্রতিভাও আপনি নন – যে প্রশ্নগুলো যে পরিবেশের ভেতর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন তা দিয়ে যদি আপনাকে বিচার করি তাহলে বলবো আপনি বেশি মাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক আর স্নায়ু সচেতন। যা আপনি আমাকে প্রশ্ন করছেন ঠিক সে প্রশ্নটা যদি আমি আপনাকে করি কী বলবেন তাহলে?’

বড় মারখেয়ে গেল, নিজাম – একটা সামান্য মেয়ের কাছে। আশ্চর্য এমন কথা তাকে শুনতে হবে। পরের কথাটা একটু চড়িয়ে বললো নিজাম, ‘আমি দর্শন শুনতে আসিনি, গপ্প করতে এসেছিলাম। তোমার সুচিন্তিত মন্তব্যটা নাইবা শোনালে।’

লুসি হেসে উঠল, ‘আপনি দেখছি রাগীও বটে।’

জবাব একটা দিতে পারতো নিজাম কিন্তু ইচ্ছে করেই দিলো না – কারণ কথাটা একটু বেশি মাত্রায় রূঢ় শোনাতে পারত।

রজতশুভ্র দাঁত বার করে হাসল লুসি, একটুখানি অবজ্ঞার, একটুখানি করুণার, একটুখানি প্রীতির, ‘গম্ভীর হয়ে থাকলে আপনাকে কিন্তু বড্ড বোকা দেখায়।’

‘বোকা আমি একা নই লুসি – গাম্ভীর্যের চূড়ান্ত বজ্জাত অতলান্তিকটাও তাহলে চরম বোকা। এভারেস্টের হিম-শুভ্র শীর্ষদেশকেও উজবক বলতে পারতে, আর ঐ বিরাট আকাশের চাঁদটার দিকে তাকিয়েও একবার একটু তির্যক হাসি হাসতে পারতে হয়ত লুসি।’

একটা কৃশকায় লোক এসে ঢুকলো রেস্টুরেন্টে। সজারুর মতো তেরচা খাড়া খাড়া চুল। মুখটা পোড়া ইটের মতো লাল। শার্টের ভেতর থেকে ময়লা গেঞ্জিটা দাঁত বার করে হাসছে।

লোকটার পক্ষে নিজামকে আবিষ্কার করবার আকস্মিকতা ক্রিস্তোফার কলোম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের গুরুত্বের চাইতে কোনো অংশে কম ছিল তা বোঝবার উপায় ছিল না। গর্তে গুঁজে দেওয়া চোখদুটোর জানালায় লোকটার ঈষৎ রক্তাভ মণি দুটো কেঁপে ওঠে উত্তেজনায়। করাত কাটা দাঁত বার করে লোকটা চেঁচিয়ে উঠলো, ‘চিনতে পেরেছিস।’

‘বিলক্ষণ – তবে মনে হচ্ছে সংস্করণে তুমি বিক্রি হয়ে গেছ। এ যেন তোমার পরিমার্জিত দ্বিতীয় সংস্করণ। এত বদলে গেছ হীরু।’

‘বদলে আমি যাইনি – বদলে দেওয়া হয়েছে এই যা। তুই তো জানিস নিজে, যে পরিমাণে মদ আমি খেয়েছি সে পরিমাণে সোডা আমি খাইনি। যে পরিমাণে টাকা উজাড় করেছি – ভোগ করিনি সে পরিমাণে – এ দুঃখটাই আমার চিরন্তন।’

লুসির দিকে তাকিয়ে হীরু অপ্রতিভ হয়ে গেল, ‘কে রে, তোর বোন বুঝি?’

‘না।’

‘কোনো আত্মীয়া হবেন তাহলে।’

‘না। এতটা অবাক হয়ে গেলে। জীবনে কেউ হয় না, কিছু এসে যায় না, এমন কারও সংস্পর্শ তো তোমার জীবনে দুর্লভ ছিল না। তোমার এতটা বিস্ময় ভালো লাগলো না আমার। কেন মনে নেই –

‘নিজি আমি চলে যাবো যদি মেলা বাজে বকিস –

‘আচ্ছা তোমার মনের কাঁকর ভরা দিনগুলোয় সন্ধানী আলো ফেলব না। হীরু এত বছরেও তোর মনে আত্মপ্রশস্তির ক্ষুণিœবৃত্তি মিটলো না। আমি ভেবেছিলাম। তুই সত্যি বদলে গেছিস – কিন্তু না, ভুল আমিই করেছি – তুই বদলাসনি।’

হীরু সোজা হয়ে বসলো। লুসির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিছু মনে করবেন না, অনেক দিনের বন্ধু কিনা।’

‘না, মনে করব কেন’ – শুকনো হাসি লুসির ঠোঁটের পরিব্যাপ্তিতে, ‘আমি তাহলে উঠি নিজাম সাহেব। অনেক বেলা হলো। আসবেন একদিন।’

লুসি উঠে পড়লো।

‘ভদ্রমহিলার সামনে যা তা বললি কেন’, নিজামের কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে ধমকের সুরে কথা বললো হীরু।

‘ভদ্রমহিলা তোমাকে যা বুঝবার তা বুঝেই ফেলেছেন। আর না বুঝলেও তোমার লাভের খাতা ভারি হতো না।’

‘যাক ওসব। হ্যাঁ ভালো কথা। কী করছিস আজকাল।’

‘করবার মতো যুঁৎসই কিছুই একটা আমার যদি থেকেই থাকে সেটা আদৌ বিজ্ঞাপিত নাই বা করলাম?’

‘কেন – কেন, কেন,’ তিনবার একই কথার পুনরুচ্চারণ করে সামনে ঝুঁকল হীরু।

‘বোস্, বোস্, হীরু। তোকে দেখে একটা কথা মনে হয় শুধু। তোর এই ঔৎসুক্যপ্রবণতাটা যদি ব্যক্তি বাদ দিয়ে বস্তুমুখাপেক্ষী হতো – বিজ্ঞানের গলি-ঘুপচিতে একটা সতরঞ্চি তুমি বিছাতে পারতে হয়তো।’

একটু প্রসন্ন হয়েছে হীরু, ‘জানিস, ভালো ছাত্র বলে বড়াই ছিল একদিন।’

‘হ্যাঁ, অতি প্রাচীন কালে। আলেকজান্দার তখনো ভারত আক্রমণ করেননি।’

‘তোর সব কথায়ই শুধু –

‘বাকিটা আমি বলে দিচ্ছি – শুধু পরিহাস, এইতো। ভালো কথা কোথায়            উঠেছিস –

‘কেন জানিসনে বুঝি – একটু নিচু গলায় কথাটা বললো হীরু।

‘ওঃ – বুঝেছি। ২৯ নং মীর্জাপুরে – তা –

‘না, না, তাছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।’

‘আচ্ছা ওটা থাক কী বলিস। যাবো একদিন।’

* * *

দ্রুত পদক্ষেপে এগুচ্ছিল নিজাম। কিন্তু ইফতিখারের দহলিজের কাছটায় এসে ব্রেক কষতে হলো। একটা জিনিস নতুন ঠেকল ওর চোখে। ভরা সন্ধ্যায় ইফতিখার বাড়ি থাকেন না। অথচ আজ থাকছেন। সাধারণত ইফতিখার ক্লাবে যান আর ফেরেন সেই ন’টায় – কোনোদিন আরও দেরি হয়। নাসিম বানু হালিশহরে গেছেন একটা শিশু-সদন পরিদর্শন করবার মানসে।

ইফতিখারের চাপা গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। টেবিলের কাছঘেঁষা একটা মেয়ে – দূর থেকে এর বেশি কিছু লক্ষ করা গেলো না। ড্রয়িংরুমের সোফায় এসে বসলো নিজাম। যে ঔৎসুক্যের কথা পেড়ে নিজাম হীরুকে হিতোপদেশ দিয়েছে আজ সেই ঔৎসুক্যই কূল ছাপিয়ে উঠেছে ওর মনের স্বল্প সীমানায়। ইফতিখারের প্রতি একটা ঘৃণা ছিল ওর – যে ঘৃণাটা ও সার্বজনীন করে রেখেছে ওই সমাজের খয়েরখাদের জন্যে। কিন্তু অনেক দিনের আলাপ-পরিচয়ের সান্নিধ্যে একটুখানি সমবেদনা জমা করে এনেছিল। কিন্তু আজকার এই জটিল পরিবেশের ভেতর সব তলিয়ে গেছে।

সেদিন সকালের কাগজটা ভাঁজ হয়ে পড়ে ছিল কুশনের তলায়। কাগজটা হাতে নিল নিজাম। সেই পুরনো খবর – ল্যান্সডাউন স্ট্রিটে ডাকাতি হয়েছে; ডাকাতের সন্ধান পাওয়া যায়নি; পুলিশ খানাতল্লাশি করছে। আদিম বর্বর ঝুটো খবর – তেলেঙ্গানায় কম্যুনিস্টদের লুঠতরাজ। তবু পড়লো নিজাম – বড় খবর ছোট খবর আর ছুটকো খবর। এক পৃষ্ঠায় যা সমাপ্ত হয়নি অন্য পৃষ্ঠায় তা দেখলো – খবরের তলায় রয়টার, এ.পি’র নাম পড়লো। ‘হর্লিক্স সেবনের উপকারিতা’ থেকে শুরু করে সুন্দরী তারকাদের ত্বকরক্ষার গূঢ় কারণটি পর্যন্ত যেখানে বিজ্ঞাপিত হয়েছে, তাও পড়লো। বুড়ো চাকরটা জিজ্ঞেস করে গেলো চা দেবে কিনা।

না, চায়ের প্রয়োজন নেই। মানা করল নিজাম!

বড় ঘড়ির ঘণ্টাটা কান পেতে শুনলো। তাকিয়ে দেখলো ছোট কাঁটা সাত ও বড় কাঁটা বারোর কোঠায় এসে পৌঁছেছে। তবু হাঁ করে নিজাম শুনলো সময়সূচক প্রত্যেকটি ঘণ্টা – এক এক করে গুনলো যতক্ষণ না যোগফল সাত হয়েছে। সময় ওর প্রচুর – প্রচুর।

নাঃ এ অবস্থা ও বরদাস্ত করতে পারে না। ও যাবে, নিশ্চয়ই যাবে ইফতিখারের দহলিজে। দুয়ারে টোকা দিয়েই যাবে না হয়। তাহলে নিশ্চয়ই ইফতিখার আপত্তি জানাবেন না।

ইফতিখারের দহলিজের দিকে এগিয়ে যায় নিজাম। বারান্দা দিয়ে যাবার সময় পায়ের ধাক্কা খেয়ে এক বদনা ওজুর পানি গড়িয়ে পড়লো মেঝেতে, নাসিম বানুর ওজুর পানি – বদনাটা উঠিয়ে রাখলো নিজাম।

* * *

দহলিজ থেকে লুসিকে বেরিয়ে আসতে দেখে প্রায় গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠতে চাইলো নিজাম। কিন্তু পারলো না। বুক-জমা যে দুরন্ত নিশ্বাসটা ওর গলায় এসে ঠেকল তারই প্রকোষ্টে চাপা পড়লো ওর কণ্ঠস্বর। আগ্রহাতিশয্যে যে চোখটা উঠেছিল কপালের ওপর, বিগ্রহের তারল্যে তাই নেবে এলো চোখের কোটরে।

‘আপনি – এ সময়ে?’ লুসির কণ্ঠস্বরে সাতমেশালি সুর। ভয়, বিস্ময় তন্দ্রা, শঙ্কা স্বস্তি, পুলক ও দুর্যোগের অর্কেস্ট্রায় ওর গলা থেকে বেরিয়ে আসা কথাগুলো আহত আর প্রতিহত হলো চার দেয়ালের সীমানায়।

কিছু বলেনি নিজাম। কারণ এ প্রশ্নের জবাব হয় না। কেবল এ সময়টার ওপরই লুসির মৌরুসী পাট্ট আছে কিনা সেটা ওর জানবার কথা নয় বলে নিজাম দাঁড়িয়ে রইলো। ওর চোখের সামনে দিয়ে অন্তর্হিত হলো লুসি। পদক্ষেপের লঘু গুরু আওয়াজ মিলিয়ে গেলো ক্রমে ক্রমে।

একটা প্রচ- বিস্ফোরণ ঘটে গেলো ওর ভাবরাজ্যে। আর তার লাভা ছড়িয়ে পড়েছে ধমনীতে ধমনীতে, একটা সৌরজগতের চক্রাবেষ্টনে নিজাম জড়িয়ে গেছে নিজে থেকে। সেই মৌন প্রতিক্ষীয়মাণ নক্ষত্রের মতো ও হয়েছে নির্বাক। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলো – মেঘটা কু-লী পাকিয়ে চাঁদের কাছটায় হোঁচট খাচ্ছে বারবার। শিরিষ গাছের ডালগুলোয় একটা শিহরণ – আর কার গ্লানিমুখর অভিশপ্ত জীবনের বৈলাপ্যে কলের পানির কাতরানি মূর্ত হয়ে উঠলো।

‘কি হে, নিজাম’ –

ইফতিখারের গলা চিনতে ভুল হয় না। লোহার পিঠে রেত ঘষার মতো কর্কশ আওয়াজ।

ইফতিখার আরও একটা প্রশ্ন করেন দ্বিধাজড়িত চিত্তে, ‘তুমি কি এখুনি এলে – না অনেকক্ষণ হয় এসেছো।’

‘অনেকক্ষণ।’

একটু সামলে নিয়ে বলেন ইফতিখার, ‘তা বেশ – বেশ। মেয়েটিকে দেখেছ – প্রায়ই আসে – আমার নিজের মেয়েরই বয়েসী। মেয়ের মতোই স্নেহ করি কিনা।’

কথাগুলো শুনছিল না নিজাম। মনে হচ্ছিল এ ইফতিখার নয়। পুরাতত্ত্ব ইতিহাসের পাতা থেকে এক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ হয়তো – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর টোলে বসে নীতি কথা শোনাচ্ছেন।

হঠাৎ টেবিলের ওপর চোখ পড়তে একটা নতুন জিনিস আবিষ্কৃত হলো। কতগুলো সিগারেটের টিন উপুর হয়ে পড়ে আছে। টিনের গায়ে রিলিফ ফান্ডের ছাপা মোড়ক সাঁটা। টিনের ঝালাই করা ঢাকনিগুলো অপসারিত হয়েছে।

কথা না বলে পারলো না নিজাম, ‘রিলিফ ফান্ডের টাকা-পয়সাগুলো পাঠাননি?’

‘আর পাঠাব কি হে। এতদিনে রিলিফ মরে পচে ভূত হয়ে গেছে। ভাবলাম পড়ে ছিল – কাজে লাগুক।’

সক্রোধে উঠে দাঁড়ালো নিজাম, ‘ইফতিখার সাহেব ও পয়সায় আপনার কানা কড়ি অধিকার নেই, এ কথা বোঝাবার জন্যে লোক জমা করতে আমি চাইনি।’

‘কোনো বুদ্ধিমান মানুষই চাইবে না। দরকার হয় কিছু নিয়ে নাও। চেঁচামিচি করে কী লাভ নিজাম। তুমি অবাক হচ্ছো – তা হবে, বয়েস তোমার কতই হয়েছে। তবু কি জানো, এ কথা তুমি প্রমাণ করাতে পারবে না আমি রিলিফ ফান্ডের টাকা অপচয় করেছি। কারণ সে কথা কেউ বিশ্বাস করবে না।’

‘সেটাই তো আমার দুঃখ – বিশ্বাস কেউ করবে না।  যে দেশে গুলি খেয়ে মুখ বুজে থাকা যায়, দুর্ভাগ্যক্রমে সে দেশের মানুষ আমি এবং আপনি। নইলে আপনাকে খুন করবার মতো বড় অপরাধটা আমি করতে পারলাম না কেন?’

‘মাস্টার!’ ইফতিখার ধমকের সুরে কথা বলেন না, কিন্তু হুঙ্কার দিতে জানেন তা বুঝিয়ে দিলেন।

নাসিম বানু প্রকোষ্ঠে এসে ঢুকলেন। নিজামকে দেখে মাথার ঘোমটা টেনে নিলেন, হাতে জড়িয়ে নিলেন উদ্বৃত্ত আঁচলের খানিকটা, ‘আমার কামরায় এসো।’ ‘শুনেছো?’ – একটু থেমে আবার প্রশ্ন করলেন নাসিম বানু।

মাথা নাড়ল নিজাম।

নাসিম বানু একটা সিন্দুক খুললেন তার ভেতর হান্টলিপামার্সের একটা পুরনো টিন। তার গবাক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো একটা ভ্যানিটি ব্যাগ, ভ্যানিটি ব্যাগের          অন্তঃস্থল থেকে একটা বড়মতো খাম আর খামের গহ্বর থেকে একটা ছোট কাগজ। নিজামের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘দেখেছো – আমিন ফেল করেছে।’ 

‘আশাকরি আমিনের এ ভাগ্য বিপর্যয়ের সঙ্গে এতক্ষণে আমার অসামান্য সাফল্যের কোনো একটা যোগসূত্র খুঁজে বের করেননি।’

না বোঝার ভান করলেন নাসিম বানু, ‘তার মানে?’

‘মানে কিছু নয়, শুনেছেন বোধহয়, ভালো ক্লাস পেয়েছি আমি।’

একটা এলাচির দানা ভাঙ্গছিলেন নাসিম বানু। বিরতি দিয়ে বললেন, ‘আমিন ফেল করেছে কেন এটাই আমি জানতে চেয়েছি।’

‘বোধহয় নম্বর কম পেয়ে থাকবে।’

‘তা হলো –

‘তা হলো মাস্টার রাখার কী দরকার ছিল, সেটাই জিজ্ঞেস করতে চাইছেন এই তো’, নাসিম বানুর অর্ধ পরিসমাপ্ত কথা শেষ করলো নিজাম।

‘যদিও তা জানতে চাইবার অধিকার আমার ছিল কিন্তু সে অধিকারের অপপ্রয়োগ আমি করবো না।’

‘আমার কথা শুনবেন, এ ভরসা নেই। নইলে আপনাকে বিনি পয়সায় একটা সদুপদেশ দেবার সাহস প্রায় অর্জন করে এনেছিলাম?’

নাসিম বানু আরেকটা এলাচি চিবুলেন, কথা বললেন না।

‘একটা বদলানো দরকার হয়ে পড়েছে বেগম সাহেবা,’ নিচু গলায় বললো নিজাম, ‘হয় আপনার ছেলে নইলে মাস্টার। ছেলেটাকে বদলে অন্য ছেলে পরিগ্রহণটা যখন সম্ভবপর হবে না, আমি বলছিলাম কি, মাস্টার বদলে দেখা যেতে পারে তো অনায়াসে।’

‘নিজাম!’ – বিলক্ষণ গলা ফাটানো শব্দ সৃষ্টির পারদর্শিতায় নাসিম বানু অপরাগ নন মোটেই প্রমাণ করলেন।

গা মুড়ি দিয়ে ওঠার চেষ্টা করে নিজাম, ‘আজকের ধমক দিবসটা আমার মনে থাকবে বিলক্ষণ।’

‘ইফতিখার সাহেব আর আপনার ধমকটা দ্বৈত কণ্ঠে হয়নি এই যা, নইলে আমি ভয়ে পেটের ভেতর হাত-পা ঢুকিয়ে বসে পড়তাম। চাকুরির বরখাস্তের সুসংবাদটা সময় করে পাঠিয়ে দেবেন একদিন, আজ চলি।’

‘বসো – তুমি বেশি কথা বলো নিজাম।’

‘উপায় নেই, কারণ যা কিছু পাবার তা কোনোদিনই বেশি করে পাইনি, তাই যা কিছু বলবার চিরদিনই বেশি করে বলি।’

একটু বিব্রতবোধ করলেন নাসিম বানু। একটু নয় অনেকখানি। হাতের এলাচিটা গড়িয়ে পড়লো মেঝেয়। মাথার কাপড়টা আছাড় খেয়েছে ঘাড়ের চৌহদ্দিতে। সাত সাতটা সোনার বালা মাথা ঠোকাঠুকি করলো পরস্পর। চাবির তোড়াটা সজোরে বিক্ষিপ্ত হলো পিঠের ওপর।

‘মরিয়ম’, – একটা অধস্তন চাকরানির তলব পড়লো।

‘জী মা –

‘কিছু খাবার আর –

‘আচ্ছা যাই মা – মরিয়ম বিদায় নিলো। বড়লোকের বাড়িতে কাজ করে মরিয়ম, একটা হুকুমের মর্মার্থ করতে বেশি সময় লাগে না ওর। আধখানা বললেই সবটুকু বুঝে ফেলে।

বুঝলোও তাই। মরিয়ম একটা ট্রেতে কিছু নয় অনেক কিছু খাবার এনে জড় করলো টেবিলের ওপর। 

নিজাম আরেকবার উঠবার চেষ্টা করছিল। নাসিম বানু বাধা দিয়ে বললেন, ‘এগুলো খেয়ে নাও।’ মরিয়মের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ভরা বিকেলে এসে বসে আছে। মনে করে কিছু খাবার পাঠিয়ে দিতে পারিস না – অলুক্ষণে সব।’

‘আমি খেতে পারব না, মাপ করবেন।’ সেই একরোখা জিদ নিজামের।

অনেক কষ্ট করে বহুক্ষণ ধরে চেষ্টার পর একটা কথা উচ্চারিত হলো নাসিম বানুর মুখে, ‘ওইগুলো আমি তৈরি করেছি নিজাম’ – শেষের কথাটা আরও আস্তে বললেন, ‘তোমার জন্যে।’

নাসিম বানুর গলার স্বরটা কেমন আঁটালো হয়ে এসেছে।

* * *

পার্কের বেঞ্চিতে বসে হাঁ করে তাকিয়েছিল নিজাম তুলোপেঁজা আকাশটার দিকে। এটা ওর ছোটবেলার শখ। দিগন্তপ্রসারী আকাশের সীমানায় ও খুঁজে বের করেছিল মানচিত্র। জমাট অভিমানের মতো মেঘগুলো কুঁচকে, বেঁকে জড়িয়ে রূপায়ণ দিচ্ছিল বিভিন্ন দেশের প্রতিকৃতি। দুটো মেঘের কু-লী – আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পরাক্রমশালী ইংল্যান্ডের মানচিত্রের মতো দেখাচ্ছিল। আশ্চর্য খানিক পরে সে মেঘের ধূম্রজাল অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে নিতে চাইলো স্থবির চাঁদটাকে। সাম্রাজ্যবাদী লিপ্সা বুভুক্ষার ফাঁদ পেতেছে, কিন্তু চাঁদটা ছিনিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। আবার একটু গাঢ় অন্ধকারের পান্থশালায় ঝিলমিলিয়ে ওঠে আশার পিদিম। পার্কের বেঞ্চিটায় সবুজ ঘাসের সতরঞ্চিটায় হিম-শুভ্র আলো ছড়িয়ে গেছে সুনির্দিষ্ট গাণিতিক সূক্ষ্মতার সীমারেখা পেরিয়ে।

গুন্ গুন্ সুরে আধ কাঁপা সুরের খানিকটা এসে পৌঁছুলো ওর কানে। পাশ ফিরে তাকালো। ওর বেঞ্চির কোণ ঘেঁষে বসেছে একটা মেয়ে। বয়েস আন্দাজ করা যায় না। বড় উগ্র ফুলের একটা ঝাঁঝ। ফুলটা চুলের খোপায় পেরেক ঠোকার মতো করে সিঁদিয়ে দেয়া হয়েছে। একটা কচি ঘাসের পাতা লম্বালম্বি মুখে পুরে চিবুচ্ছিল মেয়েটা। ভালো করে তাকালো নিজাম চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার মানসে। সিদ্ধান্তেও পৌঁছুলো – মেয়েটা সুন্দরী ছিল কোনো এক যুগে। উঠে দাঁড়ালো নিজাম। মেয়েটা ফিক্ করে হেসে উঠলো, ‘কোথায় যাচ্ছো বাবু।’

‘কেন – ফিরে যাচ্ছি!’

‘বসো, বসো আমি তো বাঘ ভল্লুক নই। খেয়ে ফেলব না।’

নিজাম জবাব দিলো না – কারণ এর জবাব হয় না।

‘বাড়িতে কেউ আছে বুঝি।’ – অবাক প্রশ্ন করে মেয়েটা।

‘না।’

মেয়েটা একটা কৌটো বার করলো। কৌটাতে দুটো সাজানো পান। জাফরানের মন মাতানো উগ্রগন্ধের খানাতল্লাশিও মেলে সেখানে।

‘পান চলে!’

‘না।’

‘আপনি আমাকে খুব ঘেন্না করেন – না বাবু।’

কথাটায় কেমন একটু লজ্জা বোধ করল নিজাম; থেমে জবাব দেয়, ‘ঘেন্না – না, ঘেন্না করবো কেন। তবে –

‘আমরা ছোটলোক বাবু – পেশাও তো আমাদের ছোটলোকের। ঘেন্না তো করবেই।’

একটু অতিরিক্ত ঔৎসুক্য দেখালো নিজাম হয়তো ওর পরের কথায়, ‘কোথায় থাকো।’-

মেয়েটা হেসে ওঠে খলখলিয়ে ‘থাকবো আবার কোথায় – সারা শহর জুড়েই থাকি।’

‘তার মানে?’ প্রশ্নটা বোধগম্য হলো না নিজামের।

‘রাতের অন্ধকার পড়লেই তো সারা শহরের বাবুরা আমাদের ওখানটায় এসে ভিড় করে। তাই বলছিলাম সারা শহরটাই যখন আমাদের ওখানটায়, আমরাই সারা শহরের বাসিন্দা হবো না কেন’, অদ্ভুত যুক্তি দেখায় মেয়েটা।

‘তা এতরাতে কী করছো।’

‘তুমি পুলিশের লোক নও তো’ –

গলা নাড়িয়ে প্রশ্ন করে মেয়েটা দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে।

‘তোমার এ টনটনে ধারণাটা হলো কেন বলো তো। পুলিশের লোক ‘শিশু’ রাষ্ট্রের দুশমনদের’ পেছনে ধাওয়া না করে পা গুটিয়ে বসে থাকবে – এ কীরকম কথা বলছো।’

‘দুটো পোস্টার সাঁটাতে এসেছিলাম – জানো আজ থেকে পোর্টের মজুররা স্ট্রাইক করেছে’, একটু বিরতি দিয়ে বললো মেয়েটা, ‘একটা কথা বলবো’ –

‘বলো’

‘আমার সঙ্গে একটু যাবে –

‘কোথায়?’

‘মেটিয়াবুরুজ’

* * *

পোর্টে স্ট্রাইক হয়েছে। বিদেশী জাহাজগুলো অলসভাবে নোঙর ফেলে বসে আছে। মাল খালাসের নৌকাগুলো বাঁধা রয়েছে বড় বড় বয়ার আংটার সঙ্গে। দুটো বুড়ো কুলি বসে স্বর্ণভরা অতীতের কথা বলছে, আর খুঁক খুঁক করে হুঁকো টানছে। সে সময়ের গপ্প হচ্ছে যে সময় তিন টাকা চাল পাওয়া যেত – দু’আনা সেরে দুধ কিনতো – দু’পয়সায় একটা বড় লাউ পাওয়া যেত। কর্মচঞ্চল বন্দরটা কথা কইছে না – মার্কিন মুল্লুকের জাহাজটার তেজোদ্দীপ্ত সিটি বন্ধ হয়ে গেছে। চোঙ্গায় ধোঁয়াটা ধিমিয়ে আসছে ক্রমশ। বয়লারে কয়লা দেবার লোকেরও অভাব। পোর্টের কাদা পানি মেশানো পথ খানিকটা শুকিয়ে এসেছে – কর্মব্যস্ত পায়ের চাঞ্চল্য একদিন অপরিসীমভাবে কমে এসেছে বলে। মনোহারী দোকানগুলোর অগুনতি ছাউনি আর চোখে পড়ে না। কসাইখানার গোশ্ত কেনা-বেচার জায়গায় দু’চারটে মাছি ভন্ ভন্ করছে। ক্লাইব স্ট্রিট থেকে পোর্টে, পোর্ট থেকে ক্লাইব স্ট্রিটের অট্টালিকা সৌধে যাতায়াত করছে মালিক কোম্পানির তৈলশকটসমূহ। কিন্তু মীমাংসায় পৌঁছানো যাচ্ছে না কোনোমতে। নিজাম এসে থামলো একটা মোড়ের কাছে, ‘কতদূর যেতে হবে আর।’

আমাদের কপাল এখানটায় থাকবো আমরা। সদর রাস্তায় সাদা মেমসায়েবরা থাকে, আমরা থাকি গলিতে খুপচিতে। আমাদের চাইতেও ভালো গ্রাহক পায় – একটু নৈরাশ্যের ব্যঞ্জনা মেয়েটার গলার স্বরে।

শহরে অত্যুজ্জ্বল আলোগুলো ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। গ্যাসের আলো ও নি®প্রভ হয়ে এসেছে। পথঘাট ভাঙ্গাচোরা। একটা হোঁচট খেলো নিজাম। মেয়েটা ওর হাত ধরে বললো, ‘এসো আমার সঙ্গে। এ পথে কোনোদিন আসোনি।’

‘না।’

মেয়েটার কর্কশ মসলাপেষা হাতের সংস্পর্শে সারা গা ঘিন ঘিন করে উঠলো নিজামের।

আরেকটু যেতে হলো। নোংরা কুকুর মরে আছে নর্দমার কাছ বরাবর। মিউনিসিপ্যালিটির কৌলিন্যপরায়ণ মেথর এদিককার আবর্জনা পরিষ্কারের কথা নিয়ে মাথা ঘামায় না।

একটা পুরনো মতো বাড়ির সামনে এসে পৌঁছলো ওরা দুজন। চন্দ্রগুপ্ত থেকে আরেকজান্ডার যে কেউ এ বাড়ির মালিকানা দাবি করতে পারতেন – অন্তত এর প্রাগ-ঐতিহাসিকতার বড়াইয়ে। সমস্ত বাড়িশুদ্ধ কেমন যেন একটা ভ্যাপসা গন্ধ। একটা দিশলাই জ্বালালো নিজাম। উপরের সিঁড়িগুলো উঠতে ওর দমবদ্ধ হয়ে আসছিল।

একটা ভাঙ্গা গলার আওয়াজ এসে পৌঁছলো অপর এক প্রকোষ্ঠ থেকে, ‘লক্ষীদি এসেছিস।’

নিজামকে বসিয়ে রেখে বাইরে গেলো লক্ষ্মী, ‘একটু বসো। আমি দেখে আসি।’ একটা বড়মতো খাটিয়া। পুরু গদি পাতা। দুটো কোলবালিশ মখমলের গেলাব দেওয়া। একটা চেয়ারে কোণঠাসা হয়ে বসলো নিজাম।

দেয়ালগুলো বিগতা যৌবনা লক্ষ্মীদির ছবিতে ভরাট। পালংয়ের একদিকে পেতলের একটা পিক দানি।

একটা ছিপছিপে মেয়ে এসে দুয়ার ফাঁক করলো; পরক্ষণেই জিব কেটে বেরিয়ে গেল, ‘ওমা লক্ষ্মীদির ঘরে লোক এসেছে!’

মাথাটা ঘুরছিল। এক অভিনব জগতে এসে পৌঁছেছে নিজাম। তবু এরা বেঁচে আছে। রোজকার মতো নতুন হয়ে বেঁচে আছে। মরা কুকুরটা অপসারণের জন্যে মিউনিসিপ্যালিটিতে নালিশ জানায়নি। ধুকে ধুকে মরবার অপরাধে গ্রাহককে বিদেয় করেনি। জীবনটাকে ওরা আয়ত্ত করে নিয়েছে – ভেঙ্গে চুরে নিজের মতো করে তৈরি করে নিয়েছে চিরদিনের জন্যে।

তবু – তবু একটু অবাক হলো নিজাম। লক্ষ্মীদির হাতে এক বান্ডল কাগজ – ‘কী হবে এগুলো।’

‘রাস্তায় সেঁটে দিতে হবে – পারবে?’

বিস্ময় হতবাক হয়ে যায় নিজাম, ‘লক্ষ্মীদি তুমি।’

‘কেন আমরা মানুষ নই। ফাঁদ পেতে মানুষ ধরে আনি, আত্ম বিক্রয়ের বিনিময়ে উপযুক্ত মাশুল নি – এ পরিচয়টাই কি চিরদিন তোমাদের কাছে চিরন্তর হয়ে থাকবে? লজ্জা করে না, ধর্মঘটি শ্রমিকদের সভা করবার জায়গা কেউ দিতে পারলো না – পারলো না তোমাদের ৮০ লক্ষ ২০ হাজার ৭ শত ৫ জনের কর্মমুখর শহর। দিলুম আমরা। তবু আমাদের ঘৃণা করবে, অভিশাপ দেবে, আমাদের আত্ম বিলুপ্তি কামনা করবে তোমরাই। তোমাদের বাহাদুরী তোমরা আমাদের নহবৎখানায় ঢুঁ মেরেও যশ কিনবে মহর্ষী বলে, আর আমাদের দুর্বলতা আমরা তোমাদের জন্যে সর্বস্ব দিয়েও তোমাদের কেতাবে বর্ণিত হবে বারবনিতা বলে। যাও দেরি করো লক্ষ্মীটি – কাল সকালে আগে এ ইস্তাহার বিলি হয়ে যাওয়া চাই।’

নিজামের মুখে থেকে কথা সরছিল না। ওর অত্মচেতনার উঁচু পাচিল পেরিয়ে একটা কথা বেরিয়ে এলো, লক্ষ্মীদি – মহীয়ষী। লক্ষ্মীদি ওকে কাছে টেনে নিয়ে আসে। বুকে চেপে আমেজের সুরে কথাগুলো বলে লক্ষ্মী, ‘জানো আজ আমার পূর্ণ যৌবন ফিরে পেতে ইচ্ছে করছে। সেই বারো বছর  আগেকার রূপরসময় লক্ষ্মী হতে চাই শুধু একটি রাতের জন্যে – আজকার রাতের জন্যে। কারণ আজ আমি কাউকে ফিরিয়ে দিতুম না নিজাম। আমার সমস্ত সত্তা বিকিয়ে দিতাম আর রূপের ফাঁদ বিছিয়ে উর্বশীর মতো জীবনের মাদকতায় প্রলুব্ধ করতুম আমার দেহ লোভাতুর ক্রেতাদের ভিড় জমতো – আর –

‘আর – কী,’ একটু হাঁপিয়ে পেড়েছে লক্ষ্মী; উত্তেজনায় ওর কপালের শিরে            দুটো উঠেছে ফুলে, ‘আর একটা করে দিতুম ওদের সকলের হাতে এই ইস্তাহার।’

রাত দুটো। একটা বড় রাস্তা বরাবর হাঁটা শুরু করলো নিজাম। কর্মচাঞ্চল্যের বৈধব্য আর বিশাল জনপদের মৌন আবেদন আজকার রাত নিথর করে তুলেছে। বড় বড় ম্যানসনের উর্ধতম কক্ষের দুটো চারটে আলোর খানিকটা চোখে পড়ে – হঠাৎ উন্মুক্ত গবাক্ষে প্রান্তদেশে। পেছনে একটা রিকশার পথচারী খেদানো টুং টুং শব্দে সচকিত হয়ে তাকালো নিজাম। মার্কিন মুল্লুকের অনুগ্রহ কলকাতার বাজারে বহুলভ্য একটা ঢিলে কামিজে শোভিত ছোকরা আঁটসাঁট হয়ে বসেছে। বাঁ হাতের কব্জায় বাহুবেষ্টিত মেয়েটার পেটেন্ট হাসির শব্দে একটা শস্তা রোমাঞ্চের আভাস।

গলির মুখে একটা বাড়ির দেয়ালে ছোট সাইনবোর্ড – বিজ্ঞাপন লাগাইও না। নিষেধাজ্ঞার এই শিষ্ঠাচারবিহীন অনুরোধ যে রক্ষিত হয়নি কোনোদিনই, তা প্রমাণিত হয় সিনেমার একাধিক পোস্টারের দিকে তাকিয়ে, একটু জায়গাও অবশিষ্ট                  নেই। হাতের ইস্তাহারগুলো সেঁটে দেবার ভার নিয়েছে নিজাম – লক্ষ্মীদির কাছে      কথা দিয়েছে সকাল হবার আগে ওগুলো লাগিয়ে দেয়া হবে। স্টিমে গ্যাস লাইটের আলোয় ঈষৎ প্রখর হয়ে উঠলো একটা পোস্টার। আস্তে আস্তে পড়লো নিজাম – ১৫ই আগস্টে ভারত সরকারের উর্ধতন কোনো মান্যবরেষুর একটা বাণী।                 তাতে লেখা – আমরা সামান্য সময়ের মধ্যে দেশের সকল সমস্যার সমাধান করিয়াছি। আরও অধিক সংখ্যক মিল চালু হয়েছে – শ্রমিকদের অবস্থার               উন্নতি হয়েছে ইত্যাদি…। তারই তলায় একটা ইস্তাহার সাঁটালো নিজাম –               ডক-শ্রমিকদের অবস্থার অসামান্য রকম উন্নতির চূড়ান্ত পরিণতি সম্মিলিত ধর্মঘটের খবর।

ততক্ষণে এশিয়ার দ্বিতীয় প্রধান মহানগরীর সড়কে এসে পৌঁছেছে। নিজাম একটু জিরুতে চাইলো – বড় ক্লান্ত বোধ করছে। কিন্তু আজকাল শাসকগোষ্ঠী অতটা উদার হবেন কেন – কাজেই পান্থশালা তৈরি করবার মতো মহৎ শুভবুদ্ধি দ্বারা অনুপ্রাণিত তাঁরা নন। যেটুকু পথ সেটুকু শুধু গতি। সামনে চলো আর চলো। পেছনে তোমার বলগা – হয়তো কারও হাতে চাবুক। তোমাকে চলতে হবে – পেছন থেকে তাড়া দেবার জন্যে সংখ্যাগুরু মোটরগাড়ির হেডলাইট আছে, ফিরতি বাসের চিৎকার শ্রেষ্ঠ কন্ডাক্টর আছে, শান্তি বিধানের দ-মু- কর্তা সেপাই আছে। কাজেই চলতে হবেই – তা চলতে চাওয়াই হোক আর নাই হোক।

একটা দিন যেন ধারাপাতের নামতার মতো কেবলই ঘটনার পূর্বানুবৃত্তি ঘটাচ্ছে। এই সকালটায় আবার ইফতিখারের দরজায় এসে ও দাঁড়াবে, তা ছিল পরিকল্পনা বহির্ভূত। হয়তো পাশ কাটিয়ে যেতে, কিন্তু ইফতিখারের ইমারতে সর্বপ্রথম              দেখলো নিজাম প্রত্যুষের প্রাণচাঞ্চল্য। সারা বাড়িশুদ্ধ লোক হরলিক্স সেবন করে দুর্বলতা কাটিয়ে উঠেছেন, একথা মনে করার বিপদ ছিল – কারণ তখন হরলিক্স কালো বাজারে বিকি-কিনি হতো। বাইরে কোথাও যাবার প্রস্তুতি চলছে হয়তো। দুটো ট্যাক্সি অপেক্ষমাণ সেই ভোর চারটা থেকে। একটু হিম পড়েছে ট্যাক্সি কাচের জানালায়। দীর্ঘ অপেক্ষায় তৈলশকটের গুঞ্জরিত অভিমানটা কানে আসছিল। ইফতিখারের বাড়ির সাত সাতটে চাকর, তিন তিনটে চাকরানি আজ বোধহয় জবিনে সর্বপ্রথম অব্যাহতি পেয়েছে প্রাতঃকালীন উনুন প্রদীপ্ত করার  নৈত্যনৈমিত্তিক ঝঞ্ঝাট থেকে। ক’টা হোল্ড, তোরঙ্গ সুটকেশ এনে জমা করা হলো উঠোনে। দোতালার জানালা থেকে নাসিম বানু মুখ বার করলেন – হাতটা বার করলেন না, ভয়ানক      ঠান্ডা বলে।

নিজাম এসে বসলো বাইরে বসবার ঘরটায়। কিন্তু একটুতেই আবিষ্কার করলো কালকে রাতে ঘুমের যে ঘাটতি পড়েছে তা মেটাতেই হবে। সুতরাং চার চারটে চেয়ার সুপরিকল্পিতভাবে এধার ওধার করে সাজানো হয়ে গেল। ঘুমিয়ে পড়লো নিজাম। বাইরে ব্যস্ততম লোকদের বাক্স টানাহ্যাঁচড়ার আওয়াজ মাঝে মাঝে খানিকটা খানিকটা করে এসে পৌঁছুলো ওর কানে। ও অন্তর দিয়ে অনুভব করলো – স্বপ্নের শীষমহলে, দূর অনেক দূরে কোথাও হয়তো একটা গোলাপ ফুটেছে। বসরাই গোলাপ। শীষমহলের রানী চন্দ্রবদনা গোলাপটা তুলতে বললেন। কেউ পারছে না সবারই অভিযোগ কাঁটা ফুটছে। কিন্তু তবু এক একজন করে এগুচ্ছে রানী চন্দ্রবদনার মনবাঞ্ছা পূর্ণ করতে। তাই তো একটু শোরগোল শুরু হয়েছে হয়তো। তারপর শোরগোলটা একটু থেমে যায় – মিলিয়ে গেলো শেষটার। রানী চন্দ্রবদনা তাহলে এবার ফুলটা পেয়েছেন। ট্যাক্সি গর্জনটা কানে এসে পৌঁছলো। বোধহয় রানী চন্দ্রবদনা সেই গোলাপটা নিয়ে শীষমহল থেকে মতিমহলে ট্যাক্সি চড়ে চলেছেন। একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন যুক্তির পর্দা সিঁধিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তাইতো রানী চন্দ্রবদনা ট্যাক্সিতে যাবেন কেন – কেন – কেন – তন্দ্রাটা ভেঙ্গেই গেলো নিজামের। আরেকটা ট্যাক্সি সগর্জন অন্তর্হিত হলো ইফতিখারের গেট পেরিয়ে। চোখ রগড়ে উঠে বসলো নিজাম।

* * *

দু’জোড়া চোখ পরস্পর বিস্ফারিত হলো। একজোড়া অধস্তন বাড়ির চাকরের, আরেক জোড়া নিজামের। বিস্ময়ের প্রথম ধাক্কাটা পাঁচ মিনিট বিরতির অবকাশ দিলো দু’পক্ষকেই। তারপর বিরতি অন্তর্হিত হলো; এলো বিবৃতির পালা।

‘আপনি এখানটায় ছিলেন। অথচ বড় মা আপনাকে পাঁই পাঁই করে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন।’            

‘কে জানতো আপনি এখানটায় এসে বসে আছেন।’

‘সত্যি বলছো – আমি যে বসে আছি তা কারও জানবারই কথা নয়, কারণ আমি আদৌ বসে ছিলাম না; ঘুমাচ্ছিলাম।’

অধস্তন ভৃত্যটি ঘরের উর্ধতম কড়ি বরগার দিকে তাকালো – একটা টিকটিকির মুখ ভ্যাংচানি খেয়ে আবার মুখ নাবাল। নিজামের কথার ঘুণাক্ষরও যে সে বোঝেনি সে কথাটা পরিষ্কার করে তোলবার জন্যে তাকে এমন একটা দৈহিক কসরৎ করতে হয়েছিল। হঠাৎ কি একটা মনে হওয়াতে লোকটা হাড়হাভাতের মতো ওর লুঙ্গির গোঁজা অংশটায় হাত দিলো, ঠিক কিম্বারলির খনিতে হীরকখ- খোঁজবার মতো করে। অষ্টাদশ ভাঁজে সঙ্কুচিত অথচ যতেœর সঙ্গে রক্ষিত একটা চিঠি বার করে দিলো নিজামের হাতে, ‘বড় মা যাবার আগে এটা আপনাকে দেবার জন্যে বলে গেছেন।’

নিজাম হাত বাড়ালো – দু’আঙুলের আংটায় আঁকড়ে নিল চিঠিটা। একটা খাম – একটুকরো কাগজ আর সরকারের তেজারতখানার ছাপ সমন্বিত প্রমাণ সাইজের পার্চমেন্ট কাগজের কয়েকটা নজরানা। নাসিম বানু ভালো বাংলা পড়তে পারেন হয়তো, কিন্তু লিখতে যে পারেন না প্রমাণ করলেন দু’চারটে শব্দের প্রমাদপূর্ণ ব্যবহারে। কলম কালির সম্পর্কটা যে তাঁর ধোপার হিসেব লেখা ছাড়া আর            কোনো কাজে আসেনি তাও সুস্পষ্ট। কারণ শেষের দিকটায় কলমের লেখা শুকিয়ে এসেছে, বাকি অংশ পেন্সিলে ভরাট হয়েছে। স্থানবিশেষে মসিটা অসি হয়ে কাগজের বুক ফুড়ে দিয়েছে। তবু লিখেছেন নাসিম বানু –

টাকা কয়টা রাখো – এগুলো তোমার জন্যে। সামনে মাস থেকে আমিন পড়বে না। ওকে আমি স্কুলে ভর্তি করবো। তোমার পরীক্ষার সাফল্যে –

বাকিটুকু পড়া গেলো না, কারণ কাগজের হেডিং ছাপা সাইজের হস্তাক্ষরটা ক্রমে ক্রমে কাগজের নিম্নাংশে অণু পরমাণু হয়ে ধরা দিলো, যা বিজ্ঞানীদের মতে নগ্ন চোখে ধরা পড়বার কথা নয়। তাই নিজামের নগ্ন চোখটাও আর কিছু দেখতে পায়নি।

যে কথাটা সর্বাগ্রে জিজ্ঞেস করা উচিৎ ছিল সে কথাটা জিজ্ঞেস করলো নিজাম সবশেষে, ‘কোথায় গেলেন ওঁরা।’ 

‘বলো তো গেলেন রাজগীরে যাবো – তা বোঝেন তো বড়লোকের ব্যাপার – আজ হেথা কাল হোথা।’

‘কবে ফিরবেন কিছু বলে যাননি?’

‘বললেন ফিরবেন মাসখানেকের মধ্যে। তবে বুঝলেন তো বড়লোকের –

‘বুঝেছি – তোমার পরের ইপ্সিত বাক্যাংশটুকু আমার মুখস্থ হয়ে গেছে।’

বেরুতে যাচ্ছিল নিজাম, অধস্তন চাকরটা এসে মিনতি জানালো, ‘বড় মা বলে গেলেন অসুবিধে না হলে আপনি এখানটাতেই থাকুন। আর আমরা তো আছি।’

প্রস্তাবটা প্রত্যাখ্যান করার মধ্যে আর যাই হোক কোলো বাহাদুরী ছিল না?। কারণ বাহাদুরীর সামর্থ্য বোঝার মতো লোক ওর আশেপাশে তখন অপ্রচুর।

সুতরাং বিনাশর্তে রাজি হয়ে গেলো নিজাম।

বহুদিন পর আজ ভালো করে ঘরশুদ্ধ পায়চারি করলো নিজাম। ইফতিখারের পিতা, প্রপ্রিতা, প্র-প্রপিতামহের টাঙ্গানো ছবিগুলো তাকিয়ে দেখলো। দরজায় ঝোলানো পর্দার ঝালরটা হাতে নিয়ে ওর স্বীয় কামিজের সঙ্গে ওই কাপড়ের ভেদাভেদটা আঁচ করলো।

একটু আরাম করে বসলো নিজাম ইফতিখারের ঘূর্ণি চেয়ারটায়। ভূগোলের সীমানা দেখার মতো করে চারপাশের সীমানা দেখলো। উত্তরে একটা হাস্নাহেনা ফুলের টব, দক্ষিণে একটা মারাত্মক বদমেজাজি ষাঁড়ের বাঁধানো একজোড়া সিং, পূর্বে একটা দুয়ার, পশ্চিমে দেয়ালে একটা মির্জাপুরি কার্পেট।

ইফতিখারের দেরাজটা দেখে লোভ হলো নিজামের। দেরাজের আংটাগুলো গজ-দন্ত-শুভ্র। বিনা পরিশ্রমে নিরর্থক দেরাজ উন্মোচনের একটা দুর্লঙ্ঘ ইচ্ছা পেয়ে বসে। আর হলোও তাই। দেরাজের আংটায় পাঁচটা আঙুল সিঁধিয়ে দিলো নিজাম। ট্রামের লাইনে গড়িয়ে যাওয়ার মতো করে দেরাজটা গড়িয়ে এলো ওর সামনে। দেরাজের ভেতর কাগজের তাড়া। ওই চটচটে একটা গন্ধ – নাক ভরে আসে। আবিষ্কারের নেশায় অধীর হয়ে ওঠে নিজাম। ওর জন্যে একটা মিউজিয়াম কালের অগোচরে মুখ লুকিয়ে ছিল – আত্মপ্রকাশের প্রত্যয়ের অভাবে। দুর্জয় প্রশ্নের জবাব ভেঙ্গে পড়বে – ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে একাকার হয়ে যাবে। তবু একটু থমকে দাঁড়ালো নিজাম – ওর অধিকারের পরিধিটা ওর কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে না। কিন্তু নিক্তি দিয়ে মাপা গেল না ওর আগ্রহের পরিমিতি।

গোপন তথ্যের পাহাড় ভাঙ্গায় ক্লেশ নেই, কিন্তু ক্লেদ আছে। মানুষ গোপনীয়তা ভালোবাসে, তাই তার শুরু অতীতকে সে স্তব্ধ করে দেয় মুখর বর্তমানের কাড়া নাকাড়ায়। বোবা অতীত, বোবা রহস্য – জিপসী মেয়ের মতো ঘুরে বেরিয়েছে দুনিয়ার ২৫ হাজার মাইলের দীর্ঘ বেড়ি। রহস্যঘন গোপনীয়তা পায়চারি করে মরেছে দেওয়ান-ই-আম থেকে দেওয়ান-ই-খাসে, দেওয়ান-ই-খাস থেকে মতিঝিলে, মতিঝিল থেকে মতি মসজিদে, মতি মসজিদ থেকে কুতুব মিনারে। শাহানশা শাজাহানের বালাখানার স্থানাভাব তো হয়নি অথচ সামান্য গোপন প্রেমকে ঠাঁই দেবার জায়গা দিতে পারলো না দিল্লী। তাই গজনী দেশের পাথর এলো, পারস্যের মিস্ত্রি এলো, এলো গোলকু-ার মণি-মুক্তা সম্রাটের দুর্বার গোপন প্রেমকে বশ মানাতে স্বল্পায়তন প্রাসাদে সৌধের তল্লাটে দেহের পিঁজরাখানায়।

* * *

অনেকগুলো কাগজের তাড়া বেরিয়ে এলো একসঙ্গে। ১৮৯০ সাল থেকে শুরু করে আকবার ইতিহাসের সন্ধান সেখানে। কবে ইফতিখারের যৌবনদীপ্ত স্বর্ণময় দিনগুলো খানিকটা অবকাশ দিয়েছিল আর তার ফলে একতাড়া পুরু মলিন হয়ে আসা সাদা কাগজের বুকে বাদামি রংয়ের কালিটা একটু নি®প্রভ হয়ে এসেছে। ইফতিখার কবিতা লিখেছেন। ছন্দ মেলেনি একটারও। বানান ভুল করেছেন যথেষ্ট – তবু বুদ্ধির ঢেঁকিতে তার ঈষৎ প্রতিভাটাকে নানা খাঁজে ভেঙ্গে চুরে দেখেছেন – তবু পারেননি চাল থেকে খোসা ছাড়াতে। পারেননি বৈষয়িক দৃষ্টির আওতা থেকে সৌম্য জীবনে নোঙ্গর ফেলতে।

আরেকটু হাতড়াতে গিয়ে একটা ছবি বেরিয়ে এলো। ছবিটি কাগজের পুঁটলীতে ঢাকা পড়ে ছিল – তাই মাঝখানটা বেঁকে গেছে স্থবির বয়োদর্শীর মতো। রামতনু স্টুডিওতে তোলা ছবি। তলার দিকে স্টুডিওর লেবেল সাঁটা। ছবিটা দেখে একটু অবাক হলো নিজাম। পাংশুটে রংয়ের এক বিস্মৃতযৌবনার অপূর্ণ ভঙ্গিমায় তোলা একটা পূর্ণ অবয়ব। একটু থমকে দাঁড়ালো নিজাম। চেহারাটা একেবারে অপরিচিত নয় ওর কাছে। কোথায় দেখেছে যেন –

নাসিম বানু নন তো? একটা আচমকা সন্দেহের ধাক্কা ওর মনের দরজায় ঘা দেয়। না-না – এ ছবি কখনও দেখেনি। ইফতিখার হয়তো জানে, এ রহস্যের বুনিয়াদ। হার মানলো নিজাম। সত্যি বড় পরাজয় হয়েছে ওর – জিতেছেন ইফতিখার। ইফতিখারের গোপন আসবাবে হামলা চালানো গেলো না – এ দুঃখটা একটু প্রচুর হয়ে উঠেছিল নিজামের মনের উপত্যকায়। একটা অবিশ্বাস্য রকম উষ্ণতায় সিক্ত নিশ্বাস ফেললো নিজাম।

* * *

হয়তো অপভ্রংশ। গিরিরাজ কথাটা সময়ের রোলারের তলায় থিতিয়ে ওলট খেয়েছে কিনা এবং সেটা কোনো বিতর্কের উপাদেয় বিষয়বস্তু হতে পারতো কিনা, সে ভাবনাটা আপাতত ইফতিখারের মনের সাদা পানি ঘোলাটে করে তোলেনি। রাজগীরের ঈষৎ ঠান্ডা হাওয়ায় মনের ভেজান দুয়োরটায় একটু কাড়া নাকড়ার ব্যঞ্ছনা শুনতে পেলো ইফতিখার। স্নায়ুত স্নায়ুতে রঙ্গীন কল্পনার চকমকি পাথরে একটা স্ফুলিঙ্গ – ওর ঘুপ্চি মনের ডোবায় বিস্তর আলো ফেলেছে। অনেক দূরে চলে এসেছে – অনেক যোজন পেরিয়েছে – আঁটালো মাটির সঙ্গে বোঝাপড়া শেষ হয়ে গেছে এখানটায়।

লাল সুরকির তবক লাগানো মাটির বুক ফুঁড়ে একটা সবুজ ঘাষের শীষও মাথা তুলতে পারছে না কাঠখোট্টা বিহারী কাষ্ঠরসের বিলাস ভূমিতে। নদীগুলো হয়েছে শঙ্কিত, সঙ্কুচিত, তার তলানিতে কাঁকরের কাঠিন্য – তার তীরভূমিতে কাঁটা গাছের দাক্ষিণ্য।

রাজগীরের নুড়িভরা পথের ওপর যেনো আরব্যপোন্যাসে তেজোদীপ্ত ঘোড়া। পায়ের নালে বিজলীর ফিন্কি ছুটিয়ে চলছে। দুটো পাহাড়ের খাঁজ থেকে বেরিয়ে আসা রাস্তা – এ পথের ইতিবৃত্ত মৌসুমি হাওয়ার বুকের পাঁজরে পাঁজরে। চুন সুড়কির বালুকণায় জমে আছে বিলুপ্তা – প্রেয়সিনীর মন্দ লঘু পায়ের বিভ্রান্ত বিহ্বল দ্বন্দ্বসঙ্কুল নাতিদীর্ঘ পদক্ষেপের কলঙ্কিত ছাপ। পাহাড়ের চত্বর থেকে নেবে এসেছে একটা জনস্রোত – না জনস্রোত নয়, বৃক্ষস্রোত। গুটি গুটি করে নেবেছে সন্দিহান শিশু প্রথম পদক্ষেপের মতো। বেতসলতার বৈতরণী পেরিয়ে পায়ে-চলা পথে মানচিত্র দুর্জ্ঞেয় সব ঠিকানায় বিলীন করেছে উর্ধমুখী যাত্রার দৃষ্টিপথ। সুদূরে মরা স্থবির পাথরের বুক ফুঁড়ে একটা দুটো কাঁটা গাছ বাদামি রংয়ের পত্রগুচ্ছে দামি অতীতের স্নায়ুশিহরিত রোমাঞ্চ ভরা দিনের আখ্যান ভাগ শোনালো – একটা মন্দ মধুর বাতাসে ফেঁপে ওঠা অভিমানের বুকে ভর দিয়ে।

ভগবান বুদ্ধ – বিহারের এই মাটিতে অহিংসার প্রাকার রচনা করে গেছেন স্মরণাতীত স্বর্ণযুগের প্রারম্ভে। জীবনরস বিমুখ ভিক্ষুদের প্রাণচাঞ্চল্যকে কবর দিয়েছেন বিহারের লাল মাটি আর মেঘহীন আকাশের চৌহদ্দিতে। কান্না আসে না – প্রিয়তমার বুকের হতাশাভার ভারি নিশ্বাসের গুমোট হাতছানিতে কেউ এখানে কালিদাস হয় না, বাসের রাতের রসতপ্ত ওষ্ঠের অতৃপ্ত স্পর্শানুভূতির স্মরণে বাঁশের বাঁশিতে কেউ তোলে না অর্ফিয়াসের সেই হারানো সুরের একটা তন্দ্রালস রাগ। তাই বৈরাগ্যের পণ্যশালা এখানে অবারিত। মোহমুক্তির সদর রাস্তা সুপ্রসারিত। অন্তর্দৃষ্টির সাধনা এখানে বিবর্তিত নয়।

রাজগীরের দুর্লভ গৈরিক ধুলোয় বসে তবু কি প্রেম করেনি মহেন্দ্র-সীতেশ-মজহার-পারভেজ। মহুয়ার মদসিক্ত গন্ধে কি কেশ এলায়িত করেনি রিনি-মিনি-রুবি-পারভীন। হ্যাঁ করেছে। আলবৎ করেছে। বৈরাগ্যের কঠোর তাপে বিদগ্ধ সন্ন্যাসীর দল আত্মার মুক্তি যেঁচেছে। বিলুপ্তির পাষাণ কক্ষে। আর তারই কটাক্ষ পেরিয়ে হাওয়া খাওয়ার ওজুহাতে জাজিম আর ফরাস পেতে বেেছ পর্যটকের দল। পাহাড়ের কোল থেকে অনাবিল ঔদার্যের গড়িয়ে আসা ঝরনার বুকে প্রাতস্নাত। অধরে অধর মিশিয়েছে প্রিয়জনের কোলে মাথা রেখে। পাইনের তলায় নখের খুন্তিতে হৃদয়ের প্রতিকৃতি এঁকেছে, মুছে ফেলেছে – আবার লিখেছে। ভালো এখানেও বেসেছে উর্বশী – প্রেমের গীতিকবিতাও রচনা করেছে অমিট রে। একটুখানি গুমোটের আলখাল্লায় হয়েছে সে প্রেমের বিকিকিনি। ঢোল নহবৎ বাজিয়ে সে প্রেম করেনি এখানকার উর্বশী। পায়ের নূপুরে সুরের মূর্ছায়নে একটু একটু করে পরিব্যাপ্ত করেছে মিষ্টি মধুর অভিব্যক্তি। পাহাড়ের ঢালাইয়ে তা হয়েছে ব্যাহত। অস্ফুট বাষ্পরূদ্ধ কণ্ঠের আবেগে বেরিয়ে আসা অভিমান মিলিয়ে গেছে শালবনের পাশ দিয়ে, বড় পাহাড়ের খাঁজ দিয়ে, ঢোলক ফুলের পাঁপড়ির ওপর দিয়ে – অনেক অনেক দূরে।

* * *

গাড়ি এসে থামলো – লোহাই সড়কের মাথায়। ছোট্ট একটা বাংলো – বাহুল্য নেই বৈভবের – প্রাচুর্য আছে বিস্ময়কর পরিবেশের। হ্যামিংটন সাহেবের বাংলোর উত্তরাধিকার সূত্রটা কিছু রৌপ্য মুদ্রার বিনিময়ে নিজস্ব করে নিয়েছিল ইফতিখার বাইশ বছর আগে। একটুখানি উঠোন – পেছনটা বড় বড় মেহগিনি বৃক্ষে সুশোভিত।

দ্বাররক্ষী ভৃত্য এসে বহুদিন নুন নেমক খাওয়ার প্রামাণ্য সূত্রেই হোক বা যে কারণেই হোক, মাথা নিচু করে দীর্ঘ সেলাম টুকলো। নাসিম বানু একটু হাসলেন – তাঁর বহুদিনকার দুর্লভ হাসি। পরিমিতি আর সুপরিকল্পিত হাসি। ওপরের ঠোঁটটায় প্রসারিত হয়েছে খানিকটা – ঠিক ততগুলো দাঁত বের করেছেন তিনি যতগুলো আত্মপ্রকাশ আজ থেকে সাতাশ বছর আগে বিভ্রান্ত করেছিল ইফতিখারকে। কিন্তু সে কথা থাক। নাসিম বানু আবার হাসলেন, বললেন, ‘বাঃ বেশ তো – কি চমৎকার জায়গা।’

* * *

রাত নেবে এলো। একটা উন্মাদ হাওয়া উন্মনা করে তুলছে ইফতিখারের মন – পুরনো স্মৃতির শক্ত গেরোটা গেছে খুলে আর দল বেঁধে দাঁড়িয়েছে স্মরণাতীত কালের রহস্যঘন স্মৃতির কবচ। ইজি চেয়ারটার ওপর আরাম হেলান দিয়ে চুরুট ফুঁকছেন আর কল্পনার ধোঁয়ায় যবনিকাপাত হচ্ছে স্বর্ণময় অতীতের বহুকাঙ্কিকা নাটকের দৃশ্যমান ঘটনাবলি।

নাসিম বানুর চোখটা হয়ে উঠেছে স্বপ্নালু। আকাশের চাঁদটা পাহাড়ের গা ছুঁয়ে শপথ নিচ্ছে – আমি এসেছি, আমি এসেছিলাম, আমি আসবো। সে শুরু শপথের অঙ্গীকারনামা বিঘোষিত হচ্ছে পাইনের কলমুখর তানে – রাজগীরের তল্লাটে তল্লাটে। নাসিম বানু শুনেছেন সে কথা। তন্দ্রালু হয়ে আসছে তাঁর দু’জোড়া চোখ। একটা বেপরোয়া চুলের ফিতে এসে ছাউনি ফেলেছে চোখের পাতার ওপর।  নিবিড়তায়, নিবিষ্টতায় খান খান হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছেন নাসিম বানু জীবনের কোনো এক অবকাশহীন বেলাভূমির সান্নিধ্যে।

উন্মনা মনটা শেকল ছেঁড়া হয়ে আছে ইফতিখারের। উদ্বৃত্ত যৌবনের আরামবাগে উঠেছে সাইমুম। মনের সাহারায় একটা ওয়েসিস কি আজ এতই দুর্লভ। আজ কি তার স্নায়বিক মৃত্যুর কৌলিন্য থেকে রক্ষা করবার মতো একজনও নেই।

সত্যি নেই, কারণ লিলিবাই, মনওয়ারী বেগম, জিল্লুবাই আজ দূরে বহুদূরে – ‘বহুদূরে’, কথাটা অলক্ষ্যে উচ্চারণ করে ফেললেন ইফতিখার।

‘বহুদূরে নই শিরাজী’, নারীকণ্ঠের সাড়া পেয়ে সোজা হয়ে বসলেন ইফতিখার। না স্বপ্ন তিনি দেখছেন না –

‘মনওয়ারী বেগম?’

‘আমাকে দেখে এতটা বিস্মিত হবার খুব কি কারণ ছিল শিরাজী’ –

‘ও নামে আমায় ডেকো না – না, না,’ একটা হতাশায় ভরে-আসা নিশ্বাসের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে বললেন ইফতিখার, ‘তোমার শিরাজী মরে গেছে। তুমি তো         জানো –

‘আমি তোমাকে ও নামে আর ডাকবো না। শিরাজী মরে গেছে আমি জানতাম, মনে আছে, একদিন তুমি আমার কোলে মাথা গুঁজে বলেছিলে সাকী আর শিরাজীর ভালোবাসা – শাজাহানের মর্মর পাথরের বুকেও তুলবে ঈর্ষার ঝড়। সেদিন তুমি কত বড় মিথ্যে কথা বলেছো, সে কথা আমাকে বুঝতে হয়েছে সমস্ত জীবনের অজস্র গ্লানির বিনিময়ে। তুমি মহল গড়েছ, মহীষী পেয়েছ – আর আমি? তুমি অতীতকে মুছে ফেলেছো শ্লেটের বুক থেকে ভুল বানান লেখার ভান করে। ভয় পেও না শিরাজী কিছু নিতে আসিনি – কিছু পেতে আসিনি। আজকে শুধু একটা প্রশ্নের মীমাংসা করে দাও।’

‘কী?’

‘মনে আছে, একদিন আমার এই দেহটার মূল্য পরিশোধের দাবিতে তোমার বালাখানার ধন নিঃশেষ করতে পারতাম আমি। এই তপ্ত বুকের ওপর মাথা রেখে চোখ বুজেছো, সেদিন আমার সান্নিধ্য তোমাকে দিয়েছি ভীরু কম্পিত হৃদয়ে। নিষেধাজ্ঞার নোটিশ দিইনি তো। তোমার পাওনা মিটিয়েছি, তোমার বুভুক্ষুর সকল দেনা চুকিয়েছি অথচ তবু আজ সেই স্মৃতির জঠর থেকে গা বাঁচিয়ে দায়িত্ব মুক্তির ছাড়পত্র পাবার অজুহাতে এতটা অবজ্ঞার সুরে কী করে প্রশ্ন জানালে ‘কী’ বলে। সেদিন ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ আমার রক্তে ঈষৎ একটা বীজানুর জন্ম দিয়েছিলে তার দায়িত্ব থেকেও কি তোমার নিষ্কৃতি শেষ করবে না ইফতিখার?’

‘না তা করিনি। লুসিকে আমি মানুষ করেছি – ঐশ্বর্যের প্রাচুর্যে। অবজ্ঞা করেছি, এ অপবাদ তুমি দিতে পারবে না মনওয়ারী বেগম।’

‘না, আর কিছু আমার জানবার নেই। লুসিকে আমি ফিরেও চাইছি না। আমার জীবনের উষ্ণ প্রলেপ ওর গায়ে লাগতে দেবো না আমি। কিন্তু ইফতিখার যাবার আগে একটা কথা বলে যাচ্ছি – আমি মা। বাংলাদেশের শতযোজন দূরে, আমার চোখের তপ্ত অশ্রু শুঁষে নিয়েছে রাজগীরের কাঁকর ভরা মাটি। সে অশ্রু তোমার বিয়োগ ব্যথায় নয় – তার সবটুকু আমার লুসির জন্যে। তোমাদের ইতিহাসে আমার ত্যাগের মূল্য বাটখারা দিয়ে তোমরা মাপবে না জানি। ভগবান বুদ্ধের চাইতে অনেক বেশি পাপ করেছি আমি, কিন্তু ত্যাগ স্বীকার করেছি ততোধিক।’

জীবনের আরও একটা অঙ্ক ভুল হয়ে গেল। অবশ্য এমনি অনেক অঙ্কই ভুল করেছেন ইস্কুলের খাতায়।

নাসিম বানু ঘুমোননি। দাঁড়িয়েছিলেন বারান্দায় রেলিংয়ে ভর দিয়ে। যাত্রাদলের প্রাণস্পর্শী কোনো এক ঘটনার বিষয়বস্তু সৃষ্টি করলেন না; যদিও তা পারতেন অনায়াসে। দুটো কথাই বললেন, ‘মেয়েটা বুঝি তোমার দুরপনেয় কীর্তির কুতুব মিনার।’

মনওয়ারী বুঝলো এ ইঙ্গিত – ইফতিখার বুঝলেন এর মর্মার্থ।

উত্তেজনায় কাঁপছিলেন নাসিম বানু, ‘আমাদের সম্পর্কটা আর এগুতে পারবে না ইফতিখার। এর মীমাংসা আমি করে ফেলেছি।’

আর কিছু বলেননি নাসিম বানু – আর কোনো জবাবও দেননি ইফতিখার।

* * *

পায়ে-চলা সড়কে যা কুড়িয়েছেন ইফতিখার তার হিসাব জানেন তাঁরা যাঁরা তা হারিয়েছেন, আর একজন সে ইফেতিখারের স্টেটের চিফ অডিটর। এত সৌভাগ্য ওঁৎ পেতেছিল ইফতিখারের বারসীমানায় যে কেউ তা নিয়ে ঈর্ষা করেনি – কপালে চোখ তুলতে পারেনি, কারণ সে সৌভাগ্যের পরিমিত ঈর্ষা করতে পারতো যে চোখ তা ছিল না কারো।

টাইপরাইটারে টাইপ হয়ে যাওয়ার মতো করে সমস্ত জীবনটা টাইপ হয়ে এসেছে। সে জীবনে যা কিছু ছিল বৈচিত্র্য তা কেবল মুহূর্তিক – একটা সেমিকোলন, ড্যাস বা একটা কমা। আজ সে টাইপ করা জীবনের কাগজটা আর আঁটাতে পারলো না ইফতিখারের এ পরিগণিত জীবনের ঘটনাপঞ্জি। তাই চূড়ান্ত যবনিকার ক্লান্ত নিশ্বাসে বেজে উঠলো একটা অধ্যায় শেষ হবার সঙ্কেত শব্দ। তবু আরও একটা লাইন টাইপ হয়ে যেতে পারতো – ওর সৌভাগ্যকে অমর করে রেখেছিল ওর অজান্তে যে নিয়তির স্টেনো – কিন্তু পারলো না।

ইফতিখার বড় সেক্রেটারিয়েট টেবিলটার কাচে মোড়া পাটাতনের ওপর মাথা রেখে ফোঁস ফোঁস করে কেঁদে উঠলেন। চোখের তলায় অশ্রুর চৌবাচ্চাটা ভরাট ছিল এতদিন – তার অপচয় সম্ভব ছিল না বলে।

মনওয়ারী অবাক হয়ে ওঠে, ‘তুমি কাঁদছো?’

‘হ্যাঁ কাঁদছি!’ প্রশ্নটা পুনরুচ্চারিত হলো ইফতিখারের মুখে, ‘আমার অসহনীয় অবস্থাটা বোঝাবার ভাষা আমি জানিনে। নইলে –

‘নইলে কী করতে। করবার কিছু নেই ইফতিখার। তোমার মনে হচ্ছে সবাই ঠকিয়েছে তোমাকে। অথচ এ কথাটা মনে হয়নি তোমার যে তুমি ঠকিয়েছো যাদের তাদের সংখ্যাটা বড় কম নয়। সেদিন তোমার এ কান্না কোথায় ছিল ইফতিখার        – ১৯১৪ সালের অক্টোবরে, সে বছরের ডিসেম্বরে। পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে  – ‘মনওয়ারী!’

‘ধমক দেবার অভ্যাসটা তোমার কলকাতার ইমারত থেকে পায়ে হেঁটে রাজগীর পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে, সেটা জানবার সুযোগ নাই বা দিলে।’

মনওয়ারী বিরতি দিয়ে আবার বললো, ‘আমি চেয়েছিলাম, ইফতিখার এমন একটা দিন – ঠিক এমনি একটা মুহূর্ত। যেদিন তোমার প্রাচুর্য্যরে কংক্রিট গাঁথা দেয়ালে হাঁপিয়ে উঠবে তুমি – তোমার কাছে মনে হবে এ জীবনটা ক্ষয়ে গেছে – তুমি অতীতে হয়ে গেছো, তোমার বৈভব অনুকম্পা করছে তোমাকে।’

‘মনওয়ারী – তোমার অভিসম্পাতের অভিষেক আমার জীবনে তুমি দেখে যেতে পারবে না এটাই আমার দুঃখ’, ইফতিখার দাঁত চিবিয়ে কথাগুলো বলছিলেন আর কপালটা ঘেমে উঠছিল সেইসঙ্গে, ‘না’ – অনুশোচনা আমি করিনি, করবো না। আমার জীবনে তোমাদের মূল্য আমি যাঁচাই করে ফেলেছি। শেয়ার মার্কেটের কাগজের মতো দাম যেদিন ছিল উঁচু, মূল্য দিতে কসুর করিনি – কিন্তু আজ তোমার আমার জীবনে অর্থহীন।

একটা অভূতপূর্ব ব্যাপার ঘটে গেল। মনওয়ারী এগিয়ে আসলো – ওর কম্পমান হাতটা এসে ঠেকলো ইফতিখারের গালে অপমানের নিদারুণ কলঙ্ক বয়ে নিয়ে।

ইফতিখার কথা বললেন না, মনওয়ারী কথা বললো আর একবার, ‘ইফতিখার, এত বড় অপমানটাকে জীবনের পাথেয় করে বেঁচে থাকতে পারবে এটাই তোমার           সান্ত¡না। তারপর তোমার ঐ ঘোলাটে চোখ দুটোতে ভেসে বেড়াবে অতীতের কেলেঙ্কারির পূর্ণ উপাখ্যানটা। তুমি হাঁপিয়ে উঠবে, কিন্তু মরতে তুমি পারবে না। তুমি মরবে না, অথচ তোমার ইমারতের বড় পাইন গাছটা মরে যাবে। তোমার পুকুরটা শুকিয়ে আসবে, দেওয়ালের সুড়কিতে ঘুন ধরবে অথচ তবু তুমি বেঁচে থাকবে। আরও পঁচিশটা হেমন্ত তোমার উদ্যানের পাতা ঝরাবে আরও পঁচিশটা বসন্ত সবুজ পাতার জন্ম দেবে, কিন্তু তুমি শুধু কুঁকড়ে শুকিয়ে লোহার খাটিয়ার ওপর উপুর হয়ে চিৎকার করে উঠবে। হাসপাতালের ছোঁয়াচে রোগীর ভ্যানটা হয়তো এসে দাঁড়াবে কোনো একদিন তোমার ছাউনিতে, হয়তো আমারই অনুরোধের অনুকম্পায়, তারপর তোমাকে নিয়ে যাওয়া হবে – কোথায় জানো?’

বাইরে একটা প্যাঁচার ডাক শোনা গেল।

মনওয়ারী বলেই চলেছে, ‘কোথায় জানিনে। ওরা তোমাকে পোড়াবে না             পুঁতবে, জানিনে। হয়তো কিছুই করবে না – গরুর কঙ্কালের মতো তোমার বুকের পাঁজরটা চিক্ চিক্ করে উঠবে এক হিম শীতল জ্যোৎস্নায়। আর আমি একদিন ওই পথ দিয়ে যাব। আমার সেতারটায় সুর তুলব – গাছের পাতাগুলো কেমন গা ঝাড়া দিয়ে শিউড়ে উঠবে আর আমি গাইব – তুমি মরে যাবে – আর আমি গাইব – তুমি মরে যাবে – আর –

কেমন অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছে যেন মনওয়ারী। একটু ভয় পেল ইফতিখার। ভয়ে একটু পেছন ফিরে এলো। গলার খাঁজের অন্তস্তল থেকে একটা চিৎকার করে উঠলো, না-না-না।’

মনওয়ারী কাঁপছে – পাগল হয়ে গেছে মনওয়ারী। মুখ উবু করে পড়ে রয়েছে মনওয়ারী – ইফতিখার ওর কপালে হাত ঠেকিয়ে একটু চমকে ওঠে, একি অনেক অনেক ঠান্ডা হয়ে এসেছে ওর কপাল অনেক – অনেক।

* * *

কাল রাতে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। সকালবেলার পরিশ্রুত আলোটা এসে পড়লো ইফতিখারের ইমারতের উঠানে। জানালার কাচগুলো জমাট বৃষ্টির ফোঁটায় একটা ধূসর পুরু কম্বলের আবরণ পড়েছে। ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ছিটকে আসা এই ক’টা দিন নিজামের মনের আংটায় গাঁথা হয়ে গেছে বড়শির টোপের মতো। একটু অবসর পেয়েছে নিজাম – ঘুম থেকে উঠেছে ভোর আটটার মিষ্টি আলোর ঝলকানিতে – হাই তুলেছে নিদ্রালস চোখে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে রানীদীঘির পদ্মফুলটার দিকে তাকিয়েছে উৎসুক নেত্রে। আকাশের বুকে সাদা মেঘের আস্তরণে দেখেছে সূর্যের বর্ণছটা। অনেক ক্রোশ আর যোজন পেরিয়েছে ওর কল্পনার যানবাহন। সেন্ট সোফিয়ার মসজিদের আজান শুনেছে, আল্পসের শুভ্র নগ্ন বুকের স্পর্শ পেয়েছে, মালয়ের দারুচিনি এলাচের জঙ্গলে নাক শুঁকে বেড়িয়েছে ওর ঔৎসুক্যপ্রবণ মনের কলম্বাস। তবু কবিতা লেখেনি নিজাম, একটা গানের ভাঙ্গা সুরে ও আহত করেনি বসন্তের শান্ত সমীরণ। এক দূরতিক্রম্য কল্পনার লাল কেল্লায় ও বসিয়েছে নিজেকে মুক্তোর তৈরি ময়ূর সিংহাসনে, কুর্নীশ করেছে ওর অসামান্য সৌভাগ্যের সাম্ভব্য প্রতিচ্ছবিকে। অনেক অনেক পেছনে ফেলে এসেছে ওর জীবনের প্রথম ক’টা অধ্যায়। সে যেন ছিল অতীত – সূদূর অতীত। লোপাট হয়ে গেছে তার স্মৃতি। একদিন হয়তো ছিল ওর চার সীমানায় একটা পৃথিবী – পানি মেশানো দুধের মতো সুখ-দুঃখের আনুপাতিক মেলামেশায় কেটেছে সে যুগ। একটা পথ তাকে বাৎলে দেয়া হয়েছিল; আর সেই পথেই হয়তো হতো ওর অভিষেক – কিন্তু আবার ভুল করলো নিজাম। সেই খাঁজ কাটা পথে হিসেব নিকেশ নিলো ওর ভূতভবিষ্যতের। দাঁড়িয়ে গেলো – মেলা কৈফিয়ৎ চাইলো এই নিরবচ্ছিন্ন জীবনের কাছে। তাই যে মিছিল চলছিল তা গেলো এগিয়ে – পিছিয়ে রইল নিজাম। ওর আবেষ্টনীর চারধারে গড়ে তুললো প্রতিরোধের পরিখা। গতানুগতিক গাণিতিক গতির প্রতি এ ছিল বিপুল কটাক্ষ। তারপর পম্পিয়াই-এর প্রাণবন্ত মুখর জনপদের মতো জীবনের রঙ্গমঞ্চে মিলিয়ে গেলো, বিলীন হয়ে গেলো ওর অতীত। তলিয়ে গেছে সেসব – ঘটনার আবর্তে অনুসন্ধিৎসু ভূতাত্ত্বিকের দল পম্পিয়াই ঘেঁটে বের করেছে – ব্যাবিলন রাজপ্রাসাদের আরও লৌহস্তম্ভ আবিষ্কার করেছে, কিন্তু অনাবিষ্কৃত রয়ে গেলো ওর অতীত – এটাই নিজামের দুঃখ।

কথাটা কিছুক্ষণের মধ্যেই রাষ্ট্র হয়ে গেল; নাসিম বানু ফিরে এসেছেন। অবাক হলো কেউ কেউ – কিন্তু প্রশ্ন জানবার উপযোগী সাহসটা সঞ্চয় করে উঠতে পারলো না।

নিজাম কথা বললো, ‘এলেন তাহলে।’

‘এলাম।’

‘কিন্তু একা! – ইফতিখার এলেন না যে।’

‘না, এলেন না।’

নাসিম বানুর সংক্ষিপ্ততম জবাবগুলো মনমরিয়া করে তুললো। বাকি কথা জিজ্ঞেস করবার উৎসাহ গেলো ফুরিয়ে।

সিঁড়ি দিয়ে ওঠবার সময় নাসিম বানু থমকে দাঁড়ালেন; সামান্য একটা নৈমিত্তিক দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে হয়তো।

‘ওপরে যাবেন না?’ একটু হতাশার সুর নিজামের গলায়।

নাসিম বানু দাঁড়িয়ে রইলেন সিঁড়ির হাতলে হেলান দিয়ে। অনিশ্চিত একটা আশঙ্কায় চোখ দুটো একটু ফিকে হয়ে এসেছে – অন্তত তাই ভাবলো সবাই।

‘আমার জিনিসগুলো নাবিয়ে নিয়ে যেতে এলাম নিজাম।’

পিনপতন নিস্তব্ধতার বুকে আর একটা বিপ্লব আনলেন নাসিম বানু।

‘কেন, হঠাৎ।’

‘হঠাৎ নয় নিজাম। কারণ হঠাৎ যেটা হয় সেটা একটা দুর্ঘটনা, অথচ আমার বেলায় এটা হচ্ছে একটা ঘটনা, অতি সাধারণ একটা ঘটনা। একে তো হঠাৎ বলা চলে না।’

নিজাম হাঁ করে তাকিয়ে রইল নাসিম বানুর দিকে।

নাসিম বানু কথা বললেন, ‘বড় হেঁয়ালি ঠেকছে না? আমি জানি অনেকখানি আশ্চর্য হয়ে কপালে চোখ তুলবে তোমরা যদি বলি এ বাড়ির সঙ্গে আমার সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে, আর মালিকের সঙ্গেও।’

‘কিন্তু – একটা অসমাপ্ত কথার জের টানলো নিজাম।

‘আর কিছু যা শুনতে চাইছো তা নাইবা শুনলে। একটা উপন্যাস শুরু হয়েছিল, শেষ হয়ে গেছে – এটাই কি যথেষ্ট নয়!’

নিজাম কী বলবে খুঁজে পাচ্ছিল না। সমস্ত ব্যাপারটা রহস্যময় হয়ে এসেছে। নাসিম বানুর কণ্ঠস্বরটা নেবে এসেছে – চোখ দুটো কেমন নি®প্রভ। একটা জীবনযুদ্ধের বিরাট ট্রাফলগারে যেন পরাজিত হয়েছেন নাসিম বানু।

আরেকটু সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করল নিজাম, ‘আপনি চলে যাচ্ছেন তাহলে?’

‘হ্যাঁ।’

কোথায় সে কথা জিজ্ঞেস করলো না নিজাম। একটু থেমে বললো, ‘কিন্তু আমিনের কথা ভেবেছেন – ওর ভবিষ্যৎ –

‘তুমি ওকে ব্যাকরণ পড়িয়েছ নিজাম?’ অদ্ভুত প্রশ্ন করেন নাসিম বানু।

‘হ্যাঁ, পড়িয়েছি।’

‘অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ – তিনটে কালই ওকে শিখিয়েছ তাহলে?’

নিজাম বাকরুদ্ধ।

‘কাজেই ভবিষ্যতের কথা নিয়ে চিন্তা করবার বয়েস ওর হয়েছে, এ বিশ্বাস আমার আছে।’

নাসিম বানুর আসবাবপত্রগুলো জড় করা হলো একটা ঠেলাগাড়ির পিঠে। সেই পুরনো এমব্রয়ডারিগুলো আর ধুলোপড়া পিয়ানোটা অপসারিত হলো নাসিম বানুর দহলিজ থেকে। দুপুর নাগদ নাসিম বানু বিদায় নিলেন। ফিটনের পাদানিতে পা দেবার প্রাক্কালে অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন তাঁর জীবনের স্মৃতিবহুল স্থবির মিউজিয়ামটার দিকে। বাইশ বছরের পূর্ণাঙ্গ এ জাদুঘরের কক্ষে কক্ষে নাসিম বানুর সেই পুরনো দিনের দেয়াল পঞ্জিকায় যা তিনি ফেলে গেছেন তারই অনুশোচনায় হয়তো দীর্ঘ নিশ্বাস তার বুক ছাপিয়ে উঠলো আর পরক্ষণেই তা পেল নিষ্কৃতি।

একরাশ ধুলো ছড়িয়ে নাসিম বানুর ফিটনটা অন্তর্হিত হলো।

* * *

একেবারে অকৃতজ্ঞ নন ইফতিখার। তিন পয়সার একটা পোস্টকার্ডে নিজামের কুশল সংবাদ জেনে পাঠালেন। তাঁর চিকিৎসারত পাশ করা ছোকরা ডাক্তারটা ইফতিখারকে জানিয়েছে, তাঁর আরও পশ্চিমে যাওয়া দরকার – হাওয়া বদলাবার মানসে। একটু কবিত্ব করেছেন শেষ দিকটায় ইফতিখার – ক্রম-পশ্চিমাভিমুখী     অস্তমান সূর্যের সঙ্গে নিজের একটা চটকদার রূপক কল্পনা করে লিখেছেন – ‘কে জানে দিন হয়তো আমার অস্তমান রবির মতোই অস্তমিত হইতেছে।’

ইফতিখারের বর্তমানে এ বাড়িটা তদারকের দায়িত্ব বর্তেছে নিজামের ওপর – কথাটা অত্যন্ত সৌজন্যের সঙ্গে বুঝিয়েছেন ইফতিখার তার কতিপয় চিঠিতে। ভাবনায় পড়লো নিজাম। জীবনটা ক্রমশ ওর কাছে দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। কেমন যেন একটু বদলে যাচ্ছে নিজাম – যা ও কোনোদনি চায়নি; অন্তর থেকে কামনা করেনি। সহজ হয়ে নিজেকে আঁটিয়ে নিতে পারছে না কোনোমতে। প্রথমেই গেটে ঢুকে নজরে পড়ে তামার ধাতব একটা নেমপ্লেট ইফতিখারের নামগুলো খোদাই করা হয়েছে যেখানটায় গভীর নৈপুণ্যের সঙ্গে। এ বাড়ির সকল বাসিন্দার প্রতিনিধিত্ব করবার তলবনামাটা যেন জোর করে আদায় করে নিয়েছে ওই ধাতব নেমপ্লেটটি। একটা নামের অস্তিত্বই শুধু এখানে মুখ্য। এই গেটের তলায় যারা মাথা নিচু করে গলা বাড়ালো প্রবেশপথে – অজান্তে তারা স্বীকার করে নিল, তুমি মহারাজাধিরাজ এই সাড়ে চার কাঠা জমির – ওই বড় পাইন গাছটার – আর এখানে যারা আছে তাদের। তাই নিজাম নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছে ততবার যতবার মাথা নিচু করে ঢুুকেছে এ গেটের তলায়।

আর ততবারই ঠকেছে যতবার ইফতিখারের ফুলের বাগানের সযতেœ তৈরি মার্বেল পাথরের বেঞ্চিটার ওপর আরাম করে বসেছে। কারণ যতবার বসেছে ততবার ভালোবেসেছে এ পরিবেশকে – এ মার্বেল পাথর আর বাগানের বসরাই গোলাপকে। কিন্তু সে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হয়তো করতো না নিজাম। কারণ সৌন্দর্যের সুচারু ব্যাখ্যাই যদি অপরাধ হয়ে থাকে তবে সে অপরাধ তার একক নয়। কিন্তু এই মার্বেল পাথরের গাঁ ছুঁয়ে একটা হিমশীতল স্পর্শে পাগল হয়ে ওঠে, নিজাম। বর্মা প্রত্যাগত আশ্রয়প্রার্থীদের কথা মনে করিয়ে দেয়। বর্মার ভাগ্যাহতদের রসদ জুটিয়ে দেবার নামে যে কন্ট্রাক্ট নিয়েছিল ইফতিখার তারই দাক্ষিণ্যে মার্বেল পাথরের বেঞ্চিটা বসানো হয়েছিল ওর বাগানে। জঠর জ্বালায় উষ্ণ যে লক্ষ লক্ষ দেহ হিম হয়ে গেলো চিরতরে – তাদেরই একটা অনুশোচনার শীতল কান্না জমাট হয়ে পাথর হয়ে গেছে – আর সেই পাথরের বেঞ্চি ইফতিখারের – আর সেখানটাতেই বসেছে নিজাম। অজানা আতঙ্কে নিজাম লাফিয়ে উঠে পড়লো মার্বেল পাথরের বেঞ্চি থেকে।

‘স্যার আপনি।’

আমিনের গলার আওয়াজে সচকিত হয়ে উঠলো নিজাম। আমিন, একবছর আগে যাকে পড়িয়েছে – এই আমিন অনেক অনেক বড় হয়ে গেছে – মাথায় ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল গজিয়েছে। তেল দেয়া হয়নি। শার্টের একটা বুতোম খোলা। মনে পড়লো নিজামের, এমনি এক শীতের সান্নিধ্যে নাসিম বানু ওকে গলার বুতোম বন্ধ করে বেরুতে বলেছিলেন।

একটা সুটকেশ হাতে দাঁড়িয়ে ছিল আমিন। পায়ের ক্যাম্বিসটা এককালে কী রংয়ের ছিল সেটা মতানৈক্যের বিষয় হয়ে দাঁড়াতে বাধ্য – কারণ তা এতো ময়লা হয়ে এসেছে।

‘বাবা ফেরেননি’ – একটা ছোট্ট প্রশ্ন করে আমিন।

‘না, কেন চিঠি পাওনি।’

‘পেয়েছি – তবু ভাবলাম যদি এর মধ্যে আপনাকে কিছু লিখে থাকেন।’

একটা অযাচিত ভয়ের উদ্ভব হয়েছিল নিজামের মনে। নাসিম বানু আর ইফতিখারের এই সংঘাতমূলক কাহিনীটা না শুনতে চেয়ে বসে আমিন।

আপাতত সে অসুবিধের কারণ ছিল না। কারণ একশ পঁয়ষট্টিটা কথার ভেতর একবারও নাসিম বানুর কথা জিজ্ঞেস করেনি আমিন।

ডেরাডুন একাডেমির ফার্স্টটার্ম শেষ করে বাড়ি ফিরেছে আমিন।

আমিনটা সত্যি কেমন বদলে গেছে, বড় আশ্চর্য প্রশ্নের উদ্ভব হয় নিজামের মনে। অথচ, ওই ঝাউ গাছটাও তো বদলেছে, বদলেছে কাজীর বাড়ির কাঁচা রাস্তাটা। তবু একটা অমূলক সন্দেহের প্রাকার ঘেরাও করে ফেলেছে ওর মন। সত্যিই কি বদলেছে আমিন!

* * *

প্রশ্নটার জবাব দিতে পারতেন রামকিঙ্কর বাবু। লোকটা সুখ্যাতি আর অখ্যাতির সিঁড়ি বেয়ে পঁয়তাল্লিশের কোঠায় পড়েছিলেন – আর ডেরাডুনের চোস্ত কথা কইয়েদের আসর গুলজার করে থাকতেন। বিদ্যে তাঁর একেবারে সাগরতুল্য না হলোও উপসাগরতুল্য বিবেচিত হতো। ভিয়েনায় ছবি আঁকতে গিয়েছিলেন, ফিলসফির ডক্টরেট এনেছেন, অক্সফোর্ডে লেকচার দিতে বলা হয়েছিল, সময় করতে পারেননি কাজের বাহুল্যে – এমনিতর ঘটনা তাঁর বহুই ছিল।

সেদিন ছিল বৃষ্টির দিন। রামকিঙ্করের ওয়াটারপ্রুফটা ভেদ করে দু’চার ফোঁটা পানি তাঁর বুকের মাঝখানের খাদ বেয়ে নাভিতে এসে ঠেকছিল। একটা বাড়ির বাড়তি ছাতের তলায় এসে দাঁড়ালেন রামকিঙ্কর।

আর সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল আমিন – ইন্টার স্কুল ফুটবলের একটা প্রতিযোগিতা অন্তে ভেজা জার্সি গায়ে কাঁপছিল। আকাশে বৃষ্টি থামবার কোনো লক্ষণ নেই।

অমোঘ মুহূর্তে পরিচয়ের সান্নিধ্যে দু’চারটা কথা হয়েছিল ওদের ভেতর।

‘খোকা, তুমি বুঝি পড়ো?’

‘হ্যাঁ।’

‘কোন ক্লাসে?’

‘জুনিয়ার কেমব্রিজ দেবো।’

রামকিঙ্কর থামলেন।

বৃষ্টির ছাঁটটা একটু কমে এসেছে। রামকিঙ্কর কথা কইলেন আবার, ‘এদিকেই যাবে বুঝি।’

‘হুঁ।’

‘বেশ আমিও তো ওদিকেই যাচ্ছি।’

রামকিঙ্কর অবিচলিতভাবেই প্রস্তাব করলেন, ‘আমার ওখানটায় যাবে?’

‘হোস্টেলে ফিরব না, সুপার যদি কিছু বলে’ – আমিন প্রশ্ন করে।

‘কিসসু বলবে না। তুমি এসো – ভারি চমৎকার একটা জিনিস দেখাবো তোমাকে।’

‘বেশ চলুন’, উৎসাহ পেয়ে যায় আমিন।

রামকিঙ্কর বাঙালি সংস্কৃতির অতীত ও বর্তমানের মর্মস্পর্শী বৈপরীত্য বোঝালেন। বাঙালি ছেলেদের দেখলে কেন তার মনে এতে পুলক জাগে তা পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলেন। আমিন অনুপ্রাণিত হলো।

রামকিঙ্করের বাংলোটা শহর থেকে দেড় মাইল দূরে। একটা কাঠের বাংলো – নামটা বাংলায় লিখেছেন একটা ছোট্ট প্রমাণ সাইজের তক্তার ওপর। আরও অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন রামকিঙ্কর। তারপর নিচু গলায় বললেন, ‘বাড়ি থেকে কত আসে।’

প্রশ্নটা পরিষ্কার হলো না আমিনের কাছে।

‘বুঝলে না, কত করে টাকা আসে –

‘যা চাই তাই পাঠানো হয়। বাবা আমাকে খুব বিশ্বাস করেন কিনা।’

এক টার্মের মাইনে দেয়নি আমিন। রামকিঙ্করের কাছে টাকাটা এনে জমা করেছে। রামকিঙ্কর বড়লোক হবার পথটা বাৎলে দেবেন এই অধীর আগ্রহে ঘুম হচ্ছে না আমিনের।

হ্যারি মার্কিন সেনা বিভাগের কোয়ার্টার মাস্টার। রামকিঙ্করের সঙ্গে হ্যারির যোগাযোগটা হতো রাত সাড়ে এগারোটায়। হ্যারি রোজকার মতো সেদিনও একটা প্যাকেট এনে দিলো রামকিঙ্করের হাতে। সেদিন রাত করে বিদায় নিলো আমিন।

আর একদিন দেখা হয়েছিল রামকিঙ্করের সঙ্গে বড় রাস্তার মাথায়। লোকটাকে ভালোবেসে ফেলেছে আমিন। রামকিঙ্কর দুই সিনেমার পয়সা দিয়েছেন, রোববার বিকেলে আইসক্রিম খাইয়েছেন, বুধবার মধ্যাহ্নে ওকে নিয়ে জিপে করে শহর ঘুরিয়েছেন, একটা মোটা শেল বাঁধানো চশমা পড়ে পায়চারি করেছিলেন রামকিঙ্কর। করডুরয়ের পাতলুন আর একটা হাওয়াইন শার্ট – হাতে একটা দামি সিগারেটের টিন, যার নামটা শুদ্ধ করে উচ্চারণ করতে পারছে না এখনও আমিন।

আমিনকে দেখে হাত তুলে ডাকলেন রামকিঙ্কর, ‘হঠাৎ এখানটায় কী মনে করে, হোস্টেলে যাচ্ছো বুঝি।’

আমিন একটু লজ্জা পায় – অতি ভালো ছেলের দুর্নামটা আজকাল আর ওর ভালোলাগে না; ভরা সন্ধ্যায় বই নিয়ে বসলে আরও দু’চারটে ছেলের টিটকিরি খেতে হয়। এগিয়ে আসলো আমিন, ‘না একটু ঘুরছিলাম, একটা সিনেমা দেখাবেন কিঙ্করদা’, আবদারের সুরে কথাটা পাড়ল।

‘নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই – দেখাবো না মানে আলবৎ দেখাবো। তবে পয়সাটা আমি        দেবো না বুঝেছো।’

‘কিন্তু আমার কাছেও তো নেই।’

‘বেশ তো, কি হয়েছে তাতে। তোমাকেই বা দিতে বলছে কে।’

রামকিঙ্করের যুক্তিটা আমিনের কাছে বোধগম্য হলো না।

‘তাহলে?’

‘যারা চিরকাল দিয়ে আসছে তারাই দেবে। তুমি একটু দাঁড়াও – আমি আসছি।’

একটা বাস এসে দাঁড়ালো – প্যাসেঞ্জার ভর্তি। রামকিঙ্কর বাসটায় ওঠার চেষ্টা করলেন। কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পর নেবে এলেন বিরক্তির অভিব্যক্তি নিয়ে – ছোঃ এত ভিড়।

‘তাই বলে বাসে উঠলেন না?’ প্রশ্ন করে আমিন।

একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসেন রামকিঙ্কর আমিনকে সঙ্গে নিয়ে, ‘দেখেছো?’

‘ম্যানিব্যাগ, কোথায় পেলেন?’

হো হো করে হেসে ওঠেন রামকিঙ্কর, ‘ওই যে বললাম যারা চিরকাল দিয়ে আসছে তারাই দিচ্ছে। বুঝেছো বাসে কেন উঠতে চেয়েও নেবে এলাম।’

বিস্ময়ের প্রথম ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠতে পারলো না আমিন, তারস্বরে চিৎকার করে ওঠে, ‘আপনি তাহলে পকেট কাটেন?’

‘তুমি দেখছি একদম ছোট ছেলে’ – রামকিঙ্কর সোজা হয়ে বসলেন, ‘শোনো  সবাই সবার পকেট কাটছে। কে কাটছে না বলো। তোমাকে একটা গপ্প বলি শোনো –

কানটা ঝিঁ ঝিঁ করে উঠলো আমিনের। রামকিঙ্করে কথাগুলো অস্পষ্ট হয়ে আসছিল। রামকিঙ্কর পকেটমার – অথচ শুনে এসেছে ভদ্রলোক বিদ্যের জাহাজ। এক টুকরো কাগজ মুড়িয়ে দাঁতে চিবুনো শুরু করলো আমিন। একটা প্রশ্ন ওকে পাগল করে তুলেছে প্রায়। রামকিঙ্করও কি পকেটমার? এও কখনও সম্ভব? – ভাবতে পারে না আমিন। কপালের শিরেটা ওর ফুলে এসেছে। হোস্টেলে ফিরে যাবে, ফিরে একটা অ্যাসপ্রো খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে, ভাবলো আমিন। মাথাটাও ধরে এসেছে।

দুয়ারের কাছটায় পা বাড়াতেই শুনতে পেল রামকিঙ্কর ডাকছেন। আমিন জবাব দিলো না।

‘তুমি না বলছিলে সিনেমায় যাবে।’

‘মাথাটা ধরেছে বড়। আজ যাবো না ভাবছি।’

‘বেশ তো – তাহলে এটা রাখো।’

একটা দশ টাকার নোট। এর আগে স্রেফ, দশটা টাকা এমন করে কেউ ওকে হাতে তুলে দেয়নি। টাকা দশটা কি নেবে? একটু ভাবনায় পড়ে আমিন। রামকিঙ্করটা যেন কী – কী – ঠিক বুঝে উঠতে পারে না আমিন।

হাঁপাতে হাঁপাতে হোস্টেলে এসে পৌঁছল আমিন রাত এগারোটায়।

আরও একদিন। উঁচু ঢিপিটার ওপর বসে একটা ইতিহাস বই খুলে পড়ছিল আমিন। ও ঠিক করে ফেলেছে আর কখনো কোনোদিন রামকিঙ্করের কাছে যাবে না। ওর অলক্ষে এক্সারসাইজ বুকের পৃষ্ঠায় ভোঁতা পেন্সিলটা দিয়ে লিখলো কথাটা দশ বার – যাবো না – যাবো না – আর কখনো যাবো না।

‘তাই নাকি, কোথায় যাবে না।’ রামকিঙ্কর দাঁড়িয়ে ওর সামনেটায়।

চমকে ওঠে আমিন। ওর দৃষ্টিপথটা ক্রমশ ঘোলাটে হয়ে ওঠে। একটু পিছু হটে যায় সন্ত্রস্ত হয়ে।

রামকিঙ্কর একটা প্যাকেট বার করে বললেন, ‘দেখেছো এটা কি?’

ইস্কুলে জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের জবাব দেবার মতো করে জবাব দিলো আমিন, ‘রিভলভার।’

‘হ্যাঁ – শুধু তাই নয় – ছ’ কার্তুজের। নেবে?’

‘আমি কী করব।’

‘আমি যা বলি শোনো। এটা রাখো। তোমাকে দিচ্ছি। না, না দাম নেবো না।’

বোকার মতো হাত বাড়িয়ে রিভলভারটা গ্রহণ করলো আমিন। পরিস্থিতিটা ক্রমশ জটিল হয়ে আসছে। ওর মন সন্দেহের দোলায় কেঁপে ওঠে। জীবনে প্রথম একটা বে-আইনি কাজ সে করতে যাচ্ছে। একটা তাজা ছ’ কার্তুজের রিভলভার। ভয়ে চোখ বুজে ফেললো আমিন।

রামকিঙ্করের কথা ভেসে আসছে কখনো কানে, ‘আমার এক মার্কিন বন্ধু, ওর কাছ থেকে নিয়ে এলাম, নইলে অমন চমৎকার অ্যামেরিকান রিভলভার আজকাল ব্রিটিশ টমিরাই পায় না।’

আরও কতগুলো কথা বললেন রামকিঙ্কর যার মর্মার্থ বোঝেনি আমিন, ‘বুঝেছো         সবকিছুর শতকরা পঞ্চাশ পাবো আমি, আর শতকরা পঞ্চাশ তোমার। এটাই আমার নিয়ম কিনা।’

রামকিঙ্কর দাঁত বার করে হাসলেন, কিম্ভুতকিমাকার হাসি। অন্ধকার নেমে আসছিল – রামকিঙ্কর নেবে পড়ছিলেন ঢালু পাহাড়টার গা বেয়ে। সন্ত্রস্ত হয়ে রিভলভারটা পেকেট পুরলো আমিন।

রাত একটু বেশি হয়ে এসেছে। লোকজনের চলাফেরা কমে গেছে অসামান্যকরম। ল্যাম্পপোস্টের তলায় দাঁড়িয়ে একটা মার্কিন সিগারেটের ধোঁওয়া ছাড়ছিল আর খুক্ খুক্ করে কাশছিল আমিন। হ্যারির কাছ থেকে একটাকা দু’আনায় কুড়িটা সিগারেট কিনেছিল – রাগ হলো ওর ওপর, ব্যাটা স্রেফ ফাঁকি দিয়ে গেছে।

পাশের ব্যাঙ্কের কাজটা প্রায় তামামসুদ হয়ে এলো। এ ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ারকে চেনে আমিন – রামকিঙ্কর চিনিয়ে দিয়েছিল – মোটাসোটা গাট্টা চেহারার লোক। একটুখানি গোঁফের বাহুল্যে লোকটাকে বেশ খানিকটা গম্ভীর মনে হয়। কালো পাম্প সু পরে আর তা দিয়ে বিস্কুট মচকানো শব্দ করে পথ হাটে। জুতোটা বোধহয় নতুন কেনা।

লোকটার পিছু নিলো আমিন। বড় মুশকিলে পড়া গেছে, সুবিধেমতো একটা গলির মুখে ঢুকতে চাইছে না কোনোমতেই। সাত সতেরো রকম জিনিস কেনার বাতিক আছে লোকটার। পানের দোকান থেকে নস্যি কিনল, কাপড়ের দোকান থেকে একটা প্রমাণ সাইজের গেঞ্জি আর মুদির দোকান থেকে দু’আনার তাল মিশ্রি কিনল।

গলিটা জনবিরল এবং আংশিকভাবে আলো বিরল। লোকটা জোর পায়ে হাঁটছে। হাতের রিভলভারটার সেপটি ক্যাচটা খুলে ফেললো আমিন। পিছু নিয়েছে লোকটার। ক্যাম্বিস জুতোয় ওর পায়ের শব্দটা শোনা যায় না বড়। দ্রুত পথ সাবাড় করবার দুর্জয় বাসনায় একটু বিপত্তি ঘটালো আমিন। অপেক্ষমাণ রিকশাটার গায়ে হুমড়ি খেল।

পেছন দিকে তাকালো লোকটা, ‘কে?’

আমিন জবাব দিলো না।

কার্তুজ ভরা রিভলভার সোজা করে ধরলো। রামকিঙ্কর এ ব্যাপারে বহু নসিহৎ করেছেন – কী অবস্থা কী রকম ভূমিকায় দক্ষতার সঙ্গে কাজ শেষ করতে হবে এ সম্বন্ধে তাঁর বহু অভিজ্ঞিত জীবনের উদ্ধৃতি থেকে কিছু শুনিয়েছিলেন।

আড়ষ্টতায় জড়িয়ে আসা কণ্ঠে একটু খানি চড়া সুর সংযোজনার ব্যর্থ চেষ্টা করে আমিন, ‘থামো – কী আছে দাও।’

লোকটা হন্ হন্ করে ছুটেই চলেছে। কানে কম শোনে হয়তো, স্থির সিদ্ধান্ত নিলো আমিন। ট্রিগারে একটা আঙ্গুলের চাপ দৃঢ়তর হয়ে আসে ক্রমশ। ওর অন্তরাত্মায় শঙ্কা ও সন্দেহের মন কষাকষি। বিপুল শব্দে গুলিটা গিয়ে একটা বিখ্যাত বিপনালয়ের শো-কেশ চূর্ণ বিচূর্ণ করলো।

বাকি ঘটনাটা আমিন বোলেছিল নিজামকে এক আচমকা মুহূর্তে রাতে ঘুমুতে যাবার আগে, ‘স্যার, রাতে যদি কেউ আসে বলবেন আমি এখানে থাকি না।’

মারাত্মক বিস্ময়ের আলোড়নে কথা বলতে পারেনি নিজাম। হাঁ করে তাকিয়ে ছিল ওর মুখের দিক।

প্রশ্নটার পূর্বাপর সরল ব্যাখ্যা দিয়েছিল আমিন, নিদারুণভাবে ওর স্বভাবজাত কণ্ঠস্বরটা আড়ষ্টতায় ম্লান করে, ‘আমি পালিয়ে এসেছি।’

আবার খানিকটা বিরতি।

‘আমার নামে ওয়ারেন্ট বেরিয়েছে। একটা লোককে খুন করবার অপরাধে কি শাস্তি হতে পারে স্যার।’

শান্ত কণ্ঠে জবাব দিলো নিজাম, ‘ওকালতি আমি পড়িনি। পড়িনি বলেই যারা পড়েছেন তাঁদের উপজীবিকার আংশিক সংস্থানের দায়িত্ব তোমাকেই মেটাতে হবে। প্রশ্নটা যথা সময় যথা ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করো।’

‘স্যার – কাউকে একথা বলবেন না।’

‘আমি বলবো না – কিন্তু তাতে এতটা আশ্বস্ত হবার কী আছে। দুর্ভাগ্যক্রমে, খবরের কাগজের আইন আদালতের কলামগুলো আমার হুকুমের তোয়াক্কা করে না – এই যা।’

‘তাহলে?’ শঙ্কিত হলো আমিন।

‘বাতিটা নিবিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। রাত অনেক হয়েছে।’

ঝিমিয়ে গেছে অক্টোবর, নেতিয়ে পড়েছে নভেম্বর, বিলীন হয়েছে ডিসেম্বর – লিপটন কোম্পানির ক্যালেন্ডারটার পাতাগুলো নিঃশেষ হয়েছে একে একে। আর একটা নতুন ক্যালেন্ডার বসাবে ওর কামরায়, ভাবছিল নিজাম। একটা বছর গড়িয়ে গেছে – অন্তঃসত্ত্বা পৃথিবী প্রসব করলো আর একটা আনকোরা বছর।

হিসেব নিলো নিজাম – ওর তিনশ পঁয়শট্টি দিনের খতিয়ানের পাতা লাভের অঙ্কটা এসে পৌঁছেছে ঘাটতির কোঠায়, সঞ্চয়ের অঙ্কটা হয়েছে অসামান্যরকম বিপর্যয়গ্রস্ত। ওর জানালায় দাঁড়িয়ে চোখ মেলে চাইলো নিজাম – দূরবীক্ষণের মতো দূরপ্রসারী করতে চাইলো ওর দৃষ্টিবাণ – অনেক অনেক দূরে। না মিছে কথা, এ রোজকার ধুলো-পড়া, মরচে-পড়া একটা দিন। ব্যথাহত বলাকার পাখার ঝাপটায় ঢেউ ওঠেনি মৃদুমন্দ উত্তর হাওয়ার পেলব বুকে। কারখানার দম্ আটকানো ধোঁয়াটা ভরাট করে ফেলেছে দৃষ্টিপথের সদর রাস্তা। নতুন জীবনের স্পন্দন তাই হয়েছে মিথ্যে আর অর্থহীন। চানাচুরওয়ালার তারস্বর চিৎকারটা রোজকার মতো ওর ক্ষুধায় আবর্তিত মনের আহাজারি জানালো। মুদির দোকানের বুড়োটা তেমনি পুরানো ময়লা কাগজের ঠোঙ্গায় ওর পণ্যশালার খদ্দেরদের ভিড় বিদায় করছে। কেউ তাদের বলেনি আজ একটা নতুন বছর এসেছে – বলেনি কেননা বলো বললেও তারা বিশ্বাস করবে না সে কথা, যেমন বিশ্বাস করেনি আজ থেকে বহু বছর। তাই ক্যালেন্ডারের প্রথম পাতার প্রথম ছক কাটা বর্গক্ষেত্রের পাষাণ কক্ষে নতুন বছরের পহেলা দিনের উন্মেষণা ওদের কাছে হয়েছে ব্যর্থ।

একটা লঘু পায়ের শব্দে ঘাড় ফেরালো নিজাম। প্রারম্ভিক কথাটা উচ্চারণ করতে বেগ পেতে হলো খানিকটা। বহুদিনের দেখাশোনায় সামান্যরকম বিরতিতে ওদের মাঝখানের প্রাকারটা দুর্লঙ্ঘের মনে হলো নিজামের কাছে। লুসি অপরিচিত হয়ে গেছে যেন সেই রূপকথার বিস্মৃত রাজকুমারীর মতো।

‘অনেক দিন পরে এলে’, একটু অনুকম্পা ভেজানো সুর নিজামের কণ্ঠে।

‘অনেক দিন – হ্যাঁ, অনেক দিনই বটে –

‘কী ভাবছেন বলুন তো অমন প্লেটোর মতো।’

‘ভাবছি – ভাবছি’, ইতস্তত করে নিজাম, ‘না, কিছু নয়। সিগারেটের কৌটোটা দেবে – টিপয়ের ওপর রাখা আছে।’

সিগারেটের কৌটোটা নিয়ে আসে লুসি, ‘দেখছেন – একটাও নেই – ফুরিয়ে গেছে।’

‘ফুরিয়ে গেছে –

‘হ্যাঁ, আর আমরাও ফুরিয়ে যাচ্ছি –

সম্বিৎ ফিরে এলো নিজামের,

‘কী বললে?’

‘না কিছু বলিনি।’

‘লুসি।’

‘বলুন।’

‘অতৃপ্ত জীবন নিয়ে আমরা আসিনি’, উত্তেজনার সুরে বললো নিজাম।

‘সে অহমিকা করিনি তো।’

লুসির স্বপ্নালু চোখটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলো নিজাম। ওই দুটো চোখ নিথর হয়ে আছে কামনার রিফ্রিজারেটারে। উষ্ণ কি তা কোনোদিন হবে না?

বিচলিত করেছে খানিকটা ওকে লুসি। মনের ভেতরকার চুন সুরকির সুসংবদ্ধ দেয়ালটা ধসে ভেঙ্গে পড়ে একাকার হয়ে যাবে।

একটা সোফার ওপর গা এলিয়ে বসে পড়লো লুসি। জানালার অবারিত উন্মুখতায় খানিকটা আলো এসে পড়েছে ওর চোখে মুখে। যুগে যুগে দেশে দেশে কালে কালে প্রোথিতযশা সুন্দরীদের আমন্ত্রণ লুসির সর্বাঙ্গে। নিজাম চোখ বুজলো। সর্বকালের সর্বযুগের রাজপুত্র আজ তন্দ্রাহীন বিক্ষোভের ঝড় তুলেছে ওর মনে। অভিসম্পাত করেছে কটাক্ষ করেছে কাপুরুষ বলে।

কাপুরুষ – এতবড় একটা অভিযোগ কি খ-াতে পারে না নিজাম, স্বাধীন দেশের কর্ণধাররা যখন নিয়ত প্রতি ঘণ্টাই খ-াচ্ছেন অযোগ্যতার অভিযোগ। না, ও পারে না, কারণ এ সমাজ তাকে পঙ্গু করে রেখেছে – ওকে ভেঙ্গে দিয়েছে খান খান করে – ওকে জড়িয়ে ফেলছে জীবনচাকার প্রতি কলকব্জার। যে মনটা নিয়ে ও হিসাবের খাতায় অঙ্ক করে, যে মনটা জীবনযুদ্ধের দ্বন্দ্বে দুটো পয়সা অর্জনের লোভে আজকের সমাজের ভারবহনের কুলি সেজে আছে, যে মনটা ওর বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর মিথ্যে প্রতিশ্রুতির প্রবঞ্চনার চোখ রাঙাতে চায়, সে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মনটাকে এনে জড় করতে পারছে কই।

কাছে এসে বসলো নিজাম – এত কাছে যে লুসির শুকনো চুলে কোনো                 একটা প্রচুর বিজ্ঞাপিত তেলের ঘ্রাণটা ওর নাক ভরে আসছে। ওর মাথায় হাত বুলোয় নিজাম – ওর হাত দুটো ধরে ফেলে নিজের মুঠোয়। চোখ দুটো ওর জ্বলছে চিতেবাঘের মতো – কেননা ও জানে ওর যে কোনো সিদ্ধান্তকে ব্যঙ্গ করবে আজকার পারিপার্শিক অবস্থা। তাই হ্যামলেট হবার পথ ওর অবারিত – রোমিও হবার পথটা রুদ্ধ।

ফাঁকা শূন্যতার বুকে একটা আঁচড় কাটলো লুসি, ‘নিজাম সাহেব আমার ভয় করছে।’

‘কেন’

‘কেন – কেন জানিনে, আমার মনে হচ্ছে তুমি শুধু সেদিনই নয় আজও ভুল করে যাচ্ছো,’ অতি উচ্ছ্বাসের প্রাবল্যে নিজামকে তুমি বলে ফেললো লুসি। ওর মাথাটা নিজামের কোলে গুঁজে দেয়, ‘তুমি আমাকে ভালোবাসতে পারো না – ভালো তুমি আমাকে কোনোদিন বাসবে না।’

‘বাসবো না?’

‘না’, আড়ষ্টতায় জড়িয়ে আসে লুসির গলার স্বর। ‘আমি কাউকে ভালোবাসতে পারবো না লুসি – কাউকে নয়।’

‘সে অভিসম্পাত আমি করিনি তোমাকে।’

‘হয়তো তুমি ঠিক কথাই বলেছো লুসি। ভালো আমি কাউকে বাসতে পারবো না – কারণ আমি ইফতিখারের কারুণ্যে প্রতিপালিত এ বাড়ির ভূতপূর্ব গৃহশিক্ষক –

‘সে কথা আমি বলিনি।’

‘কারণ তোমার জীবনের স্থবির স্বপ্নকে সফল করে তুলতে পারতো যে মন, তা আমার নেই –

‘আঃ থামো নিজাম’, কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে লুসি। বলেই চলেছে নিজাম, ‘কারণ দৈহিক ক্ষুণিœবৃতি মিটিয়ে মনের পরিতৃপ্তি কামনা করবার যে অবকাশ, তা আসবে না আমার কোনোদিন –

বাইরের এক দমকা হাওয়ায় – জানালার পর্দাটা একটু কেঁপে উঠলো।

নাসিম বানুর ফিটনটা অন্তর্হিত হয়েছিল কিন্তু অন্তর্হিত পরিকল্পনাটা সফল              হলো না। যেথা যায় দু’চোখ ধরনের একটা কাব্যিক সিদ্ধান্তে নাসিম বানু পৌঁছে গেছিলেন – কিন্তু পৌঁছুতে শুধু পারলেন না স্টেশনে।

* * *

রাসমনি স্ট্রিটের কাছে একটা ছোট দু’তলা বাড়ি। জাতিধর্ম নির্বিশেষে বহু প্রাণী অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে বাড়িটা ভাড়া করেছিলেন। সময়ের দীর্ঘসূত্রতায় ক্রমশ তাঁদের মনে হয়েছিল বাড়িওয়ালাকে যত্রতত্র তারা ধমকানি দিতে পারেন। ভাড়া চুকিয়ে না দেবার প্রামাণ্য সূত্র হিসেবে তাঁদের বহু বছরের অভিজ্ঞতায় এমন কতগুলো কারণ দাঁড় করাতে পারতো না বাড়িওয়ালা। সুতরাং ভাড়াটে শিথিল হয়ে এলো। চার শতাব্দীর উঁই ঢিপির মতো করে জমলো বাড়ির ভাড়া। ওইটুকু জমাট করতে করতে শোধ করবার ইচ্ছা জানিয়ে প্রাণত্যাগ করলেন দু’দশজন। তাদের বংশপরম্পরায় পিতৃদত্ত ঐতিহ্যের স্তম্ভ আঁকড়ে রইলেন। বাড়িটা ক্রমশ পুরনো হলো, বালবের আলো ধীমে হয়ে এলো – সিঁড়িতে ময়লা জমলো। এমনকি একদিন পানির পাইপ হলো ফুটো। তিনদিন নাওয়া খাওয়া মুলতুবি রইলো। আপত্তি কেউ জানালেন না। কারণ ভাড়া না দেবার মাহাত্মে নিত্যনৈমিত্তিক দু’চারটে অসুবিধে সহ্য করবার প্রয়োজনে যেটুকু বৈরাগ্য দরকার – দুর্ভাগ্যক্রমে তা তাদের ছিল।

একটা বিপত্তি ঘটেছিল। বাড়িওয়ালা মরে গেলেন একদিন সুপ্রভাতে। কথাটা জাহির হলো। বাড়িওয়ালার বড় ছেলে হাওড়া হাটের কামিজটা গায়ে চড়িয়ে একদিন একুশটা ফ্ল্যাটের কড়া নাড়লেন। দশ জায়গায় সাড়া পেলেন না – নয় জায়গায় অসূর্যস্পর্শা মহিলারা পুরুষ সম্প্রদায়ের অবর্তমানে দুয়োর খুলতে পারলেন না – আর এক জায়গায় এক দ-মু- ব্যক্তি বেরিয়ে এসে বললেন – তিনি বাড়ির মালিক ফালিক চেনেন না। ফ্ল্যাটটা তিনি সাবলেট করছেন। কথা প্রসঙ্গে জানিয়েও দিলেন তিনি পুলিশের চাকরি করেন। সঞ্চিত রাগটা অর্পিত হলো এক গো-বেচারি করপোরেশানের কেরানির ওপর। লোকটা তিনমাস আগে চাকরিহীন হয়েছে। বাদবিত-ার পর ওই ফ্ল্যাটটা খালি করে দিতে হলো। বাড়িওয়ালার ছেলে পিতৃলভ্য টাকাপয়সাগুলো উজাড় করবার একটা যুঁৎসই করে ফেলেছিল ইতোমধ্যেই। রউডন স্ট্রিটে এক নার্সের সঙ্গে আলাপটা বিলাপের পর্যায় এসে নামলো। তারপর এক ফালি চাঁদ শোভিত আকাশে রেড রোডের ওপর কেশ এলায়িত করে মেয়েটা নাকি সুরে একটা বাড়ির জন্যে মিনতি জানাল। তারপর ওই মেয়ে – ববি, মেলা জিনিসপত্র নিয়ে ফ্ল্যাটটা দখল করেছে। বাড়িওয়ালার ছেলের ভাগ্য ভালো। এক সদাশয় বন্ধুর পরামর্শে বারানসী যাত্রা করলো। আর ফেরেনি। ববির বান্ধবী লিলি এবং লিলির সহপাঠিনী নাসরিন চারটে কামরা ভাগ করে নিলো। সাঁয়ত্রিশ বছর বয়সের নাসরিন কোনো এক যুগে নাসিম বানুর পাড়াপড়শি ছিল।

সুতরাং – তুমি – বিস্ময়াবিষ্ট কণ্ঠে ফুটপাথের ওপর দাঁড়িয়ে ফিটনটা থামাল নাসরিন।

নাসিম বানু কথা বললেন, ‘উঃ যেন এক যুগ’

‘তা যাচ্ছো কোথায়। এত জিনিস পত্তর –

তারপর আরও দু’চারটে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কথোপকথনের পর দেখা গেলো দু’দুটো কুলি ফিটন থেকে মাল নামাচ্ছে। নাসিম বানু সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বললেন, ‘পানির ব্যবস্থা আছে তো।’

‘সকাল বিকাল – যা নিয়ম – ফ্ল্যাটের বাড়ি।’

একটা ছোটখাট বৈঠক বসেছিল। আলোচ্য বিষয় – নাসরিন থ্রি ইয়ার্স ওল্ড প্যাক্টটা লঙ্ঘন করে নতুন বাসিন্দা বসিয়েছে। একটা মীমাংসায় পৌঁছুনো দেরি হলো না – চারজন ভদ্রমহিলা সমস্বরে এবং তারস্বরে প্রতিজ্ঞা বাণী উচ্চারণ করলেন – যা হয়ে গেছে – গেছে। এরপর আর কাউকে আসতে দেয়া হবে না, হবে না।

কথাটা আরও কয়েকবার ভেবেছেন নাসিম বানু। জীবনের মোড় ফিরিয়েছেন এ দায়িত্বটা তো তাঁর নিজস্ব। ভুলও হয়তো করেছেন, কিন্তু এ ভুলকে অভ্যর্থনা জানাতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না, নাসিম বানু ভাবলেন। ইতিহাসের পাতার চরম ব্যর্থতার পিদিমের মতো এই সর্বনেশে ভুলটা যুগে যুগে এসেছে, ভুল হয়েছিল তাই সোহরাব রোস্তমের অমর কাহিনী আমরা ভুলিনি। ভুল হয়েছিল তাই ব্রিটিশ রাজত্বের মানদ-কে আমরা রাজত্বের সম্মান দিয়েছি। ভুল হয়েছিল তাই আমরা জালিয়ানওয়ালাবাগের প্রতিশোধ নিতে ভুলে গেছিলাম।

‘কী হলো, যাবেন না?’

ববির প্রশ্নে তন্ময় ভাঙ্গলো নাসিম বানুর, ‘কোথায়?’

‘বা, এই যে বললেন বোট্যানিক্যালে যাবেন।’

‘ওঃ।’

শান্ত আকাশটার দিকে তাকিয়ে বললেন নাসিম বানু, ‘জানো ববি, আজ থেকে বহু বছর আগে এমনি দিনে আমার বিয়ে হয়েছিল।’

‘তাই নাকি!’

‘হ্যাঁ।’

‘তাহলে তো আজ –

‘না, তুমি যা বলবে আমি জানি। ওই দিনটা আমার মনে থাকবে ববি। কারণ ওই একটা দিনকে আমি অভিসম্পাত জানাবো প্রতি বছর –

‘কেন?’

‘আমি ভালোবেসেছিলাম – আর আমাকে ভালোবাসতে দেয়া হলো না।’

স্বয়ং বিবর্তিত ট্রামের ঘস্ঘসানির শব্দে নাসিম বানুর কথা শোনা গেলো না সবটুকু।

আরেকটু থেমে বললেন নাসিম বানু আবার, ক্যানেস্তোরা বাজছিলো, বারোটা ফিটনে মখমলের গদি আঁটা হয়েছিল, আর আট শ’ লোক খাওয়ানো হয়েছিল। আড়ম্বর ছিল যথেষ্ট, কিন্তু মনের দিক থেকে সে ছিল কত বড় ফাঁকি তা তোমাকে বোঝনো যাবে না ববি। যাকে ভালোবেসেছিলাম তার স্মৃতির চিতাবহ্নিতে কামনাদগ্ধ শিক কাবাব তাই সেদিন হয়েছিল ব্যর্থ। তারপর –

‘থেমে গেলেন যে –

‘কারণ ওই জায়গায়টায় এসে আমিও থেমে গেছিলাম – আবার থমকেও গেছিলাম। ব্যাংক অফ মালয়ের চেকবুকটা হাতে পুরু ঠোঁট দুটো ফাঁক করে হেজাকের তলায় দাঁড়িয়ে সে আমায় কী দিয়েছিল জানো?’

‘কী?’

‘চেক বই – বলেছিল তোমার কাছে রাখো। বাসর রাতে প্রথম কী বলেছিল জানো?’

ববি চুপ।

‘বলেছিল, আসানসোলে টিম্বার সাপ্লাইয়ের কনট্রাক্ট পেয়েছি। আর সেই আকাশের চাঁদ ভরা চাঁদোয়ার দিকে তাকিয়ে দেখলাম আরেকজন যাকে আমি আমার মনের মালিকানা দিয়েছিলাম কৈশোরের প্রারম্ভে, সে সুটকেশ হাতে কুয়াশা ভরা রাতে জোর পায়ে হাঁটছে। তারপর একটু একটু করে মিলিয়ে গেছে – দূরের বাঁকটা পেরিয়ে – লোয়ার সারকুলার রোডের ওপর। একটা ক্লান্ত কলকব্জা ভাঙ্গা শব্দ করে যে ট্রামটা এসে দাঁড়ালো সে ট্রামটার হাতলে হাতটা ওর দৃঢ় হলো – তারপর কর্মচঞ্চল পৃথিবীর বেগসর্বস্ব পথের ঠিকানায় ও হলো বিলীন।’

ববি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। দোরে কড়া নাড়ার আওয়াজে সচকিত হলো ওরা দু’জন।

নাসরিন এসেছে। টেলিফোন অপারেটার নাসরিন। ডিউটির কোনো ঠিক ঠিকানা নেই।

‘একটা টাকা আছে –

‘কী করবে?’ নাসরিনের প্রশ্নে সচকিত হয়ে ওঠে ববি।

‘রিকশাটা বিদেয় করতে হবে।’

‘আবার রিকশা – তোমার স্বভাবটা বদলালো না।’

টাকাটা চুকিয়ে দিলেন নাসিম বানু। শুভ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উপদেশের অযাচিত ভা-ারটা উজাড় করতো ববি যখন তখন।

নাসরিন বসলো এসে সোফায়, ‘চাকরিটা ছেড়ে দেবো ভাবছি।’ উৎকর্ণ চারটে কান উৎকর্ণতর হলো, ‘কেন, কেন?’

‘ও আসছে মাসে একটা ফার্মে ঢুকে পড়বে বলেছে।’

‘তোর ও-কে একবার নিয়ে আয় না দেখব’। ববির আবদার।

‘কিন্তু এখানটায় – এ বাড়িতে। জিনিসগুলো যা অগোছালো। তাছাড়া আমার ভারি লজ্জা করে।’

‘তাই নাকি?’ অর্থপূর্ণ দৃষ্টি ববির চোখে মুখে।

লজ্জা পেল নাসরিন।

না, ভূত দেখেননি নাসিম বানু।

কারণ পরিবেশ আর পরিস্থিতি কোনোটাই সুবিধাজনক ছিল না তার পক্ষে। বর্ষা নেমেছে – মেঘের কম্বলে ঢাকা পড়ে পরিষ্কার আকাশটা দেখাচ্ছিল লাল কেরোসিন লণ্ঠনের চিমনির মতো। করপোরেশনের কারুণ্যপ্রবণ বাতিগুলোর আলো জ্বলছে আর নিবছে। মাঝে মাঝে বিজলীর অবারিত ধমক-খাওয়া আলোর সুতোটা ইনিয়ে বিনিয়ে ওঠে মেঘের বুকে।

চমক লাগে খানিকটা।

অচেনা মুখ চেনা হয়ে যায় অনেকের! গুমোট মুখ করা লোকটা পাশের লোকটার দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে – হয়তো তেতো রসিকতা করে কলেজ ফেরত ছেলে নিছক ভ্রƒক্ষেপযোগ্য একটা ঘটনাকে উপলক্ষ করে।

বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। ধূসর হয়েছে পথঘাট। কলকাতার এ প্রান্ত চিনেছে ও            প্রান্তকে। শ্যামবাজারের গলি-ঘুপচির ধুলো কোলাকুলি করছে পার্কসার্কাসের ফুটপাথের ধুলোর সঙ্গে। চৌরঙ্গীর অনন্যগর্বা বিপণালয়ের শো-কেসে ঝেটিয়ে দেয়া হচ্ছে রিকশাওয়ালা পানওয়ালা আর ফিরিওয়ালার পায়ের ধুলো। খানিকটা করে পানি জমেছে ট্রাম রাস্তার ওপরে – আর তাতেই ভয় পেয়েছে ছিচকাঁদুনে গড়িয়াহাটার ট্রামটা। ইঞ্জিন থামিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে হাবার মতো মাঝপথে।

আরেকটা বিদ্যুৎ কটাক্ষের লালসা ব্যগ্র দৃষ্টির কাছে সুপ্রতিভ হলো নাসিম বানুর চোখ। মার্কেটিংয়ে বেরিয়েছিলেন ববির সঙ্গে। কথাও বলেছিলেন এতক্ষণ।

অথচ –

একটু অবাক হলেন নাসিম বানু। কালবোশেখির সর্বনেশে অভিষেকের সঙ্গে সঙ্গে কোথায় হারিয়ে যাওয়া একটা পরিচ্ছেদ – যা তিনি ভুলে গেলেন মেলা দুঃখে আর দ্বিধায়, স্মৃতির দূরবিনে দূরাতীত হয়েছিল যে আখ্যানটা – সেই ঘটনার পুরানাবৃত্তিতে একটুখানি শোকাবহ হয়েছিল নাসিম বানুর, সেই বর্ষণমুখর সন্ধ্যায়। হয়তো বা নইলে তার গলার খাঁজে খাঁজে এতটা দরদ জমাট করে আনতে পেরেছিলেন কি করে ওই দুটো কথায় – ‘চিনতে পেরেছো?’

‘হ্যাঁ’, মেজর করিমের স্থূলাতিস্থূল গলার স্বরটা কেমন বেপরোয়া ঠেকল খানিকটা।

‘তারপর –

একটু থামলেন মেজর, একটু বিরতি দিলেন সিগারেট প্রদাহের অবকাশ লাভের অজুহাতে, ‘পৃথিবীটা কত ছোট –

‘হয়তো বা।’

‘সুখী হয়েছো – নিশ্চয়ই।’

‘সুখী বলতে যা তোমরা বোঝো – তার ব্যাখ্যাটা একেবারে ব্যর্থ হয়নি দু’মাস আগেও আমার জীবনে।

‘কিন্তু –

 কাছে সরে আসেন মেজর।

‘থাক গে, কোথায় আছো। অসামরিক বৃত্তিটা কি তোমাকে খুব বেশি প্রবঞ্চিত করেছিলো করিম।’

‘জানিনে। কিন্তু সাময়িকভাবে সামরিক বৃত্তির কাছে আমার নালিশ জানাবার মতো কিছু নেই।’

‘খুশি হলাম। প্রশস্তি জানবার মেলা কিছু আছে তাহলে?’

‘না, তাও নয় – মেলা নয় – শুধু একটা।’

একটা মোটর মাঝপথে স্টার্ট নিচ্ছিল না। মারাত্মক গর্জনটা শোনালো ব্যর্থ কামাতুর বিক্ষোভের আক্রোশের মতো।

নাসিম বানু তাকালেন মেজরের পেতল আঁটা বুতোমটার দিকে। অন্ধকারের মাঝখানে থেকে থেকে ঝলসে ওঠা আলোর টুকরো প্রতিফলনে কেমন একটা রূঢ় আবেদন।

‘কী বললে?’

‘না –

‘জানো করিম, পরশু আমার বিয়ের রাত ছিল।’

‘আমার ভাগ্যবিপর্র্যয়ের সিঁড়ি বেয়ে যেদিন তুমি আমায় মস্ত বড় ফাঁকি দিয়েছিলে – সেদিন? হ্যাঁ, তা প্রতি বছরই আসবে। কিন্তু ফাঁকি তুমি আমায় দিতে পারোনি নাসিম বানু। ফাঁকিটা আমার ভরাট হয়ে গেছে।’

‘তুমি বিয়ে করেছো?’

কার পকেট বিলুপ্ত একটা সিকি গড়িয়ে পড়লো ফুটপাথের ওপর।

‘অবাক হচ্ছি।’

‘মিসরের মমি অবাক হয় না।’

‘হঠাৎ এ কথা কেন?’

‘কারণ তোমার জীবনে আমি স্মরণাতীত যুগের অভিশাপের মতো নিথর হয়ে গেছি। তবু করিম, ভুল তুমি আমাকে বুঝেছো – এটা নিয়েই আমি বড়াই করব। কারণ তুমি ভুল তো বুঝতে পারো না এটা নিয়েই একদিন আফসোস করেছিলাম।’

‘নাসিম বানু – কী বলছো এসব।’

‘কেন তুমিও কি অবাক হচ্ছো।’

‘না।’

‘নাসিম বানু’, ভরা গলায় বললেন মেজর, ‘তুমি এতটা পিছিয়ে গেছিলে আর নীনা এতটা এগিয়ে এসেছিলো –

‘সে কথা থাক, করিম ভুল তুমি করোনি – আর আমি? না, আমিও করিনি। আর যদি করেই থাকি তাতেই কী এসে যায়। এই ভুলটুকুর জন্যেই আমরা অমর হয়ে রইলাম আমাদের দু’জনার কাছে। পাওনার শূন্য খাতাটা নিঃভরাট হয়ে রইল আকাক্সক্ষা পরিতৃপ্তির দৈন্যে।’

‘নাসিম বানু – বহু দেরি হয়ে গেলো – আমাদের কামনার কবরে পুরু ঘাস জন্মেছে! তার শিলালিপিতে প্রেমের ভাষাটা দুর্বোধ্য হয়ে এসেছে –

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন মেজর।

বাইরে বৃষ্টিটা কমেনি তখনও।

একটা জিপ এসে দাঁড়ালো ফুটপাথের কাছ ঘেঁষে।

‘এসো যাবে, পৌঁছে দি। তোমাকে পৌঁছে হেড কোয়ার্টারে যাবো।’

সারাপথে একটা কথাই জিজ্ঞেস করেছিলেন নাসিম বানু, ‘ঝড় থামবে না?’

নাসিম বানু এসে পৌঁছুলেন রাত সোয়া এগারোটায়।

সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে নাসিম বানু শুনতে পেলেন মেঘ আর তার তল্লাটে সামরিক তৈল শকটটির বদ্ধপরিকর গর্জন। দুটোর কোনটা আগে মেলালো বোঝা গেলো না। কারণ ততক্ষণে মেঘটা হয়েছে গর্জনমুক্ত – আর জিপটা হয়েছে দৃষ্টিমুক্ত।

এই বিপুল পৃথিবীটাকে একবার খানাতল্লাশি করে দেখেছে লুসি। দারুচিনি আর এলাচের মতো ওর জীবনের মিষ্টি দিনগুলো এসেছে প্রচুরই, কিন্তু তার পরিমাপ হয়েছে কাচ্চায় আর ছটাকে। জীবনের হেরফের বদলেছে, পথঘাট বদলেছে, তবু সীমাহীন বিস্ময় বদলায়নি। ওই আকাশটার দিকে তাকিয়ে চোখ ভরে শুনতে পারেনি অগুনতি তারার কাতরানি। কান পেতে শোনার পালা শেষ করতে পারেনি – এত আবেদন এত নিবেদন, এত কথা, এত অভিযোগ আদালতের মুলতুবি সভার মতো মুলতুবি রয়ে গেল তা চিরদিন। তবু এই পৃথিবীর চৌহদ্দি থেকে খানিকটা ভালোবাসা, স্নেহ নিংড়ে নিতে চেয়েছিল লুসি। স্নেহ ওর জীবনে এসেছিল বরাদ্দকৃত হয়ে। অবাক লাগে ভাবতে, সমাজের ভাগ্যবানরা ওর গায়ে একটা সীলমোহর দিয়েছেন কেলেঙ্কারির। প্রণয় নিয়ে খেলা করেছে ইফতিখার আর পরিণামের তাবিজটা গলায় নিয়ে ফিরেছে লুসি। তাই ইফতিখারের স্নেহটা লৌকিকতার লোকচক্ষু এড়িয়ে বর্তেছে চিরদিন ওর ওপর। ফিস্ ফিস্ করে ঢুকেছে ইফতিখারের কক্ষে সন্ধ্যার স্বল্পালোকে আর একটুখানি করুণায় আর বেদনায় চোখ ভিজিয়েছেন ইফতিখার। ইফতিখারের হাত কেঁপে উঠেছে বারবার মাসহারার টাকাটা গুঁজে দিতে গিয়ে। ভ-ামীর অভিনয় করতে হয়েছে লুসিকে। জব চর্নাকের উচ্ছিষ্ট নগরীর একপ্রান্তে তুলো ছড়ানো বালিশটায় মুখ গুঁজে কান্না এসেছে বহুদিন – শুকিয়ে গেছে – ভিজেছে।

ভালোবাসা-ভালোবাসার নিক্তিটা কোনোদিন ভারবহ হয়নি ওর দুর্জয় কামানার অনুপাতে। চেয়েছিল অনেক আর পেয়েছে অল্প। রোগীর মতো ভালোবাসার ছিটে-ফোঁটা ওর জীবনেও এসেছে দৈবাৎ আউন্স মাপা দুর্মূল্য ওষুধ হয়ে। যেটুকু পেয়েছে অসীম কর্তব্যবোধে ঢোক গিলে পান করেছে পরিতৃপ্তির প্রগাঢ় আগ্রহে। বিংশ শতাব্দীর হিংস্র পরিবেশের উঠানে ও পেতে দিয়েছিল ওর বিশুদ্ধ কামনার সতরঞ্চি। আন্তরিকতার আগরবাতি ফুঁপে ফুঁপে অভিমানে একাকার হয়ে গেছে। হৃদয়ের ব্যঞ্জনা মিথ্যে হয়ে গেল – একটু বিপ্লব – একটু মনের দেউলিপনার বিরুদ্ধে ওর জৈবিক সংগ্রাম – চেয়েছিল লুসি। কেউ তা দিতে পারলো না। একজন হয়তো পারত – ওর মনের ক্ষুন্নিবৃত্তি মেটাতে। বিস্ময় লাগে, চোখভরা পুলক আসে – সে এগিয়ে এলো না – শুধু পিছুই হটলো। বরফের মতো তুহিন হয়ে গেলো – মিউজিয়ামের মতো হলো বোবা – রাতের অন্ধকারের মতো ভয়ার্ত।  

হার মেনেছে লুসি ব্যক্তির কাছে, জীবনের কাছে নয়। নিজাম যা ওকে দিতে কুণ্ঠা করেছে, হীরু তা দিতেই এসেছে এগিয়ে। এই অতীতের দুরপনেয় কলঙ্কপরায়ণ আটাশ বছরের হীরু – যার কিনা মাসোহরা পৌনে তিনশ টাকা – মহার্ঘ্য ভাতা তিরিশ টাকা – নারকেলডাঙায় যার দুটো পাকা বাড়ি আছে – যার প্রপিতামহ নাকি অযোধ্যার নবাবের দূরপক্ষের দুরতিক্রম্য সম্বন্ধের দাবিদার – তার কাছে জীবনের অভিষেক নিতে এসেছে লুসি। হীরু ওকে ভালোবাসবে কথা দিয়েছে। ওর নামে ক্যাশ সার্টিফিকেট কিনবে – চিংড়িহাটায় একটা জমি কিনবে – গ্রামের ভিটেয় দুটো চালাটিনের ঘর তুলবে। হীরু ওর সামনে ভবিষ্যৎ তুলে ধরেছে – অতীতের সবকিছু ধুয়েমুছে তকতকে ভবিষ্যতের দস্তরখানে আমন্ত্রণ করবে ওর কল্পনাবিলাসী রঙ্গীন ভবিষ্যৎকে হীরু – যদি লুসি ওকে কথা দেয় – একটিবার।

কথা দিয়েও ছিল লুসি। আর কথার পর উপকথার প্রারম্ভটা মেলা ঘটা করে উদযাপন করেছিল ২৭শে শ্রাবণের বর্ষাসিক্ত সন্ধ্যায়। দুশ হাত আর চারশ হাত লম্বা আর চওড়া সামিয়ানার তলায় হ্যাজাকের চোখ ঝলসানো আলোয় হয়েছিল অগুনতি নিমন্ত্রিতের ভিড়।

সেই একটা ছই লাগানো নৌকায় প্রাক্তন স্মৃতির বিচ্যুতি ঘটিয়েছিল লুসি।             বিয়েবাড়ির সুশোভিত তোরণ-দ্বার পেরিয়ে ওর অতিপরিচিত দিনের উপাখ্যান শেষ হলো নদীর কাদা-ভরা আঁটালো মাটির কাছটায় – যেখানটায় খানিকটা পানি এসে চমকাচ্ছিল হাওড়া ব্রিজের চলন্ত মোটরগাড়ির অসতর্ক হেডলাইটের আলোর ধমকানিতে। একটা আগুন রংয়ের শাড়ি পরেছিল লুসি – আর একটা আগুনের তন্দুর ফেলে এসেছিল ওর কলকাতার আবাসিক ফ্ল্যাট বাড়ির এক নির্জন কক্ষে যেখানটায় একদিন – মাত্র একদিন এসেছিল নিজাম।

বাইরে ঝড়ের ঝাপটা কন্কনে বাতাস। হীরুর গলাটা মমতায় ভেজা, ‘ভেতরে বসো।’

ভেতরে এসে বসলো লুসি।

‘কথা কইছ্ না যে?’ হীরুর প্রশ্নের একটু অবাক হলো লসি। মনে পড়ে এ প্রশ্নটা একদিন লুসিই করেছিল নিজামকে।

আড়ষ্ট হয়ে এসেছে লুসি হীরুর মায়াভুক বাহুর বন্ধনে। স্বপ্নময় অতীত আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মাঝখানে মনটা দোলা দিয়ে ওঠে খানিকটা। হীরুর সাটিনের কামিজটা এসে লাগছে ওর অনাবৃত বাহুর ওপরটায়।

‘ঘুমিয়েছো’, আবার ডাকলো হীরু! চোখ ঝরা দু’ফোটা পানি এসে লাগলো লুসির আর্ত জিবের ডগায়। ভেজা গলায় জবাব দিলো, ‘না।’

ধানের ক্ষেত্রের ওপর পানি নেবে এসেছে। নৌকোর গায়ে ধানের শীষের মোলায়েম স্পর্শে অনির্দেশ্য শব্দের মায়াজাল। একটা কলমিলতা স্রোতের টানে এসে পড়েছে পাঁকের মাঝখানে। নরম কাঁচা আর একটু স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। ঝিঁঝিঁ পোকার শোকাবহ একটানা কান্নার শব্দটা থামছে না। মুখ বের করে বাইরে তাকালো লুসি। কুচ্কুচে কালো অন্ধকার। নৌকোর নিচের তলানি পানিটা ডুগডুগি বাজাচ্ছে পাটাতনের তক্তার বেসুরো ছন্দে।

এমন নিবিড় অন্ধকারের মাঝখানে লুসির মনের গোপন কামনার একটা দুটো তপ্ত অশ্রু যদি এ নদীর আষ্টে পানির সাথে একটা ঝরাপাতার গায়ে ভর দিয়ে হুগলী নদী পেরিয়ে ওর নিবিড়তম আর নিস্তব্ধতম কাহিনীর নির্যাসটা মোহনায় নিয়ে পৌঁছে দিতে গিয়ে ভুল করে সাগরের সর্বগ্রাসী পরিতৃপ্তি খানিকটা ঘটালোই তা ঘটাক না। অন্ধকার রোজ আসবে না; হুগলী নদীর পানিতে রোজ কলমিলতার ডগা ভেসে বেড়াবে না, আর তাহলেও তো নৌকোর ছই-এর তলায় এমন আত্মগোপনের মোক্ষম মুহূর্ত আসবে না। দূরে আগুন ধরেছে কোথাও হয়তো – লাল আগুনের বেপরোয়া লালচে আঁচলটা শীর্ণকায়। ষোড়শীর মতো কেঁপে উঠলো খানিকক্ষণের জন্যে। নৌকোটা আরেকটা বাঁক ফিরেছে – একটা মান্ধাতার আমালের পুলের ভেতর লম্বা একটা সুড়ঙ্গ। চুনসুরকির দেয়াল হয়তো ছিল ধসে গেছে জায়গায় জায়গায়। ভয় করছিল লুসির নৌকোটা যদি হোঁচট খেয়ে থেমে যায় ওখানটায়। ওই পচা পুলটার তলায় দম আটকা পড়বে – ও মরে যাবে, কালো অন্ধকারের আস্তাবলে হবে জীবনাবাসন।

নৌকোটা সুড়ঙ্গটার ভেতর ঢুকে পড়েছে। চোখ বুঁজলো লুসি। নৌকোটা কেঁপে উঠছে আগাগোড়া। নৌকোর মুখে তেল চিটচিটে বাঁশের ডগায় লাল কেরোসিনের লণ্ঠনটা নিবে গেলো এক ঝাঁকুনিতে। কল্কল্ করে আর খানিকটা পানি ঢুকলো নৌকোর যতœলুক্কায়িত দু’চারটে সিংহদ্বার দিয়ে।

হীরু কী করে বসবে – কে জানে। ভয়ানক ভাবনায় পড়ে লুসি। পরিবেশ, পরিস্থিতি আর পরিধি আজ হীরুর কাছে উন্মুক্ত করে দিয়েছে সুযোগের সুয়েজ ক্যানাল। নৌকোর বাঁশের মাচাটায় একটুখানি বিছানা – ঠাসাঠাসি করে দুজন থাকা চলে কোনোক্রমে।

অথচ বলবার ওর কিছু নেই। সমস্ত অধিকারের ছাড়পত্র তুলে দিয়েছে হীরুর হাতে।

হুড়মুড় করে কি একটা গায়ে এসে পড়লো লুসির। না কিছু নয় – একটা কম্বল। ‘এটা গায়ে দাও – শীত করছে না তো?’

‘কই না’, অসংলগ্ন জবাব দিলো লুসি।

একটু এগিয়ে এসে বসেছে হীরু। ওর হাতের অর্ধজ্বলমান সিগারেটটা বুজিয়ে দিলো পাটাতনের তলায় দু’আঙুলের ফাঁকে ওটা দাবিয়ে দিয়ে।

লুসির গলা বেষ্টন করে ফেলেছে ওর শঙ্কিত ঋজু বাহু। ওই হাতটা ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে লুসির সর্বাঙ্গে। চোখের কাছটায় নখের আঁচড়ে সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে লুসি, ‘ইস্ বড় লেগেছে।’

‘তাই নাকি’, শক্ত বাসি পাউরুটির মতো হীরুর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে এসেছে, ‘খুব লেগেছে বুঝি।’

লুসির কপালে এসে ঠেকেছে ওর লোমশ হাতটা। একটু ভেজা আর স্যাঁতসেঁতে। হীরু ঘামছে। আর একটু স্পন্দন। হয়তো কাঁপছেও।

‘কী হয়েছে তোমার! কাঁপছো যে!’

‘না এমনি’, আর একটা নিরেট ফাঁপা জবাব দিলো হীরু। আর আরও একটা সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন, ‘তুমি আমাকে ভালোবাসো লুসি –

প্রশ্নটার আকস্মিকতায় সচকিত হলো লুসি। একটু হাসলো। কালো অন্ধকারের কাফনে সে হাসি রইলো অনাবিষ্কৃত।

‘একটা কথা শুনবে?’

আদালতের সরকারি কৌঁসুলি পক্ষের জেরার মতো আরেকটা প্রশ্ন করে লুসি, ‘কী?’

‘আর কোনোদিন তোমায় চুমু খাব না লুসি। কেন জানো?’

দপ্ করে একটা দিয়াশলাইয়ের কাঠির আগুনে ওর পা-ুর মুখটা চোখে পড়লো লুসির। নৌকার মাঝি কেরোসিনের লণ্ঠনটা জ্বালাবার চেষ্টা করছে হয়তো।

‘কাল ডাক্তার বলেছে – অর্ধ পরিসমাপ্ত কথাটার শেষ দিকটায় গলা ভারি হয়ে আসে হীরুর।

উষ্ণ একটা নিশ্বাসের প্রদাহে লুসির ভেতরটা পুড়ে আসছে। হীরুর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে লুসি, ‘তুমি কাঁপছো কেন – শরীর খারাপ করেছে –

‘না – কিন্তু খারাপ করবে এবং আরও খারাপ হবে। আমার যক্ষ্মা হয়েছে লুসি। আমি বাঁচবো বড়জোর আর দু’বছর – অথবা হয়তো দু’মাস। তবু তুমি বেঁচে থাকবে আর আমি মরে যাবো। বিয়ের আগে এ খবরটা আমায় কেউ বলেনি তাই তোমার সঙ্গে এতবড় প্রতারণার পরও তুমি আমায় আজ শাস্তি দিতে কুণ্ঠা বোধ করছো। আর একটা কথা লুসি, যে বসন্ত আমার তোমার জীবনে আসতে পারতো আরও বহু বছর তাকে তুমি আসতে দিও তোমার মনের কোঠায়। আমি মরে যাবো তার মানে এ নয়, এ পৃথিবীটা শেষ হয়ে যাবে – তার মানে এ নয় যে, বসরাই গোলাপের সুগন্ধ কমে যাবে, তার মানে এ নয় শ্রাবণের অতৃপ্ত ধারায় গঙ্গার দু’কূল জেগে উঠবে না। বৈধব্যের সাইন বোর্ডটা গলায় ঝুলিয়ে তোমাকে আজীবন বৈরাগ্যের কয়েদখানায় আমি দ্বীপান্তর দিতে চাইনে লুসি।

‘ওসব কথা তুমি বলো না।’

‘ভয় পেয়েছো? তবু বলতে আমাকে হবেই। ধর্মে আমার বিশ্বাস নেই – এ অপবাদ আমি মাথা পেতে নিতে রাজি আছি কিন্তু জীবনে আমার বিশ্বাস নেই একথা আমি বরদাস্ত করব না। আমি জীবনে এত বিশ্বাস করি যে, আমার এ বিশ্বাসের মর্যাদা নিয়ে কোনো ধর্মে আস্থাবান হলে আমায় মহামানুষ বলে বরণ করে নেওয়া হতো।’

অন্ধকারের গেলাপটা অপসারিত হয়েছে খানিকটা। পূর্ব আকাশে সূর্যোদয়ের প্রথম তেরচা আলোর বেপরোয়া রংয়ের ব্যভিচারে আকাশটা হয়েছে বিচিত্রময়।

নৌকার তলানির পানির কতরানিটা এসে ঠেকলো হীরুর কানে। লুসরি বাহু-বন্ধনে আড়ষ্ট হয়ে আবার চোখ বুজলো হীরু। লুসির চুলের সোঁদা গন্ধটা এসে ঠেকছে ওর নাকে।

জীবনের সহস্র পাতার ইতিহাসটা শেষ কি করে দিতে পারতো না লক্ষ্মী – হ্যাঁ পারতো। সহস্র রাত যাকে সেই ফেলে এসেছে পেছনে – অসংযমী আত্মবিনোদনের রূপকথায় যাকে জড়িয়ে নিতে পারতো জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, সুখ-দুঃখের আনুপাতিক ঈষৎ চেতনায় আর অবচেতনায় – তা করেনি লক্ষ্মী! আরও একটা রাত ওর জীবনে এসেছিল নিঃসহায় কারুণ্যের শেষ পঙ্ক্তি শুনিয়ে দেবার অশুভ ঘোষণা নিয়ে। একফালি চাঁদ উঠেছিল চমক খাওয়া আকাশের ব্যাপ্তিহীন সীমানায়। কবিতার খাতা ভরাট করে দেবার জন্যে ওই চাঁদ আর পাম এভেনিউর, ঝাউগুলোর ক্লান্তপরায়ণ মৃদুমন্দ হিল্লোল সেই কি যথেষ্ট ছিল না। হয়তো। কিন্তু যথেষ্ট ছিল না ওর সেদিনকার সঞ্চয়। কর্পূরের মতো উবে গেছে পেছনের দিনের জমা – তাই না বলতে পারেনি লক্ষ্মী সার্জেন্ট হ্যারিকে। না করে থাকতে পারেনি বহুদিন উপেক্ষিত প্রসাধন। জং ধরেছিল প্রসাধন কক্ষের সেই দেরাজের মুখের ছোট্ট তালাটায়। নাক সিঁটকানো গন্ধের আত্মপ্রকাশে ওর বহুদিনের সযতেœ রক্ষিত স্নোর কৌটো দেখে খুব বেশি আশ্চর্য হয়নি লক্ষ্মী। খুব বেশি ওকে দুর্ভাবনায় ফেলেনি ওই ড্রেসিং টেবিলের ত্রিধাবিভক্ত আয়নাটা। গোলাপি রংয়ের বেনারসি শাড়িটা জড়িয়ে নিতে লজ্জা পেল না – আঁটসাটে। ব্লাউজের বুতাম আঁটতে গিয়ে শালীনতার সীমারেখা পেরুবার ভয় বিপর্যস্ত করে তোলেনি ওকে।

‘হয়েছে –

‘হ্যাঁ আসছি।’ সার্জেনের মুখে দামি চুরুটের বোঁটকা গন্ধ।

জিপের সামনের সিটে বসলো গা ঘেঁষাঘেঁষি করে লক্ষ্মী। মানা করলো না কোনো উচ্ছৃঙ্খলতার আনুষ্ঠানিকতা। চোখ বুজে মুখটা বাড়িয়ে দিলো সার্জেন্টের মুখের সান্নিধ্যে। লোকটার গায়ে এত জোর – পিঠের হাড়গুলো গুঁড়িয়ে আসতে চায়। তবু – তবু সার্জেন্টের এই লালসাব্যগ্র কামনায় ইন্ধন জোগাতে পারে লক্ষ্মী কেননা – ওর জীবনের আর ক’দিনের সংস্থান হবে তার বিনিময়ে। পঁচিশ টাকার ওর পঁচিশ দিন তো চলবে – অন্তত চালাতে হবে।

জিপটা স্টার্ট নিয়েছে।

কী যেন বলছে সার্জেন্ট – মোটরের দুর্জর যান্ত্রিক গোলযোগের আড়ালে আবডালে সে কথাগুলো হলো ইতস্তত বিক্ষিপ্ত!

রাসমনি স্ট্রিটের কাছটায় এসে থেমেছে গাড়ি। পেট্রলের হাহাকারটা ক্রমশ চূড়ান্ত হয়ে উঠছিল; তাইতে এই ব্যবস্থা – বোঝাতে চাইলো সার্জেন্ট।

‘ও বাড়িটায় কী ব্যাপার বলো তো? অত লোকজন কেন?’

সার্জেন্ট হ্যারির চুরুটটা উত্তেজনায় দ্বিগুণ লাল হয়ে ওঠে, ‘ও কথা থাক লক্ষ্মী। আজ এক রাতের জন্যে এসব প্রশ্ন কি তোমার কাছে দুর্লভ হয়ে উঠতে পারে না লক্ষ্মী – অন্তত এক রাতের জন্যে।’

‘হয়তো কেন সত্যি পারে সার্জেন্ট। কিন্তু প্রশ্নটা যখন সে কথায় কী কাজ? মেয়েটাকে বের করা হচ্ছে কেন?’

রাসমনি স্ট্রিটের সেই বাড়ির ববি আর নাসরিন। বিস্ময় পাবার জন্যে যেটুকু সময় আর পরিবেশ তার প্রয়োজন ছিল তার বরাদ্দটুকু ছিল না প্রচুর। নইলে এতটা বাকশূন্য হবার মেয়ে ববি নয় – আর টেলিফোন অপারেটর সারাদিন চব্বিশ ঘণ্টা কথা বিক্রি করে যাকে খেতে হয় সে নাসরিনও নয়। ধর্মঘট করেছে চারশ টেলিফোন কর্মচারী। বারশ’ জনের প্রতি সমান সহানুভূতি দেখাবার পক্ষে প্রিজন ভ্যানটা নিশ্চয়ই যথেষ্ট বড় ছিল না। কিন্তু রাসমনি স্ট্রিটের সেই বাড়ির সাবলেট করণেওয়ালা জনৈক সরকারি ক্লার্কের কৃপায় কথাটা কানাকানি করা হয়েছিল যথাস্থানে। আর অকল্পনের দ্রুততার সঙ্গে প্রায় আলোর গতির সমকক্ষতাকে হার মানার দুর্জ্ঞেয় অভিপ্রায়ে দু’দুটো প্রিজন ভ্যানের আগমন তাই বিস্ময়ের কোনো অবকাশ দিতে রাজি ছিল না কাউকে।

ববি – হ্যাঁ ববিও। কারণ ধর্মঘটীদের প্রতি তার আন্তরিক সহানুভূতি যে যথেষ্টই ছিল, এটা নাকি ওর বুঝবারও বহু আগে যাদের বুঝবার দরকার চিরদিনই হয়ে থাকে, তারা বুঝে ফেলেছিলেন। সুতরাং –

রেহাই পেয়েছেন নাসিম বানু। কারণ এমন এক প্রতাপশালী ব্যক্তির সহপতœীত্বের দাবিদার তিনি যাঁর ফলে তার সম্বন্ধে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। লিলি কাল রাতের ট্রেনে গিরিডি গেছিলো।

নাসরিনের যুক্তিটা ছিল অকাট্য তাই তার ওপর রোষের আধিক্যটাও হয়েছিল বেপরোয়া, ‘এত রাতে আমরা কোথায় যাবো।’

‘সে খবর পরিবেশনার দায়িত্ব আমাদের নয়’, বত্রিশ পাঁটি দাঁত বার করে কথা বললেন একজন, ‘আপনাদের বারো ঘণ্টার মধ্যে কলকাতা ছাড়তে হবে।’

‘যাবো না।’

‘হ্যাঁ – এঁ-এঁ – যাবো না বললেই যদি না যাওয়া হতো হবে কতো আগে মশাই চাকরি ছেড়ে দিতাম – বলোয়ান সিং –

বিশিষ্ট পাগড়িধারী বলোয়ান সিং-এর রক্ষিত লাঠিটা তেরচা হয়ে ছিল কাঁধ বরাবর। সম্ভাব্য পরিবেশ সৃষ্টি করবার প্রস্তুতি হিসেবে লাঠিটা সোজা হলো, ‘যাও হাটো – হাটো – ইস্কা বিস্তারা ফেক দো।’ আদেশটা বলোয়ান সিং-এর তরফ থেকে উদ্দেশিত হলো আর কোনো অধস্তন সমপেশাবৃত্তি লোকের ওপর।

সার্জেন্ট হ্যারির হাতের আংটায় জড়িয়ে আছে লক্ষ্মী। একটু সোজা হয়ে বসলো এবার। সার্জেন্ট অর্ধচেতনা থেকে মেকি চেতনায় ফিরেছে, ‘ইস্ কি অমানুষ।’

‘কে অমানুষ’, বেসুরো ঝাঁঝালো গলায় বললো হ্যারি।

‘এই রাতের বেলা –

‘ও স্টপ ইট্ ডিয়ারি।’

স্টিয়ারিং হুইলের ওপর মাথা রেখে গোঙ্গাচ্ছে হ্যারি।

‘তোমার ক্যামেরাটা দেবে হ্যারি?’

‘কেন?’ তন্দ্রালস আরেকটা প্রশ্ন হ্যারির মুখে।

জিপের হেড লাইটটা জ্বলে উঠলো। আলোর প্রখরতায় চোখ ধাঁধিয়ে আসলো দু’চারজনার। বলোয়ান সিং-এর ব্যস্ততম লাঠিটার নির্বিচার বীরত্বে কেঁদে ফেলেছে নাসরিন। লক্ষ্মীর হাত কাঁপছে ভয়ে নয় উত্তেজনায়। একটা ছবি ও তুলবেই। এক মুহূর্ত ভাবলো লক্ষ্মী। কিন্তু কে ছাপবে তা? – জাতীয়তাবাদী কাগজগুলো এমন একটা দুঃসাহসিক কাজ করবে কি! সে ভাবনা থাকে, কিন্তু ক্যামেরার সাটার টিপলো লক্ষ্মী। ওইটুকু ক্ষীণ আওয়াজে হ্যারির গোঙ্গানি একদম থেমে গেল। চোখ রগড়ে সোজা হয়ে বসলো।

প্রিজন ভ্যানের কাছ থেকে দু’চারটে বুট জুতোর পায়চারি ক্রমশ সন্নিকটতর হয়ে এলো জিপের কাছটায়। লক্ষ্মীর ঘাড়ের ওপর একটা হাত – না হ্যারির নয়, প্রিজন ভ্যানের সেই বিশিষ্ট আইনরক্ষায় উদগ্রীব পেশাদারী লোকটার। ক্যামেরাটা ছিনিয়ে নিতে চাইলো – অথচ বাধা দিলো লক্ষ্মী, ‘না দেবো না।’

‘দেবে না – আরে এ তো বেশ্যা স্যার।’

আইনরক্ষক গম্ভীর হয়ে ওঠেন, ‘তাই নাকি তাহলে একেও প্রিজন ভ্যানের দরজাটা দেখিয়ে দাও।,

‘কলকাতার ভদ্র পল্লীগুলো এরা – ’

এটুকু বলতে বলতে থামলো লোকটা। হ্যারির দিকে চাইতেই সজোরে সেলাম ঠেকালো, ‘স্যার আপনি। আমরা সার অন্ ডিউটি এসেছি। ধর্মঘটী কয়েকজন – হ্যাঁ – এঁ-এঁ –

‘আর এই মেয়েটি স্যার, কিছু যদি না মনে করেন স্যার বোধহয় জানেন না একজন বেশ্যা।’

‘স্যার কখনও জেনেশুনে কি আর এসব মেয়েদের সঙ্গে নেন; কি যে বলেন,’ সমপেশাদারী আরেকজন বললো।

‘তাহলে সার মেয়েটাকেও প্রিজন ভ্যানে তুলে দেয়া যাক। তাছাড়া কি সর্বনেশে ব্যাপার। ক্যামেরা দিয়ে ছবি –

কানে কানে ফিসফিস করে কি বললো হ্যারি। লোকটা সজোরে হেসে ওঠে, ‘তা তো বটেই – তা তো বটেই চার্জটা আমরা দেবো – বেশ্যাবৃত্তির অপরাধ – এত বছর এই করছি স্যার।’

ওই একটা পথই উন্মুক্ত দেখতে পেল তিনজন, ববি, নাসরিন আর লক্ষ্মী – একটা চলন্ত অন্ধকূপ। কোথায় নেয়া হবে, কেউ জানে না – তবে হ্যাঁ বারো ঘণ্টার মধ্যে কলকাতার পঞ্চাশ মাইলের বাইরে।

* * *

জীবনের সংগ্রহশালায় অভাব হয়েছিল যথেষ্ট স্মারকস্তম্ভের। হৃদয়ের পূর্ণতর আবেগের নহবৎখানায় ঘাটতি পড়েছিল দামি দিনের পণ্য সম্ভারের – আর কল্পনার মতি মসজিদে খোয়া গেছিলো বহুকাক্সক্ষী মনের দৃঢ় একাগ্রতা – এ কথাটা বুঝেছিলেন নাসিম বানু পরের দিনের পরের দিনেরও পরের দিন। একটা অতি ঠুনকো সুতোর সংযোগে মনের একটা সূক্ষ্মতম যোগাযোগটাকে সহজলভ্য করে এনেছিলেন নাসিম বানু, ববি আর নাসিরনের সঙ্গে। পরিশ্রুত জীবনটার যা কিছু জঞ্জাল, তার হিসেব নিকেশ চুকিয়ে আরেকটা নতুন মানচিত্র তাঁর নতুন সম্ভাবনার সম্ভাব্য দিনগুলোর ছাউনি ফেলতে চেয়েছিলেন কষ্টসৃষ্ট আগামী কয়েক বছরের কল্পনাগর্বী নয়া বন্দরে। অথচ বাধা দিতে পারলেন না নাসিম বানু – যখন দেখলেন, অভ্যুদয়ের প্রথম সোপানটা গুঁড়িয়ে দেয়া হলো। ববি আর নাসরিন, এই নীল আকাশটার অসংখ্য তারার ভিড় দেখবার মতো স্বল্প অবকাশও হলো যাদের জীবনে বিরল – দেয়াল পঞ্জির তিরিশটা দিন খাওয়া পরার সংগ্রামে জীবনের কর্মবহুল চত্বরে যাদের টহলদারী তৎপরতা একদিনের জন্যেও ক্লান্ত ছিল না – তাদের রক্ষা করতে পারলেন না নাসিম বানু। ভালোবাসা স্নেহ আর শ্রদ্ধার আনুপাতিক ব্যয় বরাদ্দটা কোনোদিনই সহনশীল হয়ে গ্রহণ করতে পারলো না কেউ। ইফতিখার পারলো না শ্রদ্ধার – আমিন স্নেহের – আর মেজর ভালোবাসার।

একটা বিচিত্র সমাজের কারাকক্ষে জন্মেছেন নাসিম বানু। ভালো তিনি হতে পারলেন না যেখানে – ভালো সেখানটায় কেউ হয় না বলে। সহানুভূতির বৈভব যেখানে একটা বিলাস – অথচ তার পরিবেশনার নিষ্কৃতি সেখানে পরিহাস নয়। তাই দেনা পাওনার হিসেবে যেটুকু মেলমেশ হলো না তার নালিশ হয়ে রইলো চিরন্তন, কিন্তু তার প্রতিকারের পথ হয়ে আছে রুদ্ধ।

ইফতিখার তাঁকে ঠকিয়েছে অথচ ঝুন্ঝুন্ওয়ালা তাকে জিতিয়েছে। ইফতিখার ঠকিয়েছে মনের কারবারে আর ঝুন্ঝুন্ওয়ালা জিতিয়েছে তেলের ব্যবসায়। যৌথ জীবনটা হলো অসহনীয় অথচ যৌথ ব্যবসাটা পেল সাফল্যের রক্ততিলক। কি আশ্চর্য জীবনে বাঁচার পথ তার এত সুগম – আয়োজন এত প্রচুর। ঝুন্ঝুন্ওয়ালা চার হাজার টাকায় ব্যবসা ফাঁদিয়েছে – কড়ায় গ-ায় লাভ চুকিয়েছে। ফাঁকি নিজে কাউকে দেবেন না নাসিম বানু – তাই ঝুন্ঝুন্ওয়ালা সে ভারটা নিজে থেকে মাথা পেতে নিতে অস্বীকার করেনি যেদিন নাসিম বানু পথে এসে দাঁড়াবার আগে কলুটোলার ওই ব্যবসাটায় টাকার অঙ্ক তুলে দিয়েছিলেন ওর হাতে।

ইফতিখার হয়তো ফিরেছে – অন্তত তাই তো বলছে সবাই। কলকাতার ওই বড় ইমারতটার ছত্রিশটা কামরার একটা কামরায় বসে ধুঁকছে হয়তো ইফতিখার অবশিষ্ট দিনগুলো সমাপ্তির আশায়। চার চারটে চিঠি লিখেছিল। ইফতিখার – জবাব দেননি নাসিম বানু – দেবেনও না কোনো দিন। অসুখের সময় কাছে ডেকেছে ইফতিখার – কিন্তু সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে নাসিম বানুর কাছে। জীবনটা আর ফিরিয়ে নেয়া যাবে না – যেটা ভেঙ্গেছে রাংতা দিয়ে জুড়ে দেয়া যাবে না – এ যুক্তিটা তলিয়ে দেখলেন নাসিম বানু।

রাত বারোটা বায়ান্নো মিনিটে ডাইরির পাতা খুলে এ কথাগুলো ভাবছিলেন; কলমের কালিটা শুকিয়ে গেছে খানিকটা। লিখবার কিছুই কি নেই – না সত্যি নেই। বৈষয়িক জীবনের তাড়াকাগজের মাঝখানে আসলো নাসিম বানুর ইপ্সিত কামনার ঠিকানা সংবদ্ধ কাগজটা হয়েছে বেমালুম গায়েব।

এই বিরাট পৃথিবীর বিপুল ঘটনার আবর্তে ইতিহাস যেখানে ফেঁপে উঠছে প্রতিনিয়ত আত্মপ্রকাশের দুর্বার আগ্রহে সেখানে নাসিম বানু লিখবার কিছুই পেলেন না।

একটা যুক্তি দ্বন্দ্বের কুয়াশাজাল ছিন্ন করে সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমশ, সমাজের ডান সড়কে চলেছেন নাসিম বানু বাঁ সড়কের বিপদবাধার ঝঞ্জাট থেকে গা বাঁচাবার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবার আশ্বস্তি নিয়ে। দুটো শিবিরে ভাগ হয়ে গেছে সমাজের অণু পরমাণু। প্রয়োজনটা কখন কোনোকালে প্রকট হয়ে ওঠেনি তাঁর জীবনে, নির্দিষ্ট পথের দিশারী হবার আগ্রহ ছিল না বলে! তবু পথ তাঁকে বাৎলে দেয়া হয়েছিল। দুঃখ একটু হয় নাসিম বানুর। তাঁর চারধারে পরিবেশটা রক্ষিত হবে কাচের বৈষমের মতো যথেষ্ট সাবধানতার সঙ্গে – এ ইচ্ছাটা ছিল তাঁর প্রচুরই। অথচ সে স্বপ্ন প্রতারণা করলো তাঁর দূরদৃষ্টির সক্ষমতাকে। প্লাটিনামে এনামেল করা যে সমাজ তার উর্ধতম কক্ষে বাস করতে চেয়েছিলেন নাসিম বানু সমাজ সচেতনতার জীবাণু সেখানটায় তার সান্নিধ্য পাবে না শুধু এ ভরসায়। তাই একটা দিন আসতো আর যেতো – আর নাবতো আর লয় পেতো; সোফায় সিঁধিয়ে বসতেন নাসিম বানু – ইভনিং ইন্ প্যারির সুগন্ধটা নাক ভরে গ্রহণ করতেন বিকেলের পড়ন্ত রোদে – সন্তুষ্টই হতেন অথবা যথেষ্ট রুষ্ট হতেন কখনো কখনো এসেন্সার নির্ভেজালতার সন্দেহপ্রবণতায়। অথচ ‘প্যারির সন্ধ্যা’ প্যারিতে বিলাসব্যাসনের সম্ভোগ আনতে পারেনি তার দেশবাসীর জন্যে, এ খবরটাও শুনেছিলেন নাসিম বানু – খবরটা বলেছিল নিজাম। কারণ ওই ছোট এসেন্সের শিশিটা প্যারির সন্ধ্যার যে কামাতুর প্রতিচ্ছবি এঁকে বেড়ায় তা কত বড় মিথ্যে তাও বুঝিয়েছিল নিজাম একদিন একটা খবরের কাগজের ছোট একটা সংবাদের দিকে ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রুটির লড়াইয়ে সেখানকার সন্ধ্যা আজ বিলাসব্যাসনের অবকাশ ব্যর্থ করেছে লাখো জনতার জন্যে। বয়ে গেলো নাসিম বানুর। প্যারির পোর্টে স্ট্রাইক হোক বা না হোক, সেখানকার মানুষ মরুক কি বাঁচুক, সে প্রশ্নটা নিয়ে কেনই বা এত মাথা ঘামাতে হবে। নিজাম বড় বাজে বকে – আর এ বিশেষণটা ওকে বোঝাবার পক্ষে একান্ত প্রযোজ্য ভেবেছিলেন নাসিম বানু। অথচ চোখের সামনে দেখলেন, ওই কলকাতার বড় ইমারতটা যার একটা ইটেও ঘূণ ধরেনি তারই প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে একটা চাপা ঝড়ের ঝাপটা। এ সমাজের ইফতিখার দুশ্চরিত্র – এ সমাজের পরম আত্মীয়েরা একান্তভাবে অপার্থিব। ঘৃণা একদিন মনে মনে করেছিলেন নাসিম বানু এই আড়ম্বর পরিপূর্ণ সমাজের নৈতিক মৃত্যুর আশঙ্কায়। অথচ সে সমাজের সিংহদ্বার পেরিয়ে আমোঘ মুক্তির সনদও চাননি। জীবনের সংগ্রামের জন্যে তাঁকে ব্যবসা করতে হলো ঝুন্ঝুন্ওয়ালার সঙ্গে আর ববি আর নাসরিনকে দু’বেলা ধুঁকে মরতে হয়েছে কলেজ স্ট্রিটে আর ডালহৌসিতে। রেহাই পেয়েছেন তিনি – বিশিষ্ট শিবিরের খাতায় তাঁর নাম লিস্টিভুক্ত নয় বলে। আজ – আজই যদি তাঁর আর ঝুন্ঝুন্ওয়ালার যৌথ ব্যবসায় কেউ ধর্মঘট করে মুনাফার অঙ্কটা কমিয়ে দিতে চায় – ক্ষমা কি করতে পারবেন নাসিম বানু।  না, তিনি পারবেন না। কারণ তাঁর ব্যাংক ব্যালেন্সটা এখনো এতটা ভারবহ করে তোলা যায়নি যাতে করে আয়কর বিভাগের কর্মচারীদের বারো ঘণ্টা হিসেবের খাতা খুলে নাসিম বানুর স্মরণাপন্ন হতে হয়।

সে কথা থাক। ডাইরি ভরাট করবেন নাসিম বানু। যেমন এতদিন করে এসেছেন আজও করবেন। কেউ এটা আনুষ্ঠানিক বলতে চায় বলুক। আনুষ্ঠানিকতা তাকে – শুধু তাকে নয়, এ সমাজের গোটা অংশটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে ম্যালেরিয়া রোগীকে মৃত্যুর হাত থেকে যেমন বাঁচিয়ে রাখছে পালুড্রিন। বিচ্ছিন্ন – অতি বিচ্ছিন্নতম একটা পরিধির ভেতর জীবনের যা কিছু স্বপ্ন, দুঃখ দ্বেষ, অহমিকা, এসবকে নজরবন্দি রাখার দায়িত্ব হয়তো আরও পঁচিশ বছর বর্তাবে নাসিম বানুরই স্কন্ধে। কারণ ওই ক’টি বছর বাঁচবেন এ ভরসা তাঁর আছে।

কী লিখবেন?

প্রশ্নটার সমাধান হয়নি, এখনও আশ্চর্য। ববি আর নাসরিন – না, না ওরা থাক। থাক না সেসব কাহিনী আত্মলুপ্ত। লিখতে গেলে খানিকটা উচ্ছ্বাস এসে পড়বে – হয়তো আরেক শিবিরের অনুসারীদের মতো কথাও বলে ফেলবেন দু’চারটে। না, তাঁর যৌথ ব্যবসাটা সরকারি কৃপায় পরিপুষ্ট হবার পথে এত বড় প্রতিবন্ধকতা নাইবা টেনে আনলেন নাসিম বানু। এ তো তাঁর নিজস্ব ডাইরি – একান্ত নিজস্ব।

হ্যাঁ – হ্যাঁ, অতি সামান্য দু’চারটে কথাই নাহয় লেখা থাক। বৈষয়িক? হোক না। বাজারে ঘিয়ের দাম বেড়েছে মনপ্রতি সাত টাকা, এ খবরটা একটা স্থানীয় কাগজের তলায় ছোট্ট আকারে দেখেছেন নাসিম বানু। এ হপ্তায় তাহলে আর ঘি স্টক করে লাভ নেই, কিছু অয়েল সিড স্টক করার কথা বলে দেবেন ঝুন্ঝুন্ওয়ালাকে।

সমস্ত পরিদৃশ্যমান ঘটনার যবনিকা টেনে কাঁপা হাতে ডাইরির পাতায় লিখতে বসলেন নাসিম বানু। ববি নয়, নাসরিন তাদের আহম্মকির ভেজাল কাহিনী নয় – একটা অতি বৈষয়িক ঘটনা। নাসিম বানু লিখলেন –

১৩ই আগস্ট। ঘিয়ের দাম কমেছে সেরপ্রতি চার আনা আর অয়েল সিডের দাম বেড়েছে মনপ্রতি সাত টাকা।

তলায় পুনশ্চ দিয়ে আরও দুটো কথা জুড়ে দিলেন – আমার ফ্ল্যাটের বাসিন্দা কমেছে আরও দুজন।

কারণটা লিখলেন না।

* * *

সিগন্যাল অবনমিত হবার রেওয়াজটার সাথে ট্রেন অতিক্রান্ত হবার পূর্বাভাসটা যেমন যুক্তি অগ্রাহ্য করা কঠিন তেমনি কঠিন হয়ে পড়ছিল মোড়ের মাথায় বিশিষ্ট পাগড়িধারীদের ঐক্যবদ্ধ সমাবেশ। দু’চারটে দোকানের অত্যুৎসাহী খদ্দের ঘাড় কাৎ করে জিজ্ঞেস করলো প্রথম সাক্ষাৎরত অচেনা যে-কোনো পথচারীকে, ‘কী – ব্যাপার বলুন তো; আবার কিছু নতুন হাঙ্গামা নয়তো। যেমন কুচকাওয়াজ দেখছি।’

জবাব যেমন আসে, তেমনি আসলো, ‘কী জানি হবে কিছু।’

কুচকাওয়াজরতদের ঔৎসুক্য বৃদ্ধির সঙ্গে সমান তালে একটা ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ এসে পৌঁছুলো কানে। তার কর্মচারীদের সম্মিলিত শোভাযাত্রা।

পরের ইতিবৃত্তটুকু চিরদিন যেমন আশা করা হয়ে থাকে ঠিক তেমনি অপরিবর্তনীয় হয়ে দেখা দিলো। কিছু একটা ঘটলো – কিছু নয় অনেক কিছু। শোভাযাত্রাটা ছত্রভঙ্গ হলো। দৃশ্যটা অবাক হয়ে দেখলেন কেউ, কেউ জানালেন মেলা আপসোস, কেউ বললেন তিনি একদিন স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন এ কথাটা আজ তার মিছে কথা মনে হচ্ছে, কেউ বুদ্ধিমানের মতো হেসে ফেললেন – বললেন, এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। রাষ্ট্রের বৃহৎ বয়লারে ‘হোওয়াইটরা, কয়লা ঠেসেছে এদ্দিন, এবার ‘ব্রাউনদের’ পালা – তাছাড়া ইনজিন একেবারে আগের মতোই প্রচুর শক্তিশালী আর তার দুর্জয় ক্ষমতা? প্রশ্নসাপেক্ষ।

ল্যাম্পপোস্টের গায়ে হেলান দিয়ে যে ছেলেটা দাঁড়িয়েছিল কোনো শুভ উদ্দেশ্য তাকে এতটা স্থবির করে তেলেনি। শোভাযাত্রাকারীদের মধ্যে যে দু’চারজনের পকেটে ব্যাগ নিয়ে ঘুরে বেড়াবার মতো উদারচিত্ততা রয়েছে, তাদের পকেট কেটে তাদেরই মাধ্যমে রুজির ফিকিরটা যে সবসময়ই অধিকতর লাভজন, আমিনের স্বল্প অভিজ্ঞতায় একথা পোক্ত হয়ে গেছিলো। একটা বাচ্চা ইস্কুলের ছোকরা শোভাযাত্রীদের মধ্যে চেঁচাচ্ছিল সবচেয়ে বেশি – তারপর চেঁচানোটা আরও বেড়ে গেল। একটু তফাৎ শুধু। এতক্ষণ ছেলেটা স্লোগান দিচ্ছিলো উচুঁ গলায়, এবার ওর কান্নাটা গেলো তারস্বরে। ব্যাটনের আঘাতটা ওর সহনশক্তির তুলনায় একটু বেশি হয়েছিল হয়তো, অনুমান করলো আমিন।

 ছোট্ট একটা প্রতিবাদ, এবং জীবনে হয়তো প্রথম, জানালো আামিন, ‘ও বাচ্চাটাকে নিয়ে এতো তোলপাড় কেন। ছেড়ে দিন না।’

এক ডজন রক্তাক্ত চোখ কেন্দ্রীভূত হলো আমিনের ওপর। দেশরক্ষা আইনের চরম সান্নিকট্য অনুভব করলো আমিন, যখন সত্যি সত্যি দু’চারটে ছোটখাট বচসার পর বলা হলো ওকে একবার লালবাজার যেতে হবে। একটা কাগজও দেখানো হলো – তার মর্মকথা : যথাযোগ্য ব্যক্তিবৃন্দ এ কথা জানাতে গিয়ে খুশি হচ্ছেন যে বিশিষ্ট পাঁচিলের বাইরে আমিনের অবস্থান দেশের হিতের পরিপন্থী।

তিনটে মেডেল ঝোলানো যে উচ্চপদস্থ কর্মচারীটি শোভাযাত্রার অসামান্যরকম সাফল্যজনক পরিসমাপ্তির সহায়ক ছিলেন তাকে দেখে একটু অবাক হলো আমিন। লোকটা যেন তার চেনা, ‘একি রামকিঙ্কর দা।’

মুহূর্তে লোকটার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল অতি আকস্মিকতার প্রাবল্যে, হ্যাঁ, মানে আমি রামকিঙ্কর –

‘তা হঠাৎ এখানটায় আর এ বেশে।’

‘না লালবাজারে কাজ করছি কিনা।’

রামকিঙ্কর লালবাজারের উর্দ্ধতন কর্মচারী। এরপর আর কোনো প্রশ্নাপ্রশ্ন চলে না, যুক্তি চলে না। সুতরাং কথাটার গতি রুদ্ধ হলো সেখানটাতেই।

‘চলো –

পেছন থেকে বিক্রমশালী – ওকে পাহারা দিয়ে যথাস্থানে পৌঁছুবার দায়িত্ব যার – ঠেলছিল আমিনকে।

রামকিঙ্কর ইতস্তত পায়চারি করতে করতে আরেকবার এসে দাঁড়ালেন ওর কাছটায়, ‘কেন যে এসব হাঙ্গামায় থাকো। কী ফ্যাসাদ  বলো তো।’

‘ফ্যাসাদ’, একটু হাসলো আমিন, ‘ফ্যাসাদই বটে, তবে কিনা রামকিঙ্কর দা যে অমোঘ শিক্ষাটা আপনি আমায় দিয়েছিলেন ডেরাডুনে, আর যার চর্চাটা ভালোই চলছিল এদ্দিন, তার পরিণামটার জন্য কোনোদিনই পস্তাতে হয়নি আমাকে, এটাই আমার দুঃখ। ওয়ারেন্ট বেরিয়েছিল অথচ সেদিন আমাকে যথাস্থানে পৌঁছুবার কথা যথাযোগ্য ব্যক্তিরা একদিনও ভাবেননি। অথচ আজ আমি মুহূর্তে কতবড় হানিকর হয়ে পড়েছি দেশের স্বার্থের পক্ষে, তাই না –

জবাব দিলেন না রামকিঙ্কর। একটু মুচকি হাসলেন মাত্তর।

* * *

স্বর্ণ যুগের স্বর্ণ দিন অতিক্রান্ত – দীর্ঘ উপক্রমণিকা সম্বলিত পুরোনো ইতিহাসের পাতায় একটা যুগ হয়েছে বিস্মৃত। আবীরের মতো রং ছিটিয়ে দিতে পারতো যে ঘটনার বৈচিত্র্য, বিস্ময়ের অনুভূতিতে অভিভূত করে তুলতে পারতো যে উপাখ্যান, আগ্রহ-নিগ্রহের প্রাচুর্য্যে প্রাচুর্য্যময় করে তুলতে পারতো যে পরিবেশ তার যাত্রাপথ হয়েছে নিঃশেষ। তার সীমাহীন গতি নিষেধাজ্ঞার বিজ্ঞপ্তি সেঁটেছে নাসিম বানুর স্থবির মনে। কোপার্নিকাসের সৌরবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে চলছে অহরহ সাত কোটি তারকাপুঞ্জ অথবা ওই নেবুলা কালের বিপুল গতিচক্রে নিয়মতান্ত্রিক ব্রহ্মা-ের প্রতি অমোঘ আস্থা হারাতে পারেনি বলে।

অথচ নাসিম বানুর সৌরজগতে ঘটেছে বিপ্লব। নিউটনের মধ্যাকর্ষণ নীতির অপব্যাখ্যা আর অপমৃত্যু হলে তাই একলা নাসিম বানুর বেলায়। আকর্ষণ করে আঁকড়ে কাউকে রাখা গেলো না, ছিটকে গেলো উল্কার গতিমুখরতায় জীবনের গতিপ্রাণ পরমাণু – পরমাণুই বটে – নিজাম, নাসরিন, ববি পরমাণুর মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হয়ে গেছে তাঁর ঋজু দৃষ্টির বড় সড়ক থেকে। দুশো কোটি বর্ধিষ্ণু মানুষের আস্তানায় ওদের অবস্থান – গাণিতিক ক্ষুদ্রতায় লজ্জাস্কররকম শূন্যতার পরিচায়ক হতো হয়তো। তবু এই পরমাণু – এই পরমাণুর মধ্যে যে অণুর জন্মই মিছে হতে পারে সে কথাই কে বলবে। আর তার আণবিক বিস্ফোরণ যদি আজকার নগ্ন সমাজের নগর নিতম্বে হিরোশিমার অপঘাত নিয়ে নাবে – সে ইতিহাস কি জয়ী হবে না; এ ইতিহাস কি পরাজিত হবে না।

ইফতিখারের কলকাতার ইমারতটা ছেড়েছে নিজাম দু’বছর হলো, খবরটা শুনেছেন নাসিম বানু। সম্ভোগের প্রাচুর্য বরদাস্ত করতে পারেনি বলে, জীবন সংগ্রামের কারখানায় ও হয়েছে দিনমজুর। ভালো করেছে না করেনি, সে প্রশ্নের জবাব দেবেন না নাসিম বানু, যেমন অনেক প্রশ্নেরই জবাব পাল্টা তিনিও পাননি নিজামের কাছ থেকে।

দূরের গির্জার ঘণ্টায় দুটো বেজেছে। দুপুর দুটো। এমন দুপুর এত নিরলস হয়ে কখনো আসেনি। দায়িত্ব মুক্তির ছাড়পত্র এমন সুস্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়নি এর আগে কখনও, তবু অবাক হন নাসিম বানু। নৈতিক বিশুদ্ধতার ন্যায় দৃষ্টিতে মাহাত্ম্যের শীর্ষতম উর্ধতায় উন্নীত হবার যোগ্যতা কি তাঁর ছিল না। অপ্রয়োজনে দুটো কথার বেশি চারটে কথা বলেননি, দীন দরিদ্রের প্রতি তাঁর মুক্তহস্ততার কথা নিয়ে অমন দু’চারখানা জীবনীও হয়তো বেরুতে পারার প্রচুর সুযোগ দিয়েছেন নাসিম বানু ইস্কুলের দু’দশটা টেক্স্ট বুকের পৃষ্ঠায়। তবু ববি নাসরিন পূর্ণাঙ্গ জীবনের অধ্যায়ে দুটো অসমাপ্ত পরিচ্ছেদ আজ যেন বড় বেশি করে শাঁসিয়ে যাচ্ছে নাসিম বানুকে – তোমরা ক্ষয়িষ্ণু আমরা বর্ধিষ্ণু। আমরা আগামী আর তোমরা ভূতপূর্ব।

শহর থেকে সাত মাইলে মধ্যে বেহালার কাছাকাছি মীরণ দরবেশের আস্তানা। মীরণ দরবেশের জীবনাবির্ভাবের সন তারিখ মনে রাখার প্রয়োজন যাদের ঘটেছিল এককালে মৃত্যুর খপ্পরে কবরের তলায় রক্ত, মাংস হাড় করে সে ভক্তের দল চিরদিনের মতো ঘুমোচ্ছেন। মীরণ দরবেশ মারা গেছিলেন অথবা মারা তাকে হয়েছিল দুটো জনশ্রুতির কোলটা সত্যি সেটা তদারকের উপায়ও নিঃশেষ হয়েছে এতদিনে। লর্ড ডালহৌসির আমলে মহাপ্রাণ সাধকের কাঁচা কবরে বারশ ইট পাঠিয়েছিল স্যার ব্যারিমুর। লোকটা ছিল খ্রিষ্টান কিন্তু শেষ বয়সে দরবেশের প্রতি অমোঘ শ্রদ্ধার বাণ কূল উপচে ওঠার আগেই ঔপনিবেশিক সরকারি চাকরিতে বরখাস্ত দিয়ে দু’বেলা দরবেশের মাজারে খালি পায়ে দস্তানা হাতে হাঁটু গেড়ে মোনাজাত করেছে এই ব্যারিমুর। কবরটা পাকা হয়েছে এতদিনে। শ্বেত চর্মের উথলে পড়া ভক্তির প্রামাণ্য সূত্রের ব্যাখ্যা যুক্তিগ্রাহ্য হবার অনেক আগেই একদল ভক্ত কোনো শুভদিনের চাঁদা করে সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে দরবেশের আস্তানায় আত্মার মুক্তির ছাড়পত্র আদায়ের কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। মোমবাতির কারখানাগুলো যে কারণে এদেশে স্বল্পালোক বিতরণের মাধ্যম হয়েও ধর্মপ্রাণ দেশবাসীর অমোঘ ভক্তির কারুণ্যে দুটো পয়সা রোজগার করে থাকেন তার ব্যতিক্রম হয়নি এক্ষেত্রেও। তিন ডজন মোমবাতি নিদারুণ উৎসাহে দরবেশের আস্তানা আলোকিত করেছে তিরিশ বছর।

তারপর ভক্তদের ভেতর একটা তর্ক উঠেছিল সেই তিরিশ বছর শেষ হবার তিরিশ দিনের আগের দিন। মীরণ দরবেশের প্রতি মরহুম ব্যারিমুরের ভক্তির আধিক্য সমন্ধে সন্দিহান হয়ে পড়লেন দু’চারজন। কেউ কেউ বললেন মীরণ দরবেশ শেষ বয়েসে ধর্মত্যাগী হয়েছিলেন – কেউ বললেন আদতেই ছিলেন খ্রিষ্টান। এই তর্কের সুদীর্ঘ অবকাশের মাঝখানে মীরণ দরবেশের আস্তানায় লোক সমাগম কমে যে অঙ্কে দাঁড়ালো তাতে করে চারটে মোমবাতি একরাতে জ্বালাবার মতো পয়সা সংগ্রহের প্রশ্নটাও জটিল হয়ে এলো। আবার পঁচিশ বছরের শেষান্তে মীরণ দরবেশের বিকৃতিকারকদের লক্ষ করে যেদিন এলাননামা ছাপা হলো, সেদিন দু’চারটে নয়া রিক্রুট এসে আসর গুলজার করলেন। ভক্তের সংখ্যা বাড়লো না, ভক্তির দৃঢ়তা বাড়লো।

এই মীরণ দরবেশের আস্তানায় নাসিম বানু এসে পৌঁছুলেন মানসিক অপমৃত্যুর প্রতিকার বিধানের আকাশকল্পী মনোবাঞ্ছনার পরিপূর্ণ পানপাত্র ভরাট করে।

সিলভার প্লেট করা ছত্রিশ টাকা জোড়ার দুটো লোবান দানি আনলেন সঙ্গে করে। এ দুটো আস্তানাতেই থাকবে – নাসিম বানুর অভিলাষ।

আস্তানা সংলগ্ন ছোট্ট কেটা ঘর। বহুদিন ব্যবহারের অপ্রাচুর্যে দু’চারটে সবুজ শিকড় মাথা গজাতে কাপর্ণ্য করেনি – সিমেন্ট বাঁধানো চত্বরে। শহরের প্রান্তদেশে নিরিবিলি এ জায়গাটা বেছে নিয়েছিল একজন। নানা ধাঁচের আর নানা ঢং-এর ছেলেরা পুরোনো চিমসানো বই আর শ্লেট পেন্সিল নিয়ে বসতো ওইখানটায়। বুদ্ধির সঙ্কীর্ণতায় আর প্রাণের আন্তরিকতায় যারা সমঝোতা করে নিষ্পেষণের যূপকাষ্ঠে মাথা পেতেছিল বহুদিন তাদের ছেলেদের পড়িয়ে লিখিয়ে মানুষ করবার চেষ্টাটা হয়তো একেবারে দুঃসাধ্য নাও হতে পারে – এমন শপথ ছিল অনেক লোক থাকতেও মাত্র একজনের। বাইরের লোক যেটাকে বলতে তার ,অহেতুক বিলাস।

তেমনি সন্ধ্যা নাবলো মীরণ দরবেশের আস্তানায়, যেমন নাবে পৃথিবীর প্রতি              প্রান্তে। তেমিন ভয়াবহ লালয়ের লালিত্যে পশ্চিম দিগন্তে মেঘের বুকে পড়েছে রংয়ের আবীর। একটা ধীমে ল্যাম্পপোস্টের নি¯প্রভ আলোয় ক্ষয়িষ্ণু সমাজের শ্লেষাত্মক আলো বিতরণের কার্পণ্যপরায়ণতার একটা জৌলুসময় অভিব্যক্তি।

পাশের ঘরটায় ছেলেরা আসর করে পড়তে বসেছে তেমন ময়লা নোংরা কাপড় পরে – তেমনি হাই তুলে শ্লেট মুছে, শার্টের আস্তিনে নাক ঝেড়ে, ছেঁড়া বইয়ের পাতায় থুতু লাগিয়ে।

লোবান জ্বালালেন নাসিম বানু নিজের হাতে। পূণ্যার্জনের ব্যবস্থাটা হস্তান্তর করতে নারাজ ছিলেন হয়তো তাই।

বিমর্ষ ক্ষোভ দগ্ধ, একদল লোক এসে নাবালো একটা লাশ আস্তানার সিঁড়ির কাছটায়। উগ্র আঁতরের গন্ধে ভেজান একটা কড়া ঘ্রাণ এসে স্পর্শ করে নাসিম বানুর নাসারন্ধ্র। কালো গেলাপে ঢাকা লাশ – মীরণ দরবেশের আস্তানার কাছটায় একটা কবর খোঁড়ার কাজ শেষ হয়ে এসেছে প্রায়।

লোবানের ফাঁপা ধোঁওয়াটা এঁকেবেঁকে জড়িয়ে মিলিয়ে গেল আত্মাহুতির চরম আনন্দে।

কানদুটো বোবা হয়ে এসেছে। কাছের কথাগুলো অস্পষ্ট হয়ে আসছে সহনশীলতার দ্বাররুদ্ধ সিংহদ্বারে একটা প্রচ- আলোড়ন। পেছন ফিরে চোখ বুজে ফেলেন নাসিম বানু।

শুভানুধ্যায়ীদের কণ্ঠ সহানুভূতির মাদকাতয় আসিক্ত। দুটো চারটে কথা এসে পৌঁছুলো অবিশ্বাস্য  চরম বেদনার শেষ উপক্রমণিকাটা নাসিম বানুকে নিজ থেকে শুনিয়ে দেবার অসীম আগ্রহে।

‘কাছাকাছি কোথাও গোর দিলে হতো না –

‘শেষ ইচ্ছে কিনা। রাজগীর থাকতেই বোলেছিলেন মীরণ দরবেশের ওখানটায় আমাকে শুইয়ে দিও – আর কোথাও আমি শান্তি পাবো না।’

‘আর কেউ নেই বুঝি, আত্মীয়স্বজন?’

‘থাক ওসব কথা আর তুলবেন না – ও অপ্রীতিকর অধ্যায়টা থাক।’

আত্মগোপন করবেন নাসিম বানু? অথচ দ্বিরুক্তির পথ তো আর নেই। ইস্পাতকঠোর শপথ নিয়েছিলেন নাসিম বানু ইফতিখারের সঙ্গে তাঁর নৈতিক সম্পর্কটা আর এগুতে পারবে না। এগোয়ওনি সত্যি।

ওই পুরোনো বন্ধ্যা বটগাছটার মতো নিশ্চল হয়ে রইলেন নাসিম বানু। দিনের সায়াহ্নে জীবনের সায়াহ্ন আজ কবিতার পঙ্ক্তি মেলানোর মতো করে সত্যি হয়ে গেছে। এ বিরাট পৃথিবীর প্রথিতযশা পরাক্রমশালী ইফতিখার জীবনের ভরাডুবিটা কি অন্তত আর একদিনের জন্যেও ক্ষান্ত রাখতে পারতো না – আর একটা দিনের জন্যে ও কি সময় দিতে পারতো না এ নৈসর্গিক আনুষ্ঠানিকতার প্রস্তুতির জন্যে। নইলে ইফতিখারের বিয়োগব্যথায় কেন একবারও ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠতে পারছেন না নাসিম বানু, যেমন ফুপিয়ে ফুপিয়ে লোবানের ধোওয়াটা কেঁপে উঠছে থেকে থেকে।

লোবানদানিটা গড়িয়ে গেলো নাসিম বানুর কেঁপে ওঠা হাতের সীমানা থেকে। অপ্রত্যাশিত আওয়াজে সচকিত হয়ে উঠলেন নাসিম বানু – তাঁর অহমিকটা গুঁড়িয়ে চৌচির হয়ে গেছে লোবানদানির মতো। সত্যি সত্যি আরও একটা তৈজসপত্র ভেঙ্গে ফেলেছেন নাসিম বানু সেই বিস্মৃত অক্টোবরের স্মৃতিবহুল দিনের পর আজ আরেকটা দিন।

আস্তানার ছেলেরা সুর করে পড়ছে। এমনি ঘটনা রোজ ঘটে – দু’চারটে লাশ রোজ না হোক হরদমই আসছে। বিস্ময়ের সামান্যতম অনুভূতি ক্ষয়ে গেছে ওদের মন থেকে।

সুরা ইয়াসিনের খানিকটা কানে আসছিল তখনও, গোর দেয়ার কাজ শেষ হয়ে এসেছে। নাসিম বানু তাকিয়ে আছেন সবিস্ময়ে আস্তানার ওই গুটিকয় ছেলে – জীবনের পাপড়ি যারা মেলছে – জীবনের পাততাড়ি যিনি গোটাবেন তাঁর – মানে সেই নাসিম বানুর তফাৎটা। আর একবার কি নতুন করে এ পৃথিবীতে কস্মিনকালে জন্মাতে পারেন না নাসিম বানু, আর একবার ও কি কবরের কয়েদখানা থেকে নতুন জন্মের অভিষেক নিয়ে ফিরতে পারে না ইফতিখার, জীবনের হালখাতা আর একবার কি নতুন করে শুরু করা চলে না প্রথম কুয়াশার মেঘজাল কাটিয়ে।

ভীরু, শঙ্কিত মনের দেয়ালে আর একবার আহত হলো ছেলেদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর।

সেই পুরোনো পচা স্যাঁতসেঁতে বই-এর পাতা উল্টে বলে উঠলো একটি বাচ্চা ছেলে, ‘স্যার স্বরে অ দিয়ে কী হবে?’

‘স্বরে অ দিয়ে – অরাজকতা আসলো দেশে’, শীর্ণকায় শিক্ষকের দেহের আকৃতি আর কণ্ঠের ব্যঞ্জনায় বৈসাদৃশ্যের যে অপরূপ চাঁদ সেটা। যেন একেবারে অপরিচিত নয় নাসিম বানুর কাছে।

‘স্বরে অ – স্বরে অ – অরাজকতা আসলো দেশে’, সুর করে পড়ে ছেলের দল। আবেগে ভরা কণ্ঠে আস্তানার দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো – ‘স্বরে অ স্বরে অ দিয়ে অরাজকতা আসলো দেশে।’

নিজাম! — কথাটা উচ্চারণ করেই বসেছিলেন নাসিম বানু কিন্তু পারলেন না – সবটুকু কথার সবটাই স্থবির হয়ে রইলো তাঁর ইপ্সিত মনের মণিকোঠায়। শহরের এক প্রান্তে বিলাস বৈভবের মায়া কাটিয়ে নিজাম জাজিম পেতে বসেছে এই এখানটায়, এটা নাসিম বানুর কল্পনারও বাইরে। নিজামের আগামী স্বপ্নের পুঁজিতে তাহলে কি রইলো কেবল ওই ক’টি ভাঙ্গা শ্লেট, নোংরা কাপড় পরা ছেলেমেয়ে আর এক দিস্তা স্যাঁতসেঁতে পুরোনো বই।

‘স্যার, আ স্বরে আ দিয়ে কি হবে বললেন –

‘স্বরে আ দিয়ে – আমরা তাকে রুখবো হেসে –

‘আমটি আমি খাব পেড়ে – হবে না কেন, সেদিন তো তাই বলেছিলেন,’ হাবামতো একটি ছেলে প্রশ্ন করে চোখ বের করে।

‘সেদিন – একটু হেলান দিয়ে বসে নিজাম, ‘সেদিন সত্যি সত্যি অজগর আসতো মিলু – আজ অজগর আসার পথটা বন্ধ হয়েছে। বন্ধ হয়নি এদের অত্যাচারের কুচকাওয়াজ। দুটো খাবার পরবার যাদের নেই, সেদেশের মানুষ রূপকথায় অজগরের স্বপ্ন নাইবা দেখলো, আম খাবার কথা নাইবা পড়লাম আমরা। তাই বলছিলাম – সেদিনের কথা সেদিন শেষ হয়ে গেছে। আজকার কথা আজ শুরু হলো।’

একটু একটু করে অন্ধকারের বোরকা নেবে আসছে। আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে কথাটা আরেকবার শুনলেন নাসিম বানু – সেদিনকার কথা সেদিন শেষ হয়ে গেছে – আজকার কথা আজ শুরু হলো। কথা কয়টা উচ্চারণ করতে গিয়ে নিজামের ফিকে চোখটা উত্তেজানয় লাল হয়ে উঠছিল আর মুষ্টিটা দৃঢ় হয়ে আসছিল আগামী ইস্পাত পথের নয়া অঙ্গীকারে, লক্ষ করেছেন নাসিম বানু।

আজকে একটা ইতিহাসের দায়িত্ব নিঃশেষ করে আরেকটা ইতিাহসের নয়া জন্ম দেবার অঙ্গীকার দৃঢ় পদক্ষেপে পথ অতিক্রম করেন নাসিম বানু। একটা কথার সানাইই শুধু বাজছে ওঁর কানে – সেদিনকার কথা সেদিন শেষ হয়ে গেছে। আজকার কথা আজ শুরু হলো। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *