আমার মা যতটা গোছানো ছিলেন, বাবা ততটাই ছিলেন বেখেয়াল। বাবা কখনো আলো পছন্দ করতেন না, মা চাইতেন বাড়ির সব জানালা খোলা, সব পর্দা গোটানো, ঘর ফর্সা থাকবে। রাতে আবার মা চাইতেন হালকা আলো, আর অন্ধকার বাবার মোটেই পছন্দ ছিল না। আলো ঢোকা না ঢোকা নিয়ে প্রায়ই মৃদু তর্ক হতো। বাবার হাতের লেখা ভারী মোটা। খোলা, ছড়ানো, প্রায় দুর্বোধ্য। মায়ের লেখা ছিল পরিষ্কার, গোটা গোটা অক্ষর, খুবই সুন্দর। কিন্তু আদর্শে তাঁদের কোনো অমিল ছিল না। টাকা-পয়সা বিষয়-আশয় নিয়ে কোনোপক্ষেরই অস্বস্তি ছিল না। বাবার তো একেবারেই না। আত্মীয়েরা হয়তো বলতেন আপনার একটি মাত্র সন্তান, কিছু রেখে যাবেন না ওর জন্য? মা এক-আধ সময় বলতে চাইতেন, বাড়িঘর তো হলো না। কিন্তু পরে দুজনেই ভেবেছেন, মেয়ে লেখাপড়া করে নিজের জীবন নিজেই গড়ে নেবে। আর নিজের বাড়িঘর না থাকলেও জীবন একরকম ভালোই কেটে গেছে। ওসব নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই।
বই পড়ার নেশা দুজনেরই ছিল। জীবনে ভালো কিছু, নতুন কিছু করার প্রতি আগ্রহ ছিল। মা মাঝে মাঝে পিছিয়ে আসতে চাইলেও বাবাকেই দেখেছি বারবার ম’াকে উৎসাহ দিয়েছেন লেখাপড়া চালিয়ে যেতে, চাকরি বহাল রাখতে। সাতাত্তর সালে আমি আর মা একসঙ্গে রাত জেগে পড়ছি – আমার প্রথম হিল ম্যাট্রিক পরীক্ষার জন্য আর মা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বি.এড. দিচ্ছিলেন। আমি যখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি আর বাবাও তখন আর নেই, মা আর বড় খালাকে (দুজনেই ষাটোর্ধ্ব) দেখেছি পরম উৎসাহে শিশুদের দিবা-পরিচর্যা কেন্দ্র খুলে বসেছেন আর বাসায় বাচ্চাদের পড়াচ্ছেন।
বাবা-মা দুজনেই খুব পরোপকারী ছিলেন। কারো অসুবিধার কথা শুনলে ব্যস্ত হয়ে যেতেন কিছু করার জন্য। লোকের উপকার করতে গিয়ে ভীষণ ঠকেছেন, মর্মাহত হয়েছেন, কিন্তু পিছিয়ে যাননি।
অনেক কিছু নিয়ে বাবা-মার দ্বিমত থাকায় আমি ছোটবেলায়ই বুঝেছিলাম যে, দুজনেই ঠিক, কারণ দুজনেই আমাকে খুব ভালোবাসতেন, বাবা বোধহয় একটু বেশিই। সবকিছুরই দুটো বা আরো বেশি দিক থাকতে পারে। এসব খুব নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। এমন সব ভাবতে ভাবতে হয়তো ব্যক্তিজীবনে আমিও কিছুটা দ্বিধাদ্বন্ধে খুগেছি, খুব কঠোর অবস্থানে সহজে যেতে পারিনি। ষাটের কোঠায় এসে, কোনটা যে আসলে ঠিক, তা আর জানাই হলো না…. তবে এ-নিয়ে কোনো খেদ নেই। ওই যে আমার বাবার ভাবালুতা আর মায়ের স্পষ্ট চিন্তা – এর একটা সুবিধা ছিল। বাবার অজস্র লেখালেখি আমার মা-ই গুছিয়ে রাখতেন। ছাপাখানার জন্য সেই দুর্বোধ্য হাতের লেখার পরিচ্ছন্ন অক্ষরে মা-ই তৈরি করতেন। কাগজপত্র গুছিয়ে রাখা, খবরের কাগজে বেরুনো লেখার কাটিং সংরক্ষণ করা – সব তাঁর কাজ। দুজনেই যখন আর নেই এবং আমার জীবনেও কিছুটা অবসর হয়েছে, তখন গাদা গাদা পাণ্ডুলিপির ফাইল খুলে দেখি কী সুন্দর করে সব সাজানো। অথচ সারাজীবনই আমার মা-বাবা চাকরিসূত্রে ঢাকা, করাচি, চট্টগ্রাম, ইসলামাবাদ আসা-যাওয়া করেছেন। তেমন কোনো স্থিতি ছিল না, স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। ঘুরে ঘুরে ধনমতি তিন নম্বর আমার খালার বাসায় আমরা নোঙর গাড়তাম। আবার বেরিয়ে পড়তাম অন্য কোনো শহরে। এসব আসা-যাওয়ার মধ্যে কিভাবে যে মা সব কাগজপত্র গুছিয়ে রাখতেন, তা ভেবে পাই না।
বাসায় একটা ব্রিফকেস ছিল। সেখানে পুরোনো পাসপোর্ট, ছোট ছোট কাগজের কাটিং, সরকারি বিভিন্ন পদের আইডি কার্ড, আমার কিছু সনদ, উলের কাটা (মা খুব ভালো লেখাই করতেন) ইত্যাদির সঙ্গে প্লাস্টিকের প্যাকেটে মোড়ানো একটা খাতা পাই। বোঝায় যায় খাতাটা চল্লিশ সালে ‘রিজভি’ নামে রসায়নের কোনো ছাত্রের। রুল টানা প্রতি পাতায় নিটোল হাতে কেমিস্ট্রি প্র্যাকটিক্যালের নোট লেখা আছে (চল্লিশ সালে উন্নত মানের কালি ছিল নিশ্চয়ই কারণ লেখা এখনো কী পরিষ্কার!)। কয়েকটি পাতায় শিক্ষকের সই আর টিক মার্কও দেখা যায়। খাতায় মুকুলের মহাফিলের সদস্য নম্বরসহ দৈনিক অজাদ পত্রিকায় ছাপানো আমার বাবার বেশ কয়েকটি লেখা এটে রাখা। কিছু লেখা চুয়াল্লিশের; ঊনপঞ্চশে দৈনিক ইত্তেহাদের মিতালী মজলিসের কাটিংও আছে। বাবার জন্ম ১৯২৯ সালে, ৩৫ ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেইন, তালতলা, কলকাতায়। চুয়াল্লিশে ওঁর বয়স পনেরো।
২০০৭-২০১০ সালে আমার বাবা আনিস চৌধুরীর ছোটগল্প, উপন্যাস ও নাটকসংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে। ওঁর নাটক নিয়ে মীর হুমায়ূন কবিরের একটি পিএইচডি অভিসন্দর্ভও ছাপা হয়েছে। শুধু দৈনিক কাগজে লেখা ওঁর কলামগুলো এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে ভেবেছি শিগগিরই সে-কাজে হাত দেব। অনেকদিন ধরেই ভাবছি খাতায় আটোনে লেখাগুলো ছাপাবো। সাহিত্যগত বিচারে নয়, মনে হয়েছে এগুলো একটা বিশেষ সময় ও সমাজপটের সাক্ষী।
চাচা জামিল চৌধুরীর কাছে শোনা যে, উনিশ শতকের শেষ দিকে যখন আমার দাদা নুরুল হুদা চৌধুরী কলকাতা থেকে বি.এ. পাশ করলেন তখন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক তাঁকে সিভিল সার্ভিসে রয়্যালের পরামর্শ দিয়েছিলেন। যেহেতু সে-সময় অনেক বেশি মুসলিম গ্র্য্যাজুয়েট ছিলেন না, তাই তাঁর পক্ষে সিভিল সার্ভিসে যুক্ত হওয়া খুব কঠিন হতো না। দেশব্যাপী চিরঞ্জন দাশের ভক্ত ছিলেন দাদা, আর তাই তিনি যখন কলকাতা, সাহেবদের গোলামি করবে কেন, এসো তোমাকে ক্যালকাটা কর্পোরেশনে চাকরির ব্যবস্থা করে দিচ্ছি’, তখন সেদিকেই পা বাড়ালেন। ক্যালকাটা কর্পোরেশনে বেশিদিন থাকা হলো না সেখানকার দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারলেন না বলে। পরে বেঙ্গল ক্যামিকেলসে তাঁর জন্য আরেকটা চাকরির ব্যবস্থা করা হলো। সে-নিয়ে একটা গল্প আছে। কেমিক্যাল কোম্পানিতে কাজের সুবাদে দাদাকে কুইনিন খেতে হতো। বাড়ি ফিরে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়েও সেই তেতো আদ দূর করা যেত না। তাই তিনি কাঁটা-চামচ দিয়ে খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এমন অদ্ভুত আচরণে মুগ্ধ কিশোর জামিল ও আনিসও মা’র কাছে আবদার করলেন যে, আজ থেকে তাঁরও কাঁটা-চামচ ব্যবহার করবেন। সেই যে শুরু, শত বাঙালিয়ানাও তাঁদের কোলোনিন বাধ্য করতে পারেনি হাত দিয়ে ভাত খেতে!
১৯৪২-এ অবসর গ্রহণ করার পর দাদা নুরুল হুদা চৌধুরী পরিবারসহ কুমিল্লায় নিজের বাড়িতে স্থানান্তরিত হন। তখন পশ্চিমগাঁওয়ে এক নবাব পরিবারের ইংরেজি পড়ানোর কাজে তিনি নিয়োজিত হন। এ-কাজ আর বেশিদিন করা হলো না। তেতাল্লিশেই তিনি মারা যান। এর ফলে পরিবারের নানা টানাপোড়েনের সম্মুখীন হয়। তাছাড়া চালের মন তখন এক লাফে তিন থেকে কুড়ি টাকায় পৌঁছেছে। অনটনে পর্যদুস্ত সকলে মিলে কুমিল্লা থেকে কলকাতায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, যেহেতু সেখানে রেশন ব্যবস্থা ছিল।
তেতলিশের শেষ দিকে আমার দাদি আসমা খাতুন ছেলেমেয়েদের নিয়ে কলকাতায় পাক সার্কাসে সংসার পাতেন। ওই সময় একমাত্র আয়ের উৎস ছিল আমার বড় চাচা চৌধুরী কুদরত গণি, দেরাদুনে ফরেস্ট্রি বিভাগে ট্রেইনি থাকার সূত্রে। দেশবিভাগের অনিবার্যতা বাধ্য করলো ঊনপঞ্চাশে কলকাতা-পর্ব চুকিয়ে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসতে। দাদি অতঃপর সাহসী, ধীর-স্থির সংকল্পের মানুষ ছিলেন। কলকাতার তালতলা লেনের বর্ধিষ্ণু পরিবারে গৃহশিক্ষকের কাছে তিনি ও তাঁর বোনেরা ইৎংরেজি-ফারসি পড়েছিলেন। বোনেরা একসঙ্গে হলে উর্দুতেই তাঁরা কথা বলতেন। ঢাকায় আগা মসিহ লেনে বাড়ি ভাড়া করে কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস ছাড়াই পঞ্চাশের গোড়ায় কিভাবে যে দাদি নিজের সাতজন ছেলেমেয়ে আর বোনের পাঁচ সন্তানকে মানুষ করেছিলেন, তা এখন আর ভেবে পাই না!
কুমিল্লা ও কলকাতা আসা-যাওয়া বিবেচনা করলে, রিজভির কেমিস্ট্রি খাতায় এটে রাখা লেখাগুলো সম্ভবত তেতাল্লিশের শেষ ভাগ থেকে ঊনপঞ্চাশ পর্যন্ত কলকাতায় লেখা। দৈনিক আজাদ ও ইত্তেহাদে প্রকাশিত আমার বাবার এসব ছোট ছোট লেখার মধ্যে কিশোর ও যৌবনের উন্মেষকালে নানা কৌতূহলের সন্ধান মেলে। দেশভাগ হয়নি তখনো, কিন্তু নিজের জায়গা পাওয়ার প্রবল উৎসাহ লেখাগুলোতে ধরা পড়ে। কয়েকটি লেখায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন রয়েছে, যা সেদিনের সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। পরবর্তীকালে বাবা স্বীকার করেছিলেন, তাঁর প্রকৌশলী হওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল এবং তেতাল্লিশে কলকাতায় স্থানান্তরের কয়েক বছর পর শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তিও হয়েছিলেন; কিন্তু অনটনে ও দেশভাগের বিপর্যয়ে সেখানে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। চর্টলাইট ও জাহাজের মডেল তৈরির লেখা দেখে বোঝা যায়, প্রযুক্তি-বিষয়ে তাঁর ঝোঁক ছিল। সুন্দর চৌকস ডিজাইনের প্রতি দারুন আগ্রহ ছিল। তাই হয়তো অত ছোটবেলায় কিভাবে ডিজাইন তৈরি করতে হয় সে-নিয়ে লিখেছিলেন।
এই খাতায় ঊনপঞ্চাশ বা কাছাকাছি সময়ে লেখা গল্প ও নাম-তারিখবিহীন দু’পাতা হাতে লেখা কবিতাও ছিল। জীবনের শুরুতে লেখা এই গল্পগুলো ছাপা হয়েছিল, তবে কবিতা নেহায়েতই খসড়া কি না, বলা যাচ্ছে না। যেহেতু বাড়িতে পাওয়া তাই কবিতাও এই বইয়ে জুড়ে দেওয়া হলো। আনিস চৌধুরী কবি ছিলেন না, কিন্তু পঞ্চাশের ভাষা-আন্দোলনে সক্রিয় সক্রিয় থাকায় হাসান হাফিজুর রহমান-সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলনের জন্য কবিতা লিখেছিলেন। কাছাকাছি সময়ে মানচিত্র নাটক রচনা করে সরার দুটি আকর্ষণ করেছিলেন; নাটক, ছোটগল্প ও উপন্যাসে জীবনের নানা ছবি এঁকে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন; রেডিও, টেলিভিশনের সংবাদ বিভাগে দীর্ঘদিন কাজ করে দক্ষ সাংবাদিক হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন – সেই আনিস চৌধুরী হয়ে ওঠার পেছনে তাঁর ক্রমান্বয়ে বেড়ে ওঠা মনের ভাবনা এই লেখাগুলোর মধ্য দিয়ে প্রতিভাত হয়েছে। এই আবিস্কারের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতেই লেখাগুচ্ছ প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছি। আশা করি সবার ভালো লাগবে।
প্রায় দশ বছর বইটা নিয়ে কাজ করলেও নানা কারণে হয়ে ওঠেনি। বইয়ের প্রাথমিক বিন্যাস ও লেখাগুলো সম্পাদন করেছিলেন আকরাম হোসেন রতন। পরে পাতাগুলো সুবিন্যস্ত করেন ইমন ওবায়দুল্লাহ। গোড়া থেকেই কালি ও কলমের সহকর্মীবৃন্দ, বিশেষ করে আশফাক খান ও মনি গোপাল গোস্বামী, নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। সম্পাদক সুব্রত বড়ুয়া এবং অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের কাছে আমি বিশেষ কৃতজ্ঞ তাঁদের পরামর্শের জন্য। লেখার বানানরীতি যথাসম্ভব অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বইটি প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করায় বেঙ্গল পাবলিকেশন্সকে ধন্যবাদ।
লুভা নাহিদ চৌধুরী
জুলাই ২০২৫, ঢাকা
