স্রোত

একটু একটু করে কুয়াশার ঘোর কাটছে। কিছুই দেখা যাচ্ছিল না এতক্ষণ। কাচের জানালার ওপর শিশির ঝরেছে সারারাত টুকরো টুকরো অভিমানের মতো। জানালা খুলে দিয়েও স্বস্তি নেই। কন্কনে হাওয়ার দৌরাত্ম। বোধহয় বাইরে টিপ্ টিপ্ বৃষ্টি। টেবিলের টাইমপিসখানা তখন থেকে বাজে বকছে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে সেটা যেন রীতিমতো ক্লান্ত।

 সেই সকাল থেকে সোয়েটার চাপিয়ে গলায় মাফলার জড়িয়ে বসে বারী। এত ভোর করে না উঠলেই পারত। এই বিশ্রী আবহাওয়ার অজুহাতে আর কিছুক্ষণ বিছানায় পড়ে থাকলেই হতো। হয়তো আর সবাই তাই করছে। অফিসের তাড়া নেই। রোববারের ঔদাসীন্যে অনেকেই ঘুমুচ্ছে। ঘুম ভাঙলেও আরামের চায়ে তাদের আড়ষ্টতা কাটেনি তখনো।

অথচ এভাবে বসে থাকা চলে না। ব্যাপারটা বলতে না পারলে স্বস্তি নেই। কিন্তু কার কাছেই বা যাওয়া যায় এই সাত সকালে। পাশের বাড়িতে গাড়ি এসে থামে। স্তিমিত স্টার্টের শব্দ। গাড়িতে এক দঙ্গল মেয়ে। ভেজা দু’বেণী দু’পাশে ঝুলিয়ে ঝাপসা চোখ আরেকটি মেয়ে এসে ওঠে সে গাড়িতে। বোধহয় কোনো বনভোজনের আয়োজন।

তারই ভুল। তাহলে অন্তত ওই বাড়ির লোকদের ঘুম ভেঙেছে অনেক আগেই। গৃহকর্তা রিটায়ার্ড ইঞ্জিনিয়ার। বছর পাঁচেক ধরে আছেন। বিলেতি ছাঁচের জীবনযাত্রা এ যুগে একটু বেমানান হলেও এখনো মাথায় ফেল্টের হ্যাট না চাপিয়ে বাইরে বেরোন না। তাঁর দুর্ধর্ষ অ্যালসেশিয়ান অভ্যাগতদের পিলে চমকে দেয়।

বোধহয় এসব  মনে করে ওই বাড়িতে যাবার বড় একটা ইচ্ছে হয় না।

আগে পাড়াটা বেশ খোলামেলাই ছিল। রাত ন’টায় কারও সাড়াশব্দ পাওয়া যেত না, আজকাল বাড়ির ছড়াছড়ি। অনেক বাড়িতে রাত করে আলো জ্বলে। অভদ্ররকম জোরে রেডিও বাজে।

সেটেলমেন্ট অফিসের মারুফ সাহেব, পলিটেকনিকের আলাউদ্দীন শিকদার, নিউ ড্রাগ হাউসের ডাক্তার আলিমুজ্জমান সবাই এখন এ পাড়ায়। কারও কারও নিজের বাড়ি। কারও ভাড়া করা।

ইচ্ছে করলে যে-কোনো বাড়িতে গিয়ে ধরনা দেওয়া যায়। লোক-দেখানো মায়া বিগলিত হাসি তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে বলবে, আসুন আসুন। কি সৌভাগ্য।

মুখোমুখি একটা ফ্ল্যাট বাড়ি। সেখানকার জীবনযাত্রা একটু স্বতন্ত্র। সেখানে কোনো কোনো বাড়ির জানালা সকাল করেই খোলে। কোনো বাড়িতে আবার সারাদিনই খিল আঁটা। দু’তলার ফ্ল্যাটে চিবুকে হাত ঠেকিয়ে অকারণেই দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে। চোখাচোখি হতেই ভুরু পাকিয়ে সরে পড়ে। এক মুহূর্ত মনে হয় ভঙ্গিটি একান্ত সনাতন হলেও লোভনীয়। মেয়েটি তাকে নিশ্চয়ই অভদ্র মনে করে।

তার রোষান্বিত দৃষ্টির জ্বালাই বারীকে এবার ঘরছাড়া করে। গলার মাফলারখানা আরেকবার ভালো করে ছড়িয়ে সোজা হাঁটতে থাকে।

মোড়ের কাছেই মডার্ন লন্ড্রি। লন্ড্রির পেছনে পায়রার খুপরির মতো দুটো কামরা নিয়ে থাকে হাসান। যখন খুশি বিরক্ত করা চলে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে কথা বলা যায়।

একবার উঁকি দিয়ে দেখে নেয়। বোধহয় তখনও ঘুমুচ্ছে হাসান। প্রায়ই তো নাইট ডিউটি থাকে কাগজে। কোন ফাঁকে যায়, কোন ফাঁকে আসে, বোঝাই যায় না।

সজোরে দরজার কড়া নাড়ে বারী।

অনেকক্ষণ হাঁকাহাঁকির পর ফোলা ফোলা চোখ নিয়ে, ছেঁড়া স্যান্ডেল পায়ে দরজা খুলে দেয় হাসান।

বোধহয় সকাল সকাল বিরক্ত করা ঠিক হয়নি। কিন্তু এসেই পড়েছে যখন, সে কথা ভেবে লাভ কী। বারী হেসে বলে, ঘুমুচ্ছিলে বোধহয়।

না। এই একটু –

খোলো খোলো দরজাটা। বেজায় শীত।

হন্তদন্ত হয়েই ছুটে এসেছিল। হাসান কোনোমতে চাদর মুড়ি দিয়ে। ভেতরে গিয়ে এবার একখানা শার্ট চাপিয়ে আসে।

চেয়ার টেনে নিয়ে জাঁকিয়ে বসে বারী। গলার মাফলার ঢিলে করে নেয়। তারপর ঠান্ডা হাতদুটো ভালো করে ঘষে নিয়ে বলে, শোনোনি?

কী?

কাল রাতে অত বড় কা- হয়ে গেল জানো না?

হাসান মাথা নাড়ে।

তার আগেই বারী আবার বলে, আশ্চর্য তোমার বাড়ির সামনেই তো হলো। অথচ টের পেলে না।

এ ফাঁকে একটা সিগ্রেট ধরিয়ে নেয় হাসান। বলে, বোধহয় অফিসে ছিলাম।

তাই হবে।

যেন এত বড় রহস্যটা এক নিশ্বাসে উদ্ঘাটন করা যায় না। একটু রয়েসয়ে না বললে গুরুত্বই থাকে না।

খানিকক্ষণ উদগ্রীব হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে হাসান। তারপর উঠে গিয়ে স্টোভখানা ধরিয়ে দেয়।

কেটলিতে পানি গরম হতে দেখে বলে বারী, চা খাওনি?

না।

আমার কিন্তু পাঁচটার মধ্যেই ওসব ল্যাঠা শেষ। থাক যা বলছিলাম শোনো : আমি সেকেন্ড শো সিনেমা দেখে ফিরছি। হঠাৎ শুনি কিসের চিৎকার। প্রথম বুঝতে          পারিনি। তারপর দেখি, যা ভয় করেছিলাম তাই।

হাসান উৎকণ্ঠিত। বলে, অ্যাকসিডেন্ট?

অ্যাকসিডেন্ট বলে অ্যাকসিডেন্ট। ধাক্কা দিয়েই গাড়ি হাওয়া। নম্বরটাও নেয়া গেল না।

জখম হয়েছে কেউ?

হয়নি মানে। আমিই তো হাসপাতালে গিয়ে এলাম।

তোমার চেনা-শোনা কেউ?

না। এমনি হবে কেউ। একবার ভাবছিলাম তোমাকে ডাকি। যাকগে – কেটলির পানি ফুটে আসছিল। হাসান উঠে গিয়ে নিজের জন্য এক কাপ তৈরি করে। আরেক কাপ বাড়িয়ে দেয় বারীর দিকে।

চায়ের কাপখানা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করে বারী, ভালো কথা তোমার কোন গ্রুপ? 

কিসের কোন গ্রুপ?

না, মানে ব্লাড গ্রুপের কথা বলছি।

কী জানি।

ফ্যাসাদ তো সেখানেই। ‘ও’ গ্রুপ পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ কিছু রক্ত না দিতে পারলে এ রোগী বাঁচানো মুশকিল।

ওর কোনো আত্মীয়স্বজন নেই?

সেসব খোঁজখবর নেবার আর সময় কই। আমরা যা কর্তব্য করে যাচ্ছি – বুঝলে না।

চায়ের কাপে আদ্ধেক চুমুক দিয়েই উঠে পড়ে বারী। বলে, এখন তাহলে যাই। ভাবলাম তোমাকে একবার জানিয়ে রাখি।

যেতে যেতে কী মনে করে আবার ফিরে আসে। পকেট থেকে একখানা কাগজ বার করে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, দাও তো একটা সই ঠুকে। কিসের সই?

অত শত দেখে কী হবে। মামলা-মোকদ্দমা কিছু নয়। চব্বিশ ঘণ্টা গাড়িঘোড়া চলছে। কখন আবার কে অ্যাকসিডেন্টে পড়ে বলা তো যায় না। মোড়ে একটা ট্রাফিক পুলিশ দরকার। দেখি না চিঠি লিখে, কিছু হয় কিনা।

কাগজখানা সই করিয়ে পকেটে রেখে দেয় বারী।

ওর চোখজোড়া যেন অকারণেই আজ খুঁতখুঁতে।

হাসান আরেক কাপ চা ঢেলে নেয়।

চোখ বড় বড় করে বলে বারী, আবার চা খাচ্ছ?

কেন?

না, না, অত ঘন ঘন খেও না। তোমার মতো আমারও ওরকম বদভ্যেস ছিল।

শার্টের ফাঁকে বেরিয়ে থাকা ছেঁড়া গেঞ্জির দিকে দৃষ্টি চলে যায় এবার। জিজ্ঞেস করে, কোথায় কিনেছিলে গেঞ্জি?

কেন, বাজার থেকে।

নিশ্চয়ই বেশিদিন হয়নি?

না।

পরের বার আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেও। আমি যাবো। তোমরা দাম-দস্তর না           করেই যা পেলে বগল দাবা করে নিয়ে এলে। দেখো না আমার গেঞ্জিখানা দেড় বছর  হলো –

হাসান কিছু বলার আগেই খবরের কাগজ এসে পড়ে। ওখানা একরকম ছিনিয়ে নিয়েই বলে বারী, দাঁড়াও দাঁড়াও একটা জিনিস দেখেই তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি। 

তারপর এক জায়গায় দৃষ্টি স্থির করে বলে, হ্যাঁ এই এই তো – টাইপরাইটার আছে তোমার কাছে?

না তো।

তাহলে আবার তোমরা কী রকম জার্নালিস্ট। দি একটা অ্যাপ্লিকেশন ঠুকে, কী বলো?

উৎসাহ দেবার মতো কিছু খুঁজে পায় না হাসান। তবু নিস্পৃহ হয়ে বলতে হয়, বেশ তো দাও না।

যাই তাহলে মারুফ সাহেবের বাসায়। বোধহয় একটা টাইপরাইটার আছে। আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে বেরিয়ে পড়ে বারী।

কাল রাতে ওই দুর্ঘটনা দেখে মন খারাপ হয়েছিল। পরহিতকর বৃত্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। ভালো করে ঘুম হয়নি। কিন্তু রাতের অন্ধকারে, চিন্তার নিবিড়তায় যা মনে হয়েছিল মহৎ, আজ সকালে সাদামাটা আলোয় সেটা যেন কেমন অর্থহীন বাজে খেয়াল। মুমূর্ষু রোগীর রক্তহীনতার জন্য আক্ষেপ হয়েছে। অথচ এমন তো অহরহই ঘটেছে। রক্তের গ্রুপ মিলিয়ে, ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় অঢেল রক্ত ঢালা হয়েছে যাদের শিরায় শিরায়, তারাই কি আর মুক্তির ছাড়পত্র পেয়েছে সবসময়। সুতরাং এসব ভাবনা অর্থহীন। মায়া-মমতা সাময়িক। ওটা মুহূর্তের।

এলোমেলো চিন্তার জটিল ধাঁধায় এমনি তন্দ্রায় ছিল, পেছনে কে ডাকছে শুনতে পায়নি।

মোড়ের ওপর দাঁড়িয়ে মারুফ সাহেব। শীতের সঙ্গে পাল্লা দিতে অকাতর পরিশ্রম করেছেন।

গায়ের ওপর কোট, গলায় মাফলার, হাতে দস্তানা। নাক ও চোখের খানিকটা ছাড়া সবটুকু ঢাকা উলের মুখোশসদৃশ টুপিতে।

মারুফ সাহেবের বাড়ির দরজা জানালা যখনই খুলুক, নিজে তিনি সকাল করেই বেরিয়ে পড়েন। রিটায়ার করার পর স্বাস্থ্য টিকিয়ে রাখার আশায় ঘণ্টা দু’চক্কর লাগান।

তাতে তাঁর স্বাস্থ্যের ইতর বিশেষ হয় বলে মনে হয় না।

আবার শনিবার বিকেলে একবার করে ডাক্তারের ওখানে ধরনা দেন। লম্বা প্রেসক্রিপশনের ফিরিস্তি সঙ্গে নিয়ে ফেরেন।

মারুফ সাহেব নিজেই ছুটে এলেন পেছন পেছন। বলেন, কী ব্যাপার তুমিও সকালে বেড়াতে বেরোও নাকি।

না! আজ এই একটু কাজে –

মারুফ সাহেব আশ্বস্ত হন, তাই বলো। তা না হলে তোমাকে দেখব না কেন। আমি তো এ বয়েসেও মাইল তিনেক – মানে তোমার চার্চ রোড হয়ে ফুলার হোস্টেল, তারপর সেখান রানী দিঘী হয়ে পপুলার ফার্মেসি পর্যন্ত যাই।

বারী কিছু বলার খুঁজে পায় না। অর্থহীনভাবে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

মারুফ সাহেবই আবার কথা বলেন, তা আজকাল করছ কী?

এ প্রশ্নটা কেউ না কেউ শেষ পর্যন্ত করবেই। আর বারীর জবাবটাও সেই চিরাচরিত, কই আর সুবিধে হলো। চেষ্টা করে যাচ্ছি।

হ্যাঁ হ্যাঁ, চেষ্টা করে যাও। কোথাও না কোথাও লেগে যাবেই। তা আপাতত কোনো কাজ আছে?

এ ভয়টাই করছিল বারী। মারুফ সাহেবের সাদা পাকা ভুুরুর কুঞ্চনে মতলবের একটা ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। কাজের মানুষদেরও একটা ভরসা চাই। সময়-অসময় কথা বলার জন্যে। সাহস জোগাবার জন্যে। অথবা আর কিছু না হোক, অন্তত নীরব শ্রোতার ভূমিকা পালনের গরজে তো বটেই। মারুফ সাহেব হাঁটা শুরু করেন। যেন তার ইচ্ছের ইঙ্গিতটাই যথেষ্ট। বারী তাঁর অনুগমন করে।

যেতে যেতে বলেন মারুফ সাহেব, তোমাকে যখন পাওয়া গেল চলো বাজারটা ঘুরে আসি।

প্রস্তাবটা আপত্তিজনক।

কিন্তু সে মুহূর্তে অব্যাহতি পাবার মতো একটা অজুহাতও মনে পড়ে না। একবার ভাবে, কাল রাতের দুর্ঘটনার উল্লেখ করে নিজের কল্পিত ব্যস্ততার  কথা পাড়বে। কিন্তু তার আগেই মারুফ সাহেব বলতে শুরু করেন, অবশ্যি তোমার তেমন কোনো কাজ থাকলে দরকার নেই। আমি একাই যাবো। আসলে তোমার সঙ্গে দুটো পরামর্শ ছিল।

নিঃসন্দেহে চতুর ব্যক্তি। ওর মনের খুঁতখুঁতে স্বভাবটা ধরে ফেলেছেন। বারী হেসে বলে, না না। তেমন কোনো কাজ নেই। চলুন। মুখোশ-মার্কা টুপিটা খুলে ফেলেন মারুফ সাহেব। ওভার কোটের পকেটে গুঁজে রেখে অন্য পকেট থেকে বার করেন একটা বাজারের থলে।

বহু প্রতীক্ষিত পরামর্শের অবতারণা তবু হয় না। লাঠি ঠুকে ঠুকে লোকজনের ভিড় এড়িয়ে বাজারের কাদামাখা রাস্তায় সন্তর্পণে এগুতে থাকেন মারুফ সাহেব। কতকটা পারদর্শী খেলোয়াড়ের মতো। মাছের দোকানের কাছে এসে বলেন, তোমার কি মনে হয়, কই না মাগুর, কোনটার ঝোল ভালো হবে আমার জন্যে?

তাহলে কি এ ধরনের পরামর্শের জন্যেই তাকে ডাকা। একটা চাপা অসন্তোষে জ্বলতে থাকে বারী।

তো হেসে নিরুত্তাপ সুরে বলতে হয়, দুটোই ভালো। যেটা আপনার খুশি।

তার আগেই কিছু দুরন্ত কই মাছ থলেতে পুরে নিয়ে দাম চুকিয়ে দেন মারুফ সাহেব। এবার বোধহয় শাক-সব্জির পালা।

এ সুযোগে সরে পড়া ভালো।

যথেষ্ট ভদ্র আর বিনীত হয়ে বলে বারী, এবার তো আপনি নিজেই বেছে বুছে কিনতে পারবেন। আমি চলি।

আড়চোখে তাকান মারুফ সাহেব, তোমার অত তাড়াহুড়োটা কিসের বুঝি না। আমার তো কেনা-কাটা শেষ। তোমার সঙ্গে একটা পরামর্শ ছিল বললাম। কোনো অজ্ঞাত প্রসঙ্গে পরামর্শের জন্য বেছে বেছে তাকেই কেন ঠিক করলেন মারুফ সাহেব বোঝা গেল না। এর আগে এরকম অসাধারণ মর্যাদায় তাকে বিভূষিত করার কথা মনে পড়ছে না। তাহলে কি তার চাকরিহীনতা, উদ্দেশ্যহীন জীবনযাত্রার মাঝেও ব্যক্তিত্বের সবটুকু স্ফুলিঙ্গ শেষ হয়ে যায়নি? অন্তত কারও কারও চোখে কি তা এখনও ধরা পড়ে।

বাড়ির গেটের কাছে এসে মারুফ সাহেবের গলার স্বরটা আরো কেমন অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠে। বলেন, তোমাকে আপনজন মনে করি বলেই দুটো কথা বলতে ইচ্ছে করে। বুঝলে না, তা না হলে আজকাল কার কি মাথাব্যথা।

ড্রইং রুমে ওকে বসিয়ে রেখে ভেতরে ঢোকেন বাজারের থলেটা সঙ্গে করে।

এর আগেও এসেছে দু’একবার এ বাড়িতে।

ড্রইং রুমটা ভালোই সাজানো। আসনগুলো আরামদায়ক। সুদীর্ঘ চাকরিজীবনে ছোটখাট রকমারি জিনিস সংগ্রহ করেছেন মারুফ সাহেব। শো-কেসে সাজানো সেগুলো থরে থরে। টি-পয়ে খালি চায়ের কাপ। দুমড়ানো খবরের কাগজ। বোধহয় কিছুক্ষণ আগে এসেছিল কেউ।

মিনিট পনেরো ভেতরে গিয়েছেন। নাকি সেখানে গিয়ে যেচে ঘরে ডেকে আনা লোকটির কথা আদৌ ভুলে বসেছেন। হবেও বা। কারও সাড়াশব্দ নেই। অন্তত যাবার আগে কাউকে বলে যাওয়া দরকার।

হাতের কাছে কিছু না পেয়ে কাগজখানা নিয়েই নাড়াচাড়া করে বারী। নতুন কোনো খবর চোখে পড়ে না। থাকলেও সেসব খবরে তার আগ্রহ নেই। কর্মখালির বিজ্ঞাপন আগেই দেখে নিয়েছে হাসানের ওখানে।

মনে পড়ে যায় আবেদনপত্র টাইপ করার কথা। ন’টা বাজতে চলে। জজকোর্টে গেলে চার আনায় করিয়ে নিতে পারবে। বাঁধাধরা লোক থাকে সেখানে।

উসখুস করে চারদিক তাকাতে থাকে বারী।

ভেতর থেকে কার পায়ের শব্দ শোনা যায়। এদিকেই এগিয়ে আসছে। বিদায় নেবার প্রস্তুতি হিসেবে দাঁড়িয়েই পড়েছিল বারী, কিন্তু পর্দা ঠেলে যাকে বেরিয়ে আসতে দেখল সে আর কেউ। বোধহয় এর নামই মণি। মারুফ সাহেবের বড় মেয়ে। লম্বা, কালোমতো দোহারা চেহারা। কেমন শীর্ণকায়। চোখে কাজল দেওয়া নিশ্চয়ই, কারণ ওটাই আকর্ষণ করে সবচেয়ে বেশি।

ভালো করে দেখেনি কোনোদিন। অন্তত এত কাছাকাছি তো নয়ই। শুনেছে ওরা তিন বোন, দুই ভাই। দু’বোনেরই সৎপাত্র জুটেছে। আরেকটি ছোট। মণি এখনও অনূঢ়া।

শুনেছে অনেকবারই বিয়ের কথা উঠেছে। পাকাপাকি হয়নি কখনো। সে সম্পর্কেই কি কোনো পরামর্শের ইঙ্গিত দিয়েছেন মারুফ সাহেব। পেছন না ফিরেও অনুভব করে মেয়েটি অনর্থক শো-কেসের ধুলো ঝাড়ছে। ছড়ানো বইপত্র গুছিয়ে রাখছে। টাইম পিসে চাবি দিচ্ছে। একসময় শীর্ণকার হাতখানা ওর সামনেই এগিয়ে আসে চায়ের কাপখানা তুলে নেবার জন্যে। বারী খবরের কাগজখানা ধরে বসে। মণিই কথা বলে হঠাৎ, আপনাকে আরেক কাপ চা দেবো?

মেয়েটা নিশ্চয়ই আস্ত বোকা। তা নইলে সকাল সকাল সাধ করে তার জন্যে এক কাপ চা পাঠাতে কারও বয়ে যায়নি, একথা বোঝা উচিৎ ছিল।

তবু মণি বলে, চা তো পড়েই আছে। ভালো ছিল না বুঝি। তার পূর্ববর্তী কোনো অভ্যাগত আতিথ্যের সবটুকু শেষ করার সময় পায়নি, মণি হয়তো সে কথা জানে না।

বারী হেসে বলে, না ধন্যবাদ। ক’টা বাজল বলতে পারেন?

যে ঘড়িটায় খানিকক্ষণ আগে চাবি দিয়েছিল সেটা তখনো ঠিক চলছে কিনা দেখার জন্যে কানের কাছে লাগিয়ে নিয়ে বলে মণি, এ ঘড়িতে তো পৌনে দশটা। কী জানি দু’চার মিনিট এদিক-সেদিক হবে।

পরের কথা ক’টি তো তার কণ্ঠস্থ হয়েই ছিল। মারুফ সাহেবকে খবর দেওয়া হোক, সে বেরুবে।

তবু তা বলা হলো না। আশ্চর্য সে তখনো বসে।

তার ঘাড়ের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে মণি। চোখ না তুলেও বোঝা যায়। স্তিমিত, সুরভিত একটা আমেজ।

কাগজের কোনো এক পৃষ্ঠার দিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে মণি, দেখেছেন কী লিখেছে?

কী সম্পর্কে?

আমরা নাটক করেছিলাম টাউন হলে সেদিন, শোনেননি?

আপনিও ছিলেন নাকি?

কেমন সহজ হয়ে বলে মণি, আসলে আমার তেমন ইচ্ছে ছিল না। সবাই এমন ধরাধরি করল।

সত্যিই তো নাটকের একটা সংক্ষিপ্ত খবরও ছবি ছাপা হয়েছে এক জায়গায়।

সেটা তুলে ধরে বলে বারী, আপনিও আছেন নাকি এ ছবিতে?

হ্যাঁ, বার করুন তো।

নাটকের কোনো দৃশ্যের ছবি। ভালো করে চেনাই যায় না। তারই কোনো একটি চেহারার সঙ্গে যেন মণির আবছা আবছা মিল। বারী সেটাই দেখিয়ে বলে, আপনি না?

হ্যাঁ, কেমন করে চিনলেন। আমার নিজেরই চিনতে কষ্ট হচ্ছিল।

যেন সাহসটা সেই জুগিয়েছে। তা না হলে এত কথা বলার সুযোগ হতো না।

বারী জিজ্ঞেস করে, কোন ভূমিকায় নেমেছিলেন?

মণি হাসে। বলে, এক হিংসুটে সতীন সেজেছিলাম! দেখুন তো, এত ভালো পাঠ থাকতে আমাকে ওটাই দিলো। পরের বার বলে দিয়েছি নায়িকার পাঠ ছাড়া আর করব না।

বোধহয় আরো কিছুক্ষণ এমনি আলাপের স্রোত চলত। অন্তত মণিকে দেখে সে কথাই মনে হয়েছে। কেমন সহজ আলাপের সুর, যেন তার কতদিনের চেনা।

মারুফ সাহেব এসে পড়েন ততক্ষণে। আলাপে ছেদ পড়ে। মণির দিকে তাকিয়ে কেমন অবাক হন, তুই এখানে নাকি?

ব্যাপারটা ভীষণ আপত্তিজনক, ভাবখানা এমনি। চায়ের কাপ তুলে নিয়ে চলে যায় মণি। এতক্ষণে যেন বারীর দিকে দৃষ্টি দেবার ফুরসৎ হলো তাঁর। হেলে দুলে বসে নিয়ে বলেন, অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি তোমাকে না। আমার কি কম ঝামেলা। এক কাজে সতেরো কাজ।

সেই বহু প্রত্যাশিত পরামর্শের জন্য তার শরণাপন্ন হবার লক্ষণ নেই তখনো।

যেন প্রসঙ্গান্তরের জন্যেই উঠে গিয়ে একটা জানালার পার্ট খুলে দিয়ে বলেন মারুফ সাহেব, একটু বাতাস আসুক। একদম দম বন্ধ হয়ে আসছে, কী বলো?

মারুফ সাহেবের পাইপ টানার অভ্যেস। এবং সেটা যেন রোজকার ব্যাপার। পাইপখানা ঠকে, সাফ করে নিয়ে একবার ফুঁ দিয়ে দেখে নেন। তারপর খানিকটা তামাক পুরে ঠেসে দিয়ে পুরোদস্তুর টায় টায় সমান করে নেন। যতক্ষণ মাপজোঁক মনমতো না হয় যেন তৃপ্তি নেই। তারপর একসময় দেশলাই জ্বালিয়ে এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলেন, বুঝলে হে আগের মতো আর নেই। আজকাল যেখানে হাত দাও আগুন। এটা বলার জন্য বলা। এমন কথার ওপর কোনো মন্তব্য করা চলে না। অথচ না করলেও বক্তা হতাশ হয়। কাজেই বারীকে সায় দিয়ে বলতে হয়, তা তো বটেই।

দেশলাইয়ের কাঠিতে পাইপখানা আরেকটু খুঁচিয়ে নিয়ে আবার বলেন, তোমরা আর কি বুঝলে হে, বিয়ে-থা করোনি আছ ভালোই।

আলোচনার গতি এভাবে চলতে থাকলে বোধহয় সারা দুপুরটাই গড়িয়ে যেতে পারে।

বারী উঠে পড়ে বলে, আজ তাহলে যাই।

যেন তাকে জোর করে আরেকটু আঁকড়ে রাখতে পারলেই তাঁর স্বস্তি। মারুফ সাহেব বাধা দিয়ে বলেন, বসো না বসো। অন্তত এককাপ চা খেয়ে যাও।

না থাক।

না থাক কেন। কই কে আছিস – এককাপ চা পাঠা তো।

কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে মারুফ সাহেবের এই দিলদরিয়া হুকুম তলবের কোনো তৎপরতা দেখা যায় না। বাইরে গাড়ির হর্নের শব্দ।

লাফিয়ে ওঠেন মারুফ সাহেব। জানালায় গলা বাড়িয়ে বলেন, আমার তো এখন উঠতে হচ্ছে।

অনেকক্ষণ থেকেই এই আগন্তুক গাড়িটির জন্যে অপেক্ষা করছিলেন বোধহয়।

এবার নিজেই দরজা খুলে বেরিয়ে যান মারুফ সাহেব। পেছন পেছন আসে বারী। বলে, আমিও যাই তাহলে।

এবার ওর আপত্তি তেমন জোরালো নয়। বরং কোথায় সম্মতিরই একটা ক্ষীণ ইঙ্গিত, আমতা আমতা করে বলেন, বেশ তাহলে আর তোমাকে ধরে রাখব না।

ভেতর থেকে গাড়ির দরজা খুলে যায়। মারুফ সাহেব গাড়িতে উঠতে উঠতে বলেন, এসো তাহলে আরেকদিন।

কেমন অসহিষ্ণু হয়েই জিজ্ঞেস করে বারী, কী যেন পরামর্শ ছিল বলছিলেন।

ও, হ্যাঁ, না তেমন কিছু নয়। হবে আরেকদিন। তুমি তো কাছেই থাকো। যখন খুশি চলে আসতে পার। আমার একটু তাড়া। একটা জমি কিনেছি, দেখতে যাবো।

গাড়ি ছেড়ে দেবার আগে যেন, নিছক কর্তব্যবোধেই গলা বাড়িয়ে আরেকবার বলেন, মারুফ সাহেব, চা খেয়ে যেও কিন্তু।

বাইরে এসে কেমন যেন ভালোই লাগে। বেলা হয়েছে অনেক। তবু শীতের শিরশিরে একটু হাওয়া।

এক মুহূর্ত নিশ্চল মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে বারী। তার অজান্তেই চোখজোড়া যেন খোলা জানালার দিকে চলে যায়। ভালো করে দেখা যায় না। তবু মনে হয় একটি ছায়ামূর্তি এককাপ চা হাতে দাঁড়িয়ে।

সে কি তারই প্রতীক্ষায়।

কিন্তু সেসব ভাবনার সময় নেই। জজকোর্টে ছুটতে হবে তাকে।

রীতিমতো একটা গোলক ধাঁধায় পড়েছে বারী। মারুফ সাহেবের খেয়ালিপনার জন্য যেটুকু ক্ষোভ তারচেয়ে অনেক বেশি কৌতূহল মণির স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহারে।

মেয়েটি নিশ্চয়ই তাকে দেখেছে আগে কোথাও। নিশ্চয়ই তার জীবনের আদ্যোপান্ত বাউ-ুলেপনার ইতিহাস তার নখাগ্রে। এবং সেজন্যেই বোধহয় একটু সহানুভূতিশীল।

নানা মঞ্চে অভিনয়ের দক্ষতা থাকলে এমনি হয়। মেকি দরদটাও আসল দরদের মতো মনে হয়, অন্তরের টান না থাকলেও।

হয়তো সত্যি সত্যি এককাপ চা এনে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেছে মণি। অবিশ্য সে চলে গেল বলে এমন কিছু দুঃখ হবার কথা নয় মণির। এই শীতে এক কাপ বাড়তি চা কার না ভালো লাগে।

জজকোর্টে টাইপিস্টদের তখন দম নেবার ফুরসৎ নেই। আদালতের নথিপত্র, জমির লগ্নি, গয়নাবন্ধক আর স্ট্যাম্পে চুক্তির ফিরিস্তি টাইপ করতে এসময় তারা         ব্যস্ত। সবারই তাড়াহুড়ো।

ছোকরা টাইপিস্টদের কদর বেশি। তাদের ভ্রƒক্ষেপেরও সময় নেই। পাশে এক বুড়ো তার নড়বড়ে টাইপে ফিতে পরাচ্ছিল। বারীকে দেখে জিজ্ঞেস করে, আপনার কী?

অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল বারী। যেন হঠাৎ শুনতে পায়নি। থতমত খেয়ে বলে, না তেমন কিছু না। একটা অ্যাপ্লিকেশন।

অ্যাপ্লিকেশন।

কেমন ঠোঁট উল্টে চোখ পাকিয়ে অবিশ্বাসের হাসি হাসে বুড়ো।

জ্বরাজীর্ণ একখানা কার্বন চড়িয়ে নিয়ে বলে, বসুন, বসুন। বলছেন যখন দিচ্ছি টাইপ করে।

রোদটা বেশ চিড় চিড় করে ওঠে।

বুড়োর তালি-জর্জরিত ছাতাখানা পোতা বাঁশের সঙ্গে বাঁধা। এত বড় সূর্য। আর তাকে ঠেকানোর জন্যে সামান্য বিনীত আয়োজন। সে ছায়ায় ভিড় করে স্নিগ্ধ হবার বাসনা মিছেই।

উদ্যমীদের দু’চারজন অবশ্যি আগেই সেই ছায়ার লোভে চারপাশে জড় হয়ে বসে। তারা এটুকুতেই তৃপ্ত।

প্রতীক্ষার মুহূর্তগুলো একসময় অসহ্য মনে হয়। মনে হয় এসব নিছকই অর্থহীন, এমনিতে বেশ আছে। চাকরির আবেদন, তারপর কপাল জোরে বড়জোর একটা ইন্টারভিউ। বুক দূর দূর করা ভয় নিয়ে ধোপদুরস্ত হয়ে হোমরা-চোমরাদের বিদ্যার অহঙ্কারে ভস্মীভূত হওয়া, এসবের চাইতে এমনি যেমন চলছে চলুক। ভরসার খুঁটি শক্ত নাই-বা হলো। জীবনের নড়বড়ে ঠাঁই-ই ভালো। দু’চারটে ট্যুইশনি, আছে। কিছুদিন পর হয়তো তাও থাকবে না।

কিছুদিন চড়াই, কিছুদিন উৎড়াই। আর নতুন করে দ্বিধাসঙ্কুল জীবনকে একটা শক্ত ভরসার নোঙ্গরে বাঁধলেই কি মুক্তবিহঙ্গের মতো সুখের পরতে পরতে কাটবে তার দিন।

চিন্তার ঘোর কেটে যেতেই দেখতে পায় বারী অ্যাপ্লিকেশনের জন্যে কাগজ চড়ানো হয়েছে টাইপরাইটারে। চিরাচরিত ধরাবাঁধা ছাঁদের কথাগুলো তার বলার আগেই লেখা হয়ে গেছে। এরা ঝানু লোক। ঠিক বুঝে নেয়।

তেল কোম্পানির জন্য যে স্মার্ট সেলস অ্যাসিসটেন্টের দরকার, কাগজে-কলমে না হয় তার যোগ্যতার ভূরি ভূরি প্রমাণ দেওয়া যায় ইনিয়ে-বিনিয়ে। কিন্তু তার চাকরি-হীনতার অবসাদ, চোখেমুখে যে ক্লান্তির ছায়া, ইন্টারভিউর মাহেন্দ্রক্ষণে তা লুকোবে কেমন করে।

জব্দ করার মতো দশটি প্রশ্নের সবক’টিও যদি সে নির্ভুল বলে, তাতেই কি ভরসা।

চাকরিতে লোক বাছাইয়ের মনস্তত্ত্বই এমনি। প্রার্থীর অপারগতা যেমন নিন্দনীয়, তার সাফল্যের তেজও তেমনি অসহ্য। বোধহয় সাফল্য-অসাফল্যের মাঝখানে একটা সূক্ষ্ম অদৃশ্য সীমারেখায় থেকে যেতে পারে যে, সেই কৃতী প্রার্থী। কৃতী প্রার্থীই সবসময় যোগ্য প্রার্থী নয়।

কাজেই ভালোই আছে এমনিতে। চাকরি নেই এটা একরকম ক্ষোভ। সেটা দৈনন্দিন যে-কোনো অঘটনের একটা স্বীকৃত, গ্রাহ্য ক্ষোভ। কিন্তু নতুন করে একটা আবেদনপত্র ঠুকে দিয়ে, পাওয়া-না-পাওয়ার ভরসার এই অবাঞ্ছিত দ্বন্দ্বে যাওয়া কেন।

বারীকে ইতস্তত করতে দেখে বুড়ো অস্থির হয়ে ওঠে। নড়বড়ে টাইপরাইটার            স্তব্ধ করে বলে, আর কী লিখব, বলুন না?

অবাক কা- করে বসে বারী। নিজেই কাগজখানা টেনে নিয়ে বলে, থাক দরকার নেই কিছু লেখার।

এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে চোখ নাবিয়ে নেয় বুড়ো। এরকম হুজুগে সে তার জীবনে মেলাই দেখেছে।

কিন্তু সেজন্যে তো আরো দুটো ফুল স্কেপ কাগজ গচ্ছা দেওয়া যায় না। বারীকে উঠতে দেখে বলে, বেশ সে আপনার ইচ্ছে। কিন্তু কাগজের দামটা –

একটা সিকি বার করে তার দিকে বাড়িয়ে দেয় বারী। খুচরোর নেবার অপেক্ষায় থাকে।

কেমন ধূর্ত দৃষ্টি বুড়োর। বলে, বিলিতি বন্ড পেপার, দিয়েছিলাম। চার আনা হলেও ঠকা হয়।

যেতে যেতে সে-কাগজখানা কুটিকুটি করে ছিঁড়ে হাওয়ায় উড়িয়ে দিতে থাকে বারী। বাতাসে সেগুলো ঝরা পালকের মতো ইতস্তত ছড়িয়ে যায়। যেন জীবনের কোনো নিশ্চিত সুযোগের এক বলাকা মাত্র, একটি খেয়ালের গুলিতে ছিন্নভিন্ন।

দুপুরের রোদটা বাড়ছে। যাবার কোনো জায়গা নেই। আমুদে বন্ধুরা মর্নিং        শো-য় ভিড় করছে। ঘোর সংসারীরা শহরতলিতে শস্তা বাজার কেনার ফিকিরে বেরিয়ে পড়েছে। উদ্যমশীল পিতারা নাচের স্কুলে মেয়েদের আগমন প্রতীক্ষায় গাড়িতে বসে হাই তুলছে। মোটামুটি কাজ সবারই একটা না একটা।

বাড়ি ফেরা যায়। সেখানে নাক-কান গুঁজে পড়ে পড়ে কাটিয়ে দেওয়া যায় দুপুরটা। সম্পর্ক যতই লঘু হোক, আত্মীয়তার একটা ক্ষীণ সূত্র ছিল বলেই একেবারে             রাস্তায় এসে দাঁড়াতে হয়নি। উপেক্ষার দু’মুঠো ভাতে অপমানের ঝাল থাকে। কিন্তু তাতে ক্ষিদে মেটে ঠিকই।

হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট সারওয়ার চৌধুরী। দূরসম্পর্কের মামা। একজন বেকার গো-বেচারা আত্মীয়কে ঠাঁই দিয়ে হা-হুতাশ করছেন না। বাড়িতে পুরনো বাসন-কোসন ভাঙা চেয়ার-টেবিলের ভিড়ে একটি বাড়তি মানুষের উপস্থিতি অবজ্ঞা করার মতো সামর্থ্য ও মনোবল দুই-ই তাঁর বর্তমান। এতবড় ঘরের কে কোথায় পড়ে তা নিয়ে বড় একটা মাথাব্যথা নেই।

অবশ্যি কিছুদিন হলো সমস্যা দেখা দিয়েছে। শীতের ছুটিতে বাড়িটা গমগম করে। তিল ধারণের জায়গা থাকে না। মেজ ছেলে পিন্টু বাইরে থেকে পড়াশুনা করে। ছুটিটা এখানেই কাটাবে। ছোট মেয়ে রুবী অ্যাদ্দিন শ্বশুরবাড়ি ছিল। কাল সেও এসেছে সদলবলে। মামী বেজায় উদ্বিগ্ন ছিলেন। বারীই ভেবেচিন্তে একটা ব্যবস্থার কথা বলে আশ্বস্ত করেছে তাঁকে।

নাইট ডিউটি করতে যায় হাসান। ঘর খালিই থাকে। সেখানে কোনোমতে কাটিয়ে দেওয়া যায় কিছুদিন। তেমন অসুবিধে নেই। শুধু অফিস থেকে ফেরার আগে ওটা খালি করে দিতে হবে এই যা।

কথাটা পাড়েনি এখনো। তবে এ ধরনের অনুরোধ আকস্মিক হওয়াই ভালো। সেক্ষেত্রে নিরাশ হবার আশঙ্কা কম। হঠাৎ করে কড়া নেড়ে নিছক মামুলি ঢঙে না হয় গিয়ে বলবে, ক’টা দিন ভাই তোমার ওখানে আমাকে রাত কাটাতে হচ্ছে।

প্রস্তাবটা এমনই আকস্মিক ও অভাবনীয় মনে হবে যে, ইচ্ছে থাকলেও হঠাৎ করে না করে বসতে পারবে না হাসান।

রাত সাড়ে ন’টায় গেলে ঠিক ধরা যাবে তাকে। দশটার আগে নাইট ডিউটিতে বেরোয় না।

বিকেলে অবশ্যি একটা ট্যুইশনি আছে। সেখানে একটু সকাল করে গেলে এবং একটু দেরি করে থেকে গেলে কারও আপত্তির কিছু নেই, বরং অভিভাবকের প্রসন্ন হবারই কথা।

দুপুরে বাড়িতে ফিরে কেমন একটু অবাক হয়। যেন দিনের কাজ গুছিয়ে সারা বাড়িটাই দুপুরের তন্দ্রালস-বিশ্রামের স্নিগ্ধতা ছড়ায়। খাবার পাট শেষ হয়েছে বোধহয় অনেকক্ষণ আগেই।

পা টিপে টিপে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। কিন্তু দরজাটা অসম্ভব শব্দ করে ওঠে। বোধহয় সে-শব্দ শুনেই কাঁচাঘুম ভেঙে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন মামী কেমন ঝাঁঝালো সুরে বলেন, এতো বেলা করে ফেরা হলো যে।

এটা প্রচলিত অভিযোগ এবং এর জবাবে বলার মতো কোনো সদ্যুক্তি নেই। কাজেই কাচুমাচু মুখ করে থাকতে হয়।

একসময় অতিষ্ঠ গলায় হাঁক ছাড়েন। কিন্তু রান্নাঘরে কারও সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না।

ব্যাপারটা নিজের কাছেই কেমন অস্বস্তিকর।

বারী মুখ নিচু করে বলে, থাক খাব না।

খাবে না কেন, খেতে তো না করিনি। হঠাৎ এত বছর পর এসব কথা শুনলে রাগ হয়। কেউ তোমাকে কিছু বলেছে না খোটা দিয়েছে।

ব্যাপারটা মুহূর্তে তার অজান্তে যেন সঙ্কটের রূঢ় মূর্তি ধারণ করে। রাগে গর্জাতে থাকেন মামী।

তার মনরক্ষার জন্যই চমৎকার মিথ্যের অজুহাত টেনে শান্ত কণ্ঠে বলতে হয়, আজ বাইরেই খেয়ে নিলাম।

অত সহজে নিস্তার পাওয়া গেল না।

বাইরে খাবে, তা আগে বললেই পারতে। খামাখা রান্না নষ্ট হতো না।

কল্পিত মিথ্যে অজুহাতগুলো বেশ চমৎকার গুছিয়ে এনেছে বারী। বলে, হঠাৎ একজনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।

কিন্তু অত কথা শোনার অবসর নেই মামীর।

যতসব, বলে বিড়বিড় করে দর্পিত চরণে ভেতরে চলে যান।

বারান্দার পাশে ছোটমতো জায়গাটা তার জন্য বরাদ্দ। ভাঙা, চেয়ার-টেবিল আর প্যাকিং বাক্সের পেছনে একখানা খাট পাতা থাকে সেখানে। তাতেই গড়িয়ে নেয় দুপুর বেলাটা। রাতে বিছানা গুটিয়ে ড্রইং রুমে শোয়।

কিছু ক্লান্তি আর কিছু উদ্দেশ্যহীন অভিযানের ক্ষোভেই যেন গা এলিয়ে পড়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। অন্তত একবার ঘুমের কোলে ঢলে পড়লে, কিছু সময়ের জন্য শান্তি।

খাটের কাছে এগুতেই থমকে যেতে হয়। সেখানে চামড়ার আর রেক্সিনের সুকেশ আর নিপুণভাবে বাঁধা একটি বেডিং। বোধহয় বাড়িতে আবার কোনো অতিথি সমাগম। জিনিসগুলো মাটিতে নাবিয়ে চলে না নিশ্চয়ই। তাহলে আগেই সে ব্যবস্থা হতো।

সিঁড়ির কাছের থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বারী। পা দুটো টন্টন্ করে ওঠে। দাঁড়ানোর শক্তি নেই। সত্যি সে ক্লান্ত। তখন বিকালে সোনালি রোদের ক’ফালি এসে পড়েছে তার চোখেমুখে।

দিনটা তবু কেটেছে হুজুগে। সন্ধে হতেই মনটা আবার কেমন কাতর হয়ে ওঠে। আকাশের রক্তাভ ছায়া  অকারণ যাতনা দেয়। নিজের ব্যর্থতার সঙ্গে আর দশজনের ব্যথা-বেদনার গ্লানি একাত্ম হয়ে ওঠে। তক্ষুনি নিজের কাছে নিজেকে মনে হয় অসহ্য।

অন্যদিন ট্যুইশনি থাকে। আজ তাও নেই। মিছেই প-শ্রম। পড়–য়া ছেলেটির শখ হয়েছে সিনেমা দেখার। কোনো দিলদরাজ মামার সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছে অনেক আগেই। ফিরবে রাত করে।

কাল রাতের দুর্ঘটনার টুকরো টুকরো স্মৃতি পীড়িত করে। অচেনা-অজানা লোকটির যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখের অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে আরেকবার। ওর জন্যেই কাল মন কেমন করছিল। ধরাধরি করে সবাই মিলে দিয়ে এসেছিল হাসপাতালে। এমনকি অজ্ঞাত বেপরোয়া মোটর চালককে ভালো করে শাসিয়ে দেবার ইচ্ছেটাও তার সেজন্যেই হয়েছিল।

নিজেই উদ্যোগী হয়ে দশজনের সই নিয়ে যে কাগজটা নিয়ে ঘুরছিল সেটা সেই থেকে তার পকেটেই। যথাস্থানে ওখানা পাঠাবার কথা আর মনে হয়নি। বোধহয় তেমন উৎসাহও বোধ করেনি।

তবু যেন উপলব্ধি করে একটি কাতর অসহায় মূর্তির হাতছানি। যে হাসপাতালের কোনো উপেক্ষার বেডে শুয়ে কামনা করে সামান্য প্রবোধ বাক্য। সামান্য সহানুভূতি।

সোজা হাসপাতাল বরাবর হাঁটতে থাকে বারী।

সন্ধের করুণ ক্ষণটির সঙ্গে যেন হাসপাতালের মেজাজটির সাক্ষাৎ আত্মীয়তা। লম্বা করিডোরের দু’পাশে অজস্র বেড। কেউ রোগমুক্তির আশায় উজ্জ্বল। কেউ মৃত্যুর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ক্লান্ত। এ সময়টি আত্মীয়স্বজন, শুভানুধ্যায়ীদের জন্যে। তারা যেন রোগীর মনরক্ষার জন্যেই কেমন বিষণœমুখো। কেমন ফিস্ফিসে তাদের গলার আওয়াজ। বোধহয় লোক দেখানো। আবার কারও কারও সান্ত¡নার ভাষা যেন নিছকই অভ্যেসের তাড়না। একই কথা শোনায় তারা রোজ। পা-ুর মলিন চেহারার দিক তাকিয়ে শীর্ণকায় একটি হাত নিজের হাতের মুঠোয় তুলে বৃথাই কল্পিত আগামীর সুখস্বপ্নের আমেজ আঁকে।

খবর নিয়ে জানা যায়, কালকের দুর্ঘটনা-আক্রান্ত রোগী ওপর তলার ওয়ার্ডে। এমারজেন্সি থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে সেখানে, রোগীর অবস্থা ভালো নয় বলে। ওই ওয়ার্ডে লোকজনের ভিড় নেই বোধহয়, ডাক্তারের বারণ বলেই।

বারী ইতস্তত করছিল। সাদা আলখেল্লা গায়ে একজন ডাক্তার এগিয়ে এসে বলে, আপনার কেউ আছেন?

বারী জানায়, কাল রাতের দুর্ঘটনার অজ্ঞাতপরিচয় লোকটির সে দর্শনপ্রার্থী। ডাক্তার আশ্বস্ত হয়ে বলেন, ভালোই হলো আমরা ওর আত্মীয়স্বজনদের হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি কাল থেকে। দেখুন মিছে আশা দিয়ে লাভ নেই। অবস্থা ভালো নয়। পারেন তো কিছু রক্তের ব্যবস্থা করুন।

অবশ্যি কালই ডাক্তাররা আভাস দিয়েছিলেন রক্তের দরকার হতে পারে। কথাটা ভুলে গিয়েছিল। এ ধরনের দায়িত্বের কথা তার, শুধু তার কেন, কাল যাদের সহানুভূতির সুর ছিল উচ্চকিত, তাদের একজনেরও মনে হয়নি। চব্বিশ ঘণ্টায় একবারও খোঁজ নিতে আসেনি কেউ।

এ অবস্থায় কী করতে পারে সে। পারে বৈকি? হঠাৎ তেজের ভঙ্গিতে চোখ পাকিয়ে বলতে পারে, কেউ আসেনি, তা আমি কী করব। দায়িত্ব আমার একার হতে যাবে কেন। আর দশজনকে খবর দিন।

ওয়ার্ডে একটা মিট্মিটে আলো জ্বলছে। অথচ সে-আলোতেও স্পষ্ট বোঝা যায় এক জোড়া চোখ তার দিকে পলকহীন দৃষ্টি ফেলে। ডাক্তারের সে-দৃষ্টিতে এক তীক্ষè জিজ্ঞাসা।

বারী চোখ ফিরিয়ে নেয়। বলে, কিন্তু আপনারা যে গ্রুপের কথা বলেছিলেন পাওয়া যাবে সে রক্ত?

সরাসরি প্রস্তাব করেন ডাক্তার, আপনার নিজের গ্রুপ মিলিয়ে দেখুন না। সেটা যদি না মেলে?

সেক্ষেত্রে অগত্যা এক বোতল রক্তের দাম দিলেই চলবে।

পরিস্থিতি কেমন ঘোরালো হয়ে আসছে। নিজের কাছেই ভালো লাগছে না। এত দায়, এত ঝামেলা যেচে যেচে সে নিজের ঘাড়ে নিতেই বা গেল কেন। কিন্তু এখন পিছু হটবার উপায় নেই। ধরা সে ইচ্ছে করেই দিয়েছে। আত্মগোপন করা যায় না আর এখন। এক বোতল রক্তের দাম দেবার মুরোদ যে নেই সে কথা আর জানিয়ে কী হবে। বিকল্প ব্যবস্থার প্রস্তাব আসবে সেক্ষেত্রে। তার এই দেহ-সিঞ্চিত এক বোতল রক্তদানের আহ্বান।

তার আগেই মনস্থির করে ফেলা ভালো।

বারী বলে, চলুন তাহলে।

ব্যাপারটা বিভীষিকাময় কিছু মনে হয়নি। চূড়ান্ত আত্মত্যাগ গোছীয় কিছু নয়। আর সত্যি কথা বলতে, তার রক্ত রোগীর কাজেও আসছে না। এটা জমা থাকছে কোনো ভবিষ্যৎ আগন্তুকের জন্যে।

ওয়ার্ডে ফিরে আসতেই বলে ডাক্তার, কাল ভোরে রোগীর মাথায় অপারেশন হবে। কিছু রক্ত জমেছে মনে হয়। সেগুলো বার না করলে আপনার রোগীকে বাঁচানো মুশকিল।

বেডে একটি কঙ্কালময় মূর্তি। অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে। কপালের যে জায়গায় চোট লেগেছিল সেটা ব্যান্ডেজ করা।

হাসপাতালের ঘণ্টা বাজে। রোগী দেখার সময় সমাপ্তি ঘোষণা।

ডাক্তার রোগীর চার্টখানা তুলে নিয়ে বলেন, আপনি তাহলে আসুন। ভালো কথা, টেলিফোন আছে আপনার।

না।

তাহলে বরং নিজেই কাল একবার খবর নিয়ে যাবেন।

পরের কথাটুকু বলার প্রয়োজন ছিল না। তবু শুনতে পেল বারী। ডাক্তার আকুলদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে বলছে, অযথা ভাববেন না। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করব।

হাসপাতালের সিস্টাররা তখন ইঞ্জেকশান আর সিরিঞ্জ নিয়ে বেরিয়েছে ডিউটিতে।

হাসানের ওখানে রাত কাটানো নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। অবশ্যি যেচে আশ্রয় চাওয়ার ব্যাপারটা কেমন যেন ভালো লাগেনি। হাসান জিজ্ঞেস করেনি কিছু। অহেতুক ঔৎসুক্য দেখিয়ে বিব্রত করেনি। তবু। হয়তো তার নিঃসঙ্গ জীবনযাত্রায় বিড়ম্বিত এক সঙ্গী পেয়ে মনে মনে সে খুশি। রাত চারটায় ডিউটি করে ফিরেও নির্দয়ের মতো হেঁচড়ে তোলেনি বিছানা থেকে। গোড়ায় যদিও শর্ত সে রকমই ছিল।

দরজাটা আস্তে করে খুলে একসময় এসে ঢোকে হাসান। কেমন উসখুস করে। অকারণেই ঘরময় পায়চারী করে। তাকে দেখে বোঝা যায় দুটো কথা বলার, বলে আশ্বস্ত হওয়ার ভীষণ ইচ্ছে। একটা না একটা ছুতো খোঁজে। স্টোভখানা ধরিয়ে দেয়। চায়ের কেটলি চড়িয়ে দেয়। ঘুমের ভান করে আড়ালে সবই দেখে বারী। চোখ ভারি হয়ে আসে কখন। টুক্ করে শব্দ হয় যেন। তার হাতের কাছে রাখা এককাপ চা। নিজের কাপখানা তুলে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই চুমুক দিতে থাকে হাসান। তারপর একসময় ঝুঁকে নিয়ে বলে, ঘুম ভাঙল? কোনোদিন না শোনার ভান করে। কোনোদিন তড়াক করে বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে ওঠে বারী, ওঃ এসে গেছ। আমি চলি তাহলে।

ঘড়ে বাড়তি আসবাবপত্র বলতে শুধু একখানা টেবিল আর চেয়ার। চেয়ারখানা টেনে নিয়ে বলে হাসান, না হে না। ভোর ভোর যাবে কোথায়। বসো। চা খাও।

চায়ের কাপখানা কাছে এনেও মুখে ছোঁয়ায় না। সবক’টি আঙুলে জড়িয়ে ধরে যেন কিছুক্ষণ তার উত্তাপটাই অনুভব করে। যে-উত্তাপের ছোঁয়ায় একটা শিহরিত আনন্দের বন্যা।

কিছু নয়। হাতের কাছে পাওয়া এক কাপ চা। তবু জীবনে যেন এটাই এক দুর্জয় সম্পদ। অন্তত বারীর সে কথাই মনে হয়। হাসান শেষ রাতের খবরের টুকরো সব কাহিনী শোনায়। বলতে বলতে কেমন নিজেই উত্তেজিত হয়ে ওঠে। ইন্দোনেশিয়ার কোনো প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আণবিক বোমা বিস্ফোরণের সর্বশেষ তথ্য, লং বিচে সৌন্দর্য, রানীদের ভিড় – এমনি কত।

বলতে শুরু করলে যেন সময় নিয়ে চিন্তা নেই। রাতের ঘাটতি ঘুমের জন্যে অনুশোচনাও নেই।

সে-ফাঁকেই কাপড় বদলে নিয়ে চিরুনি বুলিয়ে ঠিক করে, জুতোর ফিতে বেঁধে তৈরি হয়ে বসে থাকে বারী।

বোধহয় কর্তব্যবোধের তাড়নায় বারী আরেকবার তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, তোমার কি এখন ঘুমানো উচিৎ।

কেন, কেন। আমার তো ঘুম পাচ্ছে না। তাছাড়া দুপুর তো রয়েছেই। ঘুমুনো যাবে। অনেক সময় আবার নিজেই কেমন হতাশ হাসান। বলে, দানাং কোথায় জানো না?

না তো।

আচ্ছা সায়গলের নাম শুনেছ?

ঠিক যেন চাকরির ইন্টারভিউর মতো। বা তার চাইতেও দুঃসাধ্য কিছু। ইন্টারভিউতে বড়জোর চাকরি না পাওয়ার ভয়। এক্ষেত্রে ভয় বন্ধুর অপ্রিয়ভাজন হওয়ার। একসময় নিজেই চুপ হয়ে যায় হাসান। মুহূর্তে কেমন গম্ভীর দেখায় তাকে। বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে বলে, তোমাকে মিছিমিছি এত কথা বলছি। ঘণ্টা খানেক পর তো জানতেই পারবে।

কী করে?

বাঃ কাগজেই তো পড়বে।

ও, সে কথা।

তাকে আশ্বন্ত করার জন্যেই বলে বারী, কাগজে পড়া আর তোমার মুখে শোনা, দুয়ে অনেক তফাৎ।

বেশ বোঝা যায় কেমন ঘুম পায় হাসানের। গলার স্বর জড়িয়ে আসে। বাইরের আকাশ একটু একটু করে পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। জানালায় দাঁড়ালে অবশ্যি তখনো কেমন শিরশিরে হাওয়া।

বারীকে উঠতে দেখে হাসান বলে, আর খানিকক্ষণ বসো না। কোনো কাজ আছে হাতে?

আমার আবার কী কাজ।

কেমন করুণ ও অসহায় শোনায় বারীর জবাব।

বোধহয় এ ধরনের প্রশ্ন করা ঠিক হয়নি। সেই একটা পুরনো কথা আছে না, অন্ধকে অন্ধ বলো না, খঞ্জকে খঞ্জ বলো না। হাসানের সে কথা মনে রাখা উচিৎ ছিল। বারীর চাকরিহীনতার গ্লানিময় এই ঠুনকো জায়গায় আঘাত দেওয়া উচিৎ ছিল না। অথচ তাকে ইচ্ছে করে আঘাত দেওয়াই বা কেমন করে বলা যায়। চাকরিহীনতার অস্বস্তি একটা আছে হয়তো সত্যি। কিন্তু এও তো সত্যি, যাকে বিশেষ কিছু একটা আঁকড়ে ধরে রাখতে হয় না, তার কল্পনার বিচরণ ক্ষেত্র সর্বত্র। তার আকাক্সক্ষাকে ঘরকুনো করে রাখার দরকার নেই। সে তার খেয়ালখুশির ফাঁপা বেলুন যেখানে ইচ্ছে, যতদূরে ইচ্ছে ছেড়ে দিয়ে নিরুদ্বেগ।

হাসান বলে, এক হিসেবে ভালোই আছ।

কী রকম?

কোনো বন্ধন নেই, কোনো দায়িত্ব নেই। সময় নিয়ে অহেতুক মন কষাকষি নেই।

বারীর রাগ হয়। এটাও এক ধরনের প্রবোধ বাক্য। এক রকম অসহ্য সহানুভূতি।

বারী বলে, তাহলে তুমিও ছেড়ে দিলে পার চাকরি।

চাদরখানা জড়িয়ে জড়সড় হয়ে বসে হাসান। বলে, সে-চেষ্টা আমার না করলেও চলবে। ছাটাইয়ের করাত কখন নিঃশব্দে তার কাজ করে যাবে বোঝাও যাবে না।

কেমন আতঙ্কিত হয় বারী। বলে, সেরকম আশঙ্কাও আছে নাকি?

আশঙ্কা মানে, খবরের কাগজের চাকরিতে ওটাই চিরাচরিত রীতি। অন্তত এখনো।

তাহলে তুমি এ বাড়িও ছেড়ে দেবে বোধহয়।

কেমন ছেলেমানুষের মতোই প্রশ্ন। কিন্তু অবান্তর নয়, মনে হয় বারীর। তবু দুঃসময়ের একটা আশ্রয় আছে। যখন খুশি এসে দুটো কথা বলার জন্যে চার দেয়ালে ঘেরা আছে সামান্য একটু ঠাঁই। সত্যি সত্যি যদি হাসান না থাকে –

হাসান হেসে ওঠে বলে, না না। ওরকম দুর্ভাবনার কারণ নেই। অথচ সিকিও এক হাত গড়িয়ে অন্য হাতে যায়। সহজে খোয়া যায় না। তেমনি। গড়িয়ে গড়িয়ে যাবো ঠিকই। চাকরি যাবার ভয় থাকবেই। ছাঁটাইয়ের শানিত অস্ত্র ঝুলবেই। তবু।

বারী তন্ময় হয়ে শুনছিল। টেবিলে কিছু কাগজপত্রের তাড়া। রকমারি পত্রপত্রিকা। আর কিছু নিমন্ত্রণপত্র।

তারই একখানা তুলে নিয়ে বলে বারী, দেখব?

দেখো না, লুকোবার আর কী আছে। বরং কিছু নিয়ে গেলে কৃতার্থ হই। টেবিলে জায়গা হচ্ছে না।

একটা খাম খুলে কার্ডখানা পড়ে বারী। কোনো এক নাটকের নিমন্ত্রণপত্র। অকারণেই চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। উত্তেজিত হয়ে বলে, যাবে তুমি এ নাটকে?

কোন নাটক?

বারী নিমন্ত্রণপত্রখানা দেখায়।

ক্ষেপেছ। ওসবের সময় কই।

তাহলে – 

নিশ্চয়ই। সানন্দে। যত নাটক, বিচিত্রানুষ্ঠান আর টি-পার্টির কার্ড সব ঝেঁটিয়ে নিয়ে যেতে পার।

শুধু নাটকের কার্ডখানাই তুলে নেয় বারী।

হয়তো মণি আছে এ নাটকে। কোনো মনোমুগ্ধকর চরিত্রে। খালি চোখে যেমনই লাগুক, মেক-আপ নিয়ে ভুরু এঁকে আলোর সামনে স্টেজে এসে দাঁড়ালে নিশ্চয়ই মনে হবে তাকে অপূর্ব।

মণিও তাকে আমন্ত্রণ জানাতে পারতো তাহলে। তার কথা হয়তো মণির মনে হয়নি। না হওয়াই স্বাভাবিক। সে তো তেমন কোনো অনুরোধও জানায়নি। আর কার্ড দেবার লোকের কি আর মণির অভাব।

কার্ডকানা পকেটস্থ করে একটা নকল অজুহাত দেখিয়ে বলে বারী, আমাদের মারুফ সাহেবের মেয়ে নাটক খুব ভালোবাসে।

তাকেই দিচ্ছ নাকি?

আমতা আমতা করে বারী, জিজ্ঞেস করব যদি যায়। আর কে বলতে পারে, হয়তো নাটকে ও নিজেই আছে।

নাটকও করে নাকি?

তারপর কী মনে হওয়ায় বলে ওঠে, না না ওসব মেয়েছেলেকে নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করতে যেও না আবার। প্রেস গ্যালারির কার্ড। বরং তুমিই যেও। এবার নিজেই কেমন শঙ্কিত বারী, তাহলে আমাকে যেতে দেবে?

যেতে দেবে মানে। গট্গট্ করে ঢুকে বসে পড়বে। বলাবলির কী আছে।

হাসান পাশ ফিরে ঘুমোয়।

এবার যাওয়াই উচিৎ।

দরজার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে বারী, আচ্ছা নাটকের সমালোচনা বেরোয় না তোমাদের কাগজে।

হ্যাঁ বেরোয়। কেন তুমি সমালোচনা করবে নাকি?

ব্যাপারটা বলবে কিনা ভাবছিল বারী। শেষে বলেই ফেলে, মেয়েটা শুনেছি ভালোই অভিনয় করে।

কথাটা বলেই কেমন অস্বস্তি বারীর। মণির অভিনয় দূরে থাক, ওকে মঞ্চেই কখনো দেখেনি।

বেশ তো।

তাহলে ওর সম্বন্ধে কিছু লিখে দেওয়া যায় না।

কিছু, কী রকম?

এই যে-রকম কাগজে বেরোয়।

কেমন চতুর হাসি হেসে বলে হাসান, এক কথায় তোমার এই সদ্য আবিষ্কারের কথা কাগজে ফলাও করে ছাপতে হবে – এই তো?

বারী কী বলবে ভেবে পায় না। হাসান বলে, সে দেখা যাবে পরে। আগে নাটকটা দেখে এসো।

দরজাটা আস্তে করে ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসে বারী।

বাইরে এসে এক পশলা স্নিগ্ধ সুবাসিত হাওয়ার স্বাদ নিল বুক ভরে। আলোয় আলোয় মেতে ওঠে চারদিক। সে-আলোর কিছু পড়েছে পাশের তেতলা বাড়ির কাচের জানালায়, আর কিছু চিক্চিক্ করছে শিশির ভেজা ঘাসে।

বেশ বেলাই হয়ে যায় হাসপাতালে পৌঁছুতে পৌঁছুতে। রোগী ওয়ার্ডে নেই। বোধহয় এতক্ষণে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অপারেশন থিয়েটারে। বারী হাসপাতালের ঘড়িটা দেখল। ওটাই বলে দেয়, পাকা দেড়টি ঘণ্টা দেরি হয়েছে তার।

সাদা মুখোশ চড়ানো ডাক্তার বেরিয়ে আসেন দরজা ঠেলে। কী মনে হওয়ায় বারীকে দেখে থামলেন। নাকের ডগা থেকে ডাক্তারি অবগুণ্ঠন একটু ঢিলে করে বলেন, আশ্চর্য এতক্ষণে আপনার খবর নেবার সময় হলো। আপনাদের দায়িত্ব বলে কিছু নেই।

প্রতিবাদ করা যায়। কিন্তু সেটা এক্ষেত্রে রূঢ় শোনাতে পারে। অমন কড়া কথা শুনতেই হয়, বিশেষ করে কল্পিত আত্মীয়তার ভিত্তি সম্বন্ধে ডাক্তার যখন নিঃসন্দেহ। তার ভুল ভাঙিয়ে দেওয়া যায়। বলা যায়, সে নিছকই একজন কৌতূহলী দর্শক। রঙ্গমঞ্চের শেষ দৃশ্যের পরিণতি দেখার লোভেই তার এতদূর হেঁটে আসা। বারী জিজ্ঞেস করে, অপারেশন কেমন হলো।

স্টোনলেস স্টিলের ট্রেতে একখানা ফোরসেপ তুলে নিয়ে ডাক্তার জবাব দেন, হলো আর কই, এখনো চলছে।

ভয়ের কিছু নেই তো?

কী করে বলব বলুন। আমাদের যা চেষ্টার আমরা করছি।

বোধহয় ভেতর থেকে ডাক পড়ে। ডাক্তার কথা শেষ না করেই অপারেশন থিয়েটারে ছুটে যান। তার দরজা খোলার মুহূর্তে ভেসে ওঠে শ্বেত-বস্ত্র শোভিত ডাক্তারদের সারি। বেডের চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে। মাথার ওপরে নকল সূর্যের মতো একটা উজ্জ্বল বাতি। যেন তারা সবাই কোনো এক মাহেন্দ্রক্ষণের প্রতীক্ষায়। কোনো ভয়ঙ্কর দুর্যোগের হাত থেকে একটি নিবুনিবু প্রদীপশিখা ধরে রাখার আকুল চেষ্টা। যাকে কেন্দ্র করে এত আয়োজন, এত সাধ্য-সাধনা সে চেনা মানুষের চেনার সীমান্ত পেরিয়েছে অনেক আগেই। সেদিনই যেদিন জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছিল রাস্তায়। স্থান-কাল-পাত্র সবই তার কাছে অর্থহীন। অন্তত ততদিন যতদিন আর অবচেতন দেহকে এ পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধের স্বাদ আবার ফিরিয়ে দেওয়া না হচ্ছে।

লোকটা যদি সত্যি সত্যি বেঁচে যায়, কী করবে। আদ্যোপান্ত কাহিনীটা আরেকটু রং চড়িয়ে বলবে নাকি তার কাছে। না দূর থেকে জীবনের পূর্ণ উন্মেষ দেখেই সে-মুহূর্তে বিদায় নেবে তার হঠাৎ দেখা এই অবলা মানুষটির স্মৃতির একটি ক্ষীণসুর বেঁধে রাখা যাবে হৃদয়ের কোনো তন্ত্রীতে।

অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে যায়। বুক দুরদুর করে বারীর। পুরু চশমা চোখোর মোটাসোটা লোকটাই বুঝি একটি করিযুক্ত জীবনের সঙ্গে তার পাল্লা দিয়ে এসেছেন। বোঝা যায় এ নাটকের তিনিই অধিনায়ক।

সেই ছেলে ডাক্তারটিও তার অনুসরণ করে অস্ত্রোপচারে পারদর্শী মোটাসোটা ডাক্তারটিই বলতে থাকেন, আশঙ্কার তো কিছু দেখছি না। ব্লাড ফ্লট সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের এর বেশি করবার কিছু ছিল না।

ছেলে ডাক্তারটি একসময় আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বারীকে। অস্ত্রোপচারকারী এবার বারীকে লক্ষ করেই বলেন, কাছাকাছি থাকুন আপত্তি নেই। তবে বেডের পাশে যেন ভিড় না হয়।

একবার ইচ্ছে হয়েছিল তার কোনো দায় নেই একথা সাড়ম্বরে ঘোষণা করে বেরিয়ে যায় সেখান থেকে। কিন্তু পায়ে যেন বেড়ি পড়ানো। ইচ্ছে করলেও যাওয়া যায় না। কোনো অদৃশ্য শক্তি প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে রাখে তাকে।

অপারেশন থিয়েটারের পাশেই ওয়ার্ডে রাখা হয়েছিল রোগীকে। আপাতত ঢোকা বারণ। বাইরে একটা টুল পাতা ছিল। তাতেই বসে পড়ে বারী।

দুপুর না গড়াতেই সারা হাসপাতাল যেন কেমন নিঝুমপুরী হয়ে ওঠে। একদল নার্সের ডিউটি শেষ হয়েছে। তারা ফিরে যাচ্ছে। চোখেমুখে তাদের ক্লান্তির চিহ্ন। রাতজাগার ক্লান্তিতে কেমন ফোলা কারও চোখ। তাদের জায়গায় আরেক দল আসতে শুরু করছে ইতোমধ্যেই। সদ্য পাটভাঙা ন্যাপথালিন-গন্ধ শাড়ি। হাসি হাসি মুখে কখনো সামান্য একটু কৌতুক, সামান্য রসিকতা। জীবন-মরণের চিরন্তন দ্বন্দ্ব তাদের বিচরণ ক্ষেত্র। তাই গুমোট মুখ করে তাদের বসে থাকা চলেনি। একটি মৃত্যুর হাহাকারে তাদের যেমন মুষড়ে পড়লে চলে না, তেমনি হঠাৎ সান্ত¡নার ভাষায় তাদের অযথা পুলকিত হবার কিছু নেই। যেন শুধু সে-কারণেই তাদের হাসি-কান্নার জগৎ হাসপাতালের চিরন্তন সুখ-দুঃখের ছায়াপাতে প্রতিফলিত নয়।

বোধহয় একটু ঘুম ঘুম পেয়েছিল। টুলের ওপরে বসে বসেই মাথাটা চলে আসছিল একদিক।

কিছু উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর তাকে তটস্থ করে তোলে। তাইতো ঘণ্টাদুই বোধহয় এমনি করে ঘুমিয়েছে সে। ওই ওয়ার্ডের দরজা খুলেছে। আরো যেটা অবাক হবার কথা এই অজ্ঞাতপরিচয় রোগীর দর্শনপ্রার্থীও জুটেছে গোটা দু’তিন। একজন মহিলাও রয়েছে। বেডের কাছে বসে সে-ই কান্নায় ঢলে পড়ছিল সবচেয়ে বেশি। বোধহয় নিকট আত্মীয়।

বোধহয় লোকটির স্ত্রী।

রোগীর জ্ঞান ফেরেনি।

একসঙ্গে অনেকগুলো ভারি পায়ের শব্দ।

হাসপাতালের বড় ডাক্তার আসছেন। রোগীর অবস্থার অবনতির খবর পৌঁছেছে তার কাছে।

অক্সিজেন সিলিন্ডার এলো তার পরপরই। একটা আতঙ্কের ছায়া সবারই মুখে-চোখে।

ততক্ষণে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। অরেকবার অভিজ্ঞ ডাক্তার রোগীর অবস্থা যাচাই করে দেখবেন।

বারী নিজেও যেন ক্লান্ত। এবং সে সঙ্গে খানিকটা আশ্বস্তও। একক দায়িত্বের হাত থেকে অব্যাহতি পেয়ে। রোগীর আত্মীয়স্বজন, যখন রয়েছে নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়ে, তার আর দাঁড়িয়ে থাকার মানে হয় না।

হন হন করে ছুটে যাচ্ছিল করিডোর দিয়ে। তার উদ্দেশ্যহীন, অর্থহীন সহানুভূতিজনক এ আচরণের জন্যে নিজের কাছে নিজেই কৈফিয়ৎ তলবের ইচ্ছে হয়।

তার হঠাৎ এমন হলো কী করে। সে তো এই সাত বছরে এমন হন্যে হয়ে কারও সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের খবরদারি করতে আসেনি। কেউ করেওনি তার সাহায্য প্রার্থনা। বোধহয় এটাও জীবনের অনির্দেশিত অনুভূতিরই পর্যায়ভুক্ত। অথবা একঘেয়েমির ঘোর কাটানোর জন্যে একটু রং বদলানোর নেশা।

শুনছেন।

কে যেন ডেকে ওঠে পেছন থেকে।

তাকিয়ে দেখে মণি দাঁড়িয়ে।

হাঁপাতে হাঁপাতে তার কাছে এসে বলে, কখন থেকে চেঁচাচ্ছি, শুনতেই পাচ্ছেন না। আপনি হাসপাতালে যে।

ঠিক সে প্রশ্নটাই করতে পারত বারী।

তার জবাবটা আগেই দিয়ে বলে মণি, আমার বোনকে নিয়ে এসেছিলাম।

কী হয়েছিল?

যেন খুশিতে ফেটে পড়ে মণি। নাটকীয় ভঙ্গিতেই বলে, কী হয়েছিল, না, বলুন কী হয়েছে।

ব্যাপারটা বুঝতে পারে না বারী।

মণিই আবার বলে, দেখবেন কি সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চা। একদম মায়ের আদল পেয়েছে।

ও, হেসে বলে, বারী, ভালোই তো।

দেখবেন, চলুন।

তাই হয়তো যেত। কিন্তু তার আগেই চোখে পড়ে ডাক্তারের দল ধীর-মন্থর গতিতে বেরিয়ে আসছে অপারেশন থিয়েটার সংলগ্ন ওয়ার্ড থেকে। বলে দেবার দরকার নেই। দেখেই বোঝা যায় প্রকৃতির কাছে মানুষের চিরন্তন পরাভূতের ছায়া তাদের চোখেমুখে।

ছেলেমতো ডাক্তারটি তাকে দেখে করুণভাবে তাকায়। তারপর ঘাড়ের ওপর হাত রেখে বলে, আমাদের যা করবার সবই করেছি। এরকম ঘটবে আশা করিনি।

বোধহয় নিছক তীব্র ইচ্ছের তাড়নাই তাকে ধাওয়া করায় সে ওয়ার্ডের দিকে। দর্শনপ্রার্থী ভদ্রমহিলা প্রাণহীন দেহের ওপর লুটিয়ে হু-হু কান্নায় হাসপাতালের দুপুর গড়ানো বিকেলের সেই ক্ষণটি কেমন অসহ্য ও করুণ করে তোলে। একপাশে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে দেখে বারী। কিছু করার নেই। কিছু বলার নেই। কোনো সান্ত¡নার ভাষা তার জানা নেই।

সেই রাতে যার প্রাণরক্ষার তাগিদে এই হাসপাতালে ছুটে এসেছিল, সে যেন তার মহানুভবতার আমন্ত্রণটি তুচ্ছ করল। হু-হু কান্নার গোঙানিও থেমে যায়। হঠাৎ যেন ঘরটি আবার ভীষণ নীরব। চার দেয়ালের নিস্তব্ধতা যেন তাকেই অস্ফুট অব্যক্ত স্বরে কটাক্ষ করে বলে, মিছেই তোমার ছোটাছুটি। মিছেই তোমার প-শ্রম। যা হবার তা হবেই।

শোকাক্লিষ্ট ভদ্রমহিলার সঙ্গে একটি বিশ-বাইশ বছরের ছেলেও ছিল। বোধহয় তারই নিকট আত্মীয় কেউ।

সেই ছেলেটিই খুঁজে পেতে খবর দেয়, ডাক্তার বলেছে, রক্ত সময় মতোই দেবার ব্যবস্থা হয়েছিল।

ভদ্রমহিলা মুখ খোলে এবার, কে ব্যবস্থা করল।

কি জানি।

তারপর হঠাৎ আবিষ্কারে মুগ্ধ হবার মতো চোখ বড় বড় করে বলে, ছেলেটি বোধহয় ধনু মামা।

ভদ্রমহিলা বিগলিত।

বা®পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে, ভাগ্যিস ধনু মামা ছিল। ছেলেটি হাত ধরে বলে, চলো আমরা ধনু মামার কাছে যাই।

বারীর দুঃখ-অভিমান কোনোটাই হলো না। যেন এমনটিই সে চেয়েছিল। অকাতর সেবা-শুশ্রƒষার কৃতিত্বে ধনু মামা ভূষিত হলেও আপত্তি নেই। অথবা ধনু মামা নামীয় ব্যক্তিটি সে কৃতিত্ব যদি অস্বীকার করে কোনো অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির অস্তিত্বের কথাও তাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আক্ষেপের কিছু নেই। নাটকের শেষ দৃশ্যে এ ধরনের বিতর্ক অর্থহীন। বারী ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে ওয়ার্ড থেকে। ইচ্ছে ছিল না। তবু যাবার পথে আরেকবার দেখা হয়েই যায় মণির সঙ্গে।

মণির খুশি ধরে না। বলে, দেখবেন না একবার?

কাকে?

আমার বোনের ফুটফুটে মেয়েটি। কি সুন্দর তুলতুলে গাল।

তুলতুলে গালের অধিকারিণী এ-পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হবার আগেই আরেকজন কেউ তার জন্যে এ আকাশ-বাতাস আর মাটির খানিকটা জায়গা ছেড়ে গেছে, সে কথা মণির না জানারই কথা।

বারীকে যেতে হলো না। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়েই দেখাল মণি, দেখেছেন, ওই যে ওদিকে হাত-পা ছুড়ছে।

আপাত-খুশিতে ঢলে পড়া মণিকে দুটো সদুপদেশ দিতে ইচ্ছে হয়েছিল তার।

হাসপাতালের এক কক্ষে একটি অনাহূত জন্ম ও অন্য কক্ষে একটি অবহেলিত মৃত্যু – এ দু’ঘটনাকে কেন্দ্র করে মণির সঙ্গে তার সম্পর্কের কোথায় যেন একটা ক্ষীণ যোগসূত্র আবিষ্কার করেছে বারী।

যে নবজাতককে নিয়ে মণির খুশির অন্ত নেই, সে তো তার স্নেহ-ভালোবাসার এক কণাও দেবে না তাকে। অবশ্যি মণি নাটকের সার্থক শিল্পী। অন্যের কল্পিত কাহিনীর নায়িকা। অন্যের হাসি-কান্না ধার করাই তার কাজ। কিন্তু একদিন এই কুশলী শিল্পীও তার সৌভাগ্যের হিসেব-নিকেশ করতে বসে বারীর মতোই হতাশ হতে পারে। মনে হতে পারে তারও, মঞ্চে সফল নায়িকা হলেও সে জীবনসংগ্রামের এক নীরব দর্শক মাত্র। যেমন বারী।

কথার ফাঁকে ফাঁকেই জিজ্ঞেস করে একসময় মণি, ভালো কথা, আপনি কাকে দেখতে এসেছিলেন হাসপাতালে?

খানিকক্ষণ যেন কোনো কথাই ফোটে না তার মুখে।

তারপর প্রকৃতস্থ হয়ে বলে, কই না। কাউকে দেখতে আসিনি তো। মণি একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে খানিকক্ষণ।

যেন একথা বারীর মতোই তার নিজেরও বিশ্বাস হয়নি একবিন্দু। 

আগাগোড়া ঘটনাটাই যেন কেমন বিভ্রান্তিকর। অদৃশ্যে নিয়তি যেন ইচ্ছে করেই আজ হাসি-কান্নার দ্বন্দ্বময় দোলায় তাকে ঠেলে দিয়ে মহাজব্দ করেছে। না পারল সে মণির সঙ্গে কলকলিয়ে হাসতে, না পারল একটি অযাচিত মৃত্যুর শোকে কাতর হতে। দুটো ঘটনাই যেন সম্পর্ক-শূন্য। দুটো ঘটনার কোনোটিই তার মানসিক প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা রাখে না। তার নিজের ভূমিকা বড়জোর হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে হকচকিয়ে যাওয়ার মতো। তার বেশি কিছু নয়। মিছেই মুখ ভার করে বসে থাকতে দেখলে কোনো জিজ্ঞাসু চোখ হঠাৎ তার জন্যে সহানুভূতিতে ভেঙে পড়বে না। বড়জোর ভাববে, মন ভালো থাকার মতো কোনো ঘটনাই যার জীবনে ঘটে না, তার স্বাভাবিক অভিব্যক্তি। মাঝে মাঝে নিজেও ভাবে বারী, হঠাৎ এই পরহিতকর বৃত্তির ভূতটা মাথায় চাপলই বা কেন। আজকালকার উদাসীন সমাজব্যবস্থায় তার আচরণ একটু মধ্যযুগীয় এবং নাটকীয় হয়ে যায়নি কি?

বড়জোর সে একটু আহা উহু করে পারত সরে পড়তে। যেমন আর সবাই করে।

যে লোকটা আজ হাসপাতালে প্রাণত্যাগ করল, সে বেঁচে থাকলেই কি আর আজীবন কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে থাকত।

কিন্তু প্রত্যেকেরই অন্তরে বোধহয় একটা ছিঁচকাঁদুনে বাসনা রয়েছে, যা যে-কোনো দুঃখে বিগলিত। অন্তত একবার না একবার সে অনুভূতির তাড়না মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যে মানুষ খুন করতে পারে। সেও বোধহয় জীবনে একবার না একবার তার এই সঙ্গোপন বাসনা চরিতার্থ করার স্বপ্ন বিসর্জন দেয় না।

অজ্ঞাত কুলশীল ব্যক্তির জন্যে তার দরদের কথাটা নাহয় কাউকেই বলবে না। তবু নিজের কাছে ওটাই যে একমাত্র সান্ত¡নার দ্বীপ হয়ে জেগে রইল। একদিন           অন্তত একবার সে কারও একটু ভালো করতে চেয়েছিল, এটাই কম কি।

তাকে ঘরে ঢুকতে দেখে মামার মেজ মেয়ে রুবী বলে উঠল, কি ব্যাপার তোমার যে পাত্তাই নেই। কোথায় ঘোর? কী করো?

আবার সেই মায়া দেখানো। ছেলে ভুলানো কথা। রুবীর কি সত্যি তার অভাব মনে পড়েছে। না, এটা কোনো উদ্দেশ্য সিদ্ধির পূর্ব ভূমিকা মাত্র।

বারী হেসে বলে, না এই একটু কাজে বেরিয়েছিলাম, দুপুরে এলে বুঝি।

তাও ভালো মনে করে জিজ্ঞেস করেছ।

কই আমি কিচ্ছু জানি না। বাক্স-পেটারাগুলো দেখে মনে হয়েছিল একবার তোমার কথা। দুপুরবেলা আর বিরক্ত করিনি।

আগের চেয়ে অনেক হৃষ্টপুষ্ট। বেশ একটা গিন্নি গিন্নি ভাব। হাতভর্তি একগাদা চুড়ি। গলায় সরু হার। গলার ভাঁজে ভাঁজে পাউডারের সুরভিত রেখা।

রুবী কোলের ছেলেটাকে নাবিয়ে দিয়ে বলে, এলেই যখন আমার একটা কাজ করে দাও। এ-বাড়িতে গলা ফাটিয়ে মরলেও হাতের নাগালে পাওয়া যায় না কাউকে।

পিতৃগৃহের প্রতি বীতশ্রদ্ধ – এটা নিছকই অমূলক সন্দেহ। এটা বড়জোর তার সহানুভূতি আকর্ষণের কোনো চতুর পন্থা।

বারী জিজ্ঞেস করে, কী কাজ।

কাজ তেমন কিছু নয়। তোমাদের ডাক্তার আলিমুজ্জামানকে চেনো।

হ্যাঁ।

সীতুর বাবার কাছ থেকে উনি হাজার পাঁচেক টাকা নিয়েছিলেন। বছর তিনেক হলো। ওটা দেবার কোনো লক্ষণ নেই। তা ভাবছিলাম একবার তুমি নিজে গিয়ে         যদি –

সীতু মানে, রুবীর ছোট ছেলে।

রুবী সম্মতির আশায় তার দিকে তাকিয়ে থাকে।

বারী বলে, তা তুমি বলছ যখন যেতে পারি। কিন্তু আমাকে কি দেবে। তারচেয়ে আর কাউকে পাঠালে ভালো হতো না?

রুবী চারদিকে তাকায়। তারপর ফিস্ফিসে গলায় বলে, চেঁচিও না। এ বাড়িতে কাউকে বলতে আমার ভরসা হয় না। সবার তো ধারণা আমি টাকায় গড়াগড়ি যাচ্ছি।

বোধহয় রুবীর ভয়টা সঙ্গত। অতগুলো কাঁচা টাকা ঘরে আসার খবর পেলে ছেঁকে ধরার লোকের অভাব নেই। সেজন্যেই একজন ভরসার লোক খুঁজে পেতে নিতে হয়েছে।

মামী এসে পড়ায় প্রসঙ্গটা সেখানেই ধামাচাপা পড়ে।

বারী উঠে পড়ার উপক্রম করে। রুবীর সঙ্গে পাশাপাশি বসে এমন অন্তরঙ্গ আলাপের এই অস্বাভাবিক দৃশ্যটি যেন তাকে একটু পীড়িতই করে। অন্য কোনো কারণে নয়। ঘরের বাজে আবর্জনার স্তূপের মতো যার অস্তিত্ব, তাকে অমন করে সোফায় বসিয়ে আনন্দে বিগলিত না হলেও চলে। রুবীর কি। সে তো দুদিন পরেই চলে যাবে স্বামীর ঘরে। হঠাৎ মাথায় উঠিয়ে তোলার এই ঝামেলা যে পোহাতে হবে তাকেই।

রুবী বলে, বসো না মা।

আড়চোখে বারীর দিকে তাকিয়ে বলেন, না না বসব না এখন। হাতে মেলা কাজ। তা তুই ডেকে পাঠিয়েছিলি ওকে, না নিজেই এসে চাকরির জন্য ধরনা দিতে শুরু করেছে আবার।

একটা তীব্র অপমানের কশাঘাত যেন তাকে বিদ্ধ করে। তাঁর এই নির্মম কটাক্ষ যেন তার সমগ্র সত্তার বিরুদ্ধে সঞ্চিত ক্ষোভের প্রতিফলন। বেশ অনুভব করে বারী, মামীর দেহটা থেকে থেকে কেঁপে ওঠে। অন্তরের অন্তস্তলে একটা প্রতিবাদ ফেটে বেরুতে চায় এখুনি। তার আগেই হেসে জবাব দেয় রুবী, না না, সেরকম কোনো কথা বলতে আসেনি। আমিই ডেকে পাঠিয়েছিলাম।

এবার মামীর গলার সুরটাও যেন অনেক স্তিমিত। কৌতূহলী দৃষ্টি ছুড়ে বলেন, কোনো কাজ ছিল তোর? আমতা আমতা করে বলে রুবী, না কাজ আর কি। ভাবছিলাম দুটো সিনেমার টিকিট আনাব।

মামীর মেজ ছেলে রুমী শেষের কথাটুকু শুনতে পায়। ছুটে এসে বলে, তাহলে আমার জন্যে একটা মেজ আপা –

বেশ তো দিয়ে দে পয়সা।

রুমী অবাক হয়, বা রে আমি কেন পয়সা দিতে যাবো। তুমি আছ কেন।

ঘোর সংসারীই হয়েছে রুবী। হেসে বলে, আমার কাছে পয়সা কই। আসা-যাওয়ায় কম খরচ! তুমি তো নিজেই স্কলারশিপ পাও।

ছেলেমেয়েদের বায়না রক্ষার ব্যাপারে সামান্য ক’টি মুদ্রাই প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াবে, মামী সেটা বোধহয় চান না।

বলেন, থাক গে পয়সা আমিই দেবো।

তারপর বারীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে বলেন, তুমি তো আবার টিকিট কিনতে দিলে আজেবাজে খরচ করে বসবে।

বোধহয় হাতে কি একটা কাজ ছিল। ভেতরে যাবার সময় ওর হাতে দশ টাকার একখানা নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, নাও। আমাকে হিসেব দিও। রুবী তেমন আগ্রহ দেখায় না। যেন বানানো মিথ্যে বলে সে-ই বিপদে পড়েছে সবচেয়ে বেশি।

বারী জিজ্ঞেস করে, কোন শোর টিকিট কাটব।

রুবী নিরস্ত করে বলে, থাক। আমি আর যাবো না। রুমী যাক।

রুমী তৈরি হয়েই ছিল। বলল, বেশ তো মেজ আপা তুমি না যাও, ওই টাকাটা আমার কাছে থাক।

তোমার কাছে থাকতে যাবে কেন। আমার টিকেটের পয়সা অন্য কাজে আসবে। উলের কাঁটা কিনব ওটা দিয়ে।

ভাইবোনের এ ধরনের বচসায় তার নীরব দর্শকের ভূমিকাই ভালো। বারী কথা বলে না।

রুমীই মাঝখান থেকে বলে, বেশ তাহলে টাকাটা আমার কাছেই থাক। আমি নিজেই যাবো।

রুবী আঁৎকে ওঠে, আর আমার টাকা।

দেবো দেবো, তোমারটা তোমাকেই ফেরত দেবো।

রুমী চলে গেলে, হাঁপ ছেড়ে বাঁচে যেন। বলে, ভাগ্যিস তুমি কিছু বলোনি।

কী বলিনি?

ওই টাকার কথা।

ও।

তা আজই যাও না একবার ডাক্তারের কাছে।

হ্যাঁ, যাবো। এখন হয়তো পাওয়া যাবে না। রাত করে গেলেই ভালো।

তা তোমার যেমন খুশি।

রুবী প্রসন্ন হয়েছে তা তার চোখমুখ দেখেই বোঝা যায়।

সারওয়ার সাহেবের গাড়ির হর্ন শোনা যায়। তার আগেই কেটে পড়তে চায় বারী। কিন্তু তা হয় না। দরজায় মুখোমুখি দেখা হয়ে যায়। সারওয়ার সাহেবই কথা বলেন, আবার কোথায় যাচ্ছ সন্ধেবেলা।

কাচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে বারী। বলে, না কোথাও না। সারওয়ার সাহেব বারান্দায় একটা পাতা চেয়ারেই বসেন। তারপর বলেন, শোনো তোমার তো পাত্তাই পাওয়া মুশকিল। চাকরি-বাকরি তো তোমাকে দিয়ে হবে না।

এ-কথার কোনো সদুত্তর তার জানা নেই। তাই চুপ করে থাকতে হয়। সারওয়ার সাহেব তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন একদ-। হ্যাঁ, যেমনটি আশা করেছিলেন তেমনটি হয়েছে। বিনয়াবনত হয়ে মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে বারী।

মামী এসে পড়ায় কথায় ছেদ পরে।

মামী বলেন, আমাকে ডাকছিলে?

না না, বারীকে বলছিলাম, ওর তো দেখাই পাওয়া যায় না। নিজে না হোক অন্যরা যে চেষ্টা করবে তারও উপায় নেই। মারুফ সাহেব ক’দিন ধরে খুঁজছেন। আজও আমাকে সে-কথাই বললেন।

যথাসম্ভব গলার স্বর নাবিয়ে বলে বারী, আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল সেদিন। সারওয়ার সাহেব কথার ওপর কথা বলা পছন্দ করেন না। কোনো তর্কে হেরে যেতে অনভ্যস্ত। এক ধমকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, সেই দেখা হয়েছিল মানে কি। আমাকে তো আজকে বললেন যে, ওর সঙ্গে একটু পরামর্শ ছিল। তা সারাদিন টো-টো করে না ঘুরে একটু শুনে এলেই হয়।

মামী ফোঁড়ন কাটেন মাঝখান থেকে, তোমার কথা ওর বড় কানে যাচ্ছে।

না গেলে আমার কি! ওর ভালোর জন্যে বলছি। আজ আমি আছি – টের পাচ্ছ না। কিন্তু একদিন তো নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। কতদিন চলবে এভাবে শুনি।

যেন কোনোরকমে পালাতে পারলেই বাঁচে বারী।

সারওয়ার সাহেবকে আশ্বস্ত করে বলে, কাল যাবো ওর কাছে।

সারওয়ার সাহেব বোধহয় আরো কী বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই ভেতর থেকে খবর আসে, তার চা তৈরি।

বারান্দায় পাতা একখানা বেতের চেয়ারে বসে ছিলেন মারুফ সাহেব। পায়ে হাঁটু অবধি উলের মোজা। একটা পা ছোটমতো টুলের ওপর তুলে দিয়ে বাটিভর্তি সর খাচ্ছিলেন। কিছু তার মুখে গোঁফে জড়িয়ে যায়।

বারীকে আসতে দেখে মুখ মুছে নিয়ে বলেন, এসো এসো বসো। কাল থেকে বড্ড বাতের ব্যথাটা পেয়ে বসেছে। পা সোজা রাখতে পারছি না। পাশেই একটা মোড়া ছিল। ওখানা নিয়ে বসে পড়ে বারী।

কিন্তু আলাপের কোনো প্রসঙ্গই খুঁজে পায় না। জিজ্ঞেস করে, খুব ব্যথা নাকি?

খুব মানে। কাল চোখের পলক ফেলতে পারিনি।

তারপর একসময় গলাটা নিচু করে বলেন, আহা আমার আবার হাঁটার অতো অভ্যেস নেই।

হাঁটতে হবে কেন, আপনার তো গাড়ি রয়েছে।

কেমন সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চারদিক চেয়ে বলেন, আগে সে-কথাই তো বলছি।

মাঝখানে আবার থেমে বলেন, অতশত কথা বলে লাভ নেই। কার না কার কাছে গিয়ে লাগাবে। সারা পাড়া রাষ্ট্র করবে।

মারুফ সাহেব থামলেন। কিন্তু নিজেই যেন তাঁর পরম অস্থিরতা। কিছু একটা না বলতে পারলে হাঁপিয়ে উঠবেন।

বারী এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করে, আমাকে ডেকেছিলেন নাকি?

যেন আকাশ থেকে পড়েন মারুফ সাহেব, কই না তো।

মামাকে খবর দিয়েছিলেন?

ও সেই কথা। হ্যাঁ, তা আমি সবসময়ই বলি ওর একটা কিছু হলো না। কোথাও একটা লাগিয়ে দিন। উলটো আমার সঙ্গে দেখা করতে বললেন, বেশ মজা তো।

কেমন ছেলেমানুষসুলভ কৌতুকে তাঁর চোখ জোড়া নাচতে থাকে।

এক অবসরে খপ্ করে ওর হাতখানা ধরে আবার বলতে থাকেন, আমি তবু জিজ্ঞেস করি ভালো-মন্দ দু’কথা। বলো কেউ খবর নেয় আজকাল কারও।

সরের বাটিটা সরিয়ে রেখে পায়ের ওপর আলোয়ান জড়িয়ে হেলান দিয়ে ভালো করে বসেন মারুফ সাহেব।

আসলে মারুফ সাহেবের বোধহয় কোনো সঙ্গী-সাথীর প্রয়োজন হয়েছে। তাঁর নিত্য অভাব-অভিযোগ শোনার শ্রোতার অভাব।

এক মুহূর্ত কী যেন ভাবেন মারুফ সাহেব। তারপর ঝুঁকে গিয়ে কানের কাছে মুখ এনে প্রায় ফিসফিস গলায় বলেন, কথাটা যখন বলেই ফেলেছি লুকিয়ে কি লাভ? কারও কাছে বলবে না, বলো।

বারী হেসে বলে, কার কাছে আবার বলব।

তোমাকে একটু থানায় যেতে হবে।

থানায় কেন।

আমার গাড়িটা ওখানে আটকা পড়া। এক বিশ্রী দুর্ঘটনায় পড়েছিলাম।

কেমন ছায়া ছায়া সন্দেহ হয়েছিল বারীর। সে সন্দেহটাই ঘনীভূত করে তোলেন মারুফ সাহেব।

কই জানি না তো। কীরকম দুর্ঘটনা, জিজ্ঞেস করে বারী।

মারুফ সাহেব গলায় আলোয়ানের গেরোটা ঢিলে করে দেন। মোজা জোড়া খুলে নেন। চোখেমুখে ঘামের ফোঁটা। থরথর কাঁপছে তাঁর হাত। যেন এমন কোনো ঘটনার শিকার হয়েছেন বলতে গিয়ে নিজেই বিব্রত।

শহরের উপকণ্ঠে নতুন প্লট পেয়েছেন। সেটাই দেখতে গিয়েছিলেন। ফিরতে রাত হয়ে যায়। দুশ্চিন্তার কিছু ছিল না। ফতেহ আলী তাঁর পুরনো ড্রাইভার। ভরসার লোক। মাঝে মাঝে টানার অভ্যেস আছে। কিন্তু তা নিয়ে মাথা ঘামান না।…

আজ চৌদ্দ বছরে যে গাড়িতে একটা সামান্য টোকাও লাগায়নি, হঠাৎ ব্রেক কশতে গিয়ে এমনকি সামান্য অসতর্ক ঝাঁকুনিতেও আরোহীর যাত্রা-সুখ বিঘিœত করেনি কখনো, সে-ই শেষ পর্যন্ত এ কা-টা করে ফেলল। এর আগেও দেখেছেন কি অপূর্ব নৈপুণ্যের সঙ্গে পাকা খেলোয়াড়ের মতো সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে অক্ষতদেহে বার করে নিয়েছে গাড়ি। এবং যারা তা দেখেছে, এক বাক্যে স্বীকার করেছে কেবল পটু ড্রাইভারের পক্ষেই এসব সম্ভব।

বাড়ির কাছে এসে ঘটল দুর্ঘটনা। মারুফ সাহেব অন্যমনস্ক ছিলেন। বা, একটু ঘুম ঘুম পেয়ে থাকবে। হঠাৎ অন্ধকারে একটা আতঙ্কিত মূর্তি দেখলেন যেন। মুহূর্তের জন্যেই। একটা মুখ আর্তনাদকে চোখের পলকে স্তব্ধ করে দিয়ে প্রচ- ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি বাঁয়ের গলি ধরে মোড় নিল। সে পথে যাবার কথা নয়। তাঁর গন্তব্যস্থল নয়।

মনে আছে, মারুফ সাহেব প্রাণপণ চিৎকার তুলে বলেছেন, থামো। ফতেহ থামো।

তাঁর কথা কানেই তোলে না ফতেহ আলী। বোধহয় আর প্রকৃতস্থ নেই। এক অস্থির চিত্তের তাড়না তাকে অভিভূতের মতো ছুটিয়ে নিয়ে চলছে। একবার ইচ্ছে হয়েছিল দরজা খুলে নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়বেন। কিন্তু সাহসে কুলোয়নি। ফতেহ আলীকে অনুরোধ উপরোধ করতে যাওয়া বৃথা, হাওয়ার বেগে ছুটে চলছে গাড়ি। কোথায় এসেছেন, কোথায় এসে থামবেন, আদৌ থামবেন কিনা জানেন না।

প্রতীক্ষার মুহূর্ত গুনছেন। মনে হচ্ছে আর সময় নেই। তাঁর অতি বাধ্য, অতি অনুগত লোকটি আজ মৃত্যুময় সঙ্কল্প নিয়ে নিশ্চিত পরিণামের লক্ষ্যস্থলে গিয়ে পৌঁছুবেই। সে পরিণাম ভয়াবহ হবে সন্দেহ নেই। হয়তো অচিরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বেন। অথবা একটা তীব্র ব্যথা আজন্মের পঙ্গুত্ব দিয়ে রাস্তার মাঝখানেই ছুড়ে ফেলে দেবে তাঁকে। ফতেহ আলীকে খুঁজেও পাওয়া যাবে না। তার অসাড় দেহে থাকবে না কোনো স্পন্দন।

সামান্য ক’টি মুহূর্ত। কিন্তু এই সামান্য ক’টি মুহূর্ত তাঁর জীবনের বিপুল ইতিহাস মন্থনের পক্ষে যথেষ্ট। তিনি চলে গেলে কী হবে তাঁর সংসারের। তাঁর স্নেহকাতর আপনজনদের। জীবনের অনেক আরদ্ধ কাজই শেষ হয়নি। নিশ্চিত আশ্বাসের নোঙ্গরে বাঁধতে পারলেন না সংসার তরণীকে। মণির কিছুই হলো না। রয়েই গেল মেয়েটা। বোধহয় তাঁর নিজের ঔদাসীন্যের জন্যেই। পাড়ায় পাড়ায় থিয়েটার করে বেড়ায়। শুনেছেন আজকাল তার নামডাকও হয়েছে। কিন্তু এরকম করে কি চলবে। আজ না হয় চলছে। কিন্তু মারুফ সাহেব যখন থাকবেন না, তখন?

তারচেয়ে ছোট মেয়ে কণিই ভালো। ঘর সংসার করছে। স্বামীকে দিয়ে পঁচিশ হাজার টাকার একটা বীমা করিয়েছে। গ্রামে সাত বিঘে জমি কিনেছে। বছরের খাবারটা সেখান থেকেই আসে। কণির কোনোকিছুর অভাব নেই। সংসার আলো করার জন্যে একটি নবজাতকও এসেছে তার কোলে। তা হোক। কিন্তু তাতে মণির কী আনন্দ? তার কিসের পুলক। রাতদিন যে বাচ্চাটাকে কোলে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। না, নিজের ঘাটতি পূরণেরই কোনো ব্যর্থ প্রয়াস।

আসলে নিজেই তাঁর উদ্যোগী হওয়া উচিৎ ছিল। দেখেশুনে কোনো রোজগারী জামাই খুঁজলেই পারতেন এতদিন। মুখে মুখে তো না করবেই। মেয়েদের স্বভাব। কিন্তু তিনি শুনতে যাবেন কেন সেসব ওজর-আপত্তি।

নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকার ভেদ করে হু-হু বেগে ছুটে চলে গাড়ি। মারুফ সাহেব সব আশা ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর চোখ জোড়া যেন ঘুমে আচ্ছন্ন। না, মৃত্যুর আগের মুহূর্তে এমনি ক্লান্তির ঢল নামে দেহে মনে।

আর কিছু মনে নেই।

মনে হলো ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়িটা কোথায় এসে যেন থামল। জায়গাটা তাহলে জনপ্রাণী-শূন্য কোনো নিভৃত প্রান্তর নয়। স্তিমিত দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে দেখেন মারুফ সাহেব। না, ঠিকই দেখেছেন। শহরের অতি চেনা রাস্তা। আলোয় ঝলমল করছে। আরো যেটা বিস্ময়কর, তিনি বেঁচে আছেন।

দেখতে পান গাড়ির দরজা খুলে নিজেই বেরিয়ে যায় ফতেহ আলী। পেছনে তাকায় না একবারও। খাকি পোশাকধারী কিছু লোক পায়চারি করছে সেখানে। কোথায় এলো তাহলে ফতেহ আলী – একেবারে থানায়?

তাহলে এতক্ষণ তিনিও যেমন জীবনমৃত্যুর দ্বন্দ্বে হয়েছেন দোলায়িত, তেমনি ফতেহ আলীও আলোড়িত হয়ে থাকবে কোনো দুর্ভাবনায়। অন্ধকারের নানা চোরাগলি দিয়ে শহরের বিরল রাস্তায় গাড়ি ছুটিয়ে মিছেই মুক্তির ছাড়পত্র কামনা করেছিল সে। কিন্তু পথের যাত্রাই বোধহয় তাকে বলে দিলো, এ পথের শেষ নেই। পথ অনন্ত। পথ ফুরোয় না। মানুষকেই ফুরোতে হয় একদিন। তাহলে কি সে তর্কের চূড়ান্ত মীমাংসা করেই এ-পথে পা বাড়াল ফতেহ আলী।

বারী জিজ্ঞেস করে, ফতেহ আলী এখন কোথায়?

হাজতে। গাড়িও সেই থেকে থানায় আটকা পড়া। নিজের জীবন নিয়ে ভাবনা-           চিন্তার কথাই বলেছেন মারুফ সাহেব। আসল ঘটনা নিয়ে যেন তাঁর কোনো উদ্বিগ্নতাই নেই।

গাড়িতে যে চাপা পড়েছিল তার খবর জানেন?

বারীর প্রশ্নে কেমন হকচকিয়ে যান মারুফ সাহেব। বলেন, না জানি না তো। কেন, তুমি জানো?

জানি। কিন্তু আপনার নিজের একবারও ইচ্ছে হলো না সেকথা জানার? কেমন ভয়ার্ত দৃষ্টি মারুফ সাহেবের। একটা অপরাধের গ্লানি তাঁকে জুড়ে। ওর হাতখানা ধরে বলেন, আমি কি আর এসব দেখলে সহ্য করতে পারতাম। তারপর এক মুহূর্ত উদ্ভাসিত হয়ে বলেন, কি আর হবে। ভালো হয়ে গেছে নিশ্চয়ই অ্যাদ্দিনে।

বারীর কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে নিজেই কেমন বিব্রত। প্রবল ঝাঁকুনিতে তার সারা দেহে কাঁপিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, জানো যদি বলছ না কেন?

এই আপাতদৃষ্টি ভালো মানুষটির প্রতি বারীর আক্রোশের সীমা নেই। তাঁর চোখে চোখ রেখে বলে, একদিনও হাসপাতালে যাননি?

না।

আপনার নাতিকে দেখতেও না?

না। না, আমি তো জানি হয়তো গেলে হাসপাতালে কোথাও একটা বীভৎস মূর্তির লোক দেখব। গাড়ির চাকার তলায় থেঁতলে যার মুখটাই আর চেনা যায় না। সে ভয়েই যাইনি।

তারপর কি মনে হওয়ায় দৃষ্টি স্থির করে বলেন, তুমি কী করে জানলে? তুমি ওকে চিনতে?

কাকে?

যে চাপা পড়েছিল।

না।

তবে?

বারী বলে, থাক সে আলোচনা। আপনার সে বীভৎস মূর্তি লোকটি চিরকালের মতো অন্তর্হিত। আপনার দুর্ভাবনার কিছু নেই।

মারুফ সাহেবের দৃষ্টি আনত হয়। কী যেন বলতে চেয়ে বলতে পারেন না। কেমন জড়িয়ে যায় কথা। খানিকক্ষণ থেমে নিয়ে বলেন, ওর ছেলেমেয়েদের কী হবে?

কেমন শানিত তীক্ষè জবাব বারীর, আমি কী জানি।

মারুফ সাহেব সমর্থনের আশায় তার দিক তাকিয়ে বলেন, ওদের কিছু সাহায্য করলে হতো।

বারীকে নিরুত্তর থাকতে দেখে বলেন, না থাকগে। ওরা আবার আমাকে দেখলে হৈ হৈ কা- বাঁধিয়ে দেবে। জন্ম-মৃত্যুর ওপর কারও হাত নেই, কি বলো? মৃত্যু কপালে থাকলে ঠেকাবে কে বলো? 

যেন দুশ্চিন্তার ঘোর কাটিয়ে উঠেছেন মারুফ সাহেব। আর তাঁর দুর্ভাবনার কিছু নেই। কারও সুখ-দুঃখ, স্বাচ্ছন্দ্য-অস্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে ঘুম নষ্ট হবার আর কোনো আশঙ্কা নেই। খবরটা দিয়ে ভালোই করেছে বারী। মারুফ সাহেব বলেন, তোমাকে একবার যেতে হবে থানায় আমার গাড়ির কী হলো দেখতে। বোঝো তো আর কাকে বলি। আপনার লোক বলতে কে আছে আর।

কাজ আদায়ের ফন্দি ভালোই জানেন মারুফ সাহেব। এতক্ষণ যাকে জুড়ে ছিল দুশ্চিন্তার কালো মেঘ, কেমন পুলকিত স্বর তার। উঠে গিয়ে ভেতর থেকে কিছু কাগজের তোড়া নিয়ে আসেন। সেগুলো ওর হাতে দিয়ে বলেন, আমার জমির কিছু কাগজপত্র। রেজিস্ট্রি করতে হবে। ওদিকেই তো যাচ্ছ। এক কাজে দু’কাজ হয়ে যাবে। জানো তো যদি হাঁটার মুরোদ থাকত আমি নিজেই যেতাম।

বারী কাগজগুলো গুটিয়ে নিয়ে বলে, এজন্যেই ডেকেছিলেন?

না না। মানে তোমার একটা চাকরির কথা বলেছি এক জায়গায়, তা তোমাকে খবরটা দেবো ভাবছিলাম।

কথাটা এভাবে বললেন যেন মারুফ সাহেবের নিজেরই ভরসা নেই, বা একেবারেই একটা ফাঁকা চাল।

বারী উঠে দাঁড়ায়। বলে, চাকরি হবে সে ভরসায় আপনার কাজ করে দিচ্ছি না।

হাসিতে মারুফ সাহেবের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বলেন, তা জানি না। তুমি কি আর ওরকম ছেলে।

একটি অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য কর্মের ত্রুটির কথা মনে হয়ে যায় মারুফ সাহেবের হঠাৎ। হাঁক দিয়ে বলেন, মা মণি বাইরে এককাপ চা – বারী হাত নেড়ে বলে, ধন্যবাদ দরকার নেই।

মনে মনে কেমন নিজে গর্জাতে থাকে বারী। যাকে দেখবে বলে এতক্ষণ আশা করেছিল, তার কি একবারও সময় হলো না। সে কি কিছু পুলকিত দৃষ্টির আমেজ ছড়িয়ে দিতে পারত না এতক্ষণে একবারও।

মণিটা সত্যিই অকৃতজ্ঞ।

কাজের কোনোটাই হয়নি। ধরনা দেওয়াই সার হয়েছে। রেজিস্ট্রি অফিসে লোক আসেনি। গাড়িরও হিল্লে হয়নি। ইন্সিওরেন্সের লোক এসে ওটা দেখে রিপোর্ট দেবার আগে কিছু হবে না।

রুবীর টাকার জন্যে তাগিদ দিতে গিয়েও অযথা হয়রানি। চেম্বারেই ছিলেন ডা. আলিমুজ্জামান। বারী যে রোগী হয়ে দর্শনপ্রার্থী নয়, এটাই তাঁর মনক্ষুণœ হবার পক্ষে যথেষ্ট।

তবু রোগীর ভিড়ে এক অবসরে কথাটা পাড়তে পেরেছিল। প্রথমত অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে ব্যাপারটা সরাসরি উড়িয়েই দিতে চেয়েছিলেন। ছোটমতো একটা বক্তৃতাও দিয়ে বসেন। তিনি কারও কাছে ধারেন না, অন্যেরা বরং তাঁর কাছে ধারে ইত্যাদি গোছীয়।

রুবী একটা চিঠি দিয়েছিল। সেখানা হাতে দিতেই কেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার মুখম-ল। বলেন, ও রুবীর কথা বলছ। আমি ভাবলাম কে না কে।

বারবার নেড়েচেড়ে চিঠিটা পড়েন।

বাঃ হাতের লেখা তো দিব্যি আগের মতোই রয়েছে।

বারী জিজ্ঞেস করে, কী বলব?

একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন ডা. আলিমুজ্জমান। হেসে বললেন, তোমার আর কিছু বলার দরকার নেই। আমি নিজেই যাবো একদিন।

ডাক্তারের সেই প্রতিশ্রুতি রুবীর কাজে আসবে কিনা কে জানে। বোধহয় নিছক পাওয়া শোধের তাড়নাই নয়। ডাক্তারের এই উৎসাহের পেছনে যেন এক সঙ্গোপন স্পৃহার অব্যর্থ ইঙ্গিত। নাকি সেকথা রুবীরও জানা। আর সেজন্যেই একটা অজুহাতের ছল করে তাকে ডেকে পাঠানো।

বেলা হয়ে আসছিল। মারুফ সাহেবের ওখানে গিয়ে কাজ নেই। কাল গিয়ে জানিয়ে আসলেই চলবে। জানা কথা, মারুফ সাহেব আবার যেতে বলবেন। এবং আর কোনো প্রতিশ্রুতির আশায় ঝুলিয়ে রাখবেন। ঝানু লোকরা তাই করে। বারীরও কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তাতে। সেও একটু ঢিলে দিলে পারে। বা দু’চারদিন মারুফ সাহেবের কাজের কথাগুলো স্রেফ ভুলে গিয়ে অকারণ ব্যস্ততার ধূম তুলতে পারে। এই ছল-চাতুরির গোপন খেলাটা কেমন জমে দেখবে না হয়। মনে মনে নিজেই কেন একটা কৌতুক অনুভব করে।

আর সে মুহূর্তে হঠাৎ করে হাসানের সঙ্গে দেখা হয়ে যেন ভালোই হয়। হাসান চেঁচিয়ে ওঠে, কি আশ্চর্য। তোমাকেই খুঁজতে যাচ্ছিলাম।

কী ব্যাপার, হঠাৎ?

এসব ব্যাপার হঠাৎই হয়। কোনো কাজ নেই তো হাতে?

না।

তাহলে আর কথা নয়। চলো আমার সঙ্গে।

একরকম তাকে হিঁচড়ে নিয়ে রিকশায় বসায় হাসান।

কিন্তু কোথায় যাচ্ছি, বললে না তো?

দেখতেই পাবে!

একটা খবরের কাগজের অফিসের সামনে এসে থামে রিকশা।

বারী বলে, তোমার ডিউটি নাকি?

না না। সেজন্যে আসিনি। শোনো বলেই ফেলি। চাকরির জন্যে তো আর কম ঘুরছ না। একবার কপাল ঠুকে দেখো। লেগে গেলে লেগেও যেতে পারে। একজন লোক নেবার কথা।

তা আমাকে কী করতে হবে, জানতে চায় বারী।

কিচ্ছু না। কিছু ইংরিজি খবর বাংলায় তরজমা করে তোমার পা-িত্য দেখানো ছাড়া এ-মুহূর্তে আর কিছু করার নেই। অবশ্যি নেবার মালিক আমি নই। তবু বলে রেখেছি। আমার বিশ্বাস, হয়ে যাবে। ঠিক এ অবস্থার জন্যে তৈরি ছিল না বারী। এর আগে এ ধরনের কোনো ইঙ্গিতও দেয়নি হাসান।

বাইরেটা যেমনই হোক। অফিসের ভেতরটা কেমন বিভীষিকাময়। টেলিপ্রিন্টারের একটানা খট খটা খট শব্দ। আর স্তূপাকার কাগজের রাজ্যে খবরের জাদুকররা যেন হঠাৎ ঈপ্সিত বস্তুর সন্ধান পেয়ে হঠাৎ পুলকিত। কখনো উল্টো। লম্বা কাগজের  অন্তহীন ফর্দটা একটি উৎসাহোদ্দীপক তথ্যেরও সন্ধান নিতে অপারগ। সেক্ষেত্রে সেগুলো যেন অহেতুক বিরক্তিরই সঞ্চার করে।

বারী একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে। কিছু অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। কেমন ভয়ই লাগল বারীর।

লম্বা লম্বা কাগজে ছাপা প্রুফের গাদা। এগুলোই যথারীতি সংশোধিত হয়ে মার্জিত হয়ে খবরের কাগজের শোভা বৃদ্ধি করবে কাল।

হাসান টেলিপ্রিন্টার থেকে একটা কাগজ ছিঁড়ে এনে হাজির করে তার সামনে। বলে, দাও তো একটু কলম চালিয়ে।

খুব অসুবিধে হয়নি। হবারও কথা নয়। কাগজে কর্মখালির বিজ্ঞাপন দেখতে দেখতে অবসর সময়ে দু’চারটে খবরের প্রতি দৃষ্টি চলে যায়। এবং সেসব খবরের একটা বাঁধাধরা সুর।

প্রথমে একটু ইতস্তত করছিল। কিন্তু তরজমাটা পড়ে নিজেই কেমন মুগ্ধ হাসান। খবরের কাগজের সেই সনাতন ভাষার প্রয়োগ-কৌশলে বারী যে সিদ্ধহস্ত বোঝা যায়। দুটো শিরোনামও দিয়েছে : বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের আশঙ্কা এবং বলিভিয়ায় সামরিক অভ্যুত্থান।

হাসান পড়ে নিয়ে বলে, খাসা হয়েছে। এ চাকরি নির্ঘাৎ তোমার কপালে, দেখে নিও।

যেন শুধু সে ভরসাতেই জিজ্ঞেস করতে পারল বারী, কবে জানতে পারব?

কালই তোমাকে সুখবর দিতে পারব আশা করছি। নিউজ এডিটর কপি দেখবেন, তারপরই নিয়োগপত্র।

হাসানের ডিউটি ছিল না। সাপ্তাহিক ছুটি। তাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে আসে বারী।

রাস্তায় যেতে যেতে আগামী দিনের মোটামুটি একটা পরিকল্পনাও করে ফেলেছে বারী।

পরগাছা হয়ে জীবন কাটানোর গ্লানিমুক্ত হতে আর দেরি নেই। হাসান নিজেই বলেছে, সেক্ষেত্রে সে তার সঙ্গেই উঠে আসতে পারে। দুজনে মিলে থাকা যাবে। পরে না হয় একটা বড় বাড়ির খোঁজ করা যাবে।

হাসানকে এখন বলে শুধু শুধু আহত করে লাভ নেই। সত্যি সত্যি একটা চাকরির সংস্থান হলে তার কি নিজেরই অন্য কোনো ইচ্ছের তাড়না পেয়ে বসবে না। ইচ্ছে করবে না কোনো প্রগাঢ় বাসনার মধুর স্বপ্নকে রূপায়িত করতে।

হাসানকে ছেড়ে দিয়ে বাকি পথ একাই আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকে বারী। আজ সামান্য একটু আশার দোলায় বুকটা কেমন তৃপ্তির কড়া নিশ্বাসে ভরে যেতে চায়।

সেই নাট্যলোভী মেয়েটাকে জীবনের আসল নাটকের লোভটা ধরিয়ে দেবার জন্যে এখুনি ছুটে গিয়ে খবরটা দিয়ে এলে হতো না।

হয়তো তাই যেত। কিন্তু মারুফ সাহেবের বাইরের ঘরের বাতিটা যে নিবল তখুনি।

যেন এ সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল বারী। পরদিন সকালে মারুফ সাহেব ছিলেন না। সকাল সকাল জমি দেখতে বেরিয়ে পড়েছেন। দুপুরের আগে ফিরবেন না।

খবরটা মণিই এসে দিলো। বলল, তাহলে বোধহয় আর সহ্য হবে না। বারী কেমন লজ্জা পায়। বলে, না না বসব না কেন। তবে কে আবার কী ভাববে।

কেমন অবিশ্বাসের হাসি হাসে মণি, দূর, আমার সম্বন্ধে কেউ আবার কিছু ভাবে নাকি।

ভাবে না?

না।

নাটক-ফাটক করে এমনিতেই বখে গেছি বলে সকলের ধারণা।

এরকম ধারণার কোনো কারণ খুঁজে পায় না বারী। বলে, আপনি তো শখেই নাটক করেন।

মণি প্রতিবাদ করে। বলে, না না আজকাল আর শখ-টখ নয়। প্রয়োজনের তাগিদেই করি।

যেন ইচ্ছে করেই ব্যাপারটার বিস্তারিত ব্যাখ্যা চায় না বারী।

তবু একটা আসল কৌতূহল সংবরণ করতে পারে না। জিজ্ঞেস করে, আপনি কি সারা জীবনই নাটক করবেন?

কি জানি।

কেমন দীর্ঘশ্বাসের সুর মণির।

আজ কেমন উদাস উদাস লাগছে। চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে কেমন আলু-থালু হয়ে আছে। জানালা খোলা পেয়ে সকালের রোদ নাক গলাতে শুরু করেছে। আর সে রোদে মণির গায়ের লম্বা ছায়া যেন গ্রাস করে তাকে। মণির গায়ের ছায়া তাকে ছোঁয়। অথচ হাত বাড়িয়ে মণিকে ছোঁয়ার তার সাধ্যি নেই।

নিজের অজান্তেই যেন বলে ফেলে বারী, আমি যদি অভিনয় জানতাম। অদ্ভুত চমক লাগিয়ে ভুরু বাঁকিয়ে বলে মণি, কে বলল জানেন না। দিব্যি অভিনয় করে গেলেন। কেউ টেরই পেল না।

তার মানে?

সেদিন হাসপাতালের আপনার আগমন-হেতুটা দিব্যি ধামাচাপা দিয়ে গেলেন। অবশ্যি আমাকে ফাঁকি দিতে পারেননি।

কেমন অবাক হয় বারী। বলে, আপনি আবার কী শুনলেন।

ঠিকই শুনেছি এবং পরে জেনেছিও সব।

কেমন অভিমান ক্ষুব্ধ স্বরে বলে মণি, আশ্চর্য, কথাটা আমাকে জানালে কোনো অপরাধ হতো?

কোন কথার কথা বলছেন।

থাক আর সাধু সাজতে হবে না।

এবার গলার স্বরটা কেমন সহজ করে আবার বলে মণি, আমি কিন্তু বলে দিয়েছি সব।

কাকে?

যে লোকটিকে বাঁচাতে গিয়ে রক্ত দিলেন তার ছেলেকে।

কাছে সরে আসে মণি। বলে, জানেন আপনার ওপর যেমন রাগ হলো, তেমনি আপনাকে নিয়ে খুব গর্বও হলো। অন্তত এমন একজনকে তো চিনি যে তার মাহাত্ম্য নিয়ে গলাবাজি পছন্দ করে না।

বারী বলে, কেন বললেন শুধু শুধু। বাঁচাতে পারিনি।

কেমন নকল রাগের ভান করে বলে মণি, তার আগে বলুন আপনি কীরকম লোক। আপনার কোনো লোভ নেই কেন?

কীরকম লোভ?

যশ, সম্মান, স্বীকৃতির লোভ।

বারী যেন হঠাৎ কিছু বলার খুঁজে পায় না।

মণির কণ্ঠস্বর কেমন আর্দ্র হয়ে আসে। অভিভূতের মতো বলতে থাকে, তা যে আপনার নেই জানি। তা না হলে দিনের পর দিন অনুগত মানুষের মতো অন্যের বোঝা হয়ে বেড়ানোর দায় হবে কেন আপনার। কি আশ্চর্য, যাদের জন্যে এত করছেন তারা তো দুটো ভালো কথার পুরস্কারও দেয় না কোনোদিন।

তার মনের সতর্ক গোপন অনুভূতিগুলো নিয়ে কেমন এলোমেলো খেলা শুরু করছে মণি। বারীর ভালো লাগে না! যেন হাতেনাতে ধরা পড়ে যাচ্ছে সে। আর সেই ধরে যাবার ভয়টাকে সংবরণ করার জন্যেই একরকম চিৎকার করে বলে বারী, না দিক। কিছু এসে যায় না আমার।

মুখোমুখি তাকে শাসনের ভঙ্গিতে শুনিয়ে দেয় মণি, আমার এসে যায়। এবং সেজন্যেই হাসপাতালে ছেলেটিকে সব কথা জানিয়ে দিয়ে আমার তৃপ্তি।

কীরকম তৃপ্তি।

তৃপ্তি নয়? অন্তত একজন – কেউ একজন – আপনার আত্মত্যাগের একটু স্বীকৃতি দিক। সারাজীবন আপনার কাছে ঋণে আবদ্ধ থাকুক।

সত্যি আজ কী হলো মণির? সে কি তার অগোচরে তার ভালো-মন্দ, মান-অপমানের দায় নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়েছে। ভাবতেই ভয় লাগে। এ পৃথিবীতে, এ নিষ্ঠুর পৃথিবীতে, তাকে নিয়ে ভাবনার জন্যেও কি একটি লোক আছে তাহলে।

তাহলে আর সঙ্কোচের কারণ নেই। সংশয়ের মেঘ কাটতে শুরু করছে। সূর্যোদয়ের প্রতিশ্রুতির কথা শুনিয়ে দিতে তাহলে আর বাধা কি। ভীরু নয়নে চারদিক তাকিয়ে দেখে বারী। ভেতরের দরজা ভেড়ানো নয়। তবে মোটা পর্দাটা স্থির হয়ে তাকে কিছুক্ষণের জন্যে অন্তত নিশ্চিত হওয়ার ভরসা দিচ্ছে।

মণির হাতখানা মুঠো করার লোভে হাত বাড়িয়ে দেয় বারী। সামান্য একটু শিহরিত স্পর্শের ছোঁয়া পেয়েই সে মুগ্ধ। বারী বলে, আমার একটা চাকরি হচ্ছে, সে খবরটাই দিতে এসেছিলাম।

কেমন মৃদু হাসিতে বিচ্ছুরিত মণি। মাথা নিচু করে আনত নয়নে বলে, তাহলে তো ভালোই হয়।

বলে কেমন সলজ্জ ভঙ্গিতে আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে পর্দা সরিয়ে ভেতরে চলে যায়।

রাত সাড়ে ন’টার আগে বেরোয় না হাসান নাইট ডিউটিতে। অথচ সেদিন সন্ধেবেলা গিয়েও পাওয়া গেল না তাকে। ঘরের একটা বাড়তি চাবি আজকাল বারীর কাছেই থাকে। কাজেই দেখা-সাক্ষাৎটা কিছু অত্যাবশ্যকীয় নয়। আসলে ব্যাকুলতা বারীরই। সে-ই প্রত্যাশিত খবরটি জেনে নেবার লোভে একটু আগে এসে পড়েছিল।

আজ বোধহয় মণির একটা নাটক ছিল কোথাও। কার্ডও পাঠিয়েছিল তার নামে। চলেই যেত। কিন্তু কার্ডের পেছনে মণির দু’ছত্র লেখারই সাধ সাধল। মণি লিখেছে কার্ড পাঠাচ্ছি বটে। তবে এলে আমার ভীষণ লজ্জা করবে। প্লিজ আসবে না কিন্তু।

কি জানি, না এটা তাকে প্রলুব্ধ করারই সুপরিকল্পিত ছল। মেয়েদের মনস্তত্ব বোঝা ভার। এও হতে পারে, রঙ্গমঞ্চের নাটকে সামান্য দর্শকের মর্যাদা দিয়ে তাকে ক্ষুণœ করার কোনো ইচ্ছেই মণির নেই। জীবনের আসল নাটকে মুখ্য চরিত্রের ভূমিকায় যদি তাকে কল্পনা করা হয়ে থাকে, তবে মণির কথাই ঠিক।

এতদিন গড্ডালিকা প্রবাহে কোনো সুখকর কল্পনাই ঠাঁই দিতে পারেনি। ওসব       চিন্তা মনে হয়েছে কোনো খেয়ালি মরীচিকার মতো। আর, মণি আজ তার মনের সুড়ঙ্গে হানা দিয়ে সেই খেই হারানো এলোমেলো একরাজ্যি চিন্তা এনে জড়ো করছে। নানা বাসনার ইঙ্গিতে যে চিন্তার পুষ্পিত সমারোহ শুভ্র, সুরভিত।

কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল মনে নেই। টিপে টিপে এসেছে হাসান। সন্তর্পণে চেয়ারখানা টেনে নিয়ে বসে সিগ্রেট ফুঁকতে শুরু করেছে। তার একটা মৃদু সৌরভ নাকে এসে লাগে। চোখ না খুলেও বুঝতে পারছে স্টোভ জ্বলছে। কেটলিতে পানি ফুটছে। সত্যি সত্যি একটা চায়ের কাপ এসে হাজির।

বারী হাই তুলে বসে। তারপর চায়ের কাপটা হাতে তুলে নেয়। চোখাচোখি হতেই হাসান জিজ্ঞেসা করে, কাঁচা ঘুম ভাঙিনি তো?

না না। দিব্যি একটানা ঘুমিয়েছি!

যেন প্রসঙ্গ পরিবর্তনের জন্যেই বলে হাসান, কাল নাটক দেখতে গিয়েছিলাম।

কেমন দেখলে?

এলোপাথাড়ে ঢিল না ছুড়ে অভিজ্ঞ ব্যাধ যেন অব্যর্থ শিকারের সন্ধান পেয়েছে।

হাসান হেসে বলে, দেখলাম কাল তোমাদের মারুফ সাহেবের মেয়েকে। ভালোই করে তো!

ভালোই করে – কোনো মন্তব্য হলো না অন্তত আর বারীকে খুশি করার মতো কোনো মন্তব্য নয়। সেই ভালো করার সঙ্গে তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, প্রতিটি অভিব্যক্তি, প্রতিটি আবেগ তার উচ্ছ্বাসের মুহুর্মুহু ব্যাখ্যা যদি দিতে পারত, খুশি হতো বারী।

অথবা, তার চোখে কোনো একটি দর্শককে তন্নতন্ন করে খুঁজে পাবার আকুলি-বিকুলি ছিল কিনা, সেটাই কি দেখেছে হাসান। নিশ্চয়ই দেখেনি। থাক একদিন সে কথা নিজেই জিজ্ঞেস করবে মণিকে। হাসান আবার সিগ্রেট ধরায়। কিছুক্ষণ আগেই নিবিয়েছে একটা। বোধহয় উদ্বিগ্ন। বোধহয় উত্তেজিত। কে জানে।

বারী জিজ্ঞেস করে, কী ভাবছ।

কেমন করুণ হাসি হেসে বলে হাসান, কই না তো।

খবর পেলে কিছু?

বারীর উৎকণ্ঠিত প্রশ্নে কেমন আতঙ্কিত হাসান। বলে, কিসের খবর?

আমার চাকরির। তোমাদের নিউজ এডিটরকে দেখিয়েছিলে আমার তরজমা। হাসান কোনো জবাব দেয় না। যেন তার চোখে চোখ রেখে তাকানোর সাহস নেই।

কেমন আস্তে আস্তে আড়ষ্ট স্বরে বলে, আমি চেষ্টার ত্রুটি করিনি। সেই দুর্ঘটনার রোগীর মৃত্যুর আগে হাসপাতালের ডাক্তাররাও ঠিক এ কথাই বলেছিল। এরপর আর কিছু জিজ্ঞেস করা বৃথা।

হাসানই আবার কৈফিয়তের সুরে বলে, নিউজ এডিটরের এক ভাগ্নে, আমি জানতাম না।

নিশ্চল, নিস্তব্ধ। না, না, বাইরের পৃথিবী নয়। সেটা ঠিক আছে! শুধু তার আশা-আকাক্সক্ষা, সাধের যে অযুত বীজ অঙ্কুরোদ্গমের স্বপ্ন দেখছিল তারা অন্ধকারের লজ্জায় নিশ্চল, নিস্তব্ধ।

চায়ের কাপটা নাবিয়ে রাখে বারী।

আরো আরো কিছুদিন। ততদিন রঙ্গমঞ্চের নকল সংসারে কল্পিত বধূর অভিনয় করে যাক মণি। আর জীবনমঞ্চের অশুভ চক্রের আজ্ঞাবহ হয়ে চলুক বারীর পরার্থসেবীর অভিনয়!

আবার সেই জমি রেজিস্ট্রি, টাকার বায়না ও বাজারের ফর্দ তৈরির একঘেয়েমি। বোধহয় আরো আরো কিছুদিন অন্যের জন্যে নিজের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, নিজের রক্ত অন্যের শিরায় ঢেলে মূঢ় বঞ্চনার পুরস্কার পেয়েই তাকে তৃপ্ত থাকতে হবে।

এমনি করে একদিন ক্লান্ত হবে ছকবাঁধা হতাশ নায়ক।

ক্লান্ত হবে রঙ্গমঞ্চের সফল নায়িকা।

তারপর তারা একই মঞ্চে এসে দাঁড়াবে।

ঘরে বসে মনে হচ্ছিল তখনো ঘুটঘুটে অন্ধকার। হাসান অনুযোগের সুরে বলে, মনে হচ্ছে যেন ভোর হতে এক যুগ।

বারী উঠে গিয়ে জানালার কাছে দাঁড়ায়। তারপর কী যেন আবিষ্কারের আনন্দে সে হঠাৎ পুলকিত।

বুক ভরে নিশ্বাস নেয়।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার পেছন পেছন এসে দাঁড়ায় হাসান।

পুব আকাশে রক্তের আভা লেগেছে।

হাসান বলে, আসলে ভোর হতে দেরি নেই। আসলে আমরাই বুঝতে পারিনি। বারী জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিয়ে বলে, এটা ছিল বলেই দেখিনি। তখুনি মিষ্টি শুভ্র স্বচ্ছ একঝলক আলোর প্রতিশ্রুতিতে ঘরটা কেমন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *