বলাকা অনেক দূরে

সাগর-তীরবর্তী ট্যুরিস্ট কেন্দ্র নিশাপুরের হোটেল প্যারাডাইস। অর্ধবৃত্তাকার কাউন্টার। কাউন্টারের একধারে টেলিভিশন। সম্ভব হলে অ্যাকাউন্টিং মেশিনও থাকতে পারে। বড়মতো লেজার, হোটেলে আগত ব্যক্তিদের নাম লেখার জন্য। তাছাড়া নানা সাইজের কার্ডবোর্ডের প্ল্যাকার্ড। কোনোটা সিগ্রেটের, কোনোটা বিমান কোম্পানির, কোনোটা ট্র্যাভেল এজেন্টদের বিজ্ঞাপন। কোনোটায় আবার হোটেল প্যারাডাইসের বার বা রেস্তোরাঁর প্রচার। যেমন ‘ট্রাই আওয়ার ব্লু রুম ফর ডিনার’ জাতীয়। পেছনের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে সুন্দর করে বাঁধানো বড় বড় বিজ্ঞাপন। অধিকাংশই ট্যুরিস্ট কেন্দ্র সম্পর্কীয়। যেমন, ‘একবার ছুটিতে নিশাপুর আসুন’, ‘প্রকৃতির লীলাভূমি নিশাপুর’ ইত্যাদি। দেয়ালের বাকিটা জুড়ে নম্বর লেখা কাঠের বোর্ড। তাতে চাবি ঝুলছে এবং চিঠিপত্র, বিল, মেসেজ ইত্যাদি রাখার জন্য পায়রা খোপ বাক্স।

কাউন্টার সংলগ্ন লাউঞ্জ। সেখানে বসার জন্য কিছু আরামদায়ক সোফা। কিছু নিচু টেবিল এবং তাতে ছড়ানো-ছিটানো পত্রপত্রিকা, হোটেল পর্যটন গাইড বুক, লম্বা খাড়া অ্যাশট্রে পিতলের।

কাউন্টারে দুজনকে কাজ করতে দেখা যাবে। যে টেলিফোনের কাছাকাছি সে রিসেপশনিস্ট। অল্পবয়েসি যুবক। কাউন্টারের মাঝামাঝি…

                       (সমুদ্রের গর্জন)

কর্মচারী :         Yes Sir. Tourist Centre Nishapur – Yes sir প্যারাডাইস হোটেল। ইয়েস, ইয়েস রিসেপশন। রুম, কী বললেন, না সরি। টু উইক্স আমরা ফুল্লি বুক্ড। না না, সম্ভব হলে – নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই – আপনার টেলিফোন, জাস্ট অ্যা মিনিট, অল রাইট। তেমন কিছু হলে জানাব। ইউ আর ওয়েলকাম।

                   [টেলিফোন রেখে দেয়। রিয়াজের দিকে তাকায়।] ইয়েস                     স্যার –

রিয়াজ   :         আমাদের বুকিং ছিল। একটা সি-ফেসিং কামরা হলে ভালো হয়, মানে যদি সম্ভব হয়।

কর্মচারী :         ওয়ান মিনিট। কী নামে বুকিং ছিল স্যার?

রিয়াজ   :         রিয়াজ, কাজি রিয়াজুর রহমান।

কর্মচারী :         কাজি, কাজি রিয়াজ, রিয়াজুর রহমান Ñ না, এ নামে তো কোনো বুকিং নেই। তা ছাড়া Ñ

রিয়াজ   :         তাছাড়া কী?

কর্মচারী :         ফ্র্যাঙ্কলি কোনো রুম খালি নেই। গতকাল সেকেন্ড ফ্লোরের একটা কামরা খালি ছিল। ওটা তো আজ সকালেই আপনার  আসার আধঘণ্টা আগেই বুক হয়ে গেল।

কেয়া    :         আমরা টোয়ান্টি ডাউনে এলাম। আরও আগে পৌঁছবার কথা ছিল। মাঝখানে ক্রসিংয়ে Ñ

রিয়াজ   :         তা অতো কথার দরকার কী।

কেয়া    :         না এমনি বলছিলাম, ক্রসিংয়ের জন্যে দেরি না হলে এতো লেট হতো না।

রিয়াজ   :         বলেন কী খালি নেই!

কর্মচারী :         আগেভাগে অ্যাডভাইস না থাকলে – এবার ট্যুরিস্টদের প্রেশারটা বেশি।

কেয়া    :         তা হোক, আমরা তো বুকিং করে এসেছি।

কর্মচারী :         তা কেমন করে হয়। এই দেখুন ম্যাডাম। ওই যে বললাম সেকেন্ড ফ্লোরের একটা কামরা ছিল। ওটা তো ডাচ্ অ্যাম্বাসির মি. হ্যানসেনের নামে বুক্ড হয়ে গেল।

রিসেপশনিস্ট     :         আমরা অ্যাডভান্স ইনফরমেশন না পেলে –

কেয়া    :         তুমি নিজেই টেলিগ্রাম পাঠালে না?

হোটেল কর্মচারীটি এবার পেছনে নিজের জায়গায় ফিরে যায়।

রিয়াজ   :         স্ট্রেঞ্জ। দেখুন, আমি নতুন ট্রাভেল করছি না।

কেউ কোনো জবাব দেয় না। কারো কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায় না। টেলিফোন বেজে ওঠে।

রিসেপশনিস্ট     :         (টেলিফোন তুলে নিয়ে) রুমনম্বর ফোরটি এইট। কফি আর স্যান্ডউইচ। থ্যাঙ্ক ইউ।

টেলিফোন রেখে দেয়। স্লিপ অর্ডার লিখে নেয়। টুনি কেয়ার আঁচল ধরে টানে।

কেয়া    :         আবার কী?

টুনি      :         পানি খাব।

কেয়া    :         (বিরক্তির স্বরে পুনরাবৃত্তি করে) পানি খাব! (আম্বিয়াকে) আম্বিয়া ফ্লাক্সটা বার করে একটু পানি দে তো।

                   [আম্বিয়া ঝুড়ি থেকে ফ্লাক্স বের করে পানি খাওয়াতে থাকে। কেয়া লক্ষ করে।] দেখিস, ফেলিস না আবার।

টুনি মায়ের আঁচলে মুখ মুছে নেয়। আম্বিয়া ফ্লাক্স রেখে টুনিকে সঙ্গে করে দূরে সরে যায়

                   কী শুরু করলে?

                   আম্বিয়া ওকে বাইরে থেকে ঘুরিয়ে আন তো।

রিয়াজ   :         ম্যানেজার কোথায়?

রিসেপশনিস্ট     :         চিফ ম্যানেজার, না অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার।

রিয়াজ   :         একজন হলেই হলো। চিফকে খবর দিন।

রিসেপশনিস্ট     :         চিফ ম্যানেজার রিজাইন করে এখন আবুধাবিতে চাকরি নিয়েছেন।

রিয়াজ   :         অতশত খবরে আমার দরকার নেই। যে আছে তাকে দিন।

রিসেপশনিস্ট     :         অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারকে তো কাল সকালের আগে পাওয়া যাবে না।

রিয়াজ   :         না না, এভাবে হবে না। দে আর টেকিং ইট লাইটলি। হায়ার লেভেলে টেক-আপ করতে হবে।

কর্মচারী ও রিসেপশনিস্ট নির্বিকার। টেলিফোন বাজে।

রিসেপশনিস্ট     :         হ্যালো, টু স্যান্ডউইচ, কফি দেবো না? অলরাইট। সঙ্গে আইস? থ্যাঙ্ক ইউ।

                   [বেল টিপে ক্যান্টিনবয়কে ডাকে। ক্যান্টিনবয় আসে। চারশো আট নম্বরে কফি যাবে না। শুধু স্যান্ডউইচ। সঙ্গে আইস।

                   ক্যান্টিনবয়ের প্রস্থান

কেয়া    :         আপনি তো শুধু স্যান্ডউইচ আর আইস পাঠাচ্ছেন। আমাদের কী করলেন?

                   কর্মচারী উঠে আসে।

কর্মচারী :         দেখুন, কাস্টমারদের খুশি করতে পারলে আমরাও খুশি।

টেলিফোন বেজে ওঠে।

রিসেপশনিস্ট     :         ইয়েস, রিসেপশন। (রিয়াজ ও কেয়ার দিকে তাকিয়ে) এক্সকিউজ মি। (এবার টেলিফোনে) কী নাম বললেন, রুবি রহমান। পাঠিয়ে দেবো। নিশ্চয়ই। থ্যাংক ইউ। কোনো মেসেজ দেননি, টেলিফোন করেননি।

কেয়া    :         এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না।

কর্মচারী :         আপনারা কাইন্ডলি লাউঞ্জে গিয়ে বসুন। ম্যানেজার এলে বলব। বয় Ñ রিল্যাক্স করুন। যা দরকার ক্যান্টিনবয়কে বলুন, চা, স্যান্ডউইচ।

ক্যান্টিনবয়ের প্রবেশ। হাতে মেন্যু। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে লাউঞ্জের দিকে যায়। চেয়ার-টেবিলগুলো মুছে দিয়ে অনুগতের মতো অপেক্ষা করে।

রিয়াজ   :         রাখুন আপনাদের চা-স্যান্ডউইচ। আসল কাজের কিছু হলো না।

কেয়া    :         তুমি এসডিও-কে একটা টেলিফোন করলে পারো। তোমার চেনা লোক।

রিয়াজ   :         হ্যাঁ, এসডিও-কে দিন।

কর্মচারী :         এসডিও Ñ

রিসেপশনিস্ট     :         কী নাম বলব?

রিয়াজ   :         রিয়াজ, কাজি রিয়াজুর রহমান, মেসার্স ওয়ালেস সোয়ানবার্গ লিমিটেডের Ñ থাক অত কথা বলতে হবে না। রিয়াজ বললেই চিনবে।

রিসেপশনিস্ট     :         হ্যালো, হ্যালো। ও, আচ্ছা, (রিয়াজকে) এসডিও সাহেব ট্যুরে।

রিয়াজ   :         তুমি বরং বসো। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে।

কেয়া    :         টেলিগ্রাম এলো না বলে রুম-ব্যবস্থা করা যায় না বিশ্বাস করতে হবে?

রিয়াজ   :         এটা কী লন্ডন না নিউইয়র্ক Ñ

কর্মচারী :         স্যার, নিশাপুরেও লোকের ভিড় বাড়ছে।

কেয়া    :         (ঈষৎ সুর পরিবর্তন করে, স্বামীকে) ইচ্ছে করলে এরা পারেন, জানো।

রিয়াজ লাউঞ্জের দিকে এগিয়ে যায়। পকেট থেকে চিরুনি বের করে মাথা আঁচড়ে  নেয়। তার পেছনে পেছনে স্ত্রী কেয়া এবং হোটেল কর্মচারী। আয়া বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে কার্পেটে বসে। বাচ্চাটি ছুটোছুটি করছে।

রিয়া     :         আহা টুনি। ওরকম করে না। এটা ধরে না। (হোটেল কর্মচারীকে উদ্দেশ করে) আমাদের কথা ছেড়েই দিলাম। বাচ্চাটার কথা ভেবে দেখুন। সেই সকাল থেকে একনাগাড়ে ছঘণ্টা জার্নি।

কর্মচারী :         কোয়াইট ট্রু। আমরা বুঝি। কিন্তু হেল্পলেস। এই ঘণ্টাখানেক আগে হ্যানসেন সাহেবকে বুঝিয়ে বললে Ñ কাস্টমারদের কষ্টে রেখে আমরা কী Ñ

কেয়া    :         একে লম্বা ট্রেন জার্নি Ñ

কর্মচারী :         (সোফা দেখিয়ে) আরাম করুন। ক্যান্টিনবয়কে বলে দিন কিছু দরকার হলে।

ক্যান্টিনবয় মেন্যু বাড়িয়ে দেয়। হোটেলের একজন বাসিন্দা চাবি নিয়ে যায়। যাবার সময় ওদের লক্ষ করে।

টুনি      :         আমি আইসক্রিম খাবো মা। ও মা আইস ক্রিম। চকলেট দেওয়া আইসক্রিম।

কেয়া    :         মেন্যু দেখি কতো, আইসক্রিম সাড়ে পাঁচ টাকা! স্কোয়াশ তিন টাকা পঁচাত্তর পয়সা! ডাকাতি!

ক্যান্টিনবয়        :         আমাকে বলছেন?

কেয়া    :         (কর্মচারীর প্রতি) আপনারা দেখছি গলা কাটার ব্যবস্থা করেছেন।

কর্মচারী :         দামের কথা বলছেন? মানে হোটেলের একটা স্ট্যান্ডার্ড মেনটেইন করতে হয়। আর তাছাড়া আমাদের অ্যাসটাব্লিশমেন্ট কস্ট Ñ

কেয়া    :         বাইরে কমে পাওয়া যায়।

কর্মচারী :         বাইরের সঙ্গে তুলনা করলে চলবে কেন। (মেন্যুর দিকে ঝুঁকে) ম্যালাগটনি স্যুপ আর স্মোকড ফিশ ট্রাই করুন। আজকের স্পেশাল্টি।

কেয়া    :         (স্বামীর প্রতি) খাবে?

রিয়াজ   :         (সিগ্রেট বের করে। কর্মচারী লাইটার সংযোগে ধরিয়ে দেয়) না।

কেয়া    :         চা-টা কিছু? আমি ঠান্ডা নেব। (বয়কে) দুটো স্কোয়াশ।

ক্যান্টিন বয়       :         স্যান্ডউইচ?

কেয়া    :         আর স্যান্ডউইচের কাজ নেই।

কর্মচারী :         পাখাটা খুলে দিই।

কেউ জবাব দেয় না। কর্মচারীটি পাখা খুলে দিয়ে নিজ কাউন্টারে ফিরে যাবার উদ্যোগ করে। কোনো কামরার বাসিন্দা কাউন্টারে চাবি রেখে বেরিয়ে যায়।

কেউ জবাব দেয় না। হোটেল কর্মচারী পাখা খুলে দিয়ে কাউন্টারে ফিরে যাবার উদ্যোগ নেয়। এ সময় ঝুড়ি থেকে একটা খেলার পিস্তল বের করে ওখানা হোটেল কর্মচারীর দিকে এগিয়ে ধরে টুনি।

টুনি      :         হ্যান্ডস আপ।

কেয়া    :         (ঈষৎ ধমকের সুরে) ছি, এসব কী হচ্ছে?

কর্মচারী :         (আদরে মাথায় হাত বুলিয়ে) থাক না, বাচ্চা মানুষ।

কেয়া    :         (টুনির হাত ধরে, এবার রীতিমতো ধমকের সুরে) বসো এখানে চুপ করে। (আম্বিয়াকে) দেখিস না, কী করিস বসে বসে।

আম্বিয়া টুনির কাছে এসে মাটিতে বসে। হাত ধরে রাখতে চায়। টুনি হাত সরিয়ে নেয়। টুনির হাতে তখনো পিস্তল।

কেয়া    :         দাও।

টুনি      :         না।

রিয়াজ   :         ঠিক আছে আমাকে দাও।

কেয়া    :         (পিস্তল জোর করে কেড়ে নেয়) খুব বেশি বাড় বেড়েছ বুঝেছ। (স্বামীকে) হাঁ করে দেখছ কী। (জোর করে কেড়ে নেয়া           পিস্তলখানা রিয়াজকে দেয়।) নাও তো। রাখ।

টুনি রাগ করে মুখ ঘুরিয়ে বসে। আম্বিয়া ঝুড়ি থেকে টফির প্যাকেট বের করে দেখায়। টুনি প্রত্যাখ্যান করে। হোটেল কর্মচারী কাউন্টারের দিকে যেতে থাকে। পেছন পেছন রিয়াজ।

রিয়াজ   :         আচ্ছা এখানে আরেকটা হোটেল ছিল না?

কর্মচারী :         হোটেল পামভিউ।

রিয়াজ   :         মানে সেখানে কোনো জায়গা পাওয়া যায় কিনা Ñ বাট মাইন্ড ইউ Ñ আমি ব্যাপারটা অতো সহজে ছাড়ছি না। একটা বোঝাপড়া না করে Ñ

কর্মচারী :         ফাইন স্যার। পামভিউ দিতে বলব? (রিয়াজ মাথা নাড়ে) (রিসেপশনিস্টকে) হোটেল পামভিউ।

ক্যান্টিনবয় ট্রেতে করে দুটো স্কেয়াশ নিয়ে ঢোকে। পেপার, ন্যাপকিন, স্ট্র ইত্যাদিসহ পরিবেশন করে। টুনি তাড়াহুড়োয় খানিকটা ফেলে দেয়। রিয়াজ বিরক্তির চোখে দেখে।

রিসেপশনিস্ট     :         (টেলিফোন ধরে) হোটেল পামভিউ ধরে আছে স্যার।

কেয়া    :         একটু শক্ত করে বলো। তুমি তো আবার অল্পতেই গলে যাও।

রিয়াজ কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যায়। সঙ্গে হোটেল কর্মচারী। হোটেল কর্মচারী কাউন্টারের ভেতরে ঢোকে।

রিয়াজ   :         (টেলিফোনে) না না, ম্যানেজারকে দিন। ম্যানেজার বলছেন, রিসেপশনে বলা যেত, তা বলা যেত জানি। আমি একটা ফ্যামিলি রুম Ñ নেভার মাইন্ড অ্যাবাউট দি চার্জ। কী বললেন পরশু খালি হবে। আরে পরশু পর্যন্ত থাকলে তো। কোথায়, প্যারাডাইসে খোঁজ নেব। সেখান থেকেই বলছি। হ্যালো,     হ্যালো Ñ

রিসেপশনিস্ট     :         এ সময়টা বড় রাশ।

রিয়াজ   :         নো লাক। এখন বোধহয় ট্রেনও নেই।

কর্মচারী :         (ঘড়ি দেখে) লাস্ট ট্রেনটা ছেড়ে দিলো। আজ আর পাওয়া যাবে না। ফ্লাইটও পাবেন না। ব্যাড  ওয়েদারের জন্য সব ক্যান্সেলড।

কেয়া কাউন্টারের দিকে এগিয়ে আসে। হাতে স্কোয়াশের বোতল এবং স্ট্র।

কেয়া    :         (যেতে যেতে) আপনারা চাইলে ব্যবস্থা করা যায় না এটা কেউ বিশ্বাস করবে। দরকার হলে অন্তত আজকের রাতটা কোনো ফ্যামিলির সঙ্গেও শেয়ার করে Ñ অবশ্য টাকা যা লাগে, কী      বলো Ñ

রিয়াজ   :         সে তো বটেই।

কর্মচারী রিসেপশনিস্ট পরামর্শ করে। লেজার বই দেখে।

কর্মচারী :         মানে আমরা নিজে থেকে তো বলতে পারি না। (পেছনে চাবির গোছা রাখা বোর্ডের দিকে তাকিয়ে) তিনশো তেরো বুক্ড। চারশো পাঁচ বি-র স্যুটটায় যদি Ñ

কেয়া    :         ওটা কি খালি?

কর্মচারী :         না না, খালি কোথায়। তবে আপনারা এতো করে বলছেন একবার এপ্রোচ করে দেখতে পারি, যদিও ফ্র্যাঙ্কলি এটা আমাদের ইথিক্সের এগেনস্টে।

রিয়াজ   :         কার নামে ওই স্যুট।

কর্মচারী :         সাবের, এম. সাবের।

কেয়া    :         একা?

রিসেপশনিস্ট      :         হ্যাঁ।

কেয়া    :         পুরো একটা স্যুটে একা। কোনো মানে হয়; আমরা জায়গা পাচ্ছি না।

কর্মচারী :         ম্যাডাম সে-কথা বললে চলবে কেন। ভদ্রলোক বুক করেছেন, পয়সা দিয়ে থাকছেন। আমরা বলার কে। আর তাছাড়া Ñ

কেয়া    :         তাছাড়া কী?

কর্মচারী :         কিছু মনে করবেন না ম্যাডাম। আজকাল কেউ আবার সহজে শেয়ার করতেও চান না। মানে আপনাদের কথা বলছি না Ñ পামভিউ হোটেলে লাস্ট উইকে একটা ডাকাতি হয়ে গেল। এমনিতে ভদ্রলোক, কে দেখে বলবে। তা বাইরে থেকে চিনে কিছু বলা যায়!

রিয়াজ   :         হোয়াট ডু ইউ মিন। ওই ঘটনার সঙ্গে কী সম্পর্ক?

কর্মচারী :         টেক ইট ইজি। আমাদের সব দিক ভাবতে হয়।

কেয়া    :         তুমি আবার খামোকা নিজের গায়ে মাখছ কেন। চলো বসি     গিয়ে Ñ

রিয়াজ   :         দেখুন বলে, তা আপনার সাবের সাহেব না বাসেত সাহেব কী নাম যেন Ñ

কর্মচারী :         বলে দেখবো, আসতে দিন।

রিয়াজ ও কেয়া নিজের জায়গায় লাউঞ্জে ফিরে যায়। কিছুক্ষণ কোনো কথা নেই। এ সময় স্লো মিউজিক বাজতে পারে।

রিয়াজ   :         কোত্থেকে আসবে আবার। বললেন যে এখানে থাকে।

কর্মচারী :         রাতে থাকেন। রুমে পেলেই হয়। সারাদিন তো বাইরে বাইরেই। অদ্ভুত মানুষ। দেড় মাস ধরে দেখছি Ñ (ঘড়ি দেখে) এসে পড়বেন। আপনারা বসুন।

রিয়াজ   :         (কেয়াকে) চলো।

রিয়াজও ফের নিজের জায়গায় লাউঞ্জে গিয়ে বসে। টুনি সোফায় ঘুমিয়ে। এক পা সোফায়, এক পা মাটিতে। সে সোফায় আম্বিয়া মাথা রাখে খানিকক্ষণ, চোখে ঘুম নেই। হোটেলের মিউজিক বাজে।

                   টুনি হঠাৎ দাপাদাপি শুরু করে দেয়। একবার সোফার ওপর গিয়ে দাঁড়ায়। আবার লাফিয়ে নিচে পড়ে। ক্রমাগত দাপাদাপি চলতে থাকে। আম্বিয়া তাকে ধরতে চায়। তাতে টুনি আরো মজা পেয়ে দাপাদাপি অব্যাহত রাখে এবং উল্লাসধ্বনি করে।

কেয়া    :         এটা কী হচ্ছে। কথা নেই বার্তা নেই। থামা তো ওকে।

আম্বিয়া  :         কথা হুনে না।

কেয়া    :         (ঈষৎ ধমকের সুরে) আমি ধরলে কিন্তু আস্ত রাখব না।

টুনি      :         (সজোরে চিৎকার করে) খেলব না?

কেয়া    :         না। আর একটা কথা নয়। চুপ করে বসো এখানটায়। (টুনি বসে)। (কেয়া মেন্যু হাতে নেয়। রিয়াজকে) খাবে?

কেয়া    :         কিছু খাবে। (দূর থেকে কাউন্টারে) শুনছেন, এই যে শুনুন Ñ ক্যান্টিনবয়কে একটু পাঠিয়ে দেবেন?

বেল টেপার শব্দ। মেন্যু হাতে ক্যান্টিনবয় আসে। ব্যাকগ্রাউন্ডে স্লো মিউজিক।

রিয়াজ   :         (মেন্যু হাতে নিয়ে) খাব? যা দাম!

কেয়া    :         দাম হয়েছে বলে খাবে না? (মেন্যু নিজের হাতে নেয়) যাও দুটো স্যান্ডউইচ। (আয়ার দিকে তাকিয়ে) কিছু খাবি?

আয়া    :         (ঘুম-বিজড়িত কণ্ঠে) না, আফা খিদা নাই।

ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। টেলিফোন বেজে ওঠে। ওরা দুজনই সচকিত।

রিসেপশনিস্ট     :         হ্যালো, না স্যার, রুবি রহমান বলে কেউ টেলিফোন করেনি। এলে অবশ্যই পাঠিয়ে দেব। হ্যাঁ মনে আছে দুশো চার।

ক্যান্টিনবয় স্যান্ডউইচ দিয়ে যায়। ওরা ভাগাভাগি করে খায়। চারদিক মোটামুটি নীরব শান্ত। কাঁটা চামুচের শব্দটা খুবই কানে বাজে। পেপার ন্যাপকিনে মুখ মুছে কেয়া সোফার ওপর মাথা এলিয়ে দেয়। চুলের খোঁপা আলগা করে। ক্লিপ বের করে নেয়। রিয়াজ একটু লঘু পত্রিকার পাতা ওলটায়। এ সময়ে কার পায়ের শব্দ হয়। রিয়াজ সচকিত হয়ে দেখে। কেয়ার ঘুম ভেঙে যায়। দেখে লম্বামতো লোক, গলায় মাফলার, মাথায় ক্যানভাসের টুপি, কাঁধে হ্যাভারস্যাক, পায়ে বুটজুতো। লোকটা কাউন্টারের দিকে যায়।

কর্মচারী :         এই যে আসুন স্যার। আপনারই অপেক্ষা হচ্ছিল।

কেয়া    :         (ফিসফিসে গলায়) এই শোন শোন Ñ

রিয়াজ   :         কী?

কেয়া    :         আমার মনে হয় এই লোকটাই Ñ

রিয়াজ   :         এই লোকটাই কি?

কেয়া    :         মানে সাবের সাহেব না সাহেদ সাহেব কী যেন বললো না। তুমি একটু যাও না, নিজে বলো।

রিয়াজ   :         আমি যাবো কেন। চিনি না শুনি না।

কেয়া    :         তবু গরজটা তো নিজের।

দেখা যাবে হোটেল কর্মচারী লোকটিকে কী বলার চেষ্টা করে। লোকটি ঘাড় ফিরিয়ে লাউঞ্জের দিকে তাকায়। ওদের দেখে নেয়।

চুপ চুপ। বোধহয় আমাদের কথা বলছে। যাও না।

রিয়াজ একটু একটু করে এগিয়ে যায়। একটু দূরেই থেকে যায়।

কর্মচারী :         আপনার বাথরুমের ট্যাপটা কালই ঠিক করিয়ে দেব। আর জানালার ছিটকিনির কথা বলছিলেন। (এক টুকরো কাগজ বাড়িয়ে দেয়) কাইন্ডলি একটু লিখে দিয়ে গেলে লোক যাবে।

কর্মচারী :         আজ কোথায় গেলেন স্যার।

সাবের   :         না, তেমন কোথাও না। সামপানে করে বেরিয়ে পড়েছিলাম। ভাটার মুখে পড়ে গেলাম। তাই ফিরতে দেরি হলো।

কর্মচারী :         রাতে খাবার পাঠাবো?

সাবের   :         না থাক। আজ তেমন খিদে নেই। আমার চাবিটা।

কর্মচারী :         এক্ষুনি ওপরে যাবেন?

সাবের   :         হ্যাঁ, কেন?

কর্মচারী :         একটা কথা বলবো। কিছু মাইন্ড করবেন না। (রিয়াজকে দেখে) মি. রিয়াজুর রহমান, টোয়ান্টি ডাউনে এলেন। সাবের সাহেব। (পরস্পর হাত মিলায়)।

সাবের   :         ও। এরা খুব অসুবিধেয় পড়েছেন।

রিয়াজ   :         আপনি তো স্যুটে একা থাকেন।

সাবের   :         থাকি। তার জন্যে বেশি পয়সা দিই।

কর্মচারী :         না না স্যার, কথা সেটা নয়। মানে এরকম রিকোয়েস্ট আমাদের করা উচিত নয়। বহু দূর থেকে এসেছেন। ফেরত যাবারও কোনো প্লেইন নেই কালকের আগে। তাও সাইক্লোনিক ওয়েদার।

সাবের   :         বেশ তো। দিয়ে দিন একটা কামরা।

কর্মচারী :         সেটাই তো সমস্যা স্যার। সব বুক্ড। বলছিলাম কী, আপনার একটা কামরা। মানে একটা রুম ছেড়ে দিলেই Ñ

সাবের   :         একটা কামরা ছেড়ে দেব Ñ কেন? তার জন্যে পেমেন্ট করি না? হুঁ।

রিসেপশনিস্ট     :         স্যার।

সাবের   :         আমার কোনো অ্যারিয়ার আছে? কোনো পেন্ডিং বিল?

কর্মচারী :         না স্যার, তা নেই। আপনার মতো কাস্টমার পাওয়া ভাগ্যের কথা।

রিয়াজ   :         থাক, আমরা মাটিতেই কোনোরকম ম্যানেজ করে নেব। খামোকা রিকোয়েস্ট করার দরকার নেই। নিছক সঙ্গে ফ্যামিলি ছিল। একটা রুম ছেড়ে দিলে আপনার কোনো অসুবিধে হতো না।

সাবের   :         সুবিধে-অসুবিধের আপনি কী জানেন। চাবিটা দিন।

                   (রিসেপশনিস্ট চাবি দিলো।)

                                                                             সাবেরের প্রস্থান।

রিয়াজ   :         তুমিও যেমন। এসব লোককে বলতে যাওয়াই ভুল। বলো তো। কেমন ডাট মেরে হনহন করে চলে গেল।

কর্মচারী :         কিন্তু সাবের সাহেব তো ওরকম Ñ

রিয়াজ   :         রাখুন আপনার সাবের সাহেব। ব্যাটা ছোটলোক। তা না হলে একটা রাতের জন্যে Ñ আর বাবা তাও তো বিনে পয়সায় থাকছিলাম না। (কেয়াকে) শুধু শুধু তোমার কথায় থেমে থেকে এই কেলেঙ্কারি Ñ

ওরা কথা বলছে। রিয়াজ কেয়া কি পরামর্শ করছে। টেলিফোন বাজে

রিসেপশনিস্ট      :         হ্যালো, জি হ্যাঁ। পাঠিয়ে দেবো। জি হ্যাঁ পাঠিয়ে দেবো। আপনার ওখানে। আপনি, ও দিচ্ছি। কিন্তু স্যার আপনি? না না, এমনি বলছিলাম। আপনি নিচে আসছেন। আসুন।

                   রিয়াজ সাহেব, আপনাদের যেতে বলেছেন।

কেয়া    :         আমাদের।

রিসেপশনিস্ট     :         আশ্চর্য, তখন তো কিছু বললেন না।

কর্মচারী :         উনি নিজেই আসছেন।

                   সাবেরের আগমন।

সাবের   :         (টুনিকে দেখিয়ে) কার?

কেয়া    :         (হেসে) আমাদের।

সাবের   :         (আদরে চুলে হাত বুলিয়ে) বয়েস কতো?

কেয়া    :         এবার বারো পড়ল। আর বয়েস! দুষ্টুমির হাড়ি।

সাবের   :         কই, আমি তো খুব শান্ত দেখছি।

কেয়া    :         শান্ত! এতক্ষণ মাথায় করে রেখেছিল। আপনাকে দেখে Ñ

সাবের   :         কী নাম?

কেয়া    :         নাম বলো।

টুনি      :         টুনি।

সাবের   :         সুন্দর তো।

সাবের   :         আপনারা যান। সব ঠিক করা আছে। এই যে চাবি Ñ

রিয়াজ   :         তার মানে, আপনি?

সাবের   :         আমি কোনোরকমে লাউঞ্জে বসে Ñ

কেয়া    :         না না, সেটা কী করে হয়। আপনি থাকার জায়গা দিচ্ছেন এটাই যথেষ্ট।

রিয়াজ   :         একটা কামরা হলেই আমরা ম্যানেজ করে নিতে পারব। আপনার চলে যেতে হবে না।

সাবের   :         আমার সঙ্গে থাকতে পারবেন না।

রিয়াজ   :         কেন পারব না?

সাবের   :         আমি রাত জাগি।

রিয়াজ   :         তাতে কী হয়েছে। আমরাও বারোটা-একটার আগে ঘুমোই না। কী বলো কেয়া। (কেয়া সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে)।

সাবের   :         তা ছাড়া একা মানুষ, কখনো ভালো লাগে না Ñ রেডিও চালিয়ে দিলাম। কখনো, থাকগে এসব শুনে কী হবে। কখনো ইচ্ছে হলে রাত জেগে পড়লাম। আলো জ্বেলে বসে রইলাম।

কেয়া    :         তাতে কী হয়েছে। রেডিও শুনবেন, আলো জ্বালাবেন। অবশ্যি রাত জাগা ভালো নয়। কী করেন রাত জেগে?

সাবের   :         ঠিক নেই। কোনোদিন ইচ্ছে হলো ডায়েরি লিখি। কোনোদিন এমনি বসে থাকি।

কেয়া    :         মজা তো। শুনব একদিন ডায়েরি। শোনাবেন।

সাবের   :         আবার কোনোদিন বেহালাটা নিয়ে বসি।

কেয়া    :         বেহালাও বাজান নাকি। জানতাম না তো। বেহালা আমার খুব পছন্দ। তবে খুব ভালো বাজাই না।

কেয়া    :         সে দেখা যাবে। আগে তো শুনি।

সাবের   :         (উঠে পায়চারি করে, হঠাৎ কী মনে হওয়ায়) আমি কিন্তু হেভি স্মোকার।

কেয়া    :         (রিয়াজকে দেখিয়ে) ও নিজে কটা খায় জিজ্ঞেস করুন।

সাবের   :         হ্যাঁ, তা মানে Ñ

কেয়া    :         মিথ্যে বলো না। আমার সামনে সকালে এক প্যাকেট শেষ করলে। (সাবেরকে) আপনি এসব বলে শুধু শুধু লজ্জা দিচ্ছেন। থাকতে পাচ্ছি এই কতো।

সাবের   :         না না, ওসব বলবেন না। জায়গা পাননি থাকছেন। (একটু থেমে গিয়ে) জানেন, গত দশদিন কারো সঙ্গে এতটুকু কথা হয়নি।

রিয়াজ   :         বলেন কী। হোটেলে এতো লোকের যাতায়াত।

সাবের   :         মানে, আমি নিজে গিয়ে গায়ে পড়ে আলাপ করিনি। আমার সঙ্গেও আর কেউ আলাপ করতে আসবে না। সুপুরুষ নই। খ্যাতিমান লেখক বা ফিল্মস্টার নই।

রিয়াজ   :         তাতে কী হয়েছে। নিজেই আলাপ করবেন। মিশবেন লোকের সঙ্গে।

সাবের   :         সে ইচ্ছে তো হয়। ভাবি, কে আবার মাঝখান থেকে বলে বসবে, দুপয়সার মানুষ নয় আবার ফুটুনি কতো। হোটেলে স্যুট নিয়ে থাকে।

রিয়াজ   :         বলতে দিন। গায়ে মাখবেন না। ভালো কথা, আমরা কিন্তু শেয়ার করবো।

সাবের   :         কী শেয়ার করবেন।

রিয়াজ   :         কামরার ভাড়া। নিজেরা নিলে তো দিতেই হতো।

সাবের   :         (সিগ্রেট ধরায়। মনে হয় অত্যন্ত উত্তেজিত) শেয়ার করবেন? বেশ দিন।

রিয়াজ   :         এক্ষুনি দিতে হবে। (রিয়াজ পকেটে হাত দেয়)।

সাবের   :         তিনশো।

রিয়াজ   :         বলেন কী, একটা কামরার জন্য একদিনে Ñ এটা টু মাচ হয়ে যাচ্ছে না।

সাবের   :         হ্যাঁ, বেশি তো বটেই। ব্ল্যাকে দিচ্ছি কিনা।

রিয়াজ   :         অবশ্য আপনি চাইলে না করার উপায় নেই। তবে লোকের বিপদ দেখে এভাবে সুযোগ নেওয়া Ñ

সাবের   :         ঠিক নয় কেন। এজন্যেই অপেক্ষা করছিলাম। আপনারা আসবেন, খপ্ করে ধরব Ñ

কেয়া    :         থামো তো। তুমি আবার মাঝখান থেকে কথা বলতে আস কেন। শেয়ার করার কথা আসে কী করে। (সাবেরকে) আপনি ওর কথা গায়ে মাখবেন না।

সাবের   :         (তখনো উত্তেজিত) শেয়ার করবেন, কী শেয়ার করবেন। হোটেলের ভাড়া? সবটুকু শেয়ার করুন না। আমার যন্ত্রণা আমার দুঃখ-কষ্ট, আমার এগুলো শেয়ার করবে কে।

রিয়াজ   :         মানে, আমি ঠিক সেরকম মনে করে বলিনি।

কেয়া    :         ও কী বলল আপনি রাগ করে বসলেন। থাক, কোথাও যাওয়া-যাওয়ির দরকার নেই।

সাবের   :         এবার তো উলটো আপনি রাগ করছেন। আপনজন মনে করেছি বলেই কথাটা Ñ ঠিক আছে না গেলে জোর করে তো নিয়ে যেতে পারি না। আপনাদের খুশি। এই রইল চাবি।

কেয়া ও সাবের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। সাবের উঠে যাওয়ার উপক্রম করে। খানিক্ষণ পর ফিরে আসে। হাতে একটা কাগজ।

কামরার ভাড়া এতে লেখা আছে। চেকে দিলেই চলবে।

টেলিফোন বাজে।

রিসেপশনিস্ট     :         না না, রুবি রহমান এখনো আসেননি। কী বললেন, লালগাড়ি Ñ কত নম্বর Ñ এক হাজার পাঁচশো ছয়। ওয়ান ফাইভ জিরো সিক্স। মনে থাকবে। কোনো মেসেজ পাইনি তো।

কেয়া    :         কী করবে।

রিয়াজ   :         চলো যাই। না গেলে মাইন্ড করবে।

কেয়া    :         তোমার ওভাবে বলা উচিত হয়নি।

রিয়াজ   :         আমি অতটা ভাবিনি।

রিয়াজ ও কেয়া দুজন হাতে দুটো স্যুটকেস নিয়ে এগিয়ে চলে। আম্বিয়া এক হাতে ব্যাগ এবং ঝুড়ি এবং অন্য হাতে বাচ্চা কোলে নেয়।

রিসেপশনিস্ট     :         এক্সকিউজ মি Ñ

রিয়াজ   :         আমাদের বলছেন?

রিসেপশনিস্ট     :         লিফট বাঁ-দিকে।

রিয়াজ   :         ও।

ঋধফব ঙঁঃ

হোটেলের কামরা। হোটেলের প্রচলিত আসবাবপত্র এবং টেলিফোন। একটা বিছানা, বসার জন্য দুখানা গদিযুক্ত চেয়ার। এক পাশে ছোট রাইটিং টেবিল এবং পরিচর্যার আয়না। জগে পানি। সুদৃশ্য পর্দা জানালায় ও দরজায়। রিয়াজ ও কেয়া হাত-পা ছড়িয়ে চেয়ারে বসে। আম্বিয়া বাচ্চাকে নিয়ে কার্পেটের ওপর বসে। স্যুটকেস, ক্যামেরা, হাতঘড়ি, বাইনোকুলার ইতস্তত ছড়ানো। কোনোটা টেবিলে, কোনোটা বিছানায়, কোনোটা চেয়ারের হাতলে। কেয়া টিফিন ক্যারিয়ার খোলে। হাতে কিছু তৈরি করা খাবার। ঝুড়ি থেকে প্লেট বের করে রিয়াজকে দেয়।

রিয়াজ   :         বাব্বা! বাঁচা গেল। ভাগ্যিস ভদ্রলোক রুমটা দিয়ে দিলেন।

কেয়া    :         সত্যি তাই। ইয়ে তোমাকে আর লুচি দেবো?

রিয়াজ   :         না।

                   [ফ্লাস্ক থেকে ঢেলে গড়গড় করে পানি খান এবং মুখে তৃপ্তির ভাব নিয়ে বুকের বুতাম ঢিলে করে।] বাব্বা : হাত-পাগুলো ভেঙে এসেছিল। কম ঝকমারি।

কেয়া    :         ঝকমারি বলে ঝকমারি। (টিফিন ক্যারিয়ারের কোনো একটি পাত্রে আম্বিয়াকে খাবার দেয়। আয়া খাবার নেয়) তোমার সঙ্গে আর নয়।

রিয়াজ   :         (সিগ্রেট বের করে। আবার দেশলাই খুঁজে পায় না) দেখ তো দেশলাই একটা।

কেয়া    :         আমার কাছে নেই।

রিয়াজ   :         ওই ঘরে গিয়ে দেখ না। ভদ্রলোক তো চেন স্মোকার।

রিয়াজ   :         কী হলো, পেলে দেশলাই?

কোনো সাড়াশব্দ নেই। অস্থিরতার সঙ্গে রিয়াজ পায়চারি করে। দেশলাই হাতে এসে ঢোকে কেয়া।

কেয়া    :         (মুখে আঁচল চেপে) কী ছিরি ঘরের, যদি দেখতে। (দেশলাই বাড়িয়ে দিয়ে) নাও পেলাম একটা পড়েছিল। হাঁটাচলার উপায় আছে, এদিকে বই, ওদিকে একগাদা পত্রপত্রিকা, কাগজ। সিগ্রেট-ভর্তি অ্যাশট্রে। ঘরময় দেশলাইয়ের কাঠি। খালি প্যাকেট। বিছানার চাদরও বোধহয় বদলানো হয়নি একযুগ।

রিয়াজ   :         আশ্চর্য, এতোটা অগোছালো। দেখে তো মনে হয় না।

কেয়া    :         আরে বাবা, নিজে না পারো কাউকে ডেকে বললেও তো হয়।

রিয়াজ   :         তুমি একটু ঠিকঠাক করে দিলে তো পারতে।

কেয়া    :         আমি আর কী করব। তবু যতটা পেরেছি গুছিয়ে দিয়ে এলাম।

রিয়াজ   :         ভালোই করেছ। (সিগ্রেট ধরিয়ে জানালার কাছে যায়। আকাশের দিকে তাকায়) আকাশের অবস্থা সুবিধের মনে হচ্ছে না। আজ রাতটা ভালোয় ভালোয় কাটলে হয়। রেডিও থেকে নাকি বারবার খবরে বলছিল। একবার খোঁজ করে আসা দরকার।

কেয়া    :         (আম্বিয়াকে) ঘরে বসে না থেকে যা তো বাচ্চাটাকে নিয়ে একটু ঘুরে আয়। দেখিস আবার দেরি করিস না।

রিয়াজ   :         ওকে আবার কোথায় পাঠাচ্ছ।

কেয়া    :         সব ব্যাপারে তোমার নাক গলানোর কী দরকার। (আম্বিয়ার প্রস্থান)।

রিয়াজ   :         [গয়না খুলতে খুলতে সরে এসে নিচু গলায়) গয়না খুলছো যে? ও, এজন্যে একেবারে আগেভাগে লোকজন পাঠিয়ে ঘর খালি করে ফেললে। তা আমাকেও যেতে হবে নাকি।

কেয়া    :         কী সব রসিকতা করো ভালো লাগে না। (একটু আবদারের সুরে) বলো না রাখি কোথায়!

রিয়াজ   :         কোথায় মানে, যেখানে খুশি রাখো।

কেয়া    :         বলে তো দিলে। খোঁজ নাও না হোটেলে লকার আছে নাকি।

রিয়াজ   :         লকার! থাকলেই তোমাকে দেবে কেন। নিজেই থাকছ অন্যের কামরায়।

কেয়া    :         ভারী মুশকিল তো। লোকজনের স্বভাবচরিত্রের কথা কেউ বলতে পারে।

রিয়াজ   :         (বিরক্ত হয়ে সিগ্রেট নিবিয়ে দেয় অ্যাশট্রেতে) কী যে বলো মাথামু-ু। ভদ্রলোক নিজে থেকে থাকতে দিলো আর তুমি কিনা উলটো সন্দেহ করছ। তোমাদের নিয়ে পারা যাবে না।

কেয়া    :         কম করে হলেও আজকালকার বাজারে কুড়ি-বাইশ হাজার। একবার খোয়া গেলে এ জীবনে বানাতে পারবো ভাবো?

রিয়াজ   :         খেয়েদেয়ে কাজ নেই। তোমার গয়না আত্মসাৎ করার জন্যে লোকজন ওঁৎ পেতে বসে আছে। যতসব! তা তোশকের নিচে রাখ।

কেয়া গয়নাগুলো বালিশের নিচে রাখে। তলায় চাপা দেয়।

কেয়া    :         নিজের হলে বুঝতাম। রাখলাম

রিয়াজ   :         যাই ঘুরে আসি একটু। সি বিচ দেখা হয়নি। যাবে নাকি?

কেয়া    :         আর সি বিচে কাজ নেই। ভালোয় ভালোয় ফিরে যেতে পারলেই হয়। (আম্বিয়াকে) আম্বিয়া। ওই বাস্কেটটা আন তো।

আম্বিয়া  :         বিস্কুট!

কেয়া    :         তোর মাথা, বিস্কুট! বাস্কেট, বাস্কেট Ñ ঝুড়ি, ঝুড়ি চিনিস না।

আম্বিয়া ঝুড়ি আনে। কেয়া ঝুড়ি থেকে বাচ্চার জামা-কাপড় বের করে।

আম্বিয়া  :         আফা গো, আমি জিন্দেগিতে সাগর দেহি নাই। এইবার দেহাইবেন না?

কেয়া    :         দেখিস।

আম্বিয়া  :         গোসা করলনি?

কেয়া    :         কে?

আম্বিয়া  :         যে থাকবার দিলো।

কেয়া    :         কী জানি, তোর অতো কথায় কী দরকার।

আম্বিয়া  :         মানুষটা ভালো। থাকনের জায়গা না দিলে Ñ

কেয়া    :         আরে থাম। তোর সায়েব এসডিওকে পেল না। তা না হলে দেখতি, জায়গা আবার পাওয়া যায় না।

আম্বিয়া  :         (জানালা খুলে দেখে) মা গো, আসমানের কী হাল দেখসেন ।

কেয়া    :         হুঁ। ও কিছু না, মেঘলা।

আম্বিয়া  :         হেইবার যে তুফান আইল না, যদি আসমানের হাল দেখতেন। আমি সুডো। দাদি না করল, বাপজান শোনল না। (একটু নাকি বিলাপের সুরে) হায়রে নসিব! আমার বাপজান ফিরলো না।          মা-রে বানের পানি নিল রে। কত কান্দন কানলাম।

কেয়া    :         বকবক করিস না। কাপড়গুলো রেখে আয় তো বাথরুমে।

কেয়া এই সময় দরজার ছিটকিনি বন্ধ করে। চারদিক দেখে নেয়, তারপর সন্তর্পণে গয়না তোশকের তলায় লুকিয়ে রাখে। তারপর দরজা খুলে দেয়। আম্বিয়া ফিরে আসে।

কেয়া    :         বাচ্চাটাকে দেখিস। আমি গোসলটা সেরে আসি।

তোয়ালে, সাবান হাতে কেয়ার প্রস্থান। আম্বিয়া টুনিকে নিয়ে খেলা করে। সাবেরের প্রবেশ। হাতে কিছু কলা।

সাবের   :         সাহেব কোথায়।

আম্বিয়া  :         বাইরে গেছে।

সাবের   :         বিবি সাহেব কোথায়?

আম্বিয়া  :         গোসলে।

সাবের   :         ঠিক আছে। তাইলে আমি যাই।

আম্বিয়া  :         আপনে বিয়া করসেন নি?

সাবের   :         দূর।

আম্বিয়   :         সাব Ñ আপা আপনার কথা কইতেছিল।

সাবের   :         আমার কথা, কী কথা?

আম্বিয়া  :         কইল মানুষরে দেখলে বাইর তুন চিনন যায় না।

সাবের   :         অ্যাই শোন, বাচ্চা ঘুমে?

আম্বিয়া  :         ঘুম পাড়াইলাম না।

সাবের   :         (কলার ছড়া এগিয়ে দেয়) নাও, উঠলে খাইয়ে দিও।

আম্বিয়া  :         ওমা কলা খাইবার পারব নাকি। এমনে কাশের জ্বালায় বাঁচে না।

সাবের   :         তাহলে থাক। যাকে খুশি দিও। জানো, আম্বিয়া তোমরা থাকায় ভালো হলো।

আম্বিয়া  :         আমরা পরশু চইলা যামু।

সাবের   :         থাকতে চাইলে থাক না। আমি তো না করিনি।

আম্বিয়া  :         আপা কয় এমনে বহুত করসেন। আইজকাল কেকার লাইগা করে।

পাটভাঙা শাড়ি পরে। ভেজা চুলে চিরুনি বুলোতে বুলোতে কেয়ার প্রবেশ।

কেয়া    :         কার সঙ্গে কথা বলছিলি। (সাবেরকে দেখে) আপনি! ভয় ছিল রাগ করে হয়তো ফিরবেনই না। বসুন, কিছু তো খাননি। আম্বিয়া টিফিন ক্যারিয়ারটা আন তো। (সাবেরকে) দিই দুটো।

সাবের   :         না, থাক।

কেয়া    :         না কেন।

সাবের   :         রাতে তো বড় একটা খাই না। বদভ্যেস করে কী হবে। আপনারা বরং আরাম করে বসুন। আমি নিজের ঘরে যাই।

সাবের পাশের কামরায় যায়, দরজা বন্ধ করে। খানিকক্ষণ পরেই ফিরে আসে। রীতিমতো উত্তেজিত।

সাবের   :         আমার টেবিলে কেউ হাত দিয়েছিল?

কেয়া    :         দেশলাই খুঁজতে গিয়েছিলাম। চোখে ঠেকছিল, টেবিলটা গুছিয়ে দিলাম।

সাবের   :         চোখে ঠেকার কী ছিল। আপনাদের কোনো অসুবিধে হচ্ছিল?

কেয়া    :         ওমা, এটা কিরকম কথা। এ তো দেখছি ভালো করতে যাওয়াও বিপদ। শুধু বই গুছিয়ে দিলাম। আপনার কোনো মণিমাণিক্যে হাত দিইনি। কোন কিছু হারিয়েছে?

সাবের   :         সে কথা নয়।

কেয়া    :         মানে ওরকমই দাঁড়ায়। এখন কোনো জিনিস না পেলে হয়তো বলবেন Ñ

সাবের   :         আপনি বুঝতে পারছেন না। আপনি গুছিয়ে দেবেন রোজ? চাদর পালটে দেবেন। ঝুল ঝেড়ে দেবেন?

কেয়া    :         আমি কেন দিতে যাবো। হোটেলওয়ালাকে বলুন। নইলে, নইলে (আমতা আমতা করে) সেরকম বন্দোবস্ত করুন।

সাবের   :         হুঁ। আপনি রাগ করছেন, না?

কেয়া    :         বা রে, আমি রাগ করতে যাবো কেন।

সাবের   :         সারাটা জীবন এবাড়ি-ওবাড়ি করে কাটল। কখনো আত্মীয়, কখনো অনাত্মীয়। কখনো স্যাঁতসেঁতে বিছানা, কখনো তক্তপোষ, কখনো মাটিতে একটা মাদুর।

কেয়া    :         তা এসব কথা আমাকে শোনাচ্ছেন কেন।

সাবের   :         না, মানে এটা বলার জন্যে যে, এতদিন যখন গুছিয়ে থাকতে পারলাম না, আর আজ এতদিন পর Ñ

কেয়া    :         আর কতবার বলবেন, ঘাট হয়েছে।

সাবের   :         (কেমন ধরা গলায় বলে) আজ ঘরে ঢুকে চমকে গেলাম কিনা। কী বলব আপনাকে। এক অপূর্ব অনুভূতি। সবকিছু পরিপাটি, ঝকঝকে-তকতকে। অথচ জানেন, এই একটু গুছিয়ে থাকব হাত-পা ছড়িয়ে সে লোভেই তো এলাম। ভাবলাম জীবনে এই ইচ্ছেটাও চরিতার্থ হোক। নইলে, মনে করুন, আমার মতো লোকের কি হোটেলে থাকবার মুরোদ আছে বলুন।

কেয়া    :         দিব্যি স্যুট ভাড়া নিয়ে আছেন, আবার বলছেন মুরোদ নেই।

সাবের   :         ঠিক বলেছেন। এই মুরোদ সৃষ্টির জন্য কত কথা শুনতে হয়েছে। হাড়কিপটে। টিপে টিপে সেবা করে। আরে তাই যদি না করবো, তবে যে মাইনে পাই তাতে কিছু বাঁচানো যেত। (একটু থেমে) ভাবতে অবাক লাগে, তেইশ বছরের সঞ্চয় তেইশ দিনে শেষ হতে চলল।

কেয়া    :         সে বুঝলাম। কিন্তু হোটেলওয়ালাদের বললেও তো ঘরটা গুছিয়ে দিতে পারে। চাদর পালটে দিতে পারে।

সাবের   :         পারে। বলিনি ভাবছেন। কিন্তু ওদের গোছ-গাছের ঠেলায় কোনো জিনিসটা যে কোথায় উধাও, পাওয়া যায় না। একবার তো আমার আদ্ধেক বই আর কাগজপত্র ঝেঁটিয়ে সাফ। সে ভয়ে এখন আর বলি না। অথচ দেখুন তো আপনি কী ছিমছাম করে Ñ

কেয়া    :         সময় পেলে আরো ভালো করে গুছিয়ে দিতাম।

সাবের   :         আপনি তো চলেই যাচ্ছেন।

কেয়া    :         এর আগেও কেউ এমন করে চলে গিয়েছিল নাকি? আপনার নিশ্চয়ই ভারী দুঃখ। কী? তাই না?

সাবের   :         না না, দুঃখ হতে যাবে কেন। আমার আবার ওই ধরনের কোনো কাহিনি-টাহিনি নেই।

কেয়া    :         মনে হচ্ছে জীবনে কারও ভালোবাসা পাননি।

সাবের   :         পাইনি। দিইওনি।

কেয়া    :         যাই দেখি, আয়াটা আবার কী করছে। দেখুন না সেই যে মেয়েটাকে কোলে কলে বারান্দায় গেল। বাইরে এমনি যা আবহাওয়া।

সাবের   :         আমিও তাহলে একটু আসি।

কেয়া    :         আবার আসবেন। বেহালাটা শুনব কিন্তু।

সাবের   :         আচ্ছা।

সাবেরের প্রস্থান। কেয়ার যাবার আগেই আম্বিয়া বাচ্চাকে নিয়ে ঢোকে।

সাবের   :         ওটা কী আপনার হাতে?

কেয়া    :         কী জানি। টুনির কা-। বোধহয় আপনার টেবিল থেকে এনেছে। (পাতা উলটে) লেখেন নাকি?

সাবের   :         না না, এসবকে কী লেখা বলে?

কেয়া    :         কী জানি পাতা উলটে দেখছিলাম। দু-একটা জায়গা ভালোই লাগছিল। পড়ি? কিছু মনে করবেন না তো?

জীবনে চলার পথে সবাই আমরা ধাবমান কালের সহযাত্রী। সেই যাত্রায় কত মানুষ কত চেনা-অচেনা মুখের ভিড়। কেউ হঠাৎ আলোয় উদ্ভাসিত একখ- উল্কার মতো স্মৃতির স্ফুলিঙ্গ; কেউ সকালের ঝির ঝিরে যাওয়ার মতো স্নিগ্ধ। কেউ আত্মীয়। কেউ আত্মীয় না হলেও তারা আত্মীয়। আবার হয়তো কেউ পরম উপেক্ষায় নিষ্ঠুর। আমরা সবাই যেন হুজুগের একঝাঁক পাখি। এক ডাল থেকে নিয়ত অন্য ডালে। এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে Ñ

          :         বা! চমৎকার।

সাবের   :         কী চমৎকার বলছেন। ওটা আবার একটা লেখা হলো। দিন কাইন্ডলি।

কেয়া    :         নিন। সব লিখিয়েরা যদি আপনার মতো এমন বিনয়ী হয়, তাহলে দেখছি সাহিত্যের বারোটা বাজতে দেরি নেই।

সাবের   :         আপনি যে কি সব বলেন! বেশ, পড়তে চান পড়–ন। তবে আর কাউকে দেখাবেন না কিন্তু।

কেয়া    :         আমি আবার কাকে দেখাবো!

সাবের   :         চলি তাহলে। 

কেয়া    :         আপনি কিন্তু চমৎকার বেহালাও বাজান। একবার সামনাসামনি শুনব কিন্তু।

সাবের   :         আচ্ছা দেখা যাবে। চলি।

সাবেরের প্রস্থান। কেয়া বেরুবার আগেই টুনিকে সঙ্গে নিয়ে আম্বিয়ার প্রবেশ।

কেয়া    :         তোর একটুও মাথায় বুদ্ধি নেই। বাচ্চাটাকে সেই কখন নিয়ে গেলি খোলা হাওয়ায়।

আম্বিয়া  :         হাওয়া দেইখাই ছুইটা আইলাম। জানালা বন্ধ কইরা দেই।

কেয়া    :         দে। কিছু বুঝতে পারছি না বাবা কোথায় এসে পড়লাম। রেডিওটা কই। লাগা তো।

আম্বিয়া  :         (অন করার চেষ্টা করে। কানের কাছে আনে) খালাম্মা ব্যাটারি নাই।

কেয়া    :         তা থাকবে কেন। মনে করে একটা কাজও তো করতে পারিস না। টর্চের ব্যাটারি আন তো। (আম্বিয়া টর্চ আনে। কেয়া নিজেই ব্যাটারি লাগায়। রেডিও ‘অন’ করে। কোনো অনুষ্ঠানের ঘোষণা) শুনলেন সংবাদ পর্যালোচনা। এখন মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে গ্রামীণ প্রভাব সম্পর্কে বলছেন ডক্টর মাজহারুল ইসলাম Ñ বন্ধ কর।

আম্বিয়া রেডিও বন্ধ করে। হন্তদন্ত হয়ে রিয়াজ ঢোকে। বর্ষাতি খোলে।

কেয়া    :         কী হলো?

রিয়াজ   :         ভীষণ খারাপ অবস্থা। সাত নম্বর সিগন্যাল। কী যে হয় বলা যায় না। লোকজন সরতে শুরু করেছে।

কেয়া    :         তাহলে?

রিয়াজ   :         ভালো কথা, মঞ্জুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।

কেয়া    :         কোন মঞ্জু।

রিয়াজ   :         কোন মঞ্জু আবার। তোমাদের বীথিকে যে বিয়ে করল Ñ

কেয়া    :         উঠেছে কোথায়?

রিয়াজ   :         কাছেই, কটেজে।

কেয়া    :         আসতে বললে না কেন।

রিয়াজ   :         আসতে বলব! কী অবস্থা তো জানো না। ওদিকে রজনীগঞ্জের পর রাস্তা বন্ধ। মাধবপুর হয়ে ঘুরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

কেয়া    :         কেন?

রিয়াজ   :         কেন আবার কী। কাল থেকে একনাগাড়ে বৃষ্টি। ধস নেমে       রাস্তা ব্লক্ড। (গলা নামিয়ে) শোন ওদের সঙ্গে গাড়ি আছে। সেরকম অবস্থা হলে আমি বলে রেখেছি। এখন এসব নিয়ে কারো সঙ্গে আলোচনা করো না।

কেয়া    :         আমি আবার কার সঙ্গে আলোচনা করবো।

সাবের ঢোকে।

সাবের   :         (বেলুন হাতে দিয়ে) এই যে টুনু। নাও। তোমার জন্য এনেছি।

কেয়া    :         কেন এসব করেছেন।

সাবের   :         দুধও নিয়ে এলাম।

কেয়া    :         কোথায় পেলেন?

সাবের   :         আর বলবেন না। পাওয়া কী যায়। পাক্কা দুমাইল হাঁটতে হলো। তাও কি দিতে চায়।

রিয়াজ   :         দুধ, কী হবে?

সাবের   :         কী হবে মানে, বাচ্চাকে খাওয়াবেন না? দেখছেন না আকাশের অবস্থা। কাল সকালে পাবেন ভাবছেন!

রিয়াজ   :         তা আপনি কষ্ট করতে গেলেন কেন। একটা না একটা ব্যবস্থা হতোই।

কেয়া    :         আপনাকে বরং এক কাপ চা দিই।

সাবের   :         থাক, আবার মিছিমিছি কষ্ট করবেন।

কেয়া    :         কোনো কষ্ট নেই। হিটারে চড়িয়ে দেব, আবার ঝামেলা কী।

সাবের   :         শুনেছেন বোধহয়, লোকজন ইভাক্যুয়েট করা শুরু করেছে।

রিয়াজ   :         হ্যাঁ। শুনছি রাতে হিট করতে পারে। শুনছ, আমি একটু বাইরেটা দেখে আসি কী অবস্থা।

কেয়া    :         এই তো এলে, আবার কোথায় যাবে।

রিয়াজ   :         না ধারেকাছেই থাকবো। দেখি সিচুয়েশনটা কী। (সাবেরকে) আপনি বসুন।

কেয়া    :         (সাবেরকে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়ে) যা হওয়ার হবে।            ভাবনা-চিন্তা করে কী লাভ। দেখুন তো, চিনি হয়েছে?

সাবেরের হাতে পেয়ালা কাঁপে। কেয়া হাসে।

সাবের   :         হাসছেন কেন।

কেয়া    :         হাসছি আপনার চা খাওয়া দেখে। এতো হাত কাঁপলে বেহালা বাজান কী করে?

সাবের   :         (চায়ের কাপ নামিয়ে রাখে) ঠিক বলেছেন, আমাকে দিয়ে এসব হবে না।

কেয়া    :         তবে কিনলেন কেন।

সাবের   :         ভেবেছিলাম বাজাব। (কী ভেবে) তার চেয়ে এক কাজ করুন না। আপনিই নিয়ে নিন না।

কেয়া    :         আমি নেব বেহালা? তাহলেই হয়েছে। (বাচ্চাকে দেখিয়ে) Ñ দেখছেন না, কেমন একটা জলজ্যান্ত বেহালা নিয়ে সংসার করছি।

সাবের   :         আপনাদের সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগে। জানেন একনাগাড়ে এত কথা বলিনি অনেকদিন।

কেয়া    :         বললেই পারেন।

সাবের   :         বলে তো দিলেন, কার সঙ্গে বলব। কে শোনার জন্যে বসে আছে।

কেয়া    :         ওটা আপনার ধারণা। আমার তো বেশ লাগছে কথা বলে।

সাবের   :         আপনি তো আর থাকছেন না।

কেয়া    :         আমরা পরশু চলে যাবো।

সাবের   :         এরপর কথা বলার লোক পাবো না।

কেয়া    :         পাবেন না কেন। আর তাছাড়া যেমন করে বলছেন, যেন আপনার সঙ্গে আর ইহজন্মে দেখা হচ্ছে না।

রিয়াজ   :         বেশ গপ্প জুড়ে দিয়েছ দেখছি।

কেয়া    :         না জুড়ে উপায়। একবার বাইরে গেলে হুঁশ থাকে।

সাবের   :         (ইতস্তত করে) আমি বরং উঠি। নিজের কামরায় যাই।

রিয়াজ   :         কেন, কেন উঠতে যাবেন কেন।

সাবের   :         মানে আপনাদের কথার মধ্যে Ñ

রিয়াজ   :         বসুন, বসুন। আমাদের এমন কোনো গোপন কথা নেই। ভালো কথা (কেয়াকে) চল মঞ্জুদের সঙ্গে একবার দেখা করে আসি। ভালো করে বলে আসি।

কেয়া    :         আপনিও চলুন না।

সাবের   :         না না, আপনারা কোথায় বন্ধুর বাড়িতে যাবেন, যান।

রিয়াজ   :         থাক না, পীড়াপীড়ি করছ কেন। উনি টায়ার্ড বরং রিল্যাক্স করুন।

সাবের   :         আমি বরং ঘরেই থাকি।

কেয়া    :         তাহলে তো ভালো হয়, বাচ্চাটাকে রেখে যাই। আপনি থাকলে দুর্ভাবনা থাকে না।

রিয়াজ   :         এটা কেমন কথা, ওর ঘাড়ের ওপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে যাওয়া।

সাবের   :         না না, যান না। কী হয়েছে তাতে।

আম্বিয়া হঠাৎ রেডিও অন করে।

রেডিও  :         ভাওয়াইয়া শুনলেন। শিল্পী ছিলেন জেসমিন আখতার। (আম্বিয়া বন্ধ করে দিলো)।

কেয়া    :         বন্ধ করলি কেন। লাগা না।

                   সবাই উৎকণ্ঠ হয়ে শোনে।

রেডিও  :         … পূর্ব-মধ্যসাগরে অবস্থান করছে। প্রচ- ঘুর্ণিঝড়ের তীব্রতা আরো বাড়তে পারে। ঘুর্ণিঝড়ের মূল কেন্দ্রে বাতাসের গতি ঘণ্টায় সত্তর থেকে আশি মাইল। সব সমুদ্রবন্দরকে মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। মহাবিপদে প্রস্তুতি নেবার জন্যে উপকূলবর্তী লোকদের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এ প্রচ- ঘুর্ণিঝড় হারিকেনের তীব্রতা নিয়ে উপকূলভাগে আজ মধ্যরাতে আঘাত হানতে পারে।

রিয়াজ নিজেই রেডিও বন্ধ করল।

রিয়াজ   :         কেয়া চলো। আর দেরি করা ঠিক হবে না। (সাবেরকে) আমরা এক্ষুনি আসছি। দেরি হবে না।

ঋধফব ঙঁঃ

একই দৃশ্য। একই হোটেল রুম।

রাত এগারোটা।

সাবের   :         কী সাংঘাতিক ওয়েদার দেখেছেন।

কেয়া    :         সত্যি, কেমন ঘুটঘুটে অন্ধকার। গাছের একটা পাতাও নড়ছে না।

রিয়াজ   :         (আম্বিয়াকে) রেডিওটা লাগা তো। নিউজটা বোধহয় শেষ হয়ে গেল।

আম্বিয়া রেডিও লাগায়।

রেডিও  :         …বলে অনুমান করা হচ্ছে। এ সম্বন্ধে মিশরীয় পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ওয়াশিংটনের ওয়াকিবহাল মহলের বরাত দিয়ে এএফপি জানাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

                   খবর শেষ করার আগে খবরের বিশেষ বিশেষ অংশগুলো আবার পড়ছি। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘুর্ণিঝড় হারিকেনের তীব্রতা নিয়ে আজ রাতে কোনো এক সময় উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানতে পারে। কায়রোতে মিশর-ইসরায়েল আলোচনায় নতুন অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। রোডেশিয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে Ñ

রিয়াজ বন্ধ করে দেয় রেডিও।

কেয়া    :         আর শুনে কী হবে। এবার আর ছাড়াছাড়ি নেই।

রিয়াজ   :         আমার মনে হয় এখানে থাকা একদম সেফ নয়।

কেয়া    :         তা তো নয়ই। কিন্তু পালাবো কী করে। যাবোই কেমন করে।

সাবের   :         আমি কিন্তু মোটেও ভাবছি না।

রিয়াজ   :         কেন, কেন?

সাবের   :         আপনারা রয়েছেন। আপনারা যা করবেন আমিও তাই করবো।

রিয়াজ   :         (অস্বস্তি বোধ করে) সে ঠিক কথা। তবে একদম হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকাও কোনো কাজের কথা নয়।

সাবের   :         তা আপনি আপনার কোন বন্ধুর কথা বলছিলেন। গাড়ির ব্যবস্থা করেছেন?

রিয়াজ   :         মানে, সেটা তো আর নিশ্চয় করে কিছু বলা যায় না। পরের গাড়ি।

সাবের   :         তা তো বটেই।

টেলিফোন বাজে। রিয়াজ ধরল

রিয়াজ   :         হ্যালো। কী মঞ্জুর সাহেব। লাউঞ্জে অপেক্ষা করছেন। অপেক্ষা করতে বলুন। আমি নিজেই আসছি। (কেয়াকে) মঞ্জুর নিজেই এসেছে। জানি না, কী খবর নিয়ে এলো।

কেয়া    :         কী জানি বাবা কী হয়। আমার তো রীতিমতো ভয়ই করছে।

সাবের   :         তেমন যদি একটা কিছু হয়েই যায়।

কেয়া    :         আপনার হবে। আর আমাদের হবে না কী করে জানেন?

সাবের   :         একটা বলার কথা বললাম। মানে ধরুন তেমন যদি হয়েই যায়। তাহলে আমার ডায়েরিতে কয়েকটা নাম লেখা আছে, ওদের খবরটা জানিয়ে দিলে।

কেয়া    :         কে তারা, আপনার আত্মীয়?

সাবের   :         না।

কেয়া    :         বন্ধু?

সাবের   :         তাও না। মানে, আপনি বললে বিশ্বাস করবেন না, ওদের একজন মিথ্যে এক মামলায় জড়িয়ে আমাকে জেলে পাঠাতে চেয়েছিল।

কেয়া    :         আশ্চর্য, অমন লোকের জন্যে আপনার মাথা ব্যথা।

সাবের   :         আরো আছে। আরেকজন আমাকে ঠকিয়েছে। আর অন্য আরেকজন আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

কেয়া    :         তা এসব লোকের জন্যে আপনার কি এতো মায়া-দরদ বুঝলাম না।

সাবের   :         আমাকে মনে রাখার মতো ওরা ছাড়া আর কেউ নেই।

কেয়া    :         কেন?

সাবের   :         ওরা আমাকে ঘৃণা করে, ঈর্ষা করে। আমার অমঙ্গল কামনা করে এবং সত্যি কথা বলতে, আমার কিছু হয়ে গেলে খুশিই হবে ওরা।

কেয়া    :         এমন একজনও নেই যে দুঃখ পাবে।

সাবের   :         না, না।

কেয়া    :         এমন কেউ। যার নাম ডায়েরিতে লেখা নেই। আছে যে আপনার সমস্ত চেতনা জুড়ে।

সাবের   :         (যেন কোনো একটা গোপন তথ্য ফাঁস হওয়ার ভয়ে রীতিমতো উদ্বিগ্ন এমনি ভাব দেখিয়ে) বলেছি আপনাকে কখনো?

কেয়া    :         না। আমাকে বলতে যাবেন কোন দুঃখে। (খানিক্ষণ চুপ থেকে সুর বদলে) এমনি মনে হলো। কে, আত্মীয়-স্বজন নিশ্চয়ই?

সাবের   :         আত্মীয় নয়। তবে স্বজন বলতে পারেন। জানেন ওকে চেনার আগে মনে হতো বাঁচাটা যেন নিছকই একটা অভ্যাসের তাড়না। অর্থহীন, ক্লান্তিকর দিন গুনে যাওয়া।

কেয়া    :         এতদিনে একটা মানে খুঁজে পেয়েছেন নিশ্চয়ই।

সাবের   :         জানেন, এ এক আশ্চর্য অনুভূতি। আমি যেন দুর্লভ এক ধন আগলে বসে। কী করে বোঝাই! বলার মতো কিছু নেই, বড়াই করার মতো কিছু নেই। জীবন-জুয়ায় হঠাৎ করে কে যেন তাকে জিতিয়ে দিলো। একজন সব সময় আপনার কথা ভাবছে। একজনের শুভকামনা নিয়ত আপনাকে ঘিরে। প্রতিমূহূর্ত একজন আপনার হৃদয়ে স্পন্দিত Ñ

কেয়া    :         তাহলে তো দেখছি Ñ

সাবের   :         দোহাই, ওই বহুলউচ্চারিত কথাটা মুখে আনবেন না। যা হৃদয়ের কাছে টানে, অপূর্ব নিবিড়তায় দেহমন ভরিয়ে দেয়। তার চেয়ে বেশি করে কী চাওয়ার থাকতে পারে বলুন। ও কি বলে জানেন? যাক Ñ

কেয়া    :         বলুন না।

সাবের   :         বলে, ভালোবাসাবাসির কথা জানি না। ইঁঃ ও পধৎব ভড়ৎ ুড়ঁ সড়ৎব ঃযবহ ও পধৎব ভড়ৎ ধহুনড়ফু. মানে আমার জন্যে ভাবে।

কেয়া    :         তাহলে জানাতে না করছেন কেন?

সাবের   :         এজন্যে যে, না জানালেও সে জেনে যায়। বাতাসের তোড় দেখলেই যে বলতে পারে কোথায় তুফান; সামান্য ঢেউয়ের আনাগোনায় সে বলতে পারে কখন জোয়ার-ভাটা। আসল কথা কি জানেন, কিছু শুনলেও ও ছুটে আসবে না। নিজের দুঃখ হৃদয়ে ধারণ করে নিজেকে শাস্তি দিতে ওর জুড়ি নেই।

কেয়া    :         আশ্চর্য, কোনোদিন তো বলেননি। কী নাম আপনার সেই চমৎকার ভালো মানুষটির?

সাবের   :         আমি ওকে মানিক বলে ডাকি।

কেয়া    :         তাহলে দেখছি আপনারা মানিকজোড়। আড়ালে আবডালে না রেখে সেই মানুষটাকে ঘরে তুললেই তো পারেন।

সাবের   :         আসবে না। বলে, বুকে ধারণ করতে পারছ। চোখের তারায় ঠাঁই দিচ্ছ। মৌসুমী হাওয়ায় পদধ্বনি শুনছ Ñ আর কি! দূরে আছি বলেই কাছে টানতে পারছ। আমাকে ঘরের পোষমানা শেকলটা না ই বা পরালে।

কেয়া    :         উঠে পড়লেন যে। কোথায় যাচ্ছেন?

সাবের   :         সমুদ্রে।

কেয়া    :         এ সময়! কী ভয়ংকর কথা। এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে দেখবেন কী।

সাবের   :         কী জানি। আর যদি সুযোগ না পাই। আর তাছাড়া, দেখি কাউকে রাজি করানো যায় কিনা। আপনাদের এখানে এভাবে তো ফেলে রাখা যায় না।

কেয়া    :         ভালোই তো, দেখুন না কোনো গাড়িটাড়ি। অন্তত আপনার নিজের একটা ব্যবস্থা যদি হয় Ñ

সাবের   :         না না, সেটা কী কথা হলো। হলে সকলের জন্যেই হবে, না হলে নয়। চলি।

রিয়াজ   :         দরজাটা বন্ধ করো।

কেয়া আলগোছে ছিটকিনি তুলে দেয়।

কেয়া    :         ব্যবস্থা হয়েছে।

রিয়াজ   :         আস্তে, আস্তে। চেঁচিও না। মঞ্জুরকে বলেকয়ে রাজি করিয়েছি। সেই কথাই তো বলতে এসেছিল।

কেয়া    :         সকলের জায়গা হবে তো?

রিয়াজ   :         সকলের মানে?

কেয়া    :         মানে আমরা আর ওই ভদ্রলোক, মানে সাবের সাহেব।

রিয়াজ   :         ক্ষেপেছ, দুটো সিটই অতি কষ্টে ম্যানেজ করা গেল।

কেয়া    :         তাহলে সাবের সাহেব।

রিয়াজ   :         রাখ তোমার সাবের সাহেব। যার যার ব্যবস্থা তাকে করতে হবে।

কেয়া    :         এটা কিরকম কথা। ভদ্রলোক এতো কিছু করলো।

রিয়াজ   :         সেটা তো অস্বীকার করছি না। করা যাবেটা কী শুনি।

কেয়া    :         তাই বলে তুমি তাকে ছেড়ে যেতে পারো না।

রিয়াজ   :         তবু ওই এক কথা, ছেড়ে যেতে পারো না। থাক ওসব মর‌্যালিটির কথা। মঞ্জুর এসে হর্ন দেবে। রাত একটার দিকে। নিঃশব্দে বেরিয়ে যেতে হবে।

দরজায় নক করার শব্দ। কেয়া খুলে দেয়। সাবেরের প্রবেশ।

সাবের   :         শুনেছেন, ভোররাতের দিকে নাকি হিট করছে। বাইরে যা অবস্থা। মানুষ ছুটছে যে যেদিকে পারছে। চেনা মানুষও যেন চিনতে চায় না। হোটেলের একটা গাড়ি যাচ্ছিল। কথাই বললো না। প্রাইভেট ট্যাক্সি, পেয়েছিলাম বুঝলেন।

রিয়াজ   :         তারপর?

সাবের   :         অনেক বলা-কওয়ার পর রাজিও করিয়েছিলাম, কিন্তু বলল শুধু একজন নিতে পারি।

রিয়াজ   :         আপনি গেলেই পারতেন।

সাবের   :         পাগল, আমি একা যাবো কেন। ব্যাপারটা চিন্তা করুন Ñ আপনারা রয়ে গেলেন ছেলেমেয়ে নিয়ে আর আমি কেটে পড়লাম Ñ এটা হয় নাকি?

রিয়াজ   :         আপনাকে নিয়ে যাবে বলেছিলা যে ট্যাক্সি সেটা কি ছেড়ে দিয়েছে।

সাবের   :         হ্যাঁ, সে তো তখনই।

রিয়াজ   :         গেলেই পারতেন।

সাবের   :         একসঙ্গে রয়েছি। একসঙ্গে যাবো।

কেয়া    :         তা তো বটেই।

সাবের   :         আপনাদের কোনো ব্যবস্থা হলো?

রিয়াজ   :         না, ব্যবস্থা আর কী হবে। দেখি, এখনো কিছু বলা যায় না।

সাবের   :         জানেন, একটা কথা ভাবছিলাম। কোনোদিন কারও জন্যে তেমন মায়া-মমতা বোধ করিনি। অথচ আজ আমি অদৃশ্য বন্ধনে ক্রমেই জড়িয়ে পড়ছি। আগে এরকম হয়নি। কই, কেউ তো আমাকে ধরে রাখেনি। তাহলে, তাহলে? আপনাদের ছেড়ে যেতে পারলাম না কেন। (ঘড়ি দেখে) না : ওটা Ñ থাক। শুনুন আমি একদম রেডি থাকব। কোনো একটা ব্যবস্থা হলে খবর দেবেন। যদি ঘুমিয়েও পড়ি। (হাই তোলে) জাস্ট একটু নক করলে Ñ চলি।

রাত বাড়তে থাকে বাতাসের শোঁ-শোঁ গর্জন শোনা যায়। দরজা-জানালা নড়ার শব্দ। সাবের নিজের কামরায় যায়।

কেয়া    :         কী করবে?

রিয়াজ   :         কিসের?

কেয়া    :         তোমার বন্ধুটিকে একবার বলে দেখ না।

রিয়াজ   :         কী পাগলের মতো বলছো। ওই যা বললাম তাই। যেতে হয় নিজেদেরই যেতে হবে। লটবহর নিয়ে যাওয়া চলবে না।

এ সময় বাইরে থেকে আম্বিয়া এসে ঢোকে।

আম্বিয়া  :         আফা কী হইবো?

কেয়া    :         সকলের যা হয় তাই।

আম্বিয়া  :         আফা হোটেলের বাবুর্চি আমারে কইলো, তুই আমাগো লগে চইলা আয়।

কেয়া    :         সে কথা কখন হলো?

আম্বিয়া  :         আফনে যে তখন নিচে পাঠাইলেন। কয় কি তোমার কী চিন্তা। আমার বৌ-বাচ্চা আছে চলো। কইলাম, আমি যামু ক্যান আপারে থুইয়া। তোমাগো মতো যেল্লিক না।

আম্বিয়া  :         (হাই তোলে মাটিতে বিছানা পাতে) গায়ে বিষ করে। আমি ঘুমাই। আমারে জাগাইয়া দিয়েন ।

আম্বিয়া ঘুমিয়ে পড়ে। রিয়াজ সিগ্রেট জ্বালায়। দেখা যাবে নিজের মনে মনেই সে দাবার বোর্ড সাজায়। নিজে নিজেই খেলে। শেষটায় একটা রাজা আর রানী ছাড়া বোর্ডে আর কিছু থাকে না। এখানে ক্লোজ আপ নেওয়া দরকার। কেয়া চিন্তাগ্রস্ত।

রিয়াজ   :         রাজা আর রানী। বাকি সব ধরাশায়ী। 

কেয়া    :         নিজে নিজেই যখন বলছো, ধরাশায়ী তো হবেই।

রিয়াজ   :         তার মানে

কেয়া    :         না, কিছু না।

রিয়াজ   :         একটু কান খাড়া রেখো। যে-কোনো সময় হর্ন বাজাতে পারে। বসে আছ কেন। তৈরি হয়ে নাও।

কেয়া    :         (কী খেয়ালবশত দাবার বোর্ডের রাজা এবং রানীকে ধরাশায়ী করে দেয় আঙুলের টোকায়, ক্লোজ আপ নিতে হবে) এভাবে যাওয়া হবে না।

রিয়াজ   :         এভাবে মানে?

কেয়া    :         আমি এদের ছেড়ে যাবো না।

রিয়াজ   :         মাথা খারাপ। জানো এখানে থাকার পরিণাম?

কেয়া    :         না। (একটু থেমে) এবং তুমিও জানো না।

রিয়াজ   :         ছেলেমানুষি করো না। যার যার ব্যাপার। শেষ পর্যন্ত তার নিজেকেই সামলাতে হয়।

কেয়া    :         হোটেলে আশ্রয় না পেয়ে যখন দিশেহারা হয়ে পড়ো, তখন সে কথা মনে ছিল না?

রিয়াজ   :         ওটার সঙ্গে এটার তুলনা হয় না।

দুজন খানিকক্ষণ চুপচাপ। কেয়া বিছানায় উপুড় হয়ে একটা পত্রিকা ওলটায়।

                   ব্যাপারটা বুঝতে হবে। এমন নয় যে, কেউ ইচ্ছে করে করছে।

কেয়া    :         তাহলে সে কথা খোলাখুলি বুক ফুলিয়ে বললেই হয়। লুকোচুরি কেন।

রিয়াজ   :         এসব গপ্প-কাহিনিতে মানায়। সত্যিকার জীবনে চিপ সেন্টিমেন্টের কোনো দাম নেই।

কেয়া    :         বলতে লজ্জা হলো না। ভদ্রলোকের কতোটা ভরসা আমাদের ওপর। আর আম্বিয়া ছোটবেলা থেকে মানুষ এ সংসারে। আমি যাবো এদের ছেড়ে। তোমার ইচ্ছে হয় যাও।

কেয়া স্যুটকেস বার করে। ওপরের ঢাকনা খুলে শার্ট, প্যান্ট, টাই দুখানা, শেভিং কিট ইত্যাদি বার করতে যাবে।

রিয়াজ   :         কী, হচ্ছেটা কী?

কেয়া    :         তোমার কাপড়-চোপড়, জিনিসপত্র। প্যাক করে নিতে পারো।

রিয়াজ   :         এরকম স্যাকরিফাইস কোনোদিন দেখিনি। নাকি সুইসাইড করতে বসেছ।

কেয়া    :         মুখ সামলে কথা বলো।

রিয়াজ   :         চেঁচিও না। যা সত্যি তাই বলছি। আসলে বলো ভদ্রলোককে ছেড়ে যেতে পারো না। কষ্ট হয়।

কেয়া    :         ছেড়ে যেতে চাই না। পারি না বলিনি। কষ্ট তো হয়ই।

রিয়াজ   :         সে কথাই বলছিলাম।

কেয়া    :         যা খুশি ভাবো, কিছু এসে যায় না। ইয়েস আই কেয়ার ফর হিম। আই কেয়ার ফর হার। অন্তত এই বোধটুকু এখনো হারিয়ে যায়নি। (আম্বিয়ার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। গাড়ির হর্ন শোনা যায়।)

রিয়াজ স্যুটকেস বের করা জিনিসগুলো গুছাতে থাকে।

রিয়াজ   :         চুপ, মঞ্জুরের গাড়ি।

যা হয়েছে, হয়েছে। এখন চলো। সময় নেই। আবার হর্ন শোনা যায়।

কেয়া    :         তুমি যাও।

রিয়াজ   :         ঞযরং রং ৎবধষষু ংঃৎধহমব। এসো,  জলদি এসো।

           মঞ্জুর ও তার স্ত্রী বীথির প্রবেশ।

মঞ্জুর    :         (ঘড়ি দেখে) সময় নেই, চলুন ভাবি।

কেয়া    :         আমি বলে দিয়েছি।

মঞ্জুর    :         আচ্ছা লাউঞ্জে তো চলুন। অন্তত সি অফ করবেন না।

রিয়াজ, মঞ্জুর, বীথি বেরিয়ে আসে। পেছন পেছন কেয়া। রিয়াজের কোলে বাচ্চা। হোটেল লাউঞ্জ। বাতাসের গর্জন আর ইঞ্জিনের মৃদু স্টার্টের আওয়াজ শোনা যাবে।

কেয়া    :         আমি তো আপনাদের ধরে রাখিনি। যান না আপনারা।

বীথি     :         কী ব্যাপার। তুই যাবি না

মঞ্জুর    :         দেখুন, আমি আপনার সেন্টিমেন্ট বুঝি।

রিয়াজ   :         একটা মানুষ যার সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা আগেও আলাপ ছিলো না, তাকে চিনি না, জানি না তার জন্যে Ñ (কী একটা কটাক্ষ করতে গিয়ে মাঝপথে থেমে যায়) কী জানি, বুঝি না।

বীথি     :         এটা তোর ভারী অন্যায়। কথা হলো! থেকে যাবি? তাছাড়া লোকে ভাববেই বা কী?

কেয়া    :         যে যা ভাবার ভাবুক। এসে যায় না। আমি আর যাই হই অকৃতজ্ঞ হতে পারি না।

মঞ্জুর    :         (কী ভাবে। তারপর খানিকক্ষণ রিয়াজের সঙ্গে পরামর্শ করে।) অলরাইট আপনার কথাই থাকবে। তবে, সেক্ষেত্রে এক মিনিট দেরি করা চলবে না।

                   মানে এই ট্রিপটা করেই আমি আবার এসে এদের নিয়ে যাবো।

কেয়া    :         কিন্তু Ñ

বীথি     :         এতে কোনো কিন্তু-টিন্তু নেই। হলোই তো। তোর কথা রইলো। ভাবনা-চিন্তাটা আবার কোথায়।

কেয়া    :         সত্যি, কথা দিচ্ছেন তো।

মঞ্জুর    :         ভাবি, কী বলছেন। এই ঝড়ের রাতে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যে প্রবোধ দিয়ে যাবো। কখনো ভাবতে পারেন?

কেয়া    :         দেখে দেখে এমন বিতৃষ্ণা জন্মে গেছে, চট করে কোনো কিছু বিশ্বাস করতে মন সায় দেয় না।

মঞ্জুর    :         তবু বিশ্বাসের ওপরই আমরা চলেছি। পারস্পরিক বিশ্বাস। নইলে কবে পৃথিবীটা বাসের অনুপযোগী হয়ে যেত।

বীথি     :         চলো তো আর কথা না বাড়িয়ে।

কেয়া    :         দোহাই আপনার ঠকাবেন না। কথা দিন, এ গাড়িতেই আপনি ফিরে আসবেন আমাকে সঙ্গে করে।

মঞ্জুর    :         নিজে থেকে বললাম বিশ্বাস হচ্ছে না?

বীথি     :         যথেষ্ট হয়েছে। চলো তো এখন কথা না বাড়িয়ে, টুনিকে আমার কোলে দেন।

রিয়াজ   :         না। ঠিক আছে। কিন্তু তোমার সোনার গয়নাগুলো। ওগুলো যে খুলে রাখলে হোটেলের কামরায়। চট করে নিয়ে এলে হতো না?

কেয়া    :         সেখানেই থাক। সোনার চেয়ে অনেক দামি জিনিস ছেড়ে যাচ্ছি, ওদের রেখে যেতে পারলে ওই সামান্য গয়নার জন্যে Ñ

রিয়াজ   :         বলো তো, আমি নিয়ে আসি এক দৌড়ে।

কেয়া    :         (ধমক এবং চিৎকারের সুরে। কিছুটা শাসনের ভঙ্গিতেও) না। (মঞ্জুরকে) আমরা ফিরে আসছি না?

মঞ্জুর    :         (প্রথম ইতস্তত, তারপর তার কঠিন দৃষ্টির সামনে নিজেকে সামলে নিয়ে) আমাকে বলছেন? ও, হ্যাঁ নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। ফিরে আসবো না কেন।

কেয়া    :         চলুন তাহলে। একটা কথা মঞ্জুর সাহেব। আপনার ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস। মনে রাখবেন শুধু আমি যাচ্ছি না। সঙ্গে যাচ্ছে সেই বিশ্বাস বোধটাও। ওটাকেই যদি গলা টিপে মেরে ফেলেন ভাবব এসব মায়াকান্না লোক দেখানো।

মঞ্জুর    :         কোন বিশ্বাসবোধের কথা বলছেন?

কেয়া    :         আপনি এখানে আবার ফিরে আসছেন যে ওদের তুলে নিতে।

মঞ্জুর    :         (খানিকটা বিব্রত) আসব বইকি। আসব না কেন? (স্বীকৃতির জন্যে রিয়াজ এবং বীথির দিকে তাকায়। দুজন দুদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়)। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।

ঋধফব ঙঁঃ

হঠাৎ দুই কামরার মধ্যবর্তী দরজা তড়াক করে খুলে যায়। সাবেরের কামরা থেকে জিনিসপত্র গড়িয়ে মাটিতে পড়ে। একটা অ্যাশট্রে ছিটকে পড়ে। আম্বিয়া সাবেরের গায়ের কাছে ঘেঁষে আসে।

আম্বিয়া  :         আমার ডর করে।

সাবের   :         কেন?

আম্বিয়া  :         (পা লম্বা করে মেলে দিয়ে মাটিতে বসে পড়ে) তয় আপনারে কই। আমাগো বংশ তুফানে খাইল। বাপজান, মিঞাভাই, দুলাভাই Ñ হগ্গলে।

সাবের   :         তুই ভয় পেয়েছিস আম্বিয়া Ñ

আম্বিয়া  :         আমার কিছু হইলে বইনটা বাঁচব না। কইল তোরে আশ্বিন মাসে নিয়া যামু। বড় গিরস্তের ঘরে বিয়া হইসে। গেল চৈত মাসে আমারে দুইখান শাড়ি পাঠাইল না।

সাবের   :         কিন্তু আমার জন্যে কেউ কাঁদবে না।

আম্বিয়া  :         কইলেই হইল কান্দব না। আপনে কেমনে জানেন। (খানিকক্ষণ চুপচাপ) আপনি আমার খ্যাশ লাগেননি?

সাবের   :         না।

আম্বিয়া  :         আমি আপনারে ভাইজান বোলাই না।

সাবের   :         হ্যাঁ।

আম্বিয়া  :         আমি কানতাম পারি না। না গরিবের মাইয়া কান্দবারও পারে না।

সাবের   :         আমরা বড় বেকায়দায় পড়েছি আম্বিয়া।

আম্বিয়া  :         কী হইব ভাইজান?

সাবের   :         অন্তত তোকে নিয়ে গেলে পারত।

আম্বিয়া  :         না, আমার ডর করায় না ভাইজান। মউত রে ডরাই না। ডরাই হেই মানুষ গো যারা মিছা কথা কয়। মিছা কথা কইয়া বিপদের সুম সবাইরে ফালাইয়া যায়।

সাবের   :         এই দাঁড়া আমি দেখি হোটেলে কেউ যদি থাকে। তোকে যদি কারো সঙ্গে Ñ

আম্বিয়া  :         আপনে যাইয়েন না ভাইজান। (চিৎকার করে কান্নার সুরে) যাইয়েন না।

সাবের বেরিয়ে যায়। দরজায় দুড়–ম দুড়–ম শব্দ হয়। আম্বিয়া কী মনে করে বিছানাপত্র ঘাঁটে। তোশকের নিচে সোনার চুড়ি চোখে পড়ে। একটা হাতে পরে। ঘুরে ঘুরে দেখে। তারপর বিতৃষ্ণা আসে। হাত থেকে খুলে ধুম করে ফেলে দেয়। মেঝেতে গড়াতে থাকে। সাবের ফিরে আসে। ভিজে একাকার।

সাবের   :         হোটেলে আমরা ছাড়া কেউ নেইরে। কেউ নেই। শুধু তুই আর আমি। সবাই যেখানে পারে পালিয়েছে।

আম্বিয়া  :         আর একটা মানুষও নাই।

সাবের   :         না। (সাবের মাথা নাড়ে)

আম্বিয়া  :         আমারে বাবুর্চি কইসিল, লও যাই গা। আমি যাই নাই।

সাবের   :         তুই চলে যা। এখানে থাকলে Ñ

আম্বিয়া  :         আপনারে ছাইড়া যামু না। এক বইন ছাড়া আমার কেডা আছে কন? বাপ নাই, মা নাই, ভাই নাই। দেইখেন আমাগো লগে যে বেইমানি করলো তাগো ওপর গজব পড়ব? না Ñ তওবা তওবা।

সাবের   :         কী হলো?

আম্বিয়া  :         আফার কথা কইয়া ফেললাম যে। আফাকে বাদ দিয়া।

সাবের   :         সব সমান।

আম্বিয়া  :         হেউডা কইবার পারেন না। আমারে কয় তুই আমার বইনের মতো। আমারে বিবিসাব ডাকবি না। আপা ডাকবি। গেল চৈত মাসে কইলাম আমারে কানপাশা বানাইয়া দিবেননি? কয় দিমু, সময় আইলে দিমু, তবে। কী বুঝলেন? (আড়চোখে সলজ্জ দৃষ্টিতে তাকায়।)

ঝড় বাড়তে থাকে। সে সঙ্গে প্রচ-তা। একটা জানলার কপাট খুলে পড়ে। দুজনে খাটটা জানালার দিকে ঠেলে দেয়। মাঝে মাঝে গোঁ-গোঁ শব্দ করে হাওয়া ছুটে আসে। আম্বিয়া সাবেরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে

সাবের   :         বাইরে ভীষণ ঝড় আম্বিয়া।

আম্বিয়া  :         ভাইজান

সাবের   :         চুপ কর। কান্দিস না।

আম্বিয়া ছিটকে দূরে সরে যায়।

আম্বিয়া  :         আপনে আমারে ধমক লাগান ক্যান? আমি আপনার খাই না        

                   পরি। খাই? অহন আমারে ধমকাইলে আমি যামু কই!

সাবের   :         না।

আম্বিয়া  :         আপনারে ভাইজান ডাকি, কিন্তুক আপনে কি কুটুম লাগেন?

সাবের   :         না।

আম্বিয়া  :         পিরথিবীতে বইনের কাছে ভাইয়ের চেয়ে বড় কুটুম আর কে আছে? (কাছে সরে আসে) আপনি পারেন ভাইজান।

সাবের   :         কী পারি।

আম্বিয়া  :         আমারে বকবার পারেন। যে আদর করবার পারে, সে বকবারও পারে। মারবারও পারে।

সাবের   :         আম্বিয়া। আজ আমার জন্মদিন ছিল।

আম্বিয়া  :         আল্লা আপনারে হায়াত দরাজ করুক।

সাবের   :         দাঁড়া। (নিজের ঘর থেকে একটা কেক নিয়ে এলো।) এই নে। খা, কেক খা।

আম্বিয়া  :         ক্যাক। আমারে দিসেন!

সাবের   :         হ্যাঁ। খা।

আম্বিয়া  :         (অর্ধেক খেয়ে) আপনে খাইবেন না?

সাবের   :         তুই খা, তুই খা। আচ্ছা, আচ্ছা দে, একটু দে।

আম্বিয়া  :         আমার হাতেরটা খাইবেন।

সাবের   :         কেন খাব না। দে।

সাবের ওর হাত থেকে কেক নেয়

আম্বিয়া  :         ভাইজান একটা কথা রাখবেন নি।

সাবের   :         কী।

আম্বিয়া  :         আপনার ওইডা বাজান না। (বেহালা দেখিয়ে বলে)।

সাবের   :         পাগল। এই সময় শুনবি। অন্যদিন।

আম্বিয়া  :         তাহলে কাম নাই।

সাবের   :         আচ্ছা-আচ্ছা।

সাবের কিছুক্ষণ চেষ্টা করে। বাইরের গর্জন বাড়তে থাকে। ‘যে রাতে মোর দুয়ার গুলি’ সুরটি বাজাবার চেষ্টা করে। একসময় বেহালা হাত থেকে ছিটকে পড়ে যায়। বাতাসের তোড় বাড়ছে। জানালার যে দিকটা খোলা সেটা ঠেকা দেওয়ার জন্যে এখন ড্রেসিং টেবিলটি টেনে আনে।

সাবের   :         দেখি চেষ্টা করে। সম্ভব নয় আম্বিয়া। দেখছিস না। হাত থেকে ছিটকে পড়ে যাচ্ছে।

আম্বিয়া  :         কী দেখতাছেন ভাইজান।

সাবের   :         আয়নাটা।

আম্বিয়া  :         আয়না। এই ঝড়ের মধ্যে নিজের চেহারা দেখতাছেন।

হঠাৎ যেন কল্পলোকে সে নিজেকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে উদ্ভাসিত দেখতে পায়। ফুটে ওঠে তার অবয়ব। যেন এ সবই সাবেরের স্বগতোক্তি। কথাগুলো আগেই রেকর্ড করে নিতে হবে।

আয়নার সামনে সাবেরের প্রতিকৃতি : প্রতিফলিত প্রতিকৃতি দেখা যাবে। কিন্তু সাবেরের ঠোঁট নড়বে না। কখনো কখনো ইফেক্ট তৈরি করার জন্যে ড়ঁঃ ড়ভ ভড়পঁং করা যেতে পারে। কখনো খোলা জানালায় বৃষ্টির ছাঁট এসে আয়নার শিশিরবিন্দুর মতো জমতে পারে। ক্লোজ আপে সেটি দেখানো যায়।

[সংলাপে ঊপযড় বভভবপঃ থাকবে]

সাবের   :         দেখছি। দেখছে নিজেকে আর ভাবছে।

                   অত বিব্রত হচ্ছ কেন। এতো

                   উদ্বিগ্নতা কিসের। নিজের ভয়টাকে দেখছি কোনোমতেই ঢাকতে পারছ না। এতো কাতর কেন? মৃত্যুভয়? হঠাৎ জীবন ফুরিয়ে যেতে পারে সেজন্য উৎকণ্ঠা? কিন্তু তেমন যদি কিছু ঘটেই সেজন্যে অনুশোচনার কী আছে। এরকম একটা আকস্মিক পরিসমাপ্তি চাও না? তবে, তুমি কি হাসপাতালের কোনো  কেবিনে স্নিগ্ধ পরিচর্যাময় হাতের ছোঁয়ায় ধন্য হয়ে মরতে চেয়েছিলে? একই কথা। সমুদ্রতীরে নাম-ডাকওয়ালা হোটেলের কামরায় এক বড় বিক্ষুব্ধরাতে এ পৃথিবীর কাছ থেকে বিদায় চাওয়া। মন্দ কী? এতো যে লিখলে, এতো কবিতা, গপ্প আর গান এটুকু বোঝ না, তোমার জোর বরাত। বায়ান্ন সালে কত কেউ মরল, তুমি মরলে না। একাত্তরে মরলে না। দুবারই বেঁচেছিলে। অন্তত তোমার ডায়েরিতে তাই লিখেছ। এবার চাওনি। অথচ Ñ

এক সময় জানালার খানিকটা অংশ অথবা বাইরের কোনো কিছু এসে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় ধাক্কা খায়। আয়না ঝনঝন শব্দ করে ভেঙে যায়। টুকরো ছড়িয়ে পড়ে চার দিকে।

বাতাসের গর্জন বাড়ে। সামনের দরজা তড়াক করে খুলে গেল। ওঠার চেষ্টা করেও যেন ওঠা যায় না। (ক্যামেরা ঃরষঃ করে দেখানো যেতে পারে) সাবেরের দৃষ্টিভঙ্গিতে পৃথিবীটাই যেন তেরচা হয়ে বেঁকে যাচ্ছে Ñ কয়েক ডিগ্রি। ঘড়ির দোলকের মতো যেন একবার বাঁয়ে একবার ডানে হেলে যাচ্ছে।

সাবের   :         আম্বিয়া আমার হাতটা ধর ভালো করে। সাবধান।

আম্বিয়া কষ্ট করে এগিয়ে আসে দেয়াল, আসবাবপত্র ধরে ধরে। সাবের উঠে দাঁড়ায়। জুতোর তলায় কাঁচের ভাঙা টুকরো মড়মড় শব্দ করে।

আম্বিয়া  :         ভাইজান আমার ডর করে। কই যাইতেছেন ভাইজান।

সাবের   :         আমার ঘরে। আমার সব বই, কাগজপত্র সব ওখানে। দেখি কতোটা উদ্ধার করা যায়। তুইও আয়।

এক সময় পাশের কামরার দরজা শব্দ করে খুলে যায়। বইপত্র মাটিতে এসে ছিটকে পড়তে থাকে। সেইসঙ্গে অসংখ্য লেখা সাদা কাগজ। এক সময় দেখা যাবে সারা ঘরটাই যেন কাগজে, কাগজে একাকার। হাওয়ায় উড়ছে। কোনোটা সাবের ধরার চেষ্টা করে। পারে না। হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে যায়। আম্বিয়া কতগুলো কাগজ মুঠো করে আনে। কোনো কোনোটা বৃষ্টির ছাঁট লেগে ভেজা।

আম্বিয়া  :         সব আপনি লেখসেন?

সাবের   :         (কাগজগুলো দেখতে থাকে। কোনোটা দুমড়ে ফেলে দেয়। কোনোটা এমনি উড়ে যায়) তুই যদি লেখাপড়া জানতিস। আম্বিয়া যদি এতটুকু লেখাপড়া জানতিস তাহলে তোকে, অন্তত তোকে এই মুহূর্তে আমার লেখাগুলো পড়ে শোনাতাম।

আম্বিয়া  :         দরকার নাই। লেখাপড়া মানুষের যেই নমুনা। বালা কইরাই দেখছি ভাইজান।

সাবের   :         (উঠে দাঁড়ায়। উড়ে যাওয়া কাগজ ধরতে চায়। পারে না। আর্তনাদের সুরে) আমার এতদিনের লেখা। আমার জীবনের সাধনা Ñ আম্বিয়া, আম্বিয়া সব উড়ে যাচ্ছে Ñ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে Ñ অনেক Ñ  অনেক না বলা কথা আমি লিখেছিলাম আম্বিয়া,  অথচ কেউই জানবে না Ñ কেউ না।

আম্বিয়া  :         কী ভাবতাছেন ভাইজান? কী দেখতাছেন।

(হঠাৎ) একটা বই এসে পড়ে। দ্রুত পাতা হাওয়ায় আন্দোলিত হয়। সাবের বইখানা তুলে নেয়। দেখে প্রথম পাতায় লেখা :

ঋৎড়স ড়হব যিড় পধৎবং ভড়ৎ ুড়ঁ.

হঠাৎ একটা ছবি যেন ভেসে ওঠে তার চোখের সামনে। বাতাসের তোড় বাড়তে থাকে। দেখা যাবে খড়হম ংযড়ঃ ড়ঁঃ ড়ভ ভড়পঁং অবস্থায় একটি মেয়েকে। ৎড়পশরহম পযধরৎ-এ বসে একটা বই হাতে আবৃত্তি করে যাচ্ছে :

কোনো ভরাট, সুস্পষ্ট উচ্চারণের অধিকারিণী কাউকে দিয়ে আগেই রেকর্ড করিয়ে রাখতে হবে।

‘ঞযব ঙহব ৎবসধরহং, ঃযব সধহু পযধহমব ধহফ ঢ়ধং; ংবধাবহ’ং ষরমযঃ ভড়ৎবাবৎ ংযরহবং, ঊধৎঃয’ং ংযধফড়ংি ভষু; খরভব ষরশব ধ ফড়সব ড়ভ সধহু পড়ষড়ঁৎবফ মষধংং, ংঃধরহং ঃযব যিরঃব ৎধফরধহপব ড়ভ ঊঃবৎহরঃু, ঁহঃরষ ফবধঃয ঃৎধসঢ়ষবং রঃ ঃড় ভৎধমসবহঃং – উরব ওভ ঃযড়ঁ ড়িঁষফংঃ’ঃ  নব রিঃয ঃযধঃ যিরপয ঃযড়ঁ ফড়ংঃ ংববশ! ঋড়ষষড়ি যিবৎব ধষষ রং ভষবফ!’

আম্বিয়া  :         কী ভাবতাছেন ভাইজান?

সাবের   :         (যেন সম্বিত ফিরে পায়। হাত থেকে বই পড়ে যায়) না। না, কিছু না।

হঠাৎ আলো নিবে যায়। সে সঙ্গে মড়মড় শব্দ। বোঝা যায় সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটতে শুরু হয়েছে। জিনিস পড়ে যাওয়া আর ভাঙার ক্রমাগত আওয়াজ। প্রায় অন্ধকারে এই ংপবহব-এর পরবর্তী ধপঃরড়হ-সমূহ দেখাতে হবে।

আম্বিয়া  :         ভাইজান, আপনে কই? (তীক্ষ্ম চিৎকারে) আমি কিছু দেখি না।

সাবের   :         (হুড়মুড় করে কী যেন একটা এসে পড়ে। মনে হয় আহত। কষ্টকৃত কণ্ঠস্বর) আলো নেই তাই দেখিস না। (গলার আওয়াজ ফিসফিস হয়ে আসে) যা আম্বিয়া যা। সবাই পালিয়েছে। তুইও পালা।

আম্বিয়া  :         (তেমনি তীব্র কর্ণবিদারী চিৎকার) না, না যামু না। আপনারে একলা ফেলাইয়া যামু না।

          আবার কী যেন শব্দ করে পড়ে।

ভাইজান :         (নিরুত্তর)।

ভাইজান :         (চিৎকার তীব্রতর Ñ নিরুত্তর)

ভাইজান :         (চিৎকার আরো তীব্র Ñ নিরুত্তর)

                   আমি চোখে দেখি না। আমি চোখে দেখি না। (কান্না)। ভাইজান কোন্ডা আপনের হাত। আমি চোখে দেখি না। ভাইজান, ভাইজান গো। ভা-ই-জা-আ-ন (ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে জোর কান্না।

শেষের সংলাপটি বিশেষ করে শেষের লাইন কটি একদিকে আবেগ, ও অন্যদিকে ভীতির (নিরাপত্তাহীনতার) মিশ্র অনুভূতি নিয়ে বলা প্রয়োজন।

ঋধফব ঙঁঃ

হাসপাতালের করিডোর। দেখা যাবে রিয়াজ হাসপাতালের ডাক্তারের সঙ্গে আলাপরত। দুজনই ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে। করিডোরের দুদিকে হাসপাতাল ওয়ার্ড এবং অপারেশন থিয়েটার। মাঝে মাঝে কর্মচারীদের চলাফেরা করতে দেখা যাবে। এক পর্যায়ে স্ট্রেচারে একটি রোগীকে দেখা যেতে পারে। রোগীকে দেখতে পেয়ে ওরা সরে দাঁড়াবে। স্ট্রেচার সংলগ্ন অপারেশন থিয়েটার ঢুকে পড়বে।

ডাক্তার  :         বুঝলেন এরকম সাইক্লোন আমি দেখিনি। এ পর্যন্ত যা রিপোর্ট তাতে তো হেভি ক্যাজুয়েলটি। ইন্টিরিয়ারের সব খবর তো পাওয়া যায়নি। বলা যায় না হাজারখানেকও এক্সিড করতে পারে। 

রিয়াজ   :         আপনি নিজেই রেসক্যু অপারশনে ছিলেন ডক্টর।

ডাক্তার  :         সেজন্যেই তো বলছি। নইলে মনে করুন ওরকম হোটেল পর্যন্ত রেহাই পেল না। (একটু থেমে) ধরুন না আপনাদের ওই বন্ধু। কী নাম যেন?

রিয়াজ   :         সাবের Ñ

ডাক্তার  :         সাবের সাহেব। কী করে বাঁচবে বলুন। এরকম ট্র্যাপড হয়ে পড়লে কেউ বাঁচে। জানালার একটা কপাট ও একটা ফার্নিচার এসব যেভাবে ওর গায়ে এসে পড়েছিল। দুঘণ্টা লেগেছে শুধু বডি সরাতে। তবু ভালো আপনি ছিলেন বলে সহজে আইডেন্টিফাই করা গেল। (কিছুক্ষণ থেমে Ñ এ সময় রোগীর স্ট্রেচার করিডোর অতিক্রম করতে পারে)

ডাক্তার  :         দেখুন আপনাদের সাবের সাহেবকে বাঁচানো গেল না, অথচ ঘরের ভেতর ছিল বলে আপনাদের আয়া মেয়েটি প্রাণে বেঁচে গেল। তবে ওর চোখের রহলঁৎু-টা…

রিয়াজ   :         কী মনে হয় আপনার? সারবে?

ডাক্তার  :         আমরা তো চেষ্টার ত্রুটি করছি না।

সামনেই দেখা যাবে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘ঊুব ডধড়ৎফ’। ডাক্তার দরজা খুলে আসতে বলবে। আসুন।

ঋধফব ঙঁঃ

হাসপাতালের চক্ষু ওয়ার্ড :

কেয়া একটি টুল টেনে নিয়ে ওর কাছাকাছি এসে বসে। আম্বিয়ার হাতখানা বারবার ওপরের দিকে কী যেন ধরার জন্য প্রসারিত হয়। যেন কোনো একটা অবলম্বন চায়। কেয়া হাত বাড়িয়ে দেয়।

আম্বিয়া  :         কেডা? ভাইজান! (আগাগোড়া হাত স্পর্শ করে বুঝতে চায়। উঠে বসার চেষ্টা করে উত্তেজনায়। নার্স নিরস্ত করে। আম্বিয়া হাত ছেড়ে দেয়। মুখ ঘুরিয়ে ফেলে। তারপর আবার সোজা হয়ে খুব আবেগপূর্ণ কণ্ঠে কাঁদো কাঁদো স্বরে) ও আফা আপনি, ভাইজান আহে নাই?

এবার কেয়া হাতখানা নিজের গালের ওপর ঠেকায়। এক সময় দুহাতে চেপে ধরে ওখানা ঘিরে রাখতে চায়।

আমি কইলাম, আমি কইলাম Ñ

কেয়া    :         (অন্য হাত আম্বিয়ার মাথায় বুলায়) কথা বলিস না আম্বিয়া।

আম্বিয়া  :         আমি কইলাম কী আপা Ñ ভাইজান। দেইখা লইয়েন আপা আইব। টিক কই নাই, আপা?

কেয়া    :         এখন তুই ঘুমা।

আম্বিয়া  :         আমি আপনার হাত ছাড়–ম না।

কেয়া    :         ছাড়িস না।

আম্বিয়া  :         সাব আইছেনি।

কেয়া    :         এই তো আমার পাশে দাঁড়িয়ে।

আম্বিয়া  :         ভাইজান বালা আছে তো আফা। আপনেগো তো কুনুকিছু ক্ষেতি হয় নাই আফা। ভাইজান বালা আছে তো আফা। হেইযে আইজ ঝড়ের মধ্যে হোডলের দরজা ঠেইলা ভাইজান কুন জায়গায় বেরোলো। আপনারা খোঁজ করতোনি। ভাইজান বালা আছে তো।

 কেয়া   :         না।

ডাক্তার নার্সকে ডাকে। নার্স ইঞ্জেকশন ঠিক করে দেয়। ডাক্তার ইঞ্জেকশন দেয়। আম্বিয়ার হাতখানা ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ওখানা নিজে থেকেই বিছানায় গড়িয়ে পড়ে। নার্স চলে যায়।

ডাক্তার  :         রোগীকে ঘুমুতে দিন। ওকে ইনজেকশন দেয়া হয়েছে।

 কেয়া   :         কী মনে হয় ডাক্তার সাহেব। ওর দৃষ্টিশক্তি?

ডাক্তার  :         দেখুন এসব নিশ্চয় করে বলা যায় না। রোগী একটু সুস্থ হলে অপারেশনের চেষ্টা করা হবে। তবে দেখুন Ñ। ডাক্তার কথা অসমাপ্ত রেখে কেয়া এবং রিয়াজের দিকে তাকায়। ভাবটা এই, কী হয় দেখুন।

নার্স এসে ঢোকে।

নার্স      :         (ডাক্তারকে) আপনার টেলিফোন।

ডাক্তার  :         আমার? নাম বলল?

নার্স      :         না, কোনো নাম বলেনি। শুধু বলল, ডাক্তারকে একটু ডেকে দিন।

ডাক্তার ও নার্সের প্রস্থান। কেয়া গালে হাত দিয়ে বসে।

রিয়াজ   :         কী ভাবছ?

কেয়া    :         না, কিছু না। মানে সম্পূর্ণ ব্যাপারটা কেমন একটা দুঃস্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে।

রিয়াজ   :         কী বলব। এতো খারাপ লাগলো যখন নিজে গিয়ে আইডেন্টিফাই করতে হলো। ভাবতেই পারিনি সাবের সাহেব। সত্যি নিজেকে অপরাধীর মতোই মনে হচ্ছে। (কী ভেবে) তবে কি একটা কথা জানো?

কেয়া    :         কী?

রিয়াজ   :         দেখলাম যেন দিব্যি শান্তিতে ঘুমিয়ে। কোনো বেদনার চিহ্ন নেই।

কেয়া    :         বেদনা থাকবে কেন। ওর যন্ত্রণা ছিল। টানা যন্ত্রণা। কোনো বেদনা তো ছিল না।

ঞযবসব সঁংরপ  ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’

এ সময় হাসপাতালের কোনো একটি জানালার মৎরষষ-এর দিকে কেয়ার নজর যায়। ওটাকে সে বেহালার অংশ বলে কল্পনা করে। বেহালা সুপার ইম্পোজ হবে। তারপর সাবেরের কল্পিত চেহারা। সে যেন ভাঙাচোরা ধ্বংসস্তূপে প্রাণপণে বাজিয়ে যাচ্ছে Ñ যে রাতে মোর দুয়ারগুলি Ñ এই ঞযবসব সঁংরপ. এক সময় ক্যামেরা এসে উরংংড়ষাব হবে ডাক্তারের ভধপব-এ। ডাক্তারের প্রবেশ।

ডাক্তার  :         সাবের সাহেবের খোঁজ করছিল।

রিয়াজ   :         কে?

ডাক্তার  :         নাম বলল না। এক মহিলা। শুধু খবরটা সত্যি কিনা জানতে চাইল।

রিয়াজ   :         সাবের সাহেবের ব্যাপারটা সত্যি দুঃখজনক।

ডাক্তার  :         দুঃখজনক হলে এরকম জেনারেল ডিস্যাসটারে মানুষ কী করতে পারে বলুন। (একটু থেমে, কেয়ার দিকে তাকিয়ে) তবু ভালো সময় মতো আপনারা চলে আসতে পেরেছিলেন। পরম সৌভাগ্য বলতে হবে।

কেয়া    :         (উঠে দাঁড়ায়) সৌভাগ্য! কী জানি। অনেকের জন্যে বেঁচে থাকাটাই মৃত্যু। আবার অনেকের জন্যে মৃত্যুটাই বেঁচে যাওয়া। কল্পিত সাবেরের কণ্ঠ :

চার্চ মিউজিক জাতীয় কোনো কিছু বাজানো যেতে পারে। প্রথমে স্তিমিত পরে তীব্রতর করে। ঈষরসধী বোঝাবার জন্যে। কেয়া জানালার কাছে যায়। আস্তে করে পরদা সরিয়ে নেয়। ক্যামেরা দূরের মাঠ গাছপালা প্যান করে কোনো এক কৃষ্ণচূড়ার ডালে এসে স্থির হয়। হঠাৎ যেন তার মনে হয়ে যায় সেই দুটি চরণের কথা। সাবেরের নোটবইয়ে লেখা।

পঙ্ক্তি দুটি আবৃত্তির সময় ক্যামেরায় ধরা পড়বে একঝাক পাখি ডাল ছেড়ে উড়ে যাচ্ছে সম্ভব হলে শেষ লাইন।

আমরা যেন হুজুগের একঝাঁক পাখি এক ডাল থেকে নিয়ত অন্য ডালে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে।

সমাপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *