ঐ রকম একজন

জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে দেখল কামাল মাটি দেখা যাচ্ছে। একটানা ছ’ঘণ্টা পঁয়ত্রিশ মিনিট চলার পর খানিকক্ষণের মধ্যেই জাম্বো বিমান রানওয়ে স্পর্শ করবে। দেশে ফেরার বাসনা তাহলে সত্যি সফল হলো সাড়ে পাঁচ বছর পর।

যেমন ধাপে ধাপে উচ্চতা কমল, আকাশের গা থেকে তেমনি ক্রমশ ভূপৃষ্ঠের দিকে নেমে আসছে তারা। জানালা ছুঁয়ে যায় খ- মেঘ। খোলা থাকলে যেন সে হাত বাড়িয়ে ধরতে পারত। মেঘের পাহাড় দৃষ্টিপথ আচ্ছন্ন করল। থরথর করে কেঁপে উঠল প্লেন। মুছেও গেল একসময়। মনে হলো ক্রমশ আলো অন্ধকারের খেলায় মাতিয়ে রেখে কে যেন তাদের আশা নিরাশার দ্বন্দ্বে ঠেলে দিচ্ছে ক্রমশ।

আশা নিরাশাই বটে। অন্তত কামালের জন্যে তো অবশ্যই। এতদিন ছিল, বাইরে ছিল। ভুলে ছিল স্মৃতির ছোটখাট ধুলো মুছে নিয়ে। আবার সেগুলো দৃষ্টির সামনে ভাসতে শুরু করেছে। এক একটি ঘটনার অবতারণা যেন নতুন করে। ঘটনা আর ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে চেনা অচেনা মুখের মিছিল। সাদা, কালো, ফর্সা, প্রসন্ন, বিষণœ। এখনও প্লেন মাটি ছোঁয়নি। এখনও পাক খাচ্ছে চক্রবাকের মতো। এখনও মাটিতে আর আকাশে অনেক ব্যবধান। তবু মনের ক্যামেরায় ছায়া পড়তে শুরু করেছে। প্রথমে ঝাপসা তারপর ক্রমশ পরিষ্কার। আবার সেই এক রাজ্যের মুখের ভেতর থেকে দু’একটি ঋজু দৃষ্টি নিয়ে চারিদিকে তাকিয়ে। তাদের দেহ থেকে অন্ধকারের পোশাক যতই নামতে শুরু করেছে ততই মনোরম আলোর ঝলকানিতে তারা উজ্জ্বল।

অতিকায় প্লেনের গহ্বর থেকে চাকা বেরিয়ে এলো। নামতে দেরি নেই। এটাই ছিল নামার শেষ প্রস্তুতি। কিছুক্ষণ আগে এয়ার হোস্টেস ফরম দিয়ে গেছে। ওগুলো ভরতে হবে। পাসপোর্ট, হেলথ কার্ড তৈরি রাখা চাই। কাস্টমসে জবাবদিহি করতে হবে জিনিসপত্রের। কাউন্টারে হিসাব দিতে হবে বৈদেশিক মুদ্রার। এসব নিয়ে তার ভাবনা নেই। শুধু একটা হিসাব নিয়েই দুর্ভাবনা। এই সাড়ে পাঁচটি বছর সে যে বাইরে কাটাল এক নাগাড়ে জীবনের কোনো খাতে লেখা হবে তার হিসাব। কি হবে তার পরিচয় আজ, এখন – এই নতুন পরিবেশে। অথচ তার একটা পরিচয় ছিল। নির্দিষ্ট পরিচয়।

সন্দেহ নেই চাকরি ছিল মামুলি। রূপসা জুট বেলিং কোম্পানির এসিসটেন্ট ডিপো ম্যানেজার। কিন্তু ঐ গদ্য রসকসহীন জীবনের বাইরে সে তখন পাশাপাশি আরেকটি স্বপ্ন খনির সন্ধান পেয়ে বসেছে। এবং সে সঙ্গে আরেকটি জীবন। বাঁচার আরেকটি উপকরণ।

দীর্ঘদিন তার মনের আনাচে-কানাচে সে জড় হতে দেখেছে স্মৃতির জোয়ার থেকে ভেসে আসা নিত্য ঘটনার খড়কুটো। কিন্তু একদিন মনে হলো সে স্মৃতির ভা-ারে যাদের অকৃপণ ঠাঁই দিচ্ছে তারা নিজেরাও নির্লিপ্ততার দেয়াল ভাঙতে বন্ধপরিকর। করজোড়ে তারা বারবার করে মিনতি করেছে, আমাদের এভাবে জেলখানায় আটকে রেখ না। মুক্তি দাও। আমরা মানুষের সুখ দুঃখেই ঘর বাঁধতে চাই।

সেই তার প্রথম উদ্যোগ। কামালের মনে হয়েছে, বিশেষ কিছু তাকে করতে হয়নি। সে শুধু তার মনের ভাঁড়ার থেকে যখন খুশি, যাদের খুশি তুলে নিয়ে এসেছে। তারপর তাদের নির্বাক ভাষার বীজ যত্রতত্র ছড়িয়ে দিয়ে কাহিনীর অগুনতি ফসল ফলিয়েছে। ব্যস এটুকুই। এ থেকেই তার সাধুবাদ। এ থেকেই তার সুখ্যাতি। পত্র-পত্রিকায় হাত যশের কারণে তার বিশেষ সমাদর। বছর খানেকেই সে একটি মোটামুটি আলোচিত নাম। সে যে-কোনো সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিদের সান্ধ্যকালীন চায়ের আসরে আলোচ্য বিষয়বস্তু। কিন্তু রূপসা জুট বেলিং কোম্পানির এসিসটেন্ট ডিপো ম্যানেজার এতদিনে বোঝে তার জীবনের কোনো মহাশূন্যতা তাকে পীড়িত করছিল। আবার সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও, যে সুখ্যাতি আর প্রশংসায় তার পেট ভরছে না। ডিপো ম্যানেজার থেকে আর কোনো কিছুতেই উন্নীত হবার কোনো সম্ভাবনা নেই। অন্তত তার স্ত্রী তাকে সে কথা ভালোভাবেই বোঝাতে পেরেছে। ঠিকই ধরেছে কোহিনুর, লোকটাকে এখনই ফেরাতে হবে। ও এখন রঙিন নেশায় উদ্বুদ্ধ। জনপ্রিয়তার উত্তাল ঢেউ তাকে গ্রাস করলে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

সেজন্যই সে নিজে উদ্যোগী হয়ে তাকে দিয়ে আবেদন করিয়েছে সাত-সতেরো প্রতিষ্ঠানে। লেগে থাকলে কিছু একটা হয়। এবং সেটাই প্রমাণ করল কোহিনুর সত্যি সত্যি তার নিয়োগপত্র হাজির করিয়ে। এবার ফিজিতে কোনো এক সুতো কোম্পানির স্টোরকিপার। দেশ থেকে বিদেশে। পাট থেকে সুতো। ডিপো ম্যানেজার থেকে স্টোরকিপার। সেই থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের সেই ক্ষুদ্র দ্বীপে তার জীবনযাত্রা। সাহিত্যের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি প্রেমের ছাড়াছাড়ি। অন্তত সে রকমই মনে হয়েছে কোহিনুরের। কামাল হায়দারের কিন্তু অতটা মনে হয়নি। কোহিনুর জানে না, তাকে অন্য জগতে এনে বসালেও সবগুলো শেকড় সে কেটে আসতে পারেনি। অন্তত একটা তো নয়ই। যেটা থেকে তার ভাবনা, কল্পনা আর অস্তিত্বের ডালপালাগুলো রস পেতে থাকবে। প্লেন যতই মাটির কাছাকাছি আসছে, কামাল এই শেকড়ের আকর্ষণ অনুভব করছে। এই আকর্ষণ রুবি।

আবার কোহিনুরকে দোষ দেবারও কিছু নেই। কোহিনুর তাকে অবশ্যম্ভাবী দুর্যোগের হাত থেকে ছিনিয়ে এনে নিশ্চিত এবং প্রতিশ্রুত ভবিষ্যতের কোলে ঠাঁই দিয়েছে। প্রথম প্রথম তার নিজেরও মনে হয়েছিল সে পারবে না। তার সনাতন মন বিদ্রোহ করবে। নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে না। নতুন পরিবেশ। অথচ সে নিজেও আশ্চর্য হলো, সে পারতে শুরু করেছে। পিছুটানে হারিয়ে যাচ্ছে না। সে দিব্যি নতুন মাটি আঁকড়ে ধরে বসে।

অবশ্য দোটানা ভাবটা না থাকলে মনে শান্তি পেত। সায়েব সুবোদের বেলায় এসব নেই। তাই তারা জীবনে সফল বরাবর। তাদের পিছুটান নেই। একবার যেখান থেকে নোঙ্গর তুলেছে, বড় একটা ফিরে আসেনি সেখানে। পেছনের মানুষ, মুখ, সংসার সব থেকেছে পেছনে। ভ্রƒক্ষেপও করেনি। নতুন বসতবাটিতে তাদের নতুন স্বপ্নের চারা। নতুন মানুষের আনাগোনা। নতুনের মধ্যে জীবনটাকে বিসর্জন দিয়ে বসে।

ঘুরেফিরে ঐ একটাই চিন্তা – একজন লেখক একজন স্টোরকিপার হয়েছে। একজন স্টোরকিপার কি আর কোনোদিন একজন লেখক হতে পারবে। সেটা আবার যাচাই করে দেখার সুযোগ হবে কখনও। বস্তুতান্ত্রিক জগতে একটা মনের কতই বা মূল্য। এরকম মূল্য চুকিয়ে কত লোকই তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তার মতো।

কোহিনুর খুশি হয়েছে মনে মনে। একটা অপরাধ বোধ তাকে সামান্য পীড়া দেয় যদিও। তবে জীবনের আদ্যোপান্ত হিসেব নিকেশে অনুযোগের কিছু নেই। আগে কামালের সঙ্গে চোখাচোখি করতে ভয় হতো। আজকাল হয় না। বিদেশে সদা ব্যস্ত কৃত্রিম মানুষের ভিড়ে কামালের সঙ্গে চোখাচোখি হলে ভয় করে না। মর্মযাতনা হয় না। সে গান শোনে, ভিসিআর দেখে। দেশে জায়গা জমির বিজ্ঞাপনের দিকে খোঁজ রাখে। তার বিশ্বাস আর পাঁচটি বছর সে যদি জীবনটাকে এরকম চালিয়ে নিতে পারে, মোটামুটি দাঁড়িয়ে যেতে তাদের অসুবিধে হবে না।

অতীতে ভয় তাকে অহরহ ব্যতিব্যস্ত করত। লোকজনের প্রখর নজর থেকে লেখক নামীয় মানুষটিকে বাঁচানোর কোনো উপায় ছিল না। প্রশান্তি, ভক্তি, ভালোবাসা এগুলো একটা একটার গায়ে ভর দিয়ে। আলাদা করা যায় না। মনে মনে স্বীকার করতে পারত না কোহিনুর, সে হেরে যাচ্ছিল। কোনো মেয়েমানুষই পারত না। উত্তর তিরিশের প্রান্তসীমায় থেকে, তার নিজের জোরটাও কমে যেতে বসেছিল। সব লড়াইয়ে সে আগের মতো প্রাণপণ ঝাঁপ দিতে পারে না। একটি আদর্শ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপনে সে আগ্রহী নয়। ফাটল যেটা থাকার, যেটা ধরবার, ধরবেই। তবু আজকালকার উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত কমবয়েসিদের কাছে হেরে যাওয়াটা মেনে নেয়া যায় না।

এখানে এই দ্বীপে বসে বোঝার উপায় নেই সে হারছে, না জিতছে। এক চেতনাহীন চেতনা। উপলব্ধিহীন উপলব্ধি।

সমুদ্রের ধারে তাদের খোলামেলা বাড়ি। কোম্পানি থেকে বরাদ্দ। আগে ডাচ ইঞ্জিনিয়ার থাকত। হঠাৎ এক প্লেন ক্র্যাশে মারা যাবার পর অনেকদিন খালি ছিল। লোকটা কষ্ট করে গাছগাছড়া লাগিয়েছে, জংলী ঝাড়ে অদ্ভুত ধরনের লাল বেগুনি রং-এর অসংখ্য ফুল। বারান্দায় বেতের চেয়ারও সে আমল থেকেই। ঘাস-রং সবুজ পেইন্ট করা। বারান্দা জুড়ে ঝোলানো একসারি টব। সেগুলো থেকে জট পাকানো সুতোর মতো  লতাপাতা থাম বেয়ে বেয়ে একদম ওপরের কড়ি বর্গা ছুঁয়ে ফেলে। বারান্দায় বসলে সে কেমন জংলী উন্মাদনা অনুভব করে।

তাই বিকেলে কারখানা থেকে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে সেই যে বারান্দায় এসে বসে, ওঠার নাম করে না। অনেক সময় রাতের খাবারটাও ওখানে সেরে নেয়। এমনকি বাতিও জ্বালাতে দেয় না। বলে, ঘরের জানালা থেকে যে আলো এসে পড়ে সেটাই যথেষ্ট। এ নিয়ে তর্ক করে না কোহিনুর। তার মনে হয় রাতের এই অন্ধকারের জন্যই যেন কামালের সাগ্রহ প্রতীক্ষা। অন্ধকারে সে আত্মগোপন করতে চায়। দিনের বেলা যেমন তেমন, রাতের চোখ ধাঁধানো আলোয় সে ঘাবড়ে যায়। কেউ যেন হঠাৎ তার ভেতরটা তন্ন তন্ন করে দেখে ফেলছে। সে যেন হাতে-নাতে ধরা পড়ে যাচ্ছে। সন্দেহ নেই প্রাণপণ অস্বীকার করলে কি হবে সে নিজেই টের পাচ্ছে, সে পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে একটু একটু করে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। কাজের সময়টুকু বাদে যতটা খারাপ লাগবে মনে করেছিল, ততটা লাগছে না। অন্তত স্বাচ্ছল্যের একটা মৃদু সমীরণ বইতে শুরু করেছে বুঝতে অসুবিধে হয় না। দেশে থাকতে সুখ্যাতির পাগলা ঘোড়ার পেছনে ধাওয়া করেছে, পুরোপুরি নাগাল পায়নি যদিও। কিছু তার ভক্ত জুটেছে। কিন্তু নিছক স্তুতিবাদ আর প্রশংসায় জীবনের প্রয়োজনের ক্ষুধা মেটেনি।

আসলে দিন যত যেতে থাকে, একটা সংকল্প মনে মনে দানা বাঁধতে থাকে। সে দোটানায় থাকবে না। জীবনে উন্নতি চাইলে পিছুটান চলে না। নাবিক মনকে ধাবিত করতে হয় মধু-দ্বীপের সন্ধানে। বাণিজ্যিক হিসেবে জয় সন্দেহ নেই। তবু তার বৃত্ত থেকে টেনে এনে নবতর পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে কোহিনুরের লাভ লোকসানের হিসেবটা যেন পুরো কাজ করেনি। আসলে সে তাকে একটি মেয়ের কল্যাণ স্পর্শ থেকে ছিনিয়ে এনেছে। আনন্দের আতশবাজি জ্বালিয়ে রূপকথার বংশীবাদকের মতো যে মেয়ে তাকে রামধনু রং জগতে নিয়ে যাচ্ছিল হাত ধরে। কোহিনুরের হয়তো মনে হয়েছে সে বিভ্রান্তির আবর্তে নিমজ্জিত একটি মানুষকে উদ্ধার করেছে। লক্ষ করেছে মিশনারি সিস্টারদের মতো তার দৃষ্টিতে সন্তুষ্টির ঠান্ডা আগুন।

মাঝে মাঝে কোহিনুরের মনে হয় সে রাতে কামালের দীর্ঘশ্বাস শুনতে পায়। তখন  ভয়ে ভয়ে পা টিপে বারান্দায় এসে দেখে কামাল একদিকে হেলান দিয়ে পাতা চেয়ারেই শুয়ে। পীড়াপীড়ি করে না। নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে। একটা আদর্শ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের জন্য কাতর নয়। সেটা কথার কথা। রূপকথা সদৃশ। তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরেছে আগেই। কোথায়, কেমন করে, জানে না যদিও। দেশে থাকতে তারা ধরা পড়ে যাচ্ছিল। হয়ে উঠছিল নিত্যনতুন আলোচনার বিষয়বস্তু। মামুলি নির্বোধ মিথ্যে দিয়ে কোনোমতেই ঠেকানো যাচ্ছিল না। সেজন্য দরকার ছিল নিরাপদ দূরত্ব, কানকথা ভেসে আসার অবকাশ নেই যেখানে।

অন্যকে হলেও নিজেকে ঠকানো যায় না গোঁজামিল দিয়ে। আপাতদৃষ্টিতে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। বিদেশের হৈ-হট্টগোলের পরিবেশে, নকল আর কৃত্রিম মানুষের ভিড়ে মর্মযাতনা হয় না। আসলে সব মানুষই জীবনে বাঁচার একটা রীতি, একটা ভঙ্গি আয়ত্ত করতে চায়। ওটা হয়ে গেলে কোনো পরিতাপ থাকে না। আগে এত প্রচুর অবসর ছিল না। এখন অফুরন্ত সময়।

এমনি করেই সময়ের শেকড় বাহু বিস্তার করে। একজন উত্তাল হওয়ার ফলে তার ভারি নিশ্বাস। তার আক্ষেপ, শেষ লড়াই-এ হেরে যাবার। আক্ষেপ প্রতিপক্ষের আক্রমণের মুখে সাদা পতাকা তুলে ফেলার। আরেকজন ফেলছে দ্রুত লঘু নিশ্বাস প্রতারক সময়ের সঙ্গে প্রাণপণ দৌড়ে। পারছে না, হাঁপিয়ে উঠছে। তবু তাকে আরেকটু যেতে হবে। তারপর জড় করা সঞ্চয়ের হিসেব নিয়ে বুঝতে পারবে কোথাও মাথা গোঁজার মতো এক আশ্রয়ের সংস্থান হবে কিনা। মামুলি আশ্রয়। কদু, শিম গাছ, পুঁইশাক পরিবৃত একটু ঠাঁই। যতদিন না প্রগাঢ় ঘুম তাকে এ পৃথিবী থেকে কেড়ে নিয়ে না যায়, শেতল পাটিতে পড়ে পড়ে ভরাদুপুর ঘুমানোর নিশ্চয়তা।

একদিন বারান্দায় বসে বসে তার মনে হলো আকাশে কৃষ্ণপক্ষের হেয়ালি চাঁদ তার দিকে তেরচা দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে। ঐ দৃষ্টির চারপাশে কু-লী পাকানো মেঘ বিরক্তির ভ্রƒকুটি ছড়ালো। কেমন ভয় পেয়ে গেল কামাল। বুকের ভেতরে একটা পাথর চেপে বসে। তাকে উঠতে দেয় না। একসময় মনে হলো খোলামেলা হাওয়া থাকতেও সে ঘেমে অস্থির। বুকের ঐ চাপা জায়গা জুড়ে তীব্র বেদনার এক গাঢ় রেখা পারদের মতো ঠেলে ওপরে উঠছে। কে যেন মুহূর্তে তার শরীরে সবটুকু শক্তি শুষে নিয়ে তাকে ভয়ঙ্কর কোনো অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বুকের ওপর হাত রাখল কামাল। ভয় পেল। শব্দ করতে গিয়ে গলার স্বর বেরুল না। তারপর সে কানফাটা চিৎকার তুলল বা বলা যায়, আর্তনাদ। গলা কাটা জন্তু-জানোয়ারের মতো। তার চোখের মণি কাঁপছে। কোথায় যেন তার সাহসের সব সুতো ছিঁড়ে গেল নিমেষে। একসময় মনে হলো সে ঢলে পড়বে যে-কোনো সময় অবধারিত পরিণতির দিকে। দ্রুত পায়ের শব্দ হলো যেন। ছুটে এসেছে কোহিনুর। দ্রুত একখানা হাত ওর কপালে, বুকে, শরীরের সর্বত্র বুলিয়ে সান্ত¡না বুলিয়ে দিচ্ছে। ঐ হাতখানাই শক্ত করে ধরল কামাল। তারপর আকুলভাবে জিজ্ঞেস করল, আমি বাঁচব তো।

জানে ভয়ঙ্কর প্রশ্ন।

জানে এসব প্রশ্নের জবাব তার কেন, কারোরই জানা নেই। প্রবোধ দেয়া যায় মাত্র। তাই বলল, ভালো হয়ে যাবে।

ডাক্তার এলো। পরীক্ষা করল। মিশনারি হাসপাতালের বিশেষ কেবিনে স্থানান্তরিত হবার ব্যাপারটা স্বচক্ষে তার দেখা সম্ভব হয়নি। সম্ভবত সেরকম অবস্থা ছিল না। চোখ খুলে দেখল টিউব লাইটের নীলাভ øিগ্ধ আলোয় সাদা চাদরে সে ঢাকা। তার বাঁ হাতের ধমনিতে সুই ফোটানো যেটা থেকে বিন্দু বিন্দু করে স্যালাইন দেয়া হচ্ছে। তার অস্তিত্বই তাকে বলে দিল এ যাত্রা বোধহয় সে বেঁচে গেল। তার বিছানার পাশে অপেক্ষারত ডাক্তারের স্থির দৃষ্টি বলে দিলো, এ বাঁচা সহজ ছিল না। নার্সদের ব্যস্ততা থেকে অনুমান করল তার দেখাশোনার ব্যাপারে সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়নি।

কোহিনুর পুরো সাতদিনই কাটাল হাসপাতালে। তেমন কিছু করার নেই। তবু এ মানুষটাকে সামান্যতম মানসিক দ্বন্দ্বে থাকতে দিতে চায় না। বালিশটা ঘাড়ের ওপর তুলে দেয়া, পায়ের ওপর চাদর টেনে দেয়া বা কখনও মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়ার মতো ছোটখাটো সেবাশুশ্রƒষার জন্যেই তার পড়ে থাকা। হাসপাতালে একলা বসে থেকে অফুরন্ত সময় পেয়েছে ভাবনা-চিন্তার। মনে মনে ঠিক করে ফেলেছে এ মানুষকে নিয়ে সে তার সময়ের বাজি লড়তে পারবে না। ঘুঁটি যে একনম্বর ঘরে ছিল সেই ঘরেই ফিরিয়ে দিতে হবে। ডাক্তার অবশ্য বলেছে ফাড়া কেটে গেছে। নরম্যাল, শুধু কিছুদিনের বিশ্রাম দরকার। তবু। হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে সারাদিন নিজের কামরাতেই পড়ে থাকে কামাল। উঠে গিয়ে বারান্দায় বসার শক্তিটুকুও নেই। ক’দিনের অসুখে তার উদ্যম আর ক্ষমতা দুটোই যেন গায়েব। শরীরের কারণেই তার নির্ভরশীলতা আগের তুলনায় অনেক বেশি। কথায় কথায় কোহিনুরকে ডাকতে হয়। বিকেলে তাকে ধরে নিয়ে লনে বসায়। সেখানেই যা একটু স্বস্তি। কখন এসে কোহিনুর টেবিলের ওপর এক গ্লাস দুধ রেখে যায়। আজকাল তার চা খাওয়া বন্ধ। গ্লাস মুখের কাছে তুলে নিয়ে অল্প অল্প করে চুমুক দেয়। একবারে শেষ হয়ে গেলে  তার কিছু করার থাকবে না সে ভয়ে। ভয় হয় এখন থেকে তার জীবনের সবটাই যেন ঢিমেতালে চলবে। এবং নিজেকে ধীরে ধীরে সে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।

ভোগান্তি কোহিনুরেরও কম হয়নি। নতুন দুর্ভাবনা পেয়ে বসে থাকে। বড় কষ্ট করে লোকটাকে রাজি করিয়ে এনেছিল এতদুর। মামুলি ইচ্ছের জাল ফেলেছিল আগামী স্বপ্নের সরোবরে। অন্তত সামান্য একটু গুছিয়ে নিতে পারলে একটা চলনসই ভদ্রগোছের বাড়ি, মাথা গোঁজার মতো একটা ঠাঁই করে নিতে পারত – দেশে থেকে যার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। মাঝখানে লোকটা এমন করে যদি নোটিশ দিয়ে বসে তবে সাত সমুদ্র তের নদী খেদিয়ে আনার কী দরকার ছিল।

তাছাড়া আরেকটা নতুন আশঙ্কার কথা ভাবিয়ে তুলেছে কোহিনুরকে ইদানীং বড় বেশি। এবার না হয় ফাড়া কাটল। আরেকবার যদি অসুখে পড়ে, কে জানে ভেতরের নড়বড়ে কলকব্জা জবাব দিয়ে বসবে না তো। লোকটা ভালোই ছিল দেশে – এই অলক্ষুণে বৌ-টাই তাকে বিদেশ নিয়ে মারল – এমন অভিযোগ তাদের কাছে থেকেও আসবে যারা ভুলেও একদিন তার কুশল জানতে চিঠি পাঠায়নি। বিপদে সাহায্যের হাত বাড়ায়নি। এরকম অবস্থায় তার ইচ্ছের বাড়ন্ত ডালপালা ছেঁটে ফেলাই ভালো।

সেদিন রাতেই সিদ্ধান্ত নিল কোহিনুর। অটল সিদ্ধান্ত। এখানকার পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলবে। একবারে হয়তো হবে না। হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকবে কিছুদিন। নিজে থেকে নতুন করে উদ্যোগী হয়ে কাজ নেই। ফিরে যেতে চায় যাক কামাল নিজেই। তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত ক্রমশই দুর্বল হচ্ছে, বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যাবে বলে মনে হচ্ছে না। সেজন্যে নিজের ব্যবস্থাটাও পাকা করে নিতে হবে এবার। বেশ বুঝতে পারছে কোহিনুর, তার শারীরিক অসুস্থতার জন্যে কামাল তাকেই দায়ী করছে। এক্ষেত্রে অযথা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে দরকার নেই। সেতাবগঞ্জে নিজের বাপের বাড়ি। হোক অজপাড়াগাঁ – সেখানে একটা সংস্থান করে নিতে হবে। ঢাকায় কামালকে দেখার লোকের অভাব নেই। স্বল্পমেয়াদি আতিথ্যের জন্যে অনেকেরই দরজা খোলা। তাছাড়া, কোহিনুরের ধারণা, ওখানে ওর মনের খবরদারি করার লোক অগুনতি। অল্পবিস্তরও চেনে না, এমন লোক হাতে গোনা যায়। সাহিত্যের পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে ভক্তকুলের হৃদয়ে ঝড়-ঝাপটা তুলতে পারবে সন্দেহ নেই। একদা জনপ্রিয় সাহিত্যিক, কিছুকাল বিদেশবাস এবং বুদ্ধিজীবীসুলভ দুর্বল হৃদয়ের শিকার – সব মিলিয়ে জমবে মন্দ না।

পরদিন সকালেই চূড়ান্ত ব্যবস্থার কথা জানিয়ে দিলো কোহিনুর। কোনো কিছুর জন্যে মাথা ঘামাতে হবে না তাকে। নিজেই ব্যবস্থা করে নিয়েছে টিকেটের ট্র্যাভেল এজেন্টকে বলে। জানাশোনা বলে বিশ পার্সেন্ট কমেই দিয়েছে। দু’দিনেই গোছগাছ করে ফেলল। কোম্পানির সিকিউরিটি অফিসারকে খোশামোদ করে একগাদা জিনিস পাঠিয়ে দিয়েছে স্টোররুমে। আর যা হোক চুরির ভয় নেই। সঙ্গে মাত্র তিনখানা সুটকেস।

মুখে কিছু না বললেও কামালের চাপা সমর্থনের কথা গোপন থাকল না। সে নিজে থেকেই একা পরিবর্তনের প্রত্যাশী। শরীর নামক বস্তুটি তাকে অল্পবিস্তর ভাবিয়ে তুলছে। এ জায়গায় পড়ে থেকে সে বড়জোর ভারি ভারি নিশ্বাস ফেলতে পারে কিন্তু মনের আকুলতার কথা কাউকে জানাতে পারে না। কোহিনুরকে সে দোষ দেয় না। ইচ্ছে করলেও সে সহানুভূতির বন্যা ছুটিয়ে দিতে পারে না। সে শুধু দায়িত্বের ছককাটা সীমারেখায় থেকে সেবাশুশ্রƒষা করতে পারে। মিথ্যে আশার প্রলোভন দেখাতে পারে না। সেজন্য দরকার তার কল্যাণ কামনায় সর্বস্ব নিয়োজিত একটি নিবেদিত প্রাণের। হতাশার উত্তাল সমুদ্রেও নৌকো ভাসিয়ে দিয়ে সে সবুজ দ্বীপের সন্ধান দিতে পারে।

তেমন একজন ভরসার মানুষের কথা তার আজ বড় বেশি মনে এলো। সামান্য দিনের পরিচয়ে যে তার সমস্ত অস্তিত্বটাকে নাড়া দিয়ে গেল। লেখার কারণেও যদি পরিচয় হতো এক কথা ছিল। যদিও পরিচয় লেখার সূত্রেই। রুবি তার ভক্তকুলের কেউ না। সে এক আকস্মিক বিস্ময়ের ঝড়। প্রথম প্রথম লেখাটা ছিল নিছকই শখ। ইস্কুলের মাস্টারির ফাঁকে ফাঁকে কাগজ-কলম নিয়ে বসত কমনরুমে। তাতে           মস্তবড় সুবিধে। সে খাতা দেখছে না লিখছে, কারও পক্ষে আঁচ করা সম্ভব ছিল না।

মনে আছে মাসিক মনিহারে যখন প্রথম লেখা বেরুল উত্তেজনাবশত তিনটে কপি কিনে ফেলল। একটা নিজের জন্য, দ্বিতীয়টা যদি কেউ দেখতে চায়। আরো একটা বাড়তি কপি যতœ করে রাখল ইস্কুলের দেরাজে।

চোখে পড়ার মতো করেই সে বিছানার ওপর ফেলে রাখল তার লেখা সম্বলিত কপি। ভীষণ আহত বোধ করল কোহিনুরের মন্তব্যে। খেতে বসে মামুলিভাবেই ঐ প্রসঙ্গ টেনে এনে বলল, এসব রোগ ধরল কবে থেকে। সস্তা উচ্ছ্বাস।

এরপর সে চেষ্টা আর কখনও করেনি। আসলে কেউ কাউকে ডেকে বলতে পারে না আমাকে দেখো। আমাকে দেখো। আমাকে পাত্তা দাও। প্রশংসায় মুখরিত করো।

হয়তো কোহিনুরের ধারণাই ঠিক। তার এখনও অনেক অনুশীলন দরকার। এখনও অনেক কাঠখড় পোড়ান বাকি। তারপর।

তবু হাল ছাড়ল না কামাল। আরও দু’একটি পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়ে গেল তার লেখা। আশ্চর্যের কথা, মাঝে মাসে তাদের কাছ থেকে লেখা পাঠাবার অনুরোধ আসে।

মাসিক প্রগতির সম্পাদক বাহাউদ্দিন তাকে একদিন একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে বলল, আজকাল আমাদের কেয়ারে চিঠি আসছে আপনার। কি ব্যাপার?

পুলক আর প্রত্যাশায় সে থরথর কাঁপছে। ভালো করে খোলাও হলো না। চিঠির কিছুটা ছিঁড়ে গেল।

গোটা গোটা লেখা। বরিশালের আমলাকান্দি থেকে লিখেছে কেকা রহমান। নিজের নাম সই করেছে বড় বড় হরফে।

এক নিশ্বাসেই পড়ে ফেলল। তার লেখার ভূরি ভূরি প্রশংসা। তবে শেষ পরিচ্ছদে নায়িকার মারা যাওয়া কি একান্ত আবশ্যক ছিল সে সম্পর্কে তাকে একটি ঝাড়া প্রশ্ন।

চোখাচোখি হতেই বাহাউদ্দিন জিজ্ঞেস করে, কি অবলা সম্প্রদায় নাকি?

বাহাউদ্দিন এভাবেই কথা বলে কাব্যিক ঢং-এ। চিঠিখানা বাড়িয়ে দেয় ওর হাতে। বলে, পড়ে দেখুন।

আদ্যোপান্ত পড়ে ফেলে বাহাউদ্দিন। তারপর ওখানা ফিরিয়ে দিয়ে বলে, এত কঠিন প্রশংসা। মেয়েটা আপনার জন্য জান পানি করে ফেলল আর আপনি নির্বিকার। আপনি তো সাহেব রীতিমতো ফেমাস হয়ে গেলেন।

বিশ্বাস করতে ভালো লাগে সে নামজাদা হতে চলেছে। লোকজন তাকে চিনতে শুরু করেছে। অথবা, সমস্ত ব্যাপারটা তার কল্পনাপ্রসূতও হতে পারে। একটা দুটো চিঠিতে কিছু এসে যায় না। কিছু প্রমাণ হয় না। কেকা নামের মেয়ের কথাই ধরা যাক। খেয়ালের ফাঁকে তার ভাবনার সমুদ্র থেকে কিছু অনুভূতি জড় করে উপহার দিয়েছে মাত্র। অথবা হয়তো অত মনে করেও কিছু করেনি।

একবার মনে ভাবল ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি লিখবে। পরমুহূর্তে মনে হলো মেয়েটি ঠিক তার সে দুর্বলতার পরীক্ষা নেবার জন্যই অপেক্ষা করে বসে। এক চিঠির শরাঘাতে কাবু করার বাহাদুরিটা সেক্ষেত্রে সে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলবে : লেখক শর্মাতি দেখছি একদম প্রেমে হাবুডুবু।

আসলে এসব কিছু না। সাময়িক দুর্বলতা। ভক্তি, শ্রদ্ধা ভালো লাগা বলে কিছু নেই। একজন আরেকজনকে খুশি করতে চাইলে, যখন যেটা দরকার ব্যবহার করে।

চিঠিখানা টেবিলে ফেলে রেখেই উঠে দাঁড়ায় কামাল।

বাহাউদ্দিন অবাক হয়, কী হলো চিঠি নিলেন না।

না।

কেন।

আমার কোনো নিজস্ব দেরাজ নেই। বরং আপনিই রাখুন।

বলেন কি একটি দেরাজের অভাবে চিঠি নিচ্ছেন না?

না। আপনার কাছেই থাকুক।

দেরাজ কেন, বাড়িতে নিজের বলতে তার প্রায় কিছুই নেই। মাঝে মাঝে একটি অসহায় দুঃখ তাকে পীড়া দেয়। প্রথম লেখাটি না হয় কোহিনুরকে হতাশ করেছিল। পরেরগুলোয় সে একবার চোখ বুলিয়ে দেখতে পারত। জানাতে পারত তার মন্তব্য, ভালো-মন্দ। ততদিনে বুঝে নিয়েছে কামাল, ঘরে তার জন্যে অপেক্ষা করে বসে নেই। ঘাটতিটা তাকে বাইরে থেকেই পূরণ করতে হবে।

অমন চিঠি আরো এসেছে। সেগুলো বাহাউদ্দিনের কাছেই থাকে। নিজে থেকে খুলে পড়ে না। কামাল দেখতে দিলে দেখে, না দেখতে দিলে দেখে না। চিঠির বক্তব্য সম্পর্কে সবসময় নিশ্চিত হতে পারে না বলেই দেখায় না। অন্য কোনো কারণে নয়। কামাল জানে না সত্যি সত্যি তারা তার কল্যাণাকাক্সক্ষী কিনা। তবু তাদের চিঠির শেষ লাইনে অদ্ভুত সব প্রত্যাশার কথা থাকে। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, কিন্তু করার সাহস পায় না। তবে একটা কথা ঠিক। তারা আনন্দ দেয়। পরস্পর পরস্পরকে জানে না, চেনে না। তবু তাদের প্রত্যাশা আর প্রতিশ্রুতির আশ্বাস তাকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে চলে। কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নয়। মামুলি ইচ্ছে পূরণের সড়কে।

কেউ কোনোদিন যেটা আশা করেনি সেটাই ঘটল। কথা নেই বার্তা নেই, সারওয়ার আতিক এসে উপস্থিত। স্বভাবতই কামাল আতঙ্কিত সবচেয়ে বেশি। সে সারওয়ারের জায়গায় লিভ ভেকেন্সিতে এসেছিল। তবু স্কুলে ম্যানেজমেন্ট বোর্ড আশ্বাস দিয়ে বলেছিল, মনে করুন আপনি থেকেই গেলেন। সারওয়ার পাবলিক স্কুলের চাকরি ছেড়ে আসবে না। আপনি নিশ্চিত থাকুন।

অথচ সেই সারওয়ারই ফিরে এলো।

একজন জিজ্ঞেসই করে বসল, কই আপনি তো বলেছিলেন আর আসবেন না, কি হলো তার।

কাটা কাটা জবাব সারওয়ারের, বলেছিলাম বলেছিলাম। তাতে কি।

আপনার কথার কোনো দাম নেই?

না।

আশ্চর্য লোক আপনি।

হো হো করে হেসে ওঠে সারওয়ার, আমার মর‌্যালিটি বলে কিছু নেই।

শিক্ষকদের মধ্যে যে সর্বকনিষ্ঠ সেই বলে, তা তো দেখতেই পাচ্ছি। তা না হলে কেউ নিরীহ একজনকে পথে বসায়।

লোকটার বোধহয় চক্ষুলজ্জা বলে কিছু নেই। সে সোজা কামালের মুখের ওপর শুনিয়ে দিলো, অমন করে আমার দিকে তাকাবেন না। আমিই পৃথিবীর একমাত্র আদি এবং অকৃত্রিম অপরাধী নই। আরো আছে।

কামাল কিছু বলে না। সোজা কথা, তাকে পাততাড়ি গুটোতে হবে। সারওয়ারের পাকা চাকরি। ইচ্ছে করলেও ম্যানেজমেন্ট বোর্ড কিছু করতে পারে না।

কামাল বুঝল। এককথায় তার পথে দাঁড়ানো ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। একটাই ভরসা লেখার সুবাদে যদি তার কিছু হয়।

সে সোজা ছুটল মাসিক প্রগতির অফিসে। একমাত্র বাহাউদ্দিনই ভরসা। যদি কিছু একটা জোগাড় করে দিতে পারে।

বাহাউদ্দিন শুনল। একটা কিছু করে দিতে পারলে তারও আনন্দ। কিন্তু তেমন কোনো কিছু চোখে পড়ছে না। পত্রিকার অফিসে এমনিতেই সবসময় ছাঁটাইয়ের হুমকি। তার ওপর বাড়তি চাকরি – অসম্ভব।

বাহাউদ্দিন তাকে সান্ত¡না দেয়। বলে, দেখুন একটা কথা বলি কিছু মনে করবেন না। ভালো সাহিত্যিক হলেই ভালো সাংবাদিক হওয়া যায় না। উল্টোটাও সত্য।

ওসব ভূমিকা থাক। কামাল বুঝল কোনো চাকরি নেই। বাহাউদ্দিন চা আনল। কামাল বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখান করে বলল, যাই অন্য কোথাও কপাল ঠুকে দেখি। আপনি তো বোঝেন। চাকরি ছাড়া আমার একটি মাসও চালানো মুশকিল।

হঠাৎ কি মনে হয়ে যায় বাহাউদ্দিনের। বলে, বসুন বসুন। যদি কিছু না মনে করেন আপনাকে একটা এড্রেস দিতে পারি। রূপসা জুট বেলিং কোম্পানি। ওদের একজন লোক দরকার। দেখুন না চেষ্টা করে।

কামাল ইস্ততত করে। বলে, এ লাইনে আমার বিন্দুমাত্র অভিজ্ঞতা নেই।

বাহাউদ্দিন আশ্বস্ত করে দিয়ে বলে, অভিজ্ঞতার দরকার নেই। আপনার সম্মতি আছে কিনা বলুন। এসিসটেন্ট ডিপো ম্যানেজার। স্কুলে পড়িয়ে যা পেতেন তার চেয়ে দু’চারশ বেশিই পাবেন। প্রভিডেন্ট ফান্ড, মেডিক্যাল। তার ওপর বোনাস। অফিসের কাজে গাড়ি ব্যবহার করতে পারবেন। টেলিফোন থাকবে। কি রাজি!

রাজি না হয়ে উপায় নেই। এ মুহূর্তে এ ধরনের অফার পাবার কোনো সম্ভাবনাই নেই তার। প্রায় এক কথাতেই তার চাকরি হয়ে গেল। কি আশ্চর্য চাকরি হওয়া আর খোয়া যাওয়া দুটোই কি সহজ।

নতুন ধরনের কাজ তার। নতুন ধরনের দায়িত্ব। সবসময় তটস্থ থাকতে হয়। বিচিত্র সব পার্টি। বিচিত্র তাদের ধ্যান-ধারণা। টেলিফোন ওর হাতের কাছেই। চানপুর, বরিশাল, মাদারীপুর থেকে অনবরত খোঁজখবর আসছে। সবসময় মাল সরবরাহ করতে পারে না। কেউ আবার চালান নিয়ে খুঁত খুঁত করে। কেউ লেনদেন বন্ধ রাখার হুমকি দেয়। তবু তাদের মোটামুটি খুশি রাখে। মুনিবের যাতে দুটো পয়সা আসে সেটা দেখাই তার কাজ। মোটামুটি সে ঠিক গুছিয়ে নিচ্ছে বলেই ধারণা। খালি একটাই ভয়, তাকে দিয়ে সম্ভবত আর লেখার কাজ হবে না। সে ক্রমশ এক রূঢ়    বাস্তব জগতের সম্মুখীন। যেখানে কবিতা নেই। কাব্য নেই। লাভ-লোকসানের হিসেবটাই একমাত্র মুখ্য।

এরই মধ্যে একদিন টেলিফোন বেজে উঠল।

মামুলিভাবেই নিরাসক্ত কণ্ঠে হ্যালো বলে জবাব দিলো।

অথচ থমকে গেল। না, এ তো তার চিরাচরিত পাট ব্যবসায়ীর আর্জি বা অনুরোধ নয়। অপরিচিত কণ্ঠস্বর। কোনো মহিলার গলার আওয়াজ। তার বয়েস, চেহারা এসব কিছু আঁচ না করতে পারলেও কেমন মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ে।

সে কিছু বলার আগেই মেয়েটি জিজ্ঞেস করে আপনার নম্বর?

অবাক হয় কামাল। বলে, আমার নম্বর মানে, আপনি তো নিজেই ডায়াল করলেন।

মেয়েটি জবাব দেয়, আমি তো না জেনেই নম্বর ঘোরালাম। জানি না কোথায় গিয়ে ঠেকল। ভারি মজা তো।

ততক্ষণে তার খদ্দেররা এসে উপস্থিত। তাদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে কামাল বোঝে এখনই ক্ষান্ত দিতে হবে। অথচ মনে মনে ভীষণ কৌতূহলের ঝড়। না পেরে সে প্রায় অনুনয়ের সুরে বলল, বড্ড ঝামেলায় আছি। কাল একবার টেলিফোন করুন।

নির্লিপ্ত কণ্ঠস্বর ওদিকের, কত নম্বর?

কামাল নম্বর দিলো। ছেড়ে দেবার আগে আকুলভাবে বলল, করবেন কিন্তু। অপেক্ষায় থাকব।

তার উৎকণ্ঠা লক্ষ করে লোকজন অবাক। বলে, কোনো খারাপ খবর না তো?

কামাল হেসে বলে, না না ওরকম কিছু না।

পরদিন সে অধীর প্রতীক্ষায় থাকে। প্রতিবার ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই তুলেছে গভীর আগ্রহে। কোনোটা রং নম্বর। কোনোটা মামুলি ব্যবসা সংক্রান্ত। সকাল থেকে গোটা দুপুর অপেক্ষা করে থাকল। প্রত্যাশিত টেলিফোন এলো না।

সাড়ে বারোটা নাগাদ সে অফিস বন্ধ করে বেরুতে যাবে এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠে। রুবির ফোন।

সে কেন সকাল থেকে বসিয়ে রাখল, কেন এত দেরি করে করল – এক রাজ্যের কথা জিজ্ঞেস করবে মনে করেও কোনোটাই পারল না। ভীরু সন্দেহটাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে বলল, জানতাম তুমি করবে।

সেই প্রথম। তারপর সেই তাকে তার নিত্যনৈমিত্তিক কর্মসূচির অন্তর্গত ঐ কণ্ঠস্বর। সাগ্রহ প্রতীক্ষা একবার না একবার রুবি ডাকে ঠিকই। যেদিন দেরি হয়, অকারণেই ছটফট করে কামাল।

তার অসহিষ্ণুতাকে পাত্তা দেয় না রুবি। বরং সোজা শুনিয়ে দেয়, টেলিফোনের জন্যে বসে থাকবে এটা আবার কি ধরনের ছেলেমানুষী। সবারই সুবিধে অসুবিধে থাকে।

কামাল বলে, তা মানি। তবু তোমার কথা আলাদা।

আমার কথা আলাদা হলো কিসে?

আমার সঙ্গে তোমার যোগাযোগ নিছকই নিয়তির ব্যাপার বলতে পারো। তুমি নিজেই বললে তুমি নম্বর জানতে না। এমনি ঘোরাতে ঘোরাতে পেয়ে গেলে।

তা ঠিক। তাহলে কি বলব তুমি আমার নিয়তি।

হো হো করে হেসে ফেলে রুবি। বোঝা যায় না এটা নিছকই রসিকতা কিনা।

তারপর একটু থেমে নিয়ে বলে, মিস্টার নিয়তি আপনার লেখা পড়লাম।

কামাল খুশি হয়। নিজেই বলতে যাচ্ছিল। ভাগ্যিস বলেনি। মনে মনেই তর্ক জুড়ে দেয়। মোটেই উপহাসের পাত্র নয় সে রুবির কাছে। সে তার আপনজন। শুভাকাক্সক্ষী। তা না হলে অত খোঁজখবর রাখতে যাবে কেন।

কামাল জিজ্ঞেস করে বসে, কেমন লাগল?

কী?

ঐ লেখাটা।

সো সো।

রাগ করার কিছু নেই। মেয়েটা বাড়িয়ে বলেনি মন খুশি করার জন্য। যা মনে হয়েছে, তাই বলেছে। বরং তার সৎ সাহসের প্রশংসা করা দরকার উল্টো।

ভারি নিশ্বাসের শব্দ শুনে জিজ্ঞেস করে রুবি, কি হলো ফোঁস ফোঁস করছো কেন।

অনেক দুঃখ তাই।

কী রকম দুঃখ?

এই এতদিন হয়ে গেল তোমার সঙ্গে দেখা হলো না।

সাহিত্যিক মানুষ – কল্পনার চোখে দেখো।

তা তো অহরহই দেখি।

কী রকম দেখ – লম্বা না বেটে, ফর্সা না কালো, ছিপছিপে না মোটা?

কল্পনার চোখে সবকিছুই ঝাপসা, অত স্পষ্ট দেখা যায় না। তাহলে এখন ঝাপসা ঝাপসাই থাক। তাড়াহুড়োর কি। আচ্ছা ছাড়ি। বলেই টেলিফোন বন্ধ করে দেয়। ক’দিন রুবির কোনো সাড়াশব্দ নেই।

সেদিন তার অফিসের সামনে এসে দাঁড়াল ঝকঝকে একখানা গাড়ি। অবাক হবারই কথা। সাধারণত এসব বাণিজ্যিক এলাকায় বিলাসবহুল গাড়ি নিয়ে কেউ আসে না। আর এলেও তার কাছে তো নয়ই। গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো শাহাদাৎ হোসেন। কৃতী লেখক এবং বড়লোক। বিদেশী ফার্মে চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। পত্রিকা অফিসেই দেখা হয়েছিল। তারপর ওরা ঘনিষ্ঠ।

কামাল হাত বাড়িয়ে দেয়। বলে, কি আশ্চর্য তোমাকে এখানে দেখব কল্পনাও করিনি।

প্যাকেট বার করে সিগ্রেট ধরায় শাহাদাৎ। বেশ মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ। তার মুখের ধোঁয়া টুকরো টুকরো হয়ে বাতাসে মিশে যায়।

প্যাকেটখানা পকেটস্থ করার আগে কি মনে হয় শাহাদাৎ-এর।

খাও নাকি?

না ছেড়ে দিয়েছি। পোষাতে পারি না।

মুরুব্বিয়ানা চালেই বলে শাহাদাৎ, ভালো করেছ। বদভ্যেস, ছাড়তে পারছি না কোনোমতে।

তারপর প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলে, তুমি যে শেষ পর্যন্ত পাট কোম্পানিতে এসে ঠেকবে আশা করিনি। আমি ওদিকে তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান।

পকেটে একগাদা কার্ড। তার থেকে একখানা বার করে ওর দিকে বাড়িয়ে দেয়, কাল আমাদের ওয়েডিং অ্যানিভারসারি। না এলে চলবে না কিন্তু।

তখনই টেলিফোনে বেজে ওঠে। শাহাদাৎ উঠতে যাচ্ছিল। হাতের ইশারায় ওকে বসতে বলে। তারপর মাউথপিসের ওপর হাত চেপে ধরে বলে, আমার একজন ফ্যান। এসময় টেলিফোন করে।

ভেরি ইন্টারেস্টিং।

সিগারেটের জমজমাট ছাই ছেড়ে ফেলে শাহাদাৎ।

ওদিকে রুবি কথা বলতে শুরু করেছে, মনে হচ্ছে দিব্যি জমিয়ে আছে।

শাহাদাৎ-এর দিকে আর চোখে তাকিয়ে একরকম শুনিয়ে শুনিয়েই বলে, ভালো হলো তুমি টেলিফোন করলে।

কেন?

আমার সামনে বিখ্যাত লেখক শাহাদাৎ হোসেন।

রীতিমতো পুলকিত রুবি, তাই নাকি? আলাপ করবো?

করো।

কামাল টেলিফোনখানা ওর দিকে বাড়িয়ে দেয়।

ফিসফিসে গলায় জানতে চায়, কে।

আহা কথা বলেই দেখো না।

প্রারম্ভিক জড়তা কেটে গেল কিছুক্ষণেই। এ প্রসঙ্গ সে প্রসঙ্গের পর মনে হলো দু’পক্ষই যেন অন্তরঙ্গ। একসময় চমকে ওঠে শাহাদাৎ-এর প্রস্তাব শুনে, তাহলে আর দেরি কেন। চলে আসুন চাং-ওয়াতে। ধরুন দেড়টায়। হ্যাঁ হ্যাঁ কামালকেও নিয়ে আসব – অবশ্যি যদি সে অন্য কোথাও ফেঁসে না যায়।

টেলিফোন রেখে দিয়ে শাহাদাৎ পীড়াপীড়ি করল, চলো। বেরিয়ে পড়ি। 

গেল না। মনে মনে আহত কামাল। এতদিন হয়ে গেল আজকাল করে করে পুরো দু’মাস বারোদিন রুবির দেখা হয়নি। তেমন গরজ দেখিয়ে বলেওনি কোনোদিন। কথাটা উঠলেই বলেছে, হবে, হবে। দেখা হবে না কেন। আমি তো পালিয়ে যাচ্ছি না। অথচ সেই রুবি মাত্র পাঁচ মিনিটের আলাপে সম্পূর্ণ একজন অপরিচিতের সঙ্গে যেতে রাজি হলো। নিজের কাছেই তার অপরাধ বোধ। ব্যাপারটার জন্যে সে নিজেই দায়ী।

সেদিন বিকেলে ফিরল না। সন্ধের পরও থেকে গেল অফিসে। কি করে অনুমান করেছিল কে জানে। টেলিফোন এলো। মনে হলো খুশিতে গদগদ রুবি। হ্যাঁ, ওরা গিয়েছিল। চমৎকার ভদ্রলোক। মেলা মজা করল।

রুবির ভাষায়, আমরা ফিরলাম এক সঙ্গে রিকশায়।

পাশাপাশি বসেছিল। ভদ্রলোক খুব ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করেছিল।

আপত্তি করেনি রুবি – না আপত্তির কি আছে। মামুলি শখ। কি আর হয়েছে। আকাশ ভেঙে পড়েনি।

সমস্ত প্রেক্ষাপট বদলে গেল যেন। যে নিয়তি তাকে অযাচিতভাবে কাছে এনে দিলো, সেই তাকে ছিনিয়ে নিতে চাইছে না তো। পরদিন কেমন মরিয়া হয়েই বলল কামাল, কি ব্যাপার, তোমার সঙ্গে কি হবে না?

রুবি শান্ত। কোনো উত্তেজনা নেই। মামুলি জবাব, হবে আর কি।

দু’মাস তেরোদিন হয়ে গেল।

রুবি হেসে বলে, তাতে কি। এর মধ্যে দু’দুবার বনভোজনে গিয়েছে। ক্লাসের ছেলেরা বেছে বেছে ওকেও বৌ সাজিয়ে হৈ হৈ করেছে। একজন আবার চিবুক তুলে ধরে আদর করেছে।

কামাল নিজেকে স্থির রাখতে পারে না। চিৎকার করে ওঠে যে যা খুশি করে তোমাকে নিয়ে।

গ্রেনেডের মতো ফেটে পড়ে রুবি। কামাল নিজেও ভয় পেয়ে যায় ওর হুঙ্কার শুনে, ডোন্ট এভার সে দ্যাট। আমি সবকিছু সহ্য করতে পারি। নট এ ওয়ার্ড ফ্রম ইউ। অ্যান্ড ডোন্ট পুট আপ এ লং কেস। তোমাকে মানায় না।

কামাল সহজ হতে চেষ্টা করে, কিন্তু তুমি তো আমাকে দেখোনি।

তাতে কিছু  এসে যায় না। তুমি ষোলো সত্তোরো হও, কিচ্ছু এসে যায় না।

অথচ একদিন তড়িঘড়ি করে টেলিফোন করল রুবি, সাড়ে বারোটার দিকে থাকব। কাফে ডিলাইটে। দেরি করো না, সাড়ে বারো কিন্তু।

বলেই টেলিফোন ছেড়ে দেয়।

আচ্ছা মেয়ে বলা নেই কওয়া নেই মাত্র একঘণ্টার নোটিশ। কেউ কাউকে দেখেনি, চিনবেই বা কেমন করে। সব যেন কেমন গোলমাল হয়ে গেল।

তবু তার মন চাঙ্গা। উত্তরের হাওয়া বইছে। এতদিন যার সঙ্গে কথা বলা তার সঙ্গে আজ, কিছুক্ষণ পরই দেখা। নিজেকে নিয়ে প্রচুর দুর্ভাবনা। তাকে দেখে হতাশ হবার পুরো সম্ভাবনা। মুখে যাই বলুক, মনে মনে নিশ্চয়ই একটা রূপরেখা আঁকা আছে। তার সঙ্গে গরমিল দেখলে কে না হতাশ হয়।

মিনিট পনেরো হলো সে রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়িয়ে। তাকে ভাবনা-চিন্তার সময় না দিয়েই একটি ভরাট চেহারার মেয়ে হাত একগাদা বই নিয়ে নামল। পরনে হালকা সাদা শাড়ি, মিহি কাজ তাতে। বাঁ হাতে চেপে বসা এক গোছা হলুদ কাচের চুড়ি। ঘাড়ের ওপর একরাশ চুল। গোলগাল মুখ। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। একমুখ হাসি নিয়ে সোজা তার সামনে এসে বলল, আশা করি দেরি হয়ে যায়নি।

ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল কামাল, অতখানি সিওর হলে কী করে। অন্য কেউও তো হতে পারতাম।

ভুল হবে কেন, এটা যার যার অনুভূতির প্রশ্ন।

খুব তেমন একটা লোকের ভিড় নেই। তবু একধারে গিয়েই বসল মুখোমখি।

কামাল বলল, উঃ এতদিন পর।

রুবি জানতে চায়, এতদিন পর কি?

দেখা হলো।

ঠোঁট উল্টে বলে রুবি, তাতে কি হয়েছে। আমি তো আর ফুরিয়ে যাচ্ছিলাম না। তুমিও পালিয়ে যাচ্ছিলে না।

রুবি তার হাত-ব্যাগে মনোযোগ দেয়। ভেতর থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট বার করে বলে, ধরাই?

ধরাও। কিন্তু তার আগে বলো, কেমন?

কি কেমন?

নিরাশ হওনি তো?

নিরাশ হবো কেন। আই লাইক ইউ। বাট –

কি?

তোমার স্বাস্থ্য আরো ভালো হবে আশা করেছিলাম।

চেহারা?

কিছু এসে যায় না।

কামাল আশ্বস্ত হয়। তারপর একসময় বলে, আমি কিন্তু বুঝতে পারতাম।

কি?

তোমার যদি ভালো না লাগত আমাকে। চোখেমুখে এক ধরনের পলাতক অসহিষ্ণুতা আছে যা গোপন করা সম্ভব নয়। সুতরাং –

ততক্ষণে কফি এসে যায়।

রুবি তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয়। বলে, অত কথার দরকার নেই।

কফি খাও।

এক ফাঁকে ঘড়ি দেখে রুবি। বলে, বেশিক্ষণ কিন্তু বসতে পারব না। ইউনিভার্সিটি আছে।

কামাল অবাক হয়। বলে, আসল কথাই জিজ্ঞেস করা হয়নি। কী পড়ো।

ওর কৌতূহলে ঠান্ডা পানি ঢেলে দেয় রুবি, অত জেরা কেন। কিছু একটা পড়লেই হলো।

তবু।

ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স। থার্ড ইয়ার অনার্স। হলো তো?

কামালের চোখে কৌতুকের হাসি।

ভালো সাবজেক্ট নিয়েছ। রিলেশন্স তৈরি করতে তোমার জুড়ি নেই। বোধহয় সামান্য আহত হয় রুবি, গায়ে পড়ে আলাপ করেছি বলে?

না না। সে কথা নয়। কি করবে, পলিটিক্স?

পাগল, ওসবের ধারে কাছেও না। ভাবছি জার্নালিজম।

কামাল যেন ইতিমধ্যেই তার যোগ্যতা আন্দাজ করে রেখেছে। যে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েই বলে, আমার বিশ্বাস পারবে। তোমার অবজারভেশন ভালো।

কি করে বুঝলে?

আমার ধারণা।

রুবি প্রসন্ন হয়। বলে, তোমার ধারণা মিথ্যে নয়।

আর তখুনি যেন তাকে মহাধাঁধায় ফেলে দেয় কামাল। বলে, পারবে ডেসক্রাইব করতে আমাকে এক কথায়।

ওর দিকে ঘন হয়ে তাকায় রুবি। বলে, এক কথায় পারব না। তিন কথায় চেষ্টা করতে পারি : অবস্টিনেট, অনেস্ট, আর্নেস্ট।

আর তুমি নিজে?

কিছুক্ষণ যেন ভাবনায় পড়ে। তারপর গড় গড় করে বলে যায়, ডাইহার্ড, ডিফিকাল্ট, ডেডিকেটেড্।

দু’জন হো হো করে হেসে ওঠে।

কথাটা কম করে হলেও হাজারবার বলেছে কামাল, আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতালে, ভেবে দেখলে না আমার তোমার বয়েসের তফাৎ কত।

রুবি সে কথা গায়ে মাখে না। বলে, দেখব না কেন। কিন্তু আমার ওসবে কি দরকার। আমি কি তোমাকে বিয়ে করতে যাচ্ছি।

না, তা যাচ্ছ না তবু –

তবু কি? কোনো গোপন ইচ্ছে থাকলে বলে ফেল। মনে মনে পুষে কষ্ট পেও না।

কামাল বলে, আমি তো তাকালেই মজে যাই। একরকম নেশা ধরে।

তাহালে তাকিও না।

কি মনে হওয়ায় বুকের আঁচল টেনে দেয়।

কামালের দৃষ্টি এড়ায় না। ফোঁড়ন কাটে, আমি ওরকম কোনো কিছুর কথা ভাবিনি।

দৃষ্টি দৃষ্টিই। দৃষ্টি চিরকালই উলঙ্গ। তুমি আমাকে দেখবে দেখো, ওসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। কিইবা করবে। জড়িয়ে ধরে চুমু খাবে। কাম অন – ওসব আজকাল ডাল-ভাত।

কখনও খেয়েছ নাকি?

তৈরি জবাব রুবির, আমার শুলেও কিছু হয় না।

দেখেছ?

হয়তো।

কার সঙ্গে? আবার জেরা করে কামাল।

যার সঙ্গেই হোক। আমি একটা কথা ভাবছি তখন থেকে। দেখো সম্পর্ক হবে খোলামেলা। ঝামেলাপূর্ণ করো না। অবশ্যি তোমরা তো সবসময় তাই চাও, চাও না? আমি তো জেনেশুনে তোমার সঙ্গে সখ্য করলাম।

কামাল শুধোয়, আমার জন্য কী করতে পার?

অ্যাজ সাচ্ কিছু না। আবার অনেক কিছু। প্রাণ টান দিতে পারব না। বাট আই কেয়ার ফর ইউ।

কামাল ওকে ক্ষ্যাপায়, আচ্ছা কথায় কথায় তোমার ইংরিজি ছোটে কেন।

এসে যায় কি করব। ছোটবেলায় কনভেন্টে পড়েছি। ভালো করে এক্সপ্রেস করতে পারি না।

রুবির কথাতেই ওরা হাঁটতে বেরুল সেদিন। একসময় ওর হাতখানা টেনে নেয় রুবি। বলে, কোনো তুমি আমাকে বগলদাবা করে ফাইভ স্টার হোটেলের লাউঞ্জ দিয়ে গ্যাট গ্যাট করে হেঁটে যেতে পারবে?

বগলদাবা করব, অবাক হয় কামাল। তুমি কি বগলদাবা করার মতো জিনিস?

আহ হা হলো। মানে আইডিয়াটা হচ্ছে সবার সামনে আমাকে নিয়ে হেঁটে বেড়াতে পারবে?

তাতে লাভ?

তোমার বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজনরা চোখ টাটিয়ে দেখবে।

তা না হয় দেখল। যদি জিজ্ঞেস করে বসে – কী বলব।

বলবে – রুবি নামের এক মেয়ে। অথবা শুধু আমার বান্ধবী। পারবে না?

ভেবে দেখিনি। পারব নিশ্চয়ই, পারব না কেন।

হাতি পারবে। আমার খুব ইচ্ছে তুমি আমাকে ওরকম করে নিয়ে বেড়াও। এই দেখো, তুমি লেখক মানুষ। তোমার অজস্র ভক্ত থাকতে পারে। আমি সেরকম একজন। সামনা সামনি কথা বলি। হাঁটি, চলাফেরা করি। আমি তোমার হোটেলের গোপন কামরার সঙ্গিনী নই। ভয় করবে কেন?

করে অন্য কারণে।

কী কারণে?

দেখো রুবি। একটা কথা কেন বোঝ না। আমার সঙ্গে তোমার পরিচয় বিশ-পঁচিশ বছর আগে হয়নি। হয়েছে অনেক অনেক পরে। আগে হলে একরকম হতে পারত। এখন হয়েছে বলে অন্যরকম। আমার কোনো অপরাধবোধ নেই। ভালোবাসার কথা বলেও, একজনের আরেকজনকে ভালো নাও লাগতে পারে চিরকাল। আবার একজনকে ঠাঁই দিয়েও সে অন্যজনকে মনে ধরাতে পারে।

রুবি হেসে ফেলে। বলে, অত লেকচার দিচ্ছ কেন। বেশি আবদার করো না। আমি তোমাকে লিফট দেবো না।

দিও না।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ল রুবি। বলল, এক প্যাকেট সিগ্রেট কেন।

আমি তো আজকাল পাইপ খাই।

খাও তাতে কি। তবু কেন।

তারপর?

তারপর আবার কি। একটা ধরাবে।

কামাল জানতে চায়, তুমি তো খাবে না?

ধেৎ। আমি রাস্তায় খাই না।

তাহলে লাভ?

আমার ভালো লাগে। সিগ্রেট খাওয়া একটা লোক আমাকে নিয়ে হাঁটবে, বড় শখ।

কামাল বলে, সেরকম শখ পূরণের দিন তো ফুরিয়ে যায়নি।

রুবি ঠোঁট উল্টে জানায়, আমি বিয়েই করব না।

পাশেই সিগ্রেটের দোকান। কামাল কিনতে গেল এক শলা। রুবি বাধা দেয়। বলে, অত কিপ্টে হয়ো না। পুরো প্যাকেট কেন।

কামাল অবাক হয়, খাব একটা। তাও তুমি ধরাবে না।

আমি আলবৎ ধরাব না। আর তোমার ভাঙ্গা প্যাকেট থেকে নেবও না।

ইচ্ছে হয় আরেকটা কেন আমার জন্যে আলাদা করে।

অ্যাজ ইউ উইশ।

দুটো প্যাকেটই নিল কামাল।

রুবি দাঁড়িয়ে গেল। বলল, পা ব্যথা করছে। অত দূর হাঁটতে পারব না। ব্যস্ত রাস্তা। ইচ্ছে করলেই ট্যাক্সি পাওয়া যায় না, সে কথা বুঝবে না। যদিও হাঁটার প্রস্তাবটা সে নিজে থেকেই দিয়েছিল।

কামাল বলল, বরং একটা রিকশা নি।

পাগল নাকি। তোমার সঙ্গে ঠাঁসাঠাঁসি করে হুড তুলে যাব নাকি!

কি অন্যায় তাতে?

অন্যায়-টন্যায় কিছু না। এমনিতে এসব চিপ জিনিস আমার ভালো লাগে না।

তাহলে তো আর কিছু করার দেখছি না।

আমি তো দেখছি – কেমন রসিয়ে রসিয়ে বলে রুবি।

কি?

রেস্তোরাঁয় চলো। চা খাওয়া যাক।

সেখানেও একই প্রশ্ন। ঠাঁসাঠাঁসি করে এক দিকে বা মুখোমুখি হয়ে বসা।

তা হোক। আপাতত জিরোন যাক। ফার্স্ট থিং ফার্স্ট।

চারদিক চেয়ে নিয়ে কামাল বলে, এদিকে তো কোনো রেস্তোরাঁ নেই। রাস্তা পার হয়ে যেতে হবে।

চলো।

ওরা বড় রাস্তার মাঝামাঝি। উল্টো দিক থেকে ঘুরে এসে একটা গাড়ি প্রায় ওদের ওপর চড়াও। রুবি ওকে জড়িয়ে ধরল।

কামাল চটে যায়। বলে, কি করছ মাঝ রাস্তায়?

কি আর করছি। একটু হাত ধরে ফেলেছিলাম। এতে কি খারাপ দেখলে।

এ ধরনের কথার কোনো জবাব হয় না। সত্যিই তো তাতে খারাপের কিছু নেই। মানে, রুবির চোখে যেটা ভালো, সেটা ভালো। যেটা খারাপ, সেটা খারাপ।

বোধহয় এই শহরটা ক্রমশ নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছে। মাঠে-ময়দানে-পার্কে কোথাও সিকি পরিমাণ জায়গা নেই জিরোবার। একান্ত হবার। সব জায়গায় ভিড়। সব জায়গায় গিজ গিজ করছে মানুষ।

সামনে যেটা পড়ল সে রেস্তোরাঁতেই গেল। ভেতরে তিলধারণের জায়গা নেই। সবগুলো টেবিল ভর্তি। কোথাও আবার দু’একটি বাড়তি চেয়ার।

বেয়ারা এসে ওদের ওপরে সিঁড়ি দেখায়। ফ্যামিলি রুম।

রুবি দাঁড়িয়ে যায়, যাবো?

যাবে না কেন!

ফ্যামিলি রুম মানে তো রোমিও জুলিয়েটদের জন্যে।

যা খুশি পরে ভেবো। হয়তো দেরি করলে ওখানেও জায়গা পাবে না।

আহা চলো চলো। অত অধীর হচ্ছো কেন।

অধীর নয়, কোথাও বসতে তো হবে।

সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতেই নিচের দিকে দৃষ্টি ছুড়ে বলে রুবি দেখেছ?

কী?

ওই যে ব্লু শার্ট পরা ছেলেটা। ঠ্যাং লম্বা করে বসে সিগ্রেট ফুঁকছে।

তাতে তোমার কি?

রুবি অবাক করে দেয়। বলে, বড় হ্যান্ডসাম।

হ্যান্ডসাম হলে যাও আলাপ করো গিয়ে।

আবার নিজে থেকেই চটে যায়, আলাপ করতে যাবো কেন। তবে যেচে আলাপ করলে আমার আপত্তি নেই।

কামালের রাগ হয়। বলে, তোমার সেন্স প্রপোরশন নেই।

সেন্স অব প্রপোরশনের আবার কি দেখলে এতে। আমাকে ঐ রকম একটা ছেলে ভালোবাসত।

ওটা কত নম্বর ছিল?

জানি না। পঞ্চাশ-ষাট তো হবেই।

তুমি কি একটার পর একটা এফেয়ার করে যাও নাকি।

এফেয়ার, এফেয়ার মানে কি। টেবিল চাপড়ে নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে রুবি।

হতবাক হয়ে যায় কামাল। বলে, আমি ওরকম মনে করে বলিনি।

ওরকম বলো না এরপর। আমি মাইন্ড করি। ভালোলাগা এক জিনিস। ভালোবাসা আরেক জিনিস। আর কোনো কিছু না লাগা একেবারেই অন্য জিনিস।

আমাকে তোমার কেমন লাগে?

আই ডোন্ট নো। বাট আই ক্যান টেল ইউ – ভালোবাসার অমন প্রিন্স চার্মিং আমার জীবনে আসেনি। কখনও আসবেও না। স্যরি, একবার এসেছিল।

আগ্রহের সঙ্গে ঝুঁকে নিয়ে জিজ্ঞেস করে কামাল, কখন?

এক মুহূর্ত কী যেন ভাবে রুবি। তারপর মাথা হেলিয়ে বলে, লিভ ইট। ওসব শুনে কি করবে।

মনে মনে কোথায় যেন আহত হয় কামাল। রুবি সেটা লক্ষ করে বলে, আমি জানতাম, তুমি সহ্য করতে পারবে না। আমি সংসার করি, সুখী হই, ঘর করি – চাও না?

কেন চাইব না।

প্রতিবাদ করে রুবি, চাও না। আলবৎ চাও না। তোমার চোখমুখ বলছে, চাও না। সেলফিশ!

কেমন যেন সব গোল পাকিয়ে দিচ্ছে রুবি।

জট পাকিয়ে দিচ্ছে সত্য কথার তোড়ে। কথা ঠিক। রুবির পাশাপাশি সে আর কাউকে দাঁড় করাতে পারে না। ভাবতে পারে না। অথচ তারও তো জীবনে পূর্ণতা চাই। শান্তি চাই। সুন্দর পরিবেশ চাই।

হঠাৎ পায়ে কার জুতোর খোঁচা খায়। রুবি ধমকে ওঠে, ওরকম আবার মুখ করে থাকার মানে কি। আই অ্যাম ডন্ট ম্যারিং, হলো তো।

বিয়ে করবে না কেন। আমি তো সেরকম কিছু বলিনি।

কাম অন। ডোন্ট হাইড এনিথিং। আমি বুঝি। বাট দেন হি ইজ ডেড।

কে ডেড?

সেই ছেলেটি।

কোন ছেলেটি?

যাকে আমার ভালো লাগত।

তুমি তো বলোনি।

বলিনি – সব জিনিস বলার মতো নয়।

কি করত। দেখেছি তাকে, জানতে চায় কামাল।

না। কি জানি আমার বয়েসেরই বা সামান্য ছোটও হতে পারে।

কী হয়েছিল?

জানি না।

তাহলে ডেড বলছ কেন?

একটা মানুষ যে আজ চোদ্দ মাস ধরে মিসিং, কি বলব তাকে।

রুবির মুখেই শুনল। মুরাদ ছেলেটির নাম। হেলিকপ্টারের পাইলট ছিল। সেবার সাইক্লোনে রিলিফ টিম নিয়ে গিয়েছিল হাতিয়ায়। একজনও ফিরে আসেনি। হঠাৎ ঝড়ের মুখে পড়ে ওরা। টাওয়ারের সঙ্গে একবার কনট্যাক্ট হয়েছিল। উই আর ইন ট্রাবল। ক্যান্ট ল্যান্ড। ভিজিবিলিটি নিল। তারপর আর যোগাযোগ হয়নি। কথা ছিল ফিরে এসে মুরাদ টেলিফোন করবে। ওরা চাইনিজ খাবে।

কামাল শুনে বলল, থাকতেও তো পারে বেঁচে।

রুবি চটে যায়, আমাকে রূপকথার গল্প শুনিও না।

বলতে বলতে কেমন ওর গলা ধরে আসে।

জানো কামাল, ও আমাকে মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত।

তারপর আবার স্বর নিচু করে বলে, আমিও। আমিও ভালোবাসতাম। ঐ একটাই এফেয়ার আমার হয়েছিল।

কামাল চুপ করে থাকে।

বেয়ারা কফি দিয়ে যায়। কামাল ঢালতে যায়। রুবি বাধা দেয়। নিজে থেকেই কেটলি টেনে নিয়ে বলে, আমি ঢালব।

কামাল ভাবে, তাহলে এই সমীকরণে তার অবস্থান কোথায়। সে শীর্ষে নয়। কেন্দ্রেও নয়। তাহলে কোথায়। স্বতঃস্ফূর্ত এই খোলামেলা মন মেয়েটির কাছে এই দুরূহ অঙ্কের হিসাব নিয়ে কি লাভ? কোনো কি সুরাহা হবে।

আবার নিজের মনে মনেই তর্ক করে কামাল, রুবি কোনো দায়-দায়িত্বের আদালতে বসেনি। কাজেই কোনো কঠিন মামলার রায় তার কাছে প্রত্যাশা করা যায় না। উচিতও নয়।

কফি ঢালল বটে। তবে এক চুমুক দিয়েই নিজের পেয়ালাখানা সরিয়ে দেয়। বলে, ধরাও।

কী?

সিগ্রেট।

কামাল একটা সিগ্রেট ধরিয়ে ওর হাতে দেয়। ঘুরে ঘুরে তাকে লক্ষ করে রুবি। প্রচ্ছন্ন হাসি তার মুখে। বলে, তুমি আজ ভীষণ লস্ট।

আমি চিরকালই লস্ট।

রুবি সান্ত¡না দেয়, মন খারাপ করার কি আছে। নাহ্ আমারই ভুল। তোমাকে শেফালীর সঙ্গেই আলাপ করিয়ে দিলে হতো। সে পুরুষ মানুষদের গুড হিউমারে রাখতে পারে। সঙ্গে থাকলে তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু-টুমুুও খেতে পারতে। ও মাইন্ড করে না।

তুমি করো না?

হো হো করে হেসে ওঠে রুবি, ওসব ডাল ভাত। আমার মাথাব্যথা নেই। আসলে কি জানো, আমি মনটাকে সে পরিমাণ হাল্কা করতে পারি না। তা না হলে আর কি আপত্তি।

এবার চোখ তুলে তাকায়। কী যেন বলতে গিয়েও বলে না। জায়গাটা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। সম্ভবত চোখ জ্বালা করে। সে কারণে রুমাল দিয়ে হাল্কা হাওয়া করে। তারপর একসময় হাত বাড়িয়ে কামালের টাই-এর গেরো নেড়ে দেয়। বলে, কোনো ব্লু রং-এর টাই পরো না তো।

কেন?

আমার পছন্দ নয়, সেজন্যে।

রেস্তোরাঁ থেকে যখন বেরিয়ে এলো, সন্ধে ঘন হয়ে আসছে। শীতের রাত। চলাচল কম। রিকশা ট্যাক্সি কোনোটাই খালি চোখে পড়ে না।

যেতে যেতে দাঁড়িয়ে যায় রুবি। বলে, রিকশা নাও।

তুমি বললে রিকশায় যাবে না।

তখন বলেছিলাম। ইন ফ্যাক্ট আমি গাড়ি ছাড়া কোথাও যাই না। নাও রিকশা। তুমি বড় রাস্তায় নেমে যেও।

শঙ্কিত হয় কামাল।

বাকি রাস্তা তুমি একা যাবে!

হ্যাঁ। তোমার সঙ্গে বাড়ির দরজায় নামতে পারব না।

কথা সেটা নয়। আমি ভাবছিলাম তোমার এত রাতে ঠিক হবে একা যাওয়া?

ঠিক তো অনেক কিছুই নয়। বাট দেন রিস্ক । যা বলি তাই করো। কাল যদি শোনে বাড়ি ফিরিনি, ভাববে কেউ কিড্ন্যাপ করেছে। শেড সাম টিয়ার্স। অশ্রুপাত করো।

আমি সঙ্গে গেলেও পারতাম।

তুমি সব কিছু করতে চাও। এমনকি বেডরুমে যেতেও বোধহয় আপত্তি নেই?

সে কথা বলিনি।

কেমন হেয়ালি মার্কা দৃষ্টি ছোড়ে রুবি, বলনি। আমি বললাম। ইচ্ছে করে – করে না?

করলেই করবে না। আমাকে বলবে। আমি তোমাকে ধমকে দেব।

কামাল বোঝে রুবির সঙ্গে তর্ক করা বৃথা।

বড় রাস্তাতেই তাকে নেমে যেতে হলো। আবছা অন্ধকারে বাঁ-দিকে গলি বরাবর রিকশা এগিয়ে গেল। রুবি রিকশার হুড তুলে দিলো।

ছুটিতে এলে বরাবর এ ব্যবস্থাটাই করে কামাল। নিজে এসে ওঠে খালাতো বোন সাহানা আপার বাসায়। বৌ থাকে তার মেজ ভাই-এর সঙ্গে। তাতে দু’জনেরই মোটামুটি সুবিধে। ঘরসুদ্ধ দুটি প্রাণী। বেশ ফ্রি ফিল করে। যে ক’দিন থাকে তারই একচেটিয়া কর্তৃত্ব। যেমন খুশি ঘুরে বেড়ায়। যখন খুশি ফেরে।

কোহিনুরেরও অনুযোগের কোনো কারণ নেই। দোকান-পাট, বাজার কাছাকাছি। কেনা-কাটার সুবিধে। কোনো এক জাপানি কোম্পানির প্রতিনিধি ওর ভাই। একটা গাড়ি সারাদিন পরিবারের সেবাতেই নিয়োজিত। যখন খুশি ঘুরে বেড়ানো যায়। তাছাড়া বাড়িতে লোকজনের অভাব নেই। এক গাদা ভাগ্নে ভাগ্নি। ওদের কোলে করে, আদর করে, ওদের জন্য জামা-কাপড় সেলাই করে, সোয়েটার বুনে ভালোই কাটে।

সুতরাং এ ব্যবস্থায় কোনো পক্ষেরই আপত্তি নেই। অবশ্যি দিনে একবার না হলেও দু’দিন অন্তর দেখাশোনা হয়। ওদের একমাত্র ছেলে হাসান সেকেন্ড ইয়ারে। হোস্টেলে থেকে পড়ে। সায়েন্সের ছাত্র। বড় বেশি একটা সময় পায় না। প্র্যাকটিক্যাল করে ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যায় প্রায়ই।

সাহানা আপাদের ওখানে একটাই সমস্যা। ওদের গাড়ি। ড্রাইভারের দয়ার ওপর ভরসা। সাহানা আপা বা মকসুদ ভাই দু’জনের কেউ গাড়ি চালায় না। এক সময় যথেষ্ট পয়সা খরচ করে শখ করে গাড়ি চালানো শিখেছিল সাহানা। একটা রিকশার সঙ্গে টক্কর লাগার পর বড় হেনস্তা হতে হয়েছিল লোকজনের সামনে। ব্যাগ থেকে একশ টাকা বার করে রিকশাওয়ালার হাতে ধরিয়ে দিয়ে তবে পরিত্রাণ। তারপর থেকে আর গাড়ি চালানোর মধ্যে নেই। মকসুদ বলে, তারও নাকি অভ্যেস ছিল। আজকাল হাত স্টেডি রাখতে পারে না। সেজন্যে ভয় করে।

আসলে ওদের দু’জনের গতিবিধিও তেমন নয়। কাছাকাছি একটা দুটো বাড়ি বা মাঝে মধ্যে মার্কেটিং। ক্রিকেট খেলা দেখার পোকা মকসুদ। যে ক’দিন খেলা চলে সে ক’দিন গাড়ি স্টেডিয়ামেই পড়ে থাকে।

কামাল অবশ্যি একটা ব্যবস্থা করে নিয়েছে। সারওয়ারের গ্যারেজ থেকে ধার করা গাড়ি। দেখেছে ছুটিতে এসে চলাফেরার বড় অসুবিধে। ভাড়া বললেই ভাড়া পাওয়া যায় না। পয়সাকড়ির ঝামেলা তো আছেই। প্রস্তাবটা সারওয়ারের নিজেরই। গ্যারেজে গাড়ি পড়ে থাকে হরদম। দু’একটা ধরতে গেলে আবার লাওয়ারিশ মাল। বাজারে বিক্রি করা যাবে না যদিও। থানা পুলিশের হাঙ্গামা। তাই ঠেকায় পড়লে নিজে ব্যবহার করে। বন্ধু-বান্ধবদের দেয়। আর কামালের তো কথাই নেই। ছেলেবেলার বন্ধু।

কথায় কথায় সারওয়ার জানায়, এ লাইনে আসবে স্বপ্নেও ভাবেনি।

কামাল জিজ্ঞেস করে, তাহলে এলি কী করে।

তুই তো জানিস, আমার শখ ছিল ছেলেবেলা থেকেই। ভাবতাম ঐ একটা শখ পূরণ হলেই জীবন সার্থক। এই করেই গ্যারেজের আইডিয়া।

গাড়ি কিনিসনি?

পাগল! গাড়ি দেখতে দেখতে এখন অরুচি ধরে গেছে। একটা কথা বুঝতে পারছি। দরজিদের স্যুট পরার আর গ্যারেজের মালিকদের গাড়ি কেনার ইচ্ছে বোধহয় আপনা থেকেই লোপ পায়।

কাজের কথার আসে সরওয়ার। বলে, গাড়ি দিচ্ছি। যত খুশি ঘুরে বেড়াও। রাতে কিন্তু গ্যারেজে ছেড়ে দিয়ে যেতে হবে দোস্ত।

তাহলে ফিরব কী করে।

সে একটা কিছু হবে। আমি নিজেই থাকি রাত দশটা অবধি। তারপরও দরকার হলে ফোরম্যান ছেড়ে দিয়ে আসবে তোমাকে। কিন্তু গাড়ি গ্যারেজে ফিরবেই। এ ব্যাপারে আমি বড় স্ট্রিক্ট।

সে কথার কোনো খেলাপ হয়নি। রাত করে হলেও গাড়ি এসে ছেড়ে দিয়ে গেছে গ্যারেজে। আর কেউ না কেউ ছেড়ে এসেছে তাকে। তার সুবিধের কথা বিবেচনা করেই আলাদা গেস্টরুমে কামালের থাকার ব্যবস্থা। আলাদা গেট, আলাদা চাবি। যখন খুশি গেল, যখন খুশি এলো। বাড়ির কাউকে বিরক্ত করতে হয় না।

প্রথম প্রথম সাহানা সকাল-সন্ধে খোঁজ নিয়েছে। দেখাশোনা করেছে। চা পাঠিয়ে দিয়েছে বিকেল না হতেই। সকালবেলা ব্রেকফাস্ট টেবিলে অপেক্ষা করেছে। রাতের খাবার দেরি করে খেয়েছে।

ওর আগমনে বাড়িসুদ্ধ লোকের জীবনযাত্রায় নিয়ম ভঙ্গের আশঙ্কা প্রকট হয়ে দেখা দেবার আগেই নিজে থেকে উদ্যোগ নিল কামাল।

বলল, অমন হলে আমি থাকতে পারব না। আপনারা ওভাবে বসে থাকেন, আমার খারাপ লাগে। খাওয়া-দাওয়ার আমার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। নিজেই দেখেছেন কখন আসি, কখন যাই ঠিক-ঠিকানা নেই।

সাহানা ওকে নিরস্ত করে। বলে, হলো তো তোমার জন্যে কেউ অপেক্ষা করবে না। তবে খাও, না খাও রান্না রোজই হবে। যখন খুশি ডেকো, গরম করে দেবে। বাড়িতে তিন-তিনটে কাজের লোক। একরকম বসেই থাকে।

যথেষ্ট ভালো সময় থাকতেও কোহিনুর ভরা বিকেল বেলাই আসে। তার একটা বিশেষ দাবি আছে সম্ভবত এই উপলব্ধির জোরেই অনেক সময় দরজায় টোকা না দিয়েই হঠাৎ করে ঢুকে পড়ে। চমকে যায় কামাল। বলে, ও তুমি। আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

কোহিনুর ওর দিকে আড়চোখে তাকায়। বলে, কি ব্যাপার আজকাল আমাকে দেখলেই ঘন ঘন ভয় পেয়ে যাচ্ছ?

কামাল প্রতিবাদ করে, তোমাকে দেখলেই ভয় পাই এটা কোনো কথা নয়। হঠাৎ করে ওভাবে দরজা খুললে চমকে যাবারই কথা।

কোহিনুর বলে, ভালো। আরামেই আছ দেখছি।

আরাম কষ্ট জানি না। কেটে যায়।

কোহিনুর ফোঁড়ন কাটে, কেটে তো যাবেই। বন্ধু-বান্ধবী তো কম নেই।

বলেই এক পাশে গিয়ে ভিন্ন ধরনের দৃষ্টি ছোড়ে, হলো কারও সঙ্গে দেখা?

হ্যাঁ, না কিছুই বলে না কামাল। এ নিয়ে বাত-বিত-া করা ভালো নয়। কিছু সংশয়ের মধ্যে রাখাই ভালো। খুব বেশি সাধুপনা করা যাবে না। কোহিনুর জানে। তার সঙ্গে একদিন একটি মেয়েকে দেখেছে ঘুরতে। চায়ের দোকান থেকে ওরা বেরিয়ে আসছিল, মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল। দু’জনই থমকে গেল।

কিছু বলার আগেই নিজের বৌ-এর সদর্পে হাত বাড়িয়ে বলল, এ হলো তোমার ভাবি মিলি।

কোহিনুর প্রতিবাদ করে সঙ্গে সঙ্গে, আমি কারও ভাবি-টাবি নই।

ভদ্রমহিলা কে?

ঐ যে বললাম মিলি।

ওটাই ভালো নাম নাকি।

মিলি কি একটা বলতে যায়। তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে কামাল, এ নামটা খারাপ হলো কিসে।

কোহিনুর এবার সোজা মেয়েটির চোখে চোখ রাখে, আগে কোথাও দেখেছি?

মিলি অপ্রতিভ হয় না মোটেও। বলে, জানি না। দেখে থাকবেন হয়তো। আমি টেনিস খেলি।

কোহিনুর হেসে বলে, তাহলে তো পত্র-পত্রিকায় ছবি বেরোয়।

মিলি হাসে, বেরোয় বৈকি।

একটা বাড়তি অনুরোধ জানিয়ে রাখে কোহিনুর, একদিন ডাকবেন তো। আপনার খেলা দেখব।

নিশ্চয়ই। ডাকাডাকির কি আছে। যে-কোনোদিন আসুন। আপনার বুঝি টেনিস পছন্দ।

না। ঠিক তা নয়। এমনি দেখব কেমন খেলেন।

তারপর একটু থেকে কোহিনুর আবার জিজ্ঞেস করে, তা আপনার বোধহয় সাহিত্যিকদের খুব পছন্দ।

মিলি ঠোঁট বাঁকা করে, বলতে পারেন। এক সময় কবিতা লিখতাম। কামাল ভাই ছাপিয়েও দিয়েছেন দু’একটা।

আজকাল লেখেন না?

খেলাধুলা করে সময় পাই না।

মুচকি হাসে কোহিনুর, তাও তো কথা। খেলাধুলো করে আপনার সময় কই। তা আজকেও কি খেলতে এসেছিলেন?

কামাল এবার তার হয়েই সাফাই গায়। বলে, দেখলাম মিলি ছুটছে হন্তদন্ত হয়ে রোদে। নিজে থেকেই ডাকলাম। ও আমাকে দেখে অবাক।

কোহিনুর বলে, অবাক কেন। অবাক হবার কি হলো।

মানে, দুপুরে এসময় তো আমি অফিসের বাইরে থাকি না।

তারপর কি হলো?

কি আর, মিলি প্রস্তাব দিলো চা খাওয়া যাক। কতদিন পর দেখা।

কোহিনুর ঠোঁটদুটো গোল করে আহা উহ্ করে।

সত্যিই তো বলবে না, কতদিন পর দেখা।

মিলি চারদিক তাকিয়ে কেমন অস্বস্তিবোধ করে। বলে, আমি বরং যাই। আমার সময় নেই একটুও।

কোহিনুর সায় দেয় না, না না আপনাকে ধরে রাখব না। আপনার আসল খেলার সময় হয়ে এলো বোধহয়।

আসল খেলা মানে?

আঁৎকে উঠলেন কেন। আমি টেনিস খেলার কথা বললাম।

খোঁচাটা বোঝে না মিলি, তা নয়। তবু মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলে, আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে বড় খুশি হলাম। কি আশ্চর্য, কামাল ভাই কিন্তু আপনার কথা আমাকে বলেনি।

আমাকেও বলেনি আপনার কথা।

মিলি চলে যাবার পর ওদের চোখাচোখি হলো। বলার মতো কিছু পেল না কামাল।

আজ এতদিন পর সেই পুরনো প্রসঙ্গ টানল কোহিনুর, দেখা হয়নি এবার সেই টেনিসওয়ালীর সঙ্গে?

রাগে গরগর করছিল কামাল। হাতে সিগ্রেট ধরা। দ্রুত টোকা দিয়ে ছাই ঝাড়তে গিয়ে তার কিছু এসে পড়ল চোখেমুখে। বিরক্তির সঙ্গে সিগ্রেট বুজিয়ে দিয়ে বলল কামাল, টেনিসওয়ালী, ফুটবলওয়ালী, হা-ডু-ডু-ওয়ালী সব লাইন করে দেখা করতে এসেছিল।

কোনো জবাব দিলো না কোহিনুর। শুধু অনেকক্ষণ পর চুলের একখানা আলগা হওয়া ক্লিপ দাঁতে চেপে বলল, ভালো।

আসলে মিলির সঙ্গে তাকে আবিষ্কার করার পর কেমন অন্যরকম হয়ে গেল কোহিনুর। আলাদা এবং একজন। স্বতন্ত্র ও ভিন্ন প্রকৃতির। ভিন্ন স্বাদের। আগে বরং নিজের সাফাই গাইত। আজকাল আর তাও করে না। বোঝে, এসব অর্থহীন।

একজনের সঙ্গে এক একজনের বাঁধনটা এমনই হালকা সুতোর তো যেন কখনও টান দিলে ছিঁড়ে যাবে। তবুও যে যায় না, সেজন্যেই বোধহয় জীবন গড়িয়ে গড়িয়ে চলে।

উল্টোটাও হয়। মন লেগে যায় তো যায়। হয়ে যায়। মনে ধরে যায়।

রুবিকে একদিন বলায় চটে গিয়েছিল। বলেছিল, এসব চিপ সেন্টিমেন্টের কথা বলো না তো। মন দেয়া-নেয়া – বুল শিট। আই অ্যাম সিক অব ইট।

তবে তুমি কি চাও?

অনেক সময় কোনো জবাব দেয় না। আমার মন খুশি থাকলে অনেক কথাই বলে, কি চাই জানো? গাঁজা চাই – পারবে এনে দিতে?

গাঁজা, তোমার কি মাথা খারাপ?

নো আই অ্যাম সিরিয়াস। ভালো লাগে না এই পেইন, বলে তলপেটটা ধরে থাকে। জানো তো না। কিড্নি পেইন হলে বুঝতে। ওসব না খেলে থাকতে পারি না।

কামাল ভ্রƒ তোলে, বুঝলাম খাও। তা আমি পাব কোত্থেকে?

জিজ্ঞেস করো কাউকে। আমি জানব কি করে।

আবার থেমে গিয়ে বলে, আচ্ছা তা না পার কনিয়েক জোগাড় করতে পারো?

ও তো ব্রান্ডি। তোমার কি দরকার, তুমি কি গলা সাধো?

রুবি তার দিকে কিছুক্ষণ অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর দুষ্টুমির হাসি হেসে বলে, না পারলে, না পারলে। অত সিরিয়াস হচ্ছো কেন। তুমি না পারো, অন্য কাউকে বলে দেবো।

অন্য কেউ আছে নাকি?

থাকবে না কেন। আমি কি তোমার কাছে পণ করেছি।

কামালের মন খারাপ হয়ে যায়। রুবি সেটা লক্ষ করে। তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে নেয়। বলে, পারি। বললে যে কেউ এনে দেবে। তবে ফর ইওর ইনফরমেশন কাউকে বলব না। সো ইউ ক্যান গো হোম এ্যান্ড হ্যাড পিসফুল স্লিপ।

এভাবেই একটা ধন্ধে ফেলে তাকে বিদেয় দেয় রুবি। কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যে বোঝে না।

সেদিন বাড়ি থেকে বেরুবার আগেই সকাল সকাল মনে করিয়ে দিলো সাহানা বিষ্যুদবার কিন্তু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরো।

তাড়াতাড়ি কেন? কেউ আসবে নাকি?

কিছু লোককে খেতে ডেকেছি। তুমিও আছ, ভালো উপলক্ষ হলো। কাউকে বলতে চাইলে তুমিও বলতে পারো।

যে কাউকে?

হ্যাঁ যে কাউকে। তুমি লেখক মানুষ। তোমার পরিচিত কাউকে তো আমরা চিনি না।

কি মনে হওয়ায় কামাল টেলিফোনের দিকে এগিয়ে যায়। বলে, সাহানা আপা ফোন করতে পারি একটা।

একটা কেন, যত খুশি করো।

রুবিই টেলিফোন ধরল।

সরাসরি জিজ্ঞেস করল কামাল, কি করছ বিষ্যুদবার সন্ধেয়?

কিছু না।

আসতে পারবে? মানে কোনো রিসেপশনে।

প্রপারলি ডাকলে পারব না কেন। আর কে আসছে?

সবাইকে তো চিনি না। কাইউম, মনু, সারওয়ার – মানে আমারই বন্ধু-বান্ধব। অবশ্য আরো আছে, আমি চিনি না।

রুবি উত্তেজিত, কোনো সারওয়ার সাপ্তাহিক মৌচাক সম্পাদক? দারুণ হ্যান্ডসাম। দেখতে বড় ইচ্ছে করে। চেনো?

চিনব না কেন?

প্লিজ আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিও।

হঠাৎ তার উৎসাহের স্রোতের মুখে কি এসে পড়ল। একখ- আশঙ্কার পাথরকুঁচি। কামাল বিরক্ত হয়।

কেন ওর সঙ্গে আবার আলাপ করার কি হলো।

কেন, তুমি জেলাস হচ্ছো?

ততক্ষণে টেলিফোনের কাছে দাঁড়িয়ে সাহানা। সুতরাং ঐ প্রসঙ্গ আলোচনা করা যায় না।

কোনো মানে হয় না। তবু সাহানার সন্তুষ্টির জন্যে কথার যোগসূত্র ছিন্ন করে যেন কোনো নতুন প্রসঙ্গের অবতারণা করে অতর্কিতে বলল, তা তো বটেই।

রুবি জানতে চায়, তা তো বটেই মানে।

আমতা আমতা করে কামাল, এই আর কি –

ততক্ষণে রুবি বোঝে। ওদের স্বতঃস্ফূর্ত আলাপের মুখে অকস্মাৎ কোনো বাধা। অনুমান করে নিয়ে বলে রুবি, কোনো ডিফিকাল্টি? বলতে পারছ না?

হ্যাঁ। সেরকমই।

স্যরি। কাল তাহলে টেলিফোন করো।

কামাল ফোন রেখে দিতে যায়। তার আগেই কথা আদায় করে নেয় রুবি, রিসেপশনে ডাকছ কি ডাকছ না? ফ্রি রাখব সন্ধেবেলা ঐদিন?

কামাল বলে, ভেবে বলব।

ভাবাভাবির কি হলো।

আছে।

টেলিফোন রেখে দেয় কামাল। ততক্ষণে মকসুদও এসে উপস্থিত। কাছে এসে বসল। বলল, তোমাকে তো আজকাল পাওয়া যায় না। কোথায় থাকো, খাও কোথায় দুপুরে?

ও একটা হয়েই যায়।

সাহানা ঘড়ি দেখে বলে, তাই বলে আজকে বাইরে যাবার দরকার নেই। খাবার খেয়েই যেও।

কামাল মাথা নাড়ে।

বোধহয় খাবার আয়োজন করতেই চলে যাচ্ছিল সাহানা রান্নাঘরের দিকে। যেতে যেতেই বলল, বিষ্যুদবার সন্ধের কথা মনে আছে তো।

হ্যাঁ।

মকসুদও ঐ এক কথারই পুনরাবৃত্তি করে বলল, আমরা তো আর তোমার বন্ধু-বান্ধবদের চিনি না। কাউকে ডাকতে চাইলে বলে দিও আগে থেকে।

সে দেখা যাবে।

সাবধানী মানুষ মকসুদ। বলে, না না। দেখা যাবে না। আগে থেকে না বললে চলবে কী করে।

কামাল খাবার শেষ করে নিজের কামরায় যাচ্ছিল। সাহানা নিজে এসে ডেকে গেল, ঐ ঘরে চলো। টেলিভিশনের প্রোগ্রামটা দেখে যাও। নতুন সিরিজ শুরু হয়েছে।

একেবারে মুখের ওপর না করা যাবে না। বলা যাবে না, সে দেখে না বা পছন্দ করে না। নিজের মতামতের কথা ভাবলে চলে না। আর দশজনের সঙ্গেও মানিয়ে চলতে হয়। তখনও টেলিভিশনের কমার্শিয়াল চলছে।

ওরা যে ঘরে বসে টেলিভিশন দেখে সেখানে যথাস্থানে দুটি নির্দিষ্ট আসন। বুঝতে অসুবিধে হয় না সাহানা আর মকসুদের। কামাল বাড়তি দর্শক। মকসুদ নিজের আসন ছেড়ে দিয়ে তাকে বসতে দেয়।

মকসুদ উঠে গিয়ে কম আরামের হাতল ছাড়া মোড়ায় গিয়ে বসল। মোটাসোটা মানুষ, যদিও তাতে তার কষ্ট।

নিছকই আলাপ জমাবার খাতিরেই বলল মকসুদ, আর কি প্রোগ্রাম। আজকাল দেখা না দেখা সমান কথা। তোমাদের ওখানে কী রকম?

ওখানে মানে?

ফিজিতে।

আমি খুব একটা দেখি না। আর দেখলেও বুঝব না। ভাষা সমস্যা। মাঝে মধ্যে ভিসি আর দেখি – ব্যস।

মকসুদ বলল, আমাদেরও একটা কেনার ইচ্ছে ছিল। কি করব, যা ডিউটি। তোমাদের তো সব ডিউটি ফ্রি।

সেটা তো ঐ দেশে। এই দেশে আমরা আপনারা সবাই সমান।

তাও ঠিক।

কি মনে হওয়ায় উৎফুল্লচিত্তে বলে ওঠে, মকসুদ, গেলবার যে আমাকে একটা টাই পাঠিয়েছিলে অনেকে জিজ্ঞেস করেছিল।

মনে পড়ছে কামালের। হ্যাঁ ক্রিশ্চান ডায়রের। কিন্তু কমদামি। মনে আছে সেল থেকে কিনেছিল দুটো টাই, একখানা নাইলন জর্জেট। আর মেয়েদের স্টোল। স্টোলটি আলাদা করেই পাঠিয়েছিল গন্তব্যে।

বলা যায় না পার্টিতে ডেকে বসলে হয়তো আবার ওখানাই পরার বায়না ধরবে রুবি। কারও কি চোখে পড়বে? পড়তেও পারে। কেনার সময় কোহিনুরও ছিল। তা থাক না। একই জিনিস কি একাধিক মানুষ কিনতে পারে না। এ নিয়ে খুঁতখুঁত না করাই ভালো।

কামাল বলে, মকসুদ ভাই আপনার ওরকম টাই পছন্দ, বলেন না কেন।

না না। আমি আবার টাই ফাই পরি কখন। নিজের বিজনেস দেখি। আমাদের কি আর এসব সাজে।

সাহানা মনে করিয়ে দেয়, তাই বলে পার্টির দিন যা খুশি পরো না। লোকজনের সামনে ওরকম যাওয়ার কোনো মানে নেই। ঐ টাইটা পরো।

আচ্ছা আচ্ছা পরব। শার্ট, শার্ট পাব কোথায়।

সাহানা আশ্বস্ত করে, ইস্ত্রি করা আছে। চোখ থাকলে তো।

কাল মকসুদ ঐ টাই পরবে। নিমন্ত্রণ করলে রুবি ঐ স্টোল পরবে। কোহিনুর আসবে। সে কি পরবে? একই দিন একই দোকান থেকে কেনা তিনজনের জন্যে তিনরকম জিনিস। মকসুদের জন্যে টাই, রুবির জন্যে স্টোল, আর কোহিনুরের জন্যে নাইলন জর্জেট। এমনকি হতে পারে না, সব ছেড়ে তিনজনই তাদের অগোচরে কাল ঐগুলোই পরবে। সে আকস্মিক নাটকে কী ভূমিকা হবে কামালের?

টেলিভিশনের অনুষ্ঠান শুরু হতে আরো মিনিট সাতেক বাকি। এমন সময় ফস করে জ্বালানো দেশলাই-এর কাঠি নিবে যাওয়ার মতো টেলিভিশনের আলো চলে গেল। জেগে উঠল পর্দায় হিবিজিবি ঢেউ। কিছুক্ষণ পর যান্ত্রিক গোলযোগের বিনয়সূচক নোটিশ।

মকসুদ উত্তেজিত। বলে, যান্ত্রিক গোলযোগ হবে না কেন। কোনো একটা জিনিস প্রপারলি ম্যানেজ করা শেখেনি। আসলে সব কাজেই ফাঁকি, হবে কেমন করে। টেকনোলজি জানে না।

কামালের মনে হয় হঠাৎ যান্ত্রিক গোলযোগের সঙ্গে টেকনোলজি যুক্ত করা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু করাই যাবে কি। আলোচনার বিষয়বস্তু সংক্ষিপ্ত। পরচর্চারও সুযোগ নেই। বাড়িগুলো ঘেঁষাঘেঁষি হলেও এক একটি আলাদা দ্বীপ যেন। সব বাড়িতেই জানালা। জানালায় ঘঁষা কাচ। তার ওপর এ মাথা থেকে অন্য মাথা টানা পর্দা। একটা মশা-মাছিও ঢুকতে পারে না। সামান্য উৎকণ্ঠা, উল্লাস বেরুতে পারে না।

তাই মকসুদ যখন বলল, শুনলাম মিসেস শরীফের নাকি স্ট্রোক হয়েছিল। সাহানা আঁৎকে ওঠে, তাই নাকি। কবে?

পরশু।

ওদের পাশের বাড়ির মিসেস শরীফ বেশির ভাগ একাই থাকে। স্বামী সাধারণত ট্যুরে থাকে। ছেলেমেয়েরা বাইরে।

আফশোস করে সাহানা, কি আশ্চর্য আমরা জানলাম না।

মকসুদ বলল, একটু খোঁজখবর নিও। একবার দেখে এসো।

তুমিও যে কি মাথামু- বলো। এ উইকে সময় পাব কেমন করে। অত বড় একটা পার্টি ম্যানেজ করা সোজা কথা। হিমসিম খেয়ে যেতে হয়।

কামাল দেখল, যে কথাটা বললে মহিলারা সচরাচর খুশি হয় সেটা অবতারণার এই মহা সুযোগ।

কেন মকসুদ ভাই হেল্প করে না?

চোখ পাকায় সাহানা, হেল্প। জিজ্ঞেস করো কখনও এক গ্লাস পানি ঢেলে খেয়েছে কিনা। পারলে জুতোও পালিশ করে দিতে হয়।

বলেন কি!

কি আর বলব। সবাই কি আর ভাই তোমার মতো।

মকসুদ প্রতিবাদ করে না। সে আয়েশে একখানা এলাচি ভাঙতে ভাঙতে বলে, বলো বলো। লোক পেয়েছ, শুনিয়ে যাও।

ততক্ষণে হাঁপ ছেড়ে বাঁচে, যাক তবু ভালো –

আসলে কামালের ঘুম পাচ্ছিল। আজ সারাদিন বড় ধকল গেছে। দুপুরে খাওয়া হয়নি। রাতের খাবারটাও জমেনি। একটা মাছের কাঁটা গলার কাছে আসা-যাওয়া করছে।

এমন সময় ট্রে-তে  রসমালাই সাজিয়ে নিয়ে এলো কে একজন। সঙ্গে কিছু ছোট প্লেট।

মকসুদ নিল, সাহানা নিল। তার কাছে আনতেই হাতের তালু ঢেউ-এর মতো নাচিয়ে দিয়ে বলল, আমি সুইট্স খাই না।

খায়। আসলে খায়। তবু। এরকম এক-আধটা কথা জানিয়ে রাখা দরকার। ইম্প্রেশন, মানুষের ইম্প্রেশন এভাবেই হয়। কে কি খায় না, কি পরে না, তা নিয়ে।

মকসুদ বলল, তা হলে ব্ল্যাক কফি খাও।

নো থ্যাঙ্কস, বরং ছবিটা এনজয় করি।

এনজয় সে মোটেও করছিল না। কেবল ভদ্রগোছের একটু সময় নিচ্ছিল উঠে পড়ার আগে।

ঘড়ির কাঁটা পঁয়ত্রিশের ঘর ছুঁতেই সোফার হাতলে ভর করে প্যারালাল বারের মতো। শরীরটাকে তুলে নেয় এক ঝাঁকুনিতে। তারপর বলে, আজ বড় টায়ার্ড। আপনারা দেখুন।

কারও সময় ছিল না তার কথা শোনার। গভীরভাবে ডুবে দু’জনই।

তবু মকসুদ বলল, ভালো না লাগলে বেচারিকে ধরে রাখছ কেন।

সাহানা তাকে যেতে দেখে বলে, ঐ কথা রইল তাহলে। যাকে যাকে বলার বলে দিও। কোহিনুরকে তুমি আনবে, না আমরা?

আমি তো ক্লাবে থাকব।

ঠিক কোথায় থাকবে না থাকবে নিজেও জানে না কামাল। তবু বলল। ঠিক আছে ভাবতে হবে না। আমরাই আনিয়ে নেব।

সাহানা সমস্যার সমাধান বড় তাড়াতাড়ি করে দিলো।

সকালবেলাটা সে উত্তরণ প্রকাশকের অফিসে যায়। সেখানে চেনাশোনা অনেকের সাক্ষাৎ মেলে। টেলিফোনও করা চলে।

গিয়েই রুবিকে টেলিফোন করল।

রুবি বোধহয় ধারেকাছেই ছিল। নিজে থেকেই জবাব দেয়, এ ক’দিন করোনি কেন?

সুবিধে ছিল না।

তা বুঝলাম। কি হলো আমাকে ডাকছ না।

কোথায়?

সেদিন যে বললে তোমার বোনের ওখানে রিসেপশন হচ্ছে।

হঠাৎ কোনো যুৎসই জবাব মনে এলো না। সবদিক বিচার বিবেচনা করলে তার না আসাই ভালো।

রুবি এলে ভালো লাগত যদিও। প্রতিভার আলোয় সে নিজেই জ্বলজ্বল করত। চোখের কার্নিশে সবুজ কালো রং-এর ছোঁয়া মেলে, মাথার চুল ফাঁপিয়ে ভ্রমর-কালো চোখের সঙ্গে ম্যাচিং শাড়ি পরে। পায়ে রীতিমতো হাই হিলো জুতো। ওটা পরে যখন দাঁড়ায় সে মস্ত লম্বা। ভালোই লাগে। ওর শাড়ি মাটি ছোঁয়া ছোঁয়া। জুতো দেখা যায় না। শরীরকে নিয়ে সে ছবি আঁকে যেন। কোথাও একটু রং কম দেয়। কোথাও বেশি। দেহের ওজনের হেরফের হলে তাদের শায়েস্তা করে। ব্ল্যাক কফি খেয়ে। দু’চামচ ভাত মুখে পুরে হন্তদন্ত হয়ে টেবিল থেকে উঠে পড়ে। এজন্যেই তার শরীরটাকে ঠিক রাখতে জানে। গাঢ় লাল রং-এর লিপিস্টিক ঠোঁটে যখন কিং সাইজ সিগ্রেট ধরে রাখে আর চোখের পাতায় পাতায় ভয়ের আমেজ মিলিয়ে কখনও দ্রুত, বিলম্ব টান দেয়, ভালোই লাগে।

সে একটানা বই পড়তে পারে। ফ্রেঞ্চ শিখেছে। অঙ্কে লেটার পেয়েছে ইন্টারমিডিয়েটে। এক হাজার ভক্ত। দু’জন তার জন্যে সুইসাইড করতে চেয়েছে। যদিও তাদের কারও নামই বলেনি রুবি।

জিজ্ঞেস করতে গেলেই বলেছে, আমি তো কোনোদিন জানতে চাইনি তোমার ক’জন মেয়েবন্ধু। অলস কৌতূহল। চেপে যাও ব্রাদার।

তারপর তার সুঠাম একটি পা আরেকটি পায়ের ওপর তুলে যখন মৃদু তাল ঠোকে, মনে হয় সে সুখের শিহরণ তুলছে। সে যখন খুশি গল্পে মেতে যেতে পারে। পারে যখন খুশি ধন্যবাদ দিতে। ধন্যবাদ দিলে ‘ইউ আর ওয়েলকাম’ বলে প্রতিপক্ষকে খুশিতে রাখতে। এরকম একটি মেয়েই যে তার বিশেষ জন – সে কথা কেউ জানলে, তার ভালোই লাগত। আরো একারণে যে আর দশজনের আগ্রহের মৌচাকে আগেই সে ঢিল দিয়ে বসে।

কিন্তু ওর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বই ওকে তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে না, তাই বা কে জানে। আজকাল মাথায় ঝাঁকড়া চুল, ঋজু দেহের ছেলেরা আইভরি সুলভ দাঁতের হাসি হেসে যে-কোনো সময় সুন্দরীদের ছোঁ মেরে নিতে পারে। তাদের প্রতিভাদীপ্ত ভাষণে, চোখের চাউনিতে, সিগ্রেটের ধোঁয়ায় ঘর আচ্ছন্ন করার ক্ষমতায় অনেক মেয়েরাই শেষটায় ধরা পড়ে যায়। ঐ ছেলেরা এক নিশ্বাসে হ্যালো বলার সঙ্গে সঙ্গেই টেলিফোন নম্বর, বাড়ির ঠিকানা সংগ্রহ করে দু’দিন পরই চীনা রেস্তোরাঁয় একান্ত হবার সুযোগ করে নিতে পারে।

রুবি অবশ্য বলে, তোমার ওরকম ভয়ের কারণ কি। আমি কোনোদিন তোমাকে ঠেলেছি, না ফেলেছি। তুমি ভীষণ ‘জেলাস’। আমি আবার ‘জেলাস’ লোক পছন্দ করি না।

রুবি তখনও টেলিফোন ধরে। বলল, কি হলো তোমার রিসেপশনে ডাকছ কি ডাকছ না।

কামাল পরিস্থিতি বাঁচানোর তাড়নায় বলল, আমি নিজেই থাকি কিনা সন্দেহ। রিসেপশন তো আমার নয়। সাহানা আপার। লোকজন বেশির ভাগ ওদেরই।

রুবি রেগে যায়, অজুহাত দেখাচ্ছ কেন। যেন আমার ঘুম হচ্ছে না ঐ পার্টিতে যাবার জন্যে।

কামাল কিছু বলার পায় না। আমতা আমতা করে।

হঠাৎ বলে ওঠে রুবি, খেয়েছ?

আসলে এসময় তার খাবার আয়োজন করা সম্ভব নয়। একা খাওয়া যায় না। গেলে সবাইকে নিয়ে যেতে হয়। অগত্যা খাবার ইচ্ছে পরিত্যাগ করতে হয়। এখানে এসে প্রায়ই হচ্ছে। একবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে শুধু খাবার কারণে ফিরে যাওয়া পোষায় না। পেট্রোলের যা দাম।

মিথ্যে বলতে পারল না কামাল। বলেই ফেলল, না খাইনি।

ও প্রান্ত থেকে আকুতি শোনা যায়, ডু ইউ ওয়ান্ট মি টু গো হাংরি।

দেখা না গেলেও অনুভব করতে পারছে রুবির গলা ভেঙে আসছে। চোখে তার অভিমান সাঁতার দিচ্ছে।

আমি না খেলে তুমি খেতে পারো না?

পারি যে না, দ্যাট ইউ নো। ডোন্ট টক্ টু মি।

বলেই রেখে দিলো টেলিফোন ধুপ করে।

বিকেল নাগাদ ফিরে এসে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল কামাল। আজ তার খাবার ইচ্ছে ছিল। ক্ষিদের কারণে না হলেও রুবির সন্তুষ্টির জন্য। কিন্তু বেলা সাড়ে চারটায় আরেকজনের বাড়িতে সে কাকে ডাকবে। কাকে কি বলবে।

বিষ্যুদবার। সন্ধে হতেই লোকজনের ভিড়। ওর জানালায় পার্করত গাড়ির হেডলাইটের আলো এসে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায়। পাশের ড্রয়িং রুমেই পার্টি। কিছু কিছু গুঞ্জন শোনা যায় লোকজনদের।

মকসুদের বাড়িটা বড়। সামনে পেছনে লন। যতœ করে ছাঁটা ঘাস। নানা দেশী-বিদেশী ফুলের সমাহার। ফুল গাছেই ফোটে। গাছেই ঝরে। কেউ তা নিয়ে হা-পিত্যেস করে না। কিন্তু এক-এক সময় রং-বেরং-এর ফুলের স্তব্ধ মিছিল দেখে ওর মনটা কেমন করে ওঠে। মনের আড়ালে আবডালে একগাদা দুঃখ নিয়ে নিষ্পলক নেত্রে প্রকৃতির শোভা নিরীক্ষণ করাকেই বলে শান্তি। এ জিনিসটাকেই বলে আনন্দ। হয়তো।

দরজায় টোকা পড়ে। জোরেশোরেই। বোঝা যায় দর্শনপ্রার্থী তার নিজেকে নিজের অন্তরঙ্গতার হাত থেকে বাঁচিয়ে দেবার সময় দিতে চায় না। যেভাবে আছে সেভাবেই আবিষ্কার করতে চায়। কোনোমতে একখানা শার্ট চাপিয়ে তাতে বোতাম লাগাতে লাগাতে দরজা খুলে দেখে কোহিনুর।

সে বিছানায় বসে না। নিরাপদ দূরত্বে রাখা চেয়ারে গিয়ে বসে।

জিজ্ঞেস করে, খুব ঘুমালে?

হ্যাঁ।

মনে হলো ছুটির এই সংক্ষিপ্ত সাতদিনের ভেতর ওদের সাময়িক ছাড়া-ছাড়িতে ওরা অসম্ভব রকম ফরম্যাল। টেবিলে পানিভর্তি বোতলের ওপর উপুড় করে রাখা গ্লাস। কোহিনুর পানি ঢালতে গেল।

কামালই ঢেলে দিতে চেয়েছিল।

তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে কোহিনুর, এ বাসায় এসে অনেক ম্যানারস শিখেছ মনে হচ্ছে। এ পর্যন্ত কোনোদিন পানি ঢেলে খাইয়েছ মনে পড়ে না।

কোহিনুর এক চুমুক খেয়ে গ্লাস রেখে দেয়। তারপর কাঁচা সবুজ রং-এর সংক্ষিপ্ত রুমালে মুখ মুছে বলে, তোমার গার্লফ্রেন্ডরা তোমার ভদ্রতা জ্ঞান টনটনে করে তুলছে বোধহয়। ভালো।

কার কথা বলছ?

কার কথা আবার বলব। আমি জানি না। কোনোদিন বলোনি। আলাপও করিয়ে দাওনি। তবে একটা জিনিস লক্ষ করছি। দেশে ফেরার তোমার প্রচুর আগ্রহ। এবং সেটা দেশপ্রেমের কারণে নয়।

দেশে ফিরতে তোমার ভালো লাগে না?

লাগে। আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা হয়। হাসানকে কাছে পাই। তবু নিজের সংসার ছেড়ে থাকতে ইচ্ছে করে না।

কোহিনুর উঠে দাঁড়ায়। সামনের জানালার একটা পাট খুলে দেয়। বাইরে তাকিয়ে ওর দিকে পেছন ফিরে বলে, এখন বয়েস হয়েছে। তোমার নিজেকে কন্ট্রোল করা উচিত।

ইঙ্গিতটা আঁচ করতে পারে কামাল। তবু বলে, কী রকম কন্ট্রোলের কথা বলছ?

এবার ওর দিকে ঘুরে সোজাসুজি চোখে চোখ রাখে কোহিনুর। বলে আরো সরাসরি বলতে হবে নাকি। দেশের বাইরে যা করো, করো। এখানে একটু দেখেশুনে চলো।

তাহলে কি কোহিনুর কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছে। আর সেটাই তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

যেন সে কথা আন্দাজ করেই এবার কোহিনুর বলে, আমার নিজের জন্য বলছি না। আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। নিজের ছেলে বড় হয়েছে। হাসানের কথা ভাবো।

কামালে মেজাজ ঠিক থাকে না। সে বোঝে ছেলেকে টেনে আনা উপলক্ষ মাত্র। আসলে জব্দ করাই তার মতলব। কথা বলতে গিয়ে তার স্বর চড়ে যায়, আমার ভালো-মন্দ চিন্তা করে লাভ নেই।

লাভ নেই, কেন। তোমার কি সাতখুন মাফ। কি তোমার এমন গুণ। লেখ, মানি। দু’চারটে বই লিখেছ। কি ছাইপাশ জানি না। ওরকম লেখক আজকাল হাটে-বাজারে। বুঝতাম তেমন কিছু একটা লিখতে পারলে। হ্যারল্ড রবিনস, আরভিন ওয়ালেস বা জন ক্ল্যাভেলের মতো।

সবাই এক ধরনের লেখক হয় না।

আমিও সে কথাই বলছি।

টেবিলের ওপর কিছু লেখা কাগজ ছিল। একবার মনে হলো সেগুলো কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলে বাতাসে ভাসিয়ে দেয়। কিন্তু সেটা হবে সস্তা রোমান্টিসিজম। কোহিনুর যে কথা বলেছে সেটা সত্য। সে যে নিয়মে চলছে সেটা পৃথিবীর নিয়ম নয়। চলতি নিয়মে প্রেম হতে পারে। এমনকি নারীসঙ্গ লাভও। তবে বিশেষ একজন কেউ নয়। যে যখন আসে। জানতে পারা যাবে না। কেউ খোঁজ রাখবে না। বড়জোর নষ্ট চরিত্র বলবে। তাতে আপত্তি নেই। অথচ বিশেষ একজনের জন্যে হৃদয় আকুল হলে সেটা নিন্দনীয়। এমনকি সেটা অন্যের পাকা ধান মই লাগানোর মতো না হলেও।

নিজেকেই নিজে শান্ত করে কামাল। অস্ফুট স্বরে বলে, তুমি যদি চাও, আমি আর লিখব না।

তুমি লিখবে কি লিখবে না, তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। তুমি খামোখা বিব্রত হচ্ছ কেন। একটা কথা বলি – তোমার কোনো কিছু নিয়ে ভালো-মন্দ লাগানোর অভ্যেস আমি ছেড়ে দিয়েছি। শুধু –

শুধু কি?

মানে হঠাৎ শরীর-টরীরে কিছু হলে ভাবি। দু’দুবার বিছানায় পড়লে। চল্লিশ পেরিয়েছে অনেকদিন। এখনও তেজি ঘোড়ার মতো চলতে চাইলে চলবে কেন।

হো হো করে হেসে ওঠে কামাল।

আমার শরীর – আমার শরীর ভালো থাকাটা বোধহয় তোমার জন্য খুবই দরকার। কারণ কোনো মহিলাই এদেশে তাদের স্বামীর আকস্মিক মৃত্যু কামনা করে না। ব্যাপারটা মানসিক ততটা নয়, যতটা অর্থনৈতিক।

কে আবার দরজায় টোকা দেয়। এবার সাহানা আপা। কোহিনুরের গাঢ় সবুজ রং-এর শাড়ির দিকে দৃষ্টি দিয়ে বলে, জানো তোমার বৌকে চমৎকার লাগছে।

কামাল কিছু বলতে পারল না। শুধু হাসল।

কোহিনুর বলল, নিজের বৌ-এর দিকে তাকাবার ওর সময় কই?

সাহানা ফোঁড়ন কাটে, কেন অন্যের বৌকে নিয়ে ব্যস্ত নাকি?

সে কথা তোমার ভাইকে জিজ্ঞেস করো।

সাহানা তার পক্ষ সমর্থন করে বলে, তোমরা খামোখা আমার ভাই-এর পেছনে পড়েছ কেন। হি ইজ স্যুইট পারশন।

বাইরে থেকে ওরকমই মনে হয়।

সাহানার তাড়া ছিল। সে কথায় কান দিয়ে বলল, তোমরা আর দেরি করো না। তোমাদের জন্যেই আজকের রিসেপশন।

কামাল জানাল, আমার প্রিপেয়ার হতে সময় লাগবে। একটা কুইক বাথ নেব ভাবছি।

আর কুইক বাথের দরকার নেই।

বেশ।

দ্বিরুক্তি করল না কামাল। আলমারি খুলে একটা শার্ট বার করে গায়ে চাপাতে যায়।

কোহিনুর ওখানা ওর হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বলে, থাক ঐ ট্রেডমার্ক ওয়ালা শার্ট আর পরতে হবে না। লোকজন ভাববে বোধহয় একখানাই সম্বল।

কাগজে মোড়া একখানা প্যাকেট ওর সামনে ছুড়ে দেয় কোহিনুর, এতে শার্ট, ট্রাউজার দুই-ই ইস্ত্রি করা। মোজাখানাও খুলে ফেলো।

কামাল কাপড় ছাড়া শুরু করে।

হাতব্যাগ থেকে কম্প্যাক্ট বার করে শেষবারের মতো চেহারা মেরামত করে নেয় কোহিনুর। তারপর ঠোঁটে খানিকটা লিপস্টিক মেখে নিয়ে বলে, খালি এদিক- সেদিক টোঁ টোঁ করে ঘুরে বেড়ালেই তো হলো না। নিজের কাপড়-চোপড়ের দিকেও নজর দেয়া চাই।

ভালো কাপড় হলে লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করব।

যা তোমার লোকজনদের ছিরি, তারা আকৃষ্ট হলে কিছু আকাশ ভেঙে পড়বে না।

তবু আমি একটু কম আকর্ষণীয় থাকতে চাই।

কোহিনুরের কথায় বিদ্রƒপের কটাক্ষ, আকর্ষণ আর বাড়াতে হবে না। বয়েসের গাছপালা নেই। কত হলো খেয়াল আছে?

নতুন মোজাখানা পায়ে টেনে দিতে দিতে বলে কামাল, কোহিনুর তুমি আসল জিনিসটাই বোঝো না। রূপ দরকার। তবে সর্বত্র নয়। তাহলে রবীন্দ্রনাথ, সমারসেট মম, বার্নাডশ’ এদের কি দশা হলো। তাদেরও অজস্র সুন্দরী ভক্ত ছিল।

বোধহয় তার যুক্তির ধার অগ্রাহ্য করার উপায় ছিল না। কোহিনুর দরজা খুলে বেরিয়ে আসার উপক্রম করে। দুম করে শব্দ হলো। যেতে যেতে বলল, তুমি এসো। এসব আষাঢ়ে গল্প শোনার আমার সময় নেই।

সে যখন এসে ঢুকেছে, তখন মেলা লোকজন। খুব আস্তে আস্তে নিজের নাম উচ্চারণ করে কিছু লোকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিল।

কামাল নিশ্চিন্ত কেউ তাকে তেমন একটা চিনতে পারেনি। অন্তত নামে তো নয়ই। যাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এলো, তাদের নামও ভালো করে মনে নেই।

মহিলারা একদিকে। তেমন দর্শনীয় কেউ নেই। অন্তত দৃষ্টি ধরে রাখার মতো।

তবু তার মধ্য থেকে কে একজন উঠে, এসে বলল, আজকাল আর লেখেন-টেখেন না?

কামাল লক্ষ করল প্রশ্নকারিণীকে তার দিকে না তাকিয়েই। বলল, অল্প স্বল্প।

‘দুরন্ত ঝড়’-এর পর আপনার কোনো বই পড়িনি।

ওটা তো বছর সাতেক আগে লেখা।

ততক্ষণে আরেকজন ঐ মহিলার সঙ্গে যোগদান করল। পূর্বোক্ত বক্তাকে লক্ষ করে বলল, আপনি তো তবু দিব্যি বই-এর নাম বলতে পারলেন। আমি ইন্ডিয়ান লেখকদের ছাড়া আর কারও নামও জানি না। উনি লেখেন নাকি?

মকসুদ এগিয়ে এসে ওর পক্ষে ওকালতি জুড়ে দেয়, লেখেন মানে কি। নাম-ডাক আছে। গতবারও প্রাইজ পেয়েছেন।

কামাল বাধা দেয়। আপনি খামোখা বাড়িয়ে বলছেন। ওসব কিছু না। বলতে পারেন লেখা টেখার অভ্যেস আছে।

তারপর দ্বিতীয় মহিলাকে কথার মাঝখানেই জিজ্ঞেস করে বসে, আপনি এদেশের কোনো লেখকের বই পড়েন না তাহলে?

না পড়ব কেন। পড়ার মতো হলে পড়তাম। কি নাম যেন বললেন আপনার?

কামাল নিজে নাম বলল। তারপর তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলল, আপনি অত কষ্ট করে মনে রাখবার চেষ্টা করবেন না। আপনি ফাইনাল পেপার দিতে বসেননি। নাম মনে না থাকলেও কোনো অসুবিধে হবে না।

কোহিনুর ওদের বারান্তরে লক্ষ করল।

ভদ্রমহিলা বোধহয় তার সঙ্গে কোহিনুরের সম্পর্কের কথা জানতে পেরেছে। তাই বলল, আপনার কেমন লাগে ওর লেখা?

কোহিনুর আড়চোখে তাকায়। তারপর বলে, কি জানি আমি বেশি বইটই পড়িনি।

বলেন কি, আপনি পড়েননি, পুরুষদের মধ্য থেকে কে একজন বেরিয়ে এসে বলে বসল।

কামাল ততক্ষণে মনে মনে বিরক্ত। হঠাৎ তার সাহিত্যের ভালো-মন্দের বিচারের ভার এই সান্ধ্য-বৈঠকের আলোচনায় বিষয়বস্তু না হলেও চলত। সেজন্যে সে একরকম গলা উঁচিয়েই বলে ফেলল, লেখক ছাড়াও আমার একটা আলাদা পরিচয় আছে।

সবাই হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।

কামাল ওদের হতবাক করে দিয়ে, সাহানা আপাকে খুঁজে পেতে এনে একরকম জড়িয়ে ধরে। বলে, আমি এই ভদ্রমহিলার ভাই। আর ওর স্বামী, মানে আপনাদের হোস্ট আমার ভগ্নিপতি।

দ্বিতীয় মহিলা, যার পরনে লাল শাড়ি বলল, আচ্ছা তা তো জানতাম না।

কামাল তার দিকে তাকিয়ে বলে, কোনো ইন্ডিয়ান লেখকের আত্মীয় হতে পারিনি বলে আশাকরি রাগ করেননি।

না না, কি যে বলেন। আচ্ছা আপনার বইগুলোর নাম বলুন তো। আনিয়ে নিয়ে পড়ব।

ততক্ষণে ভদ্রমহিলা হাতব্যাগ খুলে ছোট্ট নোটবুক বার করে ফেলেছে।

কামাল বলে যাচ্ছে, মেঘ-ঝড়-বৃষ্টি, রুপালি আকাশ, শেষ প্রহরের গান।

ভদ্রমহিলা খসখস করে লিখে নিল। বলল, ব্যস, আর লেখেননি?

না এমনকি যেগুলো বললাম সেগুলোও না।

তার মানে?

তার মানে ম্যাডাম এটা বই-এর ফিরিস্তি নেবার সময় নয়। এতদিন যদি না পড়ে থাকেন, খামোখা এখন আর প-শ্রম করে কী হবে।

কেন বই পড়ার জন্যে বিশেষ বয়েসের দরকার নাকি?

না। লেখার জন্যেও নয়। পড়ার জন্যেও নয়। আপনি ভুল করছেন। আমার বই সম্পর্কে আগ্রহ থাকলে বই-এর দোকানে সে কথা জানা যাবে।

ভদ্রমহিলা কলম ভাঁজ করে রেখে বলল, এটা আবার কি ধরনের ঠাট্টা হলো। আপনি বললেই তো পারতেন।

পেছন থেকে কড়া তামাকের গন্ধ আসছিল। পাইপের তামাকে খোঁচ দিয়ে বলল,  লুক, দিস ইজ নো ওয়ে টু বিহেভ উইথ এ লেডি। আপনি আমার ওয়াইফকে ইনসাল্ট করেছেন।

ভদ্রমহিলা পরিস্থিতি বাঁচানোর চেষ্টা করে। বলে, না না ইনসাল্টের কি আছে। বললে বলবেন। না বললে না বলবেন। আর তাছাড়া একজন অচেনা লেখকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চাইতে আরো ভালো কাজ থাকতে পারে। আমার মনে হয় এদিকটায় যাই। এদিকে বড় বেশি সিগ্রেটের ধোঁয়া।

কোহিনুর এসে দাঁড়ায় তার গা ঘেঁষে। বলে, এটা আবার কি ধরনের ব্যবহার। সবাইকে তোমার নাম মনে রাখতে হবে, তেমন তো কোনো কথা নেই।

কামাল সায় দিয়ে বলে, আমিও তো সে কথাই বলছি ডার্লিং। কোনো মানে নেই।

কামাল চলে এলো অন্যদিকের জটলায়। দেশের ভবিষ্যৎ, চালের দর, গালফ ওয়ার, গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির ভবিষ্যৎ, ইংলিশ ইস্কুলের অভাব ইত্যাদি নিয়ে কথা হচ্ছে। একজন আলোচনায় ইতি টেনে বলল, যতদিন আমাদের গ্রিড ও টেম্পটেশন না যাচ্ছে, ততদিন দেখবেন এদেশের কিছু হবে না।

ততক্ষণে এসে যোগদান করেছে কালো চেহারার লম্বামতো এক ভদ্রলোক। আলু-থালু বেশ। মনে হয় পরিশ্রান্ত।

সবাই চেঁচিয়ে উঠল, আমাদের আর্টিস্ট ইনাম চৌধুরী।

কামাল উঠে দাঁড়ায় অন্যদের দেখাদেখি। সবাই বলে, বসুন।

ইনাম চৌধুরী মাফ চায়। বলে, বসতে পারব না। আমার হাজারো ঝামেলা। নিশ্বাস ফেলার জো নেই।

কে একজন গ্লাসে ড্রিঙ্ক তৈরি করে তার দিকে বাড়িয়ে দেয়।

ইনাম চৌধুরীর প্রত্যাখ্যান করে। বলে, স্যরি গ্যাস্ট্রিকের ট্রাবল। এসব চলবে না।

তাহলে একটু লেবুর সরবত?

না, তাও পারব না।

কে একজন বলল, কিছুই পারবেন না, উপভোগ করবেন না, তাহলে কাজ করবেন কেন।

সাহানা জবাব জুড়ে দিয়ে বলে, এজন্যে যে খাবার রেডি। আর ইনাম ভাইকে ভালো করে না খাওয়ালে কস্মিনকালেও তার আঁকা ছবি পাব না। সুতরাং আপনারা আসুন।

এক মহিলা ফোঁড়ন কেটে বলে, ভালো, একটা ডিনার দিয়েই ইনাম চৌধুরীর পেইন্টিং পেয়ে যাচ্ছেন। আমাদের ভাই ওরকম লোক নেই।

ইনাম ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে ‘বো’ করে। কিছু বলে না।

কামাল খাবার টেবিলের দিকে গেল না। সেখানে রীতিমতো একটা জটলা। এই ভিড়ে খুব একটা সুবিধে হবে বলে মনে হলো না। যদিও দিনের বেলা না খাবার ফলে ক্ষিদে ছিল প্রচুর।

বাঁ-দিকের ক্ষুদে টেবিলে রাখা টেলিফোন। সেই ভিড়েই কামাল টেলিফোন করল। প্রার্থিত নম্বর ঘোরাল। অন্য প্রান্তে ঘণ্টা বাজল অনেকক্ষণ।

কে একজন টেলিফোন তুলল।

সে রুবির কথা বলল।

রুবি ঘুমোচ্ছে।

কেন?

ও আজ দুপুর থেকে দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে। বোধহয় শরীর ভালো নেই।

শরীর ভালো নেই?

পেছনে মকসুদ দাঁড়িয়ে। এই শেষের কথাটুকু ওর কানে গেল। জিজ্ঞেস করল, কার শরীর ভালো নেই? তোমার?

কামাল টেলিফোন রেখে দিয়ে থতমত খেয়ে যায়। বলে, হ্যাঁ আমার শরীর।

সিদ্ধান্ত মকসুদেরই। বলে, শরীর ভালো নেই। তার মানে খাবে না?

কামাল বলে, না। শরীর ভালো না থাকলে খাব কি করে।

সেদিন রাতে কোহিনুর আর বাড়ি গেল না। সাহানা, মকসুদ দু’জনই পীড়াপীড়ি করল, একদিন ফিরে না গেলে আর কি আকাশ ভেঙে পড়বে। থাকছ তো নিজের স্বামীর সঙ্গেই।

কাজকর্ম সেরে সাহানা নিজেই এলো একবার ওদের তদারক করতে। হাতে ধরা ছোট্ট ট্রে। তাতে দু’কাপ কফি।

কোহিনুর মাফ চাইল। বলল, আমি এক বেলাই খাই। চা কফি যাই বলুন।

সাহানা কামালকে আলাদা করে জিজ্ঞেস করে না। বানানো কফির কাপ ওর সামনে রাখে।

মামুলি ভাবেই জিজ্ঞেস করে সাহানা, তোমরা এ মাসটা থাকছ তো।

আমি ফিরে যাচ্ছি নেক্সট উইকে। ওর কথা জানি না।

কোহিনুর বলে, আমি পরশু সেতাবগঞ্জ যাবো।

সেতাবগঞ্জ কেন?

এতদিন পর এলাম, বাপ মা’র সঙ্গে দেখা করব না?

সাহানা মাথা নাড়ে। বলে, তা তো ঠিকই।

তারপর আবার নিজেই মনে করে বলে, ভালোই হলো। তোমার মকসুদ ভাই-এরও বড় শখ কক্সবাজার যাওয়া। সুবিধেমতো লোক পাওয়া যায় না।

ওর জানাশোনা এক ফ্যামিলি যাচ্ছে।

কামাল জিজ্ঞেস করে। কবে যাচ্ছে?

ওরা তো তৈরি। বললে কালই রাজি।

কামাল বলে, তাহলে যান।

তোমার অসুবিধে হবে না তো।

আমার আবার কিসের অসুবিধে।

সাহানা প্রবোধ দেয়, অবশ্যি তাই বলে খালি থাকবে মনে করো না। যতদিন খুশি থাকো। মালী আছে, কুক। তার ওপরও কাজের ছেলে। তিন তিনটে মানুষ। আগেই বলা আছে।

তাহলে আর অপেক্ষা কেন। বলে দিন।

হ্যাঁ, একদিনে তো পারব না। রাতটা চাটগাঁয় থাকতে হবে। বলে দিই তাহলে রোববার বিকেলের কথা।

কামাল উৎসাহের সঙ্গে বলে, আলবাৎ। দরকার হলে লোকজন তো রইলই।

সাহানা বিদেয় নিল। বলল, ও-বাবা রাত দুটো বাজতে চলে। এখন ঘুমোও।

সাহানা চলে গেলে কামাল মুখ খোলে। বলে, পরশু সেতাবগঞ্জ যাচ্ছ সে কথা তো জানি না।

কড়া জবাব কোহিনুরের, সব কাজ তোমাকে বলে করতে হবে নাকি।

ফিরছ কবে?

ঠিক নেই। নাও ফিরতে পারি।

ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে কামাল। কথা বলতে গিয়ে ওর স্বর চড়ে যায়।

তোমাকে একটা কথা বলতে চাই কোহিনুর বেগম। তোমার ঐ মার্টির মানে শহীদ হয়ে যাওয়া ভাবটা কথায় কথায় আমার ভালো লাগে না। সত্যি কথা বলতে এই টানাহেঁচড়া আর চলে না।

কি করতে বলো, রক্তচক্ষু কোহিনুরের।

আমি তো কিছু করতে বলি না। তবে তোমাকে দেখে মনে হয়, তুমি স্থির থাকতে পারছ না। সুতরাং –

কোহিনুরের মুখ খুলে যায়। বলে আমি কেন। কেউই পারত না। তোমার মতো অমন কুটিল স্বভাবের লোকের সঙ্গে এতদিন কী করে ঘর করলাম ভাবি।

এটা কি হঠাৎ উপলব্ধি করলে, না আগেই বুঝেছ।

বুঝেছি অনেক আগে থেকেই। শুধু ছেলেটার কথা ভেবে মুখ খুলিনি। ভাবো আমি কিছু বুঝি না?

আমি সে কথা বলিনি। কিন্তু তোমাকে সেসঙ্গে একটা কথা বুঝতে হবে। একজন লেখক হওয়ার কারণে বা দুর্ভাগ্যবশত আমি একজনের মনোপলি হয়ে থাকতে পারব না।

তা আর থাকছ কোথায়। হৃদয় তো যত্রতত্র ছড়িয়ে দিয়ে বসে আছ। আরো কিছু বাকি আছে? আমি খালি ভাবি, তোমার বয়েসের কথা একবারও মনে হয় না।

বোধহয় ঐ কথা বলতে গিয়ে নিজের বয়েসের কথাই তার মনে হয়ে যায়। আয়নার সামনে গিয়ে খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে চুলের ফিতে খুলল। কাঁটা ছুড়ে ফেলল। তারপর বিছানায় শুয়ে চাদরে মাথা ঢেকে ফেলল। বলল, একদিন মরে যাবো।

কামাল বলল, তা সবাই যাবে। তবে তোমাকে একটা কথা বলি তোমার এ বয়েসে এ ধরনের কথা ঠিক মানায় না। বাইশ-চব্বিশ বছরের তরুণী নও, তা জানো বোধহয়।

চোখের পলকে প্রলয়কা- ঘটে যায়। হঠাৎ বিছানার চাদর বালিশ ছুড়ে ফেলে দাঁড়িয়ে যায় কোহিনুর। কিছু বোঝার আগেই বাথরুমে ঢুকে পড়ে। দরজা টেনে দেয়। ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগানোর শব্দ।

কোথায় একটা দুশ্চিন্তা ধুক ধুক করে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে দরজায় টোকা দেয়। কোনো সাড়া পায় না।

ভেতরে কিছু শিশি বোতল ভাঙার শব্দ।

নিজেও কামাল রাগে কাঁপতে থাকে। শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, ওসব যদি করতেই হয়, অন্য কোথাও গিয়ে করো। এখানে নয়। অন্যের বাড়িতে এসেছ। বি নরম্যাল। স্ক্যান্ডাল করার ইচ্ছে থাকে বাইরে গিয়ে করো। খবরের কাগজে ভালো কভারেজ পাবে।

বলতে গিয়ে সে নিজেও খানিকটা ভয় পেয়ে যায়। হঠাৎ রাগের মাথায় কিছু একটা করে বসবে না তো!

অনেকক্ষণ পায়চারি করল। চিৎকার করে ডাকল। ফল হলো না। এক অদ্ভুত নীরবতা তাকে গ্রাস করে। যে কোহিনুর এতক্ষণ চিৎকারে পাড়া-পড়শি জড়ো করবে বলে ভয় করেছিল, সে এখন নীরব। নিশ্চুপ। হঠাৎ কিছু করে বসেনি তো? করার কথা নয় যদিও। তবু বলা যায় না। মানুষ কিছু করে না, করে না। আবার রাগের মাথায় অনেক কিছু করে বসতে পারে। এরকম নিদর্শন বিরল নয়। আসলে ঘটনা বা দুর্ঘটনা এভাবেই ঘটে।

অথচ পরিস্থিতিটা তার আয়ত্তের বাইরে। কোনো ধরনের করুণা বা সহানুভূতি নয়। তাকে জেনেশুনে বিপদে ফেলার জন্যে ইচ্ছাকৃত চাল কোহিনুরের। এ কথা অনেকবারই তাকে রাগের মাথায় বলতে শুনেছে, যদি কিছু করেই বসি, তোমাকে ফাঁসানোর জন্যেই করব। যাতে আইনের শেকল পায়ে এসে লাগে। প্রতিশোধ যদি নিতে হয়, প্রতিশোধটা এরকমই হবে। তার চলে যাবার সুযোগে কামাল যাতে          অন্তত নতুন কোনো মানুষ ঘরে না আনতে পারে, তার পাকাপোক্ত ব্যবস্থা।

নিজের মনে মনে পরিস্থিতিটা তলিয়ে দেখেছে। সে নিজে যেটাকে লঘু পাপ মনে করেছে, তার জন্যে কোহিনুর গুরুদ-ের কথা ভাবে কেন।

অথচ ব্যাপারটা একদিনে হয়নি। আস্তে আস্তে হয়েছে। জীবনে চলার পথে কোথাও ওদের বাঁধন একটু একটু করে ঢিলে হয়েছে। দু’জনের যে কেউ একজন উদ্যোগী হলে হয়তো মেরামত করে নেওয়া যেত। সে চেষ্টা হয়নি।

আসলে এখন এসময় সে একটা সিচ্যুয়েশন রক্ষা করতে চায়। কিছু হবে না। জোড়া লাগার নয় যে জিনিস, অকারণেই ভাঙে। মেলা তর্ক করা যায়। সুতরাং ভালো-মন্দের বিচারে যাওয়া নিরর্থক। শুধু সে কামনা করছে শান্ত, নিরুপদ্রব পরিবেশ। সবকিছু থিতিয়ে যাওয়া। জুড়িয়ে যাওয়ার অপেক্ষা। তারপর যার যার ভাগ্যের ললাট লিপিতে যা লেখা আছে। কিছু করা যাবে না। কিছু করা সম্ভবও নয়। প্রয়োজনও নেই।

খুলল। তক্ষুনি দরজা খুলল না যদিও। সকাল হয় হয়। ভেজা চুলে ঝাঁকুনি দিতে দিতে বেরিয়ে এলো কোহিনুর।

ব্যাখ্যা দেবার প্রয়োজন ছিল না। তবু বলল, কিছু একটা করেই ফেলতাম। শুধু ছেলেটার কথা ভেবে করিনি।

একথা শুনতে চায়নি কামাল। জানতেও চায়নি। তবু সে আশ্চর্যরকম শান্ত গলায় বলল, ফিজি ফিরে যাচ্ছি। কোনো অসুবিধে হবে না। যখন আসতে চাও এসো। তোমার ওপেন টিকেট। আমি গিয়ে টেলিগ্রাম পাঠাব।

কোহিনুর কিছু বলল না।

সাহানা এসে দরজা ধাক্কা দিচ্ছে। নাস্তা তৈরি।

কেমন ঘুম হলো, অসুবিধে হয়নি তো?

কামালকে কোনো সুযোগ না দিয়ে মিষ্টি হেসে নিয়ে বলল কোহিনুর, অসুবিধে হবে কেন। আমি তো বিছানায় গেলেই ঘুম। কাল বেশ একটু হালকা হালকা ঠান্ডা পড়েছিল।

আড়চোখে তাকাল কামাল। বড় সত্যি কথার মতো করে মিথ্যে বলতে পারে কোহিনুর।

কামালকে ঘন ঘন ঘড়ি দেখতে দেখে চটে যায় রুবি। বলে ঘড়ি দেখছ কেন। সময় না থাকলে না এলেই হতো।

আমতা আমতা করে কামাল, না প্লেন ধরতে হবে কিনা। তোমার এখানেই সর্বশেষ এ্যাপয়ন্টমেন্ট।

তারপর খানিক্ষণ থেমে গিয়ে আবার বলে, সময় নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। এখনও পাক্কা আড়াই ঘণ্টা। তবে যাবার মুখে একবার বত্রিশ নম্বরে ঢুঁ মারতে হবে।

বত্রিশ নম্বর কেন?

দুলুদের বাসায় যাইনি। এক ফাঁকে দেখা না করে গেলে হুলস্থুল কা- বাঁধিয়ে বসবে। বোঝো তো নিজের বোন।

চোখ পাকায় রুবি, তাহলে সর্বশেষ এ্যাপয়েন্টমেন্ট বলছ কেন।

আহা এক অর্থে তাই। আমি কোথাও যাবার কথা বলিনি। ওখানে বড়জোর পাঁচ মিনিট।

রুবি কিছুটা আশ্বস্ত। এক সময় পেছনের জানালায় পর্দা অল্প করে টেনে দেয়। টেবিলের ওপর রাখা ফলের গুচ্ছ নিয়ে নাড়াচাড়া করে। তারপর ঘাড় কাৎ করে আয়োজন মনঃপুত হয় কিনা দেখে নেয়। আর সেসঙ্গে বলে ফেলে, তোমার জন্য কি কা-টা করতে হলো তা তো জানো না।

কী কা-?

ঘরশুদ্ধ লোকের সঙ্গে ঝগড়া-ঝাটি। কথা কাটাকাটি।

আমাকে নিয়ে?

ঠিক তোমাকে নিয়ে নয়। তবে তোমাকে কেন্দ্র করেই।

কামাল সিগ্রেটে আরামের ফুঁ দিচ্ছিল। ওখানা বুঁজিয়ে দিয়ে বলে, অত ঝামেলা হলে ডাকার কি দরকার ছিল।

কোথায় যেন একটু রাগ, একটু বিরক্তি, একটু অস্বস্তি, কামাল নিজেও বোঝে না। বলেই ফেলে একসময়, জানো ওরকম করলে আমার অস্বস্তি লাগে।

তোমার অস্বস্তি?

হ্যাঁ। তুমি অত ঝামেলা পোহাতে যাবে কেন। কেন বাড়িশুদ্ধ লোকজনের সঙ্গে ঝগড়া-ঝাটি করবে। এটা ভালো হলো?

ভালো মন্দের বিচার তোমার কাছে কেউ চায়নি, বলেই কাছে ঝুঁকে আসে রুবি। বলে, ধরিয়ে দাও।

কী?

হঠাৎ মনে হলো রেগে গেলে, উত্তেজিত হলে রুবি সিগ্রেট ধরায়। দু’চার ফুঁ দিয়ে নিবিয়ে রাখে। বাসায় ঠিক খায় না। বলে, জানে সবাই খাই। তবে সামনাসামনি খাই না, এই আর কি।

কামাল নিজেই সিগ্রেট ধরিয়ে দিয়ে ওখানা বাড়িয়ে দেয়। সঙ্গে থাকলে কাজটা অহরহ তাকেই করতে হয়। নতুন কিছু নয়।

বড় বড় চোখ করে তাকায় রুবি। আসলেই ওর চোখ বড়। ফোলা ফোলা গাল। হাসলে টোল পড়ে। এতক্ষণ হাসেনি। টোলও পড়েনি। বড় বাতি চোখে লাগে বলে ওখানা নিবিয়ে দিয়ে হাল্কা পাওয়ারেরটা জ্বালায়। ওই কম আলোতেই ঝলমল করে ওঠে কানের লাল পাথরের দুল। পরণে নীলাভ রং শাড়ি। পায়ে হাল্কা স্যান্ডেল এবং তা থেকে বেরিয়ে আসা মেরুন রং নখ। কী যেন একটা ঘষতে থাকে স্যান্ডেলের তলায়।

ও কী করছ?

সিগ্রেট নেবাচ্ছি।

এ্যাশট্রে তো ছিল।

হ্যাঁ ছিল।

তাহলে?

তাহলে আর কি। ভালো লাগল।

কামাল মুখ ঘুরিয়ে বসে, তোমার ভালোলাগার ধারাটাও বড় বিচিত্র। বোঝা যায় না।

রাগের মাথায় যা আসে তাই বলে ফেলে রুবি, না বুঝলে বলছ কেন। চুপ করে বসে থাকো।

কামাল সঙ্গে করে একখানা প্যাকেট এনেছিল। তাতে রুবির জন্য একখানা শাল।

রুবি দেখে বলে, ওটা কি?

প্যাকেট।

খোলো।

রাগ চড়ে যায় মাথায় কামালেরও, ওরকম করে বলছ কেন।

কীভাবে বলব। ওহ গড্ তুমি আমার মাথা খেয়ে ফেলো। সেই সকাল থেকে ঘুমুতে পারিনি। প্রচ- মাথাব্যথায় মরছি। তার ওপর চটাং চটাং কথা।

আমাকে কি করতে হবে শুনি।

কিছু না, প্যাকেটটা খুলতে বলছি।

ওটা যদি তোমার না হয়।

তাহলেও খুলতে হবে।

ঐ অতি হুকুমের মাথায় কামাল তার স্বভাব গাম্ভীর্য হারিয়ে ফেলে। হেসে দেয়। হেসে ফেলে রুবিও।

কামাল বলে, যাক দেখলাম শেষটায়।

তোমার গালের ঐ টোল। ভয় ছিল বোধহয় আর দেখব না।

বোঝা গেল পরিবেশ শান্ত হয়েছে। একটু ঝড়-ঝাপটার পর এরকমই হয়। সবকিছু থিতিয়ে আসে। আবার স্বাভাবিক। একসময় ওর ডান হাতখানা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে খেলা করতে থাকে কামাল।

রুবি বাধা দেয়, উঁহু। ডোন্ট…।

ওর হঠাৎ ইংরেজি ধমকের চোটে নিরস্ত কামাল। নিস্তেজভাবে হাতখানা ছেড়ে দেয়। সেই ছাড়া পাওয়া হাতখানা নিজের মাথার ওপর বুলিয়ে নিয়ে একগুচ্ছ বিভ্রান্ত চুলের গোছা ঠিক করতে করতে এক মুখ হাসি ছড়িয়ে বলে রুবি, তাহলে চলেই যাচ্ছ।

হ্যাঁ। ছুটি তো শেষ।

কী রকম লাগে? এই বিদেশ বিভুঁইয়ে থাকা।

বোরিং।

মাই গড। সিলিং-এর ওপর চোখ তুলে নকল রাগের ভঙ্গিতে বলে, অমন ডাহা বিশুদ্ধ মিথ্যে আমি শুনিনি।

কামাল ততটা রসিকতার কিছু দেখে না। বলে, আসলে কিছুদিন বাইরে না থাকলে বুঝবে না। এখান থেকে সবই স্বর্গীয় মনে হয়। সুন্দর মনে হয়। মনে হয় রোমান্টিক। পাঁচ-সাত বছর কাটালে বোঝা যায়।

ওর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে রুবি। মাথাটা একদিকে কাৎ করে টেনে টেনে কথা বলে, কেন কোনো সুন্দরী দেখোনি। মানে বৌ-এর কথা বলছি না।

দেখব না কেন।

তাদের সঙ্গে মন দেয়া-নেয়া হয়নি?

বড় বাজে ধরনের প্রশ্ন করো।

প্রশ্ন মাত্রই বাজে ধরনের হয়। তা না হলে হয় চাটুকারিতা।

এইবার ঠিকই আরেকবার ঘড়ি দেখল কামাল। নড়েচড়ে বসল। বলল, আমাকে কিন্তু পৌনে দশটার মধ্যে ছেড়ে দিতে হবে।

যাও।

মানে?

যাও। ধরে রেখেছে কে?

এখুনি বলিনি। আধ-ঘণ্টা পর।

কেন প্লেন ফেল করার ভয়?

বললে সারারাতও থাকতে পারি।

সে কথায় ভ্রƒক্ষেপ না করে রুবি বলল, আধ-ঘণ্টার আগেও ছেড়ে দিতে পারি। আবার আধ-ঘণ্টা কেন সারারাতও থাকতে পারতে যদি এটা আমার বাসা হতো। আনফরচুনেটলি বাসা আমার নয়। সুতরাং অধিকারও নেই।

তারপরও কথা ঘুরিয়ে বলে, পনেরো মিনিটের মধ্যে তোমার খাবার নিয়ে আসতে বলব।

কিন্তু তার আগেই ট্রলিতে খাবার এলো। গুনে গুনে সাতটি আইটেম।

কামাল বলল, আমি তো অত খেতে পারব না।

ওর হাতে প্লেট তুলে দিয়ে বলল রুবি, পারব না বললে তো হবে না। আমার হাতে তৈরি। বিশেষ করে ঐ আইটেমটা – নুডলস।

আর দুঃখের কথা কি জানো, ঐ আইটেমটাই আমার গলা দিয়ে যায় না।

তার মানে?

কি জানি বোঝাতে পারব না। ওসব জট পাকানো সুর সুতোর মতো জিনিস দেখলে মনে হয় গলায় আটকে মারা যাব।

এটাতে কিছু হবে না। আমার তৈরি।

‘আমার তৈরি’ – কথাটার ওপর জোর যদিও, কামাল ইতস্তত করে।

রুবি বড় চামচে জড়িয়ে বেশ খানিকটা তুলে দেয় ওর প্লেটে।

অসুবিধে হয় সন্দেহ নেই। সুতোর মতো খানিকটা এসে পড়ে ওর টাই-এর ওপর। খানিকটা নিচে।

ন্যাপকিনে মুখ মুছে নেয়। বলে, আমাকে সহজ ধরনের কিছু দিলে ভালো হয়। এটা আমার সামলাতে কষ্ট হয়।

বলেই কামাল জিব কাটল, ছি ছি এতক্ষণ মনে হয়নি। দেখো কি কা-। আমি একা একা খেতে বসেছি। আর ওদিকে তুমি –

ততক্ষণে আরেকখানা সিগ্রেট ধরিয়ে পা দিয়ে তাল ঠুকছে রুবি। এক কথায় তাকে শান্ত করে দিয়ে বলে, আমি তো রাত দশটা-এগারোটার আগে খাই না।

তবে আমাকে ইনসিস্ট করছিলে কেন?

ইনসিস্ট করছি না। করি না।

কামাল বুঝল এ পথে এগিয়ে সুবিধে হবে না। তাই বলল, অন্তত আমাকে সঙ্গে দেবে না?

দেবো কফিতে।

এ মেয়ের সঙ্গে তর্ক করা বৃথা। কামাল হাল ছেড়ে দেয়।

তোমার যেমন খুশি।

খুশি-অখুশির প্রশ্ন নয়। কামাল তোমাকে বুঝতে হবে আমার শরীর ভালো নেই। আই অ্যাম সিক। রাতে দু’বার বমি হয়েছে। রাতে কি হয়েছিল জানো না। আই ওয়াজ ডাই-ইং। কলাপস করে গিয়েছিলাম। আর তুমি বলছ খাও। হোয়াই ডোন্ট ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড?

ওর হাতখানা নিজেই এবার টেনে নেয় রুবি। ঘড়ির ওপর হাত চেপে ধরে বলে, দেখতে হবে না। বিকজ আমি পাঁচ মিনিটে তোমাকে যেতে বলব।

কেমন অবাক হয় কামাল। এবং নিরাশ। পাঁচ মিনিট?

হ্যাঁ, কফিটা শেষ হলেই।

কফি যদি শেষ না হয়। আবার যদি কফি চাই।

তাহলে অপেক্ষা করব। আবার কফি খাবে। তবে না খাওয়াই ভালো, হঠাৎ ওর যুক্তিতর্ক প্রিয় মন কথা বলে ওঠে। এক মিনিট।

বলে উঠে দাঁড়ায় রুবি। ভেতরে যায় পর্দা সরিয়ে। কামাল একা। সে যেন এ বাড়ির কোনো কামরায় বসে নেই। এক নিভৃত দ্বীপে বন্দি। বাড়িতে আরো লোকজন। আরো মানুষ। তাদের সকলের দৃষ্টির অগোচরেই তার আসা যাওয়া। কারও সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। লোকজন কি ভাবে, কে জানে। এ বাড়ির একটি মেয়ের সঙ্গেই সে দেখা করতে আসে। কথা বলে। সাহসী মেয়ে তাকে সাহচর্য দেয়। চা খাওয়ায়। খাবারেও ডাকে। ঘরের চারদিকে তাকায়। একদিকে ফ্রেমে বাঁধানো একটা ছবিতে বেগবান অশ্বের রেশ ধরে হাতে চাবুক হাতে ব্রিচপরা একটি মেয়ে। মনে মনে একটি তুলনার লোভ তাকে পেয়ে বসে। ঐ কশাঘাত বিদ্ধ অশ্বটি বোধকরি সে নিজে। আর ঐ আপাত নিষ্ঠুর মেয়েটি রুবির প্রতিচ্ছবি। কিন্তু তাই বা কি করে হয়। রুবি তো নিষ্ঠুর নয়। বড় জোর একরোখা। বড় জোর একগুঁয়ে। তুলনা ঠিক হলো না। রুবি দরজা দিয়ে কোনো ঘরে গেল কে জানে। পাশের কামরায় আছে কেউ নিশ্চয়ই। হয়তো তার অবস্থানের কথা জেনেই সেখানে নিচু গলায় ফিসফিস শব্দ। সতর্কতার সঙ্গে পদচারণা।

রুবি একদিন নিজেই বলেছে, জানবে না কেন। বাড়িশুদ্ধ জানে এখানে এলে তুমি আমার সঙ্গেই দেখা করতে আসো। তুমি আমার পছন্দের মানুষ। বিশেষ ব্যক্তি। হতে পারে আমার অবর্তমানে তোমাকে নিয়ে ভাবনা-চিন্তা। গুঞ্জন। কিন্তু ওসব নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই।

আবার কখনও দিল দরাজ হলে বলে, জানো তোমার কাঁধে মাথা রেখে আমি এ মুহূর্তে গোটা পৃথিবীটাকে তুচ্ছ করতে পারি। এক প্রলয়কা- ঘটে যেতে পারে। একটা ভূমিকম্প হয়ে যেতে পারে ততক্ষণে। আমার কিছু এসে যায় না।

সুদৃশ্য মোড়কে বাঁধা একটি প্যাকেট হাতে রুবি এসে ঢোকে। এবার নিজেই ওর ক্ষুদ্রাকায় হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলে, এবার তোমাকে উঠতে হয়।

আমি ইচ্ছে করলে আরো পনেরো মিনিট বসতে পারি।

তা পারো। কিন্তু আমি তোমাকে এখুনি বিদেয় করতে চাই, বলে নিজেই দরজার পাট খুলে দাঁড়িয়ে থাকে।

উঠে দাঁড়াতেই প্যাকেটখানা হাতে ধরিয়ে বলে, তোমার জন্য ছোট্ট একটা গিফ্ট।

খুলে দেখতে পারি।

এখন না। পরে দেখো।

কী আছে বললে না?

কৌতূহল ধরে রাখতে পারো না?

না।

কিছু না। একটা শার্ট, একটা টাই।

তুমি বললে টাকা নেই।

কপর্দকশূন্য।

তাহলে?

তাহালে আর কি। চালিয়ে নি। তাই বলে একটা কিছু কিনে দিতে পারব না?

টাকা-পয়সা ছিল না। কি দরকার ছিল মিছি মিছি।

রুবি চোখ পাকায় নকল রাগের ভঙ্গিতে, দেখো সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে টাকা-পয়সা প্রসঙ্গ তুলো না। তেমন অসুবিধেয় পড়লে তোমার দেয়া শালখানা বিক্রি করে দেবো।

কী করে জানলে ঐ প্যাকেটে শাল?

জানি না। অনুমান করছি। যদি আরো কিছু মূল্যবান হয়, ভালো। বাজারে বেশি পয়সা পাব। এখন গুডবাই। পারলে এয়াপোর্ট থেকে টেলিফোন করো।

তখন তো রাত পৌনে বারোটা বেজে যাবে।

বারোটার মধ্যে হলে করো। তা না হলে দরকার নেই।

ভেতরেই থেকে গেল রুবি। দরজার ওদিকে। শুধু মৃদু করুণ হেসে একখানা হাত বাড়িয়ে বলল, টেক কেয়ার অব ইউ।

একরকম এয়ারপোর্ট থেকে ফিরেই এসেছে বলা যায়। প্লেন সাত ঘণ্টা লেট। সুতরাং ওখানে বসে কি লাভ।

প্রথমবারের মতো বাসায় ফিরে তার নিজের বড় নিঃসঙ্গ মনে হলো। যদিও সাহানা আপা বলে গেছে বাড়িতে তিন তিনজন লোক। তাদের কাউকে ডেকে লাভ নেই। বুকের ভেতর হালকা হালকা ব্যথা। মাঝে মাঝে তীব্র হয়ে ওঠে।

হঠাৎ কিছু হয়ে গেলে বলার মতো কোনো লোকের কথা মনে এলো না এই রাতে। কোহিনুর পরশু তার দেশের বাড়িতে গেল ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে। সাহানা আপার গেল আজ বিকেলে। সুতরাং এই রাতে কাছে ডাকার, ভরসা দেবার মতো কোনো লোকের কথা মনে এলো না। রুবির কথা মনে হয়েছে। কিন্তু রাত তিনটেয় তাকে ডাকতে যাবে কোন সাহসে।

সারারাত বিছানায় ছটফট করল। অতি কষ্টে বাসার একজনকে সঙ্গে নিয়ে ডাকঘর থেকে ডাকল রুবিকে পরদিন সকাল।

রুবি অবাক। বলে, কোত্থেকে। যাওনি?

কামাল বলল, কথা বলতে পারছি না। খারাপ লাগছে। বুকের ভেতর কেমন ব্যথা। শিগগির চলে এসো।

কামাল ঠিকানা দিলো।

ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে রুবি। সঙ্গে তারই সমবয়েসি একজন – সম্ভবত কাজের মেয়ে।

এসেই হাঁপাতে থাকে। বলে, খবর পেয়েই ছুটে এলাম। মেয়েটিকে দেখিয়ে বলল, বাসায় কেউ ছিল না। আম্বিয়াকেই সঙ্গে করে রিকশায় এলাম।

একসময় লক্ষ করে এসব বৃত্তান্ত শোনার মতো অবস্থা তার নয়। কাছে এসে বিছানায় বসে।

কামাল একবার উঠে বসার চেষ্টা করে। রুবি নিরস্ত করে। জোর করে শুইয়ে দিয়ে বলে, কাল রাতে খবর দাওনি কেন।

গলার স্বর বেরোয় না। প্রায় অস্ফুট স্বরে বলে, ব্যবস্থা ছিল না।

কেন এ বাড়িতে টেলিফোন নেই?

আছে ওপর তলায়। কামরা বন্ধ। বাড়ির সব বাইরে।

তোমার বৌ কই?

ওর তো আগেই বাপের বাড়ি যাবার কথা ছিল।

আর তোমার ছেলে?

সেও মায়ের সঙ্গে।

রুবি খানিক্ষণ কি খোঁজাখুঁজি করে। তারপর বলে, সিগ্রেট আছে?

না। আনিয়ে দিচ্ছি।

না থাক।

না কেন। লোক আছে আনিয়ে দি।

তাহলে দাও।

বিছানার পাশেই কলিং বেল। ওখানা টিপতেই ভেতর থেকে বারো-চৌদ্দ বছরের একটি ছেলে এসে ঢুকল। খানিকক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল রুবির দিকে। এ বাড়িতে তার উপস্থিতির কার্যকারণ তার বোধগম্য নয়।

কি দেখছিস, তাকে ধমকে দেয় রুবি।

তারপর নিজেই ব্যাগ থেকে টাকা বার করে সিগ্রেট আনতে পাঠায়।

রুবি ওর গায়ে হাত দিয়ে চমকে যায়। জ্বর।

বুকের ওপরটা চেপে ধরে কামাল। বলে, ওটা কিছু নয়। অসম্ভব ব্যথা বুকে। রুবির হাতখানা ধরে রাখে। বলে, বড় সমস্যা রুবি। ব্যাকরণের নিয়মে সংসার করা হলো না। কাব্যের নিয়মে প্রেম করা হলো না। কি হবে আমার?

তোমার কিছু হবে না। ওকে সান্ত¡না দেওয়ার জন্যে বলে, শো মি ইওর হ্যান্ড। তারপর নিজেই ওখানা টেনে নিয়ে দেখে, কি লম্বা লাইন অব লাইফ। ক্ষেপেছ, কম করে হলেও সত্তর চুরাশি। এনি ওয়ে এখন কথা বলো না।

সিগ্রেট আনতেই একখানা ধরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, তোমার বৌকে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছ?

নাঃ।  মনে হচ্ছে এবার তোমাদেরই পাঠাতে হবে। কনডোলন্স মেসেজ।

মুখের ওপর হাত চেপে ধরে। বলে, খবদ্দার। এসব বলবে না। আমি আজমিরে গিয়েছিলাম গত বছর মে মাসে, বলিনি তোমাকে? তোমার জন্যে দোওয়া চেয়ে এসেছি।

কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল। তবু জিজ্ঞেস করল, কী চাইলে?

শান্তি।

আমার জন্যে?

হ্যাঁ।

আর তোমার জন্যে?

শান্তি।

ব্যথা ক্রমশই বাড়তে থাকে। ভীষণ ঘামতে থাকে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, জানতাম একদিন এরকম হবে। যন্ত্রণা হবে। কষ্টে ছটফট করব। সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলব। পরদিন লোকজন বিছানায় তোমার ক্লিপ আর সেফটিপিন খুঁজে পেয়ে রসালো গল্প জুড়ে দেবে।

নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তবু ডাকল, রুবি?

হুঁ।

তোমার জন্ম আর বিশ বছর আগে হতে পারত।

তোমারও পরে হতে পারত।

তার গলার স্বর ক্রমশই মিলিয়ে যেতে থাকে।

রুবি দাঁড়িয়ে যায়। তার অসহায় অবস্থা লক্ষ করে নিজেই কেমন দিশেহারা। চেঁচিয়ে ওঠে, ছাই আমার কিছু মাথায় আসছে না। মাস্ট কল্ সাম ওয়ান।

রুবি দরজার দিকে পা বাড়ায়।

প্রায় আর্তনাদের সুরে বলে ওঠে কামাল, চলে যাচ্ছ?

ডোন্ট ওয়ারি। এক দৌড়ে টেলিফোন করে আসি।

যেতে যেতে কামালকে সান্ত¡না দিয়ে যায়, যাবো আর আসব।

তেমন ভরসা পায় না কামাল। বলে, একা থাকব? ভয় করছে।

একা থাকবে কেন। আম্বিয়াকে দেখিয়ে বলল, ও থাকল। নিজে উঠে পানি ঢালতে যেও না। যা দরকার ওকে বলো।

খানিক্ষণেই ফিরে এলো। ধারে কাছেই ফোন ছিল। হালকা করে কামালকে ডাকল। কোনো সাড়া পেল না।

ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। কোনো তৃতীয় ব্যক্তির অস্তিত্বের কথা ভেবে সে বিব্রত হলো না। কামালকে জড়িয়ে ধরে তার বুকের ওপর পাগলের মতো মুখ ঘষতে ঘষতে বলল, তোমার কিছু হবে না কামাল। আমি বলছি ভালো হয়ে যাবে। হ্যাভ কারেজ।

চেতনা অর্ধ-চেতনার দুর্লঙ্ঘ সীমানায় থেকে সে যেন কুয়াশার মতো হালকা আর ঘোলাটে হয়ে মিশে যাচ্ছে। কখনও আবছা, কখনও গাঢ় অন্ধকার। চোখ বুজলেই যেন দেখবে ঝুলছে সবুজ আর লাল মখমলের ভারি পর্দা। ঝুপ করে যেন পড়বে ওখানা। আর অনাবশ্যক আবর্জনার মতো ঢাকা পড়ে যাবে সে।

পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল। ভারি অথচ সতর্ক। এসে থামল তার বিছানার কাছেই।

কষ্ট হচ্ছে চোখ মেলতে। তবু আধো আধো যেটুকু দেখছে লোকটিকে অনুমান করতে অসুবিধে হয় না। রুবির তলব পেয়েই ছুটে এসেছে তার বাবা আবু শরীফ।

দাঁড়িয়েই ছিল রুবি একধারে। এক সময় কান্নায় ভেঙে পড়ে। শরীফ সাহেব বোঝে খাটে শোওয়া ঐ অসহায় মানুষটির জন্যে তার মেয়ের কাতরতা।

রুবি বাবার দিকে ঘুরে মুখ ঢেকে ফেলে। কাঁপা কাঁপা গলায় শুধোয়, আমাকে ভালোবাস?

শরীফ সাহেব কথা খুঁজে পায় না। বুকে জড়িয়ে ধরে যেন নিজেও অনেকটা ভেঙে পড়ে। বলে, কি বলছিস মা। নিজের মেয়েকে ভালোবাসব না?

রুবি তখনও সাহেবের বাহু সংলগ্ন। এক একবার কান্নায় ওর সারা দেহ কেঁপে ওঠে আর বলতে থাকে, বাবা ওর কিছু হলে আই উইল ডাই। আই উইল ডাই, ফর আই নিড্ হিম।

শরীফ সাহেব নিজেকে কোনোমতে মেয়ের কাছ থেকে একরকম জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, মা আমি এ্যাম্বুলেন্সে ডেকে নিয়ে আসি।

কথাটা তার কানে এলো। দূর-দূরান্ত থেকে ভেসে আসা কিছু শব্দমালা। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কোথায় তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সে তো বেশ ছিল এই অন্তরঙ্গ পরিবেশে, সতর্ক পরিচর্যায়। চোখ বুজে আসছিল। কপাল হালকা শিশিরের মতো কী যেন তাকে ভরে দিলো এক অপূর্ব øিগ্ধতায়। রুবি ফ্লাক্সের পানিতে তার সবুজ রং রুমাল ভিজিয়ে আলতো করে কপাল মুছে দিচ্ছে।

ক্লান্ত। কিন্তু তবু শান্তি। প্রকৃত স্বস্তি। উদ্বিগ্নতার ঢেউ ক্রমশ বুদ্বুদ মিলে যাচ্ছে দূরের কোনো তট রেখায়।

সে ব্যাকুল হয়ে কী যেন খুঁজল। হাত বাড়াল। এবং নাগালের মধ্যেই পেয়ে গেল। রুবির হাত তার হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা। এ যুগের রাগী, প্রতিবাদী এক মেয়ের কাহিনী। ঘুনে ধরা সমাজের লৌকিকতাকে ভ্রƒকুটি করেও যে ভীষণ আত্মসচেতন। বয়েস ঐশ্বর্য বা পদমর্যাদার মানদণ্ডে  মানুষকে বিচারে যে প্রয়াসী নয়। যে বাঁচার আনন্দে বাঁচে। বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়। হৃদয়-নিঃসৃত আলোয় আলোকিত যার পরিমণ্ডল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *