লোকজন

রিপোর্ট খাতা সঙ্গে নিয়ে প্রায় আদ্ধেক পথ চলে এসেছে। এখন আবার ডাক্তারের চেম্বারে ফিরে যাবার মানে হয় না। নতুন কিছু জিজ্ঞেস করার নেই। তেমন মনে করলে তখুনিই বলতে পারত। অকাট্য যুক্তি। কিন্তু সবসময় যুক্তির শাসন চলে না। ফিরতি যাত্রায় কিছু না হোক খানিকটা সান্ত¡না মিলতে পারে। যেটার এ মুহূর্তে সে বড় কাঙ্গাল। ভরসার কথা নাইবা থাকল। তবু ডাক্তার নিজে থেকেই বলুক। এটা যদি তার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত মামলার চূড়ান্ত রায় হয়ে থাকে, খোদ জজের মুখেই শোনা ভালো।

ভারি ক্লান্তি লাগছিল। প্রথমবার একনাগাড়ে, না জিরিয়ে অতটা পথ যেতে পারবে কিনা ঘোর সন্দেহ ছিল। অথচ এবার কি ভীষণ এক উত্তেজনা আর অসহিষ্ণুতা তখন তাকে চাবুকের মতো তাড়া করে ফের ডাক্তারের চেম্বারের সামনে হাজির করল, টেরও পেল না। বিকেলে ভিড় ছিল না। এখন ভেতরে-বাইরে লোকজনের গিজগিজ। এসময় ডাক্তারকে ধরার সম্ভাবনা কম। সাক্ষাৎ লাভ যদিও ঘটে, সম্ভবত একটি ত্বরিৎ ভ্রƒকুটির ইঙ্গিতই তাকে নিরস্ত করতে যথেষ্ট।

না বুঝেশুনে আবার এতটা পথ না এলেই হতো না। নিজের ওপর রাগ হলো।

মকবুল সাহেব আপনি। বাইরে দাঁড়িয়ে কেন, কিছু বলবেন?

নিজের নাম উচ্চারিত হতে শুনে চমকে ফিরে তাকাল। চেম্বারের ভেতর থেকেই তাকে দেখতে পেয়েছে এখলাস। ডাক্তার রাব্বানীর এ্যাসিসটেন্ট। স্মার্ট, চটপটে। সদাব্যস্ত, ছুটোছুটি। তবু মুখে হাসির আমেজ। তাছাড়া লক্ষ করেছে মকবুল, তার প্রতি যেন একটু বাড়তি দরদ। অথবা অনুকম্পা। বড় কথা, ছেলেটা তাকে সমীহ করে। গায়েপড়ে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করে।

রিপোর্ট পাননি?

পেয়েছি। ভেবেছিলাম আরেকবার…

বুঝে ফেলেছে এখলাস, এত করে বোঝাবার দরকার নেই। এরকম দ্বিধাগ্রস্ত রোগী সে তো জীবনে প্রথম দেখছে না। আদ্ধেক বললেই পুরোট বোঝে।

মকবুলের গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না। ওর কানের কাছে মুখ এনে সন্দেহের কথা ব্যক্ত করে, আরেকবার ডাক্তার রাব্বানীর সঙ্গে কথা বলে নিলে হতো না?

এখলাস যেন তার দুরুদুরু ভয়ের কালো বেড়াল আগেই খপ্ করে ধরে ফেলেছে।

আপনি খামাখাই ভাবছেন। দেখা করতে চান করিয়ে দেবো এক ফাঁকে।

এখলাস না বললেও মকবুল জানে, হয়তো বসতে হবে তার জন্যে। অপেক্ষা করতে হবে। তা হোক। আপত্তি নেই। তার দরকার একটু প্রবোধ বাণী, সামান্য আশ্বাস। আশঙ্কার দীর্ঘছায়ারা তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। উপায় নেই এছাড়া তাদের নিরস্ত করার।

পলকে ঘুরে গেল এখলাস তার সামনে দিয়ে। বলল, ভাববেন না স্যার, ম্যানেজ করে ফেলব।

বলেই অদৃশ্য। মকবুলের নিজেরও বিশ্বাস : বলেছে যখন, পারবে। করিৎকর্মা ছেলে।

ডাক্তার না হয়েও কম যায় না। ইঞ্জেকশন, ব্লাডপ্রেসার এসব তো আছেই। তার ওপরও মুখে মুখে ব্যবস্থাপত্র। তাড়াহুড়োর রোগীরা তেমন আপত্তিও করে না। বরং দশ-বিশ টাকা হাতে গুজে দিয়ে বিদায় নেয় সেদিনের মতো।

নিজেই দেখেছে মকবুল, কেউ সহজে তাকে ঘাটা তো না। সময়ের কাঁটা ধরে যারা আসে তাদের কথা আলাদা। তবু ব্যতিক্রমের লোকদের ছাড়পত্র পাইয়ে দেবার কলাকৌশল তার আয়ত্তে।

আবার ইচ্ছে হলে এক কথাতেই কাউকে বিদেয় করে মুখের ওপর বলে, খামোখা এসব কেস নিয়ে ডাক্তার রাব্বানীর কাছে আসেন কেন? যান না কোনো এম. বি. বি. এসের কাছে। ডাক্তার মোক্তার, ডাক্তার আকরামের ওখানে। এসব দেখার সময় কই। নিজেই তো দেখেছেন।

চেম্বারের ভেতরেই ঘসা কাচে মোড়া একজামিনেশন রুম। বাইরে বসেও আন্দাজ করা যায় ডাক্তার রাব্বানীর ব্যস্ততা। প্রতিফলিত ছায়ারা কাচের ওপরে বড় হয়ে ওঠে। সাপের ফণার মতো স্টেথেসকোপ ছোবল মারে দেহের যত্রতত্র। ক্ষুধে বর্শা ফলকের মতো দেখায় হাতের থার্মোমিটার।

একসময় হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে আসে এখলাস। বলে, কই দিন তো স্যার আপনার রিপোর্টখানা। মকুবল তার পেছন পেছন ধাওয়া করে।

একটা কথা মকবুলের বোধগম্য হয় না। লোকটি কী সুবাদে তাকে ‘স্যার’ বলে ডাকে। তার জীবনে বিরল হয়ে আসা এই সম্বোধন শুনলে ভয় লাগে। কোনো বাজে রসিকতার ঠাট্টা নয়তো।

জোড়া দরজা ফাঁক হয়ে যায়। বেরিয়ে আসে ডাক্তার রাব্বানী। হাতে ধরা রিপোর্টখানা।

যদিও প্রায় মুখোমুখি, সরাসরি তাকাতে ভয় করে। চোখ নাবিয়ে নেয়। আর সে অবস্থাতেই অনুভব করে সহানুভূতির নিস্তেজ একটি হাত আলতোভাবে তার কাঁধের ওপর।

যেন খানিকটা ভরসা পায় মকবুল। চোখ তুলে থাকায়। শুনতে পায় ডাক্তারের গলায় স্বর। শান্ত, গাঢ়।

রিপোর্ট আমি দেখেছি। সিরিয়াস কিছু নয়। মিছে ঘাবড়াবেন না।

সেই ফাঁকেই রিপোর্টখানা হাতে ধরিয়ে দেয় এখলাস। সম্ভবত বাইরে কোনো ‘কল’-এ যাবার প্রস্তুতি।

ঠিক কী করা উচিত এ পরিস্থিতিতে ভেবে পায় না মকবুল। ডাক্তার নিজেই তাকে উদ্ধার করে।

আপনিও আগের ওখানেই।

মকবুল মাথা নাড়ে।

তাহলে উঠে পড়–ন আমার সঙ্গে। যেতে যেতে কথা হবে।

গাড়িতে গিয়ে বসল। অতিষ্ঠ ভাবখানা গেল না। অনেকক্ষণ বাইরে ছিল বলেই কিনা মনে হলো ভেতরে বরফশীতল এ্যান্টিসেপটিক পরিবেশ। ওরা পাশাপাশি। নিঃশব্দ মুহূর্ত। নিরিবিলি রাস্তাঘাট। শীতের সন্ধে। এমনিতেই লোকজনের আনাগোনা কম। টায়ারের পত্পত্ শব্দ। হঠাৎ ঝলসিত হেডলাইট। একটি গাড়ি উলটো দিক থেকে প্রায় গা ছুঁয়ে চলে যায়। সম্ভবত ভেতরের এই গুমোট হাওয়ার হাত থেকে পরিত্রাণের লোভেই বাঁদিকের জানালা অল্প করে খুলে দেয় ডাক্তার রাব্বানী। তারপর সেই সীমাবদ্ধ পরিসরে যতটকু পারা যায় হাত-পা ছড়িয়ে বাঁ হাতে ক্লান্তির হাই ঠেকিয়ে বলে, আপনি ওয়ারি করবেন না।

সম্ভবত কথাটা তেমন জোর সান্ত¡নাদায়ক হয়নি বিবেচনায় ওর একটা হাত নিজের মুঠোয় তুলে নেয়। বলে দেখুন, কোনো কিছু নিয়েই কেউ ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে না। নিশ্চয় করে বলা তো দূরের কথা। ডাক্তাররা অনুমান করতে পারে মাত্র।

সায় দেবার কারণেই নিরাসক্ত গলায় বলতে শোনা গেল মকবুলকে, তা তো বটেই।

কিন্তু তার এই আর্তস্বর চাপা পড়ল পেছন থেকে ধাওয়া করা গর্জনশীল একটি বাসের অভদ্র হর্নের চিৎকার।

বাস চলে যেতে মকবুল আবার শুনতে পায় ডাক্তারের গলা। ধীর, স্থির, শান্ত।

আমার যদ্দুর মনে হয় আপনার রেস্ট দরকার। প্রচুর রেস্ট। টেনশনে থাকবেন না। কখনও একজার্ট করবেন না। তাই বলে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকারও দরকার নেই। চলাফেরা করবেন, যেমন করছেন। প্লেন এ্যান্ড সিম্পল লিভিং। মানে নরম্যাল লাইফ।

কথাটা নিজের কানেই কেমন শোনাল নরম্যাল লাইফ। নরম্যাল লাইফ হলে কেউ ডাক্তারের কাছে যাবে কেন, কেন যাবে সাত সতেরো টেস্টের ঝামেলায়।

একটা কথা –

কি বলতে গিয়ে থেমে যায় ডাক্তার। কোনো দুরু দুরু সন্দেহের অজগর লেলিয়ে দিচ্ছে না তো তার দিকে। কিন্তু না। সেরকম কোনো ভয়ের কথা বলেনি ডাক্তার। মকবুল দেখল অন্ধকারে চশমার আড়ালে তার প্রতি স্থির হওয়া ডাক্তারের তীক্ষè দৃষ্টি।

কতকটা কৈফিয়তের সুর ডাক্তারের, আমাকে মিছিমিছি আবার ভুল বুঝবেন না। কেস আপনার অফিস থেকেই রেফার করা হয়েছিল। এক মাসের বেশি আর্নলিভ নিতে গেলে নিয়মও তাই। রিপোর্টের কপি আপনার অফিসে পাঠাতে হয়েছে। কোনো চয়েস ছিল না। আমরা আপনার স্বাস্থ্যের কথা ভেবেই প্রিম্যাচুউর রিটায়ারমেন্টের পরামর্শ দিয়েছি।

আসল বেড়াল তাহলে বেরুল থলে থেকে এতক্ষণে। অবশ্যি দোষারোপ করতে যাওয়া বৃথা। এরকম একটা পরিণতির কথা সে আগে থেকেই অনুমান করেছিল। মকবুল সহজ হওয়ার চেষ্টা করে। বিনা আওয়াজের ফিসফিসে হাসি ফুটিয়ে বলে, এতে মাইন্ড করার কি আছে। আমি এসেছিলাম আপনার কাছে অন্য কারণে। মানে এসব ক্ষেত্রে রোগীরা কতদিন –

কথা শেষ হয় না। জড়িয়ে যায় মাঝখানে।

ডাক্তার রাব্বানী পুরু লেন্সের চশমা নাবিয়ে কোটের বুক পকেটে ভাঁজ করা রুমালে ওখানা দ্রুত মুছে নেয়। তারপর চশমা জোড়া হাতে ধরা অবস্থাতেই তার দিকে তাকায়। মকবুলের ভয় করে। চশমাহীন চোখের দৃষ্টি পীড়াদায়ক। দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নেয়।

মকবুলের অসমাপ্ত প্রশ্নের আকস্মিকতায় ডাক্তার বিব্রত। গাড়ি থামাতে বলে ডাইভারকে। তারপর নিজের হাতেই বাঁ-দিকের দরজা খুলে ধরে রাখে। বলে, আমাদের টেস্টে যা ধরা পড়েছে সেরকমই বলা হয়েছে। চান অন্য কাউকেও কনসাল্ট করতে পারেন।

অসুখটা কী –

তার ঔৎসুক্যের বুলেটটি যেন লক্ষ্যস্থল ভেদ না করে ছাড়বে না।

ঘড়ির দিকে তাকায় ডাক্তার। জরুরি ‘কলে’ যাবার তাড়া হয়তো। তবু খানিকক্ষণ না থেমে উপায় নেই। অন্তত এ ধরনের অপ্রিয় প্রসঙ্গের গুমোট মেঘ একটু হালকা হতে না দিয়ে বিদেয় নেয় কী করে।

   অল্পতে তুষ্ট হবার লোক নয় মকবুল, সে সম্বন্ধে নিশ্চিত ডাক্তার রাব্বানী। জবাবটা অজানা নয়। কেমন করে বলবে ভাবনা সেটাই।

অথচ মনস্থির করে ফেলেছে মকবুল। আদালতে যায়নি। তবে শুনেছে কৌঁসুলিরা যাই বলুক, যত দক্ষতার সঙ্গেই লড়–ক, বিচারকের রায়ে কোনো ভাবাবেগ নেই। অযথা ঘোরপ্যাঁচ নেই কথার। তার রায় স্থির শান্ত ও দৃঢ়।

অথচ ডাক্তারা জজ নয়। জজের ভাষায় বলে না। বলে সম্ভবত ঝানু কৌঁসুলির মতো, যেটা শোনার পর আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব থেকেই যায়। সোজাসুজি ভয়ও দেখায় না। আবার ঢালা আশ্বাসও দেয় না।

কোথাও অবশ্যি যুক্তির তীর ঘায়েল করে সরাসরি। কোথাও থাকে লক্ষ্যহীন।

বলে যাচ্ছে ডাঃ রাব্বানী : এসব নিয়ে মেলা রিসার্চ হয়েছে, এখনও হচ্ছে। আমি বললেই তো হলো না। নানা মুনির নানা মত। তবে মোটামুটি আপনার ক্ষেত্রে যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা এক কথায় বলা যায় আপনার রক্তে কোনো এন্টিবডি তৈরি হচ্ছে না। এমনিতে তেমন সিরিয়াস নয়। তবে হঠাৎ কোনো ইনফেকশান হলে, এমনকি সর্দি-কাশি হলেও এসব ক্ষেত্রে সিরিয়াস কলিকেশন দেখা গেছে।

মকবুল থামিয়ে দেয় কথার মাঝখানেই। আমার একটাই প্রশ্ন। আর কতদিন? ডাক্তার রাব্বানী ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে বলে সব্বনাশ সাড়ে নটা। এতক্ষণ রোগীর কি অবস্থা কে জানে। ড্রাইভার তাড়াতাড়ি।

মকবুল নিজেই গাড়ির দরজা বন্ধ করে দেয়। গাড়ি স্টার্ট না করা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর হাঁটা ধরে। যেতে যেতে মনে হয় তার জ্ঞান ভা-ারে নতুন কোনো আশার আলো সঞ্চারিত হয়নি। যেমন হয়নি নিবু নিবু প্রদীপ শিখার নিস্তেজতার কোনো হেরফের। যেমন ছিল তেমনই আছে।

চোখমুখ জ্বালা করছে। করারই কথা। বেরিয়েছে সেই বিকেলের মুখে। একদিকে ব্যস্ততার ছুটোছুটি। আরেকদিকে রাস্তার ধুলোবালি। এখুনি বাথরুমে ঢুকবে। তার আগে পকেটের কাগজগুলো রাখতে হবে কোথাও। ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার রসিদ, ভাঁজ করা বিবর্ণ ভাগ্যাহত একটি প্রাইজবন্ড এবং ডাক্তারি রিপোর্ট। এলোমেলো করে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিলো টেবিলে যেমন সবসময় দেয়। কী মনে হওয়ায় তুলে নিল রিপোর্টখানা। কোনো আদালতের অঘোষিত গোপন রায়। সবাইকে বলা যাবে না। সবাইকে দেখানো যাবে না। যদিও ওই রায় একদিন ফিরবে সবারই মুখে মুখে। কিন্তু হাতের কাছে একটি নিরাপদ জায়গার সন্ধান পেল না। তার কোনো বিশেষ ড্রয়ার নেই। কোনো নির্দিষ্ট সুটকেস নেই।

সস্তা খবরের কাগজের মতোই সারা জীবন সে নিজেকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখল। বারওয়ারি দৃষ্টির সন্তুষ্টির জন্যে। জীবনের একটা দুটো সামান্য ঘটনা ছোট্ট নোট বইয়ের পাতায় বন্দি করার কথা মনে হলো না যার, সে জরুরি কাগজ সামলানোর জন্যে আর একটি নিরাপদ জাগয়া কোথায় পাবে। ভাঁজ করে ওখানা কোটের পকেটেই রেখে দিলো। কাল অফিসের ড্রয়ারে পাচার করে দেবে।

চোখে-মুখে পানি ছিটিয়ে কিছুটা ভালো লাগল। যেন নিজে থেকে সে দেখল না। আয়না গায়ে পড়েই তার চেহারাখানা খুঁটিয়ে দেখিয়ে দিলো। তার নিজের চেহারা নিজেকে। কেমন অন্য রকম। বিষণœ। অবসাদগ্রস্ত। এটা আবার কোন ধরনের অনুভূতি। কোনদিন সকালে সে নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করায়নি? রোজই তো দেখেছে। চোখের তলায় ভাঁজের গাঢ় রেখাটি এতদিন নজরে পড়ার মতো ছিল না। একদিনে হয়নি। প্রথম একদিন হয়তো খানিকক্ষণের জন্য চোখের পাতায় লেগেছিল কাজলের মতো। তখন ওটাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। তারপর একটু একটু করে জাঁকিয়ে বসেছে ক্লান্তির গাঢ় ভাঁজ। জীবনটাকে এতদিন তাড়া করে এনেছে মেলে ট্রেনের মতো। এতটুকু অবসর ছিল না, যাত্রাপথে কোথায় আঁচড় লাগল কোথায় রং-এর চটা উঠে গেল দেখার। আজ খুঁটিয়ে দেখছে বলেই চোখে পড়ছে। সত্যি তো, মুখের সেই টানটান ভাবখানাও নেই। কেমন ঢিলেঢালা। শেভ করতে গিয়ে সামান্য খানিকটা ছড়ে যায়। আফটার শেভ লোশনের খানিকটা মেখে নিল কাটা জায়গায়। অনুভব করল বাইরের ক্ষতের জ্বালা যেন ভেতরের অনির্দেশিত জ্বালার মতোই কেবল থেকেই যাচ্ছে। মিটছে না।

ব্যাপারটা নিছকই অপ্রাসঙ্গিক। তার বয়েস। ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় যেটা দরকার হয়েছিল, চাকরিতে ঢোকার আগে যেটা হলফ করে বলতে হয়েছে সেটা আজ একেবারেই অর্থহীন। তবু কত ঘাট পেরিয়ে এলো। মেঘনা-যমুনায় কতপানি গড়াল। হিসেব করলে আঁতকে উঠতে পারে মকবুল। অথচ ডাক্তার বলেছে কোনো টেনশনে থাকবেন না। বয়েস বাড়বে অথচ অবশ্যম্ভাবী পরিণতির কথা ভাববে না, সেটা কি ডাক্তারবর্ণিত প্লেন এ্যান্ড সিম্পল লিভিং। এখন পঞ্চাশের দোরগোড়ায়। এই ধুক্ধুক্ হৃদয়ের দোষ কি। বছরে চার কোটি নিরানব্বুই বার স্পন্দিত একটি ক্ষুদ্রায়তন যতেœর কাছ থেকে আর কি আশা করার আছে। শরীর তো শরীর। পাঁচ বছর গ্যারান্টি দেওয়া ঘড়িও তো সময় কাবার করার আগেই নিরাশ করে।

বড় সকাল সকাল এসে পড়েছে। ওর নিজেরটা ছাড়াও মুনপ্যালেসে আর দু’দশটা অফিস। তবু এসময় তেমন লোকের আনাগোনা নেই। নইলে লিফটের মুখেই সবসময় রকমারি লোকের ভিড়। অহেতুক ব্যস্ততা। ভুল তারই। হাতঘড়ি ঝাঁকুনি দিয়ে দেখল। ওখানা রাত দশটার পর দম ফুরিয়ে স্থির হয়ে বসে। ঠিক সময় আঁচ করা যাচ্ছে না। বোধহয় ন’টার কাছাকাছি। বা দু’দশ মিনিট এদিক-সেদিক। এমনিতেও সাড়ে ন’টার আগে কারো অফিসে পদধূলি পড়ে না।

ফুটপাথে অথর্ব ল্যাম্পপোস্টের মতো দাঁড়িয়ে থাকা চলে না। তার চেয়ে নিজের অফিসে গিয়ে বসাই ভালো। কিছুক্ষণ নির্বিবাদে জিরোতে পারবে।

লিফট খোলেনি। সুতরাং সিঁড়ি ধরতে হলো। ডান হাঁটুর ওপর হাতের চাপ দিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে হচ্ছে। এতদিন মনে হয়নি। আজ পদে পদে কষ্ট। হাঁপিয়ে উঠছে। যেন কোনো অবাধ্য জড়বস্তুকে ঠেলে ওপরে তোলা।

কোনোমতে নিজের আসনে এসে বসল। বেদম ঘেমে গেছে। তখনও হাঁপাচ্ছে। দেহের কলকব্জারা মহাক্ষুব্ধ। তাদের ‘গো স্লো’ নোটিশ অবজ্ঞা করতে গেল মকবুল কোন সাহসে।

হাতের কাছে পাখার সুইচ। ওখানা খুলে দিলো। মাথার হাল্কা চুলে ফুরফুরে বাতাসের খেলা। কেমন আদুরে স্পর্শে। অক্টোবরের দ্বিধাগ্রস্ত এক ফালি রোদ জানালা খোলা পেয়ে ঢুকে পড়েছে বিনা অনুমতিতেই। টেবিলের ওপর লম্বালম্বি পা মেলে দিতেই ছিটকে পড়া রোদের খানিকটা ওর পায়ের আঙ্গুল ছুঁয়ে ফেলে।

মকবুল চোখ বুজে ফেলল। এই পাখা, এই হাওয়া, এই ঝলমলে রোদ। অপ্রত্যাশিত কোলাহলশূন্য একটি সকাল। বাইশ বছরের চাকরিজীবনে নিশ্চয়ই এসেছে এমন সকালসন্ধে। শুধু তখন চোখে পড়েনি।

পায়ের শব্দ শোনা গেল। ঘাড় ফেরাবার দরকার নেই। পরিচিত শব্দ। পরিচিত কণ্ঠস্বর।

স্যার, আজ এত সকাল সকাল।

এক মুখ হাসি নিয়ে হাজির বাদশা মিঞা। তার পায়ে কি এক পুরোন ব্যথা। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে। শ্লথগতি এবং একই সঙ্গে অথর্ব বলে দুর্নাম। তবু টিকে আছে। নিছক পিয়নের চাকরি বলেই বোধহয় কেউ খাটায় না। তাছাড়া লোকটা সদা হাসিমুখ। যে-কোনো হুকুম তামিলের জন্য তৈরি।

চা দি স্যার।

আপত্তি করার সঙ্গত কারণ ছিল না। লোকটি সকাল সকাল কারও সেবায় আসতে চায়, নিরাশ করে কি লাভ। মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানায় মকবুল।

চা আসার আগেই লোকজন আসতে শুরু করেছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই অফিসটা হয়ে দাঁড়াবে হাটবাজার।

তার পাশের টেবিলে একাউন্ট্যান্ট মওদুদ। কাগজ আর নথিপত্রের জঞ্জালে থেকেও লোকটার রসজ্ঞান প্রচুর। সুযোগ পেলেই নিজ থেকে চেয়ার টেনে নিয়ে এসে মুখোমুখি বসে।

প্রথমে অভ্যাসমাফিক সিগ্রেট ধরায়। তারপর একমুখে ধোঁয়া ছেড়ে বলে, মকবুল সাহেব একমাত্র আপনাকে দেখলেই মনে হয় জীবনে কোনো দুঃখ নেই।

তর্কে যাবার মানে হয় না। তবু জিজ্ঞেস না করে পারে না, সেটা কী করে জানলে?

লাল টাইয়ের ওপর অসাবধানে ছিটিয়ে পড়া সিগ্রেটের ছাই টোকা দিয়ে ঝেড়ে দিতে দিতে বলে, আপনার ‘ফেস’-এ দুঃখ-দুঃখ মার্কা সাইনবোর্ড নেই। চারদিকে দেখুন সবাই হাঁড়িমুখ।

তারপর নিজেই কোনো এক প্রসঙ্গের অবতারণা করে।

বলে, এই তো সেদিন বললাম টেগরের বার্থ ডে করি। জোগাড়যন্ত্র আমিই করবো। না হয় আমার বাড়িতেই হবে। বিলিভ মি কারও কাছ থেকে সামান্য রেসপন্স পেলাম না।

মকবুলকে ওই দলে ফেলা হয়নি সেটা বোঝাবার তাগিদেই সম্ভবত মনে করিয়ে দেয়, আপনি অবশ্যি ট্যুরে ছিলেন। নইলে কার সাধ্য ঠেকায়।

লোকটা তাকে মনগড়া এক বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়ে পস্তাবে না তো শেষটায়?

তবু কেমন অভিভূত মকবুল। মুখের কথা জড়িয়ে যায়, আমার কথা যে অমন করে বলো, সেজন্যে ধন্যবাদ।

মওদুদ প্রতিবাদ করে।

না না, ধন্যবাদের কি আছে। হতে পারি এ্যাকাউন্টেন্ট। একেবারে গদ্য। তবু হিউম্যান ক্যারেকটার ঠিক ধরতে পারি। ধরুন আপনার কথাই। আপনার মুখের ওই শান্ত ভাবটা কেন, জানেন?

না তো।

আপনার কোনো লোভ নেই।

বড় রকমের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে তার সম্পর্কে।

হাসি পেল। মানুষের আবার লোভ নেই।

তাদের আলোচনায় বাধ সাধল একটা তীক্ষè চিৎকার টেলিফোন। তৃতীয়বার বাজার অপেক্ষা না করেই ওখানা তুলল।

অনুমান মিথ্যে নয়। সঠিক জায়গা থেকে সঠিক ব্যক্তির তলব। ম্যানেজিং ডাইরেক্টর অপেক্ষা করছেন। কোনো অসুবিধে না হলে যেন এখুনি চলে আসে। আজ আবার এগারোটায় বোর্ড মিটিং।

মকবুল উঠে দাঁড়ায়। মওদুদ সিগ্রেট বুজিয়ে দিয়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে। অনুযোগ করে, কোথায় দুটো আলাপ করছিলাম। অমনি তলব।

তারপর আবার নিচু গলায় বলে, করবেই বা কি। রাতে ঘুম হয় না। শুনেছি হোম ফ্রন্টে গোলমাল।

মকবুল বুঝল, ব্যাপারটা ঠিক আঁচ করতে পারেনি মওদুদ। এটা যে মামুলি অফিসি তলব নয়, সম্ভবত সে কথা ওর জানা নেই।

সন্দেহ নেই আলোচ্য বিষয় ওই মেডিক্যাল রিপোর্ট। ভদ্রভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শুনিয়ে দেবার কারণেই ওর ডাক, সে সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত।

একবার ভাবে মওদুদকে বলে যাবে। তারপর মনে হলো, থাক। ওর স্বপ্নরাজ্যের পাখাবিস্তারি রং-বেরং-এর পাখিদের শরাহত করে লাভ নেই। এ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে খবর তার কাছে ঠিকই পৌঁছুবে। নিজে থেকে গায়ে পড়ে বলার কি দরকার।

একরকম নিঃশব্দেই কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে উঠে পড়ে মকবুল।

অনেকবছর আগে এসেছিল এ কামরায়। চাকরির প্রথম জীবনে। এবং আরেকবার আজ। সম্ভবত শেষবারের মতো। নেম প্লেটে ঝকঝকে পেতলের কিছু অক্ষর অফিসি পদবি ঘোষণা করেই ক্ষান্ত নয়। প্রকারান্তরে একথাও জানিয়ে দেয় অন্তরালে কারও জন্য জীবনের স্বর্ণ মুহূর্ত। কারও জন্য চূড়ান্ত যবনিকা। মকবুল দরজা খুলে ঢোকে।

এগিয়ে এসে হাত মিলিয়ে ভেতরে এনে বসাল ওই অফিসের ক্ষমতার সিংহপুরুষ, মোক্তার মাসুদ। দ-মু- কর্তা। ম্যানেজিং ডাইরেক্টর। তারপর নিজেও বসল। পুরু নীলাভ সোফার এক প্রান্তে। খানিকক্ষণের জন্যে।

কি এক অসহিষ্ণুতা তাকে বসতে দিলো না। মকুবল দেখতে পেল সে তড়িতাহতের মতো উঠে গিয়ে পেছন করে দাঁড়াল জানালার কাছে। হাতের সিগ্রেটের ধোঁয়া মৃতদেহের পাশে রাখা আগরবাতির মতো সরু কু-লী পাকিয়ে ছড়িয়ে গেল চারদিকে। নিজেকে কিছুটা আড়াল করতে পেরে নিজেও পরিতৃপ্ত মোক্তার মাসুদ। আর ঠিক তখুনি একটি ঝানু প্রশ্ন : কী করবেন ঠিক করেছেন?

দেখেছে দক্ষ অভিনেতারা সিনেমায় এভাবেই বলে। সংকটের মুহূর্তে দৃষ্টির তীর ছুঁড়ে দিয়ে, ভুরু পাকিয়ে। লোকটা কি কোনোকালে থিয়েটার করতো?

বিচলিত হলো না মকবুল। বুকের দুরু দুরু ভাবটাও নেই যেন। বরং কেমন যেন একটু স্বস্তি। আতংকের আগুন নিবতে শুরু করেছে। জ্বালা নেই আগের মতো। কোনো সারপ্রাইজ নয়। দুরূহ অঙের প্রশ্নপত্র ফাঁস করে গিয়েছে অনেক আগেই। সুতরাং ফল নিয়ে মাথাব্যথা নেই।

নড়েচড়ে বসে মকবুল। যে শক্ত সুতোর গেরোয় দেহটা টানটান হয়েছিল, ওখানা ঢিলে করে দিয়ে পা ছড়িয়ে দেয়।

তখনও পায়চারি করছে মোক্তার মাসুদ। সিগ্রেট নিবিয়েছে দু’দুবার অদ্ধেকের বেশি থাকতেও। এসবের দরকার ছিল না। সোজাসুজি বললেই পারত।

যেন হীরে মুক্তো মাপা নিক্তিতে মাপজোক করা সংলাপ। আমার কোনো আপত্তি নেই। থাকুন, যতদিন খুশি। আজ, কাল, পরশু, এক সপ্তাহ।

কথা শেষ করার আগেই লোকটা আবার সিগ্রেট ধরাল। ফস করে দেশলাই জ্বালিয়ে প্রায় এক নিশ্বাসে বাকি কথা শেষ করল।

আগে স্বাস্থ্য। নিজে না বাঁচলে চাকরি বাকরি দিয়ে কী হবে?

তারপর থামল। বোধহয় প্রতিক্রিয়া লক্ষ করার প্রয়োজনে সামান্য বিরতি। বিরতির  মুহূর্ত কাবার হবার পরই আবার শুনতে পেল মকবুল, ছুটি নিয়ে তিনমাস পরেও জয়েন করতে পারেন। অবশ্যি মেডিক্যাল বোর্ড যদি ক্লিয়ারেন্স দেয়। আমাদের তরুফ থেকে সবরকম কোপারেশন পাবেন। তবে আমি বলব এসময় আপনার দরকার রেস্ট।

মকবুল উঠতে যাচ্ছিল। মোক্তার মাসুদ ইঙ্গিতে তাকে বসতে বলল। দ্রুত এগিয়ে এসে বসল মুখোমুখি।

বলল, আমি শুধু একটুই বলব আপনার কাছ থেকে বরাবরই ডেডিকেটেড সার্ভিস পেয়েছি। অনেস্টি, ইন্টেগ্রেটি।

মনে হচ্ছিল তার ফেয়ার ওয়েল বক্তৃতা। বোধহয় আগে থেকে রপ্ত করা ছিল।

ট্রেতে সাজানো চা এলো। নিজেই কাপে ঢেলে ক’ চামচ চিনি জানতে চেয়ে সে পরিমাণ ঢেলে ওর দিকে পেয়ালা বাড়িয়ে দিলো মোক্তার মাসুদ। সঙ্গে সঙ্গেই কাগজপত্র নিয়ে হাজির এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার হাই।

টাইপ করা একখানা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এখানে একটা সই। আর নিচে আরেকটা দেখলও না। দরকারও ছিল না। জানতে অব্যাহতির ছাড়পত্র। সই করে দিলো মকবুল।

কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে গেল হাই, আর দু-একটা সিগনেচার ছিল। পরে করিয়ে নেব।

নকল রাগের ভঙ্গিতে ওকে শাসিয়ে দেয় মোক্তার মাসুদ, তাড়াহুড়ো কিসের শুনি। উনি পালিয়ে যাচ্ছেন, না আমরা অফিস উঠিয়ে দিচ্ছি। তোমাদের সব কাজেই বাড়াবাড়ি।

এডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার চলে যাবার পর ওরা দু’জনই যেন এক অনিভিপ্রেত শূন্যতার শিকার। নাটকের শেষ দৃশ্যে যা যা করণীয় ছিল তা তো সবই হলো। তাহলে বিলম্ব কেন?

মকবুল উঠে দাঁড়ায়।

মোক্তার মাসুদ ঘড়ি দেখে।

ইচ্ছে ছিল আপনার সঙ্গে আরেকটু বসব। কিন্তু আজই আবার বোর্ড মিটিং। হয়তো এতক্ষণে হাঁক-ডাক শুরু হয়ে গেছে।

তারপরই টেলিফোনের বোতাম টিপে বলল, গাড়ি রেডি করতে বলো।

অফিসি ভদ্রতার সামান্যতম ত্রুটি নেই। দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এলো। নিজের হাতেই দরজার পাট খুলে দিয়ে বিনয়ের ভঙ্গিতে বলল অফিসের মহারাজাধিরাজ, যদি সামান্যতম প্রয়োজনেও কখনো কাজে আসতে পারি –

এসব বাক্য শেষ করার মানসে বলা হয়ে থাকে না। কাজেই তাকে নিজে থেকে বিগলিত হয়ে বলতে হলো, নিশ্চয়ই স্যার। আপনার কৃতজ্ঞতার কথা মনে থাকবে।

ঠিক হলপ করে বলা যাবে না মোক্তার মাসুদের কোনো ভাবান্তর লক্ষ করা গিয়েছিল কিনা। তবু আর্তনাদের শব্দ শুনে বিচলিত হলো মকবুল। মুহূর্তে ভুল ভাঙল। কিছু নয়। ওটা আর্তনাদ নয়। ¯িপ্রং-এর দরজা বন্ধ হবার আগে কব্জার অভদ্র আওয়াজ। বোধহয় অনেক দিন তেল দেওয়া হয়নি।

এসে দেখল মেলা ফাইলপত্র জড় তার টেবিলে। হাই অপেক্ষা করে বসে।

বলল এগুলো আজই আবার বোর্ডে যাবে। আপনি নিজে একবার দেখে নিন।

বোধহয় কিছুটা সান্ত¡নার আশায় এক ফাঁকে বলল মকবুল, ডাক্তার অবশ্যি বলছিল আপাতত মাস তিনেক ছুটি নিলেও চলত।

একটার পর একটা কাগজ সই করিয়ে নিচ্ছে হাই।

ডাক্তারের কথা রাখুন। ওকরম বলেই থাকে। ওদের আর কি। আমার নিজের ভাইয়ের এক ছেলে –

আরো দু’একটা সই বাকি। সেগুলো করিয়ে নিয়ে কাগজপত্র গুটিয়ে ফেলে হাই।

তারপর পূর্ব প্রসঙ্গের সূত্র ধরে বলে, আপনাকে যার কথা বলেছিলাম ও আবার মায়ের একমাত্র সন্তান। চিকিৎসার কোনো ত্রুটি হয়নি। টাকাপয়সা যা ছিল তার ওপরেও মেলা ধার-কর্জ। শেষটায় এমনকি জায়গাজমিও বিক্রি করতে হলো। সবই বৃথা। কপালে যা ছিল তাই হলো।

মকবুলের সন্দেহ হয়। আপনার আবার কোন ভাই, বলছিলেন ত্রিকূলে কেই নেই।

হাই হার মানার পাত্র নয়। বলল আহা, ভাই মানে কাজিন, চাচাত ভাই। একই কথা।

কী হয়েছিল?

সম্ভবত আরেকটা সই বাকি। ওখানা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, সরি আপনাকে আর বিরক্ত করব না। শুধু এখানে একটা সিগনেচার।

হাই উঠেই যাচ্ছিল। কি মনে হওয়ায় আবার বসে। বলে, হ্যাঁ কি বলছিলাম আমার ভাইয়ের ছেলের কথা। ইয়ং ম্যান – পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। পলিটিক্যাল সায়েন্সে অনার্স। ডাক্তার দেখে বলল, জ্বরটর কিছু নয়। সেরে যাবে। সপ্তাহখানেক ভালোই কাটল। তারপর হঠাৎ একদিন প্যারালেসিস। একনাগাড়ে সাড়ে তিন মাস। দেখলে আপনারও মায়া হতো। শুকিয়ে কাঠ।

মকবুল নিজের অজান্তে বুকে হাত ঠেকাল। ভেতরে স্পন্দনের ক্ষিপ্রতার সে কিছুটা শঙ্কিত। নিশ্চয় করে বলা যাচ্ছে না। তবে এটুকু ঠিকই উপলব্ধি করেছে কোথাও যেন ছন্দপতন। কোথাও কোনো কিছুর ঘাটতি। হয়তো সবই মনগড়া। তেমন কিছু নয়।

হাই অমন করে বলছিল বলেই মনে হয়েছে তার নিজের ভেতরও ভাঙ্গাচোরার কি যেন খেলা। আসল কথা, যেটা অনিবার্য সেটা হবেই। জীবনের অনিশ্চয়তার দর্শনে তার বিশ্বাস দৃঢ়তর করে বুক ভরে টানা নিশ্বাস নিয়ে সোজা হয়ে বসল মকবুল।

শেষবারের মতো ফর্ম, লেজার, সার্ভিস বুক রিলিজ অর্ডার যথাযথ সাজিয়ে নিয়ে উঠে পড়ে হাই। যেতে যেতে বলে, আপাতত লিভ প্রিপেরটরি টু রিটায়ারমেন্ট। নেক্সট উইকে টাকাটা তুলে নিতে পারেন।

সেসব কথা কানে যাচ্ছে না। আসলে তার অন্তরালে অনেক আগেই একটা নাটক শুরু হয়েছিল : সেটার শেষ দৃশ্য দেখল মাত্র। মেলা আলোচনা হয়েছে, বোর্ড মিটিং হয়েছে। চূড়ান্ত রায় নেওয়া হয়েছে অনেক আগেই। ড্রপসিন তার সামনেই ফেলা হলো। 

চা এলো। সে সঙ্গে প্লেটে সাজানো সন্দেশ, সিঙ্গাড়া। কে পাঠালো বোঝা গেল না।

হাই যেতে যেতে বলে গেল, খান খান। আমাদের তো সেরকম সৌভাগ্য হবে না।

হেয়ালি মার্কা কথা। হাই নিজেই পাঠাল কি। না, তাই বা কেমন করে হয়, তেমন হলে না বলে থাকতে পারত।

হন্তদন্ত হয়ে একটি তরুণ ছেলে ছুটে এলো বলল, স্যার আপনি আগামী মঙ্গলবার ফ্রি?

ফ্রি মানে!

আমরা সবাই একটু বসব ভেবেছিলাম। চা খাব আপনার সঙ্গে।

বলতে ইচ্ছে করছিল আমার আবার ‘ফ্রি’ কি। আমার সোম-মঙ্গল নেই। ছুটি-অছুটি নেই। আমার কাছে মাসের তারিখ, সপ্তাহের দিন, ঘড়ির কাঁটা অর্থহীন।

ছেলেটি এক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকল। সম্ভবত তার মৌনতাকে সম্মতির লক্ষণ মনে করেই বলল, ঠিক আছে স্যার। তাহলে সেরকমই কথা রইল। মঙ্গলবার বিকেলে অফিসের পর আমরা বসব। অবশ্যি তার আগে আমি নিজে থেকে মনে করিয়ে দেবো আপনাকে।

মকবুল কিছু বলল না।

অনেক চেষ্টা করেও নাম মনে পড়ছে না ছেলেটির। মাস ছয়েক হলো জয়েন করেছে। বোধহয় এখনো তারুণ্যের মোহভঙ্গ হয়নি। ভালো মানুষ স্বভাবটি যায়নি।

মকবুলের টেবিলে আজ কোনো ফাইল এলো না। দু’দুবার টেলিফোন বেজেছে। মকবুল তোলেনি। অন্যরাই এসে ধরেছে। আর সে সঙ্গে একটা চলনসই কৈফিয়ৎ দিতেও ভোলেনি তারা খামোখা আপনাকে অফিসের ব্যাপার নিয়ে হয়রান হতে হবে না। আমরাই কথা বলব।

মনে মনে আশা ছিল, একটা দুটো ‘কল’ তার নিজেরও হতে পারত। আচমকা কেউ তাকে স্মরণ করতে পারত। অথচ সেরকম কিছুই হলো না।

এখন অফিসে পুরোদমে কাজ। কেবল থেকে থেকে কিছু ফিসফিসে আওয়াজ। কিছু মন্তব্য। কিছু বক্তব্য। সম্ভবত কিছু তাকে কেন্দ্র করে।

দু’একজন দেখা করতে এলো ফাঁকে ফাঁকে। পান-সিগ্রেট বাড়িয়ে দিলো। পরম বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করল মকবুল।

প্রত্যুত্তরে একজন বলল, ছেড়ে দিয়েছেন, ভালোই করেছেন। এসব অভ্যাস না করাই ভালো। পয়সার পয়সা, শরীরের শরীর দুটোই বরবাদ। আমাদের কথা ছেড়ে দিন। যে ক’টা দিন আছে হেসে খেলে চলে যাবে। অত ভেবে-চিন্তে কী হবে বলুন।

মকবুল দেখল, বক্তা কম করে হলেও তার চেয়ে বছর সাত-আটেকের বড়। হলে কি হবে। সে তো আর কাজ করতে করতে মাথা ঘুরে টেবিলের ওপর পড়ে যায়নি। তাকে তো আর ডাক্তারের কাছে রেফার করা হয়নি। তাই লোকটা আরামে পান চিবিয়ে নাকে-মুখে তৃপ্তির ধোঁওয়া তুলে অমন বড় বড় কথা শুনিয়ে দিতে পারছে।

তবে আমার বিশ্বাস হয় না।

আবার ওই গলা।

কি বিশ্বাস হয় না?

ডাক্তারদের প্রবোধবাক্য। আসল কথা কী জানেন। এমনিতে এমনিতে কিছু হয় না। তবে সিচ্যুয়েশন কখন কীভাবে টার্ন করে কেউ কিচ্ছু বলতে পারে না। আপনি কোথাও রেস্টে চলে যান।

একটু থেমে গিয়ে আবার বলে, আপনি চলে গেলে অফিস খালি খালি লাগবে।

তারপর চারদিক তাকিয়ে সম্ভবত সবাইকে জানিয়ে দেবার মানসেই স্বর উঁড়িয়ে বলে, মানুষ গেলেও স্মৃতি থেকে যায়। হাজার হলেও এত বছর একসঙ্গে ওঠা-বসা। আপনি চলে গেলে আমি ওখানটায় বসব।

এই উক্তি সম্ভবত যার প্রতি উদ্দেশিত তার প্রতিক্রিয়া জানার অপেক্ষা ছিল। কামরার এক প্রান্ত থেকে একটি কণ্ঠস্বর প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে।

সবুর সাহেব আপনারা তো সব ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি। আপনি বসবেন কেন। আমার আগেই বলা আছে।

হয়তো বচসা চলত আরো কিছুক্ষণ।

যে ছেলেটির নাম তার কোনোমতেই মনে এলো না, যে কিনা কিছুক্ষণ আগে তাকে জিজ্ঞেস করে গেল সে মঙ্গলবারে ফ্রি কিনা, সে-ই ধমকে দিলো ওদের।

থামুন তো, আপনাদের সেন্স অব প্রপোরশন নেই। মকবুল সাহেব ছেড়ে যাননি, আর এরই মধ্যে –

দু’জনের কেউ প্রতিবাদ করল না।

ছেলেটি তেমনি চড়া গলায় বলে গেল, আপনাদের কাউকে বসতে হবে না। বসতে হয় ওখানে আমিই বসব। কারও সাহস থাকলে ঠ্যাকাক।

ছেলেটি ধীরে ধীরে মকবুলের কাছে এসে দাঁড়ায়। তাকে বলে স্যার, আমি সামান্য এল. ডি. সি। দু’মাস হলো জয়েন করেছি। অথচ যারা দীর্ঘদিনের পরিচয়ের দোহাই দিয়ে লম্বা লম্বা লেকচার দিয়ে গেল, দেখলেন তাদের কা-। চক্ষুলজ্জা বলে একটা কথা আছে। না, অন্তত আজকের মতো রেহাই দিতে পারত না? বয়েসে ছোট হতে পারি। কিন্তু আমি সহজে ছাড়ার পাত্র নই। কলেজে ইউনিভার্সিটিতে মেলা ইউনিয়ন বাজি করেছি। কাউকে বড় বেশি একটা তোয়াক্কা করি না স্যার।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যাচ্ছে মকবুল। ভালোই লাগছে। তার প্রতি মমত্ববোধ না ‘লয়্যালটি’। আজকাল আবার ‘লয়্যালিটি’ বলে কিছু আছে নাকি।

মাথাটা ধরে এসেছিল। হতে পারে ক্লান্তির ঘোর। বোধহয় একটু খোলা বাতাস দরকার। নিজে উঠে গিয়েই জানালার একটা পাট খুলে দিলো। খোলা জানালা বরাবর সে দাঁড়িয়ে ছিল শূন্য দৃষ্টি মেলে।

তার পক্ষ সমর্থনকারী ছেলেটি অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। তবে কার লঘু পায়ের শব্দ তার পেছন এসে থামল। ঘাড় ফেরাতেই দেখতে পেল সলজ্জভঙ্গি একটি মেয়ে।

মাঝে মাঝে লক্ষ করেছে। কিন্তু যেমন ওই ছেলেটির নাম জানে না। তেমনি মেয়েটিকে চেনে না। জানে, টাইপিস্টের কাজ করে। অফিসের শেষ মাথায় ম্যানেজিং ডাইরেক্টরের কামারার লাগোয়া অপরিসর জায়গায় বসে।

মেয়েটি লজ্জায় আনত টেবিলে রাখা চায়ের কাপ ও প্লেট দেখিয়ে বলে, খেলেন না।

তাহলে এই মেয়েটিই তাকে সাধ করে মিষ্টি আর সিঙ্গাড়া পাঠিয়েছিল। নিজে থেকে বলে না গেলে জানাই হতো না।

কৃতজ্ঞতায় গলা জুড়িয়ে আসে, বলে মিষ্টি আমি তেমন খাই না। তবে তুমি পাঠিয়েছ, আলবৎ খাব। কী নাম যেন তোমার?

সলজ্জ জবাব এলো, রাণী।

হয়তো এই প্রথম এবং শেষ। আর কখনো কথা হবে না। হাসি পেল, এমন ভাগ্যহত মেয়েদের নামই হয় রাণী।

বড় ইচ্ছে হলো প্রগাঢ় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতে। আদর করে কাছে টেনে নিতে। অফিস বলেই সম্ভব নয়।

মেয়েটি তখনও দাঁড়িয়ে। হাতে ধরা কলাপাতা রঙের ছোট্ট একটি খাতা।

মকবুল জানতে চায়, কিছু বলবে?

খাতটা বাড়িয়ে দেয়, বলে, কিছু একটা লিখে দিন।

আকাশ থেকে পড়ে।

লিখে দেবো।

তার সন্দেহ ভঞ্জন করে মেয়েটি, জানি না কেন স্যার প্রথম যখন এ অফিসে আসি সেদিন থেকেই ইচ্ছে আপনার অটোগ্রাফ নেব। সাহস হয়নি।

আমার কেন?

স্যার আমি বিখ্যাত-অবিখ্যাতদের চিনি না। আমার অভিধানে মানুষ দু’করম। ভালো মানুষ। মন্দ মানুষ। আপনার সই না পেলে আমার লিস্টি থেকে একজন ভালো মানুষ বাদ পড়ে যায়।

সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে মেয়েটির সামান্যতম কোনো কাজে এসেছিল কিনা মনে পড়ে না। হয়তো অমন কাউকে না পেয়ে মেয়েটি অকারণেই তার ওপর সাধুতার রং চড়িয়ে খুশি। শেষটায় পস্তাবে না তো।

মকবুল বুঝল তর্ক নিরর্থক। বলল, বেশ দাও। কিন্তু কী লিখব।

আপনার যা খুশি।

খাতাটা হাতে তুলে নিতে নিতে বলল, কিন্তু এক শর্তে –

কী শর্ত?

আমি অফিস ছেড়ে যাবার আগে দেখবে না।

রাজি?

মেয়েটি ঘাড় হেলিয়ে খুশি মনে চলে গেল। বলল, আমি পরে এসে নিয়ে যাবো।

অফিসের লাঞ্চ আওয়ারের তখনও মিনিট পনেরো বাকি। তার আগেই শেষবারের মতো কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে উঠে পড়ার উপক্রম করে মকবুল।

মেয়েটি তার আগেই এসে হাজির। সামনেই রাখা ছিল সই করা খাতাটি। ওখানা তুলে নিয়ে খুলতে গেল। বাধা দিলো মকবুল।

আমি যাই তারপর পড়ো।

আস্তে করে নিজের চেয়ারখানা সরিয়ে চারদিক তাকিয়ে নিয়ে দরজার দিকে, হাঁটতে শুরু করে। দেখে-শুনে চলতে হয়। কোথাও চেয়ার, কোথাও টেবিল, কোথাও ক্যাবিনেট। তারই ভেতর গোলক-ধাঁধার মতো পথ। যেতে যেতে দেখল মেয়েটি নিশ্চল থামের মতো দেয়ালের এক কোণে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। মনে হলো তার চোখ ছলছল করে আসছিল। না হলে বারবার চোখ মুছছিল কেন অফিসের লোকেরা? কেউ হাত মেলাল, উঠে এসে আলিঙ্গন করল। কেউ কেউ দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল। পারল না একমাত্র রাণীই। সে টাইপরাইটার নিয়ে বসল। দ্রুত টাইপ করে গেল অক্ষরে। পেছনে না তাকিয়েও বুঝতে পারল মকবুল, তার অভিমানের ঝড় টাইপরাইটারের এক ঝাঁক অক্ষরের ওপর। কী জানি সেসব অক্ষরের সমষ্টিতে সহানুভূতির কোনো বাক্য রচিত হলো কিনা।

রাস্তায় নেবে পড়েছে মকবুল। কিছুক্ষণ পরই সে বিশাল জনস্রোতে মিশে যাবে। তার নিজস্ব কোনো আইডেনটিটি থাকবে না। সে হবে ভিড়ের একজন।

চলতে চলতে তার মনে হলো মেয়েটি ওই খাতা খুলে পড়তে শুরু করেছে হয়তো। যা মনে এসেছিল তাই লিখেছে। কিন্তু দিব্যি মুখস্থ হয়ে গিয়েছে প্রতিটি শব্দ প্রতিটি ছত্র। সে লিখেছিল : খামোখাই একটা পাতা নষ্ট করলে। অন্য কারও জন্য রাখলে পারতে। কোনো খ্যাতনামা চিত্রতারকা, কোনো জবরদস্ত ক্রিকেট খেলোয়াড় বা যশস্বী কোনো লেখক। আমি ভূতপূর্ব। এদেশে ভূতপূর্বদের কোনো দাম নেই। সুতরাং বোকা মেয়ে, লোকসানটা তোমারই।

ব্যাপার চাপা ছিলা না। থাকার কথাও নয়। একটা মানুষ হাসপাতাল আর ডাক্তারের কাছে অন্তহীন ছুটোছুটি করছে – ক্রমশ উদ্বিগ্নতা আর অনিশ্চয়তার শিকার হচ্ছে। এ দেখে বাড়িসুদ্ধ মানুষের আঁচ করতে অসুবিধে হয়নি। ঠিকই বুঝতে পেরেছে পুঞ্জীভূত কালোমেঘ জমতে শুরু করেছে যখন, ঝড় আসন্ন। অন্যরা বুঝুক না বুঝুক সাহানার সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় ছিল না।

জানে, যা অনিবার্য ঠেকানো যাবে না। সমস্যা অন্যত্র ঘটনার পরিণতির প্রতি তার নিজের প্রতিক্রিয়া স্থির করতে পারছে না। কি করা উচিত তার এক্ষেত্রে। কিই বা করতে পারে। সমবেদনা দেখাবে? হয়তো সেটাই স্বাভাবিক এক্ষেত্রে। কিন্তু আবার অর্থহীনও। বরং নিজেকেই প্রবঞ্চনার শিকার মনে হয়। এজন্যে যে, অনির্দেশিত অন্ধকার সুড়ঙ্গে এগুবার আগে সতর্কবাণী উচ্চারিত হতে পারত। মকবুলের বিপর্যয় সে অস্বীকার করছে না, খাটো করে দেখছে না। কিন্তু একটা মানুষের সঙ্গে ভাগ্যসূত্রে গ্রথিত হবার মানে তো এই নয় যে, নিজের ভালোমন্দ দেখব না। দুর্দশার শেষ চূড়ায় উঠে গুডবাই বলে ঝাঁপ দেবে কেউ। আর সে থেকে যাবে বিলাপের জন্য, এটা কেমন কথা। সাহানার মনে হয় তার ক্ষোভ, অন্তজর্^ালা সঙ্গত। একদিনে হয়নি। হয়ও না। কেউ তো হঠাৎ করে লোকটাকে বাতিল করে দিয়ে সংসারের আবর্জনার ঝুড়িতে ফেলে দেয়নি। সবই হয়েছে সময়ের দীর্ঘ যাত্রাপথে। সেখানে কোথাও থেমে যাবার সতর্কবাণী ছিল, কোথাও জিরিয়ে নেবার পরামর্শ ছিল। কাদার গাঁথুনি দেওয়া দেয়াল ভাঙ্গতেও সময় লাগে। এক বর্ষায় কিছু হয় না। এক ঝড়ে ধসে যায় না। আর এতো মানুষের শরীর। লক্ষণ ছিল, উপসর্গ ছিল। কিন্তু সেজন্য উপযুক্ত চিকিৎসার নির্দেশও ছিল। সেসব উপেক্ষা করে সে কেবলই পড়ে থেকেছে দুশ্চিন্তার আঁস্তাকুড়ে।

খবরটা যখন জানতে পেরেছে সাহানা কোনো সারপ্রাইজ ছিল না। কোনো উত্তেজনা ছিল না।

নিজেই বলেছে মকবুল। রিপোর্টের কাগজখানা মেলে ধরেছে চোখের সামনে। একবার মাত্র চোখ বুলিয়ে গেছে। আদ্যোপান্ত দেখার প্রয়োজন অনুভব করেনি সাহানা।

শুধু বলেছিল, ভালো।

সে রাতে আর কথা হয়নি।

ওদের শোবার ঘরে পাশাপাশি দুটো খাট। একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া নয়। মাঝখানে বিস্তর ব্যবধান। প্রথম প্রথম অস্বস্তিকর মনে হলেও সময়ের দীর্ঘসূত্রিতায় সেটা মানিয়ে গেছে। বিষদৃশ্য ঠেকেনি। নিবিড় হয়ে পারস্পরিক দেহের উষ্ণতা বিনিময়ের দিন বিগত একযুগ। সবই সয়ে যায়। প্রথম ধাক্কাটাই আসল। তারপর অস্তিত্ব এক চেতনা। বা বলা যায়, চেতনা নিছকই এক অস্তিত্ব। নিজেকে তখন ঘরের আর দু’দশটা জড়পদার্থের সঙ্গে একাত্ম করে নিতে অসুবিধে হয় না। মনে হয় যে যার নির্দেশিত মাপজোক করা জায়গায় – টেবিল চেয়ার, কাপবোর্ড এবং তারা নিজেরা।

মাঝে মাঝে আর্তধ্বনি। টানা নিশ্বাস, কিছু অসংলগ্ন সংলাপ শুনেছে সাহানা। কিন্তু সে নিশ্চিত সেগুলো হৃদয়ের কোনো আকুলতা থেকে নয়। শারীরিক দুর্বলতা বা অস্বাচ্ছন্দ্যের কারণেই।

অন্যদিন ঠিক ঘুম না ভাঙ্গলেও আধ বোজা চোখে অনুমান করতে পারে পাশের বিছানার কাছে স্লিপারের স্থানচ্যুতি। বাথরুমে ট্যাপ খোলার হিস্ হিসে আওয়াজ। বাথরুমের দরজা ভালো করে লাগে না। বোধহয় সেজন্যেই আফটার শেভ লোশনের সৌরভ জানালার পাশে ফোটা হাস্নাহেনার ঘ্রাণ বাতিল করে ঘরময় ঘুরে বেড়ায়। প্রায় গাণিতিক নিয়মে। দিনের পর দিন। মাসের পর মাস।

সময় সময় মনে হয়েছে হয়তো লোকটার প্রতি সুবিচার করা হয়নি। দায়িত্বের অভাব থেকে যাচ্ছে। কিন্তু মকবুলের তরফ থেকে তো কোনো অভিযোগ নেই। বরাবরই নিজের হাতে চুলো ধরায়। নিজে চা বানিয়ে খায়। তারপর অফিস। এখন অফিস নেই। কিন্তু সেই অভ্যেসটা রয়ে গেছে। ওর তরফ থেকে আপত্তি থাকলে বরং সাহানা উদ্যোগী হতে পারত। কিন্তু নিজে থেকেই যখন একটা প্রক্রিয়া চলে আসছে, কোনো উচ্চবাচ্য নেই, তার কিসের মাথাব্যথা।

তাদের দু’জনের সম্পর্ক শীতল হয়ে আসছে। আবেশ-উচ্ছ্বাসের চারাগাছগুলো অনেকদিন ধরেই মুখ থুবড়ে! সেগুলোকে একরকম জোর করেই বাক্সবন্দি করে ফেলেছে সাহানা। তবে যখন আর ধরে রাখা যাবে না গলা ফাটিয়ে নালিশের সুরে বললেও বলে ফেলতে পারে। আবার এমনও হতে পারে এই সংসারের শূন্যতার বিশাল উদ্যানে তার উৎসাহে ধুলোর পাহাড় জমতে শুরু করবে।

কিছুটা মায়া হয় না, তা নয়। যুদ্ধে পরাজয় অবধারিত জেনেও লোকটা স্বার্থপর সেনাপতির মতো একাই লড়ে যেতে চায়। আশা করে ডাক্তারের মতামত বদলাবে। অফিসের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচিত হবে। আরো কিছুদিন থেকে যাবে চাকরিতে। তেমন কোনো সম্ভাবনা থাকলে সাহানা নিজেই সাধাসাধি করত। লোকজনেক ধরত।

তবু সাহানা কিছু বলে না এজন্যে যে, জানে মকবুল তার পরামর্শের ধার ধারে না। কর্তব্য, অকর্তব্যের সংজ্ঞা তার নিজের। ডাক্তারের রিপোর্ট আর অফিসে রিটায়ারমেন্টের খবর সে দায়সারা গোছের মতো করেই জানিয়েছে। বোধহয় স্ত্রীর প্রতি ন্যূনতম কর্তব্য হিসেবে। কোনো সহানুভূতির প্রত্যাশায় নয়।

এখন শুধু সাহানার একটা কথাই বলতে ইচ্ছে করে যা হবে না তার জন্য সময় অপচয় বৃথা। যা আছে তাই সামলাও। প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটির টাকা জড় করো। কাজে আসবে।

লক্ষ করছে সাহানা, তার প্রাত্যহিক নিয়মের রাজত্বে আজ কিছুটা বিভ্রাট ঘটছে। অন্যদিনের তুলনায় সকাল করেই ঘুম ভেঙ্গে গেল সাহানার। অথচ বাথরুমে ট্যাপ খোলার আওয়াজ পেল না। কোনো আফটার লোশনের সৌরভ ঘরময় বিচরণ করলো না। বোধহয় অন্ধকার থাকতেই বেরিয়ে পড়েছে নিঃশব্দ চরণে। বিছানায় কম্বল আলুথালু। বালিশ দলা করা।

এমন কোনো সমস্যা নয় যে, এ নিয়ে ভাবনায় পড়তে হবে। নিজের মনের কাছেই নিজে তর্ক জুড়ে দেয় সাহানা : মাঝে মধ্যে কি এক একজনের কাকভোরে ওঠার বাসনা হতে পারে না। আকাশের শেষ সম্বল তারাটির দিকে তাকিয়ে বুক ভরে নিশ্বাস নেবার আকুতি জন্মাতে পারে না। ইচ্ছেপূরণের স্বাধীনতা কি মানুষের নেই। বিশেষ করে যে এতদিন অভ্যেসের চার দেয়াল থেকে ছাড়া পেয়েছে সে কেন চাইবে না তার ইচ্ছের হরিণ ছুটিয়ে টপকে যেতে ঝোপ-জঙ্গল, মাঠ-ঘাট, খাল-বিল।

সাহানা ভাবল, হয়তো মকবুলের সেই দুর্দমনীয় ইচ্ছের হরিণ বলে বেড়াচ্ছে : এতদিন চাকরি করলে ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে। হুকুমের ক্রীতদাস হয়ে রইলে। জীবনের বহু স্বপ্নই অনাস্বাদিত রয়ে গেল।

হয়তো নিজ থেকেই তার মন আর্তনাদ করে মরছে – আমি বহুদিন সূর্যোদয় দেখিনি। সূর্যাস্ত দেখিনি। আজ দেখব। ভেজা ঘাসে খালি পায়ে হাঁটিনি। আজ হাঁটব।

এ সবই অনুমান। এছাড়া কোনো সদ্যুক্তি মনে আসছে না। মুখ ঘষল খালি বালিশের উপর উপুড় হয়ে। তবে কান্না পেল না। সামান্য ফুঁপিয়ে উঠল কেবল। আবার আরেক সময় মনে হলো সে অত ভেবে ভেবে মরছেই বা কেন। লোকটা তো আর নিউইয়র্ক, সানফ্রানসিসকো বা টোকিরও বাস্তার ভিড়ে নিখোঁজ হয়নি, আটলান্টিকে হালভাঙ্গা তরী ভাসিয়ে বসে সেই বা সাত হাজার ফুট উঁচু চূড়া থেকে ডাইভ দিচ্ছে না। তবে এত ভাবনা হচ্ছে কেন তার।

ঘড়িতে সবে সকাল সাড়ে পাঁচটা। আরো কিছুক্ষণ অনায়াসে ঘুমুতে পারে সাহানা। নিজের ওপর তার রাগ হলো। উঃ মানুষের হৃদয়ে ভাবনার ক্ষুধা এমন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। আসলে না ভাবলেই মানুষ সুখী। নির্লিপ্ত। শান্ত। ভাবনার ঝড়ে আন্দোলিত হলেই সে উত্তাল তরঙ্গে নিক্ষিপ্ত পালহীন নৌকোর মতো। কখনো অসহিষ্ণু। কখনো অশান্ত। 

ফিরে ঘুমাল সাহানা। এবার কেমন হাল্কা হাল্কা ভাব। বাষ্পের মতো দুশ্চিন্তার মেঘ কেটে যেতে শুরু করেছে। দুর্ভাবনার শত্রুরা আর কোনোমতেই তাকে পরাস্ত করতে পারছে না। সে সুন্দর সুগোছাল হয়ে গায়ের ওপর মখ্মল সদৃশ্য কম্বল হাল্কা করে টেনে দিয়ে দু’হাঁটু চিবুকে ঠেকিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস নিল। ঘুমের আমেজে চোখ ভারি। কিন্তু খানিকক্ষণের জন্যে।

বাইরে আলোর দাপাদাপি। গাড়ির হর্ন। কুকুরের অভদ্র চিৎকার। সকাল সাতটায় বিদেশগামী কোনো বোয়িংয়ের দ্রুত অন্তর্ধানে বাড়ির দেয়াল কেঁপে ওঠে। রেডিওতে চড়া স্বরে গান।

উঠে পড়ল সাহানা। পর্দা টেনে দিলো। মুহূর্তে রাজ্যের আলো ওর চোখমুখ ধাঁধিয়ে দিলো। রাতের অন্ধকারে মনটা গলে মোম হয়ে গিয়েছিল। দরাজ দিল ছিল। এখন বাইরের নির্লজ্জ আলোয় রাতের কাতর অনুভূতিগুলো দ্রুত হাওয়ায় মিলে যাচ্ছে।

ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে পেল তার চোখের সে মায়াবিনী ভাবটি আর নেই। সে জায়গায় জ্বলজ্বল করছে ক্ষমাহীন দৃষ্টি। আর এ দৃষ্টিটা নিয়েই সে  যেন কঠিন করে তাকাতে পারে যে-কোনো লোকের প্রতি। যেমন খুশি চড়াগলায় কৈফিয়ৎ তলব করতে পারে। নিজের অধিকার খর্ব হয়েছে মনে করলে নিঃসঙ্কোচে, নির্ভয়ে তার খেসারত দাবি করতে পারে। এবং সেটা সে করবে বলেই বদ্ধপরিকর।

সাতসকালে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ার কোনো সদ্যুক্তি পেল না মকবুল। একমাত্র স্বাস্থ্যোদ্ধারের অজুহাত ছাড়া। তবু অভিজ্ঞতাটা খুব সুখকর মনে হয়নি। সকালের মুক্ত বাতাস, চারদিকের খোলামেলা ভাবটা ভালোই। ভাজা মাছের স্বাদ তাদের কাছেই যারা মাছের তেল দিয়ে মাছ ভাজতে পারে। নিজের শরীরে উদ্যম না থাকলে নতুন উদ্যম সঞ্চয়ের আশা করা যায় না। জায়গায় জায়গায় রাস্তা উঁচু নিচু। কোথাও আবার খাদ, ছোটবড় গর্ত। রাস্তায় ক্ষ্যাপা কুকুরের আতঙ্ক। দ্রুতগামী বাসের মুখে অনবরত নিজেকে সামলে নেওয়া। এসব হলেই প্রাতঃভ্রমণ সার্থক। তার কাছে সমস্ত ব্যাপারটাই একটা অহেতুক হয়রানির সামিল। খামোখাই শরীরটাকে শাস্তি দেওয়া।

একটা কার্যকারণ বা সদ্যুক্তি ছাড়া সবকিছুই কেমন অর্থহীন। যেতে যেতে মকবুল ভাবল কাল তার অসুস্থতার খবরটা জানিয়ে দিয়ে সে কি বাড়ির লোকদের অহেতুক ভাবনায় ফেলে দিলো। নাকি সে নিজেই একটু অতিরিক্ত সহানুভূতি বা অনুকম্পা লাভের জন্য কাতর।

ততক্ষণে সে রীতিমতো হাঁপাচ্ছে। ডাক্তার বলেছিল পূর্ণ বিশ্রাম নিতে। তাহলে এতক্ষণ হৃদয়ের গতিবেগ অসম্ভব পরিমাণ বাড়িয়ে সে কি ভালো করল। না, অবধারিত যাত্রার দিকে এক পা বাড়াল। পায়ের গিঁটে গিঁটে ব্যথা। জুতোটা পর্যন্ত পায়ে বিঁধছে। সামনে মরা ড্রেনের মাথায় একটা কালভার্ট। সেটারই এক ধারে দুপা তুলে হাঁটতে চিবুক ঠেকিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নিল মকবুল। কাঁপুনি থামুক। তারপর সে ফিরবে। আর, প্রথম প্রথম এক নাগাড়ে এতটা হাঁটাও ঠিক হয়নি। অল্প অল্প করে এগুলেই পারত। একদিনে হয় না।

তাকে ভীষণভাবে চমকে দিয়ে কে যেন পিঠে জোর চাপড় দিলো। তাকিয়ে দেখল লোকটা মিটি মিটি হাসছে। কমলা রঙের ট্রাক সুট পরা। ভালো নাম মনে নেই। এক সঙ্গে পড়ত। দুলু দুলু করে সবাই ডাকত। ভালো নাম নিশ্চয়ই একটা ছিল। এখন এতদিন পর আর জিজ্ঞেস করা হয় না। দুলুর সুন্দর সুঠাম দেহ। জাত খেলোয়াড় সুলভ পেটা শরীর। দুলু কিন্তু পায়ের ওপর এক জায়গায় দাঁড়িয়ে লাফাচ্ছে।

দুলু জিজ্ঞেস করে বসল, কি হে আজকাল রেগুলার মর্নিং ওয়াক করছ নাকি। খুব ভালো।

মকবুল তখনও হাঁপাচ্ছে। বলে, আসলে আমাকে দিয়ে এসব হয় না। কি মনে করে বেরিয়ে পড়েছিলাম। একদম ওঠার শক্তি নেই এখন।

তেমনি একই জায়গায় গায়ের ওপর লাফাতে লাফাতেই বলল দুলু আরে ওঠো। দৌড়াও। ওরকম হাঁপানি রোগীর মতো বসে থাকলে হবে না। আরে বাবা, প্রথম প্রথম একটু অসুবিধে হয়। কিন্তু সিস্টেম ঠিক হয়ে গেলে, নো ওয়ারি।

মকবুলের বলতে ইচ্ছে করছিল, যা বলার এক জায়গায় দাঁড়িয়ে স্থির হয়ে বলো। ওরকম তড়বড় করো না। নর্তন কুর্দন থামাও।

বলল, দেখা যখন হয়েই গেল, চলো বসি, দুটো কথা বলি।

দুলু আঁৎকে ওঠে।

না ভাই তার উপায় নেই। আমাকে আরো টুয়েন্টি মিনিট জগিং করতে হবে। পুরো দু’ঘণ্টা। প্রতিদিন সকালে আমার বাঁধাধরা।

তারপর নিজের স্বাস্থ্যের দিকে সুনজর দিয়ে বলে, তা না হলে এরকম ফিজিক রাখা যেত।

মকবুল বলল, তুমি তো আবার স্পোর্টসম্যান। আমার লেটেস্ট বোধহয় জানো না।

কি?

ডাক্তাররা ঠিক ভালোভাবে বলছে না। তবে মনে হয় কমপ্লিকেটেড কিছু একটা। অফিস থেকে রিটায়ার করিয়ে দিয়েছে।

দুলু তার নাচুনি মন্থর করে এনেছে। আর সে সুযোগে নীল রুমালে ঘাড় মুখ মুছে বলল, আচ্ছা এ খবর তো জানতাম না। তা করবে কী?

কী আর করব। পয়সা কড়ি থাকলে ছোটখাট বিজনেস-টিজনেসের কথা ভাবা যেত।

সে কথায় কান না দিয়ে দুলু তার নিজের মতামত চাপিয়ে দেয়, আরে ডাক্তারদের কথা ছাড়ো। জগিং না পার হাঁটো। অন্তত রোজ সকালে দু’মাইল। ক’দিন ধরে হাঁটছ?

আজই বেরুলাম প্রথম।

করে দেখো। এক উইকেই ফল পাবে। তারপর অনেকক্ষণ তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল দুলু। বোধহয় সেও একটা অসুস্থতা আঁচ করতে পারছে। বলতে পারছে না শুধু ভদ্রতার খাতিরে।

ভালো কথা মাঝে-মধ্যে ই. সি. জি. করিয়ে নিও। আর ব্লাড প্রেসার। সপ্তাহে একবার যথেষ্ট।

অনেকদিন নিইনি।

বলো কি?

তবে রক্ষে দুলু এবার থামল। স্থির হয়ে দাঁড়াল। বলল, আরো পাঁচ মিনিট করার কথা ছিল। থাক, এক কাজ করো। আমার সঙ্গে এক ডাক্তারের চেনাশোনা আছে। থরো চেকআপ করিয়ে দেবো।

এই শীত শীত সকালে হিতোপদেশ ভালো লাগল না। কেমন ভয় ভয়ই করল। সবাই কি টের পেতে শুরু করেছে একটা বিপর্যয় আসন্ন। তারা কি দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছে একদিন ওর ওই দেহে অসাড় হয়ে কোনো মসজিদের চত্বরে সারিবদ্ধ শোকার্ত বন্ধুদের সহানুভূতি কুড়োবে।

দুলু আবার বলল, না, তুমি বরং জগিং করো। হাঁটা ফাঁটায় কাজ হবে না।

নিজের বুকের ওপর হাত রাখল মকবুল। বলল, আমার এই অবস্থায় ঠিক হবে কি।

কালভার্টের ওপর তার পেশিবহুল একটা পা তুলে দেয় দুলু।

ওসব ছাড়ো। ডাক্তাররা অনেক কথাই বলে, আমি বলি, শোনো। প্রথমে আধ মাইল তারপর সোয়া মাইল।

তারপর মহাতৃপ্তির সাথে হাতের পেশির দিকে তাকিয়ে বলল, আমি টিকিয়ে রেখেছি কেমন করে। ওষুধপত্রে আমার বিশ্বাস নেই। ভিটামিন-টিটামিন খাই না। মাথাব্যথার জন্যে কোনোদিন এ্যাসপিরিন খাইনি।

হঠাৎ উৎসাহের আধিক্যে পিঠের ওপর আরেকখানা চড় মেরে বসল দুলু।

কি হলো, ভাবছ কী। আমার কথা মতো কাজ করো।

এই চড়ে ভয়ানক আতংকিত। বুকের সব ক’টা পাঁজির যেন কেঁপে উঠল।

আমতা আমতা করে বলে মকবুল, বলেছ যখন চেষ্টা করব। কিন্তু অত ভোরে যদি উঠতে না পারি।

আঃ দু’পাঁচ মিনিটে কিছু হয় না। আমি অবশ্যি রেগুলার জগিং করি। কোথাও না কোথাও তোমাকে ধরে ফেলব ঠিক। দুলু চলে গেল।

ব্যাপারটা সম্বন্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার আগে পূর্বাপর ভেবে দেখা দরকার। এত তাড়াতাড়ি কথা দেওয়া ঠিক হয়নি।

বেলা হয়ে আসছে। এখন ফেরা দরকার সন্দেহ নেই। সকালবেলা তার আকস্মিক আন্তর্ধানে যদি সামান্যতম কৌতূহলও হয়ে থাকে এখন আর তা নেই। চায়ের টেবিলে তার জন্যে কেউ অপেক্ষা করে নেই। বরং কেন যেন মনে হচ্ছে আজ সাহানার সঙ্গে তার কনফ্রনটেশন অনিবার্য। সাধারণত তাই হয়। দু’চারদিন কথাবার্তা নেই তারপর তুলকালাম কা-।

ফিরতি পথে হাঁটতে খুব খষ্ট হলো। কোথাও গ্যাসপাইপ বসানোর জন্য গর্ত, কোথাও নতুন বাড়ি তৈরির জন্য স্তূপীকৃত ইট সুরকি।

হঠাৎ ওর পেছনে জোর ব্রেক কষে একখানা গাড়ি থামল। কিছু বলার আগেই গাড়ির জানালা থেকে কে মুখ বাড়িয়ে বলল, একে এ্যাকসিডেন্ট, তার ওপর বন্ধু হত্যা। আমার বারোটা বেজে যেত। ডান-বাম দেখে চলো না? আমি তো ভাগ্যিস আস্তে ড্রাইভ করছিলাম। টপ গিয়ার খারাপ।

তার একদা সহপাঠী আকরাম। আজকাল ব্যবসা করে। ঠিক কি ব্যবসা জানে না।

কি মনে হওয়ায় আকরাম গাড়ি রাস্তার একপাশে করল। বলল, আজকাল করছ কী। সে নাইনটিন সেভেনটি থ্রিতে তোমার সঙ্গে টুরে দেখা হলো, আর খোঁজ নিতে পারিনি।

রিটায়ার করলাম লাস্ট উইকে।

ও।

তুমি?

আমার নতুন কোনো খবর নেই। ভালো হলো, দেখা হয়ে গেল। ড্রাইবার আসেনি। আমাকেই বাধ্য হয়ে গ্যারাজে দিয়ে যেতে হচ্ছিল। সকাল সকাল তোমার সঙ্গে দেখা।

মকবুল তাকে দুলুর কথা শোনল।

ও তাই নাকি। বাছাধন খুব স্বাস্থ্যেদ্ধার করে বেড়াচ্ছে। আমারও সাত সতেরো রকম কমপ্লেন। ডায়াবেটিস ব্লাডপ্রেসার।

নিজের অসুখের প্রসঙ্গ তুলল না মকবুল।

একরকম জোর করেই গাড়িতে চড়াল আকরাম। বলল, চলো ছেড়ে দি। মকবুল আপত্তি করল না।

ওর বাড়ির কাছে সরু গলি। গাড়ি যদিও যায়, ফিরতি পথে ঘোরানো মুশকিল। বড় রাস্তার মোড়ে গিয়েই বলল, এখানেই ছেড়ে দাও।

এখানে কেন। চলো বাসার সামনেই নামিয়ে দি। কোথায় নিয়েছ বাসা।

কাছেই।

প্রসঙ্গ পরিবর্তনের কারণেই। বানিয়ে বলল, তাছাড়া একটু বাজারে যাবো। বোঝ তো সংসারের ঝামেলা।

আকরাম মাথা নাড়ে, তা তো বটেই।

চলেই যাচ্ছিল মকবুল। আকরাম আবার ডাকল, দাঁড়াও।

কি মনে করে পকেট থেকে একখানা কার্ড বাড়িয়ে দিলো। ইন্টারকন্টিনেন্টাল বিল্ডার্স। ঠিকানা, টেলিফোন, টেলেক্স সবকিছুই আছে।

কথায় কথায় জানাল, পদ্মা হাউজিং সোসাইটিতে বাড়ি আছে নিজের। ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে পড়ে।

বারবার করে অনুরোধ করে গেল একবার যেন সে বাসায় আসে। সন্ধ্যায় থাকি বরাবরই। তবে টেলিফোন করে এলেই ভালো হয়।

বাড়ি ফিরেই টের পেল যথেষ্ট হইচই হয়েছে তার অবর্তমানে। তবে তার স্বাস্থ্যগত কারণে ততটা নয়, যতটা তার অপরিণামদর্শিতার জন্যে।

সবারই আক্ষেপ, না হলো একখ- জমি, না বাড়ি।

মকবুল বোঝাতে চায় ইচ্ছে থাকলেও বাড়ি করা যেত না। অত টাকা তার কাছে কোনোকালেই ছিল না।

সাহানা রেগে যায়। বলে, অন্যেরা কীভাবে করে?

তার শাণিত দৃষ্টির সামনে কোনো জবাব মনে এলো না। শুধু বলল, কীভাবে করে জানি না। আমাকে বেচলেও জমির টাকা উঠবে না। বাড়ি তো দূরের কথা।

সিগ্রেট ছেড়েছে আজ দু’বছর। তবু সাহানা কটাক্ষ না করে ছাড়ে না।

খাও আরো গাঁজা, ভাং, তামাক। নিজের সংসারের প্রতি মমতা থাকলে ঠিকই হতো।

মমতা!

কথাটা শুনে নিজেই আঁৎকে ওঠে মকবুল। মমতা কী করে আসে! কীভাবে দেখানো যায় !

এরকম একটা জবাব অনেক আগেই মনে করে রেখেছিল : আমি তোমার সঙ্গে আদর্শ স্বামীর মতোই আচরণ করেছি। বাচ্চাদের গায়ে আদর বুলিয়েছি। ওর কোনো আবদার শুনে গলে যাবে না জেনেও বাবা, মা ডেকেছি – ইত্যাদি। কথাগুলো বলতে গিয়েও বলতে পারল না।

অবশ্যি এ ধরনের জবাবে সাহানাকে খুব একটা ইমপ্রেস্ড করার সম্ভাবনা কম। হয়তো উল্টো বলে বসতো করেছ করেছ বেশ করেছ। দুনিয়ার সব বাপ-মারাই করছে। কথা হলো, ভবিষ্যতের জন্য কী করে গেলে।

ভবিষ্যতের জন্যে কী করেছি। কিছু না। ছেলে নান্টু ইস্কুলে যাচ্ছে। মেয়ে মিথুনকে বিয়ে দিয়েছি। আমি আমার সাতচল্লিশ বছর বয়েসে আর কি করতে পারতাম সাহানা। একটু বিচার-বিবেচনা করে কথা বলো। যে চাকরি করি তাতে ঘুষের কোনো স্কোপ নেই। থাকলেও আমাকে বিশ বছর ধরে পাঁচশ টাকা কে দিত! তারা সবাই জানত অফিসে আমার ক্ষমতার বহর। আমি শুধু এটুকুই লিখতে পারতাম এটা দাও, ওটা দাও। বা ওটা দিও না। তাতে কোনো কাজ হয় না। যাদের দেওয়ার, দেওয়া হয়। যাদের হয় না, হয় না। এ সত্যটা কোনো কালেই অজানা ছিল না। তাহলে তারা জেনে শুনে খাতির করতে যাবে কোন দুঃখে।

সাহানা বলল, আমরা কোনোদিনই ওরকম ভাবিনি। ওসব তোমার নিজেরই ধারণা। তোমাকে লোকে তোষামোদ করতে যাবে কেন। তারা কি জানত না তুমি ছিলে নিছক মার্কেটিং এ্যাসিসটেন্ট।

খানিকক্ষণ থেমে আবার সাহানা বলল, সারা ছুটি গেল, লোনের এ্যাপ্লিকেশন করলেও তো পারতে। কথাটা কেমন করে বলবে ভেবে পেল না। নিজের ত্রুটি স্বীকার করল, অবশ্যি করা যেত। তবে আমাকে লোন দিত না। বাড়ির সকলের এ্যাটিচিউডটা আগে থেকেই খারাপ।

সাহানার হাতে উলের সেলাই ছিল, ওখানা রেখে দিয়ে বলল, ওদের দোষ দিচ্ছ কেন। নিজের গলদ চেপে যাচ্ছ। কোনোদিন দেখলাম না নিজে থেকে উদ্যোগী হয়ে কিছু করলে। কত বললাম, অন্য কোথাও দেখো, তাও দেখলে না।

এত সব শোনার ধৈর্য তার ছিল না। তবু সত্যি কথা না বলে পারল না।

আমাকে ওই বয়েসে কেউ চাকরি দিত না।

ভালো।

সাহানা নিজেও বোঝে এ সংসারে এসে তার নিজের ভেতরটাও কেমন ফাঁপা হয়ে আসছে। কিসে ভালো, কিসে মন্দ, তার নিজের কাছেও গুলিয়ে যায় অনেক সময়। মেয়েটির বিয়ে হয়েছে। বর ভালো চাকরি করে। ছেলেটা লেখাপড়ায় সুবিধে করতে পারছে না। অদ্ভুত গাণিতিক নিয়ম। কোথাও হচ্ছে। কোথাও হচ্ছে না। চিরন্তন টানাপোড়নের খেলা।

তবে কি আসলেই সমস্ত অপরাধ তার? তার অপারগতার? কেন সে পারল না। মানুষ কী না করছে? টাকা নেই বললেই হলো। তবে নতুন নতুন বাড়ি উঠছে কেমন করে। রাস্তায় হাল মডেলের গাড়ি আসছে কোত্থেকে। যার উদ্যম আছে, উদ্যোগ আছে, তারই হয়। যার নেই, হয় না।

গালে হাত দিয়ে বসে থাকে মকবুল।

সাহানা বলে, মন খারাপ করে কি আর করবে। শুধু নিজের তো নয়, আমাদের কপালেও মেলা দুঃখ আছে।

কেমন একটা স্তিমিত ভাব। আজ কেউ টু-ইন ওয়ান বাজাল না। টেলিভিশন প্রোগ্রামের জন্য কারও চাঞ্চল্য দেখা গেল না। মেয়ে মিথুন শুধু একবার মাকে মনে করিয়ে দিলো, দশটার নাটক শুরু হচ্ছে।

গরজ দেখাল না সাহানা।

বলল, আর নাটকে কাজ নেই। চোখের সামনে যে নাটক দেখতে পাচ্ছি, সেই যথেষ্ট।

নিজের অপারগতার কথা বলে মকবুল ভালো করেছে না মন্দ করেছে জানে না। এক অর্থে ভালো করেছে। করবে না কেন।

সব মানুষের একটা সীমা আছে। সে কাজ করেছে। মন জুগিয়েছে। আজ তারাই তাকে মাঝপথে ফেলে চলে গেল। সে অন্ধকারে পড়ে থাকল। গায়ে ঠান্ডা বাতাস। আকাশে হাজারো তারার বাতি। হঠাৎ সে বেজায় একা। এটাকে দুঃখ বলে না ঠিক। হয়তো সহমর্মিতা বলে। নিজের অবস্থানকে অন্যের চোখে দেখা।

কদম্বপুরে মেজভাই আছে। তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই অনেক বছর। মকবুলের শারীরিক অস্বাচ্ছন্দ্যের কথা জানালে হয়তো একটু বিচলিত হবে। কিন্তু ওইটুকুই। বড়জোর সমবেদনার হাল্কা প্রলেপ সম্বলিত একটা চিঠি আসবে : দেখ কি হয়। মুষড়ে পড়ার কিছু নেই। আমার তো নিজের এই অবস্থা। দিনাজপুরের জমিটা নিয়ে বড় হ্যাংগামা। তা নইলে তোকে দু’দশ হাজার দিতে পারতাম।

এই দু’দশ হাজারের দরকার নেই মকবুলের। এক কপর্দকেরও নয়। সে কামনা করে সত্যিকার সহানুভূতি। তার সঙ্গে একাত্মতা। মকবুল উপলব্ধি করে : ক্রমশ তার বয়েস বাড়ছে। সে এক মহাশূন্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার সামনে-পেছনে কিছু নেই।

গন্তব্যে সবাই যাবে। তবু তার স্বাস্থ্যে বিরাট রকম একা গলদ ধরা পড়েছে বলেই সবাই তাকে টানা-হ্যাঁচড়া করছে। তারা কি ধরেই রেখেছে এ মানুষটা আর কতদিন।

আবার অনেক সময় তার নিজেরই মনে হয় এখনও সময় আছে। সব ফুরিয়ে যায়নি। তার নিজের অনেক শখ ছিল, আশা ছিল, আকাক্সক্ষা ছিল। যেমন সে একদিন বেপরোয়া হবে। নেশা করবে, কঠিন নেশা। শেক্সপিয়ারের সব ক’টা বই পড়ে ফেলবে। সে একটা উপন্যাস আরম্ভ করেছিল। ওখানা শেষ করবে।

পুরোন বইয়ের দোকানে যাবার ইচ্ছে নিয়ে বেরিয়েছিল বিকেলে। কিছু দূর যেতে না যেতেই দেখা হয়ে গেল ডক্টর রাব্বানীর এ্যাসিসটেন্ট এখলাসের সঙ্গে। ভারি উদ্বিগ্ন দেখাল তাকে।

মকবুল জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার বড় ব্যস্ত মনে হচ্ছে?

ব্যস্ত নয় স্যার, ব্যস্ত নয়। কাল রাতে আমাদের ওপর দিয়ে যে কী গেছে বোঝাতে পারব না।

সন্ধ্যায় এক বিয়েবাড়িতে যাবেন ডক্টর রাব্বানী, তখনই ডাক পড়ল। তিনি আবার জেনুইন পেশেন্টদের কল পেলে কখনও না বলেন না।

মকবুল জানে কথাটা একটু বাড়িয়েই বলছে এখলাস। কিছুটা পাবলিক রিলেশনিংও বলা যেতে পারে। যার নূন-নেমক খাচ্ছে, তার গুণ খাওয়া আর কি।

কী হয়েছিল জানতে চায় মকবুল।

কোনো ভূমিকা না করেই গড়গড় করে বলে ফেলল, আর কি হবে। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজিং ডাইরেক্টার দেলওয়ার হোসেন কাল হার্টফেল করে মারা গেল।

কোন দেলওয়ার হোসেন?

আসলে ওই নামে তো তাকে কেউ চেনে না। সবাই দুলু সাহেব বলেই ডাকত।

মুহূর্তে মকবুলের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। বলে কি, যে লোকটার সঙ্গে তিনদিন আগে দেখা, যে নিজের স্বাস্থ্য সম্বন্ধে এত ব্যাকুল, সেই দুলু। সুন্দর সুঠাম দেহ, জাত খেলোয়াড়। বানানো পেটানো শরীর। মুখ দিয়ে কথা সরলো না।

এখলাস আঁচ করতে পারল।

জিজ্ঞেস করল, আপনার জানাশোনা বোধহয়।

মকবুল মাথা নাড়ল।

এবার এখলাসের ভিন্ন সুর। আসলেই কার যে কখন ডাক আসে কিছু বলা যায় না। দেখুন না দুলু সাহেবের অসুখের খবর পেয়ে গেলেন ডক্টর রাব্বানী সব ছেড়ে-ছুড়ে। আমিও রেহাই পেলাম না। কখন কোন ওষুধ লাগে। কোন ইঞ্জেকশন দিতে হয়। হার্ট স্পেসালিস্ট এলো পরীক্ষা করে দেখল। কিছু পেল না। অথচ তার দু’ঘণ্টা বিশ মিনিট পরেই সব শেষ।

এখলাসের মুখেই শুনল চিকিৎসার কোনো ত্রুটি হয়নি। ডাক্তার, নার্স সবাই ছিল কিন্তু কোনোমতেই অবস্থার মোড় ফেরানো যায়নি। এগারোটা সাত মিনিটে দুলু মারা গেল।

পরদিন সকালে হাঁটতে গিয়ে মকবুলের মনে হলো, এই চট করে মরে যাওয়াটাই যেন দুলুর পক্ষে স্বাভাবকি ছিল। তা না হলে হাসপাতালের বিছানায় তার ধুঁকে ধুঁকে মরবার কথা কল্পনা করা যায় না। দুলুর ব্যাপার শুনে মন খারাপ হয়েছে। ভয়ও ধরেছে মনে। দুলুরই যদি এরকম হয়, তাহলে তার দশা কী হতে পারে। যদি একবার নিয়তির কাছ থেকে জেনে নেওয়া যেত। এই যে রোজ প্যালাপটিশন, মাথাব্যথা, হাঁটুতে বাত, চোখ ছলছল করা। এসবের যা মিশ্রফল, তার টোট্যাল করলে কি দাঁড়ায়। সব মিলিয়ে-টিলিয়ে থাকে ক’দিন, তিন, দুই, এক বছর না ছ’মাস? মাই গড, মরে যেতে হবে যে-কোনো দিন। আর সে কালক্ষয় করে যাচ্ছে।

আজ অনেকদিন পর ঢিলে-ঢালা কামিজ গায়ে, স্যান্ডেল পায়ে হেঁটে এলো লম্বা পথ। মাইল খানেক তো হবেই। এ রাস্তায় কবে হেঁটেছিল শেষ। কবে কার সঙ্গে?

সে খুব টায়ার্ড। গলা ধরে এসেছে। বসে পড়ল মাঝপথে। ওরকম বসে পড়লে দুলু বলত, বসে পড়লে কেন। চলো। সামান্য এটুকু পথ হাঁটতে পারো না।

সকালবেলার নিঃসঙ্গ আলো-অন্ধকারে, ল্যাম্প পোস্টের ভৌতিক ছায়ায়, অর্ধনির্মিলিত চোখে সে একটা বিচিত্র পৃথিবী কল্পনা করল, যেখানে তার মৃত্যুশয্যা থেকে দুলু তার জগিং শুরু করেছে। কেডস পায়ে। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি। পরনে হাফপ্যান্ট। অত্যাধিক লোমশ পা।

হঠাৎ যেন আগের মতোই তার পিঠে চাপড় দিয়ে জিজ্ঞেস করে বসে, কী ব্যাপার?

কোনো জবাব মনে আসে না মকবুলের।

বলে, না কিছু না।

আমি মাইল চারেক দৌড়ে এলাম। রোজই দৌড়াই। এতদিন তোমাকে দেখিনি।

এতদিন আসিনি।

বেশ বেশ।

ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সেই এক কথাই জিজ্ঞেস করল, তোমারও দুটি ছেলেমেয়ে? থাকো এখনও অফিসের কোয়ার্টারে?

হ্যাঁ।

মাঝে মাঝে বেড়াও তো।

আজই বেড়াতে বেরুলাম অনেকদিন পর।

দুলু সেই পুরনো কথাটাই পাড়ল আবার। এ বয়েসে হাঁটাফেরা ভালো। আমি সবসময় করি। ই. সি. জি. করিয়ে নিও। ব্লাডটাও দেখিয়ে নিও। করাও তো?

অনেকদিন করাইনি।

দুলু যেন ঠিক সেই আগেকার মতো চোখ বড় বড় করে বলছে, বলো কি।  এসো একদিন। আমার জানাশোনা ডাক্তার আছে। থরো চেকআপ করিয়ে দেবো।

সেই দুলু কি নিজের চেকআপ করিয়েছিল?

অনেক দেরি হয়ে গেল। ফেরা দরকার। তার অনেক কাজ। বরাদ্দ সময় সীমিত। যা কিছু এর মধ্যেই গুছিয়ে নিতে হবে।

বাড়ির দরজায় সাহানার সঙ্গে দেখা হবে। তাকে আড়চোখে চেয়ে চেয়ে দেখবে। কৌতুক করবে মনে মনে। বলবে না। কিন্তু ঠিক ভাববে। লোকটা কিছু বাড়তি সময় বাঁচার ফন্দি নিয়ে শরীর ঝালিয়ে নিচ্ছে।

সাহানার দেহ এখনও ধোপে টেকে। শক্ত গাঁথুনি। এখনও সে দেহটাকে নানা ছাঁদে সাজাতে পারে। ওর হাসির একটা মারাত্মক প্রভাব। ওই দেহটাকে নিয়ে হয়তো তার আরো কিছু পরিকল্পনা আরো কিছু ধ্যান-ধারণা।

॥ দ্বিতীয় পর্ব ॥

একরকম যেঁচেই নতুন একটা দায়িত্ব নিয়েছে আজকাল মকবুল। বিকেলে রুটিটা সে নিজেই কিনতে যায়। তাড়াতাড়ি না গেলে পাওয়া যায় না। প্রায়ই ছ’টার পর শেষ হয়ে যায়।

ডন বেকারির মালিক নওশের আলী নিজেই বসে দোকানে। সঙ্গে ফুটফরমাস খাটার জন্য পনেরো-ষোলো বছরের একটি ছেলে আবদুল। বেচাকেনা যা হয় তা ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই। তন্দুর থেকে রুটি এসে নাবে সাড়ে চারটা নাগাদ। সেগুলো হিসেব করে তোলারও সময় পায় না। তার আগেই শেষ। বোধহয় তার দোকানের আলাদা একটা সুনাম। তা না হলে সব ছেড়ে তার দোকানেই এত ভিড় কেন।

মকবুলকে দু’চারদিন খালি হাতে ফিরে যেতে দেখেছে নওশের আলী। একটি ভগ্নস্বাস্থ্য মানুষ ভিড়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে হতাশ হয়ে চলে যাচ্ছে, বোধহয় এটা নওশের আলীকে বিশেষভাবে পীড়িত করে। একদিন সোজাসুজি তাকে ডেকে পাঠায়, আপনি প্রায়ই ফিরে যান, আমার খারাপ লাগে।

অকপটে স্বীকার করে মকুবল, বিকেল সাড়ে তিনটা থেকে ধরনা দিতে পারি না। অদ্দূর পথ রোদ মাথায় করে এসে হাঁপিয়ে পড়ি।

নওশের আলী তাকে ভেতরে নিয়ে বসায়। বলে, আপনাকে ভাবতে হবে না। আপনারটা আমার কাছে রাখা থাকবে। যখন খুশি নিয়ে যাবেন।

মকবুল বোঝে না কেন তার প্রতি এই অনুকম্পা। তাছাড়া সে তো নিয়মিত খদ্দের হতে পারছে না। গোড়াতেই কথাটা বুঝিয়ে দেওয়া ভালো। তাই বলে, আমি তো রোজ রোজ আসতে পারব না। তাছাড়া আস্ত একটা রুটি কেনার মুরোদ কই। মাঝে মধ্যে ইচ্ছে হলো কিনে খাই। আর কিনলে আপনার এখানেই আসি। কারণ রুটিটা ভালো।

নওশের তাকে থামিয়ে দেয়, ভালোমন্দ যাই হোক দামের জন্য ভাবতে হবে না। আপনার মতো খদ্দেরকে আদ্ধেক দামে দিলেও বিজনেস ফেল মারবে না।

মকবুল কি একটা বলতে যায়, তার আগেই ভেতর থেকে খবর আসে চা তৈরি।

দোকানের সঙ্গে লাগোয়া ছোট একতলা বাড়ি। সামনে ছোটমতো উঠোন। সেখানে গুটিকতেক চেয়ার পাতা।

নওশের তাকে সেখানেই নিয়ে এলো। বলল, বিকেলের চা-টা আমি এখানেই সেরে নিই। ঘর-দোকান দুটোই দেখা হয়। তাছাড়া জায়গাটা খোলামেলা। আমারও ভালোই লাগে।

মকবুল জানতে চায়, এ বিজনেসে এলো কেমন করে।

নওশের আলী মৃদু হাসে। বলে, কেমন করে নিজেও জানি না। সারা জীবন কোর্ট-কাচারি করি করলাম। মুন্সেফি করেছি। একবার একটা লোককে চুরির অপরাধে দিয়েছিলাম। হঠাৎ একদিন জেল থেকে এসে সে হাজির। আমিও রিটায়ার করেছি। ভাবলাম, বোধহয় পুরোন ঝাল মিটিয়ে নিতে চায়। দেখলাম তা নয়। লোকটা অনুতপ্ত। বলে, স্যার আমি একসময় ভালো কারিগর ছিলাম। গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে। রুটি বানাতাম। অনুমতি দেন তো এখানেই একটা দোকান দি।

ভাবলাম, ভালো। দিক, তারও দুটো পয়সা আসবে আর আমারও কিছু রোজগার, মন্দ কি।

ততক্ষণে চা এসে গেল। এক কাপ চা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নওশের আলী বলে, জানেন প্রথম প্রথম সবাই আমাকে খুব একচোট নিত। বলত, শেষটায় বাড়ি আর দোকান এক জায়গায় করলেন। মনে মনে বললাম, তাতে কি মানসম্মান খুয়ে যাচ্ছে।

মকবুল স্বস্তির চুমুক দেয় চায়ের কাপে। অনেক দিন অত আদর-আপ্যায়ন করে তাকে কেউ চা খাওয়ায়নি। সে সায় দিয়ে বলল, আমার তো মনে হয় ঠিকই করেছেন।

আপনি বলেছেন ঠিক করেছি ছেলেমেয়েরা চটা? বলে, আমি মান ইজ্জত ডুবিয়েছি। আমি পরওয়া করি না। বলতে দিন যে যা বলতে চায় –

কোথায় যেন মনে তার একটা ভারি দুঃখ। কথা বলে হাল্কা হতে চায়।

একটু বাইরে বসে চা খাই, সেটাও নাকি কারও কারও পছন্দ নয়। আমি বলি, আমার ভালো লাগে খাই। রাস্তার লোকজন দেখি, গাড়িঘোড়া দেখি। তারপর দেখুন না এই যেমন আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দুটো কথা বললাম। ঘরের ভেতর চেয়ার-টেবিলে বসে খেলেই লাট সাহেব বনে যাবো।

নওশের আলীকে সে আর কি প্রবোধ দেবে। পারলে সে বরং নিজেই চাইত। লোকটা কর্মক্ষম। তবুও একটা কিছু দাঁড় করিয়েছে। সেও যদি এরকম কিছু একটা করতে পারত। দেখতে মনে হয় লোকটার বয়েস তার চেয়ে বেশি। সম্ভবত পঞ্চাশ, পঞ্চান্ন বা আটান্ন। কিন্তু বয়েস হলে কি হলো। আসল হচ্ছে উদ্যোম। আর এ উদ্যোমের লড়াইয়ে মকবুল নির্ঘাৎ মার খেয়ে যাবে।

মকবুল উঠতে যায়। নওশের আলী তখনও চুমুক দিতে থাকে চায়ের কাপে। বলে, বসুন, বসুন। এখন কি যাবেন। আটটা তো বাজেনি। আপনাকে একটা নানখাতাই বিস্কুট দিতে বলি। আমাদের স্পেশ্যালিটি।

মকবুল মাপ চায়। বলে, আজ থাক। আরেক দিন এসে টেস্ট করে যাবো।

বৈকালিক চায়ের আসরে সে নিয়মিত সঙ্গী হবে, এই প্রতিশ্রুতি দেবার পর সেদিনের মতো ছাড়া পায়।

মকবুল সোজা বাসস্ট্যান্ডের দিকে জোর পায়ে হাঁটা শুরু করে, কিছু দিন ধরে হাঁটুতে ব্যথা। টোটকাটুটিতে কাজ হয়নি। সুলেমান মুনশী বন্ধু মানুষ। একসঙ্গে পড়াশোনা করত। শুনেছে হোমিওপ্যাথি করে। বাতের রোগের নাকি অব্যর্থ চিকিৎসা তার কাছে। অন্তত লোকজন তাই বলে। চাকরি করত ছোটখাট একটা ফার্মে। তেমন কিছু আয় ছিল না। চিকিৎসায় হাত যশের পর থেকে গাড়ি-বাড়ি সবই হয়েছে। অবশ্য আজকাল চোখে তেমন দেখে না। প্র্যাকটিস আগের মতো জমে না। আদৌ আছে কিনা সন্দেহ।

বাড়িটা বড়ই। তবু নম্বর বিভ্রাটের জন্য চট করে খুঁজে পায়নি।

বাইরে লোহার গেট। কলিং বেল বা দরজার কড়া কোনোটাই নেই। বাধ্য হয়ে দরজা ধাক্কা দিতে হয়। ভেতরে ছেলেমেয়েরা ব্যাডমিন্টন খেলছিল। তাদেরই একজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানতে চাইল সুলেমান মুনশী বাসায় আছে কিনা। একটি ষোলো-সতেরো বছরের মেয়ে তার চোখের ডবল বড় সানগ্লাস সরিয়ে এক ঝলক তাকে দেখে নেয়। তারপর বলে, জানি না।

অবশ্যি মকবুলকে অপেক্ষা করতে হয় না। তার আগেই রোগা পাতলা একটি লোক এসে গেট খুলে দেয়। তাহলে এই সেই সুলেমান মুনশী? কি চেহারা হয়েছে। পরনে গেঞ্জি আর প্রায় হাঁটুর ওপর তোলা লুঙ্গি। চোখে মোটা পাওয়ারের চশমা। মনে হয় অনেকদিন গোঁফ-দাড়ি কামানো হয়নি।

মকবুল হতবাক।

আমাকে দেখলে কী করে।

গেটের খিল লাগিয়ে দিয়ে তাকে ভেতরে নিয়ে আসে সুলেমান। যেতে যেতে বলে, আমি সারা দিনই নিজের ঘরের জানালা খুলে রাখি। রাস্তার লোকজন দেখি। যদি কেউ কখনও আমার কাছে আসে। আর কেউ যদি ডেকে না দেয়। আজকাল বড় বেশি কেউ একটা আসে না যদিও।

একটা ছোট্টমতো প্রায় অন্ধকার ঘরে গিয়ে বসল ওরা দু’জন। অনেকদিন পর মনের মতো একজন পেয়ে আনন্দে আত্মহারা সুলেমান।

জিজ্ঞেস করল, কোথায় ছিল।

মকবুল জানাল, আমি তো চাকরিতেই ছিলাম। রিটায়ার করিয়ে দিলো।

ভেতরে ভ্যাপসা গরম। তাছাড়া অন্ধকার।

মকবুল জিজ্ঞেস করে, পাখা নেই?

না।

কেন?

এই এমনি। জানালা দিয়ে হাওয়া আসে। যথেষ্ট হাওয়া, কি বলো।

মকবুল সায় দিতে পারে না। সন্ধে ঘনিয়ে আসে দেখে নিজেই বাতির সুইচ খোঁজে।

সুলেমান বাধা দেয়, থাক থাক। আলো দরকার নেই।

কেন?

এবার ওর কানের কাছে মুখ এনে বলে, বাতি জ্বালালে রাগ করে।

কে?

আমার মেয়ে, ছেলের বৌ সবাই। বলে, অত বাতির কী দরকার। মিছিমিছি ইলেকট্রিসিটির বিল বাড়ানো।

তারপর কিছুটা দার্শনিক ভঙ্গিতেই বলে, আমার এখন অন্ধকারই ভালো।

কেন?

এজন্যে যে, আমরাও একদিন অন্ধকারেই যাবো।

যুক্তিটা খুব মনঃপুত হলো না, যদিও প্রতিবাদ করল না।

মনে মনে ভীষণ রাগ হয় মকবুলের।

বাড়িটা কার? তোমার না অন্য কারও?

কেন আমার।

তোমার নিজের বাড়িতে তোমার এ দশা?

দুটো কাঁপা হাত তাকে অন্ধকারে ঠাহর করে।

তারপর তাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ওসব বলো না। অত জোরে বলো না। ছেলেমেয়েরা শুনলে চটে যায়। বলে, আপনি লোক দেখলে আমাদের বদনাম করেন।

মকবুলের ইচ্ছে করে এই ভীতসন্ত্রস্ত লোকটাকে দু’হাতে প্রচ- ঝাঁকুনি দিয়ে জিজ্ঞেস করে, তাহলে কেন করেছিলে এ বাড়ি। যখন ভোগ করতে পারো না, ভয়ে ভয়ে লুকিয়ে থাক।

সুলেমান ফিস্ফিসে গলায় বলে, এখন ওসব বলো না। আমি ওদের দয়ায় আছি। কাল যদি একটা ভালোমন্দ বলে বসে কোথায় যাবো। কী করব। একসময় আশা ছিল নিজের বাড়ি হবে। সেখানে একটা লাইব্রেরি করব। মাদুর বিছিয়ে শুয়ে শুয়ে পড়ব। লেখক হতে চেয়েছিলাম, হলো না। আসলে সত্যি কথা কি জানো, মানুষ কেবল চাইতেই পারে। কোনো কালেই তার কিছু হয় না।

এখনও ইচ্ছে করলেই বই কিনতে পারো। লিখতে পারো।

টাকা পাব কোথায়? টাকা যা ছিল তা তো বাড়িতেই গেল।

তোমাকে কেউ কিছু দেয় না?

না, না, চাইলে দেবে হয়তো। তবে ওরা বলে আপনার এ বয়সে টাকার কী দরকার। খাচ্ছেন, দাচ্ছেন, ঘুমোচ্ছেন, আর কি চাই?

মকবুলের হাসি পায়। বলে, কি অবস্থা বানিয়ে রেখেছ দেখো। কাপড়ে ইস্ত্রি নেই। গেঞ্জি ছেঁড়া।

এ বয়সে আর কী হবে ওসবে?

তাহলে এ বয়সে বাড়িটারই কী দরকার ছিল? হীরাগঞ্জের তোমার সেই চালা ঘরটা এমন কি খারাপ ছিল। তবুও ও বাড়িতে তোমার হাঁকডাক ছিল। দশজন তোমার কথা শুনত। চোখ তুলে তাকাতে সাহস করত না। আর আজ?

মাঝখানে কথা থামিয়ে দিয়ে মকবুল বলে, যাক ওসব তোমার ব্যাপার। তুমিই ভালো বুঝবে। আমি এসেছিলাম বাতের ব্যথার একটা ওষুধের খোঁজে। শুনলাম তোমার নাকি হোমিওপ্যাথিতে খুব হাত যশ ছিল।

আনন্দে সুলেমানের চোখ বড় বড় হয়ে ওঠে। বলে, জানো একটা চেম্বার থাকলে ভালো প্র্যাকটিস হতো। এ বাড়ি করার পর ছেড়ে দিয়েছি।

ওদের কথার মাঝখানে একটি ষোলো-সতরো বছরের মেয়ে এসে ঢুকল।

বোধহয় এক নজরে মকবুলকে দেখল কিংবা দেখল না।

শুধু বলল, আমরা যাচ্ছি।

ভয়ে ভয়ে সুলেমান জিজ্ঞেস করে, কোথায়। ঝাঁঝিয়ে ওঠে মেয়েটি, কোথায়, আপনার সব কথার কী দরকার। মার্কেটিং-এ। বলতে এসেছিলাম বেশিক্ষণ কথা বলে আবার সেদিনের মতো না হয়। ছ’টায় ওষুধ খেয়ে নেবেন। চম্পার মা দিয়ে যাবে।

মকবুলকে দেখিয়ে বলে সুলেমান, তোমার আংকল।

মেয়েটি চলন্ত ট্রেন থেকে মাইল পোস্ট দেখার মতো করে একবার দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর নিজের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, আচ্ছা, আমরা যাই।

চলে যেতেই পরিচয় দিয়ে বলে সুলেমান, আমার ছোট মেয়ে রীতা।

মেয়েটির মুখের ভাষা পড়ে ফেলেছে মকবুল। ওদের চঞ্চল দৃষ্টিতে শুধু একটাই হিসেব। বুড়োর আর ক’বছর, কতদিন? পাঁচ, সাত, বড়জোর দশ। কাজেই অত তোষামোদ কেন। যেটুকু দরকার ততটুকুই। তার বেশি কোনোক্রমেই নয়।

সুলেমান তাকে অবাক করে দিয়ে বলে, মেয়েটি কিন্তু আমাকে ভালোবাসে।

মকবুলের হাসি পেল। কেন, তার বিশ্বাস অর্জনের জন্য সুলেমানের প-শ্রম। ভালোবাসা! একটি মানুষ আরেকটি মানুষকে কত বিচিত্রভাবে ভালোবাসতে পারে। সত্যিকার অর্থে ভালোবাসে। অন্যের মন রক্ষার তাড়নায় ভালোবাসে। ভালোবাসে গরজের তাড়নায়।

বোধহয় আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনছিল ওদের কথা সুলেমানের বৌ।

পরদা সরিয়ে দু’জনকে চমকে দিলো। বলল, কি এমন দুঃখে মরে যাচ্ছ যে, বাইরের লোকের কাছে তার ফিরিস্তি দিতে হবে।

সুলেমান আহত হয়। বাইরের লোক বলছ কেন। মকবুল বাইরের লোক হতে যাবে কেন।

কিন্তু এসব সদ্ব্যাখ্যা শোনার সময় ছিল না সুলেমান গিন্নীর।

তবু যা মনে এলো বলে ফেলল, কৈফিয়তের দরকার নেই। আমার বন্ধুটিকে আপনারা কি সুখে রেখেছেন স্বচক্ষে দেখে গেলাম।

মকবুল উঠে দাঁড়ায়। যাবার উপক্রম করে।

আবার উঠে এসে অন্ধকারে একটা হাত তাকে খুঁজে বেড়ালো। কিন্তু পেল না। ভেতর থেকে একটা আর্তস্বর শুনে দাঁড়িয়ে গেল মকবুল দরজার বাইরে এক মুহূর্ত।

চলে যাচ্ছ? কী জন্যে এসেছিলে বললে না তো।

আমার একটা ব্যথা ছিল।

তাহলে যাচ্ছ কেন?

দেখলাম আমার তুলনায় তোমার ব্যথা অনেক সিরিয়াস।

রাতে একান্তে বসে মকবুল তার নবলদ্ধ অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করল ডাইরিতে।

দেখে এলাম সুলেমান মুনশীকে। বাড়ি-ঘর মন্দ নয়। মেয়েটাও সুন্দরী। আমাকে দেখে বড় বেশি পাত্তা দিলো না। পাত্তা আমাকে আজকাল কেউই তেমন দেয় না। সেজন্য আমার দুঃখ নেই; ওর বৌ আমাকে অপমান করল। তাতেও বিচলিত হইনি। অপমানও আমাকে অনেকে করে। সুতরাং গায়ে মাখি না। সুলেমান মুনশীর কাছে ব্যথার চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলাম। কিন্তু ওর নিজেরই চিকিৎসা দরকার।

ইচ্ছে ছিল উল্টো আমার বন্ধুটিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো। বলব, কী হয়েছে দেখুন। এমন করে কি লোকটা বাঁচবে, বলুন।

ডাক্তাররা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা নয়। তবু। মকবুলের বিকেলের ঘোরাফেরা ক্রমশই সন্দেহের বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়।

মকবুলের বৌ বলে, আজকাল কী হয়েছে তোমার। বেকারির দোকানে বসে আড্ডা দাও। চা খাও। বললে তো বাসায় আমরাও বানিয়ে দিতে পারি।

মেয়ে মিথুন এসে বলে, রাস্তার ধারে লোকজনদের সামনে এরকম ডেমনস্ট্রেশন না দিলেও চলে।

হঠাৎ বলার মতো কিছু খুঁজে পায় না মকবুল।

নইলে তার বলতে ইচ্ছে করছিল, আমাকে কদর করার লোক কমে আসছে। যে আমাকে কদর করে, নিজ থেকে ডাকে তার কাছে যাই। কি আপত্তি তাতে।

পরিবর্তে কথাটা ঘুরিয়ে বলল, নওশের আলী নিজে থেকে ডাকে বলেই যাই।

সাহানা ওর যৌক্তিকতা স্বীকার করে না। বলে, ডাকল বলেই চলে যাবে। তোমার নিজের একটা বাছ-বিচার নেই।

মেয়েও এসে মায়ের সঙ্গে গলা জুড়ে দেয়। ওদের বক্তব্য : চাকরি নেই তা বলেও সে যেমন খুশি আচরণ করতে পারে না। মানুষকে যে-কোনো অবস্থায় নিজের স্টেটাসের কথা ভাবতে হয়। কিছু না হোক পরিবারের আর দশজনের সুখ-রক্ষার জন্য বুঝেশুনে চলতে হয়।

মকবুল প্রতিবাদ করে, আমি বাসায় বসে স্বস্তি পাই না?

তবে কোথায় পাও?

লোকজনদের সঙ্গে কথা বলে।

কই তারা তো তোমার সঙ্গে গায়ে পড়ে মিশতে আসে না। তোমার গরজটা কি?

মকবুল বলে, একজন লোক কম করে হলেও তার জীবদ্দশায় পাঁচশ জনকে চেনে।

সাহানা বলে, পাঁচশ হোক, পাঁচ হাজার হোক, তোমার তাতে কি। তারা তো কেউ তোমার আপন নয়।

সেজন্যই তো দু’চারজনকে আপন করে যেতে চাই।

ডাকে না হাতি। ওসব ছাড়। পেনশনের টাকার কী হলো খোঁজ নাও। বাড়িঘর তৈরির চেষ্টা করো।

এক কথায় নাকচ করে দেয় মকবুল, বাড়ি সম্ভব নয় সাহানা। আমার দ্বিতীয়বার জন্ম হলেও ব্যাংকে অত টাকা হবে না কোনো জন্মে।

তাহলে অন্যরা করে কী করে?

ওদের হয়তো ব্যাংকিং আছে। অথবা বড়লোক শ্বশুর। তাছাড়া আমার সে বয়েসও নেই।

রাগ করে উঠে পড়ে সাহানা।

তাহলে আর কি, চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকো।

এক একবার অবাক লাগে ভেবে, এই সেই মেয়ে সাহানা।

একদিন সে ছিল লজ্জায় জড়সড়। চোখ তুলে তাকাতে ভয় পেত। ফিসফিসে গলায় কথা বলত। আদ্ধেক বোঝা যেত, আদ্ধেক বোঝা যেত না।

মুখের কাছে গলা বাড়িয়ে শুনতে হতো। আর কখন ওর আবল-তাবল চুলের ঝড় এসে ওদের দু’জনকে আচ্ছন্ন করে দিত। ভালো লাগত।

মকবুল মোড়ার ওপর বসে, হাঁটু জোড়া দু’হাতে চেপে ধরে দোল খাওয়ার ভঙ্গিতে চটাতো সাহানাকে, বিয়ে তো করলে একদম অথর্ব লোক দেখে। ভবিষ্যৎ ঝরঝরে।

সঙ্গে সঙ্গে সাহানার প্রতিবাদ, বলেছে!

বলে রাখছি, দেখো।

ইস, যেন ভবিষ্যৎ জানেন।

এ ধরনের টিপ্পনি আর কটাক্ষে বিদ্রƒপ ছিল। কিন্তু তার চেয়ে বেশি ছিল আনন্দ।

সাহানা নিজেই ভাবত : লোকটা মুখে যাই বলুক। হবে হবে, একদিন হবে। মানুষ তো বিনয় করে নিজের কথা কম করেই বলে। যারা ডালভাত খাওয়ার আমন্ত্রণ জানায় তারা তো শুধু ডালভাতই খাওয়ায় না। সঙ্গে থাকে আরো কিছু। অন্তত আরো দু’দশটা আইটেম।

ওই লোকটারও তেমনি বিনয়। নতুন সংসার। নতুন চাকরি। সেজন্য বড় কিছু একটা ভাবতে পারছে না। সময় তো ফুরিয়ে যাচ্ছে না।

সেই শান্ত-দৃষ্টি সহিষ্ণু মেয়েটি শুধু প্রত্যাশার দিনগুলোর অপেক্ষা করল। একসময়ে বয়সের দাগ দেখল আয়নায়। নিজের ও মকবুলের।

চোখের সামনেই বড় হচ্ছে ছেলেমেয়েরা। অথচ কিচ্ছু হচ্ছে না। হাতের কাছে এসেও ফস্কে যায়।

প্রথম প্রথম স্বামীর প্রতি ছিল সমবেদনা। এমনকি অনুকম্পা। কখন যে সেটা আক্রোশে পরিণত হলো নিজেও বুঝতে পারল না।

রাতে একদিন মকবুলের জ্বর দেখে কেঁদে ফেলেছিল সাহানা। কেঁদে ফেলল। ক্ষমাহীন মনের নির্দয় আচরণ অভিভূত করল তাকে। আমার কারণেই কি লোকটার দুর্গতি। একথা ঠিক মনের গভীরে তার জন্যে একদিন যেমন আকুতি করেছি আজকাল করি না। তেমন মায়া-মমতা নেই। সমবেদনা নেই। তবু লোকটার কথা ভাবি। তবে, ভেবে ভেবে মরি না।

এসব কথা মনে হলে বা কল্পনা করলে এক একদিন মকবুলের প্রচ- হাসি পায়।

আসলে সহানুভূতিটুতি কিছু নয়। হঠাৎ তার কিছু হয়ে গেলে সংসারের কী হবে, তা নিয়েই সাহানার দুশ্চিন্তা। ভয় সাহানারও হয়। মৃত্যুকে ভয় করে। মৃত্যুকে পরিহার করে। মুখে যদিও হাজার বার বলে, এ সংসারে মরণের আর কি বাকি।

যতই দিন যায়, সাহানা আর মিথুনের ভয় বাড়ে। লোকটা চলে গেলে কী হবে। সম্ভবত তারা সেই আসন্ন দুর্যোগের ভয়ে সন্ত্রস্ত। মকবুলের জন্যে ততটা নয়। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যতটা।

একায় দু’ঘণ্টা বাসের জন্য দাঁড়িয়ে।

আকরামের সঙ্গে আবার দেখা হয়ে গেল একরকম হঠাৎ করেই।

একঠায় দু’ঘণ্টা বাসের জন্য দাঁড়িয়ে। পা ধরে গেল। মাথা ঝিমঝিম করছে। এ সময়ই শুনল গাড়ির হর্ন। আকরামের গাড়ি। সঙ্গে ড্রাইভার।

কোথায় যাবে, জানতে চায় আকরাম। তারপর নিজেই দরজা খুলে তাকে তুলে নিল। বলল, যেখানেই যাও ড্রাইভার ছেড়ে দিয়ে আসবে। আগে আমার ওখানে চলো।

আপত্তি করল না মকবুল। বাসায় ফিরেও তার এমন কিছু করার ছিল না। বরং আকরামের সাহচর্যে হয়তো ভালোই কাটবে কিছু সময়।

লম্বা রাস্তা। বাড়ি শহর থেকে একটু দূরেই, জায়গাটা খোলামেলা বলে বোধহয়।

মকবুলের মনে পড়ে গেল, কলেজ জীবনে আকরাম বিপ্লবের কথা বলত। সামাজিক, অর্থনৈতিক বিপ্লব।

সুযোগ পেলেই বক্তৃতার ভাষায় বলত, পৃথিবীটা না বদলালে আমাদের মুক্তি নেই। তার জন্য আমার তোমার সবার সহযোগিতা চাই।

হয়তো এসব কথা মনেও নেই এখন! কাজ নেই মনে করিয়ে।

ড্রইংরুমে এয়ার কন্ডিশনার খুলে দিলো। লেবুর শরবত এলো ওদের জন্য। ঘন হয়ে বসল আকরাম।

বলল, তোমার অসুবিধে আমি বুঝি। তবে এসব সমস্যার সমাধান একদিনে হয় না। তোমার আগে থেকে প্ল্যান করা উচিত ছিল।

কিসের প্ল্যান?

জমি কেনা, বাড়ি তৈরি করা। এখন এ বয়েসে আর কী করবে।

আকরাম ফস করে সিগ্রেট ধরিয়ে প্যাকেটখানা বাড়িয়ে দেয় ওর দিকে।

মকবুল নিল না। বলল, আসলে আমি ওসবের জন্য আসিনি।

আকরাম আশ্বস্ত।

ভেবেছিলাম বোধহয় কিছু টাকা চেয়ে বসবে।

চাইলে দিতে? পাল্টা প্রশ্ন মকবুলের।

দিতাম কোত্থেকে।

মকবুল হেসে বলে, জানি না। আর আমিও তো সেভাবে চাইনি। বন্দুক হাতে ধরলে ঠিক ঠিকই দিতে। জটিল কোনো মামলায় সাক্ষী হলে দিতে। আমি কোনোটাই নই। সুতরাং দেবে না।

কীসব আজে-বাজে বকছ।

আজে-বাজে নয়। আসলে আমি কথাগুলো তোমাকে বলে দেখতে চেয়েছিলাম।

তা তো দেখলে। তোমার লাভ?

কিচ্ছু না।

কিছুক্ষণ পর ওর বৌ এলো। বাইরে গাড়ির দরজা খোলার শব্দ। সে-সঙ্গে পর্দা সরিয়ে গমগমে হাসির তুফান তুলে এসে ঢোকে দুটি মেয়ে।

ওরা আগন্তুককে দেখে এক মুহূর্ত থমকে যায়। একজনের ঘড়ির চেন প্রয়োজনের তুলনায় বড় হওয়ায় হাতের কব্জি ঢিলে হয়ে ঝুলছিল। সে ওখানা সোজা করে ঘুরিয়ে নিয়ে জানিয়ে দিয়ে গেল, আমাদের কিন্তু বারোটায় বেরুবার কথা।

মকবুল নিজেও ঘড়ি দেখল। পৌনে বারোটা। বলল, তাহলে তো তোমার সময় নেই।

আকরাম বলে, আজ নেই তো কী হলো। কাল এসো কোনো এক সময়।

আমি এখন উঠি। কাল হবে না। অন্য কোনোদিন দেখব।

কথায় কথায় প্রস্তাব করে বসে আকরাম, তেমন কোনো বিশেষ জায়গায় নয়, পিকনিক খাচ্ছি। চলো না আমাদের সঙ্গে।

না।

কেন। জায়গাটা ভালো ছিল।

মকবুল তার অপছন্দের কথাটা খোলামেলাভাবেই জানিয়ে দিলো, দেখো কতগুলো জিনিস কোনোকালেই ভালো লাগেনি। যেটা ঘরে বসে খাওয়া যায় সেটা গাড়িতে করে নিয়ে ঠান্ডা করে বনে-জঙ্গলে খাবার পক্ষপাতী আমি নই। এই জন্যেই পিকনিক ভালো লাগে না। 

কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য –

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন থাকার তেমনি থাকে। রোজ বদলায় না। ঘনঘন দেখার দরকার হয় না। আমরাই বদলাই।

আকরাম আক্ষেপ করে, তুমি রসকস হারিয়ে ফেলছ।

বাইরে হর্ন বাজছে।

আকরাম দুটি মেয়ের একটিকে দেখিয়ে বলে, মিনি এবার থার্ড ইয়ারে। তোমার আংকল।

মেয়েটি ঘাড় ফিরিয়ে হেসে চমৎকার সম্ভ্রমের ভঙ্গিতে বলে, আংকলকে নিয়ে গেলেও পারতে।

ততক্ষণে ওর বৌ দরজা খুলে ঢুকেছে। আকরাম বলল, আমার বৌ-এর সঙ্গেও বোধহয় আলাপ হয়নি।

ভদ্রমহিলাকে আলাপের জন্য খুব একটা উন্মুখ মনে হলো না। আকরামের কথা শুনে মামুলিভাবেই বলল, ভাই একদিন আসুন না। চা খেয়ে যাবেন। তবে আমরা রোজ থাকি না। টেলিফোন করে এলে ভালো হয়।

মকবুলও বেরিয়ে এলো ওদের সঙ্গে সঙ্গে।

আকরাম বলে, এটা কেমন হলো। তুমি হেঁটে যাবে আর আমরা –

না না, আমার জন্য ভাবনার কিছু নেই। কিছু একটা পেয়ে যাবো।

আকরাম দরজা বন্ধ করতে করতে আরেকবার পীড়াপীড়ি করে – ঠাঁসাঠাঁসি করে কিন্তু চলে যাওয়া যেত। কিন্তু তুমি তো পিকনিকের নাম শুনতে পারো না।

সাহানা অনেক করে বোঝাল।

মাথা খারাপ, ও বয়েসে ট্রেন জার্নি করবে। কোথায় থাকবে, কোথায় খাবে তার ঠিক-ঠিকানা নেই। হঠাৎ করে যাবো বললেই তো যাওয়া হয় না। নিজের শরীরের কথা ভাবা দরকার।

মকবুল তার সিদ্ধান্তে অটল। বলে, থাকব কোথাও।

আর যদি হঠাৎ করে কিছু একটা হয়ে যায় হাতের কাছে পাবে কাউকে?

এক কথায় সাহানার ভয়টাকে বাতিল করে দেয় মকবুল, কাউকে পাব না। তবু আমি শাহরানপুর যাবো বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম।

কার কাছে?

একজনের কাছে।

পুরুষ মানুষ না মেয়ে মানুষ?

মকবুল জবাব দেয় না।

সাহানা বলে, এসব আইডিয়া ছাড়। তোমার জন্য কেউ বসে নেই মকবুল। তুমি ওখানে যাবে, বসবে। আকুল নয়নে কেউ তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবে, এ সবই কল্পনা। জানি, হয়তো কোনো বয়েসে প্রেমে পড়েছিলে। আমার তাতে কিছু এসে যায় না। এ বয়েসে মেয়েরা তোমাকে নিয়ে কী করল তা ভেবে আমার মাথাব্যথা নেই।

মিথুন বলল, তোমার কি মাথা খারাপ। কথা নেই, বার্তা নেই, ট্রেনে করে শাহরানপুরে যাবে। কেন?

এমনি।

তাড়াতাড়ি করে বাঁচিয়ে দেয় সাহানা, বলে, তোর বাবার মানত ছিল।

মকবুল স্থির দৃষ্টি নিয়ে তাকায়। মেয়েটার চোখেমুখে অস্বস্তি। পিতৃত্বের অধিকারী এই মানুষটিকে পেয়ে সে বিব্রত।

যেতে হয় কবীরকে বলি, সঙ্গে থাকবে। সে তো অফিসের কাজে ওদিকে যায়।

আপত্তি করার কিছু নেই। তবু প্রায় অস্ফুট স্বরে মকবুল বলে, না না, কার সঙ্গে নয়। আমাকে একাই যেতে হবে।

সাহানা বলে, একটা লোক থাকলেও ভালোই হতো, আজকাল রাস্তাঘাটে যা এ্যাকসিডেন্ট হচ্ছে।

মিথুন কেমন শক্ত করে তাকায়। বলে, জানি না, কী হয়েছে তোমার। চাকরি বাকরি ছেড়ে মানুষ ঘরে বসে থাকে। বাগান করে। দুটো পুণ্য করে। তোমার মাথায় এসব ঢুকল কী করে।

সাহানা ওকে থামিয়ে দেয়, ওকে বলিস না। যেতে দে, যা খুশি করুক।

তারপর মকবুলের দিকে তাকিয়ে বলে, আমরা তোমার জন্য বসে থাকব না। বাইরের দরজাটা টেনে যেও।

সে দরজা দিয়ে গেল। যদিও জানে কেউ ঘুমোয়নি। জানে, তার জন্যে ওরা ব্যাকুল। তাকে নিয়ে ওদের আলোচনার শেষ নেই। ওরা কষ্ট করে নিজেদের সম্বরণ করছে। ওদরে কারও ঘুম নেই। ওরা জেগে। একটু পরেই উঠে পড়বে। 

ট্রেনে চাপতে গিয়ে বুঝল ওর আগের মতো শরীর নেই। ধস্তাধস্তি ও ঠেলাঠেলি করার ক্ষমতা নেই। শক্তি ফুরিয়ে আসছে। হঠাৎ বুকের বাঁ ধার ব্যথা করে ওঠে। যদি কিছু হয়ে যায়। পকেটে হাত দেয়। ওর নামে ব্যাংকের একটা চিঠি নাম-ঠিকানা সম্বলিত। এর বেশি আর কী আশা করতে পারে।

হৈ হট্টগোলের পর এখন চারদিকের পরিবেশ শান্ত। কত হাঙ্গামাই না হলো বার্থ নিয়ে, আসন নিয়ে। এখন যে যেখানে সেখানেই সন্তুষ্ট, তৃপ্ত। ওদের কোনো অভিযোগ নেই।

মকবুলের মুখোমুখি মোটামতো এক ভদ্রলোক। সঙ্গে নানা বয়সের ছেলেমেয়ে, অনেক বাক্স পেটরা। কিছু বার্থের ওপর রাখা, কিছু সিটের নিচে। পায়ের কাছে বড়মতো ঝুঁড়িতে টিফিন কেরিয়ার, থার্মোফ্লাক্স এবং প্লাস্টিকের বাসন। একসময়ে লোকটি পিঠ ঘুরিয়ে বসল। চারদিকে ঘিরে তার বউ আর ছেলেমেয়ে। বৌ তাকে লুচি দিচ্ছিল। লোকটা খেল সবাইকে আড়াল করে। একটি সংসার। একটি সুখী পরিবারের ছবি।

ওদের আর কী কী আছে। সম্ভবত ব্যাংকে টাকা, শহরে বাড়ি। আবুধাবীতে হিসেবী জামাই। ভদ্রলোক ইন্টারক্লাসে তার সঙ্গী। সন্দেহ নেই নিছকই মিতব্যয়িতার কারণে।

মকবুলের মনে হলো অত সুসংঘবদ্ধ যাত্রা আজকাল হয় না। গিন্নীরা মনে করে থার্মোস বা টিফিন কেরিয়ার সঙ্গে দেয় না। বোধহয় দরকারও হয় না। আর তাছাড়া মনে হলো মকবুলের লুচি তৈরি করা বৌদের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।

ট্রেনের অধিকাংশ যাত্রী ঘুমুচ্ছে। সে একা জেগে। শুধু বাথরুমের একটা বাতি ছাড়া বাকি সব নেবানো। বাইরে জমজমাট অন্ধকার। শীত শীত করছে। একা একা লাগছে। অকারণেই চোখ ছলছল করে। পৃথিবী দুটো শিবিরে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এক শিবিরে যারা তার জন্য পরোয়া করে। অন্য শিবিরে যারা করে না।

টেরও পেল না কখন সকাল হলো। বোধহয় চোখ জোড়া বুজে এসেছিল মাঝখানে। ট্রেন এসে থামল শাহরানপুর।

নতুন জায়গা। থাকার জায়গা নেই। এমন কেউ নেই যে, গিয়ে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে রাতের ক্লান্তি ঘুচোবে।

তারও একটাই কাজ। একজন মানুষের জন্য আকুলতা। তাকে দেখে যাবার বাসনা। স্টেশনের ধারে কাছেই সে শস্তা বোডিংয়ে ঠাঁই নিল। তারপর বেরুল কাপড়-চোপড় ছেড়ে। ঠিকানা জানাই ছিল। মিলিয়ে মিলিয়েই গেল। কেবল একজন মেয়ে মানুষের নাম সম্বল করে কোথাও বাড়ি খোঁজা যায় না। আরো কিছু পরিচয় দরকার।

কিছুদূর গিয়ে বাড়ির নম্বর লেখা নেই, মকবুল সে একটি বাড়ির সামনে দাঁড়াল। মনে হলো ওপরের রেলিং থেকে কোনো এক ভদ্রমহিলা তাকে দেখল। এক মুহূর্ত দাঁড়াল। তারপর চলে গেল। বুক দুরদুর করছে। সে কলিং বেল টিপল। সাড়া পেল না। এসময় কারও থাকার কথা নয়। অফিস আদালতের সময়। লিকলিকে দেহ, একটি ছেলে বেরিয়ে আসে। নাম জানতে চায়। মকবুল নাম জানায়।

ছেলেটি তাকে ভেতরে বসতে বলে। একটানা আধঘণ্টা অপেক্ষার পর কপালে অধৈর্যের ঘাম ফুটে ওঠে। এটা কীরকম ব্যবহার। যার জন্য আড়াইশ মাইল অতিক্রম করল, সে তাকে অমন করে বসিয়ে রাখল। হাতের কাছে বই বা           পত্র-পত্রিকা নেই। জানালার পর্দা টানা। বাইরে কিছু চোখে পড়ে না।

একসময় মনে হলো সে পায়ের শব্দ শুনতে পেল। শব্দ ঘনীভূত হচ্ছে। চোখ তুলে তাকাল মকবুল। হঠাৎ যেন চিনতে পারল না কেউ কাউকে। রেবা – এরকম হয়েছে গিন্নী মার্কা, ভারিক্কি চাল-চলন। তার টলটলে দৃষ্টি কোথায়। চোখের তলায় ওরকম কালি কেন।

অত্যন্ত মামুলি সংলাপ। সামান্যতম বিস্ময়ের ছোঁয়া নেই রেবার মুখে, চোখে, আচরণে।

ও আপনি। নাম শুনে বুঝতে পারিনি। এখন কোথায়। কতদিন এখানে?

এক সঙ্গে এতগুলো কথার জবাব দিতে গিয়ে কেমন খেই হারিয়ে ফেলল। শুধু বলল, এখন তো আর আমি চাকরিতে নেই। রিটায়ার করেছি।

তাহলে – এখানে?

বলা যেত প্রত্যুত্তরে, দেখতে। দেখা করতে। বলা যেত, প্রায় বিস্মৃত একটি প্রতিশ্রুতির কথা। যেখানেই থাকি আবার যেন দেখা হয়। আমি অপেক্ষা করব – ওই কথা মনে করিয়ে দিলে কোনো হেরফের হবে কি রেবার অনুভূতির।

সে কথা ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, আমি এদিকে এসেছিলাম কাজে।

ও।

উনি তো বাসায় নেই। আপনি আজই চলে যাবেন, না থাকবেন?

জবাব দিতে পারল না।

উনির জন্য সে আসেনি। কোনো মতলবে নয়। কোনো কারণে নয়। ঘর ভাঙ্গার জন্যে নয়। ঘর শক্ত করার মানসেও নয়। এসেছিল তার কিছু দুঃখ, কিছু অনুযোগ জানাবে এমন একজন হিতৈষী বন্ধুর সন্ধানে। অর্থাৎ সে-কথা বলা হলো না।

রেবা হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বলে, ছেলেমেয়ে ক’টি?

দুটি।

বাঃ, বেশ তো।

চারদিকে তাকিয়ে নির্বোধের মতো প্রশ্ন করে মকবুল, বাড়িটা বোধহয় তোমাদের নিজেদের?

আর বাড়ি। তিনতলার ফাউন্ডেশন ছিল। দু’তলার বেশি এগুতে পারলাম না।

ভালোই।

আর ভালো। তবে আমরা এখানে থাকব না। এটা ভাড়া দিয়ে বরিশাল চলে যাবো।

সুখী জীবন।

রেবা জানতে চায়, আপনার আর কী খবর?

আমার আর কি –

কবে যেন দেখা হয়েছিল?

অনেক বছর আগে।

হ্যাঁ, তা তো বটেই। সময় দেখতে দেখতে চলে যায়।

রেবা ঘড়ি দেখল।

এখন আবার নীলুর স্কুল থেকে ফেরার সময় হলো। ড্রাইভার আসবে।

মকবুল উঠে দাঁড়ায়। দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যায় রেবা। যাবার মুখে বলে, দেখুন তো আজকাল কি হয়েছে আমার। এক কাপ চা দেবো, তাও মনে ছিল না, কাজের মেয়েটাও ছুটি নিয়ে দেশে।

কোনো দিকে না তাকিয়ে বেরিয়ে এলো সোজা বড় রাস্তায়। হেঁটে হেঁটে         বোর্ডিং-এ যাবে। সময়ের অভাব নেই। বরং প্রচুর সময় হাতে।

হাঁটতে হাঁটতে নিজের মনে মনে বলতে থাকে মকবুল পুরোন প্রতিশ্রুতির কথা একদম ভুলে বসে আছ। নাকি কোনো স্মৃতির সুড়ঙ্গ দিয়ে ওটা ভেসে উঠবে মানসপটে পরে। আগা-গোড়া প্রতিটি ঘটনা। তোমার সেইসব কথা। যা তোমারই বলা। তোমারই কণ্ঠ নিঃসৃত। হয়তো চমকে উঠবে বিছানা থেকে। তখন তিনতলার ফাউন্ডেশনের কথা মনে থাকবে না। তখন তুমি সারা শহরে তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও এই মানুষটিকেও আর পাবে না রেবা। কোনো ইতর বিশেষ হবে না হয়তো। তবু তুমি যে ভাবতে বসবে, ভাবনায় পড়বে, এটুকুই লাভ।

এবার ফেরার পালা। আর কোনো কাজ নেই। কোনো প্রতিশ্রুতি রক্ষার তাগিদ নেই। এবার হোটেলে কাজ নেই। সে প্যাসেঞ্জারস ওয়েটিং রুমে থাকবে। একটা মেল ট্রেন অল্পের জন্য মিস করবে। তারপর দু’দিন অপেক্ষা। অন্তত তিনটি দিন বাইরে কাটাতে না পারলে ভদ্রগোছীয় একটা অজুহাত সে দিতে পারছে না।

সেজন্যই একটু বাড়তি থেকে যাওয়া।

ফিরতি ট্রেন পেতে বেগ পেতে হলো না। অল্পতেই ঘুম পেল। সে একটা মামুলি স্টেশনে নেবে কুলিকে পয়সা দিয়ে জিরোবার ব্যবস্থা করল। বেঞ্চিতে জায়গা ছিল না। একজনের পাতা হোল্ডলের বাড়তি অংশের ওপর সামান্য জায়গা করে নিয়ে ঘুমাল।

এই ঘুম তার ভালো লাগল। অনেক দিন পর দায়দায়িত্বহীন ঘুম। টেনে টেনে সে সন্ধেবেলা পর্যন্ত ঘুমোল। এবার ফিরতে হবে তাকে।

এই ফিরে আসা জিনিসটা যদি না থাকত। মানুষ যদি কেবল বিরতিহীন ভাবে যেতেই থাকত এক গন্তব্য থেকে আরেক গন্তব্যে চিনে নেবার, জেনে নেবার অবকাশ না দিয়ে। বুকভরা হা-হুতাশ যদি পারত ট্রেন ধাওয়া করা রাতের উন্মাদ হাওয়ার কাছে ক্রমশ বিকিয়ে দিতে।

বাসায় যখন ফিরে এলো তখন সকালবেলা। তিনদিনের জার্নি, অনিদ্রা ও অনিয়মে সে ক্লান্ত। কেউ তাকে অযথা প্রশ্ন করে বিরক্ত করল না। সে তার ঘরে দরজা বন্ধ করে শুয়ে থাকল।

সব কিছু বদলাচ্ছে। ওর হিসেব আগা-গোড়া ভুল। সে কাকে ধরে রাখতে চায়? তারা কেউ ধরাছোঁয়ার ত্রিসীমানায় নেই। তার কিছু আশা-আকাক্সক্ষা ছিল। সবারই থাকে। সেগুলো পূরণ হয় না। তার হয়নি। এবং তা নিয়ে দুঃখ করা নিরর্থক।

কে যেন কথা বলে উঠল। কেউ না। সে নিজেই নিজের গলার প্রতিধ্বনি শুনে আঁৎকে উঠল, আমার বয়স বাড়ছে আমার স্বভাব পাল্টানো দরকার। আমি অসুস্থ। আমার সব গুলিয়ে যায়। কারও সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে পারি না।

মকবুল বুঝতে পেরেছে তার হৃদয়ের গভীর একটি পৃথক সত্তার বাস। যে সাধারণত মৌন থাকে। অসহিষ্ণু হলে কথা বলে। যেমন আজ বলল।

আসলে বেঁচে থাকার জন্য তার পুরো স্ট্যাটেজি বদলাতে হবে। সে কোনো কাজ জোগাড় করতে পারছে না। কোনো কাজে আসতে পারছে না। তার অপারগতার গ্লানি নিয়েই তাকে একটু একটু করে জমি ছেড়ে দিতে হবে। থাকবে শুধু ওইটুকু, যেটুকু তার দেহরক্ষার কারণে দরকার।

মিথুনের মেয়ে হেসেছে। স্বামী আবুধাবীতে। সুতরাং যে ক’টা দিন বাপের বাড়িতে কাটাতে হচ্ছে তার জন্য একটা ভদ্রগোছীয় কামরা দরকার।

আর এই দরকারটাই সাদামাটা কথায় বুঝিয়ে দিয়েছে সাহানা অত বড় ঘরটা তোমার কী দরকার। এক কামরায় বাচ্চাকে নিয়ে মিথুনের বড় অসুবিধে।

মকবুলের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা আগেই করা ছিল। ওপর তলার ছাদে ওঠার জন্য যে সিঁড়ি, তার তলায় খানিকটা জায়গা। পুরোন বাক্স পেটারা রাখা। সেগুলো সরিয়ে এখন সেখানে ছোটমতো একটা খাট।

মিথুন কোলের বাচ্চাটির কান্না থামাতে গিয়ে বার দুয়েক নিজেই সিঁড়ির নিচের জায়গা প্রদক্ষিণ করেছে। মুন্শিয়ানা ভঙ্গিতে বলেছে, জোরাজুরির কোনো কথা নেই। তোমাদের অসুবিধে হলে যেখানে খুশি পড়ে থাকব।

তারা কেউ তার আত্মত্যাগের কথা বলছে না। বলছে না এজন্যে যে, আত্মত্যাগ কথাটার সঙ্গে সম্ভবত তার স্থান পরিবর্তনের যুৎসই কোনো তুলনা হয় না।

এরকম তো হরহামেশাই হচ্ছে। বেশি কাজের লোকেরা কম কাজের লোকদের কোণঠাসা করছে।  আসলে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাখ্যাত হবার এটা একটা স্তর মাত্র। সিঁড়ির ওপর খাটে শুয়ে শুয়ে সে আজকাল নতুন সব কাজের মানুষদের পদধ্বনি শুনতে পায়। তারা বাড়িসুদ্ধ লোককে মাতিয়ে রাখে। হাসি আর উল্লাসে ফেটে পড়ে সারা বাড়ি। অনুমান করে আগন্তুকরা মাঝে মাঝে বিদেশ পাড়ি দেয়। সাত-সতেরো জিনিস আনে। শাড়ি, ঘড়ি, চকোলেট। এ বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক নির্ণয়ের কারণে কখনও কখনও তার নাম উচ্চারিত হতে শোনে। যদিও কেউ পরিচিত হবার বাসনায় ব্যাকুল হয় না।

সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এর কাছে যতদিন পড়ে থাকবে, নিত্যনতুন মানুষের আনাগোনা দেখবে। হয়তো কেউ গভীর পরিতাপের সঙ্গে তার নামোচ্চারণ করবে। সামাজিক তাড়নায় সুস্বাস্থ্য কামনা করবে। অথচ যাতায়াতের পথে হঠাৎ যদি চোখ পড়ে যায়, কেউ কেউ অস্বস্তি বোধ করবে। সে যেন বাড়ির লোকজনদের উল্লাসের জগতে অবাঞ্ছিত কোনো প্রহরী।

অথচ তারাও জানে নিত্যনতুন আগন্তুকদের নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। সে তাদের সুখ-দুঃখের জগতের তদারকি করছে না। তার নিজের জগতেই আজ ভীষণ তোলপাড়। বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ পেরিয়ে সে এসেছে এক নিভৃত জলাশয়ের কাছে। সেখানে বড় বড় নিমগাছ, শিমুলগাছ তাকে আড়াল করে। নিজের অজান্তেই সে স্মৃতির পাথরকুচি ছাড়তে থাকে এক এক করে। প্রতিবারই এক একটা বুদ্বুদ। প্রতিবারই সে বুদ্বুদের সঙ্গে সঙ্গে এক একটা চেনা মুখ। মকবুল তাদের ঠিক ঠিকই চিনতে পারছে। তারা তাকে চিনতে পারছে না। অথচ সে বলেই যাচ্ছে।

রেবা তুমি আমাকে চেনো না? 

তুমি বলতে, জীবনে যাই ঘটুক, যেখানেই থাকি তোমার সঙ্গে যেন দেখা হয়। দেখা করার মানসেই তো গিয়েছিলাম।

মিথুন আমি এখানে। এই খাটে, এই সিঁড়ির তলায়।

তুমি বলতে, বড় হলে আমার কোনো দুঃখ থাকবে না। ঘাড়ের কাছে যে জায়গাটা ব্যথায় টন্টন্ করে ওঠে, সেখানে সেঁক দিতে গিয়ে বারবার মনে করিয়ে দিতে  সে-কথা।

সাহানা আমার দিকে তাকাও।

তুমি ঠিকই বলতে, কী আর দেখব। রোজই দেখছি। নতুন করেও শিং তো আর গজায়নি।

সেই আলো অন্ধকারে আরো দেখতে পাচ্ছে ডাক্তার রাব্বানী, এখলাস, নওশের আলী, সুলেমান মুনশীর আবছা আবছা চেহারা। মকবুল হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করল পুকুরঘাটে পরিত্যক্ত একটি সিংহাসনে। সামনে লাল সালুতে মোড়া টেবিল। চারদিকে মানুষের ভিড়। সমস্ত পুকুর ছেয়ে গেল মানুষের কলগুঞ্জনে। তারা সবাই দাঁড়িয়ে। অথচ কেউ ভাবছে না। নৌকার মতো কখনও ডানে, কখনও বামে হেলছে মাত্র। জায়গাটা এখন অন্ধকার। অথচ চেনা মানুষের চোখের বাতিতে উজ্জ্বল।

মকবুল ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি একটা বক্তৃতা দেবো।

ওরা ইতস্তত করল, আবার বক্তৃতা। বক্তৃতা তো সারাজীবন শুনছি।

ওদের থামিয়ে দেয় মকবুল, তা শুনেছেন হয়তো। সম্ভবত এটা আমার শেষ বক্তৃতা! আমি বেশি সময় নেব না।  কেউ আর দ্বিরুক্তি করে না।

মকবুল শুরু করে :

ভদ্র মহিলা ও ভদ্র মহোদয়গণ। আপনারা এখানে সমবেত সেজন্যে খুশি হইনি। দুঃখিতও হইনি। আমি আপনাদের সবাইকে চিনি। আপনারা চিনলে ভালো। না চিনলে বিব্রত হওয়ার কিছু নেই। আমি আপনাদের চেনাচিনির ধার ধারি না।

ডাক্তার, আপনার হিসেবটা ভুল কিনা জানি না। তবে আপনার কথামতো যদি আমি সময়মতো বিদেয় নিই, আপনার হাত যশ হবে। রোগ খুঁজে পেয়ে মারা যাবার সময় বলে দিতে পেরেছেন বলে। আবার যদি আপনার কথামতো নির্দিষ্ট সময়ে না মরি, আপনার আতঙ্কিত হবার কারণ যথেষ্ট। তবে আপনার মন খারাপ করার কিছু নেই। সময়ের সামান্য হেরফের হলেও যা অনিবার্যতা হবেই। আসলে আমার কোনোরকম অনুভূতি নেই। মরে যাওয়া জিনিসটা যে কি, সেটাই বুঝি না। হয়তো নেবে যাওয়া অনেক নিচে, গাঢ় অন্ধকারে। আমি তো নেবেই গেছি সকলের দৃষ্টিতে এবং বিবেচনায় আমার অসুখ বাড়ছে। কখন কি হয় জানি না। তার আগে একটা ছোট্ট কনফেশান। জীবনে আমাকে সবচেয়ে কে ভালোবেসেছে? স্ত্রী, পুত্র, আমার প্রণয়িনী? কেউ না। ভালোবেসেছে শুধু ওই একজন। বেকারির ওই লোকটা। যে হয়তো এখনও রাস্তার ধারে শেষ বিকেলের এক কাপ চা নিয়ে আমার প্রতীক্ষায় বসে। পারলে আপনারা তাকে ওই কথা জানিয়ে দেবেন, জীবনের চূড়ান্ত লটারিতে সেই জিতল।

আপনারা ঘন হয়ে বসুন। পারলে ফটোগ্রাফারকে ডাকুন। ছবির ক্যাপশন হতে পারে এরকম : আদর্শ মকবুল পরিবার অথবা শোকাবিভূত স্ত্রী, আত্মীয় ও             বন্ধু-বান্ধব পরিবৃত মকবুল।

আমি মারা গেলে আমার শেষ অবস্থানটি স্মৃতির ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার জন্য সন্দেহ নেই আমার স্ত্রী একটি মার্বেল পাথরের খোঁজ করবে। এদেশে পাথর হয় না, ইম্পোর্টেড পাথরের দাম চড়া। আপনারা আমার বিধবা স্ত্রীকে স্বামীভক্তি দেখাবার এই শেষ সুযোগটি দেবার ব্যাপারে যথাসাধ্য সাহায্য করবেন আশা করছি। আপনাদের সামগ্রিক প্রচেষ্টার বিনিময়ে ওর মনোবাঞ্ছনা পূর্ণ হতে পারে।

না, আমি কাঁদছি না। আমার চোখ ছল্ ছল্ করছে। দু’এক ফোঁটা পানি প্রায়ই পড়ে। ওটার একটা বিশেষ নাম ও উপসর্গ ডাক্তারের মনে আছে নিশ্চয়ই। আমার ঠিক মনে পড়ছে না। যেমন, সত্যি কথা বলতে গেলে আমাকেও আপনাদের ঠিক মনে পড়ছেন না হয়তো। ধৈর্য ধরে আমার বক্তব্য শোনার জন্য ধন্যবাদ। গুডবাই অ্যান্ড গুডলাক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *