রজনী

চরিত্রলিপি

মাহবুব   পত্রিকা সম্পাদক

সিরাজ   যুগ্ম সম্পাদক

মোবারক বার্তা সম্পাদক

শহীদ    শিফ্ট-ইন-চার্জ

কবির    রিপোর্টার

শওকৎ  সাব এডিটর

হেমায়েত         ,,

মাহমুদ  ,,

রব       ,,

নাজির   শিক্ষানবিশী সাব এডিটর

মাসুর    বোর্ড অফ ডাইরেক্টরসের চেয়ারম্যান

ইফতেখার        বোর্ডের সদস্য

একরাম  ,,

জব্বার   ফোরম্যান

হানিফ   ,,

হাবিব    সার্কুলেশন ম্যানেজার

কুদ্দুস    সাক্ষাৎপ্রার্থী

প্রথম ছাত্র         সাক্ষাৎপ্রার্থী

দ্বিতীয় ছাত্র        ,,

আহমদ  পিয়ন

সিদ্দিক আলী      ,,

কলিম   অতিথি (কবিরের বাড়িতে)

সাহানা   সম্পাদিকা মহিলা বিভাগ

পারু     কবিরের স্ত্রী

ডালিয়া  কলিমের স্ত্রী

ইফতেখার        আবুল হায়াত

শওকৎ  ফখরুল ইসলাম বৈরাগী

হালিম   আবদুল আজিজ

তালুকদার         শেখ ফজলুর রহমান

হাসান   কাজি মকসুদুল হক

আনওয়ার         আফজাল হোসেন

তারেক  রাইসুল ইসলাম আসাদ

চানু শেখ কাজি মেহফুজুল হক

সহচরবৃন্দ         আবদুস সাত্তার

          দেলওয়ার হোসেন দিলু

          নুর হোসেন

পুলিশ ইন্সপেক্টর  আলি ইমাম

পুলিশ কনস্টেবল জামিলুর রহমান

বেবী     সুবর্ণা মুস্তাফা

সাহানা   রেখা আহমদ

কোয়েল রুবিনা

রীতা     জলি নাসরিন

রীতার মা অমিতা বসু

অন্যান্য ভূমিকায় : আলি আশরাফ, জিয়া হাসান, লাভলি ইয়াসমিন, মিলি ইয়াসমিন, আইভি আহমদ, পারভিন ইসলাম, সৈয়দ মোহাম্মদ চান্দ, আবুল কাসেম।

প্রযোজনা : আতিকুল হক চৌধুরী

দ্রষ্টব্য : ভুলক্রমে প্রথম পৃষ্ঠায় চরিত্রলিপিতে কোয়েলের উল্লেখ নেই। কোয়েল চান্দু শেখের সাম্প্রিতা। বয়েসে যুবতী। অনুরূপভাবে ড্রাইভার চরিত্রটিও ওই তালিকায় সংযোজিত হবে। ওপরের অন্যান্য ভূমিকায় যাদের নাম দেখানো হয়েছে তাদের অধিকাংশই চতুর্থ দৃশ্যে বেবীর জন্মদিনের নিমন্ত্রিত অতিথি।

প্রথম দৃশ্য

খবরের কাগজের অফিস। বাঁ-দিকে কিছুটা জায়গা ঘষা কাচে মোড়া সম্পাদকের জন্য নির্দিষ্ট। ডানদিকে বার্তা সম্পাদকের জন্য অনুরূপ ব্যবস্থা। বাইরে সাইনবোর্ড। পড়া যায় – সম্পাদক, দৈনিক দেশবাণী এবং বার্তা সম্পাদক দৈনিক দেশবাণী। দুটো জায়গায়ই এখন খালি।

মাঝামাঝি জায়গা লম্বামতো টেবিল জুড়ে কার্যরত কিছু সাব-এডিটর। শিফ্ট ইনচার্জ মাঝখানে। তার সামনে টেলিপ্রিন্টার থেকে ছেঁড়া মেসেজ গাদা করা। অনুরূপ মেসেজও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি সাব-এডিটরদের সামনেও। খবর বাছাইয়ের জন্য শিফ্ট ইনচার্জের সামনে দুটো ট্রে। কিছু অ্যাশট্রে। খালি চায়ের পেয়ালা। কাগজপত্র গাঁথার জন্য টেবিলে ইতস্তত ছড়ানো কয়েকটা ফাইল। দুটো টেলিফোন ঘনঘন বাজতে থাকে। কখনো কখনো ফোন টেপার শব্দ। লম্বা টেবিল সংলগ্ন ছোট্ট একটা টেবিলে টাইপরাইটার। যে কেউ সেখানে গিয়ে টাইপ করতে পারে। কামরার এক কোণে রাখা টেলিপ্রিন্টার। খবর আসা শুরু হলে একটানা শব্দ। কামরার সকলের দৃষ্টিগোচরযোগ্য একটি বড় দেয়ালঘড়ি। ভালো হয় সেকেন্ডের কাঁটা সংবলিত ইলেকট্রিক ঘড়ি হলে। তাছাড়াও বার্তাকক্ষে খবরের কাগজ গাঁথা লম্বা র‌্যাকে রাখা ফাইল। বাতির সারি। কোনোটার শেড আছে, কোনোটার নেই। সম্পাদকের কামরার বাতি নেবানো। দরজা দিয়ে অনবরত লোক আসা-যাওয়া করবে। পিয়ন বইয়ে করে বাইরে থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে লোকজন ঢুকবে। প্রেসের লোক লম্বা কাগজের ছাপানো গ্রুফ নিয়ে আসবে বা লেখার কপি নিয়ে যাবে। মোট কথা একটা ব্যস্ত পরিবেশ। সবাই কাজ করছে। মনে হচ্ছে এ সময় প্রেসের অত্যধিক তাড়া। শিফ্ট ইনচার্জ শহীদ অন্যদের চাইতে বয়সে বড়। চোখে ভারি ফ্রেমের চশমা।  ঘনঘন সিগ্রেট খেতে দেখা যাবে। অন্য সাব-এডিটররা পঁচিশ থেকে ত্রিশের মাঝামাঝি। সবাই ক্ষিপ্রগতিতে কাজ করে যাচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী কপি ছিঁড়ছে, ফেলছে। শুদ্ধ করছে। শহীদের সামনে জড়ো করা অনুবাদ করা কিছু কপি। সদ্য টেলিপ্রিন্টার থেকে ছেঁড়া মেসেজ দেখে নিয়ে পাশের ট্রেতে রেখে দেয়।

সময় : রাত্রি

শহীদ    :         ভালো একটা লিড পাওয়া যাচ্ছে না। তোমার হাতে কী?

শওকৎ  :         (মুখ না তুলেই) কম্বোডিয়া।

শহীদ    :         হয় কিছু?

শওকৎ  :         না। রুটিন ব্যাপার। অবশ্য সীমান্ত সংঘর্ষের একটা খবর আছে বড় রকমের। (মেসেজসমূহ দেখতে থাকে) কোনো কনফার্মেশন পাওয়া যাচ্ছে না। আপনার হাতে রয়টারের মেসেজ ছিল না।

শহীদ    :         ওটা তো তোমাকে দিলাম।

শওকৎ  :         (ডানে-বামে সামনে-পেছনে গলা বাড়িয়ে খোঁজ করে) দিলেন তো, রাখলাম কোথায়।

                   (মুনীর উঠে দাঁড়ায়। টেলিপ্রিন্টার থেকে কী যেন ছিঁড়ে এনে শহীদের কাছে যায়)

মুনীর    :         নিন হয়েছে।

শহীদ    :         (সিগ্রেট ধরায়) কী?

মুনীর    :         (মেসেজ দেখায়)

শহীদ    :         হাইজ্যাকিং Ñ আবার মিয়ামি থেকে। কজন যাত্রী। নাম্বারটা বুঝতে পারো।

মুনীর    :         সিক্সটি ফোর না এইটি ফোর, বোঝা যাচ্ছে না।

শহীদ    :         (পাশে কার্যরত রবকে) আপনার হাতে কী?

রব       :         ওয়েদার।

শহীদ    :         ওয়েদার করতে হবে না। নিউজ এজেন্সিকে টেলিফোন করে জিজ্ঞেস করুন ফিগারটা কত। (শহীদের হাত থেকে রব মেসেজ নেয়। মুনীর নিজের জায়গায় ফিরে যায়। টেলিফোন বেজে ওঠে)

রব       :         কোত্থেকে করব?

মুনীর    :         কেন এডিটরের কামরায় চলে যান। ওখান থেকে করুন স্বস্তিতে। (রব এডিটরের কামরার দিকে যায়)

শহীদ    :         (টেলিফোন তোলে) জি, দৈনিক দেশবাণী বলছি। বলুন। না, ওরকমের কোনো খবর পাইনি। রেডিওতে বলল? কমতে পারে। ওদের জিজ্ঞেস করুন। জ্বি-না। জানি না। না না, ঠিক আছে। একশবার।

                   (টেলিফোন রেখে দেয়) কিছু আছে নাকি ফরেন সিগ্রেট ব্যান করা সম্পর্কে।

শওকৎ  :         না তো।

শহীদ    :         রেডিওতে নাকি দুপুরের বুলেটিনে বলেছে।

শওকৎ  :         কী জানি।

শহীদ    :         কী জানি বললে তো চলবে না। একবার চেক করে দেখ। অমনি উড়িয়ে দিও না। লোকটা না জেনে টেলিফোন করল। (একই সময় অনুবাদ করা কপি দেখতে থাকে। মুনীরকে ফিরিয়ে দিয়ে। না না, তিন কলামের দরকার নেই। আপাতত ডবল কলাম রাখ। (রব দিয়ে আসে)

রব       :         কেউ বলতে পারল না স্যার।

শহীদ    :         আপনি টেলিপ্রিন্টারটা অ্যাটেন্ড করুন তো। দেখুন কিছু আছে কিনা।

                   (রব টেলিপ্রিন্টার থেকে কী একটা ছিঁড়ে এনে উত্তেজিত)

রব       :         ক্র্যাশ Ñ (শহীদের কাছে যাবার আগেই ওখানা ছোঁ মেরে ওর হাত থেকে তুলে নেয় শওকৎ।)

শওকৎ  :         ক্র্যাশ। লে হালুয়া। একশ চব্বিশজন লা-পাত্তা। (শওকৎ মেসেজখানা শহীদকে দেয়)

শহীদ    :         কোথায়!

শওকৎ  :         আটলান্টিকে। নাইরোবি থেকে যাচ্ছিল। (শহীদ ওখানা আবার শওকৎকে ফিরিয়ে দেয়)

শওকৎ       কী করব।

শহীদ    :         হুঁ, কী করা যায়।

শওকৎ  :         কম বাপু। তুমি শিফ্ট ইনচার্জ।

শহীদ    :         রাখ দেখি কী দাঁড়ায়।

শওকৎ  :         দিও কিন্তু।

মুনীর    :         হ্যাঁ জুট। মানে পাট রপ্তানি, গত চার মাসের ফিগার। থানা হেল্থ কমপ্লেক্স। উত্তরাঞ্চলে পাওয়ার পাম্প প্রজেক্ট। আর আরেকটা হচ্ছে ইউনিসেফের দশ কোটি টাকার প্রজেক্ট।

শহীদ    :         ইউনিসেফের তো সেদিন কী যেন একটা করেছি। আছে কিছু?

মুনীর    :         করা যায়। দৈনিক পঞ্চাশ হাজার লিটার দুধ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন খামার। জায়গা বাছাই হয়েছে। আগামী মাসে শুরু হওয়ার কথা। বারো কোটি টাকার প্রজেক্ট। যদিও ফিগারটা কেমন মনে হচ্ছে। এই (অর্থাৎ আমার কাছে এসব ছাড়া আর কিছু নেই Ñ

শহীদ    :         (ঘড়ির দিকে তাকিয়ে) ভালো কোনো স্টোরি না থাকলে ইউনিসেফ দিয়ে করতে পারো। হাইজ্যাকিং বা দেখ কী আসে। আর মস্কো আলোচনার ওপর কী একটা দেখেছিলাম। আরব-ইসরায়েল বৈঠকের কী হলো? কিছু আসেনি। (প্রেস থেকে ক্ষিপ্রগতিতে জব্বার মিঞার আগমন)

জব্বার   :         এরকম স্লো গেলে পারব না। এখনো আঠারো কলাম বাকি।

শহীদ    :         (সামনে রাখা ছাপানো প্রুফ কপি দেখে) আঠারো কলাম? এক দুই, তিন, তিন, তিন, আট-এগারো। এখানে এগারো কলাম। তারপর বিজ্ঞাপন। প্যারাডাইস সোপের একটা হাফ পেজ ছিল না।

জব্বার   :         ওটা আজ রিলিজ হবে না।

শহীদ    :         সেটা আগে বলতে হয়। এখন ম্যাটার পাবো কোথায়।

জব্বার   :         আমরা কী করব। অ্যাডভারটাইজিং সেকশনকে বলেন। (শহীদ চারদিক দেখে। রব ক্রমশ লিখতে থাকে ও ছিঁড়তে থাকে)

শহীদ    :         (জব্বারকে কিছু কপি দিলো) নিন। (রবকে) আরে ভাই তোমাকে দিয়ে তো কিছু হবে না। হাত চালিয়ে কাজ করো।

রব       :         চেষ্টা করছি স্যার।

শহীদ    :         চেষ্টায় হবে না। আর তোমার ওই স্যার স্যার রাখ তো। ওই স্যার স্যার করতে যতো সময় ততক্ষণে আরো দশলাইন লেখা হয়ে যায়।

শওকৎ  :         নতুন নতুন হবেই। সময়ে সয়ে যাবে। আমি কিন্তু হাইজ্যাকিংয়ের ওপর তিন কলাম মেরে দিলাম। মিয়ামিতে যাত্রীবাহী বিমান হাইজ্যাক। বন্দুকধারীদের পরিচয় অজ্ঞাত।

(শহীদের মতামতের জন্য অপেক্ষা করে)

শহীদ    :         ঠিক আছে। একটু নজর রাখতে হবে। দেখ কোথাও ল্যান্ড করে ফেলল কিনা।

শওকৎ  :         (জব্বারকে) নিন। প্রথম পেজে।

জব্বার   :         (কপি মেপে) ছ’কলাম।

শহীদ    :         চিঠিপত্র আছে তো।

জব্বার   :         চিঠিপত্র দু’কলাম। ভেতরের জন্য এখন তো দরকার কমসে কম তিন কলাম। (ঘড়ি দেখে) সাড়ে বারোটা বাজে। সোয়া একটার পর কপি নেব না।

মুনীর    :         নেব না বললে তো হয় না।

জব্বার   :         আমি পারব না। কাল ওই নিয়ে প্রেসে মারামারি। আমাকে মাপ করেন।

শহীদ    :         (কলম নামিয়ে রেখে) তাহলে কাগজ বেরুবে না।

জব্বার   :         আপনাদের খুশি।

মুনীর    :         কাগজ যেন আপনার মর্জির ব্যাপার। আরে বাবা, এখানে বসে কেউ আড্ডা দিচ্ছে না।

শহীদ    :         দিন-দিন আপনাদের কপি যে যার হাতের কপি শহীদকে দেয়। টেলিফোন বাজে টেলিফোনে কথা বলা অবস্থাতেই কপি দেখতে থাকে এবং কোনাে কোনোটা জব্বারের হাতে তুলে দেয়।) জ্বি, জ্বি-জ্বি, জ্বি। কোন স্টোরি। কোনো খবর। (জব্বার চলে যায়) ওটা ঠিক নেই? ফিগারে ভুল। এখন কী করব? এখন কিল করব কী করে। না আলবৎ না। টেলিপ্রিন্টারে কোনো মেসেজ আসেনি। আপনারা মনে করে টেলিফোন করতে পারতেন। বুঝেছেন আপনারা আমাদের চাকরিটা খাবেন। আমার সাত কলাম দরকার আর আপনি রাত পৌনে একটায় বলছেন এটা যাবে না, ওটা যাবে না। এটা কি মামাবাড়ির আবদার? নো নো। নিশ্চয়ই বলব। আমি তো ফারুক সাহেবকে ছাড়ব না। আচ্ছা ছাড়ি। হ্যাঁ হ্যাঁ Ñ আচ্ছা।

                   যত্তসব। ইউনিসেফের স্টোরি যাবে না।

মুনীর    :         যাবে না? না গেলে ভরব কী দিয়ে। কী মুশকিল (বেল বাজায়, পিয়ন আহমদ আসে) প্রেস থেকে ইউনিসেফের কপিটা আন তো তাড়াতাড়ি। সেরেছে। (রবকে)।

রব       :         এসে?

মুনীর    :         ওই হলো। তাড়াতাড়ি হাত চালান। (জব্বারের প্রবেশ। হাতে প্রেসের কপি)

জব্বার   :         সময় নেই। তার ওপরে কম্পোজ করা ম্যাটার ভাঙব। আমাকে দিয়ে হবে না। আপনারা অন্য ফোরম্যান দেখেন।

শওকৎ  :         শোনেন ভাই, মাথা গরম করলে চলবে না।

জব্বার   :         মাথা আমরা গরম করি না। আপনারা করান।

শহীদ    :         বেহুদা কথা বলে লাভ আছে। দিনের ম্যাটারটা আছে না Ñ মফস্বল সংবাদ Ñ যেটা বাদ দিয়েছিলাম ওটা চালিয়ে দেন।

জব্বার   :         ওটা ভেঙে ফেলেছে কিনা দেখতে হবে না?

শহীদ    :         ভেঙে ফেলবে কেন। ওটা দেন। আর এদিকে আমরা দেখি কলাম চারেক ম্যানেজ করা যায় কিনা। (টেলিফোন আসে। শওকৎ ধরে)

শওকৎ  :         জ্বি Ñ এখানে কথা বলুন।

শহীদ    :         জ্বি বলুন। এডিটর নেই। আমি? আমি চার্জে আছি বলুন। আপনার ছেলে আসবে উচ্চশিক্ষা শেষ করে Ñ কোত্থেকে? হল্যান্ড থেকে। জ্বি-না, আমরা এসব ছাপি না। এডিটর চেনেন। ভালো কথা। তাঁকে বলবেন। বলুন। বাড়ির নম্বর দেব। আছে আপনার কাছে। আচ্ছা। জ্বি-না, জ্বি-না।

                   (আবার টেলিফোন বাজে) জ্বি জ্বি Ñ মডার্ন ফার্মেসি? জ্বি-না, রং নাম্বার, (আবার টেলিফোন বাজে) (সঙ্গে সঙ্গে) না ভাই এটা মডার্ন ফার্মেসি নয়। (থেমে) ও. কে। এত রাতে কোত্থেকে কে? এয়ারপোর্ট। সে কি, কপি দেবে। কিসের। এখন কটা বাজে খেয়াল আছে। স্পেস হাফ কলাম দিতে পারি। আহ্, আগে তো দাও তারপর দেখি। রেখে দিচ্ছি ভাই সময় নেই। মাইন্ড করো না।

শওকৎ  :         রিপোর্ট দেবে? তা এতক্ষণ গাঁজা খাচ্ছিল!

শহীদ    :         কী জানি, এয়ারপোর্ট থেকে করল।

মুনীর    :         বুঝেছি। বুঝেছি। রিপোর্টার। রিপোর্টাররাও সোনার চাঁদ। আমরা শিফ্ট করে মরি আর রিপোর্টার বাবাজিরা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়ায়।

শওকৎ  :         সে কথা তাকে আসলেই বলো।

মুনীর    :         আলবৎ বলব।

শওকৎ  :         (হাত চালিয়ে কপি লিখতে থাকে। নিজের মনেই বলে ওঠে) যতসব।

মুনীর    :         (নিজের কপি দেখতে থাকে) বলব না কেন। একশবার বলব। রাত জেগে খাটার বেলায় আমরা। ঝড়বৃষ্টি মাথায় করে অফিস করার বেলায় আমরা। আর পার্টি আর ফাংশানের বেলায় রিপোর্টার। তারপর আবার অ্যাডভান্সড।

মুনীর    :         এই তো সেদিন কবীরকে দেখলাম আরেকজনের গাড়িতে দিব্যি ঘুরে বেড়াতে।

শওকৎ  :         যেতে দাও বাবা, যেতে দাও। আমাদের আসবে টাইম। তখন দেখো।

মুনীর    :         নাম করতেই এসে হাজির।

কবির    :         (হাতের কাগজগুলো টেবিলে সশব্দে রেখে গা এলিয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বসে) ওঃ, কী ঝকমারি বাবা। খেটেখুটে জান পানি।

শওকৎ  :         তা পানির মধ্যে থেকেই উঠে এলে মনে হচ্ছে। তা পানি খাওয়া হলো কোথায়? ভালো সিগ্রেট-টিগ্রেট থাকে তো ছাড়ো একটা।

                   (কবির সিগ্রেট ছুড়ে দেয়)

মুনীর    :         থ্যাংক।

শওকৎ  :         এদিক ছাড়ো একটা। (কবির সিগ্রেট ছুড়ে দেয়)

শহীদ    :         আমি কী দোষ করলাম। (কবির তাকেও দেয়) আছে, ভালো ভালো রিপোর্টিংয়ের ব্যাপার আলাদা।

কবির    :         হ্যাঁ। গাধার মতো খাটার নাম রিপোর্টিং। ভাই তোমাদের দেখলে হিংসে হয়। এজেন্সি মেসেজ তুলে মেরে দিয়ে খচ্খচ্ করে দু-কলম লিখে দিলেই কেল্লাফতে।

শহীদ    :         দেখ, মেজাজ তিরিক্ষি করো না তো এ সময়। হাতের মাল কী আছে ছাড় তাড়াতাড়ি। সময় নেই।

কবির    :         আধ কলামে কী লিখব, কী বাদ দেব। (বেল টেপে। পিয়ন আহমদের প্রবেশ) এক কাপ চা।

আহমদ  :         চায়ের ক্যান্টিন বন্ধ স্যার।

কবির    :         এক গ্লাস পানি। পানির ক্যান্টিন বন্ধ হয়নি তো। নিয়ে এসো বাবা এক গ্লাস ঠান্ডা পানি।

শওকৎ  :         মনে হচ্ছে কড়া জিনিস ছাড়ছ।

কবির    :         ছাড়ব, তবে আজ নয়। সময় আসুক। একবার বেরোক। তারপর দেখো।

শহীদ    :         ওসব পরে। এয়ারপোর্টের কপিটা ছাড়ো তাড়াতাড়ি। একদম সময় নেই। তোমারটাই লাস্ট কপি। (কবির লিখতে থাকে)

দ্বিতীয় দৃশ্য

একই অফিস, দুপুর বেলা। অফিস একটু নিরিবিলি। টেলিপ্রিন্টার বিরতি দিয়ে কাজ করছে। বোঝা যায় এ সময় কাজের চাপ কম। এই শিফ্টের দুজন সাব-এডিটর মাহমুদ ও হেমায়েত। জনতায় প্রকাশিত একটা ঘোষণার প্রতি হেমায়েতের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়।

হেমায়েত         :         দেখেছ আজকের কাগজ।

মাহমুদ  :         না তো। কী আছে?

হেমায়েত         :         আসল জিনিসই দেখেনি। (মাহমুদ উঠে এসে তার এক পাশে অথচ পেছনে দাঁড়ায়) বিশেষ ঘোষণা : তারাগঞ্জ-চান্দিনা হাইওয়ের দুর্ঘটনার রহস্যোদ্ঘাটন।

মাহমুদ  :         তারাগঞ্জ-চান্দিনা হাইওয়েতে আবার অ্যাকসিডেন্ট হলো কেন।

হেমায়েত         :         ওই যে মনে নেই গেল সেপ্টেম্বরে। ব্রিজ ভেঙে আস্ত যাত্রীবাহী বাস চলন্ত ট্রেনের ওপর গিয়ে পড়ল।

মাহমুদ  :         ও, সেই সিরিয়াস অ্যাকসিডেন্ট। পঁচাশি জন তো স্পটেই মারা গেল।

হেমায়েত         :         পঁচাশি জন তো এমনি ফিগার। আমার মনে হয় দেড়শর কম হবে না। শোন পড়ছি। তারাগঞ্জ-চান্দিনা হাইওয়ের শোচনীয় দুর্ঘটনা কি আকস্মিক? ওন্ডারব্রিজ নির্মাণে মারাত্মক ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণ কী? ইচ্ছাকৃত? এসবেরই জবাব পাবেন দৈনিক দেশবাণীর পাতায়। প্রতীক্ষা করুন।

মাহমুদ  :         মনে হচ্ছে কঠিন ব্যাপার। কার রিপোর্ট। নিশ্চয়ই কবিরভাইয়ের।

হেমায়েত         :         সেই বলো। আমি তো জানি না। এখন তোমার কল্যাণে কাগজে দেখলাম। সকাল থেকে কম করে হলেও এক ডজন টেলিফোন। আমি নিজেই তো তিনটে ধরলাম। ওই এক কথা : কী নতুন শোনাচ্ছেন আপনারা।

মাহমুদ  :         ব্যাপার অনেকদূর গড়াবে। দেখা যাক। (হেমায়েতকে সিগ্রেট ধরাতে দেখে) এদিকে ছাড়ো না একটা। (হেমায়েত প্যাকেটসুদ্ধ ছুড়ে দেয়। ওখানা খালি)

হেমায়েত         :         নেই। বেজায় ক্রাইসিস। (নিজের জ্বালানো সিগ্রেট বাড়িয়ে দিয়ে) নাও Ñ

মাহমুদ  :         আরে না, না। (কবিরের প্রবেশ)

কবির    :         কী ভাই, একদম হাত-পা ছেড়ে। মনে হচ্ছে ফাঁকা মাঠ।

মাহমুদ  :         এই যে কবিরভাই। দেখেছ আজকের কাগজ। অত ঘটা করে যে লেখা হলো। তা পর্বতের মুসিক প্রসব হবে না তো। তুমিই বলো, কী রহস্য উদ্ঘাটন হতে যাচ্ছে। আঁচ করতে পারো?

কবির    :         কী করে বলি। দেখি আগে বেরোক।

হেমায়েত         :         ভালো। তবে শেষে সামলাতে পারলেই হয়। এখুনি যা রিঅ্যাকশন।

কবির    :         পারবে না কেন। পত্রিকার একটা স্টান্ড থাকবে না।

মাহমুদ  :         সত্যি যদি তেমন কিছু ঘটে থাকে। এক্সপোজ হওয়া উচিত। চিন্তা করো এতগুলো মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিছি খেলা।

কবির    :         আমাদের দেশে আবার মানুষের জীবনের দাম। হুঁ। যাই, একটু প্রেসক্লাবে যাব।

                   (কবিরের প্রস্থান। প্রেসের দ্বিতীয় ফোরম্যান হানিফের প্রবেশ)

হানিফ   :         কপি দেবেন না। শিফ্ট কখন থেকে বইসা।

হেমায়েত         :         আরে যাও। যাও। ভেতরের পেজ। মাথাব্যথার আছে। দেওয়া যাবে ধীরেসুস্থে। রাতের কোনো বাড়তি আইটেম নেই। ওগুলো চালাও না আগে।

হানিফ   :         হাতে টোটাল দেড় কলাম। দেড় কলামে কাগজ বাইরইব?

হেমায়েত         :         তা যে বেরোয় না সেটা জানি না? সকাল সকাল অত লেকচার ঝাড়ছ কেন?

হানিফ   :         আমরা কইলেই চেইত্যা যান। না বুইজাই প্রেসের কাম করি?

হেমায়েত         :         (কিছু কপি তুলে দেয়) আপাতত এগুলো ধরিয়ে দিন।

হানিফ   :         পরে শর্ট পড়লে আবার দোষ দিয়েন না। (হানিফের প্রস্থান)

                   (উত্তেজিত অবস্থায় দুজন ব্যক্তির প্রবেশ। একজন প্রবীণ বয়েসি। নাম কুদ্দুস। সঙ্গী তরুণ। নাম সিদ্দিক।

কুদ্দুস    :         আমার নাম আবদুল কুদ্দুস। (সঙ্গের জনকে দেখিয়ে দিয়ে) আমার সিদ্দিক।

হেমায়েত         :         জ্বি বলুন।

সিদ্দিক  :         এটা কী? কিসের রিপোর্ট ছাপবেন?

মাহমুদ  :         লেখাই তো আছে। হাইওয়ে অ্যাকসিডেন্টের ঘটনা।

কুদ্দুস    :         তা ছাপতাছেন, এতদিন পরে ক্যান। চাবি লাড়ছেনি কেউ কোনানদিয়া।

হেমায়েত         :         দেখুন, এসব অবান্তর কথা। আপনার কিছু বলার থাকলে Ñ

কুদ্দুস    :         এডিটর কই?

মাহমুদ  :         এ সময় এডিটরকে পাবেন না।

সিদ্দিক  :         চলেন তাহলে।

কুদ্দুস    :         আরে না। কেসটা না বুইজা যামু না। একটা খবর ছাপাইলেই অইবোনি।

মাহমুদ  :         (এডিটরের কামরা দেখিয়ে) আপনারা তাহলে ওইখানে বসুন।

কুদ্দুস    :         ক্যান এইখানে বইলে দোষটা কি। জাত যায়? আপনি কে?

মাহমুদ  :         আমি এই কাগজের কর্মচারী।

কুদ্দুস    :         কর্মচারী তয় কাম করেন।

 হেমায়েত        :         দেখুন একটা কথা বলি। আপনারা প্রথম থেকে যেরকম শুরু করেছেন, কিছু বলিনি। এটা কাগজের অফিস। মুদির দোকান নয়। (দাঁড়িয়ে পড়ে) আবার উলটো শাসাচ্ছেন।

সিদ্দিক  :         চল আমরা ওইখানে বসি।

কুদ্দুস    :         চল। বেআক্কেল গো লগে কথা কইয়া লাভ নেই। কাইল আমু নিজেই টেলিফোন কইরা আমু।

                   [দুজনের প্রস্থান। টেলিফোন বাজে।]

 হেমায়েত        :         (টেলিফোন তুলে) হ্যালো। জ্বি। না নিউজ এডিটরকে এখন পাবেন না। কী ছাপা কর? জ্বি জ্বি হাইওয়ে অ্যাকসিডেন্ট //। আগে থেকে তো কিছু বলতে পারছি না। ছাপা হলে দেখবেন। কেন ছাপাচ্ছি। এটা তো আমি বলতে পারবো না।

                   (টেলিপোন রেখে দেয়। আবার টেলিফোন বাজে।

                   তুমি ধর। আমি ততক্ষণে কপিগুলো দেখে একটু প্রেসে পাঠাই।

মাহমুদ  :         (কপির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ। টেলিফোন কানে ধরে ঠেকিয়ে রেখে কথা বলতে থাকে) হ্যালো জ্বি দৈনিক জনতা। কবিতা ছাপা হয় কিনা। হয়। পাঠিয়ে দেন। জ্বি না পয়সা দিতে হবে কেন। ঠিক আছে। (টেলিফোন রাখে)

হেমায়েত         :         হাত চালাও।

মাহমুদ  :         বুঝতে পারি না। দুপুরবেলার শিফ্টে দুটো হ্যান্ডে কী করে হয়। যদি রিপোর্টিং থাকত তাও এক কথা। দুজন মিলে ষোলো কলাম ভরে কী করে।

হেমায়েত         :         আমিও তো সে কথা বলি। শুনছে কে! লাস্ট মিটিংয়ে বলতে গিয়ে উলটো নিউজ এডিটরের ধমক খেতে হলো।

মাহমুদ  :         এটা ফেলে দিই।

হেমায়েত         :         ফেলে দিচ্ছ মানে। কোনটা।

মাহমুদ  :         অ্যাঙ্গোলায় শ্রমিক অসন্তোষ। আসলে ওটা পুরনো।

হেমায়েত         :         আরে বাবা, ফেলো না। পুরনো হলেও চালাতে হবে। পেজ ভরবে কী দিয়ে।

                   (দুটি ছাত্রের আগমন। হেমায়েত ওদের দেখে হাত নেড়ে বসতে বলে। ইত্যবসরে কপি গুছিয়ে নিয়ে বেল বাজায়। পিয়ন সৈয়দ আলীর প্রবেশ)

 সৈয়দ আলী     :         জ্বি স্যার।

 হেমায়েত        :         এগুলো প্রেসে দাও।

                   (সৈয়দ আলী চলে যেতে উদ্যত) আর বলো আর ম্যাটার পরে। (ছেলেদুটোর দিকে তাকায়)  আপনাদের কী?

প্রথম ছেলে       :         আমি উদয়ন সংঘ থেকে এসেছি।

হেমায়েত         :         বলুন।

দ্বিতীয় ছেলে      :         আমরা একটা ফাংশন করব। চাঁদার জন্য এসেছি।

মাহমুদ  :         চাঁদা?

প্রথম ছেলে       :         কেন খবরের কাগজের অফিস চাঁদা চাওয়া যায় না।

হেমায়েত         :         যাবে না কেন। তবে আমাদের মাপ করতে হবে।

দ্বিতীয় ছেলে      :         বেশ চাঁদা না দেন, তবে নিউজটা ছাপুন।

হেমায়েত         :         সেটা দেখা যাবে। লিখে দিয়ে যান।

                             (ছাত্র দুজন কাগজে তাদের বক্তব্য লিখে হেমায়েতকে দেয়।)

প্রথম ছেলে       :         কবে ছাপা হবে?

হেমায়েত         :         হবে আর কী। ব্যস্ত হচ্ছেন কেন?

প্রথম ছেলে       :         আগেও দিয়েছিলাম একবার। ছাপা হয়নি।

হেমায়েত         :         সব সময় স্পেস থাকে না।

দ্বিতীয় ছেলে      :         কী থাকে না?

হেমায়েত         :         জায়গা থাকে না। নিউজে ভরে যায়। আচ্ছা দেখব। (ছেলেদের প্রস্থান) দেবে নাকি দুটো লাইন?

মাহমুদ  :         রাখ, বিকেলের শিফ্টে দেখা যাবে। স্পোর্টস পেজে যেতে পারে।

হেমায়েত         :         এক কাপ চা খাওয়া তো।

মাহমুদ  :         খাওয়া। তবে বাকিতে। পয়সা দিতে পারব না।

হেমায়েত         :         কী হয়েছে তোমার? বাড়ি থেকে গুনে গুনে দেয় নাকি।

মাহমুদ  :         আর বলো না। গত মাস থেকে আমার কী ক্রাইসিস বোঝাতে পারব না। তারপরও একগাদা লোকজন শ্বশুর বাড়ির। আনতে বলো না। (বেল টিপল, সৈয়দ আলীর আগমন) দুটো চা, তাড়াতাড়ি।

                   (হেমায়েত টেলিপ্রিন্টার থেকে মেসেজ ছিঁড়ে নিয়ে আসে)

হেমায়েত         :         সিচ্যুয়েশন ভালো না।

মাহমুদ  :         কিসের সিচ্যুয়েশন?

হেমায়েত         :         ইন্দোচীনের। দেখছ না কি রকম খেলা শুরু হয়েছে দুদিকে।

                   (চা আসে) নতুন এক যুবক, নাজিরের আগমন। বেশ নার্ভাস। পাশেই বসে পড়ে চেয়ার টেনে। খবরের কাগজ পড়ে। তারপর হাতের আঙুল ভাঙতে থাকে)

হেমায়েত         :         আপনি?

নাজির   :         জ্বি, আমি প্রবেশনার।

মাহমুদ  :         ট্রেনিংয়ে আছেন। কই আমরা তো জানি না।

                   বলছেন যখন তাই হবে। সব কি আমাদের জানিয়ে হয় নাকি। তা আপনার কোয়ালিফিকেশন?

নাজির   :         আমার জার্নালিজমে ডিগ্রি আছে। বরাবর ভালো রেজাল্ট। ইন্টার কলেজ ডিবেটে রানার আপ হয়েছি।

হেমায়েত         :         অত করে বলছেন কেন। আপনার ইন্টারভিউ কে চাইছে। কাগজে কাজ করেছেন কখনো?

নাজির   :         না (থেমে), তবে দিলে পারব।

হেমায়েত         :         আশা করি নিশ্চয়ই পারবেন। পারবেন না কেন।

                   (নাজির সিগ্রেটের প্যাকেট বার করে। অফার করতে যায়। হেমায়েত ইতস্তত করে)

                   আপনি আবার সিগ্রেট খাওয়াতে যাচ্ছেন কেন। (সিগ্রেট ধরায়) মিছিমিছি দরকার ছিল না।

নাজির   :         চা, চা পাওয়া যাবে না?

হেমায়েত         :         পাওয়া যাবে না কেন। বেল টিপুন। (সৈয়দ আলীর আগমন)

 সৈয়দ আলী     :         (মাহমুদের কাছে) বলেন। ইঙ্গিতে নাজিরকে দেখিয়ে দেয়।

নাজির   :         তিনটে চা। তিনটে সিঙ্গাড়া Ñ আচ্ছা চারটেই আন। (গুনে পয়সা দিতে যায়)

সৈয়দ আলী      :         পয়সা পরে দিয়েন।

হেমায়েত         :         একদিনে এভাবে বা সিগ্রেট খাওয়াতে গেলে বাকি নিগুলোয় করবেন কী।

নাজির   :         না, প্রথম দিন এলাম।

মাসুদ    :         ভালো।

(হেমায়েত ও মাহমুদ কাজে মন দেয়।)

মাহমুদ  :         দেখ তো সিহানুকের প্যারিস স্টেটমেন্টটা তোমার কাছে।

হেমায়েত         :         হ্যাঁ।

মাহমুদ  :         (একটা মেসেজ বাড়িয়ে দেয়) তাহলে আমার মনে হয় সে সঙ্গে এটাও জুড়ে দেওয়া যায় এক লাইন। সোভিয়েট ভাইস প্রিমিয়ারের হ্যানয় ভ্রমণ।

হেমায়েত         :         তোমার কাছে আর কী কী আছে দেখি। (মাহমুদ নিজের কপিগুলো হেমায়েতকে দেয়)

                   সুমাত্রায় বন্যায় ৩৩ জনের মৃত্যু। আমার কাছে সব মিলিয়ে দু-তিন, বড়জোর চার কলাম। (কাগজে-কলমে হিসাব করে) তাহলেও হয় না। আরো তিন কলাম দরকার। এই ভদ্রলোক যদি কলামখানেক Ñ

মাহমুদ  :         না না। সে ভরসায় বসে থাকা যায় নাকি।

হেমায়েত         :         বাঁশখালির ওই লঞ্চ অ্যাকসিডেন্টের জন্য ডিসিকে টেলিফোন করো না। কোনো কিছু থাকলে Ñ

মাহমুদ  :         লাইন পাব?

হেমায়েত         :         চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী।

                   নাজিরকে ঘন ঘন খবরের কাগজের ফাইল নাড়াচাড়া করতে দেখা যায়। আবার কখনো ডিকশনারি, কখনো আবার রুমালে মুখ মুছতে। হেমায়েত ও মাহমুদ লক্ষ করে কিছু বলে না।

নাজির   :         মানে একটা শব্দ খুঁজছি।

হেমায়েত         :         নিয়ে আসুন তো, কী কী করলেন দেখি। (নাজির তার করা খবরগুলো হেমায়েতকে দেয়) না না, এসব যাবে না। যেগুলো একেবারেই রিলায়েবল সোর্স নয়, দেবেন কেন। ইতালির মন্ত্রিসভার পতদ্যাগ, নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর। রিজাইন করতে দিন। এতো আগে কেন। ফেলে দিন। অন্যকিছু দেখুন। আপনার মেসেজগুলো দিন তো। (নাজির মেসেজের বান্ডিল তুলে দেয়) মিডলইস্টে কী আছে দেখি। এটা কি ইয়াসির আরাফাত। যেতে পারে। আরব-ইসরায়েল টক্স। শুরু হতে দিন। ডিমনস্ট্রেশন ইন প্যালেস্টাইন। করেছেন? দেখি। ইহুদি নির্যাতনের প্রতিবাদে জেরুজালেমে প্যালেস্টাইন সন্ত্রাসবাদী Ñ সন্ত্রাসবাদী পেলেন কোথায়?

নাজির   :         লেখা ছিল।

হেমায়েত         :         লেখা তো অনেক কিছুই থাকে। মুক্তিযোদ্ধারা চিরকালই ওদের চোখে সন্ত্রাসবাদী। কিন্তু সেটা আপনাকে দেখতে হবে না। নিন, ঠিক করে দিন। অ্যারাব লীগ কনফারেন্স Ñ এটা ডবল কলাম। মোটামুটি এগুলোই করুন। (নাজির সিগ্রেট বের করে। মাহমুদ ও হেমায়েত নেয়)

মাহমুদ  :         যে হারে সিগ্রেট বিতরণ করছেন চাকরির টাকা নিয়ে আর ঘরে যেতে হবে না।

                   টেলিফোন বাজে হ্যালো। (নাজির সিগারেট জ্বালাতে যায়) পারে। (টেলিফোনের মাউথপিসে হাত রেখে নাজিরের একটা আইটেম দেখে ডবল কলামের দরকার নেই। সিঙ্গল কলাম করুন। জায়গা হবে না। হ্যাঁ হ্যালো। জ্বি Ñ ডিসি সাহেব বলছেন। আসসালাম আলাইকুম। জ্বি, দৈনিক জনতা। জি, কালকের ওই অ্যাকসিডেন্টটা। এক মিনিট। কাগজ নিয়ে নিই। (হেমায়েত ওকে একটি প্যাড বাড়িয়ে দেয়) জ্বি বলুন। কত বডি পাওয়া গেছে বললেন, বাইশ, টোয়েনটি টু। সাতাশ। জ্বি জ্বি, টুয়েনটি সেভেন। আচ্ছা, আর ইনজুরড কত বললেন, বিয়াল্লিশজন। সিরিয়াস ফোর্টি কী বললেন, লাইন ডিস্টার্ব করছে, ফোর্টিন, চোদ্দ, চোদ্দজন। হ্যাঁ, রিলিজ দিচ্ছেন। ইনকোয়ারি চলছে। কতদূরে ডুবল। সতেরো মাইল, লঞ্চ ওভারক্রাউডেড ছিল। ছিল কিনা জানেন না। আপনাকে কোট করব? করব না? না করলে কী করে দেব। কাকে কনট্যাক্ট করব। না না, সে তো বুঝলাম। আমাদের ব্যাপারটাও তো বুঝতে হবে। আমরা ওয়েট করতে পারি না। না না, যা বলেছেন তাই যাবে। কী বললেন, রেসক্যু অপারেশন চালাচ্ছেন। আচ্ছা। লাইন কেটে যায় বারবার। হ্যালো, হ্যাঁ এক্সটেন্ড করুন। রাতে আবার টেলিফোন করব। আপনি থাকবেন না। সাইটে যাবেন। তাহলে আপনার জায়গায়। কী নাম, কী নাম বললেন, কাসেম সাহেবকে করব। আচ্ছা ছাড়ি। জ্বি, জ্বি-না। আপনারে নামে কোট করব কেন।

                   [টেলিফোন রেখে দেয় এবং খবর লিখতে থাকে। নাজির ক্রমাগত কাটাকুটি করে। কাগজ ছিঁড়তে থাকে। কেউ ভ্রƒক্ষেপ করে না। প্রেসের হানিফ মিঞা আসে। মাহমুদ দুটো পেজ বাড়িয়ে দেয়।]

হানিফ   :         লঞ্চ অ্যাকসিডেন্ট ক’পেজ দেবেন?

মাহমুদ  :         এখন বলি কী করে। হবে আরো কলাম তিনেক। এটা তো নিয়ে যান। ইন্ট্রো পরে পাবেন।

হানিফ   :         আর পরে কখন। এখন পেজ মেশিনে তুলবার কথা। (টেলিপ্রিন্টারে খবর আসে। সৈয়দ আলী সেগুলো ছিঁড়ে টেবিলে স্তূপাকার করে। হেমায়েত সেগুলো বাছাই করে রাখে। এক সময় নাজিরের অসহায়তা লক্ষ করে। চেয়ার ছেড়ে ওর দিকে যায়। মাহমুদ প্রাণপণে খবর লিখতে থাকে।)

হেমায়েত         :         হলো আপনার?

নাজির   :         না, মানে হেড লাইন খুঁজে পাচ্ছি না।

হেমায়েত         :         দেখি।

                   (নাজির দেখায়। হেমায়েত দু-একজায়গায় প্রয়োজনীয় সংশোধন করে কপিতে। নাজির নার্ভাস। রুমালে মুখ মোছে।)

                   শুনুন আপনি খামোকাই পেরেশান হচ্ছেন।

নাজির   :         না, মানে হেডলাইন ঠিক না হলে Ñ

হেমায়েত         :         ঘাবড়ালে চলবে না। দেখুন আমি যখন প্রথম আসি, কিছু দেখিয়ে দেবে এমন লোকও ছিল না। হয়ে যায়। (পিঠ চাপড়ে) লেগে থাকলে হয়ে যায়। শুনুন কাগজের দাম কত?

নাজির   :         পঞ্চাশ পয়সা।

হেমায়েত         :         আমরা এই শিফ্টে করছি তিন আর চার, ভেতরের পৃষ্ঠা। সহজ অঙ্ক। এক পৃষ্ঠার দাম ছ’পয়সার মতো। আমরা করছি বারো পয়সার কাজ। আপনি দু’কলাম মানে বড়জোর দেড় পয়সার। তা এই দেড় পয়সার জন্য আপনার সিরিয়াস হবার কী আছে?

মাহমুদ  :         (কপি গুছিয়ে চোখ বুলোতে বুলোতে) ভালোই বুঝিয়েছ।

নাজির   :         তবু আপনাদের সঙ্গে তুলনা হয়?

হেমায়েত         :         হবে না কেন। ওই যে বলল। আপনি করছেন দেড় পয়সা। আর আমরা তিন পয়সার কাজ। এতো তফাৎ!

হেমায়েত         :         কটা বাজে? পাঁচটা। তাহলে তো উঠতে হয়। (মাহমুদকে) হলো?

মাহমুদ  :         ইন্ট্রোটা দাঁড় করাতে পারলেই আমার ছুটি। ইভনিং শিফ্টের লোক আসুক। (মুনীরের প্রবেশ)

হেমায়েত         :         নাম করতেই হাজির।

মুনীর    :         সব ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার।

হেমায়েত         :         সব। তোমাদের কোনো ঝামেলা পোহাতে হবে না। (নাজিরকে চোখে পড়ে) ইনি?

মাহমুদ  :         ইনি নতুন। প্রবেশনার।

নাজির   :         এখনো কাজ শিখছি।

মুনীর    :         ভালো। এ লাইনে থাকবেন?

নাজির   :         সেরকমই তো ইচ্ছে।

মুনীর    :         জেনেশুনে আসবেন। ভালো।

নাজির   :         আপনারাও তো রয়েছেন।

                   (মুনীর সিগ্রেট ধরায়)

মুনীর    :         আমরা? (টেলিপ্রিন্টারের মেসেজ গুছোতে থাকে। তারপর একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে) আমাদের কথা ছেড়ে দিন। জেনেশুনে বিষ করেছি পান। (হেমায়েতের দিকে তাকায়) কি বলো? (হেমায়েত হাই তোলে)

তৃতীয় দৃশ্য

সম্পাদকের কামরা। মোটামুটি সাজানো। শেল্ফে কিছু বই রাখা। পেছনে বিশ্বের মানচিত্র। টেবিলে টেলিফোন। সম্পাদক মাহবুব। যুগ্ম-সম্পাদক ও কবির আলাপরত। সম্পাদক কবিরের তৈরি রিপোর্ট দেখছেন।

সম্পাদক :         দেখলাম তোমার কপি। যথেষ্ট খেটেছ। কথা হচ্ছে, ফ্যাক্টস ফিগারস চেক করেছ তো?

কবির    :         নিশ্চিন্ত থাকুন স্যার। আমি তিনমাস ধরে এটার পেছনে।

সম্পাদক :         তিনমাস?

কবির    :         ওই অ্যাকসিডেন্টের সময় থেকেই। স্যার আপনিও জানেন আমি নিজে ওই অ্যাকসিডেন্টটা কাভার করেছিলাম। প্রথম থেকেই কেন মনে হচ্ছিল কোথায় যেন একটা শুভঙ্করের ফাঁকি। বছর গড়াল না, অমনি ঘটা করে তৈরি করা কোটি টাকার ব্রিজ ভেস্তে গেলো।

সম্পাদক :         সে কথা আমিও ভেবেছি। কিন্তু মনে হলেই তো চলে না। প্রমাণ চাই।

কবির    :         সেজন্যেই আমি আর্কিটেক্ট, ইঞ্জিনিয়ার, কন্ট্রাক্টর, লেবার সকলের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রশ্ন করেছি। ওদের নিয়ে সাইটে গিয়েছি। অফিসে অফিসে ধরনা দিয়েছি। এর-ওর দ্বারস্থ হয়েছি। তারপর অনেক খেটেখুটে এই রিপোর্ট তৈরি করেছি। 

সিরাজ   :         যারা এই ব্রিজ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত – অবশ্য আপনার মতে Ñ নিশ্চয়ই তারা হোমরা-চোমরা। পেরে উঠবেন শেষটায়। পাবলিক সাপোর্ট পাবেন? পারবেন ধরিয়ে দিতে?

কবির    :         ঘটনার সত্যতা তুলে ধরা আমার কাজ। যারা খুঁজে বার করার ঠিকই করবে বলে আমার বিশ্বাস।

সিরাজ   :         পারছে কই। তেমন যদি কেউ থেকেই থাকে তারাও দিব্যি অন্যের চোখে ধুলো দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কালপ্রিটরা তো বাইরের কেউ নয়। আমার-আপনার মতোই এদেশের বাসিন্দা। কে কী করতে পারছে?

মাহবুব   :         পারেনি বলে কোনোদিন পারবে না, এমন তো কথা নয়। মানুষের ওপর অতটা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছেন কেন। 

মাহবুব   :         সেসব তর্ক থাক। যে কথা হচ্ছিল। তুমি বলছ শৈথিল্য। কর্তব্যে অবহেলা।

কবির    :         শুধু অবহেলা নয়, ইচ্ছাকৃত গুরুতর অবহেলা। (উঠে দাঁড়ায়। জায়গায় জায়গায় দেখিয়ে দিয়ে) আমি বিস্তারিত বলেছি আমার রিপোর্টে। প্রাথমিক কোনো শর্তই পূরণ হয়নি। মাটি পরীক্ষা হয়নি। সয়েল টেস্টের নামে যে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে ওটার সঙ্গে বাস্তব অবস্থার কোনো সম্পর্ক নেই। সিমেন্টের কোয়ালিটি খারাপ ছিল। আর্কিটেক্ট রাজি হয়নি। জোর করে কাজ করানো হয়েছে। ব্রিজ তৈরি হবার পরও ইঞ্জিনিয়ার তিন-তিনবার সিরিয়াস ক্র্যাকের কথা বলে রিপোর্ট পাঠিয়েছে। সে রিপোর্টও গায়েব।

সিরাজ   :         এসব প্রমাণ করতে পারবেন?

কবির    :         কিছু ফটোস্ট্যাট করা দলিল তো কাগজেই ছাপা হবে। তাছাড়া সাইটে যারা ছিল এমন দুজনের চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তিই আমার সঙ্গেই রয়েছে।

সিরাজ   :         যদি কোর্টে যেতে হয়।

কবির    :         যাব।

সিরাজ   :         আপনার বক্তব্যের সমর্থনে পাবেন কাউকে?

কবির    :         আশা করি।

মাহবুব   :         ওসব আদালত-কাছারি পরে। কাগজের সম্পাদক হিসেবে আমার দায়িত্ব তোমার তথ্যাদি নির্ভুল কি-না খতিয়ে দেখা।

কবির    :         আমার কাছে ক্র্যাক করা পিলারের ছবি আছে। সে-সঙ্গে এক্সপার্টদের মতামত।

সিরাজ   :         তোমার এই পুরো রিপোর্ট ছাপা হলে অবস্থা কি দাঁড়াবে কল্পনা করতে পারো? ছাপা হবে সে বিজ্ঞপ্তি শুনে এখনই লোকজন অফিসে হানা দিতে শুরু করেছে।

কবির    :         স্বাভাবিক। অনেকে ইনভল্ভ তো। দড়িতে টান পড়লে কে কোথায় বেরিয়ে আসে বোধহয় সে ভয়ে। চারপাশে সবই তো রাঘব বোয়াল। দরকার হলে তাদের ফেস করব।

মাহবুব   :         তোমার ফেস করার কিছু নেই। একবার রিপোর্ট ছাপা হলে ওটা ব্যক্তিগতভাবে তোমার নয়, পত্রিকার। আর দায়িত্বের কথা যদি বলো, সম্পাদক হিসেবে সেটা আমার।

সিরাজ   :         স্যার, মিছিমিছি এতবড়ো রিস্ক নেওয়া কি ঠিক হবে! আমার তো মনে হয় এ পর্যায়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেই কী লাভ। লোকগুলো তো আর ফিরে আসবে না। সেন্টিমেন্টাল হয়ে লাভ নেই।

মাহবুব   :         আমি সেন্টিমেন্টাল নই সিরাজ সাহেব। যখন আমি বাড়িতে থাকি আমি দয়ালু এক পিতা কিংবা ভীরু এক স্বামী। অথচ এ চেয়ারে যখন বসি আমি হৃদয়হীন সম্রাট। সেখানে ভাবাবেগের কোনো স্থান নেই।

সিরাজ   :         আমি সে কথা বলিনি।

মাহবুব   :         সিরাজ সাহেব, অ্যাকসিডেন্টের দিন আমিও গিয়েছিলাম। আমি একটা বাচ্চার বুকফাটা আর্তনাদ শুনেছিলাম। ওর দুটো বড় বড় চোখ আমার কাছে কি যে বলতে চেয়েছিল। আমি যেন তার কাছে কি প্রতিজ্ঞা করে এসেছিলাম।

সিরাজ   :         প্রতিজ্ঞাটার কী হলো?

মাহবুব   :         মনে হচ্ছে ওটা পূরণ হতে দেরি নেই। (কবিরের দিকে তাকিয়ে) কী বলো?

কবির    :         স্যার, আমারও সান্ত¡না সেটাই। সেটা মনে হয়েছিল দৈব দুর্যোগ, সেটা কিছু নরপিশাচের ঘৃণিত চক্রান্ত ছাড়া আর কিছু নয় Ñ অন্তত এটুকু তো সবাই জানবে।

মাহবুব   :         সতেরো বছর অনর্গল কথা বলেছি। বলতে পারো, কার কথা? না আমার, না তোমার। আজ যখন সুযোগ এসেছে ভয় করলে চলবে কেন? তোমার পুরো রিপোর্টই ছাপাব। একটা অক্ষরও বাদ যাবে না।

সিরাজ   :         একবার বোর্ড অব ডাইরেক্টরসদের মতামত জিজ্ঞেস করলে হতো না।

মাহবুব   :         নীতিমালার  প্রশ্নে, কাগজের পলিসির প্রশ্নে সম্পাদকের মত চূড়ান্ত। তার নিজস্ব এক্তিয়ার। যেটা আমার নিজস্ব অধিকার সেটা স্বেচ্ছায় আর কারো হাতে তুলে দিতে যাবো কোন দুঃখে। অধিকার বর্জন না করে অর্জন করতে শিখুন সিরাজ সাহেব। (বেল টেপে, সৈয়দ আলীর প্রবেশ) এটা নিউজ এডিটরকে দিয়ে এসো। বলো, কাল থেকে ছাপা হবে।

কবির    :         স্যার, আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।

মাহবুব   :         কৃতজ্ঞতার কিছু নেই। রিপোর্টার হিসেবে তুমি তোমার দায়িত্ব আর সম্পাদক হিসেবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। এতদিন শুধু দিয়েছ বিমানবন্দরে গণ্যমান্যদের যাতায়াতের খবর, কাগজ ভরেছ বিবৃতি আর বক্তৃতায়। বলেছ সেমিনার আর সিম্পোসিয়ামের কথা। আজ নিজের মানুষদের কথা নিজের মতো করে বলো। এতোটুকু ভয় করো না।

কবির    :         আমি চলি স্যার।

সিরাজ   :         আমিও তাহলে চলি।

                   (কবির ও সিরাজের প্রস্থান) মাহবুব পাইপ ধরায়। নিজের ধুম্রকু-লিতে যেন নিজেই হারিয়ে যায়। খানিকক্ষণ পর বার্তা সম্পাদক মোবারকের প্রবেশ।)

মোবারক :         বলেন কী স্যার। পুরো রিপোর্টটা ছাপা হবে। কোনো এডিট না করেই?

মাহবুব   :         কেন নিউজ এডিটর হিসেবে আপনার কোনো আপত্তি?

মোবারক :         না, আপত্তি থাকবে কেন? আপনি কাগজের এডিটর। যা ভালো বোঝেন করবেন।

মাহবুব   :         ছাপা যে হবে সে কথা তো কাগজে বিজ্ঞপ্তি দিয়েই জানানো হয়েছে।

মোবারক :         তবু কাগজের স্বার্থের কথা ভেবে বলা দরকার মনে করলাম। ব্যাপারটা আরেকবার বিবেচনা করে দেখলে হতো না।

মাহবুব   :         পাঁচ কলাম ব্যানার। ফ্রন্ট পেজ।

মোবারক :         পাঁচ কলাম ব্যানার?

মাহবুব   :         যদি আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ বাঁধে আলাদা কথা। তা নইলে পাঁচ কলাম ব্যানার।

সিরাজ   :         মিছেমিছি এত বড় রিস্ক নেওয়া কি ঠিক হবে। আমার মনে হয় এ পর্যায়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে লাভ কী? যারা গেছে তারা তো আর ফিরে আসবে না। সেন্টিমেন্টাল হয়ে…।

মাহবুব   :         আমি সেন্টিমেন্টাল নই সিরাজ সাহেব। যখন আমি বাড়িতে থাকি, আমি দয়ালু এক পিতা অথবা ভীরু এক স্বামী। কিন্তু এ চেয়ারে যখন বসি তখন আমি হৃদয়হীন সম্রাট, যেখানে আবেগের স্থান নেই।

চতুর্থ দৃশ্য

সম্পাদকের কামরা। ঘনঘন ফোন। টেবিলে অজস্র কাগজপত্র ছড়ানো।

মাহবুব   :         সার্কুলেশন ম্যানেজারকে লাগান। (ফোন বেজে ওঠে) আমাকে ফোন করেছিলেন। বেশিরভাগ জায়গায় আমাদের কাগজ পৌঁছায়নি আজ! কারণ? এক কাজ করুন আপনি নিজেই একবার চলে আসুন, এসব ফোনে হয় না।

                   (মাহবুব কাগজপত্র দেখতে থাকে। সার্কুলেশন ম্যানেজার হাবিবের আগমন)

হাবিব    :         আমি খোঁজ নিয়েছি স্যার। আমাদের সার্কুলেশন ডিপার্টমেন্টের কোনো দোষ নেই। কাগজ সময়মতোই পাঠানো হয়েছে। সকালের মেলও ধরেছে।

মাহবুব   :         তাহলে?

হাবিব    :         বলা মুশকিল। তবে অনেকে সন্দেহ করছে প্যাকেটগুলো আগেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে। নইলে নগদ দামে কিনে নিয়েছে কোনো পার্টি সরাসরি আমাদের এজেন্টের কাছ থেকে।

মাহবুব   :         শহরের স্টলে কাগজ গিয়েছে?

হাবিব    :         শহরে কোনো অসুবিধে হয়নি। আমাদের নিজেদের ভ্যান ছিলো।

মাহবুব   :         ব্রিজ কেলেঙ্কারির খবরটা দেখছি এদের বেসামাল করে তুলেছে। অদৃশ্য শত্রুরা ছুরি শানাচ্ছে। এটাও এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। প্রয়োজন হলে আবার ইম্প্রেশন দিতে বলুন। যে যে জায়গায় কাগজ যায়নি, পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন বিকেলের মধ্যে। আর শুনুন, দরকার হলে আগেরটা পালটে এবার সাত কলাম ব্যবহার করবেন।

                   (সার্কুলেশন ম্যানেজার হাবিবের প্রস্থান। টেলিফোন বেজে ওঠে।)

মাহবুব   :         বলুন। বলছি। জ্বি। বুঝলাম না। কী হয়েছে। ওই খবর কোথায় পেলাম? লেখাই তো আছে স্টাফ রিপোর্টার। সোর্স? সোর্স আমরা বলতে বাধ্য নই। আপনার কোনো বক্তব্য থাকলে লিখে পাঠান। কী? বন্ধ করতে বলছেন। না বন্ধ করব কেন। আমরা ছাপতে থাকব। কী করবেন? (টেলিফোন রেখে দেয়) যতসব।

                   (আবার টেলিফোন বাজে)

মাহবুব   :         আলায়কুম সালাম। না, চিনতে পারছি না। তাতে কী বলুন। ছাপলাম কেন। এটার তো কোনো জবাব দিতে পারবো না। যা ভালো মনে করেছি ছেপেছি। জ্বি। আরো কতদিন চলবে। যতদিন দরকার। দেখুন চোখ রাঙিয়ে কোনো লাভ হবে না। কী করবেন? আগুন লাগিয়ে দেবেন। সেটারই আগাম নোটিশ দিলেন নাকি। হ্যালো হ্যালো Ñ (টেলিফোন রেখে দিলো। পিয়ন আহমদের প্রবেশ।)

আহমদ  :         স্যার মিটিংয়ের জন্য সবাই এসে গেছেন।

মাহবুব   :         ডাকো।

                   (এক এক করে যুগ্ম-সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক ও সহ-সম্পাদকরা আসন গ্রহণ করেন।)

মাহবুব   :         আজকের মিটিং দীর্ঘ করব না। আমার কথা খুব সামান্য। আপনারা জানেন একটা রিপোর্ট নিয়ে কোনো কোনো মহল তৎপর হয়ে উঠেছে। হুমকি দিচ্ছে, টেলিফোনে শাসাচ্ছে। কিছু এসে যায় না। আমরা আমাদের কাজ করে যাব। তবে একটা কথা, যা-ই ছাপি না কেন আমাদের দায়িত্ব ও সততার কথা ভুললে চলবে না। দৈনিক জনতার রিপোর্টার মনগড়া খবর দিয়েছে এরকম অপবাদ শোনার আগে আমি নিজেই কাগজ ছেড়ে দেব। আমার আর কিছু বলার নেই।

মোবারক :         আজকেও আমরা কয়েকটা টেলিফোন কল পেয়েছি। কেউ কেউ অফিসে এসে হামলারও কথা বলছে।

মাহবুব   :         এটা নিয়ে বিব্রত হবার কিছু নেই। ভালো কথা, গত সপ্তাহে আমরা দুটো খবর মিস করেছি, ক্যালানেনের ভিজিট। রোডেশিয়ান ক্রাইসিস।

শওকৎ  :         টেলিপ্রিন্টার খারাপ ছিল।

মাহবুব   :         এটা কোনো যুক্তি নয়। আমাদের এলার্ট থাকা উচিত। আর কেউ কিছু বলবেন? কী (নাজিরের দিকে তাকিয়ে) কিছু বলবে। অত বিমর্ষ কেন?

নাজির   :         গত রবিবার বড়ভাইয়া মারা গেছে।

মাহবুব   :         (উৎকণ্ঠিত হয়ে) আচ্ছা কী হয়েছিল? কোথায়?

নাজির   :         হাসপাতালে। একটা ছোট্ট অপারেশন করতে গিয়ে।

মাহবুব   :         বুঝতে পারছি তোমার মনের অবস্থা। তবু মানুষ কী আর করতে পারে বলো।

নাজির   :         সেটা বুঝি স্যার। কিন্তু আমি দু-লাইন খবর ছাপাতে পারলাম না নিজের কাগজে, সেটা দুঃখ।

মাহবুব   :         সেজন্যে মন খারাপ করার কিছু নেই। আমি-তুমি মারা গেলে দুই লাইনের বেশি যাবার কথা নয়।

নাজির   :         তাই বলে নিজের ভাইয়ের খবরটিও দিতে পারবো না।

মাহবুব   :         সে-কথা ভেবে নাকি কেউ // তাকে কাগজ ছাড়তে বলত। তোমার ভাই মারা গেছে এটা দুঃখজনক। তার ছবি ছাপিয়ে আহা-উহু করলে কি আত্মপ্রসাদ লাভ হতো?

মাহবুব   :         নাজির। আমরা এমন কেউ নই যে, পত্রিকায় আমাদের জন্ম-মৃত্যুর খবর ছাপিয়ে মানুষকে শোনাতে হবে।

নাজির   :         তবু স্যার, অনেক কাগজে ছাপা হয়।

মাহবুব   :         ছাপাতে দাও।

নাজির   :         এখানেও হতে পারে। যেমন অপারেশন টেবিলে হঠাৎ একজন রোগীর মৃত্যুর খবর। যেমন আর দশজনের বেলায় হয়। আত্মীয় বলে কেউ অতিরিক্ত সুবিধে আশা করতে পারে না।

মাহবুব   :         অন্তত আমি করি না। (খানিকক্ষণ থেমে) তোমার মনে আছে গেলমাস বিলতলি নদীতে স্টিমারডুবি হলো?

কবির    :         জ্বি। আমরা নিজেরাই তো দিয়েছি সে খবর।

মাহবুব   :         ওই স্টিমারে আমার স্ত্রীও ছিল। ছোট ছেলে ছিল স্বপন। ওদের  বডি পাওয়া যায়নি। আমর পক্ষের স্ত্রী।

নাজির   :         সে কথা তো আমাদের কোনোদিন বলেননি।

মাহবুব   :         বলার মতো কোনো খবর নয়। আমাদের ব্যক্তিগত মান-অভিমান সুখ-দুঃখের ফিরিস্তি ছাপাবার জন্য পত্রিকা নয়। পত্রিকা আমাদের মেজাজমর্জির বুলেটিন নয়। (নাজির চলে যাচ্ছিল)

                   [টেলিফোন বাজে। টেলিফোন ধরে] হ্যালো, হ্যাঁ। এক মিনিট। (মাউথ পিসে হাত রেখে) আপনাদের ধন্যবাদ।

মাহবুব   :         শোনো। আমার কথায় কিছু মনে করো না। তোমার আর কোনো ভাই নেই।

নাজির   :         না স্যার।

মাহবুব   :         তোমার বড়ভাইয়ের জায়গায় আমাকে দেখতে চেষ্টা করো। যাও কাজ করো গে।

পঞ্চম দৃশ্য

                   [কবিরের বাড়ি। স্বাভাবিক মধ্যবিত্ত পরিবেশ। বাড়িতে টেলিফোন থাকবে। পারু কবিরের স্ত্রী। প্রায় সমবয়েসি। বছর চব্বিশেক।]

পারু     :         কী ব্যাপার, আবার কাপড় পরছ? বেরুবে নাকি।

কবির    :         না, বেরুব না ঠিক। একজনের আসবার কথা ছিল।

পারু     :         তোমাদের কাগজে নাকি কী রিপোর্ট বেরিয়েছে, কোনো দুর্ঘটনা সম্পর্কে। স্কুলের টিচাররা বলছিল।

কবির    :         কী বলছিল?

পারু     :         না। এমনি কথায় কথায় উঠল।

                   (টেলিফোন বাজে)

                   হ্যালো। কে, কোত্থেকে। বুঝতে পারছি না। বোধহয় তোমার।

কবির    :         হ্যালো। হ্যাঁ কে, হ্যাঁ বলুন। আসব তো ভাই বলেছিলাম। কিন্তু পারি কই। না, সেক্রিটারিয়েটে যাওয়াও হবে না। আমি একটু এয়ারপোর্টে দৌড়–ব। সেখান থেকে প্রেসক্লাব। দুপুরে? দুপুর-টুপুর আর কোথায়? ফিরতে ফিরতে রাত ১১টা বাজবে। আচ্ছা আচ্ছা। সে দেখা যাবে। না না, তার জন্য কী।

পারু     :         বিকেলে কোথায় যাচ্ছ। ফিরছ না?

কবির    :         বিকেলে পারছি কই। দেখছ না ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়।

পারু     :         আজ বিকেলেও বেবী আসবে। বললাম না তোমাকে।

কবির    :         ভালো তো। আসুক না।

পারু     :         আসুক না মানে। এটা কী ধরনের ভদ্রতা। স্বামী নিয়ে আসবে আর তুমি বাইরে টোঁ-টোঁ করে ঘুরে বেড়াবে। কোনো মানে হয়!

কবির    :         ব্যাপারটা খুবই অসামাজিক।

পারু     :         তাহলে আর বলছ কেন। নিজেই তো বোঝ দেখছি।

কবির    :         (চিরুনি পরিষ্কার করতে করতে) আমি তো বুঝি। বোঝা দরকার তোমার। অসামাজিক একটা প্রফেশন আমি না হয় বেছে নিয়েছিলাম। তুমি একটা অসামাজিক স্বামী বেছে না নিলেই পারতে।

পারু     :         থাক থাক, আর বলতে হবে না। মনে হয় যেন তুমি না হলে কাগজ আর চলে না। যতসব বড় বড় কথা। আসল কথা আড্ডা।

কবির    :         ব্যাপারটা এভাবে মীমাংসা হবে না। আড্ডা হয় না তা বলি না। কিন্তু চাকরিটাই যে সে ধরনের।

পারু     :         মানলাম কাজ। তাই বলে নিজের সংসার চেলেপুলে বউ নেই।

কবির    :         দুর্ভাগ্যবশত অনেক জার্নালিস্টেরই থাকে। তবে না থাকাই ভালো।

পারু     :         এতদিনে সেটা বুঝলে।

কবির    :         এটা আক্ষেপ নয়। নিছক একটা উপলব্ধি।

পারু     :         তুমি মনে করো তোমাদের কাগজে বেশ বড় বড় দুলাইন খবর ছাপা হলো, আর অমনি তোমরা কেউকেটা হয়ে গেলে।

কবির    :         আমার মনে করাকরির কথা নয়। এটা তোমার ধারণা। বেবীদের আসতে দাও। দেখি, কাজ সেরে আসতে পারি কিনা।

পারু     :         থাক থাক, ওসব ঢের শুনেছি। যাও যাও দেশোদ্ধার করো গিয়ে। কাজ। তাই বলে তিরিশ দিনে একটা বিকেল ফ্রি হতে পারেন না।

কবির    :         একটা দিনকে তিনভাগে সকাল, দুপুর, বিকেল বা বলা যায় রাত নিয়ে চারভাগে ভাগ করা যায়। এর বেশি তো সম্ভব নয়। তাছাড়া আমি তোমাদের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে খুব একটা পপুলার নই।

পারু     :         হবে কী করে। কোনোদিন মেশো? কারো বাড়ি যাও? কেউ এলে তার সঙ্গে কথা বলো?

কবির    :         না-না, শুধু তোমার আত্মীয়স্বজন নয়। আমার নিজের আত্মীয়স্বজনদের কথাও বলছি। তাছাড়া ওদের সঙ্গে আলোচনা করব কী বলো, বাড়ি নেই যে ভাড়াটের চরিত্র বিশ্লেষণ করব। গাড়ি নেই যে ইঞ্জিন বিকল হওয়ার সমবেদনা জানাবো।

পারু     :         থাক থাক। মনে করো ওসব বলে খুব বাহবা পাওয়া যাবে।

কবির    :         নিজের স্ত্রীর কাছে স্বামীরা বাহবা খুব একটা আশাও করে না। এবং পায়ও না। (টেলিফোন বাজে)

করিব    :         হ্যালো। কী করছিলাম। ঝগড়া? কার সঙ্গে? নিজের স্ত্রীর সঙ্গে। কথা বলবেন। বলুন।

পারু     :         (চাপা গলায় ভুরু কুঁচকে) কে Ñ

কবির    :         (টেলিফোনের মাউথপিসে হাত চেপে) শফি।

পারু     :         তা আমি কী বলব।

কবির    :         কেমন আছেন, কবে আসছেন। কিছু একটা জিজ্ঞেস করো। নাও ( টেলিফোন দেয়।)

পারু     :         (ভাবান্তর। মুখে ভদ্রতাসূচক হাসি।) জ্বি ভালো আছি। কই আপনারা তো আর এলেন না। আমি Ñ আমরা তো, না ভাই ও সময়ই পায় না। অফিসের ঝামেলায়। রোববার? আমাদের আবার রোববার, সোমবার। দেখুন আবার কোথায় ছুটছে। আপনারা দয়া করে ওর চাকরিটা ছাড়িয়ে দিন। আমরা? আমার চলে যাবে। স্কুলের চাকরিতে যা পাই Ñ না হয় ওসব ফুটুনি করব না। কেন, আমাদের সঙ্গের টিচাররা তিনশ তেত্রিশ টাকা দিয়ে সংসার চালাতে পারে, আমি পারব না কেন। জ্বি ভালো। ভালো। সবাই ভালো। আপনারা? আচ্ছা আসবেন একদিন। (টেলিফোন রেখে দেয়)

                   বাব্বা! একবার ধরলে আর ছাড়ে না। শোন, এটা কোনো কাজের কথা নয়। তোমাকে স্টেশনে যেতে হবে এবং বিকেলে তোমাকে থাকতে হবে। এডিটরকে গিয়ে বলো। চুলোয় যাক তোমার কাজ।

কবির    :         তুমি একটা সোজা ব্যাপার বুঝতে পারছ না। পাঁচটায় কনফারেন্স।

পারু     :         তোমার কনফারেন্সে আর কাউকে পাঠিয়ে দাও। তোমাকেই যেতে হবে কথা আছে নাকি।

কবির    :         ব্যাপারটা তাই। আমাদের কাগজে নিজ সম্পর্কে যে রিপোর্ট ছাপা হয়েছে তার ওপর নিউজ কনফারেন্স। ডেকেছে স্বয়ং চিফ ইঞ্জিনিয়ার। তাদের বক্তব্য বলবেন। বুঝতেই পারছ, আমার না থাকলে চলে না। আজকের কাগজগুলো দাও তো। (পারু কিছু কাগজ এনে কবিরের হাতে দেয়)

পারু     :         নাও।

কবির    :         কাগজ (দেখতে থাকে। তারপর টেলিফোন ঘোরায়) হাসান বাসায় আছ নাকি। এয়ারপোর্টে যাচ্ছ? যাচ্ছ না। ও না, ঠিক আছে। (আবার ঘোরায়) তারেক Ñ আছেন। হ্যাঁ ধরে আছি। যাচ্ছ তো এয়ারপোর্ট? গাড়ি, স্কুটার। ঠিক আছে তোমার স্কুটারের পাশের সিটটা বুক করে রাখলাম। তৈরি থাকব। যাবার সময় তুলে নিও।

পারু     :         (একটা চিরকুট বাড়িয়ে দেয়) নাও।

কবির    :         কী।

পারু     :         একটা কাজ তো করো। মনে করে মেয়েটার ওষুধ নিয়ে এসো।

কবির    :         মনে থাকলে নিশ্চয়ই আনব।

পারু     :         এটুকু কাজ মনে থাকবে না?

কবির    :         আশা করি থাকবে। তবে আমার মনে হয় কাউকে দিয়ে আনিয়ে নিলে ভলো হতো। ঠিক আছে, নিয়ে আসব। ফিরতে ফিরতে রাত হতে পারে। সেজন্য বলছিলাম। (কড়া নাড়ার শব্দ। কলিম ও ডালিয়ার প্রবেশ)

কলিম   :         অসময়ে এলাম।

কবির    :         আমাদের বাসায় সময়-অসময় বলে কিছু নেই। যখন আসবে সেটাই সময়।

ডালিয়া  :         আমরা কিন্তু একটা মতলবে এসেছি।

কবির    :         আশা করি তোমার স্পোর্টসের খবর নয়। গতবার ছাপিনি বলে আপনি তো ছ’মাস রাগ করে কথাই বলেননি।

ডালিয়া  :         না না, ওসব খবর একজন রিপোর্টার পেয়েছি। ও নিজেই করে দেয়। (কলিম ও কবির সিগ্রেট বিনিময় করে ও ধরায়)

কবির    :         তাহলে তো ভালো কথা। তা কী মনে করে।

ডালিয়া  :         আমরা চারটে টিকিট এনেছি।

কবির    :         কিসের?

ডালিয়া  :         নাটকের।

কবির    :         পরে আবার জয়েন করছে কে?

কলিম   :         পরে আবার জয়েন করবে কে? আমরা চারজন।

কবির    :         আমাকে নিয়ে?

ডালিয়া  :         হ্যাঁ।

কবির    :         মাপ করতে হবে।

ডালিয়া  :         বা-রে, নিজে তো দেখানই না। আমরা মনে করে নিয়ে এলাম, তারপরও আবার বলছেন যাবেন না। আচ্ছা মানুষ আপনি।

পারু     :         থাক, ওসব বলে লাভ হবে না এ বাড়িতে। এ বাড়িতে ওসব সামাজিকতার নিয়ম চলে না।

কবির    :         বরং তোমরা যে-কোনো দিন ছবি দেখতে চাইলে তার ব্যবস্থা করে দিতে পারি।

ডালিয়া  :         আপনার ‘অফ ডে’ কবে?

কবির    :         আমার অফ ডে-র কথা ছাড়ো।

পারু     :         তোর ও যে কী হয়েছে ডালিয়া। তুই-ই বা সাধতে যাস কেন এত। না গেলে না গেল। একটা টিকিট কি পানিতে ফেলা যাবে। এ সংসারে লোকের অতই অভাব। যতসব।

                   (ডালিয়াকে নিয়ে পারু ভেতরে যায়। কলিম ও কবির নীরবে সিগ্রেট বিবর্ণময় করে ও ধরায়।)

কলিম   :         তোমার প্রব্লেমটা বুঝি। এ তো সাতটা-দুটোর অফিস নয়।

কবির    :         তাহলে? তুমি তো বোঝই। সময়ের ওপর আমার কোনো হাত থাকলে তো। কাজটাই ছাতার এমন।

কলিম   :         আমার তো মনে হয় কাজটা তোমার পছন্দ।

কবির    :         অপছন্দ নয়। চলে যাচ্ছে। এতদিন করছি। সয়ে গেছে।

কলিম   :         না বলছিলাম কী, সুযোগ থাকলেই যেন তুমি সাংবাদিকতা ছেড়ে দিতে।

কবির    :         কী জানি!

কলিম   :         আমার মনে হয় এটাও একটা নেশা।

কবির    :         কী?

কলিম   :         এই তোমাদের সাংবাদিকতা। সব সময়ই ছোটায়। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ব্যস্ততার তুফান তোলে। সে পরিমাণে দেয় না। তবু তোমরা ছাড়তে পার না। (ডালিয়ার আগমন। কলিম আবার সিগ্রেট দেয়। কবির প্রত্যাখ্যান করে)

কবির    :         আজকাল সিগ্রেট খুব কম খাই।

কলিম   :         তাই নাকি। কিন্তু এটা তো কম-বেশি করা যায় না। আমার মনে হয় তুমি ভালোবাস।

কবির    :         কী?

ডালিয়া  :         মানে আপনার কাজ। আপনার পেশা। আমার আপনাকে হিংসে হয় কবিরভাই। (পারুর প্রবেশ)

কবির    :         তোমার মতো এরকম একটা হিংসুটে মানুষ যদি আমার ঘর করতো ডালিয়া।

ডালিয়া  :         কী যা সব বলছেন। ভালো হবে না বলছি।

ষষ্ঠ দৃশ্য

[দেশবাণী অফিসের একাংশ। দেখা যাবে ছোট ছোট খোপ। কোনোটা ‘সাহিত্য বিভাগ’, কোনোটায় ‘মহিলা বিভাগ’, কোনটায় ‘শিশু বিভাগ’ লেখা সাইনবোর্ড। মহিলা বিভাগ-নির্দেশিত খোপ থেকে বিভাগীয় সম্পাদিকা সাহানা বেরিয়ে আসে লেখার ফাইল সঙ্গে করে। বাইরে রাখা বড়মতো একটা টেবিলে আস্ত খবরের কাগজের একটা পৃষ্ঠা মেলে ধরে। প্রয়োজনবোধে প্রুফ কপি রেখে মাপজোক করে। স্কেল, মোটা পেনসিল ইত্যাদি সাজ-সরঞ্জাম দেখা যাবে। টেবিলটা যেহেতু মেক-আপের কাজে ব্যবহৃত সেহেতু একটা ছোট্ট টেবিল ল্যাম্প। অন্য কোনো আসবাবপত্র তেমন নেই। সাহানা (যুবতী) নিশ্চিন্তমনে কাজ করে। বোঝা যায় কোন লেখা কোথায় বসাবে সেটা নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত। মুনির আসে।

মুনীর    :         আমাকে ডেকেছিলেন?

সাহানা   :         হ্যাঁ, বড্ড মুশকিলে পড়েছি। একটু হেল্প করুন না।

মুনীর    :         মুশকিলটা কী শুনি।

সাহানা   :         মেক-আপ নিয়ে।

মুনীর    :         (তাকিয়ে দেখে) মেক-আপ নিয়ে! আপনার মেক-আপ নিয়ে কোনো সমস্যা আছে বলে তো মনে হয় না।

সাহানা   :         আমার নয়। কাগজের। মেক-আপ করতে হবে।

মুনীর    :         এসব করেননি কখনো?

সাহানা   :         (মাথা নাড়ে)

মুনীর    :         এতদিন চলল কী করে?

সাহানা   :         আমি কোনোদিন করিনি। কবির সাহেব করে দিত। সেদিন আমার সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেল।

মুনীর    :         দিন আপনার ম্যাটার। মেক-আপ না জেনে কাগজে এলেন কী করে।

সাহানা   :         তখন বলিনি তো, জানি না।

মুনীর    :         ও।

সাহানা   :         বোঝেন না কেন, প্রয়োজন ছিল।

মুনীর    :         আমি করে দিলাম না হয় কিছুদিন। তারপর? (একটা বড় কাগজে মুনীর ছক কাটতে থাকে মোটা পেনসিল দিয়ে)

সাহানা   :         (একটা প্রুফ কপি নিয়ে) এটা এখানে দিই।

মুনীর    :         না ছোট কিছু একটা, ওই কবিতাটা দিন না। আমি আপনাকে করে দেব। বিনিময়ে পাব কী?

সাহানা   :         আপনাদের ওই একই কথা।

সাহানা   :         হিসাব-নিকাশের ধরন সবারই এরকম। কী আর বলব বলুন। একটা করে চপ-কাটলেট খাওয়াব। ডাকি? (ডাকি এই অর্থে যে, কোনো লোক ডাকব নাকি)

মুনীর              আরে না না, করছেন কী। অফিসের একগাদা লোকের সামনে আমার বারোটা বাজাবেন নাকি। শেষটায় লোকজন একটা সম্পর্ক কল্পনা করে নেবে। (আড়চোখে চেয়ে)  তা তো সত্যিই হতে পারে।

                   (দুজনেই হাসে)

মুনীর    :         দেখি দেখি, কী কবিতা। বাঃ, শুনুন :

                   চাঁদের আলোর সুধার মতো

                   তোমার প্রেমের ছায়াপথ ধরে

                   চলে যাবো। চলে যাবো বহুদূরে

                   লোকালয় ছেড়ে

                   বাধা পড়ে থাকে মন

                   শতাব্দীর ঘোরে

                   কবে মুক্ত বিহঙ্গের মতো

                   তাকে ডানা মেলে নিয়ে যাবো

                   দূরে, বহু দূরে।

সাহানা   :         কি রকম?

মুনীর    :         কঠিন মেয়েলি কবিতা। এখন বুঝি, আপনাদের মহিলা পেজটা কেন পপুলার। একটা কথা জানেন? আপনাদের এই মহিলা পেজটা মহিলারাই বেশি পড়ে।

সাহানা   :         তাই নাকি? জানতাম না তো। এখানে একটা ছবি, সিঙ্গল কলাম ছবিটা দিন। ক্যাপশন বামে দিই কী বলেন?

                   (মুনীর সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে। একটা লোক টেলিগ্রাম নিয়ে ঢোকে। সাহানা খুলে পড়ে)

                   আপনার টেলিগ্রাম। (মুনীর মেক-আপের কাজে ব্যস্ত।)

মুনীর    :         পড়–ন।

সাহানা   :         পড়ব। কাম শার্প। ওয়াইফ ইল। Ñ তাহলে?

মুনীর    :         দেশের বাড়িতে ছুটতে হবে।

সাহানা   :         তাহলে থাক। আপনি যান।

মুনীর    :         আমি এখুনি চলে গেলে আপনার পেজ মেক-আপ পড়ে থাকবে। অথচ গেলেই স্টেশনে গাড়ি তৈরি পাব না।

সাহানা   :         ব্যাপারটা অত ধীরস্থিরভাবে নিতে পারছেন?

মুনীর    :         কী করতে পারে মানুষ? চিৎকার Ñ হইচই। কান্নাকাটি। (সিগ্রেট ধরায়) একটা কথা মনে রাখবেন সাহানা খান। অযথা অসহিষ্ণু হয়ে লাভ নেই। টেলিগ্রামটা আমাদের দেশে কিসের প্রতীক বোঝেন না? আপনি কিছু বোঝেন না।

সাহানা   :         বুঝি। আপনি বাড়ি যান। আপনার এই চুপ করে বসে থাকা দেখে আমার রাগ হচ্ছে।

মুনীর    :         যাবো। জানেন, কাগজে কাজ করার আগে আমিও অমনি দুঃখে ভেঙে পড়েছি। চিৎকার করেছি। কান্নাকাটি। কোনো লাভ হয়নি। কেউ কারো কান্নাকাটি শুনতে চাই না। সময় কোথায় বলুন। আমাদের কথাই ভাবুন না। কাগজে কাজ করছি। মাঝে মধ্যে একটা ছবি দেখেছি, প্রেসক্লাবে আড্ডা দিয়েছি। কোনো বন্ধু ধরে নিয়ে চাইনিজ খাওয়ালে খুশি হয়ে যাচ্ছি। ব্যস দিনগুলো পার হয়ে যাচ্ছে।

                   (মেক-আপ শেষ করে বড় পেজটা সাহানাকে দেয়) আপনি পেজটা প্রেসে পাঠিয়ে দিন। দেরি হয়ে যাবে।

সাহানা   :         পাঠাচ্ছি। আপনাকে এভাবে ধরে রাখা উচিত হয়নি।

মুনীর    :         এ মুহূর্তে পৃথিবীতে আমার ব্যক্তিগত একটা ঘটনা নয়। অনেক অনেক কিছু ঘটে গেছে সাহানা খান। কয়েকটা পাহাড় ধসে পড়েছে। কয়েকটা নদীতে প্লাবন ডেকেছে। কয়েকটা হতভাগা মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। কয়েকটা হতভাগ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। একটা প্লান ধ্বংস হয়েছে। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে…। কিছু না কিছু চলছেই। কিন্তু তবু তো আমরা কাজ করছি, হাসছি।

সাহানা   :         আপনি এতসব ভাবেন?

মুনীর    :         ভাবি না। অনুমান করি।

সাহানা   :         বুঝতে পারেন? বোঝা আর অনুমান করা কি এক জিনিস হলো। আচ্ছা আমার সম্পর্কে আপনার কী মনে হয়। কিছু অনুমান করতে পারেন।

মুনীর    :         কী?

সাহানা   :         কায়রো ক্রাশে আমার স্বামী মারা গিয়েছিল। আমার বাঁচার কোনো সম্বল ছিল না। একটা সত্যি কথা বলি মুনীরভাই। সংসারে আমি বেশিকিছু জানি না। জানতামও না। প্রয়োজন আমাকে শিখিয়েছে। প্রয়োজন দিয়ে দিয়ে বলিয়েছে। শুধু কাগজের কথা বলছেন কেন, আমি কোনো মেক-আপই জানি না মুনীরভাই।

মুনীর    :         মানুষের জীবনের ধারাটাই এখন। মানুষ এমনি করেই বাঁচে। এমনি করেই শেখে।

সাহানা   :         কারণ তাকে বাঁচতে হয়। আপনি যান মুনীরভাই।

মুনীর    :         (ঘড়ি দেখে) হ্যাঁ যাই। যদি একটা কাগজ থাকত Ñ আমাদের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের কাগজ। তার পেজ মেক-আপটা যে কে করত। আপনি না আমি?

সপ্তম দৃশ্য

বোর্ড অফ ডাইরেক্টরসের মিটিং। মাঝখানে বোর্ডের চেয়ারম্যান মনসুর এবং দুজন সদস্য একরাম ও ইফতেখার। একপাশে মাহবুবের মধ্যে। প্রধানত কথাবার্তা হবে মনসুর এবং মাহবুবের মধ্যে। প্রয়োজনবোধে অন্য দু-চারজন সদস্য কথা বলবে অথবা চেয়ারম্যানের বক্তব্যের প্রতি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাবে।

মনসুর   :         দেখুন মাহবুব সাহেব, সাধারণত আপনাদের পলিসি ম্যাটারে আমরা কখনো কথা বলিনি। প্রয়োজনও হয়নি। কিন্তু এই রিপোর্ট ছাপার পর Ñ বোর্ড অফ ডাইরেক্টরের চেয়ারম্যান হিসেবে আমার কিছু ফল জানার দরকার।

মাহবুব   :         রিপোর্ট আমি ছাপতে বলেছি।

মনসুর   :         দেখুন অলিখিত নীতিমালা বলে একটা কথা আছে। বোর্ডের সম্মতি নেওয়া প্রয়োজন। মাহবুব, লিখিত হোক অলিখিত হোক কাগজের সবচেয়ে বড় নীতিমালা বোধকরি জনমত আর মুক্ত বিবেক।

মাহবুব   :         এডিটর হিসেবে আমি আমার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন। এবং পুরো দায়িত্ব নিয়েই আমি রিপোর্ট ছাপিয়েছি।

ইফতেখার        :         রিপোর্টের ভালো-মন্দ নিয়ে কথা হচ্ছে না। পড়লে যে কেউ ওটা আদতেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত

মাহবুব   :         হ্যাঁ! একটি মাত্র /// তা হলো যা সত্য তাই স্পষ্ট করে বলা।

মনসুর   :         আসলে আপনার কোনো স্টাফ আপনাকে বিপদে ফেলার জন্যে –

//

মাহবুব   :         ভুল ধারণা। সম্পাদকীয় থেকে শুরু করে পত্রিকায় যা কিছু যায় তা কেবল আমার দায়িত্বেই নয়, আমার সম্মতিক্রমেই যায়।

মনসুর   :         এটা আপনার বিনয়। আপনি জানেন এই রিপোর্টের ফলেই পত্রিকার সমূহ ক্ষতি হয়েছে। দেখুন আমরা  কোর্ট-কাছারি নই। ইনকোয়ারি কমিটিও নই। আমাদের কাজ খবর দেওয়া। কে ভালো কে মন্দ করলো তার খোঁজ-খবরদারি করা নয়। কেন নয়? আমি মনে করি, শুধু মনে করি নয়, আমি বিশ্বাস করি, আমাদের কাজ হচ্ছে ঃড় ংযবহশ ঃযব ঃৎঁঃয ঃযব ংবধষ ঃৎঁঃয ঃযব হড়ঃযরহম ///

মনসুর   :         তাই বলে পত্রিকার ক্ষতি করে নয়।

মাহবুব   :         পত্রিকার কোনো ক্ষতি হয়েছে বলে আমার মনে হয় না।

মনসুর   :         আপনার কাছে তো মনেই হবে না। কথা হচ্ছে কিছু ব্যক্তি আর প্রতিষ্ঠানকে টেনে এনে বাহাদুরি পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেটা কোন ধরনের সাংবাদিকতা আমি বুঝি না।

মাহবুব   :         একজনের কাজের ধারা আরেকজন বুঝবে আশা করা উচিত নয়। আপনি (কোনটা কোন ধরনের) সাংবাদিকতার ধরন বোঝেন না। আমিও আপনাদের মানসিকতা বুঝি না।

মনসুর   :         আপনি শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তাই ব্যাপারটা পরিহাসের মতো করে বললেও আমি প্ররোচিত হবো না। সাংবাদিক হয়েছেন বলে ইনস্টিটিউশনকে বিপদে ফেলার স্বাধীনতা কেউ আপনাকে দেয়নি।

মাহবুব   :         স্বাধীনতা কেউ কাউকে দেয় না। নিরাপদে রাখার বা বিপদে ফেলার কোনোটার বেলায়ই নয়।

মনসুর   :         (একটা কাগজ তুলে রিপোর্টের অংশ চিহ্নিত করে) জানি আপনি ডিফেন্ড করছেন। সোর্স বলুন। কে রিপোর্টটা লিখেছে। আমরা অ্যাকশন নেব। বলুন।

মাহবুব   :         আমি সম্পাদক। রিপোর্ট আমার।

মনসুর   :         এটা আপনার বিনয়। না অহঙ্কার।

                   (মনসুর বেল টেপে। অফিসের একজন পিয়ন সকলের সামনে চা এনে রাখে। সে সঙ্গে কিছু কেক পিস। বোর্ড সদস্যরা চায়ে মুখ দেয়। মাহবুব স্পর্শ করে না। আস্তে করে পেয়ালা সরিয়ে দেয়)

মাহবুব   :         (উঁচু গলায়) বিনয় নয়, অহঙ্কারও নয়। সম্পাদক, সম্পাদকই। ভালো হোক, মন্দ হোক দায়িত্ব আমার। (ওঠার উপক্রম করে) দেখুন এ নিয়ে সময় নষ্ট করা বৃথা। কে লিখেছে সে তথ্য জানাতে আমি বাধ্য নই।

একরাম  :         কাইন্ডলি বলুন।

                   (মাহবুব আবার বসে)

মনসুর   :         এটা গায়ের জোরের কথা। আমার কাগজের ব্যাপার আমি জানব না।

মাহবুব   :         (সিগ্রেট ধরায়) কাগজ আপনার নয়। কাগজের ব্যবসা আপনার। কাগজ আমাদের।

ইফতেখার        :         চমৎকার। কোনোদিন বলে বসবেন বাড়িঘর, চেয়ার-টেবিল সব আমাদের।

মাহবুব   :         এ ধরনের দাবি যে দেশে উঠেছে সে দেশের মানুষকে কেউ পাগল বলেনি। ফরাসি বা রুশ বিপ্লবের অনুসারীরা পাগল ছিল না। (জনৈক পিয়ন একটা স্লিপ নিয়ে ঢোকে। মনসুরকে দেয়। মনসুর সদস্যদ্বয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে।)

মনসুর   :         আপনাদের একজন সাব-এডিটর আসতে চান। বলেন তো ডাকতে পারি।

মাহবুব   :         স্বচ্ছন্দে। (শহীদের প্রবেশ)

শহীদ    :         (বোর্ডের সদস্যদের সঙ্গে হাত মেলায়) শহীদুল ইসলাম।

 মোবারক         :         দেখুন এক পর্যায়ে আমি নিজেও আপত্তি করেছি। কিন্তু সেটা রিপোর্ট নিয়ে নয়। কীভাবে ছাপা হবে তা নিয়ে।

মনসুর   :         কিন্তু ম্যানেজমেন্টেরও একটা বক্তব্য থাকতে পারে।

শহীদ    :         মাপ করবেন স্যার। পেশাগত ব্যাপারে নয়।

মনসুর   :         স্বীকার করি ব্রিজ তৈরির ব্যাপারে দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। পাবলিক মানি নষ্ট হয়েছে।

মাহবুব   :         তার চেয়ে বড় কথা, অতগুলো নিরীহ মানুষ এজন্য মারা গেছে।

মনসুর   :         সব সামাজিক অনাচার থেকে দেশকে উদ্ধার করার দায়িত্ব কি আমাদের? তাহলে সাংবাদিক না হয়ে সমাজ সংস্কারক হলেই পারেন আপনারা।

মাহবুব   :         সংস্কার অসংস্কারের প্রশ্ন নয়। এটা সাংবাদিকের নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্ন।

শহীদ    :         অর্থলোভী কিছু নরঘাতকের মুখোশ খুলে ধরেছি Ñ এতে আপনার খুশি হওয়া উচিত ছিল।

মনসুর   :         হতাম। আগাগোড়া সেন্টিমেন্টাল না হলে খুশি আমরাও হতাম। তিনমাস আগের একটা দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদাজল খেয়ে লাগার মানে একটাই। কিছু লোককে হেয় প্রতিপন্ন করা। তাদের অন্যের চোখে খাটো করা। (কিছুক্ষণ থেমে) স্বীকার করি জাজমেন্টে ভুল হতে পারে। আপনাদেরও হয়েছে। যদি আন্ডারটেকিং দেওয়া হয় এ সম্পর্কে আর কিছু ছাপা হবে না, এ ব্যাপারটা আমি পারস্যু করব না।

মাহবুব   :         সেরকম আন্ডারটেকিং অন্তত আমার কাছ থেকে কোনোদিন পাবেন না। রিপোর্ট ছাপা হবে এবং পুরোটাই। আমি  ঈড়সঢ়ৎড়সরংব-এ বিশ্বাস করি না। নবষরাব রহ পড়সবহঃসবহঃ.

মনসুর   :         আমরা আশা করেছিলাম আলোচনার মাধ্যমে ব্যাপারটা নিষ্পত্তি হবে। সে পথ আপনারাই বন্ধ করলেন।

ইফতেখার        :         সেক্ষেত্রে আপনার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে আমরা বাধ্য হবো মাহবুব সাহেব।

মাহবুব   :         সম্পাদকের বেলায় একটাই অ্যাকশন এবং সেটা স্বয়ং সম্পাদকই নিতে পারেন। আপনারা পারেন না। কেউই পারে না।

মনসুর   :         এক্ষেত্রেও কি তাই ঘটছে।

মাহবুব   :         কী করে জানলেন পারেনি? এজন্যে যে, সম্পাদক পদচ্যুত হলো না, পদত্যাগ করলো। (মাহবুব, মোবারক ও শহীদ সভাস্থল ত্যাগ করে। মনসুর ফাইল বন্ধ করতে থাকে।)

মনসুর   :         কেন পারি না?

মাহবুব   :         এজন্যে যে সম্পাদক পদচ্যুত হন না। পদত্যাগ করেন।

মনসুর   :         এক্ষেত্রেও কি তাই ঘটছে।

মাহবুব   :         আমি আমার রেজিগনেশন পাঠিয়ে দিচ্ছি।

                   [মাহবুব, মোবারক ও শহীদ সভাস্থল ত্যাগ করে। মনসুর ফাইল বন্ধ করতে থাকে)

 [মাহবুব পায়চারি করছে Ñ চেয়ার নাড়ছে। ছবিগুলোর দিকে তাকাচ্ছে। তারপর কিছু লিখছে। ]

অষ্টম দৃশ্য

বোর্ড অফ ডাইরেক্টরসের মিটিং। সভাপতির আসনে চেয়ারম্যান মনসুর। দুপাশে বোর্ডের সদস্যদ্বয় ইফতেখার ও একরাম।

একরাম  :         মাহবুব সাহেবের রেজিগনেশন লেটার কাল দিয়ে গেছেন।

মনসুর   :         (পেছনে হেলান দিয়ে পাইপে অগ্নিসংযোগ করে) দীর্ঘ সতেরো বছর কাজ করার পর বুঝি না একটা সামান্য ব্যাপারকে কেন্দ্র করে Ñ

ইফতেখার        :         সম্পাদক হিসেবে মাহবুব সাহেবের অবদান আমরা অস্বীকার করি না। কিন্তু কেউ অপরিহার্য নয়।

মনসুর   :         সে কথা ঠিক।

একরাম  :         কারো ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাকে ধরে রাখা সংগত নয়। ইম্মর‌্যাল।

ইফতেখার        :         তাহলে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হলো বলে ধরে নেব।

                   (পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে)

মনসুর   :         ডিসিশান এখুনি নেয়ার দরকার নেই। পেন্ডিং থাক। আপাতত কাউকে চার্জ দেওয়া সম্পর্কে যদি কোনো প্রোপোজাল থাকে Ñ

ইফতেখার        :         আমরা জয়েন্ট এডিটর সিরাজ সাহেবকে ট্রাই করে দেখতে পারি, যদি বোর্ড একমত হয়।

একরাম  :         আপনারা যা ভালো মনে করেন।

মনসুর   :         অ্যাগ্রিড। (সিরাজ এসে ঢোকে)

সিরাজ   :         আমাকে ডেকেছিলেন।

মনসুর   :         বসুন। আপনি বোধহয় লেটেস্ট ডেভেলপমেন্টটা জেনেছেন। মাহবুব সাহেব রিজাইন করতে চেয়ে চিঠি দিয়েছেন।

সিরাজ   :         আশ্চর্য।

একরাম  :         আশ্চর্য হবার কিছু নেই। আমরা এ রকমই আশঙ্কা করেছিরাম। তা যাক। আপনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার কথা চিন্তা করে বোর্ড আপনার কথা বিবেচনা করছে। আপনি সিচ্যুয়েশন ট্যাকল করতে পারবেন?

সিরাজ   :         ম্যানেজমেন্টের সাপোর্ট থাকলে ইনশাল্লাহ পারবো না কেন। (ডাইরেক্টররা পরস্পর পরামর্শ করে)

মনসুর   :         ঠিক আছে। আমরা মোটিফিকেশন ইস্যু করে দিচ্ছি। আপাতত আপনি অফিশিয়েট করবেন।

সিরাজ   :         কিছু মনে করবেন না স্যার। ডিসিশানটা আগে নিলে অবস্থা এরকম দাঁড়াত না। সব সময় কি আর /// হলে বলে। খুব বুঝেশুনে একটু /// চলতে হয়। তাছাড়া একটা কথা বলবো স্যার।

মনসুর   :         বলুন।

সিরাজ   :         আমার মনে হয় এডিটর সাহেব আর একটু /// ও ৎবধষরংঃরপ হলে আজ আমাকে এসব ভধপব করতে হতো না। হয়তো হলেও বড় মতো হয়েছে Ñ ঝবষভ-দের ঠিকমতো ঃধপশষব করতে পারছেন না। আমি কিন্তু প্রথমেই কিছু লোককে ‘স্যাক’ করতে চাই Ñ

মনসুর   :         ‘স্যাক’ করা না করা পরের কথা। আগে কাগজ বের করার ব্যবস্থা করুন।

সিরাজ   :         আমি যাচ্ছি। আপনি ভাবেন না। ম্যানেজ হয়ে যাবে।

                   (সিরাজের প্রস্থান। মনসুর বেল টিপল। আহমদের প্রবেশ।)

মনসুর   :         নিউজরুমে কেউ আসেনি।

আহমদ  :         না।

মনসুর   :         কোথায় সব?

আহমদ  :         সব বাইরে দাঁড়িয়ে।

                   (বাইরে গুঞ্জন শোনা যায়। শওকৎ ও হেমায়েতের প্রবেশ।)

হেমায়েত         :         আসতে পারি?

মনসুর   :         কিছু বলবেন?

শওকৎ  :         আপনার ডিসিশন অযৌক্তিক। আপনি যাকে খুশি বহাল করতে পারেন না।

একরাম  :         এসব নিয়ে আপনাদের সঙ্গে তর্ক করতে আমরা রাজি নই। কাকে রাখা হবে, না হবে সেটাও কি আপনাদের সঙ্গে পরামর্শ করে করতে হবে?

শওকৎ  :         সম্পাদক রাখা না রাখার প্রশ্ন নয়। নীতিমালার প্রশ্ন। একজন সম্পাদকের চাকরি যাচ্ছে না। একটা মৌলিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে Ñ যা আপনারা পারেন না।

ইফতেখার        :         কী পারি না পারি তা আপনাদের কাছ থেকে শিখতে হবে না। আমরা আরো দু-দশটা ইন্ডাস্ট্রি ‘রান’-করি।

হেমায়েত         :         এটা সে ধরনের ইন্ডাস্ট্রি নয়। এটা সাবানের, বালতির, তালার কারখানা নয়। এটা খবরের কাগজের অফিস।

মনসুর   :         জানি।

শওকৎ  :         মানুষের সৎবুদ্ধি ও সদিচ্ছায় যারা বিশ্বাস করে, পার্থ্যকটা তারা বুঝবে।

মনসুর   :         তখন তো আপনাদের সম্পাদক সাহেব বড় গলায় বলে গেলেন কাগজ আমাদের। তা এই সকাল থেকে কপি যাচ্ছে না, ক্ষতি কার হচ্ছে?

 হেমায়েত        :         সে প্রশ্নের মীমাংসা আপনাদের হাতে।

                   (ফোরম্যান আসে)

হানিফ   :         স্যার ডেকেছেন?

মনসুর   :         কপির কী অবস্থা ফোরম্যান সাহেব?

হানিফ   :         নিউজরুমে কপি দেবার লোক নেই।

একরাম  :         ওদের বুঝিয়ে বললে হয় না।

মনসুর   :         কেউ কথা শুনতে রাজি না।

একরাম  :         ব্যাপারটা একটা ইস্যু হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমার মনে হয় সিরাজ সাহেবের অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যাপারে তাড়াহুড়ো না করলেই ভালো ছিল।

ইফতেখার        :         আপনি ওদের সঙ্গে একবার কথা বলে নিলে ভালো হতো না।

মনসুর   :         না না, কোনো লাভ হবে না। অনর্থক হাঙামা বাড়বে।

একরাম  :         তাহলে মাহবুব সাহেবকেই ডাকতে হয়। যদি কিছু করতে পারেন। এভাবে বসে থাকা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না।

মনসুর   :         (আবার টেলিফোন তুলে) পি-এ সাহেব, মাহবুব সাহেবকে খবর পাঠান। এক্ষুনি। দরকার হলে আমার গাড়ি নিয়ে আপনি নিজে যান। আর শুনুন, শহীদ সাহেবকে একটু পাঠিয়েদিন।

                   (শহীদের আগমন) সঙ্গে কবীর।

শহীদ    :         আমাদের ডেকেছিলেন।

একরাম  :         (শহীদকে) হ্যাঁ বসুন। আপনি একজন এক্সপিরিয়েন্স হ্যান্ড। অনেকদিন ধরে রয়েছেন। দেখেছেন কখনো আপনাদের ব্যাপারে নাক গলাতে। মাহবুব সাহেব ব্যাপারটাকে প্রেস্টিজ ইস্যু ধরে ফেললেন। কাগজের স্বার্থ কি আমরা বুঝি না?

ইফতেখার        :         আসলে বুঝলেন, আমাদের ওপরে একটু প্রেশার আছে।

শহীদ    :         কজনের? যাদের মুখোশ খুলে যাচ্ছে তাদের? করগোনা কয়েকজন মানুষের প্রেসারের চেয়ে বিবেকের প্রশ্নটাই কি বড় নয়?

মনসুর   :         তা আপনারা যাই বলুন, কজনের প্রতিপত্তি তো আর অস্বীকার করা যায় না।

শহীদ    :         হাজারো মানুষের কথা বলতে গেলে সামান্য কজনের প্রেশারের ভয় করলে কি আমাদের চলবে?

মনসুর   :         কবীর সাহেব। আপনি ওখানে রিপোর্টিংটা না করলে আজ এ অবস্থা হতো না।

কবীর    :         আমি আমার বিবেকের কাছে এতটুকু অপরাধী নই Ñ এটা আপনিও বোঝেন তারাগঞ্জ হাইওয়ের ব্রিজটা হঠাৎ নিজের মর্জিতে ভেঙে পড়েনি। ওটা যাতে ধসে পড়ে তার পাকাপোক্ত ব্যবস্থাই ছিল। আমরা ওই কথাটাই সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চাই।

ইফতেখার        :         ধরে নিলাম যা বলছেন তাই ঠিক। কিন্তু একা কটা সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন?

কবীর    :         সমাজের একজন হিসেবে চোখ বুজে থাকা যায় না। (আহমদের প্রবেশ)

আহমদ  :         স্যার আপনার টেলিফোন।

মনসুর   :         কার?

আহমদ  :         (শহীদকে দেখিয়ে) স্যারের। ওই রুমে।

শহীদ    :         আমি আসি। (শহীদের প্রস্থান)

মনসুর   :         (পি-একে) প্রেসে খোঁজ নিন তো। এখনো কপি যায়নি। সিরাজ সাহেব কোথায়? সিটে নেই। ঠিক আছে। (মনসুর বেল টেপে। আহমদের প্রবেশ)

আহমদ  :         না স্যার।

মনসুর   :         একটু লক্ষ রেখে। খবর দেবে আমাকে।

ইফতেখার        :         (একরামকে) ব্যাপারটা ফ্র্যাঙ্কলি আরেকবার আলাপ করে দেখি, কী হয়।

                   (আহমদের প্রবেশ। সঙ্গে মাহবুব।)

মনসুর   :         আসুন, আসুন, মাহবুব সাহেব।

মাহবুব   :         কী ব্যাপার, ফুল বেঞ্চ।

মনসুর   :         বেঞ্চ নয়, বোর্ড। ///

মনসুর   :         (উঠে দাঁড়ায়। হাত মেলায়) আপনারই অপেক্ষা হচ্ছিল। আপনাকে আবার কষ্ট দিতে হলো। চা খাবেন?

মাহবুব   :         না না। আমি তো পদত্যাগপত্র দিয়েছে। পাননি?

মনসুর   :         পেয়েছি। কিন্তু সেটা গ্রহণ করা না করার স্বাধীনতা আমাদের আছে Ñ না এটাও অস্বীকার করবেন?

মাহবুব   :         না, তা অস্বীকার করি না।

ইফতেখার        :         খুবই গুরুতর পরিস্থিতি। সকাল থেকে প্রেসে একটা কপি যায়নি।

মাহবুব   :         আমি এ অবস্থায় কী করতে পারি বলুন।

মনসুর   :         কিছু একটা না করলে কাল কাগজ বেরুবে না।

মাহবুব   :         আপনারা রিপোর্ট ছাপাতে চান না। কাগজ না বেরুলে রিপোর্টও বেরুবে না। ভালোই তো। সমস্যা চুকে গেল।

মনসুর   :         আপনি রসিকতা করছেন।

একরাম  :         মাহবুব সাহেব দোষ আমাদেরও। হয়তো উত্তেজিত ছিলাম। তাতে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকবে।

মাহবুব   :         ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ তো আমি দেখছি না।

                   (শহীদের পুনরায় আগমন)

শহীদ    :         আসতে পারি?

মনসুর   :         নিশ্চয়ই। না আমরা মাহবুব সাহেবকে বলছিলাম, ভুল বোঝাবুঝি হয়েই থাকে Ñ

শহীদ    :         (মাহবুবের দিকে তাকিয়ে) স্যার যদি অনুমতি দেন।

মাহবুব   :         নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। বলো।

শহীদ    :         মোদ্দা কথা হচ্ছে : আপনারা ব্রিজ কেলেঙ্কারির খবর ছাপতে দিতে চান না Ñ রিপোর্ট ধরে রাখবেন Ñ

মনসুর   :         ধরে রাখছি কেন সেটা তো বুঝতে হবে।

শহীদ    :         কোন স্বার্থে ধরে রাখবেন। কিছু লোকের ভয়ে। কারা সে সব লোক। এতগুলো নিরীহ প্রাণ মানুষের হত্যাকারীদের বাঁচিয়ে কাদের কথা বলবেন। আপনারা কি তাদের দলে?

ইফতেখার        :         না না, আমরা তাদের দলে হতে যাবো কেন।

শহীদ    :         তবে কাকে প্রটেক্ট করছেন? কেন প্রটেক্ট করছেন?

মনসুর   :         বিশ্বাস করুন, আমাদের ওপর প্রেশার আসছে। হুমকি আসছে।

শহীদ    :         কিসের হুমকি? কারা হুমকি দিচ্ছে, দেখুন আমরা আর ঝামেলায় যেতে চাই না।

কবীর    :         যেতে চান না তো পত্রিকা বার করেছিলেন কেন। কেন বড় বড় গলায় পত্রিকায় ফলাও করে প্রচার করছেন আপনারা জনগণের বাহন। তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গে একাত্ম। এই সাতাশ বছর কাদের সুখের কথা বলেছেন? কাদের দুঃখের জন্য বিলাপ করেছেন?

মনসুর   :         সেসব কি এখন জিজ্ঞেস করার সময় হলো।

কবীর    :         নিশ্চয়ই। য়্যুনিভারসিটি থেকে পলায়ন করে অন্য কোথাও না ঢুকে সংবাদপত্রে চাকরি লিখেছিলাম কিসের জন্যে। কিসের জন্য মাহবুবভাই দীর্ঘ তিরিশটি বছর তার জীবনের মহূর্তগুলো এই কাগজের অফিসে কাটালেন। আমরা জানি ঢাকাতে তার বাড়ি নেই। তবে একটা মাত্র /// তার আছে ///

মাহবুব   :         উত্তেজিত (ঘড়িতে পাঁচটা বাজে)। তুমি বরং যাও। আমিই কথা বলছি।

শহীদ    :         যে /// বলেন। আমাদের শুধু একটা কথা।

কবীর    :         মনে করেন ছাপাইতে। এবং কাগজের সম্পাদক হিসেবে মানতে হবে।

মনসুর   :         মাহবুব সাহেব, পাঁচটা বাজে, নইলে কাগজ কাল বের হবে না। প্রেসে কোনো কপি যায়নি। (খানিক থেমে) মাহবুব সাহেব আমাদের এভাবে বিপদে ফেলে Ñ আপনি পদত্যাগপত্র ফিরিয়ে নিন।

একরাম  :         বিশ্বাস করুন ওটার ওপর কোনো অ্যাকশন নেওয়া হয়নি। হবে না।

মনসুর   :         কাগজের ভালো-মন্দের কথা চিন্তা করে এ সামান্য অনুরোধটুকু নিশ্চয়ই করতে পারি।

মাহবুব   :         চিন্তা করে দেখি কী করা যায়।

মনসুর   :         চিন্তা নয়। আপনি কথা দিন।

মাহবুব   :         ঠিক আছে।একটু পড়ে আমি আসছি।

                   [মাহবুব নিজের রুম বরাবর /// গুলোর ওপর যায় Ñ ছবি গুলোয় হাত রেখে দিয়ে তাকায় কলম তুলে নেয়। মনে হবে তলোয়ার।]

মাহবুব   :         যারা বাইরে দাঁড়িয়ে, তাদের সবাইকে ডাকো। এই যে সিরাজ সাহেব।

সিরাজ   :         আমি জানতাম আপনাকে ফিরে আসতেই হবে।

শহীদ    :         মাহবুবভাই। আপনি যদি আজ হেরে যেতেন, আমরা সামনে এগোবার আর পথই খুঁজে পেতাম না।

কবীর    :         আমার কিছুই বলার নেই।

মাহবুব   :         যাও। যাও কাজ করো গে।

সিরাজ   :         চলো। চলো সবাইকে চালিয়ে কাজ করতে হবে। পুরো একটা দিন ক্ষতি হলো।

শহীদ    :         এতো বড় একটা মহৎ লাভের জন্য এটা কিছু নয়। সামান্য ক্ষতি।

মনসুর   :         কাগজ তাহলে বেরুচ্ছে।

মাহবুব   :         আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। আমি এটাকে ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করিনি তার প্রমাণ নিশ্চয় পেয়েছেন।

মনসুর   :         অবশ্যই।

মাহবুব   :         (কী ভেবে নিয়ে) এতে একটা কথা। ভবিষ্যতে পলিসি ম্যাটারে, নিউজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে কে?

মনসুর   :         আপনিই নেবেন, যেমন নিচ্ছিলেন। অবশ্য যদি প্রয়োজন মনে করেন। আমরা যদি কোনো সাহায্যে আসতে পারি Ñ এনিথিং, আর কিছু?

মাহবুব   :         কবীরের রিপোর্টের কথাটা বলতে চেয়েছিলাম। ওটা আশাকরি ছাপা হবে?

মনসুর   :         নিশ্চয় হবে। সম্পাদক হিসেবে আপনি যদি মনে করেন পত্রিকার কল্যাণের স্বার্থে যাওয়া দরকার অবশ্য যাবে। বলুন, আর কোনো শর্ত? আমি আগে থেকেই আন্ডারটেকিং দিচ্ছি।

মাহবুব   :         তার দরকার হবে না। আপনার মুখের কথাই যথেষ্ট। আমার একটাই ছিল এবং চিরদিন থাকবে।

মনসুর   :         কী? মাহবুব   :         যাদের কথা বলব বলে প্রচার করে এসেছি এতদিন, তাদের কথা বলতে গেলে ভবিষ্যতে আর কোনো শর্তের দরকার হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *