জাল

এখানে সব কিছুই কেমন দ্ধিধাগ্রস্ত। আলোয় হঠাৎ ঝলমল করে ওঠে না কোন সকালবেলা। যখন কুয়াশা কেটে যায়, বট বা শালগাছের কোন উচুঁ ডাল ছুয়ে যায় আলো, তখনই একটি দিনের সুচনা। দুপুর গড়িয়ে যাবার আগেই বিকেলের হাতছানি। তারপর মুষলধারে অন্ধকার।
জায়গাটা ঠিক বনেদি শহুরে এল কার নয়, অজপাড়াগাঁও নয়। বরং বলা যায় শহরতলীর কমচেনা রাস্তার ধারে কাছে। সেখানেই মাথা তুলে লাল সরকির বাড়ি সাউথ ব্রিজ কটেজ। দক্ষিণ খেলা। এক ধারে লেক। তারপার কিছুদুর শূন্য প্রান্তর। আর একটু এগুলে গড়াই নদী। ধারে কাছে আর বাড়ি নেই তা নয়। কিন্তু কেমন ছাড়া ছাড়া। মনে হয পরস্পর পরিচিত হবার বাসনায় ব্যাকুল নয়। বেশির ভাগ খালি পড়ে থাকে বছরের আর্ধেক দিন; শীতে বা গরমের ছুটিতে কখনওরা সে সব বাড়িতে কিছু দিনের জন্য শোনা যায় কলগুঞ্জন। তখুনি মন কেমন করে ওঠে ডাঃ মহসীনের। হাহাকার করে নিঃসঙ্গ বেদনার আক্ষেপ। কোন কোন দিন আপন মনেই সাউথ ফিরে আসেন আবার। তার নিস্পৃহ চেতনাই যেন এক ধমকে তাঁকে কুড়েমির আস্তানায় টেনে আনে।
আবার যেদিন দ্বিধা কাটিয়ে প্রতিজ্ঞায় অটল হয়ে ভাবেন, প্রতিবেশীর সঙ্গে আলাপ সেরে নেবেন, ওদের চায়ের টেবিলে ডাকবেন সেদিনই হয়ত দেখা যায় সেসব ঘরে তালা ঝুলছে। কিম্বা জিনিসপত্র গোছগাছের পালা। তার সময় হলে তার প্রতিবেশীদের হয় না।
বাড়িতে ফিরে এসে ভাল লাগে না। জানালায় কবাট ফাঁক করে দেখেন কিছু উচ্ছল-প্রাণ মানুষ যেমন হৈ হৈ করে পাড়া মাথায় করে এসেছিল, তেমনি চলে যাচ্ছে। তার সাউথ ব্রিজ কটেজের দিকে আড়চোখেও তাকায় না। বরং গাড়ি ছুছিয়ে যাবার সময় বেশ কিছুটা ধুলোই ছড়িয়ে। ডাঃ মহসীন জানালা বন্ধ করে দেন। এমনি করে তাঁর কৌতুহলের ওপর সেদিনের যত যবনিকা নাবে।
এমন ঘটনা শুধু একবার নয়, কতবারই ঘটেছে। কখনও দেখেছেন কৃতি কোন চাকুরে তার বৌ ছেলেমেয়ে নিয়ে দু’টো দিন বেশি পাওয়ারের বাতি জ্বালিয়ে চড়া স্বরে রেকর্ড বাজিয়েছে। ঘন ঘন হাসির ফোয়ারা তুলেছে। উৎকর্ণ হয়ে শুনেছেন প্লেট-বাসনের শব্দ, ঘ্রাণ পেয়েছেন কোন দুর্লভ খাদ্য-বস্তুর। তারপর একদিন কোন নয়া হাল মডেলের গাড়ি অতর্কিতে আগন্তকদের খেয়া পারের মত যেখান থেকে এনেছিল, সেখানেই নিয়ে গেছে। ইচ্ছে করেছে একদিন তাদের যেচে ডেকে আনতে বা রবাহুত অথিতি হয়ে নিজেই তাদের কাছে যেতে। ইচ্ছে করেছে তাদের নব্য -বাহাদুরি সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাঁর নিজের কিছু রোমাঞ্চর কথা শোনাতে। কিন্তু অত সময় কই? কেইবা তাঁর উৎকর্ণ শ্রোতা? হয়ত এস না করে একটা বায়োগ্রাফি লিখলেই ভাল হয়।
নামটাও মনে মনে ঠিক করা আছে দি ষ্ট্রাগল অব এ ডক্টর’ বা এজাতীয় কিছু। কিন্তু বই ছাপা হলেই পড়বে কে? বন্ধুবান্ধব যা কিনা তাঁর এ সংসারে নেই বললেই চলে, তাদেরই দিতে হবে যেচে। আর তাছাড়া লিখবেনই বা কেমন করে। কোথায় হবে শুরু কোথায় শেষ।
প্রবেশিকা পরীক্ষার চকচকে সাফল্যেও কথা বলে আজকাল আর কাউকে তাক লাগানো যায় না। মেডিক্যাল কলেজের হাত যশের আজকাল কেউ মুগ্ধ হয় না। অমন অনেক হাত যশের কাহিনী রা¯তাঘাটে, ট্রেনে-বাসে ছড়িয়ে। এমন কি গোপন রোগের চিকিৎসকরাও সে বড়াই করে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে।
কিন্তু সব কিছু ফুরিয়ে যাওয়ার আগে, তার জীবনের কাহিনী কাউকে শুনিয়ে যাওয়া দরকার। তাঁর স্তদ্ধ চেতনা অন্তত একবার প্রগলভ হতে চায়।
অন্তত একদিনের জন্যে কিছু লোকজন পেলে চায়ের আসরে বসে মেলা কাহিনীই শোনানো যায়। তারা পুরোপুরি হয়ত বিশ্বাস করত না। কিন্তু খানিকটাত করত। অবশ্যি একটু আধটু মিথ্যের রং চড়িয়ে নিজেকে যথাসম্ভব বিনয়ী আর পরার্থসেবী করে ধরে তোলার বাসনা যে তাঁর হত না, তা নয়। তবু।
দুর্ভাগ্য, এ দেশে জন্মেছেন। বিদেশ হলে পেশাদার লেখক ভাড়া করে একটা চলনসই কাহিনী দাঁড় করাতে পারতেন। এখানে তাও হয় না। অবশ্যি সে চেষ্টার একবার করেছিলেন। চোখ দেখাতে এসেছিল তার কাছে একটি ছেলে। ভাল করেই দেখে দিয়েছিলেন। তারপর কথায় কথায় জেনেছিলেন ছেলেটি লেখক। ভিজিটের টাকা নেননি। বলেছিলেন, তুমি লেখক মানুষ। তোমার কাছ থেকে টাকা নেব না। লেখক পুলকিত হয়ে বলেছিল, আপনার এই সহৃদয় তার কথা আমি জীবনে ভুলব না।
তারপর একদিন ওকে বাড়িতে ডেকে এনে শুনিয়েছিলেন নিজের কথা।
লেখক চায়ের কাপখানা মৃদু টোকায় সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, তারপর?
ডাঃ মহসীন কেমন বিব্রত বোধ করেন। বলেন, মানে আমাকে কোন একটা চরিত্র হিসেবে দাঁড় করানো যায় না?
লেখক কিছু বলেনি। ফিরে এসেছিল দিন দু’চার পর। এবার দৃষ্টিশক্তির অনুযোগ নিয়ে নয়। বরং তার প্রথম দিনের ভিজিটের টাকাটা বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, মাপ করবেন, আমাকে দিয়ে হবে না। স্বীকার করি, আপনার জীবন খুবই ঘটনবহুল। কিন্তু আমি কাহিনীকার, রির্পোটার নই। এই নিন আপনার ভিজিট।
ডাঃ মহসীন আপত্তি করেননি। করে লাভ নেই। লেখক প্রকারান্তরে জানিয়ে দিয়েছে তাঁকে নিয়ে গল্প লেখার চাইতে ষোল টাকা ভিজিট দেয়ার কাজটা অনেক সহজ।
তিনি যে বার বছর এমন নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন করেছেন সেটা দেখবার অন্তদৃষ্টির লেন্সটা তার যেমন ছিল তেমনি রয়ে গেল।
আর শুধু লেখকই কেন। তাঁর আশেপাশে এই অতর্কিত অভ্যাগতের দল, তাদের কি একবার সে কথা মনে হয়নি। বোধ হয় কারও কারও নিশ্চয়ই হয়ে থাকবে। কিন্তু আজকালকার ভদ্রতা জ্ঞানটাই কেমন টনটনে। এমনকি তাঁকে নিয়ে যে দুটো কথা উঠবে, তারও উপায় নেই। পরর্চ্চার আগ্রহর কেমন মিয়মাণ। তা না হলে এই এতদিনে অন্তত একজনও কি তাঁকে জিজ্ঞেস করতে পারত না, তাঁর বৌ-ছেলেমেয়ে সংসার নেই কেন?
বলতে গেলে বন্ধুবান্ধব তাঁর নেই। যাও দু’চারজন, দুদন্ড বসে। অসম্ভব মিতভাষী। মাপজোঁক করে সিগ্রেট ধরায়। এ্যাশট্রের যথাস্থানে সযতেœ ছাই ফেলে। আর মিটমিটে চোখে কৃতজ্ঞতার ভড়ং দেখায়।
তবু ভাল লাগে যতক্ষণ তারা থাকে। তাঁর উৎসহে যেন জোয়ার ছোটায়। অভ্যাগতদের ইচ্ছের বিরুদ্ধের তাদের জোর করে বসিয়ে বলেন, নতুন লং-প্লে কিনেছি একটা শুনবেন?
তারপর জবাবের আপেক্ষা না করেই চড়িয়ে দেন রেকর্ডখানা। সুরেলা গানের ভাঁজে ভাঁজে তারা কখনও মাথা দোলায়। কখনও তৃপ্তির বাহবা তোলে। কিন্তু সে আর কতক্ষণ। হঠাৎ তাদের একজন ঘড়ি দেখে। ইংগিতেই বোঝেন ডাঃ মহসীন আর ধওে রাখা যাবে না। ক্ষাপ্ত দেন।
আবার কোন কোনদিন তাদের পছন্দ করা রেকর্ডই বাজার থেকে কিনে এনে বলেন, তোমাদের সেই রেবা রহমানের আধুনিক গান এনেছিল, শুনবে?
কিন্তু আজকালকার ছেলেদের সঙ্গে পারা যায় না। তাদের গিন্নিদের সঙ্গে-ত নয়ই।
বার-এ্যা-ল পতœী শুধু রেকর্ডখানা হাতে নিয়ে একবার উল্টে দেখেই ফিরিয়ে দেয়। বলে, আজকাল রেবা রহমান পড়ে গেছে। আগের মত এ্যাপীল নেই। তার চেয়ে ফররুখ আলমই ভাল্ একটু আহত হন ডাঃ মহসীন।
সেই অতি ভদ্র মার্জিত অতিথি পতœীরা হেসে ফেলেই আবার বলে, তাতে কি দিন না।
বলে বোধহয় এ জন্যে যে তাদের হাতে তখনও কিছু সময়। প্লেটে তখনও কয়েক পিস কেক, কিছু ডালমুট, কেটলিতে তখনও গরম চা। কিন্তু একবার যখন সে পর্ব শেষ হয় রেকর্ড শেষ হওয়ার আগেই তড়াক করে তারা লাফিয়ে ওঠে।
বলে, ওমা পৌনে ন’টা। অনেক রাত। তাহলেত আমাদের যেতে হয়। ডাঃ মহসীন বাধা দেন না।
রেকর্ড ছেড়ে দিয়েছেন। তার জীবনের কাহিনী শোনার কেউ নেই। বলার কেউ নেই। বড় জোর একটা ডাইরি রেখে যেতে পারেন। কিন্তু তাও লিখতে গেলে মনে হয় এমন কিছুই ঘটেনি যার ফিরিস্তি দেওয়া যায়।
আজ সে নিজের হাতে পেশোওয়ারী গোলাপের ঝাড়টা ছোটে ফেলেছেন, সেটা লেখা যায়।কিন্তু কি লাভ? অথবা কৃঞ্চচূডোর রং দেখে তার কি মনে হয়েছিল, সে কথা। কিন্তু তাঁর-ত সত্যিকারের তেমন কিছু মনে হয়নি। অনেক ভাল ভাল দুরুহ জটিল চিন্তার কথা ভেবেছেন। কিন্তু মনে আসেনি। বরং কৃঞ্চচূড়োর এই চড়া লাল রং দেখে মনে মনে কোন বদমেজাজী লোকের চোখের উপমা মনে এসেছে এমন সব গদ্য অনুভূতি বলার মত নয়। গল্পের মত-ত নয়ই। আর কি আছে তাঁর জীবনে? কই কিছুইত মনে পড়ে না। কোমরের পেছনে কিছুদিন ধরে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। ওটা বোধহয় কিডনি ট্রাবলের সুত্রপত। কিন্তু ও রকম একটা জঘন্য ব্যথার কথা লোকের কাছে প্রচার করে কি লাভ? বুকে তার কোন ব্যথা নেই। অন্তত ডাক্তারের যন্ত্রে ধরা দেবার মত। তাহলে জীবনটা কি তার শুধুই এক আকাশ অন্ধকার। সেখানে কি এতটুকু ক্ষীণ রজতশূত্র আলোকরশ্মি নেই? স্মৃতিপটে উজ্জ্বল এটি তারাও কি ফোটেনি কখনও?
না না, কোন প্রেম-কাহিনী নয। প্রেমট্রেম করার সময়ই হয়নি তার। তবু জীবনে একটি কি দুটি সামান্য ছোটখাট ঘটনার সূত্রপাতকে যদি কেউ রসাস্বাদনের উপযুক্ত মনে করে, তবে তেমন কিছু তাঁর জীবনে ঠিকই ঘটেছিল। ব্যাপারটা অবশ্যি মাঝে মাঝে নিজে যেমন রসিয়ে ফাঁপিয়ে বলছেন, আসলে তেমন কিছু নয়।
ছোটখাট হাসপাতালে চাকরি নিয়েছেন সদ্য বিদেশ থেকে ফিরে। অস্বীকার করে লাভ নেই বেশ খানিকটা হাত যশ কখন। অপারেশন কেসগুলো তার কাছেই বেশি আসে। সেদিনও একটা শক্ত অপারেশন ছিল। এক নাগাড়ে পাঁচ ঘন্টা লেগে ছিলেন। হঠাৎ লক্ষ্য করেন তাঁর ওয়ার্ডেও শান্ত -স্নিগ্ধদৃষ্টি নার্সটিকে। এর আগেও অনেকদিন দেখেছেন বোধহয়। কিন্তু লক্ষ্য করলেন সেদিনই প্রথম। কি জানি হৃদয়ের আকুলতা বোধহয় এমনি আকস্মিক। কিন্তু তাঁর নিমেষে এই মুগ্ধ হওয়া, এই ভাল লাগার কোন ভাষাই যে বোজাবার মুরোদ নেই। তাঁর জীবনে কাব্য নেই। রস নেই।
প্রথমে কিছু বলেননি ডাঃ মহসীন। নিজের মনের সঙ্গেই লড়েছেন এক প্রস্থ। ভেবেছেন, তাড়াহুড়ো করে কিছু মাটি করবেন না। বরং সময় করে গুছিয়ে বলবেন রসঘন করে। হৃদয়ের আকুলতা বাড়ৃক। সেই উচ্ছ্বাসের ভাষা জোগাবে। তারপর সেই ভাষায় বিগলিত-চিত্ত মেয়েটিকে লজ্জায় আরক্তিম করে দিয়ে জানাবেন ঘর বাঁধার বাসনার কথা। কিন্তু রোগীদের ভিড়ে তাঁর সে সময় কই। তাকে দেখে তরুণ ডাক্তাররা থমকে দাঁড়ায়। সহকর্মীরা সমীহ করে চলে। ব্যাপারটাকে সম্ভাব্য পরিণতির দিকে ঠেলে দেবার জন্যে যে অবিচল সাধ্য-সাধনার দরকার সে সময় বা অবকাশ তাঁর নেই। তাই কথাটা একদিন সরাসরিই বলতে হয়।
নিজের চেন্বারে ডেকে পাঠান। এক নিশ্বাসেই বলে ফেলেন, হাসিনা আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।
একটি সফল, কৃতি ডাক্তারের এ ধরনের প্রস্তাবে তখুনি কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল হাসিনার। এক মুহূর্ত সে স্তব্ধ প্রস্তরের মত দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর বলে, এখন আমি যাই, স্যার।
এরপর আর কোন কথা বলতে পারেননি ডাঃ মহসীন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন। ভরা দুপুরে মেয়েটিও হেটে যাচ্ছে লক্ষ্য করলেন। এক মুঠো ধুল্যে উড়িয়ে ওর সামনে গাড়ি থামিয়ে বলেন তোামকে পৌছেদি চল।
হাসিনা দ্বিরুক্তি করেনি।
মনে মনে প্রসন্নই হয়েছিলেন মহসীন। প্রেমের অঙ্কুরোদ্ধম এমনি করেই হয়। তার সুরভিত পুষ্প এমনি করেই ফোটে।
হাসিনার চপল-হরিণ চোখ থেকে যেন কি খুজছে। ডাঃ মহসীনের দৃষ্টি এড়ায় না।
হাসিনা পেছন ফিরে কাকে হাত নাড়ে।
রিয়ার ভিউ মিররে দেখতে পান ডাঃ মহসীন, তার গাড়ির ধুলোয় ম্লান মুখ কোন একটি যুবক। বোধহয় ওরই সঙ্গে বাইরে যাবার কথা ছিল।
ডাঃ মহসীন বলেন, কি হল্ কাকে হাত নাড়লে?
হাসিনা আঁচকে ওঠে। বলে, না না কাউকে নাত।
তবে যে দেখলাম।
মেয়েটির মুখে কথা সরে না।
ডাঃ মহসীন আবার বলেন, ছেলেটি কে আত্মীয়?
না।
তবে তোমাদের দেশের?
না।
বুঝেছি। কতদিন জানাশোনা?
আনত নয়ন হাসিনা জবাব দেয়, অনেকদিন।
ও।
ডাঃ মহসীন গাড়ি থামান। বলেন, নেবে পড়। এখনও গেলে ধরতে পারবে। ও বোধহয় অপেক্ষা করছে। মেয়েটি আতঙ্কিত হয়ে ওঠে না স্যার আপনি আমাকে পৌছে দিন। ওর সঙ্গে আমার দেখা করবার কথা নেই।
ডাঃ মহসীন যেন আর কোন কথাই শুনবেন না। প্রায় আদেশের সুরে বলেন, নেবে পড়।
হাসিনা ম্লান হাসি হেসে বলে, আপনি রাগ করলেন না ত স্যার?
বিদ্যুৎবেগে গাড়ি ঘুরিয়ে নেন ডাঃ মহসীন।
সেদিন ওয়ার্ডে মেয়েটির সঙ্গে আবার দেখা। নিজেই জিজ্ঞেস করেন, ছেলেটিকে ভালবাসে?
হাসিনা নিরুত্তর।
তাহলে ওকে বিয়ে করছ না কেন। আমার কোন আপত্তি নেই।
হাসিনা বলে, আপনাকে কি বলে ধন্যবাদ দেব। আপনার কৃতজ্ঞতার কথা আমি ভুলব না। তারপর আবার একটু থেমে বলে, স্যার আমার চাকরিটা থাকবে ত?
ডাঃ মহসীন হোসেন্ বল্লেন, হ্যাঁ।
তবে ঐ ওয়ার্ডে নয়, অন্য ওয়ার্ডে বদলি করে দিয়েছিলেন। আজ তার মুঢ়-তার জন্যে নিজের ওপরই রাগ হয়। মেয়েটি হয়ত মনের খেয়ালে ছেলেটিকে বিয়ে করে মিছেই পস্তাচ্ছে। হৃদয়ের টান ছিল। কিন্তু ওসব ক’দিন থাকে। তার চেয়ে তাঁরই ঘরসংসার করত। কলগুঞ্জন মুখরিত আগন্তকর যখন বাড়ি মাথায় করে তুলত তখন এক দুপুরের অর্থহীন প্রেমের কথা মনেও থাকত না মেয়েটির। বরং কৃতি ডাক্তরের বৌ হয়ে স্বাচ্চল্যেও স্নিগ্ধছায়ায় প্রসন্নই হত।
আজ এতদিন পর অবশ্যি এসব ভেবে লাভ নেই। নিছকই মনঃকষ্ট। সময়ের স্রোত তাদের দুজনকে জীবনে কোন অচেনা বন্দরে ঠেলে দিয়েছে।
ইচ্ছে করেই যেন এত দুরে এক স্বাস্থ্য-নিবাসে বাড়িটা করেছেন। শহরে চেন্বার আছে। সকাল বেলা কিছু রোগী দেখেন। তারপর ফিরে এসে সারাদিনই ঘরে থাকেন। অবশ্যি কখনও তাঁর বাড়িতে এসেও রোগীরা চড়াও হয।
সন্ধ্যায় বেড়াতে যান। একটি অখ্যত ঝর্ণার সন্ধান পেয়েছেন কিছুদিন হল। সেখানেই বসে কাটিয়ে দেন কয়েক ঘন্টা একই দৃশ্য দেখেন রোজ। দুরে গড়াই নদী বরাবরে ছায়ায়েরা গ্রাম। ঢলে এসে সূর্য এক সময় ছোঁয় তার প্রান্তসীমা। তারপর খানিকটা রং-এর ছটা লেগে থাকে। রাশি রাশি লজ্জার মত আরক্তিম আকাশের দিকে হতবুদ্ধির মত তাকিয়ে থাকেন। অন্ধকার নাবে। ডাঃ মহসীনের বাড়ি ফেরার সময় হয়। এই নিত্যকার কর্ম-নির্ঘন্টে কোন ব্যতিক্রম নেই। কোন হেরফের নেই।
সেদিনও তেমনি সান্ধ্য ভ্রমণ শেষ করে বাড়ি ফিরছেন। প্রথমে লক্ষ্য করেননি, পরে মনে হল তাঁর বাড়ির সামনে একটা গাড়ি। সচরাচর থামে না। অবাক হবারই কথা।
কে একজন গাড়ি থেকে নেবে এসে গেটের কাছে ডাকাডাকি করে।
মহসীন নিজেই এগিয়ে আসেন।
তাকে দেখে লোকটি জিজ্ঞেস করে আপনি এ বাড়িতে থাকেন?
হ্যা কেন?
আমি অনেকক্ষণ ধরে ডাকাডাকি করছি, কারও সাড়াশব্দ পাইনি। আমরা এখানে বেড়াতে এসেছিলাম। বলতে পারেন ফটিকছড়ি টি-এস্টেটের রেষ্ট-হাউসটা কোথায়? অনেক খুজলাম, পেলাম না।
এখানে তেমন কোন রেষ্টহাউসের কথা জানেন না। সোজাসুজি সে কথাটাই বলে দিলে পারতেন। কিন্তু কি যে হল, যেচে আলাপ জুড়ে দিলেন। বললেন, সে দেখা যাবে, ভেতরে আসুন।
লোকটি এক নয়। সাজগোজ করা একটি সুন্দরী মেয়ে মুখ বাড়িয়ে গাড়ির জানালায়, দেখতে পান।
মেয়েটির কেমন জড়তা।
ডাঃ মহসীন বলেন, কি হল আপনার স্ত্রী নাববেন না?
কেমন যেন থতমত লোকটি। বলে নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই।
এস মীনু।
থেকে থেকে ওদের লক্ষ্য করেন। লোকটি দিব্যি সদালাপী। আর কেমন সলজ্জ স্নিগ্ধ দৃষ্টি মেয়েটি। পর পর দু’কাপ চা হল। লোকটি আপত্তি করল না। মেয়েটি এক চুমুক খেয়ে বলে আমার তেমন অভ্যেস নেই।
অনেকদিন পর কথা বলার লোক পেয়েছেন। পেয়েছেন যাদের তাড়না নেই। ব্যাকুলতা নেই। তবু নিজেই অনুভব করেন রাত হয়ে আসছে, এ সময় রেষ্ট-হাউস খুজতে যাওয়া নিরর্থক।
এতদিন পর দুটো অচেনা মানুষের কাছে হঠাৎ অন্তরঙ্গ হয়ে নিজেরই ভাল লাগছে। যেন কোন ঠুনকো সুযোগের অজুহাতে এদের আরও কিছুক্ষণ ধরে রাখতে পারলে খুশি হন।
এক রকম দ্ধিধাজড়িত কন্ঠেই বলেন ডাঃ মহসীন, আপনারা দু’জন কিন্তু আমার এখানেও থাকতে পারেন। কোন অসুবিধে নেই, আমিত একাই থাকি।
লোকটি তেমন আপত্তি করে না। মেয়েটি গোড়ায় ফিসফিসে গলায় একটু কি বলছিল বোধহয়। কিন্তু ডাঃ মহসীনের পীড়াপীড়িতে টিকল না। নিজে গিয়ে গেষ্টরুমের তালা খুলে দেন। দক্ষিণের জানালা খুলে দেন। বাথরুমের আলো জালিয়ে দেন। অতিথি আপ্যায়নের এমন সুযোগ বহুদিন পাননি।
তারপর নিজেই এক সময় ওদের কাছ থেকে বিদায় নেন। আর ধরে রাখা ঠিক হবে না। হয়ত ওরা একটু নিবিড়তা চায়। যেটা কিনা এ বয়সের ধর্ম। যেতে যেতে ভাবেন ওরা নিছকই ব্যতিকগ্রস্তের দল। বোধহয় ছুটি ছাটা পাওয়া চাকুরে। আপিসী ক্লান্তির হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার লোভে এমনি দুর-দুরান্তের রেষ্ট হাউসের হোটেলের মায়া কুড়িয়ে বেড়ায়। বাড়িতে মন টেকে না। বছর দশেক আগে হলে তিনি নিজেও পারতেন। এখন আর হয় না।
মনে নেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছেন। সময়ের আগেই ঘুম ভাঙ্গল। সেই মুহূর্তে এসে বলে মহসীন, কি রে মীনু যাবি পিকনিকে?
মেয়েটির মুখে কথা সরে না।
বার-এট-ল গিন্নি বোঝে ভারি লাজুক মেয়ে। তাই জবাবের প্রতীক্ষা না করেই বলে, আমরা কিন্তু ঘন্টাখানেক পর এসে নিয়ে যাব।
ওরা চলে যাবার পর মনে হয় ডাঃ মহসীনের মিছিমিছি নতুন করে এদায় না নিলেই হত। ঘন্টাখানেক পর জীবনে যাকে আর দ্বিতীয়বার দেখবেন কিনা সন্দেহ, তাকে নিয়ে কাল্পনিক আত্মীয়তার প্রহসন কেন। একবার ইচ্ছে হয় রাগ করবেন। ঘাড় ধরে বার দেবেন। কিন্তু সে পথত নিজেই বন্ধ করেছেন।
চেয়ারখানা টেনে এনে বসেন ওর কাছাকাছি। বলেন, কোন ভয় নেই্ ওদের বলব পিকনিক শেষে তোমাকে ট্রেনে তুলে দিতে। টাকা আছে?
মেয়েটি মাথা নাড়ে।
পরে বোঝেন এ প্রশ্ন অবান্তর। সঙ্গ-সুখের পারিশ্রমিক এত তাড়াতাড়ি ফুরোবার কথা নয়। তারপর কান কথা হয়নি। নিঃসঙ্গ মুহূর্ত কাটে। সেই অবসরে মেয়েটি সত্যি সত্যি এক কাপ চা বাড়িয়ে দেয় তার দিকে। ডাঃ মহসীন আপত্তি করেন না।
কিছুক্ষণ পরই আবার ওরা সদলবলে আসে। তেমনি হৈ হৈ করে বলে, কই মীনু?
নিজেও লক্ষ্য করেন নি কখন এক ফাঁকে মেয়েটি আবার সাজগোজ পাল্টে বেরিয়ে এসেছে। যেন মুহূর্তের জন্য তার ক্লেদাক্ত জীবনের একটি অধ্যায় ভুলে গিয়ে খুশির স্রোতে গা ঢেলে দিতে চায়।
পিকনিকগামীরা জানায়, আমরা কিন্তু সন্ধ্যার আগে ফিরব না?
বেশত ফেরবার পথে ওকে ট্রেনে তুলে দেবেন।
একা যাবে নাকি?
তাতে কি ফিমেল কম্পার্টমেন্টে অসুবিধের কিছু নেই। ওখানে থেকে ওর বাবা এসে নিয়ে যাবে।
মেয়েটি যাবার সময় এক মূহূর্ত তার মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় না তাকিয়েও বুঝতে পারেন তার প্রতি মেয়েটির কৃতজ্ঞতার সীমা নেই।
বাইরে গাড়ির হর্ন বাজে। মীনু বেরিয়ে যায়। স্থুবিরের মত দাড়িয়ে থাকেন ডাঃ মহসীন। তাপর কি মনে হওয়ায় একবার নিজও ছুটে যান বাইরে। না, কারও চিহ্ন নেই। গাড়ির ধুলোয় দৃষ্টি আচ্ছন্ন। ঘরে ঢুকে সেই ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তেই চাকরকে ডেকে বলেন, মেন গেটটা বন্ধ করে তোলা লাগিয়ে দাও। আজ আর বাইরে যাব না।
অন্তত নতুন কোন সন্দেহ হলেও বার-এট-ল গিন্নিরা শুড় শুড় করে ভেতরে ঢুকে আসতে পারবে না। আর ক’টাই বা দিন তারপরত গরমের ছুটি শেষ। মীত আসছে। বার-এট-ল পতœীরাও চলে যাবে। হৈ-হুল্লোডও হবেনা। সে ক’টা দিন নিজেকে নিয়ে নিজে পড়ে থাকবেন আর শুকনো ঝরা পাতা গুনবেন।
মেন গেটে তালা দিতে গিয়েও ফিরে আসে চাকর। জানায় একজন রোগী তার দর্শনপ্রার্থী। এক মুহূতৃ কি ভাবেন ডাঃ মহসীন। তারপর ইস্পাত কঠিন সংকল্প নিয়ে বলেন, আজ দেখা হবে না। বলগে ডাক্তার আজ নিজেই অসুস্থ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *