সরোবর

এক

ছায়াঘন পাম রোডের এক প্রান্তে দেখা হলো তার সঙ্গে। প্রথমে চিনতে পারিনি। না চেনবারই কথা। সেই কবে দেখেছিলাম। তখন তার বয়েসই কত। সেদিনের চেহারার সঙ্গে আজ কোনো মিল নেই। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত একটি মূর্তি স্মৃতির জাদুঘর থেকে উঠে এসেছে। ধোঁয়াটে চশমার আড়ালে তার অসহায় চোখ জোড়া খুঁটে খুঁটে দেখছে আমাকে। তারপর একসময় দৃষ্টি স্থির হলো আমার মুখের ওপর। তক্ষুনি শুনতে পেলাম শাহানশা জিজ্ঞেস করছে, ‘কেমন আছেন?’

তুমি নয়, আপনি। দীর্ঘ ব্যবধানের পর হয়তো ওই বিনয় অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। তবু এক অস্বস্তিকর উপলব্ধি। ওই সামান্য সম্বোধনের স্ফুলিঙ্গ চেতনার রাজ্যে কি প্রলয়কা- ঘটিয়ে গেল, তা শাহানশা কী করে বুঝবে। কী করেই বলব।

নিছক বিনয় নয়। শাহানশা যেন আমাকে ইচ্ছে করেই মনে করিয়ে দিলো, বয়েসের কুঁড়ি আমারও ঝরছে একে একে। মুখের আদলে আজ বসন্তের øিগ্ধতা খুঁজে বেড়ানো নিরর্থক।

বরফ তুহীন সময়ের রূঢ়তা যেমন তাকে ভেঙে খান খান করে দিয়েছে, তেমনি আমাকেও করবে। নাকি, আমার বেশভূষা, পকেটের উদ্যত সোনালি কলমের গৌরব, হাতের ফিরোজা বসানো আংটি শাহানশার সাহসটাকে গলা টিপে মেরেছে। তাই ‘তুমি’ বলে সম্বোধনের সাহস হয়নি।

আর শাহানশা? সেও আজ নিবু নিবু বাতি। চোখ ধাঁধিয়ে দেবার, গলা বাড়িয়ে কথা বলার তেজটাই যেন নেই। কেননা, সময় যখন বদলায়, মানুষ বদলায়। তাদের কথা বলার ভঙ্গি বদলায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুঝে যুঝে যদি না পারা যায়, ঘাড় কুঁজো করে ভীরুতাকে আশ্রয় করাই ভালো। বোধহয় এটাই আজ শাহানশার জীবন দর্শন। তার চোখ আমি বদলেছি। অনেক বদলেছি। আজ আর সেদিন নেই। তার হাতটা আমার হাতের কাছে ভিড়তেও সাহস পায়নি। ডান হাতটাকে জোর করেই যেন চেপে রাখে বাঁ হাত দিয়ে।

আশ্চর্য, যে আমি শাহানশার ব্যবহারে এত মর্মাহত, তার মুখেও কোনো কথা সরছে না।

তবু চেয়ে থাকতে হয়। শাহানশা শুধু নামের মতো একটি নাম নয়। শাহানশা আমার জন্য কোটি যুগ। আমার একটি মোহ, একটি অভিনব স্বপ্ন।

কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। তবু মনে হয়েছে মাঝখানে স্মৃতির এক অতলান্ত সমুদ্র। তার চোখে আমি যেন নতুন পণ্যে ভারি জাহাজে একটি সাফল্যের মাস্তুল। আর সে তুচ্ছ নিরীহ সনাতন একটি বাতিঘর। যে বাতিঘর এখন অভ্যাসের আলোয় উজ্জ্বল। তা নইলে বাতির কোনো আলো নেই।

শীত পড়েছে। কনকনে হাওয়া। এতক্ষণ এভাবে ধরে রেখে যেন কষ্টই দিচ্ছি।

বললাম, ‘ঠিক যেন এক যুগ।’

শাহানশা সে কথার কোনো জবাব না দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।

তারপর বিড় বিড় করে বলে, ‘কী করা হয়?’

বোঝা গেল তার দ্বন্দ্ব এখনও ঘোচেনি। পরিচয়ের সান্নিধ্যেও লৌকিকতার প্রহসন কাটিয়ে উঠতে পারছে না।

শাহানশার কোটে কি বোতাম লাগাবার লোক নেই। তার কি দাড়ি কামাবার ব্লেড নেই। জুতোর ফিতে বদলে নেবার সঙ্গতি নেই। করুণায় বিগলিত হয়ে হাত বাড়িয়ে তুলে দেবো নাকি কিছু!

জিজ্ঞেস করতে সাহস হয় না। হয় না এজন্যে যে, পরিচয়ের নিবিড়তায় আমরা দু’জন দু’জনের কাছে ধরা পড়ে যেতে পারি। আর তাতে আমার কী হবে জানি না। শাহানশার মর্মযাতনাই বাড়বে। বললাম, ‘আসুন না এক কাপ চাই খাই।’

রেস্তোরাঁয় বসিয়েও দেখলাম শাহানশা আমার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। যেন এ যাত্রা ছাড়া পেলেই বাঁচে। পরম অস্বস্তিতে ভুগছে।

চা আনতে দিলো না।

‘কেন, খাবেন না।’

‘না।’

পীড়াপীড়ি করিনি।

আমার চায়ের দরকার ছিল না। দরকার ছিল এই পুনঃপরিচয়ের মোহাবিষ্ট মুহূর্তটি মধুর করে তোলা। হঠাৎ কী হলো জানি না। শাহানশা টেবিলের তলা থেকে সিগারেটের পাতলা কাগজের টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে পেনসিল দিয়ে কী যেন লিখল খস্ খস্ করে। তারপর ওখানা আমার হাতে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আমার ঠিকানা।’

কাগজখানা মুড়েই দিয়েছিল। আমি মুড়েই রেখে দিয়েছিলাম। হয়তো সেখানেও খানিকটা সঙ্কোচ। শাহানশা যে কোনো দীনহীন পল্লীতে থাকে, সেটা প্রকাশ্যে ব্যক্ত হোক, চায় না। তাকে উঠতে দেখে বললাম, ‘এখুনি উঠবেন।’

বলল, ‘হ্যাঁ।’

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আর্দ্র গলায় বললাম, ‘সত্যি ভাবিনি আপনার সঙ্গে আবার দেখা হবে।’

যেন অন্য কারও গলা শুনলাম, ‘কী বলছেন?’

তাকিয়ে দেখি সামনে দাঁড়িয়ে রেস্তোরাঁর বয়। শাহানশা আগেই অদৃশ্য হয়েছে। তখন সন্ধে নেবেছে।

শাহানশা সেদিন এমন করে চলে গেল কেন। তাঁর মর্যাদা ক্ষুণœ করেছি – সে কথা ভেবেই কি। এমনটি সে হয় কোনোদিন আশা করেনি। কোনোদিন হবে ভাবেনি। ভাগ্য বিধাতার দুরুহ দাবার চালে শাহানশা পরাস্ত হয়েছে, এটা সত্যি হতেও পারে। কিন্তু আমিই যে জিতেছি, জানল কী করে। সে কথাই বলতে চেয়েছিলাম। শাহানশা সুযোগ দিলো না।

রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে ফিরে এসেছি ঘরে। আমার চেতনার কুয়াশা ধীরে ধীরে হাল্কা হয়েছে। শাহানশা যে আমাকে দুঃখ দিয়েছে, আঘাত দিয়েছে এবং উল্টো পেয়েছে, সেটা দূরের মাস্তুলের মতো মিশে গেছে। ঘোলাটে মেঘের মতো তার আবরণ মনের কোথাও লেগেছিল। এখন আর নেই।

ঘরের চেনা পরিবেশে আমার নিজের জগৎটাই আমাকে বাঁচাল। আশ্রয় দিলো। নীলা দরজার রোয়াকে দাঁড়িয়ে। আমি যে হঠাৎ অকারণে এত দেরি করে ফিরেছি তার জবাবদিহির সময় এটা নয়, নীলা বোঝে। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেতে দিলো। পাখা ছাড়ল। আমায় অ্যাশট্রের আবর্জনা ঝেড়ে পুছে টেবিলে এনে রাখল।

একটু একটু হাওয়া বইছে। এ সময় খুট করে নিবিয়ে চোখ বুজে থাকতে ইচ্ছে করে। নীলাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে বোধহয় চোখ বুজেই ফেলেছিলাম একসময়। নীলা বোধহয় এসেছিল তারপরও একবার। চোখ বুজেও অনুভব করতে পারি একটি চায়ের কাপ। একপেয়ালা উষ্ণ ও ভালোবাসার মায়াজালেও বশ মানতে পারিনি অশান্ত মনকে। রেডিওতে চিরাচরিত বিদায়ের নিপুণ ঘণ্টা বাজে। যাদের হাতঘড়ি মেলাবার, মিলিয়ে নেয় তারা। আমিও তাই করেছি এতদিন। কিন্তু আজ কোনো এক বি¯তৃত সময়ের টুকরো টুকরো ছবি একটি মুহূর্তের সময়নিষ্ঠাকে অর্থহীন করে দেয়।

আমার উদাস দৃষ্টির ভাষা বুঝি নীলাও পড়ে থাকবে। যে দৃষ্টি কিছু অচেনা, কিছু আশ্চর্য, কিছু অভিনব, কিছু মায়াময়।

নীলা বলল, ‘কী ভাবছ?’

এসব কথার জবাব একটাই হয়। বললা, ‘না, কিছু না।’

কিন্তু আমার এই প্রাণপণ মিথ্যেটা সেদিন যেন হাজারো সত্যের বিদ্রƒপের মতো শোনাল।

নীলাও আকাশের দিকে তাকিয়ে। তার চিবুকে জ্যোৎøার ভীরু আলোর কাঁপুনি। শঙ্কিত হরিণ শাবকের মতো থরথর করে কাঁপছে চোখের পাতা। তার এই মেয়েলি রূপ আমি ভালোবাসি। ভালোবেসেছিলাম এবং সেজন্যেই ঘরে এনেছিলাম।

নীলা কথা বলছে না। জবাবদিহি করছে না। আমার ভালো লাগছে। কত সেধিছি তখন দুটি কথা বলার জন্যে। কিন্তু সে কথার সুর ছিল আলাদা। সংসারে হাজারো ঝামেলার আর্তনাদ ছিল না তাতে। আজকাল ইচ্ছে হয় নীলা চুপ করে থাকুক।

আকাশে একটা উল্কাপি- ঝরে যায়।

নিস্তব্ধ রাতের মোহ ভাঙিয়ে চমক লাগিয়ে দি তাকে। বলি, ‘শাহানশার সঙ্গে দেখা হলো আজ।’

কল্পনার স্বপ্নরাজ্য থেকে তড়িতাহত হয়ে ফিরে এলো নীলা। আমার দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টি হেনে বলে, ‘সত্যি?’

যেন আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষার চূড়ান্ত পরীক্ষা নেবার ছলেই আবার বলে, ‘তুমি কথা বললে?’

‘হ্যাঁ।’

‘লজ্জা হলো না?’

‘লজ্জা হবে কেন।’

চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায় নীলা, ‘এমন একটা লোকের সঙ্গে কথা বলার রুচি হয় তোমার?’

অন্য সময় রাগ হতো। আজ যেন আমিও হাল ছেড়ে দিয়েছি। যেন কারও ক্ষোভের জ্বলন্ত দৃষ্টি থেকে আর বাঁচাতে পারব না শাহানশাকে। তবু নিরাসক্ত সহানুভূতির সুরে বলি, ‘কেন লোকটার ওপর অবিচার করছ?’

‘ওর নাম করো না আমার কাছে।’

আবার বলি, ‘ওকে দেখে মায়াই হলো। ভাবছি একদিন বাসায় ডাকব।’

‘তুমি পার। তুমি সব পার।’

উপহাসের সুরে বলল নীলা, ‘বাসায় ডাকবে?’

তারপর এক মুহূর্ত কোনো কথা সরে না নীলার মুখে।

কিন্তু তার নীরবতাকে সম্মতি বলে ভুল না করি সেজন্যেই যাবার আগে চড়া গলায় শুনিয়ে গেল, ‘সে তোমার খুশি। তবে আমাকে এসবের মধ্যে জড়িও না, দোহাই তোমার।’

আবার যেতে যেতে ফিরে আসে নীলা।

‘একটা কথা রাখবে?’

‘বলো।’

‘ওকে কবে ডাকতে চাও জানিয়ে দিও আগে থেকে। আমি ঘরে থাকব না।’

এরপর দুমদাম করে দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছিল নীলা। অন্তত আমাকে সে কথাই বলেছিল। অথচ আমি জানি, যেমন নীলাও জানত, এ নিছকই বানানো কথা।

নীলা কেন, শাহানশাকে যারা চেনে, তার কথা যারা জানে, তাদের কারওই ঘুমুবার উপায় নেই।

শাহানশা কি সত্যি সত্যি মানুষ, না পাষ-। সে প্রশ্নের জবাব এতদিন এত লোকের কাছে চেয়েছি – পাইনি।

রাত বাড়ছে। ঠান্ডা হাওয়া বইছে। আর আমি বসে বসে ভাবছি শাহানশাকে নিয়ে আমার মাথাব্যথা কেন। ও আমার কেউ না। কস্মিনকালেও হতো না। ওকে আমি কতটুকুই চিনি। কতটুকু জানি। তবু এমন চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল কেন। আর এ পৃথিবীতেই তার বন্ধু কি একটিও নেই? সে কি সবার দরজাতেই ঘা খেয়ে খেয়ে ফিরবে? তবু তার কথা ভাবছি কেন। না অদৃশ্য সুতোর টানাপোড়েনে আমরা যেমন, সেও তেমনি নেচেছে। ওর দোষ কি!

দুই

রওশন জাহান যেদিন ছাতা মাথায় গট্ গট্ করে বার লাইব্রেরির সামনে কলেজে তার প্রথম ক্লাস নিতে গেল, অনেকেরই তা পছন্দ হয়নি। তার দর্পিত পদচারণায় কেমন দুঃসাহসের ভঙ্গি। তার ভ্রƒক্ষেপহীন স্থির দৃষ্টিতে কেমন একটা ঔদ্ধত্য। বার লাইব্রেরির যারা ইন্টারভিউ নিয়ে তার চাকরি দিয়েছিল তাদের দিকে তাকিয়ে দেখার কথা মনে হয়নি। আর কিছু না হোক অন্তত সামান্য কৃতজ্ঞতা বোধ, অনেকেই আশা করেছিল মহিলা কলেজের নতুন লেকচারের কাছ থেকে।

কিন্তু সত্যি সত্যিই তো আর তার অকৃতজ্ঞ আচরণের জন্য যেচে দুটো কড়া কথা শুনিয়ে দেওয়া যায় না। রওশন জাহানকে চাকরি দেবার আগে ম্যানেজিং কমিটির সবাই তার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, বিদ্যাবুদ্ধি যাচাই করে নিয়েছেন। তবু যদি তার ব্যবহারে, আচরণে একটা অসহনীয় কিছু লক্ষ করা যায় তার জন্যে ক্ষুব্ধ না হয়ে পারা যায় না। সেদিন সন্ধেবেলাই কথাটা উঠেছিল বার লাইব্রেরিতে।

থার্ড মুন্সেফ মনোয়ার বলেছিল, ‘আমি প্রথম থেকেই না করেছিলাম।’

জজকোর্টের প্লিডার শফিক মাহমুদ বলল, ‘না আমিও করেছিলাম কিন্তু ব্যাপার এতদূর গড়াবে ভাবতে পারিনি।’

উৎকর্ণ মনোয়ারের সঙ্গে সঙ্গে আরো কয়েকটি মাথা এসে জড় হলো ব্রিজ টেবিলের চারপাশে।

‘নতুন কিছু শুনলে নাকি।’

তেমন নতুন কিছু শোনাবার বোধহয় ছিল না মাহমুদের। তবু এতগুলো লোককে নিরাশ করতে মন ওঠেনি।

তাই বলল, ‘কাল দেখলাম সোজা ফোর্টিন আপে চেপে বসল।’

‘কেউ সঙ্গে ছিল?’

‘আহা সে কথাই তো বলছি।’

মাহমুদের জর্দার শখ। কৌটো থেকে খানিকটা মুখে পুরে নিয়ে বলল, ‘নাসির।’

‘কোন নাসির?’

প্রশ্ন করে মনোয়ার।

‘আমাদের এক্সেকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার।’

ইঞ্জিনিয়ার নিজে জিপে করে তাকে ট্রেনে চাপিয়ে দিয়ে এসেছে। মুফিজ পেছন থেকে একখানা চেয়ার টেনে এনে বলল, ‘ভেরি ইন্টারেস্টিং।

প্রসঙ্গ আর এগুল না। অন্যায় করে রেফারি ফাউল দেওয়ায় মায়াপুর স্পোর্টিং ক্লাব, থমসন শিল্ড পায়নি সে খবরটা কে এনে উপস্থাপিত করল।

রওশন জাহান অন্তত সেদিনের মতো অব্যাহতি পেল।

শনিবারে ক্লাস সেরে ফোর্টিন আপ ধরে রওশন। রোববার দেশের বাড়িতে কাটায়, আবার বিকেলে ট্রেনে ফিরে আসে।

প্রথম প্রথম গাড়ি ডেকেই যেত। ইঞ্জিনিয়ার জিপ পাঠাতে চেয়েছে। আপত্তি করেছে রওশন, ‘থাক না। গাড়ি কি অসুবিধে। দরকার হলে খবর দেবে।’

দরকার সেদিনও হয়নি। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার ঘুরেফিরে লাল সুরকির পথ বেয়ে কলেজ কম্পাউন্ডের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। বেরুতে যাচ্ছিল রওশন।

দেখে বলল, ‘নিয়ে এসেছেন গাড়ি। চলুন ভালোই হলো।’

রোববার দিনও সেই স্টেশন থেকে তুলে এনেছিল।

জিনিসপত্র তুলতে তুলতে শুধাল রওশন, ‘বসুন। এক কাপ চা দি।’

ইঞ্জিনিয়ার নাবল গাড়ি থেকে।

বলল, ‘বেশ তাহলে ভেতরে চলুন। এখানে না।’

রওশন যেন বোঝে না। এমন চমৎকার বাগান। ঝিরঝিরে হাওয়া এই বিকেলে ঘরকুনোর মতো ভেতরে গিয়ে বসতে হবে কেন।

ভেতর থেকে একটা চেয়ার এনে দিয়ে বলে, ‘বসুন। আমি আসছি।’

তবু আমতা আমতা করে ইঞ্জিনিয়ার।

‘বাইরে বসব? ঠিক হবে কি।’

সে কথার জবাব দেবার অবকাশ নেই রওশনের।

নতুন চায়ের সেট থেকে দুটো পেয়ালা বার করল।

ট্রেতে দু’কাপ চা নিয়ে আসে। সঙ্গে কিছু খাবার।

ইঞ্জিনিয়ারের স্বস্তি নেই। কলেজ কম্পাউন্ড। আশেপাশে মেয়েরা ঘোরাফেরা করছে। বোধহয় দু’একজন কটাক্ষও করে থাকবে। রওশন যেন তার মনের কথাটা বুঝতে পেরেছে। বলে, ‘আপনি ভীষণ ভীতু। হোক না কলেজ কম্পাউন্ড, আমার নিজের কোয়ার্টার, পরওয়া কাকে।’

কী জবাব দেবে ভেবে পায় না ইঞ্জিনিয়ার। তাকে ভীতু বলে অপবাদ দেওয়ার কোনো মানে হয় না। রওশন জাহান কি তাকে কচি খোকাটি ভেবেছে?

‘কী ভাবছেন?’

চায়ের কাপ তুলে নিয়ে তাতে চুমুক দেয় ইঞ্জিনিয়ার।

সন্ধে হয়ে আসে। এবার ওঠার উপক্রম করতে হয়। মেয়ে হোস্টেলে বাতি জ্বলতে শুরু করেছে।

রওশন তাকে নিজে গাড়ি পর্যন্ত তুলে দেয়। বলে, ‘কাল আসুন না আবার। ভালো একটা ছবি আছে, দেখা যাবে।’

প্রস্তাবটা লোভনীয়। প্রত্যাখ্যান করেনি ইঞ্জিনিয়ার। যদিও এই লোকে লোকারণ্যে সিনেমাহলের ভিড়ে সে একটুও নিবিড় হয়ে কথা বলতে পারবে না।

কিন্তু আর কোথায় নিয়ে যাওয়া যায়। ছোট্ট শহর। পর্দা টেনে কেবিনে বসে চা খাওয়ার চেয়ে তো ভালো।

ঠিক কী ছবি ছিল মনে নেই ইঞ্জিনিয়ারের। ভালোই লেগেছিল। আরো ভালো লেগেছিল যখন সেই আধো অন্ধকারে রুপালি পর্দার বিচ্ছুরিত ঝাপসা আলোয় রওশনের শ্বাপদ চোখদুটি থেকে থেকে তাকে লক্ষ করেছে। তন্ময় রওশন তার আঙুলের কণা দিয়ে একবার ছুঁয়ে দিয়েছিল নাকি। কি জানি।

গাড়ি থেকে নেবে রওশন জাহান বলে, ‘আপনার ওপর বড্ড অত্যাচার করা হলো কিন্তু। টিকেটের পয়সাটাও নিলেন না। মেয়েদের দেখলে খুব মহানুভব হয়ে যান, না?’

সে কথার জবাব সরেনি ইঞ্জিনিয়ারের মুখে।

রওশনই কথা বলল আবার, ‘কবে আসছেন ফের?’

পেছনে গাড়ি ঘোরাতে গিয়ে লাল আলোয় দীপ্ত হয়ে ওঠে এক জোড়া চোখ।

ইঞ্জিনিয়ার জিজ্ঞেস করে, ‘কে দাঁড়িয়ে?’

বজ্র নির্ঘোষে জবাব এলো, ‘আমি শাহানশা।’

কলেজ কম্পাউন্ডের বাইরে একটা বটগাছের তলায় ওভারকোট গায়ে দাঁড়িয়ে শাহানশা।

এরপর আর কোনো কথা হয়নি।

শাহানশাকে সবাই চেনে। সবাই জানে।

ইঞ্জিন স্টার্ট দেবার আগেই পাশে এসে বসে শাহানশা।

বলে, ‘কোথায় যাচ্ছেন, আমাকে নাবিয়ে দিন তো।’

তাকে নিরস্ত করার চেষ্টা নিরর্থক। অস্বাভাবিক আচরনের কৈফিয়ৎ চাওয়াও তার কাছে অর্থহীন। শাহানশা সব পারে। কিন্তু নিজেই কোথায় যেন অপরাধ স্খলনের অজুহাতে বলে ইঞ্জিনিয়ার, ‘ভদ্রমহিলাকে সিনেমাহল থেকে তুলে নিয়ে এলাম।’

শাহানশা জবাব দেয় না।

আবার যেতে যেতে বলে, ‘বড় ভালো ভদ্রমহিলা। আলাপ করলেই দেখবেন।’

শাহানশা তবু চুপ।

কেবল একবার কথা বলল, ‘আহ্হা কী করছেন। দেখছেন না সামনে কি বিরাট গর্ত। মন কোথায় ফেলে এসেছেন। না, থামুন। আপনার সঙ্গে যাওয়া পোষাবে না।’

সত্যি সত্যি নেবে যায় শাহানশা। তাকে বুঝিয়ে কিছু করা যাবে না। লোকটা এমনি একগুঁয়ে। এমনি গোঁয়ার স্বভাবের। পেছনে তাকিয়ে দেখল ইঞ্জিনিয়ার। কোথায় শাহানশা। এবার সে ক্লাসে পা দেয়।

যে মেয়ে কাউকে ভিড়তে দেয়নি, প্রশ্রয় দেয়নি, এত লোক থাকতে বেছে বেছে সে ইঞ্জিনিয়ারকে আমল দিচ্ছে কেন। একি শখের নুড়ি কুড়ানো। হঠাৎ ভালো লেগেছে বলে ঝাঁপিতে তুলে নেওয়া, মন ভরলেই ছুড়ে দেওয়া – এমন কিছু খেলা।

ইঞ্জিনিয়ারের মনে হয়েছে সে কথা। কিন্তু যদি সে তার শখের পুতুলই হয় দোষ কী। পুতুলের কাছে প্রাণের দাবি নাই থাকল। তবু তো সে এক মায়া জগতের মধ্যমণি। আদর যতœ পুতুলকে ঘিরে। যে কিশোরী বেণী দুলিয়ে গোলাপি ফিতে দিয়ে পুতুলে মাথায় পাগড়ি বাঁধে, সে কি কিছু তার ভালোবাসার কুঁড়ি সমর্পণ করে না। তার হৃদয়ের অনুভূতির পরাগরেণু ছড়িয়ে দেয় না। রওশন তাকে ডাকে। কথা বলে। প্রাণখুলে হাসে। বড় কথা এটাই। হঠাৎ একদিন সে প্রাণোচ্ছল জীবনের শেষ হবে, কথা ফুরোবে গান ফুরোবে, জলসা ভাঙ্গবার করুণ মুহূর্তটি আসবে, সেটা ভেবে মন খারাপ করা কেন।

সুতরাং ছোট মুহূর্তকে কুড়াও। অণু-পরমাণুর তুচ্ছতাকেই হাত পেতে নাও।

স্টিয়ারিং-এর চাকা থরথর করে কাঁপছে। সত্যি তার মনের তেজটা আজ আক্রোশের রূপ ধারণ করেছে। পাগলা ঘোড়ার মতো জিপটাকে তীর বেগে নিয়ে ছুটে চলছে। কিন্তু ঘুরেফিরে জিপটা যে সার্পেন্টাইন লেনের কাছে এসেই জিরোয়। সেখানে মেয়ে কলেজের কম্পাউন্ডে রওশন জাহানের কোয়ার্টার।

রওশন জাহান ছিল না। পাশের কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে আসে ইতিহাসের অধ্যাপিকা মরিয়ম বানু।

বলে, ‘কার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?’

ইঞ্জিনিয়ার আকাক্সিক্ষত ব্যক্তির নাম জানায়।

‘এখন তো নেই। বসতে হবে।’

মরিয়ম তখনও দাঁড়িয়ে। তাকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে আরেকটা কৌতূহলী প্রশ্ন ছোড়ে।

‘কিছু হয় আপনার?’

থতমতো খায় ইঞ্জিনিয়ার।

কিন্তু একটি অনর্গল সুনিপুণ মিথ্যে এসে বাঁচায় তাকে সে যাত্রা। ইঞ্জিনিয়ার বলে, ‘রওশন আমার দূর সম্পর্কের বোন।’

‘দূর সম্পর্কের’, কথাটা প্রতিধ্বনিত হয় অবিশ্বাসের সুরে মরিয়মের কণ্ঠে।

তারপর একটু হেসে বলল, ‘তাহলে ওর ঘরে গিয়েই বসুন না।’

‘সেটা কি ঠিক হবে?’

‘তা বলে গাড়ি নিয়ে মেয়ে কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকাই কি ঠিক হচ্ছে?’

গাড়ি ঘোরাতে যায় ইঞ্জিনিয়ার।

বলে, ‘আমি তাহলে বরং চলি। বলবেন এসেছিলাম।’

কিন্তু তার আগেই একটা স্কুটার এসে থামে। রওশন নাবে সেটা থেকে।

‘আমি এসে গেছি।’

ইঞ্জিনিয়ারকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আবার বলে রওশন, ‘থামলেন কেন। স্টার্ট দিন। চলুন।’

মরিয়ম অবাক হয়, ‘এই এসে আবার বেরুবে নাকি?’

‘হ্যাঁ। আজ তো কলেজ ছুটি। কী করব ঘরে বসে বসে। তুমিও এসো না।

মরিয়ম হাতজোড়া করে, ‘মাপ করো। তাও যদি সকাল সকাল হতো। এই বিকেলে’-

‘কেন ভয় কিসের?’

যেন পরের কথাটা বলার সুযোগের অপেক্ষায় ছিল মরিয়ম বহুদিন। তাই বলল, ‘একটু একটু ভয় থাকাই ভালো। সব দিক ভাবতে হয়।’

‘কবে থেকে এত হুঁশিয়ার হলে।’

‘ঠেকে ঠেকে শিখেছি, হেসে জবাব দেয় মরিয়ম।

তারপর আবার বলে,’ ‘হয়তো একদিন তুমিও শিখবে। জানো এ নিয়ে কানাঘুষাও হয়েছে।’

রওশন ঠোঁট বাঁকায়, ‘কেউ যদি গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াতে চায়, আসুক না, ইঞ্জিনিয়ারের মতো। আপত্তি করব না।’

গাড়ি স্টার্ট নিয়েছে। কেমন করুণ হয় তাকিয়ে বলে মরিয়ম, ‘তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। নইলে ভাবনা করব।’

জিপে যেতে যেতে রওশন জিজ্ঞেস করে, ‘আপনারও ভাবনা হয় নাকি?’

‘কার জন্যে?’

‘কেন, আমার জন্যে?’

‘হয় বৈকি।’

কথার পিঠে কথা বলে রওশন, ‘কীরকম ভাবনা?’

এই তর্কপ্রিয় মেয়েটিকে নিয়ে যেন কোনোমতেই পেরে ওঠে না ইঞ্জিনিয়ার। রওশন যদি জানত, একটু জানত তাহলে জীবনের দু’একটা মূল্যবান কথা শোনাতে পারত। কিন্তু ও মেয়ের যে সময় নেই।

রওশন তখনও কথা বলে চলেছে, ‘আপনাকে নিয়ে যে বেড়াতে আসি অনেকেই তা পছন্দ করে না।’

রীতিমতো রাগই হয় ইঞ্জিনিয়ারের।

‘তবে আসেন কেন?’

‘আপনি দুঃখ পাবেন বলে।’

‘আমার দুঃখের জন্য যেন আপনার ঘুম হচ্ছে না।’

‘ঘুম আমার সত্যি হয় না। তবে আপনার দুঃখে নয় ঠিক।’

‘কার দুঃখে?’

একটা মজা নদীর ধারে গাড়িখানা থামিয়ে ইঞ্জিনিয়ার বলে চলুন, ‘ফেরা যাক।’

আবদার ধরে রওশন, ‘কেন বসুন না, নদীর ধারে।’

আরো কয়েকটি গাড়ি এসে থামে। বোধহয় বনভোজনের বাতিকগ্রস্ত দল। কেউ কেউ চোখ ফিরিয়ে দেখছে। যেটা অন্যদের কাচে অবাক লাগে সেটা তাদের আলাপের ধরন, কথাবার্তার, আলোচনার স্রোতে সংসারের হাজারো ঝামেলার ব্যর্থ করুণ সুরটি নেই। দরজা আঁটা গড়িতে নয়, হাওয়ায় আঁচল উড়িয়ে চুল এলোমেলো করে এসে নেবেছে খোলা গাড়ি থেকে তারা দু’জন।

ইঞ্জিনিয়ার তাকিয়ে দেখে। সত্যি অপূর্ব সেজেছে রওশন। চুল বেঁধেছে টান করে। ভুরু এঁকেছে ধনুকের মতো তীব্র করে। ঠোঁটের ওপর গোলাপি পলেস্তরা পড়েছে। জংলী পাড়ের শাড়ি আর দু’স্ট্যাপের স্যান্ডেল রওশনকে মনে হয় কলেজের প্রথম বর্ষের মোহাবিষ্ট ছাত্রীর মতো।

সত্যি সত্যি কি তাকে লোভ দেখাচ্ছে রওশন।

‘বড্ড লোভ হয়।’

রওশন যেন তার মনের কথাটি চুরি করে বলে ফেলেছে।

একটা হঠাৎ আনন্দের ঝলকানিতে খুশি হয়ে ওঠে ইঞ্জিনিয়ার, ‘কিসের লোভ?’

‘হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে বসে থাকার’, জবাব দেয় রওশন।

ইঞ্জিনিয়ার একটা সিগারেট ধরায়। এই নদীতেই তারা একটা ব্রিজ তৈরি করছে। দুটো খাম বসেছে, যার ওপর লোহার বিম আর চুন সুরকির কাজ হবে। প্রথম পিলার দুটো ঠিকই বসেছে। পরেরটি কোনোমতেই থাকছে না। এ নিয়ে দু’ দু’বার ধসে গেল।

তার নিজের সেতুটাও যেন একটি বিশ্বস্ত খুঁটির অভাবে টেকসই হচ্ছে না। বার বার বানের পানিতে ভেসে যাচ্ছে। রওশন তার এই অনিশ্চিত খুঁটির দৈন্য ঘোচাতে পারে না? পারে নিশ্চয়ই।

পায়ে পায়ে হেঁটে নদীর ধারে গিয়ে একটা শাপলা তুলে নিয়ে এলো রওশন। তার শাড়ির পাড় ভিজেছে! হাঁটুর কাপড় ভিজে চপ্ চপ্ করছে।

কাছে আসতেই বলে ইঞ্জিনিয়ার, ‘আপনাকে একটা কথা বলা দরকার।’

‘বলুন।’

‘শাহানশা আমাদের কথা জানে।’

‘তাই নাকি।’

কথাটা যেন এড়িয়ে যেতে চায় রওশন। তারপর বলে, ‘চলুন নৌকোয় ঘুরে আসি।’

ইঞ্জিনিয়ার আপত্তি জানায়, ‘না থাক। অন্যদিন।’

ক্ষিপ্রগতি গাড়িতে বসিয়ে ঘুরে বেড়ানো অন্য কথা। সত্যি সত্যি খানিকটা রাস্তার ধুলো ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায়। কিন্তু এই পড়ন্ত বিকেলের আলোয় নৌকো বিহারের দৃশ্যটি চেপে যাওয়া সম্ভব নয়। রওশন হাসছিল। বলল, ‘অন্যদিন। আপনার আর অন্যদিন আসবে না।’

ও বসেছিল শাড়িটা পেঁচিয়ে নিয়ে ধুলোভরা মাটিতে।

হাত বাড়িয়ে বলল, ‘তুলুন তো। উঠতে পারছি না। পা ধরে গেছে।’

উষ্ণতায় ধন্য একটি হাতের স্পর্শ সেই প্রথম পেল ইঞ্জিনিয়ার।

ঝাঁকুনিতে মুখের কাছাকাছি এসে পড়েছিল রওশন।

তারপর হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘অমন পরম সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেন না। হাত বাড়িয়ে দিলাম।’

চোখমুখ লাল হয়ে আসে ইঞ্জিনিয়ারের। যেতে যেতে নিজের মনেই বলে রওশন, ‘অবশ্যি অমন কিছু করলে ঠাস্ করে চড় বসিয়ে দিতাম।’

একটু আহতই হলো ইঞ্জিনিয়ার।

অন্ধকার হয়ে আসে। রাত যতই বাড়ছে চুনসুরকির পথ সরে যাচ্ছে। ইঞ্জিনিয়ারের মনে একটা উত্তাল তরঙ্গ ওঠানামা করে। রওশনের চুলের একটি বেণী ক্ষিপ্র হয়ে তার কপালে এসে লাগে। আরো কিছু চুল এলোমেলো হয়ে জড়িয়ে যায় ওর মুখে, চোখে, চিবুকে। গাড়ির গতি আরো তীব্র করে বলে ইঞ্জিনিয়ার, ‘সকলের জন্যই কি আপনার এ শাস্তির ব্যবস্থা?’

‘সকলের জন্যে কেন হতে যাবে। শাস্তি যে নেয় তার জন্যে, যে দেয় তার জন্যে নয়।’

ইঞ্জিনিয়ার সত্যি বোঝে না রওশনকে। দুর্বোধ্যই রয়ে গেল সে তার চোখে।

কিন্তু হৃদয়ের একটা অদৃশ্য টান সেটা আর দুর্বোধ্য নেই। একদিন নয়। ইচ্ছে করে রোজ এমনি করে তার কোয়ার্টারের সামনে জিপটা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। আর এই অসহ্য অপেক্ষার মুহূর্ত যখন নানা দ্বন্দ্ব, নানা সংঘাত নিয়ে আসবে, তখুনি ফুটে উঠবে রওশন জাহানের সুন্দর মুখ! পুলকিত স্বর কথা বলে উঠবে, ‘চলুন আমি তৈরি।’

তারপর কে জানে তখুনি গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে গিয়ে আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠবে শাহানশার চোখ!

একি শাহানশার জাতক্রোধ, বিদ্বেষ না ঈর্ষা।

তিন

বড় বড় দুটো বুলডোজার এসেছে ‘সাইটে’। কংক্রিটের মশলা তৈরি হচ্ছে দানবীয় যন্ত্রে। ট্রাক থেকে নাবছে ইটের স্তূপ। ব্লু-প্রিন্ট হাতে ইঞ্জিনিয়ার মাপজোক নিতে ব্যস্ত।

ব্রিজ বসবে নদীতে। তিন নম্বর পিলারের কাজ শুরু হবে। পাইপ বসানো হবে। দশ ফুট গাঁথনি হবে নদীর তলদেশে থেকে। খানিকটা জায়গা কাঠ দিয়ে ঘিরে পানি সরানো হচ্ছে লম্বা ‘হোজ পাইপ’ দিয়ে।

এই ব্রিজের কাছেই জিপ নিয়ে থেমেছিল সেদিন। সঙ্গে ছিল রওশন। পাশাপাশি বসেছিল এই মজা নদীর ধারে। বর্ষার যার কুল ছাপিয়ে ওঠে। আজকের বিপুল কর্মমুখরতা যেন সেদিনের স্বর্ণ মুহূর্তকে উপহাস করছে। খুবই শক্ত কাজ। তিন তিনবার পিলার ধসে যায়। হয়তো এবারও তাই হবে। এটা ইঞ্জিনিয়ারের শেষ চেষ্টা। জীবনে সবকিছুরই থাকা দরকার, একটা আদি আর অন্ত। তারও সময় এসেছে। শুধু কংক্রিটের এই সেতুই নয়। জীবন সেতুর গাঁথনিটাও পাকা হবে কিনা তার চূড়ান্ত পরীক্ষাও নিকটবর্তী।

খানিকক্ষণের জন্য দিশেহারা হয়ে পড়েছিল ইঞ্জিনিয়ার। কার গলা শুনে চোখ তুলে তাকায়।

শাহানশা।

পরনে খাকি শার্ট আর প্যান্ট। চোখে সূর্য-চশমা। কালো বিপুলাকার দেহ, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। আস্তিন গোটানো। হাতের যেটুকু দেখা যায় তা ঘন লোমে আবৃত। ডান হাতে একটা বিবর্ণ ঘড়ি। পায়ে একজোড়া বুট।

শাহানশাকে দেখেছে আরো অনেকবার। কিন্তু তার এ মূর্তি সচরাচর চোখে পড়ে না।

তার কি টাকার অভাব। বিয়ে-থা করেনি। সংসারে কেউ নেই। টাকার চেয়েও বেশি প্রতিপত্তি।

শহরে এমন কেউ নেই তাকে চেনে না। তাকে রেখে কথা বলে না। এমন কেউ নেই যে একবার তার কোপদৃষ্টিতে পড়ে বাঁচতে পেরেছে।

নানা ধরনের কাজ তার। লেবার সাপ্লাই, ছোট-বড় কন্ট্র্যাক্ট, কমিশন এজেন্সি, আরো কত কি। এই ব্রিজে তৈরির মজুরের ঠিকেও নিয়েছে শাহানশা।

কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই শাহানশা মৃদু হেসে বলে, ‘কাজকর্মের কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো? গোটাপঞ্চাশেক লেবারার লাগিয়েছি। বলেন তো আরো খাটাতে পারি।’

ইঞ্জিনিয়ার ব্লু-প্রিন্ট গুটিয়ে রেখে বলে, ‘এখানকার কন্ট্র্যাক্ট নিলেন কবে। কে দিলো?’

‘আপনার বস্।’

এরপর জিজ্ঞাসাবাদ নিরর্থক।

অদৃশ্য নিয়তি যেন দুষ্ট গ্রহের মতো এই মানুষটিকে তার জীবনের গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে বেঁধে রেখেছে। এ থেকে মুক্তি নেই।

অব্যাহতি নেই। শাহানশা পূর্ব কোনো ঘটনারই উল্লেখ করল না। যেন সেসব কোনো দুঃস্বপ্ন। যার কথা তার মনেই নেই।

‘কিছু বললেন না যে?’

ভুলে গিয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার, শাহানশা জবাবের অপেক্ষা করছে।

‘না, আর লোক দরকার নেই। এতেই হবে।’

‘বেশ।’

শাহানশা চলেই যাচ্ছিল।

ইঞ্জিনিয়ার ডাকল, ‘শুনুন।’

ফিরে দাঁড়ায় শাহানশা, ‘আমাকে ডাকছেন?’

‘হ্যাঁ।’

কথাটা কী করে বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। আর পরিবেশটাও হয়তো তার উপযুক্ত নয়।

শাহানশা সূর্য-চশমা খুলল। তার রক্তাক্ত চোখ দু’জোড়া ভেসে ওঠে।

‘আপনি কি সেদিন রাতের কথা জিজ্ঞেস করছেন?’

আঁৎকে ওঠে ইঞ্জিনিয়ারের বুক। তার মনের কথা জানল কী করে।

বেশ শক্ত হয়ে শাসনের ভঙ্গিতে বলে, ‘হ্যাঁ সেদিনের কথাই জিজ্ঞেস করছি। কী করছিলেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে?’

বাসের অপেক্ষা করছিলাম। শেষটায় আপনাকে দেখতে পেয়ে লিফ্ট নিলাম। পরের ঘটনা তো আপনার জানাই।’

‘ওখানে বাসস্ট্যান্ড আছে নাকি, তা তো জানতাম না,’ কেমন মৃদু সন্দেহের দৃষ্টি ছুড়ে বলে ইঞ্জিনিয়ার।

‘জানেন না বলেই তো বললাম। আর কিছু বলবেন?’

‘না।’

‘আমি তাহলে চলি।’

শাহানশা তার ভাঙা সাইকেলখানা মাটি থেকে তুলে নিয়ে বলল, ‘তাহলে আপনার সবই ঠিক আছে দেখছি। চলি আমি।’

কি মনে হওয়ায় ফিরে আসে শাহানশা।

‘আপনাকে কথাটা আগেই বলতে চেয়েছিলাম সুযোগ হয়নি।’

বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে ইঞ্জিনিয়ার তার ভাবলেশহীন মুখের দিকে।

‘কী কথা?’

‘কাজটা হাতে না নিলেই ভালো করতেন। এ নদীতে তিন নম্বর পিলার বসবে না।’

যেন তার পারদর্শিতার ওপর ভীষণ কটাক্ষ!

আবার ওই কথা। চটে গিয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘তবে সে কথা আগে বলেননি কেন?’

‘জিজ্ঞেস করেননি। তাই বলিনি।’

‘আমার কাজ আমি বুঝি। আপনার কাজ আপনি করুন।’

শাহানশা মৃদু হেসে বলল, ‘বেশ। আমি চলি।’

সাইকেলখানা নিয়ে ধীরে ধীরে দূরে অদৃশ্য হয় শাহানশা।

যেমন চেনা যায় না রওশনকে, তেমনি চেনা যায় না শাহানশাকেও। বাসে সাইকেলে ঘুরে বেড়ায় কেন শাহানশা। দু’দুটো স্কুল, একটা আরফ্যানেজ চালায়। তবু রোদে বৃষ্টিতে ঘেমে ভিজে সকাল সন্ধে কাজ করে ভূতের মতো।

আবার তেমনি, লোকের মুখে শুনেছে, কি দুর্ধর্ষ শাহানশা। এমন কোনো হীন কাজ নেই সে পারে না। দরকার হলে গু-া লেলিয়ে দেওয়া তার অসাধ্য নয়। করেছেও অনেকবার, লোকমুখে শোনা যায়। মানুষের পরস্পরবিরোধী এমন চরিত্রের সমন্বয় হলেই বুঝি তার নাম হয় শাহানশা। এক এবং অদ্বিতীয় শাহানশা।

চার

গাঁথনিটা দু’ফুট করে এনেছিল পানির ওপর। পরদিন সকাল বেলা ধসে গেল ওটা আবার। ইঞ্জিনিয়ার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে। তার বিদ্যাবুদ্ধির আয়ত্তে যা ছিল করেছে। কিন্তু পিলার বসছে না। খেয়াপারের মাঝিরা কিংবদন্তি শোনায়। ইঞ্জিনিয়ার তন্ময় হয়ে শোনে।

তারা জানায় : বছরদশেক আগেও একবার জরিপ করতে এসেছিল লোকজন। নদীর ওপারে বুনো হাঁস পাওয়া যেত সেগুলো চালান হবে এ পারে। তাছাড়া বর্ষায় চলাচলেরও সুবিধে। সেইজন্যই দরকার ছিল ব্রিজের। বড় বড় থাম পুঁতেছিল। তার কোনোটাই টেকনি। জুনাইদ পীরের অভিশাপ! বছর পঞ্চাশেক আগে দক্ষিণ পারে ছিল তাঁর মাজার। হাজার হাজার ভক্ত আসত সেখানে। একবার গ্রামে ডাকাত পড়ে। সব লুটে নিয়ে যায় তারা। যাবার সময় আগুন ধরিয়ে দেয় মাজারে। সেই থেকে অভিশপ্ত এ নদী। কালক্রমে পার ক্ষয়ে যায়। মাজারের যেটুকু অবশিষ্ট ছিল সেটুকও গ্রাস করে সর্বনাশা নদী। মাঝিমাল্লারা জানে সে কথা। এখনও দাঁড় তুলে নেয়। আস্তে আস্তে চলে।

কিংবদন্তির হোক আর নাই হোক, এই তিন তিনবার ব্যর্থ হলো পিলার বসানোর কাজ। সদর অফিসে রিপোর্ট পাঠাতে হবে, এ কাজ তার অসাধ্য। সে হার মেনেছে।

অথচ ব্লু-প্রিন্ট দেখে সেই একদিন উঁচু গলায় বলেছিল, কেন পিলার বসবে না?

ম্যাকব্রাইড কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স ফার্মের বড়কর্তা বলেছিল, এর আগেও অনেকে চেষ্টা করেছে, পারেনি।

দর্পিত হাসির ঢেউ তুলে জবাব দিয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার, বোধহয় ডিজাইনে খুঁত ছিল।

বড়কর্তার ইতস্তত ভাব কাটে না তবু।

‘ভেবে দেখো। যদি পার, হাতে নাও। নইলে আমরা রিগ্রেট করি।’ ইঞ্জিনিয়ার জানায়, ‘আলবৎ পারব। কবে কাজ শুরু করতে হবে?’ সাফল্যের হাসি হেসে বলেছিল, ‘ওরা পারেনি বলে আমিও পারব না ভাবছেন কেন।’

কিন্তু আজ যে তার বড়াইটা মার খেয়ে গেল। তার এই পরাস্ত দম্ভের চেহারা দেখাবে কেমন করে। তারচেয়ে নীরবে সরে পড়াই ভালো।

ইট-কাঠ-পাথরের কাজ যখন শিখেছে, তখন ভাত জুটবেই।

চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে চিঠি সে রাতেই লিখল হেডকোয়ার্টারে। ম্যাকব্রাইডে ইস্তফা দিয়ে ঠিক করেছিল ইঞ্জিনিয়ার এদেশের মায়াও ঘুচিয়ে যাবে। তার পরাস্ত প্রতিভার জন্য জবাবদিহি করতে হবে না কারও কাছে। পৃথিবীর সবাই সব কাজের জন্যে নয়। একটা মজা নদীর ওপর ব্রিজ বসাতে পারেনি, দুঃখ সেটা নয়। দুঃখ, এ আঘাত আরো বিপুল ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে এলো না কেন। যদি সে আকাশচুম্বী সৌধমালা তৈরির কাজ নিত, যদি সে অতল গভীর থেকে হীরে তোলার দায়িত্ব নিত অথবা যদি পাহাড় কেটে রাস্তা বানাবার চুক্তি নিত, তবে সেক্ষেত্রে তার ব্যর্থতাও যেন একটা সান্ত¡নার ভাষা পেত।

হয়তো কেউ কিছু বলবে না। শাহানশাও না। কিন্তু তার চোখজোড়াকে বড় ভয়। যে ধূর্ত চোখের ভাষাই রাষ্ট্র করে বেড়াবে একটি ইঞ্জিনিয়ারের অতি বাহাদুরির অপমৃত্যুর কথা।

আর রওশন?

তাকে কি আবার শখের জিপে করে বেড়াতে নিয়ে যাবে নদীর ধারে। দেখাবে, তার ব্যর্থতার ধ্বংসাবশেষ। রওশন অন্ধ নয়। দেখবে। রওশন মূঢ় নয়। বুঝবে।

মনে মনে করুণাই করে বসবে। তার পারদর্শিতার বড়াই, সামান্য একটা স্তম্ভেরও জন্ম দিতে পারে না, সে কথাই ভাববে বেশি করে। মনের দিক থেকে প্রগাঢ় ক্ষুধা অনুভব করেছে এতদিন। যে ক্ষুধার জন্য দায়ী রওশন। সাহস দুঃসাহসের প্রশ্ন নয়। একটি দুর্লভ হাতকে মুঠো করে ধরবে, তার এই আগ্রহের কথা এতদিনেও বলতে পারেনি। কিন্তু আগ্রহ আর সঙ্কল্প এক জিনিস নয়। দুর্জয় সঙ্কল্প ছিল একদিন ওই ব্রিজ শেষ হলে, তার বাঞ্ছিত সহযাত্রিনীকে সেখানে দাঁড় করিয়ে বর্ষার দু’কূল ছাওয়া ভয়ঙ্করী নদীর বুকে দাঁড়িয়ে শুধাবে, এ নদীকে যে বশে এনেছে, তেমন সার্থক পুরুষকে তার কি পছন্দ! তখন অন্তহীন লজ্জায় তার কাঁধে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাসে সম্মতির জবাবটা দিতে হয়তো কুণ্ঠা করত না রওশন।

আর ঝুঁকি নিয়ে কাজ নেই। এই ইট-কাঠ-চুন-সুরকির ব্যর্থতার আঘাতই যথেষ্ট। কিন্তু সেই ব্যর্থতায় করুণ হয়ে কারও কাছে হাত পাতা যায় না।

মন ঠিক করে ফেলেছে। তার অহমিকার সবটুকু শেষ করে দিতে পারে না। ইট-কাঠ-পাথরের কাছে হেরে গেলেও রক্ত-মাংসের একটি দেহের কাছে এখনও সে দুর্জয় থাকুক, অটল থাকুক।

সে কথাই আজ জানিয়ে আসবে রওশনকে।

কিন্তু রওশনকে পাওয়া গেল না তার কোয়ার্টারে। সাধারণত সন্ধে করে বেরোয় না! যখন বেরোয়, তখন সেই থাকে সহচর। মরিয়ম আজও সকৌতুক দৃষ্টি নিয়ে দেখছিল ইঞ্জিনিয়ারকে।

বলল, ‘আপনাকে বলে যায়নি বুঝি? আমাকেও বলেনি। তবে শুনেছি এই কলেজে কাজ করবে না আর।’

ইঞ্জিনিয়ার আকাশ থেকে পড়ে, ‘কেন?’

‘ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছে।’

তেমনি রুদ্ধশ্বাস স্বরে জিজ্ঞেস করে ইঞ্জিনিয়ার, ‘কী নিয়ে?’

মরিয়ম ব্যাপারটা যেন এড়িয়ে যেতে চায়।

বলে, ‘কী জানি।’

অথবা মরিয়ম সবই জানে। তাকে কেন্দ্র করে রওশনের বিরুদ্ধে যে কানাঘুষা চলছিল এ তারই পরিণতি, বোধহয় প্রকারান্তরে সে কথাই বলতে চেয়েছে মরিয়ম। তার সব পুঞ্জীভূত ক্ষোভ সত্ত্বেও মরিয়ম তার একমাত্র সহানুভূতির আশ্রয়। গলাটা নাবিয়ে বলে, ‘কে ছিল এর পেছনে। কাউকে সন্দেহ হয়?’

মরিয়ম খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। তার পর বলে, ‘হয়তো শাহানশা জানে।’

শাহানশা, শাহানশা।

ওই লোকটা কি ছায়ার মতো ঘিরে থাকবে তাকে দুষ্ট গ্রহের মতো!

রওশন কী ক্ষতি করেছিল তার।

মরিয়মই একসময় বলে, ‘সন্ধে হয়ে আসছে। আপনার সঙ্গে এভাবে দাঁড়িয়ে কথা বললে কে কি ভাববে, কে জানে।’

সত্যি তো যে মেয়ের সঙ্গে ভালো করে আলাপ পরিচয় নেই, যে রওশনের যাওয়া আসার বেশি কোনো খবরই দিতে পারেনি, তার সঙ্গে হৃদ্যতার এই পরম দৃশ্যটি অনেকের কাছেই বেসুরো মনে হবে। এমনকি ইঞ্জিনিয়ারের নিজের কাছেও।

সেখান থেকে গাড়ি ছুটিয়ে সোজা ধাওয়া করেছিল শাহানশার বাড়ি। এত অভিজাত এলাকা থাকতে বেছে বেছে শহরের এক ঘিঞ্জি গলিতে বাড়ি নিয়েছে শাহানশা। নিছক দায়ে না পড়লে অতর্কিত দর্শনের গৌরব তাকে দিত না ইঞ্জিনিয়ার।

সারাপথ একটা কথাই মনে হয়েছে, শাহানশার কাছে কী কাজ থাকতে পারে রওশনের। যার চাল-চুলো  নেই, যার অতীত অজ্ঞাত, যার বর্তমান তর্কসাপেক্ষে, সেই সমাজের উদ্ভট জীবটি কী কাজে আসতে পারে তার জীবনে।

ততক্ষণে এসে পৌঁছেছে ওই গলিতে।

গাড়ি থেকে নাবতে হলো। আর ভেতর যাবে না। দুই দেয়ালের মাঝখানে প্রায় অন্ধকার। সারা পথ বেয়ে তবে যেতে হয় ভেতরে। দরজায় কড়া নেই। কলিং বেল নেই। একটা দড়ি ঝুলছে। ওটা ধরে টানতেই কোথায় একটা কাসার ঘণ্টা বেজে ওঠে। কোনো সাড়া নেই।

আরেকবার দড়ি ধরে ঝাঁকুনি দেবে কিনা ভাবছে এমন সময় ভেতর থেকে দরজা খোলার শব্দ আসে।

মাফলারে গলা আর মুখের অর্ধেকটা ঢেকে টর্চ হাতে বেরিয়ে আসে স্বয়ং শাহানশা।

হঠাৎ তাকে এভাবে আসতে দেখে সামান্য উত্তেজিত হয়েছে তেমন কোনো লক্ষণ নেই।

মামুলিভাবে বলে, ‘ভেতরে আসুন।’

ইঞ্জিনিয়ার গলা ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ‘আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসিনি।’

তবু নিরুত্তাপ শাহানশা।

‘জানি। যার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। তিনি ভেতরেই আছেন।’

ঢুকেই ড্রয়িংরুম। সেখানে পুরোন কয়েকটি বেতের চেয়ার-টেবিল ছড়ানো। ধুলোমাখা কয়েকটি পত্র-পত্রিকা। নিস্তেজ আলো জ্বলছে।

ড্রয়িংরুম থেকেই দেখা যায় পাশের কামরায় নীল পর্দা আলোয় গাঢ় হয়ে। নিশ্চয়ই সেখানে বসে রওশন। এত রাতে এবং একা কী করে এমন একটা লোকের সঙ্গে কথা বলতে রুচি হয়। এই রওশনকে নিয়েই এত আকাশ কুসুম ভেবেছিল।

ভেতরের কামরা বাইরের তুলনায় বেশ ঝকঝকে তকতকে। রেক্সিনে মোড়া দুটো চেয়ার এক পাশে। তারই একটায় বসে রওশন। সামনে গোল টেবিলে কিছু খাবার রাখা। অন্য পাশে আরাম কেদারা। বোধহয় সেখানেই হাত-পা গুটিয়ে বসে আলাপ করছিল শাহানশা। শাহানশা একটা চেয়ার দেখিয়ে দিয়ে আরাম কেদারায় গিয়ে বসল। ইঞ্জিনিয়ারকে দেখে কেমন মিটি মিটি হাসল রওশন। অসহ্য সে হাসির জ্বালা।

ফেটে পড়ে ইঞ্জিনিয়ার, ‘এমন করে এত রাতে এখানে বসে আলাপ করতে লজ্জা করে না তোমার?’

শাহানশা যে সেখানে বসে, সে ভ্রƒক্ষেপ নেই। যেন প্রয়োজনও নেই।

‘কী বলছ এসব?’ ঝাঁঝিয়ে ওঠে রওশন।

শাহানশা নির্বিকার।

একসময় উঠে দাঁড়ায়। বলে, ‘আপনারা বসুন।’

অবাক হয় ইঞ্জিনিয়ার, ‘চললেন নাকি?’

‘হ্যাঁ।’

‘কিন্তু আমি এলাম আর আপনি –

‘আপনি না এলেও যেতাম। আপনি এসেছেন বলেও বসে থাকতে পারব না। মাপ করুন।’

এরপর আর কিছু জিজ্ঞেস করা নিরর্থক।

রওশন একটা আলোয়ান এনে দিলো।

‘ঠান্ডা লাগিয়ে অসুখ বাধাবার মতলব নাকি? নিন এটা গায়ে চাপিয়ে।’

তবু কোনো কথা সরে না শাহানশার মুখে। একটা ছোট ধন্যবাদও নয়। এমন অনুভূতিহীন একটা কাঠ-পাথর আর দেখেনি ইঞ্জিনিয়ার।

সামান্য আগ্রহ নেই, এক বিন্দু কৃতজ্ঞতা নেই। মুখে হাসিটুকু নেই পর্যন্ত। শাহানশা চলে গেলে চেয়ারটা এগিয়ে নিয়ে বসল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আপনি এখানে আসবেন ভাবতে পারিনি।’

রওশন হেসে নিয়ে বলে, ‘আসব খবরটা তো ঠিক ঠিকই পেয়েছেন দেখছি।’

কাজের কথায় আসে ইঞ্জিনিয়ার।

‘চাকরি ছাড়লেন কেন?’

‘নিশ্চয়ই কোনো কারণ ছিল।’

‘বেশ, না বলতে চান পীড়াপীড়ি করব না। কিন্তু শাহানশা – রওশন গম্ভীর হয়ে যায়। এই চকিত চপল মেয়েটির মুখে হঠাৎ হাসির রেখা মুছে গেলে যেন।

কেমন বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। ‘কী জানতে চান শাহানশা সম্বন্ধে?’

ইঞ্জিনিয়ার ফোঁড়ন কাটে, ‘বলতে না চাইলে কিছু জানতে চাইব না। সে আপনার ইচ্ছে। শুনেছি নতুন চাকরি জুটেছে আপনার, শাহানশার কল্যাণে।’

‘সেটাও ঠিকই শুনেছেন।’

ইঞ্জিনিয়ারের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। যেন আর কোনোমতেই নিজেকে সামলে রাখতে পারে না। বলে, ‘তাহলে যা ভেবেছি মনে মনে, সেটাও সত্যি।’

‘কী ভেবেছেন?

‘আপনি আর শাহানশা –

রওশন নয়, তার ভেতর থেকে একটি আহত সিংহ গর্জন করে ওঠে।

বলে, ‘থামুন। কি বলেছেন আপনার মাথা ঠিক নেই। শাহানশার পায়ের ধুলোর সমান আপনারা কেউ নন।

কী বলবে ভেবে পায় না ইঞ্জিনিয়ার। শুধু ভাবে কি জাদু জানে এই কদাকার, উদ্ভট লোকটি, রওশনের মতো মেয়ের মনেও যে তাক ধরিয়ে দিতে পারে। নিশ্চয়ই সে নমস্য।

এরপর আর কিছু শোনবার দরকার নেই। জানবার দরকার নেই। মনে করার         এ-সবই ছিল এক দুঃস্বপ্ন। মনে করবে, কোনো দিন চিনত না রওশনকে। কোনোদিন তার জন্য আকুলি-বিকুলি করেনি। তাই সম্ভব। সময়ে সবই সম্ভব। ভাগ্যের নির্মম চক্রান্তে নিজেরই শিকার হয়েছে ইঞ্জিনিয়ার।

একটি ব্রিজের একটি পিলার নয়, জীবনের মহা বিশ্বাসের স্তম্ভই তার গুঁড়িয়ে গেছে। এ নিয়ে হা-হুতাশ করা নিরর্থক। তার চোখ ছলছল করে আসছে। কি করে সবাই এমন নিষ্ঠুর হয়। নদী ও নারী। উঠে দাঁড়ায় ইঞ্জিনিয়ার।

রওশন তাকে নিরস্ত করতে চেষ্টা করে। বলে, ‘আমার কথা শেষ হয়নি।’

কী কথা বলবে রওশন। নতুন ভাষার পোশাকে সাজিয়ে হঠকারিতার স্বরূপটাকে রসনীয় করে তুলবে এই তো – কোনো  প্রয়োজন নেই। শাহানশা কেন ওর জন্যে সর্বস্ব, কেন অব্যর্থ, সে কাহিনী রওশনের মুখে নাই শুনল।

ইঞ্জিনিয়ার জিপে গিয়ে বসে। চাবি ঘোরাতেই গর্জন করে ওঠে গাড়ি। সেদিনের হুঙ্কারটা যেন অন্যদিনের চেয়ে বেশি। তার হেডলাইটের আলো অন্যদিনের চেয়ে বেশি প্রখর।

একটি প্রাণহীন যন্ত্রণায় যেন প্রভুভক্ত একটি জীব অপমানের জ্বালা ধরিয়ে, ধোঁওয়া ছড়িয়ে শেষ প্রতিবাদের নির্মম রূঢ় ভাষা পৌঁছে দিতে চায় রওশনের কানে।

রওশন বেরিয়ে আসে অবচেতনের মতো দরজা খুলে।

কিন্তু তখন ইঞ্জিনিয়ারের গাড়ি চোখে পড়ছে না।

বহু বহু দূরে রাস্তার বাঁকে তার লাল বাতির দুটি ক্ষীণ বিন্দু বিদায়ের করুণ ক্ষণটির মতো জ্বলেই অদৃশ্য হয়ে গেল।

পাঁচ

এসবই পরে শুনেছিলাম শাহানশার মুখে।

শাহানশার সাথে আমার পরিচয় সেও এক কাহিনী। কিন্তু সে কথা এখন থাক।

শাহানশাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর আর ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে দেখা হয়নি?’

‘না।’

শাহানশাই আমাকে বলেছিল পরের ঘটনা।

জীবনে সকলের ভালোবাসার রীতি এক নয়। চিরাচরিত পন্থায় তা হয়ও না। আর ভালোবাসার এই হার জিতের আনন্দ ও দুঃখ এক একজনের বেলায় এক এক রকম।

মহিলা কলেজে সাইন্স ল্যাবরেটরির কাজ তদারক করতে এসেছিল ইঞ্জিনিয়ার। রওশনের সাথে পরিচয়ও সে সূত্রেই। প্রথমে মামুলি ভালো-মন্দ প্রসঙ্গ। তারপর আলাপের নিবিড়তায় দু’জনই দু’জনের কাছে হয়ে পড়েছিল অন্তরঙ্গ। এ পৃথিবীর বাইরে, তাহাদের চেনা জগতের বাইরেও যে আরেক জগৎ, তারই সন্ধান দিয়েছিল রওশনকে ইঞ্জিনিয়ার। বোধহয় ভালোবাসার সেই প্রথম অঙ্কুর। কিন্তু অঙ্কুর অঙ্কুরই থেকে গেল।

তার এই মেলামেশা অনেকের চোখেই ভালো লাগেনি। ইঞ্জিনিয়ারের জিপ যেন লোভের একটা বিশাল ফাঁদ। আর ওই ফাঁদেই শখ করে রোজ পা দিয়েছে রওশন। নিন্দুকের দল হাজারো কথা ছড়িয়েছে। কলেজে ছড়া কেটেছে তার নামে। দেয়ালের গায়ে চক্ দিয়ে বড় বড় করে লিখেছে তাদের কল্পিত অভিসারের কথা।

তবুও সহ্য করতে পারত। পারল না যেদিন থার্ড ইয়ারের মেয়ে গীতালী হকের এক বিশ্রী কটাক্ষের শিকার হলো। গীতালী হোস্টেলে থাকে। ইদানীং তার আচরণে কিছু উচ্ছৃঙ্খলতা লক্ষ করেছে রওশন। কলেজ হোস্টেলের বাঁ ধারের পুকুরে গাছের তলায় গীতালীকে আলিঙ্গনাবদ্ধ দেখতে পেয়েছে একটি ছেলের সঙ্গে।

ভুল সেখানেই করেছিল রওশন।

ডেকে এনে বলেছিল, ‘ওকে ভালোবাস?’

গীতালী বড় বড় চোখ করে বলে, ‘কাকে?’

‘যাকে দেখলাম।’

‘আপনি কাউকে দেখেননি। ওটা আপনার কল্পনা।’

খাতায় ভুল ধরিয়ে দিয়ে নম্বর কমানোর অধিকারের মতোই মনে করেছিল সদুপদেশ দেবারও তার অধিকার আছে।

রওশন ভেবেছিল এ অধিকার তার øেহের, প্রীতির। কাউকে চাবুক মারার নয়। গীতালী যদি ভালোবেসে থাকে, বাসুক। ঘর বাঁধুক। না হয় নেই মধুর চিন্তায় খারাপই হোক একটি পেপার, পাশ করিয়ে দেবে। কিন্তু সে ভালোবাসা হোক। ভালোলাগা নয়। প্রাণের গভীর থেকে হৃদয়ের আহ্বান আসুক। সামান্য উত্তেজনার, অসহ্য দুর্বলতার ক্ষুধা মেটাবার তাগিদ নিয়ে নয়।

কিন্তু সেই মেয়ে গীতলী হক, তার চোখে আরেক মেয়েমানুষকে দেখেছে। সহৃদয়-চিত্তকে নয়। তার কল্যাণাকাক্সক্ষীকে নয়। ব্যর্থ প্রেমের নিদারুণ যন্ত্রণায় পিষ্ট রওশন। ঘর তৈরি করতে যে জানে না, সে ঘর ভাঙার নিষ্ঠুর আনন্দে মেতে থাকতে পারে, সেরকম সন্দেহই করেছিল গীতালী।

কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছিল, ‘আপা আপনি আমাকে হিংসে করেন।’

যেন নিজের কানকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারেনি রওশন, ‘আমি হিংসে করি, তাও যাকে কোনোদিন দেখিনি?’

রওশন বলতে চেয়েছিল, ও যদি ভালোই বাসে, লুকিয়ে থাকে কেন। ওকি দিনের আলোয় মিষ্টি হেসে সলজ্জ প্রেম জানাতে পারে না। নিজের জীবনের কোনো এক বিস্মৃত বিপর্যয়ের কথা মনে করেই কি বলতে গিয়েছিল রওশন, ‘এমনটি আমি কোনোদিনই হতে দেবো না।’

গীতালী রুখে দাঁড়ায়, ‘আপনার মতো মানুষের মুখে ওসব সদুপদেশ মানায় না।’

নিষ্ঠুরতা সে পৃথিবীর কাছ থেকে আশা করেছিল রওশন, যে পৃথিবীর অনেকেই তাকে চেনে না। আশা করেনি তার জনৈকা ছাত্রীর কছে। দারুণ কটাক্ষ করেছে গীতালী তার চরিত্রে। কী করে বলবে রওশন, ধুলোয় ধুলোয় মলিন হয়েও মেকি সোনাটি হয়ে যায়নি সে। বাইরের কারও চোখে না হোক, অন্তত তার চোখে। এ সত্যটা ধরা পড়বে, এ আশা এমন কিছু অপ্রত্যাশিত ছিল না।

চোখ ছলছল করে আসে।

কেমন করে বলবে গীতালী হককে, তার জীবনের বিচিত্র ইতিহাস। আর বললেই কি বিশ্বাস করবে সে কথা শান্ত সুবোধ বালিকার মতো। ভালোবাসার বড় বড় কথা শুনিয়েছে গীতালী। অথচ এই ভালোবাসার আগুন কি বিপুল, কি নির্মম হতে পারে তার সে কি জানে। জানে না, কারণ সে রওশন নয়।

জীবনের এক পিঠই দেখেছে। সেখানে সবকিছু ঝকঝকে তকতকে। মায়া মমতা øেহ যেখানে বর্ষার প্লাবনের মতো দু’কূল ছাপিয়ে আসে আর মনের অজান্তে সেখানে একটি সুপ্ত কোরক বাঞ্ছিত জনের জন্য পুষ্পিত হয়ে ওঠে। আশা-আকাক্সক্ষার বীজ অঙ্কুরোদ্গমের আগেই লয় পায় না।

বড় বড় কথা বলতে পারে রওশনও। ভাগ্যাকাশ থেকে নক্ষত্রচ্যুত হয়ে পড়ার বেদনা ও বঞ্চনায় তার জীবনের ইতিহাস যদি কলুষিত না হতো। ছিটিয়ে পড়া কুয়াশার ফাঁকে ফাঁকে হাল্কা রোদের মতো টুকরো টুকরো স্মৃতি আজও পীড়া দেয় রওশনকে। কিন্তু গীতলীকে দোষ দিয়েই কি লাভ।

এসব অপবাদ আদালতে মিথ্যে প্রমাণ করে মামলা জেতার মতো নয়। এ ধ্যান ধারণা, বিশ্বাসের কথা। মানুষ হিসেবে যদি সে তার মহত্ত্ব কোনোদিন প্রমাণ করেও থাকে, আজ হিংসা ও দ্বেষের আগুন নেবানোর ক্ষমতা তার নেই।

গীতালীর ওপর রাগ করা বৃথা। গীতালী উপলক্ষ। ইঞ্জিনিয়ারের সাথে আলাপের দুটো স্বর্গীয় মুহূর্তের নানা ব্যাখ্যা হয়েছে। নানা অর্থ হয়েছে। মেয়ে কলেজের দায়িত্ব সম্পর্কে নৈতিক যোগ্যতার প্রশ্ন একবার যখন উঠেছে তখন যুদ্ধে নিজের সততা প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টায় আহত হওয়ার মানেই হয় না।

সেজন্যেই দ্বারস্থ হতে হয়েছিল শাহানশার। হ্যাঁ শাহানশা। কারণ তার এই কক্ষচ্যুত জীবনে আবার শাহানশার মতো একটি দ্বন্দ্বময় পুরুষের আশ্রয় দরকার। যে নিজের ওপর কলঙ্কের ধুলো পড়তে দিয়েও তা ধুয়ে মুছে তকতকে করতে চায়নি। যে ধুলো আর কাদার মধ্যেই পঙ্কজ ফোটাবার ক্ষমতা রাখে। পাঁচ বছর বয়সে যার মা প্রেমে অন্য আরেকজনের সঙ্গে ঘর করতে বেরিয়ে যায়, তার মুখে যেন এসব মানায় না।

বিয়ে করে মান্নান যখন বৌ এনেছিল, সবাই দেখে বলেছিল এ তার কপালের জোর। অমন সুন্দর মেয়ে তারা দেখেনি। মেঘের মতো কালো চুলের বোঝা যখন তার নিখুঁত চা-রং মুখটাকে ফ্রেমের মতো ঘিরে রাখত কেউ নাকি পারত না চোখ ফিরিয়ে নিতে। চোখের পলক ফেলতে।

সেই কুলসুম বানুর কোল আলো করে এসেছিল একখ- হীরের মতো রওশন। এই ত্রয়ীকে নিয়ে হয়তো কোনো নতুন ইতিহাস রচিত হতো। কিন্তু ভাগ্যের অমোঘ নির্দেশে সবকিছু যায় পাল্টে। স্কুলে ফোর্থ টিচার মান্নানের ডাক এসেছিল অসময়ে। কুলসুম বানু তার ছলছল চোখ নিয়ে কোলের মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে বৈধব্যের যাতনায় কি কাঁদাই কেঁদেছিল। কিন্তু সে কান্না নভেম্বরের শিশিরের মতো কখন শুকিয়ে গেল, একটি নতুন রৌদ্রদীপ্ত দিনের আলোয়।

সেই কুলসুম বানুই প্রেমে পড়ে আরেকজনের ঘর বাঁধতে যায়। বোধহয় প্রথম বাসর রাতের শুভলগ্নে যা পায়নি, তাই পাবার জন্যে আরেকবার হাত বাড়ানো। মান্নান তাকে প্রেমের স্বাদ দিয়েছিল! স্বাদ দেয়নি মেটাবার।

ব্যাপারটা যে কেমন করে হলো তা বোধকরি কুলসুম বানুও জানে না। বোধহয় ভেবেছিল বাকি দশজনার ভাগ্যে যা হয়, তারও তাই হবে। থান কাপড়ের মতোই বাকি জীবনটা হবে নির্মম শুচিতার এক করুণ শাস্তি।

কুয়েতে কোনো এক তেল কোম্পানির ফোরম্যান জব্বার। সেই কবে ছেলেমানুষী শখের বসে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল মনে নেই। সাত ঘাটের পানি খেয়ে কুয়েতেই জুটল তার চাকরি। বারো বছর দেশে ফেরেনি। দেশে ফেরার কথা তার মনেও হয়নি।

ভালো চাকরি, মাইনে, বাড়িঘর কিছুরই অভাব নেই। অভাব শুধু একটি সঙ্গিনীর। তার নিঃসঙ্গ জীবনে যে একটু রং-এর ছোঁয়া দিতে পারে। জীবনে বাঁচার নতুন অর্থ দিতে পারে।

প্রথম দর্শনেই সে বুঝেছিল, এমনি একটি মেয়ের কথাই সে ভেবেছে। যার মুখের দিকে তাকিয়ে শান্তি। লোহিত সাগরের তৃষ্ণা। যার সলজ্জ আড়ষ্ট ভঙ্গি যেন দুর্জয় আকাক্সক্ষা চরিতার্থের একটি বিনীত আমন্ত্রণ।

ভালো হয়তো লেগেছিল কুলসুম বানুরও। এই জীবনে প্রথম সেই ভালোবাসার অর্ঘ নিয়ে এসেছে তার কাছে। ব্যাকুলতা জানিয়েছে। তৃষ্ণার সরোবর মিলেছে এতদিনে। জীবনে কারও কাছে তার কোনো দায় নেই। সে স্বামীর অবাধ্য হয়নি, মুখ তুলে কথা বলেনি। কিন্তু ভাগ্যের এই নিষ্ঠুর খেলায় তার তো কোনো হাত ছিল না। আজ হাত পেতে কেউ নিতে আসে যদি, বঞ্চনার কশাঘাতে তাকে অপমান করা কেন।

শুধু একটি অন্তরায়। তার কোলের মেয়ে রওশন। তার পুরোন বাগানের চারা গাছে সদ্য-কাটা একটি গোলাপ। কিন্তু সে গোলাপের লোভে তার মানস সরোবরে পুষ্পিত পদ্মের বাসনাই বা ত্যাগ করবে কেমন করে।

দূর সম্পর্কের এক ফুপুর কাছে কোলের মেয়েকে ফেলে রেখে যেতে কেমন কেমন লেগেছিল, সে কথা সাক্ষ্য দেবার কেউ নেই। হয়তো ছলছল করে উঠেছিল তার চোখ। কিন্তু শুধু সেই দুর্বলতার অজুহাতে আগামী প্রসন্ন দিনের হাতিছানি ত্যাগ করতে পারেনি। পারেনি এজন্যে যে, সেও রক্তমাংসে গড়া অনেক নির্বুদ্ধিতার, অনেক উচ্ছ্বাসের হাজারো মেয়েমানুষেরই একজন। কুয়েতে তার বাঞ্ছিত জনের সঙ্গে প্রথম সুখের যে ঘর বেঁধেছিল, কুলসুম বানু তার কথা অনেক বার ফেনিয়ে ফেনিয়ে লিখেছে চিঠিতে। তারা ছুটিতে গিয়েছিল তেহরান, বাগদাদ, ইস্পাহান, বৈরুত। পৃথিবী যে এত বড়, এত বিচিত্র, এত রূপ-রসময় সে উপলব্ধি এই যেন তার জীবনে প্রথম।

সৌখিন টুরিস্টের মতো তারাও স্যান্ডউইচ আর কফি খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছে দিনের পর দিন। থেকেছে রকমারি হোটেলে। অনেকদিন তাঁবুর নিচেই কেটেছে রাত। এক একটা রাতে কখনও কখনও শিরশির করে উঠেছে সারা দেহ মন। স্বামীর বাহুলগ্ন হয়েও মনে হয়েছে নিজেকে একটা বাতাসভর্তি ফানুসের মতো। যে ফানুস রঙ্গের মোহ ছড়িয়ে নিজের নিঃসঙ্গতায় নিজেরই মৃত্যু ডেকে এনে। কৈশোরের স্বপ্নভরা চোকে আকুল হয়ে দেখেছে রওশন মায়ের পাঠানো ছবি। কখনও কোনো সাগর সৈকতে, কখনও প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের পাশে, কখনও উন্মুক্ত প্রান্তরে কোনো এক পুরুষের বাহুলগ্ন হয়ে। আরো জেনেছে, তার মার কণ্ঠলগ্ন এই অনন্য অদ্বিতীয় পুরুষটি তার কেউ নয়। কোনদিন কোনো কিছু বলে সম্বোধন করবার সামাজিক ছাড়া নৈতিক কোনো দায়িত্বই নেই।

বেণী দুলিয়ে গুনগুন গান ধরেছে চাঁদের আলোয় বসে। হাত বুলিয়ে দিয়েছে ফুপুমণি। কিন্তু তার মনের অতলান্তে গভীরে একটা বেদনা হাহাকার করে ওঠে।

আর বিচিত্র সব প্রশ্নের উদ্ভব হয়,  মা যদি তার কোনো পরমা সুন্দরী না হয়ে, এমনি মামুলি ঘরনি হতো তাহলে তার ইতিহাসটাই বুঝি হতো আলাদা। কিন্তু এসব নিষ্ফল আক্রোশের মতোই। মনের গোপনেই অভিমানের কুয়াশা জন্মায়। মনের গভীরেই তার সমাপ্তি।

কিন্তু স্বপ্ন স্বপ্নই।

একদিন ফিরে এলো কুলসুম বানু। কাউকে সঙ্গে নিয়ে নয়। একা। কুয়েতের তেল চাকুরের মন ভরেছে। আরেকটা খনির সন্ধান পেয়েছে বুঝি সে। বচসা করে জীবনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় না, জানত কুলসুম বানু। জানত হয়তো একদিন আকণ্ঠ সুধা পান করত যে তেল-চাকুরে, একদিন সেও হয়ে উঠবে ক্লান্ত। বিচ্ছেদের করুণ মুহূর্ত সেদিন অতর্কিতে বিদায়ের ছাড়পত্র নিয়ে আসবে। কোনো কলহ, কোনো উত্তেজনা কলুষিত হয়নি বিদায়ের মুহূর্ত। যেমন ছিল তেমনই থেকেছে। প্রশ্ন করেনি স্বামীকে তার নবসঙ্গিনী সম্পর্কে। কুণ্ঠায় আনত হয়নি নয়ন।

অবাক হয়ে গিয়েছিল সবাই হঠাৎ বিমানবন্দরে এমন নিরাসক্ত হয়ে তাকে ফিরতে দেখে।

কোনো অভিযোগ করেনি কুলসুম বানু।

কিন্তু সেদিন যারা তাকে আনতে গিয়েছিল তাদের একজনকে দেখে অবাক হয়েছিল কুলসুম বানু।

ছয়

আমি সে কথাই জিজ্ঞেস করেছিলাম শাহানশাকে।

‘আপনাকে দেখে অবাক হলো কেন?’

‘বোধহয় আমার উপস্থিতি তার প্রথম জীবনের মায়াময় স্বপ্নের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছিল। আমি শুধু উপলক্ষ।’

শাহানশা ছিল মান্নানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বিয়ের ব্যাপারে সে-ই সবচেয়ে হুজুগে। বিয়ের দিন এমারল্ড আর পার্ল বসানো দুটো সোনার বালা সেই দিয়েছিল নব পরিণীতাকে।

মান্নান অবাক না হয়ে পারেনি।

‘কী করেছ এসব। খামাখা এত পয়সা খরচ করতে গেলে কেন।’

শাহানশা হেসে বলেছিল, ‘হীরে পান্নার মূল্যটাই তোমার কাছে বেশি হলো। মানুষটা কিছু নয়?’

তারপর আর তা নিয়ে কথা হয়নি।

সেই শাহানশাই আজ আবার এসেছে। শুধু অভ্যাগতদের দল ভারি করতে নয়।

তাকে দেখে চোখ নাবিয়ে ফেলেছিল কুলসুম বানু।

ধরা গলায় বলল, ‘আপনি এলেন কেন আবার লজ্জা দিতে?’

শাহানশার মন বলে কিছু নেই। অনুভূতি কিছু নেই।

সে কথার জবাব সে নিজেও জানে না।

অভ্যাগতদের ভিড় কমছে একে একে। তারা সাদর সম্ভাষণ জানাতে এসেছিল। দু’একজন হাতে করে এনেছিল মালা। পৌঁছে দেবার জন্য সঙ্গে এনেছিল গাড়ি।

কিন্তু কুলসুম বানুর যে যাবার কোনো জায়গা নেই। সেই অভ্যাগতদের ভিড়ে একটি ছোট্ট মেয়ের অনুপস্থিতি তাকে কাতর করে তোলে। চোখ ছলছল করে ওঠে। এত লোক এলো। কারও কি মনে পড়ল না, লাল ফিতে দিয়ে চুল বেঁধে তার মেয়েটাকে সঙ্গে আনতে? হাসিমুখে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে শাহানশার কাছে এসে দাঁড়ায় কুলসুম। একটু দূরে সরে দাঁড়িয়েছিল সে।

শাহানশার মৃদু হেসে বলে, ‘কোথায় যেতে হবে?’

‘আপনার সঙ্গে গাড়ি আছে?’

‘না।’

‘তাহলে?’

‘ট্যাক্সি নেব। চলুন!’

ভাড়া করা ট্যাক্সিতে সেদিন শাহানশার পাশাপাশি বসে ভীষণ অস্বস্তি বোধ করছিল কুলসুম।

কোথায় যেতে হবে জানে না।

একসময়ে না পেরে বলে কুলসুম, ‘কিছুদিন কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। কোনো বোর্ডিং-এ। যতদিন পেট চালাবার মতো একটা কাজ না জোটে?’

শাহানশার যেন তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই।

বলে, ‘থাকবার জন্যে বোর্ডিং কি হবে?’

‘কোথায় থাকব?’

তেমনি শান্ত কণ্ঠে জবাব দেয় শাহানশা, ‘কেন আমার ওখানে?’

‘কিন্তু’ – আমতা আমতা করে কুলসুম।

‘আপনার মেয়েকে দেখতে ইচ্ছে করে না?’

‘সেখানেই চলুন আগে’, আকুতি জানায় কুলসুম।

‘সেখানে যাচ্ছি।’

পুরোনো মতো একটা বাড়ির কাছে এসে থামে গাড়ি। এ তো শাহানশার বাড়ি তাহলে –

অবাক হয় কুলসুম।

‘রওশন কি এখানেই ছিল?’

‘হ্যাঁ।’

‘কতদিন?’

‘অনেকদিন।’

‘ও, আমি ভেবেছিলাম’-

মুখের কথা শেষ করার সুযোগ পায় না কুলসুম।

‘আপনার ফুপু বেঁচে নেই। কেউ জানায়নি সে কথা?’

‘না।’

তাকে দয়া করে আশ্রয় দিয়েছে শাহানশা। কিন্তু এই দয়ার সুযোগে অনেক কথা শোনাতে পারত। অন্তহীন উপদেশে জর্জরিত করতে পারত। তার কিছুই করেনি।

অথচ সামান্য কৃতজ্ঞতা জানাবারও সুযোগ পায়নি কুলসুম। আর সে কেন, কেইবা পেয়েছে। শখ করে অরফ্যানেজ খুলেছে, মেয়ে-স্কুল বসিয়েছে।

অরফ্যানেজের সুপারিটেনডেন্ট এসেছে। এসেছে মেয়ে স্কুলের হেড মিস্ট্রেস। অনুরোধ জানিয়েছে বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী সভায় সভাপতিত্ব করতে। অম্লান বদনে হেসে প্রত্যাখ্যানের হাসি হেসে বলেছে শাহানশা, ‘আমি ওসবের মধ্যে কেন।

আমাকে মানায় না।’

কিন্তু একবারে নিরাশও করেনি তাদের। যাবার সময় বলেছে, ‘একটু দাঁড়ান।’

তারপর বেরিয়ে এসেছে একটা চেক হাতে।

বলেছে, ‘নিন। টাকাটা স্কুল ফান্ডের জন্য।’

‘সে তো প্রতি মাসেই নিচ্ছি আপনার কাছ থেকে।’

‘বলছিলেন, খেলাধুলোর সাজসরঞ্জাম দরকার। এটা সেজন্যেই।’

অথবা অরফ্যানেজের ট্রাস্ট্রির মেম্বাররা বলেছে, ‘আপনাকে এবার চেয়ারম্যান করব।’

তেমনি হেসে বলেছে, ‘পাগল। আমি এসবের মধ্যে নেই। বরং শুনুন’, যেতে যেতে দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বলেছে শাহানশা, ‘অন্ধদের জন্য হাতের কাজের একটা সেকশন খুলুন। সামনের জমিটা পড়ে আছে। পয়সা কিছু লাগে তার ব্যবস্থা করা যাবে।’

সেই বিচিত্র চরিত্রের মানুষের ঘরে এসে কেবলই বিস্মিত হয়েছে কুলসুম বানু। এ মানুষের কি কোনো লোভ নেই? তার কি কোনো আকাক্সক্ষা নেই। নামের, যশের? আর সামান্যতম কোনো আত্মীয়তার সূত্রেও যে বাঁধা নয়, তারই আশ্রয়ে জীবন কাটানোর ধারাটাই কেমন হবে।

গুঞ্জরণ শুনেছে কুলসুম বানু। লোকজন বলতে ছাড়েনি। তারা এতদিন যেন একটা যুৎসই কারণ খুঁেজ পেয়েছে।

বলেছে, লোভই যদি না থাকবে তবে কুলসুম বানুর মতো মেয়েকে ঠাঁই দিলো কেন?

তারা বলেছে, ও লোকটা আসলে ভ-। নইলে চোরের মতো ঘুরে বেড়ায় কেন? লোকের চোখে ধরা দিতে ভয় কেন? একটা ভাঙা সাইকেল নিয়ে শহরময় ছুটে বেড়ায় কেন? শাহানশার কি টাকার অভাব? শাহানশা ভ-।

সাত

এ প্রশ্ন একদিন আমার মনেও জেগেছিল। বোধহয় এখনও তার মীমাংসা হয়নি পুরোপুরি। কিন্তু শাহানশার সঙ্গে পরিচয়ের মুহূর্তটি আমার এখনও মনে আছে।

ইউনাইটেড ট্রাভেল এজেন্সির এসিস্টেন্ট বিল কলেক্টর আমি। ওটা নিছকই অপিসী পদমর্যাদা। নতুন ঢুকেছি। সবাই বলছে যোগ্যতা ও পারদর্শিতা দেখাতে পারলে একদিন উঠব। যেমন উঠেছে রিজভি। যেমন কায়সার হেড অফিসের পারসোন্যাল অফিসার একদিনে হয়নি। সে আমারও চেয়েও কম মাইনেতে ঢুকেছিল।

রোজকার মতো অফিস করি। কাজে ফাঁকি দেবার মত ওঠে না। বরং ওপরওয়ালাকে একটু খুশি করতে পারলে যেন কৃতার্থ হই। ইউনাইটেড ট্রাভেল এজেন্সি। যাত্রীদের প্লেন, জাহাজ ও গাড়ির বুকিং করা। বড় বড় পার্টির জন্য হোটেলের ব্যবস্থা। বুকিং-এর ওপর কমিশন দু’পারসেন্ট। যা মাইনের অতিরিক্ত।

মিস মার্জোরি আমার সাক্ষাৎ ওপরওয়ালা বা ওপরওয়ালি। কাচে ঘেরা তার কেবিন। সেখানে ঢোকার সুযোগ হয় না। কিন্তু একদিন মার্জোরি ডেকে পাঠায় তার কামরায়।

বলল, ‘একটা বড় পার্টি আসছে। তাদের জন্য ভালো হোটেলের বন্দোবস্ত করতে হবে, ‘এ’ ক্লাস। খাবার দাবারের দিকে যেন বিশেষ নজর দেওয়া হয়।’

মিস মার্জোরি আমাকে নিজেই যেতে বলল অফিসের গাড়ি নিয়ে, ‘এসব কাজ টেলিফোনে হয় না, বুঝেছ।’

চলে যাচ্ছি। মিস মার্জোরি আবার ডেকে বলে, ‘ওরা কিন্তু বি.ও.এ.সি ফ্লাইট ৬২২-এ আসছে। নিজে একবার এয়ারপোর্ট যেও।’

কোনো হোমরা-চোমরা কাস্টমার না হলে এহেন রাজকীয় সম্বর্ধনার ব্যবস্থা নেই। সেদিন কি ভীষণ ছুটোছুটিই করেছি। হোটেল প্যারাডাইসের পাশাকে নিজে গিয়ে বলেছি, ‘দেখো হে ইম্পরট্যান্ট গেস্ট। পান থেকে চুন খসলে উপায় নেই।’

মিস মার্জোরি নিজেই খাবার একটা মেনু করে দিয়েছিল। ওটা বুঝিয়ে দিয়েছে পাশাকে।

তারপর ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে কাঁটা মিলিয়ে ছুটেছি এয়ারপোর্টে। বুক র্দু র্দু করছে। একটা যুদ্ধ জয়ের মতো কিছু। টম হ্যারিস ডান্ডি থেকে আসছে বিজনেস কনফারেন্সে।

বিপুলাকায় জেট নাবল। তার গবাক্ষ থেকে বেরুল নানা চেহারার নানা লোক। কারও হাতে ব্যাগ। কারও লাগেজ বলতে শুধু সূর্য-চশমা। কেউ ট্রাভেল করার আনন্দেই প্রসন্ন। কারও ঘোরা ফেরাটাই যেন এক মস্ত দায়।

এদেরই একজন টম হ্যারিস আমার সম্মানিত অতিথি।

হাতে করে একজন এয়ার হোস্টেসকে এগিয়ে দিলাম এক টুকরো কাগজে নামখানা লিখে।

সরবে ঘোষিত হয় আমার অনুরোধ : মিঃ টম হ্যারিস ইজটু প্লিজ রিপোর্ট টু দি ট্রাফিক কাউন্টার।

টম হ্যারিস কাউন্টারে এসেই আমার সঙ্গে দেখা করল। উজ্জ্বল গৌরবর্ণ। বোধহয় চল্লিশ ঊর্ধ। দাঁত দিয়ে চিবিয়ে ধরেছে একটা পাইপ। এগিয়ে গিয়ে পরিচয় দিলাম।

বললাম, ‘স্যার আপনার ব্যাগেজ স্লিপটা দিন। আমি আনিয়ে নিচ্ছি।’

হ্যারিস পকেটের ভেতর থেকে ওখানা বের করে আমার হাতে দিলো। সত্যি আমার কর্মনৈপুণ্যে আমি নিজেই যেন হতবাক হয়ে পড়েছিলাম। জিনিসপত্র গুছিয়ে ট্যাক্সি করে হোটেলের নির্দিষ্ট কামরায় পৌঁছে দিয়ে তবে ছুটি।

হ্যারিস পকেট থেকে মানিব্যাগ বার করে। তারপর একটা দশ টাকার নোট এগিয়ে দিলো আমার দিকে।

আমি বিনয়ে হেসে বলি, ‘স্যার আমি ট্রাভেল এজেন্সির রিপ্রেজেন্টেটিভ। হোটেলের বয় বেয়ারা নই।’

হ্যারিস কিছু বলল না। হাতের তালুতে পাইপখানা ঠুকে খানিকটা ছাই বার করে ফেলে এ্যাসট্রেতে। নোটখানা দুমড়ে কোটের পকেটে রেখে দিতে দিতে বলে, ‘এক্সসেলেন্ট। কাল এসো।’

টম হ্যারিস আমাকে টিপ্স দিতে চেয়েছিল নিইনি শুনে সবাই অবাক। এতে সম্মানহানির কি। হ্যারিসের মতো লোকদের নজরে এলে বরাত ফিরতে কতক্ষণ। সাহেব সুবো কোম্পানির ওপরওয়ালারা তো সবই চেনা। সামান্য সুপারিশই ঢের।

বিজনেস কনফারেন্স শেষ হলো। ডান্ডিতে পাট রপ্তানি সম্পর্কে দু’দশটা মিলের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। পাকাপকি হয়েছে সব শর্ত।

মিস মার্জোরি বলল, ‘এবার তুমি ওর টিকিটের খবরটা নাও। কোন ফ্লাইটে যাবেন শুনে নিয়ে বুকিং করে দাও।’

টম হ্যারিসকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘স্যার আপনার বুকিং কনফার্ম করব।’

একটা বোতল থেকে বিয়ার ঢেলে নিয়ে বলল, ‘না ভাবছি কিছুদিন ঘুরে যাই। তোমাদের ওরিয়েন্টাল লাইফ দেখতে চাই।’ সত্যি এ ক’দিন তার একদম ফুরসৎ ছিল না। গলফের মাঠে যেতে পারেনি। বিলিয়ার্ড টেবিলের কাছে ঘেঁষতে পারেনি। সারাদিন বসে সেক্রেটারি ‘ব্রিফিং’ তৈরি করেছে আর সেগুলো রাত জেগে দেখতে হয়েছে হ্যারিসকে। ‘বিজনেস ডিল’ ভুল করলে চলে না। আর মুখের কথায় বারবার ডান্ডি থেকে আসাও যায় না। ক’টা দিন থাক। বিশ্রাম নেবে। ঘুরে ফিরে দেখবে। তারপর জাপান হয়ে দেশে ফিরবে।

আমি মিস মার্জারেকে সে কথাই জানাই।

মাশুক অফিসে অ্যাকাউন্টস দেখাশোনা করে। কেমন চাপা স্বভাবের। লোকটা যে বেজায় ধূর্ত বোঝা যায় ওর চোখের দিকে তাকালে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মিট্ মিট্ করে তাকায়। একটা কিছু কথা হলেই উৎকর্ণ হয়ে শোনে। এর সম্বন্ধে ওর কাছে কথা লাগানো যেন একটা বাতিক।

সেই মাশুক আমার টেবিলের কাছে কাঁচু মাচু হয়ে দাঁড়িয়ে বলে, ‘শোনো, তোমার হ্যারিস সাহেবের হোটেলের কামরা বলতে পার।’

‘কেন হোটেলের কামরা জেনে কী হবে।’

সাধারণত ক্লায়েন্টদের ব্যক্তিগত ব্যাপার আলোচনা না করাই কোম্পানির নিয়ম। সেজন্য খানিকটা ইতস্তত করছি।

মাশুক বলে, ‘তার সঙ্গে অ্যাকাউন্টটা সেট্ল করতে হবে। সেজন্য একদিন খাতাপত্র নিয়ে যাবো। হোটেলের নম্বর এমনি জানতে পারি। তবু তোমাকে জিজ্ঞেস করলাম।’

এরপর তাকে নিরস্ত করা সম্ভব নয়।

মাশুক হ্যারিসের সঙ্গে ওইদিনই দেখা করেছিল।

পরদিন উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, হ্যারিস তাকে পছন্দ করেছে। নিজে ডিনারে ডেকেছে।

ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত ঠেকল। মাশুকের মতো লোককে কারও পছন্দ হতে পারে বিশ্বাস করা কঠিন।

কিন্তু সত্যি কথাই বলেছে মাশুক।

হ্যারিসের কাছ থেকে ফোন আসে ওর কাছে। জরুরি তলব হয় যখন তখন।

মনে মনে কেমন নিরাশ হয়ে যাই। আমিই হ্যারিসের পুরো তদারকের ভার নিয়েছিলাম। এখন আমি কেউ নই, মাশুকই সব।

মাশুক নিজেও আমাদের শুনিয়ে বলত, ‘এখন আর হ্যারিসের সঙ্গে গিয়ে তোমরা সুবিধে করতে পারবে না। আমিও তার সঙ্গে ফিরে যাবো ভাবছি।’

‘চাকরি পেলেন নাকি?’

প্রায় সেরকমই। আমাকে কনফিডেন্সিয়াল ক্লার্কের চাকরি দিতে চান। বলেন, পাটের ব্যবসায় এ দেশী একজন থাকলে খুবই সুবিধে।

আমি হ্যারিসের কথা ভুলে গেছি। নিউজিল্যান্ড থেকে এক ফুটবল টিম আসবে। সব মিলিয়ে আঠারো জন। তাদের সব ব্যবস্থাও আমাকেই করতে হবে।

মাঝে মাঝে কিছুটা কানাঘুষা শোনা যেত। রাতে বার থেকে পানোম্মত্ত অবস্থায় কে বেরিয়ে আসতে দেখেছে হ্যারিসকে। সঙ্গে মাশুক। ইন্ডিয়ান বাইজির নাচ দেখতে গেছে হ্যারিস। মাশুকই ব্যবস্থা করেছে।

কিন্তু ব্যাপারটা একদিন অন্যরকম মোড় নিল। পুলিশ অফিস থেকে টেলিফোন এলো। আশেপাশে কেউ ছিল না। আমি ধরলাম।

পুলিশ জানতে চাইল, ‘মাশুক বলে কেউ কাজ করে আপনাদের অফিসে?’

‘কেন, হ্যাঁ।’

‘তাহলে শিগগির আসুন। ইনজারড্।’

‘সে কি। কী হয়েছিল?’

‘চলে আসুন আপনারা কেউ। টেলিফোনে অত কথা বলা সম্ভব নয়। সঙ্গে একজন শ্বেতকায় ছিল। অবশ্যি তার আঘাতটা তেমন কিছু নয়।’

টেলিফোন পেয়েই সেখান থেকে ছুটি থানায়। থানা থেকে হাসপাতালে।

সারজিক্যাল ওয়ার্ডে মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় মাশুক। আমাকে দেখে চোখ খুলল। মাশুককে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, হ্যারিসের তেমন কিছু হয়নি। মাথায় দু’একটা স্টিচ্ পড়েছে এই যা। ও আজ বিকেলে ফ্লাইটে ফিরে যাচ্ছে।

মাশুক গোঙাচ্ছে। একটা চোখ পুরো ব্যান্ডেজ করা।

তবু মোটামুটি ব্যাপারটা ওর মুখে জানা গেল।

এক বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল হ্যারিসকে নিয়ে।

ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। হঠাৎ অন্ধকারে কে একজন এসে তাদের আক্রমণ করে। কিল চড় ঘুষি। চিৎকারে রাস্তাতেই লোক জড় হয়।

মাশুক সেখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। পরের ঘটনা ওর মনে নেই।

জিজ্ঞেস করলাম ‘মারল কে। পুলিশ ধরেছে আসামিকে?’

‘হ্যাঁ।’

মাশুক ব্যাপারটা চেপে গেলেও ঘটনাটা আদালত পর্যন্ত উঠেছিল। এবং তখন পুরো ইতিহাসটাই জানা গেল।

হ্যারিসকে এক নতুন উন্মাদনাময় জীবনের সন্ধান দিয়েছিল মাশুক।

‘ওরিয়েন্টাল লাইফের’ স্বাদটা এমন পুরোমাত্রায় পেয়েছিল হ্যারিস যে, সে মোহ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব ছিল না। এক শ্বেতাঙ্গের কৃপার বিনিময়ে তার উদগ্র কামনার ক্ষুদার ইন্ধন জুগিয়েছে মাশুক।

পাড়ায় নিয়ে এসেছে তাকে। চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে। অপ্সরী সুন্দরীদের জুগিয়েছে দিনের পর দিন।

পাড়ায় এ নিয়ে কানাঘুষা হয়েছে অনেক। সবাই জানত, রাত এগারোটায় হৈ-হল্লার আসরে দিনের পর দিন কি নারকীয় যজ্ঞ চলছে। শুধু হ্যারিস একা নয়। তার সাঙ্গপাঙ্গ জুটেছে তখন। আর ওই নৈশ চিত্ত-বিনোদনের আনাচে-কানাচে সে নারী-খনিজের সন্ধান পেয়েছে। কেউ কেউ শখ করে আসে। স্বেচ্ছায় আসে। কিন্তু সবাই না। অন্তত একজন আসেনি।

সেই মেয়েটাই হয়তো প- করেছিল সব।

গলা ফাটিয়ে আর্তনাদ করেছিল। বীভৎস অত্যাচারের শিকার হতে চায়নি বোধহয়!

পাশেই থাকত এক ট্রাক ড্রাইভার। আন্তঃজেলা মালবোঝাই ট্রাক নিয়ে তার কারবার। একটি ছোট কামরা নিয়ে থাকে নিরিবিলি।

সে বেরিয়ে এসেছিল চিৎকার শুনে!

টুঁটি চেপে ধরেছিল মাশুকের। ঘুষি মেরে ফেলে দিয়েছিল হ্যাসিরকে।

আদালতে প্রতিপক্ষের কৌঁসুলি তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার নাম?’

‘শাহানশা।’

‘আপনি ওদের ওপর হামলা চালিয়েছিলেন?’

‘আমি মেয়েটাকে বাঁচাতে চেষ্টা করেছিলাম।’

‘মেয়েটাকে আপনি চিনতেন?’

‘না।’

‘মেয়েটি আপনার কেউ হয়?

আবার জবাব এলো, ‘না।’

কৌঁসুলি জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার কি আরো গুরুতর কিছু করার ইচ্ছে ছিল।’

‘সে সুযোগ পাইনি।’

শাহানশার জেল হয়েছিল। মাশুকেরও।

সেই আমি শাহানশার কথা প্রথম শুনি। কিন্তু দেখা হয়েছিল অনেকদিন পর।

বোধহয় সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই ভুলে যেতাম।

একজন এসে জানায়, কে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।

চিরকুটে ছোট্ট করে লেখা আগন্তুকের নাম : শাহানশা।

আমি আঁতকে উঠি।

ঠিক দেখে চিনতে পারিনি। লম্বা চওড়া। কালো একটা খাকি পাতলুন। গায়ে বুশশার্ট। চোখে সূর্য-চশমা। মুখে চুরুট।

বললাম, ‘আপনি কবে জেল থেকে ছাড়া পেলেন?’

‘অনেকদিন।’

‘তা আমার কাছে কেন।’

শাহানশা মৃদু হেসে বলল, ‘একটা কাজে এসেছিলাম। সেই যে বিদেশী ভদ্রলোক এসেছিলেন তার ঠিকানাটা একটু দেবেন।’

বললাম, ‘কার কথা বলেছেন। হ্যারিস? ও তো ডান্ডিতে।’

‘হ্যাঁ, আমি সেখানকার ঠিকানাই চাই।’

‘কেন?’

‘চিঠি লিখব।’

‘চিঠি লিখবেন?’

‘হ্যাঁ। ক্ষমা প্রার্থনা করে। মানে ওর ওপর চোটপাট করার কোনো অধিকার ছিল না আমার। ওর কি দোষ। ও তো যেচে আসেনি। ওকে আনা হয়েছিল। আমি অনুতপ্ত। বুঝিয়ে বললে নিশ্চয়ই ক্ষমা করবেন।’

শাহানশার কথা যেন আমি নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! এ কি সেই শাহানশা যে আদালতে দাঁড়িয়ে বলেছিল, সুযোগ পেলে সে আরো গুরুতর কিছু করত।

আমার কাছ থেকে ঠিকানাটা নিয়ে আর দ্বিরুক্তি না করে চলে গেল শাহানশা।

আমি তন্ময় হয়ে ওর যাবার পথের দিকে তাকিয়ে থাকি।

তখনই মনে হয়েছিল : পারে, শাহানশা সব পারে।

আট

কিন্তু সময়ে সবই বদলায়। আমিও ট্রাভেল এজেন্সিতে বিল কালেক্টর নই। শাহানশাও ট্রাক চালায় না। সে নিজেই বহু ট্রাকের মালিক।

আমি এখন এডভারটাইজিং ফার্মে ঢুকেছি। পদোন্নতি হয়েছে। মাইনেও বেড়েছে আগের তুলনায়।

অফিস থেকে বেরিয়েই একদিন দেখা শাহানশার সঙ্গে। শাহানশাও অবাক, ‘আরে আপনি। কোথায় আছেন আজকাল।’

বললাম।

শাহানশা ছাড়ল না। বলল, ‘চলুন কোথাও বসি। আপনার সাথে পরামর্শ আছে।’

অবাক হই। আমার সাথে শাহানশার পরামর্শের কী থাকতে পারে। কাছেই চায়ের দোকান ছিল সেখানেই গিয়ে বসি। শাহানশা ইতস্তত করে বলে, ‘আপনাকে বলতে আর ক্ষতি কি। কিছু পয়সা কড়ি ইনভেস্ট করতে চাই।’

বললাম, ‘বেশ তো করুন না।’

‘সেজন্যেই তো আপনার পরামর্শ চাইছি।’

বললাম, ‘শেয়ার কিনুন। শুনেছি ওতেই আসল লাভ।’ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে শাহানশা, ‘কাল রাত পর্যন্ত সে কথাই ভাবছিলাম। কিন্তু এখন ঠিক করেছি একটা সৎকাজে লাগাবো। একটা অরফ্যানেজ খুললে কেমন হয়?’

চমকে উঠি।

‘কী খুলবেন, অরফ্যানেজ?’

শাহানশা যেন আমার কথা শোনেনি। বলেই চলেছে একমনে, ‘আমার কি দায় বলুন। শেয়ার কিনে কী করব। বিয়ে-থা করিনি। সংসার বলতে আমি আর ওই এক মেয়ে –

সেই প্রথম রওশনের কথা উল্লেখ করে শাহানশা।

এক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘রওশনকে দেখেননি, না?’

‘না।’

‘ভালো মেয়ে। ওর লেখাপড়া শেষ হলেই আমার কাজ শেষ।’

রওশন কে, শাহানশার সঙ্গে তার কী সম্পর্ক, সেসব কথা জিজ্ঞেস করিনি। বরং মনে মনে অযাচিত কোনো সন্দেহই পোষণ করেছিলাম বোধহয়। আজ সে কথা মনে করে নিজের কাছেই মাথা হেঁট হয়ে আসে।

বললাম, ‘অরফ্যানেজ করার কথা মনে হলো কী করে।’

শাহানশা বলে, ‘কী করে যে হলো আমিও জানি না। টম হ্যারিসের কথা আপনার মনে আছে। এখন থুরথুরে বুড়ো। রিটায়ার করে স্কটল্যান্ডের এক পল্লীতে থাকছে। চিঠি লেখে মাঝে মাঝে। ওই আমাকে আইডিয়াটা দিলো। টাকাও পাঠাতে চেয়েছিল। নিইনি।’

হেসে বললাম, ‘যাক তাহলে টম হ্যারিস আপনাকে চিঠি লিখেছিল?’

‘হ্যাঁ।’

তারপর এক মুহূর্ত কি ভেবে নিয়ে বলে শাহানশা, ‘সে ঘটনার কথা মনে আছে আপনার। যেবার থানা থেকে টেলিফোন পেয়ে হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন?’

‘খুব মনে আছে।’

উদাস দৃষ্টি মেলে বলে শাহানশা, ‘সেই থেকে ভেবেছি মাশুক আর হ্যারিসের ওপর চোটপাট করে অন্যায় করেছি। ওদের কি দোষ। আর এত করেও কি আমি একটি নিরপরাধ মেয়েকে বাঁচাতে পেরেছি?’

‘কোন মেয়ের কথা বলছেন?’

‘তাকে কি আর আমি চিনি। যার চিৎকার শুনে ছুটে গিয়েছিলাম। শুধু তার ভীতসন্ত্রস্ত আকুতি ভরা চোখের কথা মনে আছে। সে মেয়ে হয়তো যেখানে যাবার সেখানেই গেছে। আমি তার কিছুই করতে পারিনি।’

শাহানশা বলল, ‘সেই থেকেই ভেবেছি একটা অরফ্যানেজ দেবো।’ সমাজের নির্মম শোষণ থেকে সবাইকে সে বাঁচাতে পারে না। তবু সেই হাজারে একজনকেও যদি ঠাঁই দিতে পারে সেটাই কম কথা কি। সত্যি কথা বলতে, আমি শাহানশার কথা বিশ্বাস করিনি। ভেবেছি নিছকই তার খেয়াল।

শাহানশা মাসখানেক পর নিজে এসে আমাকে নিমন্ত্রণ করে গিয়েছিল। অরফ্যানেজের উদ্বোধনী উৎসবে। উদ্যোক্তরা বারবার করে উল্লেখ করল ওর কথা। খোঁজাখুঁজি হলো ওকে মঞ্চে এনে বসাবে। কিন্তু শাহানশা নেই কোথাও।

লোকটা কি এমনি লুকোচুরি খেলাই ভালোবাসে। পর বছরই মেয়ে-স্কুলের জন্য জমি দেখতে নিয়ে গেল আমাকে।

বললাম, ‘আপনি দেখছি সত্যিকার একটা দানবীর হবার মতলব আঁটছেন।’

সলজ্জ হয়ে বলে শাহানশা, ‘না না। ওসব বলে লজ্জা দেবেন না!’

জায়গাটা মন্দ নয়। পেছনে একটু টিলামতো। সামনেটা ঢালু। কিছু আম, লিচু ও কলাগাছ জায়গায় জায়গায়। বোধহয় শখ করে কেউ লাগিয়েছিল।

হাঁটতে হাঁটতে বললাম, ‘আপনার কি নামের কোনো মোহ নেই।’

শাহানশা এক মুহূর্ত কথা বলে না।

তারপর থেমে বলে, ‘আপনিও পাগল হয়েছেন। আমি স্কুল খুলছি শুনলে সেখানে কেউ মেয়ে পাঠাবে।’

‘কেন, সে কথা ভাবছেন কেন।’

‘না না। ওসব বলবেন না। আমার মতো হীনচরিত্রের একটি লোকের নামের সঙ্গে কোনো কিছু জড়াতে চাইনে। নাম না থাক। সৃষ্টির আনন্দই কি কম।’

‘কিন্তু তাহলে এসব চালাবে কে?’

‘ট্রাস্ট করে দেবো।’

আবার একটু থেমে বলে শাহানশা, ‘আপনাকে একটা অনুরোধ, এসবের সঙ্গে আমি জড়িত, একথা কাউকে বলবেন না। আপনার ওপর দিব্যি রইল।’

মনে মনে হাসলাম, বললাম, ‘বেশ। কী দরকার আমার। কিন্তু তাতে আপনার লাভ কি শুনি।’

হো হো হেসে ওঠে শাহানশা।

‘লাভ নেই বলছেন। আমার সম্বন্ধে এক একজনের এক এক রকম ধারণা। আর সত্যি কথা বলতে আমি মানুষ হিসেবেও খাঁটি নই। আমার মতো চরিত্রের লোকদের জন্য সমাজের করুণা আর অনুকম্পাই ভালো।’

‘আপনি চান, আপনাকে সবাই অন্যায় সন্দেহ করুক।’

‘করুক। কি এসে যায়। আর সবাই বলছেন কেন, আপনি নিশ্চয়ই করেন না। করেন?’

বোধহয় তেমন জোর দিয়ে কিছু বলা সম্ভব ছিল না আমার।

তাই চুপ করে থাকি।

শাহানশাও আর পীড়াপীড়ি করে না।

কিন্তু সেসব অনেক আগের কথা।

এরপর শাহানশার সঙ্গে বড় বেশি একটা দেখা হয়নি। আমিও একের পর এক চাকরি বদলেছি।

লোকের মুখেই শুনেছি শাহানশা সাত সতেরো বিজনেস করছে। আজ এটা কাল ওটা, পয়সাকড়ির ভাগ্য বোধহয় চিরকালই ওর সুপ্রসন্ন।

পয়সাকড়ি মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য আনে। কিন্তু শাহানশার একটুকু তারতম্য হলো না। তখনও দেখেছি খাকি প্যান্ট ও আস্তিন গোটানো শার্ট পড়ে ঘুরত। এখনও তাই। বরং তখন ওর সাইকেলখানা ছিল নতুন, ঝকঝকে। জং পড়ে কেমন বিবর্ণ হয়েছে এখন। বিবর্ণ হয়েছে শাহানশাও।

ভেবে অবাক হই, যে লোক হৈ হৈ করতে পারে, মানুষের মাথা ভাঙতে পারে, সে নিজের স্বার্থ কোনোদিন ভালো করে বুঝল না কেন। তার উত্তেজনায় কি কোনো আগুন নেই, বাষ্প নেই। জীবনের সব চালই তার পাকা জুয়াড়ির মতো। বোধহয় ভাবে প্রতিপক্ষকে মাত করতে পেরেছে, এই নীরব গৌরবই তার পাথেয়।

দায়িত্ব তার কারও প্রতি নেই। রওশনের প্রতি নয়। কুলসুম বানুর প্রতি তো নয়ই।

বোর্ডিং-এ রেখে লেখাপড়া শিখিয়েছে। মানুষ করেছে রওশনকে। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় গৌরবের দিনে মিথ্যে কথা বলেছে শাহানশা।

তখনও চাকরি নেয়নি রওশন কলেজে।

জিজ্ঞেস করেছে, ‘মাসের পর মাস যে টাকা দিচ্ছেন, তার দেনা শুধব কী করে।’

‘আমি দিচ্ছি, কে বলল।’

‘আপনি দিচ্ছেন না তো, কে দিচ্ছে?’

হো হো হাসি শাহানশার। যে হাসির গমকে অনেক মিথ্যেও সত্য বলে বিশ্বাস করাতে পারে!

‘তোমার বাবার কি টাকা ছিল না ভাবছ। তখন ব্যাংক ট্যাংকের ধার ধারত না কেউ। আমার কাছেই রেখে গিয়েছিলেন।’

ব্যাপারটা যেন তাই হয়। তাহলে একটা একটা অকারণ কৃতজ্ঞতার নাগপাশে চিরকাল এই লোকটার কাছে আবদ্ধ থাকতে হয় না।

তারপরের প্রশ্নটা যেন অতর্কিতেই করে ফেলে রওশন, ‘কত টাকা রেখে গিয়েছিলেন আমার বাবা?’

‘সে হিসাব কি আর মনে আছে। তোমার কি আরো টাকা দরকার?’

‘না।’

সত্যি তার দরকার নেই। মহিলা কলেজের চাকরি তার পাকাপাকি। কেমন লাগবে নতুন চাকরি জানে না। ভালোই লাগবে বোধহয়।

বিশেষ করে সে লোকটির সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্কটুকু নেই, যার রুচির সঙ্গে, মেজাজের সঙ্গে, চিন্তার সঙ্গে কোনোখানেই মেলে না, তেমন একটি লোককে কী বলে পরিচয় দেওয়া যায়।

বাবার বন্ধু, বলা যায়। কিন্তু এই বন্ধুত্ব্যের নানা ব্যাখ্যা হতে পারে। সবচেয়ে ঘৃণ্য ব্যাপার যেটা, শাহানশা তাদের পারিবারিক দ্বন্দ্বের পুরো ইতিহাস জানে। কিন্তু শাহানশার মতো একটি জটিল, অসামাজিক চরিত্রের সঙ্গে তার বাবার সদ্ভাব হলো কেন। কেন, এত বিশ্বাসভাজন হলো লোকটি।

কুলসুম বানু তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তখন এই লোকটি হাত বাড়িয়ে সে সুযোগে লুণ্ঠন করেছে। বেণী দোলানো ছোট্ট মেয়েকে ভুলিয়ে ভালিয়ে øেহ, আদরে ঋণী করে রেখেছে।

রওশন বলেছিল, ‘আমি তো এখন থেকে নিজের কোয়ার্টার পাব। আপনি আর আসবেন না।’

শাহানশা কি একটু আহত হয়েছিল। দেখে কিন্তু তা মনে হয়নি। যেন নিজের মনেই তার একটা সৎযুক্তি খুঁজে পেয়েছে।

বলে, ‘সত্যি এমন চাষাভুষোর মতো থাকি, তোমার ওখানে গেলে লোকে কী বলবে?’

রূঢ় শোনাতে পারে। তবু বোধহয় কথাটা খোলাখুলি বলা ভালো।

রওশন বলে, ‘না সেজন্যে নয়।’

‘তবে?’

‘আপনার সম্পর্কে নানা লোকের নানা ধারণা। অনেক কথা বলে তারা। কোনো অপ্রীতিকর অবস্থা হোক আমি চাইনে।’

এ মুহূর্ত প্রস্তর মূর্তির মতো অসাড় হয়ে থাকে শাহানশা। পুলকিতও হয়। রওশন, যে রওশনকে নিজে বসে বাল্যশিক্ষার প্রথম পাঠ দিতে হয়েছে, সে বেশ গুছিয়ে বলতে পারে কথা। যে কথার রাগের ছিটে ফোঁটা নেই, অথচ আহত করার জ্বালা আছে।

ভেবেছিল শাহানশা প্রতিবাদ করবে। বাঁধাধরা গৎ শোনাবে। তিল্ তিল্ করে সর্বস্ব দিয়ে কী করে তাকে ছেলেবেলা থেকে মানুষ করেছে তার চিরাচরিত ইতিহাস রোমন্থন করবে।

শাহানশা যে তার কিছুই করল না, তাতেই ভীষণ অস্বস্তি লাগে রওশনের। তাই সান্ত¡না দেবার ভাষাতেই বলে, ‘যদি কখনও প্রয়োজন হয় আমিই যাবো নিজে। আপনার আসবার দরকার নেই।’

যে ঘরে বসে কথা বলছিল সেটা তো বেশ অন্ধকারই ছিল। আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে দেবার কথা নয়। তবু হঠাৎ পকেট থেকে সূর্য-চশমা জোড়া বার করে চোখে দিলো কেন শাহানশা। না তারও কিছু গোপন করার ছিল। কোনো অভিমান অশ্রু?

এয়ারপোর্ট থেকে সোজা শাহানশার বাসায় এসে নিরাশ হয়েছে কুলসুম। এমন জরাজীর্ণ দশা ভাবতে পারেনি। তারচেয়ে একটা ভদ্রগোছের বোর্ডিং-এ উঠলে ভালো হতো। আবার মনে হয়, তার বিপর্যস্ত জীবনের সঙ্গে শাহানশার এই ভুতুড়ে বাড়িটাই মানায় বেশি। ঝুল জমেছে, কালি পড়েছে জায়গায় জায়গায়। বাতিগুলোর তেজ নেই। আসবাবপত্রগুলো ঝাড়মোছ করা হয়নি একযুগ।

শাহানশা মনে মনে হয়তো ভেবেছে, কুলসুম বানুর জীবনে আজ যখন কেউ নেই তখন করুণ আশ্রয়ের হাতখানি বাড়িয়ে দিয়ে সে বাহাদুরিই করেছে। আরেকবার সে তাদের পরিবারকে ধন্য করার অধিকারটা জোর করেই আদায় করে নিয়েছে। বিপুলায়তন বিমান যখন গর্জে গর্জে মেঘের ওপর আকাশে গতির ঝড় তুলছিল, কুলসুম মোটামুটি একটা ব্যবস্থা ঠিক করে রেখেছিল। যেখানে গেছে আগে থেকেই পাকাপাকি ব্যবস্থা। হোটেলের মধ্যে উৎকৃষ্ট কামরার হোটেল, উৎকৃষ্ট হোটেলের উৎকৃষ্ট কামরা, উৎকৃষ্ট কামরার উৎকৃষ্ট আসবাবপত্র।

এত সুখ তার প্রথম স্বামীর সঙ্গে ঘর করেও মেলেনি। অবশ্যি জানত, এসবেরই একদিন সমাপ্তি ঘটে। ঘটলও। সেজন্য অনুতাপ নেই। আগুনের উত্তাপ যত দিন থাকে, ভালোই লাগে। যদিও জানা কথা সে আগুন নিবে ছাই হয় একদিন।

এর আগে কেউ তাকে জীবন নিয়ে ভাবার অবকাশ দেয়নি। জীবনের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচার গপ্পটাই শুনেছে লোকের মুখে। পড়েছে বইয়ের পৃষ্ঠায়। কিন্তু নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তা জানা হয়নি।

সে আশা করেছিল, বিমানবন্দর থেকে বেনে কোনো ট্রাভেল এজেন্টকে বলব সব ব্যবস্থা করে দিতে।

আত্মীয়স্বজনের দল অবাক হয়ে দেখবে। কানাঘুষা করবে। আর শাহানশা? শাহানশা যদি এসেই পড়ে, সে প্রত্যাখানের হাসিটা রপ্ত করে বলবে, ‘ধন্যবাদ। আমার থাকার জায়গা ঠিক করে ফেলেছি।’

তারপর।

তারপর। ভালো হোটেল থেকে মামুলি হোটেল। মামুলি হোটেল থেকে সস্তা হোটেল। কিংবা –

হ্যাঁ, জীবনে একটা আসন্ন ঝড়ের ঝাঁকুনি তার চাই। যে ঝড়ে চারাগাছের মতো, খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে কুলসুম। তার আরাম আয়াসের ভিতটাই নড়ে উঠবে। তখন সেই বিপর্যয়ের বেদনায় যদি তার চোখ ফেটে কান্না আসে, আসুক। যদি কেউ সমবেদনা দেখাতে আসে, আসুক। যদি কেউ øেহ দরদের লোভ দেখায়, দেখাক।

গ্রহণ সে অনেক করেছে। মানুষকে, মানুষের øেহ ভালোবাসাকে। প্রত্যাখ্যান করেনি। এবার তাই করবে। এবং প্রত্যাখ্যানের জ্বালায় নিজেই জ্বলবে।

তারপর কি?

রূপকথার গপ্পের মতো কোনো সোনার পালঙ্কে নয়, এ যুগে যা সম্ভব এমনি কোনো হাসপাতালের বেডে কঠিন রোগে আক্রান্ত হবে। নির্বোধ ডাক্তারের দল মিছেই ছুটোছুটি করে হয়রান হবে।

কিন্তু এ খেলার যেদিন শেষ, সেদিন কে আসবে তার ‘বডি’ ক্লেম করতে পাসপাতালে। হয়তো কুয়েতের তেল চাকুরের কাছেও পৌঁছুবে একদিন সে খবর। ছুটেও আসতে পারে সে হাসপাতালে। অনুতপ্ত হয়ে জিজ্ঞেস করবে তার কথা। ম্যাট্রন তাকে নিরাশ করে বলবে, তিনদিন কেউ তার ‘বডি’ ক্লেম করেনি। সুতরাং সৎকারের ব্যবস্থা করেছে তারাই।

হাসি পায়। তিনদিন তার ‘বডি’ ক্লেম করার লোক থাকবে না তখন। বেঁচে থাকতে যে ‘বডি’র আকর্ষণ অনেককে প্রলুব্ধ করে সেই ‘বডি’ মৌচাকের মতো গুঞ্জন ওঠে যাকে কেন্দ্র করে।

কুলসুম বানুর কোনো আক্ষেপ নেই। অনুযোগ নেই। ক্ষেদ নেই। কুয়েতের তেল চাকুরে একদিন তাকে লুফে নিয়েছিল। সেদিন তার চোখে ছিল প্রেমের তৃষ্ণা। একযুগ ঘর করেছে তারা। ভালোবেসেছে। নিবিড় হয়েছে। কুয়েতের তেল চাকুরে দুঃখ করেছে তার ঔরসে একটি সন্তানের জন্ম দিতে পারল না কুলসুম। কিন্তু মনে মনে কৌতুকই বোধ করেছে। ভাগ্যবিধাতা যেন তাকে নিজেই দুর্জ্ঞেয় এক ছকে ফেলে, কোনো পার্থিব বন্ধনের ক্ষেদ ছাড়াই সময়মতো মুক্তি দিয়েছেন। সেজন্যে কুলসুম বানুর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

তার পরিকল্পিত জীবনটায় মোড় ঘুরিয়ে দিতে শাহানশা আজ বদ্ধপরিকর কেন? কী তার স্বার্থ। কী তার মোহ?

শাহানশা কুটিল, নির্মম, প্রতিহিংসাপরায়ণ।

আজ তার সাদামাটা জীবনের পাশাপাশি কুলসুমকে ঠাঁই দিয়ে নিজের অসাড় শূন্যতার জয়ধ্বনিই সে ব্যক্ত করেছে। তার দয়া, অনুকম্পা যেন চার দেয়ালে প্রতিহত হয়ে বারবার তাকে মনে করিয়ে দেবে, তুমিও যা, শাহানশাও তাই। তোমরা শূন্য। তোমরা রিক্ত। তোমরা নিঃস্ব।

নয়

কিন্তু শাহানশা কি সাহসে তার সঙ্গে নিজের তুলনার স্পর্ধা রাখে। কুলসুম বানু রিক্ত হয়েছে, নিঃস্ব হয়নি। বড় কথা, রুচির ভেদাভেদ। ভেদাভেদ দৃষ্টিভঙ্গির।

নিজের কামরা ছেড়ে দিয়েছিল শাহানশা। এও যেন তার আরেক বাহাদুরি। সে কি ভেবেছে কুলসুম বানু সেজন্যে ভাববিগলিত হয়ে বলছে, ‘আহা আপনার এত কষ্ট হচ্ছে।’

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে আসেনি কুলসুম। হোটেলের ভালো কামরা চিরকালই জুটেছে তার ভাগ্যে। স্বাচ্ছন্দ্য তার কাছে নতুন কথা নয়। শাহানশা সাথে করে তাকে বাড়ি এনেছে। পরিচর্যা করছে। সুতরাং এ আত্মত্যাগের জন্যে তাকে বাহবা দেবার কোনো মানে হয় না। বাহবা পাওয়ার শাহানশার অনেক কিছু আছে। তার সারা জীবনের ইতিহাসটাই তো তার জানা। ইচ্ছে করলে ফাঁপিয়ে ফাঁপিয়ে সে কথা জাহির করতে পারে লোকের কাছে, ইয়ার বন্ধুর কাছে। বোধহয় করেও। তার ক্ষেত্রে যা কলঙ্ক, সেই অধ্যায় নিয়ে নিজে তাকে বাজে মানুষ বানিয়ে শাস্তি দিচ্ছে শাহানশা।

শাহানশা স্কুল বসিয়েছে। অনাথ আশ্রম খুলেছে। অথচ নাম-যশ চায়নি।

আর কেউ না জানুক, কুলসুম জানে এও একরকম হঠকারিতা। বিনয়ের হঠকারিতা। লোক বলবে, সর্বস্ব দিয়েও যার নামের মোহ নেই, সেই শাহানশা। নিজের জীবনের ব্যর্থতা দিয়ে যে অন্যের জীবন সার্থক করার পণ নেয়, সে শাহানশা।

ক’দিন যেন কুলসুমকে এড়িয়ে চলেছে শাহানশা। একটা দুটো ছাড়া কোনো কথাই বলেনি। কিন্তু তার নীরব চিন্তাকে কুলসুম এতটুকু তোয়াক্কা করে না সে কথা সামনা সামনিই বলবে।

সুযোগ হয়েছিল সেদিন সন্ধের বেলাই।

শাহানশা বাইরে যাচ্ছিল। কুলসুম ডাকল।

বলল, ‘আমার মেয়েটিকে একটু খবর দিতে পারেন?’

‘বেশ দেবো।’

‘ওকে বলেননি আমার কথা?’

‘কী কথা?’

‘আমি যে এখানে এসেছি।’

‘না?’

কেন?’

‘সে কথা আপনি নিজেই জানাতে পারতেন ইচ্ছে করলে।’

‘তা অবশ্যি পারতাম। আশা করেছিলাম এয়ারপোর্ট আসার সময় ওকেও মনে করে সঙ্গে আনবেন।’

‘ও আমার সঙ্গে আসত না।’

‘সেরকম কিছু বলেছে নাকি?’

মাথা হেঁট করে বলে শাহানশা, ‘হ্যাঁ।’

একটা অলীক ছায়া ছায়া-সন্দেহ তাকে ঘিরে ফেলে। রওশন আর ছোট্ট খুকিটি নেই। বড় হয়েছে। মানুষ চেনার, মানুষকে বোঝার বয়েস হয়েছে নিশ্চয়ই। যদি সে ‘না’ করে থাকে, তবে একটা কারণ থাকা বিচিত্র নয়।

ভ্রƒ কুঁচকে ফেলে কুলসুম।

আবার প্রশ্ন করে, ‘এটা কবেকার কথা?’

‘বছর খানেক হলো।’

‘তারপর আর কোনোদিন যাননি দেখা করতে?’

‘না।’

‘তাহলে খবর দেবেন বললেন যে!’

‘হয়তো সে নিজেই আসবে। নইলে কাউকে দিয়ে খবর পাঠাব।’

সতর্ক হয় কুলসুম, ‘না। আমি নিজেই যাবো। ঠিকানা দিন।’

শাহানশা ঠিকানা দিলো।

গর্জে ওঠে আবার কুলসুম বানু, ‘আপনার অনাথ আশ্রমে ওকে চাকরি দিলো কে?’

‘আমি।’

‘কেন, কলেজের চাকরি করছিল না?’

‘হ্যাঁ, সে চাকরি ছেড়ে দিয়ে এতে ঢুকেছে।’

‘না, আপনিই সে ব্যবস্থা করেছেন।’

শাহানশার মন বলে কিছু নেই। অনুভূতি নেই।

তেমনি শান্ত কণ্ঠ।

জবাব দেয়, ‘না, আমি কিছু করিনি। ও নিজেই আমার কাছে এসেছিল চাকরির জন্যে।’

কুলসুম এবার বিগলিত কণ্ঠে বলে, ‘অবশ্যি আপনি ওর জন্যে যা করেছেন, যতটুকু করেছেন সেজন্যে’- কথাটা বলবে কিনা যেন নিজেই ঠিক করতে পারে না।

তবু শেষ করতে হয়, ‘সেজন্যে আমরা মোটামুটি কৃতজ্ঞ। কিন্তু একটি মেয়ের অভিভাবকত্বের যোগ্যতা আপনার নেই, আশা করি তা বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। ও যদি আপনাকে দেখা করতে না করে থাকে, ভেবেই না করেছে। অন্যায় কিছু করেনি।’ শাহানশা জুতোর ফিতে বাঁধছে। হাতের আস্তিন গুটিয়ে ঠিক করছে।

তার অবিন্যস্ত কাঁচা-পাকা চুলের দিকে তাকিয়ে একটু মায়া হয়। ইচ্ছে হয় সদুপদেশ দিয়ে একটু গোছালো হতে বলে। বলে, মাথাটা আঁচড়ে নিতে। জুতোটায় কালি করে নিতে। একটা নতুন আনকোরা শার্ট গায়ে দিতে।

কিন্তু আমতা আমতা করেও কিছুতেই সে কথা বলতে পারে না কুলসুম।

বরং বলে, ‘থাক। আপনার খবর নিয়ে কাজ নেই। আমি নিজেই যাবো।’

শাহানশা কেমন ভীত চাউনি দিয়ে তাকায়। মা-মেয়ের সাক্ষাৎ পর্বটা কেমন হবে কে জানে। নিবিড় ও মুগ্ধকরই হবে।

সামান্য মান-অভিমানের পর, রক্তের মোহ, প্রাণের স্পন্দন, অনুভূতির নিবিড়তা একজনকে আরেকজনের কণ্ঠলগ্ন করবে। তখন অচেনা অদেখা, কালের ব্যবধানে বিচ্ছিন্ন দুটি প্রাণ একান্ত হয়ে শক্তির স্তম্ভ হবে।

শাহানশা সেখানে তৃতীয় পুরুষ।

মা-মেয়ের সেই নিবিড় মুহূর্তে সে একটি তুচ্ছ অস্তিত্ব।

রওশন তাকে বলবে, মাসে মাসে যে টাকা দিয়ে সাহায্য করেছে শাহানশা সে টাকা তো ওর নিজেরই। কিছু তার আত্মসাৎ ও করেছে এমন সন্দেহও হবে।

কুলসুম যদি তখুনি শাহানশার চতুর মিথ্যে কথাটা ফাঁস করে বলে দেয়, ওটাও একটা ভাওতা। কৃতজ্ঞতা অর্জনের আরেকটা জারিজুরি। টাকা শাহানশা নিজেই দিয়েছে, এক কানাকড়িও রেখে যায়নি তার বাবা, সে কথা শাহানশা ভালো করেই জানে। সঙ্কটাপন্ন রোগীকে বিস্বাদ ওষুধ সেবনের জন্যে ডাক্তার যে প্রবোধ বাক্যের আশ্রয় নেয় তেমনি করে থাকবে শাহানশা।

তখন?

কৃতজ্ঞতায় ভেঙে পড়বে রওশন!

মোটেও না। বরং ভীষণ রাগ হবে। রাগ হবে তার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে। তাকে মানুষ করে লিখিয়ে পড়িয়ে বড় করাটাও যেন এমনই এক কেলেঙ্কারী যেটা আর কোনো উপায়েই জীবন থেকে মুছে ফেলা যায় না।

তবু আশ্বস্ত হবে শুনে কুলসুম, এই লোভাতুর লোকটিকে কাছে ভিড়তে দেয়নি রওশন।

কিন্তু সে যে অলক্ষে দূরে বাসস্টপে দাঁড়াবার নাম করে নানা অজুহাতে তাকে দেখেছে, ধরাও পড়েছে একদিন ইঞ্জিনিয়ারের কাছে, সে কথাও বলবে কি রওশন।

সব ব্যাপারটাই যেন কেমন গোলমেলে হয়ে গেল। এর কোনো কিছুই চায়নি শাহানশা।

কিন্তু চাওয়া পাওয়ার রাজ্যে চিরন্তন সংঘাতের কী করবে শাহানশা।

মা মেয়ের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারে পরিণতি জানতে পারেনি শাহানশা।

তবে এটুকু জানে, কুলসুম নিজেই গিয়েছিল একদিন সকাল করে। সারা দুপুর থেকে বিকেলে ফিরে এসেছিল।

একটা উগ্র বাসনা ছিল, তাদের এই একান্ত ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনায় কোথায় নির্দেশিত হয়েছিল শাহানশার স্থান। কোন পর্যায়ে ফেলা হয়েছিল তাকে।

কুলসুমকে জিজ্ঞেস করতে পারে কথায় কথায়। কিন্তু সেটা কীরকম শোনাবে না। নিছক প্রয়োজন ছাড়া এতদিন যার সঙ্গে কোনো কথাই হয়নি, তার কাছে এই অদ্ভুত প্রসঙ্গের অবতারণা করবে কী করে। তাও তাকে ভালো লাগা না-লাগার প্রশ্ন। এমনও হতে পারে, তাদের ব্যক্তিগত জীবনে শাহানশার উল্লেখ একবারও হয়নি। এ তার মনগড়া কল্পনা।

এখন মনে হয় আগাগোড়া জীবন দর্শনটাই ভুল ছিল। দয়া দাক্ষিণ্য করুণা কোনো কিছুই দু’হাতে বিলিয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি। দেবার আগে পাওনা হিসাবটা কড়া ক্রান্তি বুঝে নেওয়া উচিত ছিল।

যে শাহানশা তাদের আশ্রয় দিয়েছে, বিপদে কাজে এসেছে, সে আজ কুলসুম রওশনের কাছে একটা পায়ে ওঠার সিঁড়ি মাত্র। তার বেশি কিছু নয়। সেজন্যে কৃতজ্ঞতা প্রত্যাশা করা যায় না।

সিঁড়ি না থাকলেই ওরা উঠত না তাই কে জানে। উঠবে যারা পণ করে, তারা দেয়াল বেয়েও ওঠে। কিন্তু সে কথা অপ্রাসঙ্গিক। বারান্দায় একা বসে বসে খাচ্ছে কুলসুম। তার নিজের সঙ্গে আনা স্টোভে তৈরি চা। চায়ের পাতা আর টিনের দুধও আনিয়েছে সে। এ তো অবজ্ঞায় বাড়িয়ে দেওয়া শাহানশার এক কাপ চা নয়। সেজন্যেই রসিয়ে খাচ্ছে। বোধহয় এমনি করে সংসারের ভেতর আরেক সংসার, এক আশ্রয়ের মাঝখানে আরেক পরমাশ্রয়ের ঠাঁই করেই কুলসুমের তৃপ্তি।

কুলসুমের রীতিটাই বুঝি এই। ধরা দিলেও অজেয় থাকার দুর্জয় বাসনা। হাতের মুঠোয় এসেও যে ছোঁয়ার বাইরে। কৃতজ্ঞতার নাগপাশে এসেও যে বাঁধনের গেরো আরো শক্ত করে।

সেদিন মনটা বুঝি তার খুব ভিজে ছিল। তা নইলে এ ধরনের অনুরোধ আর কখনও করেনি কুলসুম।

শাহানশাকে যেতে দেখে জিজ্ঞেস করে, ‘চা খাবেন এক কাপ?’

রেস্তোরাঁয় চা খেয়েছে। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মাঝে মাঝে হৈ-হল্লা করেছে। সেখানে হিসাবের চা আসে। হিসাব অনুযায়ী পয়সা মিটিয়ে দিতে হয়।

তার বাড়িতে অসময়ে কাপ হাতে নিয়ে কখনও আবদারের সুরে কেউ বলতে আসেনি : এক কাপ চা খাবেন।

বিকেলে চা খায় না শাহানশা। কিন্তু আজ তার মন কোনো ব্যতিক্রমের জ্বালায় অতিষ্ঠ নয়। এই আচার নিষ্ঠা অভ্যাসের আনুগত্য বেলওয়ারি গ্লাসের মতো ঝন্ ঝন্ করে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

সামনে একখানা বেতের চেয়ার ছিল। ওখানে টেনে নিয়ে বলে, ‘বিকেলে চা খাবার অভ্যেস নেই। তবু আপনি যখন বলছেন –

কুলসুম কেটলির ঢাকানা খুলে চায়ের পরিমাণ লক্ষ করে। শাহানশা ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে, ‘তাহলে দরকার নেই। নতুন করে বানাতে হবে না।’

কাপে চা ঢালতে ঢালতে বলে কুলসুম, ‘একটু কম হলেই কি, বসুন না।’

এমন সোজাসুজি ওর মুখোমুখি আর বসেনি কখনও শাহানশা। খুব সহজ কাজ যে সেটা নয়, আজ বড় বেশি করে তা উপলব্ধি করে। যে বসে চা ঢালছে সে এমনি হৃদয়ের কিছু নিবিড় অনুভূতিও ঢালতে পারত। ঠিক কবে কখন কুলসুম বানুকে তার ভালো লেগেছিল, মনে মনে মধুর কল্পনার জাল বুনেছিল তা মনে নেই।

সেদিন কি, যেদিন তার বন্ধু মান্নান বিয়ে করে নিয়ে এলো নতুন বউ। যাকে দেখলে চোখের পলক ফেলা যেত না। যাকে কাছে পেলে ইচ্ছের সুড়ঙ্গ থেকে ছোট বড় বাসনার বুদ্বুদ উঠত। কিন্তু সে কথা ভাবাও যে অন্যায়।

আজও কুলসুম বানুর সেই সুষম দেহ, সেই অভিনব ছাঁচে ঢালা মুখম-ল, সেই তৃপ্তির হ্রদে ভেজানো হাসি। বয়েসের স্বাক্ষর পড়েছে এখানে-সেখানে। ভ্রƒ-র মাঝখানটা কুঁচকে গিয়ে বয়েসের চাইতে অনেক বেশি মনে করিয়ে দেয় তাকে পাওয়ার দুর্লভতার কথা। ফিকে মাটি-রং শাড়ি পরেছে। দেহের কাঠামো এখনও ধরা পড়ে আঁটসাঁটো বেগুনি-রং ব্লাউজে। কুলসুম বানুর দেহ সৌষ্ঠব এখনও কেমন অসহিষ্ণুতা জাগায়। চা ঢেলে দিতে দিতে বলে কুলসুম, ‘কতদিন পর দেখলাম রওশনকে। ভারী মিষ্টি হয়েছে কিন্তু।’

বুক দুরদুর করে শাহানশার।

হয়তো এখুনি কোনো অপ্রিয় প্রসঙ্গের অবতারণা হবে।

শাহানশা বলে, ‘ও মায়ের আদল পেয়েছে তাই –

একটুকু সলজ্জ হয় কুলসুম। হঠাৎ কোনো কথা সরে না। তারপর থেমে বলে, ‘এমন করে থাকা আর ভালো লাগে না আমার।’

‘এমন করে মানে?’

যেন আহত করার ইচ্ছে নেই শাহানশাকে সেভাবেই বুঝিয়ে বলে কুলসুম, ‘আমার নিজের কথা বলছি না। লোকজন কী ভাববে?’

শাহানশা উদাস দৃষ্টি দিয়ে তাকায়। সত্যিই তো এমন কোনো বন্ধন নেই, এমন কোনো অধিকারের সূত্র নেই যার দোহাই দিয়ে পারস্পরিক সম্পর্ককে স্বাভাবিক করা যায়। তবু তাকে বলতে হয় নিরাসক্ত হয়ে, ‘লোকজনের সমালোচনাকে কি খুব ভয় আপনার।’

‘সমাজে থাকলে সে ভয় একটু-আধটু থাকবেই।’

‘তাছাড়া –

‘তাছাড়া?’ 

আগ্রহে ঝুঁকে পড়ে শাহানশা।

কুলসুম চায়ের কাপ নাবিয়ে বলে, ‘তাছাড়া সামাজিক একটা সম্পর্ক বা আত্মীয়তার বন্ধনও যেখানে নেই সেখানে নিছক পূর্ব-পরিচয়ের অজুহাত খুব জোরালো নাও মনে হতে পারে।’

বোধহয় চলের যাবার আগে একটা যুৎসই যুক্তি দাঁড় করাতে চায় কুলসুম। হয়তো মায়ে-মেয়েতে মিলে এই সিদ্ধান্তই হয়েছে। কুলসুম আবার নিজেই বলা শুরু করে, ‘রওশন গুছিয়ে গাছিয়ে নিলে, ওর সঙ্গেই থাকা যেত।’

শাহানশা এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার কোনো ক্ষিপ্ত অভিমান ওকে মরিয়া করে তোলে।

বলে, ‘আমার এখানে থেকে অপমানিত বোধ করছেন?’

শান্তকণ্ঠে মৃদু হেসে বলে কুলসুম, ‘মান অপমানের প্রশ্ন নয়। তবু সব কথা ভাবতে হয়।’

শাহানশা উঠে দাঁড়ায়।

কুলসুম বলে, ‘বসুন এক মিনিট। আপনাকে একটা কথা বলব।’ কী কথা থাকতে পারে কুলসুমের। আশায় জ্বলজ্বল হয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে শাহানশা।

‘কী কথা?’

কৌতুকের সুরে বলে, ‘একটা কথা ভাবছি ক’দিন ধরে। সত্যিকার কোনো সম্পর্ক দাঁড় করালে কেমন হয়?’

কী বলতে চায় কুলসুম। কীরকম কাল্পনিক সম্পর্ক!

কিন্তু তাকে ভাবনার সময় না দিয়েই বলে, ‘আচ্ছা আমাকে বোন বলে গ্রহণ করতে আপত্তি আছে, আপনার?’

শাহানশা জবাব দেয়, ‘জানি না।’

কুলসুম আবার বলে, ‘তাহলে এখানে থাকাটা অসহ্য মনে হবে না। ভ্রাতৃত্বের অধিকারটা যদিও মনগড়া তবু তাতে একটা সান্ত¡না, কি বলেন?’

‘আপনার সান্ত¡না কি আর দশজনের সান্ত¡না হবে?’

‘হবে। আর যদি একান্তই না হয় আমার দুঃখ নেই। অন্তত আমি মনের কোথাও একটা নকল বিশ্বাসের ভরসা পেয়েছি ভাবব।’

শাহানশা বলে, ‘তাতে কি সব সমস্যার সমাধান হয়?’

‘আর কোনো সমস্যার কথা জানি না।’

‘পুরুষের চোখে মেয়েমানুষ নানা রূপে, নানা ছাঁদে ভূষিত হতে পারে। আপনি আমাকে কী চোখে দেখেছেন কে জানে। কিন্তু সে দৃষ্টিতে যদি লোভ থাকে, তবে সে লোভের প্রতিবিধান দরকার।’

কুলসুমের শেষের কথা কেমন শাসনের সুর।

‘আমাকে বদলাতে বলছেন?’ জিজ্ঞেস করে শাহানশা।

‘আপনাকে কিছু করতে বলছি না। কিছু করারও নেই। পরগাছা ধরে এনে বসানো যায়। কিন্তু পরগাছা, পরগাছাই। যেমন আমি, কিন্তু তার কাছে পুষ্পের বাসনা করা কেন?’

একটি মেয়ে আজ দর্পিত দম্ভে, তার মনের আনাচে-কানাচে ঘুরে যে ধুল জমেছে, সেগুলোই যেন আজ আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে।

শাহানশা বলে, ‘আপনি আমাকে চেনেন না।’

‘সে কথা শুধু আপনার বেলায় প্রযোজ্য নয়। সকলের বেলাতেই সাজে।’

শাহানশা ভাবে মনের গভীরে যদি সে ইচ্ছের একটি অঙ্কুর বপন করে থাকে, থাক না। তাকে শেকড় তুলে উপড়ে ফেলার কি অধিকার এই আপাত-দৃষ্টি সুন্দর, চতুর মেয়েটির?

অঙ্কুর থেকে চারা যদি না জন্মায়, কিংবা সে চারায় যদি পুষ্পের প্রতিশ্রুতিও না থাকে, না থাক। কিন্তু তা নিয়ে কুলসুমের মাথাব্যথা কেন।

তাদের দুজনের সম্পর্ক কী, কী হতে পারত, সে রহস্য কুয়াশা উন্মোচনের কোনো আগ্রহই তার ছিল না। কথায় ব্যবহারে ও আচরণে সে যদি অতিসংযমের পরিচয় দিয়ে থাকে, তাতে যদি কুলসুম বানু খুশি হয়ে তাকে নিষ্পাপ আত্মীয়তার আসনে সমাহিত করে তাতে আপত্তির কিছু নেই। আবার তেমনি যদি একটি কি দুটি উচ্ছল মুহূর্তে তার অসহিষ্ণু আবেগের কাতরোক্তি স্তম্ভিত করে কুলসুমকে, তাতেই কি। শাহানশার কোনো দায় নেই। সে কোনো কিছুর শুরু চায়নি। সুরাহা চায়নি।

সে জ্বলতে চেয়েছে মনের আগুনের উত্তাপে। সে উত্তাপের দাহ থেকে কেউ তাকে উদ্ধার করুক, চেয়েছে কখন? দরজা খুলে দাঁড়ায় শাহানশা। বুক ভরে নিশ্বাস নেয়। তার বলে, ‘আমি চলি।’

দশ

অন্ধকার রাতে সাইকেলখানা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। রাস্তায় লোকজন কম। আস্তে আস্তে বড় রাস্তা ধরে এগুতে থাকে। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ভাবনার জটিল সুতোগুলো বারবার তাকে বিপর্যস্ত করে। যাবার কোনো জায়গা নেই। শাহানশার কোনো বন্ধু নেই, আত্মীয় নেই। বুকের বাঁ ধারটা মোচড় দিয়ে ওঠে। মাঝে মাঝে এরকম হয়। কিন্তু তার এই ব্যথার কথা শুধু ডাক্তারকেই জানানো যায়। আর কাউকে না। আর কেউ নেই যে। সাইকেল মাটিতে রেখে জিরোয় একটা পার্কে।

মাঝে মাঝে দু’একটা রিকশা, স্কুটার ছুটে যায়। তাদের গতি দুর্বার। তাদের         গন্তব্যস্থল আছে। তার তো কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কোনো তাকিদ নেই।

হঠাৎ সে নির্মম হয়ে যেতে পারে না কেন। কেন পারে না, বুলডোজারের মতো সব গুঁড়িয়ে ভেঙে চুরমার করে, হঠাৎ সাহসের অপ্রতিরোধ্য দুর্গ হয়ে যেতে।

দূরে পাহাড়ের ওপর লাল রং-এর বাংলোতে বাতি নেবে। রাস্তার বাতিতে থোকা থোকা পোকা ভিড় করেছে।

এই ঠান্ডা ঘাসের বুকে গা এলিয়ে দিয়ে সে তার মূঢ়তাকে স্মরণ করে!

পাহাড়ের সেই লাল রং-এর বাংলোর মতো তার নিজের শান্ত নিবিড় ঘরে এমনি আজ বিশ্রামের অন্ধকার নেবে আসতে পারত। তার ভূষিত আত্মার শান্তির জন্যে একটি øিগ্ধ হাতের স্পর্শ দুর্লভ হতো না।

কিন্তু তা যে হলো না, তার জন্যে কার কাছে আজ কৈফিয়ৎ চাওয়া যায়।

কোথায় সে যেতে চেয়েছিল, আর কোথায় এসে থেমেছে।

তার জীবনদর্শনটাই কেমন ঠুনকো। একটি মেয়ের করুণ আর্তনাদ, যাকে সে চেনে না, যাকে সে দেখেনি তার হয়ে খামাখাই সে উত্তেজিত হয়েছিল একদিন। জেলও খেটেছে। মেয়ে-স্কুল আর অনাথ আশ্রম তৈরির পরিকল্পনাই তার হলো কেন। সে কি দানবীর হতে চেয়েছিল। তার জীবনী স্কুলের বইয়ে ছাপা হবে, সে আশায়?

কতক্ষণ এমন করে কাটে মনে নেই।

রাত হয়েছে অনেক। রাস্তায় কুয়াশা জমেছে। শুধু রাস্তায় নয়। আশেপাশে, সবখানে।

আরেকটা নতুন কন্ট্রাক্ট হাতে নেবে মনে করে বেরিয়েছিল বাড়ি থেকে। কিন্তু আজ এই প্রথম সে ক্লান্ত বোধ করছে। ক্লান্ত হয়ে গা এলিয়ে দিয়ে নিজের অক্ষমতার সুযোগে আকাশ কুসুম ভেবেছে। সাইকেলখানা তুলে নেয় শাহানশা। এখানাও যেন বয়েসের ভারে আর্তনাদ করে ওঠে। রেহাই চায়।

ঘরে ফিরে এসে হঠাৎ মনে হয় ক্ষিধে পেয়েছে।

পা টিপে টিপে ঢোকে। পাশের ঘরে কুলসুম। সেখানে নীল আলো জ্বলছে।

খুট্ করে দরজা খুলে যায়।

কুলসুম বেরিয়ে আসে। যেন এত রাতে তাকে দেখে অবাকই হয় খানিকটা।

‘কোথায় গিয়েছিলেন?’

যেন একটা যুৎসই মিথ্যেও খুঁজে পাওয়া ভার।

ইতস্তত করে বলে, ‘এমনি। একটু কাজ ছিল।’

‘খাননি?’

‘না। খাব না।’

দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না শাহানশা।

বলল, ‘একটু বসব, যদি কিছু না মনে করেন।’

কুলসুম দরজা খুলে বলে, ‘ভেতরে আসুন। বাইরে ঠান্ডা।’

শাড়ির আঁচল ঠিক করে নিয়ে জড়িয়ে বসে কুলসুম। আরেকটা চেয়ারে শাহানশা।

কুলসুম বলে, ‘আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে, না?’

কী করে জানল তার কষ্টের কথা।

প্রতিবাদ করে বলে, ‘না না। কোনো কষ্ট নেই তো।’

‘আমি সে কষ্টের কথা বলছি না। মনের কষ্ট।’

এ আবার কীরকম প্রশ্ন।

অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে শাহানশা তার মুখে দিকে। যেখানে নীল আলো অপূর্ব মায়াজালের সৃষ্টি করে।

কুলসুম বলে, ‘একটা সত্যি কথা বলুন তো?’

‘কী কথা।’

‘আপনি আমাকে বোনের দৃষ্টিতে দেখতে অভ্যস্থ নন, না?’

শাহানশা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না। বিনা চেষ্টাতেই যেন জবাব বেরিয়ে আসে, ‘না। করলে ওটা ভ-ামি হতো।’

‘তবে কী সম্পর্ক আপনার পছন্দ?’

পছন্দ-অপছন্দের কথা বলে লাভ নেই। কোনো সম্পর্ক যখন নেই, তখন সম্পর্কহীনতার দৈন্যই চলুক। কুলসুম মেয়েমানুষ। সে প্রলুব্ধকর। সেই প্রলুব্ধকর দৃষ্টিতেই তাকে দেখার, তাকে ভালোবাসার অধিকার, আর কিছু নয়। কল্পনাতেই এসব ভাবনা চিন্তার উদ্ভব, কল্পনাতেই তার লয় ঘটুক, তবু।

শাহানশা বলে, ‘সে কথার জবাব আপনার অজানা নেই।’

কুলসুম বলে, ‘আমিও তাই ভেবেছি। যাকগে এ নিয়ে আর কোনোদিন পীড়াপীড়ি করব না।’

‘সে আপনার ইচ্ছে।’

জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় কুলসুম। তারপর বলে, ‘আপনার সততা ভালো লাগছে। ইচ্ছে করলে তো মিথ্যে বলতে পারতেন। কিন্তু – কিন্তু একথাও সত্যি কিছু করবার নেই। কিছু হবার সম্ভাবনা নেই। রাগ করবেন না। আপনি আমার মৃত স্বামীর অন্তরঙ্গ বন্ধু।’

পরের কথাটা জুড়ে দেয় শাহানশা, ‘এবং লোভ তৃষ্ণা ক্ষুধার একটি সাধারণ মানুষ।’

‘হ্যাঁ। অস্বীকার করছি না সে কথাও।’

শাহানশা বলে, ‘এখন আপনি ঘুমোন। আমি চলি!’

কিন্তু সে ঘটনার মাস ছ’ পরেই টেলিগ্রাম এসে পৌঁছায় কুলসুম বানুর কাছে। প্রথমে ভয়ে ভয়ে খুলেছিল। তারপর সেখানা দেখে নিয়ে সুপ্রসন্ন হাসির রেখা ফুটে ওঠে। সেদিন বিকেলেই শাহানশাকে বলল, ‘কুয়েতের প্লেন কবে ছাড়বে খোঁজ নেবেন একটু?’

শাহানশা একবারও অকারণ ঔৎসুক্য দেখিয়ে বলেনি, হঠাৎ সে খবরে তার কাজ কী। বলেনি, চলে যাওয়া মনস্থ করেছে নাকি।

বরং বলল, ‘কাল খবর নিয়ে জানাব।’

শাহানশা অন্ধকার বারান্দায় একটা চেয়ার নিয়ে বসে। জুতোর ফিতে ঢিলে করে। শার্টের দুটো বোতাম খুলে দেয়। পেছনে একটা ছায়া এসে দাঁড়ায়।

মাথা না ফিরিয়েও বলতে পারে এ ছায়া-ফেলা মানুষটি কে। কুলসুম বলল, ‘একবারও জিজ্ঞেস করলেন না, কেন যাচ্ছি।’

শাহানশা নিরাসক্ত।

বলে, ‘জিজ্ঞেস করে কী লাভ। এমন কোনো বন্ধন নেই, কোনোকালে ছিল না যে আপনাকে বেঁধে রাখব।’

‘তবু কৌতূহল হয় না?’

‘হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে কৌতূহল অনধিকার চর্চা!’

কুলসুম নিজেই বলল, ‘কুয়েতের তেল-চাকুরের মন বদলেছে। সে আকুতি জানিয়ে পরপর দু’খানা চিঠি লিখেছিল। আজকে টেলিগ্রাম এলো।’

শাহানশা বলে, ‘আমি জানতাম।’

‘কী জানতেন?’

‘আপনি একদিন চলে যাবেন।’

‘সেজন্য দুঃখ হচ্ছে?’

‘না। দুঃখের কী আছে।’

‘আমি ভেবেছিলাম আপনি বিচলিত হয়ে পড়বেন।’

‘আমিও ভেবেছিলাম। কিন্তু কিছুই হলো না।’

তারপর একটু থেমে বলে, ‘আপনার এই আসা যাওয়াটা আমার কাছে অর্থহীন। স্যানাটরিয়ামে রোগমুক্তির অপেক্ষায় থেকে স্বাস্থ্যেদ্ধারের পর একদিন যেমন করে চলে যেতে হয়, আপনিও তেমনি যাচ্ছেন। দুঃখ হবে কেন।’

‘আপনি কি রোগমুক্তি চাননি?’

‘আমার কথা ছেড়ে দিন। কেউ আমাকে মুহূর্তের জন্য প্রলুব্ধ করতে চেয়েছিল। তাই আপনাকে এনে দিয়েছিল ক’দিনের দুর্লভ অতিথি করে। সেই আবার নিয়ে যাচ্ছে।’

‘কার কথা বলছেন?’

‘অদৃশ্য নিয়তির।’

শাহানশার পরের কথাটুকুতে কেমন আহত মনের আমেজ।

কুলসুম আর দাঁড়ায় না।

বলে, ‘যাই কাল আমাকে খুব ভোরে উঠে জিনিসপত্র গোছাতে হবে।’

শাহানশা বসেছিল। কত রাত মনে নেই। আকাশে মিটিমিটি তারা জ্বলছে। এক রাজ্যি মেঘ ভয়ে জড়সড় হয়ে পশ্চিমে ধাওয়া করছে। কুয়াশার জাল ছড়িয়ে পড়ছে।

আর তখুনি অর্থহীন কান্নার মতো হু-হু আওয়াজ তুলে ঝাউগাছটা হাওয়ায় নড়ে ওঠে।

এগারো

পরদিন সকালে কেউ দেখেনি শাহানশাকে। শুধু একটা ছোট্ট চিরকুট রাখা ছিল কুলসুম বানুর নামে। তাতে লেখা : আপনার প্লেনের সময় জেনে দিতে পারিনি বলে দুঃখিত। খবর আপনি ঠিকই জেনে নিতে পারবেন সে ভরসা আছে। আপনাকে সেদিন এয়ারপোর্টে তুলে আনতে গিয়েছিলাম আমি। এবার অন্য কেউ ছাড়তে যাক, এটাই আমার ইচ্ছে। কুশল কামনা করি।

কুলসুম বানু নিজেও অবাক হয়েছিল। এমনটি হবে ভাবেনি। একি তার কোনো আহত অভিমানের প্রতিক্রিয়া। নিস্পৃহ অনুভূতিহীন মানুষের বেলায় বুঝি এমনই হয়। একের পর এক আঘাত, অপমান তারা মুখ বুজে সহ্য করে। অথচ সামান্য একটু কটাক্ষের জ্বালা তারা সইতে পারে না। এমন কিছু কি ঘটেছিল শাহানশার ক্ষেত্রেও?

ডেকে ডেকে অনেককেই জিজ্ঞেস করেছে কুলসুম বানু সে কথা।

শাহানশার আচরণে কি অস্বাভাবিক কিছু দেখা দিয়েছিল?

না।

সে কি তার গোপন অভিসন্ধির কথা বলে গিয়েছিল কাউকে?

না।

এক একবার মনে হয় কুলসুম বানুর, এ-সবই তার দুর্জ্ঞেয় কোনো খেলা। একটার পর একটা খেলায় নিজে হেরে গিয়ে কি বিচিত্র প্রতিশোধ নিতে পারে শাহানশা।

যাবার আগে যদি মেকি কৃতজ্ঞতার ভান করেও যেত, স্বস্তি পেত কুলসুম বানু। উচ্ছাসে ভেঙে পড়ত না। বরং পাল্টা তাকে শুনিয়ে বলতে পারত, শাহানশা তোমার যাওয়াই ভালো। কারণ সময় পরিবেশ, কুলসুম বানু কিছুই তোমার জন্যে অপেক্ষা করে নেই।

অবশ্য নিজের তরফ থেকে কোনো অনুযোগ নেই। কোনো অনুশোচনা নেই।

অনেক ভালো ভালো হোটেলে থেকেছে কুলসুম বানু। শাহানশার আশ্রয় সে তুলনায় অনেক নিকৃষ্ট। দুটো দিন তাকে ঠাঁই দিয়েছিল বলে এমন কিছু ঋণী করেনি তাকে শাহানশা। দেখেছে, অনেক হোটেলেও বাড়তি একটা দুটো দিনের জন্যে আলাদা বিল হয় না। বোধহয় ক্লায়েন্ট আবার আসবে সে আশাতেই। আর শাহানশা তো তাকে হোটেলের দু’দিনের ঠিকে ক্লায়েন্ট হিসেবে কামনা করেনি, বোধহয় চেয়েছিল চিরদিনের ক্লায়েন্ট করে পেতে। বাড়ির চাকরকে জিজ্ঞেস করেছিল কুলসুম বানু, ‘আমরা চলে গেলে এ বাড়িতে কে থাকবে?’

তাও সে জানে না। শাহানশা বলে যায়নি। এ মাসের পরই তাদের ছুটি। বোধহয় ভিটেমাটি বিক্রি করেই গেছে শাহানশা। কাল নাকি কারা বাড়ি দেখতে এসেছিল।

কিন্তু যেদিন যেতে চেয়েছিল, সেদিন যাওয়া হয়নি কুলসুম বানুর।

মেয়ে রওশন নিজেই এসেছিল, সকাল করে।

বলেছিল, ‘মা তোমার এখন যাওয়া হতে পারে না।’

‘কেন?’

ব্যাগ থেকে একটা চিঠি বার করে পড়তে দিয়েছিল রওশন।

পুলকিত হয়ে ওঠে কুলসুম, ‘সত্যি। আমাকে বলিসনি কেন?’

সলজ্জ-দৃষ্টি রওশন আঁচলে মুখ ঢাকে।

বলে, ‘আমি কি নিজেই জানতাম।’

অবাক লাগে কুলসুম বানুর। অপয়া শাহানশাই যেন ছিল সবকিছুর প্রতিবন্ধক। আজ শাহানশা নেই। রওশন জানাতে এসেছে তার শুভলগ্নের খবর।

কুয়েতের তেল-চাকুরে দিন গুনছে তার জন্যে। ইঞ্জিনিয়ার আসছে মেয়ের জন্য।

এ যেন রূপকথাতেই সম্ভব।

জীবনে একটি ব্রিজের ব্যর্থতা যে কিছুই নয়, জানিয়েছে সে কথা রওশনকে। বহু ব্রিজ বানিয়েছে সে। সেদিন মনের ক্ষোভে চলে গিয়েছিল। কিন্তু সে উত্তাপ এখন নেই। ছেলেমানুষী নেই। সে ঘর বাঁধবে।

আরো লিখেছে চিঠিতে : মজা নদীর ওপর যে স্তম্ভ তৈরি হলো না, ওটা শাহানশার মতোই একটা ব্যর্থতা। যা কোনোদিন টিকবে না। কোনোদিন টেকবার নয়।

ইঞ্জিনিয়ার যেদিন ফিরে এলো, সে যেন আরেক মানুষ। সেদিন সেই শান্ত উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিটি আর নেই। চপল কথার তুড়ি ফোটে না আগের মতো। অনেক বেশি গম্ভীর, অনেক বেশি সচেতন।

রওশন তাকে দেখে বলেছিল, ‘সত্যি, তোমাকে দেখে কিন্তু চিনতেই পারিনি।’

ইঞ্জিনিয়ার শুধু মৃদু হাসল।

তাকে হোটেলে নাবিয়ে চলে যাচ্ছিল রওশন।

ইঞ্জিনিয়ার বলল, ‘একটু বসো।’

রওশন আপত্তি করেনি। হোটেলের লাউঞ্জে বসে তার পুরো কাহিনীটাই শোনাল ইঞ্জিনিয়ার।

বলল, সেদিনের ছেলেমানুষী মনে পড়লে হাসি পায়। ভেবেছিল এমনি করে এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে গিয়ে ভিড়বে। কিন্তু একসময় ক্লান্তি আসে। বিশ্বাসের শেকল ভেঙে যেতে চায়। তাই এখন তার দরকার একটি পরমাশ্রয়ের, যা শুধু রওশনই দিতে পারে।

একবার একটা ড্যাম তৈরির কাজ নিয়েছিল। ভয়ঙ্কর খরস্রোতা নদী। বড় বড় ট্রাক্টর আর বুলডোজার আসে। পাহাড়ের শিখর চূড়ায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখত অতল গভীরে কল্কল্ বেগে ছুটে চলেছে একটা ক্ষিপ্ত নদী। একবার পড়লে রক্ষে নেই।

একদিন জরিপ করার কাজে উঠেছিল ওই পাহাড়ে। না, পা পিছলে পড়েনি। পিছলে পড়েছিল আরেকজন। তাদেরই এক ওভারসিয়ার। তাকেই তুলতে গিয়েছিল।

কিন্তু কোথায় সে। আর সেসঙ্গে সেখানেই ইঞ্জিনিয়ারের জীবনের সমাধি রচিত হতে পারত।

কিন্তু বরাতের জোরেই বেঁচে গিয়েছিল। অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল তিন দিন।

হাসপাতালে নার্স ডাক্তাররা ঘিরে থেকেছে তাকে।

একজন তাকে রোজ দেখতে আসত। তার ওপরওয়ালা, ফ্রেডারিক। এ প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা।

ইঞ্জিনিয়ার বলেছিল, ‘তুমি আমার বড্ড যতœ নাও। আমার দেখাশোনা কর। কি করে এর প্রতিদান দিই। দেশে ফিরে গিয়ে আমি তোমাকে চিঠি দেবো।’

অবাক করে দেয় ওকে ফ্রেডারিক, ‘আমি তো এখানে থাকব না।’

‘তবে কোথায় যাবে?’

‘বাড়ি চলে যাবো।’

‘সে কি এত তাড়াতাড়ি। তোমার কন্ট্রাক্ট তো ফুরোয়নি।’

‘না ফুরোক। অন্য কাউকে বসিয়ে দিয়ে যাবো! কাজের ক্ষতি হবে না।’

তারপর একটু থেমে আবার বলে ফ্রেডারিক, ‘যে পাহাড় থেকে ওভারসিয়ার পড়ে গিয়েছিল পা পিছলে, আমি কাল ওটার ওপরে উঠেছিলাম।’

‘তারপর।’

‘জানো এত যে ভয়ঙ্কর নদী তা যেন চোখেই পড়ল না। চোখে পড়ল, দূরে ছোট্ট একটি ভাঙা কুটির। আধো আধো চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছিল। সে আলোতেই দেখলাম সে ঘরের বৌ ছেলেমেয়েদের নিয়ে জড় হয়ে বসে।’

‘তাই বুঝি আপনার নিজের বাড়ির কথা মনে হয়।’

ইঞ্জিনিয়ারের প্রশ্নে ফ্রেডারিক অবাক হয়, ‘কী করে বুঝলেন?’

‘না, অনুমান করলাম। বাড়িতে আপনার বৌ বোধহয় অপেক্ষা করে আছে।’

ফ্রেডারিক বলে, ‘মানুষের মন আর জীবন কোনোটারই ভরসা নেই। তাই আমাকে কালই ছুটতে হবে।’

ইঞ্জিনিয়ার বলে, ‘নেই কেন?’

‘না না, আপনি ভুল বুঝছেন। আমার স্ত্রীর প্রতি কটাক্ষ নয়। আমার নিজের ওপরই কোনো বিশ্বাস নেই। এমন ঠুনকো মানুষের মন।’

ফ্রেডারিক উঠে পড়ে। বলে, ‘আর হয়তো দেখা হবে না। তবে আপনার কথা আমি ভুলব না।’

ফ্রেডারিকের বাড়ি যাওয়া হয়নি। পরদিন সকালে বুলডোজারে চাপা পড়ে মারা গিয়েছিল সে।

সে দুঃখ গভীর হয়ে বেজেছিল সন্দেহ নেই। কিন্তু তারচেয়েও বড় সত্য সেদিন উদ্ভাসিত হলো। ফ্রেডারিকের কথাই ঠিক : সময় থাকতে যাও। সময় যখন ফুরিয়ে যাবে কী নিয়ে থাকবে সেদিন।

রওশন কটাক্ষ করে বলল, ‘তাহলে বলো আমার জন্য আসোনি। তোমার বাসনার আয়ুক্ষয়ের ভয়ই তোমাকে টেনে এনেছে।’

‘না না, তা নয়। আসলে আমার মিথ্যে দম্ভটাই খর্ব হয়েছে। একদিন সাফল্যের চকমকি পাথরে একটু প্রতিভার স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে তোমার কাছে বাহবা পেতে ইচ্ছে করত। আজ আর তা করে না। তখন পৌরুষ তোমার কাছে মাথা তুলতে চেয়েছিল। আজ পৌরুষ নিয়ে নয়, পুরুষ হয়ে তোমার কাছে এসেছি। এখন জেনেছি তোমাকে আকৃষ্ট করার জন্য রং-এর চটক দেখানোর দরকার নেই।’

রওশন বলে, ‘কোনোকালেই ছিল না।’

ইঞ্জিনিয়ার বলল, ‘তাহলে বাধা তখন দাওনি কেন?’

‘কী জানি। এক একজন বোধহয় ওরকমই। তুমি যেমন দুটো পিলার বসিয়েও শেষেরটা পারোনি, আমিও তেমনি দু’পা এগিয়ে পরের পা আর এগুতে পারিনি।’

‘আমাকে নিয়ে ভয় ছিল?’

‘না, ভয় ছিল না। বিশ্বাস ছিল।’

‘সে বিশ্বাস সফল নাও হতে পারত।’

‘তা পারত। কিন্তু জানতাম দম্ভের চেয়ে বিশ্বাসের জোরটাই বেশি। ওটাই জেতে শেষ পর্যন্ত।

অনেক রাত হয়ে এসেছিল।

রওশন বলল, ‘এখন চলি। কাল মাকে পৌঁছে দিতে হবে।’

ইঞ্জিনিয়ার অবাক হয়, ‘তিনি চলে যাচ্ছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘আমি এলাম, অথচ –

‘তোমার আসার সঙ্গে এ যাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।’

‘তবু তোমার মন খারাপ করবে না?’

রওশন বলে, ‘না। কক্ষচ্যুত হয়ে যেমন তোমার ভালো লাগেনি, তাঁরও লাগবে না। তাঁরও একটা জীবন আছে।’

পরের কথাগুলো তার কেমন উদ্ভ্রান্তের মতো শোনায়, ‘হাত বাড়িয়ে সবসময় দূরের তারা মুঠো মুঠো করে চাইলেই হয় না। শুধু এটা জানলেই চলে, আমার মা, আমারই মা। দূরে থাকলেও।’ আশ্চর্য হয় ইঞ্জিনিয়ার। এ ক’বছরে এত কথা শিখল কেমন করে রওশন। ঠিকই বলেছে রওশন আকাক্সক্ষাই মানুষকে ছোটায়। আবার আকাক্সক্ষাই তাকে তিলে তিলে দগ্ধ করে। রওশন ওঠার উপক্রম করে।

এবার ভাড়া ট্যাক্সিতে নয়। ইঞ্জিনিয়ারের নতুন ঝকঝকে তকতকে গাড়িতে মেয়ের পাশে বসে এয়ারপোর্টে এসেছে কুলসুম।

মাঝখানের ক’দিনের এই শূন্যতা নিয়ে এতটুকু অনুযোগ হয়নি। ভালোই হয়েছে। জীবনে এক একটা মুহূর্ত আসে যখন মনকে বিশ্রাম দিতে হয়। বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত করতে হয়। তারপর একদিন সে যন্ত্রণার উপশম হলে ভিতটা গড়ে ওঠে নতুন করে। আর কোনো ক্লেদাক্ত পরিবেশ থাকে না। গ্লানিমুক্ত হয় জীবন। প্লেনে ওঠার সময় কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে একদিক ওদিক তাকিয়ে দেখেছে কুলসুম। কাকে খুঁজছিল?

ভুল করে যদি সে আসে। তার পরাস্ত প্রেমের যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে, সে আশাই করেছিল কুলসুম।

রওশন বলল, ‘মা তোমার প্লেনের সময় হয়ে আসছে।’

ইঞ্জিনিয়ার বলে, ‘আপনার ওখান একবার যাবো আমরা শীতের ছুটিতে।’

আনমনা হয়ে পড়েছিল কুলসুম।

বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই যাবে।’

কিন্তু কুলসুম কেমন উদাস। তার দৃষ্টিটাই আজ কেমন এলোমেলো। হু-হু করে কান্না এখুনি যেন তার কোনো দুর্বল অনুভূতির কথা সরবে ঘোষণা করে বসবে।

কুলসুম মুখ ঘুরিয়ে নেয়।

রওশন বলে, ‘কান্নার কী আছে। আমরা তো আসছিই।’

কী করে বলবে কুলসুম, অন্তত সেদিনের সে কান্না রওশনের জন্যে নয়, ইঞ্জিনিয়ারের জন্যে নয়, তার বিগত স্বামীর জন্যেও নয়।

বারো

শাহানশা বোধহয় বুঝে নিয়েছে জীবনের ধারাটাই এমন। কারও জন্যে সে ছিল মহীরুহ। কারও জন্যে পান্থশালা। ক্লান্তির একঘেয়েমিতে উত্ত্যক্ত হয়ে এসেছে তার কাছে অতর্কিত অতিথির দল। তার ছায়ায় বিশ্রাম নিয়েছে। তার আশ্রয়ে নিরাপদ হয়েছে। তারপর সে ক্লান্তির ঘোর কেটেছে যখন তাদের, সময় হয়েছে যাবার। বিদায়ের লগ্নে যদি কেউ কাতর হয়ে থাকে, সেটা মুহূর্তের দুর্বলতা। যদি কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে থাকে, সেটা নিছক করুণা। কিন্তু শাহানশার জন্যে তো এ দুনিয়ায় কোনো পান্থশালা ছিল না। তবু সে একদিন ঘর ছেড়ে বেরুল কেন। জীবনের দুর্লভ ক’টি মুহূর্তের স্মৃতি কি তাকে মর্মাহত করেছিল।

সে কথার জবাব কারও কাছে পায়নি।

শাহানশার কথা কেউ জানে না। বার লাইব্রেরির রসালো আলাপেও তার নামোল্লেখ হয় না। সে অতীত। সে বর্তমান যুগের প্রয়োজনের খাতায় বাজে লোকশান।

তবু ভেবেছি লোকটা কি নিজের দুঃখেই গুমরে গুমরে মরবে। তার জন্যে সামান্য একটু সহানুভূতি জানাবার কেউ নেই।

আমি শাহানশার ঘনিষ্ঠ বন্ধু নই। নিছক পরিচয়ের একটি ক্ষীণ সূত্র।

তবু মনে হয়েছে ও লোকটাকে একদিন শুধাই, অনুনয় করে বলি : শাহানশা এসো। পাখাটা ছেড়ে দি। আরাম কেদারা বিছিয়ে দিয়ে বলি, বিশ্রাম করো। নতুন পাট করা তোয়ালে এনে দিয়ে বলি, মুখ ধুয়ে নাও। শাহানশা একদিনের জন্য আয়েস করো। সকাল করে উঠে না। ত্রস্ত হয়ে ছুটো না। শাহানশা থামো। দুঃখ করো না। শাহানশা তোমাকে একটা ডাইরি দিই। তাতে তুমি যা খুশি লেখো। যে কথা বলতে চেয়েছ অথচ পারনি। অথবা এমন কথাই লেখো যার কোনো মানে হয় না। তবু তোমার মনের মেঘ বৃষ্টি হয়ে নাবুক। তোমার ওই বেদনাহত মুখ দেখলে আমার মায়া হয়। তোমার মর্যাদা ক্ষুণœ করব না। তুমি দু’দিন থাকবে বলে দু’ঘণ্টা থেকো। তারপর চলে যেও বাতি বুজিয়ে, পা টিপে টিপে।

আমি খুশি হবো।

আমি অনেককে দেখেছি শাহানশা। মিস মার্জোরিকে, টম হ্যারিসকে, মাশুককে, ইঞ্জিনিয়ারকে আমার ট্রাভেল এজেন্সির হাজারো ক্লায়েন্টকে। কিন্তু তারা কেউ তোমার মতো নয়। তারা তাদের মতো। তুমি কারও মতোই নও।

কিন্তু জানি এসবই আমার ভাবনা। আকাশ কুসুম কল্পনা। এমনও হতে পারে, আমি তোমাকে ভালো করে চিনি না, তাই আমার এই অর্থহীন বিলাপ।

শাহানশার গড়া অরফ্যানেজে গিয়েছিলাম একদিন। বড় গেট দিয়ে ঢুকে একদল ছেলেমেয়ে চোখে পড়ে। তারা কপাটি খেলছে হাসির হল্লা তুলছে।

আজ শাহানশা এখানে এলে কেমন লাগত তার।

চশমা-পরা এক ভদ্রমহিলা আমাকে দেখে বলে, ‘কাকে চান?’

বললাম, ‘সুপারিনটেনডেন্ট আছেন?’

‘হ্যাঁ, ভেতরে আসুন।’

মেয়েটির পেছন পেছন চলি।

সুপারিনটেনডেন্টের কামরায় ঢুকি।

বয়স্ক ভদ্রলোক। রাশভারি চোখ তুলল না। এ কাগজ সে কাগজ দেখল। ফাইলের কিছু কাগজ সই করল।

তারপর সেগুলো গুছিয়ে রেখে বলল, ‘সরি, বলুন কী করতে পারি।’

বললাম, ‘বলতে পারেন শাহানশা কোথায় থাকেন?’

ভদ্রলোক যেন বিরক্তই হয়।

‘সে খবর আমরা জানব কী করে।’

‘তারই হাতে গড়া এ প্রতিষ্ঠান! তাই ভেবেছিলাম খোঁজখবর পাব।’

সুপারিনটেনডেন্ট তার রুপালি ফ্রেমের চশমাখানা চোখে তুলে বলে, ‘হেয়ার স্কুলে কেউ ডেভিড হেয়ারের খোঁজ নিতে আসে না।’

বললাম, ‘একদিন  হয়তো আসত। কিন্তু এখন আর আসে না, তার কারণ ডেভিড হেয়ার বেঁচে নেই।’

‘শাহানশাই বেঁচে আছেন কিনা তাই জানব কী করে?’

ভদ্রলোক বোধহয় বুঝতে পারে, অহেতুক রূঢ়তায় কোনো ফল হবে না।

তাই এবার একটু শান্ত কণ্ঠে বলে, ‘শাহানশা এখন এ প্রতিষ্ঠানের কেউ না। কর্তৃত্ব ট্রাস্টির হাতে।’

তারপর আবার একটু থেমে বলে, ‘আর তাছাড়া ভদ্রলোকের যা সুনাম, তাতে এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওর নাম জড়িত না থাকাই ভালো।’

বললাম, ‘শাহানশার আত্মত্যাগটা কি কিছুই না।’

সুপারিনটেনডেন্টের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে। বলে, ‘দেখুন আমার কাজ অরফ্যানেজ দেখাশোনা করা, শাহানশার বন্দনা করা নয়।’

কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে পড়ি। বোধহয় মেয়ে-স্কুলে গেলে খবরটা পাওয়া যেত।

কিন্তু যেতে যেতেও যাইনি। কে জানে সেখানেও শুনতে হবে ওই একই কথা।

শাহানশাকে যথেষ্ট অপমান করেছি। আর নয়।

কিন্তু মান অপমানের আমি কী করব।

ভেবেছিলাম শাহানশা স্মৃতির অগোচরে বিলুপ্ত হয়েছে। কোনোদিনই জানব না তার কথা।

কিন্তু মানুষ ভাবে এক। হয় অন্য।

ঘটনাটা আমার মনে আছে।

শাহানশা যে মেয়ে-স্কুলের জন্মদাতা তারই বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী সভায় আমার ডাক পড়েছিল।

যাবো ইচ্ছে ছিল না। নীলার পীড়াপীড়িতেই রাজি হয়েছিলাম। উদ্যোক্তারা সুন্দর করে সাজিয়েছে স্কুল। লাল নীল আলোয় সাজিয়েছে গেট।

গেটে কার্ড দেখিয়ে ঢুকেছিলাম। একটু পেছনের সারিতে বসেছি। সামনে ঘেরা খানিকটা জায়গা। লাল সালুতে মোড়া। বহুবর্ণ চাদরে ঢাকা টেবিল। দু’পাশে সযতেœ দুটো ফুলের তোড়া সাজানো। খান দু’তিনেক চেয়ার। একটা উঁচুমতো। বোধহয় প্রধান অতিথির জন্যে।

সন্দেহ নেই, প্রবল হর্ষধ্বনির মধ্যে, বহু মাল্যভূষিত হয়ে যিনি মঞ্চে গিয়ে উঠলেন প্রধান অতিথি তিনিই। ভালো করে দেখতে পাইনি ভিড়ে। তবু বারবার উঁকি দিয়ে দেখছিলাম। একটা ক্ষীণ আশার আলোকে দীপ্ত হয়ে উঠি। কিন্তু না। যাকে ভেবেছিলাম, সে নয়। অন্য কেউ।

প্রধান অতিথির আসন যিনি আলো করে, বোঝা গেল না কী তাঁর যোগ্যতা। কী তাঁর গুণ-গরিমা। ভিড়ের ফাঁকে তাঁর সহাস্য বদন মুখটি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। ডান হাতের প্রায় পাঁচটা আঙুল জুড়েই আংটি! হঠাৎ আলোয় চিকচিক করে ওঠে সেগুলো। কেমন চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।

সেক্রেটারি তার রিপোর্ট পড়ল। স্কুলের পূর্বাপর ইতিহাস। কেমন করে দশ বছরে বোর্ড অব ট্রাস্টির চেষ্টায় বড় হয়েছে স্কুল। ভালো রেজাল্ট করে মেয়েরা মাইনর আর ম্যাট্রিক পরীক্ষায় বরাবর বৃত্তি পেয়ে আসছে, তার লম্বা ফিরিস্তি।

না, যতটা ভেবেছিলাম, ততটা অনুদার মনে হলো না উদ্যোক্তাদের। এক জায়গায় উল্লেখ ছিল শাহানশার। কথাগুলো এখনও আমার কানে ভাসছে : এ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা হয়তো বেঁচে নেই। তবু আমরা তাঁকে সকৃতজ্ঞ ভাবে স্মরণ করছি।

ব্যস ওইটুকুই।

তারপরে প্রধান অতিথির দিকে তাকিয়ে ভাবে গদ্গদ্ হয়ে আবার তার বক্তব্য শুরু করে সেক্রেটারি। বলে, তবে এই স্কুলের পেছনে যাঁর অবদান, নিষ্ঠা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার তুলনা নেই, তিনি আজ আমাদের সামনে উপস্থিত। এককথায় তিনিই এই স্কুলের সত্যিকার প্রাণ প্রতিষ্ঠাতা। নারীশিক্ষার প্রতি তাঁর অসীম আগ্রহের কথা আপনাদের অজানা নেই –

আরো বোধহয় কী বলেছিল মনে নেই।

যেন নিখুঁত মহড়া দেওয়া নাটক দেখছি। রঙ্গমঞ্চে যখন এক দৃশ্যের শেষ, অন্য দৃশ্যের সূচনা।

সেক্রেটারির ইঙ্গিতে বোর্ড অব ট্রাস্টির কে একজন এগিয়ে এসে প্রস্তাব করে, আমরা হাজী এয়াকুবকে আমাদের মধ্যে পেয়ে ধন্য। এই পরোপকারী, সমাজসেবক, তেজপ্রাণ মনিষীর প্রতি যোগ্য সম্মান দেখাব, সে সাধ্য আমাদের নেই। তাই আপনাদের সকলের ইচ্ছানুসারে, আপনাদেরই প্রস্তাবানুসারে বোর্ড অব ট্রাস্টি হাজী এয়াকুবের নামানুসারে এই স্কুলের নামকরণ স্থির করেছেন।

তারপর বোধহয় আবার মাল্যদান গোছীয় কিছু একটা হয়েছে। নাটকের শেষ দৃশ্যে নায়কের বক্তব্য থাকে। এক্ষেত্রেও ছিল।

হাজী এয়াকুব উঠে দাঁড়ান। তার ‘পার্ট’ মুখস্থ না থাকলেও অসুবিধে ছিল না। তুমুল করতালির মধ্যে প্রধান অতিথির কথা কারও কানে যায়নি।

একটা নীরব প্রতিবাদের আক্রোশ ফেটে বেরুতে চাইল। উদ্যোক্তারা কি এভাবেই শাহানশার কৃতকর্মের প্রতিদান দিচ্ছে। এরা কি সবাই জন্মান্ধ। যারা হাত পেতে দাঁড়িয়েছিল শাহানশার কাছে একদিন, তারাও আজ নীরব কেন? না, তারাও আমার মতো হতবুদ্ধি, যে তাদেরও প্রতিবাদের ভাষা নেই।

ঠিক তখুনি শোনা গেল হৈ-চৈ।

গেটের সামনে প্রায় মারামারি কা-। কে একজন নাকি ঢুকতে চেয়েছিল। উদ্যোক্তারা বাধা দেয়। তার কাছে কার্ড নেই। জিজ্ঞেস করেও তার পরিচয় পাওয়া যায়নি। আগন্তুক কথা বলেনি।

আমার পার্শ্ববতী এক মেয়ে গার্জেন মন্তব্য করে ওঠে, ‘এমন লোককে পুলিশে দেওয়া উচিৎ।’

নিছক ঔৎসুক্যবশতই গলা বাড়িয়ে দেখি। বিস্মিত হই। এ কি! তার আজ কী হলো। জীবনের এত চূড়ান্ত অপমান কি তার জন্যে যথেষ্ট ছিল না। তবু যেচে যেচে এলো কেন।

শাহানশা কি বীরদর্পে উদ্যোক্তাদের দু’হাতে সরিয়ে দিয়ে বলতে পারত না, সে কে।

বলতে পারত না, এ স্কুলের প্রতিটি ইট কাঠ ধুলো কণা তারই চেষ্টার ফল।

আমাকে উঠতে দেখে নীলা বলে, ‘কোথায় যাচ্ছ?’

বললাম, ‘দেখে আসি।’

নীলা নিরস্ত করে, ‘না না। থাক। ওসবের মধ্যে গিয়ে কাজ নেই।’ কিন্তু বেরিয়ে গিয়ে পাইনি কাউকে। উদ্যোক্তাদের একজন বলল, ‘নিশ্চয়ই বদ্ মতলব ছিল। এত করে নাম জিজ্ঞেস করলাম, নাম বলল না।’

আরেকজন বলল, ‘আপনারা বড় সহজে ছেড়ে দিলেন। হাজতে দিলেন না কেন।’

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে একজন বলল, ‘কী সাহস ভেবে দেখুন!’

বললাম, ‘লোকটাকে চেনেন?’

সবাই অবাক আমার কথা শুনে।

‘আপনি চেনেন নাকি?’

বললাম, ‘হ্যাঁ’

বেশ ছোটখাট একটা কৌতূহলী ভিড় জমেছে বাইরে।

কে যেন বলে ওঠে, ‘আমি কিন্তু লোকটাকে আরো দু’একবার দেখেছি। স্কুলের আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে।’

‘বলেন কি’, আতঙ্কিত স্বর শোনা যায় আরেকজনের।

‘এদের মতলব সম্পর্কে খুব হুঁশিয়ার হওয়া দরকার।’

সঙ্গে সঙ্গে কে যেন এক গপ্প ফেঁদে বসে : ‘জানেন খবরের কাগজে পড়লাম মুলতানে এমনি এক লোক হাবার মতো ঘুরে বেড়াত মেয়ে-স্কুলের সামনে।  দেখলে মনে মতো সাত চড়েও কথা বলতে জানেন না। তারপর একদিন সবাই যখন ক্লাসে, একটি মেয়েকে কাছে এনে ডেকে কি খেতে দিলো।’

বোধহয় তর সই ছিল না। শ্রোতাদের একজন বলে ওঠে, ‘ঘুমের ওষুধ ছিল বোধহয়?’

কাহিনীকার ব্যাপারটা বেশ জমিয়ে এনেছে, ‘তা আর বলতে। আসল ব্যাপার কি জানেন মেয়েটার গলায় চেন ছিল। চেনটা তো গেলই, কিন্তু যে ভাবে হ্যাঁচকা টান দিয়ে পালাচ্ছিল, গলায় ফাঁস আটকে মরার যোগাড় আর কি।’

কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল এক ভদ্রমহিলা। বোধহয় স্কুলের টিচার। সেও এবার আলোচনায় যোগ দেয়। বলে, ‘আমি তো এতসব জানতাম না। আজকাল ভালোমন্দ চেনার উপায় নেই। কার যে কী মতলব।’

তারই কোনো সহকর্মিনী, হুঁশিয়ার করে বলে, ‘রুবী আপা তোমারও কিন্তু সাবধান হওয়া উচিত। তুমি তো দেখছি আবার সেই ব্রেসলেটটা পরে এসেছ।’

এরই মধ্যে আরেকজন বলে ওঠে, ‘আমার মনে হয় এরা একটা গ্যাং। একসঙ্গে কাজ করে। স্কুলের দেয়ালটা উঁচু করে দিন, আর কড়া দারোয়ান রাখুন।’

একটি আবদারী মেয়ে বেণী দোলাতে দোলাতে বলে, ‘আমি কিন্তু লোকটাকে আরো একদিন দেখেছি। আমাকে হাত নেড়ে ডেকেছিল।’

ভিড় কমে এসেছিল কিছুটা। মেয়েদের বিচিত্রানুষ্ঠান শুরু হয়েছে ততক্ষণে। বোধহয় আমারই খোঁজে বেরিয়ে এসেছিল নীলা। মেয়েটির কথা শুনে দাঁড়িয়ে যায়।

আমি নিরস্ত করে বলি, ‘চলো চলো, এসব শুনে কাজ নেই।’

নীলা ছাড়ে না। বলে, ‘কি সাংঘাতিক ব্যাপার। তারপর কী হলো খুকি? তুমি কি অমনি অমনি গিয়েছিলে?’

‘না, অমনি যাবো কেন। আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকল।’

‘তারপর কিছু জিজ্ঞেস করল?’

‘জিজ্ঞেস করল আমরা কি পড়ি। কে কি পড়ায় এসব?’

মাঝখানে থেকে একজন ফোঁড়ন কাটে, ‘বুঝলেন না। এসব খোঁজখবর ওরা আগে থেকেই সংগ্রহ করে।’

চেয়ে দেখছি এবার আরেকজন তন্ময় শ্রোতা জুটেছে। সেও ঝুঁকে পড়ে মেয়েটির কথা গিলছে।

নীলা তখনও মেয়েটির কথা আগ্রহের  সঙ্গে শুনছে, ‘আর কিছু বলেছিল?’

‘আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল বাসায় কে কে আছে। আরো কত কি।’

লোকটি বলে, ‘বুঝেছেন বড্ড বাঁচা বেঁচে গেছে। বোধহয় সোনার হারটার ছিল না, তাই রক্ষে।’

তারপর আমার দিকে সম্মতির আশায় তাকিয়ে বলে, ‘আমাদের এ ব্যাপারে স্ট্রিক্ট হওয়া চাই। আমরা তো আমাদের মেয়েদের পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত। কে এসে কী বলল, ফুঁসলে ফাঁসলে নিয়ে গেল বলা তো যায় না।’

যুগল শ্রোতা পেয়ে মেয়েটি বোধহয় আরো উৎসাহিত বোধ করে। বলে, ‘শুধু আমাকে নয়। রীতা, ডলি, মায়া ওদেরও কতদিন ডেকে ডেকে কথা বলেছে।’

লোকটির বোধহয় যাবার তাড়া ছিল। সিগারেটের ছাই ফেলতে ফেলতে বলে, ‘বলিনি দেশটা চোর জোচ্চরে ভরে গেছে। কাকে বিশ্বাস করবেন।’

এ অপমান আর সহ্য হচ্ছিল না। ইচ্ছে করছিল এখুনি শাহানশাকে টেনে হিঁচড়ে সামনে এনে বলি, শাহানশা এরা তোমাকে অপমান করছে। জবাব দাও।

কী জানি তখনও হয়তো সে মাথা হেঁট করে বলত, ‘আমি আর কী বলব।’

নীলা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে।

বলে, ‘চলো ভেতরে যাই।’

বললাম, ‘তুমি যাও। আমি ঘুরে আসছি।’

প্রাণপণে বড় রাস্তা পর্যন্ত ছুটে এসেছিলাম। কিন্তু এত করেও শাহানশার নাগাল পাইনি। এ যাত্রাও যে শাহানশাকে বাঁচাতে পারিনি লোকের মিথ্যে সন্দেহ আর বিদ্রƒপের হাত থেকে সে দুঃখে ক্ষোভে কান্না পাচ্ছিল।

মনে পড়ে একদিন এই রাস্তা দিয়ে শাহানশার সঙ্গে পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। একসময় আমাকে থামিয়ে বলে, ‘ওই দেখুন।’

বললাম, ‘কী?’

স্কুল তৈরির কাজ সবে শেষ হয়েছে। শুধু ছাদ ঢালাই বাকি। অপলক নেত্রে সেদিক তাকিয়ে শাহানশা বলে, ‘ভাবিনি সত্যি সত্যি স্কুলটা তৈরি হয়ে যাবে। কেমন লাগছে আপনার?’

বলেছিলাম, ‘ভালোই। কিন্তু আপনার কী লাভ। আপনার এ আত্মত্যাগের কথা কে মনে রাখবে।’

শাহানশা একটু হেসেছিল। তার স্বভাবসিদ্ধ ম্লান হাসি হেসে বলেছিল, ‘আপনি খামাখাই ভাবছেন। কেউ মনে না রাখুক, আপনি তো রাখবেন। তাছাড়া গলাবাজি করে নিজের কথা আবার কাকে বলতে যাব।’

বলেছিলাম, ‘তাহলেও তো শখ বলে মানুষের কিছু থাকে। আপনার দেখছি তাও নেই। এমনকি নিজের নামটাও জড়াতে আপত্তি।

‘না, সত্যি কথা কি জানেন, ওসব অনুভূতিই আমার নেই। আমার মনটাই বুঝি কেমন স্থুল।’

তারপর আবার একটু থেমে বলেছিল শাহানশা, ‘আমার কোনো দুঃখ নেই! পৃথিবীর দস্তুরটাই এই, লড়ে যারা প্রাণ দেয়, যুদ্ধজয়ের কৃতিত্ব তাদের হয় না। হয় সেনাপতির, যাকে হয়তো একটা গুলিও ছুড়তে হয় না।’

শাহানশার কথা শুনে আমার নিজেরই কেমন হাসি পায়। বলি, ‘আপনি যে একেবারে দর্শনের কথা পাড়ছেন।’

শাহানশা বলে, ‘না না। আসলে আমার একটা গপ্প মনে পড়ল। আমি একসময় পল্টনে ছিলাম।’

অবাক হয়ে বলি, ‘তাই নাকি?’

‘হ্যাঁ।’

আমরা দুজনে একটা চায়ের দোকানে ঢুকি পড়ি।

শাহানশা তার গপ্প শোনাল : পল্টন থেকে এসে একবার ভালো চাকরি জুটে গেল এক নেটিভ স্টেটে। তখন বাজিতপুরের নবাব মহব্বৎ শাহ। অনেক আগেকার কথা। বোধহয় আমার তাগড়া শরীর দেখে পছন্দ হয়েছিল।

এমনিতে কোনো কাজ নেই। খাও, দাও, আর ঘুমোও।

সেই মহব্বৎ শাহের একদিন শখ হলো বাঘ শিকারের, তাও আবার রয়েল বেঙ্গল টাইগার। দিনক্ষণ ঠিক করে যাত্রা হলো। সঙ্গে পারিষদ উপদেষ্টা, সবাই গেল। আর আমরা তিনজন, মানে আমি ইমামবক্স ও দিলওয়ার খান।

মহব্বৎ শাহ আমাদের অন্দর মহলে ডেকে নিয়ে এক একটা বন্দুক দিয়ে বলেছিলেন, তোমাদের ওপরই কিন্তু আমার ভরসা। শিকারের আয়োজন আগে থেকেই করা ছিল। বাঘকে ফাঁদে ফেলার জন্যে ছাগলের বাচ্চা বেঁধে রাখা হয়েছিল। একটু দূরে উঁচুমতো মাচান। সেখানে পালা করে আমাদের ডিউটি, প্রত্যেকের হাতে কার্তুজ ভরা বন্দুক।

একটা বাঘের সন্ধান আগে থেকেই পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু ঘন ঘন শিকারি দেখে বাঘদেরও বোধহয় একটু টনক নড়েছে।

ছাগল দেখলেই অন্ধের মতো আর ঝাঁপ দেয় না।

আমরা তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম।

নবাব সাহেব বাইজির নাচ দেখছেন।

থেকে থেকে দূত পাঠান, শিকারের কী হলো।

বারবারই তার কাছে ব্যর্থ খবর যায়।

মহব্বৎ শাহের দুশ্চিন্তার কারণ ছিল। পরদিন সকালে কমিশনার জেঙ্কিস আসবেন ষাট মাইল ড্রাইভ করে। তাঁকে নিরাশ করা যায় না। জেঙ্কিস খুশি হলে খেতাবের জন্য সুপারিশও করতে পারেন। নবাব সাহেব আবার জানতে পাঠান বাঘ শিকার হয়েছে কিনা এবং একই জবাব যায়, না হুজুর।

শীতের রাত। থরথর কাঁপছি, গলার মাফলার জড়িয়ে বসে আছি এক ঠায়। নির্দয় বাঘটার ওপর আমার ভীষণ রাগ হচ্ছিল। একে এক ইমামবক্স, দিলওয়ার খান সবাই কেটে পড়ে। তাদের ধারণা এ বাঘ আর আসবে না। খামাখাই খেটে মরা।

সত্যি কথা কি জানেন, আমার নিজেরও একটু ঘুম পেয়েছিল। হঠাৎ মনে হয়, কোথায় শব্দ শুনতে পেলাম। শুকনো পাতার ওপর একটু মচমচে আওয়াজ।

প্রথমে পাত্তা দিইনি, পরে হঠাৎ ছাগলের তীব্র গলাফাটা আর্তনাদ শুনে পিলে চমকে ওঠে। সত্যি সত্যি বাঘটা ফাঁদে পা দিয়েছে। জানি না। সাহস না আত্মরক্ষা কিসের তাড়নায়, এলোপাথাড়ে একের পর এক গুলি ছুড়তে থাকি। একটা বুঝি গিয়ে লেগেছিল তার চোখে। তবু বিশ্বাস নেই। ভয়ে রক্ত জমে বরফ হয়ে আছে। ইমামবক্স আর দিলওয়ার খান বোধহয় তখনও নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছে। আমিও মাচার ওপরই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকাল বেলা হৈ-চৈ শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। জেঙ্কিন্সের গাড়ির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সবাই ধরাধরি করে মহব্বৎ শাহকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে এলো। মাত্রাধিক সুরাপান ও রাত্রি জাগরণে তিনি ঘুমে প্রায় অচৈতন্য। কোনোমতে তাঁর হাতে একটা বন্দুক গুঁজে দেওয়া হলো। বাঘটাকে তুলে আনা হলো ধরাধরি করে।

জেঙ্কিন্স সাহেব আসতেই পারিষদরা বোঝাল, কাল নবাব সাহেব অতন্দ্র রাত কাটিয়েছেন। এত বড় বাঘটাকে ঘায়েল করা চাট্টিখানি কথা নয়।

তবু একটা জিনিস জেঙ্কিস সাহেবের চোখ এড়ায় না। বন্দুকটা কখন মহব্বৎ শাহের হাত ফসকে পড়ে যায়। আবার ওখানা তুলে নিয়ে মৃত বাঘের গায়ে দর্পিত পা তুলে দিয়ে জেঙ্কিন্সের সঙ্গে ছবি তোলা হলো নবাব সাহেবের। অত সাধ্য সাধনার পরও শুনি, ইমামবক্স বলে বেড়াচ্ছে, বাঘটা সেই মেরেছে। দিলওয়ার খান বলল, এ তারই গুলির অব্যর্থ শিকার। অথচ জেঙ্কিন্সের ধারণা নবাব সাহেবই আসল শিকারি।

শাহানশা তার গপ্প শেষ করে।

প্রশ্ন করি, ‘কোন খেতাব পেয়েছিলেন মহব্বৎ শাহ?’

‘পেয়েছিলেন বোধহয়, জানি না। কিন্তু খবরের কাগজে বড় বড় করে ছাপা হয়েছিল তার নাম। ঘেন্না হলো। সে বছরই চাকরি ছেড়ে দিলাম।’

বললাম, ‘প্রতিবাদ করলেন না কেন?’

শাহানশা বলেছিল, ‘ক্ষেপেছেন আমার প্রতিবাদ শুনছে কে। রাজ-রাজড়াদের শিকারের কাহিনীই লোক শোনে। লোকে বিশ্বাস করে। আমাদের কে পাত্তা দেয়?’

আজ অনেকদিন পর শাহানশার ব্যর্থ-সন্ধানে মেয়ে-স্কুলের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমার তার বহুদিন আগেকার সেই গপ্পটাই মনে পড়ল।

শাহানশার কথাই ঠিক। একজনের চেষ্টা, সাধনা, আত্মত্যাগ এমনি করে আরেকজনের কুক্ষীগত হয়, এটাই চিরাচরিত রীতি। কিন্তু এতো কোনো রয়েল বেঙ্গল টাইগার শিকার নয়।

শুধু সকলের ভ্রƒক্ষেপ, শ্যেন দৃষ্টি এড়িয়ে সকলের সন্দেহের জ্বালাময়ী দৃষ্টির সামনে একবার গলা উঁচিয়ে বলা, ‘আমি শাহানশা।’

শুধু এটুকুই আশা করছিলাম তার কাছ থেকে।

বোধহয় একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম।

নীলা বলল, ‘কার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলে?’

‘ওই যে লোকটাকে ঘাড় ধরে বার করে দেওয়া হলো।’

কে একজন বলে ওঠে, ‘আপনার সাহসের বাহবা দি। ওদের পাল্লায় পড়লে উপায় ছিল না।’

অন্যরাও বলে, ‘না না। আপনার এভাবে ওর পিছু ধাওয়া করা উচিৎ হয়নি। বলা যায় না, কী মতলব ছিল।’

হেসে বলি, ‘আপনারা ভুল করছেন। ওকে শাসানোর কোনো ইচ্ছেই আমার ছিল না।’

‘তবে?’

সে কথার জবাব দিইনি। যদিও বলতে পারতাম কেন অমন করে ছুটে গিয়েছিলাম।

বলতে পারতাম : শুধু এই লোভে, আহত, মর্মাহত, অপমানিত শাহানশা যদি একবার পেছন ফিরে তাকায়। আর যদি সে সুযোগে নতজানু হয়ে বলতে পারি : শাহানশা ওরা কেউ তোমাকে না চিনুক। আমি তো চিনি। শাহানশা ফিরে এসো। আমার ঘরে এসো। আরাম কেদারা বিছিয়ে পেতে দিয়ে বলি, বিশ্রাম করো। নতুন পাট করা তোয়ালে এনে দিয়ে বলি, মুখটা ধুয়ে নাও। শাহানশা একদিনের জন্য আয়েশ করো। সকাল সকাল উঠোনা। ত্রস্ত হয়ে ছুটো না। শাহানশা থামো। দুঃখ করো না।

কিন্তু শাহানশা উল্কার মতোই এসেছিল। উল্কার মতোই বিলীন হয়েছে।

তেরো

গোড়ার কথা ফিরে যাই।

সেই যে পাম রোডের মোড়ে দেখা হয়েছিল আর জোর করে রেস্তোরাঁয় নিয়ে বসিয়েছিলাম, সে-ই বোধকরি তার সঙ্গে শেষ দেখা। অথচ শাহানশা সেদিন প্রাণ খুলে কথা বলতে পারেনি। পারেনি মামুলি স্বাচ্ছন্দ্যের কথা জিজ্ঞেস করতে। হয়তো দুঃসহ সব দিনের কথা ভুলে থাকতে চায়। আর আমি সেসব দিনের স্মৃতিবহ, সে কথা মনে করেই যেন এড়িয়ে গেল আমাকে।

তবু তার ঠিকানা লিখে দিয়েছিল আমাকে। বলেছিল যেতে। সেদিন আলোয় ঝলমল, উৎসব মুখরিত রেস্তোরাঁর পরিবেশে যেন কিছুতেই স্বস্তি পায়নি শাহানশা। তার মনের পায়রাগুলো শুধু পেখম আছড়ে মরেছে বাকরুদ্ধ যন্ত্রণায়।

তাই শাহানশা হয়তো চেয়েছে জনকোলাহল মুক্ত, শিশিরস্তি কোনো মাঠে বটগাছের তলায় বসে তার কিছু কথা শোনাতে। হয়তো সেজন্যেই এ বিনীত অনুরোধ।

কিন্তু শাহানশা নিজের মর্মপীড়নের কাহিনী শোনাবে এটাও নিছক দুরাশা। দুঃখ ক্লেশের যাতনাই যদি তার থাকবে সে উপাখ্যান আমাকে কেন, আমার চেয়েও বেশি যারা তার জীবনে ঘনিষ্ঠ হয়েছিল, তাদেরই কাউকে শোনাতে পারত অশ্রুবিগলিত কণ্ঠে। কিন্তু তাতো সে করেনি। আজই করবে তার কী ভরসা। আর যদি সে কাহিনী আমাকে বলেই, কী বলব তার প্রত্যুত্তরে। পারি শুধু নীরব শ্রোতা হয়ে বসে থাকতে।

আবার ভাবি ওই চিরকুটে লেখা শাহানশার ঠিকানা কোনো আমন্ত্রণ নয়। মামুলি ভদ্রতা। কোনোদিন যাবো না জেনেই বলেছে যেতে। আসলে আমাকে সে প্রত্যাশা করে না।

শাহানশার মতো মানুষকে আমি ঘরে ডাকতে পারব না। øেহের øিগ্ধতা দিয়ে এক কাপ চা বাড়িয়ে দিয়ে বলতে পারব না, নিন জুড়িয়ে যাচ্ছে।

নীলা পছন্দ করবে না। পছন্দ বোধহয় শাহানশা নিজেও করবে না। পারি, নীলাকে বুঝিয়ে বলতে। যার সম্পর্কে এতকিছু শুনেছ, তাকে চেনো না, যেমন অনেকে চেনে না।

বলতে পারি আকুতি, ঝিনুকের ওপরটাই সব নয়। ওর ভেতরের মুক্তোটাই আসল। ওটা দেখোনি তোমরা কেউ।

কিন্তু তাতে যে শাহানশার অপমান। শাহানশা কারও কাছে স্বীকৃতির আবদার জানায়নি। আজইবা তাকে দিয়ে সে কাজ করানো কেন। কেউ যদি তাকে না বুঝে থাকে, সে শাস্তি শাহানশার প্রাপ্য হবে কেন। যারা বোঝেনি, তারাই ওর ভাবনায় দিশেহারা হোক।

নীলাকে আরো বলতে পারতাম, জানো লাল-নীল ফ্রক-শাড়ির ভিড়ে, যে মেয়ে-স্কুল সকাল ন’টায় সাজানো বাগানের মতো মধুর হয়ে, মৌমাছির গুঞ্জনের মতো মুখর হয়ে ওঠে তা শাহানশারই অবদান। অথবা, অরফ্যানেজে আজ যারা হাসি ফোয়ারার স্থির নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে, সে স্বপ্নের মাল মশলা এই উদ্ধত, বদমেজাজি, অসামাজিক লোকটিই খুঁজে পেতে এনেছিল।

আমি শাহানশার আত্মীয় নই, কুটুম নই। বন্ধু নই। মিত্র নই। তবু আমার কিসের মাথাব্যথা। কিসের মমতা।

এর আগে যতদিন শাহানশার সঙ্গে দেখা হয়েছে, এ কথা সে কথা বলেছে। কোনো দুঃখ, কোনো যাতনায় মর্মাহত হয়ে নয়। কোনো অনুযোগের সুর তুলে নয়। কখনও কখনও দেখেছি তার চোখ চিক্ চিক্ করে উঠেছে কুলসুমের কথায়। গলা ধরে এসেছে রওশনের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে।

আমি কথার মোড় ঘুড়িয়ে তাকে সান্ত¡না দিতে চেয়েছি।

বলেছি, ‘ক’দিন ধরে কেমন ভীষণ ঠান্ডা।’

শাহানশা আমার চতুর সান্ত¡না হাতে-নাতে ধরে ফেলেছে।

বলেছে, ‘গলা যে ধরে আসে, সে ঠান্ডার জন্যে নয়।’

মাথা নিচু করে বলি, ‘তা জানি।’

তখুনি উঠতে চেয়েছে শাহানশা।

বলেছে, ‘আমি যাই।’

বাধা দিইনি।

আজ সেসব কথা মনে হয়। মনে হয় এখন তার অজস্র আলাপ আলোচনার একটি অসামপ্ত স্রোত কোনো একদিন হয়তো এমনি করে প্রতিহত হয়েছে! আজ সে স্রোতের তাড়নাই তাকে আবার অধীর করে থাকবে। অথবা তার জীবনের ছোটবড় সহস্র কাহিনীর বিড়ম্বনা আজ পর্বত প্রমাণ বোঝা হয়ে চারদিকে থেকে গ্রাস করতে বসেছে।

সেজন্যই তার কারও কাছে হৃদয় উজাড় করে সে বোঝা নিষ্কৃতির তাড়না।

সেজন্যে সে যদি আমাকেই বেছে থাকে, বেশ তো। আমি যাবো। হবো তার নীরব শ্রোতা।

সন্তর্পণে কোটের পকেট থেকে ওর ঠিকানা লেখা কাগজখানা উদ্ধার করি।

তারপর নীলাকে ডেকে বলি, ‘কাল আমি ট্যুরে বেরুব।’

নীলা অবাক হয়। বলে, ‘এই তো সেদিন এলে। এরই মধ্যে এমন কী কাজ পড়ল।’

বললাম, ‘এসব ট্যুর হঠাৎ করেই হয়। এমনি করেই হয়।’

নীলা একটু অন্তরঙ্গ হওয়ার সুরে বলে, ‘তা বেশ যাও। কিন্তু কী আনবে আমার জন্যে বলো।’

এটা তার বরাবরের আবদার।

এনেও দিয়েছি। কখনও একগাছা চুড়ি। টিয়া-লং পাড়ের শাড়ি। বা কখনও নলেন গুড়ের সন্দেশ।

নীলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলি, ‘এবার বোধহয় শূন্য হাতেই ফিরতে হবে।’

‘কেন ধারেকাছে বাজার থাকবে না?’

বাজার থাকবে নিশ্চয়ই। কিন্তু শাহানশার কাছ থেকে যে অমূল্য স্মৃতির পাথেয় কিনে আনব, তারপর আর কি আমার কিছু কেনার থাকবে?

কিন্তু কেমন করে বলি সে কথা নীলাকে।

নীলা টিফিন কেরিয়ারে খাবার সাজিয়ে দিয়েছিল। যেমন বরাবর দেয়।

যাবার সময় দিব্যি দিয়ে বলেছিল যেন সন্ধের আগেই ফিরে আসি। ঠিকানা দিয়েছে – বিলাসপুর গ্রাম। কোনো অখ্যাত পল্লী নিশ্চয়ই। বোধহয় এতদিনে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে একটি নিভৃত প্রান্তর খুঁজে পেয়েছে। যেখানে শ্যামল ধান আর হরিৎ সর্ষে ক্ষেতের উদার প্রসারী শান্তি। নিমগাছের øিগ্ধ ছায়া। হাজারো মানুষের ভিড়ে একখ- তৃপ্তির দ্বীপ। সেখানেই ছাউনি ফেলে আজ কি সত্যিকার শান্তি পেয়েছে শাহানশা। যেখানে পুরোন দিনের গ্লানি নেই। অন্তহীন যাতনার উর্বর ফসল তুলতে হয় না। যেখানে কেউ তাকে চেনে না। যেখানে সে না দানবীর না কৃপণ না মহাপুরুষ না কাপুরুষ, না নির্মম না নিরাসক্ত।

তারা তাকে বিশেষ একজন ভাবে না। ভিড়ের একজন ভাবে। এমনি হিমশীতল পরিপূর্ণ শান্তির লোভটাই বুঝি ছিল তার বরাবর। আর শান্তি যদি পেয়ে থাকে শাহানশা, সে শান্তির ছোঁয়ায় আমিও øিগ্ধ হবো। ঠিকানা মিলিয়ে মিলিয়েই যাচ্ছিলাম। প্রথমে বড় পাকা রাস্তা। শাহানশার সাথে দেখা করার ব্যাকুলতায় তুফান তুলেছি গাড়ির চাকায়।

কিন্তু এ কি! এ কোথায় এলাম।

এ যে সেই মজা নদী। যে নদীতে ব্রিজের একটি পিলার আজও বসাতে পারেনি কেউ।

গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম লোকজনকে। তারা জানায়, এ নদী পার হয়ে আরো মাইলতিনেক গেলে তবে বিলাসপুর। সেখানে গাড়ি চলে না। এমনকী জিপও চলে না। পায়ে হেঁটে যেতে হয়।

এমন জায়গা বেছে নিল কেন শাহানশা? কোনোদিন যাবো না জেনেই কি ঠিকানা দিয়েছিল? আমার সব উৎসাহ যেন কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের মতো ক্ষয়ে যেতে থাকে। আমার সাহচর্য পাবার তার কতটুকুই তাড়না, আদৌ কিনা, না জেনে এ দুঃসহ যাত্রায় কী ফল?

তাছাড়া বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত, শাহানশাকে যদি কোনো জরাজীর্ণ বাড়িতে একটি পরম উপেক্ষার খাটে শুয়ে থাকতে দেখি, আমার কেমন কষ্টই হবে। সে আমার চোখে স্মৃতির এক জ্বলন্ত মশাল। আমি তাকে দুর্জয় হতে দেখেছি, বিধ্বস্ত হতে দেখিনি। আজ করুণা ও অনুকম্পার দৃষ্টি নিয়ে কি ভাষায় সান্ত¡না দেবো। বরং তাতে নিজের অক্ষমতার জ্বালাটাই বাড়বে। পারব না তাকে ঘরে তুলে আনতে। পারব না মানুষের জ্বলন্ত ক্রোধ থেকে বাঁচাতে। তবে কী লাভ? তারচেয়ে এই ভালো। যেতে চেয়েছিলাম, যাইনি। শাহানশা আমাকে ইতর মনে করে, করুক! পৃথিবীতে কেউ তার জন্যে ভালো হয়নি, কেউ তাকে ভালোবাসেনি। আমি তাদের সকলের হয়ে অপরাধ স্খলনের দায়িত্ব নিতে পারব না। সকলের দায় মোচনের শক্তি নেই। সামর্থ্য নেই।

আর তাছাড়া, যে মানুষ শত সয়েও ভেঙে পড়েনি, অপমান সহ্য করেও কাতর হয়নি, নির্মম আচরণের প্রতিশোধ নিতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেনি, সহানুভূতির ভাষা তাকে শোনাব কী করে। তার পরম সহিষ্ণুতার লৌহ-প্রাচীর যদি ভেঙে যায়? শাহানশা যদি আমার কাঁধে মাথা রেখে হু-হু কান্নায় অধীর হয়ে পড়ে!

সেটা কি তার জীবনের ভয়াবহ পরাজয় হবে না। আর সে পরাজয়ের গ্লানি আমি তাকে সাধ করে দিতে যাবো কেন?

থাক সে অপ্রতিরোধ্য দুর্গের মতো নির্মম, নিঃসঙ্গ ও নিরুদ্বেগ। শাহানশার জন্য আমি কিছু করতে পারব না। আমার ঘর আছে, সংসার আছে। বৌ আছে। তারা আমার পথ চেয়ে থাকে। তারা আমাকে নিরাপদ আশ্রয়ে অভ্যর্থনা জানায়। শাহানশা সেখানে অনাহুত।

বরং শাহানশা আমাকে ভুল বুঝুক। যাদের উপেক্ষা, অবজ্ঞার শিকার হয়েছে শাহানশা, মনে করুক আমি তাদেরই একজন।

সব নদীতে সেতু বাঁধা যায় না। তার সবগুলো স্তম্ভ বসলেও একটি বসে না। শাহানশা তেমনি এক স্তম্ভ। যাকে কেউ জোর করে তুলে ধরতে পারে না। কেউ যদি বলে এ শাহানশার ব্যর্থতা, তবে যারা সে ব্যক্তিত্বের স্তম্ভকে বশে আনতে চেয়েছিল তাদেরও সমান ব্যর্থতা।

শাহানশা চাওয়া-পাওয়ার সুধা গরলে মথিত সরোবরে একটি দুর্জয়, শ্বেতপদ্ম। তাকে চোখ বাড়িয়ে দেখা যায়। হাত বাড়িয়ে নেওয়া যায় না। কারণ পাঁকে আটকা পড়ার ভয় থাকে। শ্বেতপদ্মের সাধই যথেষ্ট। তাকে পাওয়ার সাধনা না করাই ভালো।

শাহানশা যদি আমার পথ চেয়ে বসে থাকে, থাকুক। আমার চেয়ে যারা তার প্রিয়, যারা নিবিড়, যারা অন্তরঙ্গ হতে পারত, তারাও তো তার মনে অপেক্ষার নিস্তেজ মোহ বিস্তার করেছে। শাহানশা যদি তাদের প্রতীক্ষায় অধীর না হয়, আমার প্রতীক্ষাতেও হবে না।

এপিলোগ

শাহানশা আমি অনেক দূর এসেছিলাম, তোমার সঙ্গে দেখা করার মানসে। শ্বেতপদ্মের লোভ আমার ছিল। কিন্তু সাহস ছিল না। বিশ্বাস করো শাহানশা, আমার ইচ্ছেটাও ইঞ্জিনিয়ারের অসমাপ্ত ব্রিজের মতো। যার এক নম্বর, দু’নম্বর স্তম্ভ উঠেছিল। চূড়ান্ত স্তম্ভটি, যেটা থাকলে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানো যেত, ওঠেনি।

আমি চেষ্টা করেছি। পারিনি।

যদি আবার কখনও দেখা হয়, মিথ্যে কথাই বলব। বলব না, এতদূর গিয়েও গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম।

বলব, তোমার দেওয়া ঠিকানা লেখা কাগজখানা হারিয়ে ফেলেছিলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *