এক
হুশ্ হুশ্ করে স্টেশনের বড় ছাউনির ভিতর ঢুকে পড়ে মেল ট্রেন। রাতজাগা ক্লান্ত-চোখে হেডলাইট জ্বলছে। ধুলোয় আর নভেম্বর-সকালের সলজ্জ কুয়াশার সেটা হারিকেনের ধীমে শলতের মতো। আকাশে রং-এর আভা। লাল গোলাপির মাখামাখি। কখন হুড়োহুড়ি সরে এক ঝাঁক পায়রা উড়ে যায় স্টেশনের ছাউনি থেকে। ট্রেনের আতঙ্কে, না আলোর নেশায় বোঝা যায় না।
শেষবারের মতো সিটি বাজিয়ে গতিশীল কলকব্জার পায়ে বেড়ি পরিয়ে এসে থামে গাড়ি। এক মুহূর্ত আগে যেখানে শুধু স্তিমিত কলগুঞ্জন সেখানে যেন এক ভয়ংকর দানবের তাড়া। প্রাণচঞ্চল সবাই। ট্রেনের জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে নিতেই যাত্রীরা ঠান্ডা হাওয়ার ছোঁওয়া পেল। বরফগলা হাওয়া আদর বুলিয়ে দিলো ওদের চোখেমুখে। সজল করে তুলল। সময় ও দূরত্বের সঙ্গে একটানা পাল্লা দিয়ে যেমন নিস্তেজ হয় নাবিক, যেমন তীরভূমি দেখে আনন্দ করার ইচ্ছেটা থাকে না, এও তেমনি। বাইশ ঘণ্টা আগে যারা মেল ট্রেন ধরেছিল ‘কখন আসবে, কখন আসবে’-এর সেই শ্বাসরুদ্ধ প্রতীক্ষা অনেক আগেই তাদের শেষ হয়েছে। পুরো একটা রাত আর প্রায় আস্ত একটা দিন। যে সময় পৌঁছুবার, তারচেয়ে সাড়ে চার ঘণ্টা দেরি। রানামুসা না কোথায় একটা গুডস ট্রেন ‘ডিরেল’ হয়েছিল।
অর্থহীন ব্যস্ততা, তাড়াহুড়ো আর হৈ-হুল্লা যেন নিমেষেই শেষ হয়। যাত্রীদের অধিকাংশই নেবে পড়েছে। মালের ওজন ও কুলির মজুরি নিয়ে যাদের বচসা, এমন দু’চারজন তখনও হ্যান্ডেল ধরে ঝুকে দাঁড়িয়ে। ভালো গ্রাহক না পেয়ে কেউ যদি শেষটায় রাজি হয় শুধু এ আশায়। না হয় মনে মনে দুটো গাল দিয়েই সিকিটা ঢ্যাঁকে গুঁজুক। পয়সা বাঁচাতে গেলে মানসম্ভ্রম চলে না।
আমীরের তাড়াহুড়ো ছিল না। সঙ্গে জিনিসপত্র তেমন নেই। শুধু একটা এ্যাটাচি। সেখানা নিয়ে নেবে পড়ে। জনসমুদ্র এখন জনব্দ্বুুদ্ মাত্র। কিছুক্ষণ পর, সাইডিং-এর মালগাড়িগুলো বাদ দিলে গেটে দাঁড়ানো দু’চারটে চেকার ছাড়া কাউকেই আর চোখে পড়বে না।
প্ল্যাটফর্মের এ মাথা থেকে ও মাথা চোখ বুলিয়ে নিল। তার সন্দেহটাই ঠিক। শওকৎ তাহলে স্টেশনে আসেনি। অথচ চিঠি তো ঠিক সময়েই পাঠিয়েছিল। ‘তার’ও দিয়েছিল একটা। ক্যান্ট স্টেশনে যায়নি তো ভুল করে? তাই বা কেমন করে হবে। স্পষ্ট মনে পড়ে, লিখে দিয়েছিল : এ্যাটেন্ড সিটি স্টেশন।
মুহূর্তে সারা সকালটা বিস্বাদ মনে হয়। কোথায় আশা করেছিল গলা বাড়িয়েই দেখবে একটি উসখুস মুখ তার জন্যে ব্যগ্র প্রতীক্ষায় আকুল। ভিড়ে তাকে হঠাৎ আবিষ্কার করার আনন্দে মুখের সিগ্রেটটা ফেলে দিয়ে ছুটে আসবে। মনোরম হাসি ফুটিয়ে প্রথমেই বলবে, এত লেট যে।
জবাব দেবারও সুযোগ হবে না। বলবে, থাক থাক। ওখানা আর তোমাকে বয়ে বেড়াতে হবে না। এ্যাটাচিখানা আমাকেই দাও।
তারপর কোনো অপেক্ষমাণ ট্যাক্সি। ক্ষিপ্রগতি তুলে কিছু সোজা পথ গিয়ে কয়েকটা বাঁক ঘুরে দু’একবার ব্রেক কষে শেষপর্যন্ত কোথাও গিয়ে থামবে। শওকৎ বলবে, দাঁড়াও, সামনের দরজা বোধহয় বন্ধ! ভেতর থেকে খুলে দিচ্ছি।
বিয়ে করেছে নাকি শওকৎ?
করে থাকলে একটা পাতা বিছানায় রাতের ক্লান্তিকে ঠাঁই দেবারও অসুবিধে নেই। কিন্তু সে সুযোগ কি হবে? তার আগেই সলজ্জ কণ্ঠস্বর হয়তো বলে বসবে, আগে মুখ ধুয়ে নিন। বলছি বলে ভাববেন না কোনো রাজকীয় আয়োজন। চাট্টে ডাল-ভাত। রুচবে তো?
টিকেট।
ধোপদুরস্ত চেকারটা যেন তাকে নাজেহাল করার জন্যেই সরু গেট বরাবর তটস্থ হয়ে দাঁড়ায়। যেন টিকেটহীনতার অপরাধে জব্দ করতে পারলেই সে সুখী। আমীর তাকে নিরাশ করে। পকেট থেকে টিকেট বার করে দেখায়। ওখানা কয়েকবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে পথ ছেড়ে দেয় চেকার। বেরিয়ে এসে হাতের এ্যাটাচিখানা নাবিয়ে রাখে আমীর। একটা দেশলাইয়ের কাঠিতে হলো না। তিন-তিনটা কাঠিতে ঠোকাঠুকি করে তবে ধরাল সিগ্রেট। একটা লঘু ক্রোধের দাহ ভেতরটা পুড়িয়ে দিতে থাকে। অযথা বন্ধুপ্রীতি না দেখিয়ে সোজা শাহপুরের ট্রেন ধরলেই ভালো ছিল। হয়রানির হাত থেকে বাঁচা যেত।
নতুন জায়গায়, কাউকে চেনে না – ঠিক এ অজুহাত অবশ্যি চলে না। সব জায়গাই অজানা, সব মানুষই অচেনা। সেই অজানার আর অচেনার কুয়াশা জাল সরিয়ে যারা চেনা মহলের খবর শোনায়, সে তো তাদেরই একজন।
গেল বছর যে খবরটা নিয়ে এত হৈচৈ, এত আদালত-কাছারি, শহরময় গম্গমে ভাব, সেটা তো সে-ই রিপোর্ট করেছিল ‘দৈনিক স্বদেশ’-এর জন্যে। শুধু এটুকু আঁচ পেয়েছিল কোথায় কোন্ ডোভার্স লেনে জোড়া খুন। কোথায় ডোভার্স লেন, কত নম্বর বাড়ি, কিছুই জানা ছিল না। পুলিশেও ডায়েরি হয়নি। তবু অন্য সাংবাদিকদের কানে পৌঁছবার আগেই ‘স্কুপটা’ দিয়েছিল। কেমন করে পেরেছিল সেদিন। সে কি ডোভার্স লেন চিনত, না চিনত ওই বাড়ি, না যারা খুন হয়েছিল তাদের।
এমনি নিরন্তর ঘটনা-দুর্ঘটনার ইতিবৃত্ত সংগ্রহ নতুন নয়। নতুন নয়, অনিশ্চিত পরিস্থিতি আর অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা। সেখানে তাকে ভরসা দেবার জন্যে কি চিরকাল হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে শওকৎ।
বরং, শওকৎ-এর সঙ্গে তার আলাপটাই এক দুর্ঘটনা! বা, বলা যেতে পারে এক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে। দানাপুরের কাছে যেবার মেল ট্রেন এ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল।
নিছকই কিছু ঘটনার যোগসাজশ না হলে সকলের চোখে ধুলো দিয়ে ওই খবর জোগাড় সম্ভব হতো না।
সেদিন ছিল বোধহয় হয় শুক্রবার। আসলে খবর সংগ্রহের উৎসাহ ছিল না। সে গিয়েছিল একটা টেলিগ্রাম করতে। ছুটি নিয়ে ক’দিন বাড়ি যাবে সে খবর জানাতে। গিয়েছিল ডিউটি সেরে আর.এম.এস-এ। আর কোনো ডাকঘর তখন খোলা নেই বলে। একটু শীতও পড়েছিল বোধহয়। ইচ্ছে করছিল না হাঁটতে। এত রাতে যা-ও একখানা রিকশা পাওয়া গেল, দেখল এক দম্পতি শীতে ঠক্ঠক্ করে কাঁপছে। তাদের কোথাও যাবার তাড়না। কোথায় গিয়েছিল, এত রাতে কোথায় যাচ্ছে, সে কৌতূহল সাংবাদিকের কাছে অবান্তর নয়। হয়তো এটাও কোনো ‘স্কুপ’ রাতের প্রেমাস্পদরা, সকালবেলা খুনি আসামি – এমন তো নতুন নয়।
রিকশা তাদের জন্যই ছেড়ে দিতে হয়। বোধহয় মেয়েটি তার স্বরে ধন্যবাদ জাতীয় কিছু একটা দিয়ে থাকবে।
আর.এম.এস অফিসে শ্রুত একটি বেঁফাস কথাই তার পরম সৌভাগ্যের চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়াল। একজন রেল কর্মচারী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে বলেছিল, টেলিগ্রামগুলো এখুনি পাঠিয়ে দিন। এক্সপ্রেস।
বোধহয় টেলিগ্রাম অফিসের লোকটিরও কৌতূহল হয়ে থাকবে। জিজ্ঞেস করে, কিছু জানতে পারলেন, ক’টা বগি গেল?
সে কথায় জবাব দেবার সময় নেই রেল কর্মচারীর। সময় নেই আমীরেরও।
সে ছুটে যায় টিকেট কাউন্টারে।
বলে, দিন দানাপুরের একটা ইন্টার।
সুতীক্ষè দৃষ্টি কাউন্টার ক্লার্কের, এত রাতে দানাপুরের ট্রেন কোথায়। মেল তো ছেড়েছে সেই বিকেলে।
বেশ লোক্যালেই যাবো।
লোক্যাল যাবে না।
কেন?
এবার বোধহয় বেচারীর মেজাজ ঠিক থাকে না।
বলে, আপনি তো পুলিশের মতো জেরা শুরু করলেন। যাবে না বলছি, যাবে না। যা করার করুন।
তখন বয়েস কম। রক্ত গরম। কাউন্টারে থেকে হাতের মুঠো করা নোটখানা বার করে বলে, বেশ তাই করছি।
ততক্ষণে রীতিমতো একটা হাঙ্গামা বেধে যায়।
খানিকক্ষণ আগে জরুরি তলব পেয়ে ছুটে এসেছে স্টেশন-মাস্টার। তখনও ঘুমের রেশ কাটেনি।
কোনো অনুমতির অপেক্ষা না করে ¯িপ্রংওয়ালা কব্জির দরজা দিয়ে বুলেটের মতো ঢুকে পড়ে আমীর।
দানাপুরে ট্রেন যাবে না কেন?
স্টেশন-মাস্টার রক্তচক্ষু।
কে আপনি? চট্ করে আমার কামরায় ঢুকে পড়ার মানেই বা কি? টরে-টক্কার চাবিতে তখনও স্টেশন-মাস্টারের আঙুল রাখা। রাগে গর্জাতে গিয়ে ওটা আরো ক্ষিপ্রগতি হয়ে ওঠে।
প্রত্যুত্তরে দূরাগত টরে-টক্কার ধ্বনিটাও যে আন্দাজে তীক্ষèতর হয়।
আমীর পকেট থেকে একটা কার্ড বার করে তার সামনে রাখে।
সে যে সংবাদপত্রের প্রতিনিধি তার প্রমাণবাহী। মুহূর্তে কি যে হয়ে গেল স্টেশন-মাস্টারের। বেল টিপে ডাকল, হুরমত বেগ।
হুরমত বেগ আশা করেই এসেছিল। কটমট চোখে দেখছিল আমীরকে। অবাঞ্ছিত প্রবেশকারীর ওপর গায়ের ঝাল ঝাড়ার সুযোগ, যা কিনা আজকাল পাওয়া যায় না, তাই বোধহয় পাওয়া গেল এদ্দিন পর।
শুধু হুরমত বেগই নয়, আমীরও কম অবাক হয় না।
ইউরোপিয়ান স্টাইল রিফ্রেসমেন্ট রুম থেকে এক কাপ স্পেশ্যাল চা আনার অর্ডার গেল।
মৃদু হাসিতে স্টেশন-মাস্টারের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, বসুন, বসুন। তাই বলুন, আপনি নিউজপেপারের লোক। আগে বলতে হয়।
কী যেন বলতে গিয়েও থেমে যায় স্টেশন-মাস্টার। তারপর গলাটা নাবিয়ে বলে, দানাপুরে কাল সকালে গেলে হয় না। আজ আর নাইবা গেলেন। সন্দেহের ছায়া ফেলে বলে আমীর, অসুবিধে কি? লোক্যালেই যাবো।
লোক্যাল তো যাচ্ছে না।
ততক্ষণ চা এসে যায়। আমীরের দিকে কাপ বাড়িয়ে চা ঢালতে যাবে এমন সময় বেজে ওঠে টেলিফোন।
ব্যস্ত হয়ে ওঠে স্টেশন-মাস্টার, কিছু মনে করবেন না। ঢেলে খান।
হ্যালো – হু ইজ স্পিকিং, ডি.টি.এস? ইয়েস স্যার। রিলিফ ট্রেন, ফোর বগিস? অলরাইট, সিক্স। হাফ এন আওয়ার। সিওর, সিওর। থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।
টেলিফোন ছেড়ে দিয়ে স্টেশন-মাস্টার বড় ঘড়িটার দিকে তাকায়। বলে, আমার কিন্তু একদম সময় নেই। আপনি বসুন তাহলে। আমীর উঠে দাঁড়ায়, না বসব না। আমিও রিলিফ ট্রেনে যেতে চাই।
আপনি টেলিফোনে কথা শুনছিলেন বোধহয়।
হেসে ওঠে আমীর, কী করব বলুন। পেশাটাই এমন।
কাচমাচু হয়ে যায় স্টেশন-মাস্টার। মুখে কোনো কথা সরে না। জোড়া দরজা দিয়ে বেরুতে বেরুতে বলে, জেনেই ফেলেছেন যখন চলুন। কিন্তু দোহাই ডি.টি.এস.কে বলবেন না। আমার চাকরি যাবে! আপনারা নিউজম্যান। আপনাদের কথা রাখাও দায়। না রাখলেও চলে না। আমরা হচ্ছি যাকে বলে পেটি অফিসার।
বলেই টুপিখানা মাথায় চাপিয়ে ওকে সঙ্গে করে বেরিয়ে পড়ে স্টেশন-মাস্টার।
ব্রিজের মুখেই দুর্ঘটনা ঘটে থাকবে। গোটাকয়েক বগি নদীগর্ভে বিলীন। শুধু যেন গায়ের জোরে কিছু বগি টেনে ধরে কাৎ হয়ে পড়ে একদিকে ইঞ্জিনটা। চারদিকে আর্তনাদ, চীৎকার, হৈচৈ। ভয়ার্ত শব্দ করে নদীতে দু’একটা রেস্কু বোট ছুটোছুটি করে। নিরাপদ দূরত্বে অন্য একটা লাইনের ওপর সাইডিং করা রিলিফ ট্রেন। তার হেডলাইট জ্বলছে।
সেই হেডলাইটের আলোয় যা দেখল, তা দেখবে আশা করেনি। তারচেয়ে একটা ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখলেও অতখানি মর্মাহত হতো না। উস্কোখুস্কো চুল। ঠোঁটে একটা সিগ্রেট চেপে ধরে চোখ কুঁচকে কাগজে খস্ খস্ করে কী যেন নোট নিচ্ছে শওকৎ। ‘ডেলি নিউজ’ পত্রিকার প্রতিনিধি। সিগ্রেট জ্বলে জ্বলে ছোট হয়ে এসেছিল। তার ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করছিল। ওখানা ফেলতে গিয়েই চোখাচোখি হয় আমীরের সঙ্গে। কথা বলারও ফুরসৎ নেই। কেবল হাত নেড়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। চেয়ে দেখল আমীর। চূর্ণবিচূর্ণ লোহার পি- মাড়িয়ে, ভাঙা কাচের টুকরো সরিয়ে খরগোশের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটছে শওকৎ। কারও সঙ্গে ইন্টারভিউ। কত বগি চূর্ণবিচূর্ণ হলো তার বিবরণ। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আন্দাজ, সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ। দমে যায় আমীর। একটা একান্ত নিজস্ব প্রতিনিধির খবর পাঠানোর সুযোগ এমন মাঠে মারা যাবে, কল্পনাও করেনি। তার উৎসাহটাই সাংঘাতিকরকম মার খেয়েছে। তবু একমাত্র ভরসা যদি তার টেলিগ্রাম আগে গিয়ে পৌঁছয়, দৈনিক স্বদেশ যদি একটা বিশেষ সংখ্যা বার করে।
ধারেকাছে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না শওকৎকে। বোধহয় ভিড়ে অদৃশ্য হয়েছে কোথাও।
কিন্তু দেখা হলো টেলিগ্রাফ অফিসেই।
শওকৎ নিজের খবরটায় আরেকবার চোখ বুলিয়ে বলে, ভাগ্য ভালো, খবর পাঠাতে পারছি। তা না হলে আমার খবরই তোমাকে পাঠাতে হতো।
কেন?
আমি তো এই মেল ট্রেনেই ছিলাম। সামনের বগি বলে কোনোমতে বেঁচে গেছি।
মনে আছে সেদিন এক জঘন্য কাজ করেছিল আমীর। ভাবলেও কেমন বিশ্রী লাগে। টেলিগ্রাম ফাইল করতে গিয়ে শওকৎ দেখে দু’টাকা কম। পকেটে কিছু খুচরো ছিল। বাকি টাকা মানিব্যাগে। ভিড়ে সেটা কোথাও খোয়া গিয়ে থাকবে।
হাত পাততে হয় আমীরের কাছেই শেষ পর্যন্ত, হবে টাকা দুয়েক। বেয়ারিং। অথরিটিও সঙ্গে নেই।
ছিল। দু’টাকার অনেক বেশি। যেন আমীর নিজে নয়। কোনো নিচ হীনমন্য একটা বিষধর, যা এতক্ষণ ফণা তুলে গর্জাচ্ছিল, সেই তার হয়ে জবাব দিয়ে বলেছিল, ইস্ আগে বলোনি কেন? তাহলে আমারটা না পাঠালেই হতো।
শওকৎ-এর বিবরণী কাগজে বেরুল না।
অথচ ‘স্বদেশ’ সেদিন নিজস্ব প্রতিনিধির খবর ফলাও করে ছেপে একটা বিশেষ সংখ্যা বার করেছিল।
সেই শওকৎই আবার তাকে একরকম জোর করে চা খাইয়েছিল। বলেছিল, চলো টেলিগ্রাম যখন পাঠান গেল না, কিছু খুচরো পয়সার সদ্গতি করা যাক।
তার মানা সত্ত্বেও তিন চামচ চিনি ঢেলেছিল শওকৎ। অথচ তবু সেদিন চা-টা বিস্বাদ মনে হয়েছিল।
কিন্তু সে অনেক দিনের কথা।
ঘণ্টাখানেক শাহপুরের কোনো ট্রেন পেলে তাতেই চেপে বসবে ঠিক করল। খামোকা হোটেলে গিয়ে হয়রানির চেয়ে ঢের ভালো।
চেকারকে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিলো বুকিং অফিস। ‘বুকিং অফিস’ কথাটা নিশ্চয়ই খুব ছোট করে লেখা ছিল। তাই চোখে পড়েনি। অথচ বেশ বড় করে পুরু অক্ষরে লেখা ছিল পেতলের প্লেটে : কার্টেসি ইজ আওয়ার ওয়াচওয়ার্ড। ভদ্রতা আমাদের মর্মকথা।
কথায় আর কাজে কিছুটা ফাঁক থাকবেই। পৃথিবীর চিরন্তন নিয়ম। কিন্তু সেটা যে সারা ব্রিজের এ মাথা থেকে ও মাথা, টের পেল ভেতরে ঢুকেই।
একজন লম্বামতো খাতায় কী যেন লিখছে। লিখছে না, যেন এক একটা অক্ষর আবিষ্কার করে তার ওপর শিল্পপ্রতিভা ফোটাচ্ছে। কাজটা মেলগাড়ি-সংক্রান্ত হলেও সময় এখানে গরুগাড়ির চাইতে ক্ষিপ্রগতি হয়নি, কাউন্টার ক্লার্ককে দেখে বোঝা যায়।
খাতা থেকে মুখ না তুলেই জিজ্ঞেস করে, কি চাই।
আমীর আর্জি জানায়, শাহপুরের একটা ইন্টার।
কবে, কোন গাড়ি, কোন ট্রেন তা বলতে হবে না। না আমরা নাড়ি টিপতে জানি?
নাড়ি টেপার প্রসঙ্গ ধামাচাপা দেবার জন্যেই যেন টেলিফোন বেজে ওঠে।
ইয়েস, রিজার্ভেশান। নো বুকিং অন ফোন? নো সিট।
ধুপ্ করে বন্ধ হলো টেলিফোন। যেন কোনো নিরীহ যাত্রীর আকুতির ওপর একটা জগদ্দল পাথর এসে নাবে।
এবার আমার চোখ তুলে তাকায় লোকটি। আমীর জানায় পরবর্তী যে-কোনো ট্রেনে সিট পেলেই তার চলে।
ফোর্টিন ডাউন, চাকওয়াল হয়ে। টোয়ান্টি এইট ডাউন শরনপুর।
সরি। শরনপুর হয়ে কোনো টিকেট নেই।
তাহলে চাকওয়াল হয়েই যাবো।
যেন পরম দয়াবশতই একটা দিয়ে বলে কাউন্টার ক্লার্ক, দিন চোদ্দ টাকা সতেরো পয়সা।
দশ টাকার দুটো নোট বার করে দেয় আমীর।
চেঞ্জ দিন খুচরো হবে না।
কিন্তু যিনি এত দয়ার আধার, তিনি যেন আর একটুকুর জন্য তাকে আর ফিরিয়ে দিতে পারেন না। কালুয়া বলে কাকে ডাকা হলো! সে-ই নোট ভাঙিয়ে দেয়।
টিকেটখানা হাতে নিয়ে তবে স্বস্তি।
পাক্কা ছ’ঘণ্টা তাকে বসে কাটাতে হবে। ট্রেন ছাড়বে সেই দুপুর দেড়টায়!
তার মানে প্রায় আর্দ্ধেক দিন। এখানে না বসে বরং শহরে একটা ঢুঁ মেরে এলে হয়।
এ্যাটাচিখানা লাগেজ রুমে রেখে একটা টাঙ্গা হাঁকে।
কোথায় যাবে বলতে হবে। ‘যেখানে খুশি নিয়ে চলো’ মার্কা কথা আজকাল অচল। হয় লোকে বলবে পাগল কিংবা সন্দেহজনক চরিত্র বলে থানায় পৌঁছে দেবে।
টেলিফোনে খবর নিল শওকৎ-এর, ডেইলি নেশন পত্রিকা অফিসে। গত চার বছর ধরে সে ওই কাগজেই আছে।
প্রথম যে টেলিফোন ধরল সে প্রায় ভড়কেই দিয়েছিল। বলল, কাকে চান, শওকৎ? সে-তো সিরিয়াস এ্যাকসিডেন্টে পড়ে –
মুখে কথা সরে না আমীরের। বুক র্দু র্দু করে ওঠে। অযথা না জেনেশুনে রাগ করা উচিত হয়নি। এরকম কিছু না ঘটলে নিশ্চয়ই আসত শওকৎ। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, সিরিয়াস, কী রকম সিরিয়াস?
গাড়ি টাড়ি চাপা পড়েনি তো?
ওধার থেকে জবাব আসে, দাঁড়ান। আমি ঠিক বলতে পারব না। রিজভি জানে।
এরপর যার হাতে টেলিফোন গেল ঘটনাটা তার মুখে আরেকটু মুখরোচক হয়ে ওঠে, দেখুন অতশত কথা তো আমরা বলতে পারব না। তবে কারমাইকেল হাসপাতালে যেদিন নিয়ে যাওয়া হলো, যায় যায় অবস্থা আর কি। ওখানে আবার অক্সিজেনেরও ব্যবস্থা আছে।
মনে মনেই জবাব দেয় আমীর, তা তো থাকবেই। প্রায় সব হাসপাতালেই থাকে।
ধৈর্যচ্যুতি ঘটে গলা চড়িয়ে বলে, কী হয়েছিল আমি সেটাই জানতে চেয়েছিলাম।
রিজভি নামক ব্যক্তিটির দৌড় বোধহয় ওখানেই শেষ। ও বলল, দাঁড়ান, ওহিদুল্লাহ নিরাশ করল না। দল বেঁধে ওরা সেদিন বুলন্দশাহী মিনার দেখতে গিয়েছিল। শওকৎ ছিল সকলের আগে। উৎসাহের আধিক্যে বা যে-কোনো কারণেই হোক, একটা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে পা পিছলে পড়েছিল। পাশেই একটা গর্ত। উরুর ওপরের দিকটা থেঁতলে যায়। জখম বড়রকমের সন্দেহ নেই। তবে আশঙ্কার কিছুই নেই।
শুধু মাসখানেক হাসপাতালে কাটাতে হবে এই যা। ওর কাছ থেকে হাসপাতালের নম্বর নিল আমীর।
দুই
কারমাইকেল হাসপাতালে পঁচিশ নম্বর কেবিনের দরজা ঠেলতেই বেরিয়ে আসে এক ভদ্রমহিলা। যেন চেনা মুখ। তবু সন্দেহ না মিটিয়ে আলাপের ঝুঁকি নিতে সাহস হয় না।
ভদ্রমহিলার চোখেমুখে রাত-জাগার ক্লান্তি। তবু সেই অবসাদগ্রস্ততা ছাপিয়ে হেসে বলে ওঠে, আমীর ভাই না।
ভুল হয় না চিনতে, মুক্তা। ও নামেই তো চেনে বরাবর। কি জানি আর কোনো ভালো নাম ছিল নাকি! একটু ভারিক্কি হয়েছে। গিন্নী গিন্নী ভাব। তবু যেন ইচ্ছে করলে তেমনি মৃদুহাসির ঢেউ তুলতে পারে। যে হাসির ঢেউ-এ ভেসে গিয়েছিল শওকৎ-এর দুরু দুরু চিত্ত।
জীবনে বিয়ে করব না, এমন প্রতিশ্রুতি যে কলেজের কমনরুমে, রেস্তোরাঁয় সহজ দর্শনের বুলির মতো ছুড়ে দিত, সে-ই একদিন আকুল হয়ে উঠল। বিশ্ববিদ্যালয় সে বছর নিশ্চিত ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া ছাত্রটিকে নিরাশ করল বটে। কিন্তু মুক্তা করল না। সে তো এক কথাতেই বাড়ি ছেড়ে বাসস্টপে এসে দেখা করেছিল, সব চুকিয়ে দিয়ে এলাম। এখন তোমার যা খুশি।
ব্যাপারটার অত রোমাঞ্চকর পরিণতি হয়নি। স্বাভাবিক নিয়মেই বিয়ে হয়েছিল মেলা হৈ হৈ করে, বাজনা বাজিয়ে, বাজি পুড়িয়ে আর কাঁটা-চামচ আর প্লেটের শব্দ মুখরিত করে। সেই মুক্তা।
শওকৎ একটা ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে দিয়েছিল বিছানার ওপর। সকালবেলায় কাগজে বুলিয়ে নিচ্ছিল দৃষ্টি। যেন কিছু বাকি নেই। তন্ন তন্ন করে পড়েছে।
বোধহয় হয় আমীরকে দেখে উত্তেজনাবশতই উঠে বসল। কিন্তু পায়ের প্লাস্টার তখনও খোলা হয়নি। ঝুঁকে পড়ে চেপে ধরতে হয় হাঁটুর ওপরটা। তারপর শান্ত হয়ে আনন্দে চোখদুটো নাচিয়ে বলল, ভালোই করলে। নিজের তো এ অবস্থা। বৌকে পাঠাবো তারও উপায় নেই।
আমীরের টেলিগ্রামখানা সামনেই রাখা।
এতক্ষণ চোখে পড়েনি। পাশেই আরেকখানা খাট। সেখানে কম্বলের ভেতর জড়সড় হয়ে গুটিকয় উৎসুক চোখ খুঁতিয়ে খুঁতিয়ে দেখছে তাকে, দৃষ্টি এড়াল না শওকৎ-এর – জিজ্ঞেস করে, তুমি ক’টি দেখে দিয়েছিল?
একটিও না।
ও তাই তো। তখন তো আমার বিয়েই হয়নি।
আমীর বলে, যাকগে পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে কি লাভ। এখন ক’টি শুনি?
ওই দুই ছেলে। আর সবচেয়ে ছোটটি মেয়ে।
তারপর যেন কর্তব্যবোধের তাড়নায় ওদের দিকে তাকিয়ে বলে শওকৎ, আদাব করো, তোমাদের চাচা।
লাভ হলো না। কম্বলের নিরাপদ অন্ধকারে ওরা নিজেদের গুটিয়ে নিল আবার।
মুক্তা বোধহয় চায়ের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছিল। আমীর বাধা দেয়। চেয়ারখানা এগিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, তোমার পা ভাঙার শখ হলো কেন এ বয়েসে শুনি।
সে কথার জবাব না দিয়ে উল্টো জিজ্ঞেস করে শওকৎ, তার আগে শুনি তোমার আগমন হেতু। কই আগে তো কখনও বলোনি।
আগে তোমারও পা ভাঙেনি। আমারও কপাল ভাঙেনি। বুঝতেই পারছ। কেমন সন্দেহের চোখে ওকে আবার জেরা করে শওকৎ, না বলতে আপত্তি? তোমার কাজটা জেনে নিয়ে আমি একটা ডবল কলম খবর ফেঁদে বসি, সে ভয়?
আমীর মনে মনে ভাবে কথা সেটা নয়। কোনো বাঁধ পরীক্ষা করতে আসেনি। আসেনি কোনো সেচ-পরিকল্পনার পরিণতি দেখতে, কোনো মাতৃসদনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে বা কোনো মান্যবর ব্যক্তির বক্তার বিবরণী লিখতে। যে কাজে এসেছে শুনলে হাসবে শওকৎ।
ওকে চুপ করে থাকতে দেখে শওকৎই আবার বলে, বলেই ফেলো না। নির্ভয়ে বলতে পারো। জানো তো আমি বার্তাবিভাগে নেই এখন! নীরস সম্পাদকীয় মন্তব্য লেখাই এখন কাজ।
তবু কেমন করে বুঝিয়ে বলবে বুঝে পায় না। গোড়ায় সে উৎসাহিতই বোধ করেছিল। ভেবেছিল আরেকবার তার রিপোর্ট-কুশলতা দেখবার সুযোগ উপস্থিত। নিজস্ব প্রতিনিধির পাঠানো পরপর বারোটি খবর ছাপা হবে দৈনিক স্বদেশে কোনো এক ইতিহাসাতীত কাহিনীর ওপর। পাঠকেরা পড়ে যে মুক্ত হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ তো কোনো জনবরেণ্য নেতার জ্বালাময়ী ভাষণ নয় – যে বাছাই করা কথাগুলো তুলে ধরবে। কোনো নতুন পরিকল্পনার ব্লু-প্রিন্ট নয় যে, পাঁচ বছরের আনুমানিক ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখ করে মোহিত করবে বা মেয়ে-স্কুলের পারিতোষিক বিবরণী নয় যে, রিপোর্টের সঙ্গে আহামরি চেহারার একটি মেয়ের ছবি পাঠিয়ে দিয়ে তাদের চিত্ত হরণ করবে।
আমীর এক মুহূর্ত ভাবল। যে ভদ্রলোক প্রথম কিম্বার্লির খনিতে হীরের সন্ধানে গিয়েছিলেন, তিনি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পেরেছেন, হীরে আনতে যাচ্ছি? মাদাম কুরি তাঁর গবেষণাগারে দুঃসহ চেষ্টায় ব্রতী হওয়ার আগে বলতে পারতেন, কেন সে কাজ করছেন? বা পারতেন প্রিন্সটন ইউনিভারসিটির বুড়ো অধ্যাপক আগেভাগেই বলে দিতে যে, বস্তুর সীমাহীন শক্তির নিদর্শন পেয়েছেন তা একদিন হিরোশিমা আর নাগাশাকির আতঙ্কের কারণ হবে?
অবশ্যি তার কাজটা এমন কিছু চাঞ্চল্যকর নয়। তবু সম্ভাবনার কথা কে বলতে পারে! সম্ভাবনার বীজ এমনি করে একদিন দুর্জয় ভরসার মহীরুহ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমন তো কত আছে।
চাকওয়ালের অদূরে আবেদ্রুম। জন-উপেক্ষিত অঞ্চল। ক’দিন আগেও মানুষের ছায়া পড়েনি। সূর্যের আলো পড়েনি। উঁচু পাহাড় আর দুর্গম জঙ্গলে ঘেরা কয়েকশ বর্গগজ জমি। কিছুদিন আগে পথ ভুল করে কে একজন সেখানে এসে পড়ে। বিরাটকায় কি দেখে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। কিছু নয়, গ্রানাইটখচিত অপূর্বদর্শন এক নধরকান্তি পুরুষ মূর্তি। পাহাড়ের বুক থেকে হেলে। বোধহয় কোনোদিন ধস নেবেছিল।
তারপর এক মৌন ইতিহাস তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে এ যুগের আলোয় উদ্ভাসিত হলো। প্রতœতত্ত্ববিদরা দলবেঁধে এসেছে। কিছুদিন আগেও ঘুরে গেছে একদল ফরাসি বিশেষজ্ঞের দল। পৃথিবীর মাটি খুঁড়ে অতীত ইতিহাসের আবর্ত থেকে সহস্র বছরের কীর্তি-সৌধকে যারা নজরবন্দি করেছে মিউজিয়ামের চারদেয়ালে, তাদেরই কেউ কেউ।
কেবল ছুটিতে যাওয়াই ঠিক ছিল। পশ্চিমের আবহাওয়া মধুক্ষরা, একথা কোনোদিনই তার মনে হয়নি। স্বাস্থ্যোদ্ধারের ভূয়সী প্রশংসিত অঞ্চলে গায়ে রক্তের জোয়ার ছোটানোর লোভেও নয়। শুধু কিছুদিন বিশ্রাম। কিছুদিনের জন্যে চেনামহলের গ-ি থেকে নিজেকে অচেনা পরিবেশে ঠাঁই দেওয়া। যেখানে তার সম্বন্ধে ঔৎসুক্য কম, ভাষা যেখানে মনের সব কথা কলকলিয়ে ঝরনার মতো ছুটিয়ে দিতে বাধ্য করে না। যেখানে কথা না বলেও, শুনে এবং দেখেই তৃপ্তি। স্বদেশ সম্পাদক ছুটি মঞ্জুর করেছিলেন ঠিকই। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে একটা চেক বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, রাখো।
চুরুটে ফুঁ দিয়ে বলেছিলেন স্বদেশ সম্পাদক, স্বার্থ আছে বুঝতেই পারছ। সেই আবেদ্রুমে খোঁড়ার কাজ শুরু হয়েছে জানো বোধহয়। ফরাসি দলটি পৌঁছে গেছে। তুমি শুধু সপ্তাহে একটা করে ছাঁকা ডেসপ্যাচ্ পাঠাবে।
অনেকক্ষণ তাকে চুপ করে থাকতে দেখে শওকৎ বলল, কী ভাবছ?
ভাবছি কাজটা বেজায় শক্ত। তেমন ভরসা হয় না। আবেদ্রুম জায়গাটা চেনা?
না। তবে শুনেছি রাস্তাঘাট তেমন নেই। বোধহয় চাকওয়ালেই থাকতে হবে তোমাকে। সেখান থেকে যদি কারও সঙ্গে ব্যবস্থা করে নিতে পার। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ওঠার উপক্রম করে আমীর। মাত্র ঘণ্টাআর্দ্ধেক বাকি। এখুনি ছুটতে হবে স্টেশনে।
তা ক’দিন থাকবে হাসপাতালে?
সে কথার জবাব না দিয়ে ওকে কাছে টেনে এনে কানে কানে বলে শওকৎ, সহজে নড়বার ইচ্ছে নেই! এর আগে যে বাড়িটা নিয়েছিলাম সেখান থেকে নোটিশ এসেছে। বৌ-ছেলেমেয়ে নিয়ে কেবিনে আছি। ছোটখাট রান্নাবান্নাও চলে। বুঝতেই পারছ। অবশ্য মুক্তা শুনলে রাগ করবে।
তারপর একসময় আবার আমীরের দিকে দৃষ্টি স্থির করে বলে শওকৎ, আর যাবো বললেই যাই কেমন করে? আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় আমার পা ভালো হবে তো? চলতে পারব তো আগের মতো?
স্বয়ং ডাক্তারও বোধহয় তাকে সে আশ্বাস দিতে পারেনি। এক ধারে ক্র্যাচ রাখা। আমীরের মনে হয় হয়তো অনেকদিন ওটাকে হাতছাড়া করতে পারবে না শওকৎ।
এতক্ষণ চোখে পড়েনি। দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মুক্তা। চোখেমুখে তার মৃদু কৌতুক।
কী বলা হলো কানে কানে?
না, কিচ্ছু না।
তবু যেন একটা সান্ত¡নার বাণী শোনাতেই হয়।
আমীর বলে, এ নিয়ে ভাবনার কি আছে। এমন দুর্ঘটনা কতই হচ্ছে। আমার এক মামাতো ভাই, তাকে দেখলে ভয় পেতেন। তার একটা পা যেতেই বসেছিল। এখন দিব্যি ফুটবলের টিমের হাফব্যাক।
যেন ভরসা পায় মুক্তাও। বলে, আমি তো সে কথাই বলি। বলুন এ নিয়ে এত দুর্ভাবনার কোনো মানে হয়?
একেবারে মানে যে হয় না, সে কথাটা জোর করে বলতে পারেনি আমীর। ট্রেনের সময় হয়ে আসছিল। আর কোনো কথা না বলেই বেরিয়ে পড়ে।
তিন
শাহপুর স্টেশনে নাবতেই অভ্যর্থনা জানায় নক্শবন্দী আর সাবজোয়ারী। সঙ্গে এক বিদেশী ভদ্রলোক। ক্যামেরাও ছিল তার হাতে। তাকে রীতিমতো অপ্রতিভ করে ক্লিক করে ওঠে ক্যামেরা।
নক্শবন্দী প্রতœতত্ত্ববিদ। মিশিগ্যান ইউনিভারসিটিতে ডক্টরেট করেছিল। নতুন আবিষ্কারের নেশায় থিসিস শেষ না করে দু’মাস আগেই দেশে ফিরে এসেছে।
যেতে যেতে সেই বলল, অমন নার্ভাস দেখাচ্ছিল কেন?
কাকে?
আপনাকে।
কখন?
ছবি তোলার সময়।
আমীর হাসে। বলে, অভ্যেস নেই কিনা। ব্যাপারটাই যে নার্ভাস করে দেবার মতো। এরকম অভ্যর্থনা পেলে যে-কোনো সাংবাদিক হার্টফেল করবে। তারপর আবার মনে মনে ভাবে, ব্যাপারটা নিশ্চয়ই স্বদেশ সম্পাদকের কীর্তি।
পরিচিতির পরিধি যদি পপুলারিটির মাপকাঠি হয়, স্বদেশ সম্পাদকের জুড়ি নেই। যেখানেই যান সেখানেই নাকি ঠেলিফোন ডাইরেক্টরির লাল নীল আর হলদে পাতার নামগুলো টুকে নেন। তারপর দিলদরিয়া হলে ডিনার কিম্বা নিদেনপক্ষে টি-পার্টি। আর কাগজ যখন নিজেরই, রং চড়াতে কতক্ষণ। যত খুশি ছবি ছাপাতে কি বাধা?
আমীর যেতে যেতে বলল, ব্যাপার কি জানেন? অন্যকে মালা পরতে দেখে, ছবির সামনে মার্জিত হাসিতে উদ্ভাসিত হতে দেখেই অভ্যস্ত। অনুগ্রাহীদের ভিড়ে কোথায় নোটখাতা আর পেন্সিল নিয়ে অখ্যাত নেতার মন্তব্য শোনার জন্য ভীমরুলের মতো –
নক্শবন্দী বলে, ভীমরুল কী?
ইংরিজিতে তরজমা করলেও ভীমরুল কথাটা বোঝানো যায় না। আর তা গেলেও তার হুল ফোটানোর জ্বালাটা তরজমা করবে কী করে!
আমীরকে ইতস্তত করতে দেখে নক্শবন্দী বলে, বুঝেছি, বুঝেছি। আপনার উপমাটা না বুঝলেও, ব্যাপারটা আঁচ করতে পারছি।
তার সঙ্গীরা পেছনে পেছন আসছিল।
নক্শবন্দী বলল, ভালো কথা পরিচয় করিয়ে দিইনি। সাবজোয়ারী ইতিহাসের অধ্যাপক। লন্ডনের ফার ইস্ট সোশাল রিচার্চ ইনস্টিটিউটের এ্যাসিস্টেন্ট কিউরেটরের কাজ করতেন একসময়। তিনিও থাকবেন আমার সঙ্গে। আর ইনি মাইকেল তোগালিত্তি।
বোধহয় তোগালিত্তির দেবার মতো তেমন কোনো পরিচয় নেই। জাত টুরিস্ট। পরনে ব্লু জিনস! ছাই রং-এর বুশ শার্ট। বিবর্ণ জুতো। সানগ্লাস, পাইপ, ট্যোবাকো পাউচ্, নোটবুক, গোটা চার পেন্সিল আর কলম শার্টের পকেট থেকে উঁকি দিচ্ছে। এমনকি আস্তিনের ওপরও দুটো পকেট। তার একটায় বোধহয় কিছু ভাঁজ করা কাগজ।
আমীর জিজ্ঞেস করে, ওটায় কী রাখেন?
তোগালিত্তি হেসে বলে, রুট-ম্যাপ। বোঝেন তো মানিব্যাগ হারালে তেমন দুঃখ নেই। কিন্তু রাস্তা হারালে যাবো কোথায়?
হঠাৎ মনে পড়ল স্বদেশ সম্পাদক ফরাসি বিশেষজ্ঞদলের কথা বলেছিল। তাহলে তোগালিত্তিও কি তাদের একজন?
নক্শবন্দীকে জিজ্ঞেস করতেই বলে, ওরা তো কালই চলে গেল। বলে গেল, আগে খোঁড়া হোক, কিছু বের হোক তারপর না হয় আসবে। ফরাসি দলটি আপাতত সোমালিয়া যাচ্ছে।
তাহলে তোগালিত্তি? প্রশ্ন করে আমীর।
সাবজোয়ারী কথা বলে এবার, ইনি ইতালিয়ান। কী করে খোঁজ পেয়ে ভিড়ে গেল! চমৎকার দিলদরিয়া লোক। দুদিন মিশলেই বুঝবেন। এতক্ষণে তারা রেস্ট-হাউসে এসে পৌঁছেছে। আসলে এ রেস্ট-হাউস ছিল কমিশনার মরিসনের আমলে। মনোরম পরিবেশ আর নিরিবিলি জায়গা। যে-কোনো কারণেই হোক, এখনও রেস্ট-হাউসে সময়ে অসময়ে অভ্যাগতদের ভিড় হয়।
আগে তো কথাই ছিল না। অমুক স্টেটের প্রিন্স এসে পড়ল চট করে। তাদের তো আর ঠেকানো যায় না। দৌড়ঝাঁপ করে শুধু তো খাট-পালং টানা-হ্যাঁচড়া নয়। ডিনার-টেবিলের চামচগুলো ভালো করে ঘষা আছে কিনা, ছুরিতে কোনো দাগ আছে কিনা সেগুলো তদারক করতে হতো চিফ বাট্লারকে। চিফ বাট্লার মানে আসলে চিফ বাবুর্চি এবং একজনই। অবশ্যি ফুটফরমাশ খাটার জন্যে যারা ছিল তাদের বাদ দিয়ে।
করিমবক্স এই শর্ত করেই চাকরি নিয়েছিল। মাইনে যা হোক, যেমন হোক, পদবী বদলানো যাবে না। বিশ বছর গোরা সায়েবদের বাড়িতে কাজ করেছে। এখন খানসামা বাবুর্চি হলে কেমন করে চলে!
আর ফ্রান্সিস স্যামুয়েল জন স্টিফেনস্ন ছিলেন সেকালের রেসিডেন্ট জেনারেল। যেমন তেমন সায়েব নয়। কাটা চামচে হাতের একটু ছোপ পড়লে হুঙ্কার দিয়ে উঠতেন। সুপের রং তার গায়ের রং-এর সঙ্গে ম্যাচ না করলে চটেই যেতেন।
সেই স্যামুয়েলের বাড়িতে প্রথমে বাবুর্চি, পরে বাটলার করিমবক্স।
আজ তাকে দেখলে আর চেনা যায় না। বয়সে কুব্জ ভার। হ্যাংলা চেহারা। তবে, মাথার পাগড়িটা আজাও ধবধবে। আর তার ওপর ঘষা পেতলের লেবেল, এস.জে.এস। সবাই বোঝায় এখন তো আর স্যামুয়েল নেই। ওটা নাবাও না মাথা থেকে।
করিমবক্স চটে যায়। বলে, তা হয় না। ওটা স্যামুয়েল স্মরণে নয়। তার পেশাগত ঔৎকর্ষের ছাপ।
তারপর তা নিয়ে কেউ তাকে জেরা করেনি।
নক্শবন্দীর কাছে রেস্ট-হাউসের গল্প শুনে তোগালিত্তি বলে, আমি একবার গিরিডিতে এ ধরনের একটা লোক দেখেছিলাম।
গিরিডিতে গিয়েছিলেন নাকি? আমীর জিজ্ঞেস করে।
হ্যাঁ, ঠিক যাবার কথা ছিল না। আমরা গিয়েছিলাম নালন্দায়। পথে একদিন থেকেছিলাম গিরিডির এক হোটেলে। সে হোটেল, যাকে বলে একদম ভেজিটেরিয়ান। অথচ সেখানকার এক বয় শার্টের ওপর একটা শীলমোহর এঁটে বেড়াত। কাছে ডেকে দেখলাম ওটা মুরগির ছবি, বোধহয় কোনো হোটেলের প্রতীক, মুরগি তাদের স্পেশ্যালিটি।
বললাম, ওটা কেন লাগাও? তুমি তো মুরগি খাও না বা সার্ব করো না।
সে কিন্তু চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিল, তাতে কি! জীবে দয়া কি অন্যায়?
লোকটার আর যাই হোক যুক্তির বহর ছিল, কি বলেন?
সাবজোয়ারী তোগালিত্তির কথায় মাথা নাড়ল।
এতক্ষণ তোগালিত্তির মনে হলো আমীরের পরিচয়টা ভালো করে জিজ্ঞেস করেনি।
আমীরও সেটা আন্দাজ করে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আমি হচ্ছি আপনাদের যাকে বলে তথাকথিত সাংবাদিক।
তোগালিত্তি খুশি হয়। বলে, তাহলে তো ভালোই। আমার মতো টুরিস্টকে হিউ-এন-সাঙ, কলম্বাস গোছীয় করে তুলতে পারেন। রং চড়াতে কতক্ষণ?
তা তো পারিই, কিন্তু তার জন্যে বানানো এবং আজগুবি হলেও কিছু নরখাদকের গপ্প আর কঙ্গোর গভীর জঙ্গলে হিংস্র উপজাতীয়দের হাতে কীভাবে প্রাণ যাচ্ছিল, সে কাহিনী একটু রসিয়ে বলতে হবে।
তোগালিত্তি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, জানেন ওই কাজটাই আমাকে দিয়ে হয় না। ছিলাম মিকানিক। যুদ্ধের সময় চাহিদা ছিল। সাত সতেরো কাজ তখন।
তারপর –
যেন নিজেরই অজান্তে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তোগালিত্তির বুক থেকে।
আমীর জিজ্ঞেস করে, তারপর কী হলো?
সে এক বিরাট ইতিহাস।
হোক না। বলুন, শুনব।
খানিকদূর গিয়ে একটা খোলা মাঠ। সবুজ ঘাস সতরঞ্চিতে মোড়া যেন। সারি সারি দেবদারু। প্রতিযোগিতা করে দীর্ঘাঙ্গ হওয়ার চেষ্টা করছে। মাঝে মাঝে কিছু জংলী ফুলের ঝাড়।
তোগালিত্তি বলল, চলুন এখানেই বসা যাক।
তারপর নিজেই বসে পড়ে পায়ের জুতো খুলতে লেগে যায়। বেশকিছু কসরৎ করার পর খুলে এলো ওখানা। সচ্ছিদ্র উলের মোজার ফাঁকে ওর পায়ের তিনটে আঙুলই দেখা যায়। সেগুলোতে হাত বুলিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে তোগালিত্তি।
আমীর ওর পাশে এসে বসে।
তোগালিত্তি বলে, জিজ্ঞেস করলেন না টুরিস্ট হলাম কেন?
সে কথা জিজ্ঞেস করা বৃথা, আমীর জানে। ধন-সম্পদের গরিমায় অভিষিক্ত দেশের মানুষের কাছে সে কৌতূহল জানিয়ে লাভ? ইউরোপের বাইরের জগৎ যাদের কাছে এখনও বিস্ময়, সেই বিস্ময়ের জগতে সভ্যতার পীমুষধারা বয়ে নেবার জন্য তোগালিত্তির মতো পরিব্রাজকদেরই তো দরকার। তারা দেশে ফিরে একদিন শোনাবে সে কাহিনী। কোনো তমসাচ্ছন্ন জনপদের নরনারীর। তাদের অনুভূতি, ভালোবাসা, বেদনার উপাখ্যান যেমন খুশি তেমন করে বলবে। আর সেটাই বিশ্বাস করতে হবে! সেই পরিব্রাজকের দলই যেন যুগে যুগে মর্মপীড়নের অন্ধকার থেকে তাদের তুলে আনে, সমাদৃত করে?
কাজেই তোগালিত্তিকে সে কথা জিজ্ঞেস করতে যাওয়া কেন।
তবু তোগালিত্তি বলেই চলেছে, মহাযুদ্ধের পর জীবনে ঘনিয়ে এলো চরম হতাশা ও নৈরাশ্য। মনে হলো জীবনের সবকিছুই ব্যর্থ! সবকিছুই অর্থহীন। শুধু কয়েকটি লিরা ছাড়া। কিন্তু স্ত্রী, পরিবার, আত্মীয়স্বজন যেখানে শান্তি দিতে পারে না সেখানে ব্যাংকে জমানো কয়েক সহস্র লিরায় কি শান্তি। তাই বেরিয়ে পড়লাম। বিশ্বাস করুন, বাড়ি থেকে এক কানাকড়ি নিইনি। কিছু ছুঁইনি। শুধু একটা নোট বই, আমার এই পাইপ আর সঙ্গের জামাকাপড় ছাড়া। ক্যাথারিনের কাছ থেকেও কিছুই নিইনি, বিশ্বাস করুন। ক্যাথরিনের নামোল্লেখে কৌতূহল হয় আমীরের।
কিন্তু তাকে কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ না দিয়েই তোগালিত্তি আবার বলে, ক্যাথারিন কে জানতে চান নিশ্চয়ই? আজ নয়, আরেকদিন বলব।
বোধহয় চেষ্টা করলেও বলা যেত না।
সাবজোয়ারী এসে পড়েছে ততক্ষণে। হাতে একটা ফলের ঝুড়ি। দু’জনকে বসে থাকতে দেখে সেদিকেই এগিয়ে আসে। বলে, ভালোমানুষ আপনারা যা হোক। হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি, আর আপনারা দিব্যি গপ্প জুড়ে দিয়েছেন।
সন্ধে নাবছে। পাইন গাছের চূড়ায় তুলির ছোঁয়ার মতো টুকরো টুকরো অন্ধকার। একসময় মনে হলো ওটাও আকাশের মতো গম্ভীর আর নির্বাক। এক ঝাঁক পাখি উড়ে গেল। তারপর মিলিয়ে গেল পশ্চিমের দিগন্তে। বিপুল মন্থরতা আর শূন্যতা নিয়ে রাত নাবছে। অমাবস্যা। মিটমিটে কয়েকটা তারা বিপুল আকাশের গায়ে যেন মিথ্যে আলোর প্রবোধ জাগায়।
চমনের আঙ্গুর, সাওয়াতের আপেল আর নারাঙ্গি এনেছিল সাবজোয়ারী সঙ্গে করে।
তারই একটা বাড়িয়ে দিলো আমীরের দিকে। তোগালিত্তি নিল একটা।
আপেলে এক কামড় বসিয়েই বলে তোগালিত্তি, ক্যাথারিনের গালটাও ছিল এমন টকটকে লাল। না না, অতটা নয়। তবে সাজলে প্রায় তাই মনে হতো।
সাবজোয়ারী লজ্জা পায়।
আমীর বলে, কল্পলোকের কোনো মানসী হবে নিশ্চয়ই আপনার এই ক্যাথারিন, যার গাল আপেলের মতো টুকটুকে লাল না হলেও, কল্পনায় তাই মনে হয়। ঠিক বলিনি তোগালিত্তি?
তোগালিত্তি কেমন আহতই হয় যেন, দেখোনি কিনা। তাই ঠাট্টা করছ।
বলে তার ওপর আক্রোশে না সুস্বাদু বলে কোনটা বোঝা গেল না, এক কামড়েই আপেলটা নিঃশেষ করল।
যেন ব্যাপারটা মোড় ঘোরাতেই নতুন প্রসঙ্গের অবতারণা করে সাবজোয়ারী।
বলে, আপনারা গালগপ্প নিয়ে মশগুল। ওসব তো সেকেলে ব্যাপার। তারচেয়ে মজার গপ্প বলি শুনন।
এ নিশ্চয়ই আপনাদের লন্ডনের কফি হাউসের কোনো গপ্প, ফোড়ন কাটে আমীর।
না শুনেই অধীর হলে চলবে কেন? আমি বলছিলাম একটা হাতের কথা।
হাত? তোগালিত্তিও কম বিস্মিত হয় না।
সাবজোয়ারী বলে, ঠিক হাত নয়। বলতে পারনে আঙুলের কাহিনী।
তোগালিত্তি বলে, শুনেছি আঙুলের ডেস্ক্রিপশন দিয়ে আপনাদের দেশে কত কাব্য হয়।
তারপর আমীরের দিকে চেয়ে বলে, বলো না। কিসের সঙ্গে উপমা দেওয়া হয়, তোমাদের বাংলা ভাষায়?
চাঁপাকলির সঙ্গেই তো জানি।
দু’জনের কেউ রসোদ্ধার করতে পারেনি, সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারে আমীর।
সাবজোয়ারী বলে, যাক্গে যা বলছিলাম। আমি তখন ফার ইস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ঢুকিনি। কোনো এক কাউন্টিতে এক জাদুঘরের এ্যাসিস্ট্যান্ট। বলতে পারেন সবে হাত মক্স করছি। পুরোন জিনিস, কুড়োন পাথর, নিলাম থেকে কেনা নানা ধরনের এন্টিকস, এসব ঘাটাঘাটি করি।
এলিস আমার সহকর্মী। বা বলতে পারেন সহধর্মিণী।
একদিন লঞ্চ কাউন্টারে আমাকে ফিস্ফিসে গলায় বলল, আপনি হাত দেখতে জানেন?
কেন?
শুনেছি ইস্টে খুব নামজাদা গণক আর পামিস্ট হয়। আমার দাদা প্রথম মহাযুদ্ধে রাওয়ালপি-ি ছিলেন। গণক নাকি তাকে বলেছিল মেসপটেমিয়ায় তার মৃত্যু অনিবার্য। বিশ্বাস করেননি ফাউলার। তিনতারকা বিশিষ্ট ফাউলার। কিন্তু যারা রইল তারা অবিশ্বাস করতে পারেনি সে কথা। অথচ জানেন তাও যুদ্ধে মরলো না।
তবে?
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে পা পিছলে। যাক্গে যা বলছিলাম।
এবার আর কোনো কথা না বলে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় এলিস।
এলিসের সঙ্গে বসে রোজ কাজ করি। রোজ দেখি। অথচ তেমন খুঁতিয়ে দেখিনি। সেদিন এত কাছে পেয়ে তার যৌবনপুষ্ট নীল ধমনীর দিকে তাকিয়ে মনে হলো, আমার নিজেরই দেহ-মনে কেমন রোমাঞ্চের বন্যা বইছে। জানি না হাত দেখা। তবু বইয়ের ধারকরা বিদ্যে দিয়ে বললাম, লাক ভালো, তবে –
যেন নিজের ইচ্ছেটাই চাপিয়ে দিয়ে ওকে বাজিয়ে দেখা। বললাম, বিয়ে হয়েছে?
হ্যাঁ।
ও মাথা নাড়ল।
অস্বীকার করব না, লন্ডনের অমন শীতে ওর হাতখানা আমার হাতে কোমল মখমলের মতো মসৃণ আর ধীমে চুলোর আঁচের মতো গরম লাগছিল। হেসেই বললাম, তাহলেই সেরেছে। তুমি মজেছ কারও প্রেমে। এ বিয়ে টিকবে না।
সাবজোয়ারী গপ্পের মাঝখানে আমীরের দিকে তাকিয়ে বলল, কি ভেবেছেন আমাদের মেয়েদের মতো ভ্রƒকুটি করে উঠল? হুঙ্কার দিয়ে উঠল? কিছু না।
কচ্ছপের গলা যেমন অজান্তে তার নিরাপদ আশ্রয়ে ঢুকে পড়ে তেমনি আমার আশ্রয় থেকে ওর হাতটা সরে আসে একসময়। ঘাড় নিচু করে বলে, লোকটি কে?
তা বলতে মানা। তবে হ্যাঁ, হপ্তায় একবার করে যদি হাত দেখাও, বলে দিতে পারব। রেখাটা আরেকটু গভীর হোক।
আশ্চর্য, এরপর এলিস প্রায়ই আসত। মেলে ধরত হাত। যেন হাত নয়। আঁকা দুর্লভ একটা ছবি। ফিকে গোলাপির ক্যানভ্যাসে যেখানে মানচিত্রের মতো অজস্র গাঢ় গভীর রেখা। ছুঁতে ভালো। দেখতে ভালো।
ওর বাঁ হাতের আঙুলে হীরের আংটিটা ঈর্ষাকাতর প্রেমিকের কটাক্ষের মতো আমার দিকে দৃষ্টি মেলে থাকে।
আংটিটা ধরে চাড়াচাড়া করছি দেখে এলিস বলল, কি ভাবছেন এত সহজে এটি সরানো যাবে না। নকল হীরে নয় বুঝেছেন। আসল হীরে।
তারপর একসময় যেন দারুণ ঘৃণায় এক ঝট্কায় হাতটা সরিয়ে জ্বালাময়ী দৃষ্টি ছুড়ে বলল, শখ তো কম নয় অন্য পুরুষটির। জেনে রাখুক, এ মেয়ে সে মেয়ে নয়।
বলেই দ্রুতপদে বেরিয়ে যায়। তারপর আর দেখা হয়নি।
তোগালিত্তি বলল, কী হলো আপনার ভবিষ্যদ্বাণীর?
সাবজোয়ারী কেমন মৃদু হেসে বলে, শুনেছি ও বিয়েটা ভেঙেছিল। তবে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেনি এলিস। একদিন একটা পার্সেল পেয়েছিলাম। তাতে তার ওই এনগেজমেন্ট রিং।
সঙ্গে ছোট্ট একটা চিরকুট। তাতে লেখা ছিল, মিউজিয়ামে ঠাঁই দিতে পারেন? সত্যি সত্যি খাঁটি হীরে কিন্তু।
আমীর বলে, তার কি আর অন্য আংটির দরকার হয়নি?
কী জানি।
সাবজোয়ারী যেন কাহিনীটা এখানেই শেষ করতে চায়। ওকে আর পীড়াপীড়ি করা নিরর্থক।
তোগালিত্তি বলে, দুঃখের কিছু নেই সাবজোয়ারী। আপনি একটা আংটি বদলাতে পারেননি। আমি তো একজনের আংটি বদলেছিলাম। তবু সাত বছর ঘর করেও ওর মন বদলাতে পারিনি।
আমীর চেপে ধরে, আজকের এই করুণ আবহাওয়ায় আপনার রসঘন কাহিনীটা শোনা যাক। মন্দ লাগবে না।
তোগালিত্তি উঠে পড়ার উপক্রম করে। বলে, আজ থাক। তবে যাওয়ার আগে আপনাদের শুনিয়ে যাবো।
চার
পরদিন সধূম চায়ের কাপের ওপর কথাটা পাড়ল নক্শবন্দী। এখান থেকে জিপে করে যেতে হবে মাইল তিরিশেক। তারপর রাস্তা এত সরু ও বাকি পথ পায়ে হাঁটা ছাড়া উপায় নেই।
তারপর একবার আমীরের দিকে, আরেকবার তোগালিত্তির দিকে তাকিয়ে বলল, কষ্ট হবে না আশা করি।
তোগালিত্তি চেয়ারে হেলান দিয়ে পা দু’টো লম্বা করে দিয়ে বলল, ও কথা বলে ভয় দেখানো যাবে না এ পা জোড়াকে। মাইলেজ কত জানেন? দাঁড়ান সর্বশেষ টোট্যাল করে বলে দিচ্ছি।
নোট বই-এর জন্যে হাত বাড়াল। ওটা সঙ্গে ছিল না বলে পায়ের মাইলেজ জানা গেল না।
আমীরের দিকে সকৌতুক দৃষ্টি হানে নক্শবন্দী। বলে, আপনারও কি ওই কথা?
আমীর হেসে বলে, শরীরে কসরৎ দেখিয়ে নাম করার সুযোগ হয় কখনও বাঙালি ছেলের? অবশ্যি তাই বলে পাল্কি চড়ার বায়না ধরব, ভাববেন না।
নক্শবন্দী আশ্বস্ত হয়, আপনাদের কষ্ট না হলেই হলো। আমরা তো তিনশ পঁয়ষট্টি দিন এসব করে বেড়াচ্ছি। আমি তাহলে জিনিসগুলো গুছিয়ে নিই। রেডি হয়ে নিন আপনারাও। ঘণ্টা আদ্ধেকে জিপ এসে পড়বে।
নক্শবন্দী চলে যাবার ঘণ্টা আধেক নয়, ঘণ্টা দেড়েক পর আহত সিংহের মতো গর্জন করতে করতে একটা হাড়সর্বস্ব গাড়ি এসে দাঁড়ায়। ব্যবহার না বয়সের দৈর্ঘ্য, কী কারণে কে বলবে, জিপের কঙ্কালটাই বুঝি বাকি। আর সবকিছুই পাল্টেছে। এমনকি ক্যানভাসের ছাদটা পর্যন্ত প্লাস্টিকের পাতল চাদরে মোড়া। রং-এর পোঁচ পড়েছে কয়েকবার। কিন্তু সেটা বয়েসের জীর্ণতা ঢাকার জন্যে না জৌলুস বাড়ানোর জন্যে বোঝা যায় না। একটা কথা ঠিক। প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণার জন্যে এই জ্বরাজীর্ণ গাড়ি না হয়ে ঝক্ঝকে শেভ্রলে হলে, তা চোখে ঠেকত।
আপাতদৃষ্টিতে যেমনই হোক, কাজে বেশ তোখড় মনে হলো। প্রায় কিছুদূর পাকা রাস্তা। প্রায় নিঃশব্দ অভিযান, শুধু চাকার পত্পত্ শব্দ ছাড়া।
নক্শবন্দী সার মটিমার হুইলারের একটা বই নিয়ে বসেছে। সাবজোয়ারীর হাতেও কিছু কাগজপত্র, নক্সা। কিন্তু সেদিকে তার তেমন ভ্রƒক্ষেপ নেই। তোগালিত্তিও কেমন উদাসদৃষ্টি।
বেশ খানিকদূর এগিয়ে এসেছে ওরা। জনশূন্য প্রান্তর। মাঝে মাঝে স্তব্ধ ঢেউ-এর মতো ছোটবড় পাহাড়ের সারি। কে যেন খুদে খুদে তার অন্তর জীর্ণ করেছে জায়গায় জায়গায়। সেখানে জমানো অশ্রুর মতো পাথরের চাঁই।
কী নাম ওই পাহাড়ের?
কেউ বলে, তাগরোল। কেই বলে, ডুকরি। কেউ বলে, নাম জানি না। আর কিছুদূর যেতেই চোখে পড়ে রাস্তার একধারে পাহাড়ের গায়ে গর্ত খোঁড়া। মনে হয় বেশ অনেকদূর চলে গিয়েছে সুড়ঙ্গের মতো। আবার কোথাও ছোট ছোট গবাক্ষ।
তোগালিত্তি বলে, এমন চমৎকার ব্যাপার দেখিনি কখনও।
চোখেমুখে তার উৎসাহ। ক্যামেরার শাটার চঞ্চল। কী এগুলো?
সাবজোয়ারী বুঝিয়ে দেয়, থাকবার ঘর। কি শীত কি গরম, যে-কোনো সময় নাকি পরম শান্তি এগুলোতে থেকে। তাছাড়া ঘর তৈরির হাঙ্গামা নেই। চুন-সুরকির দরকার নেই। অবারিত পাহাড়ের বুকে যে যত বড় খুশি সুড়ঙ্গ খুঁড়ে নিল। তারই ভেতর মাটির সঙ্গে নিবিড় হয়ে বর্তমান সভ্যতার বুকে মর্মান্তিক প্রহসনের মতো এখনও এগুলো টিকে। এখনও মানুষ গর্তে ঢোকে। দিনের প্রথম আলো পাহাড়ের গুহায় তাদের গাঢ় অন্ধকারের নেশা ভাঙতে পারে না।
এই শতাব্দীর সীমারেখা যেন এই গুহা। ভেতরে প্রাচীন, সনাতন। বাইরে দুঃসাহসিক সভ্যতার জয়যাত্রা। ল্যাম্প পোস্ট, পিচঢালা রাস্তা, সৌখিন মানুষ। আর ভেতরে যারা তারাও সীমারেখা পেরুলেই এ যুগের আলোর ছোঁয়ায় ধন্য।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নাবে। গাড়ির কাচ আর বনেটের ওপর জমেছে শিশিরবিন্দু। কুয়াশার রাস্তার বারো ফার্লং দূরের গাছগুলোকে মনে হয় স্বপ্নের মতো।
বই বন্ধ করে একসময় বলে ওঠে নক্শবন্দী, আজ বড্ড দেরি করে ফেললাম। কোনো কাজই হবে না। সাড়ে সাতটা বাজতে চলল।
পুরো একটা রাত কাটিয়ে তারপর সকাল করে যেতে হবে স্তূপ দেখতে। যতই রোমাঞ্চকর হোক, ব্যাপারটা খুব উপভোগ্য মনে হলো না।
অন্তত এখানে রেস্টহাউসের বিলাসিতা নেই। বিজলি আলোয় করিম বক্সের কাঁটাচামচের ঝলকানি দেখে গরম সুপ চেখে দেখার সুযোগ নেই। খাওয়াদাওয়া সেরে ¯িপ্রং-এর বিছানায় গা এলিয়ে দেয়াও চলবে না।
বাইরে শালগাছের বনে হু-হু হাওয়ার কান্না। বেশ ঠান্ডা পড়েছে মনে হলো। তোগালিত্তি তার গলার বোতামটা ভালো করে এঁটে নেয়।
একসময় জিপ এসে থামে। আর পথ নেই। এবার পায়ে হাঁটা রাস্তা। নক্শবন্দী বলল, আজ তো আর ‘সাইটে’ যাচ্ছি না। এখানেই কোথাও কম্বল বিছিয়ে রাতটা কাটিয়ে দিতে হবে।
উঁচুমতো একটা জায়গা পাওয়া গেল। রুক্ষ। ঘাস নেই একটু। পাথরের কুচি ছড়ানো। শুকনো ডালপালা এনে সাবজোয়ারী আগুন জ্বালায়। বলে, খোলা মাঠ। কোনো ভরসা নেই। আগুন বড় প্রটেকশন।
লাকড়িগুলো আগুনে দিতেই লকলকে আগুন দুর্দান্ত হয়ে ওঠে। বিষধর সাপের ফনার মতো হাওয়ায় দুলে দুলে কখনও ডানে, কখনও বামে ফোঁস ফোঁস করতে থাকে। আর নিজের অজান্তেই সে বিষধর সাপটাকে খেলিয়ে বেড়াচ্ছে সাবজোয়ারী। তারপর একসময় দুর্ধর্ষ আগুনের শিখা যেন একটু শান্ত হয়। যেন ধীরস্থির হয়। এখন তার জ্বালাময়ী ক্ষুধা নেই তেমন। একটা দুটো ভাঙা ডাল হলেই সে ধুক্ ধুক্ করে জ্বলে ওঠে, আবার শান্ত-সুবোধ ছেলেটির মতো মাথা নাবিয়ে নেয়।
আলোর আঁচ পড়ছিল সাবজোয়ারীর চোখেমুখে।
সরে এসে বলে, জানেন আমার ক্যাম্প-ফায়ারের কথা মনে পড়ে। একসময় স্কাউট ছিলাম। তখনকার মতো উত্তেজনা আর পাই না। সেদিন কোনো দায় ছিল না। আজ যে আগুন জ্বালানো, সেটাও দায়ে পড়ে। আর দায়ে পড়ার প্রয়োজন হলেই আনন্দের সবখানি মাটি। তোগালিত্তি বলল, আপনার একঘেয়েমির দায় থেকে মুক্তি দিতে পারে একজন।
সবাই তাকায় ওর দিকে।
সে কথার জবাব না দিয়ে হিপ পকেট থেকে ছোট্টমতো কি একটা বার করে বলে, এই মাউথ্ অরগ্যান।
তোগালিত্তির এ গুণের কথা কারও জানা ছিল না। তলে তলে লোকটা যে সঙ্গীতরসিক, বলেনি সে কথা। জিজ্ঞেসও করেনি কেউ।
সুর যাই হোক। এটুকু বোঝা যায় অন্তরনিঃসৃত অনুভূতির বেদনায় সিক্ত কোনো অভ্যস্ত রাগিণী। মর্মান্তিক গাঢ় সুরের মূর্ছনা। যাতে কখনও তার চোখ বুজে আসে। কখনও সেটা কোটর থেকে বেরিয়ে এসে হেডলাইটের মতো জ্বলে। মাথা দোলাতে গিয়ে একগুচ্ছ চুল এসে ঢেকে দেয় কপাল। সেদিকে লক্ষ নেই।
কেউটের ফনার মতো সরু আঙুলগলো মাউথ্ অরগ্যানের গায়ে গায়ে নেচে যায়। আর সেই নাচার সঙ্গে তাল রেখে বেজে উঠে সঙ্গীতলহরী। এখন কি যে নক্শবন্দী ক্যাম্প-ফায়ারের আলোয় বই পড়ছিল, সেও আঙুলে চেপে বইটা বন্ধ করল।
কারও লক্ষ নেই, যখন আগুন ধীমে হয়ে এসেছে। জ্বলা কাঠগুলো সহস্র রাত জাগা চোখের মতো।
সাবজোয়ারী বলল, আগুন যে নিবুনিবু। দু’একটা কাঠের চেলি ঠেলে দিন না আমীর সাহেব।
কী ভাবছিল আমীর কে জানে! যন্ত্রচালিতের মতো একটা ডাল ভেঙে দিয়ে বলল, এতক্ষণ কাঠ ছিল না। শুধু সঙ্গীতের জোরেই জ্বলছিল আগুন, কি বলেন?
তোগালিত্তিও হাসল।
বলল, ব্যাপারটা রসিকতা করেই বললেন জানি। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন, এ জায়গায়, এ মাটিতে যেখানে বসে আছি ঠিক সেখানে কেউ কোনোদিন বীণায় মূর্ছনা তোলেনি? দিগি¦দিক মুখরিত করে তোলেনি? পাষাণপুরী থেকে পালিয়ে এসে সেই সঙ্গীতের সুর শুনে কোনো কুমারী মেয়ে খুঁজতে আসেনি তার প্রেমাস্পদকে? আগুন তখনও জ্বলছে ওদের বুকে। ধিকিধিকি আগুন। সে আগুনের জন্যে কিন্তু কোনো কাঠের দরকার হয়নি।
সাবজোয়ারী বলে, বেশ তো ফেঁদেছেন গপ্পটা।
তোগালিত্তি বলে, কল্পনায় রং চড়ালে ক্ষতি কি। তার তুলিতে রং যে অফুরন্ত।
ছন্দপতন ঘটায় নক্শবন্দী।
বলে, অনেক রাত হলো। এবার খেয়েদেয়ে ঘুমুবার আয়োজন করতে হয়।
পাঁচ
সাবজোয়ারীকে সঙ্গে নিয়ে নক্শবন্দী ‘সাইট’-এ চলে যায় সকাল সকাল। সেখানে গেলে তাকে মনে হয় গয়নার দোকানে সে কোনো দুর্জেয় ইচ্ছের গিন্নী। সোনা বললেই সোনা বলে মেনে নিতে যে রাজি নয়। যে ঘরে, আলোর সামনে ধরে, বাজিয়ে যতক্ষণ না দেখছে ততক্ষণ শান্তি নেই। গয়নার দোকানের সতর্ক গিন্নীকেও সে হার মানায়।
সেদিন আমীর সঙ্গে ছিল।
খোঁড়ার কাজ কিছু কিছু এগিয়েছে। দশ ফুট গভীর পর্যন্ত পৌঁছানো গেছে। তা থেকেই টুকিটাকি দু’একটা জিনিস মেলে কখনও। কখনও খুঁড়তে গেলে টুং করে আওয়াজ যায়। নক্শবন্দী থামিয়ে বলে, সাবধান, জোরে মেরো না। মনে হচ্ছে কোনো দুর্লভ বস্তু।
অনেক সময় নিরাশ হতে হয়। দুর্লভ বস্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় একালের এনামেলের একটা ভাঙা বাসন। কেমন করে মাটিচাপা পড়ে স্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে।
সেদিন অবিশ্যি পাওয়া গিয়েছিল একটি শিলাখ-। তাতে কোনো নারীর স্পর্ধিত যৌবনের প্রতিকৃতি। কোনো এক বিস্মৃত মুহূর্তের স্মরণীয় আকাক্সক্ষার ভঙ্গিতে কোনো জাদুকর শিল্পী খুদে রেখেছে পাথরে। কালো বিষপাথর। জায়গায় খোদাই অস্পষ্ট। একটা ধার ভাঙা। মেয়েটির পায়ের গোড়ালি বাদ পড়েছে তাতে।
এমন শিল্পনৈপুণ্য দেখে আহা মরি মরি করার লোক নয় নক্শবন্দী। বরং নৈপুণ্যই যেন তার মনে সন্দেহের সুচের মতো মাথা তুলে ওঠে। কারুকার্য আর শিল্পকলার চাতুর্যে সহজে মুগ্ধ হওয়ার চোখ নয় তার। অনুসন্ধিৎসু জিজ্ঞাসু চোখ।
কিছু আঁচ করতে পারেন?
আমীরের অভিমত যাচাই করতে চেয়ে একসময় অপলক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে নক্শবন্দী।
সন-তারিখের কথা বলছেন? কিন্তু সেটা বলা কি সম্ভব?
কঠিন ধাঁধার প্রশ্নটি দিয়েছে যে সমাধানও জানে না সে, এমনি উজ্জ্বল হয়ে বলে নক্শবন্দী, সেটা জানার জন্যেই তো আমাদের আসা। নয়তো এত বুলডোজার দিয়েও খোঁড়া যায়। আমাদের কী দরকার?
কিন্তু আপনার ধারণাই যে নির্ভুল তার কি কথা?
নক্শবন্দী ভ্রƒকুঞ্চিত করে। তার পারদর্শিতায় কটাক্ষ করেছে আমীর। তবু হাসির আমেজ নিয়ে বলে, তা নাও হতে পারে। কিন্তু যদ্দিন অন্যেরা উল্টো যুক্তি দেখাতে না পারছে তদ্দিন আমার বক্তব্য না মেনে উপায় নেই।
নক্শবন্দী আবার শিলাখ-টির দিকে ঝুঁকে পড়ে। গত সাতদিনে পঞ্চাশ বর্গগজ জায়গা খোঁড়া হয়েছে। উল্লেখযোগ্য নিদর্শনের মধ্যে শুধু এই শিলাখ-টি।
আমীরের মনে হয়, এভাবে কাজ এগুতে থাকলে তার বহুবিঘোষিত ‘কলামে’র জন্য লেখা জোগানো দূরের কথা, এই ‘সাইটের’ পূর্ণ রহস্য উন্মোচনই সম্ভব হবে কিনা সন্দেহ।
তবু কথার ফাঁকে ফাঁকে নক্শবন্দীর অভিমত যাচাই করে নিয়ে প্রথম ডেসপ্যাচটা ঠিকই পাঠিয়েছিল। সাংবাদিক নিয়মে পাঠকদের ঔৎসুক্য বজায় রাখার জন্যে তার আরো মালমশলা দরকার।
নিজেই শিলাখ-ের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, ঘন মাপল। মোটামুটি একটা ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাও ঠিক করা হলো। প্রতœতাত্ত্বিকরা যে এই দু®প্রাপ্য শিলাখ- থেকে কোনো বিস্মৃত সভ্যতার ওপর আলোকসম্পাত করতে পারবেন সেরকম একটা ইঙ্গিত দিতেও ভুল করল না।
রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে তার পরবর্তী ডেসপ্যাচের এই বিষয়বস্তু নিয়েই আলোচনা করছিল আমীর। নক্শবন্দী তার প্রিয় খাদ্য শিককাবাবে মেখে রুটিটা হাতে নিয়েও আর মুখে তুলল না। যেন কেউ তার বুকে ছুরি বসিয়েছে।
হোয়াট! মৌর্যযুগ বলে কি করে ডেসক্রাইব করলেন! ফিচার লক্ষ করে দেখেননি গ্রিক স্থাপত্যের প্রভাব?
সাবজোয়ারী থামাতে চেষ্টা করে। বলে, তাতে হয়েছে কি। আপনার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হলে আবার না হয় আগের বক্তব্যটা শুধরে নেয়া যাবে। খবরের কাগজে এ ধরনের ব্যাপার তো নতুন নয়।
নক্শবন্দী মানে না। বলে, না না। ঐতিহাসিক ব্যাপার নিয়ে জল্পনা-কল্পনার কোনো মানে হয় না। এ ধরনের খবর পাঠানো হবে আর আমি চুপ করে থাকব, তা কখনও হতে পারে না।
নক্শবন্দী নিজেও বোঝে চিৎকারটা একটু বেশিমাত্রায় করে ফেলেছিল।
তাই বলল, রাগ করেননি তো? আমি আমার এসব ব্যাপারে বড় সেন্টিমেন্টাল।
তোগালিত্তি বলে, আপনি তো দেখি আমার সেই বৌ-এর অধম।
নক্শবন্দীও হাসির স্রোতে ব্যাপারটা লঘু করতে চাইল। কিন্তু পারল না। বরং তার অস্বস্তির রূপটাই প্রকট হয়ে ওঠে।
হাত ধুয়ে রুমালে মুখ মুছতে মুছতে বলে, আপনি আসলে ব্যাপারটই আলাদা করে ধরে তুলেছেন আপনার ডেসপ্যাচে। আসলে কি তাই? সত্যিকার যে যুগ, যা ইতিহাসের পথদর্শী তারই সন্ধান যদি না থাকল আপনার দেওয়া খবরে তাহলে থাকল কি?
হয়তো কিছু সমর্থনের আশায় চারদিকে তাকায় নক্শবন্দী। কিন্তু তেমন ফল হয় না। সবগুলো চোখ যেন তার এই ভাবপ্রবণতাকে কটাক্ষ করছে। তবু আগের কথার রেশ টেনে বলে নক্শবন্দী, এ শিলাখ-ে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমি অনেকদিন ধরে যা ভেবেছি বোধহয় সেটাই সত্যি। আরো মজার কথা কি জানেন, আমার জীবনের সঙ্গে তা যেন হুবহু মিলে যায়।
যে সাবজোয়ারী নক্শবন্দীকে সমীহ করে কম কথা বলে সেও জিজ্ঞেস না করে থাকতে পারে না, আপনার জীবনের সঙ্গে মিলে যায় মানে?
একদল ক্ষুধার্ত নেকড়ের পাল্লায় পড়েছে নিরীহ মেষশাবক। নক্শবন্দী সোজা হয়ে বসে। বলে, আসল কথা কি জানেন, প্রতœতত্ত্বে যেমন জীবতত্ত্বেও তেমনি একটা দুটো ভুলের জন্য মাশুল দিতে হয়।
সবাই উদগ্রীব হয়ে তাকে ঘিরে ধরে। নক্শবন্দী যেন কোনো রূপকথার গপ্প ফেঁদেছে।
নক্শবন্দী বলে, আমি তখন ডেরাডুনে। নতুন বিয়ে করেছি, যাকে বলে রীতিমতো সুন্দরী বৌ।
পাশের বাসায় থাকে এক আর্টিস্ট। মানে আপনাদেরই সমগোত্রীয়। ওই জার্নালিস্ট আর আর্টিস্ট একই কথা। যাক যা বলছিলাম। সেই আর্টিস্ট ছবি আঁকে কিনা জানি না। কিন্তু আঁকিয়ে হিসেবে বেশ নাম ডাক।
একদিন এলো আমার বাড়িতে। বৌ-এর সঙ্গে আলাপ হলো। অনেক কথাবার্তা হলো। বোঝেন তো আর্টিস্ট মানুষ, মন জুগিয়ে কথা বলতে ওস্তাদ। যাবার সময় আর্টিস্ট আমার হাত জড়িয়ে ধরে বলল, সত্যিকার সুখী পরিবার। আইডিয়াল কাপ্ল? যুগল দম্পতির একটা ছবি আঁকব। আপত্তি নেই তো?
আমার আপত্তি থাকবে কেন? খুশি হয়েছিলাম। বানুকে ডেকে বললাম, কি বলো?
সে তো হেসেই কুটি, আমার ছবি!
আর্র্টিস্ট বলে, শুধু আপনার নয়। আপনাদের দু’জনের।
কথাটা সেদিন আমাদের কারওই তেমন মনে হয়নি। আলাপের স্রোতে ভেসে আসা জীর্ণ পত্রের মতো, ভেবেছিলাম সে প্রসঙ্গে ও ইতি হবে। কিন্তু হলো না।
পরের রোববার আর্টিস্ট এলো তার ক্যানভাস আর তুলি নিয়ে। সঙ্গে স্কেচিং-এর খাতা।
বানু কাপড় কাঁচছিল।
বলল, আসুন তো কাপড়টা ছেড়ে।
আমি সবে বাইরে যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছি। আমাকে দেখে বলল, বাঃ আপনি কোথায় চললেন।
আমার একটা কোচিং ক্লাস নেবার তাড়া ছিল। বললাম, কলেজে।
সে কি! তাহলে যুগল-দম্পতির প্ল্যানটাই যে মাঠে মারা যায়!
বললাম, তাতে কি, বানুরটাই আঁকুন। তারপর আমার না হয় জুড়ে দেবেন।
প্রস্তাবটা তার মনোপুত হয়নি। তবু মেনে না নিয়ে উপায় নেই।
আমি বইপত্র ঘাটছি। এসিরীয় সভ্যতার ওপর সারগর্ভ আলোচনা, রোমানা সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও তার প্রভাব নিয়ে লেখা মোটা মোটা বই। ছবি-টবির দিকে মন দেবার অবকাশ আমার নেই। বছর গড়িয়ে যায়। ঠিক আগের মতো আর্টিস্টের ক্যানভাসে ধরা দেবার কথা মনে করলেই হাসি পায়।
বানু অবশ্যি মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দেয়।
আমলই দিই না সে কথায়।
তারপর কতদিন কেটে গেল মনে নেই। বাড়ি এসে দেখি কি কান্না বানুর।
বললাম, কী হয়েছে?
কাল রাতে হার্টফেল করে মারা গেছে আর্টিস্ট। ক’দিন ধরে নাকি শরীর ভালো যাচ্ছিল না। ডাক্তারের মানা সত্ত্বেও খাটুনির ফলে শরীর ভেঙে পড়ে।
বন্ধুবান্ধবরা শোকসভা করে বলল, ওর ছবির একটা এক্জিবিশন করা দরকার। এমন প্রতিভাবান শিল্পী সচরাচর চোখে পড়ে না।
বানুকে এসে বললাম সে কথা।
আশ্চর্য যে, বানু তার ঘোর ভক্ত, এক্জিবিশনে তার ভীষণ আপত্তি।
বললাম, কেন?
সে কথার জবাব না দিয়ে বানু বলল, এমনি।
সেদিনই আবিষ্কার করেছিলাম যুগল-দম্পতির ছবি। চমৎকার মানিয়েছিল বানুকে। তার সেই ফুটন্ত গোলাপ হাসিটা যেন এখনও মনে দাগ কাটে। এক মুহূর্ত তাকে থামিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করে আমীর, আর আপনাকেও নিশ্চয়ই অপূর্ব লাগছিল।
নক্শবন্দী আহত গলায় বলে, আমাকে? আমি তো ছিলাম না ওর পাশে।
তবে কে ছিল?
সেই আর্টিস্ট নিজেই।
নক্শবন্দী থামল। কারও মুখে কথা সরে না।
কিন্তু নক্শবন্দীই কথা বলল আবার, সেজন্যেই বলছিলাম সময় ও যুগ নিয়ে ভুল করতে নেই। অনেক মাশুল দিতে হয়। সেই প্রথম আলাপের যুগে রাজি হলে বানুর পাশে আমিই থাকতাম। সেজন্যে বলছিলাম মৌর্য যুগে গ্রিক যুগের স্বপ্ন, রোমান যুগে মোগল যুগের আকাক্সক্ষা বাতুলতা মাত্র। এক-একটা যুগই একরকম।
নক্শবন্দী কথা শেষ করলে তোগালিত্তি বলে, কিছু মনে করবেন না, আপনার স্ত্রী?
নক্শবন্দী জানালার বাইরে উদাস দৃষ্টি দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্মিত, øিগ্ধ হাসি হেসে বলল, ও তো পরের বছরই মারা গেল। তারপর, আর বিয়ে করিনি।
ছয়
আবেদ্রুমে সেদিন ঢালা বৃষ্টি। এ্যাস্বেস্টসের ছাদের ওপর অঝোর ধারায় কোনো একঘেয়েমি ছন্দের ঐকতান। জানালার কাচে বৃষ্টির ছাঁট। শিরশির হাওয়ায় ছিটিকিনি থেকে থেকে ঠক্ ঠক্ আওয়াজ করে ওঠে।
করিমবক্সের রান্নাঘর থেকে কড়ায়ে তেল ফোটার শব্দ। ডিম ভাজা হচ্ছে। বৃষ্টি-ভেজা সুপরিচিত ঘ্রাণে কেমন রসনা-তৃপ্তির আশ্বাস। সাঁই সাঁই স্টোভের মৃদু গর্জন।
খামোখাই ওপরের পাখা ঘুরছে। একা শুয়ে আমীর। কোনোমতেই ভুলতে পারছে না নক্শবন্দীর কাল রাতের কাহিনী। বরাবরই সেটা মনের আনাচে-কানাচে আনাগোনা করে।
এক মুহূর্ত মনে হয়, জীবন যেন স্থির। যেন স্থির ছিল। ভবিষ্যতেও থাকবে যেন এই মৃত্যু-নিথরতা।
এই সমাহিত শান্তির রাজ্যে পৌরাণিক ভগ্নস্তূপ থেকে কিছু খুঁজতে যাওয়াই যেন বৃথা, অর্থহীন। মানুষ এখানে নিজেই কেমন আত্মবিস্মৃত। উ™£ান্ত। সামান্য একটি উচ্ছ্বাসের তাড়নায় সে অনর্গল মনের গভীর থেকে খুঁজে পেতে তার মর্মপীড়নের কাহিনী শোনায়। যেমন শুনিয়েছিল কাল নক্শবন্দী। বোধহয় আবেদ্রুমেই এসব সম্ভব।
বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল এক অবসরে। যেন জানতেও পারেনি আমীর। কেমন থমথমে ভাব। নিস্তব্ধ দুপুরটা ফুঁফিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদিয়ে দিলো তোগালিত্তির মাউথ অরগ্যান।
তোগালিত্তি কেন এলো, এখানে? এদেশে, এই বিজনপুরীতে? কী দেখল সে? কী নিয়ে যাবে? না, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এমনি তার ব্যর্থ অভিযান। হিসেব নিকেশে বসবে যেদিন, সেদিন হয়তো লাভ-লোকসানের খাতায় তোলার মতো থাকবে না কিছুই। যে মাউথ অরগ্যানটা সঙ্গে নিয়ে এসেছিল, সেটাই নিয়ে যেতে হবে ফিরিয়ে। আমীরের চিন্তার জালে বাধা পড়ে। দড়াম করে দরজা খুলে যায়।
বর্ষাতি হাতে কে এসে ঢোকে। ছিপ্ছিপে, মোটা কাচের চশমা। দু’একটা চুলে বোধহয় পাক ধরেছে। তবু বয়েসের চেয়ে অনেক বেশি ভারিক্কি মনে হয়। খাকি প্যান্ট ফুলহাতা বুশশার্ট পরনে। বর্ষাতি কোথায় রাখবে তা নিয়ে কিছুক্ষণ ইতস্ততর পর ওটা আমীরের হাতে তুলে দিয়ে বলে, আমি এখানকার মিউজিয়ামের নতুন কিউরেটার। বুঝতে অসুবিধে হয় না আমীরের যে, ভদ্রলোক তার দর্শনপ্রার্থী নয়। বোধহয় ভুল করে আসা।
তবু আমীর একটা চেয়ার দেখিয়ে তাকে বসতে বলে।
তারপর বলে, আপনি নক্শবন্দীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?
ভদ্রলোকের বিস্ময়ের শেষ নেই, তাহলে আপনি?
আমার নাম আমীর। নক্শবন্দী পাশের কামরায়।
তাহলে কাজটা কেমন হলো! ছি ছি, ভুল করে আপনাকে অসময়ে বিরক্ত করলাম। ঘুমুচ্ছিলেন বোধহয়।
না না, তাতে কী হয়েছে, বসুন না।
না না। বসব না।
অথচ তেমন কোনো তাড়াহুড়োও লক্ষ করা গেল না।
কপালে বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির ছাঁট মুছতে মুছতে আমীরের দিকে তাকিয়ে বলে, আপনিও কি আর্কিওলজিস্টদের দলে?
সন্দেহটা কিছু অযাচিত নয়। মেষশাবকদের দলে মেষশাবক মনে হওয়াই স্বাভাবিক।
আমীর আমতা আমতা করে বলে, আমি এসেছি এদের সঙ্গে, বলতে পারেন গেস্ট হয়ে।
উজ্জ্বল আলোয় প্রতিভাত হয়ে ওঠে তার চোখমুখ। যেন নিজের সিদ্ধান্তের নির্ভুলতায় নিজেই পুলকিত, আচ্ছা বুঝেছি সেই ইতালীয় টুরিস্টের সঙ্গে বোধহয়।
তারপর পকেট থেকে একখানা সিগ্রেটের প্যাকেট বার করে তা থেকে একটা ধরায়। প্যাকেট টেবিলে রাখা দেশলাই চাপা দিয়ে। কোনো সরাসরি আমন্ত্রণ নেই। তবে ধূম্রপায়ীর তেমন ইচ্ছে হলে একটা তুলে নিতে পারে, ভাবটা এই। সিগ্রেটে দুটো টান দিয়ে নিজের মনগড়া সিদ্ধান্তের ওপর আলোচনা চালায় কিউরেটার, ফরেনারদের প্রাইভেট সেক্রেটারি, খুব ভালো কাজ। না না, মাইনে কড়ির কথা বলছি না। সে তো থাকবেই। শুনেছি যাবার সময় ভালো ক্যামেরা, হাতঘড়ি থাকলে দিয়ে যায় ‘চিপ’-এ।
তারপর ঝুঁকে আবার বলে, আমার কিন্তু একটা টেপ রেকর্ডারের বড় শখ ছিল। কিউরেটার আমীরকে ইতালীয় টুরিস্টের মাইনে করা তাঁবেদার মনে করেছে, ক্ষোভ সেজন্যে নয়। তার শেষের এই কথা ক’টি বর্শাফলকের মতো এসে বেঁধে।
মৃদু রাগের কৃত্রিম হাসিটা ফুটিয়ে বলে আমীর, সেরকম ভালো টেপ রেকর্ডার বা ঘড়ির খবর পেলে আপনাকে ঠিক ঠিক জানাব।
আলোচনা আর এগোয় না। নক্শবন্দী এসে ঢোকে তখুনি। তার মারফৎ জানা গেল ভদ্রলোকের একটা পৈতৃক নামও আছে – রজব আলী। এর আগে নানা জায়গায় ছিল। এবার এখানকার জাদুঘরের দায়িত্ব নিয়ে এসেছে।
নক্শবন্দী বলে, আজই চার্জ নিলেন তাহলে?
রজব আলী হেলে দুলে বসে। বলে, ফোরনুনেই চার্জ নিলাম।
অফিসের ব্যাপারে আমি বড় স্ট্রিক্ট।
নক্শবন্দী বলে, আমরা তো সব ভেবেছিলাম স্টেশনে যাবো। কিন্তু যা ঝড়-বৃর্ষ্টি। রজব আলী চোখ দুটো মার্বেলের গুটির মতো বর্তুলাকার করে বলে, তাই কখনও হয়? ডিউটি ফাস্ট। ছোটবেলা থেকে ওই আমার প্রিন্সিপাল। জানেন, আমাদের দেশের লোকদের কিছু হয় না কেন?
যেন এ প্রশ্নের জবাব আমীর বা নক্শবন্দী কেউই জানে না।
খানিকক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে থেকে নিজেই তার জবাবটা জুড়ে দেয় রজব আলী, তাদের সেন্স অব রেস্পন্সিবিলিটি বলে কিছু নেই, সেজন্যে। নক্শবন্দী কথার মোড় ঘুড়িয়ে বলে, প্ল্যানটা কি আজই আলাপ করব। না না, তার দরকার নেই। কালই আসবেন বরং অফিসে। অফিসিয়ালি ব্যাপারে একটু ডেকোরাম থাকা ভালো। তাছাড়া –
বোধহয় আমীরের দিকে ইঙ্গিত করেই পরের কথা ক’টি শেষ করে রজব আলী। তাছাড়া এসব স্কিম একটু কন্ফিডেন্সিয়ালি আলাপ করাই কি ভালো নয়?
নক্শবন্দীর প্রতিক্রিয়া বোঝা গেল না। তবে এটুকু বোঝা গেল, রজব আলী অতিমাত্রায় অফিসি। যেমন স্বভাবে, তেমনি কাজে, তেমনি চালচলনে।
তাহলে এখন ওঠা যাক।
বাইরে আবার বৃষ্টি নেবেছে।
নক্শবন্দী সাধাসাধি করে এখন কি যাবেন? বসুন। বাইরে কি বৃষ্টি দেখছেন না? বরং ভালো কফি আছে। এক কাপ দিতে বলি?
রজব আলী ঘড়ি দেখে, সরি, এটা আমার চা-কফি খাবার সময় নয়। আবার খাব পাঁচটায়।
একদিন না হয় একটু –
যেন কেউ তাকে দিয়ে মহাপাপের কাজ করিয়ে নিতে চাইছে, তেমনি ভাব দেখিয়ে জিব কেটে বলে, পাগল। একদিন করতে গেলে রোজই করতে হবে। যখন যে সময়, তখন সে কাজ। বুঝলেন না?
রজব আলীকে এ নিয়ে পীড়াপীড়ি করে লাভ নেই, বোঝে নক্শবন্দী। তাই চুপ করে থাকতে হয়।
নিজে থেকেই আবার কথা বলে রজব আলী। আমীরের দিকে তাকিয়ে বলে, রেস্ট হাউসে কোনো অসুবিধে নেই তো আপনাদের? কোনো কষ্ট হলে কমপ্লেন বুকে লিখবেন। আমি আমার এসব ব্যাপারে ভয়ানক স্ট্রিক্ট। রজব আলী উঠেই পড়েছিল। যেতে যেতে আবার ফিরে এসে বলে, আমি তো কাল থেকে অফিসে বেজায় ব্যস্ত থাকব। দরকার হলে টেলিফোন করবেন। নিন লিখে নিন আমার নম্বর, ফোর নাইন টু ওয়ান।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমীরকে টুকে নিতে হয়।
যেমন ঝড়ের বেগে এসেছিল, তেমনি ঝড়ের বেগে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায় রজব আলী।
খবর পেয়েছে রেস্টহাউসের বাবুর্চি, গার্ডনার, ওয়াচ এন্ড ওয়ার্ডের লোকজন, পাওয়ার হাউসের ফোরম্যান নতুন ইনচার্জ এসেছে। কেউ কেউ ছাতা এগিয়ে দিতে যায়, কেউ পোর্টফোলিও ব্যাগটা তুলে নিতে চায় হাতে। রজব আলী তাদের সবাইকে নিরাশ করে। কেননা তার ধারণা অফিসী নিয়েমে এগুলো ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার।
দেখা যায় বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কোনোমতে বর্ষাতিখানা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে দৃপ্ত সতেজ পায়ে ইউক্যালিপটাসবেষ্টিত উঁচুমতো টিলার দিকে চলতে থাকে রজব আলী। সেখানে একটা লাল রং-এর বাড়ি। বৃষ্টিতে পাহাড়চূড়া পথঘাট সবকিছু যেন স্বপ্নময় মনে হয়। আর সেই স্বপ্নময় পরিবেশে অযথা আমন্ত্রণের হাতছানি জানায় যেন ওই লাল রং বাড়ি।
কতক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল আমীর মনে নেই। একসময় মনে হলো খুট্ করে যেন ঘরের বাতি জ্বলে উঠল। আর পাহাড় চূড়ার বাড়ির চিমনি দিয়ে হাল্কা ধোওয়া কেবলই বৃষ্টির পানিতে ভিজে ভিজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
সাত
নক্শবন্দী যে ঘরে থাকে, সেটা নামমাত্র শোবার ঘর। আসলে ওটাও ছোটখাট জাদুঘর।
সাইটে পাওয়া টুকরো পাথরের কুঁচি, শিলালিপি, টোরাকোটা দিয়ে সাজানো। দেয়ালজুড়ে পৃথিবীর সভ্যতার ক্রমবিকাশের অনেকগুলো তথ্যবহুল চার্ট। এসিরিয়, রোমান, গান্ধার ঐতিহ্যের বিবরণী, সাল তারিখ তাতে।
তাছাড়া আতস কাচ। শিলালিপির লেখার মর্মার্থ করতে হয় যা দিয়ে খুঁতিয়ে খুঁতিয়ে। সবসময় সুরাহা যে হয়, তা নয়। অনেক খেদ থেকে যায়! ধরা-ছোঁয়ার রাজ্যে চিরন্তন লুকোচুরি। বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে নানা সংশয় ও সংঘাত। সেদিনও নক্শবন্দী সারা বিকেল ব্রোঞ্জের মুদ্রাখ- নিয়ে গবেষণায় মগ্ন। টেবিল লাইটটা নিচু করে দিয়ে তার প্রতিফলিত আলোয় বারবার ওটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে। কখনও তাক থেকে দশ ভল্যুম পা-িত্যের কোনো একটা তুলে নিয়ে চোখ বুলিয়ে নেয়। কখনও বা লন্ডনে তার ফার ইস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের থিসিসটা কাজে আসে।
নিঃশব্দে ঘরে এসে ঢোকে আমীর। এক মুহূর্ত তার মুখে কথা সরে না। নক্শবন্দী যেন আর নক্শবন্দী নেই। সেও জাদুঘরের একটি স্থবির মূর্তি। হঠাৎ সচকিত হয়ে নড়ে না বসলে হয়তো প্রাণহীন মমির মতোই মনে হতো তাকে। নক্শবন্দী কাজ গুটিয়ে রাখে। চশমা খুলে নেয়। গৌরবর্ণ প্রশস্ত ললাটে একগুচ্ছ চুল আলু-থালু হয়ে পড়ে থাকে। ভারি চোয়াল। বয়সের যত না, তারচেয়ে বেশি ক্লান্তির ছাপ মুখে।
কাজ করে পরিশ্রান্ত দেখেই বোঝা যায়। নক্শবন্দীও যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। এই অতর্কিত আগমন না হলে যেন ছেদ ঘটবার মতো আর কোনো অজুহাতই ছিল না।
চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে আমীর।
অনেকদিন হয়ে গেল। তেমন জুতসই খবর পাঠাতে পারেনি একটাও। বোধহয় সে কথা ভেবেই বলে, পেলেন কোনো নূতন মাল-মশলা? দি একটা ফিচার ফেঁদে।
নক্শবন্দী এক মুহূর্ত বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে থাকে ওর মুখের দিকে। অদ্ভুত লাগে এই খবরের কাগজওয়ালাদের ঔৎসুক্য। তাদের এই তাড়াহুড়ো। হঠাৎ জেনে নেওয়ার ব্যাকুল বাসনা। সময় নিয়ে অযথাই কাড়াকাড়ি। সে কথার জবাব না দিয়ে পাল্টা জিজ্ঞেস করে নক্শবন্দী, গত সপ্তাহে আপনার ফিচারের জন্য কী পাঠালেন?
আর বলেন কেন! আপনাদের পাল্লায় এসে হিমশিম খেতে বসেছি। আমার সাংবাদিকতার বিদ্যেতেও কুলোচ্ছে না। না হয় একটু-আধটু বানিয়ে বলা যায়, তার ওপর রং চড়ানো যায়। কিন্তু একেবারে হাওয়ায় কেল্লা বানিয়ে আর ক’দিন চলে?
তবু কী দিলেন বলুন না।
আবার একটু থেমে অন্য কথা পাড়ে নক্শবন্দী, কই আমাকে তো বাংলা শেখালেন না।
আমীর হেসে বলে, শেখাইনি ভালোই করেছি। পড়তে জানেন না বলেই মোটামুটি আমার ওপর ধারণাটা ভালো। নইলে –
নইলে কি।
নইলে স্রেফ আবহাওয়া আর প্রাকৃতিক দৃশ্যের ওপর পাঠানো ডেসপ্যাচ পড়ে ভীষণ হতাশ হতে হতো আপনাকে।
হঠাৎ কি মনে হওয়ায় চট্ করে উঠে দাঁড়ায় নক্শবন্দী। বলে, দেখেছেন, বসে আছি! আপনাকে এক কাপ কফি দেবার কথা পর্যন্ত মনে হয়নি।
সাবজোয়ারী ব্যাডমিন্টন খেলার জন্য একটা জায়গা বাছাই করে কোর্ট তৈরি করা যায় কিনা সে চেষ্টায় ছিল। এক রাজ্যি ধুলোমাখা হাতে একটা ঢাকা প্লেট নিয়ে এসে উপস্থিত।
শেষের কথাটা শুনতে পেয়েই বোধহয় বলে, তাহলে আমাকেও এক কাপ দিতে ভুলবেন না যেন। রজব আলী গিন্নী বড় কনসিডারেট। একই সঙ্গে দু’জনে তাকায় ওর দিকে।
সাবজোয়ারী প্লেটটা সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, এখুনি দিয়ে গেল। কি জিনিস ভালো করে দেখিও নি। নিশ্চয়ই –
আমীর ওপরের প্লেটখানা সরিয়ে দেখে।
তার মুখ চোখ উল্লসিত। ছানার তৈরি মিষ্টি। আর গোটা আটেক সিঙ্গাড়া। কড়াই থেকে ভাজা অবস্থায় এসেছে। এখনও গরম প্লেটটা।
নক্শবন্দী লাফিয়ে ওঠে। বলে কি, বেঙ্গলি সুইট্স!
তারপর একখানা মুখে তুলে দিয়ে বলে, যাই বলুন রজব আলী গিন্নী গ্রেট। নইলে ঠিক সময়ক্ষণ বিচার করে পাঠায় কেউ।
এসে জুটল তোগালিত্তিও। বলল, আগে এক্সপ্লেন করুন এগুলি কিসের প্রডাক্টস।
সাবজোয়ারী বলল, কেন, কাউ মিল্ক।
আইসি। রেসিপিটা কী।
জন জিজ্ঞাসু নেত্রে আমীরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করে।
আমীর বলে, ভারি ফ্যাসাদ হলো তো। বাঙালি বলে বাঙালিদের হাঁড়ির খবরও রাখতে হবে নাকি। আচ্ছা আবদার।
তোগালিত্তি শোনে না।
সে কেমন কথা। পুরোন এক হাজার বছর আগেকার জংধরা মূর্তি নিয়ে আপনাদের ঘুম হচ্ছে না। আর এ যুগের সদ্য ঘণ্টাখানেক আগেকার তৈরি জিনিসের উপাদান নিয়ে মাথাব্যথা নেই। বড্ড বেরসিক আপনারা। তোগালিত্তি গোগ্রাসে দুটো সন্দেশ সাবাড় করে।
লাভলি। লেডিশাস। বলেই হঠাৎ একটা কা- করে ফেলে।
আপনারা কেউ কিছু মনে না করলে অকেশ্যনটা একটু সিলিব্রেট করতে চাই।
তার বুক-পকেটের ভেতর থেকে কালোমতো চৌকুনো একটা বোতল বার করে দেখায়, পুরানো ওয়াইন এটা। এ্যানসেসট্রাল ইনহেরিটেন্স। সাতান্ন বছর ওয়াইন সেলারে ছিল। দেখেছেন কি ঝাঁজ আর রং। খুব স্পেশাল ব্যাপার না হলে বার করি না। থ্রি চিয়ারস ফর দি হস্পিট্যাবল লেডি। দু’ঢোক গিলে ছিপে দিয়ে আবার বোতলের মুখটা এঁটে দেয়।
বলে, এর আগে আর দু’বার খেয়েছিল। একবার যখন ওর বিয়ে হয়। আরেকবার যখন তার বৌ পালিয়ে গেল। আর এই আজ।
কফি এসে যায়।
সাবজোয়ারী একটা সধূম কাপ ওরদিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, এর পরও চলবে নাকি।
আলবৎ চলবে। আপনারা গিলবেন। আমি বসে বসে ধুঁকব নাকি?
কফি পানের ফাঁকে ফাঁকেই জিজ্ঞেস করে নক্শবন্দী তোগালিত্তিকে, আপনাদের রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিওলজির হেড কে এখন?
হবে কোনো দিক্গজ। কেন?
ভাবছিলাম তার কাছে একটা স্যাম্পল পাঠাব। এর আগে ডক্টর তুমি ছিলেন। এ ব্যাপারে তাঁর খুব ভালো পড়াশুনো ছিল।
তোগালিত্তি বলে, দোহাই আপনাদের। পুরোন জিনিস খুঁজে পেতে বার করলেন, সেটাই কি যথেষ্ট নয়? খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আবার তার সন-তারিখ বার করতে হবে?
নক্শবন্দীর বিরক্তি গোপন থাকে না। কাজের সমালোচনা তার আদৌ পছন্দ নয়।
বলে, দেখুন মাউথ অরগ্যান বাজানোর মতো সস্তা কাজ নয় এসব। তোগালিত্তিকে সহজে অপমান করা যায় না, বোঝা গেল সেদিনই। বলল, ভালো মাউথ অরগান বাজানো সহজ। কিন্তু সেই সহজ সুর যে কঠিন হৃদয় থেকে বেরোয়, সে হৃদয়ের সন্ধান আপনার ওই পাথর কুঁচি কুড়িয়ে বেড়ানোর চেয়ে অনেক কঠিন।
আমীর ব্যাপারটাকে সহজ করতে চায়। বলে, আমার মনে হয় এরপর সবাই মিলে আমাদের একদিন রজব আলী এন্ড কো-কে নিমন্ত্রণ করা দরকার।
কথাটা বোধহয় নক্শবন্দীরও মনোপুত হলো। বলল, তা ঠিক। কিন্তু রজব আলী গিন্নীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রেস্টহাউসের বাবুর্চি পেরে উঠবে কি? তোগালিত্তি প্রস্তাব করে, খুব হবে। মনে করুন আপনি সেই দু’হাজার বছর আগেকার সেই চুলোর মতো যেটা পেয়েছিলেন সেটা দিয়ে রান্না করলেন। আমার কাছে প্রাচীন রেসিপি লেখা আছে। আমার বৌ বলত সে রেসিপি নাকি রোমানদের খুব পছন্দ ছিল।
সেসব জিনিস এখন পাওয়া যাবে কোথায়? প্রশ্ন করে নক্শবন্দী।
তাতে কি! একেবারে খাঁটি নাইবা হলো। একটু না হয় হেরফের হবে। সব জিনিসই আজকাল ভেজাল হচ্ছে। আমি চমৎকার বিফ স্টেক করব, জুলিয়াস সিজার স্টাইল।
আমীর বসে বসে ওদের কথা শুনছিল। বলল, কিন্তু এত সাধ্যসাধনায় কী লাভ?
লাফিয়ে ওঠে তোগালিত্তি, লাভ না মানে? রীতিমতো একটা প্রতœতাত্ত্বিক ভোজ। আশাকরি নক্শও খুশি হবেন।
তোগালিত্তি নক্শবন্দীর পুরো নাম উচ্চারণ করতে পারে না। নক্শবন্দী নিজেও প্রস্তাব শুনে কম হাসল না।
এবার আমীরের দিকে তাকিয়ে বলে তোগালিত্তি, পাব্লিক রিলেশন্সের কাজটা তুমিই করবে। মি. এন্ড মিসেস রজব আলীকে খবর দেবার ভার কিন্তু তোমার।
আট
রজব আলী অফিসে ছিল না। সকাল সকাল বেরিয়েছে রাউন্ডে। সাইটে নতুন লোকদের কাজে লাগানো হয়েছে। তারা ঠিকমতো আসে কিনা তার তদারক দরকার। সেজন্যেই বিশেষ সারপ্রাইজ ভিজিট।
হঠাৎ মনে পড়ে রজব আলীর দেওয়া টেলিফোন নম্বরের কথা। অবশ্যি মনে না থাকলেও ক্ষতি ছিল না। এ রাজ্যের যিনি সর্বাধিপতি তার টেলিফোন নম্বর জেনে নিতে অসুবিধের কিছু নেই।
টেলিফোন করতেই ওধার থেকে মহিলা কণ্ঠের আওয়াজ। এখানে আসার পর এই তিন মাসে প্রথম মহিলা বাঙালি কণ্ঠ।
কে কথা বলছেন, জিজ্ঞেস করে আমীর।
মিসেস রজব আলী। কেন, কিছু বলতে হবে?
হ্যাঁ, অসুবিধে না হলে রাতে আমাদের এখানে খাবেন আপনারা। সামান্য আয়োজন।
ইচ্ছে করেও যেন প্রতœতাত্ত্বিক ভোজের কথা উল্লেখ করা গেল না।
জবাব এলো, ওঁকে বলে দেবো।
আচ্ছা।
এখানেই হয়তো শেষ হয়ে যেত কথা। কিন্তু – হ্যাঁ সেই কিন্তু নিয়েই এ গপ্প।
নিজের এধার থেকে লাইনচ্যুত হওয়ার অপরাধে অপরাধী হবে না, যেন সে ভয়েই টেলিফোনটা আঁকড়ে থাকে। মিসেস রজব আলী যদি এখুনি কোনো ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে আলাপ সাঙ্গ করে, সে আলাদা কথা।
কি জানি কী ভাবছিল মিসেস রজব আলী।
বলল, এটা কি সেদিন বিকেলে সেই যে কি পাঠিয়েছিলাম, তারই পাল্টা জবাব?
একটি কথার তরঙ্গে আরেকটি তরঙ্গ। এমনি করে চলে আলাপের মৃদুমন্দ স্রোত।
বোধহয় তাকে খুশি করার জন্যেই একটু বাড়তি কথা বলে আমীর, আপনার সেদিনের পাঠানো জিনিসগুলো তৃপ্তির সঙ্গে খাওয়া গেল। বেশ হাত কিন্তু আপনার।
ধন্যবাদ।
তারপর যেন তাড়াতাড়ি এ প্রসঙ্গের ইতি করার জন্যে আবার বলে মিসেস রজব আলী, কী বলব উনি এলে?
ওই তো, যা বললাম।
কে ফোন করেছিল বলব?
নিজের পুরো নামটা জানিয়ে বলে, বলবেন আমীরুল ইসলাম। এ নামে যদি না চেনেন, বলবেন নক্শবন্দীর গেস্ট।
কি যেন হয়ে গেল।
হঠাৎ যেন আলাপের স্রোত একটা পাঁকে পড়ে মুখ বুজে রইল।
কিছুক্ষণ পর আবার প্রশ্ন করে মিসেস রজব আলী, আচ্ছা আপনি কি – না থাক।
বলুন না, পীড়াপীড়ি করে আমীর।
ডলিকে চেনেন?
হ্যাঁ, আমার বোন। কেন?
এমনি।
মনে হলো এরপর একটা কেমন একটানা ভারি নিশ্বাস। বা অনেকক্ষণ কথা বলার পর স্বাভাবিক নিয়মে একটু ক্লান্তি। কোনোটা বোঝা গেল না। খুট্ করে ওধার থেকে টেলিফোন বন্ধ হয়ে যায়।
হ্যালো, হ্যালো।
তবু আরেকবার নি®প্রাণ টেলিফোনকে প্রাণচঞ্চল করে তুলতে চায় আমীর।
কথা বলে এবার অপারেটার, লাইন ডিসকানেকটেড। আই এ্যাম সরি স্যার।
আকাশ সেদিন স্বচ্ছ, পরিষ্কার। কিন্তু আমীরের মনে কিছু নিবিড় সন্দেহ, প্রত্যাশা আর বেদনার কালো মেঘ জড়ো হয়! যেন সে নিজেই সে মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে। খুঁজেই পায় না। তারপর যখন আবার এ দেহ স্পর্শ করে, হাতের টকটকে শিরেটা অনুভব করে, মনে হয় এসব অবান্তর কল্পনা। মিথ্যে। সে ঠিক আগের মতোই আছে। সবকিছুই আগের মতো।
এক মুহূর্ত কি যেন তার মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল মৃত্তিকাগহ্বর থেকে পাওয়া প্রাগৈতিহাসিক শিলাখ-ে উৎকীর্ণ যে আয়তচক্ষু মেয়েকে দেখেছিল, স্থান, কাল ও পাত্রের অপ্রতিরোধ্য প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে সে-ই এসেছে। ধরা দিয়েছে। কি আশ্চর্য! তার নিশ্বাস, তার ধোঁয়া থেকেই যেন আজকে রাতের কুয়াশা। আর সেই কুয়াশা থেকেই এত মেঘ। এত রহস্যজাল।
পরমুহূর্তেই মনে হয় নক্শবন্দীর এই শিলাখ- হিম হয়ে গেল। পাথর হয়ে গেল। সব যেমন ছিল তেমন আছে। এ-সবই তার কল্পনা। মনগড়া ভাবনা।
ওই তো তোগালিত্তির জুতোর আওয়াজ ক্রমশ দরজার কাছে এগিয়ে আসে।
একটা ঝুড়িতে কিছু মশলা তরিতরকারি।
ঢুকেই বলে, জানো এ অজপাড়াগাঁয়ে রেসিপির জিনিসগুলো পাওয়া গেল না। তোমাদের রোম্যান চপ্টা খাওয়াতে পারলাম না। প্রাচীন থাক, এ যুগের একটা রেসিপি দিয়েই তৈরি করব। করিমবক্সকে সেরকমই বলে দিয়েছি।
আমীরের মনে হয়, এও যেন কোনো ব্যর্থ চেষ্টা। কিন্তু তাকে নিরুৎসাহ করতে ইচ্ছে হয় না।
মৃদু হেসে বলে, এ নয়া রেসিপি মুখে রুচবে কিনা সেটা জিজ্ঞেস করলে ভালো হতো না?
তোমাকে তো টেলিফোন করতে বলেছিলাম।
করেছিলাম।
তারপর?
যেন আসামির ফাঁসি হলো কিনা জানার আগ্রহ।
আমীর জানায়, রজব আলী বাসায় ছিল না।
তাতে কি, তাঁর স্ত্রীকে বললেই হতো।
বলেছি।
তোগালিত্তি আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠে।
তবে তো ঠিকই করেছ। আর কনফার্মেশনের কি দরকার।
ইতস্তত করে তার সন্দেহের কথাটা না বলে পারে না, তবু আমার কি মনে হয় তোগালিত্তি, আজকের ব্যাপারটা জমবে না।
তার মানে?
ওরা হয়তো নাও আসতে পারে। অন্তত ওর মিসেস আসবে না বলেই আমার বিশ্বাস।
কী করে জানো?
জানি না। কিন্তু তাই মনে হয়।
তোগালিত্তি এক মুহূর্ত ওর দিকে হতভম্বের মতো তাকিয়ে থাকে।
তারপর বলে, দূর ছাই। তুমিও যেমন। আচ্ছা আমি নক্শবন্দীকে দিয়ে আবার টেলিফোন করিয়ে দিচ্ছি।
তা করাও। ফল হবে না। মিসেস আসবে না।
তোগালিত্তি বলে, এ তোমার মনগড়া।
মনগড়া? আশ্চর্য হয় আমীর।
কোথায় তার মনের সত্যি কথাটা যেন ধরে ফেলেছে তোগালিত্তি। সামনে ঝুঁকে বলে, মনগড়া কেমন করে জানেন?
জানি কই। আমার মনে হলো।
যেন আশ্বস্ত হয় আমীর, তাই বলুন মনে হয়।
নয়
ঠিক যা ভেবেছিলাম তাই। রজব আলী পতœী এলো না। অথচ কাঁটায় কাঁটায় এসে হাজির রজব আলী নিজে। সঙ্গে একটা থার্মোস।
সবাই অবাক হয়। জিজ্ঞেস করে, ওটা আবার কেন?
লজ্জা পাবার লোক নয় রজব আলী।
বলে, কেন বলিনি বুঝি। আমি সেদ্ধ না করে পানি খাই না। কিন্তু অমন অনুরোধ তো আর যেখানে সেখানে করা যায় না। তাই সঙ্গে করেই নিয়ে আসি।
আপনার মতো কনসিডারেট লোক হয় না, মাঝখানে থেকে ফোঁড়ন কাটে তোগালিত্তি।
হয়তো নক্শবন্দী আর সাবজোয়ারীও যোগ দিত। কিন্তু সিনিয়র অফিসারের বিশ্বাসের এই সূক্ষ্ম ক্ষেত্রটি নিয়ে আলোচনা করা ঠিক হবে না। মনে করেই ক্ষান্ত দেয়।
অনেকক্ষণ পর, সবাই যখন একথা সেকথা আলোচনায় ব্যস্ত রজব আলী কথায় কথায় জানায়, আমার স্ত্রী আসতে পারলেন না। ওঁর শরীর ভালো নেই।
তারপর একসময় আমীরের দিকে তাকিয়ে বলে, আপনার বোন নাকি ওর সঙ্গে পড়ত। কি আশ্চর্য বলুন তো। কোথায় মানুষের সঙ্গে মানুষের পরিচয়ের সূত্র।
নক্শবন্দী সায় দিয়ে বলে, ঠিক কথা। আমাদের আর্কিওলজিতেও তাই। হারাপ্পা, মহেঞ্জদারো, ইলোরা, ময়নামতি, অজন্তা। বিভিন্ন কালের, বিভিন্ন যুগের। এগুলোর উৎসস্থল এক নয়। কিন্তু ভিন্নও নয়। রজব আলী ব্যাপারটা শুনল বলে মনে হলো না। অন্তত এ ধরনের আলোচনায় তার বিশেষ একটা আগ্রহ নেই। দেখলেই বোঝা যায়।
সাবজোয়ারী ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছিল। রজব আলীকে হাই তুলতে দেখে বলল, তাহলে খাবার দিতে বলি।
যেন এই মোক্ষম পর্বের জন্যেই এতক্ষণ অপেক্ষা। ডান হাতের আস্তিন কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিয়ে বলে, তা মন্দ হয় না। রাত ন’টা বাজে। আপনাদেরও দেরি হচ্ছে নিশ্চয়ই।
তোগালিত্তি বলে, আমি তো দেরি করেই খাই। ঘড়ি দেখে খাবার অভ্যেস নেই। বরং উল্টো।
রজব আলী প্রশ্ন করে, তার মানে?
খেতে বসলে বুঝি সাড়ে দশটা বাজা উচিৎ। অনেক দিন সেভাবেই ঘড়ি মেলাই।
কি সাংঘাতিক কথা!
রজব আলীর দিকে মিটিমিটি তাকিয়ে বলে তোগালিত্তি, তারচেয়েও সাংঘাতিক ব্যাপার কি জানেন, দেখা যায় তাতে দু’চার মিনিটের বেশি গরমিল হয় না।
সাধারণত এসব কথায় রজব আলীর উৎসাহ থাকার কথা নয়। কিন্তু টুরিস্ট বলে তার অমিতবিক্রম উপদেশ বিতরণ ক্ষান্ত থাকে। তবু খেতে খেতে বলে রজব আলী, নক্শবন্দী একে দিয়ে এখানে একটা বক্তৃতা দেওয়ালে ভালো হতো না?
কাঁটাচামচ পড়ে যাবার জোগাড় তোগালিত্তির, আমাকে দিয়ে বক্তৃতা! রজব আলী যেন আহতই হয় মনে মনে, কেন ফরেনার্সদের বক্তৃতা প্রায়ই এ্যারেঞ্জ করা হয়ে থাকে। সে বছর কেনিয়া থেকে এসেছিল লেপয়ার্ড হান্টার সার ক্রিস্টোফার হিউ। আগেও অনেকে এসেছে।
তোগালিত্তি বলে, তাদের বলার ছিল। আমার কিছু নেই।
এ একটা কথা হলো; আপনারা এক্সপেরিয়েন্সড্। কত দেশ ঘুরেছেন।
আমার এক্সপেরিয়েন্স ভালো লাগবে না কারও মিঃ রজব আলী। কত দেশ ঘুরেছি, যত ভাষা শুনেছি সবগুলো যদি জড়ো করে শোনাতে পারতাম দেখতেন সব লোকেরই বলবার কথা প্রায় একই।
সাবজোয়ারী বলে, সে কী করে হয়?
রজব আলী চটে গিয়ে বলে, পুরোন কথাও নতুন করে বলা যায়।
নাঃ, নতুন করে বলার কিছুই নেই। সে চেষ্টা তো ক্ষুদে সাহিত্যিকরা অহরহই করছে। আমার নাক গলিয়ে কি লাভ? সাবজোয়ারী যোগ দেয় আবার, তাই বলে বলতে চান দেশ-বিদেশে এ্যাডভেঞ্চার হয় না? আগুন লাগলে লোক লাফ দিয়ে বাঁচে না, ঝড় হলে আশ্রয় খোঁজে না বা ভূমিকম্প হলে আর্তনাদ তোলে না?
তোগালিত্তি হেসে বলে, আমিও তো সে কথাই বলছি। এত হাজারো বছর ধরে একই রকম হচ্ছে। আপনার অভিজ্ঞতা আর আমার অভিজ্ঞতা কি এ ব্যাপারে এমন কিছু আকাশ-পাতাল তফাৎ হবে? হবে না।
চরম অপমানিত বোধ করে রজব আলী তোগালিত্তির কথায়।
যেন বেশ খানিকটা ভেবেই তাকে পরের কথা ক’টি বলতে হয়, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ম্যাগাজিনের নাকি সব সত্য ঘটনা ছাপা হয়। আপনাকে এক বছরের জন্যে। সাব্সক্রাইব করিয়ে দেবো। আমি যেমন বলতে পারব না, তারচেয়েও ভালো করে তারা বলে।
আমীর কোনো কথা বলছিল না। ভাবছিল তোগালিত্তির কথা সত্যি হলে তার ভাত জুটবে না। দুনিয়ার সবকিছুই যদি এক, তার যদি কোনো হেরফের না থাকে, তাহলে যে সাংবাদিককুল মাঠে মারা যাবে। ভাগ্যিস তোগালিত্তির মতো এমন গদ্য লোক খবরের কাগজ চালায় না। তাহলে কবে ব্যবসা পাটে উঠত।
এ সপ্তাহে ফিচারের জন্য কোনো নতুন লেখা জোগাড় করতে পারেনি। না, রজব আলী বনাম তোগালিত্তির ওপরই একট কিছু দাঁড় করিয়ে দেবে। মন্দ জমবে না। অবশ্যি এসব লঘু চিন্তাকে ছাপিয়ে একটি অস্বস্তিকর উপলব্ধি তাকে বারবার পীড়িত করে। আজকের সমস্ত উৎসাহ, সব আয়োজন যেন অর্থহীন। রজব আলী, নক্শবন্দী, সাবজোয়ারী, তোগালিত্তি – এরা সব ছায়ামূর্তি। তাদের শুধু চেয়েছিল পার্শ্ব চরিত্র হিসেবে। আজকের আসরে প্রধান নায়িকা যে হবে ভেবেছিল, যে এলে সে খুশি হতো, সে কি ইচ্ছে করেই এলো না? আমীরের স্থির বিশ্বাসের তরী ভরাডুবি করার জন্যেই কি। এ নিশ্চয়ই মমত্ববোধের অভাব। শারীরিক অস্বাচ্ছন্দ্য, একটা অজুহাত। চিরকালই যা বলা হয়ে থাকে আর চিরকালই যেটা মেনে নিতে হয়।
সাবজোয়ারীর চোখ এড়ায় না। আমীর স্যালাডের বাটি থেকে রক্ত বিট তুলে নিয়ে কার হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত করার মতো তা কাঁটায় বিদ্ধ করছিল বারবার। যেন নিছক ভদ্রতার জন্যেই টেবিল আঁকড়ে থাকা। নইলে তার এতটুকু আগ্রহ নেই।
সাবজোয়ারী বলে, এত আয়োজন করে আপনিই নিজেই খেলেন না, কী ব্যাপার?
আমীর হাল্কা রসিকতার আমেজ আনতে চায়। আবার নিজের কাছেই নিজে ধরা না পড়ে, সে ব্যাপারেও সচেতন।
বলে, অমন কাঁচা ছেলে আমি নই। কুইক এ্যাকশনে বিশ্বাস করি। রিপোর্টার মানুষ। শর্টহ্যান্ডে আমাদের জুড়ি নেই। যেমন লেখায়, তেমন খাওয়ায়। সকলের সঙ্গে সঙ্গে রজব আলীও হো হো করে হেসে ওঠে। এই বোধহয় প্রথম কেউ তাকে হাসতে দেখেছে।
বেশ বলেছেন। এখন চটপটে লোকই আমাদের দেশে দরকার। বলেই চলেছে রজব আলী, আমাদের দেশটা বড় স্লো। যেমন আমরা, তেমনি আমাদের কাজ। গতি বলে কোনো জিনিসই নেই। এজন্যেই সহজে প্রগ্রেস হয় না। একসময় কথা ছেদ পড়ে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হৈ হৈ করে ওঠে রজব আলী, ওহো দশটা! তাহলে তা আমাকে উঠতে হয়। এ্যাকচুয়ালি একটু দেরি হয়ে গেল। দশটায় আমি ঘুমুই।
সময়-কৃপণ লোকটিকে দেখে মনে মনে কেমন গর্জায় তোগালিত্তি। বলে, আপনার সময় জানা থাকল। ভবিষ্যতে ডাকলে আপনার আজকের এই পনেরো মিনিট পুষিয়ে দেওয়া যাবে।
রজব আলী সে কথা শুনল কিনা বোঝা গেল না। প্রায় কাউকে কিছু না বলেই থার্মোসখানা নিয়ে উঠে পড়ে। তিনজন তাকিয়ে দেখে রজব আলী বড় রাস্তা ছেড়ে বরাবর কোনাকুনি হাঁটতে শুরু করেছে। যদিও যেতে হলো কয়েকটা কাঁটা গাছ ডিঙিয়ে। তবু সে পথ যেতে কিছু কম সময় লাগে।
দশ
রেস্টহাউসের টেলিফোনটা খাবার ঘরে। এ রাজ্যে এ ধরনের একটা কিছু নিছকই বিলাস বস্তু। কতকটা বালুভর্তি লাল বালতির মতো। আগুন নেবানোর প্রয়োজনে যা সাজানো থাকে। কোনোদিন কাজে আসবে, কিংবা আদৌ এসেছিল কিনা সন্দেহ।
আসলে আগে টেলিফোন এখানেও ছিল না। আর কেইবা ভেবেছিল একটা মিউজিয়াম হবে এ জায়গায়। এমন কিছু নামকরা জায়গা নয়। পর্যটকরা এসব জায়গার কথা ভুলেও স্মরণ করে না। ওয়ালি খান বলে এক ভদ্রলোকের মাথায় ঢুকেছিল এক নেশা। তার বাড়িটা কালক্রমে এক এ্যান্টিক শপ হয়ে ওঠে। টাকা-পয়সার অভাব নেই। বিয়ে-থা করেনি। ওই একটাই শখ। দেশ-বিদেশের টুকিটাকি জিনিস কিনে ঘর সাজানো। কিন্তু বেচারী ওয়ালি খান ঘরটাই সাজিয়ে গিয়েছিল, তার সাজানো ঘর দেখাশোনার কেউ ছিল না। ওয়ালি খান মারা যাবার পর তার দুর্মূল্যে সংগ্রহ লোপাট হতে বসেছিল। তখুনি কথা উঠল একট মিউজিয়াম গড়ার। মরিসনের তৈরি রেস্টহাউসের লাগোয়া তৈরি হলো নতুন দালান আর লোকজনদের কোয়ার্টার। আবেদ্রুমও কাছাকাছি। তাই সেখানকার কাজের তদারক এখান থেকেই হয়। দেখতে দেখতে মিউজিয়ামে টেলিফোন, বিজলি আলো সবই এলো। একটি নীরব উপেক্ষিত জনপদ যেন জাতে উঠল।
রেস্টহাউসের টেলিফোন বড় বেশি ব্যবহার হয় না। অমন জরুরি লোকের আনাগোনাই বা কই। ছোট চৌকুনো টেবিলে ওটা পড়ে থাকে এক কোণে। কাউকে হঠাৎ ঘুম থেকে তুলে বিরক্ত করে না। ঘুমকাতুরে লোককে কাঁটায় না। দিনে দুপুরে হৈচৈ করে না। ওটা যেন কারও শান্ত পোষা বেড়াল। তবু যখন ঘণ্টা বেজে উঠে, মনে হয় অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে। পোষা বেড়ালটার লেজ ধরে টেনেছে কেউ। প্রথম এসে ধরে করিম বক্স। তারপর ডাকে নক্শবন্দীকে। নক্শবন্দী অনভ্যস্থতায় অহেতুক চিৎকার করতে থাকে, হ্যালো, হ্যালো। এতকিছুর পর যখন শোনে রং নম্বর ভীষণ হতাশ হতে হয়।
কখনও অবশ্যি কিউরেটার কথা বলে। কম কথার লোক। মাপজোঁক জীবনের সব কিছুতেই। বড়জোর কাউকে ডেকে পাঠায়। একটা জরুরি ফাইল সম্পর্কে মতামত জানতে চেয়ে।
রজত আলীদের আমন্ত্রণ জানানোর কাজে ওই যে একবার ব্যবহার হয়েছিল, তারপর বহুদিন ওটা ছোঁয়া হয়নি।
সেদিন দুপুর দুপুর টেলিফোনটা প্রগলভ হয়ে ওঠে। একটানা আর্তনাদ জানায়। যথানিয়মে করিম বক্সকেই যেতে হয়। পূর্ব নিয়মেই নক্শবন্দী আসে। তারপর সেই আবার আমীরের দরজায় টোকা দিয়ে জানায়, আপনার ফোন। কোনো ভদ্রমহিলা বোধহয়।
এ পা-ববর্জিত রাজ্যে যেচে টেলিফোন করার মতো একটি মহিলা যেন প্রার্থনাহীন অনুগ্রহ ও অনুকম্পা লাভের মতো। অপ্রত্যাশিত অথচ আকাক্সিক্ষত শ্রাবণের বর্ষণের মতো।
টেলিফোনে কান লাগিয়ে ভীরু ভীরু নিশ্বাসের আওয়াজটা শোনে প্রথম। তারপর নিজের নাম জানিয়ে মুহূর্ত গোনে শ্বাসরুদ্ধ প্রতীক্ষায়।
সন্দেহ নেই মহিলার কণ্ঠস্বর।
ওপার থেকে কণ্ঠস্বর শোনা যায়, চিনতে পারলেন?
এবার বিস্ময়টা আর আগের মতো থাকে না। রজব আলীর স্ত্রীর সাথে সেদিনই কথা হয়েছে।
আমীর বলে, পেরেছি বলেই তো মনে হচ্ছে।
ছাই পেরেছেন।
এত সহজ করে, এত আবদারের সুরে, এত প্রীতির ঝঙ্কার গলায় এনে যে এমন তৃপ্তির তিরস্কার দিলো, সে কি তাহলে –
তার সন্দেহটা যেন এখুনি সংশয় মোচনের দায়মুক্ত হতে চায়।
আমীর আবার বলে, বলেই ফেলুন না নামটা আপনার।
তবু একটু রহস্য। তবু একটু কৌতুক।
আসল নাম বলব, ওপার থেকে জবাব আসে, কোনটা আসল ভাবছি। এখন যা বলে আমাকে চেনেন না একদিন সে নামে আমাকে চিনতেন। এতদিন ধরে যে আকাক্সক্ষা দুরু দুরু করেও ভরসার তীর খুঁজে পাননি, তা আজ যেন নোঙ্গর করার একটি নিরাপদ ঠাঁই পেয়েছে। এই পরমাশ্রয়ের ঠাঁই তার না চেনবার কথা নয়।
পর্বতপ্রমাণ অসহিষ্ণুতা তাকে দিয়ে যেন অনর্গল কী সব কথা বলাতে চায়। আশ্চর্য, সেদিনও কথা বলেছে রজব আলী পতœীর সঙ্গে। অথচ, সেদিন এসব মনেও হয়নি। আজ মনে হচ্ছে টেলিফোনকারিণীর পরিচয়, শুধু একটি নামেই নয়। সে যেন চেনা একটি জীবনের ধূসর স্মৃতি। আবেদ্রুমের মতো অত পুরোন নয়। কিন্তু সময়ের ধুলো যেমন জমেছে আবেদ্রুমের ওপর, তেমনি স্মৃতির কুয়াশা এ নামের ওপরও। আবার শুধু একটি নামই তো নয়, শুধুই তো একটি স্মৃতি নয়, হঠাৎ আলোর ঝলকানিও নয়। টেলিফোনের ওপারে যেন মিতালির কলতান। বড় নাটকীয় শোনাল আমীরের পরের কথা ক’টি, কেন যেন সেদিনও মনে হচ্ছিল, তুমি সেই নীলা।
মিথ্যে কথা। কখ্খনো মনে হয়নি। কই সেদিন তো কিছু বলেননি। যাকগে সে কথা। তারপর?
সত্যি তো, তারপর কী বলবে। সেদিন যেমন সহজ ছিল, যেমন গড়গড় করে বলতে পারত আজও কি তা পারে। পারা উচিত?
রজব আলী পতœী ওরফে নীলাই আবার প্রশ্ন করে, কতদিন হলো এসেছেন?
অনেক দিন।
ভালো। আর তুমি?
এই তো সেদিন।
একটা উচ্ছৃঙ্খল অভিমানকে অনেকখানি ধাতস্থ করে বলে আমীর, এতগুলো বছর। এতগুলো দিন! একবারও খোঁজ নিলে না।
ওপক্ষ নীরব।
আমীর ব্যাকুল হয়ে ওঠে, কি শুনছ না? হ্যালো।
শুনছি, বলুন।
কেমন ছেলেমানুষের মতো অভিমান। নিজের কাছেই লজ্জা পায় আমীর। হয়তো আর কথা নেই। বলার মতো কিছু নেই। শোনার মতোও নয়। নীলাই আবদার করে, কই একবার আসবেন না, কেমন সংসার করছি দেখতে?
আসব।
নীলা বলল, যে-কোনোদিন সকালের দিকে আসুন না। সাড়ে ন’টা থেকে এগারোটা। তারপর তো রান্নাবান্না, ঘর-সংসার। ঠিক ঠিক আসছেন তো?
আসব।
যে পথ দিয়ে দু’হাজার বছর আগে যাওয়া যায়, সে পথ দিয়ে বারো বছর আগে যাওয়া কঠিন কিছু নয়। আবেদ্রুমের আকর্ষণের চাইতে নীলার আমন্ত্রণ কিছু কম হৃদয়গ্রাহী নয়।
বোধহয় নীলার তাড়া ছিল। বলল, এখন ছাড়ি তাহলে। আসবেন কিন্তু। হঠাৎ চেতনার রাজ্যে একটি সুন্দর স্বপ্ন, কিছু মিষ্ট কলগুঞ্জন আর হৃদয়ের উষ্ণ আবেগ ছড়িয়ে কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেল। টেলিফোন রেখে দেয় আমীর।
মনে মনে যা নিয়ে কল্পনা করেছে অথচ কোনোদিনই সম্ভব হবে না ভেবেছিল, তা আজ ঘটল কেমন করে। এবং যদি ঘটলই তবে উল্লাসের চিৎকার তুলতে পারল না কেন। বিস্ময়ে আকুল হলো না কেন। শুধু একটা শিহরণ তুলল মাত্র। তাও তার দেহে। কণ্ঠে হলো না তার কোনো প্রতিধ্বনি।
এতক্ষণ তন্ময় হয়ে কথা বলার সময় লক্ষ করেনি, পেছনে নক্শবন্দী দাঁড়িয়ে। বোধহয় কেবল দাঁড়িয়ে নয়। অনেকক্ষণ টেলিফোনের প্রতীক্ষায় পায়চারি করছে ঘুরসুদ্ধ।
আমীরকে টেলিফোন ছাড়তে দেখে বলল, বেশ লম্বা কনভারসেশন!
বিনায়বনত হয়ে বলে আমীর, হ্যাঁ, বেশ একটু লম্বাই হয়ে গেল।
ভাবছিলাম বোধহয় টেলিফোনেই খবর পাঠাচ্ছিলেন আপনার কাগজে।
আমীর বলে, না তা হবে কেন।
নক্শবন্দী আশ্বস্ত হয়েছে এমন ভাব দেখিয়ে বলে, আমিও সে কথাই বলছিলাম সাবজোয়ারীকে। আগে কিউরেটারের অনুমতি না নিয়ে ট্রাঙ্ককল করার নিয়ম নেই।
বোঝা গেল ব্যাপারটা নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা হয়েছে। বলে দেবে নাকি তার কথা, সেই কাকলিমুখর মহিলার, যাকে আবিষ্কার করল খানিকক্ষণ আগে। অথচ যে তার জীবনে এসেছিল একযুগ আগে। আমীর বলল, ট্রাঙ্কল করব কেন? আর যদি করিই জানিয়েই করব আপনাদের।
না না, সে কথা বলিনি। থাকগে, যাবেন নাকি সাইটে?
ইচ্ছে ছিল না। যদিও এটাই তার মুখ্য কাজ। যদি এক মুহূর্ত আগে এই মুখ্যকাজ গৌণ মনে হয়েছে। কিন্তু সে কথা সবাইকে বলা যায় না। একটু একটু শীত করছিল। পুলওভারটা সঙ্গে নিয়ে নিল আমীর। আজ বেশি কথা হলো না কারও সঙ্গেই।
মাটি খুঁড়ে নাকি একটা ভগ্ন প্রাসাদের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। কণিঙ্ক রাজ্যের কোনো বংশধর এখানে এসে রাজত্ব করে গেছে এক শতাব্দী। তারই কিছু স্মৃতিবিজড়িত চিহ্ন।
রাজমহিষীর শয়নকক্ষ ও øানাগারের সন্ধান মিলেছে। জাফরিকাটা উঁচু দেয়ালে ঘেরা চৌকুনো মতো জায়গা। সেখান থেকে অনেক অনেক নিচে একটা গভীর মজা কূপ। হঠাৎ করে তাকালে ভয় লাগে। কেমন ভৌতিক রহস্যের অন্ধকারে বিলীন যেখানে কোনো স্বর্ণযুগের ইতিহাস। সম্রাজ্ঞীর øানাগার ছিল নাকি এটাই। সঙ্গীরা আসত সিঁড়ি বেয়ে, কূপের চারধারে ঘুরে ঘুরে উঠেছে যা। নানা আয়োজন আর উপাচারে যে সমাধা হতো øানানুষ্ঠান, তারও নিদর্শন বর্তমান।
এক জায়গায় উঁচুমতো পাটাতন। তারপর একটা সুরম্য প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ। বোধহয় কোনো পাহাড়ি নদীর ক্ষীণধারা আপনমনে তারই ভেতর দিয়ে পথ করে নিয়েছে অজান্তে। কল্কল্ শব্দে বয়ে যায়। এই নদী কি সেই আদ্যিকালের না সাম্প্রতিক, তার হদিস কেউ দিতে পারল না।
আমীর বলে, আমার মনে হয় সুড়ঙ্গপথ দিয়ে বেরিয়ে পানি কোথাও ছড়িয়ে বিছিয়ে যায়, কি বলেন?
নক্শবন্দী বলে, তা হবে। সুড়ঙ্গপথে যা আত্মগোপন করে, একদিন না একদিন তাকে আত্মপ্রকাশ করতেই হয়।
এই শেষের কথায় যেন কেমন প্রচ্ছন্ন খোঁচা।
একটা সুরু পথ দিয়ে টর্চের আলো ফেলে ফেলে চলে নক্শবন্দী আর সাবজোয়ারী। দু’পাশে খাড়া পাহাড়। খুঁড়তে গিয়ে ভেতর থেকে পানি বেরিয়ে সমস্ত জায়গাটাই কাদামাটিতে ভরে।
এক মুহূর্ত থামে সাবজোয়ারী।
বলে, সামনের উঁচুমতো জায়গাটা দেখছেন? কি অদ্ভুত কনস্ট্রাকশন। মাত্র দুটো পিলারের ওপর সাপোর্ট।
অন্ধকারে ভালো করে চোখে পড়ছিল না। সাবজোয়ারী আলো ফেলতেই দেখা গেল রেলিং ঘেরা বারান্দার মতো খানিকটা। আড়াআড়ি, প্রায় পঞ্চাশ ফুট জায়গা জুড়ে। মাঝখানে কিছু জায়গা গোলাকার আসনের মতো। কয়েকটা সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। সেই আসনের ওপর কাঠের বিমের মতো কোনোকিছুর আভাস পাওয়া যায়।
নক্শবন্দী বলল, আমি এ ধরনের একটা জায়গা দেখেছিলাম। রাজগীরের কাছে।
আমীর জিজ্ঞেস করে, কী হতো সেখানে?
শুনেছি সাজা দেয়া হতো।
কাদের?
অন্তঃপুরবাসিনীদের সঙ্গে যারা প্রেম কারার চেষ্টা করত, তাদের। আর শুনেছি, সে শাস্তিও কি যে সে শাস্তি! সাতদিন না খাইয়ে দাইয়ে রাখা হতো একটা সেলে। তারপর একশ চাবুকের ঘা। কাটা জায়গায় নাকি আবার নুন ছিটিয়ে দেওয়া হতো। ওটা শুকালে সাতদিন পর আবার চাবুকের একশ ঘা।
রীতিমতো বর্বর ব্যাপার, প্রতিবাদ না করে পারে না আমীর।
বর্বরতার কি দেখলেন, নক্শবন্দী বলে, ব্যাপারটা একটু ইনহিউমান সন্দেহ নেই। তবে ডিসিপ্লিন ও মরালিটি রাখতে গেলে একটু নিষ্ঠুরতারও দরকার।
রাগে গর্জাতে থাকে আমীর, আমি সে কথা মনে করি না।
আপনার মতো সাধক পুরুষ কেউ থাকলে সে কথা তাদের একবার বুঝিয়ে দেখার চেষ্টা করতে পারত।
হেসে হেসেই বলে নক্শবন্দী। তবু তার কথায় কেমন তীব্র দাহ!
সুড়ঙ্গপথে এগুতে নজরে এলো একটা পাথরের গেট। পাহাড়ের গায়ে খাঁজে খাঁজে বসানো। চারধার জুড়ে নয়নাভিরাম স্থাপত্যের নিদর্শন। নৃত্যরতা পরিপুষ্টদেহী নর্তকীদের নাচের সুললিত ভঙ্গি। গোলাপি পাথরে খোদাই করা।
অপূর্ব!
পাথর দেখে দেখে অভ্যস্থ নক্শবন্দীর পাথর-চোখটাও যেন সায় না দিয়ে পারে না।
তোগালিত্তির তর সইছিল না। ক্লিক করে একটা ছবি তুলল। কিন্তু ছবি তুলতে গিয়েই বিপত্তি। জুতসই ভঙ্গিতে তোলার জন্যে দাঁড়িয়েছিল একটা পাথরের চাঁই-এর ওপর। সেখান থেকে পিছলে পড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ক্যামরাশুদ্ধ। ব্যাপারটা যেন নিমেষেই ঘটে গেল।
ভাগ্যিস সাবজোয়ারী ধরে ফেলেছিল। তা না হলে ওই পাথরটাই এসে আরো ঘটনা ঘটাত। হাঁটুতে লেগেছিল। দু’তিনবার চেষ্টা করেও দাঁড়াতে পারে না তোগালিত্তি। পরে ধরাধরি করে তোলা হলো তাকে। আর এগুনো গেল না।
নক্শবন্দী আর সাবজোয়ারী থেকে থেকে কিছু নোট নিল। হাউমাউ করে বাচ্চা ছেলের মতো হাঁটু জড়িয়ে চিৎকার শুরু করে তোগালিত্তি।
নক্শবন্দীও এতক্ষণ লক্ষ করেনি। দরদর করে রক্ত পড়ছে হাঁটুর খানিকটা জায়গা দিয়ে।
বলে, দাঁড়ান দাঁড়ান। এখুনি ব্যবস্থা করছি। একটা ব্যান্ডেজ দরকার। চলুন রেস্টহাউসে দিয়ে আসি আপনাকে।
কিউরেটার রজব আলী ছুটে আসে খবর পেয়ে। কেউ আহত হয়েছে বলে নয়। একজন ফরেনার চিকিৎসার অভাবে বাইরে কমপ্লেন করতে পারে, কতকটা সে ভয়ে।
তোগালিত্তিকে বিছানার ওপর শুইয়ে দিয়ে নক্শবন্দীর দিকে তাকিয়ে বলে রজব আলী, তাহলে তো একটা কিছু করতে হয়।
সাবজোয়ারী বলে, মিলিটারি হাসপাতালে পাঠালে কেমন হয়?
সে তো অনেক দূর।
তাহলে কোনো ডাক্তারের ব্যবস্থা করা যাক।
তোগালিত্তি দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ব্যথা গোপন করার চেষ্টা করে বলে, আপনারা খামোখাই ব্যস্ত হচ্ছেন। ভালো হয়ে যাবো ঠিক ঠিক। এ নিয়ে মিছিমিছি ভাববেন না। এর আগেও দুর্ঘটনায় মেলা পড়েছি। একবার বোমায় আহত হয়ে তিনমাস হাসপাতালে ছিলাম।
রজব আলী তার বিছানার কাছে ঝুঁকে গিয়ে বলে, দেখুন আমাদের কাজ আপনার যাতে কোনো অসুবিধে না হয় দেখা। যদি মনে করেন কোনোকিছুর দরকার নেই, সে আলাদা কথা।
তোগালিত্তি বলে, দু’দিন বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। একটু লেগেছে, এই যা। তাই বলুন। আমি ভাবছিলাম না জানি কি। দেখুন তো, অনর্থক অফিসের সময় নষ্ট হলো। বহু ফাইল জমা। শেষ করতে হবে।
তারপর একসময় নক্শবন্দীর দিকে তাকিয়ে বলে, আপনাদের গত সপ্তাহের রিপোর্ট পাইনি। সাইটের ড্রয়িংটাও পাঠালেন না।
নক্শবন্দী কী যেন বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই বেরিয়ে পড়ে রজব আলী।
এগারো
পায়ে হোঁচট খেয়ে একটা লাভ হলো। বিশ্রাম দরকার ছিল তোগালিত্তির। সকাল থেকে সন্ধে তার অন্তহীন ছোটাছুটির স্বভাবটা কোনোমতেই বদলায় না। ঘণ্টায় ঘণ্টায় নিত্যনতুন বিস্ময়। যে বিস্ময় নিয়ে নিরন্তর প্রশ্ন। খেয়ালখুশি মতো ক্যামেরার বোতাম টিপে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। কখনও নোট বইয়ে টুকিটাকি লিখে নেয়।
নক্শবন্দী একদিন ঠাট্টা করে বলেছিল, বই ছাপবেন নাকি?
না তো! কেন?
সব বিদেশী পরিব্রাজকরাই করে কিনা। দু’চারটে ভুল তথ্য দিয়ে নিজের মনগড়া কাহিনী তৈরি করে দশ ভল্যুমের আবলতাবল। তারপর কোনো না কোনো য়ুনিভার্সিটিতে গিয়ে বলে, ওরিয়েন্টাল লাইফের ওপর নিখুঁত স্টাডি। কপাল জোর থাকলে ডক্টরেটও মিলে যায় সে সুবাদে।
তোগালিত্তি বলে, বড় ভালো ফেঁদেছেন আমার সৌভাগ্য সিঁড়ি। আমি তো বই লিখব না, ডক্টরেটের লোভ নেই বলে। কিন্তু আমার কি মনে হয় জানেন যে, দশ ভল্যুম বই লেখার বিদ্যে হলে আপনারাই কিনবেন তার তিনসেট। আমাদের মতো পুওর টুরিস্টদের দোষ দিয়ে কী লাভ?
তা কেন?
কি জানি। তবে হরদম তো তাই দেখি। দেশের প-িত ব্যক্তিদের চাইতে বাইরের হাতুড়েদেরই কদর বেশি। তবে একটা কথা কি জানেন, আমার ঐতিহাসিক হওয়ার শখ নেই।
তবে ইতিহাসের নেশা কেন?
ভারি মজার কথা। বই লিখতে যে পারে না তার কি পড়তেও মানা? ঐতিহাসিক যে নয়, তার কি ইতিহাস জানতে নেই?
এমনিতর কথার ওপর কথা সাজাতে ওস্তাদ যে তোগালিত্তি, সে আজ তিনদিন ধরে বিছানায় পড়ে কাৎরাচ্ছে।
আর বলছে, জানো, বৌ থাকলে নিশ্চয়ই একটা হট্ ওয়াটার ব্যাগ এনে দিত।
আমীর বলে, সে তো আমরাও পারি।
তা পার জানি। কিন্তু সেটা যার বৌ যেমন করে পারে অন্যেরা তেমন পারে না। কথাটা কি শুনি? সত্যি সত্যি গরম সেঁক দরকার আপনার?
হেসে উড়িয়েই দেয় সে কথা তোগালিত্তি, পাগল ও তো বলার জন্যেই বলা। আবদার আর øেহের বাড়াবাড়িতে ব্যথাটা বেড়েই উঠত। প্রায়ই ওঠে। কি মনের, কি দেহের। হটওয়াটার ব্যাগ দেবার লোক নেই। তাই ব্যথাও নেই।
আমীর বলে, আসলে আপনি ঘরকুনো। বিয়ে থা করে ঘরসংসার করাই আপনার ভালো।
হাসে তোগালিত্তি, একবার তো করেছিলাম। মনে নেই ক্যাথারিনের কথা। ওকে খোয়ালাম। আবার আরেকজনের সঙ্গে মালা বদল করে তাকেও হারাই – এই তো?
আবার একটু থেমে বলে তোগালিত্তি, একটা আঘাত সইতে পেরেছি মনের ঔদার্য আর সহনশীলতার গুণে। অন্যটা পারব তা কেমন করে বলি? যদি ঠুন্কো মাটি পুতুলের মতো ভেঙে পড়ি। ভালো হবে সেটা? তাহলে কী করবেন?
এমনি চলবে। সময় কাটানোর নাম করে চিরকাল টুরিস্টই থাকব। হোটেল আর রেস্টহাউসে গড়াব। পয়সা থাকলে শেষ বয়েসে কোনো স্যানাটোরিয়ামে একটা সাংঘাতিক অসুখে পড়ে পড়ে ভুগব। তারপর –
আমীর বলে, বাঃ ভালো বেছে নিয়েছেন তা কোর্স অব এ্যাকশন।
এক মুহূর্ত তোগালিত্তি নীরব।
তারপর যেন তার মনের অতলে ডুব দিয়ে বলে, একটা কথা। কিছু মনে করবে না তো? ওই ভদ্রমহিলাটি কি হয় তোমার?
আঁৎকে ওঠে আমীর, কোন ভদ্রমহিলা?
যার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছিলে?
যেন ব্যাপারটা হাল্কা করার জন্যেই বলে আমীর, সে তো মিসেস রজব আলী।
কিন্তু তিনি ভদ্রমহিলা একজন! আড়চোখে চেয়ে বলে তোগালিত্তি।
তা তো বটেই।
আমি বাংলা বুঝি না। শুধু এটুকু মনে হয়েছে তোমার চোখ দেখে, মুখভঙ্গি দেখে যে, সে আলাপ নিছকই আলাপ নয়। কোথায় যেন কোনো কিছু আবিষ্কারের মোহে জ্বলজ্বল করছিল তোমার চোখ-মুখ।
আমীর বলে, উঃ কি আপনার কল্পনার দৌড়।
কল্পনা কিন্তু একদম হাওয়ায় হয় না। কিছু কি তার সত্যি হতে নেই, সবটা যদি নাও হয়?
আমীর যেন তার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে না। তোগালিত্তির চোখে যে সে দেখেছে কি খুঁজে নেবার সন্ধানী আলো। যা মনের গভীর থেকে সব নিবিড়তাকে শুষে নেবার ক্ষমতা রাখে।
পা জোড়া টেনে কাৎ হয়ে শোবার চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যথায় আর্তনাদ করে ওঠে। তারপর সেটা আগের অবস্থায় রেখে দিয়ে বলে, কারও কারও মনের ব্যথাটাও বুঝি আমার পায়ের ব্যথার মতোই।
কার?
বোকার মতোই প্রশ্ন করে ফেলেছে আমীর।
কী করে জানব। তোমার বা ওই ভদ্রমহিলার। কিন্তু জানি, আমার এই কনকনে ব্যথার চাইতে তা অনেক অনেক গুণে অসহ্য।
নিজকে আর লুকানোর চেষ্টা নিরর্থক। শ্বাসরুদ্ধ বেদনার এই মহা নির্যাতন বোবা কান্নার মতো মনের চার দেয়াল হাঁপিয়ে মরছিল। একটা খোলা জানালায় সহানুভূতির মন জুড়ানো একটু হাওয়ার সে মুক্তির আস্বাদ যদি পায়, ক্ষতি কি।
বিছানার কাছে এসে বসে আমীর। কখন তারই অলক্ষে তোগালিত্তির হাতদুটো চেপে ধরে।
অনেকক্ষণ কোনো কথা হয় না।
খোলা জানালার পর্দা কেঁপে ওঠে। দুটো ঝরাপাতা জানালার কাচে এসে এসে ঠেকে। তারপর পাল তোলা নৌকার মতোই বাতাসে ভেসে যায়।
তোগালিত্তি এখানকার বাঁধাধরা নিয়মের রাজ্যে আমরা যেন ব্যতিক্রম এবং অস্বস্তি।
সায় দেয় তোগালিত্তিও, কেন জানি না। আমিও যেন অথর্ব হয়ে যাচ্ছি। এ ভাঙা পা-জোড়া যেন আমার সেই উৎসাহ খর্বতার সময়োপযোগী অজুহাত। তা না হলে বলো তো আমীর, এখানে থাকলাম কেন। এতদিন থাকবার কি দরকার।
আমীর বলে, আমার মনে হয় উদ্দেশ্যহীনতার অদৃশ্য বন্ধনই আমাদের টেনে এনেছে এখানে। আমাকে এবং আপনাকে।
তোগালিত্তির তবু সেই এক কথা, আমার কিন্তু যাওয়াই উচিত। না না। মায়ায় পড়ে নয়। নিজের দেশের জন্যেই মায়া হলো না যার, অন্য দেশের জন্যে মায়া হতে যাবে তার কোন অধিকারে! কেনই বা হবে।
এখন আপনার যাওয়া চলে না।
চোখ টান টান করে তোগালিত্তি, রঙ্গমঞ্চে তোমাদের নাটকটা দেখে যেতে বলছ?
যদি তাই বলি।
তাহলে তো থাকতে হবেই।
পাশ ফিরে ঘুমুলো তোগালিত্তি।
বারো
সেদিন সকালে ঘুম ভেঙে যায়। একটা অযাচিত পুলকে নেচে ওঠে মন। লজ্জা পেয়েছে করিম বক্স। ঘুম ভাঙার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড্-টি দিতে পারেনি বলে। পরিচর্যায় ত্রুটি হলে গেস্টরা কী বলবে।
অকারণে খোলা মাঠটায় দাঁড়িয়ে বুক ভরে নিশ্বাস নিল আমীর। সবুজ ঘাসের ওপর হাঁটল খালি পায়ে। একটু ঠা-া লাগল। তবু ভেজা পায়ে একটা নতুন স্বাদ। বাতাস ছড়িয়ে-বিছিয়ে দিয়ে যায় জংলী ফুলের সৌরভ। যে ফুল সেদিন ছিল। তারাই হাজার বছর পর, আজও আছে। হয়তো এর পরও থাকবে।
একটা গানের কলি ভাঁজতে ভাঁজতে ফিরে এসে দেখে তখনও তোগালিত্তি ঘুমে। একমাত্র নক্শবন্দীর কামরায় স্টোভের মৃদু গর্জন। বাতি জ্বলছে। সকালে বেড্-টি খাবার অভ্যেস নেই। তাজা কফিটা নিজের হাতেই বানায়। বহুদিনে অভ্যেস।
কড়া কফির ঘ্রাণ টুকরো টুকরো স্বাদের মতো ভেসে আসে। এরকমই একটা মনোরম স্বাদ আজ দিতে হবে তার মনকে। ভালো লাগবে। তৃপ্তি পাবে তাতে।
চায়ের টেবিলে তোগালিত্তি আর আমীর দেরি করেই বসে। কোনোদিন তার আগেই নক্শবন্দী আর সাবজোয়ারী ছোটে সাইটে। দরকার হলে গাড়ি পাঠায় ওদের জন্যে পরে।
আমীরকে সেজেগুজে সকাল সকাল চায়ের টেবিলে হাজির হতে দেখে অবাক হয় সাবজোয়ারী।
জিজ্ঞেস করে, আমাদের সঙ্গেই যাবেন নাকি সাইটে?
না। সেজন্যে নয়।
তবে?
এমনি।
অন্য কোথাও যাবেন বোধহয়।
বোধহয়, সাবজোয়ারী পরের কথাটারই পুনরুচ্চারণ করে আমীর। ওদের চলে যাবার পর মনে হয়, আজকের প্রসঙ্গটাকে অহেতুক রহস্যময় করে তোলা উচিত হয়নি। তাতে অযাচিত সন্দেহের ভয়টাই বেশি। যা কিনা কম বেশি, ওরা দু’জনই করতে পারে।
আজ কেন তার একটু বাড়তি সাজ করতে ইচ্ছে করল? কেন ভালো করে বুরুশ করতে হলো জুতো জোড়া? সে তো নতুন করে কারও মন জয় করতে যাচ্ছে না। কাউকে মাৎ করতে যাচ্ছে না। তবে?
তবে এসব যেন তার চেষ্টা ছাড়াই হয়েছে। একঘেয়ে জীবনে একটু বৈচিত্র্যের আস্বাদ পেলে মনটা এমনি পাখা মেলতে চায়। কারণ থাক আর নাই থাক। মনকে কারণ বোঝানো যায় না। কারণ দিয়ে মন চলেও না।
বাইরে এসে দাঁড়ায় আবার আমীর।
তোগালিত্তি বাথরুমে ঢুকেছে। সেখানে জোরে কল ছাড়ার শব্দ। এখুনি হয়তো বেরিয়ে আসবে। বলবে, কোথায় যাচ্ছ? গিয়ে কী লাভ?
কে বলতে পারে ভীরু মন যদি সে যুক্তির কাছে মাথা নত করে ফেলে। আত্মসমর্পণ করে। তার আগেই তাকে ছুটতে হবে। একজনের পাতানো সংসার দেখার আমন্ত্রণে। এই সুযোগ। এই সময়। যেতে পারত মাঠটা দিয়েও। যেমন মাঝে মাঝে যায় – রজব আলী। তাতে সময় কম। তাতে সহজে পৌঁছানো যায়, যে বাড়ির চিমনিতে ধোঁওয়া দেখেছিল সেদিন বৃষ্টির দিন। যেমন দেখছে আজ ভোর ভোর অন্য আট-দশটা বাড়ির সঙ্গে।
রাস্তা ধরেই চলল। তাতে একটু ঘুরপাক। একটু চড়াই উৎরাই। অথচ মাঠের ওধারেই বাড়িটা ছোট্টমতো টিলার ওপর। মাঠ মনে হয় না। মনে হয় এক এক দূরতিক্রম্য সাগর। সাগরের ওপারের মুক্তো। যা একদিন ছিল। আজও আছে। যা তাকে হাতছানি দিচ্ছে।
সে কি ভালো করছে এভাবে ধরা দিয়ে। কি হয়, যদি অনেক অনুনয় বিনয়ের মামুলি প্রত্যাখ্যানের মতো অগ্রাহ্য করে সে হাতছানিও।
আর্দ্ধেকটা পথ চলে এসেছে কখন। একযুগ পেছনের ইচ্ছের চারাগাছটি ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে কেমন ডাল-পাখা মেলেছে, দেখবে। দেখবে, যেমন অর্থহীন ব্যাকুলতা নিয়ে শো-কেসের দামি অলঙ্কার দেখে কেরানি-গিন্নী। কোনোদিন ধরাছোঁয়ার সাধ্য হবে না জেনেও। শুধু চোখে দেখেই যেমন আনন্দ।
নীলা বলেছিল, কখন আসবেন বলুন। আমি নিজে রকে দাঁড়িয়ে থাকব।
চলেই এসেছে বাড়ির কাছে। তাকে দেখে কোথায় যেন পাশের বাড়িতে একজোড়া কৌতূহলী চোখ মুহূর্তে সপ্রতিভ হয়ে পর্দার আড়ালে মুখ লুকায়। দরজার কড়া নাড়ে আমীর। জোরেও নয়। অভদ্র চিৎকারের মতো করেও নয়। এমনকি আস্তেও নয়। ভীরুতার স্বরূপ ধরিয়ে দিয়েও নয়। কোনো সাড়া নেই।
একটা নীল পর্দা বাতাসে সচকিত হয়ে আবার স্থির হলো।
বারান্দায় কাঠের জাফরি। বরাবর চোখ চলে যায়। কাউকে দেখা যায় না। অপেক্ষা হয়েছে। আকস্মিকতার রোমাঞ্চও গেছে। এবার এলেই হয়।
তবু সাড়া নেই। এমনকি নিঃশব্দ পদচারণার ইঙ্গিতও নেই।
এবার জোরেই কড়া নাড়ে আমীর।
এন্তার চুল দু’হাতের মুঠোয় খোঁপার মতো করে গুছিয়ে নিয়ে হাল্কা কমলাই স্যান্ডেল পায়ে কে এসে দরজা খুলে দেয়। মাথার আঁচল তুলতে গিয়েও তোলে না। বলে, কাকে চাই।
আমীর নিজের পরিচয় জানিয়ে বলে, মিসেস রজব আলী আছেন?
আছেন। ভেতরে এসে বসুন।
তাও ভালো। নীলাভ সোফায় – হাত পা ছড়িয়ে বসে শান্তি। এখানে সবই নীলার স্পর্শে ধন্য। এই সোফা, টেবিল কভার, দেয়ালে চৌকুনো তাকের ওপর সাজানো চিনে মাটির পুতুল, এমব্রয়ডারির একটা ডিজাইন – দুটো পাখি যেখানে ঠোঁট ঠোকাঠুকি করছে – সব।
এ বাড়ির কোথাও, এ মুহূর্তে নীলা আছে। অন্তত এ মুহূর্তে নীলা জানে, যে আসবে কিনা ঠিক ছিল না, সে সত্যি সত্যি এসেছে। কী ভাবছে নীলা?
কল্পলোকের কুসুম-রঙিন জগৎ থেকে হঠাৎ তাকে ছিনিয়ে নিয়ে অতর্কিত কণ্ঠ জেগে ওঠে পর্দার ওপারে।
শুধায়, কেমন আছেন?
আমীরের চুপ করে থাকা উচিত ছিল। উচিত ছিল কথাই না বলা। উচিত ছিল শুধু মন ভরে দেখা।
তা কি পারল। অভ্যেসের দাস তাকে মিষ্টি হাসিয়ে বলালো, ভালো। তুমি?
দূরের আসনটিতেই বসে নীলা। বলে, যেমন দেখছেন।
তারপর চোখ নাবিয়ে দেয়। সে সুযোগেই এক নজর দেখল তাকে। বদলায়নি রং, মুখের আদল, মাথা হেলিয়ে রাখার আদিম ভঙ্গি। তেমনই আছে। তেমনি টিকোল নাক। তেমনি মোহময় তার দৃষ্টি।
বেছে বেছে একটা ফিকে ধূসর শাড়ি পরেছে নীলা।
ওটা গায়ে ছিল, না এখুনি পরে এসেছে কে জানে?
নীলা একা নয়। কোনোদিনও থাকবে না। আজ, সংসার, আত্মীয়তার দাবি হাত বাড়িয়ে তাকে আঁকড়ে। সে দুর্বার বন্ধন থেকে আলাদা করে, একাত্ম করে কল্পনা করা যায় না তাকে। কেউ একজন ছিল, একদিন কোনোদিন। বহুদিন পর আজ এসেছে। তার সাথে পরম হয়ে কথা বলার অবকাশ নীলার কই। তবু আরেক কাপ চা ঢালতে ঢালতে সেই কথাই বলে নীলা, বলুন না চুপ করে কেন?
কী বলব?
যা খুশি।
বেশ লাগছে তোমাকে।
ঠোঁট কামড়ায় নীলা। প্রতিবাদ করে না। শুধু সতর্ক করে দেয়, আস্তে।
কেউ শুনলে কী ভাববে বলুন তো।
তাহলে আর কী বলব।
কেন, মনগড়া মিথ্যে না বলে আর কিছু বলা যায় না?
নীলার হৃদয়ের আধখানারও বেশি জুড়ে যে, তার সেই ছোট্ট মেয়েলি কথা এতক্ষণ একবারও মনে হয়নি। গুটিগুটি পায়ে একটা লেবেঞ্চুস মুখে পুরে তার কোলে জুড়ে বসে।
অবাক লাগে। নীলা আজ একা নয়, দুই। একটি দেহ যেন আজ খ-িত হয়ে আরেকটি জীবনে বসন্তের কুঁড়ি ফুটিয়েছে। তাছাড়া আরো একজন। সে দেহের সামাজিক অধিকার যার, সেই সার্থক পুরুষটি।
তাই এই একান্ত নিজস্ব সুখ-সমৃদ্ধির পরিম-লে, আমীরের বড়জোর একজন সম্মানিত অতিথির মর্যাদা। কিংবা তার কিছু বেশি।
মেয়েটাকে আদর করে কাছে ডাকার চেষ্টা করে।
কেঁদে উঠতেই ওকে ছেড়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে, কী নাম রেখেছ মেয়ের?
ডানা।
বেশ তো। ডানা কি একটি?
হ্যাঁ।
আরেকটা হলে মানাত না?
না। একটাই যথেষ্ট।
আর কথা নেই। বলার মতো, সৌজন্যসূচক, আলাপসূচক সব সথাই যখন শেষ, তখন আর কি অজুহাতে বসে থাকা।
আমীর বলে, এবার উঠতে হয়।
তাকে চুপ করে থাকতে দেখে নীলাই বলে, কিছু বলুন। বলছেন না কেন?
আগের মতোই আছ দেখতে।
আর আমি?
কেমন করে বলব। চেহারা না বদলালেও, মন তো বদলায়।
তারপর আবার নিজে থেকেই বলে নীলা, আগের মতো কেমন করে থাকব।
এখন গিন্নী হয়েছি। ঘর-সংসার করছি। এখনও কি সেই কচি খুকিটি রয়েছি ভাবছেন?
আলোচনায় ছেদ পড়ে। যে মেয়েটি প্রথম তাকে স্বাগত জানিয়েছিল সে-ই সলজ্জভাবে পর্দার ওপারে এসে দাঁড়ায়।
নীলা আসতে বলে, এসো না এসো। লজ্জা কিসের।
কথার ফাঁকে ফাঁকে কতগুলো ছাপানো কুপনে সই করে যায় নীলা। একটার পর একটায়।
আমীর জিজ্ঞেস করে, কী এগুলো?
সংসারের ঝামেলা। দুধের কুপন। মিলিটারি ডায়েরি থেকে আনতে হয় কিনা। সই লাগে। বিরক্ত হচ্ছেন নিশ্চয়ই।
মোটেই না। আমি দেখছিলাম –
কথা শেষ করতে পারে না আমীর। তার আগেই নীলা জিজ্ঞেস করে, কী দেখছিলেন?
দেখছিলাম তোমার হাতের লেখা আগের মতোই কিনা।
থাক থাক, হাতের লেখার কথা বলে লজ্জা দিতে হবে না। আর এ বয়েসে হাতের লেখা দিয়ে করবই কি। বাজারের হিসেব লেখা ছাড়া আর কী কাজে আসবে বলুন।
বলেই ওঠার উপক্রম করে নীলা, দেখুন কি আশ্চর্য। এক কাপ চাও দিতে মনে নেই। নিয়ে আসি?
একটি প্রবল ইচ্ছের তাকিদ তাকে নিয়ে বলায়, থাক না। একটু বসো। কোথাও যেতে হবে না।
ভেতর থেকে আবার শোনা যায় সেই মেয়েটির কণ্ঠস্বর, চা চড়িয়ে দিয়েছি।
ভারি লাজুক মেয়ে রীণা। দেখুন তো, বলতেই চা চড়িয়ে দিয়েছে।
রীণা কে?
বলিনি বুঝি। আমার মেজ জা।
আজ একান্ত অন্তরঙ্গ আর নিবিড়ভাবে নীলাকে বলবে, কিছু না হোক শুধু ঘণ্টার পর ঘণ্টা মুখোমুখি বসে থাকবে, আজ সকালবেলার আলো-হাওয়ায় সে ধরনের একটা প্রতিশ্রুতি দেখেই না তার মন নেচে উঠেছিল আনন্দে।
উঠবেন সত্যি সত্যি?
কেন ধরে রাখবে নাকি?
না। আর সে চেষ্টা করলেই যেন আপনি থাকছেন।
দরজা দিয়ে বেরুতে বেরুতে বলে আমীর, একদিন তো পারতে বলেই তোমার ধারণা ছিল।
সে যখনকার, তখনকার কথা।
বোধহয় জবাবটা একটু রূঢ় হয়েছে মনে করেই আবার বলে নীলা, যে ক’দিন আছেন, সময় পেলে আসবেন। তাছাড়া টেলিফোনে খবর নিতে দোষ কি মাঝে মাঝে।
আর এক মুহূর্ত দেরি না করে, কোনোদিকে না তাকিয়ে চলতে থাকে আমীর। এবার আর চুন-সুরকির সেই ঘোরানো পথ দিয়ে নয়। খোলা মাঠ বরাবর রেস্টহাউসের দিকে।
তেরো
ঘরে ঢুকেই অবাক আমীর।
তোগালিত্তি বসে।
কি আশ্চর্য, আপনি উঠে এলেন কখন?
অনেকক্ষণ।
কিন্তু আপনার তো –
পায়ের কথা বলছ, কৌতুকের ভঙ্গিতে পা দুটো লম্বা করে দিয়ে বলে তোগালিত্তি, আমিও ভাবিনি ব্যথা নিয়ে উঠে আসতে পারব। কিন্তু পারলাম। ইচ্ছে ছিল কিনা। ইচ্ছেই শক্তি জোগাল। তা না হলে যারা যেত না।
হঠাৎ শিশুসুলভ কৌতূহলে চোখ দুটো বড় বড় করে বলে তোগালিত্তি, এসেছি কেন জানো?
একটা দুষ্টুমিভরা হাসি ওর মুখ ছাপিয়ে ওঠে। আমীর তা বুঝতে পারে এবং বুঝতে পেরেই ব্যাপারটা হাল্কা করার চেষ্টা করে, বোধহয় আমার অবর্তমানে ডায়েরিটা পড়ার ফিকিরে ছিলেন।
হুঃ। অমন ডাইরি আমারই গ-া গ-া। কে পড়ে? তাও যদি ‘বেঙ্গলি’তে লেখা না হতো। আর কিইবা লিখেছ বলো। ক’টা মেয়ের সঙ্গে প্রেম করেছ, ক’জনকে চুমু খেয়েছ – এই তো?
আমীর বলে, আপনি দেখছিন আমাকে পেশাদার প্রেমিক মনে করেছেন।
পেশাদার প্রেমিক হওয়া কি আর খারাপ। যাক সে কথা। সকাল সকাল বেরিয়ে গেলে যে হুট করে।
যা আঁচ করেছিল তাই।
তোগালিত্তি হেসে আবার বলে, তা কেমন দেখলে?
আমীরও না হেসে পারে না। বলে, ধন্যি আপনার গোয়েন্দা-অনুমান।
নিশ্চয়ই খুব সুইটি লেডি।
খুব।
টিপিক্যাল বেঙ্গলি বিউটি, আক্ষেপের সুরে বলে তোগালিত্তি, আমি কোনোদিন দেখিনি। বড় শখ ছিল।
আপনাকে একদিন দেখাব।
তা বলে কিন্তু রেহাই দিচ্ছি না। অন্যের পুকুরে সাঁতার কাটছ, এটাই ঢের মন্দ। তার ওপর আবার আমাকে ভেড়াবে নাকি?
আমীর বলে, আপনি এসব বুঝবেন না।
তোগালিত্তি বিছানায় উপুড় হয়ে হাতের তালুতে চিবুক ঠেকিয়ে বলে, একটা কথার জবাব দাও। খুশি তো?
কে খুশি?
কেন, তুমি।
আপনি আচ্ছা ছেলেমানুষ। এককথায় কি এসবের জবাব হয়? ভালো কথা, আপনাকে একটা অনুরোধ –
যেন কথাটা বলেও বলতে পারে না আমীর।
তোগালিত্তি বলে, তোমার অনুরোধের কথা তোমার চোখের আকুতির ভাষাতেই পড়েছি। কাউকে বলব না, এই তো?
আমীর মুখ নিচু করে থাকে।
তোগালিত্তি ওর হাতখানা ধরে বলে, জানো বন্ধু, এমন অনেক কথা আমাকে জীবনে গোপন রাখতে হয়েছে। এমন কথা আমি জানি। কত দেখেছি। যে একবার দেখে, মনটা বলার জন্যে তারই আকুলি-বিকুলি করে। কিন্তু অনেক অনেক দেখেছে যে, তাকে সহজে কুপোকাৎ করা মুশকিল।
হঠাৎ তোগালিত্তি হেসে ওঠে। বলে, চলো ঘুরে আসি।
একটা নিশ্চিন্ত ভরসার লোক পেয়েছে যেন এতক্ষণে।
তার দিকে দৃষ্টি স্থির করে বলে আমীর, আপনার এ হাসির ভেতর একটা নিদারুণ কান্না দেখতে পাচ্ছি। তারচেয়ে কান্নাই ভালো।
সন্ধে হয়ে আসছিল। আকাশে হাজারো তারার ভিড়। নাম না জানা কোনো পাখির আর্তস্বর বাতাসে। বুক কেঁপে ওঠে। ঝিরঝিরে হাওয়ায় কেমন শিহরণ। ঠান্ডা পড়েছে।
তোগালিত্তি বলে, তুমি ভাগ্যবান।
কেন?
তোমার জন্যে কাঁদার লোক আছে।
আপনারও ছিল। এবং থাকবে।
ছিল। এখন নেই। আর কোনোদিন থাকবে না।
কী করে জানেন?
তা তোমাকে বোঝাতে পারব না। কিন্তু আমি বুঝি। জানি সন্ধে হলেই মাঝে মাঝে এখানে এসে বসি। দূরের পাহাড় আর আকাশ দেখি। অন্ধকারে একসময় আমার নিজেকেই চেনা যায় না। অনেক সময় নিজের নাম ধরে ডাকি।
আমীর বলে, আসলে আপনি আপনার বৌ-এর দুঃখ ভুলতে পারছেন না। তোগালিত্তি প্রতিবাদ করে। বলে, না না। সেজন্যে নয়। দুঃখ হয় যে মনটা ওকে অর্পণ করেছিলাম, সে মনের জন্যে। নাও তো দিতে পারতাম। কিন্তু একবার দিলে তাকে তো আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না। কিন্তু আপনার বৌ তো একদিন আপনাকে ভালোবেসেছিল।
হ্যাঁ। কিন্তু তারপর ছেড়ে দিতেও দ্বিধা করেনি।
তবে আর তার ভাবা কেন?
আমি থোড়াই ভাবতে চাই। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাই। ভাবি জীবনে কোনোদিন দেখব না ওকে। সেজন্যেই ছেড়ে এলাম ইতালি।
এ করে কি শান্তি পান, আমীর জিজ্ঞেস করে।
কই আর পাই। যার ভয়ে এলাম, সে যে সবখানে। এখানে, সেখানে, সর্বত্র। কারও চোখে দেখি ওর সম্মোহনী। দৃষ্টি। কারও মুখের ছাঁদে ওর মায়াময় লাবণ্য। কারও চুলে ওর মাথার ফিতে।
আমীর বলে, তাহলে ভুলে থাকার চেষ্টা করেন কেন?
কারণ একমাত্র সে চেষ্টাই মানুষ পারে। আর তো কিছু পারে না। সে কথা থাক। আজ আমার বড্ড খুশি লাগছে।
কেন?
কি জানি। সত্যি কথা বলব? কতবার ভেবেছি, হিংসে করি, ঈর্ষা করি। আমার সম্ভাবনার সবুজ মাঠ যেখানে জ্বলে ছাই হলো, সেখানে আর কারও সাফল্যের কেন? কিন্তু, কিন্তু –
কিন্তু কি?
তোগালিত্তি কেমন ধরাগলায় বলে, কিন্তু পারিনি। সকাল সকাল চুপি চুপি দেখেছিলাম তুমি হেঁটে যাচ্ছ। ঠান্ডা হাওয়ায় চোখ সজল হয়ে এলো। আশ্চর্য উদার হয়ে পড়ি। ভালো লাগল তোমার যাওয়া। ভালো লাগল, এই ভেবে যার কাছে যাচ্ছ। আমার হিংসে দূরের কথা, বড্ড আনন্দই হচ্ছিল।
আমীর বলে, আমার হিতৈষী বলেই তো পেরেছেন।
তোগালিত্তি রাগের ভান করে বলে, ওসব কথা রাখো। কেউ কারও হিতৈষী নয়।
আবার থেমে বলে তোগালিত্তি, আসলে আমার ভালো লাগালাগি কারও চাওয়া-চাওয়ির ওপর নির্ভর করে না। আজ তোমাকে একটা কথা বলি। শুনলে অবাক হবে। তোমরা যখন ঘুমিয়ে পড়ো, রেস্টহাউসের সব লোক ঘুমিয়ে পড়ে, কতদিন পা টিপে টিপে বেরিয়ে পড়েছি সাইটের দিকে। সবটুকু যেতে পারিনি। বসে পড়েছি কোনো ভাঙা ইটের পাঁজায়। সুর তুলেছি আপন মনে মাউথ অরগ্যানে। সেটা কি তোমাদের জন্যে? আমার নিজের ভালো লেগেছিল বলেই।
আমীর তোগালিত্তির হাত দুটো ধরে ফেলে। বলে, আপনি স্বীকার করুন আর নাই করুন, মানুষের প্রতি আপনার ক্ষমার্হ মনোভাবই আপনাকে এত সহজ ও সুন্দর করে তুলেছে। নিজের দুঃখ আর হতাশার জ্বালা অন্যের শান্তি আর øেহের ছায়ায় øিগ্ধ করতে যে চেয়েছেন চিরকাল, সেটা স্বীকার না করলেও আমি বুঝি।
তোগালিত্তি সে কথার জবাব না দিয়ে বলে, চলো ফিরে যাই। পায়ের ব্যথাটা বাড়ছে।
তোগালিত্তি আগে গেল। পেছন পেছন আমীর। যেন তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও দৃষ্টি চলে যায় টিলার ওপরের এই বাড়িটায়। এতক্ষণ বাইরের বারান্দায় বাতি জ্বলছিল। তারপর একসময় সেটাও নিবে যায়। তখন অনেক রাত।
চোদ্দ
ক’দিন হলো নক্শবন্দী শুধু সাবজোয়ারীকে সঙ্গে নিয়ে সাইটে যায়। আগে জিপ ফিরে আসত তাদের নিতে। আজকাল তাও হয় না।
নিজের অধিকার যেখানে সামান্য, সীমিত এবং প্রায় অবর্তমান সেখানে তর্ক নিরর্থক। রেস্টহাউসের লোকজনদের আচার-ব্যবহারেই কেমন যেন বোঝা যায়, ঠিক আগের আন্তরিকতা যেন নেই। যেটুকু করা সেটুকু যেন দায়ে পড়ে, অভ্যেসের তাড়নায়।
নক্শবন্দীর দেখা হলে এখনও অভিবাদন করে, কফি খেতে বলে। তবে জোরাজুরি নেই। তার পাঠানো ডেসপ্যাচ নিয়ে এতটুকু আগ্রহ নেই নক্শবন্দীর। তা নিয়ে আলোচনাও হয় না। যেটুকু কথা হয়, তা যেন পরিচয়ের খাতিরেই।
তোগালিত্তির পায়ের ব্যথা বেড়েছে আবার। সেদিন তাকে আর বাইরে বেরুতে দেখা যায়নি। সারাদিনই বিছানায়।
রেস্টহাউসে চায়ের পর্ব শেষ। সবকিছুই যেন কেমন তাড়াহোড়া করে হয়। সবাই যেন তাদের কাটাতে পারলেই বাঁচে। কখন নক্শবন্দীদের গাড়ি আসে, কখন যায় বোঝাও যায় না। সকাল ন’টা বাজতে না বাজতেই রাত বারোটার থমথমে ভাব। শান্ত। এমনকি অনেকদিন ভীরু সূর্যটাও উঠি উঠি করে মেঘের কম্বল সরিয়ে চোখ মেলতে আলসেমি করে।
আমীর এক-একদিন চায়ের টেবিলে যেতে যেতে দেখে, আশ্চর্য প্রলোভনের মতো এককোণে রাখা কালো টেলিফোন। পোষা বেড়ালের মতো। আদরের ধুলো জমে, যতক্ষণ কেউ তাকে প্রগলভ না করে তোলে। নীলা কী করছে?
নীলা আর তার মাঝের ব্যবধান ক্ষুদ্রতর হতে পারে যদি এখুনি – ক্রিং! ক্রিং! বেজে ওঠে টেলিফোন।
একটা প্রগাঢ় ইচ্ছে আর বাসনায় উত্তেজিত আমীর। ছুটে গিয়ে টেলিফোনটা ধরে।
হতাশ হতে হয়। কিউরেটারের অফিসের একাউন্ট্যান্ট করিম বক্সকে চায়। এ মাসের হিসাবের খাতা জমা দেয়া হয়নি সেটা মনে করিয়ে দিতে। করিম বক্স দৌড়ে আসে। টেলিফোনটাই এসময় ওর মুনিব। মাথার টুপিখানা ঠিক করে মাটিতে বসে পড়ে কথা বলে। কথা শেষ হলে আরো এক মিনিট দাঁড়ায়। অর্থপূর্ণ দৃষ্টি।
আমীরের কাছে এগিয়ে এসে বলে, সার। একাউন্ট্যান্ট সাহেব বলছিলেন এমাসের সিট রেন্টটা।
তেমন কথা ছিল না। কথা ছিল ওদের থাকার ব্যবস্থা খরচাতেই হবে। খাবার অবিশ্যি যার যার।
অবিশ্যি এ নিয়ে তর্ক করা বৃথা। যে কলমের খোঁচায় তাদের বিনা ভাড়ায় থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল, সে কলমের জোরেই বোধহয় সেটা এখন বাতিল হয়ে থাকবে।
আমীর জিজ্ঞেস করে, কত?
হিসাবটা লেখাই ছিল করিম বক্সের নোট বুকে। ওখানা বাড়িয়ে দেয়। পয়সা চুকিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছিল আমীর।
করিম বক্স একটা প্লেটে সাজিয়ে খুচরোগুলো ওর দিকে বাড়িয়ে দেয়। আমীর বলে, থাক। ওগুলো তোমার।
সেই সুবাদেই বুঝি আরেক কাপ গরম চা এসে গেল। অপ্রত্যাশিত বাড়তি আরেক কাপ। ভালো লাগল বসে বসে চুমুক দিতে।
দুর্জয় ইচ্ছের বিরুদ্ধে তার মনে তখন তুমুল লড়াই। টুবি আর নট্ টুবি।
লড়াইয়ে কি তার অবধারিত পরাজয়? না। টুবি টুবি। শক্ত হতে রিসিভারখানা তুলল। তারপর জাদুমন্ত্রের মতো ডায়াল করে ওই ক’টি আকাক্সিক্ষত নম্বর। যে নম্বরে মিলনে কোনো বাড়ির অতর্কিত গিন্নী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে না জেনে শুনেই ঝাঁঝাল গলায় বলে উঠবে, হ্যালো।
এবারও ধরল রীনা।
আমীর বলে, মিসেস রজব আলীর সঙ্গে কথা বলতে পারি?
এটুকু জেনে নিয়েই সন্তুষ্ট হতে পারে না। সেদিনকার বহুল-প্রশংসিত, সুবিবেচনাশীল রীনা।
তা সত্ত্বেও নামটা জিজ্ঞেস করে বসে, কে কথা বলছেন?
আমীর নাম জানায়।
আচ্ছা ধরুন ডেকে দিচ্ছি।
কিছু নীরব, নিশ্চল মুহূর্ত। ঝড় আসার আগে যেন। যেমন বন্যায় বাঁধ ভাঙার আগে।
একসময় ঝর্ণা-গলা মিষ্টি আওয়াজ বেজে ওঠে, হ্যালো।
আমীর নিশ্চিত হতে চায়, আপনি কি –
ওপক্ষ নিশ্চিন্ত। বলে, হ্যাঁ যাকে চাইছেন সে-ই। মনে পড়ল এতদিন পর তাহলে। কেমন আছেন?
ভালো। তুমি?
ভালো।
বোধহয় একটু অতিমাত্রায় উচ্ছ্বাসপ্রবণই হয়ে উঠেছিল সেদিন আমীর। বলল, মাঝে মাঝে ভাবি তোমার সঙ্গে একদম দেখা না হলেই ভালো ছিল।
নীলা বলে, ভালোই তো, এখুনি সব চুকিয়ে দিন।
তাও পারব না। কাল একদম ঘুমুতে পারিনি জানো।
নীলা হাসে। অন্তত টেলিফোনে সেরকমই মনে হয়?
বলে, জার্নালিস্টরা অনেক মিথ্যে কথা বানিয়ে বলতে পারে।
তা পারে। কিন্তু কোনো জার্নালিস্ট জীবনে প্রেম করেছে, ভালোবেসেছে এবং ব্যর্থ হয়েছে এবং সব করেও সত্যি কথা বলেছে, মানো?
না। মানি না।
আমীরের মনে হয় তাকে চটিয়ে দেবার দুর্জয় ইচ্ছে পেয়ে বসেছে নীলার। তার টুকরো টুকরো হাসি ভেসে আসে ওধার থেকে।
হ্যালো।
নিশ্চিত হতে চায় আমীর।
হ্যাঁ শুনছি, বলুন।
হঠাৎ ব্যস্ততার ধুম দেখিয়ে বলে নীলা, ছাড়ি হ্যাঁ। কে যেন ডাকছে অনেকক্ষণ। কি ভাববে, ছাড়ি। ও মা, মমিন ভাই-এর বৌ। এখন চলি, হ্যাঁ?
টেলিফোন বন্ধ হলো।
নীলা সন্দেহ করেছে এখনও তাকে আগের মতো মনে পড়ে নাকি? সেটাই বুঝিয়ে বলার ইচ্ছে ছিল। অনেক নিবিড়তা, অনেক স্মৃতি। তবু আজ এত বছর পর প্রেম-ভালোবাসা এসব কি সত্যি সত্যি উচ্চারণ করা যায়। তার কি করা উচিত। একদিন যে মেয়ে তাকে সর্বস্ব দেবার, সর্বস্ব নেবার অঙ্গীকার করেছিল, সেদিনকার সেই ভীরু মেয়েটি আজ কী ভাবছে। না কলকলিয়ে হাসছে ওর দুঃখ আর মর্মপীড়নে মুগ্ধ হয়ে।
নীলাই একদিন বলেছিল, মাঝে মাঝে মন খারাপ করলে আপনাকে দিব্যি দেখায়।
সেন্ট্রাল এভেন্যুর আকাশচুম্বী উঁচু ফ্লাটের বাড়িতে বসে ফাস্ট ইয়ারের ছাত্রীর মুখে সেদিন কথা ক’টা কেমন লাগছিল। আমীর কিছু বলেনি।
নীলা বলেছিল, চা দি।
না।
অন্য কিছু?
না।
তাহলে?
ওঠার উপক্রম করে বলেছিল আমীর, তাহলে আর কি, চলি।
হঠাৎ সেই চঞ্চল মেয়েটি গম্ভীর হয়ে বলেছিল, যান না। আমার বয়ে গেছে।
কে আসতে বলেছিল?
তারপর সেই একটার পর একটা সিঁড়ি ভাঙা। পাঁচতলা থেকে রাস্তায় ফুটপাথ অবধি সাতাশি সিঁড়ি।
কিন্তু যেতে যেতেও মোড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। একবার যদি তার ফ্লাটের রেলিং-এ এসে দাঁড়ায়। যদি একবার, তাহলে আজকের এই মন খারাপকে প্রশ্রয় দেবে না। নীলা কি দাঁড়িয়েছিল বারান্দার রোয়াকে। আশার পতাকার মতো পত্পত্ করে উড়িয়ে দিয়েছিল সবুজ শাড়ির আঁচল।
সেদিন সোজা ছুটে দিয়েছিল শওকৎ-এর বাড়ি। তার মনে তখন অসম্ভব উত্তেজনা আর চাপা ক্ষোভের আগুন। পুরো ঘটনাই শোনাল শওকৎকে। বড় বিব্রত শওকৎ, তাই নাকি? কী বলল?
বলল, না এলে আমার বয়ে গেল।
চোখদুটো গোল করে মাথা হেলিয়ে বলে শওকৎ, তাহলে তো এর মধ্যে ব্যাপার আছে।
বুক র্দু র্দু করে ওঠে আমীরের, সেটা কীরকম?
না বোঝার কি আছে? আর কেউ জুটেছে আর কি। কিছু খাঁচ করতে পার?
আমীর বলে, না তো।
আচ্ছা দাঁড়াও, লাল ভাইকে জিজ্ঞেস করি।
আমীর অবাক হয়। বলে, সে আবার কে?
শওকৎ বলে, দাঁড়াও না। ওর সঙ্গে পরামর্শ করি।
সেদিনই প্রথম দেখল। উস্কো-খুস্কো চুল। লাল চোখ। পরনের কাপড়টাও বেশ ময়লা। আরো অদ্ভুত নাম, লাল ভাই। তার চেহারা বা বর্ণ-ঔজ্জ্বল্যে লাল রং-এর প্রতি কোনো পক্ষপাতিত্বই ছিল না।
লাল ভাই কী করে, কেউ জানে না। এমনকি আদৌ কিছু করে কিনা কেউ জানে না। কেমন করে যে তার চলে সে কথা লাল ভাই বলে না।
কেউ জিজ্ঞেসও করে না।
লাল ভাই কোনো কথা বলল না। একবার আপাদমস্তক তাকে দেখি নিয়ে পকেট থেকে নিয়ে একটা বিড়ি ধরায়। বকপাখির মতো পাদুটো চেয়ারের ওপর তুলে দিয়ে জড় হয়ে বসে।
শওকৎ ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ওটাই ওর অভ্যাস। আস্তে, শুনলে লাল ভাই রাগ করবে।
তারপর শওকৎ গুটি গুটি পায়ে কাছে গিয়ে বলে, লাল ভাই, আমাদের এক সমস্যা।
লাল ভাই হাত পাতে।
শওকৎ বলে, হাঁ করে দেখছ কী। ওটা নরম্যাল ফি।
লাল ভাই বলে, ডাক্তারের ফি আছে। আমাদের থাকবে না কেন?
আমি যে তোদের বুদ্ধি দি। ভালো দেখে এক প্যাকেট গ্লোরিয়া সিগ্রেট নিয়ে আয়।
আমীর ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে দিয়ে এক প্যাকেট সিগ্রেট কিনে আনে।
সিগ্রেট ধরিয়ে তবে কথা বলে লাল ভাই, কী সমস্যা?
শওকৎ আমীরের হয়ে আদ্যোপান্ত ঘটনাটা বলল।
লাল ভাই চোখ বুজে বলে, তারপর?
যেন ব্যাপারটা খুব ভালো লেগেছে।
শওকৎ বলে, মেয়েটার কেমন যেন গতিমতি। আমীরকে ইনসাল্ট করেছে সেদিন।
লাল ভাই খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, গোয়েন্দা লাগা।
বলেই লাল ভাই বেরিয়ে যায়।
আমীর বোঝে না। কথা শেষ না করেই যে ছুটল লাল ভাই।
শওকৎ রেগে যায়। বলে, লাল ভাই ওরকমই। আসলে বেশি কথার লোক নয়। কেউ পেছনে আছে নাকি সে খোঁজটা নিতে বলেছে।
তারপর?
তারপর আর কি। ব্যাপারটা লাল ভাইকে বললে আবার বুদ্ধি দেবে।
কবে?
আবার মঙ্গলবার।
তার আগে হয় না?
তা কেমন করে হয়? তাকে অন্য জায়গাতেও যেতে হয়। শুধু কি একজনকে পরামর্শ দেওয়া?
লাল ভাইয়ের পরামর্শেই কিনা জানে না, তারপর অনেকদিন দাঁড়িয়ে থেকেছে নীলাদের বাড়ির মোড়ে আড়ালে। ডিসেম্বরের শীতে ঠক্ঠক্ করে কাঁপতে কাঁপতে দেখেছে লোকদের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে। একবার একজনের পিছু নিয়েছিল শওকৎ।
নিচে উৎকণ্ঠ প্রতীক্ষা আমীরের। নেবে আসতেই ধরে বসে তাকে, কী দেখলে?
যা ভেবেছিলাম। বুঝলে কিনা আমার সামনে তরতর করে গিয়ে সোজা টোকা দেয় দরজায়। একবার চুলটা পাট করে নেয়। দরজা খুলে যেতেই কি তার আদর-যতœ।
তাই নাকি? অবাক হয় আমীর।
তবে কি বলছি। ওকে দেখেই নীলার চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। বলে, এলেন এতদিন পরে তাহলে। আসুন, বাইরে কেন?
আমীর বলে, খুব খুশি খুশি দেখলে না?
খুশি বলে খুশি।
তারপর, তারপর কী হলো? আমীরের যেন তর সয় না।
শওকৎ বলে, তারপর কী হলো আমি কি জানি। কি কল্কল্ হাসি। শুনলাম কাকে যেন শুনিয়ে শুনিয়ে বলা হচ্ছে, মমিন ভাই এসেছে।
তোকে দেখেনি তো নীলা?
না। আমি অত কাঁচা ছেলে! ওদিকের দরজা খুলতেই উল্টোদিকের ফ্লাটে কড়া নাড়ার ভান করি। তারপর তো নিচে নেবে এলাম।
তার অচেনা, অজানা প্রতিদ্বন্দ্বীকে সেদিন শিক কাবাব করে খেতে ইচ্ছে করছিল আমীরের। দাঁতে দাঁতে চিবিয়ে ওই নামটা উচ্চারণ করে বলল, ঠিকই বলেছ। সেজন্যই আজকাল আমাকে কেমন এড়িয়ে চলে।
আমি বুঝি না ভাবছ? খুব বুঝি। এখন করি কি!
শওকৎ বলে, ভাবাভাবির কী আছে। লাল ভাই-এর কাছে গেলেই হয়। তারপর একটু থেমে বলে, ভালো কথা, এবার কিন্তু স্টেট এক্সপ্রেস খাওয়াতে হবে। গ্লোরিয়াতে চলবে না। লাল ভাই বলে, যেমন কাজ তেমন ধোঁওয়া চাই।
লাল ভাই দু’দিন ভেবে নিয়ে তবে জবাব দিলো। এক কথার জবাব : কোনো আশা নেই।
সেদিন লাল ভাই-এর সিদ্ধান্তের বিষয়বস্তু কি ছিল, কে জানে। কিন্তু ওই ছন্নছাড়া লোকটির কণ্ঠ থেকে সেদিন কি নিদারুণ সত্য নিঃসৃত হয়েছিল। মমিন ভাইয়ের কথা একদিন নীলাই বলেছিল মাস খানেক পর থাকতে না পেরে যেদিন আমীর হন্যে হয়ে ছুটে গিয়েছিল ফের ওই বাড়িতে।
জিজ্ঞেস করেছিল নীলা তাকে, এতদিন আসোনি কেন?
অভিমানরুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিল আমীর, এমনি।
এমনি-র একটা কারণ নিশ্চয়ই আছে। সেটা শুনি?
শুনতে হবে না। আর আমার কথা শোনার, সময়ই বা কই তোমার?
কেন!
ইস আর ঢং করতে হবে না। অমন হেসে কুটি কুটি হয়ে কে কথা বলেছিল সেদিন। ওই যে কি নাম যেন।
ইচ্ছে করেই নামটা উচ্চারণ করে না আমীর।
ও মমিন ভাই, আবার হেসে হেসে কুটি নীলা, ও যা হাসায়। যা হাসির গপ্প বলে। মজার মজার গপ্প! ওকে দেখলেই আমরা হেসে ফেলি। তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবো একদিন।
এর বেশি নীলা বলেনি। জিজ্ঞেস করাও সম্ভব হয়নি। তবে অনুভব করেছিল দুশ্চিন্তার কালো মেঘটা একেবারে সরে যায়নি। জোৎøার আলোয় আকাশ টলমল করে ওঠেনি ঠিক আগের মতো। কিন্তু সেই মমিন ভাই তো তার জীবনে এলো না। সে কি নীলাকে হাসিয়ে হাসিয়েই বিদেয় নিল একদিন?
পরের বছরই বদলি হয়ে গিয়েছিল নীলারা। আর দেখা হয়নি। সেই মমিন ভাই-এর স্ত্রী। যে অনেক হাসাতে পারত সেই মমিন ভাই-এর বৌ-এর সঙ্গে বোধহয় একটু হাসি-খুশির আলাপ। মমিন ভাইকে দেখেনি আমীর। তার বৌ তো দূরের কথা।
কখন মনে নেই, তোগালিত্তির ডাকে চিন্তার তন্ময় রাজ্য কেটে যায়।
তোগালিত্তি পাশের কামরা থেকেই ডাকছে, কোথায় তুমি?
কেন কী হয়েছে? এদিকে, মহা হৈচৈ।
তোগালিত্তি বলে, নক্শবন্দীর আজকাল কি যে হয়েছে। খানিকক্ষণ আগে আমাকে খুব কড়া কড়া কথা শুনিয়ে গেল। আমরা নাকি রেস্টহাউসের নিয়ম-কানুন মানছি না।
সেটা কীরকম?
বলে, আমরা এসেছি কাজ করতে। পারমিশান দেওয়া হয়েছিল সাইটে কাজ দেখার। তা না করে একজন চিৎ হয়ে শুয়ে এটাকে হাসপাতাল বানিয়ে ফেলেছে। আর একজন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যথেচ্ছ টেলিফোন ব্যবহার করছে। নক্শবন্দী বলে, এটা তো হোটেল নয়।
তোগালিত্তি বলে, আমিও ছাড়িনি। দু’কথা শুনিয়ে দিয়েছি নক্শবন্দীকে। বলেছি, হোটেল না হোক, আপনার পৈত্রিক সম্পত্তিও নয়। নক্শবন্দী সে কথার জবাব না দিয়ে পাল্টা শাসিয়ে দিয়ে গেল, কালই নাকি বলবে কিউরেটারকে। তা না হলে যে কেউ এখানে এসে স্বর্গসুখ পেতে চাইবে।
তোগালিত্তি নাকি ওকে শুনিয়ে দিয়েছিল, ভয় দেখাচ্ছেন কেন। পৃথিবীতে এত মানুষের সঙ্গে চলাফেলা, এত জায়গায় থেকেছি যে, কোনো কিছুতেই ভয় হয় না। এক আশ্রয় গেলে আরেক আশ্রয়। আর তা যদি নাই পাই, তাতেই কি।
তারপর থেমে আমীরের চোখে চোখ রেখে বলে তোগালিত্তি, আসল কথা কি জানো? আসল হচ্ছে নক্শবন্দীর গাত্রদাহ।
আমীরের বুক টিপ্টিপ্ করে।
গাত্রদাহের কারণ তার অজানা নেই।
অন্য কারও সুখের একটি ক্ষীণ সূত্রও বোধহয় নক্শবন্দীকে পাগল করে তোলে। নিজের বঞ্চনা আর বেদনার কথাই মনে করিয়ে দেয়। মাটি আর পাথর নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেও মনটা তার মাটি হয়ে যায়নি।
কী করবে তাহলে? জিজ্ঞেস করে তোগালিত্তি।
কিছু একটা করতে হবে নিশ্চযই। আজ সেই আগেকার লাল ভাই থাকলে শুধুমাত্র এক প্যাকেট ভালো সিগ্রেটের বিনিময়ে বলে দিতে পারত, তাদের কী করতে হবে।
তাদের ভাববার কোনো সুযোগ না দিয়েই পর্দা ঠেলে ঢোকে কে যেন।
দু’জনই অবাক হয়। এক ভদ্রমহিলা। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি।
অন্তত তাই মনে হয়। খাড়া নাক। খাট করে ছাঁটা চুল। বাঁ কব্জিতে ছোটমতো হাতঘড়ি। পায়ে দু’স্ট্রাপের কালো স্যান্ডেল।
কোনো ভনিতা না করেই হাতের ব্যাগখানা রেখে নিজের পরিচয় দিয়ে বলে, আমি শাহনাজ বেগম।
তারপর তোগালিত্তির দিকে বলে, আমি মাত্র কাল শুনলাম আপনার কথা, মিসেস রজব আলীর মুখে। বললেন, কোনো ইতালীয় পরিব্রাজক এসেছে। কি আশ্চর্য এদ্দিন আমাকে কেউ বলেনি। আমি তো এক হপ্তার ওপর ওখানে।
তোগালিত্তি মাথা ঝুঁকিয়ে বলে, সুখী হলাম আপনার সঙ্গে আলাপ করে। তা এক হপ্তা বলেছেন কেন, আপনি কি এখানে থাকেন না?
না, তা আর পারি কই। আমার মামার অবশ্যি খুব শখ ছিল এখানেই থাকি।
তোগালিত্তি বলে, আপনার মামা মানে?
কেহ শাহ ওয়ালি খানের নাম শোনেননি। ওর জিনিসপত্র দিয়েই তো মিউজিয়াম সাজানো। আমাকে বড্ড আদর করতেন। ছোটবেলায় মানুষ হয়েছিলাম কিনা। শাহ ওয়ালি বলতেন, আমি মরে গেলে এগুলো দেখাশোনা করবে কে? যাকগে যা বলছিলাম। পাশের টিলাটা পড়েছিল। শাহ ওয়ালি খান সেখানেই বাংলো তৈরি করে দিলেন। পরের বছরই মারা গেলেন তিনি। এখন এই খালি বাড়িতে আমার মন টেকে না। আমি তো বেশির ভাগ সময়ে বাইরেই থাকি। বেশ কেটে যায়। আজ ফ্যাশন শো, কাল এটা, পরশু ওটা।
কথা বলতে বলতে হুঁশ ছিল না। এতক্ষণ দ্বিতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি অনুভব করে নিজেই লজ্জিত হয়। আমীরের দিকে তাকিয়ে বলে, তাই তো দেখুন আপনার পরিচয়টাই জিজ্ঞেস করা হলো না।
দ্বিতীয়বার যদি নিজের পরিচয় ব্যক্ত করার দরকার ছিল না তবু বলল, আমার নাম শাহনাজ বেগম।
উল্লসিত হয়ে ওঠে শাহনাজ বেগম, এ তো যাকে বলে সোনার সোহাগা। বলেন কি, জার্নালিস্ট আর টুরিস্ট। এমন যোগাযোগ হয় কখনও। আমি তো আজই চলে যেতাম। যাক ভালোই হলো। আজ রাতে আমার এখানে খেতে হবে কিন্তু।
বলেই শাহনাজ বেগম উঠে পড়ে।
যেতে যেতে দরজা থেকে ফিরে এসে আবার বলে, গাড়ি পাঠিয়ে দেবো। রাতে হয়তো বাসা চিনতে অসুবিধে হবে।
পনেরো
শাহনাজ বেগম নিজেই দরজায় দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানায়।
সাতপাক ঘোরানো রাস্তা দিয়ে উঠতে হয়। টিলার ওপরে ছোটমতো বাংলো। খাঁজকাটা ইটের দেয়াল। ওপরটা টালির ছাদ। জানালার কাচে ভেতরের আলো প্রতিফলিত হয়ে কেমন মোহময় পরিবেশ।
শাহনাজ বেগম এগিয়ে এসে বলে, গাড়ি ঠিক সময় গিয়েছিল তো?
আমীর বলে, হ্যাঁ। মিনিট পাঁচেক আগেই এসে পড়েছিল।
আমাদেরই একটু দেরিই হলো বরং।
শাহনাজ আশ্বস্ত হয়ে নিচু গলায় বলে, ভালোই। সময় নিয়ে ফরেনার্সদের কমপ্লেন করার সুযোগ দিতে নেই, কি বলেন?
তোগালিত্তি বোধহয় শুনতে পেয়েছিল। পুলকিত হাসি নিয়ে ঘরে এসে ঢোকে।
শাহনাজ চেয়ার দেখিয়ে বসতে বলে।
তারপর নিজে থেকেই বলে, জীবনে একবার দেরি করে ফেলেছিলাম। বড় মাশুল দিতে হয়েছে। সেই থেকে আমি সময় সম্পর্কে খুব সচেতন। এই অতর্কিত ভাষণে দু’জনেরই দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় তার ওপর।
আমীর বলে, সেটা কীরকম?
যেন মামুলি প্রসঙ্গ। এ নিয়ে সঙ্কোচের কোনো কারণ নেই তেমন করে বলে শাহনাজ, ওই একবারই দেরি করে ফেলেছিলাম। বিয়ের সময়। সেজন্যে আর বিয়েই হলো না।
বলেন কি?
হেসে বলে শাহনাজ, ও কিছু নয়। আমি আবার পামিস্ট্রিতে বিশ্বাস করি কিনা। আমি হচ্ছি যাকে বলে ‘স্যাগিটেরিয়াস’। সেই হিসেবে বিয়ের দিন-কাল ঠিক হয়েছিল। তেইশে জুন, সন্ধে ন’টা। কাঁটায় কাঁটায়। বরপক্ষ দেরি করল। বিয়ে ভেঙে দিলাম।
আর করলেন না? তোগালিত্তি জানতে চায়।
না। জীবনে অপরচ্যুন মোমেন্ট একবার আসে। প্রেম একবারই হয়।
বোধহয় ধরা পড়ে যাবার আশঙ্কায় মোড় ঘুরিয়ে বলে শাহনাজ, সে কথা যাক। তা বলুন কেমন দেখলেন এখানকার রেলিক্স, আপনাদের রোমের মতো?
তোগালিত্তি বলে, সে কথা বলতে পারে আমীর। ওকে খবর পাঠাতে হয়। আমীরকে জবাবের কোনো সুযোগ না দিয়েই বলে শাহনাজ, আপনার লেখাগুলো পাঠিয়ে দেবেন তো। এক অবসরে পড়ে নেব।
আমীর বলে, কিন্তু সেসব যে বাংলায়।
তাতে কি, মিসেস রজব আলীকে দিয়ে পড়িয়ে নেব।
ও নামটা উচ্চারণ করে যেন অকারণ পীড়া দেয় শাহনাজ।
কিন্তু শাহনাজ থামে না। বলেই চলেছে, সুইটি লেডি। স্বামী একটু ঘরকুনো। তা হোক। মেয়েটা কিন্তু মিশুক।
ভুরি ভোজনের ব্যবস্থা ছিল। কার কি পছন্দ, কার কি খেতে আপত্তি সেটা জেনে নিয়েই যেন আয়োজন। শাহনাজ বেগম যেন নিছক ভদ্রতার জন্যেই একটা প্লেটে সামান্য কিছু তুলে নিয়ে সঙ্গ দিলো সারাক্ষণ।
তোগালিত্তি বলল, বহুদিন অমন রান্না খাইনি।
তেমন হলো কই। আগে জানলে রওশনচকে লোক পাঠাতাম। হাটবারের দিন ভালো তরিতরকারি পাওয়া যায়। ঘরে যা ছিল তা দিয়েই সামান্য ব্যবস্থা।
নরম সোফায় বসে খাবার পর হাত-পা ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল। ভূরি ভোজনের পর একটু তন্দ্রালস ভাব।
শাহনাজ বেগম সচকিত করে বলে ওঠে, আসুন এ ঘরে আসুন। আমার কালেকশান দেখবেন না?
যন্ত্রচালিতের মতো যেতে হলো তার পেছনে পেছনে। ঘরটা অন্ধকার ছিল। বাতি জ্বালাতেই চোখে পড়ে সুদৃশ্য কার্পেটে ঢাকা দেয়ালে কিছু দুর্মূল্য ছবি। ঘর জুড়ে কোথাও পেতলের পিলসুজ, কোথাও পুরোন ঝাড়লণ্ঠন। একপাশে হাতির দাঁতের তৈরি টেবিল। সঙ্গের চেয়ারটিও সে তুলনায় জাঁক-জমকের।
শাহনাজ বলে, এটায় বসে ওয়ালি খান লিখতেন। আসলে আমার এখানে যা দেখছেন প্রায় সবই তাঁর কালেকশান। কিছু অবশ্যি জাদুঘরে গেছে। খানিকটা জায়গা কালো পর্দায় ঢাকা ছিল। ওখানা সরিয়ে দিতেই চোখে পড়ে বিচিত্র নক্সার এক প্রস্থ কাপড়। মাঝে মাঝে এত সরু ও সূক্ষ্ম সেলাই যে চোখেও পড়ে না।
শাহনাজ বেগম বলে, এটা হাতে কাজ করা চাদর। তিনশ বছর আগেকার এক ফ্যামিলির কাছে ছিল। বড় বলে-কয়ে নিতে হয়েছে।
এককোণ থেকে ধুলো ঝেড়ে খুঁজে বার করে রুপোর ফুলদানি। কত বছরের পুরোন বলতে পারেন? প্রায় সাতশ বছর।
বলে যেন নিজেই পুলকিত শাহনাজ বেগম।
আরো ছিল। বুদ্ধের মূর্তি, পুরোন পাঁতি, নথ। সমস্ত ঘরটাই যেন কোনো স্মরণাতীত কালের স্বাক্ষরবাহী।
বুদ্ধিটা দিলো তোগালিত্তি। বলল, মিস শাহনাজ আপনার, কাছে এতসব রেলিক্স। একটা ফিচার লিখলে কেমন হয়।
তা লিখুন না, আপত্তি নেই। কিন্তু সেরকম আগ্রহ এদেশে ক’জনার আছে বলুন।
আমীর বলে, আপনি বললে পারব না কেন।
শাহনাজ বেগম যে খুশি হয়েছে, তার মুখ-চোখ দেখেই আন্দাজ করা যায়। আমীরের প্রস্তাবে সায় দিয়ে বলে, তাহলে তো ভালোই হয়। না না, আমার নিজের পাবলিসিটির জন্যে বলছি না। আমি চাই দেশের লোক জানুক, আমার তো কেউ নেই।
বলতে বলতে কেমন তরল হয়ে আসে তার কণ্ঠস্বর।
সাহস করে তোগালিত্তিই জিজ্ঞেস করে, আপনি বিয়ে করলেন না কেন?
শাহনাজ যেন সে কথা শুনতে পায়নি, এমন ভান করে বলে, সেরকম মন ভরে আপনাদের খাওয়ানো গেল না।
তোগালিত্তি ছাড়ে না। বলে, আমার প্রশ্নের জবাব পাইনি।
শাহনাজ কাছে এসে বসে। হঠাৎ আলোয় উদ্ভাসিত তার চোখ মুখ। চোখের তলায় ক্লান্তির রেখা। কোমল ত্বকের জায়গায় জায়গায় ভাঁজ।
প্রসাধনের মহিমা দিয়েও গোপন করা যায়নি। একটা দুটো চুলে সাদা পাক ধরেছে। তবু অপূর্ব হাসি। সাদা ঝকঝকে দাঁত। তাছাড়াও হাসতে গেলে টোল পড়ে।
খামোখাই একগুচ্ছ চুল চিবুকে পড়ে বারবার বিরক্ত করছিল। ওখানা হাত দিয়ে সরিয়ে শাহনাজ বেগম বলে, এসব এক কথায় বলা যায় না। এক কথায় বলার মতো ঘটনাও নয়।
আমীর অস্বস্তি বোধ করে। ব্যক্তিগত ব্যাপারে এতটা ঔৎসুক্য নিশ্চয়ই ভদ্রমহিলার পছন্দ নয়।
তার সেই সন্দেহের কথাটাই যেন বুঝতে পেরেছে শাহনাজ। তাই বলে, না না। লুকোবার কিছু নেই। আর লুকোবার বয়েস আমার আছে নাকি থোড়াই।
কোনো ব্যর্থ প্রেমের সেই একঘেয়ে কাহিনীর অবতারণা হয়তো।
শাহনাজ তাদের দু’জনকে অবাক করে দিয়ে বলে, আসলে দোষ আমারই। আমিই মন ঠিক করতে পারিনি।
সেটা কীরকম? তোগালিত্তি জানতে চায়।
আমার হয়েছিল এক ভীষণ ফ্যাসাদ মি. তোগালিত্তি। সবাই বলত আমি নাকি বড় দুর্বলচিত্ত। একটা চড়–ই পাখির ডানা ভেঙে গেলেও মনে হতো বোধহয় বুকের একটা পাঁজরের হাড়ই ভাঙল। কেমন হয়ে যতাম।
আমীর বলল, পাখির প্রতি আপনার বুঝি খুব দুর্বলতা।
তা বলতে পারেন। তবে বিশেষ একটার জন্যে নয়। সব পাখির জন্যেই। মানুষের বেলাতেও তাই। জীবনে এগিয়ে এসেছিল যারা তাদের কাউকে প্রত্যাখ্যান করতে মন ওঠেনি। এটা আমার দুর্বলতা না অক্ষমতা, কি জানি।
যেন নিজের স্বীকারোক্তির জবাব কামনা করেই দু’জনের দিকে তাকিয়ে থাকে শাহনাজ বেগম। কথা বলতে বলতে তার গলা ধরে আসছিল। একসময় দাঁড়িয়ে উঠে বলে, দেখবেন তাদের ছবি?
এবার একটা ট্রাঙ্ক থেকে অনেক কাগজপত্রের বান্ডিলের ভেতর থেকে বেরুল একখানা অ্যালবাম। তিনটি ছবি আঁকা তাতে। তিনটি পুরুষ চিত্র।
শাহনাজ বেগমের মুখেই জানা গেল, তাদের তিনজনের কাউকেই গ্রহণ করতে পারেনি, কারণ তাহলে আর দু’জনকে যে প্রত্যাখ্যান করতে হয়। শাহনাজ বেগম তা পারেনি। এবং পারেনি বলেই জীবন তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
কথাটা ঘোরাবার জন্যেই বলে তোগালিত্তি, রাত হয়ে যাচ্ছে না মিস শাহনাজ? আপনি তো ঘুমুবেন।
ওদের দু’জনকে অবাক করে দিয়ে বলে শাহনাজ, আজ তো ঘুমুব না।
কেন?
প্রথম পৃষ্ঠায় যার ছবি দেখলেন আজ তার মৃত্যুর দিন। বেচারি অল্পবয়েসে লাং-ক্যান্সারে মারা গিয়েছিল। যাবার সময় আকুতি জানিয়ে বলেছিল, ভালোবাসতে নাই পারো শাহনাজ, জীবনে অন্তত একদিন আমাকে স্মরণ করো। আজ ওর লেখা চিঠিগুলো বার করব। অনেক চিঠি। অনেকগুলোর কোনো মানেই হয় না। না মিলে আমার চেহারার ডেসক্রিপশান, না সৌন্দর্যের সাধুবাদ। না সেই আবেদ্রুমের পথঘাট। তখন চাকওয়াল যাবার ওই রাস্তাও হয়নি। খালি মাঠ। আমরা কত বিকেল একা একা গপ্প করে কাটিয়েছি।
আমীর অবাক হয়। বেছে বেছে তার কোনো পূর্ব প্রেয়সীর মৃত্যু-তারিখটিতে ডাকল কেন তাদের শাহনাজ বেগম। সে-কথার জবাবও শাহনাজ বেগমের কাছ থেকেই পাওয়াও যায়। বলে, আজ বড় খুশি হতো ও বেঁচে থাকলে। বড় পছন্দ করত লোকজন, হৈ-হুল্লোড়। ভাগ্যিস আপনারা ছিলেন। রজব আলীরা কেউ এলো না।
আমীর না বলে পারে না এবার, ওদের আসবার কথা ছিল নাকি?
বলেছিলাম। কিন্তু রজব আলী আগেই দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। তার অফিসের কাজের অজুহাতে। কিন্তু বৌটাকে পাঠালে কি ক্ষতি ছিল বলুন তো?
অভিযোগের সুরে কথা ক’টা বলে আমীরের দিকে স্থির দৃষ্টি করে শাহনাজ। তারপর নিজের মনেই বলে, ভদ্রমহিলা বেশ ভালো। আমার মনে হয় আলাপ করে বড় খুশি হতো আপনাদের সঙ্গে।
খানিকক্ষণ কোনো কথা হয় না। তারপর আবার শাহনাজ বলে, আপনাদের সঙ্গে আবার শিগ্গির দেখা হবে না।
কেন? তোগালিত্তি জানতে চায়।
আমি তো কাল ভোরের গাড়িতেই চলে যাচ্ছি।
হঠাৎ একটা অদ্ভুত কা- করে বসে শাহনাজ বেগম। আমীরের হাতখানা ধরে বলে, একটা অনুরোধ করব। রাখবেন?
হ্যাঁ হ্যাঁ। কেন রাখব না।
যে ক’দিন আছেন এখানেই থাকুন না আপনারা। রেস্টহাউসের আরাম দিতে পারব না। তবে কষ্টেও রাখব না। চাকর-বাকর তো ছ’মাস ঘুমিয়েই কাটায়। আপনারা কিছুদিন থাকলে বর্তে যাই।
প্রস্তাবটা মন্দ নয়। কিন্তু হঠাৎ সাহস করে কিছু বলতে পারে না আমীর। তোগালিত্তির মতটা জেনে নেওয়া দরকার।
শাহনাজ প্রস্তাবের আকস্মিকতায় তার ইতস্তত ভাবটা বুঝতে পেরেছিল। তাই বলল, যখন খুশি আসুন। কোনো দিব্যি নেই, কালই আসতে হবে। দারোয়ানকে বলা রইল। যখন বলবেন ব্যবস্থা করে দেবে।
আমি কিছুক্ষণ পরে বলে, দেখি কেউ এলো বোধহয়।
কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বলে, যা ভেবেছিলাম। মিসেস রজব আলী খবর পাঠাল এইমাত্র। চিঠি লিখে জানিয়েছে ওর নাকি ভয়ানক লজ্জা করে। আচ্ছা বলুন তো এর মধ্যে লজ্জার কী হলো?
আমীর আর তোগালিত্তি পরস্পর চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে। মূঢ়ের মতো তাকিয়ে থাকে শাহনাজ বেগম।
ষোলো
সাবজোয়ারী বরাবরই কম কথা বলে। তার নিরুত্তেজ চেতনাকে চটিয়ে দেবার মতো যেন কিছুই নেই এ রাজ্যে। হাসি-কান্নার খেলা সে তো কতই দেখেছে! দেখেছে, কেমন করে একদিন সব পাথর হয়ে যায়। তলিয়ে যায় স্মৃতির অতলান্ত গভীরে। নিজের বেদনা আর বঞ্চনা নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই। নেই কোনো অনুযোগ। সাবজোয়ারী জানে তার এই শান্ত স্থির, নিরুদ্বেগ দৃষ্টিভঙ্গি ভালো লাগে না অনেকেরই। কিন্তু না লাগলেই কী করবে! হঠাৎ করে নিজেকে বদলে দেবার ক্ষমতাও যে নেই। এই অক্ষমতাই একদিন তাকে গভীর মর্মপীড়া দেয়। যেমন দিয়েছিল সেদিন। উ™£ান্তের মতো এসে ঢোকে আমীরের ঘরে। বরাবরের এই শান্ত মানুষটি যেন আজ বিবেকের তাড়নায় ক্ষিপ্ত। ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে। হাঁপিয়ে উঠেছে সাবজোয়ারী।
ডেসপ্যাচের কপি লিখতে বসেছে আমীর। আবেদ্রুম থেকে পাঠানো বোধকরি তার শেষ কিস্তির লেখা। সাবজোয়ারীকে দেখে টাইপরাইটার রেখে উঠে পড়ে আমীর। বলে, আসুন আসুন। কি সৌভাগ্য!
সাবজোয়ারী যেন তার চোখের দিকে তাকাতে পারে না। কি এক অব্যক্ত বেদনার ছায়া তার চোখে।
তারপর প্রায় এক নিশ্বাসে বলে ফেলে, আমি সাধ্যমতো বুঝিয়ে বলেছি। কিন্তু কি করব বলুন। আমি তার এসিসটেন্ট।
আমীর আঁচ করতে পারে, দ্বন্দ্ব আর সংঘাতের মেঘ জমেছে কোথাও গাঢ় হয়ে এবং তাকে কেন্দ্র করেই। তবু প্রসন্ন হাসি ফুটিয়ে বলে, ব্যাপারটা কী শোনা যাক।
ব্যাপার বুঝতেই পারছেন। নক্শবন্দী আর সময় দিতে রাজি নয়। বলে, কোন কাগজের কি সুবিধে-অসুবিধে হচ্ছে সেটা দেখার দায়িত্ব আমার নয়।
আমাকে এখানকার মায়া ত্যাগ করতে হবে এই তো?
এবার যেন নিজের নিরপরাধতার কথা বোঝাবার নিস্ফল চেষ্টায় বলে সাবজোয়ারী, আমি রাজি হইনি। কিন্তু কী করব বলুন, সারা জীবন কারও না কারও এসিসটেন্টই রয়ে গেলাম। আমার মতের কোনো দাম নেই। তার নিজের দুঃখের চেয়ে সাবজোয়ারীর জন্যেই যেন মায়া হয় বেশি।
আমীর বলে, তা আপনি মন খারাপ করছেন কেন? আপনার তো কোনো হাত ছিল না।
সাবজোয়ারী যেন স্বস্তি পায়। বলে, শুধু আমি নই। কিউরেটারও প্রথম সই করতে রাজি হয়নি। কিন্তু নক্শবন্দীর পীড়াপীড়িতে করতে হলো। আর না করেই উপায়। নক্শবন্দী সামনের মাস থেকে সাইটের চার্জ নেবে। সে-ই দেখাশোনা করবে। কিউরেটারের হুকুম নিতে হবে না। রেস্টহাউসও থাকবে তার আন্ডারে।
আর আপনি?
আমি যেমন ছিলাম তেমনি। তার এসিসটেন্ট।
তারপর যেন চোখাচোখি হবার ভয়েই মাথা নিচু করে বলে সাবজোয়ারী, নোটিশটা আমিই নিয়ে এসেছি। নিন।
বলে একটা কাগজ বাড়িয়ে দেয় তার হাতে। যেন তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করার সাহস নেই।
যথাসম্ভব ভদ্রগোছের নোটিশ। আগামী চব্বিশ ঘণ্টায় উঠে যাবার বিনীত নির্দেশ। অজুহাত, প্রতœতাত্ত্বিক বিভাগের নতুন আরেকটি দল এসে পৌঁছুতে পারে যে-কোনো মুহূর্তে। সাবজোয়ারী যেন মৃত্যু সমন দিতে এসেছে, এমনি অপরাধীর মতো চিঠিখানা হাতে দিয়েই চলে যাওয়ার উপক্রম করে।
আমীর বসতে অনুরোধ জানায়।
না বসব না। আর তাছাড়া –
যা সন্দেহ করেছিল বোধহয় তাই।
কী হয়েছে বলুন না।
সাবজোয়ারী কয়েকবার চেষ্টা করেও যেন গুছিয়ে বলতে পারে না। তারপর একসময় বলে, আমার বড় দুঃখ হলো। তাছাড়া আমি নিজেও বিশ্বাস করি না এসব।
কীসব?
যেন আমীরের প্রশ্নজালে জর্জরিত হয়েই বলতে হয় তাকে শেষ পর্যন্ত, এই মিসেস রজব আলী আর আপনাকে কেন্দ্র করে কীসব কথা। অবশ্যি তাও ভালো, রজব আলীর কানে ওঠেনি।
কীসব কথা। শোনাই যাক না।
না না। আমি এসবের মধ্যে নেই। ডাহা মিথ্যে কথা।
আমীর কৌতুক করে বলে, কেন সত্যিও তো হতে পারে।
সাবজোয়ারী নির্বোধের মতো হাসে, ছি ছি। কীসব বলছেন। এ কখনও বিশ্বাসযোগ্য?
কী বিশ্বাসযোগ্য নয়?
এই নক্শবন্দী যা বলল আমাকে! থাকগে সেসব কথা। আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। উল্টো নক্শবন্দী বলল, যা জানেন না তা নিয়ে মাথা ঘামাতে আসেন কেন? যান, নিজের কাজ করুন।
আমীর জিজ্ঞেস করে, তোগালিত্তিকেও যেতে হচ্ছে নাকি?
না। কিউরেটার রাজি হয়নি। বলে, ওরা ফরেন টুরিস্ট। ওদের সঙ্গে যেমন খুশি ব্যবহার করা যায় না।
এক মুহূর্ত কোনো কথা সরে না আমীরের মুখে।
বোধহয় এখানকার মায়া কাটিয়ে যাওয়াই ভালো। নক্শবন্দীকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। যেতে হতোই একদিন। এ যাওয়ার পেছনে একটা তাড়না থেকে ভালোই হলো। খবরের কাগজের জন্যে আরো কিছু চিত্তাকর্ষক খবর জোগাড় হলো না, দুঃখ সেটা নয়। দুনিয়ার কোনো খবরই চূড়ান্ত নয়। কোনো কিছুরই নিষ্পত্তি হয় না। একটা না একটা জের চলতেই থাকে। যে ক’দিন ছিল, দেখেছে, শুনেছে। অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরে নিয়েছে। এখন যাওয়াই ভালো।
আমীর বলে, ভালোই তো। একদিন তো যেতেই হতো। তবু একটা অজুহাত মিলল, কী বলেন?
সাবজোয়ারী সে কথার কোনো জবাব দেয় না।
তারপর একটু ভেবে বলে, আমার নিজের এখানে কোনো কোয়ার্টার নেই। তা না হলে –
উল্টো যেন তাকে প্রবোধ দিয়ে বলে আমীর, আপনি অযথাই ভাবছেন। আপনার কি দোষ? তোগালিত্তি থাকুক। দু’চার দিনেই আমি পাততাড়ি গুটাব।
সাবজোয়ারী আস্তে আস্তে বেরিয়ে পড়ে।
যথানিয়মে এ সময় তোগালিত্তি আসে। বেড়াতে যায় সঙ্গে নিয়ে। ঘরে ঢুকেই কিউরেটারের লেখা নোটিশখানার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নেয়।
আমীর বলে, আজ আর বেড়াতে যাবো না। বোধহয় এটাই রেস্টহাউসে আমার শেষ সন্ধে। ঘরে বসেই কাটিয়ে দেবো ভাবছি।
তোগালিত্তি এবার মুখ খুলল, আমিও থাকব না।
আমীর বলে, সে কি কথা! আপনার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।
জানো আসল ব্যাপার কি। আমি এত দেশ ঘুরেছি, কোথাও এক নাগাড়ে এতদিন থাকিনি। এখানে এসেই কেমন যেন মনটা স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে। কেমন যেন হয়ে গেছি। আমি যে বসবার জন্যে, জিরুবার জন্যে নই, সে কথাও ভুলতে বসেছি। আমার রক্তে যে ঘুরে বেড়ানোর নেশা, সেটা আফিমখোরের মতো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। এর চেয়ে দুঃখের আর কী হতে পারে বলো?
আমীর বলে, তবে এতদিন থাকলেন কী করে?
সে কথাই বলছিলাম। এ আমার স্বভাব-বিরুদ্ধ। দু’দিন আরামের স্বাদ পেয়ে মনটা বড় বেশি ঘরকুনো হয়ে পড়েছিল। ভালোই হলো। এমন করে মোহভঙ্গ না হলে বোধহয় চিরকালই পড়ে থাকতে হতো এখানে।
তাদের দু’জনকে সচকিত করে দিয়ে একটি ছায়ামূর্তি এসে ঢোকে সে ঘরে। আমীর যেন নিজের চোখজোড়াকে বিশ্বাস করতে পারে না। মিসেস রজব আলী।
দু’জনের দিকে মৃদু তাকিয়ে যেন বিশেষ কাউকে উদ্দেশ্য না করেই বলে নীলা, চলে যাচ্ছেন শুনলাম।
নিছক ভদ্রতার আবরণটুকু দরকার বলেই যথাসম্ভব সংযত হয়ে বলে আমীর, ভালোই হলো দেখা হয়ে গেল। আপনার সঙ্গে।
নীলা একটি অদ্ভুত কা- করে বসে। কোনো অনুরোধের অপেক্ষা না করেই চেয়ারখানা টেনে নিয়ে বসে। তারপর তেমনি শান্তকণ্ঠে বলে, যাবো বললেই যাওয়া হয় না।
কেন, এরপরও পুলিশ লেলিয়ে দেবার ইচ্ছে আছে নাকি?
না বলে পালিয়ে গেলে কিন্তু তাই করতে হবে।
কেন?
বা, এমন সময় কেউ যায় শুনিনি। মাটি খোঁড়াই হলো না। কিছু বেরুল কি বেরুল না, না জেনেই অমনি ছুটবেন।
এবার যে যাবার সমন ঘাড়ে ঝুলছে।
ও, সেটা পেয়েই বুঝি জার্নালিস্ট আর টুরিস্টের নাভিশ্বাস। শুনেছিলাম কোনো কিছুতেই নাকি ভড়কে যাওয়ার লোক নন আপনারা। আর তাছাড়া আপনাদের রেস্টহাউস ছাড়তেই বলল কে?
তোগালিত্তি বলে, আপনার স্বামী।
ও।
এবার কেন যেন হঠাৎ কিছু বলার খুঁজে পায় না নীলা। বোঝা যায় একটা তীব্র আক্রোশে নিশ্বাস ভারি হয়ে আসছে।
জ্বলে ওঠে নীলা, এরকম নির্দেশ পাঠানোর মানে?
কিন্তু সে এক মুহূর্তের জন্যেই। যেন তার জবাবটা নীলা নিজেই জানে। জানে, এর কোনো জবাবই হয় না।
নিজেকে সামলে নিয়ে মাথা নিচু করে বলে, অবশ্যি ব্যাপারটা যে আঁচ করতে পারিনি, তা নয়। তবে কি জানেন, আমার স্বামীর কোনো ব্যাপারে আমি হস্তক্ষেপ করি না।
আজই বা করতে হবে কেন? জিজ্ঞেস করে আমীর।
শান্ত কণ্ঠেই জবাব দেয় নীলা, না আজও করব না।
এবার ব্যাগ থেকে এক তোড়া চাবি বার করে বাড়িয়ে দেয় বলে, শাহনাজ বেগমের ঘরের চাবি। ঘরটা ভালোই। খোলামেলা। আমার মনে হয় ভালোই লাগবে আপনাদের।
তোগালিত্তি বলে, আমার তো কোনো কাজ নেই। থাকার আর কি মানে? নীলা উল্টো তর্ক করে, কাজ না থাকলেই কি থাকতে নেই। অন্তত অকাজের লোকগুলো কাজের লোকদের একটু সঙ্গ দিতে পারে। আমি চলি। এই রইল চাবি। শাহনাজ বেগম দিব্যি দিয়ে গিয়েছিলেন, যেন নিজে হাতে করে দিয়ে আসি। ঘর আমি আগেই ঝেড়ে মুছে রেখেছি। কোনো অসুবিধে হবে না। তবে হ্যাঁ, জানালাগুলো ভালো করে টেনে ঘুমুবেন। যা বাতাসের তোড়।
সতেরো
শাহনাজের বাড়িটা সব দিক দিয়েই মনোরম। প্রচুর জায়গা। হাত-পা ছড়িয়ে দেয়ার মতো। লম্বা বারান্দা। সামনে বিস্তৃত লন। ভেতরে বড়মতো একটা হলঘর। দুটো শোবার ঘর। আরেকটা কামরা পড়াশুনোর জন্যে আলাদা করা। সেখানে কুশন দেওয়া চেয়ার পাতা।
জানালায় ফিকে কমলাই রং-এর পর্দা।
পড়াশুনোর যে ঘর, তার চার দেয়াল জুড়ে বই-এর তাক। দামি মলাটে ভল্যুম করে বাঁধানো। একদিকে শো-কেস! যেন এই গুরুগম্ভীর পরিবেশ ওটাই একমাত্র রসিকজন। চীনে মাটির পুতুল, খেলনা, রকমারি এ্যাশট্রে, হাজার সোভেন্যিরে ঠাঁসা।
শাহনাজ বেগম নিজে একদিন বলেছিল, আমার ওই বদভ্যেস। যেখানে যা পাই, যা ভালো লাগে, কুড়িয়ে এনে ঘর সাজাই।
আমীর বলেছিল ভারি মজার শখ তো। মাঝে মাঝে বার করে দেখেন বোধহয়।
ক্ষেপেছেন, অত সময় কই আমার। দূর থেকে দেখেই আনন্দ। কি জানি ছুঁতে গেলে যদি ভেঙে যায়। আমার সংস্পর্শে তো সবই ভাঙে।
তারপর আর কোনো কথা হয়নি এ নিয়ে।
একদিকে দেয়ালের লাগোয়া সেক্রেটারিয়েট টেবিল। দু’পাশে চেয়ার। একখানা পুরু গদি আঁটা। অন্যটা মামুলি বেতের।
জিনিসপত্র গুছোতে রাত হয়ে আসে। বাইরে ঠান্ডা। আমীর বসেছিল গদি আঁটা চেয়ারে। ভালোই লাগছিল।
পাশের কামরা থেকে বেরিয়ে আসে তোগালিত্তি। বলে, কি এখানে বসে কী করছ?
কী আর করব। টেবিলটা দেখে বড্ড লেখার ইচ্ছে হলো। বসুন না আপনিও মুখোমুখি। আপনার তো টাইপে ভালো স্পিড। দেবেন টাইপ করে? আমি বলে যাই। হয়তো এই আমার শেষ ডেসপ্যাচ।
টাইপরাইটার নিয়ে বসে তোগালিত্তি।
হঠাৎ উঠে বলে, না। পারব না।
কেন, কী হলো?
কেন যেন তোমাকে ওই গদি আঁটা চেয়ারে বসতে দেখলে মনে হয় আমার সামনে জাঁদরেল কেউ বসে। শাহনাজ বেগমের মতোই। আর – আর কী? টাইপ থেকে মুখ না তুলেই শুধায় আমীর।
আর আমাকে তার পাশে মনে হয় কোনো ইন্সিওরেন্স কোম্পানির দালাল কিংবা বড়জোর একজন চাকরির উমেদার।
হো হো করে হেসে ওঠে আমীর, বুঝেছি আজ আর আমার ডেসপ্যাচ টাইপ করা হবে না।
দু’জনই চোখ বাড়িয়ে দেখল জানালার বাইরে দুটো মায়াবী জগৎ যেন। একটা রেস্টহাউস, অন্যটা কিউরেটারের বাড়ি। দুটোই ভীরু আলোয় উজ্জ্বল যেখানে আশারা দপ্ দপ্ করে জ্বলে আর নেবে। দূরে আবেদ্রুমের রাস্তা, যেখানে এখন কোনো সভ্যতার ওপর কোদাল চালানো শেষ হয়নি।
সহস্র বছরের ঘুমন্ত সভ্যতা কখন এ যুগের আলোয় চোখ কচ্লে উঠবে। কখন এ যুগের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে ফেলবে তারই প্রতীক্ষায় এতগুলো হুজুগে মানুষের নিদ্রা নেই। অন্তহীন সাধনা।
তোগালিত্তি বলে, কেন যে তোমার সাথে একাত্ম হয়ে উঠেছি। কেন ভালোবেসে ফেলেছি কি জানি।
আমীর বলে, তার আপনি কী করবেন। এ হৃদয়ের তাড়না। এক ভালোবাসা থেকে যার যাত্রা আরেক ভালোবাসায়। এমন কিছু আমাকেও আঁকড়ে রেখেছে হয়তো। তা নইলে বিশ্বাস করুন আর কোনো কিছুর প্রতি আমার আকর্ষণ নেই। আর ক’টাই দিন? তারপর আমাকেও যেতে হবে। আপনাকেও। সে ক’টা দিন রঙ্গমঞ্চে নট-নটীদের ভাগ্যে কী আছে দেখে যাবেন না?
তোগালিত্তি তার হ্যাভারস্যাকখানা মাটি থেকে তুলে নিয়ে একটা ব্র্যাকেটে ঝুলিয়ে রাখতে রাখতে বলে, দেখা যাক। তার আগে একটা কথা বলো, মিসেস রজব আলীকে ভালোবেসেছিলে?
ও ভালোবাসত একদিন।
তা জানি। আজ?
আজ ওর কথা জানি না। আমার কথা জানি।
ওদের দু’জনকে স্তব্ধ করে দিয়ে কলিং বেল বেজে ওঠে।
তোগালিত্তি গলা বাড়িয়ে দেখে বলে, তুমি ভেতরে এনে বসাও। আমি বারান্দায় গিয়ে বসি ততক্ষণ। তুমি কথা বলো। যদিও এক বিন্দুবিসর্গ বুঝব না। তবু আমার এই উৎসুক চোখ অমন করে তাকিয়ে থাকলে তোমায় ভালো লাগবে না জানি। আসলে মুখের ভাষা যতই ভিন্ন হোক, চোখের ভাষা সবখানেই এক।
কোনো জবাব দেবার আগেই তোগালিত্তি অদৃশ্য হয়।
যেন আর অবাক হওয়ার মুহূর্তটিকে কেড়ে নিয়ে নিজে থেকেই কৈফিয়ৎ দেয় নীলা, বেড়াতে বেরিয়েছিলাম চাকরটাকে সঙ্গে নিয়ে। উনিও নেই। কোথায়?
আজ বিকেলে টুরে গেলেন। পরশু ফিরবেন। তা ঘুমুচ্ছিলেন নাকি?
না তো।
আবার আমতা আমতা করে বলে নীলা, না আমি এসেছিলাম জানতে কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো। ঠান্ডা বেশি নেই তো। কম্বল পাঠাব?
না।
কিউরেটারের ওপর আপনাদের খুব রাগ, না?
আমীর মৃদু হেসে বলে, না তো।
আশ্চর্য ক্ষমাশক্তি আপনাদের। আমি হলে অত সহজে ছাড়তাম না।
খানিকক্ষণ কোনো কথা নেই।
আমীর অনুভব করে কিছু একটা বলার জন্যে মন আইটাই করে। এ ক’দিনের দ্বন্দ্ব ও সংঘাত মনে যে আকাক্সক্ষা আর বাসনার ঝড় তুলেছে, কোনোমতেই পারছে না তাকে বশ মানাতে।
নীলা আজ গিন্নী হয়েছে। আজ যখন খুশি হাওয়া খেতে খেতে নিরুত্তাপ আনন্দে ঘরে ঢুকে মামুলি ছন্দে জিজ্ঞেস করতে পারে ঘুমুচ্ছিলেন নাকি।
কম্বল পাঠিয়ে দেবো নাকি।
নীলাই আবার বলে, কাল একবার আসবেন।
কোথায়, বাসায়?
না। রেস্টহাউসের কাছেই আসুন বিকেলে। সেখান থেকে বেড়াতে যাবো।
কিন্তু –
কেন, সময় নষ্ট হবার ভয় নাকি?
না।
নীলা বলে, হয়তো সাংবাদিকদের নতুন কোনো লেখার খোরাক জুটবে।
কি আসবেন?
আসব।
নীলার তাড়া ছিল। আমীরও পীড়াপীড়ি করে না।
তাকে বিদায় দিয়ে এসে অনুভব করে, নীলা যেন একরকম জোর করেই তার মনের ইচ্ছেটাকে ওর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। ওর ইচ্ছের খেলাটা ছুটিয়ে যাচ্ছে বল্গাহীন অশ্বের মতো।
তোগালিত্তি তখনও বসে এক মনে।
আমীর বলে, কী ভাবছিলেন?
ভাবছিলাম এ ভদ্রমহিলার কথা।
কোন ভদ্রমহিলা?
যেন তাকে নিরাশ করেই বলে তোগালিত্তি, এই শাহনাজ বেগম। অদ্ভুত। আমার মনে হয় সবই ওর বানানো কথা। ওর দশাও আমারই মতো। দুনিয়ার কোথাও ওর কোনো কাজ নেই। পালিয়ে গিয়ে নিজের কোনো অজ্ঞাত দুঃখকে চেপে যাওয়ার চেষ্টা ছাড়া। আসলে তার অসহিষ্ণু মন কোনোখানেই টিকছে না। কোনোখানেই টিকবে না। এক এক সময় মনে হয় সে আমারই মতো।
অনেক রাত তখন। তোগালিত্তি উঠে দাঁড়ায়।
আমীর অবাক না হয়ে পারে না। বলে, এত রাতে কোথায় চললেন?
ঘুরে আসি। মনটা ভালো নেই। জানো, আরাম আয়াশে থাকার কথা আমি ভাবতেই পারি না। কেমন যেন হাঁপিয়ে উঠি।
এখন কোথায় যাবেন?
বোধহয় সাইটে। তারপর কি জানি –
এত রাতে? সে তো অনেক দূর।
চাকওয়ালের একটা বাস যায় রাতে। ওটা পেলে কাছাকাছি পৌঁছে যাবো। বাকি পথ হেঁটে যাবো।
কী দেখবেন আবেদ্রুমে?
হয়তো কিছুই দেখব না। অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে যাবো। সেখানে ছোটমতো একটা ঘর দেখেছিলাম। কি জানি কি ছিল সেখানে। ইচ্ছে করছে ওই পৈশাচিক অন্ধকারে বসে রাত কাটিয়ে দিই।
ভয় করবে না?
হ্যাভারস্যাক আর ক্যামেরাখানা বগলদাবা করে বলে তোগালিত্তি, ভয় করবে কেন? ফিরে আসার নিরাপদ জায়গা যাদের আছে, ভয় তাদেরই মানায়। আমাকে মানাবে কেন?
আমি আসব?
সত্যি সত্যি বুট জুতো পরেছে। বাঁ হাতে একটা টর্চ। কতকটা সেই প্রথম যেবার শাহপুর স্টেশনে দেখেছিল তেমনি সাজগোজ।
তোগালিত্তি বলে, তুমি কেন? অমন অন্ধকারে তোমাকে মানায় না। তুমি ভয় না পেলেও তোমার জন্যে উৎকণ্ঠায় যে কারও ঘুম হবে না।
হঠাৎ তোগালিত্তির হাত চেপে ধরে বলে আমীর, আমার মনে হয় আপনি চলে যাচ্ছেন। একটা কথা কোনোদিন বলিনি। আজ জিজ্ঞেস করব। বুট জুতার ফিতেটায় আরেকটু শক্ত গেরো দিয়ে বলে তোগালিত্তি, কী কথা? নীতি কথা ছাড়া আর সব শোনাতে পারি।
রুদ্ধ নিশ্বাসে ওর দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে বলে আমীর, আমার কী উচিৎ?
কী উচিৎ?
মিসেস রজব আলী যে দেখা করতে বলল।
এমন জোরে হেসে ওঠে তোগালিত্তি যেন ঘরশুদ্ধ কেঁপে ওঠে।
উচিৎ, অনুচিৎ, আমি কেন, কেউ বলতে পারবে না। যার যার মনের কাছে জিজ্ঞেস করাই ভালো। তুমি ভালোবেসেছ সেটা যদি মিথ্যে না হয়, ও তোমাকে ভালোবেসেছিল সেটাও যদি সত্যি হয়, তবে সেই স্মৃতিবিজড়িত দিনগুলো স্মরণ করতে বাধা কি।
কিন্তু এ অবস্থায়, যখন আমার কোনো দাবিই নেই?
দাবি তো নেইই। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও কেউ শুনছে না। কিন্তু তুমি তো কিছু ভাঙতে শুরু করোনি। কিছু গড়তে চাও না। জুয়াড়ির মতো যে চালে একদিন বাজিমাৎ হয়েছিলে, আজ আবার সেই চালটা নতুন করে দেখতে চাও। এত দোষের কি।
আমীর যেন তার কথা বোঝে না। বলে, আপনি আমার প্রশ্নের জবাব দেননি।
তোগালিত্তির বুটের আওয়াজ শোনা যায়, নুড়ির ওপর। ঠক্ ঠক্ আওয়াজ। যেতে যেতেই বলে, সে প্রশ্নের জবাব কেইবা দিয়েছে, না দিতে পেরেছে।
পেছনে পেছনে দৌড়ে যায় আমীর।
সে কথার জবাব পাওয়া গেল না। তোগালিত্তি পাহাড়ের ঘোরানো পথ ধরে মাঠ বরাবর হাঁটছে।
আঠারো
সেদিন রাতেও না, এমনকি পরদিন সকালেও তোগালিত্তি ফিরে এলো না। এমনি একটা কিছু আশঙ্কা করেছিল আমীর। কিন্তু সেটা এ এমন আকস্মিক হবে কল্পনা করেনি।
বোধহয় তোগালিত্তির কথাই ঠিক। মায়ার বন্ধন যতই দৃঢ় হতে থাকে, যাবার তাড়না ততই তীব্র হয়। অন্তত তা না হলে অব্যাহতি নেই। এক বন্ধনের জালা থেকে আরেক বন্ধনের জ্বালা। এর তোগালিত্তিও বোধহয় বুঝেছিল, যাচ্ছি বলে বিদায়ের মুহূর্তে করুণ করে তোলার কোনো মানে হয় না। যাবার বেদনা এমনিতেই যথেষ্ট দুঃসহ। দুপুর গড়িয়ে বিকেল আসে। আজ কোনো কজেই মন বসে না। চারটা কার্বন কাগজ নষ্ট করেও দু’লাইন টাইপ করতে পারেনি। হঠাৎ মনে হলো নীলার আমন্ত্রণের কথা। বলেছিল বিকেলে রেস্টহাউসের দিকে আসতে। কোথাও বেড়াতে যাবে।
করিম বক্স লন মোয়ার দিয়ে বাড়তি ঘাসের সদ্গতি করছিল। রেস্টহাউসের কাছাকাছি যেতেই তার সঙ্গে দেখা। তারই মুখে শোনা গেল সেই বহু-বিঘোষিত আর্কিওলজিস্টদের দল এখনও এসে পৌঁছয়নি। তাদের কামরা এখনও খালি। তালা ঝুলছে। সাবজোয়ারীও নেই। ছুটি নিয়ে বাড়ি গিয়েছে। গোটা রেস্টহাউসে এখন একাই নক্শবন্দী। বোধহয় এমনটিই চেয়েছিল সে।
ইচ্ছে করেই ভেতরে ঢুকল না। ধারেই খানিকটা উঁচুমতো জায়াগা। কয়েকটা ইউক্যালিপটাসের ছায়া-আশ্রয়। সেখানেই বসে পড়ে আমীর। পায়ের শব্দ শুনে সচকিত হয়ে ওঠে। কিন্তু না। নীলা নয়, নক্শবন্দী। কী করছেন বাইরে? আসুন।
আমীর হেসে বলে, না ধন্যবাদ। এখানেই বেশ লাগছে।
নক্শবন্দী চোখ থেকে পুরু চশমা জোড়া নাবিয়ে বলে, আর তো এলেন না। আপনি বা তোগালিত্তি।
তোগালিত্তি তো নেই।
নেই? যেন এতটা আশা করেনি নক্শবন্দী।
তারপর বলে, যাবার আগে বলেও গেল না। অন্তত দেখা করে যাবে আশা করেছিলাম।
তাই নাকি? আমাকেও বলে যায়নি।
তাই নাকি?
ঠিক যেন কিছু বলার মতো পায় না নক্শবন্দী।
থেমে নিয়ে বলে, আশাকরি আপনি ওরকম করবেন না আবার।
আমীর বলে, না। জানিয়েই যাবো।
একসময় কেমন চতুর দষ্টি মেলে আবার বলে নক্শবন্দী, আপনার তো দু’দিকেই লাভ হলো।
তার মানে?
মানে একটা ঐতিহাসিক জায়গা দেখা হলো। আবার চেনা পরিচিত লোকেরও সন্ধান পেলেন।
ঠিক যেন তার ইঙ্গিত বুঝতে পারেনি এমন ভাব দেখিয়ে বলে আমীর, কার কথা বলছেন।
কারও কথা নয়। এমনি বললাম। সেদিন বুঝি মিসেস রজব আলী আপনাকে চা খেতে ডেকেছিলেন?
আঁৎকে ওঠে আমীর, কোন দিন?
তা তো মনে নেই। আপনার মতোই কাকে দেখলাম যেন সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে।
আমীর নিরুত্তর।
পরশু আবার আপনাদের ওখানে গিয়েছিলেন বুঝি।
সেটাও দেখলেন নাকি?
ইতস্তত করে বলে নক্শবন্দী, না অনুমান করলাম। মিসেস রজব আলী বড় বেশি একটা বাইরে যান না। একটা কাজে টেলিফোন করেছিলাম। পাইনি।
বিকেলের পড়ন্ত রোদেও দেখতে পায় আমীর, একটা আহত ক্রোধ যেন নক্শবন্দীর চোখ শ্বাপদের মতো হিংস্র করে তোলে।
তার চোখে চোখ রাখতে ভয় পায় আমীর।
নক্শবন্দী বলে, অথচ আমি ডাকলে তিনি কখনও আসেন না। এতদিন রয়েছি, কই এক কাপ চা খেতেও ডাকেননি।
সে কথা আমি জানতাম না।
না জানবারই কথা। এসব কেউ কাউকে বলে বেড়ায়? আপনার প্রতি উনি বোধহয় খুব সদয়।
আমীর প্রশ্নটা এড়ানোর চেষ্টাতেই বলে, সদয় বলা যায় না। আগে ওকে চিনতাম। অনেকদিন পর দেখা হলো।
তারপর?
যেন কোনো একটা রসঘন কাহিনীর পরিণতি শোনার উদগ্র বাসনা নক্শবন্দীর।
তারপর আর কি। কিছু না।
সেই পড়ন্ত বিকেলে ম্লান রোদেই একটি ছায়া এসে দাঁড়ায়। নক্শবন্দী হকচকিয়ে যায়। বলে, এ কি মিসেস রজব আলী যে।
যেন সে কথার জবাব দেবারও প্রয়োজন মনে করে না। কেবল একটি সংক্ষিপ্ত অভিবাদন বিনিময় করে।
তারপর আমীরের দিকে তাকিয়ে বলে, একটু দেরি হয়ে গেল, না?
না। বরং ভয় ছিল ভুলেই বসলে বুঝি।
ভুরু পাকিয়ে বলে নীলা, কেন সন্দেহ ছিল নাকি।
একটু ছিল বৈকি।
নক্শবন্দী কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো কিছুক্ষণ ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর একসময় বলে, আপনারা বরং গপ্প করুন আমি চলি।
নীলা বলে, আমরাও বসব না।
নক্শবন্দী জিজ্ঞেস করে, বেড়াতে যাবেন বোধহয়।
বোধহয়।
যেন অযাচিত হয়েই খানিকটা সদুপদেশ দেয় নক্শবন্দী, এখানে থেকে মাইল আর্দ্ধেক দূরে সুন্দর ঝর্ণা। অনেকেই বেড়াতে যায়। দেখে আসুন না।
তেমনি মিষ্টি প্রত্যাখ্যানের হাসি হেসে বলে নীলা, আমরা ঝর্ণা দেখতে যাচ্ছি না।
এরপর বোধহয় আর কোনো অজুহাতই নেই।
নক্শবন্দী কেমন উদাস হয়ে তাকায়। তারপর বলে, তাহলে আমিও চলি। হাতে কিছু কাজ।
পেছন থেকে তার মুখখানা দেখতে না পেলেও বেশ বোঝা যায়, নক্শবন্দীর পা সরছে না। মিছিমিছি কাজের ছুতোর ঘরে ঢুকে একসময় বাতি বুজিয়ে দিয়ে বসে থাকবে।
নক্শবন্দী চলে যেতে আমীর জিজ্ঞেস করে, কোথায় যাবে?
চলো।
এ আজ নতুন কোনো পথে নিয়ে এলো নীলা। ওদের বাড়ি রাস্তাটা সেখানে গেছে মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টের পাশ দিয়ে। সেখানে সেনাবাহিনীর ছাউনি। মাঝে মাঝে দু’একটা বাড়ি। তা নইলে প্রায়ই ফাঁকা। হাঁটতে হাঁটতে কত দূর এসে পড়েছে মনে নেই। এতক্ষণ লক্ষ করেনি। আকাশের জ্যোৎøার সমারোহ। রুপালি আলোর বন্যায় মুখরিত দিগি¦দিক। সেই আলোর কিছু কিছু চোখে মুখে ঠিকরে পড়ে কেমন মোহময় মনে হয় নীলাকে। রাতের কুয়াশায় মাঝে মাঝে ঘোলাটে পথঘাট।
হুঁশ করে বেরিয়ে যাচ্ছিল একটা গাড়ি। ভয় পেয়ে ওর হাতটা ধরে ফেলে নীলা।
তারপরই ছেড়ে দেয় আবার।
আমীর বলে, কোথায় যাচ্ছি?
কি জানি। অনেক দিনের শখ, এ রাস্তা কোথায় গিয়ে শেষ হয় দেখব।
তাহলে গেলে না কেন এতদিন?
শখের মানুষ ছিল না বলে।
সে কথার জবাব না দিয়ে আমীর বলে, পৌঁছুতে পারবে শেষ পর্যন্ত?
নীলা হেসে বলে, কেউই পারে না। ইচ্ছেটাই যথেষ্ট।
মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট ফেলে এসেছে পেছনে। তেমন ঘনবসতি নেই। বাড়িঘরও বেশি একটা চোখে পড়ে না। আশ্চর্য, ঘনবসতি ছেড়ে, জনকোলাহল ছেড়ে, রাস্তার এক প্রান্তে এমন একটা মেলা মাঠের সন্ধান যে পাবে, আশা করেনি। জনশূন্য নির্জন প্রান্তর। কেমন ভয়ই করে। আবেদ্রুমেও তো গেছে কত বার। তেমন ভয় করেনি। নাকি তখন নীলা সঙ্গে ছিল না বলেই।
একটু গিয়ে দেখা যায় মাঠের একধারে খাদমতো। খাড়া হয়ে নেবেছে। নীলা বলল, চলো নাবি।
কোথায়?
ওই তো ওখানে।
হাত ধরাধরি করেই জংলা দু’একটা গাছের আক্রমণ থেকে নীলাকে নিরাপদ করে দিয়ে নেবেছিল। আবার কিছুদূর সমতল ভূমি। আবার আরেকটা খাঁজে ভেঙে খানিকটা নিচু জায়গা। তারও বহু বহু নিচে একটা কলকলে নদী।
আমীর সাবধান করে দিয়ে বলে, আর নিচে নেবে কাজ নেই। এখানেই বসি। বসো।
এবার জড়সড় হয়ে নয়। হাত-পা ছড়িয়ে খোঁপার বন্ধন থেকে তার এন্তার চুলের বোঝাকে মুক্তি দিয়ে বসে নীলা। তারপর একসময় আঁচলটা বিছিয়ে দিয়ে কাৎ হয়ে শুয়ে থাকে। তার দেহের সম্ভ্রম নিয়ে ভয় নেই। কোনো কিছুর শঙ্কা নেই। নীলা বলে, শুয়ে পড়লাম।
সেই জ্যোৎøারাতের মায়া ধরানো আমেজ নিয়ে তাকে লক্ষ করে আমীর। তার ভঙ্গিমাটাই যেন সামাজিক রীতিনীতিকে ভয় পাইয়ে দেবার মতো।
আমীর যেন নিজের আশঙ্কার কথাই ওর ওপর চাপিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে, কি ভয় লাগছে?
না তো।
তারপর?
বলো।
আমীর বলে, আবেদ্রুমের ভগ্নস্তূপ কিছু নয়, তোমাকে আবিষ্কার করাটাই আমার সবচেয়ে বড় লাভ।
তাই নাকি। আমাকে নিয়ে ভেবে কী লাভ?
কিছু না! শুধু এটুকু জানা যে, এ পৃথিবীতে একজন সহৃদয় কেউ রইল আমার জন্যে।
নীলা বলে, আর আমার?
কেন তেমন একটি ভরসার লোক মনে হয় আমাকে তোমার? যে কেবল সুখের পায়রা হয়ে নয়, দুঃসহ যাতনার দিনেও কাছে এসে দাঁড়াতে পারে। অন্তত বন্ধুত্বের দাবিতে।
তারপর কী ভেবে আবার বলে, অবশ্যি তেমন কেউ তোমার নেই, সে কথা বলছি না।
নীলা শান্ত স্থির কণ্ঠে জবাব দেয়, তোমার আসার আগে কেউ ছিল না। আজ যেন তার মনের চরম সিদ্ধান্তের কথাই জানতে বসেছে আমীর। বলে, যেখানেই থাক, যেমন থাক শুধু ভালো আছে এটুকুই জানার বাসনা। সামাজিক অধিকার নেই। ছাড়পত্র নেই। না থাক। দুঃখও নেই। আচ্ছা, একটা কথা বলবে?
বলো।
সেই পুরোন কথা। হাজার বার শুনেছ। তবু বলছি, সত্যি সত্যি কি আমাকে ভালো লাগত।
অবাক করে দেয় নীলা তাকে। বলে, পুরোন কথাও নয়। হাজার বারও শুনিনি। কিন্তু সে কথার জবাব জেনে কী লাভ?
আত্মসন্তুষ্টি।
ওসব ভেবে লাভ নেই।
ওর খোলা চুলের জট ভাঙছিল আমীর। আজ আরেকবার ইচ্ছে করে তার স্পর্শ-ধন্য হতে। অনধিকার চর্চা সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই অতৃপ্ত লোভটার কী করবে। যেন নিজের অজান্তেই মুঠো করে ওর হাতদুটো ধরে ওকে কাছে টেনে নেয় আমীর। নীলা উঠে দাঁড়ায়। এ তৃষ্ণার সরোবরের কাছে বকধার্মিক হয়ে বসে থাকা যেন আর চলে না। তার সংযম আর সহিষ্ণুতার বাঁধ ভাঙতে শুরু করেছে। বুকের কাছে টেনে এনে আলিঙ্গনাবদ্ধ করে।
নীলা বাহু-বেষ্টন থেকে বেড়িয়ে এসে বলে, এসব কী?
আমীর বলে, দেখছিলাম আমার একদিনের অধিকারের মেয়েটি আজও আমার অধিকারের আছে কিনা।
মিটি মিটি হেসে প্রশ্ন করে নীলা, কী দেখলে?
আমীর বলে, কি জানি। বোঝা গেল না।
নীলা এবার নিজেই নীলায়িত ভঙ্গিতে একটা হাত ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, থামলে কেন। আর কোনো ইচ্ছে নেই? আর কিছু চরিতার্থ করার নেই?
যেন ভীষণ বোকা বানিয়েছে তাকে নীলা।
আমীর সরে এসে বলে, না। এ ধরনের আমন্ত্রণে পুরুষমানুষের আগ্রহের দর্পই যে খর্ব হয়। বোধহয় রাগ করলে।
নীলা গম্ভীর হয়ে বলে, না রাগ করিনি। আসলে আমার নিজের ওপরই রাগ হয়। তোমার কিছু করবার ছিল না।
একসময় আমীর বলে, আজকের দিনটা আমার খুব মনে থাকবে।
নীলা বলে, আমারও।
তারপর আবার বলে, শুনলাম চলে যাচ্ছ।
হ্যাঁ। আবার হয়তো শিগগির দেখা হবে না।
কেমন কৌতুকের দৃষ্টি মেলে বলে নীলা, বোধহয়। তুমি কি আর বারবার ভগ্নস্তূপ দেখতে আসবে।
আমীর বলে, আমার আর কিছু দেখার সাধ নেই নীলা। শুধু তোমার কথা ভেবেই আমি নক্শবন্দীকে কিছু বলিনি। আসলে ওর আক্রোশ অহেতুক নয়। মিথ্যে বড়াই করে ওর কাছে সত্যি কথা গোপন করা কেন? নীলা বলে, আমিও সে কথাই ভাবছিলাম। অথচ, তোমার কাজ কিছুই হলো না। তোমার পাঠকরা মিছেই হতাশ হলো।
আমীর হাসে, নাহয় একবার হলোই। আমি তো হইনি। এক যুগ পর দেখলাম। সেই কবে রাগ করে তোমার ওখান থেকে ঠুনকো অভিমান বুকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। আর তো দেখা হয়নি।
নীলা বলে, আমি কিন্তু তোমাকে তারপরও অনেকবার দেখেছি।
কোথায়? উদগ্রীব হয়ে ওঠে আমীর।
য়ুনির্ভাসিটিতে। আরো কত সভা অনুষ্ঠানে।
বলো কি! তাহলে ডাকনি কেন?
কি জানি। বোধহয় মনের জোরটাই আর ছিল না। আর দেখা করলেই কী হতো।
আমার তোমার জীবনের উপাখ্যানটার হয়তো অন্যরকম হতো।
নীলা বলে, তা তো হয়নি।
জানি।
আজ হৃদয়ের ভাবনা যখন মুক্তি পেয়েছে, সব বরফ গলতে শুরু করেছে, বাধা দেওয়া কেন। সংশয় আর সংঘাতের দ্বন্দ্ব যা এতদিন পীড়িত করেছে, পলে পলে তা নীলার কাছে জেনে নিতে বাধা কি।
আমীর বলে, আমি যে এতদিন ছিলাম না একবারও মনে হয়নি আমার কথা?
তার জবাব না দিয়ে বলে নীলা, সেই কবিতাই মনে পড়ে আমার বারবার। যেখানে কবি বলেছেন, ‘রেখেছি তোমারে চোখের তারাতে হৃদয় হারাতে’ –
তারপর নিজেই বলে, দুঃ ছাই। মনে আসছে না শেষেরটা।
আমীর বলে, আমার একটা অনুরোধ।
নীলা জিজ্ঞেস করে, কী?
আবার যদি কখনও কেউ তোমাকে এখানে, এ জনশূন্য প্রান্তরে বেড়াতে নিয়ে আসে সে যেন আর কেউ না হয়, আমিই হই। অবশ্যি সে সুযোগ হয়তো হবে না।
ঠিক বলেছ।
তবু আরেকবার পরখ করে দেখতে চায় আমীর। বলে, তবু একান্তই যদি হয়?
হলেও আর কোনোদিন এখানে আসতে ইচ্ছে করবে না।
কেন?
একবার মন খারাপ করাই কি যথেষ্ট নয়। বারবার করা কেন।
তারপর আবার নীলাই জিজ্ঞেস করে, সত্যি সত্যি চলে যাচ্ছ?
হ্যাঁ।
নীলা বলে, বেশ হলো। অতীতের রাজ্যে এসে নক্শবন্দী কি পেল জানি না। তুমি পেলে একটা কানা পাথর।
কই?
কেন আমি।
বলেই চলেছে নীলা, শিলাখ-ের মতোই। মনে হবে, শখ করে কেউ একবার ধুলোমাখা অন্ধকার থেকে হাতে তুলে নিয়েছিল আদর করে। তারপর সেটা যেখানে ছিল সেখানেই ফেলে গেল। তা থাক। তবু আজকের এ দিন আমার মনে থাকবে।
তার কণ্ঠস্বর কেমন জড়িয়ে আসে।
একটু স্থির হয়ে বলে নীলা, এ জায়গার বোধহয় কোনো নাম নেই। আমি কিন্তু মনে মনে একটা নাম ঠিক করে রেখেছি আজকের দিনের স্মরণে।
কী নাম?
বলব কোনোদিন, পরে।
বেশ রাত হয়ে আসছিল।
নীলা বলল, এখন ওঠা যাক।
পথে যেতে যেতে বলে, তোমার কিন্তু একদিন আমাদের বাসায় আসা উচিৎ।
সে তো গিয়েছি।
না ওরকম নয়। ভাবছি তোমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকব একদিন।
একদিন কেন, কালই এসো না রাতে। যা হয় খাবে।
আমীর দ্বিরুক্তি করেনি।
কিন্তু বলে, আনুষ্ঠানিকভাবে কেন?
নীলা বলে, ওঁর সঙ্গে একবার দেখা করে যাওয়া দরকার।
আমীর বলে, রজব আলী তো আমাকে চেনেন।
নীলা বলে, তবু।
উনিশ
যেন ইচ্ছে করেই বাইরের আর কাউকে ডাকেনি নীলা। শাহনাজ বেগমও নেই। শুধু মালেক খোন্দকার ছাড়া। সার্ভেয়ার জেনারেলের অফিসে কাজ করত। এখন রিটায়ার করে চাকওয়ালে আছে। নীলা আলাপ করিয়ে দিয়ে বলে, এঁর কিন্তু ভারি লোভ আমার রান্নার ওপর।
দেখুন না, চাকওয়ালা থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এসেছেন।
প্রথমে আমীর বুঝতে পারেনি। ‘তুমি’ থেকে ‘আপনি’। পরে বুঝল। মালেক হেসে বলে, আমি না হয় হলো চাকওয়াল থেকে ড্রাইভ করে আসি। তাতে আর কত তেল পোড়ে। তোমার কড়ায়ে যত তেল ঢালো তার তুলনায় কিছুই নয়।
ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে রজব আলী।
নীলা জিজ্ঞেস করে, পরিচয় আছে নিশ্চয়ই।
রজব আলী কেমন আমতা আমতা করে বলে, না না। তা থাকবে না কেন।
স্বামীর দিকে তাকিয়ে নীলা বলে, অনেকদিন ধরে ডাকব ভেবেছিলাম। হয়ে ওঠে না। কাল তো উনি চলে যাচ্ছেন।
তাই নাকি?
কি মনে হওয়ায় তার পাশে এসে বসে রজব আলী। তারপর আস্তে আস্তে বলে, দেখুন কোনো ভুল বোঝোবুঝি হোক আমি চাই না। নক্শবন্দী বলল, রেস্টহাউসে অন্য লোকজন আসছে। কাজেই –
নীলা মাঝখানে যোগ দেয়, কাজেই হিড় হিড় করে ঘাড় ধরে বার করে দিলে, তাই না?
মালেকও একদৃষ্টে তাকিয়ে।
যেন এতগুলো সতর্ক দৃষ্টির সামনে খেই খুঁজে পায় না রজব আলী। গুছিয়ে বলতে পারেন না কথা, মানে আমি আমার ডিউটি করেছি। আশাকরি কিছু মনে করেননি।
আমীর বলে, না। কোনো অসুবিধে হয়নি। আমরা তো শাহনাজ বেগমের বাংলোয় উঠে গিয়েছিলাম।
রজব আলী তবু অনুতপ্ত।
বলে, কালই চলে যাচ্ছেন। আমার একবার গিয়ে আপনাদের ভিজিট করা উচিৎ ছিল। সময়ই হলো না।
তাতে কি হয়েছে। আমি নিজেই তো এসে গেলাম।
তা ভালো করেছেন। খুব খুশি হয়েছি সেজন্যে। ক’টা দিন থাকলে আপনাকে নিয়ে বেড়ানো যেত। আমি তো আজ সকালেই টুর থেকে এলাম। খাবার টেবিলে বসে নীলা সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলে, আমি কিন্তু কাল ওকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম। বেশ জায়গাটা।
তারপর আমীরের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে বলে, অনেক পুরোন ভগ্নস্তূপ দেখলাম না?
আমীর আকাশ থেকে পড়ে। এ সম্পর্কে হ্যাঁ-না কোনোটা করতে যাওয়াই বিপদ।
অথচ নীলা ছাড়ে না। পাল্টা ওকে জিজ্ঞেস করে, কেন কাল যে আপনাকে নিয়ে গেলাম।
সেটা মনে করিয়ে দেবার দরকার ছিল না। বোধহয় লৌকিকতার খাতিরেই এ প্রসঙ্গের অবতারণা এবং নীলা চায় যে আলোচনার গতি সেভাবেই চলুক।
যেন তার মন রাখতেই নকল কৌতূহলের ভান করে বলে, ও হ্যাঁ মনে পড়ছে।
নীলা জিজ্ঞেস করে, জায়গাটার নাম জানেন? মধুগড়।
মালেক খোন্দকার খাবার প্লেট থেকে হাত তুলে বলে, মধুগড়। সেটা আবার কোথায়? মধুবন, মধুপুর আছে। কিন্তু ওরকম কোনো নাম তো শুনিনি।
নীলা বলে, পৃথিবীতে এমন কত জায়গা আছে, কেউ সেগুলোর নাম শোনেনি।
সার্ভেয়ার জেনারেলের অফিসের লোক সহজে কাবু হবার নয়। মনে সংশয় থেকে যায়। বলে, ঠিক ঠিক জানেন তো রাধুগড় নয় তা?
নীলা আর আমীর চোখ চাওয়া চাওয়ি করে। নীলা বলে, না। রাধুগড় যে নয় তা জানি।
মালেক মাথা নাড়ে, কিন্তু ওরকম নাম তো শুনিনি। তারপর সমর্থন লাভের আশায় আমীরের দিকে তাকিয়ে বলে, আপনি শুনেছেন?
আমীর জবাব দেবার আগেই নীলা বলে ওঠে, কালই তো নামকরণ হলো। কী করে শুনবেন?
রজব আলী জিজ্ঞেস করে, কে করল?
কেন আমি।
মালেক খোন্দকারও আশ্বস্ত হয়। বলে, ও তাই বলুন। নইলে এ অঞ্চলে ও নামের কোনো জায়গা থাকলে আমি জানতাম।
রজব আলী তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলে, তোমার সেই মধুগড় পৌরাণিক স্মৃতিবিজড়িত জায়গা নিশ্চয়ই।
মালেক জিজ্ঞেস করে, কিছু দেখলেন?
আমীরকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নীলা বলে, নক্শবন্দী থাকলে দেখতে পারত। এসব চোখ তার ভালো কিনা।
রজব আলীকে গম্ভীর দেখায়। বলে, লোকেসানটা পেলে নাহয় ওকে একবার পাঠাব। কী বলো?
নীলা জবাব দেয়, তোমার খুশি।
বিদায় নেবার আগে মালেক খোন্দকার নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করে, আপনি শাহপুর যাবেন কেমন করে?
আমীর বলে, কি জানি। বোধহয় বাস ধরতে হবে।
তারচেয়ে এক কাজ করুন না। আমি ছেড়ে দিয়ে আসব আপনাকে। আপনার সঙ্গে দেখার সুযোগ আবার কবে হবে।
নীলা হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলে, ওকে তুলতে গেলে আপনাকে পাহাড় চড়তে হবে কিন্তু। শাহনাজ বেগমের বাংলো।
মালেক বলে, বুড়ো মানুষকে খামাখা পাহাড় পর্বত চড়িয়ে লাভ কি। আপনি বরং সকাল সকাল চলে আসুন এঁদের বাসায়।
রজব আলীও সায় দেয়, সেই ভালো। তাই করুন। সকালে আসুন। এখান থেকে চলে যাবেন সোজা স্টেশনে।
এরকম ব্যবস্থায় আপত্তি থাকার কথা নয় আমীরের।
বিশ
সুটকেস হাতে করে সকাল সকাল এসে হাজির। সেদিন ডাকাডাকি করে হয়রান হতে হয়নি, প্রতীক্ষার জ্বালায় হতে হয়নি অধীর। নীলা গেটের বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল। বলল, এসো।
তাকে বসতে দিয়ে পাখাটা ছেড়ে দিয়ে এককোণে চুপ করে বসে থাকে নীলা। কোনো কথাই বলে না। হয়তো এতদিন মনে হয়নি। আজ এই যাবার ক্ষণটি একটু বেশি করে বাজছে।
তেমন মেয়ে হলে না হয় নিজেই যেচে বলত আমীর, অমন করে থেকো না। যদি চোখটা ছলছল করে, করুক না। কিন্তু নীলা হঠাৎ খুশিতে উল্লসিত বা হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ার মেয়ে নয়।
খারাপ যে লাগছে এটা জানা কথা। খারাপ আমীরেরও লাগছে।
যে নীলা এতকিছু বোঝে, সে এটুকু কেন বোঝে না একদিন সবকিছু যায়। যেমন মেল ট্রেন, তেমনি সময়, তেমনি জীবন। যেতে না চাইলেও দুর্জ্ঞেয় ইচ্ছের শাসন তাকে যেতে বাধ্য করে।
আমীর ব্যস্ত হয়ে বলে, গাড়ি তো এখনও এলো না।
খুব হাঁপিয়ে উঠেছ নাকি?
নিজের কাছেই লজ্জা পায় আমীর। বলে, না বরং উল্টো। নিজের মনকে বিশ্বাস নেই। আহত অভিমান প্রশ্রয় পেলে নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
নীলা বলে, যাক না।
বোধহয় কেটলিতে পানি ফুটছিল।
নীলা বলল, যাই। একটু কফি দিই।
ফিরে এসে বলে আবার, যাবার সময় কতকিছু বলব ঠিক করে রেখেছিলাম। এখন কিছু মনে আসছে না।
আমীর বলে, আমারও সে অবস্থা।
দূরে মৃদু গুঞ্জন শোনা গেল।
নীলা জানালায় চোখ বাড়িয়ে বলে, ওই গাড়ি এলো বোধহয়। একটা কাজ করো না।
কী?
যাবার সময় গাড়ি ঘুরিয়ে দেখে এসো না মধুগড়। আর যদি কখনও সুযোগ না হয়।
আমীর বলে, যাবো। আমিও সে কথাই ভাবছিলাম।
কী ভাবছিলে? জিজ্ঞেস করে নীলা। মধুগড় নিয়ে কাল্পনিক কিছু লিখবে?
না লিখব না। ওটা মনে মনেই থাক।
মালেক খোন্দকার গাড়ি থেকে নেবেই বলে, এসে গেছেন দেখছি। বেশ বেশ।
নীলা বলে, আসবেন না মানে। যাবার আনন্দে কাল ঘুম হয়নি।
মালেক সে কথা যেন কানে তোলে না। বলে, ঘুম কাল আমারও হয়নি।
আমার কাছে হালের সার্ভে রিপোর্ট ছিল। ওটা দেখছিলাম।
নীলা বলে, আপনি বুঝি মিছিমিছি মধুগড় নামটা খুঁজছিলেন। কী করে পাবেন। ওটা তো আমার দেওয়া।
অবাক করে দেয় তাকে মালেক, তবু কি মজা জানেন। ম্যাপে পেয়ে গেলাম। অবশ্যি এখানে থেকে অনেকদূরে। চাটগাঁর রামগড়ে গেছেন?
না তো।
ওটা রামগাড় থেকে আরো মাইল বিশেক উত্তরে।
গাড়িতে উঠে বসতে বসতে বলে আমীর, আপনার ভৌগোলিক মধুগড় থাক। আমাদের সদ্য আবিষ্কৃত মধুগড় আপনাকে আজই দেখাতে পারি, যদিও তাতে একটু ঘুরে যেতে হবে।
মালেক খোন্দকার রাজি। বলে, চলুন না। তাতে কী হয়েছে। গাড়ি স্টার্ট দেয়।
নীলা প্রস্তর মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। কোনো কথাই বেরোয় না তার মুখ দিয়ে।
একবার পেছন ফিরে তাকায় আমীর। যাবার সময় নীলার চোখের দৃষ্টি কেমন হয়ে আসছিল। কাতর না সজল সেটাই দেখতে।
গাড়ি তখন মোড় ঘুরেছে।
মালেক খোন্দকার বলে, কিছু ফেলে এসেছেন নাকি?
যেন নিজেকে সামলে নিয়ে বলে আমীর, কি জানি হবেও বা।
হ্যাঁ, ওই রাস্তা দিয়েই চলছে গাড়ি। সেদিন যে পথ অফুরন্ত মনে হয়েছিল, আজ যেন দশ মিনিটেই তা ফুরিয়ে যায়।
আমীর বলে, একটু রাখুন।
যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারে না আমীর। তাদের কাল্পনিক মধুগড়ের ওপর দুটো ট্রাক্টর মাটি খুঁড়ে তার বুক বিদীর্ণ করছে। ট্রাক থেকে ইট, লোহা আর সিমেন্ট নাবছে। একটা সাইনবোর্ডও চোখে পড়ে, কসমপলিট্যান হাউসিং প্রজেক্ট। জায়গাটা বোধহয় তারাই কিনেছে। মালেক খোন্দকার বলল, কী ভাবছেন?
ভাবছি, ক’দিন পরে বাড়িঘর তৈরি হলে আর এ জায়গাটা চেনা যাবে না।
মালেক জিজ্ঞেস করে, কই আপনার মধুগড় দেখালেন না? আমীর বলে, মধুগড় বলে একটা জায়গা ছিল ঠিকই। কাল এলে আপনাকে দেখানো যেত। এখন আর নেই।
