চোখের রঙ

সিঙ্গাপুর থেকে চিঠি এসেছে বড় ভাই মাসুদের।

দেশে থেকে যখন সুবিধে হলো না, চলে আসুক এখানে। আর কিছু না জুটলে দোকান দেখাশোনা করতে পারে মাশুক। খেয়েপরেও দু’পয়সা হাতে থাকবে।

চাকরির মোহ ততটা নয়, যত ওই নাম এবং দূরত্বের। স্বপ্নালু দূরপ্রাচ্য। এলাচি-দারুচিনি রাবার বন আর ইউক্যালিপটাসের প্রলোভন যেখানে হাতছানি দেয়। পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, চীনা, ইংরেজ দুনিয়ার সব জাত পয়সার লোভেই যায়নি। হিসেব ঠিক করতে গিয়েও হয়েছে বেহিসেবী। কাঁচা টাকাকে পাউন্ড, ডলার করে সবাই তো ফিরে আসেনি। থেকেও গেছে। নীলানুন চোখের মায়া ধরে রেখেছে কাউকে। সেদেশের মাটি আঁকড়ে রেখেছে। উন্মুক্ত আকাশের নিচে নারকেল ঝাড়ের ছায়ায় সমুদ্রতরঙ্গে পা ডুবিয়ে মুহূর্তের উত্তেজনায় ভালোবেসেছে সে দেশ। সতেরো বছর আগে মাসুদ বলে গিয়েছিল, বছরপাঁচেক পর ফিরে আসবে। হাজার হলেও নিজের ঘর ভিটে ছেড়ে প্রবাসে থাকতে কে চায়। অকাট্য যুক্তি দিয়ে বলেছিল, নাড়ির টান তো রয়েছেই। বিয়ে তো করেছে, ছেলেমেয়ে আছে।

মাশুকের বয়েস তখন সাত কিংবা আট!

দরজায় দাঁড়িয়ে অন্যদের সঙ্গে সেও তার ক্ষীণ হাতখানা তুলে বিদেয় দিয়েছিল মাসুদকে। অন্যদের মতো অধীর হয়নি। বোধহয় অধীর হবার বয়েসই সেটা নয়। অথবা পেয়েছিল খানিক রোমাঞ্চের আস্বাদ। বাইরে যাবার মতো তাদের পরিবারে জুটেছে একজন তাহলে। বলবার মতো একটা ঘটনা। নইলে মহিষখালি গ্রামে বলবার আর কি আছে। সেই মাসুদ ফেরেনি। চিঠি লেখেনি বছরখানেক।

মরিয়ম কেঁদেছে। কোলের ছেলেকে নিয়ে মাথা ঠুকেছে দেয়ালে। স্বামী কি তাহলে… সে সন্দেহই পেয়ে বসত। বাঁচাল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। সময় বুঝেই যেন এলো। স্বস্তি দিলো মরিয়মকে। সন্দেহ আর অনিশ্চয়তার দোলায় কাটিয়ে দিতে দিলো আরো সাত বছর।

যুদ্ধ নয়, মহাযুদ্ধ। কত কিছু ঘটে তাতে। মানুষ মরে, যখম হয়, নিখোঁজ ও বন্দি হয়। দূরপ্রাচ্যের বিরাট ভু-খ- ধরে ক্ষমতার হিংস্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শুধু বোমারু বিমান, যুদ্ধ জাহাজ আর সৈনিক নয়, সাধারণ মানুষেরও ভূমিকা আছে। তাদের অস্থিসজ্জা আর মৃত্যু না হলে যুদ্ধ হয় না। ক্ষমতার লড়াইয়ে তা না হলে যে নিষ্পত্তি নেই।

অতটা চরম অবস্থা কল্পনা করতে পারেনি মরিয়ম। শত্রুপক্ষের জেলখানায় কয়েদি হয়ে তার জীবন কাটুক, প্রাণে না মারা যাক, প্রার্থনা করেছে।

যুদ্ধ থামল। তবু খবর আসে না। মনে মনে ভয়, হয়তো তার প্রার্থনা যথাযথ জায়গায় পৌঁছুয়নি। পৌঁছুলেও মঞ্জুর হয়নি।

কিন্তু একদিন চিঠি এলো। মৃত্যুর খাতে ফেলে দিয়ে তার অতীত গুণপনা কীর্তনে যারা ব্যস্ত তারা খুশি হলো না। তার মহত্বের নিদর্শন দিতে গিয়ে অনেকে আবার বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিল। তাদেরই অস্বস্তি সবচেয়ে বেশি। অস্বস্তি আরো এজন্যে যে স্বামীপরিত্যক্তা মনে করে মরিয়মকে দুটো কৃপা উপদেশ দেবার সুযোগও এ সঙ্গে শেষ।

শুধু চিঠিই আসেনি, টাকাও এসেছে। পুত্র-কন্যা নিয়ে মরিয়মকে সিঙ্গাপুরে চলে আসার অনুরোধ।

দীর্ঘ নীরবতার ভূমিকা খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু রোমান্টিক উপন্যাসের বিষয়বস্তু।          তা-ও চি নামে একটি মেয়েকে তার ভালো লাগে। প্রেমে পড়েছিল কিনা বলতে পারব না। তবে তা-ও চি রোজ আসত। পিপিলিকা-ক্ষুদ্র টানা চোখের ভুরু তুলে বসে থাকত একদৃষ্টে চেয়ে। মাসুদ প্রথম প্রথম বাধা দিয়েছে। তা-ও চি কখনোই দেয়নি। দিয়েছে শুধু প্রশ্রয়। তারপর যেটা অনিবার্য সেটাই হয়েছিল।

তা-ও চি আর সে। সে আর তা-ও চি। ইতিহাস হয়তো একথাই বলত। এবং সে ইতিহাসের পাতায় একটি নারীর প্রতি চরম অবিশ্বাসে ও বঞ্চনার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠত অন্য একটি নরনারীর প্রেমকাব্য। কোনো পরিব্রাজক চোখ থাকলে তা দিয়ে ভালো উপন্যাস লিখতে পারতেন। কিন্তু মোড় নিল অন্যরকম।

মাসুদকে কিছুই করতে হলো না। যুদ্ধের সময় গুপ্তচর বলে ধরা পড়েছিল তা-ও চি। তা-ও চি অবশ্য বলেছিল, একসময় সে ছিল। এখন আর নেই। এখন সে ঘর সংসার করছে।

দলিল প্রমাণের সময় তখন নেই। তা-ও চি যাবার সময় তার মিটমিটে তারকা চোখে কী বলেছিল মাসুদ বোঝেনি।

বোধহয় বলেছিল, আশ্চর্য তুমি আরামে সিগারেট ফুঁকছো।

অথচ কী করতে পারত।

এক ঘুষিতে ধরাশায়ী করত গ্রেফতারকারীকে। তারপর আরেক তুচ্ছ বুলেটের গুলিতে লুটিয়ে পড়ত। তার প্রেমকাব্য রচয়িতারা এরকম পরিণতি পেলে রসিয়ে লিখতে পারতেন।

মাসুদ পারেনি তার কোনোটাই।

পরে অনেক খোঁজ নিয়েছে। তা-ও চির খবর পায়নি। তা-ও চি কোথায়। কোথায় তার তারা মিটমিটে চোখজোড়া। কতদিন খুঁজেছে। তা-ও চির মতো অনেক চোখ দেখেছে। তা-ও চিকে দেখেনি।

বোধহয় কথাটা কাউকে বলার জন্যে আকুলি বিকুলি করছিল মাসুদ। সব কথাই জানাল একদিন মাশুকের কাছে চিঠিতে।

ওই চিঠিতেই লিখেছিল, সব জেনেই সে আসুক। লোভ প্রলোভন তো থাকবেই। সবখানেই আছে। তবে সে হয়তো মাসুদের মতো দুর্বলচিত্ত নয়।

চিঠিতে আরো বলেছিল, মরিয়মের কাছে অত কথা বলার দরকার নেই। বলুক কিছু একটা মনগড়া কাহিনী। তাদের আনিয়ে নেবে শিগগিরই। ঘর সংসার করবে। একা একা ভালো লাগছে না।

পুনশ্চ দিয়ে লিখেছিল। তা-ও চির মতো কাউকে কোনোদিন চোখে পড়েনি তা না, আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। যুদ্ধে কে কোথায় ঠিকরে পড়েছে ঠিক আছে তার।

মরিয়মও ছেলেপুলে সঙ্গে করে গেল একদিন ঘর বাঁধতে। এখন সুখেই আছে সে। থাকবে না কেন। চোখে চোখে ধরে রেখেছে যে। মরিয়মও আসতে লিখেছে মাসুদকে। বলেছে, দেশের বাইরে না বেরুলে জড়তা কাটে না।

জড় দেশের মেয়ের মুখে কি অদ্ভুত শোনাল কথাগুলো।

তা-ও চির কথা মাসুদকে ভাবিয়ে তোলেনি, তা নয়। সেও কারও ভূষিত চোখের সামনে বাঁধা পড়বে, সে ভয়ে নয়। তবু নিজের সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়া যায় না।

মনে মনে একদিন প্রতিজ্ঞা করেছিল, দেশের বাইরে যাবে না। মাসুদের মতো লোকের মুখ দেখবে না। আশ্চর্য, ক’বছরে কি হয়ে গেল। যুদ্ধের হাওয়ায় নিমেষে বদলে গেল মানুষ, তার মন, স্বভাব, মেজাজ। ভাঙনের তীব্র স্রোত তাদের গ্রামেও এসেছিল। পঞ্চাশের মন্বন্তরে এদেশের মানুষকে না খাইয়ে মেরেছে তো এদেশেরই মানুষ। মরতে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার সময় হয়নি কারও।

মাসুদের মনে হলো, আসলে মানুষের মনটাই সব। আসলে, মেকি সব দেশেই। কোনোটাই স্বর্গরাজ্য নয়। নারকীয় নয় কোনোটাই। মানুষের মন তাকে যখন যেমন গড়েছে, সে তেমনি। ক্ষুদ্র গ-ির বাঁধনে থেকে আর মুক্তি নেই। হাওয়া যে বইতে শুরু করেছে। মনকে প্রবোধ দিলো, হতে পারে মাসুদের দোষ ছিল না। মেয়েটিরও না। যৌবন ধর্ম।

সেও একদিন বদলাবে। শ্যামল প্রান্তর আর নীল আকাশ নিয়ে যত কাব্যই করুক, সেই দারুচিনি রাবার বন তাকে ধরে রাখবে একদিন।

মাসুদের দোকানের জন্য বড় বেশি একটা লোভ হয় না। সিঙ্গাপুরে কোনো অচেনা রাস্তায়, তার চেয়েও অপরিচিত কোনো গলির ওপর ভাঙা নড়বড়ে একটা বাড়ি হয়তো। ‘ওরিয়েন্টাল ট্রেডার্স’, নাম যতই মুখরোচক হোক, দেখা যাবে হয়তো একটা ভাঙা টিনের সাইন বোর্ড। কিছুটা জং আর কিছুটা মাকড়সার জালে পড়াও যাবে না নাম।

তবু হয়তো যাওয়া উচিৎ। চাকরি করেই যখন খেতে হবে এখানে গেলেই হলো। চাকরি যাই হোক, অপরিচিত লোকের গ-িতে পদবিটা তুচ্ছ। চাকরিই আসল।

মাসুদের সঙ্গে একটাই তফাৎ লক্ষ করেছে সে। মন তার ভবিষ্যতে যাই হোক, এখনও কিছুটা ঘরমুখী।

বাইশ বছর গ্রামে মানুষ হয়েছে। যুদ্ধের পর কত জায়গায় ছড়িয়ে গেছে দেশের লোকজন। গাঁয়ের লোক মফস্বলে, মফস্বলের লোক শহরে। আবার শহরের লোক গ্রামে। যাবার আগে সত্যি একবার নিজের মনকে যাচাই করতে ইচ্ছে করে। সত্যিই সে সিঙ্গাপুর গিয়ে ফিরে আসতে পারবে কিনা একবার জানতে ইচ্ছে হয়।

উদ্ভট খেয়াল সন্দেহ নেই।

আত্মীয়তার সূত্র ধরে জোঁকের মতো তাদের বাছাই করা। তাদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া।

আর সুযোগ হবে না হয়তো। আজ, আজই তাকে মনস্থির করে ফেলতে হবে। অনেক আত্মীয়স্বজন যেতে বলে। আসতে অনুরোধ জানায়। সেগুলো আন্তরিক নাও হতে পারে। সে যখন থাকছেই না, তখন সে চিন্তা করে লাভ?

শেষবারের মতো একবার দেখা করে যাওয়া।

পরীক্ষা করে দেখবে এই ক’টি বিভিন্ন কাতর, অধীর, অসহিষ্ণু চেহারার আবেদন বেশি, না কোনো এক ভবিষ্যৎ তা-ও চির চোখের বাণ বেশি।

তা না হলে তার বিচারে ভুল থেকে যাবে।

কারণ মাসুদের জীবনে যেমন তার জীবনেও তেমনি তা-ও চি আসতে পারে।

॥ দুই ॥

প্রথমেই যার কথা মনে করতে পারল, সে রানুখালা। আত্মীয়তার জড়ানো জালে রুই কাতলা নন, হয়তো নিছকই পুঁটি মাছ। কিন্তু আপাতত পুঁটি মাছটির কথাই মনে হয়ে গেল।

সেই কবে একবার দেখেছিল। নাদুস নুদুস, গোলগাল। গাল কিছুটা সত্যি ফোলা আর কিছুটা কয়েক খিলি পানের অস্তিত্ব ঘোষণা করছিল। তখন তার বয়েস কত হবে? বোধহয় ত্রিশ-ছত্রিশ। গৌরবর্ণ, চোখে টান করে কাজল মাখা।

ওর থুতনি ধরে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কী নাম খোকার? মনে আছে খোকা নামের সেই ছেলেটি কোনো জবাব দেয়নি। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল তার দিকে একদৃষ্টে।

অমন হাঁ করে কী দেখছিস।

অপ্রতিভ হয়ে চোখ নামিয়ে নিল মাশুক।

রানুখালার গায়ে রসিকতায় ঢলে পড়ে পাড়ার কোনো মেয়ে যেন টিপ্পনি কেটেছিল, বোধহয় তোমাকে।

তার হাতের বলটা ছিল সুন্দর। লাল। সুন্দর দেখতে রানুখালাও। অভিজ্ঞতালব্ধ বুদ্ধি যেন তাকে বাতলে দিয়েছিল, বলটা নিয়ে খেলা করাই ভালো । বড় মানুষদের খাটানো ভালো নয়।

আর কোনো কথা না বলে এক দৌড়ে চলে এসেছিল পুকুর ধারের মাঠে। রাবারের বল ফসকে গিয়ে খানিকক্ষণ লাফাল। তারপর নির্বিরোধ স্বাধীনতা পেয়ে পড়ল পুকুরে। হাঁটু গেঁড়ে বসে বলটার কথাই ভাবছিল।

হঠাৎ কে যেন তার পেছনে এসে একটা ছায়া ফেলল। মাথার চুলে হাত বুলিয়ে বলল, কি ভাবছ চিন্তামণি। বল যে তোমার পুকুরে ভাসছে।

রানুখালার হাতটা কপালে ঠেকতে অনুভব করেছিল কর্কশ হলেও সেটা স্নেহময়। স্নেহের আদর বুলোতে বুলোতেই যেন ক্ষয়ে গিয়ে সেটা হয়েছে অমসৃণ।

পাশেই মা দাঁড়িয়ে।

মাকে উদ্দেশ করেই বলেছিলেন রানুখালা, বলের দুঃখে তোমার ছেলের মন খারাপ।

তারপর পাল্কিতে উঠতে উঠতে বললেন, একদিন এসো না তোমরা সবাই। বর্ষায় আর অসুবিধে কি। একদম ঘাটে গিয়ে ভিড়ে নৌকো।

এরপর আর কোনোদিন রানুখালা এসেছিলেন কিনা মনে নেই। তাদেরও যাওয়া হয়নি।

মতিপাড়া, বিজনপুর। আড়ঘাটা হয়েও যাওয়া যায়। বড় আটচালা ঘর। দেখলেই চেনা যায়। খবরটা দিয়েছিল মামাতো ভাই কবির। চক্কর দেওয়া তার কাজ। রেল, স্টিমার, গরুগাড়ি যখন যা পায় তাতেই ঘুরে বেড়াতে হয়। কোনো এক ওষুধ কোম্পানির ক্যানভাসার।

সে-ই বুদ্ধি দিয়ে বলেছিল, দরকার থাকলে যা না একবার।

যদি না চেনে।

চেনাচিনি আবার কি। নিজেকে চেনাতে পারলে লোক ঠিকই চেনে, এই ধরো না –

সুযোগ পেলেই কবির নিজের অভিজ্ঞতার খানিকটা জোর গলায় বিবৃত করত।

গেলাম বনকুয়া।

সে আবার কোথায়?

জায়গাটা না চেনা যেন ভয়ানক অন্যায় হয়েছে, এমনি ভাব করে আবার বলে কবির, বনকুয়া আর কি।

তারপর খানিকক্ষণ থেমে আবার বলে, পাংশী চিনিস?

না তো।

তাহলে বোঝাই কী করে। যাকগে শোন, বনকুয়া নাবতেই শুনলাম সেখানকার ডাক্তার বড় কড়া। ক্যানভাসার সহ্য করে না। দূর দূর করে হাঁকিয়ে দেয়। এল. এম. এফ. হলে কী হবে, ব্যাটার পসার ভালো । বাঁ হাতে নোট গোনে –

বাঁ হাতে কেন, প্রশ্ন করে মাশুক?

ডান হাতে প্রেসক্রিপশন লিখতে হয় যে। বলে, যে হাত দিয়ে বিদ্যে ছুঁই সে হাতে পয়সা ছোব না। যাকগে সেই ডাক্তার আকরাম। আমাদের কোম্পানির আরো কয় ছোকরা গেছে। সুবিধে করতে পারেনি তাদের কেউ।

আমি গিয়েই বললাম, আপনি ডাক্তার আকরাম?

ডাক্তারকে নাম ধরে ডাকেনি বোধহয় কেউ এক যুগ।

সোজা হয়ে চোখে চোখ রেখে বলেন, হুঁ কেন।

কেন আবার কি। আপনাকে ‘কল’ দিতে এসেছি।

মুখস্থ করা গদ্যের মতো বলে গেলেন ডাক্তার আকরাম, নৌকোয় গেলে ছইঅলা নৌকো, হুকো আর বালিশ। ট্রেনে গেলে ইন্টার ক্লাশ।

বললাম, দেবো। চলুন আমার সঙ্গে।

গভীর আগ্রহে তন্ময় হয়ে শুনছিল মাশুক। বলল, তারপর?

তারপর আর কি। ডাক্তার রাজি।

কিছুদূর এগুতেই বলে, গাড়ি টাড়ি দেখছি না যে।

তা পরে দেখবেন। আপাতত আপনাকে সর্ষে ফুল দেখতে হবে।

কেন, কেন।

এখানে আর একজন ডাক্তার আসছেন যে।

যেন আকাশ থেকে পড়েন আকরাম।

আমতা আমতা বলেন, তার মানে? এ গ্রামে ডাক্তার অসম্ভব। ভারিক্কি চালেই কথাটা পাড়ে এবার কবির, অসম্ভব মানে। ভালো ডাক্তার এম. বি. বি. এস.। সব বন্দোবস্ত পাকা। আজই শুনলাম। ডিস্ট্রিক্ট হেলথ অফিসার আবার আমার একটু –

হেঁ হেঁ, তাই নাকি।

কবির হাতটা ধরে ফেলে আকরামের। এ যেন তার বন্ধুত্বের দাবি। আকরামকে হাসতে কোনোদিন দেখেনি। পিটপিটে চোখটা উজ্জ্বল হয়ে আসে। কেঁচোর মতো মেটো ঠোঁটজোড়া ঠেলে বেরিয়ে এলো পান খাওয়া হলদে একপাটি অসমতল দাঁত। বিনয়ে কুঁজো হয়ে যান আকরাম, তাহলে আপনি পারেন, হ্যাঁ। আসুন আমার ওখানে দুপুরে চাট্টে খেয়ে নেবেন।

না, তার আর সময় হবে না।

প্রায় আত্মপ্রসাদের সুরে বলল কবির, সেই যে ধাপ্পা দিয়েছিলাম, ডাক্তার আকরাম আজও আমার হাতের মুঠোয়। কোথায় হেলথ অফিসার আর কোথায় এম. বি. বি. এস. ডাক্তার।

রানুখালার ওখানে যাওয়ার সঙ্গে ডাক্তার প্রসঙ্গের কী যে সম্পর্ক, বোঝে না মাশুক। তবু প্রতিবাদ করার সাহস হয় না। শুধু বলে, বুঝলাম তোমার না হয় খুব মুরোদ কবির ভাই। কিন্তু সে তো ডাক্তার আকরাম নয়, রানুখালা।

কবির দমে না, ওই একই হলো। সব মানুষই সমান।

একজনকে ‘ট্যাকল’ করতে পারলে অন্যজনকেও পারা যায়। ভালো কথা, প্রথমবারের মতো যাচ্ছিস কিছু নিয়ে যা।

খানিকক্ষণ উদ্বিগ্ন থাকার পর জানাল মাশুক, ভাবছি কিছু রসমালাই আর সেরখানেক সন্দেশ নিলে কেমন হয়।

কথাটা ফুৎকারে উড়িয়ে দেয় কবির, ধ্যাৎ, ওসব আজকাল আউটডেটেড, এতদিন পর যাচ্ছিস। একটা কিছু কাজের জিনিস নিয়ে যা। যা উপকারে আসবে সকলেরই।

মাশুক ভাবতে চেষ্টা করল, সেই অমোঘ বস্তুটি কি। কিন্তু তার আগেই কবির      প্রস্তাব করে, যেমন ধর সালফা ড্রাগস।

সালফা ড্রাগস?

হ্যাঁ। চমকে গলিত। আর যে-কোনো অসুখে অব্যর্থ। নিজের কোম্পানির জিনিস, আমার কাছ থেকে পাবি সস্তায়। বাজারে গিয়ে দেখ।

ব্যাগে হাত গলিয়ে কয়েকটা ওষুধের প্যাকেট বার করে তার দিকে বাড়িয়ে দেয়।

পরম অনিচ্ছায় কবিরের হাতে নগদ পাঁচটা টাকা গছিয়ে দিয়ে প্যাকেটগুলো নিতে নিতে বলে, ঠিকঠিক কাজে আসবে তো কবির ভাই।

॥ তিন ॥

নৌকো ছেড়ে দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ধোওয়া চিমনি অদৃশ্য। শীতলক্ষার ঘন কৃষ্ণ আর পীত পানির সীমা শেষ। এখন শহর দেখা যায় না। দূরে রাস্তার বাতি মনে হবে মোমবাতির মতো করুণ আর নিরুপায়।

দূরের লঞ্চকে মনে হয় জ্যান্ত কুমিরের মতো। ছোট ছোট রুপালি ঢেউ নদীর বুকে লিকলিকে রাস্তা করে নেয়। সে রাস্তা দিয়ে লঞ্চ আসবে।

যেতে যেতে মনে হলো একেবারে কবিদের কথায় ভরসা করা ঠিক হয়নি। নিজের মাথা খাটিয়ে কিছু মিষ্টি নিলে হতো। এই প্রথম যাচ্ছে। সুস্থ বাড়িতে ওই প্যাকেট বার করে সে কি বলতে যাবে, তোমাদের স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা করে এনেছি এগুলো। চমৎকার জিনিস। অব্যর্থ। নৌকো ততক্ষণে নদী থেকে খালে এসে ঢুকেছে। দু’ধারে বড় বাঁশঝাড়। প্রণত ভক্তের মতো তারা মাথা নাবিয়ে। পানিতে মুখ চুইয়েও তৃষিত ডগার তৃষ্ণা যেন মেটে না। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। একটার পর একটা বাঁক। এতক্ষণ নৌকোর যে মাঝিকে গ্রামের নির্বোধ জীব মনে করে শহুরে আত্মপ্রসাদ পেয়েছে, জটিল ধাঁধায় আঁকাবাঁকা গলিতে তাকেই মনে হয়েছে সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল। আজকের ভাগ্যনির্ধারক। কখনও কখনও তার অহেতুক নীরবতাকে ভয় করে। নৌকোর তলায় পানির তরতর শব্দের মতোই সে আশ্চর্য ও রহস্যময়। এ জনমানবহীন নদীতীর্থে সে ভয়ানক শক্তিসম্পন্ন অতি মানুষ। হাতের বৈঠা ধরে দু’ঘা যদি লাগিয়ে দেয়, সভ্য পৃথিবীর কোনো আদালত চোখ রাঙাতে আসবে না। একটা শীতল মৃত্যু তাকে গলিয়ে গলিয়ে টোপ করে দেবে হাঙ্গর তিমির জন্যে নয়, বোয়াল আর ট্যাংরা মাছের আধার জোগাতে।

একদিকে অনেকখানি ডেবে গেল নৌকো যেন। ভয়ে অন্যদিকে সরে আসে মাশুক।

যেন নিছকই কৌতূহল নিবৃত্তির সুরে বলল, তোমার নৌকো কখনও ডোবেনি তো।

শুধু দু’বার। একবার পাগলা ফকিরের দরগায় সিন্নি দিতে গিয়েছিল। ভাদ্রমাস। হঠাৎ বৃষ্টিতে ছেয়ে ফেলল আকাশ। লগি দিয়ে কিছুতেই ঠিক রাখা গেল না। পেয়ারি সেবারেই মারা গেল।

পেয়ারি কে?

মাঝির চোখ বোধহয় ছল ছল করে আসছিল। ধরা গলায় বলল, আমার কলজের টুকরো।

কোনো সাধ তার পূর্ণ হয়নি। এখন শুধু পেটের দায়েই লগি ঠেলা। দ্বিতীয়বারের দুর্ঘটনায় কী হয়েছিল সে কথা আর শোনা হলো না। বাঁক ঘুরতেই দূরে বাঁশের ওপর ঝোলানো হারিকেনের আলো চোখে পড়ল। আম্বর আলী মাঝি বলল, কিছু ঠাহর করতে পারছেন।

সামনে খাল দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। বাঁ দিক পানা পুকুরে ভর্তি। ডান দিক তবু কিছুদূর যাওয়া যায়। বোঝা গেল নৌকো সরছে না। চালাতে অসুবিধে হচ্ছে। তলায় শাপলার শেকড়।

মাঝির দিকে শূন্য দৃষ্টি মেলে দিয়ে বলল মাশুক, এদিকে আর কখনও আসিনি। সবাই বলছিল যে কাউকে জিজ্ঞেস করলে নাকি বলতে পারবে। বিজনপুর। আটচালা ঘর। সহজেই নাকি চোখে পড়ে। আড়িঘাটা হয়েও যাওয়া যায়।

আম্বর আলী বুঝল, সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে হবে।

কচুরিপানার ওপর ঠেলে ঠেলে খানিকদূর গিয়ে একখানে এসে থামল। মাশুকের মনের দুর্বল চিন্তা আবার মূর্ত হয়ে ওঠে। একটু আগে যে তার পেয়ারির গপ্প করেছিল, এবার সে যদি দেখা দেয় অন্য মূর্তিতে।

পাশেই ধানক্ষেত। সেখানে আলের ওপর দিয়ে একটা ছায়া শরীর অদৃশ্য হবার আগেই জোর গলায় হাঁক ছাড়ল আম্বর আলী। 

লোকটির হাতে লণ্ঠন। ডাক শুনে থমকে দাঁড়ায়। তার মনে হয় অন্ধকারে ভূত দেখেছে সে। আটখোলার নাম করতেই তার লণ্ঠন নামিয়ে এগিয়ে আসে নৌকোর দিকে। ভয়ের কিছু নেই। যেন বুঝতে পেরেছে কোনো পথভ্রান্তকে পথের সন্ধান দেবার জন্যেই তার ডাক।

সামান্য বিড়ির আদানপ্রদানে আলাপ জমে ওঠে। শেষটায় নিজেই উঠে এলো লোকটা। দুই এর ভেতর হাঁটু গেড়ে বসে থাকা শামুককে দেখে জিজ্ঞেস করে, আপনার কোনো সম্বন্ধ লাগে নাকি।

যেন কিছুই কানে যায়নি এতক্ষণ।

স্নায়ুগুলো অসাড়। শরীরটাকে অতর্কিতে একটা ঝাকুনি দিয়ে ভয়মুক্ত একটু জবাব দেবার চেষ্টা করে মাশুক।

তারপর বলে, হ্যাঁ।

সত্যি সত্যি বাড়ির কাছেই এসে ভিড়েছে নৌকো। রানুখালার কথায় কোনো ভুল নেই।

আসল বাধা পার হয়ে এসেছে। তবু পা নড়ে না। আঁৎকে ওঠে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে, বারোটা বাজে বাজে। মিনিট সাতেক বাকি। আত্মীয়তার বন্ধন কত দৃঢ় হলে এসময় বিরক্ত করা যায় সেটা ভাবতে না ভাবতেই কে যেন বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে।

একরকম জোর করেই হাত ধরে তুলল তাকে নৌকো থেকে। বয়স্ক লোক। রানুখালার সঙ্গে এর সম্পর্ক উদ্ভাবনার কোনো উৎসাহ আপাতত নেই। রীতিমতো  ক্লান্ত। পঁচা পানি, কচুরিপানা আর বাঁশঝাড়ের তেতো গন্ধে মাথা ধরে এসেছে। রাতে এত ঘুম পেয়েছিল যে আত্মীয়তাসূচক দু’চারটে কুশলবিনিময় ছাড়া আর কিছুই মনে পড়ে না। চৌকিতে পাতলা তোষক। তার ওপর বিছানো একটা স্যাঁতসেঁতে চাদর। তারচেয়েও বেশি স্যাঁতসেঁতে বালিশ। সরষে তেল আর মাথা ঘামানোর কল্যাণে সেটা আর বালিশ নেই। অন্য কিছু হয়েছে।

যতক্ষণ ঘুমিয়েছিল মনেই হচ্ছিল না নতুন পরিবেশ। নতুন মানুষ। ঘুম ভাঙলো সকাল সকাল। জানালা খুলে দেখল সামনে একটা পুকুর। দুটো পাতি হাঁস লাফালাফি করছে সেখানে।

হংস-কেলি দেখা আর হলো না। পেছনে কে যেন এক লাফে উঠে পড়ে তার বিছানায়। চুলের গোছায় হ্যাঁচকা টান দিয়ে আকর্ষণ করে তার দৃষ্টি। তারপর সঙ্গে সঙ্গে মিহি গলায় নিজের পরিচয় ব্যক্ত করে, আমার নাম বিশু। তোমার নাম?

বছরপাঁচেক নিশ্চয়ই হবে। নাদুস নুদুস। রঙ জম-কালো না হলেও বেশ ময়লা। কিছুক্ষণ আগে আমকাঁঠালের সঙ্গে যোগাযোগের ফলে ওর হাতমুখে একটা ফলসুলভ ঘ্রাণ। 

একটা নামই জেনে এসেছে : রানুখালা। ভেবে দেখেনি রানুখালার সঙ্গে সঙ্গে আরো দু’চারজনকে জেনে রাখা দরকার ছিল। আত্মীয়তার বিচিত্র ধাঁধায় কাল রাতের ওই ভদ্রলোক, আর আজকের এই বখাটে ছেলেটি কোথাও না কোথাও জড়িয়ে তাদের আবিষ্কার করা চাই। বখাটে ছেলেটি, সত্যি যদি সে আত্মীয় হয়ে থাকে এবং যদি একান্তই তাকে আদর করা দরকার, অবশ্যি করবে। তা না হলে নির্বিচারে ওর চুলের গোছা ধরে টানার জন্যে শাসনও করতে পারে। হাসতেই হলো মিষ্টি করে, আমার নাম জেনে কী করবে। কোন ক্লাসে পড়ো।

স্কুলে পড়ি না। কেন পড়ব। আমি তো বড় নই।

তবে বড় কে?

মীরা।

এরপর যা কিছু প্রশ্ন মীরাকে নিয়েই করতে হয়। কিন্তু সেটা ঠিক হবে কিনা মনে করে থেমে যায় মাশুক।

বিশু ওর হাত ধরে টানতে শুরু করে। বিছানা থেকে উঠিয়েই দেয় একরকম জোর করে, মীরা কী করছে দেখবেন?

হয়তো লোভনীয় অনুরোধ।

তবু বয়েস, তার চেহারা এবং গড়ন কিছু না জেনেই এই মীরার কাছে সে যেতে পারে না। কিন্তু কোনোমতেই বোঝানো যায় না সে কথা বিশুকে।

আবার জিদ ধরল, চলুন না।

না থাক, তুমি যাও।

আসুন না। শব্দ করব, ওকে।

কোনোমতে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলে মাশুক, তুমি করো। আমি মুখ হাত ধোব।

বারে, সেখানেই যেতে বলছি।

এরপর বাধানিষেধ চলে না। একরকম জোর করেই তাকে হেঁচড়ে আনল পুকুরঘাটে।

তখুনি যদি জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে আরেকটু ঝুঁকে দেখত, শুধু পাতিহাঁস জোড়াই নয়, মীরা নামের এই মেয়েটিকেও পড়ত চোখে। বোধহয় সতেরোর কিছু কম বা বেশি। পরিতৃপ্তির সঙ্গে আচারের স্বাদগ্রহণে ব্যস্ত। পেছন হয়ে বসা। লিকলিকে বেণীটা চোখে পড়ে, যখন ওটা চঞ্চল হয়ে এপাশ-ওপাশ করে। গলায় কালো সুতোর একগাছা মালা। ঘাড়ের পেছনে ওটা পেতলের সরু পাতে মোড়া। তাতে হয়তো একটা ছোট নকশাও।

নারায়ণগঞ্জ ছাড়তে যেমন ঘোলাটি পানি দেখেছিল পরনে তেমনি রঙের শাড়ি। অথবা হয়তো এখন কোনো রঙই নয়। রঙের অপভ্রংশ। নানা ভাঁজে ভেঙে নিপুণভাবে জড়িয়ে নিয়েছে ওর দেহ পরম আদরে। সেই মেয়েটি, মীরা, এবার কৌতূহল-চোখ ফিরিয়ে নকল রাগের ভান করে।

শাসনের সুরে ডাকে, বিশু।

চোখ ফেরাতেই দেখে মাশুক দাড়িয়ে। সঙ্গে বিশু।

যেন না জিজ্ঞেস করলে ভালো দেখায় না সেজন্যেই শুধালো। গলার স্বর নাবিয়ে বলে, কে রে বিশু।

আমি কী জানি। আমাদের বাইরের শোবার ঘর আছে না, সেখানে শুয়ে ছিল।

আবার মুখ ঘুরিয়ে বসে মীরা। বাইরের ঘরে শোওয়া একটি লোক যার সঙ্গে চেনাশোনা নেই, কেমন করে কথা বলবে। লজ্জা পেলেই ভালো দেখায়, না বাকবাকুমের মতো কথার স্রোত ফুটিয়ে তোলা উচিৎ। বোধহয় সেটা ভাবনার জন্যেই আঁচলে হাত মুছে নিয়ে মাটির গায়ে আঁচড়ে কাটতে বসে যায়।

একসময় অতর্কিতে উঠে পড়ে মীরা।

বলে, আমি যাই বিশু। তুই থাক।

কিন্তু যাওয়া হয় না।

তার আগেই ওকে দেখে বেশ বড় করে ঘোমটা দিয়ে দাঁড়ান এসে এক ভদ্রমহিলা। হাবার মতো তাকিয়ে থাকে মাশুক। এক মুহূর্তে মনে হয়, রানুখালা হবার সম্ভাবনা যদি কারও থাকে, এই ভদ্রমহিলারই তা আছে। আগের চেহারা আবছা আবছা মনে পড়ে। আদল বদলেছে অনেক। সেদিনের খলখলে হাসি নেই। দেখলেই মনে হয় আগের মতো কথায় কথায় আর রসের ঢেউ তুলতে পারবেন না।

রানুখালার চোখেও বোধহয় কবে দেখা সেই চেনা মুখটা ভেসে উঠল এতক্ষণে। বললেন, মীনুবুর ছেলে মাশুক না।

পায়ে ধরে সালাম করল মাশুক।

মাথার ঘোমটা সরিয়ে বললেন, কাল রাতে তুমিই এসেছিলে। কি কা-, আমাকে বলতে হয়। উনি কেবলই বলছেন, কে যেন এসেছেন। জিজ্ঞেসও করলাম, নাম কী। বলেন, আহা হা নাম কি জিজ্ঞেস করা যায় রাত বারোটায়? কী মনে করবেন।

মনে মনে লজ্জিত হলো মাশুক, ও তাই নাকি। খালুকে আমি দেখিনি তাই বোধহয় চিনতে পারেননি।

তা কী করে দেখবে। দেখলেও কী মনে আছে।  যা হোক, খুশি হয়েছি। সত্যি সত্যি এলে তাহলে। কতবার কত লোককে বলি। গাঁয়ে কষ্ট করে কেউ আসতে চায়।

এতক্ষণে যেন বিশু আর মীরার দিকে নজর দেবার সময় হলো তাঁর।

তোরা ভাইবোনে মিলে কোথায় ধরে এনেছিস বেচারিকে।

চিবুকটা তুলে ধরে আবার বলেন, তাই তো, চোখ লাল। ঘুম হয়নি রাতে জানি। মাশুকের মনে পড়ে সেই কবে এমনি করে চিবুকে হাত দিয়েছিলেন রানুখালা। তখন সে কত ছোট।

কে যেন জবাব দিয়ে ওঠে, লাল, চোখ ঘষলেও হয় মা। শাসনের সুরে বলেন রানুখালা, সব কথাতেই তোর ফোঁড়ন কাটা পছন্দ করিনে মীরা।

তারপর মাশুকের দিকে তাকিয়ে বলেন, দাঁড়িয়ে কেন। বসো না বাবা, যা না একটা মোড়া নিয়ে আয়।

না না। তাতে কি হয়েছে ঘাসেই বসব।

তাও পারো। পরিষ্কার জায়গা।

পুকুরধারে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে বাগান। নাম জানার মধ্যে সূর্যমুখী, বেলী আর রজনীগন্ধাই চোখে পড়ল। আরো ছিল। সেগুলোর নাম মনে এলো না।

সত্যি সত্যি একটা মোড়া নিয়ে আসে মীরা। মাশুকের সামনে রেখে দিয়ে বলে, আপনি বসুন। আমরা পারিষদের মতো ঘিরে থাকি।

মাশুক বসল। আর কেউ বসল না।

মীরা ফিসফিসে গলায় বলল, বাবা।

রাতে যে ভদ্রলোক তাকে নিতে এসেছিলেন।

মাশুক দাঁড়াতে গেল। বাধা দিয়ে বললেন, না না বসুন। আমি বসব না।

বয়েস পঞ্চাশের কাছাকাছি। ছাঁটা দাড়ি। গোঁফ জোড়া বিনয়ের আতিশয্যে নিম্নমুখী। মুখে একটা  স্তব্ধ হাসি লেগেই আছে।

তোমরা সবাই সবাইকে চেনো।

রানুখালা গর্জে ওঠেন, এ আবার কেমনতর কথা হলো। নিজের খালাতো ভাই চিনবে না কেন?

সলজ্জ হন ভদ্রলোক। রানুখালার কথায় সায় দিয়ে বলেন, তা ঠিকই বলেছ। আপনি বসুন।

প্রতিবাদ করে মাশুক, আমাকে আপনি বলবেন না। আপনি আমার –

আত্মীয় হই। আচ্ছা হ্যাঁ। ভালো কথা মনে পড়েছে। দেখেছি নিশ্চয়ই। হ্যাঁ নিশ্চয়ই দেখে থাকব। 

শিশুসুলভ সরলতার একটা মিষ্টি হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে বলেন, নাম যেন কী?

মাশুক।

ও, আচ্ছা হ্যাঁ হ্যাঁ।

বোঝা গেল ‘আচ্ছা হ্যাঁ হ্যাঁ’ নিছকই লৌকিকতা। আসলে কোনোকিছুই তার মনে নেই।

কী পড়া হয়?

বোটানিতে বি. এসসি দিলাম।

কিসে, বোটানিতে, অপূর্ব। দেখলে মীরার মা এমনটি হতেই হবে।

বোটানিতে বি. এসসি দেওয়ায় কোথায় তার অপরাধ, বুঝে উঠতে পারে না।

একরকম জোর করে ওর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় এনে বলেন, তাহলে আর কথা কি। এখুনি উঠে পড়ো। তোমাকে দিয়েই হবে।

কিন্তু –

দু’জনই গম্ভীর! রানুখালা, মীরা।

মনোয়ার সাহেবের এ প্রস্তাবের জন্য কেউ যেন তৈরি ছিল না।

তবু রানুখালা প্রতিবাদ করতে ছাড়েন না। বলেন, তোমার কি মাথা খারাপ। ছেলেটা দু’দিনের জন্যে এলো। রোদে নিয়ে তাকে কষ্ট দেওয়া কেন? কষ্টের কী হলো।

রানুখালার কথা যেন কানেই পৌঁছায় না। একপাশে কলাপাতায় মোড়া কয়েকটি ফুলের ডাল পড়ে ছিল। তারই একটা তুলে নিয়ে দেখান, এটা হলো পাহাড়ি জবা।

চেয়ে দেখল মাশুক, সত্যি সত্যি একটা শুকনো ডাল। তাতে ম্রিয়মাণ কয়েকটা জবা ফুল। দু’একটা পাপড়ি ছেঁড়া।

যেতে যেতে মনোয়ার সাহেব বলেন, আমার বাগানে যে ফুল তার পাপড়ি কেমন ফ্যাকাশে। অথচ এটা দেখো কেমন লাল টকটকে।

পুকুরের খানিকটা জায়গায় যে বাগান দেখেছিল এর কাছে তা কিছুই নয়। সারাটা জমি শুধু ফুলগাছে ভরা। কোথাও আবার পাতাবাহার। কোথাও কাঁটা গাছ। ছক করে লাগানো। ফাঁকা জায়গায় পরিমিত ছাঁটা সবুজ ঘাস।

রীতিমতো মুগ্ধ হলো মাশুক। বলল, সুন্দর বাগান করেছেন খালু। মনোয়ার সাহেব থমকে যান। জবা ফুলের ডালটা পড়ে যায় হাত থেকে। লজ্জায় জিব কাটেন, বাগান কী বলছ। বাগান করা কি চারটেখানি কথা। বাগান বললেই বাগান হয়। না না, বাগান বলো না, বরং গাছের ঝাড় বলতে পার।

যতই এগুলো, দেখল ওটা নিছকই মনোয়ার সাহেবের বিনয়। গাছের ঝাড়ের চেয়ে হাজারগুণ সুন্দর, সুদৃশ্য ও সুসজ্জিত। সার করা ফুলের গাছ। হাস্নাহেনা, বেলী, সূর্যমুখী, গোলাপ সবই আছে।

মনোয়ার সাহেব এক একটা করে দেখান আর মনে হয় বাড়ির লোকদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিচ্ছেন। কেমন আত্মপ্রসাদের ভাব তার চোখেমুখে।

আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন, এটা দেড় বছর।

আবার বলেন, এটা সেদিন জন্মাল।

সাবধান করেন চলতে চলতেই, না না। ছায় ফেলো না। সূর্যের আলো না হলে বাঁচবে না।

তারপর জবা ফুলের গাছটার কাছে এগিয়ে এসে বলেন, আমার বাগানের ফুল গাঢ় না হয়ে ফ্যাকাশে লাল হলো কেন, বলতে পার। বুঝতে পারছ কিছু।

আমতা আমতা করে একটা কারণ অনুমান করে মাশুক, বোধহয় মাটি ভালো নয় তাই।

না হয় তেমন গাঢ় লাল নাই হলো, এমন দুর্ভাবনা কি আছে তা নিয়ে বোঝে না মাশুক।

মনোয়ার যেন লক্ষ করেছেন একটা উৎসাহহীনতা, একটা অর্থপূর্ণ ঔদাসীন্য। নিশ্চয়ই ভালো লাগছে না। মীরার মা ঠিকই বলেছিল, দু’দিনের জন্য এসেছে। কেন খামাখা কষ্ট দিতে যাওয়া।

একটা চারাগাছে কিছু সার দিচ্ছিলেন মনোয়ার। মুখ না তুলেই বলেন, আচ্ছা তুমি বরং যাও। ওদের সঙ্গে গপ্প করো।

কথাটা একবার করে সবাইকেই বলেন। তাই মাশুককেও না বলে পারলেন না, ওই যে বলেছি বাগানের শখ বড় সাংঘাতিক। সবাইকে দিয়ে হয় না।

হয় যে না, তা জেনে নিক। দুটো ফুলের বীচি ছড়িয়ে দিয়ে ঝাঁঝরা দিয়ে পানি দিলেই তার নাম বাগান করা হয় না। তবু কি লোকে তাঁর কথা বিশ্বাস করে। না ভাবে লোকটা বদ্ধ পাগল। আরো খানিকটা মাটি দেন চারাগাছের গোড়ায়।

মাশুক গেল না। তার অন্যমনস্কতা ধরা পড়ায় নিজেই যেন লজ্জিত হলো। নিজের ভালোলাগাটা যে বড় নয়, জীবনের এ পরম সত্য ভুলল কী করে।

সিঙ্গাপুরে সব কি তার মনের মানুষ? তারা কি করজোড় হয়ে আছে তাকে স্বাগতম করার জন্যে? ইচ্ছে করেই হয়তো কেউ আঘাত দেবে। কেউ দেবে, না জেনেই।

মনোয়ার সাহেবের মতো এই সুন্দর সহজ মানুষটিকে যদি তার ভালোলাগার খাতায় নম্বর না দিতে পারে কাকে দেবে। সিঙ্গাপুরের কোনো কোকেন-ব্যবসায়ীকে?

মনোয়ার সাহেবের অনুরোধের অপেক্ষা না করেই নিজে একটা চারা গাছ পুঁততে শুরু করে।

মনোয়ার সাহেব এসে বাধা দেন, খামাখা হাত নষ্ট করছ কেন। আমিই বরং –

কিন্তু তার সে বাধা স্বতঃস্ফূর্ত নয়। লৌকিকতাই যেন তাকে দিয়ে কথা বলাল। অথচ তার চোখ মুখ উজ্জ্বল। এমন অনুরাগীই যেন তিনি মনে মনে চেয়েছেন। পেয়েও গেছেন। খানিকটা স্বস্তি আর তৃপ্তিভাব নিয়েই সরে পড়েন একদিকে। হাস্নাহেনার বেয়াড়া একসার ডাল উদ্যত বাহু বাড়িয়ে। তারা ছুঁতে চায় পাশের ক্যামেলিয়া গাছটাকে। তাদের শিক্ষা দেবার জন্যে ধারাল কাঁচি নিয়ে সেদিকেই যান।

জানো গাছেরও প্রাণ আছে।

সায় দিতে পারে না মাশুক। তা আছে, সে আর নতুন কথা কি। রোদের আঁচটাও বেশ। কপাল পুড়িয়ে দেয়।

কথা না বলে জোরে মাটি ঠেলতে থাকে।

মনোয়ার তখনও কথা বলে যাচ্ছেন। শেষের কথা ক’টি তার কানে গিয়ে বাজে।

যেন তার ভাবনার অনুসরণ করেই বলে চলেছেন, প্রাণ আছে নতুন কথা কি। প্রাণ আছে বলেই তো প্রাণের মৃত্যু। নতুনের জন্ম। প্রাণের অজুহাতে অনন্তকালের অধিকার চাইলে নবজাতকের ঠাঁই হবে কোথায়। মনের আনন্দে তিনি কাঁচি চালান। নবজাতককে ঠাঁই দিচ্ছেন। নতুন কুঁড়ি, যারা পুরনো পাতার আড়ালে মুখ লুকিয়েছিল, আলো দেখছিল, বুক ভরে হাওয়া নিতে যাদের ছিল বারণ, তাদের আকাশ দেখিয়েছেন। আলোর মুখ দেখিয়েছেন। মুক্ত হাওয়ার নেশায় বিভোর করেছেন। মানুষ একটি শিশুকেও কি এত ভালোবাসে। এত নিষ্ঠুরভাবে জরাজীর্ণকে হত্যা করে নবজাতককে অভিনন্দন জানায়। মনোয়ার সাহেবের কাঁচি চালানো দেখে সে কথাই মনে হচ্ছিল।

রোদ চিক্ চিক্ করছে। ঠিক এখন কি করা উচিৎ – উঠে পড়বে, না ক্লান্তির অজুহাত দেখিয়ে ক্ষমা চাইবে। আসল কথা, মনের কাছে অনেক তর্ক করে, অনেকখানি উদার হয়েও ভালো লাগাতে পারেনি এসব। ভালোলাগাই বা কেন বলবে। ভালোও তো বাসতে পারেনি কাউকে। এ পর্যন্ত না। তৃণপাতঙ্গের কাছে, ভালোবাসার হাতেখড়ি নিতে হবে নাকি তাহলে বেলী রক্তাজবা রজনীগন্ধাকে ভালো না বেসে তাদের অনুরাগিণীদের ভালোলাগার আর কি কোনো পথ নেই।

ছায়া পড়ে। কটকটে রোদে এক খ- স্নেহময় মেঘ। ছায়ার দিকে চোখ ফেলতে চোখটা সত্যি সত্যি গিয়ে পড়ে সেই ছায়াদেহের ওপর।

মীরা মুখ টিপে হাসছে।

এ কি হচ্ছে শুনি।

কেন, গাছ পুঁতছি।

কিসের গাছ?

ফুলের।

হয়তো জিজ্ঞাসার জবাব এখানেই শেষ হতো। কিন্তু মীরার ঠোঁটের সে হাসি গালের ওপর ঢলে পড়ে আবার জেগে ওঠে চোখে। সে হাসি অত অল্পতে তুষ্ট নয়। আরেকটু শুনতে চায়।

যেন মীরাকে নয়, তার হাসিমুখর চোখকেই প্রশ্ন করে, ফুল ধরলে, সে ফুল ভালো লাগবে না দেখতে।

মীরা অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে ওপরের ঠোঁট বাঁকিয়ে আনে।

বলে, ফুল আমি দেখতে পারিনে।

কেন, ফুল দেখতে পার না কেন?

বড্ড ভয় করে যে।

ভয় করে কেন? খোপায়ও তো দিতে পার আর –

সকৌতুক মীরার চোখ নাচছে তখনও।

গলায় মালা করে পরতে পারি এইতো। সে হয় না। খোপাই বলুন, আর গলাই বলুন, দুইই সমান। ফুল কি থোড়াই আপনার হাতের মতো শক্ত? অল্পতেই মুষড়ে যায় দেখেননি।

তারপর চোখদুটো কেমন বড় করে ওর কানের কাছে মুখ এনে বলে, জানেন কেউ ফুল দিলে আমি তা টুপ করে পুকুরে ফেলে দিয়ে আসি। তার হাত শক্ত। কী করে জানে?

মীরা তার হাত ছোঁয়নি। নিশ্চয়ই আর কারও হাতের কথা বলছে। এতক্ষণ কথাটা ভেবে দেখেনি। ষোলো সতেরো বছরের বিপজ্জনক সীমানায় প্রীতি উপঢৌকন দেবার কথা আগেই হয়তো ভেবে থাকবে কেউ। এবং দিয়েও থাকবে। অথচ সেটা যে মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করবে, তাও হয় না।

আচ্ছা মীরা –

মীরা পরনের শাড়িটা কয়েক পাক ঘুরিয়ে নিয়ে আঁচলটা কোমরে গুজল। তারপর ধপাস করে মাটিতে বসে বলে, কি?

জানো আমি সিঙ্গাপুর যেতে চাই।

সেটা আবার কোথায়?

মীরার চোখেমুখে বিস্ময়।

অনেক দূর। সেজন্যেই তো ভাবলাম সকলের সঙ্গে দেখা করে নিই যাওয়ার আগে।

সকলে মানে?

মানে তোমরা, রানুখালা, তুমি সবাই।

এমন হঠাৎ করে না বলে, ধীরে সুস্থে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললেই ভালো হতো বোধহয়। সিঙ্গাপুরের কথা উল্লেখ করে কোনো আকাক্সক্ষনীয় প্রভাব সৃষ্টি করা যায়নি।

নিজের মনকেই যেন ভয় দেখাচ্ছে মাশুক, এমনি সুরে বলে, জানো সেখান থেকে অনেকে ফিরেও আসে না।

আপনি ফিরে আসবেন না?

আমি, ইতস্তত করে মাশুক, কী জানি। কী আর হবে। যদি ফিরেই আসি।

তবে কী?

তবে আমার জন্যে একটা জিনিস আনতে বলব।

কথাটা বলেই থামল মীরা।

যেন উৎসাহের স্রোতে ভাটা পড়ে কোথাও।

বলে, না থাক বলব না। অনেককে বলেছি। মুখে আনাই ভুল হয়েছে।

তবু পীড়াপীড়ি করে মাশুক একবার বলেই দেখো না।

হঠাৎই করল। কে যেন তাকে উচ্ছৃঙ্খল সাহস দিলো। ব্যাকুলতা দিলো। চট করে মীরার হাতটা তুলে নিয়ে রাখল নিজের হাতের মুঠোয়। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে মীরা, ছিঃ আপনার হাতে যে ধুলো।

মাশুকই লজ্জিত হলো ওর চেয়ে বেশি। জীবনের এই প্রথম শুভ লগ্নটি মাটির জন্যেই মাটি হলো। রাগ হচ্ছিল বাগানপ্রীতির ওপর।

হাতটা পরিষ্কার থাকলে আরো কতক্ষণ মীরার উষ্ণতার মাদকতায় সে নেশা করত। নেশা করাতোও হয়তো।

হাত ঝেড়ে নিয়ে বলে, আচ্ছা কী বলতে চেয়েছিলে বলেই দেখো না।

বলব, অত্যন্ত সঙ্কোচে, সলজ্জ কণ্ঠে কথা ক’টি উচ্চারণ করে মীরা। মেয়েরা যেমন মাথায় দেয়, তেমনি একটা রঙিন ছাতার আমার বহু দিনের শখ।

॥ চার ॥

সামান্য এক টুকরো মেঘ। দেখতে দেখতে ছেয়ে যায় আকাশ। অন্ধকারের অশরীরী ছায়ারা নাবে। ছুঁয়ে ফেলে উদ্ধত কৃষ্ণচূড়া, ঝাউগাছ, পথপ্রান্তর। কালোর বিভীষিকা তার ডানা চুঁইয়ে দিঘীর ঘোলাটে পানির রঙটাই দিলো বদলে। অশুভ উদ্বেগ মাথায় করে বোকা দৃষ্টি নিয়ে তাকায় বাঁশঝাড়টা। দমকা হাওয়া ভয়ের খবরটা হিস্ হিস্ শব্দে বলে যায় তার কাছে। কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধতা। সৃষ্টির সমস্ত গতির টুটি চেপে ধরেছে কেউ। বিব্রত পৃথিবীকে চোখ রাঙায় অতর্কিত কয়েকটা বিদ্যুৎ শিখা।

শাসরুদ্ধ গতি পথ পেয়েছে, আবার সৃষ্টি এবার ধ্বংসের সঙ্গ নেবে। অশান্ত বিদ্রোহী হাওয়ার চুলের ঝুঁটি ধরে ফেলেছে সে। ভাঙার শপথ নিয়ে ভাঙনের ইতিহাস লেখার প্রতিশ্রুতিতে সে আজ ভয়ঙ্কর। মাথা নাবিয়ে কুর্নিশ করেছে বাঁশঝাড়, ভূলুণ্ঠিত সুপারির সারি। কেবল একটা উদ্ধত বট আর নিমগাছ মাথা জেগে। অনেক ইতিহাস আর কালের মৌনতা নিয়ে যারা দীর্ঘায়ু হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল, পদানত হতে শুধু তারাই বাকি।

একে একে সবই গেছে। খড়ছাওয়া ঘরে দরজা, টিনের চালাঘর, কেরোসিন বাতির থাম। উপেক্ষিত হয়ে শিমুল তুলোর মতো ভেসেছে, কণা কণা হয়েছে তৃণখ-ের মতো।

শেষ যুদ্ধ তখনও বাকি। রণক্ষেত্রের শেষ দুই সৈনিক এখনও সতান্ত দেয়নি ওই বট আর নিমগাছ।

ঝড়ের তা-বলীলার দিকে তাকাতে গিয়ে এক একবার মাশুকের নিজেরই মনে হয়েছে, ওরা পারবে। ওরা যেন অনেক যুদ্ধ-জেতা অনেক পরাভবসহ, অনেক ইতিহাসদ্রষ্টা। ঝড় আগেও এসেছে। এবং গেছে। পরাভূত হয়েছে প্রত্যেকবার। এবারও হবে। কিন্তু হলো না। একটা উন্মুক্ত ক্রুদ্ধতা দু’বাহু বাড়িয়ে সাঁড়াশির মতো ধরে ফেলল বটগাছটাকে। তারপর রূপকথার বুভুক্ষু দানবের মতো এক একটা হাড় চিবিয়ে খেল। গোটা বটগাছটাই মাথা নোয়াল। সত্তর বছরের পরাক্রম ভূলুণ্ঠিত। সহচরের পরাজয়ে নিমগাছের মনোবল ভেঙেছে। হাল ছেড়ে সেও শেষশয্যা নিয়েছে।

সমস্ত ঘর যখন দুলছে, শক্তপালার খুঁটি মাঝে মাঝে আর্তনাদ করে ওঠে, হারিকেনের আলোয় ভয়ে ভয়ে চোখ মিটমিট করে, কী মনে হয়েছে তখন। একটি স্বার্থপর বাসনা। যে বাসনায় সকলের প্রতি নিদারুণ ঔদাসীন্য। কেবল একটি নরনারীর পরিত্রাণ কামনা?

মীরার চোখে সে প্রশ্নের কি জবাব!

সেদিকেই তাকাল। অথচ তাকালে গিয়ে মনে হলো সে জবাবের আগেই অন্য একটা জিনিস আবিষ্কার করেছে সে। অন্ধকারে মীরার চোখের রঙ যা, দেহের রঙও তাই। সমস্ত দেহ তার চোখ হয়ে যায়। সমস্ত দেহ, চোখ। সমস্বরে তারা বলে, এ প্রলয়ে আমরা যদি শেষ হই, তুমিও হও কি। নীরব মৃত্যুকে দু’বাহুটি বাড়িয়ে তুমিও কি উষ্ণ আলিঙ্গন করো।

হাওয়ার বেগ বাড়তে থাকে। একসময় জানালার একদিকের কপাট খুলে যায়। বাতাসের সঙ্গে এক ঝলক বৃষ্টি। খোলা জানালায় জ্বলজ্বল করে ওঠে। ক্রুদ্ধ আকাশের চোখ। সে চোখে লিকলিকে আগুনের শলতে। বাজ পড়েছে কোথাও।

মীরা কাঁপছে। সরে এসেছে খানিকটা। না তাকিয়েও তার সান্নিধ্য অনুভব করে মাশুক।

জিজ্ঞেস করে, ভয় লাগছে।

না তো। ভয় লাগবে কেন।

আশ্চর্য করুণ মীরার স্বর।

একদম ভিজে গেছ দেখছি।

কিন্তু মীরার কাছে এই ‘দেখছি’টা দুর্যোগময় রাতে সতৃষ্ণ পুরুষ-নয়নে একটি অসহায় মেয়েকে আবিষ্কারের মতো নির্লজ্জ। ভেজা শাড়ি। এ ‘দেখা’ যে অনাস্বাদিত দেহের লুক্কায়িত পরম নিবিড়তাকে দেখা নয়, কে বলবে।

ভেজা জায়গাটা সামলে নেয় মীরা। কুণ্ঠিত হয়ে সরে আসে খুঁটির কাছে। হাতদুটো পেছনে এনে ভর করে দাঁড়ায় আধ হেলান দিয়ে।

তারপর অর্থহীন একটা প্রশ্ন করে, সিঙ্গাপুরেও কি এমন ঝড়?

জানবার কথা নয় মাশুকের। বাইরের জগতে দেশ-কাল-পাত্র ভেদে দুর্যোগের চেহারা হয়তো একই রকম। ঝড়ের তা-ব তেমনি আতঙ্কজনক। কিন্তু বাইরে দুর্যোগটাই সব নয়। মনেরও একটা দুর্যোগ আছে। আজ, ঝড় না চললেও, যা চলতে পারত। ঝড় চলাতেও যা বন্ধ হয়নি। হয়ও না। একটি মেয়েকে চাওয়া-পাওয়ার কাক্সিক্ষত বেদনা নিয়ে এবার যেমন পলাশপুরে উঠতে পারে, সিঙ্গাপুরেও পারে।

কিন্তু তার অর্থহীন কল্পনাগ্রস্ত মনকে হঠাৎ থামিয়ে দেয় মীরা। ইচ্ছে করেই আজ কথার গায়ে একটু কটাক্ষের ছোঁয়া দিতে ভালো লাগছে তার।

আপনারা আমাদের কেমন আত্মীয়।

প্রশ্নটি করে নিজেই যেন লজ্জা পেল মীরা। বড় বড় দু’চোখে ক্ষমাসুন্দর হাসির প্রলেপ লাগিয়ে বলল, কিছু মনে করেননি তো, জিজ্ঞেস করলাম বলে।

একবার মনে হয়েছে নিরুত্তর ভদ্রতায় জানিয়ে দেবে কতবড় অপমান করেছে তাকে মীরা।

নিরুত্তর থাকল না মাশুক। বলল, কেন জানো না।

জানি। তবু জিজ্ঞেস করছি।

গলার স্বর মাশুকের বেশ চড়া এবার, নিকট আত্মীয় না হলে কি আত্মীয় হওয়া যায় না।

বারবার বৃষ্টির সঙ্গে গলা মিলিয়ে তুষার গলানো মিষ্টি সুরে বলল মীরা ভ্রƒযুগল বাঁকিয়ে, তা কেন হতে যাবে। আত্মীয় না হলেও নিকট হওয়া যায়।

কী মনে করে কথাটা বলেছে মীরা? গভীর ইঙ্গিত যদি থেকেও থাকে, তা কি আশা করা উচিৎ। তাও মীরার কাছ থেকে। মনে মনেই তর্ক করে মাশুক, যেটা অভাবনীয় সেটা কি একেবারেই হতে পারে।

এক মুহূর্ত মনে হয়, সিঙ্গাপুর যাওয়া তার জীবনের পরম লক্ষ্য হতে পারে না। ভালোবাসা না পাক, পরম আত্মীয় না হোক, একটি অপরম আত্মীয়কে মনে ঠাঁই দিলে সে কি কল্পনার সেতু তৈরি করতে পারে না। তার আবিষ্কৃত আত্মীয়তার এই ক্ষীণ তটরেখায় দাঁড়িয়ে সে অনন্ত একটা সূর্যাস্ত তো দেখতে পারে। রানুখালার বাড়িতে যেচে আসার কোনো অজুহাতই তার ছিল না। কবে একবার উচ্ছল একটি হাসিতে শুধু একটা লৌকিকতার আমন্ত্রণ জানিয়ে গিয়েছিলেন। আমন্ত্রণ হয় অনেক। সব আমন্ত্রণ, আমন্ত্রণরক্ষার অভিলাষ ঘোষণা করে না।

অতর্কিত ঝড়ের মতো এসে উপস্থিত হয় রানুখালা। আপাদমস্তক ভেজা।

হাটু পর্যন্ত শাড়িটা ভেজা। কাদার ছিট জায়গায় জায়গায়। সাদা পাকা চুলের শলতে বেয়ে পানি পড়ছে দরদর করে।

মীরাকে পুরুষের নিবিড়তায় ও এতখানি সান্নিধ্যে আবিষ্কার করেও কোনোমতেই অবাক হতে পারলেন না যেন। তার চোখেমুখে আতঙ্কের ভাষা এতই মূর্ত। বিবর্ণ ঠোট কাঁপছে।

কথা বললেন যেন অনেক সাধ্য সাধনা করে। মনকে অনেক অনেক প্রবোধ দিয়ে। তবু যে আশঙ্কামুক্ত করতে পারেননি, তার ধরে আসা গলায় গোপন থাকে না তা।

করম আলী নৌকো নিয়ে ফিরে এলো এই মাত্র। ঘাটে ওকে পাওয়া গেল না। কি হবে তাহলে?

প্রশ্নটা করে যদিও তাকান মীরার দিকে তবু তার দৃষ্টির অসহায় হা যেন এসে থামে মাশুকের ওপর।

কাঁঠালচাপার চারা আনতে গিয়েছিলেন মনোয়াম রূপসাই। অর্ধেক পথ নৌকোয় যেতে হয়। ফেরা পথেও তাই। এখন মনে হচ্ছে তিনি ফিরে আসা দূরের কথা, গিয়ে পৌঁছুলেন কি না তাই সন্দেহ। অনেকে মানা করেছে। মনোয়ার শোনেননি। রূপসাইয়ের আফজল আলীকে কথা দিয়েছেন। ওরকম ভালো জাতের কাঁঠালচাপা এদিকে হয় না।

সন্ধ্যার আগেই ফিরবেন কথা ছিল। কথামতো করম আলী নদীর ঘাটে গিয়েছিল নৌকো দিয়ে। ঝড়ের দিনে লগি ঠেলা সহজ নয় জেনেও। করম আলীর খোঁজ নিয়ে এই মাত্র ফিরছেন রানুখালা। ঘরের নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে জানালার ওধারে দুর্যোগময় বিধ্বস্ত পৃথিবীকে দেখতে ভালো লাগল। দর্শকের ভূমিকায় সে দুর্যোগ অবাঞ্ছিত মনে হয়নি। একমাত্র সক্ষম আত্মীয়-পুরুষের কাছে আত্মীয়-মহিলা আবেদন নিয়ে এসেছেন। তাকে বিমুখ করা কঠিন। আরো কঠিন এজন্যে যে, সে দেখতে পেয়েছে মীরার শানিত দৃষ্টিও তাকে শাসন করে বলছে : প্রমাণ করো তুমি কাপুরুষ নও।

ঝড় তেমন নেই। বৃষ্টি পড়ছে তখনও। দীর্ঘশ্বাসের মতো হু-হু শব্দ হাওয়ার। ওই শব্দই কখনও মনে হয় মধুর গুঞ্জনের মতো। ধ্বংসস্তূপে কারও বীণাবাদনের মতো করুণ অথচ দাম্ভিক।

চালাঘর, পর্যুদস্ত বাতাবি লেবুর ঝাড়, সুপারি গাছ, অসংখ্য ডালপালা কঙ্কালের মতো ছাড়িয়ে। একটা রক্তক্ষয়ী মৃত্যুতে অনেক সৈনিকের মৃত্যু। কারও অনুমতির অপেক্ষা না করেই দরজাটা শব্দ করে খুলল মাশুক। তলোয়ার-ধার বাতাস ঢুকল ঘরে। অদ্ভুত শীতল স্পর্শে চমকে যান রানুখালা, মীরা দু’জনেই।

লণ্ঠনটা তুলে নিল। মৃদু কাঁপা আলো কিছুটা পড়ে মাশুকের মুখে।

একটা নিশ্চিন্ত আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতির ভাষা পড়লেন সে চেহারায় রানুখালা। একবারেই যেতে দিলেন না। তাঁর স্নেহমাখা হাতখানা তার কপালে ঠেকান। চোখ বুজে কি যেন আওড়ান। পরম আশীর্বাদ তার কপালে হাত ছোঁয়, চিবুক স্পর্শ করে, চুল বুলিয়ে দেয়। রানুখালা কড়ে আঙুলে রুপোর আংটি যখন লাগে মনে হয় হিমশীতল। তার অগাধ বিশ্বাসের পলিমাটিতে এটাই যেন সন্দেহের একটু কারা         প্রস্তরখ-।

কী বলেছেন রানুখালা। আরোধ্য দেবতার কাছে কী বলেছেন। সাহস দাও, ধৈর্য দাও, অতর্কিত সহ্য করার ক্ষমতা দাও।

সজল হয়ে আসে দুটো চোখ। প্রার্থনা। একটি রমণীর, শঙ্কাগ্রস্ত স্ত্রীর দুর্বলচিত্ত জননীর। তার চেয়েও বড়, অলক্ষণীয় নির্দেশ একটি মেয়ের শানিত দৃষ্টির। ভাষাশূন্য যে দৃষ্টি তাকে কিছু না বলেও অনেক কিছু বলেছে। অনেক ভরসা দিয়েছে। তার যাত্রাপথ সুগম করেছে। ছাতা ছাড়াই বেরুচ্ছিল মাশুক। রানুখালা ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। মেয়েকে ডেকে বলেন, ছাতাটা নিয়ে আয় না। এই বৃষ্টিতে যাবে কী করে! মীরার হাত থেকে ছাতাটা নিতে গিয়ে একবার তাকাল মাশুক। রানুখালাও তাকান।

কে বুঝি কানে কানে তাকে মন্ত্রণা দিয়েছে। একমুহূর্ত কি ভেবে বলেন, যেতে চাস তুইও যা না। করম আলী তো সঙ্গে আছেই। হয়তো খুশিই হবেন তুইও এসেছিস দেখলে।

কিন্তু মাশুকের মনে হলো এই পাথেয়টা যেন তাকে খুশি করার জন্যেই। যে ছাতা ছাড়াই বেরুতে পারে, ভিজতে তৈরি থাকে বৃষ্টিতে, একটু নিবিড়তা পরম সাধ করে তাকে হয়তো তুলে দেওয়া যায়। দরকার হলে আবার যেতে হবে নৌকো নিয়ে। মনোয়ার হয়তো ওখান থেকে আসবার পথে নৌকোই পাননি। অথবা ইতোমধ্যে ঘাটে এসে পৌঁছেছেন। খেয়াপারারি পাওয়া যাচ্ছে না।

ঘাটের কাছাকাছি আসতেই বৃষ্টির বেগ বাড়ল। ছাতার আশ্রয়লাভের জন্যেই অনেকখানি কাছে সরে আসে মীরা। কিছু দেখা যায় না। ঘষা কাঠের মতো দৃষ্টিপথ ঘোলাটে; খাল ভরে গেছে পানিতে। এখন শুধু স্রোতের কলকল শব্দ। দু’একটা কচুরিপানা ও শাপলার জড় স্রোতের সঙ্গে।

মীরার কথা শোনা গেল না। শোঁ শোঁ হাওয়ার শব্দে তার কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে। মুখ নাবিয়ে বলে মাশুক, কিছু বলছিলে।

কানের কাছে সত্যি এবার একটা আর্তনাদ শুনল। হাওয়ার বেগ, নদীর স্রোত, কোনোকিছুই ডুবিয়ে দিতে পারল না সে উচ্চারিত শব্দ ক’টি। বাবা যদি না ফেরে –

মধ্যযুগীয় সাহস তাকে দিয়ে ভরসার কথা বলায়। বিপন্ন নারীর প্রতি পুরুষের           স্তোত্রবাক্য। না না, তা হতে যাবে কেন। দরকার হয় নৌকো নিয়ে যাবো।

নৌকো যদি ডুবে যায়।

সাঁতার কাটব।

আমি তো সাঁতার জানিনে।

তুমি এখানেই অপেক্ষা করবে।

বাঃ একা একা আমার ভয় করবে না।

তা করতে পারে। কিন্তু সব দায় কি তার। সব পরিণতির কথা শুধু তাকেই চিন্তা করতে হবে। মনের যুক্তি নির্মম হতেই বলেছিল। মুখের ভাষা তা দিলো না।

অপার আশ্বাস ও ভরসায় ধরল মীরার হাত। পৃথিবীর সমস্ত দুর্বিলাষ, দুর্যোগ ও সঙ্কটের কবল থেকে যে আশ্বাস ও ভরসা তাকে বাঁচাবে বলে কথা দিয়েছে। আমার সঙ্গেই থাকবে। নৌকো ডুবলেই তোমাকে ডুবতে দেবো, তাই ভাবো নাকি।

দু’আঙুলে ওর চিবুকে টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করে মাশুক।

করম আলী হারিকেনের শলতে উঁচু করে বাতির তেলটা ঝাকিয়ে নেয় আবেগ নিয়ে এমন খেলা অনেক দেখেছে। এখন সে বয়স নেই, উৎসাহও নেই। মন তার নদীর গভীরের মতো। যেখানে পাক পড়ে কিন্তু থাকে না। ধুয়ে মুছে যায়।

একটা কালো ছায়া দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়ে করম আলী।

দেখো তো মাশুক মিয়া ওদিকে ঠাহর করে।

ঠাহর করার দরকার হয় না। নিকটেই বেল গাছ। ওর হারিকেনের আলোয় তারই ছায়া পড়েছিল।

খাল যেখানে রূপসাই নদীর সঙ্গে মিশেছে সে পর্যন্ত যাওয়া ঠিক হলো শেষটায়। ছইবাঁধা নৌকো ঘাটেই বাঁধা ছিল।

করম আলী উঠল প্রথম। পেছন পেছন মীরা আর মাশুক। হাত ধরাধরি করে বসল ছইয়ের ভেতরে। সামনে খুটির সঙ্গে হারিকেন। নইলে ভেতরটা অন্ধকার। টুপ টুপ করে বৃষ্টি পড়ছে। কাঠের তলায় জমা পানির ছলছল শব্দ। তবলা সঙ্গীতের বাজে বাইরে ছোট ছোট ঢেউয়ের মৃদু আঘাত। সব মিলিয়ে শব্দ, ভয় ও শঙ্কার এক আশ্চর্য জগৎ। এ জগৎ শেষ না হলেই যেন ভালো।

কতক্ষণ? এক ঘণ্টা, দু’ঘণ্টা। তারপর? তারপর নিরাসক্ত করম আলী যদি হাল ছেড়ে বসে থাকে, স্রোতের মুখে যদি এমনি ভাসতে থাকে নৌকো কোথায় শেষ। এমনি যদি শুধু ভাসে আর ভাসেই। তারপর একদিন তো দুর্যোগের মেঘ কাটবে। অন্ধকার ভীরু রাত্রি থাকবে না।

তার জায়গায় আসবে আশ্চর্য সতেজ আলোভরা সকাল। তীরভূমি ফুটে উঠবে কোথাও। সে তীরভূমিই হবে আশ্রয়।

চিন্তার খেই ভেঙে দেয় মীরা। কাছে সরে আসে। শুকতারার মতো জ্বলে তার চোখের মণি। একটা হাত বাড়িয়ে বলে, ধরুন তো একটা আঙুল।

কী হবে তাতে।

যাই হোক। ধরুন না।

না, আগে বলো।

তাহলে থাক।

এতটুতেই অভিমান। হাত গুটিয়ে নেয় মীরা।

মাশুক এবার নিজেই উদ্যোগী হয়ে বলে, থাক জিজ্ঞেস করব না। কোন হাত ধরতে হবে বলো।

হাত নয়। আঙুল। যে-কোনো একটা ধরুন।

ধরল।

হারিকেনের কৃপণ আলোতেই দেখতে পেল মীরার চোখের পাতা ভারি হয়ে এসেছে। মনে মনে যে ভাগ্য নিয়ে জুয়া খেলতে বসেছিল তাতে হার হয়েছে। এখুনি ভেঙে পড়বে কান্নায়। ঠোঁট কাঁপছে।

মীরা কাঁদল না। নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বাড়িয়ে দিলো ওই হাত।

এবার ধরুন তো আরেকটা আঙুল।

দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরেছে ওপরের ঠোঁট। নিশ্বাস পড়ছে না। ভাগ্যের জুয়ায় আরেকবার রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা। কড়ে আঙুলটা ছোঁয় মাশুক এবার।

একটু আগে কান্নায় যে ভেঙে পড়বে মনে হয়েছিল, একন সেই যেন ভরসার আলো দেখতে পেয়েছে। খুশিতে ফেটে পড়ছে।

দেখবেন, বাবা নিশ্চয়ই ফিরবে, কথা ক’টা উচ্চারণ করতে গিয়ে গায়ে পড়েই যেন কনুই দিয়ে মৃদু একটা আঘাত করে। এবং সেটা যেন তার অযাচিত সন্দেহ মোচনের জন্যে।

তুমি কড়ে আঙুল দিয়ে এসব বোঝো নাকি।

হ্যাঁ!

কখনও মিথ্যে হয় না।

না।

মনে মনে ঠিক করল এমনি আরেকটা জুয়া খেলতে বলবে মীরাকে।

কারও ফিরে আসা না-আসা নিয়ে নয়। কাউকে ভালো লাগা না-লাগা নিয়ে।

হঠাৎ নৌকোটা একটা তীব্র বাঁক ঘুরে এক জায়গায় এসে থামল। করম আলীর চিৎকারে বোঝা গেল ব্যাপারটা। এবার বেলগাছ নয়। সত্যি সত্যি মানুষের ছায়া দেখতে পেয়েছে। এবার ভুল হয়নি।

মীরা ছইয়ের বাইরে এসে দাঁড়ায়। পারলে এখনি যেন ঝাঁপ দিয়ে তীরে ওঠে।

যেন ভুত দেখল মাশুক। মনোয়ার দাঁড়িয়ে আছেন স্থিতির নিশ্চেতন মূর্তির মতো। সুঁচের মতো তীক্ষè হাওয়া, অঝোর বৃষ্টি মাথায় করে। এক হাতে ব্যাগ। দু’একটা ফুলের চাড়া মাথা বার করে আছে। নির্দয় বর্ষণে চাড়াগাছের কচি পাতা ঝরে পড়েছে।

বিস্মিত হবার কথা। কিন্তু বিস্মিত হলেন না মনোয়ার। এখন এ যেন তিনি আশা করেছিলেন। অভ্রান্ত বিবেকের নির্দেশ পেয়েছে, নৌকো আসবেই। তিনি যে ঘাটে পৌঁছুতে পারেননি, পায়ে হেঁটে হেঁটে এতদূর এসেছেন তা জানবেই। রানুখালা এখন বহুবার তাকে দুর্জ্ঞেয় পথ থেকে ঠিক ঠিক খুঁজে বার করেছেন। এবারও করবেন। তার বিশ্বাস শিথিল হবার নয়। আর এজন্যে তিনিও তো কম মাশুল দেননি। মাশুল দিয়েছেন অধীর না হয়ে। ভাগ্যকে অভিসম্পাত না করে। যা অবধারিত যা ঘটতোই, তাই ঘটেছে।

কথা বলতে পারছেন না। বুকের ওপর হাতটা বুলিয়ে নেন একবার। বোধহয় ব্যথা করছিল। বেদনায় বিষাক্ত একটা স্রোত বইছে সেখানে, দাঁতে ঠোঁট চেপে নিশ্বাসরুদ্ধ হয়ে থাকেন। মীরা তাকাতে পারে না। চোখজোড়া খুললে যেন অচেনা মানুষের ছবি ফুটে উঠবে। এত রিক্ত, অসহায়, বিধ্বস্ত মানুষ কখনও দেখেনি।

মনোয়ার তাদের দেখে স্বস্তির নিশ্বাসও তো ফেলতে পারতেন। তীব্র চিৎকার জনশূন্য নদীতীরে, এই দুর্যোগময় রাতের বুকে পারতেন ভয় ধরিয়ে দিতে। মনে মনে বিরক্ত হয় মীরা। দুঃখে হা-হুতাশ করার, আনন্দে অধীর হওয়ার লোভটুকু পর্যন্ত নেই। নিজের জন্য নয়, লজ্জা হয় তার সঙ্গের এই দূর-আত্মীয়টির জন্যে। সে তো মনে মনে একটু কোলাহল, একটু উত্তেজনা আশা করেছিল।

হাত ধরাধরি করে তোলা হলো নৌকোয়। ছইয়ের ভেতর জায়গা নেই। বাপ আর মেয়ের জন্যে সেটা ছেড়ে দিতে হয়। আশ্চর্য, মনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির উত্তেজনাও স্তিমিত। কে যেন হঠাৎ একটা দাড়ি টেনে দিলো। ক্রুদ্ধ হাওয়াকে ফুৎকারে দিলো উড়িয়ে, বৃষ্টির ধারা যে মেঘে মেঘে ছিল সে মেঘে মেঘেই দিলো ফিরিয়ে। কেবল শাসন মানল না রূপসাই নদী। স্রোতের বুকে লঘু পা ফেলে ফেলে সে যে চলছে চলছেই। থামো বললেই থামানো যায় না তাকে। অনেক বেঁকে, ঘুরে, অনেক খড়কুটো মাথায় করে তাকে পৌঁছুতে  হবে আরেকটা শাখা নদীতে। সে নদীতে থেকে আবার বড় নদীতে।

শান্ত আকাশ নেয়ে উঠেছে। একটা কালো মেঘের আস্তর যে একবার উঁকি দিয়ে গেল লাজুক চাঁদ। তারপর ঢাকা পড়ল। যতক্ষণ নৌকো চলেছে, এমনি খেলা আকাশে।

ভেতর থেকে দুর্বল একটা কণ্ঠস্বর কানে এলো। মনোয়ার কী যেন বলার চেষ্টা করছেন।

একবার উঁকি দিলো ছইয়ের ভেতর। পায়ের কাছে একদলা কাপড়ের মতো পড়ে মীরা। মাথা কাত করা হাতের উপর মনোয়ার কাঁপছেন, নইলে তাদের কোনো ভূমিকা নেই।

যাত্রী নিরাপদে পৌঁছাক করম আলীর মতো এ বাসনা তারও না হয়ে যে উপায় নেই।

যখন সমস্ত আকাশটাই ভেঙে পড়বে পৃথিবীর ওপর আর তার ভারে পুতুলঘরের মতো গুঁড়িয়ে যাবে মনে হয়েছিল, তখন সে ছিল এক মুহূর্তের ভরসার নাবিক। পুতুলঘর ভাঙেনি। ধুয়েমুছে কে যেন তাকে করেছে আরো সুন্দর। সবুজ হয়েছে আরো সবুজ, নীল আরো নীল, পীতাভ আরো পীতাভ। এমন সুন্দর পৃথিবী। সাহসকে যেখানে ঘুরতে হয় নিরাশ হয়ে দ্বারে দ্বারে।

তীব্র মিষ্টি ঘ্রাণ। বন্য ফুলের আমন্ত্রণ এইমাত্র ছড়িয়ে পড়ল হাওয়ায় হয়তো। একপাশে দুলে উঠল নৌকো। মীরা পেছনে দাঁড়িয়ে। হয়তো ফুলের ঘ্রাণ নয়, তার সুরভি তেলের গন্ধটাই আসছিল এতক্ষণ।

শুচিশুভ্র পৃথিবীতে অপূর্ব মনে হলো একটি মেয়েকে। হঠাৎ করে চলে আসা, দু’হাতে ধরে খোপা ভেঙে দেওয়া, ভীরু নিশ্বাসে বুক দুরদুর করা, এ যেন শান্ত সমাহিত পৃথিবীকে নিয়ে রচিত কাব্যেরই এক স্তবক। চোখাচোখি হলে লজ্জা পাবে হয়তো। মাশুক না তাকিয়েই বলল, ঘুমাচ্ছিলে না।

উঁ।

উঠে এলে যে।

ভয় করল।

ভয় করল কেন?

ভেতরে অন্ধকার। তাছাড়া মশা কামড়ায়।

উনি ঘুমুচ্ছেন।

অনেকক্ষণ যে কথা বলবে বলে ভেবেছিল সেটা হঠাৎ মনে হয়ে যাওয়ায় চোখদুটো বড় করে তোলে। এক নিশ্বাসে বলে, চোখ মেলেই কী বললেন বাবা জানেন? বললেন, আমার চারাগাছগুলো ঠিক আছে তো। তরতর করে নৌকো ছুটছে। মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক সেই একসুরে ছন্দ কেটে যায়। দুটো জোনাকি তাকে দেখে হাসল।

দু’বার মিটমিট করে জ্বলে আবার নিবল।

তুমি কী বললে?

বলছি, বলে চুপ করে বসে পড়ল। অমন চমৎকার জবাবটা শোনাতে হলে একটু জাঁকিয়ে না বসলে যেন চলে না।

আপনি সরে আসুন না এদিকটায়।

ছইয়ের সামনে অল্প একটু জায়গা। দুজন ঠাসাঠাসি করে বসতে পারে বড়জোর। পাদুটো ছইয়ের ভেতর লম্বা করে জায়গা করে দেয় মীরা, বসুন।

দ্বিতীয়বার অনুরোধ করতে হলো না। নিজেই বলল, কী বললাম জানেন। বললাম ফুলের চারায় দশটা পাতা ছিল। তিনটে নিহত। আর দুটো একটু জখম। হাসপাতালে পাঠাতে হবে বোধহয়।

মুখটা সামনে ঝুঁকিয়ে একটু ভারিক্কি চালে বলল, বলুন তো কোথায় নিজের শরীর নিয়ে ভাবনা, না ফুলের চারার তা নিয়ে মাথাব্যথা। ফুলের কী হলো। যতসব মাথামু-ু। দেখবেন না ফুলের বাগানটা একদিন সত্যি সত্যি গরু দিয়ে খাইয়ে দেবো। সব ল্যাঠা চুকবে।

মনে মনে কৌতুক বোধ করছিল মাশুক। কিন্তু কোথায় সে বিরক্তির একটা কাঁটা খুটছে খরখর করে।

মনোয়ারের হয়েই ওকালতি করে, বলে কারও যদি কোনো জিনিস ভালো লাগে তোমার কী মাথাব্যথা।

কোনো জিনিস মানে, গোল গোল চোখে তাকায় মীরা।

মানুষ, ফুল, গাছ, যাই হোক না কেন।

ফুলগাছ আর মানুষ কি এক কথা হলো।

ভয়ানক যুক্তির কথা বলেছে যেন এমনি আত্মপ্রসাদের সুর তার গলায়। মেধাবী ছাত্রের কৌতূহলপ্রিয়তাকে যেমন কৌশলে প্রতিহত করে অভিজ্ঞ মাস্টার, তেমনি নিজেকে সামলে নিল মাশুক। যুক্তির যে সোজা পথ চোখে পড়ল, কাজে লাগাল তাকেই। বলল, ফুলকে ভালোবেসে একজন যে আনন্দ পায়, অন্যজন হয়তো তাই পায় মানুষকে বেসে।

জবাব যেন তৈরিই ছিল মীরার জিভের ডগায়।

কই মানুষকে ভালোবাসতে আমি তো না করিনি।

বলেই আড়চোখে তাকায় মাশুকের দিকে। তটরেখা আবিষ্কারের নেশায় দূরবীণ চোখ নিয়ে যেমন তাকায় নাবিক।

অন্যমনস্ক হয়েও টের পেল মাশুক, কড়ে আঙুলের মৃদু টোকা। সেই কড়ে আঙুল, টোকা নিয়ে কিছুক্ষণ আগে ভাগ্যের জুয়া খেলছিল মীরা। আগের কথার খেই ধরেই শুধোল, বলুন না আমি কি না করেছি? মানা করেছি আমি।

॥ পাঁচ ॥

কাপড়বোঝাই বালতিটা অতিকষ্টে হাতে করে নিয়ে ফিরছিল মীরা। সঙ্গে বিশু, অতবড় ভার সামলাতে হিমসিম খেয়ে যায়। হাতের শিরায় শিরায় খিঁচুনি। রক্তের ছোপ জেগে ওঠে দু’গালে। কপালে ছিন্ন হার মুক্তোর মতো ইতস্তত ছড়িয়ে ঘামের ফোঁটা। বাতির আংটা ধরতে যায় বিশু। বোধহয় ভার লাঘবের জন্যে। ভার তাতে লাঘব হয় না। বিরক্তিই বাড়ে।

খিচিয়ে ওঠে রাগে মীরা, ধরলে মাঝখানে ধর না। ওখানে ধরে আর নাম করতে হবে না।

কিন্তু বিশু যে তা পারে না সেটা যেন নিজেই পরে বোঝে।

আচ্ছা থাক, থাক। আমিই পারব। যা।

বিশুকে ছুটি দিয়ে একরকম খোড়াতে খোড়াতে বালতিটা নিয়ে তোলে উঠোনে। একরাজ্যের কাপড়। শাড়ি, সায়া, সেমিজ, সার্ট, বানিয়ান। আস্ত একখানা ভেজা শাড়ি তুলে নেয়। কোনোমতে দু’হাঁটুর ফাঁকে সেটা সাঁড়াশির মতো ধরে কুঁজো হয়ে পানি চিপতে থাকে। অবারিত চুলের গোছা নাবে কান বেয়ে। প্রায় মাটি ছোঁয়। নিংড়ানো পানির ফোঁটা ঝরতে থাকে দরদর। এক অবসরে মাথাটা সোজা করে জড়ো করে নেয় চুলের গোছা। তারপর লম্বা শাড়ির মতোই ওটা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে নিংড়ে নেয় ভালো করে। সেই কটকটে রোদে একপ্রস্থ তৃপ্তির ছায়া ফেলে পেছনে এসে দাঁড়ায় মাশুক।

হাতের সেমিজ আর নাড়া হয় না। ওটা বালতিতেই থাকে।

ওমা আপনি কখন এসে দাঁড়িয়ে।

চোখেমুখে মীরার বিস্ময়।

সে কথার জবাব না দিয়ে পাল্টা জিজ্ঞেস করে মাশুক, সব কাপড় নিজেই ধুলে নাকি?

খুশি হয়েছে মীরা মনে হলো। ওই প্রশস্তিটুকু সে কামনা করেছিল মনে মনে।

সেমিজখানা তুলে নিয়ে এবার মেলে দিলো দড়ির ওপর।

তারপর শাড়িতে ভেজা হাতটা মুছে নিয়ে বলে, কেন বিশ্বাস হয় না বুঝি?

তা হবে না কেন?

একটা ভেজা শার্টের আস্তিন ঝুলে পড়েছিল। সেটা তুলে দিয়ে চোখ বড় করে বলে, শুধু কাপড় ধোয়াই নয়। রান্না, সেলাই, ঘরকন্না, কোনটা পারিনে বলুন।

তোমার রান্না তো কোনোদিন খাইনি।

ঠোঁট বাঁকিয়ে আড়চোখে চায় মীরা।

এখন রানতে যাবো কোনো দুঃখে।

এ প্রশ্নের জবাবে একটা মিষ্টি মধুর আলোচনার ঢেউ তুলে দিতে পারত মাশুক। সেই ঢেউয়ে ঢেউয়ে আরো ঢেউ উঠত। ছন্দময় হয়ে উঠত একটি মানস সরোবর, নিশ্চয়ই ভালো লাগত, সেই সরোবরে কল্পনার একটি কাগজ নৌকো ভাসিয়ে দিতে মীরার।

মাশুক শুধু বলল, তোমার রান্না খাওয়া তাহলে আমার কপালে হবে না।

কী ভাবছিল মীরা কে জানে।

চোখেমুখে কৌতুকের বাণ ছুটিয়ে বলে, বেশ তো আপনার নাই হলো। যার কপালে আছে সেই খাবে। কথা ক’টা বলে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে না। কাপড় মেলে দিয়ে সরে পড়ে। যাবার সময় শুধু চোখ ফেরায় একবার। যেন মাশুকের মুখের প্রতিক্রিয়ার দেখার লোভে নয়, কাপড়গুলো ঠিক আছে কিনা নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্যে।

বলি বলি করেও বলা হলো না কথাটা।

পনেরো দিনের কাছাকাছি। বড়জোর তিনদিন থাকবে ভেবেছিল। বোধহয় শোভনও হতো। আতিথেয়তার কানাকড়ি কিছু নিতে বাকি নেই। প্রথম দিনের মতো তেমনি ধূমায়িত চায়ের পেয়ালা রাখা থাকে সকালবেলা মাথার কাছে। ওই ঘ্রাণটা নাকে নিয়ে ঘুম ভাঙে। খাবার ব্যাপারে পক্ষপাতিত্ব আগের মতোই চলছে। তবু যেন অনুভব করে, বাজার থেকে কিনে আনা বইয়ের মতো তাকে নিয়ে আর কাড়াকাড়ি নেই। এখন সে শেলফে রাখা একটা যতেœর একটি আসবাব মাত্র। চোখে পড়ে, কিন্তু বারবার ধুলো মুছে সাজিয়ে রাখতে আর যাকে ইচ্ছে করে না কারও।

রানুখালা পাখা নিয়ে হাওয়াও করেন কখনও কখনও খাওয়ার টেবিলে দাঁড়িয়ে। বিশু বড় বড় চোখে তাকায়। অতিথির অধিকারে যেটুকু তার পাতে যায়, তার খানিকটায় যেন তারও দাবি ছিল।

তেমনি আছেন শুধু মনোয়ার সাহেব।

সেই দুর্যোগময় রাতের একটি কৃতজ্ঞ মুহূর্তকে যেন ভুলতে পারেননি। পুলকিত দৃষ্টি নিয়ে তাকান। কখনও অজান্তেই হাতটা রাখেন ওর ঘাড়ের ওপর। কথা একরকম বলেন না। কারুর সঙ্গেই না।

কেমন যেন হয়ে গেছে সেদিনের দুর্ঘটনার পর। সাতদিন সমানে শয্যাগত জ্বরে          হু-হু করে কেঁপেছেন। গঞ্জনা করেছেন রাজ্যের ফুলের নাম ধরে। তারা সব ষড়যন্ত্র করেই যেন এ অবস্থা করেছে তার। ডাক্তার বলল, জ্বর বেশি, তাই ভুল বকছেন।

জ্বর থামল। কিন্তু আগের মতো আর কথা বলেন না। খাটের ওপর হেলান দিয়ে বসেন খোলা জানালায় চোখ দিয়ে। কী দেখেন। বোধহয় বেল ফুলের একটা অনাদৃত ডাল। ভয়ে ভয়ে জানালার কাছে উঁকি দিয়ে যেটা তাকে লক্ষ করছিল।

অহেতুক ছেলেমানুষীর জন্যে অনেক বকেছেন স্বামীকে। আজ এই নিথর পাষাণ মূর্তির মতো লোকটিকে দেখে তার মাথা খুঁটে মরতে ইচ্ছে করে। তবু তো বেশ ছিল। ঘর মাথায় করে রাখত। সকাল বিকাল মেতে থাকত নিজের খেয়াল নিয়ে। কেউ কি তাকে মনে কষ্ট দিয়েছে, কারও আচরণে ব্যথা পেয়েছেন মনোয়ার।

ডাক্তাররা বলে, মনে হয় খুব শকও পেয়েছেন। অন্ধকারে কিছু হয়েছিল নিশ্চয়ই, যা দেখে তার মনে স্থায়ী ছায়াপাত হয়েছে।

আপনার কিছু মনে পড়ে না। ধরুন কোনো দুর্ঘটনা, ডাক্তাররা ঝুঁকে জিজ্ঞেস করেন।

মনোয়ার মাথা নাড়েন।

কখনও দু’হাতের তালুতে মুখ ঢেকে ফেলেন। যেন ভয় পেয়েছেন।

প্রসন্ন হন মাশুককে দেখলে। বোধহয় ধারণা হয়েছে তাঁর, এই একটি অনুগত ভক্তই পেয়েছে সারা জীবন সাধনা করে। ঘরে ঢুকলেই ওর হাতটা নিজের মুঠোয় টেনে নিয়ে বসান মাথার কাছে। অনেকক্ষণ আঙুলগুলি নেড়েচেড়ে দেখেন। তারপর তেমনি উদাস নেত্রে তাকান খোলা জানালা বরাবর।

খুব যে কথা বলেন তাও না। তবু বসতে হয়। ওঠার চেষ্টা করলে হাত ধরে আবদার করেন। চোখের ভাষায় আকুতি জানায়, আর একটু সময় দেবার জন্যে।

অথবা কখনও কখনও স্ফুট গলায় বলতেই শোনা যায়, বসুন!

আমাকে আপনি বলছেন কেন। আমি আপনার –

তাই তো, তাই তো।

জিব কাটেন। যেন কি সাংঘাতিক ভুলই হয়েছে।

মনে করিয়ে দিও। তাহলে ভুল হবে না।

তবু একদিন সাহস করে বলতে হলো যাওয়ার কথা।

বেল ফুলের ডালটি জানালার শিকের সঙ্গে সুতো দিয়ে বাঁধছিলেন, মনোয়ার তাকে দেখে চমকে ওঠেন। কেউ যেন তাকে অন্যায় কাজ করতে দেখে ফেলেছে।

ঘাটে এসে বসলেন মনোয়ার। একধারে জায়গা করে মাশুকও বসল।

আমাকে এবার যেতে হয়। অনেকদিন হয়ে গেল।

কোথায়?

বাড়ি।

কেন?

আমার সিঙ্গাপুর যাওয়ার সময় হয়ে এলো।

হঠাৎ বাচ্চাছেলের মতো টগবগিয়ে ওঠে তাঁর চোখ। বলো তো কি গাছ পাওয়া যায় সেখানে।

মনোয়ার সাহেবের প্রশ্নে চমকে ওঠে। ডাক্তারদের কথা ভুল। প্রকৃতিরই আছেন। কয়েকদিন বিছানায় পড়ে বাগান করতে পারেননি, বোধহয় সে দুঃখেই উদাস ছিলেন। নইলে হঠাৎ অমন প্রশ্ন করে বসতেন না।

পান আর নারকেল গাছের কথা শুনেছে মাশুক। আর কোনো গাছের কথা জানে না। মাথা নিচু করে বলল, কি কি জানি। আমি তো যাইনি।

কোনো ‘রেয়ার ভ্যারাইটি’ থাকলে চারা পাঠিয়ে দিও।

আচ্ছা দেবো।

দক্ষিণের মাটিটা পরিষ্কার করে রাখব। তোমার চারা সেখানেই পুঁতব। ভালো হবে না?

উত্তরের আকাক্সক্ষায় পুলকিত দৃষ্টি দেন এবার। খুবই ভালো হবে, সায় দেয় মাশুক। আশঙ্কা ছিল, হয়তো মনোয়ার যেতে দেবেন না। বলবেন আর কিছুদিন থেকে যাক। মাত্র তো সেদিন এলো। এত সহজে তাঁর কাছ থেকে ছাড়পত্র পাবে আশা করেনি।

॥ ছয় ॥

পরদিন বিকেলে নৌকো ছাড়বে।

রানুখালা নিজেই ডেকে বলে দিয়েছেন, তাঁরাও যাবেন কাছাকাছি একটা গ্রামে বিয়ের নিমন্ত্রণে। পথেই পড়ে। তাদের ছেড়ে দিয়ে পৌঁছে দেবে মাশুককে।

পরদিন সকাল সকাল বাক্স গোছাতে শুরু করে মাশুক। গুছোবার কিছু নেই। শুধু কাপড়ের ভাঁজগুলো ঠিক করে বাক্সে পোরা।

দিনটা কেমন মেঘলা মেঘলা। একটা অভিমানের বাষ্প চোখ ছলছল করিয়ে দেয়। মীরা একবারও এলো না। কাল রাতেও না। আজ সকালেও না। আর যাবার কথা নিশ্চয়ই শুনেছে। একবার নকল দুঃখ দেখিয়ে ও তো বলতে পারত, সত্যি সত্যি যাচ্ছেন।

ঠুনকো অনুরোধও জানাতে পারত, আসবেন কিন্তু আবার। অথবা কি ক্ষতি ছিল নিমগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল চোখে একবার চাইলে। সে তো জানালা খুলেই রেখেছিল ওই একটি আকুল প্রত্যাশায়। বিশু এসেছে বারকয়েক। তাকে দিয়ে খবর পাঠানো যেত। ইচ্ছে হয় না।

বিশু খুশি।

আপনি চলে গেলে এ বিছানায় এরপর থেকে আমি শোব।

অত্যন্ত অকৃতজ্ঞের মতো শোনাল বিশুর কথা।

কিন্তু ওইটুকু ছেলের ওপর রাগ করা নিরর্থক। একটু কৃতজ্ঞতা দেখালে ক্ষতি ছিল না যাদের, তারাই যখন উদাসীন। নিজের অজান্তেই একটা অভদ্র মানুষ গর্জে ওঠে তার মধ্যে। এখন যাও তো। ঘুমুব।

ঘুমুবেন কেন?

কেন আবার কি। মাথা ধরেছে।

বিশু চলে গেল।

চলে যাওয়ার সে যেন খুশিই হয় মনে মনে। দরজা জানালা ভেজিয়ে দিয়ে এ ঘরের আবছা আলো অন্ধকারে স্যাঁতসেঁতে বালিশের ওপর মাথা গুঁজে একবার নিঃসঙ্গ হবে। পরম নিবিড়তায় নিজের মনকে শান্তি দেবে। বোঝাবে এদেশে মায়া নেই। মমতা নেই। একটি প্রাণের জন্যে অন্য একটি প্রাণের দরদ নেই।

উঠে গিয়ে খিল আঁটতে গেল দরজার।

তারই দরজার কাছে ভীরু দুটি কণ্ঠ। ফিসফিস শব্দ। ছিটকিনিটা খুলতে গিয়ে কেমন বিশ্রি আওয়াজ হলো। খোলা দরজায় তার বিস্মায়াবিষ্ট দৃষ্টির সামনে বিশু আর মীরা।

তাদের ভয়েই দু’জোড়া চোখ যেন আকুতির ভাষা। হঠাৎ এমন করে ধরা পড়ে অন্যায় যদি করে থাকে তার জন্যে ক্ষমা করুক মাশুক। একটা অযাচিত অনুরাগ এক মুহূর্ত আগেকার বিতৃষ্ণা আর নৈরাশ্যের পাহাড় গুঁড়িয়ে দিয়েছে। অকারণে তাদের ওপর রাগ করেই যেন অনুতপ্ত মাশুক।

মীরার একহাতে একটা ধুলামাখা চারাগাছ। কলাপাতায় জড়ানো। মীরা চলে যাচ্ছিল বিশুকে সঙ্গে নিয়ে।

সিঁড়ি বেয়ে নাবল মাশুক, চলে যাচ্ছ যে।

মীরা থামল। সেখান থেকেই দাঁড়িয়ে বলল, বিশু যে বলল মাথাব্যথা। বিশু যে বলল, কারও আসতে মানা। বিশু যে বলল –

কৃত্রিম রাগের ভান করে বলে মাশুক, বিশু কী বলল সেটা তো শুনলাম, তুমি কী বললে। তারপর চারাগাছটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, হাতে ওটা কী?

তাড়াতাড়ি শাড়ির আঁচলে আড়াল করতে গিয়েও পারল না লুকাতে মীরা।

মাশুকের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পাল্টা জিজ্ঞেস করে বসল, শুনলাম আজ বিকালেই যাচ্ছেন।

হ্যাঁ। তোমরাও তো যাচ্ছ নাকি কোথায়?

সে তো মণিবুর বিয়েতে। সিঙ্গাপুরে তো আর নয়।

বিশুর দিকে তাকিয়ে এবার তাকে শুনিয়েই যেন বলল, বুঝলি বিশু আর কষ্ট সহ্য হচ্ছিল না। বাব্বা : সিঙ্গাপুর যারা যায়, তারা এমন স্বার্থপর হয়। ওসব হতচ্ছাড়া দেশে যাবার জন্য বায়না ধরিসনে তুই কোনোদিন, হ্যাঁ। বাধ্য ছেলের মতো মাথা হেলায় বিশু!

নকল রাগের ভান সত্ত্বেও বিশুকে তার দিকে ঠেলে দিয়ে বলে মীরা, যা না জিজ্ঞেস কর আসবে নাকি। ঘুম যখন এলোই না, আসুক না আমাদের সঙ্গে।

মীরা তাকে সঙ্গে যেতে বলেছে বিশ্বাস করতে পারে না নিজেকে মাশুক। তবু কৌতূহল নিবৃত্তির জন্যই জিজ্ঞেস করে, কোথায়? 

এবারও বিশুর দিকে তাকিয়েই জবাব দিলো মীরা, এলেই দেখতে পাবে। কী বলিস। আগে আগে অত কথা জানার কী দরকার?

একটা ছায়াপথ তাকে যন্ত্রচালিতের মতো হাত ধরে নিয়ে চলে। মীরা আগে আগে, তার পেছনে বিশু। আর সবশেষে সে। নিঃশব্দ পদচারণা শুকনো পাতায় পা লেগে মাঝে মাঝে আর্তনাদের মতো শব্দ হয়। কালো পরিপুষ্ট একটা বেড়াল কোত্থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে। আড়চোখে তাদের দেখে আর লেজ নাড়ে। তারপর মিশে যায় বাঁশঝাড়ে। পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে পায়ে-হাঁটা পথটা পেরুলেই উঁচুমতো টিলা। দু’একটি অনাদৃত আম কাঁঠালের গাছ। জায়গায় জায়গায় বাতাবি লেবুর কাঁটা ভরা ডাল বাহু বিছিয়ে। সাবধানে মাথা নিচু করে যেতে হয়। ভাঙা একটা চালাঘরের কাছে এসে থামল মীরা। ঘরের অস্তিত্ব নেই। শুধু ভিটে দেখে বোঝা যায় একদিন বসতি ছিল। তাও প্রায় ঢাকা পড়েছে জংলী গাছের জঙ্গলে। কয়েকটা ফণীমনসা সুযোগ বুঝেই যেন শেকড় গেড়েছে সেখানে। জায়গাটা জুড়ে কেমন বিচিত্র এক ঘ্রাণ। মাটি-মাটিও নয়, গাছ-গাছও নয়। নির্জীবতা ও নিঃসঙ্গতার ভয়াবহ স্বাদ যেন সে গন্ধে।

মীরা বলল, এখানে বড়মা থাকতেন।

বড়মা, মানে আমার দাদির মা।

পাছে বুঝতে না পারে সেজন্য বংশের পরিচয় দিলো বিশু।

বেলগাছটা দেখছেন।

মীরার কথায় চমক ভাঙল। সত্যি এত বড় বেলগাছটা কেমন করে চোখ এড়াল।

কেন কী হয়েছে তার।

আমার বড়মা নিজ হাতে পুঁতেছিলেন।

চারাগাছটি মাটিতে রেখে আঁচল বিছিয়ে ওখানেই বসে পড়ে মীরা।

বিশু একটা ভালো ঘাসের জায়গা বেছে নিয়েছে। এক মূহূর্ত মনে হলো মীরা আর এ জগতে নেই।

সে যেন অন্য জগতের কোনো মানুষদের রাজ্যে হারিয়ে গেছে। কল্পলোকের রাজ্য থেকে ভেসে আসছে তার কথা, চোখে ভালো করে দেখেনি, মনেও নেই সেই বড়মা, টুকুন খালা, মনু দাদা কাউকে। মাশুকের মনে হলো, তারা ইতিহাসের মতো জুড়ে বসেছে জায়গাটা। একটু এগুলোই তাদের কবর। এক দূরাগত ইতিহাস এক নবতম ইতিহাসের সঙ্গে মিতালি করতেই যেন তাদের এখানে আসা।

কনুইয়ে ভর দিয়ে একসময় উপুড় হয়ে শোয় মীরা। হাতের তালুতে চিবুকটা ঠেকিয়ে চিবুতে শুরু করে একটা কাঁচা ঘাসের ডগা। নিজের মনেই পা দোলাতে থাকে।

বেলগাছটা কেন লাগিয়েছিল, জানেন।

না তো।

মাশুকের অসহায় অবস্থা দেখে বিশুই একটা সঙ্গত জবাব দিতে চেষ্টা করে, কেন আবার, বেল ধরবে বলে।

আদরের শাসনে বিশুর চুলের ঝুঁটি টেনে দিয়ে বলে মীরা, তুই থাম। তারপর ধরা গলায় বলে, এখনও গাছটা দেখলে বড়মার কথা মনে হয়ে যায়।

মাশুক দেখল, মীরার চোখ গাছের শেকড় থেকে উঁচু ডালে গিয়ে স্থির হয়েছে। কোনো এক সুখমধুর অতীতকে চোখ খুঁটিয়ে দেখছে সে।

সেই স্মৃতিবহুল বেলগাছের গুঁড়িতে লাল পিঁপড়ের বাসা। তারই একটা বেরসিকের মতো মীরার পায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিলো। তড়াক করে উঠে বসল। হাত বুলোতে থাকল বারবার বিষধর চুম্বনের জায়গাটায়। ফুলেও গেছে একটু।

কিন্তু সেদিকে মাশুক দৃষ্টি দেবার আগেই শাড়িটা টেনে পা ঢেকে দেয়। কি মনে করে হাতে করে যে চারাগাছ এনেছিল সেটা তুলে নিয়ে বাড়িয়ে দেয় এবার মাশুকের দিকে।

হতভম্বের মতো এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে মাশুক। বলে, কী করব এটা। নিজের হাতে পুঁতে দেবেন। বড়মা যেমন পুঁতে গেছিলেন।

জায়গাটাও দেখিয়ে দিলো।

গোল করে খানিকটা জায়গা আগে থেকেই তৈরি করা। যতœ করে ঘাসের চাপড় সরানো। কালো মাটির সঙ্গে মেশানো খানিকটা সার।

চারাটা নেড়েচেড়ে দেখে মাশুক। পাতাগুলো মুষড়ে গেছে। নুইয়ে গেছে ডালের ভারে। সাদা নরম শেকড় এখনও ভেজা ভেজা। এখনও দু’একটা মাটির কণা প্রাণপণ চেষ্টায় তাকে আঁকড়ে আছে।

কিন্তু আমাকে দিয়ে লাগিয়ে লাভ?

মীরা হাসে। হালকা লোক দেখানো মামুলি একপ্রস্থ হাসি, লাভের জন্যে বলেছি নাকি। তা নাহলে এতো মিষ্টি গাছ থাকতে সবচেয়ে তেতোটা লাগাতে বলছি কেন।

তেতো মানে।

নিমগাছ চেনে না নাকি?

মাশুক দ্বিরুক্তি করল না। দু’হাতে নরম মাটি সরিয়ে আস্তে করে বসিয়ে দিলো চারাটি।

বিশু হাত লাগাতে যাচ্ছিল। মীরার ধমকে দমে গেল, না না তোকে হাত লাগাতে হবে না।

চারধারটা ভালো করে দেখে নিল মীরা। তারপর মাশুকের দিকে তাকিয়ে বলল, বাঁ ধারে মাটি দেননি কেন। হেলে যাবে না।

আরো কিছুটা মাটি ভরতে ভরতে জিজ্ঞেস করে মাশুক, তেতো গাছটাই আমার ভাগ্যে কেন।

আপনি যেমন – কথাটা শেষ করল না মীরা।

আমি কি তেতো।

তবে কি মিষ্টি!

কেমন একটা প্রচ্ছন্ন খোঁচা মীরার এই শেষ কথায়। মীরা উঠে পড়ার উপক্রম করে। হাতের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলে, বড় কষ্ট হলো না তেতো গাছ লাগাতে। মিষ্টি গাছ লাগানোর শখ হলে নিজে লাগালেই পারতেন। কেউ তো বারণ করেনি।

একটা দীর্ঘশ্বাস যেন অজান্তে বেরিয়ে এলো বুক ফুঁড়ে। পরের কথায় তার খানিকটা রেশ থেকে যায়, আর তো কখনও আসবেন না। নইলে দেখতেন কি প্রকা- গাছ। তার ছায়ায় বসে কি শান্তি।

তবু সন্দেহ নিরসনের চেষ্টায় আরেকবার শুধাল, আসবেন না কোনোদিন নিজের হাতে তেতো গাছ দেখবার জন্যে?

মনে মনে রীতিমতো একটা ব্যথা অনুভব করে মাশুক। মীরা তাকে দিয়ে গাছ পুঁতিয়ে তার বড়মার মতো অতীত করে ফেলল চিরকালের জন্যে। এখন সে আর সে নেই। সে একটা স্মৃতি। সে একটা ছায়া যেখানে দুপুরে এসে বসতে ভালো লাগবে অনেকদিন পর।

যেতে যেতে বলল মীরা, খুব কষ্ট দিলাম সকাল সকাল না। তাতে কি, একবার সিঙ্গাপুর গেলে আর তো সহজে কষ্ট দিতে পারব না। মনে মনে ভাববেন আপদ চুকল।

এক মুহূর্ত মনে হলো সিঙ্গাপুর যাওয়ার কথাটা না তুললেই হতো। তার আসা আর চলে যাওয়ার ঘটনাটা নিরুত্তেজ হতো সন্দেহ নেই। কিন্তু এত বেদনাময় নিশ্চয়ই হতো না। শখ করে কেউ তাকে দিয়ে স্মৃতি রোমন্থনের উপকরণ আদায় করিয়ে নিত না।

ঘরের কাছে এসে জিজ্ঞেস করে মীরা, আপনার জিনিসপত্র গুছিয়ে দিতে হবে, না?

মাশুক বাধা দিলো। না। ক’টাই বা জিনিস। ও আমি নিজেই পারব।

তবু পেছনে পেছনে ঢুকে এলো মীরা।

ডালা-খোলা অগোছাল সুটকেশটার দিকে তাকিয়ে বলল মীরা, কি নরম চামড়ার সুটকেশ।

কেন খুব পছন্দ।

ভালো বললেই কি পছন্দ হয় নাকি।

নিজের মনেই কাপড় গোছানো শুরু করে।

চিঠি লেখার একটা প্যাড বার করে নেড়েচেড়ে দেখে কৌতূহলী চোখে শুধায়, এগুলোর অনেক দাম না। কি সুন্দর নীল কাগজ। আমি দুটো পাতা ছিঁড়ে নি।

দুটো পাতা কেন, গোটা প্যাডটাই রাখো না।

ওমা, অতগুলো কী করব। কাকে লিখব অত চিঠি।

কৌতুকের ভঙ্গিতে বলে মাশুক, কী করে বলি বলো। দরকার লাগতেও তো পারে।

মনে মনে বড্ড খুশি হয়েছে দেখলেই বোঝা যায়। তা সত্ত্বেও মীরার অনুতাপ, আপনি সমস্ত প্যাডটাই দিয়ে দিলেন। অর্ধেকটা রাখুন না।

রাখতে হবে না। দরকার হলে কিনে নেব। আর আমারই চিঠি লেখার লোক কই।

কথাটা বোধহয় শুনল না মীরা।

একটা পেন্সিল এনে বলল, তাহলে লিখে দিন আমার নামটাও নিজে থেকে। দিলে লিখতে হয় না অমুককে দিলাম?

ও তাই তো। নিয়ে এসো।

পেন্সিল দিতে গিয়ে আঙুলটা ছুঁয়ে ফেলল তাকে। ইচ্ছে করল ধরে রাখতে। অনেকক্ষণ।

খানিক ইতস্ততায় হাতটা সরিয়ে নেয় মীরা। বলে, ছাড়–ন। আমার ভীষণ লজ্জা করে।

॥ সাত ॥

প্রথমটায় আপত্তি করেছিল মাশুক। পরে নিমরাজি হলো।

প্রস্তাবটা এসেছে রানুখালার কাছ থেকে। একা মেয়ে অতদূর যাবেন, তার চেয়ে বরং কেউ সঙ্গে থাকুক। মীরার বাবাই যেত। কিন্তু এ অবস্থায় তাকে বলতে যাবেন কোন সাহসে। তার চেয়ে মাশুকও চলুক। মধুগঞ্জে মণিবুরা ফেলনা নন। মীরারা যেমন আত্মীয়, তারাও তেমনি। বরং দেখলে খুশিই হবে। মণিবু বেঁচে থাকলে নিজেই বলতেন। তবু খালু আছেন ভাই-বোনেরা আছে।

জবাব না দিয়ে উঠলেন না রানুখালা। বললেন, কী বলো?

বেশ তো। আমি আর কী বলব। না, ভাবছিলাম। কখনও দেখেনি আমাকে। হঠাৎ করে গেলে আবার কিছু ভাববে না তো ওরা।

ঠোঁটটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে বাঁকিয়ে খানিকটা পানের পিক ফেলেন। মাশুকের কথার সূত্র ধরেই বললেন, ভাববে না হাতি। এত লজ্জা, ভাবছি কী করে বিদেশবিভুঁইয়ে থাকবে তুমি।

জানে, না করা অর্থহীন। নিরুত্তেজ সম্মতি জানিয়ে বলল মাশুক, বেশ আপনাদের সঙ্গেই যাবো।

রানুখালা আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করেন না।

বলেন, আমি চলি ওদিকে আবার অনেক কাজ গোছোতে হবে। তুমি বরং এ সুযোগে একটু ঘুমিয়ে নাও। নৌকোয় অনেকদূর যেতে হবে। নিশ্চয়ই অভ্যেস নেই।

ঘুম পেল না। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েই একটার পর একটা চিন্তার ধোওয়া আচ্ছন্ন করে ফেলে মনকে। যে দায় নিয়েছে তাতে যেমন সুখ, তেমনি মনোকষ্ট। কে তাকে বলেছিল মনের গভীর সমুদ্রে ডুবুরি হতে, কলম্বাস হয়ে কেইবা বলেছিল অথৈ         মন-সমুদ্রে পরম কাম্য একটি তটরেখা খুঁজে নিতে। কেউ না?

সত্যি জরিপের এমন একটা কাজ কেউ তাকে দিলে কি লিখত খাতায় ক’টি চেহারা দেখেছে আজ পর্যন্ত। মনোয়ার সাহেব, মীরা, রানুখালা। কী দেখেছে – তারা কি নিশ্চিন্ত ভরসার হরিৎভূমি, না অনিশ্চয়তার ধু-ধু মরুভূমি। কি সিদ্ধান্ত দিত তাদের সম্বন্ধে। নিজের কাছেও এটা কেমন যেন জব্দা করা ধাঁধা। চট করে জবাব দেওয়া যায় না।

আজ আবার নতুন আমন্ত্রণ। আরেকটি অনাবিষ্কৃত দেশ। আরো ক’টি প্রাণী। ঠিক সেই কলম্বাস মন নিয়েই তাদের দেখতে যাবে। তাদের যাচাই করবে।

নিজের লিস্টিটা তারও কম বড় ছিল না, সিঙ্গাপুরের টুকুন ফুপু, কাসিমগড়ের হীরণ চাচা মেঘকান্দির রোকন মামু আরো কত। কিন্তু সেভাবে দেখতে গেলে হয়তো এই ‘আরো কত’র পরও রয়েছে আরো অসংখ্য। সারা জীবন দেখেও দেখা শেষ হবে। আবিষ্কারের মোহ যাবে না। সে গাণিতিক নয়। হিসেবে তার কড়া-ক্রান্তি ভুলচুক যদি থেকেও যায় কেউ চোখ রাঙাতে আসবে বলে মনের একটি ভুলও তার অজ্ঞাত থেকে গেল বলে কেউ কৈফিয়ৎ চাইবে না।

মীরার মধ্যেই তো সে কতজনকে দেখছে। হাস্যোজ্জ্বল, চটুল, শান্ত, অভিমানী অনেকগুলো মানুষ তারা এক হয়েই মীরা। মীরা তাদের দিয়েই। তা না হলে তার আলাদা অস্তিত্ব নেই।

তবু তার সন্ধানী মনের লিস্টিতে আরেকটা নতুন ফর্দ বাড়–ক। মধুগঞ্জের আরো ক’টি মানুষ কেমন করে হাসে, কেমন করে কাঁদে, কেমন করে চোখ বড় বড় করে ভুরু বাঁকিয়ে তাকায় দেখা যাক। শব্দ করে দরজা খুলে যায়।

সেই দরজা দিয়ে যেন ঢুকল উচ্চকিত এক ঝলক হাসি। আর তার পেছন পেছন মীরা। চোখ ঢুলু ঢুলু হয়ে আসছিল। উঠে বসল। দেখল না হাসি আর মীরা একই সঙ্গে ঢুকেছে। মীরা যখন হাসল তখনই এসেছে। যখন আসল, তখনই হেসেছে।

আপনি নাকি আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন।

খালা তো সে কথাই বললেন।

এক মুহূর্তে তার মুখের হাস্যোজ্জ্বল আলোর দীপ্তি নিবে গেল। গম্ভীর হয়ে বলল মীরা, তাহলে নিজে ইচ্ছে করে যাচ্ছিলেন না?

মীরার মনগড়া ভিতটা হঠাৎ নির্মমভাবে ভেঙে গেল বলেই বোধহয় সে বিষণœ।

মাশুক হাসল। যথেষ্ট আন্তরিক হয়ে বলল, নিজের ইচ্ছেয় যাচ্ছি না কে বলল, নিশ্চয়ই যাচ্ছি।

মান ভাঙল কিন্তু একেবারে প্রবোধ দেওয়া গেল না মীরাকে।

অভিমানের সুরে তার দিকে সজল চোখ জোড়া মেলে দিয়ে শুধাল, তাহলে সে কথা আমাকে জানাননি কেন।

জানাব কী করে। এখুনি ঠিক করলাম যে।

ও।

ব্যাস শুধু একাক্ষর একটি জবাব।

মুখ ঘুরিয়ে বসে মীরা।

মাশুকের মুখটা খুশি খুশি। ও তর্ক করে হারিয়ে দিয়েছে তাই কি? সে কি সত্যি তর্ক করে হার মানবে বলে ধপাস করে টোকা না দিয়ে দরজা খুলে ফেলেছিল। কথার গায়ে কথা লাগিয়ে তাকে হারিয়ে দিয়ে জয়ী মাশুক, সন্দেহ নেই।

অকাট্য যুক্তিতে অন্যকে হারিয়ে দেওয়াই কি সবচেয়ে বড় সান্ত¡না। নিজে হেরে  অন্তত কারও কাছে, কোনো সুখই কি নেই।

অনুরোধ সত্ত্বেও মীরা বসল না।

বলল, মাথা ধরেছে।

তাহলে অ্যাসপ্রিন খাও।

আবার সেই কথার গায়ে কথা। নইলে নতুন কিছুই যেন বলতে শেখেনি।

মাশুক আবার ডাকল।

মীরা সিঁড়ি দিয়ে নাবতে নাবতে বলল, না যাই। মাথা ধরার ওষুধ খেতে            বললেন যে।

নৌকো ঘাটের কাছেই ভিড়েছিল।

এখান থেকে যাবে শিমালিঘাট। সেখান থেকে ট্রেন। রানুখালা বসলেন ভেতরে মীরাকে নিয়ে। ছইয়ের বাইরে রইল মাশুক আর বিশু।

নৌকো ছেড়ে দেবে এমন সময় কার চিৎকার শুনতে পেল। কে যেন বলল নৌকো থামাতে।

রানুখালা গজগজ করেন, যাত্রার সময় পিছু ডাকল ভালো লাগে না। নিশ্চয়ই কপালে দুর্ভোগ আছে দেখিস।

মীরা গলা বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করে।

ওমা, বাবা আসছে যে।

রানুখালাও বিশ্বাস করতে পারেন না। হঠাৎ লোকটা বিছানা ছেড়ে উঠে এলো কেন। শরীর খারাপ করেনি তো।

মনোয়ার সাহেব যখন ঘাটে এসে পৌঁছুলেন তখন রীতিমতো হাঁপাচ্ছেন।

মাশুককে ডাকলেন ইঙ্গিতে। মাশুক উঠে এলো।

প্রথম ক’মিনিট কথাটা যেন গুছিয়েই বলতে পারেন না। বারবার হোঁচট খাচ্ছেন, জানো সেইটে পেয়ে গেছি।

কোনটা।

ওই যে তোমাকে একটা রেয়ার ভ্যারাইটি পাঠাতে বলেছিলাম সিঙ্গাপুর থেকে। নামটা আমার মনে ছিল না। নোট বইটা খুঁজে পেলাম একটু আগে। কই লিখে নাও তো।

মাশুক লিখে টুকে নিল নোট বুকে। যাবার সময় হঠাৎ তার হাতটা ধরে ঝাঁকুনি দেন মনোয়ার। আর্দ্র কণ্ঠে বলেন, আরেকবার ওরকম ঝড়ে পড়লে আমাকে নিতে আসবে কে। মাশুকও অনুভব করল, কোথায় একটা কান্না তার গলায় আটকে। বিদায়ের মুহূর্তটি করুণতর হয়ে আসে।

কেউ না কেউ আসবেই।

তা তো বটেই। তা তো বটেই।

যদিও তার চোখে অবিশ্বাস তবু কথা কটা উচ্চারণ করতে করতে লাঠি ঠুকে ঠুকে এগুতে থাকেন মনোয়ার। নৌকো তখন খাল পেরিয়ে ছোট নদীতে।

॥ আট ॥

যতক্ষণ নৌকোয় ছিল একটা কথাও হয়নি মীরার সঙ্গে।

একবার শুধু বেরিয়ে এসেছিল মীরা বিশুকে ডাকতে।

ভেতরে আয়। বাইরে কি ঠান্ডা দেখছিস না।

ধমক খেয়ে ছাইয়ের ভেতর ঢুকল বিশু। তারপরও খানিকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল মীরা। তার শাসন সবটুকুই যেন বিশুর জন্যে নয়। একটা কটাক্ষ আপাদমস্তক তাকে দেখে নিল সে-সঙ্গে। অথচ বলল না কিছুই। নিশ্চয়ই রাগ করেছে মীরা।

রানুখালা বোধহয় ঘুমিয়ে। প্রথমে তার গলা শোনা যাচ্ছিল, ক্রমে জড়িয়ে এলো সে গলা। তারপর কিছুই শোনা গেল না।

হু-হু বাতাস।

কলারের বোতাম লাগিয়ে দিল মাশুক।

মীরা অন্তত একবার তাকে ডাকতে পারত।

তার মর্যাদা কি পাষাণপুরীর দ্বাররক্ষীর। ঝড়, কুঝ্ঝটিকার মুখে তাকে শুধু দাঁড়াতে হবে জাগ্রত প্রহরীর মতো। রাণী ঘুমোবেন, ঘুমোবেন রাজকন্যে। সজাগ-চক্ষু থাকবে রাজভৃত্য। ফিসফিসে গলায় কে যেন বলল বিশুকে। যা এটা দিয়ে আয়। বিশু বেরিয়ে এলো। হাতে ভারি একটা কম্বল।

ওটা রেখেই এক দৌড়ে ঢুকে গেল আবার ভেতরে।

অনেকক্ষণ ধরেনি। পড়ে ছিল কম্বল পাটাতনের ওপর। কম্বলের রুক্ষ পশমে কুয়াশার বিন্দু নেমেছে। ঠিক যেন মাশুকের অভিমান অশ্রু। আরো কতক্ষণ এমনি যদি শীতে ঠকঠক কাঁপতে থাকে, কাঁপুক না। কাউকে চোখের আড়াল করে নিজের ওপর নিজে প্রতিশোধ। নির্মম, ভয়াবহ, আত্মকেন্দ্রিক আনন্দ।

অথচ কি আশ্চর্য আত্মনির্যাতনের আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। কম্বলটা তুলে নিল গায়ে।

চোখ ভারি হয়ে আসে।

চোখের পাতা পড়লেই এ জগৎ থেকে বেরিয়ে যেন নতুন কোনো জগতে গিয়ে পড়ে সে।

বিশ্বের অন্যতম পুণ্যতীর্থ, সিঙ্গাপুর। মানুষগুলো বেঁটে। কাঁচা হলুদের মতো রং। মিটমিটে চোখ। ঢলঢলে পোশাক। স্ট্র্যাপ দেওয়া স্যান্ডেল। মাথায় থালার মতো গোলাকার টুপি। কাচের পুতুল খেলনা ঘরের আলমারি ভেঙে ছুটাছুটি করছে। সেদেশে জাপানিরা বোমা ফেলেছিল।

হিউল্যাং সুখী পরিবার। সাত পুরুষ ধরে বাস। পূর্বপুরুষরা নাকি এসেছিল চীন থেকে।

ল্যাং বসে লম্বা পাইপে সিগারেট ফুঁকছে। সামনে বেতের গোলাকার টেবিলের ওপর রাখালোহিত পীত পানীয়। সন্ধ্যা-আকাশের রংটাই যেন তার। গেলাসে কি আস্তে আস্তে চুমুক দিয়েছিল। জোরে নিশ্বাস নিতেও যে ভয়। শত্রুপক্ষের বোমারু ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ল্যাং গলা ছেড়ে ডাকল, ন্যান।

আদর করে বৌকে ডাকত ন্যান। পিতৃদত্ত নামটা পছন্দ হতো না। আসছি, বলে বেরিয়ে এলো একটি প্রাণোচ্ছল চঞ্চল যুবতী। হাতে কস্ফটার শখ করে হালকা সমুদ্র-নীল উল দিয়ে বুনেছে নিজে। এক ফাঁকে ওটা স্বামীর গলায় জড়িয়ে দিয়ে বলল, ঠা-া লাগবে, তাই দিলাম। তারপর আত্মপ্রসাদের সুরে জিজ্ঞেস করে, পছন্দ হয়নি।

জবাব দিয়েছিল নিশ্চয়ই ল্যাং। শোনা যায়নি। ভয়াবহ শব্দ করে আছড়ে পড়ল চায়ের পেয়ালা। তারপর একরাশ ধোঁয়া, আগুন আর ধ্বংস। কেরোসিনের শলতের মতো জ্বলছে সিঙ্গাপুর।

এক উদ্বাস্তু শিবিরে বছর দুতিন পর দেখা হয়েছিল ল্যাং আর ন্যানের। চেনা যায় না। দুটো কঙ্কাল-দেহ যেন তাদের সুখী জীবনের খোলসটা হারিয়ে ফেলেছে।

প্রেম? না। প্রেম কারও চোখে নেই। ক্ষুধার আগুন জ্বলছে। শীতে কাঁপছে। তারা স্বামী-স্ত্রী নয়। আত্মমনে দুজন স্বতন্ত্র সত্তা।

আসলে দুটোর মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পূর্ণ মনগড়া। বিরুদ্ধ মন নিজে নিজেই যুক্তি দেয়, একেবারেই সম্পর্ক নেই? আছে। এমন এদেশে কি হতে পারে না, না হয়নি? পঞ্চাশের মন্বন্তরে মুখের গ্রাস কেড়ে নেবার অপরাধে কোনো জয়নাব গলা টিপে মারেনি তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে। কম্বল তো দূরের কথা।

আসলে অবস্থাই মানুষ যা, তাকে তাই করে। এভাবে সে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারবে না। একটি মুহূর্তের আবেশে বিচলিত হয়ে কি লাভ। কি লাভ একটি সামান্য দুঃখের তিলে আহত হয়ে। অবস্থা মানুষকে যা করে তাই। সে সিঙ্গাপুরে যেতে হলে তার যাওয়া উচিত ছিল এয়ার বুকিং অফিস ট্রাভেল এজেন্সিতে। নরম এয়ার ব্যাগে ভাজ করে নেওয়া উচিৎ ছিল শার্কস্কিনের স্যুটখানা। বড় সানগ্লাসে রোদে ধুলোর চোখ বাঁচিয়ে সে কি আস্তে আস্তে হাঁটতে পারত না এখন সিঙ্গাপুরের রাজপথে। ক্লান্ত হয়ে গেলে গৃহগত প্রাণ বাঙালির মতো অন্তত বসতে পারত গীতাঞ্জলি নিয়ে। তা না করে সে কেন এলো বিজনপুর, কেনই বা যাচ্ছে মধুগঞ্জ, কেন ভাসছে। কেন কাঁপছে শীতে। কেন কেউ তাকে কম্বল দেবে যখন তখুনই শীত থেকে বাঁচবে।

চোখ ভারি হয়ে আসে। কিন্তু ভারি চোখে সহজে ঘুম আসে না।

॥ নয় ॥

কুলির চিৎকারে চোখ খুলল বাজিতপুর স্টেশন। এখান থেকে সোজা ট্রেন।

মাল আগেই সরানো হয়েছে। ইচ্ছে করেই কেউ যেন বিরক্ত করেনি তাকে। বিশু ডাকতে এসেছে। আর সবাই কম্পার্টমেন্টে।

এককোণে রানুখালা বসেছেন মীরাকে নিয়ে। বিশু বসেছে মুখোমুখি। তার সঙ্গেই জায়গা করে নিতে হলো।

ট্রেন ছাড়ার আগে রানুখালা বললেন, তোমাকে আর ডাকাডাকি করিনি। দেখলাম অঘোরে ঘুমোচ্ছ। রাতে ঠান্ডা লাগেনি তো।

অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় মীরার দিকে। মীরা জানালায় গলা বাড়িয়ে।

না, কম্বল ছিল।

মাথায় অকৃতজ্ঞ সুর এমনি মূর্ত যে, মীরা একবার তার দিকে চোখ না ফিরিয়ে পারে না।

যেন ইচ্ছে করেই অকৃতজ্ঞ হয়ে শাস্তি দিয়েছে মীরাকে। মনে করে কম্বল পাঠানোর প্রসঙ্গকে ভ্রƒক্ষেপ করে।

নিজের কাছেই নিজেকে অসহ্য মনে হয়। একটা শান্ত সৌম্য পরিবেশকে সে ক্রমশই করে তুলছে ভয়াবহ আর জটিল। আর এতে যেন ওর মনের সায়ও ছিল। কী বলছে সে। সে কি রানুখালা আর তার পরিবারের ক’টি প্রাণীর হাতে হাতে বাঁধা পড়েছে। সে যেতে চায়নি। তবু যাচ্ছে। প্রতিবাদ করার মতো সাহস হয়নি।

পিঠে কার চাপড় অনুভব করল। নির্দয় রসিকতায় চটে যেত। পারল না। একটা ঝুলি কাঁধে দাঁড়িয়ে কবির।

কবিরই কথা বলল প্রথম, চললি কোথায়? মণিখালাদের ওখানে বিয়েতে।

একা?

না, রানুখালা ও মীরাদের দেখাল মাশুক।

তারপর চরম ভদ্রতার তাড়নাই যেন তাকে কর্তব্যসচেতন করে দিলো। মাশুক উঠে দাঁড়িয়ে বলল, মীরা এ হলো আমার ছোটবেলার বন্ধু কবির। ওষুধের ক্যানভাসার।

প্রতিবাদ করে কবির, উহু ঠিক হলো না। এখন আর ওষুধের নয়।

তবে?

এক পারফিউমারির। স্নো, ট্যালকম পাউডার, ক্রিম দেখবি?

বলে নিজেই ঝুলি থেকে একটা ক্রিমের শিশি বার করে। মাশুক কিছু বলার আগেই ওটা বাড়িয়ে দেয় মীরার দিকে। মীরা ইতস্তত করে। কবির ছাড়বার পাত্র নয়, রাখুন না রাখুন। মনে করুন স্যাম্পল দিচ্ছি। কি আশ্চর্য মীরা শুধু নিল না কৌটো খুলে খানিকটা ক্রিম মুখেও ঘষল। বলল, উঃ কি ঠান্ডা। কী দিয়ে তৈরি?

এই সুযোগের অপেক্ষায় যেন ছিল কবির।

শুরু হলো তার নতুন অভিজ্ঞতার ফিরিস্তি। মীরার এই বাড়াবাড়ি ভালো লাগল                না মাশুকের। কবির ওদের কাছ ঘেঁষে ক্রিম তৈরির রহস্যময় কাহিনী ব্যক্ত করতে ব্যস্ত।

গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে।

কথা শোনা যায় না।

থেকে থেকে দু’একটা অসম্পূর্ণ শব্দ। চাপা হাসির কণ্ঠস্বর।

দু’স্টেশন পরে কবির এসে বসল মাশুকের কাছে। বলল, সামনের স্টেশনে নেবে যাচ্ছি। তা কখন যাচ্ছিস সিঙ্গাপুর? ভদ্রভাবে প্রতিজ্ঞা করেও রূঢ় জবাব বেরিয়ে এলো তার মুখ দিয়ে, জানি না!

কবির থামে না।

স্নো ক্রিম প্রসঙ্গ নয়। অন্য প্রসঙ্গ। সচেতন হয়ে ওঠে মাশুকের কান। মেয়েটি ভালো বুঝলি। খুব ফ্রি, মফঃস্বলের হলে কি হবে। আমাকে যেতে বলল একবার। তেমনি কটাক্ষের জ্বালা ধরিয়ে বলল মাশুক, বাঃ অত। খুব ভালো। যা না।

হ্যাঁ বাবা। কাজটা গুছিয়ে নি একটু নতুন কোম্পানি কিনা।

পরের স্টেশনে নাবল কবির।

ট্রেন ছাড়া পর্যন্ত হাতল ধরে দাঁড়িয়ে। গলাটা নাবিয়ে বলল, যাচ্ছিস সিঙ্গাপুর, ভালো। তা আমাদের ক্রিমটা ব্যবহার করে দেখলে পারতি। ওরকম ভালো জিনিস বাইরে পাবিনে। সস্তায় দিচ্ছি। মাশুকের কোনো উৎসাহ না দেখে হাতল ছেড়ে দেয় কবির। মনে হলো একটু মর্মাহত। আত্মপ্রসাদের সুর ঠিকই আছে।

ভাবিসনে লাটের মাল। এ যা জিনিস না, বাজারে বেরুলেই দেখবি কাড়াকাড়ি। আর তা হবে না। জার্মান কেমিস্ট – হুঁঃ

ট্রেন ছেড়ে দিলো।

কবিরের মুখটা শেষ সিগন্যালের আড়ালে অদৃশ্য হয়। তাকে দেখা যায় না।

বিয়েবাড়ির প্রথম দু’দিন শান্তিতে ছিল। কেউ বিরক্ত করেনি। বিয়েবাড়ির হৈচৈয়ের মধ্যে সিঙ্গাপুর যাত্রী মানুষটিকে নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। মীরার সঙ্গে দেখা হয়নি এ দুদিন। অন্তঃপুরের নিষিদ্ধ কোনো কক্ষে সে বুঝি নিজেকে ব্যস্ত রাখার একটা ছুতো পেয়েছে। বিয়েবাড়ির পান-সুপোরি সাজানোর কিংবা রান্নার জোগান দেওয়ার কাজ। ফুরসৎ নেই এক মুর্হূত। বিশুকেও দেখা যায় না বড়।

বিয়েবাড়ির প্রধান অতিথিরা একে একে বিদায় নিচ্ছেন। কনে বাপের বাড়ি।

ঘরটা তাই একটু খালি।

কোনো কাজ না পেয়ে তুলে নিল একটা পুরোনো খবরের কাগজ।

তারিখ দেখবার দরকার নেই! কোনোমতে সময় কাটানো।

হাসিতে ফেটে উঠল ঘরটা। প্রাণোচ্ছল দুটি মেয়ে দাঁড়িয়ে তার ঘরের দরজায়। সঙ্গে বিশু। একটির বয়েস বোধহয় বারো-তেরো, অন্যটি কিছু ছোট। এক রঙের ডুরে শাড়ি। বোধহয় বিয়ের উপহার। আশ্চর্য তারা এতটুকু লাজুক হলো না। দরজার কাছে এসে বললও না, আসব নাকি। হুড়হুড় করে ঢুকে পড়ল।

বড় মেয়েটি, পরে জেনেছিল তার নাম কাজল, এসে বলল, আপনি অনেক পড়েছেন। একটা ধাঁধার উত্তর বলে দেবেন।

কাগজ থেকে মুখ না তুলেই বলে, কী ধাঁধা।

তুই বল না টুকু।

বড় মেয়েটি ছোট মেয়েকে ঠেলে। কাজল চোখ বড় বড় করে এক নিশ্বাসে বলে,

চার অক্ষরে নাম প্রায় যেতে মন চায়।

শিং নেই প্রথমে, মাঝে কিন্তু হয়;

মধু ছাড়া মধুপুর জুড়িও নিশ্চয়।

বেছে বেছে তার কাছে আসার কারণ পরিষ্কার হলো এতক্ষণে।

যথাসম্ভব নিজেকে সংযত রেখে বলল মাশুক, ধাঁধাটা বানাল কে।

টুকু একবার চোখ চাওনি করল। তারপর বলল, পুতুলবু।

কাজল আর টুকু তখনও দাঁড়িয়ে। ধাঁধাটা কি এতই কঠিন। কই বললেন না কী হবে?

যে পাঠিয়েছে তাকেই জিজ্ঞেস করো। কাজল ছাড়ে না। বলে, বাঃ পুতুলবু ধাঁধার জবাব আনলে কি আপনার কাছে পাঠাত?

টুকু ওকে টিপল, আর। জানে না। যেতে যেতে কেমন অবিশ্বাসের ঠোঁট উল্টিয়ে বড়দের জ্ঞান সম্পর্কে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করে বলে কাজল, ওমা। বড় হয়েও পারে না। আমাদের কলিম ভাই কিন্তু পারত। এই সর্বজ্ঞ কলিম ভাইটির জন্যে করুণা হয় মাশুকের।

কিন্তু এই পুতুলবুটি কে।

যেই হোক ধাঁধাটি সে নিজে বানায়নি। সিঙ্গাপুর যাওয়ার কথা শুনেছে নিশ্চয়ই মীরার মুখে। খবরটা রটিয়ে কি সুখ মীরার। তাকে জব্দ করা ছাড়া।

দুপুরে খেতে গিয়ে দেখা হলো পুতুলদি নামীয় মেয়েটির সঙ্গে।

লম্বা ছিপছিপে। এমন কিছু ‘আহামরি’ গোছের চেহারা নয়। শুধু যা আকর্ষণীয় তা এক জোড়া চোখ। চেরা কাগজি লেবু আকৃতি। সবল ও সতৃষ্ণ। চঞ্চল ও ব্যাগ্র।

মণিখালার মেজমেয়ে। সেই বেড়ে খাওয়াচ্ছিল। তাদের থালাটা ওর দিকে ঠেলতে আপত্তি করল মাশুক।

পুতুল শোনে না, জোর করে দু’চামচ তুলে দেয় পাতে।

সিঙ্গাপুর যাবেন, তা আমরা কি দোষ করেছি যে, ভাতের ওপর রাগ। মাশুক কথা বলে না।

মীরা বসে পাখা করে।

পুতুল বলেই চলে, জামাই গেল। এবার আপনার পালা। ক’দিন খোঁজখবর নিতে পারিনি।

এবার কিছু বলতেই হয়।

তাই বলল, না না। তাতে কী হয়েছে।

পুতুল বলে, কবে যাবেন।

জানি না। ঠিক নেই।

আচ্ছা ওখানকার মেয়েরা খুব সুন্দরী, না?

দেখিনি।

নিজে নিজেই তার জবাব দেয় পুতুল, না দেখলে কি হবে। বাব্বা একদম রাক্ষস। আপনার মতো ভালোমানুষটি পেলে আস্ত গিলে খাবে।

এতক্ষণ লক্ষ করেনি সে রীতিমতো একটা প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু। কাজল আর টুকু এসে জুটেছে কোন অবসরে। কোনোমতে খাওয়া শেষ করে হাত ধুতে গেল মাশুক।

দুপুরে কী করবেন?

নাছোড়বান্দা পুতুল।

কি জানি, ঘুমোব বোধহয়।

দুপুরে ঘুমুনো কি ভালো।

হয়তো না। কিন্তু আমি ঘুমুই।

ও।

ঘুম পেল না। তবু চাদরখানা মুড়ি দিয়ে বিছানায় লম্বা হলো। দরজা ভেজানো ছিল।

হঠাৎ এসে ঢুকল পুতুল।

ঘুমুচ্ছেন।

উঠে বসল মাশুক, না কেন?

এই এমনি। মীরারা বিকেলে চলে যাচ্ছে বলতে এলাম।

ছেলেমানুষের মতো জিজ্ঞেস না করে পারল না, কেন আজ বিকেলে কেন?

বিকেলেই সুবিধে, উজান কিনা। ট্রেন ধরতেও হাঙ্গামা নেই।

পুতুল চলে যাচ্ছিল।

মাশুক ডাকল, বসো না।

কেমন সলজ্জ দেখাল তাকে, খাটের প্রান্তসীমা ছুঁয়ে দাঁড়াল কোনোমতে। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসে, তার চেয়ে মীরাকে ডাকি।

তার চেয়ে মীরাকেই ভালো লাগবে যেন এই অনুমানেই কথাটা বলেছে পুতুল।

না, ডাকতে হবে না।

হাতের নখ কামড়াতে থাকে পুতুল। একবার আড়চোখে তাকায় তারপর আবার চোখে নিচু করে বলে, ধাঁধা বানিয়েছি বলে রাগ করেছেন।

না তো।

এবার চোখ উজ্জ্বল হয়ে আসে। বলে, ধাঁধা খুব বানাতে পারি, জানেন।

মাশুকের তরফ থেকে কোনো উৎসাহ না দেখে বলল, এবার আমি যাই।

যাই যাই করেও আবার ফিরে আসে পুতুল।

ও একটা কথা।

বলো।

সিঙ্গাপুরে চিঠি লিখতে কত লাগে।

কি জানি। ডাকঘরে জিজ্ঞেস করতে হবে। কেন?

যেন কৌশলে নিজেকে বাঁচাতে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে বলে, আমার জন্যে না। মীরার যদি কখনও লিখতে ইচ্ছে করে। আপনি আবার কী ভেবে বসলেন কে জানে?

পুতুল এবার সত্যি সত্যি গেল।

উঠে গিয়ে দরজার খিলটা বন্ধ করে দেয় মাশুক।

কয়েকটি অনুসন্ধিৎসু মন তাকে এমন খুঁতিয়ে খুঁতিয়ে দেখছে কেন। যাবার নাম করে কি অপরাধই না জানি করেছে। ব্যাপারটা আর ঔৎসুক্যের স্তরে নেই, যেন প্রহসন।

রীতিমতো ঘেমে উঠেছে। এতক্ষণ একটানা ঘুমিয়েছিল বোধহয়। অন্ধকারে ছায়া নেবে আসে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। হঠাৎ মনে হলো, মীরাদের যাবার কথা ছিল বিকেলে।

দরজা খুলতেই দেখল পুতুল দাঁড়িয়ে।

উঃ এতক্ষণে ঘুম ভাঙল। ওরা চলে গেল।

চলে গেল, একটা আর্তনাদ করে ওঠে যেন মাশুক।

কি আপনার সাংঘাতিক ঘুম। কত ধাক্কা, কত টোকা দিয়েছি আমি আর মীরা। কিছুতেই ঘুম ভাঙাতে পারিনি।

একটা চিরকুট দিলো পুতুল।

এইটে দিয়ে গেছে মীরা।

ভাঙা ভাঙা অক্ষরে লেখা মাত্র দু’লাইন : আমরা এসেছিলাম আপনার সঙ্গে দেখা করতে। বহুবার ডেকেছি তবু ঘুম ভাঙেনি। কবে দেখা হবে? আশা করি ভালো আছেন।

চিরকুটখানা পড়ে ফেলে একদৃষ্টে পুতুলের দিকে তাকিয়ে থাকে।

তার প্রাণ অযাচিত সন্দেহ আশঙ্কা করে বলে পুতুল, ভাবছেন আমি পড়েছি লুকিয়ে লুকিয়ে। অমন মেয়ে নই, বুঝলেন।

সেই সন্ধ্যায় আর কিচ্ছু না, শুধু চকচক করে ওঠে পুতুলের চোখ জোড়া। কোথায় যেন পরম পরাজয়ের একটা আঘাত তাকে মর্মাহত করে তোলে। আহত করে। মায়া দিয়ে, আদর দিয়ে, স্নেহ দিয়ে অনুকম্পা দিয়ে তারা ব্যতিব্যস্ত করে তুলল কেন।

সেদিন রাতেই দেখা হলো কেরামৎ সাহেবের সঙ্গে। দেখা হলো বলা ঠিক হবে না, বরং ভালো করে আলাপ হলো।

পুতুল এসে নিয়ে গিয়েছিল তার ঘরে।

আধাপাকা দাড়ি মুখ ভরা। খুব ছোট করে ছাটা চুল। পানে আসক্তি বোঝা যায় কালচে ঠোঁট দেখে। নিকেলের চশমা।

সম্ভবত কিছু পড়ছিলেন।

মাশুককে দেখে, বইটা নামিয়ে রাখলেন। লণ্ঠনটা তেজ করে দেন। ঢুকতেই জিজ্ঞেস কলেন, শুনলাম সিঙ্গাপুর যাচ্ছ।

মাথা নাড়ল মাশুক।

দাঁড়াও, বলে শেলফ থেকে কী যেন পুরনো এক খাতা বার করেন। হারিকেনের সামনে ধরে পড়তে শুরু করেন : সিঙ্গাপুর মালয় – সর্ব দক্ষিণ প্রান্তে। খ্রিষ্টমাস ও ককোস দ্বীপপুঞ্জু এর অন্তর্ভুক্ত। স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর ঘাঁটি। উৎপন্ন দ্রব্য : রাবার, নানা জাতীয় ফল ও কফি। আয়তন : ২৯১ বর্গমাইল। জনসংখ্যা ১,২৬৪,০০০।

থামলেন কেরামত সাহেব।

পড়া শেষ করে বলেন, কিন্তু কেন যাচ্ছ।

কৈফিয়ৎ এতজনার কাছে দিয়েছে যে ওটা এখন ওর কণ্ঠস্থ, চাকরি-বাকরি তো সুবিধে হলো না তাই ভাবছি।

এরকম কথা সবাই বলে। ভাবছ সেখানে যাবে, হঠাৎ অনেকগুলো টাকা আসবে হাতে। বড় বাড়ি তৈরি করবে। মাঝে মাঝে মন কেমন করলে কবিতার বই নিয়ে দুটো লাইন আওড়াবে, এই তো?

মাশুক জবাব দিলো না।

কেরামত সাহেব তার চোখে চোখ রেখেছেন। পলক ফেলছেন না। কী যেন তিনি খুঁজছেন। কোনো একটা দুর্বলতাকে আবিষ্কার করতে চান কি?

খানিকক্ষণ থেমে আবার বললেন, পারবে না। চমকে ওঠে মাশুক, কী পারব না।

দেশের বাইরে থাকতে।

কী করে জানলেন?

তোমার চোখে এখনও মায়ার অঞ্জল। এখনও একটা করুণ ছায়া। আকুতি, মিনতি। এ চোখ নিয়ে যাওয়া হয় না।

তার সম্পর্কে এরকম সিদ্ধান্ত দেবার জন্য মনে মনে ক্ষুণœই হলো মাশুক। মুখে কিছু বলল না। 

পুতুল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা ছবির বই উল্টাচ্ছিল।

সেদিকে চোখ পড়তেই কেরামত সাহেব বলেন, যা তো মা দুটো জরুরি কথা আছে।

এমন নিষ্ঠুরভাবে তাকে সরিয়ে দেওয়া ভালো লাগল না। একটা তৃতীয় সান্ত¡নার বা ভরসার মতো পুতুল ছিল। কেরামত সাহেবের শানিত দৃষ্টি থেকে চোখ ফেরাবার এখন আর কেউ রইল না।

ইচ্ছে করেই যেন হারিকেনের শলতে প্রায় বুজিয়ে দিয়ে ওটা নাবিয়ে রাখেন। একটা কৃত্রিম অন্ধকার ঘরে ছেয়ে ফেলে। স্বস্তি বোধ করে মাশুক। হারিকেনের জ্বলন্ত শলতের চাইতেও যেন বেশি জ্বলন্ত ছিল তার চোখ।

সেই আলো-ছায়া অন্ধকারে কেরামত সাহেবের গলা কোনো মায়াময় অতীতের মতো বেজে ওঠে। পদানত পরাভূত অতীত আগামীকে তার অভিজ্ঞতা বলছে যেন।

বলেই চলেছেন, গ্রামে আছি বলে ভাবছ আশা নেই, উচ্চাকাক্সক্ষা নেই। তা নেই সত্যি। কিন্তু থেকে কি হতো। এত পড়লাম, শিখলাম কিছু হলো। ওরা বলত – গলা ধরে আসে।

থেমে নিয়ে আবার বলেন, ওরা বলত বিশ্ববিদ্যালয়ের কড়া ছাপ, তোমাকে পায় কে। কিন্তু দেখলে তো আমি কোথায়।

লন্ডনে না, প্যারিসে না, রোমে না, আমি মধুগঞ্জে। জানো ইতিহাসে প্রথম হয়েছিলাম। তাই জীবনটাই আমার কাছে ইতিহাস। তবু বেশ আছি।

বেশ আছি কথাটা আরো কয়েকবার উচ্চারণ করে থামলেন কেরামত সাহেব।

আর যা বললেন তা একরম :

একটা স্কুল করেছেন গ্রামে নিজের বৌ-এর নামে। মেহেরুন্নেসা মেমোরিয়াল স্কুল। মেহেরুন্নেসা মণিখালার ভালো নাম। কেরামত সাহেব দুঃখ পরার্থসেবী যুবক পাচ্ছেন না। সেজন্যেই কথাটা পেরেছেন। দেশ ছেড়ে চলে যাওয়াই ঠিক করেছেন জেনেই বলেছেন। মায়া যখন কাটিয়েছে তখন শহর আর গ্রাম তার তো দুইই সমান। অন্তত কিছুদিন থেকে দেখুক না। যদি ভালো না লাগে চলে যাবে না হয়। কেন যে মন ভিজে গেল, বিনা প্রতিবাদে মেনে নিল। নিশ্চয়ই কেরামত সাহেবের এমন একটা ব্যক্তিত্ব যার সামনে তার প্রতিবাদ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।

আবার বোধহয় মনের দিক থেকেও সায় পেয়েছিল খানিকটা। অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের আরেকটা অধ্যায় পূর্ণ হোক না। না হয় অপেক্ষাই করবে কিছুকাল। সে না হয় মনে কবে মন-জরিপের নতুন একটা কাজ জুটলো। মাশুক বলল, কাজ নিতে সে রাজি; কিন্তু এক শর্তে। শর্ত জানতে চান কেরামত সাহেব।

এ বাড়ি থেকে নেয়। বাইরে কোথাও থেকে কাজ করবে।

বেশ তো তাই হবে। তুমি ঘনিষ্ট আত্মীয়। অবশ্যি আত্মীয়তার সবচেয়ে শক্ত ভিতটাই যখন গেছে তখন তোমাকে ধরে রাখব কোনো দাবিতে। মণিখালার কথা বলতে বলতে গলা ধরে আসছিল।

তুমি রাজি হয়েছ শুনলে তোমার মণিখালা খুশি হতো। স্কুলের সঙ্গেই টিনের একচালা ঘর। থাকতে চাও ওটা মেরামত করে দিই।

আলো প্রখর করলেন কেরামত সাহেব। তার জাদুমন্ত্র শেষ হয়েছে। সম্মোহনী শক্তির জোরে বশ করেছেন। এখন তাকে দেখাল নিঃশেষিত অঙ্গবারের মতো। আবছা অন্ধকারে মনে হয়েছিল কি অসীম ক্ষমতা ওই চোখের। এখন তিনি অসাধারণ পুরুষ নন, যার প্রতিটি কথা বুকে ভয় ধরিয়ে দেয়। অবিচলিত মনকে যা একটু আগে বিচলিত করে তুলেছে এখন তিনি শুধু একটি ব্যক্তি মাত্র। আত্মীয় মাত্র, পরলোকগত মণিখালার স্বামী মাত্র।

সে এমনিও রাজি হতে পারত। কিন্তু তা না হয়ে সে ক্ষুদ্রতর সত্তা নিয়ে বৃহত্তর ব্যক্তিত্বের কাছে পরাভূত হয়ে এসেছে।

মীরা চলে গেল। চিরকুটখানা রেখে গেল। ওটা না রাখলেই কি লাভ ছিল। কেন যেচে লাগাতে গেল ওই নিমগাছটা। কেন রাখল তার ভীরু মনের একটা ডালপালা ও শাখাবহুল স্মৃতি। ভালোই হলো মেরামত করা টিনের একচালাটায় আরেকটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা। হয়তো সূচনা এবং শেষ দুইই।

॥ দশ ॥

চলে আসার আগে পুতুলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল একবার।

বিয়েবাড়ির হৈ-হট্টগোল থেমেছে। সারা বাড়িটায় একটা থমথমে ভাব। ভয়ানক উত্তেজনার পর নিস্তেজতা। কারা যেন খেলা করতে এসেছিল, খেলেছে সারাদিন। তারপর মুঠো মুঠো ধুলো ছড়িয়ে, আর অনেক ধুলো গায়ে হাতে মেখে চলে গেছে। খেলাশেষে সেই তছনছ বাড়িতে অপরিসীম ক্লান্তিতে নাবল আরেকটি সন্ধ্যা। সে সন্ধ্যাকে বেদনাময় করে তুলল অসংখ্য গাছের দীর্ঘায়িত ছায়া। দীর্ঘশ্বাসের মতোই করুণ।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো একা ঘরে বসে ছিল মাশুক। উত্তরের হাওয়ার ভীরু পদক্ষেপে শিরশির করে ওঠে নারকেল গাছের পাতা। ম্লান গ্যাসবাতির মতো কাতর দেখায় দশমীর চাঁদ। আজকের জলসা ভাঙা জলসাঘরে শেষ বাতির মতো।

বই হাতে নিল, মন বসল না। দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে বিছানায় গা ছড়িয়ে দেয়। অসম্ভব ভালো লাগছে আজকের রাত। ভালো লাগছে। অসম্ভব গম্ভীর পরিবেশ, সুচ-পতন স্তব্ধতা। যেন ঠিক এ মুহূর্তেই হৃদয়কে হাতের কাছে পাওয়া যায়। তাকে ডাকা যায়। কোলাহলের রাজ্য থেকে যেন এইটুকু সময় তার স্বল্প অবসর। নিজের ভাববার, নিজেকে নিয়ে ভাববার অবসর।

কোথায় যেন একটা সাংঘাতিক বেদনার স্রোত বদ্ধপ্রাচীরে মাথা খুঁটে মরছে। সে স্রোতকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। অনুভব করা যায় শুধু।

মানুষের মন-জরিপ। কী অদ্ভুত শখ। ক’টি মনের সন্ধান পেল? যে ক’টির পেল, তাদের কেমন লাগল।

ইচ্ছে ছিল না। মনে মনে বরং বাধাই দিয়েছে। তবু এলো। এলো মীরা। অবাক-দৃষ্টি চোখ নিয়ে। কাঁধে একরাজ্যি চুল মেলে দিয়ে। অন্ধকারে উজ্জ্বল হয়ে। কোনোমতেই পারল না মীরাকে সরাতে। সে এলোই। মীরা তাকে দিয়ে গাছ লাগিয়েছিল। নিমগাছ। তেতো কেন লাগাল। মীরা যাবার সময় দেখা করেনি। একটা চিরকুট রেখে গেছে। ওই একটা চিরকুটে কাঁপা কাঁপা কয়টি শব্দ। আর অক্ষর। আর তো কিছু ছিল না। মিষ্ঠি সম্ভাষণটুকুও না। এত চিঠি লেখা হয়। ক’টি কথা তার মনে থাকে।

মীরার একটা কথাও ভুলতে পারছে না কেন।

অসম্ভব জ্বালা। এই আবছা অন্ধকার আলোকে সহ্য করতে পারছে না। চোখ ব্যথা করছে। একটা হাজার ওয়াটের উজ্জ্বল আলোর দিকে তাকালে বোধহয় সে শান্ত দৃষ্টি মেলে দিতে পারত। ভয় করত না। কিন্তু এই অন্ধকার আলোয় তার আসল চোখ নয়, তার মনের চোখটাই যেন অনুযোগ করছে বেশি। ভয় পাইয়ে দিচ্ছে।

চোখ বুজল মাশুক।

আস্তে করে শব্দ হয়। দরজাটা ফাঁক হয়ে যায়।

মাশুক সচকিত। হয়তো চিৎকারই তুলতো। পারল না। প্রাণবন্ত চিৎকারের জন্য গলা ফাটাবার শক্তিও যেন তার নেই।

ছায়াদেহ সরে এসে দাঁড়িয়েছে তারই চৌকির কাছে।

ফিসফিসে গলায় বলে, ভয় পেলেন, আমি পুতুল।

তুমি –

কী যেন একটা বলতে গিয়েও বলতে পারে না মাশুক।

হ্যাঁ। শুনলাম কাল চলে যাচ্ছেন। স্কুলের কোয়ার্টারেই থাকবেন।

হুঁ।

কেন?

হুঁ।

হুঁ মানে?

পুতুলের কথায় চমক ভাঙল।

অবচেতনের মতোই কথা বলেছে এতক্ষণ।

পুতুলই কথা বলল আবার, আপনি চলে যাবেন, আমার কিন্তু ভীষণ ভয় করে।

কেন?

কি জানি, ঠোঁট কামড়ে ফেলে পুতুল। নিজের অজান্তেই যেন কোনো কথাটা বলে ফেলতে যাচ্ছিল। সামলে নিল।

উত্তরের হাওয়ার বেগ বেড়েছে। দরজার কপাট শব্দ করে ওঠে থেকে থেকে।

পুতুল দাঁড়িয়ে। এতক্ষণ বসতে বলেনি। একবার বসতে বলার কথা মনেও হয়নি।

নিজের স্বার্থপরতার জন্য কুণ্ঠা হলো।

মাশুক বলল, বসো পুতুল।

কাছের চেয়ার ছেড়ে বিছানায় এক পাশ ঘেঁষে বসে পুতুল। যেন মিনতির সুরে বলে, মাঝে মাঝে আসবেন।

গুরুগম্ভীর পরিবেশটাকে হালকা করার জন্যেই একগাল হেসে বলে মাশুক।

বাঃ আসব না কেন।

কৌতুকের বাণ ছোটে পুতুলের চোখে, কেন আসবেন। মীরা তো নেই। মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুতুল। তাদের দুজনকে নিয়ে হয়তো গড়েছে ছোট্ট একটা জগৎ। আর কী ভেবেছে, কে জানে। কী করে জানল পুতুল? ওই ছোট চিরকুট কি তাকে বলে দিলো এত কথা। নিরাসক্ত হাসি মাশুকের ঠোঁটে। যেন এ কথাটা বলার জন্যে যা খুশি ধারণা করতে থাক, আপত্তি নেই, শুধু কোনো সিদ্ধান্ত নিও না।

নিজের মনে কোথায় যেন বুঝল, মীরার সাথে তার সম্পর্কের বাঁধন যতই ঠুকনো হোক, সিঙ্গাপুর যাওয়ার অবিচল সিদ্ধ মেয়েটি মস্তবড় প্রতিবন্ধকতা। হঠাৎ করে রানুখালার যাওয়া, দুর্যোগময় রাতের কয়েকটি মুহূর্তে তার সান্নিধ্য, নৌকোয় মনোয়ার সাহেবের খোঁজে একসঙ্গে যাওয়ার নিশ্বাসরুদ্ধ কয়েকটি প্রহর – এসবই তার সঙ্কল্পের খুঁটি নরম করে দিয়েছে।

সিঙ্গাপুরে তার মন খারাপ করার মতো মোহিনী শক্তি নিয়ে যে দাঁড়াতে পারে, সে মীরার চেয়ে কি ভিন্ন হবে। না মীরা তার তুলনায় কিছু কম। এই আলো নির্জন ঘরে যে এলো সেও তো আরেকজন। দেশ, কাল, সময়ের দুর্লভ প্রাচীর ধসে গেলে এদেশই কি আর ওদেশই কি। এসময়ই কি আর অন্যসময়ই কি। সবই এক। মুহূর্তের উত্তেজনায় আজ এই নিঃসঙ্গতার সুযোগ নিয়ে যদি নিবিড় হওয়ার চেষ্টা করে, পুতুল বাধা দেবে কি। অবিশ্বাসের আগুন জ্বলছে তার চোখে, ঠিক। কিন্তু তবু মোমের মতো গলে গলে সেও কি আত্মসমর্পণ করবে না। করবে কিন্তু শুধু কাঁটার মতো বিঁধবে একটি সাম্প্রতিক স্মৃতি। সে স্মৃতি মধুর না হোক, বেদনাময়। মীরা তাকে দিয়ে নিমগাছ লাগাল। কেন, তার বিচ্ছেদের তিক্ততা ডালপালা মেলুক, তিক্ততা সুবাস ছড়িয়ে দিক বাতাসে, সেজন্যে কি।

পুতুল তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। তার ঘন নিশ্বাসের আগুনে উত্তরের হাওয়া উষ্ণ।

যে সজনে গাছের ডাল উন্মুখ প্রতীক্ষায় সূর্যের আলো পাবার আশায় দেয়াল টপকে আসে, সে ডালের মতোই তার বিছানায় আলুলায়িত পুতুলের একটি হাত। মাশুক তুলে নিল। পালকের নিচে পায়রার উলঙ্গ বক্ষের মতো তা উষ্ণ আর মসৃণ।

সুযোগ নিজে এসেছে তার কাছে। সে যেচে যায়নি। প্রার্থনার মতো দু’হাত বাড়িয়ে জড় করে নিল পুতুলের আস্ত মুখ। চিবুকটা তুলে ধরল। এক মুহূর্ত পৃথিবীর গতি         স্তব্ধ। স্তব্ধ সৃষ্টির গতি। একজনের চোখে আরেকজন যেন দেখল নিশ্চিল কয়েকটি মুহূর্ত। যে মুহূর্তকে প্রশ্রয় দেওয়ার ঝুঁকি অনেক।

অধীর আগ্রহের একটি উপহার কোনোমতেই নিল না পুতুল। একরকম জোর করে ছিনিয়ে নিল নিজেকে। প্রার্থনার হাত এক মুহূর্ত দিশেহারা হয়ে নেবে আসে গভীর হতাশায়। ভীষণ পরাজয়। ভীষণ লজ্জা মাশুকের।

কান্নায় ভেঙে পড়ে পুতুল। দেহ কেঁপে ওঠে থেকে থেকে।

পেছন ফিরেই অনেকক্ষণ পরে কথা বলে পুতুল, আপনি দেখছি আমার বাবার মতো। নির্মম কশাঘাতের মতো কথা ক’টা বিঁধল মর্মে মর্মে। তার পরাজিত পৌরুষের গ্লানি ভুলে গেল মাশুক। কি সাংঘাতিক ইঙ্গিত করেছে পুতুল।

কেরামত সাহেব। অনেক পড়েছেন, জীবনে অনেক জ্ঞান সঞ্চয়ের গৌরব যার – তার সম্পর্কে মেয়ে হয়ে এমন কথা বলতে পারল কী করে পুতুল।

ধরা গলায় ডাকল মাশুক, পুতুল।

শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে নিয়ে বলে পুতুল, ভাবছেন বাবার সম্পর্কে অমন কথা কি করে বললাম, না? সেজন্যেই তো বলেছিলাম। আপনি চলে গেলে ভীষণ ভয় করবে। এতদিন আপা ছিল, ভরসা ছিল। এখন সেও শ্বশুরবাড়ি।

কী বলবে ভেবে পেল না মাশুক। প্রায় অনুচ্চারিত স্বরে বলল, কিন্তু কেরামত  সাহেব –

চোখ তুলে চাইল পুতুল। এক মুহূর্ত আগেকার ভীরু কান্নায় ঢলঢল মেয়ে সে আর নয়।

বলুন তো বাবাকে কেমন লাগে আপনার –

মাশুককে নিরুত্তর দেখে পুতুলই আবার বলে, নিশ্চয়ই একজন মহাপুরুষ, কৃতসঙ্কল্প পুরুষ – তাই না। বাইরে সত্যি তাই। কিন্তু তাঁর ভেতরের মানুষটি যে কত হীন, দুর্বল, কাপুরুষতা কম লোকেই জানে।

এক রহস্যময় জগতের উপাখ্যান শোনাচ্ছে যেন পুতুল। আপনাকে বলব, ইচ্ছে ছিল না। হাজার হলেও আমার বাবা। ভালো-মন্দে মিলিয়েই তো মানুষ। তিনিও তার ঊর্ধ্বে নন। তবু বলছি কেন জানেন?

কেন?

মীরার জন্যে।

মীরার জন্যে!

অবাক হয় মাশুক।

হ্যাঁ। মীরা আমার ছোটবেলার পাতানো সই। তাকে আপনার কেমন লাগে জানিনে। যাওয়ার সময ওর চোখ ছলছল করছিল –

আরেকটি নতুন তথ্য তাকে শোনাল পুতুল।

তাই নাকি?

মীরার জন্যেই বলছি। তাকে আপনার ভালো লাগে বলেই বলছি। যাবার সময় বলেছিল ওকে বলিস তোর কাছে থাকতে। রাখবেন না মীরার কথা?

কিন্তু আমি তো কোয়ার্টারে যাবো বলে কথা দিয়েছি। এখন আর তা হয় না। কিন্তু আমার যে ভয় করে।

মাশুক স্থির থাকতে পারে না। কী একটা কথা বলতে গিয়েও বারবার থেমে যায় কেন পুতুল। কিসের ভয় বারবার তাকে আচ্ছন্ন করে। একটা অনিশ্চয়তার মেঘ চোখমুখ জুড়ে। একটা রূঢ় সত্য যেন কোনোমতেই বাধানিষেধের পাঁচিল টপকে আলোর মুখোমুখি হতে চায় না। কিন্তু অসহিষ্ণু কৌতূহলই পাগল করে তোলে মাশুককে।

বাচ্চা ছেলের মতো জেদ ধরে, না তোমাকে বলতেই হবে।

এবার পুতুলের হাত ধরতে গিয়ে আর শিউরে ওঠে না। শিউরে ওঠার দরকার হয় না। এটা কামনার তাড়না নয়। একটা সহজ-সরল দাবি মাত্র। তার বেশি কিছু নয়।

চোখাচোখি হওয়ার ভয়েই মুখটা একদিকে সরিয়ে নেয় পুতুল।  তারপর একটা ক্ষীণ সমর্থনের আশায় বলে, এসব কথা আমার কি বলা উচিৎ? কোনো সব কথা? কী জানি তুমিই জানো উচিৎ কী অনুচিৎ। ইচ্ছে না হয়, বলো না।

পুতুল বলল। সবই বলল। অনেকদিন চুপ করে ছিল। অসহিষ্ণু মন বিদ্রোহ করতে চেয়েছে। শান্ত করেছে তাকে। প্রবোধ দিয়ে বলেছে, হাজার হলেও পরমাত্মীয়। রক্তমাংসের সম্পর্ক। কী করে সে গলা ফাটিয়ে কুৎসা করবে, নিজের ভয়ের কথাটা যতই যথার্থ হোক, কী করে সে ভয়ের কথা উচ্চারণ করবে। এতদিন পেরেছে। আজ আর পারা যায় না। অব্যক্ত সন্দেহ আর আতঙ্ককে একা সহ্য করতে হয়নি। বোন ছিল। বিয়ে হয়ে সেও গেছে। বাড়িটা খাঁ খাঁ করে।

হঠাৎ একটা আওয়াজ হয়, গড়গড় করে গেলাসে পানি ঢালার মতো। চমকে উঠে যায় ঘুম থেকে, পুতুল বলে, কে?

কেরামত সাহেব স্বভাবগম্ভীর গলায় ও ঘর থেকে জবাব দেন, আমি।

কেন?

না বাবা, কিছু না, এমনি।

খস্ খস্ শব্দ্ পাশের ঘরে।

কোনো কোনো দিন পা টিপে টিপে এসে দেখে পুতুল। চোখাচোখি হতেই বলে, কিসের যেন শব্দ হচ্ছিল না বাবা।

কেরামত সাহেব হাসেন। হাতের একরাশি কাগজ গুছিয়ে রেখে বলেন, লিখছিলাম। কাগজের শব্দ।

সত্যিই তো শব্দগুলো বিচিত্র নয়। অস্বাভাবিক নয়। সবই তার চেনা আওয়াজ। জগ থেকে গেলাসে পানি ঢালা বা কলম দিয়ে কাগজে লেখা, এমন কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না। তবু আশ্বস্ত হতে পারেনি পুতুল। তার কেবলই মনে হয়েছে, পিতৃত্বের গৌরবে উজ্জ্বল এই সার্থক পুরুষটি কোথায় যেন লোকের চোখে ধুলো দিয়ে যাচ্ছেন। তার পা-িত্য, জ্ঞানপিপাসা আর স্বভাব-গাম্ভীর্যের খোলসটি যেন বাইরের লোক দেখানো। অন্তরে আরেকটি অসহিষ্ণু মানুষ নিজেকে ধরা দিতে গিয়েও ধরা দিতে পারে না।

আর সে কথাও কি জানতো পুতুল? জেনেছে মাত্র সে বছর।

পুতুল সেবার স্কুল ছেড়েছে। ধারেকাছে মেয়েদের হাইস্কুল নেই। তাই পড়াতে এখানেই ইতি। কথা ছিল কেরামত সাহেব নিজেই পড়াবেন সন্ধ্যায় দু’ঘণ্টা করে।  প্রথম প্রথম পড়াতেনও। কিন্তু হঠাৎ তার শখ চাপল মাছ ধরার। পয়সা খরচ করে ভালো ছিপ তৈরি করিয়েছেন। ভালো মাজা সুতো আনিয়েছেন। বিকেল হলেই ছিপ নিয়ে ছোটেন পুকুরধারে। ফিরতে ফিরতে কখনও রাত হয়।

ওই পুকুরের ধারেই ছোটমতো একটা ঘেরা জায়গায় মণিখালা মানে পুতুলের মার কবর। লোকে বলে মাছ ধরা ছুতো। আসলে লোকটা স্ত্রী-বিরহে আকুল। সেজন্যেই ধারেকাছে মাছ ধরার আয়োজন। নইলে পুকুর কি আর ছিল না।

সন্ধ্যা হয় হয়। হারিকেনটা জ্বালিয়ে সেটা দিতে গিয়েছিল কেরামত সাহেবের ঘরে। হঠাৎ দেরাজের দিকে চোখ পড়ে। কি যেন একটা চিকচিক করছে। হারিকেনটা কাছে নিতেই নিজে চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারল না পুতুল। সেই বিছে-হার দু’বছর আগে যেটা খোওয়া গেছে বলে ধরে নিয়েছিল, সেটাই। একবার ইচ্ছে করল, সন্তর্পণে সরিয়ে নিতে। পারল না। কৌতূহলে দেরাজটা খুলে দেখেছিল শুধু। না বিছের হার ছাড়া আর কিছু নেই। আর কিছু পুরনো কাগজপত্রে হাতের টান লেগে তার দু’একটা পড়ে মাটিতে। তারই একটা তুলে নিতে গিয়ে কি মনে হয় পুতুলের, পড়তে বসে যায়। সম্প্রতি লেখা। তবে কালি ও খুব হালকা বলে জায়গায় জায়গায় লেখা পড়া যায় না। মনে হলো কোনো এক ডাক্তারের স্বাক্ষরিত চিঠি। তলায় প্যাঁচানো সই।

ডাক্তার হুমকি দিয়েছে, বছরসাতেক হতে চলল ওই টাকাটা শোধ করেননি কেরামত সাহেব। অমুক তারিখের মধ্যে পাওনা আদায় না করলে বিবেকমতে যা সম্মত তাই করা হবে। তবে তা যাতে না করতে হয়, সে ব্যবস্থা করলেই ডাক্তার সন্তুষ্ট।

পুনশ্চ দিয়ে তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, ডাক্তারের কাছ থেকে সার্টিফিকেট না পেলে লোকে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু সম্পর্কে যে অন্ধলক সন্দেহ করতে বসত না, তারই কি ভরসা। এখনই যে পারে না, তারই কি ভরসা। পোস্টমর্টেম এখনও হতে পারে। গা ছমছম করে এলো পুতুলের, চিঠিটা রেখে দিলো ড্রয়ারে। তাহলে তার জন্মের কারণ বলে মনে সম্মান আর শ্রদ্ধায় অন্ধের মতো যাকে ভক্তি করে এসেছে, শেষে এ লোকটা কি এই?

শব্দ করে দরজা খুলে যায়।

জ্বলন্ত দৃষ্টি নিয়ে কেরামত সাহেব দাঁড়িয়ে। খানিকক্ষণ কোনো কথা ফুটল না পুতুলের মুখে।

যেন তার দৃষ্টির উত্তাপ থেকে বাঁচার জন্যেই হাত দিয়ে চোখ ঢাকল। তারপর ভীরুকণ্ঠে বলল, তোমার বিছানার চাদর বদলে দিতে এসেছিলাম। কেমন ময়লা দেখো না।

ড্রয়ার ভালো করে লাগেনি। খানিকটা বার করা। সেদিকে দৃষ্টি পড়তে আহত বরাহের মতো চিৎকার করে ওঠেন কেরামত, দেরাজে হাত দিয়েছে কে।

পুতুল কাঁপছে। ধুক্ ধুক্ হৃদয় সাংঘাতিক ভয়টাকে আরো ভয়াবহ করে তোলে। ধারেকাছে হেলান দেওয়ার মতো কিছু নেই?। বসবার কিছু নেই। জীবনের পরম মিথ্যাগুলোকে কেন সে আর সকলের মতো শান্ত সহজ কণ্ঠে বলতে পারে না। কেন, গলা কেঁপে ওঠে। আর্তনাদের সুর বেজে উঠে কেন।

কেরামতও কাঁপছেন। ভয়ে নয়, রাগে। অনেক সাধনা ও চেষ্টায় গড়া দেয়ালে ভাঙনের সূচনা দেখতে পেরেছেন।

দেরাজটা ধুম করে বন্ধ করে হেলান দিয়ে দাঁড়ান।

পুতুল হয়তো সত্যি সত্যি চিঠিটা পড়ে থাকবে। কিন্তু তার জীবনের একটি চরম নিষ্ঠুরতা কাহিনী জেনে নেবার পক্ষে ওইটুকুই কি যথেষ্ট। এখনও সময় আছে। সুযোগ আছে।

ঘরের শত্রুকে নির্মূল করতে পারবেন না। আপোস করাই ভালো। একবার তো সে চেষ্টাই করেছিলেন। আজও তাকে জাগ্রত প্রহরীর মতো বিস্মৃত অতীতের সিংহদ্বার টহল দিয়ে বেড়াতে হয়। অনুসন্ধিৎসু মানুষের চোখ সে রহস্যের সন্ধান পায়নি। একবার পেলে তাকে কি আর ঠেকাতে পারবেন। পুতুল মাথা নিচু করে চলে গেল। কেরামত কিছু বললেন না। একবার বজ্রমুষ্ঠী তুললেন। কিন্তু সেটা দেরাজের গায়ে ঠেকে নিষ্ফল গর্জন করল মাত্র।

তারপর থেকে কোনোদিনই আর প্রকৃতস্থ হননি কেরামত সাহেব।

কাজ না থাকলে কথা বলেন না। কেমন এড়িয়ে চলেন লোকজন, কিন্তু তার জ্ঞানসাধনা অব্যাহত থাকে।

মস্ মস্ শব্দ করে রাতে। একটা বই শেষ হয়, তারপর অন্য বই নাবান। নোটবইয়ে কি টুকতে থাকেন। তারপর একসময় হাই গেলেন। বাতি নিবিয়ে ঘুমুতে যান। পুতুল জানে লোক-ঠকানো এ অভিনয় তাকে করতেই হবে। পাশের ঘর থেকে পুতুল যেন প্রতিটি শব্দ অনুসরণ করে। বাতি নিবলে সে নিজেও স্বস্তি পায়। বাতি জ্বলে ওঠে কখন আবার।

উঁকি দিয়ে দেখে পুতুল। দেরাজের কাগজগুলো বড় করে দেশলাই দিয়ে জ্বালাচ্ছেন কেরামত।

একবার ইচ্ছে হলো, সাবধান করে দেয়। শীতের দিন। হঠাৎ আগুন লাগলে অঘটন ঘটতে পারে।

তবু নীরব দর্শকের মতোই শ্বাসরূদ্ধ হয়ে সব দেখতে হয়। গলগলে নিবে গিয়ে, ছাই থেকে ধোঁয়া বেরোয়। দু’একটা কাগজে এখনও মরা আগুনের রং।

কেরামত শুতে গেলেন।

সেদিন রাতে ঘুম হলো না পুতুলের।

দিন দু’তিন পর। কেরামত সাহেব তার পুরনো জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে শক্ত বুট পায়ে দিয়ে সকাল সকাল তৈরি হয়ে যান। পুতুল জানে, এটা বাইরে যাবার আয়োজন। দু’নালা বন্দুকটা ভেঙে ভালো করে দেখেন কোথাও ময়লা জমেছে কি না।

পুতুল চা এনে দিলো।

চা খেতে খেতেই জানালেন কেরামত, দিনদুয়েকের জন্যে বাইরে যাবে শিকারে। তার বন্ধুর অনুরোধে। একা থাকতে পুতুলের অসুবিধে হবে জানেন, কিন্তু তিনি যে আগেই কথা দিয়েছেন। দরজা-জানালা ভালো করে খিল দেয় যেন মনে করে। আর খুব ভয় করলে মাশুককেও ডাকতে পারে। বাইর ঘর তো খালিই।

টুঁ শব্দটি করেনি পুতুল।

মনে মনে সর্বান্তকরণে কামনা করেছে এ যাত্রা। দু’দিন কেন, তার বেশি হলেও আপত্তি নেই। তার অস্থিরচিত্ত তাহলে দুদিনের জন্য একটু খানি অবসর পেল। দু’দিন সে মন ভরে নিশ্বাস নিতে পারবে। হোক একা। ভয় করবে না। মাশুককে ডাকবার দরকার হয়নি।

কাজলীর মা থাকতে এলো। বলল, যে ক’দিন দরকার সেই থাকবে। বাইরের লোককে ডাকতে যাওয়া কেন। কুব্জ-দেহ কাজলীর মা এখনও লাঠি-ছাড়াই চলতে পারে। বয়েস যে কত তা সে নিজেও জানে না। শুধু হেসে বলে, আমার জন্ম কি আমি চোখে দেখেছি।

হাসতে গেলে দেখা যায় এক পাটি দাঁতও নেই। চোখেও দেখে না ভালো করে। তবু কাজলীর মা দাওয়ায় বসে দোক্তা খেতে বসে, মনে হয় তারচেয়ে সুখী কেউ নেই। আপন বলতে এখন কেউ নেই। নিজের বিয়ে হয়েছিল সাধনপুর। স্বামীকে ভালো করে মনেও নেই। শুনেছে লোকটা ছিল গাঁজাখোর! সেই কবে ‘মিলে কাজ করতে যাচ্ছি’ বলে তার ভাঙা ছাতা সম্বল করে বেরিয়েছিল, আর আসেনি। কোলের মেয়েটিকে দেখতেও না। কেউ বলে রেলের তলায় পড়ে মরেছে। কেউ বলে,           বেওয়ারিশ লাশ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হয়তো সেখানেই হবু ডাক্তাররা ছুরি চালিয়েছে তার ওপর।

তার কোনোটাই হয়তো বিশ্বাস করেনি কাজলীর মা। এখন তো ভাটার বয়েস। একটা পেট কোনোমতে চলেই যায়। এ বাড়ি ও বাড়িতে ধান ভেনে, এক কোঁচা চাল পাওয়া যায়। খানিকটা জায়গা জুড়ে বাগান করেছে। কুমড়ো, সিম আর ডাঁটার। আগে নাকি ফুলের বাগান ছিল।

মাশুক একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, কাজলীর মা, তোমাকে বাগান করতে শেখাল কে?

যে বছর মীরারা এসেছিল, মনোয়ার সাহেব এই একটি ভক্তই পেয়েছিলেন। কাজলীর মাকে বলেছিলেন ফুলের বাগান করতে। করেও ছিল। যদিও নিজের মনের সমর্থন ছিল না। প্রতিবাদ করে বলেছিল কাজলীর মা, ফুলের বাগান দিয়ে কী করব। পেটের আগুন আগে নিবুক। উহুঁ-হুঁ। পেটের আগুনটাই তো মানুষের মন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খেয়েছে, বাগান কর। ফুলের বাগান। দেহটাই সব নয়। মনটাই আসল। কেরামত সাহেবের পছন্দ হয়নি সে কথা।

তিনি কাজলীর মার পক্ষ নিয়ে বলেছিলেন, সত্যি কথা বলতে গেলে বাগানপ্রীতির বাতিক না থাকলে আপনি মহাপুরুষ হতে পারতেন। মেয়েলি স্বভাব কী করে হলো আপনার? মনোয়ার সাহেব রাগ করেননি হেসে বলেছিলেন, ভালো, একটু মেয়েলি স্বভাব ভালো। পৌরুষের দম্ভই তো পৃথিবীর ছারখার করল।

কেরামত সাহেব বিদ্রƒপের কটাক্ষ হেসে বলেন, পুষ্পেও কীট আছে, জানেন।

তেমনি শান্তকণ্ঠ মনোয়ার সাহেবের।

মৃদু হেসে বলেন, তা আছে জানি। কীট তো শুধু পুষ্পেই না, মানুষের মনেও আছে। এটা দেখা যায়, ওটা দেখা যায় না – এই তো তফাৎ। তীক্ষè বল্লমের মতো তার কথায় খোঁচা আবিষ্কার করলেন কেরামত সাহেব। মুখে কিছু বললেন না। মনে মনে গর্জালেন। আত্মীয় মানুষ, দুর্ব্যবহার করতে পারেন না।

তার পরের বছরই মণিখালার মৃত্যু হয়েছিল। তবে কি কিছু অনুমান করতে পেরেছিল মনোয়ার সাহেব।

কেরামত কোনোদিকে না তাকিয়ে চলে যান।

পরে নাকি কাকে বলেছিলেন, লোকটা গাছের সঙ্গে থেকে থেকে জংলি হয়ে গেছে। মানুষের ভালো দেখতে পারে না।

কাজলীর মা’র বাগান করার এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। নিজের আপত্তি সত্ত্বেও ফুলের বাগানই করেছিল। মনোয়ার সাহেব দেখিয়েও দিয়েছিলেন নিজে হাতে লাগিয়ে। কিন্তু সে ফুল শুধু বাগানেই ফোটে আর শুকোয়, দেবার লোক নেই।

সেদিন একলাঘরে বসে পুতুল জিজ্ঞেস করেছিল, কেন, দেবার লোক পেলে না কেন।

কাকে দেবো মেহেরন বু-ই নেই।

মণিখালাকে তার শুদ্ধ পৈতৃক নামেই ডাকতো কাজলীর মা। কাজলীর মা বলল, তোর বাবা আজ ফিরবে না তো।

না। বললেন তো শিকারে গেছেন। দিন দুই থাকবেন।

হাতলে দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে আসি।

দরজা ভিড়িয়ে দিলো কাজলীর মা।

গা ছম্ ছম্ করে এলো পুতুলের। মুখে কিছু বলল না।

কাজলীর মা মোড়াটা কাছে টেনে নিয়ে বসে। তার হাতের কুপি মাটিতে রাখা। কড়া কেরোসিনের গন্ধ বেরুচ্ছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে গাঢ় কালো ধোঁওয়া।

নিবিয়ে দিই।

কাজলীর মা ফুঁ দিতে যায়। পুতুল মানা করে। একটু নড়েচড়ে বসে কাজলীর মা। চোখ দুটো বাঁকিয়ে নিশ্বাসরুদ্ধ কণ্ঠে বলে, একদিন সকালে বাগানের একতোড়া ফুল নিয়ে দিতে গেছি তোর মাকে – কথাটা মাঝপথে আটকে দিয়ে জিজ্ঞেস করে পুতুল, আমরা তখন কোথায় ছিলাম?

তোরা দু’বোনই তখন বিজনপুর। মীরাদের বাড়ি।

তারপর?

মেহেরন বু বললেন, ফুল এনেছিস কাজলীর মা। কিন্তু কাজ খুচরো নেই।

ব্যাপারটা পুতুলের বোধগম্য হবে না মনে করে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করে কাজলীর মা, তোর মা ফুলের তোড়া আনলেই দু’চারআনা না গছিয়ে ছাড়তেন না। সেদিন হাতে পয়সা ছিল না সে কথাই বলছিলেন মেহেরন বু।

আমি বললাম তাতে কি হয়েছে।

চলে যাবো এমন সময় আবার ডাকলেন।

বললেন, চলে যাচ্ছিস কাজলীর মা।

বললাম, কেন।

আমার যেন কী রকম লাগছে।

দেখলাম সত্যি কেমন পা-ুর রক্তহীন চেহারা। চোখের মণি কেমন ঘোলাটে।

বললাম, মাথা ঘুরছে নাকি?

কি জানি, বলে মাথাটা আমার ঘাড়ের ওপর রাখলেন।

দেখলাম ভয়ানক ঠান্ডা। আমাদের ভীষণ ভয় করল।

সামনে দুধের গ্লাস। অর্ধেকটা চুমুক দিয়েছেন বোধহয়।

বললাম, দুধটা খেয়ে নাও না।

নাঃ বলে হাত নাড়লেন তোর মা।

আবার কি মনে করে বললেন, নে তো কাজলীর মা দুধটা খেয়ে নে। চুমুক দিতে যাবো হঠাৎ আমার হাতটা চেপে বললেন, না রে না তুই খাসনে। তুই আমাকে রোজ ফুল দিয়েছিস। যা তো, দুধটা ফেলে গ্লাসটা ধুইয়ে আন।

আমার পা সরল না। কেমন একটা সন্দেহ খচ্খচ্ করে উঠল, একবার দুধের গ্লাসের দিকে তাকাই। আরেকবার তাকাই তোর মার দিকে। ঠোঁট শুকিয়ে আসছে। চোখের পাতা খুলে রাখতে পারছিনে।

আস্তে আস্তে আমার হাতটা টেনে নিয়ে বললেন জানিস কাজলীর মা, দুধটা খাওয়ার পরই কেমন যেন –

কিন্তু কথা শেষ করলেন না। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন, যা না দেরি করছিস কেন। গ্লাসটা ধুইয়ে রাখ।

বাইরে এসে দেখি তোর বাবা দাঁড়িয়ে।

গ্লাস ধুতে যাবো, তোর বাবা বাধা দিলেন। বললেন, কাজলীর মা তুই ওর কাছে থাক। আমিই ধুয়ে আনি। রোগীকে একা ছেড়ে যাসনে। কত বললাম শুনলেন না। একরকম জোর করেই কেড়ে নিলেন আমার হাত থেকে।

ফিরে এসে তোর মাকে আর দেখিনি।

অতর্কিতে প্রশ্ন করে পুতুল, ডাক্তার এসেছিল?

আসবে না কেন। কিন্তু ডাক্তার এলেই কি।

পুতুলের বারবার মনে হলো ডাক্তারের নাম জিজ্ঞেস করে।

কিন্তু সে ইচ্ছে দমন করল।

অবাক হয়নি পুতুল। দেরাজ খুলে যেদিন ওই চিঠিখানা পড়েছিল সেদিন সন্দেহ হয়েছিল। আজ কাজলীর মা সে সন্দেহটাই পাকা করল।

মাকে মারল কেন বাবা।

মুখ নিচু করে থাকে কাজলীর মা। একমুহূর্ত কোনো জবাব দেয় না। দ্বিতীয়বার পুতুলের একই প্রশ্নে চমক ভাঙল।

বলল, তোর বাবার দোষ ছিল।

কে রে, কাজলীর মা।

হঠাৎ রাগে ফেটে পড়ে যেন কাজলীর মা, কে শুনবি। পেটে করে সাপ পুষেছিলাম সে। কাজলী। পোড়াকপালি নিজেও ডুবল অন্যকেও ডোবাল।

উত্তেজনা কমলে আবার বলা শুরু করে, তোর মা সব সহ্য করতে পারত। পারত না বিশ্বাসহীনতা। বলেই দিয়েছিল দুজনকে নিয়ে চলতে হয় ওকে সরাও। নাহয় আমাকে। তোর মাকেই সরতে হলো।

কাজলীকে দেখেছে পুতুল। টানা ভুরু। অজানুলাম্বিত কেশগুচ্ছ। টিকোল নাক। ঠোঁটজোড়া একটু পুরু। কিন্তু সেজন্যে অসুন্দর মনে হয়নি তাকে।

হঠাৎ একদিন চলে গিয়েছিল কাজলী কাউকে না বলে।

কাজলীর মা কুপিটা নিবিয়ে দিলো এবার, পারল তোর বাবা কাজলীকে রাখতে। হতচ্ছাড়া বেরিয়ে গেল না শেষ পর্যন্ত আরেকজনের সঙ্গে।

তার চোখের সামনে চেনা পৃথিবীটা হঠাৎ বদলে গেল।

তার মা, কাজলী আর বাবা। নিষ্ঠুর পৃথিবীর তিনটে খেলনা। প্রথমটাই তার ছিল কাচের তৈরি, সেজন্যে সেটাই ভাঙল। আর একটা ছিল চকমকি পাথরের। সে কেবল লোভ দেখিয়েই বেড়ায়। পরেরটা পেতলের। পড়ে গিয়ে চোট খেলেও ভাঙে না।

কাজলীর মা মাদুর পেতে ঘুমিয়ে।

সহস্র যোজন দূরের তারার মতো জ্বলছে তার চোখ। পাশ ফিরলেই দেখতে পায় পুতুল।

কিন্তু না। আর না। যথেষ্ট। একটি রাতের জন্যে এই দুঃসহ আঘাত আর বেদনাই যথেষ্ট। এর বেশি সে সইতে পারবে না। অনেকগুলো ভালো মানুষকে একসঙ্গে অপরাধী করে নির্মম দম্ভ দিতে পারবে না এ মুহূর্তেই। তার জন্যে সময় লাগবে। তার জন্যে ধৈর্যের দরকার। দরকার অভ্যাসের।

পলাতক মন কেবলই ফিসফিসে গলায় বলে, পালাও। পালাও। নির্মম, দয়াহীন, রূঢ় পৃথিবীর বিষের ধোঁয়া থেকে যদি মুক্তি চাও, পালাও। কাজলীর মা বোধহয় তখনও আপন মনে কথা বলে যাচ্ছিল। শেষেরটুকু শুনল পতুল।

কাজলীর মা বলছে, একদিন কাউকে না কাউকেই বলতে হতো রে। তাই তোকে বললাম। আমার কত দুঃখ পুতুলবু তুই জানিস নে।

কথা তারও জড়িয়ে আসে। ঘুমিয়ে পড়ছে কাজলীর মা।

এপাশ-ওপাশ করে পুতুল। ঘুম আসে না।

স্বপ্ন দেখল তিনজন ডানাকাটা পরী তার কপালে রজনীগন্ধার একটা ডাল ছুইয়ে দিলো। বলল, ফুলেল মতো শুভ্র, সুন্দর হতে চাও যদি পুতুল পালাও। মানুষের রাজ্য থেকে চলে এসো। আমরা তোমাকে নবজন্ম দেবো। আমাদের এক ছোঁয়ায় তুমি ফুল হয়ে যাবে। কোনো ফুল হয়ে ফুটতে তোমার সাধ, হাস্নাহেনা, জুঁই না ক্যামিলিয়া –

পরদিনই গিয়েছিল মাশুকের কাছে ছুটে।

সেয়ানা লোকদের জগতের অবিশ্বাস্য রূপকথা শোনাল পুতুল।

আশ্চর্য তার কল্পনায় যে মানুষটিকে ভেবেছিল মহাপুরুষ, কোথায় তাকে ঠেলে দিলো পুতুল। স্কুলে পড়াবার কথায় যেদিন রাজি হয়েছিল মাশুক সেদিন। হয়েছিল এজন্যে যে, মনে মনে অপূর্ণ যুদ্ধশীল মানুষটির কথা এড়াতে পারেনি। পরলোকগত স্ত্রীর প্রতি একটি কাতরপ্রাণ স্বামীর নিষ্ঠার কথা ভেবেই সে রাজি হয়েছিল। শুধু রাজি হয়নি। স্ত্রী-প্রেমে মুগ্ধ লোকটিকে যতই দেখেছে, ততই মুগ্ধ হয়েছে।

অথচ –

কি আশ্চর্য। যেন পুতুল তার মনের ভাবনা চুরি করে জেনে নিয়েছে। তার কথারই প্রতিধ্বনি করে বলল, অথচ আজ আর আমার বাবাকে বাবা মনে হয় না। মনে হয় একটা খুনির সঙ্গে কে ঘরে বাস করছি। তার দৃষ্টি এড়ানোর জন্যেই চোখ নাবিয়ে আবার বলে পুতুল, কেন বলেছিলাম আপনি আমার বাবার মতো জানেন। বাবাও হয়তো একদিন কাজলীকে অসহায় পেয়ে –

চরম অপমান ইচ্ছে করেই দিলো যেন পুতুল। কি ক্ষতি ছিল কথাটা ভুলে গেলে। সে প্রসঙ্গের তো সেখানেই ইতি ঘটেছে। তবু কেন আবার তা তুলল পুতুল।

একবার ইচ্ছে করেছে জিজ্ঞেস করবে, কে এই মেয়ে কাজলী। কিন্তু তা আর হয় না।

একটি নির্মম অপমান সে পথ বন্ধ করে দিয়েছে আগেই।

মাশুক যেন একরকম জোর করেই তাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বার করল। বলল, যাও তো পুতুল। ঘুম পাচ্ছে।

পুতুল উঠল।

কথাটা বুঝল কিনা কে জানে। একবার আড়চোখে চেয়ে বলল, ঘুম পেয়েছিল, আগে বলেননি কেন সে কথা। তাহলে বিরক্ত করতাম না।

মাশুক চেয়ে দেখে অশরীরী ছায়া দেহ যেমন করে এসেছিল, তেমনি আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। রাতের অন্ধকারকে জামগাছের ছায়া যেখানে আরো গাঢ়তর, গভীরতর সে পথ দিয়েই গেল পুতুল। তারপর অন্ধকার নিজেই যেন একটা অতিকায় দেহ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আর দেখা গেল না পুতুলকে।

॥ এগারো ॥

কেরামত সাহেবের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাসের খুঁটি দুর্বল হয়েছে জেনেও সে কথা জানতে দেয়নি মাশুক।

নিজের মনে মনেই তর্ক করেছে। হয়তো পুতুলের কথাই ঠিক। লোকটা জাতভ-। লোক ঠকাবার অমোঘ অস্ত্র হিসেবেই তার জ্ঞানস্পৃহা। স্কুলটাও হয়তো সে জন্যেই।

কেরামত সাহেব তার পরলোকগত পতœীকে ভালোবাসতেন, মনেপ্রাণে –

সে সমন্ধে কারও সন্দেহ থাকবে না। স্ত্রীভক্তির নিদর্শন পাকাপোক্ত করার জন্যেই বোধহয় বৌয়ের নামে স্কুল করার কথা ভেবে থাকবেন। স্কুলের প্রতি একরকম মায়া জন্মে যায় মাশুকের। গ্রামের দেড়শো ছেলে পায়ে হেঁটে আসে। কাঠের বেঞ্চিতে বসে তারা, ধুলোমাখা পা দুলতে থাকে। নতুন বই কেনার পয়সা নেই। মলাটের পরও দু’দশটা পৃষ্ঠা ছেঁড়া। তবু তেল চিটচিটে বইগুলো সাত হাত ঘুরে এখনও কাজ দিচ্ছে। বাকি কাগজের খাতা। তাও কি সবাই জোগাতে পারে।

আগে মাস্টার ছিল জনাসাতেক। এখন সব মিলিয়ে তিনজন। এতগুলো ক্লাস নেওয়া যায় না। মাস্টারসংখ্যা কেরামত সাহেবই কমিয়েছেন। বলেছেন, স্কুলের পয়সায় যা আয়, তা দিয়েই চালাতে হবে। এক পয়সা দিতে পারবে না।

কিন্তু যা আয়, তাতে তিনজনেরই চলে না।

আজম সবচেয়ে জুনিয়র টিচার। প্রায়ই স্কুল কামাই করে।

মাশুক সে কথা বলেছেও ক’দিন।

আজম হাসে। বলে, আপনার যত মাথাব্যথা।

তারপর কটাক্ষ হেনে বলে, অবশ্যি হবেই না কেন। খালুর স্কুল। নিজেদের জমিদারিই বলতে পারেন। সময়মতো মাইনে দিতে যখন পারবেন, তখন ওসব কথা মানায়। তার আগে না।

আজম চাকরি থেকে ‘রিজাইন’ করেছিল পরদিন। আসল কথা চাকরি তার হয়েই ছিল। এটা যাবার আগে একটা ছুতো মাত্র।

বিদায় নেবার আগে সদুপদেশ লোভ সামলাতে পারে না আজম। বলে, ভালোয় ভালোয় আপনিও সরে পড়–ন। এ স্কুল চলবে না। শুনেছিলাম, আপনি যাচ্ছেন সিঙ্গাপুরে না কোথায়। কেন, আজকাল জাহাজ যাচ্ছে না বুঝি। অবশ্যি যদি অন্য কোনো আকর্ষণ থেকে থাকে – অর্থপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকায় আজম।

দুটো কড়া কথা শুনিয়ে দিতে পারত। কিছুই করল না। তার নিজের দাবার ছকে সে নিজেই হারতে বসেছে। কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।

রাতে কেরামত সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনার জন্যে।

পুতুলের ঘর হয়ে যেতে হয়। দেখাও হয়েছিল একবার। কোনো কথা হয়নি। কেরামত সাহেব চিরাচরিত নিয়মে সেদিনও কী একটা বই পড়ছিলেন। চোখাচোখি হতেই লুকিয়ে নিলেন। তবু এক ফাঁকে দেখে নিয়েছিল নামটা। ‘মেডিক্যাল জুরিসপ্রুডেন্স’।

ভূমিকা না করেই বলে মাশুক, শুনেছেন বোধহয় জুনিয়ার টিচার ‘রিজাইন’ করেছে।

শুনিনি। তবে সম্ভব।

জবাবের ঢং-এ মনে হলো তিনি সত্যিকার বিচক্ষণ ব্যক্তি, একথাটা তিনি প্রাণপণে না বুঝিয়ে ছাড়বেন না।

মাশুকও ছাড়ে না, সম্ভব-অসম্ভবের কথা না খালু। আমি ভাবছি স্কুলের কথা।

ঔদাসীন্য দেখিয়ে বলেন কেরামত সাহেব, না ভাবলেও পার। ইচ্ছে করলে তুমিও চলে যেতে পার। তুমি তো সিঙ্গাপুর যেতে চেয়েছিলে।

হ্যাঁ, তা চেয়েছিলাম। কিন্তু স্কুলের এতগুলো ছাত্র –

তাদের ভালোমন্দের কথা আমাকে আর তোমাকে ভাবতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এক স্কুল গেলে অন্য স্কুল হবে।

এ যেন সম্পূর্ণ আরেক মানুষ।

এই কেরামত সাহেবই অনুনয় বিনয় করে তাকে স্কুলে চাকরি নিতে বলেছিলেন। কিন্তু কেন?

তার জবাব না চাইতেই দিলেন কেরামত সাহেব, স্কুল থাকবে না তা আমি জানতাম। শুনলে হয়তো আঘাত পাবে মনে মনে, এ পরিণতিই আমি কামনা করেছি। সাত বছর চলেছে, সেই অনেক। লোকে বলবে তুমি আসার পর স্কুল পাততাড়ি গোটাল।

একদিকে ভালোই হলো। তুমি তো এদেশে থাকছ না। আর রসিয়ে বলার মতো একটা কারণও পেল লোকে। বলবে আত্মীয়তা তোষণের জন্যেই স্কুল গেল। বলুক, তা না হলেও তো বলত।

রাগে থরথর করে কাঁপছে মাশুক।

কেমন পাশবিক আনন্দে তার চোখ নাচছে।

বলেই চলেছেন কেরামত, তারা বলবে তোমার আসার আগে বেশ চলছিল। তুমি আসতেই উচ্ছন্নে গেল। জানো, যখন শুনলাম তুমি সিঙ্গাপুর যাচ্ছ, তখুনি আমার মনে হয়েছে তোমাকেই আমার দরকার। লোকে বলুক স্কুল আমি গড়েছিলাম। আর ভেঙেছ তুমি।

এক ফাঁকে মাশুকের মুখের প্রতিক্রিয়াটা দেখে নিলেন যেন।

তারপর বললেন, আর স্কুলের কাজ ফুরিয়েছে। আমার স্ত্রী-প্রেমের কথাটা তোমরা সবাই জেনে ফেলেছ। আমার কী দরকার স্কুল চালিয়ে। একটা প্রতিবাদ বার ঠেলে বেরুতে চায়। এতক্ষণ তাকে সম্বরণ করেছে এবার করল না। বলল, কিন্তু আপনার ভ-ামি কি তাতে চাপা থাকবে। নরকীয় পাপের অপরাধে কোনোদিন কি আপনাকে শাস্তি পেতে হবে না।

শুধু স্কুল নয়, আপনার মিথ্যে ছলনার জগতটাও এবার ভাঙতে শুরু করেছে।

চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে ওঠেন কেরামত। যেন উদ্যত শিকারের সামনে ঝাঁপিয়ে পরবেন। টুকরো টুকরো করে ছিঁড়বেন। অথচ পারেন না কিছুই। নিষ্ফল বজ্রমুষ্ঠিও তুলতে পারেন না শূন্যে।

মাশুক বসে থাকে। শান্ত, সৌম্য মূর্তি। বাইরে ক্ষুব্ধ ঝড়ে একটি পালক যার নড়েনি সেই সাবধানী ঈগলপাখির মতো। লক্ষ করেনি, এখন এসে দাঁড়িয়েছে তার পেছনে পুতুল।

আশ্চর্য, তার না হয় কারণ ছিল। কিন্তু এত সাহস পুতুলকে কে দিলো। কী দিলো তাকে এমন ক্ষমাহীন, নির্মম ও বেপরোয়া হতে।

পুতুলের চোখে ঘৃণার আগুন। দাউ দাউ করে জ্বলছে। সেদিকে তাকাতে সাহস হয় না কেরামতে। যেন নিজের মেয়ে নয়, যেন নিজের কোনো পরিচিত আত্মীয় নয়। একটি পরাক্রমশীল শত্রুর মুখাপেক্ষী হয়েছেন। তাকে নিরুদ্যম করার জন্যই যেন অমোঘ অস্ত্রের আশ্রয় নিলেন, পুতুল তুই আমার মেয়ে।

এক পা এক পা করে এগিয়ে আসে পুতুল। সেই জ্বলন্ত দৃষ্টির আগুনে লোকটাকে পুড়িয়ে দিতে। তার উষ্ণ নিশ্বাস অনুভব করেন কেরামত তার নিজের বুকে। পুতুলের দিকে তাকান। যেন এখুনি তাকে পিঁপড়ের মতো পিষে মারতে পারেন। কিন্তু সত্যি সত্যি কি তিনি পারেন। তার নিজের ওপরই যেন নিজের বিশ্বাস কমে আসছে।

পুতুল এবার তাকে সরাসরি আঘাত করেছে। তীক্ষè ছোরাটা বুকের আসল জায়গায় বসিয়ে দিয়েছে। হ্যাঁ, এর চাইতে সত্যি সত্যি একটা ছোড়া বসিয়ে দিলে কি ক্ষতি ছিল।

গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলেছে, আর আমার মা, আপনার লালসা আর কামনার বিষে মরেছে যে, সে আপনার কী? সে আপনার স্ত্রী ছিল না, বাবা?

শেষের এই ‘বাবা’ কথাটা শোনাল চরম পরিহাসের মতো।

মাশুক অপ্রতিভ হয়। এতটা সেও আশা করেনি। প্রবোধ দিতে যায়। পুতুল কথা শোনে না। আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, আপনি বাধা দেবার কে। আপনি এ নাটকের তৃতীয় পুরুষ। আমি উত্তম পুরুষের সঙ্গে কথা বলছি।

কেরামত কথা বলেন না।

এ যুদ্ধে তার পরাজয়, এটা যেন অবধারিত জেনেই তিনি আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিয়েছেন।

প্রথমবারের মতো করুণ হয়ে বাজে তার কণ্ঠস্বর, মেয়ে হয়ে বাবার কলঙ্কের কথা বলতে লজ্জা করবে না তোর?

না।

আত্মপ্রত্যয় ও বিশ্বাসের দ্বন্দ্বহীন ঘোষণা কেরামত সাহেবকেও বিস্মিত করে।

আশ্চর্য, পরমুহূর্তেই পুতুল দৌড়ে গিয়ে কেরামত সাহেবকে জড়িয়ে ধরে। তার আধাপাকা চুলের ঢেউয়ে হাত বুলিয়ে বলে, এ লুকনো যায় না বাবা। যায় না। তুমি অনেক শাস্তি দিয়েছ, পেয়েছ। কিন্তু তবু কি শান্তি পেলে, পাওনি। ডাক্তার একটি মিথ্যার অঙ্গীকার দিয়ে তোমাকে বাঁচাতে পারবে না। আমি পারব না। কেউ পারবে না। তোমাকে বাঁচার জন্যেই মরতে হবে বাবা। এর আর কোনো পথ নেই।

এতটা দুর্বলচিত্ত আর কখনও হননি কেরামত। নিজের মেয়ের মাথায় হাত রেখে অসহায়ের মতো বলে ওঠেন, কোনো পথ নেই পুতুল?

থাকলে আমি তোমার কাছে সে কথা লুকোতাম বাবা। কান্না-চোখ তুলে একবার তাকায় কেরামত সাহেবের দিকে। তারপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। চোখের পানিতে ভরে যায় কোরামত সাহেবের কোল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *