তারা ঝরার দিন

সকাল বেলা।

মামুলি সাজানো ঘর। মঞ্চের পেছনে বাঁ-ধার ঘেঁষে পর্দা আটা দরজা। একধারে জানালা। পর্দা টানা। দরজার পাশেই পাতা বিছানা। বিছানার তলায় জুতো, স্যান্ডেল। বিছানার মাথার দিকে টেবিল। তাতে নানা ধরনের জিনিস যেমন বইপত্র, আয়না, ক্রিমের কৌটো, তেলের শিশি, আয়না, প্রসাধন সামগ্রী, ফ্লাক্স, গ্লাস এবং শেড দেওয়া টেবিল ল্যাম্প। জিনিসপত্র ইতস্তত ছড়ানো। দেয়ালে, প্রায় মাঝামাঝি জায়গায়, টানানো কোনো যুবকের ছবি। দেয়ালের কোণে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন ছাতা, ব্যাডমিন্টন র‌্যাকেট ইত্যাদি। পর্দা উঠতেই দেখা যাবে বছর চব্বিশের এক মহিলা মিনু ঘর গুছোতে ব্যস্ত। বিছানার চাদর পাট করা, বইপত্র সাজানো ইত্যাদি। মিনু একমুহূর্ত দেয়ালে টানানো ছবির দিকে তাকায়। ফ্রেমখানা সোজা করে দেয়। তারপর আবার কাজে মন দেয়।

শহীদের প্রবেশ। মিনুর বছর দুয়েকের বড়। ছিপছিপে গড়ন। গলা অবধি শার্টের বুতাম চড়িয়ে দেওয়া। চোখে ভারি লেন্সের চশমা। ঢিলেঢালা ভাব। কিছুটা নার্ভাস।

ঢুকেই একবার নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকায়। আরেকবার টেবিলে রাখা টাইমপিসের দিকে। সন্দেহ মোচনের জন্যেই যেন একরকম মিনুর গায়ের ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে টাইমপিসখানা তুলে নেয়। মিনু এতক্ষণে শহীদের উপস্থিতি লক্ষ করে। শহীদ নিজের হাতঘড়ি ঝাঁকিয়ে নেয়।

শহীদ    :         তাহলে আমারটা কি বন্ধ ছিল?

                   (টাইমপিস টেবিলে রেখে দেয়) সর্বনাশ, সাড়ে ন’টা।

                                                   প্রস্থান

ঘড়ি জায়গাচ্যুত হয়েছে মনে হওয়ায় ওখানা ঠিক জায়গায় রাখতে চায় মিনু। মনঃপুত হয় না। আবার জায়গা বদল করে। এ সময় ছোটবোন রুবি এসে ঢোকে সদ্য বাথরুম থেকে। মিনুর বছর দুয়েকের ছোট। চটপটে, চঞ্চল। পরনে পাটভাঙা শাড়ি। কোনোমতে জড়িয়ে নিয়েছে গায়ে।

রুবী      :         (ঝুঁকে টাইমপিসের দিকে তাকিয়ে নিয়ে) পৌনে দশ! সেরেছে। দে তো চিরুনিটা শিগগির।

                   [মিনু ঈর্ষৎ বিরক্ত Ñ ঈষৎ সোহাগের সঙ্গে তাকে লক্ষ করে। আবার কাজে মন দেয়। রুবি টেবিলে খোঁজে, কই আমার চিরুনি Ñ কিন্তু পায় না। মিনু ঠোঁট উলটে তাকায়। রুবি সে বিছানার ওপর বসে পড়ে। আর মিনুকে বলে অনুযোগের সুরে জাত যাবে না।] দে না তোরটাই দে। ইস, এমনিতেই মেলা দেরি হয়ে গেল। দুঃ ছাই।

                   মিনু টেবিল থেকে নিজের চিরুনিখানা খুঁজে এনে দেয়। রুবি ভেজা চুলের গোছা বাঁ-হাতের ওপর মেলে ধরে অন্য হাত দিয়ে পানি ঝাঁকিয়ে নেয়। তারপর চিরুনি চালাতে থাকে।

                   [অতই যখন করলি, দে না আমার চা-টা এনে। অফিসে কী রদ্দি চা, কী বলব তোকে আপা।]

মিনু      :         উহুঁ সেটি হচ্ছে না। যার যার কাজ সে গিয়ে করুকগে। এখানে কারো দশটা দাসী-বান্দি নেই।

রুবি      :         (চুলের কাঁটা ঠোঁটের ফাঁকে ধরে চুলের খোঁপা ঠিক করতে করতে) সে তো জানি। সময় থাকলে তোকে বলি? (খুবই সোহাগের সুরে) যা-আ-না, আ-আ-পা, প্লি-ই-ই-জ।

                   [শওকতের প্রবেশ। বয়েসে মিনুর বছর পাঁচেক বড়। তিরিশের কাছাকাছি। খুবই সৌখিন। কেতাদুরস্ত। গোঁফ আছে। চোখে           সূর্য-চশমা, মুখে ভস্মীভূত সিগারেট।]

শওকৎ  :         (টাইয়ের গেরো ঠিক করতে করতে) এখানে ফাইল ছিল না           একটা Ñ

রুবি চুলের সামনের দিকটায় দ্রুত চিরুনি বুলোতে থাকে। মিনু টেবিলে রাখা একখানা খালি গ্লাস তুলে নিয়ে যেতে যেতে ফিরে আসে।

মিনু      :         (শওকৎকে) কী খুঁজছ?

              জবাব না পেয়ে মিনুর প্রস্থান।

শওকৎ  :         (মিনুর উপস্থিতি আশা করে) একটা ফাইল ছিল। গেল কোথায়। (নিজেই টেবিলের তলা থেকে উদ্ধার করে) কী কা-! (ফাইলখানা ঝেড়েমুছে নিয়ে) বাজল কটা? (হাতঘড়ি দেখে) সেরেছে।  দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শওকৎ একনজর ফাইলখানার ওপর দৃষ্টি বুলিয়ে নেয়। মিনু চা নিয়ে ঢোকে।

মিনু      :         নে আমারটা তৈরি ছিল।

রুবি      :         (চায়ে চুমুক দিয়ে) সুইট আপা। (হঠাৎ শওকতের দিকে দৃষ্টি পড়তেই) ভাইয়া, এক মিনিট Ñ

শওকৎ  :         আমার সময় নেই। তুই পরে আয়।

রুবি      :         (দ্রুত চুমুক দিতে থাকে) দু-মিনিটে রেডি হয়ে যাবো।

শওকৎ  :         পাগল (ঘড়ি দেখে)। এমনিতেই মেলা দেরি হয়ে গেল।

                   (শওকৎ যেতে উদ্যত)

রুবি      :         ওই পথেই তো যাচ্ছ। আমাকে ছেড়ে দিও। একটা জুতোর ফিতে ঢিলে হয়েছে আবিষ্কৃত হওয়ায় টাইট করতে করতে Ñ

                   শওকতের প্রস্থান।

শওকৎ  :         বললাম পারব না, তবু এক কাপ?

রুবি      :         দু-মিনিট তর সইল না। (যাত্রাপথে লক্ষত কণ্ঠস্বর নামিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে) স্বার্থপর, ছোটলোক।

মিনু      :         দোষ তোরই। মিছিমিছি বকছিস। চাকরি-বাকরি করতে গেলে অত লাট সাহেবিয়ানা চলে না। সময় করে উঠে পড়লেই পারিস। তা না, আটটা পর্যন্ত নাক ডেকে ঘুমোবেন। দেখিস একদিন চাকরিটাই হারাবি।

রুবি      :         (এবার বেশ আরাম করে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে) গেলে যাক। অত চাকরি চাকরি করে মরি না।

মিনু      :         মুখেই বলিস। না থাকলে দেখতাম। ভালোই আছিস তোরা যে যার চাকরি নিয়ে। মাসের শেষে মাইনে। কপাল শুধু আমারই ফাটল না।

রুবি      :         (টেবিলে রাখা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভুরুর ওপর পেনসিল দিয়ে দাগ কাটতে থাকে) তুই চাকরি করলে আমাদের দেখতো কে। (একটু থেমে) তারপর মায়ের এই অবস্থা।

মিনু খালি চায়ের কাপখানা তুলতে গিয়ে কার পায়ের শব্দে থমকে যায়। শহীদের প্রবেশ। চায়ের কাপ তোলা হয় না।

রুবির প্রস্থান।

মিনু      :         ওমা, তুমি যাওনি?

শহীদ    :         যাচ্ছিলাম। আদ্ধেক রাস্তা গিয়ে মনে হলো ছাতাখানা নিয়ে যাই। আকাশের যা অবস্থা। (একটু থেমে) রুবির গলা শুনছি না? যায়নি?

মিনু      :         না। ওকে পৌঁছে দাও না।

শহীদ    :         আমার তো উলটো দিকে।

মিনু      :         মোড়ের মুখে নামিয়ে দিও। বাকিটা হেঁটেই যাব।

শহীদ    :         খুব তো বললি। কতটা ঘুরতে হবে শুনি। একগাদা ভাড়া চেয়ে বসবে। তাছাড়া সময়ই বা কই। (ঘড়ি দেখে) বাব্বা দশটা বাজতে দশ মিনিট! চলি।

দেয়ালের কোণ থেকে ছাতাখানা নিয়ে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর রুবির প্রবেশ। এবার পরিপাটি সাজগোজ।

রুবি      :         আমার শাড়িটা টেনে দে-না একটু। তোর দুলজোড়া পরলাম। কেমন মানয়েছে বল তো (ঘুরে দেখায়)

মিনু      :         তা মানিয়েছে ভালোই। বলি, যাওয়া হচ্ছে কোথায় Ñ অফিসে না বিউটি কনটেস্টে?

রুবি      :         (সে কথায় কান না দিয়ে) মভ্ কালারের শাড়িটা হলে বড্ড ম্যাচ করত।

মিনু      :         ওখানা তো ধুতে দিয়েছিলাম। বোধহয় শুকোয়নি।

রুবি      :         ভালোই করেছিস। তুই না থাকলে যে কী দশা হতো আমাদের। (শেষবারের মতো আয়নার সামনে চুলের গোছা ঠিক করতে করতে) জানিস মাঝে মাঝে বড্ড হিংসে হয় তোকে। দিব্যি আছিস। চাকরির ঝঞ্ঝাট নেই।

মিনু      :         অত যদি হিংসে হয়, দে না ছেড়ে তুই-ও। মেলা ফুরসত পাবি।

                   রুবি পায়ের দিকে নজর দেয়। মনঃপুত  না হওয়ায় খাটের তলা থেকে নতুন একজোড়া স্যান্ডেল বের করে পায়ে দেয়। তারপর টেবিলের কাছে যায়।

রুবি      :         (ক্রিমের কৌটা খুলে) দেখেছ, ক্রিমের কৌটো খালি।

মিনু      :         তুইই তো মাখিস।

রুবি      :         (ক্রিমমাখা অবস্থাতেই বিছানায় বসে পড়ে। হঠাৎ বিরক্ত হয়ে ক্রিমের কৌটোখানা ছুড়ে ফেলে দেয়) সকাল-সন্ধে চব্বিশ ঘণ্টা মাখি না তাই বলে। পয়সা দিয়ে আনি কি বাড়িসুদ্ধ লোকের জন্যে? সাতভূতের কারবার। সুফিয়াই ভালো। দিব্যি হোস্টেলের কোয়ার্টারে থাকে। নিজের ঘর। নিজের জিনিসপত্র। কোনো ঝামেলা নেই। ঝঞ্ঝাট নেই।

মিনু      :         যা না তুই-ও। তোর যখন অত দুঃখ। কোয়ার্টার নিয়ে থাক তুই-ও।

রুবী      :         না রে আপা, রাগের কথা নয়। দরকার হলে তাই করতে হবে। আজকাল পৃথিবীটাই এরকম। যার যার, সে সে।

রুবির প্রস্থান

মিনু খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে গালে হাত দিয়ে। এক সময় মাটি থেকে ক্রিমের কৌটোখানা তুলে নিয়ে ওখানার ওপর হাত বুলোয়। শুঁকে দেখে, তারপর কেমন রাগ করেই যেন ওখানা শব্দ করে টেবিলের ওপর রাখে।

শহীদের প্রবেশ

মিনু      :         কী ব্যাপার? যাই যাই করে দু-দুবার ফিরে এলে।

শহীদ    :         নাঃ বড্ড দেরি হয়ে গেল। ভাবছি এ বেলাটা আর যাব না। শরীরটাও তেমন ভালো নেই।

মিনু      :         এতক্ষণ ছিলে কোথায়?

শহীদ    :         তোর আবার সব কথায় জেরা। (খানিকক্ষণ থেমে) তোদের ওই বারোয়ারি চা মুখে তোলা যায়?

মিনু      :         রেস্তোরাঁয় গিয়ে ওই পচা চা যে গিলে এসেছ।

শহীদ    :         পচা বালিস। দিব্বি ভালো চা। দাম বেশি নেয় বটে তবে খেয়ে তৃপ্তি। Ñ কী যেন বলতে এসেছি? হ্যাঁ, তোর সঙ্গে একটা কথা ছিল। রুবির কী হয়েছে। চেঁচাচ্ছিল কেন।

মিনু      :         (অভিমানের সুরে) জানি না। ওকেই জিজ্ঞেস করো। বলো, কী বলবে। যত দায় আমার। ঘরসুদ্ধ লোকের বকুনি খাই।

শহীদ    :         ঘরসুদ্ধ লোকের বকুনি খেতে যাবি কেন। সত্যি কথা বলতে দোষ তোরই। রুবিকে আশকারা দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেছিস।

মিনু      :         রুবির কথা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। কী বলবে বলো।

শহীদ    :         (চারদিক চেয়ে নিয়ে) দরজাটা বন্ধ করে দিলে হতো না।

নিজেই দরজা ভেজিয়ে দেয়।

মিনু      :         বাব্বা ! এমন কী গোপনীয় কথা?

শহীদ    :         মানে, তোকে যে টাকা পয়সাগুলো রাখতে দিই, হিসাব-টিসাব ঠিক রাখিস তো?

মিনু      :         তোমার টাকার হিসাব আমি রাখতে যাবো কোন দুঃখে।

                   (আলমারি খুলে একখানা খাম বের করে শহীদের হাতে দেয়)

                   যা আছে, এতেই রাখা। দেখে নাও।

শহীদ    :         (খামখানা হাতে ওজন করার ভঙ্গিতে) কেমন হালকা হালকা মনে হচ্ছে না।

মিনু      :         হবে না, আমি যে টাকা সরাই।

শহীদ    :         তুই আবার সব কথায় (টাকা গুনতে থাকে) রুবি আবার          দেখে-টেখেনি তো।

মিনু      :         কী হয়েছে তোমার বলো তো? বাড়িসুদ্ধ লোককে সন্দেহ। এতোই যখন দুর্ভাবনা, নিজের কাছে রাখলেই পার। আমি পারব না।

শহীদ    :         এই দেখ, তোদের একটা কথা বললেই Ñ (একটু থেমে নিয়ে) নিজের কাছেও রাখতে পারি। কথা সেটা নয়। বড় কষ্টের সঞ্চয়।

মিনু      :         সঞ্চয় কষ্টেরই হয়। কী আর নতুন কথা।

শহীদ    :         (টাকা গুনতে গুনতে) এ মাসে সংসারের খরচের টাকাটা আমার ভাগে যেন একটু বেশি পড়ল।

মিনু      :         বেশি হতে যাবে কেন। সবাই যা দিচ্ছে তুমিও তাই দিচ্ছ।            সাত-সকালে এসব তর্কে যেতে ভালো লাগে না। (কী মনে করে কাগজ-কলম নিয়ে বসে) দেখ, গেল মাসে সবসুদ্ধ খরচ হলো সাতশ ছাপ্পান্ন টাকা। ঠিক তো? (শহীদ হিসাব দেখে নিয়ে মাথা নাড়ে) তোমরা তিনজনের ছিল একশ আটানব্বই করে। আর আমি একশ আটানব্বই।

শহীদ    :         তা, তা তোর অত দেবার কী দরকার। তোর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা। আনওয়ার বেঁচে থাকত, অন্য কথা।

মিনু      :         তবু ভালো, মনে রেখেছ। সংসারটা কেমন করে চলে খোঁজ রাখ? কাগজের দাম, দুধের পয়সা, ইলেকট্রিসিটির বিল এসব দিতে হয় না। তিন-তিনটে ফিউজ্ড বাল্ব বদলাতে হলো গেল মাসে।

শহীদ    :         কে দিলো পয়সা?

মিনু      :         যেই দিক, তোমাকে তো দিতে হয়নি। তোমাদের বাবা বলতেও ভয় লাগে। যখন যা সাত-সতেরো বাড়তি খরচ বেচারি রুবীকেই পোহাতে হয়।

শহীদ    :         তা ও পারে। ওর খরচটাই বা কী। (টেবিলের কাছে গিয়ে সেন্টের শিশি তুলে নেয়) এসব মাখছে বুঝি আজকাল।

মিনু      :         মাখুক না। তোমার পয়সায় তো মাখছে না।

শহীদ    :         কাল দেখলাম তোর কাছ থেকে টাকা নিয়ে গেল।

মিনু      :         আচ্ছা মুশকিল তোমাকে নিয়ে। ওর টাকা ও নেবে না।

শহীদ    :         তা তো নেবেই। মানে বলছিলাম, আমার টাকার সঙ্গে ওর টাকা মিলিয়ে দিস না তো। (মিনু অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। শহীদ মুখ ফিরিয়ে নেয়) বললাম বলে সরহফ করার কিছু নেই। ভুল সবারই হয়। না যাই, অফিস থেকে ঘুরেই আসি একবার। (শহীদের প্রস্থান)

মিনু      :         (স্বস্তির নিশ্বাস) উফ্।

                   (ওপরতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামার শব্দ। মায়ের প্রবেশ) চোখে চশমা।

মা       :         ওরা সব গেল?

মিনু      :         সারা বাড়ি মাথায় করে তুলেছিল।

মা       :         সকালের দিকে আমি ওই ভয়েই নাবি না।

মিনু      :         কী করো বসে বসে? খবর নেব তারও উপায় নেই। সকাল হলেই কী যে হুলস্থূল কা- বেধে যায়।

মা       :         কী আর করব। তসবি পড়ি। কখনো এমনি বসে থাকি।

মিনু      :         জানো মা, কদিন ধরে দেখছি তোমার জানালার ধারে নিমগাছের ডালে একটা অদ্ভুত পাখি এসে বসে।

মা       :         তাই নাকি, দেখিনি তো। কেমন দেখতে।

মিনু      :         কী রকম, মানে কেমন বলব। আশ্চর্য। কেমন বলব। না হলুদ, না লাল, না কালো। জানো মুখের দিকটা কেমন ঘন লালচে ঢাকা। গাঢ় লাল। ডানার খানিকটা বাদামি, খানিকটা বেগুনি, আবার জানো, লেজটা ছোপ ছোপ হলদে।

মা       :         কই দেখাস তো আমাকে।

মিনু      :         কেউ এলে থাকে না। উড়ে যায় ফুড়ুত করে।

মা       :         যতসব আজগুবি কথা। (জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। কেমন স্বপ্নালু দৃষ্টি নিয়ে ধরা গলায় টেনে টেনে।)

মিনু      :         আমার কী মানে হয় জানো মা। পাখিটা আমাদের নানা শখ, নানা ইচ্ছের রং। ছোট্ট সখ, বড় সখ, বিস্মৃত-সব সখ। যা হতে পারতো, হলে ভালো হতো। কিন্তু কখনো হয় না।

মা       :         তাহলে আমার কাছে না এসে তোদের কাছে ধরনা দিলেই পারে। আমার আর এ বয়েসে কী শখ।

মিনু      :         (জড়িয়ে ধরে) তুমি আমার মা কিনা। তাই তোমার ভেতরই সে আমাদের সবাইকে দেখে।

                   [জানালা থেকে সরে আসে। টেবিলের ওপর থেকে কিছু কাগজ নিয়ে বসে।]

মা       :         কী দেখছিস।

মিনু      :         ইন্সিওরেন্সের কাগজ। সম্বল তো এই আর কটা সেভিং সার্টিফিকেট। মা তোমার সেই হেয়ালিমার্কা পাখিটা এলে জিজ্ঞস করো তো এগুলো দিয়ে আমার বাকি জীবনটা কাটবে তো?

মা       :         সব কিছুতেই তোর অযথা ভাবনা। সবারই কিছু না কিছু হয়। এতো ভেবে কী হবে। তেমন কিছু হলে তো সবাই রয়েছে।

মিনু      :         রয়েছে যে যার জন্যে। আমার জন্যে কে আছে?

মা       :         কেন, যদ্দিন বেঁচে আছিস, আমি। ওরা সবাই।

মিনু      :         আমার কারো ওপর ভরসা নেই। (একটু থেমে) তোমার কথা আলাদা। জানো, আমারও বোধহয় কিছু একটা করা দরকার।

মা       :         চাকরি? আর চাকরি করে কাজ নেই। বাড়িসুদ্ধ লোকের যা নমুনা দেখছি। (চারদিকে তাকিয়ে নিয়ে প্রসঙ্গান্তর টেনে)

                   সবাই চলে গেলে বাড়িটা খুব শান্ত হয়। ভালো লাগে। তোর সঙ্গে দুদ- কথা বলতে পারি।

মিনু      :         আমি কেন, বাকিরা কি সব বানের জলে ভেসে এলো নাকি। (খানিকক্ষণ নিরুত্তর দেখে) আসলে আমার কী মনে হয় তুমি ওদের এড়াতে চাও। কেন?

মা       :         কী জানি, ওরা যেন আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে।

মিনু      :         ছিঃ মা। তোমার নিজের ছেলেমেয়ে Ñ ওদের চেয়ে আপন কে আছে বলো।

মা       :         এ্যাদ্দিন তাই ভাবতাম।

মিনু      :         আজও তাই ভাবা উচিত

মা       :         সবাই সবাইকে নিয়ে ব্যস্ত আমার কাছে ওদের কোনো কাজ নেই।

মিনু      :         অফিসে চাকরি করে। তাই ওরা ব্যস্ত।

মা       :         তা করুক। তুই অমন করতি?

মিনু      :         আমার কথা আলাদা।

মা       :         আমার কাছে বোস্।

মিনু      :         বসেই তো আছি।

মা       :         সত্যি বলব। তোদের সবাইকেই পেটে ধরেছি। তবু আজকাল ওদের কেমন যেন ভয় হয়। ওরা যেন এক দুনিয়ার মানুষ। আমি আরেক দুনিয়ার। (একটু থেমে) তোর কথা আলাদা।

মিনু      :         কেন আমাকে ভয় করে না।

মা       :         না।

মিনু      :         আগেও এমন মনে হতো?

মা       :         কখন?

মিনু      :         যখন তোমার নিজের সংসার ছিল। বাবা মারা যাবার আগে।

মা       :         কী জানি, মনে হয় শান্তিতে ছিলাম। একে একে সবাই কেমন বদলে গেল চোখের সামনে।

মিনু      :         কমবেশি মানুষ মাত্রই বদলায় মা।

মা       :         তা ঠিক। তবু কেন জানি না ওই দিনগুলোর কথাই বেশি মনে পড়ে। মনে নেই, বিকেলে রুবি আমার চুল আঁচড়ে দিতো।

মিনু      :         আজকাল ওর সময় কই। ফিরতে ফিরতেই বেচারির সন্ধে হয়ে যায়। চুল আঁচড়ে দেবে কখন?

মা       :         না, সে কথা বলছি না। (একটু থেমে) মনে আছে চাকরি পেয়ে শওকৎ একখানা চাদর কিনে দিয়েছিল। বললাম বোকা ছেলে, ভরা জ্যৈষ্ঠ মাসে ওখানা গায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়াব নাকি। খুব বকেছিলাম।

মিনু      :         শুধু একজনের কথা বলছ কেন। কেন, শহীদ স্কলারশিপের টাকা পেয়ে সেবার তোমাকে একখানা শাড়ি কিনে দিলো না। মনে নেই? মাত্র তো সেইদিনের কথা।

মা       :         হ্যাঁ, তবু মনে হয় কতদিন। যেন এক যুগ।

                   (হাত থেকে চশমাখানা পড়ে যায়।)

মিনু      :         (তুলে নিয়ে) ভাঙল নাকি। না, বেঁচে গেছে। সেই যে চশমা কিনেছিল, তারপর তো বোধহয় আর বদলানো হয়নি?

মা       :         না। এক একবার ভাবি বদলানো দরকার। কাকেই বলি Ñ

মা       :         কাকে বলি মানে। বাড়িতে এতগুলো ধাড়ি রোজগেরে ছেলেমেয়ে থাকতে বলার লোক পাচ্ছ না। বেশ, আমিই বলব।

মা       :         না থাক। এমনিতে চলে যায়। পড়তে  গেলে একটু ঝাপসা দেখি। (থেমে গিয়ে) হ্যাঁ বলতাম, তুই চাকরি করলে।

মিনু      :         কেন, আমি বদলে যেতাম না?

মা       :         সবাই কি বদলায়? তুই অন্য ধাঁচের। (থেমে নিয়ে) সাধ করে বিয়ে দিলাম। সংসারের মুখ দেখা তোর কপালে সইল না। কী থেকে কী হয়ে গেল।

মিনু      :         (উঠে দাঁড়ায়। দেয়ালে টানানো ছবিটার কাছে যায়। ওখানা সোজা করে দেয়) থাক ওসব কথা। তোমার মেয়ে একা নয়। মুক্তিযুদ্ধে আরো অনেক মেয়ের স্বামী প্রাণ হারিয়েছে মা। (মিনু আবার এসে বসে।)

মা       :         তা ঠিক। (খানিকক্ষণ থেমে) তোর কাছে এসে শান্তি। ভরসা। মা মেয়ে যেন কতকালের সঙ্গী।

মিনু      :         (করুণ হাসি হেসে) এক জায়গায় যে আমাদের ভীষণ মিল। তুমি একা। একা আমিও, তাই বোধহয় আমরা এতো একাত্ম।

মা       :         মিনু Ñ

মিনু      :         (হঠাৎ চমক ভাঙার মতো) কী মা।

মা       :         না। ডেকে দেখলাম, কেমন লাগে।

মিনু      :         (ওঠার উপক্রম) যতসব ছেলেমানুষি। চলো ওপরে। ওষুধটা খাইয়ে দিই।

                   অফিস প্রয়োজনানুযায়ী সাজানো। যেমন দেয়ালঘড়ি, ক্যালেন্ডার আলমারি, র‌্যাক ও কিছু চেয়ার। মাঝখানে বড়মতো ঘড়ি। দেয়ালে ক্যালেন্ডার। প্রয়োজনানুযায়ী টেবিল-চেয়ার ইত্যাদি। পাশাপাশি তিনটি টেবিল। একেবারে বাঁ-দিকেরটা ম্যানেজারের। দু-ধারে পার্টিশন, সামনের দিক খোলা। স্বভাবতই তাঁর টেবিল সুসজ্জিত। ডায়েরি, পেপার ওয়েট, ফাইল-ট্রে, টেলিফোন, কলিং বেল আছে। আগের এবং ডান ধারের টেবিলে টাইপরাইটার, কিছু কাগজপত্র এবং ফাইল। মাঝের টেবিলে দুজন মহিলা কাজ করেন। আর ডান দিকেরটায় প্রবীণ এক ভদ্রলোক টাইপরত। খুবই শ্লথগতি। কিছু অভ্যাসের দায়ে, কিছুটা বয়েসের ভারে। চোখে পুরু চশমা।

                   ম্যানেজার চল্লিশোর্ধ্ব। মোটা ফ্রেমের চশমা। কেতাদুরস্ত পোশাক। রুবীর প্রবেশ।

                   (টেলিভিশনে পাশাপাশি তিনটি টেবিল না দেখিয়ে ম্যানেজারের ঘরটি সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখানো যেতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রবেশপথে সুইং ডোর থাকবে।)

রুবি      :         ডেকে পাঠিয়েছিলেন স্যার?

ম্যানেজার         :         ডেকে পাঠাইনি ঠিক। খোঁজ করছিলাম। (ঘড়ি দেখে) এই এলেন নাকি।

রুবি      :         (অস্বস্তি বোধ করে) বেরুতে একটু দেরি হয়ে গেল। (ম্যানেজারের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে) কিছু পাওয়া গেল না রাস্তায়। আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম। বাসেও যা ভিড় Ñ

ম্যানেজার         :         এসব অসুবিধে নতুন নয়। তার মধ্যেই সময় করে নিতে হয়।  (থেমে গিয়ে) কী জন্য আপনাকে মনে করেছিলাম Ñ ( ট্রে থেকে কিছু কাগজপত্র তুলে নিয়ে) ও হ্যাঁ, দেখুন কিছু বিল ছিল Ñ

রুবি      :         কিসের বিল স্যার?

ম্যানেজার         :         গত মাসের স্টেটমেন্ট দেখেছেন Ñ দেখেননি? (কাগজ তুলে নিয়ে) বাজারে আমাদের দেড়লাখ বাকি। গেল তিন মাস কোনো ইনিশিয়েটিভ নেওয়া হয়নি। নইলে এ অবস্থা হলো কেন।

রুবি      :         ওসব তো বিল কালেক্টর দেখে থাকেন। ওঁকে স্যার দেব?

ম্যানেজার         :         না। কখন হয়েছে? ফাইলে কোথায়? লাটে উঠবে সব।

রুবি      :         বিল কালেক্টর একটু নজর দিলে Ñ

ম্যানেজার         :         কে কি করলে পারেন সেটা আমার ওপর ছেড়ে দিলে ভালো হয় না? (সুর পালটে) সকাল সকাল আপনারাই মেজাজ খারাপ করান। মিস রুবী সেকেলে অ্যাপ্রোচ দিয়ে আজকাল চলে না। ম্যানেজমেন্টের কনসেপ্ট বদলাচ্ছে। (ফোন বেজে ওঠে। তুলে নিয়ে) কে, কোত্থেকে Ñ না। বলো এখন আমি মিটিংয়ে। পরে। (ফোন রেখে দিয়ে) হ্যাঁ যা বলছিলাম। এসব কাজে আপনাদের মতো চাই ইয়ং ব্লাড। তাছাড়া আপনাদের মতো… কেটেও মহিলারা…

                   (কফি হাতে বেয়ারার প্রবেশ। কফির সরঞ্জাম টেবিলে নামিয়ে রাখে।)

                   দুধ দেব?

রুবি      :         (ইতস্তত করে) কফি Ñ আমি তো Ñ

ম্যানেজার         :         খান না, এই তো? নিন। বিষ দিচ্ছি না। এটা খেয়ে চটপট চলে যান মি. তালুকদারের ওখানে। বলাই আছে। একটু বুঝিয়ে বলবেন এই আর কি। আমার মনে হয় একটু পারস্যু করলে Ñ

রুবি      :         কিন্তু স্যার, আমি এধরনের কাজ কখনো করিনি।

ম্যানেজার         :         করেননি, এখন থেকে করবেন। মায়ের পেট থেকে পড়ে কেউ কিছু করে না। (একটু থেমে)

রুবি      :         এসব কাজের জন্য অন্য কাউকে পাঠালে হয় না?

ম্যানেজার         :         হবে না কেন। একশবার হয়। কিন্তু তাহলে খামোকা এই মাইনে দিয়ে আপনাদের পোষার দরকার কী বলুন। দেশে কি বেকার যুবকের অভাব ছিল?

রুবি      :         আপনি কী বলতে চান Ñ

ম্যানেজার         :         ম্যাডাম আমি কিচ্ছু বলতে চাই না। সচরাচর বলিও না। যা বলার ছিল শুনলেন। আপনার কিছু বলার থাকলে বলতে পারেন। কথা না বাড়িয়ে বিলগুলো নিয়ে বেরিয়ে পড়–ন। অফিসের গাড়িকে বলে দেওয়া আছে।

                   (রুবি চলে যাওয়ার উদ্যোগ করে)

শুনুন ইচ্ছে করলে বিকেলটা ফ্রি করে নিতে পারেন। শুধু কি হলো ফোনে আমাকে জানিয়ে দিলেই চলবে। বেস্ট অফ লাক।

                   (মাথা নিচু করে বেরিয়ে পড়ে। এবার মাঝের টেবিলে এসে বসে। তারপর ডানদিকের টেবিলে যায়)

বিল ক্লার্ক         :         বসুন। আমাকে দিয়ে হলো না। এবার বোধহয় আপনাকে পাঠাচ্ছে।

রুবি      :         কোথায়?

বিল ক্লার্ক         :         কোথায় আবার, বিল তুলতে।

রুবি      :         তাই তো বললেন। কিন্তু কেন বুঝলাম না। আপনারাই তো ছিলেন।

বিল ক্লার্ক         :         ছিলাম। অনেকদিন ধরে রয়েছি। এখন আমাদের দিয়ে হচ্ছে না। ক্লায়েন্ট বদলাচ্ছে। (ড্রয়ার থেকে পানের কৌটো বের করে এক খিলি মুখে পোরে) তাদের রুচি বদলাচ্ছে। তাই আপনাদের বলব।

রুবি      :         তার মানে?

বিল ক্লার্ক         :         তার মানে পার্টি আমাদের দেখলে খুশি হচ্ছে না। আর সত্যি কথা বলতে, তালুকদারের কাছে যাচ্ছেন তো? যান। মেয়েদের দেখলে নাকি এমনিতেই একটু উথলে ওঠেন। যা কানে আসে তাই বলছি। কিছু আবার মাইন্ড করবেন না।

রুবি      :         মানে আমি হেসে হেসে কথা বলব, মন টলাব। স্যরি, আমি ওকাজের নই। (বিলগুলো রেখে দেয়)

বিল ক্লার্ক         :         কী জানি, ম্যানেজার হয়তো ভেবেছেন আপনি ফ্লোরেন্স নাইটএঙ্গেলও নন। থাকগে আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবরে কী কাজ। আমি একটু বেরুচ্ছি। তালুকদার ডেকে বসলে বলবেন ব্যাংকে এই ফাঁকে র‌্যাশনটা তুলতে না পারলে, বুঝলেন না ছেলেমেয়ের সংসার। (রুবি নিজের টেবিলে ফিরে যেতে উদ্যত) বিলগুলো বাঁধে, এ সঙ্গে স্ট্যাটমেন্ট, ভাউচার।

রুবি      :         (এক মুহূর্তে কী ভেবে ওগুলো তুলে নেয়। বিল কালেক্টারের প্রস্থান)

রীতা     :         তুমি বাইরে চললে?

রুবি      :         হ্যাঁ।

রীতা     :         আমাকে ভাই ছেড়ে দিও একটু রাস্তায়।

রুবি      :         কেন অফিস করবে না?

রীতা     :         আর অফিস। আমিও বিল কালেশনে বেরুচ্ছি। তা আমাকে ভাই তোমার মতো অফিসের গাড়ি দেয় না।

                   (কেমন অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে রুবির দিকে তাকায়। নিজের কাগজপত্র গুছিয়ে নেয়)

রুবি      :         আমি একা নই দেখছি।

রীতা     :         চুনোপুঁটিদের জন্য আমি। রাঘব বোয়ালদের জন্যে Ñ তাছাড়া কী… বোধহয় ভরসা নেই।

রুবি      :         কী সব ফাজলামো হচ্ছে।

রীতা     :         অনেক হয়েছে। আমার মিছিমিছি নাক গলানো কেন। তবে তোমাকে একটা কথা বলি, কাউকে বলো না (চারদিক তাকিয়ে দেখে) আমি না এই করে ফিল্মে একটা চান্স নেব ভাই। সে মতলবেই আছি। বেশিদিন থাকব না।

রুবি      :         তাহলে সব কাজটা তোমাকে দিলেই পারতো। একটা কথা বলি, তোমাকে মানিয়েছে কিন্তু বড্ড। সত্যি একবার গিয়ে দাঁড়ালে Ñ

রুবি      :         ফের? ভালো হবে না বলছি। বরং তোমার কথাই শোনা যাক। ফিল্মে চান্স পেলে কেমন করে Ñ

রীতা     :         ওমা পেলাম কই। বলেছে দেবে। আমি কি জানতাম। প্রথম যেবার গেলাম বলল, আজ আসবেন, কাল আসবেন Ñ

রুবি      :         তারপর?

রীতা     :         তারপর আর কী। মানে আমি গেলেই দেখ কেমন, একটু ইয়ে করে।

রুবি      :         ইয়ে মানে?

রীতা     :         মানে, এই আর কী। কী বলছিলাম যেন। হ্যাঁ, তারপর তো সোজাসুজি বলেই ফেলল একদিন, এসব করে কী করবেন। চলে আসুন আমার কনসার্নে। আসল কাজ তো আমাদের ফিল্ম লাইনে।

রুবি      :         ওরা বুঝি ফিল্ম বানায়?

রীতা     :         না, বানায়নি। বানাবে বলছে। আর প্রথমে তো হিরোইনের চান্স দিতে পারে না। একটা সাইড রোল দেবে বলেছে। (একটু থেমে) তবে আমি বলে পারি। তুমি হলে পারতে না।

রুবি      :         কী পারতাম না?

রীতা     :         যতসব ঝাক্কি-ঝামেলা।

রুবি      :         যাও কেন, জেনেশুনে। না গেলেই পার।

রীতা     :         কেন যাই, আমার অবস্থা হলে বুঝতে ঘাড়ের ওপর তিন-তিনটে বোন, ছোট দুভাই।

রুবি      :         (একটু হাসল) ঘাড়ের ওপর তিন-তিনটে বোন, ছোট দুভাই Ñ ভালোই শোনায়।

রীতা     :         হাসলে যে। বিশ্বাস হচ্ছে না। জানি। বিশ্বাস হবে না।

রুবি      :         বিশ্বাস হবে না। নাটকের চমৎকার সংলাপের মতো। শুনে নিজেরই কেমন চোখ ছল ছল করে আসছিল।

রীতা     :         তবে? অস্বীকার করছি না। আসল কথা।

রুবি      :         ফিউচার, অ্যাম্বিশন Ñ

রীতা     :         কার?

রুবি      :         তোমার, আমার সবার। (স্বর চড়িয়ে) সোজাসুজি বলো না কেন, বড় হতে চাও, উঠতে চাও, ডিঙ্গিয়ে যেতে চাও। (বিল ক্লার্কের প্রবেশ। টাইপরাইটারে মন দেয়।)

রীতা     :         তুমি চাও না।    

রুবী      :         চাই। তার জন্যে কৈফিয়ৎ কেন।

রীতা     :         আমি পাঁচ বছর ধরে চেষ্টা করেছি Ñ

রুবি      :         কিছু হচ্ছে না, এই তো। (টাইপরত বিল ক্লার্ককে দেখিয়ে) কত বয়েস আন্দাজ করতে পারো। পঞ্চাশ, পঞ্চান্ন, পঁয়ষট্টি যা  কিছু হতে পারে। সেই তখন থেকে এসেছেন স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণের ওপরে হাত মকশ করে যাচ্ছেন। হয়েছে কিছু। (হাত নেড়ে) কিস্সুই হয়নি। উলটো কথায় কথায় ছাটাইয়ের হুমকি।

রীতা     :         জানি, তুমি আমার কাজ সমর্থন করো না।

রুবি      :         (ম্লান হেসে) নিজেরটাই সমর্থন করি না, আর তোমারটা।

রীতা     :         ম্যানেজারের সঙ্গে খুব হয়েছে বোধহয় একচোট।

রুবি      :         কিছু না। উলটো এক কাপ কফি খেয়ে মুখ বুজে নিজের নির্বুদ্ধিতার গ্লানিতে মাথা হেঁট করে বেরিয়ে এলাম। একমুহূর্ত দ্বিধা ছিল। সঙ্কোচ ছিল। কখন হালকা মেঘের মতো তা সরে গেল। তাই বলছিলাম, এ দুনিয়ায় কোনো কিছুর জন্য অ্যাপলজির দরকার নেই। কেউ মূল্য দেয় না।

রীতা     :         অতশত ভাবতে পারি না তোমার মতো।

রুবি      :         না ভাবাই ভালো। ভাবলেই আপদ, অশান্তি। মনে মনে যাই ভাব, মুখে ভালো ভলো কথা বলে যাও। আসল কথা অ্যাম্বিশন। অ্যাম্বিশনের স্টিমরোলারের তলায় সব গুঁড়িয়ে যায় রীতা। তুমি আমি কোনো ছার।

রীতা     :         বুঝেছি তোমার মন ভালো নেই।

রুবি      :         (গা ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায় ভালো নেই মানে। দিব্যি ভালো। দেখছ না কেমন এক নিশ্বাসে গড়গড় করে বলে ফেললাম। আসলে সুযোগ পেলাম, দুটো বড় কথা শুনিয়ে দিলাম। থাক ওসব। তোমার সেই ফিল্মওয়ালার কথা বলো। দিয়েছে কিছু?

রীতা     :         তবে কি আর এমনি যাই। সেদিন একশ টাকা দিয়ে বলল, এই যে আপনার অ্যাডভান্স।

গাড়ির হর্ন শোনা যায়।

রুবি      :         ভালো, ছবি হওয়ার আগেই অ্যাডভান্স। গাড়ি এসে গেল বোধহয়। কোথায় যাবে না বলেছিলে চলো।

রীতা     :         চলো।

মিনুদের ঘর। একই দৃশ্য।

মিনু বিছানার ওপর উপুড় হয়ে খবরের কাগজ পড়ছে। রুবির প্রবেশ।

মিনু      :         (কাগজ গুছিয়ে রেখে) এত তাড়াতাড়ি যে। অপিস ছুটি?

রুবি      :         ঠিক ছুটি নয়। ছুটি পেয়ে গেলাম বলতে পারিস। একটা বড়মতো কাজ করে দিলাম কিনা।

মিনু      :         কী কাজ শুনি।

রুবি      :         তেমন কিছু নয়। অনেকদিন ধরে বড় একটা বিল ঝুলছিল। আদায় করে দিলাম। লোকটা বড় ডিফিকাল্ট। কিন্তু দেখলাম এক কথাতেই মাত।

মিনু      :         মানে প্রথম দর্শনেই ঘায়েল, এই তো? তা কী করে আদায় করলি, এ্যাদ্দিন যখন কেউ পারল না।

রুবি      :         (নাটকীয় ভঙ্গিতে) কিছু না। গেলাম টেলিফোন করে মি. তালুকদারের অফিসে। সেখানে বসেই সেরে ফেললাম দুপুরের লাঞ্চ। তারপর, তারপর শুনি Ñ

মিনু      :         হ্যাঁ বল শুনছি।

রুবি      :         তারপর? তারপর ওর গাড়িতে চড়ে মস্তবড় এক হোটেলে। লিফ্টে উঠে সোজা ওর কামরায় (দুষ্টুমির ভঙ্গিতে) তারপর একটু মিষ্টি হাসি হেসে বললাম, স্যার আমাদের বিলটা।

মিনু      :         (অস্বস্তি বোধ করে। বিছানা থেকে উঠে পড়ে মাথায় খোঁপা ঠিক করতে করতে) আবার হোটেল, হোটেল কেন?

রুবি      :         বারে, বলল যে ওর চেক বই হোটেলের কামরায়।

মিনু      :         এসব চাকরি করায় নাকি তোকে দিয়ে আজকাল।

রুবি      :         খারাপ কী দেখলি। দরকার হলে আবার যেতে হবে। (কাগজখানা তুলে নিয়ে) তাই বলে আজ কোথাও যাবো না।

                   (কাগজে চোখ বুলিয়ে) লেবাননে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, চাপাঘাটায় ট্রেন লাইনচ্যুত Ñ এই, এই দেখ বিশ্বসুন্দরী মিস ব্রাজিল, কেমন থেবড়ো মুখ না রে Ñ কী যে ওদের রুচি, বুঝি না বাপু। (মিনু চোখ বুলিয়ে নেয়। রুবি কাগজ দলা পাকিয়ে রেখে দেয়।) বুঝলি, আজ কোথাও যাব না। সারাক্ষণ তোর সঙ্গে বসে গপ্প করবো।

মিনু      :         (অবিশ্বাসের সুরে) আমার সঙ্গে। আমি গপ্প করার মানুষ নাকি। কী করবি মিছিমিছি। আমি কি কাজের কথা জানি। না বলতে পারি। তার চেয়ে হাতে যখন সময় ছিল, একটা সিনেমা দেখে এলেই পারতি।

রুবি      :         র্দু । এই ভরা রোদে সিনেমায় যেতে বয়ে গেছে। তোর সঙ্গে তাস পেটাব। আড্ডা দেব।

মিনু      :         (আবার কেমন অবিশ্বাসের সুরে) সত্যি? (রুবির পেছনে দাঁড়িয়ে ওর চুলের বিনুনি খুলতে থাকে) কথা বলারও লোক পাই না জানিস। যা এই দুপুরটাই একটু সময়। (একটু থেমে গিয়ে) আমার আজকাল কিছু ঠিক থাকে না। যখন-তখন তোকে বকুনি দিই।

রুবি      :         কই দিস। দিলে আমার এই দশা। উলটো সকালবেলা আমিই তো যাচ্ছেতাই ব্যবহার করলাম।

মিনু      :         ওসব আমার মনে থাকে না।

রুবি      :         ভাগ্যিস থাকে না। (মিনুর হাতখানা তুলে নিয়ে নিজের গালে ঠেকিয়ে) সেজন্যই তুই এতো ভালো।

রুবি পেছন করে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়

রুবি      :         (অন্যমনষ্কভাবে) এক এক সময় ভাবি, চাকরি করে কী হলো। আগেই বেশ ছিলাম। দুবোন বসে ক্যারম খেলতাম।

মিনু      :         (ওর পাশে এসে দাঁড়ায়) দুপুরে চুরি করে আচার খেতাম।

রুবি      :         অনুরোধের আসর শুনতাম। কোনোদিন ম্যাটিনি দেখতে যেতাম।

মিনু      :         হ্যাঁ রে রুবি, বাজিতপুরের মেলার কথা মনে আছে? তুই হারিয়ে গিয়েছিলি। সে কী খোঁজ খোঁজ। শেষটায় দেখা গেল তুই কিনা দিব্যি সাপের খেলা দেখছিস।

রুবি      :         আজকাল ওরকম মেলা হয় না?

মিনু      :         হয় নিশ্চয়ই।

রুবি      :         জানিস মনটা সেরকমই আছে। হয়ে উঠে না।

মিনু      :         জানি, হয়ে ওঠে না।

রুবি      :         হলে ভালো হতো। জানিস আপা, বাবা বেঁচে থাকতে সংসারে ভাবনা-চিন্তা ছিল না। কেমন করে কী হতো জানতাম না। দরকারও হতো না। আর এখন?

মিনু      :         থাক, অত ভাবতে হবে না তোমাকে। দুদিন পর বিয়ে-থা করে Ñ

রুবি      :         বিয়ে। (কেমন ম্লান হেসে) কী জানি কপালে কী আছে। কে জানে বরই জুটবে কিনা শেষটায়। আর ভরসাই কী, বিয়ে করেও সে লোক যদি চাকরি করতে পাঠায়।

মিনু      :         পাঠাক না Ñ

রুবি      :         আর ওপরওয়ালা বিলের ধরনা দিতে ঠেলে পাঠাক আজ এ হোটেল, কাল ও হোটেলে। তখন, তোমাদের খুব মুখ থাকবে, না? (একটু থেমে নিয়ে) আর বিয়ে তো তোরও হয়েছিল। কী হলো? আজ আনওয়ার ভাই বেঁচে থাকলে তোর এই দশা!

মিনু      :         ওসব কথা থাক রুবি। ওকে আর মিছিমিছি এসবের মধ্যে টেনে এনে লাভ নেই।

একই দৃশ্য।

শওকৎ  :         কিন্তু আমার কাছে টাকা কই?

মিনু      :         সামান্য কটা টাকাও হবে না?

শওকৎ  :         আহা, হবে না কেন। নিজের খচ্চাটা আছে না। যাতায়াত, টুকটাক কেনাকাটা নেই? তাই বলে সংসারের অবহেলা করছি, এ কথা কেউ বলতে পারবে না। সংসারের সবকিছুই করছি, যখন যা দরকার।

মিনু      :         এতো বছর হলো চশমা বদলানো হয়নি। মা দুঃখ করছিলেন।

শওকৎ  :         দুঃখ করবার কী আছে। যখন যেমন দরকার দিচ্ছি না? দিচ্ছিই তো। অন্যরাও দিক। সবাই হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে কেন। শহীদ Ñ শহীদ দেয় না কেন। ওর টাকা-পয়সা তো বোধহয় তোর কাছেই থাকে। আর হতচ্ছাড়ি রুবি, কী করে এত পয়সা দিয়ে। 

মিনু      :         বললে দেবে হয়তো। ওই তো সেদিন নিয়ে গেল মাকে ডাক্তারের কাছে। নতুন চশমা নিতে বলল ডাক্তার। ভাবলাম, বাড়ির বড়ভাই হিসেবে তোমার একটা দায়িত্ব আছে।

শওকৎ  :         আছে বইকি। সবাই দিক। আমিও দেব। যখন পেরেছি দিইনি। খুব তো ওকালতি করছিস Ñ (কী মনে হওয়ায়) আর আমি বলি এ বয়েসে মার পূর্ণ বিশ্রাম দরকার। পড়ানোর দরকারটাই কী।

মিনু      :         এমনিতেও ভালো দেখতে পান না।

শওকৎ  :         সে আলাদা কথা। আমি ভালোর জন্যই বললাম। যা ঠিক হয় জানাস। চা দিতে পারিস এক কাপ চটপট। ভাগ্যিস আজ একটু তাড়াতাড়ি এসে পড়েছি। (ঘড়ি দেখে) তা নইলে দশভূতের পাল্লায় পড়লে হয়তো চা খাওয়াটাই হবে না। দে দে, চটপট। ওরা এসে গেল বলে।  (মিনুর প্রস্থান। রুবির প্রবেশ। হাতে কিছু প্যাকেট)

                   (রুবিকে) তোকে নিউ মার্কেটে দেখলাম মনে হলো। গয়নার দোকানে।

রুবি      :         আমাকে?

শওকৎ  :         হ্যাঁ।

রুবি      :         অন্য কেউ হবে।

হাতের দুটো প্যাকেট নামিয়ে রাখে বাকিগুলো সঙ্গে থাকে।

শওকৎ  :         নিজের চোখে দেখলাম। খুব টাকা ওড়াচ্ছিস।

রুবি      :         তা যদি ওড়াই। তোমার কী। তোমার মতো একলা চোরের মতো সিনেমাহলে ঢুকি না তাই বলে, বুঝেছ?

শওকৎ  :         (কেমন বিব্রত) তা, তা তুই জানলি কী করে?

রুবি      :         আমি সব রিপোর্ট পাই।

শওকৎ  :         (প্রসঙ্গান্তর টেনে) খুবতো টোঁ-টোঁ করে ঘুরে বেড়াস। আজে-বাজে পয়সা নষ্ট না করে বুঝতাম মায়ের চশমাখানা Ñ

রুবি      :         (ব্যাগ থেকে বার করে) আজ্ঞে মশাই, ওটা তোমার বলার আগেই কেনা হয়েছে।

মিনু চা নিয়ে ঢোকে। শওকতের সামনে রাখে।

মিনু      :         তুই নিয়ে এলি?

রুবি      :         ভাবলাম, নিয়েই যাই। প্রেসক্রিপশন সঙ্গে ছিল। তাছাড়া তোমরা কবে দয়া করে টাকাটা চাঁদা করে তুলে দেবে তার অপেক্ষায় না থেকে Ñ

শওকৎ  :         (কিছুটা অপ্রস্তুত) নিয়ে এসেছিস, বেশ করেছিস। মানে, তেমন মনে করলে আমার শেয়ারটা দিয়ে দিতে পারি।

মিনু      :         মিছিমিছি কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। চা ঠান্ডা হচ্ছে।

রুবি      :         ওই প্যাকেটটা খোল না আপা। কী আছে বার করো।

মিনু প্যাকেট খুলতে থাকে।

শওকৎ  :         (ঘড়ি বাড়িয়ে) কেক মনে হচ্ছে না?

রুবি      :         মনে হওয়ার কী আছে। একেবরে খাঁটি বিশুদ্ধ কেক।

শওকৎ  :         ফ্রেশ মনে হচ্ছে।

রুবি      :         ফ্রেশ।

শওকৎ  :         চায়ের সঙ্গে ভালোই যায়। রোজই আনব আনব ভাবি। মনে থাকে না।

রুবি      :         খাবে, খাও না। অত বৃত্তান্ত শুনিয়ে লাভ কী।

মিনু প্লেট নিয়ে এসে এগিয়ে দেয়

শওকৎ  :         না না। তার জন্যে নয়। তা যা বলছিলাম, কতো হলো?

রুবি ও মিনু প্লেট হাতে নেয়।

রুবি      :         কোনটা কত হলো?

শওকৎ  :         (কেক মুখে পুরে) মানে চশমাজোড়া।

রুবি      :         আশি টাকা। আরো বেশি হতো। ফ্রেমখানা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম।

শওকৎ  :         আশি টাকা। চেষ্টা করলে বোধহয় কমেও পাওয়া যেত। থাকগে সেরকম মনে করলে Ñ আফটার অল একজনের ওপর প্রেশার           দিয়ে Ñ

মিনু      :         (শব্দ করে প্লেটখানা রেখে দিয়ে) দাম, দাম, টাকা টাকা করো না তো। কান ঝালাপালা হয়ে গেল। এ জীবন কি শুধু কিছু পয়সার সমষ্টি। প্রেম, ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা বলে কিছু নেই? কী হয়ে যাচ্ছ তোমরা।

শওকৎ  :         (চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে) খুব তো লেকচার শেখাচ্ছিস। কালেভদ্রে রুবির মতো এরকম দরাজ দিল আমরাও হতে পারি। বুঝেছিস। দেখা যাবে, ভবিষ্যৎ পড়ে আছে।

                   (সিগ্রেট ধরাতে ধরাতে উঠে দাঁড়ায়)

রুবি      :         দেখা যাবে। আমিও দেখব।

                   (শওকতের প্রস্থান )

                   মিনু চায়ের কাপ ও প্লেট তুলে নিয়ে ভেতরে যায়। তারপর ফিরে আসে।

মিনু      :         এবার সত্যি বল তো, গিয়েছিলি গয়নার দোকানে?

রুবি      :         হুঁ (মাথা দোলালো)

মিনু      :         কী আনলি দেখি (নিজের হাতের ব্যাগখানা চেপে ধরে রুবি)

                   মিনুদের ঘর। (একটা সামান্য পরিবর্তন লক্ষ করা যাবে। আনওয়ারের বাঁধানো ছবির ওপর কোনো চটুল চিত্রতারকার ক্যালেন্ডার ঝুলছে।

শওকৎ  :         তুই খুব ব্যস্ত?

মিনু      :         না তো।

শহীদ    :         তোর সঙ্গে একটা পরামর্শ ছিল। রুবি কই, দেখছি না যে।

মিনু      :         কী জানি ফেরেনি বোধহয়। আজকাল অফিসে কাজের চাপ। রোজই দেরি হচ্ছে।

শহীদ    :         কাজ না ছাই। যাকগে ভালোই হলো। কথাটা তোকেই বলার।

শওকৎ  :         কদিন ধরেই ভাবছি বলব বলব।

মিনু      :         (শহীদকে) তোমার টাকার হিসাবের কোনো গোলমাল হয়েছে?

শহীদ    :         না না। হিসাবের গোলমাল হতে যাবে কেন?

মিনু      :         তাহলে? বুঝেছি চাকরি নিয়ে ফ্যাসাদ বাধিয়েছ বোধহয়। জানতাম। সবসময়ই বলি, অফিসটা সময় করে যেও, বলিনি?

শওকৎ  :         (শহীদের সঙ্গে চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে) তা বলেছিস। না সেরকম কিছু হয়নি। মানে কথাটা হচ্ছে, (শহীদকে) তুই বল না।

শহীদ    :         না তুমিই বলো।

শওকৎ  :         রোজই বলব ভাবি, সময় হয়ে ওঠে না। হবেই কী করে, এক বাড়িতে থেকেও কারো সঙ্গে কারো দেখা নেই।

শহীদ    :         সত্যিই তো।

শওকৎ  :         কিন্তু উপায় কী। যে যার পেটের ধান্ধায়। কেউ কি আর ইচ্ছে করে (শহীদকে) Ñ দেশলাই আছে তোর কাছে Ñ (শহীদ দেশলাই দেয়) ইচ্ছে করে করে? করে না। হয়ে যায়। সে কি আর আগের দিন আছে? আজকাল স্বামীর সঙ্গেই স্ত্রীর দেখা হয় না। মায়ের সঙ্গে আমাদের দেখা হয় না।

শহীদ    :         এই তো, আমার বসের সঙ্গে আমার পনেরো দিন দেখা নেই।

মিনু      :         মায়ের সঙ্গে দেখা না হওয়া আর তোমার বসের সঙ্গে দেখা না হওয়া এক কথা নয়।

শওকৎ  :         (শহীদকে) তুই থাম। আলোচনাটা সিরিয়াস। মানে, এভাবে চাকরি করে যা পাই তাতে ভদ্দর লোকের সংসার চলে!

মিনু      :         তাই বুঝি, মাথায় নতুন কোনো প্ল্যান এসেছে। আমি তখুনি আঁচ করেছি। কদিন ধরেই দেখছি, সকাল-সন্ধে কার সঙ্গে ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছ। ব্যাপারখানা কী বলো তো।

শওকৎ  :         হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছিস। একটু ব্যস্তই ছিলাম কদিন।

শহীদ    :         তাহলে খুলেই বলি। আমরা ব্যবসা করব ঠিক করেছি।

মিনু      :         (হেসে উঠে) ব্যবসা, তোমরা। ঠকিয়ে ভূত করে দেবে না?

শহীদ    :         যা যা, কথায় কথায় ঠাট্টা ভালো লাগে না।

মিনু      :         ও বুঝেছি। সেজন্যেই বোধহয় তাড়াতাড়ি টাকাটা চেয়ে নিয়ে গেলে। তা ওই টাকায় কী হবে। কোনো ফিনান্সিয়ার পেয়েছ?

শওকৎ  :         বলতে পারিস ওসব মোটামুটি ফাইনাল।

মিনু      :         তা তোমাদের কত দিতে হলো শুনি।

শওকৎ  :         তা শুনে আর কী করবি। কিন্তু তাতেও যে কুলোচ্ছে না। অন্তত আরো পাঁচ হাজার টাকা দরকার।

মিনু      :         পাঁচ হাজার। ঘরে ফুটো পয়সার সাক্ষাৎ নেই । দেখ কপাল ঠুকে।

                   (মিনু চলে যাবার উপক্রম করে)

শওকৎ  :         আরে চললি যে। তোর সঙ্গে এ নিয়ে পরামর্শ ছিল। (মিনু ফিরে আসে)

মিনু      :         বলো।

শহীদ    :         মানে এতদূর এসে যদি মাত্র পাঁচ হাজার টাকার জন্যে ঠেকে যাই। একটা ইয়ে কথা ভাবছিলাম।

মিনু      :         কী?

শওকৎ  :         বাড়িভাড়ার আগাম টাকাটা যদি হাতে আসতো।

মিনু      :         বুদ্ধির বহর দেখে বাঁচি না। বাড়িওয়ালা টাকা দিতে যাবে কোন দুঃখে। বারো মাসের আগাম দিয়ে তবেই তো ভাড়া নেওয়া হলো।

শওকৎ  :         তা ঠিক। তবে বলেকয়ে Ñ

মিনু      :         দেবে না তোমার শ্বশুরবাড়ির লোক। এক মাসের টাকা কম পড়েছিল তাতেই কত টালবাহানা। শেষটায় গয়না বন্ধক রেখে ছ হাজার টাকা পুরো করতে হলো, মনে নেই? হ্যাঁ বাড়ি ছেড়ে দিলে এক কথা ছিল।

শহীদ    :         যদি ছেড়ে দিই Ñ

মিনু      :         (পুনরাবৃত্তি করে) যদি ছেড়ে দিই Ñ ছেড়ে দিয়ে থাকব কোথায়?

শওকৎ  :         তা আমরা ব্যাটাচ্ছেলে, আমাদের একটা ব্যবস্থা হবেই।

মিনু      :         আমরা যাব কোনো চুলোয়?

শওকৎ  :         দেশের বাড়িটা তো পড়েই আছে। আপাতত সেখানে থাকতে পারিস মাকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে।

মিনু      :         বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা হয়েছে নাকি?

শওকৎ  :         মানে এতে কথা বলাবলির আর কী আছে। বাড়ি ছেড়ে দিতে চাইলে টাকাটা ফিরিয়ে দিতে আপত্তি করবে কেন।

মিনু      :         তাই বলো। পানি তাহলে অনেকদূর গড়িয়েছে। রীতিমতো কথাবার্তাও হয়েছে দেখছি। তা কবে ছেড়ে দিতে হচ্ছে বাড়ি?

শওকৎ  :         না, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। দিন পনেরো সময় তো পাওয়া যাবেই।

মিনু      :         তাই বলো। সব ঠিকঠাক। আসলে আমাদের নোটিশ দিতে এসেছ।

শহীদ    :         দেখ কথায় কথায় তোর Ñ

শওকৎ  :         তুই থাম।

মিনু      :         আমাদের কথা বুঝলাম। রুবির কী হবে?

শহীদ    :         সত্যি কথা বললে, ওর জন্যে আমার মাথাব্যথা নেই। ও আমাদের থোড়াই তোয়াক্কা করে যে আমরা করব। মজা বুঝুক।

শওকৎ  :         আহ্, তুই থাম না। না-কথা সেটা নয়। মবিন সাহেব মানে আমাদের পার্টনার নিজেই ওয়াই এম সিতে একটা ব্যবস্থা করে দেবেন বলেছেন। মেয়েদের জন্যে সুন্দর ব্যবস্থা। রুবির সেদিক দিয়ে কোনো অসুবিধে নেই।

                   (সবার অলক্ষে মা এসে দাঁড়ায় দরজায়)

মিনু      :         তা তো বুঝলাম। বাড়ির জমা টাকাটা কিন্তু মায়ের নামে। তাকে একবার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল না।

শহীদ    :         সে কথা কি অস্বীকার করেছি?

মিনু      :         বলা যায় না, যা যুগ। ওই দাবিটাও যদি হাইজ্যাক করে নিয়ে যাও, কী বলতে পারি।

শহীদ    :         তোর যতসব আজগুবি ভাবনা।

শওকৎ  :         আপাতত, মাস দুই। তারপর ব্যবসা গুছিয়ে নিতে পারলে নিজেরাই একটা বড় বাড়ি ভাড়া নেওয়া যাবে। তখন তোরা ফিরে এলি। (একটু থেমে) সত্যি কথা বলতে গেলে, একবার বিজনেসটা জমে উঠলে সবারই লাভ।

মিনু      :         মিথ্যে প্রবোধ দিও না ভাইয়া। একসময় ভাবতাম সবাই চাকরি করলে সবার লাভ। আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি সবার লাভের চাইতে কারো কারো লোকসানটাই বেশি।

শহীদ    :         তুই বড় সেন্টিমেন্টাল।

মিনু      :         আমার স্বামী মারা গেল হানাদার বাহিনীর হাতে। তোমরা দুদিন শোক করলে। বললে স্বাধীনতার জন্যে প্রাণ দিতে হয় মানুষকে।

শওকৎ  :         সেজন্য আমরা আনোয়ারকে শ্রদ্ধা করি।

মিনু      :         (ছবির কাছে গিয়ে, ফ্রেমের ওপর চটুল চিত্র তারপর ক্যালেন্ডারখানা দেখিয়ে) করো না। ভীষণ শ্রদ্ধা করো।

শহীদ    :         (ক্যালেন্ডারখানা সরিয়ে দিয়ে) এটা কেউ না দেখেশুনে রেখেছে বোধহয়। আমার মনে হয় এসব ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে Ñ

শওকৎ  :         যাক, এসব সামান্য ব্যাপারে উত্তেজিত হয়ে লাভ নেই। কোন কথা থেকে কোন কথা…। কথা হচ্ছিল বাড়ি নিয়ে। দেখ চিন্তা করে যা ভালো হয় Ñ

শহীদ    :         যাই, একটু ডাক্তারের কাছে ঘুরে আসি। শরীরটা কেমন করছে। গ্যাস্ট্রিকের ট্রাবলটা বাড়ল বোধহয়।

                   (সবাইকে অবাক করে মা সামনে এসে বলে, চিন্তা করার কিছু নেই। আমি মনস্থির করে ফেলেছি।)

শওকৎ  :         মা। সেরকম তাড়াহুড়োর কোনো দরকার নেই। এখনো হাতে দিন পনেরো সময়। দেশের বাড়িটা ঠিক হয়ে যাক। কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে Ñ

মা       :         কী বলতে চাও?

শওকৎ  :         সেরকম তো কিছু বলিনি। এমনিতেই ভালো লাগছিল না তোমার।

মা       :         ঠিক বলেছিস। এমনিতেই ভালো লাগছিল না। শেষটায় এরকম যে একটা হবে জানতাম। দেশের বাড়িতেই হোক, যেখানেই হোক, আমার জন্যে তোদের কাউকে ভাবতে হবে না।

                   (রুবির প্রবেশ। হাতের ব্যাগখানা ফেলে চারদিকে চেয়ে নিয়ে ধপাস করে বিছানার ওপর বসে পড়ে। শওকতের প্রস্থান)

রুবি      :         কী ব্যাপার। ভাইয়ারা সব বেরিয়ে গেল দেখলাম। আর তোমরাও কেমন গম্ভীর।

মিনু      :         রসিকতা নয়, রুবি। ছেলেমানুষি ছাড়। একটু সিরিয়াস হ। আমাদের বাড়িছাড়ার নোটিশ এসেছে।

রুবি      :         নোটিশ? দিলো কে?

মিনু      :         যারা দিতে পারে। শর্টে শুনে নে : ভাইয়ারা বিজনেস করবে। এখানে থাকবে না। আমাদের বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে।

রুবি      :         হুঁ বললেই হলো। মুখের কথা? হুঁ।

মা       :         আমি এখানে থাকব না। তোদের ইচ্ছে হয় থাক। আমি দেশের বাড়িতে চলে যাবো।

রুবি      :         ও মা তুমিই থাকবে না, তা আমরাই বা থাকতে যাবো কোন দুঃখে।

মিনু      :         কিন্তু তোর চাকরি?

মা       :         তাই তো, তোর চাকরি।

রুবি      :         মা, এতদিন তোমাকে ছেড়ে চাকরি নিয়েছিলাম। এখন না হয় চাকরি ছেড়ে তোমাকে নিয়েই থাকলাম।

মা       :         হুঁ।

রুবি      :         আমার কোনো কথাই তোমরা শোন না। আমি না হয় একটু উড়নচ-ি, খামখেয়ালি। কিন্তু চোখের সামনে যা দেখছি ঘেন্না ধরে গেছে।

মা       :         কী সব বলছিস?

রুবি      :         দেখছ না মা, দুটো পয়সার লোভে মানুষ কী হয়ে যাচ্ছে। তারপরও তুমি চাও আমি চাকরি করে উচ্ছন্নে যাই।

মা       :         তাইলে ছেড়ে দিবি?

রুবি      :         চাকরি ছাড়ার কথা বলছি মা। তোমাকে ছেড়ে দেবার কথা নয়।

শওকৎ  :         আজকালকার দিনে অমন একটা চাকরি Ñ

রুবি      :         সহজে পাওয়া যায় না, এই তো? সহজে কোন জিনিসটাই পাওয়া যায় ভাইয়া?

শওকৎ  :         না, বলছিলাম ব্যাপারটা কেমন যেন হয়ে যাে য় যাচ্ছে না? তোরা থাকবি না Ñ

মিনু      :         বারবার সে কথা তুলে কী লাভ। যা হবার, তা হবেই।

                   (শহীদের প্রবেশ।)

শওকৎ  :         তবু Ñ (মা চলে যেতে চায়)

রুবি      :         মা যেও না। তোমার জানা দরকার।

মিনু      :         তুমি ওপরে যাও মা। (মা চলে গেল।)

শহীদ    :         ডাক্তারকে পেলাম না। চলে গেছে। (একটু থেমে) কী বললি?।

রুবি      :         মিছিমিছি দুর্ভাবনা করে লাভ নেই। আপসে বললেই হয় যে, খারাপ লাগছে। মনে করো আমরা কেউ নই।

শওকৎ  :         রক্তের সম্পর্ক অস্বীকার করছিস?

রুবি      :         স্বীকার-অস্বীকারে কিছু এসে যায় না। সম্পর্ক যেখানে রাখা যাচ্ছে না, সেখানে ওটা নিয়ে অযথা টানাহ্যাঁচড়া করে কী লাভ?

শহীদ    :         তোর জন্যে আমার আপসোস হয়।

রুবি      :         তার চেয়ে বেশি আমার হয় তোমাদের জন্যে।

শহীদ    :         ইস, কী আমার দরদি।

মিনু      :         আর যাই হই অতটা অমানুষ এখনো হইনি। নিশ্চয়ই চাই তোমরা বড় হও, উন্নতি করো। তবু যদি কখনো বিপদে পড়ো, নিঃস্ব কপর্দকশূন্য হও,  এসো Ñ আমরা আছি।

শহীদ    :         ভাবছিস তখন তোদের কাছে হাত পাততে যাব?

রুবি      :         হাত পাততে হবে কেন। এমনিতেই এসো। ভাবছ ঠাঁই পাবে না?

মিনু      :         অত ছোটলোক হইনি। ঠাঁই ঠিকই পাবে।

শওকৎ  :         আর যদি সফল হই।

রুবি      :         তার মানে এই দাঁড়াচ্ছে না, আমরা বিফল হবো। ব্যর্থ হবো।

মিনু      :         বর্তমানকে অস্বীকার করে ভবিষ্যৎ গড়া যায় না।

শওকৎ  :         সে কথা উঠছে কেন?

রুবি      :         এজন্যে যে, তোমরা ভবিষ্যৎ গড়বে বলে বর্তমানকে অস্বীকার করছ।

শওকৎ  :         তাই বলে নিজের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেব?

মিনু      :         ছেড়ে দেবে কেন?

রুবি      :         আমরা বর্তমান আঁকড়ে আছি। তাই বলে ভবিষ্যৎ ছাড়িনি।

মিনু      :         কিন্তু আমাদের সবাইকে নিয়েই তো ঐশ্বর্যের পথ খুঁজতে পারতে তোমরা।

শওকৎ  :         সে চেষ্টা হয়তো সফল হতো না।

মিনু      :         সবাই সংসারে এতটাই সুখী হতে চায়।

শহীদ    :         অতবড় কথা বলিস না। আমরাও একদিন কাজে আসতে পারি।

মিনু      :         কাজে যে আসে, চিরদিন আসে। হঠাৎ করে একদিন আসে না।

শহীদ    :         তোমাদের জন্য দুঃখ হয়।

রুবি      :         আমাদের জন্যে দুঃখ করতে হবে না। আমরা ভালো আছি। ভালো থাকবো।

শহীদ    :         ভালো আছিস জানি, ভবিষ্যতেও থাকবি কেমন করে জানিস।

রুবি      :         জানি।

শহীদ    :         একেবারে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা সবজান্তা।

রুবি      :         সবজান্তা হতে হয় না। চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি।

শওকৎ  :         কী দেখছিস।

রুবি      :         তোমরা ভাঙছ, আলাদা হচ্ছ।

শওকৎ  :         আর তোরা?

মিনু      :         আমরা আলাদা ছিলাম। এক হতে যাচ্ছি।

একই দৃশ্য। তবে ঘর খুব অগোছালো দেখা যাবে। যত্রতত্র সুটকেস, ট্রাঙ্ক, ব্যাগ ইত্যাদি ছড়ানো। কোনো কোনোটা ডালা খোলা অবস্থায়। টেবিল ও দু-একটা টুকিটাকি জিনিস ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না। মিনু সুটকেস গোছাতে ব্যস্ত, এসময় শওকতের প্রবেশ।

মিনু      :         (শওকৎকে দেখে) তোমাদের কাপড় ওই সুটকেসে রেখেছি। (একখানা শার্ট বার করে দেখায়) শার্টটি বোধহয় তোমার। কী ছিরি করেছ।

শওকৎ  :         জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেলেছিস দেখছি। তাহলে সত্যি সত্যি যাওয়া ঠিক?

মিনু      :         (সুটকেস বন্ধ করতে করতে) সত্যি-মিথ্যের কী আছে। সেদিন তো মার কাছেই শুনলে। (উঠে দাঁড়ায়) উহ্ হাঁপিয়ে উঠেছি। (বিছানায় বসে) বসি। তোমাকে চা দিই?

শওকৎ  :         না।

মিনু      :         না কেন, শরীর ভালো নেই?

শওকৎ  :         (মুখ ঘুরিয়ে) না, এমনি। শহীদ এসেছিল?

মিনু      :         কই, না তো।

শওকৎ  :         রুবি চাকরিটা ছেড়েই দিচ্ছে তাহলে।

মিনু      :         বোধহয়। বলছিল আপাতত ছুটি নেবে।

শওকৎ  :         ও। না, ভেবেছিলাম ধীরেসুস্থে একটা Ñ (দ্রুতগতিতে রুবির প্রবেশ)

রুবি      :         (শওকতের সামনে হাত বাড়িয়ে দিয়ে) ভাইয়া তুমি তো খুব ভাগ্য ভাগ্য করো। দাও তো আমার হাতটা দেখে Ñ

শওকৎ  :         বাজে বকিস না। (রুবি হাত সরিয়ে নেয়।)

রুবি      :         বাজে বকলাম? কখন আবার সুযোগ হবে, তাই বললাম। (কী মনে করে) ওই দেখ, আমি দিব্যি দাঁড়িয়ে আছি। যাই তোমার কালো সুটকেসটা খালি করতে হবে। কে আবার খোঁজ করবে।

মিনু      :         (শওকৎকে চিন্তিত দেখে) কী হয়েছে ভাইয়া, তোমাকে ওরকম দেখাচ্ছে কেন?

শওকৎ  :         ওরকম মানে?

মিনু      :         মানে কী রকম যেন। জানিস রুবি, গোমরামুখো লোকদের আমি দুচক্ষে দেখতে পারি না। (শওকতের দিকে তাকিয়ে) তাই বলে তোমাকে না ভাইয়া। (শওকৎ দ্রুত পায়চারি করতে থাকে) কিছু একটা হয়েছে নিশ্চয়ই। কী, শরীর ভালো লাগছে না? বল না।

শওকৎ  :         না, এমনি।

মিনু      :         বললাম তো চা বানিয়ে দিই। বিকেলে চা না খেলে তোমার আবার মাথা ধরে। যা না রুবি, চট্ করে এক কাপ চা বানিয়ে আন।

রুবি      :         তখন বলতি বানিয়ে দিতাম। কেটলি তো প্যাক করে ফেলেছি।

                   রুবির প্রস্থান।

শওকৎ  :         না, থাক। শহীদটা আসছে না কেন। (ঘড়ি দেখে) দুপুরে এসেছিল?

মিনু      :         কই না তো।

                   রুবির প্রবেশ।

রুবি      :         রানুখালা এসেছেন, দেখা করতে। কার কাছে শুনেছেন চলে যাব, অমনি Ñ

মিনু      :         তাহলে ভাইয়া তুমি বসো। চল রুবি।

                   (মিনু ও রুবির প্রস্থান। শওকৎ আরো কিছুক্ষণ পায়চারি করে। তারপর চিবুকে হাত ঠেকিয়ে বসে পড়ে। শহীদের প্রবেশ।)

শওকৎ  :         (উঠে দাঁড়ায়) আচ্ছা লোক তুই। সেই যে গেলি, এখন ফিরলি। (শহীদ কোনো জবাব দেয় না) কী হলো, খোঁজ পেলি?

শহীদ    :         না।

শওকৎ  :         বলিস কী?

শহীদ    :         তবে কী বলছি। সারাদিন তো ওই নিয়েই ছুটোছুটি করলাম।              দু-দুবার তো ব্যাংকেই গেলাম। সমস্তটা শহর তন্ন করে খুঁজলাম, কেউ বলতে পারল না।

শওকৎ  :         ব্যাংকে, ব্যাংকে কী বলল?

শহীদ    :         কী আর বলবে। কোথায় জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট। ওই নামের কোনো লোকই নেই।

শওকৎ  :         কারো নামে না থেকে যদি আমাদের ফার্মের নামে খোলা হয়ে থাকে। খোঁজ করে দেখেছিলি প্রোগেসিভ ইন্ডাস্ট্রিজ নামে কোনো অ্যাকাউন্ট আছে কিনা।

শহীদ    :         সেটাও বাকি রেখেছি ভাবছ। গিয়ে দেখলাম ব্যাংকের ম্যানেজার আমার অনেকদিনের চেনা। একসঙ্গে কাজ করতাম। সে নিজে লেজার বুক খুলে দেখিয়ে দিলো।

শওকৎ  :         এতগুলো টাকা।

শহীদ    :         আমার কথা ভাব। তোমরা জানো না ‘মাইজার’ বলে আমার দুর্নাম। আমি টিফিন করিনি। পুওর ফান্ডে চাঁদা দিইনি। কোনো পিকনিক-সিনেমায় যাইনি। পাই পাই করে জমানো টাকা।

শওকৎ  :         এখন ওসব বলে আর কী হবে?

শহীদ    :         এতবড় ধুরন্ধুর, জোচ্চোর। জানো সেদিন বাড়ির ঠিকানাটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করলাম। বেমালুম চেপে গেল।

শওকৎ  :         কী আচ্ছা বিপদ বলো তো।

শহীদ    :         ওই পাঁচ হাজারও বোধহয় মারার মতলবে ছিল। সময়মতো টের পেয়ে কেটে পড়েছে।

শওকৎ  :         ওই টাকা থেকেই কী লাভ হচ্ছে বল? বাড়ি ছাড়ার কথা বলে নিয়েছিস?

শহীদ    :         ও মা, সে তো ওইদিনই। বাড়িওয়ালা রীতিমতো খুশি। পারলে যেন তখনই টাকা ফেরত দেয় এমন ভাব।

শওকৎ  :         ওই টাকা থাকা না-থাকা সমান কথা। কোথায় বাড়ি খুঁজব। খুঁজলেই পাওয়া যাবে ভাবছিস। এদিক-ওদিক, দুদিকই গেল। (কিছুক্ষণ থেমে নিয়ে) লোকটা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেওয়া উচিত ছিল। তা না করে হুট করে অতগুলো টাকা গছিয়ে দেওয়া কোনোমতে উচিত হয়নি।

শহীদ    :         তুমি বললে বলেই তো Ñ

শওকৎ  :         (ধমকের সুরে) তুমি বললে বলেই Ñ আমি বললেই তুই বিষ খাবি? তোর নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা নেই। সন্দেহ হয়েছিল বলিসনি কেন?

                   রুবি ও মিনুর প্রত্যাবর্তন।

রুবি      :         ভাইয়া, রানুখালা আমাকে জাড়িয়ে ধরে সে কী কান্না। আমি বললাম কাঁদছেন কেন। (একুট থেমে) শহীদ ভাই, খুব ভালো তুমি এসে গেছ। (একখানা সুটকেস টেনে নিয়ে আসে ডালা খোলা) বন্ধ করতে পারছি না। একটু হেল্প করো না প্লিজ। (শহীদ খানিকক্ষণ হতভম্বের মতো তাকিয়ে থাকে। তারপর সুটকেসের ডালা বন্ধ করতে যায়) জোরে, জোরে Ñ আরেকটু জোরে। (শহীদ ক্ষান্ত দেয়) ও কী ছেড়ে দিলে কেন?

শওকৎ  :         রুবি, মিনুকে একটু পাঠা।

মিনু      :         কী ভাইয়া।

শওকৎ  :         বয়।

মিনু      :         বলো না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনি। পাতা সংসার বোঝ তো। কম ঝামেলা। মরবার ফুরসত নেই।

শওকৎ  :         তোদের কি কালই যাওয়া ঠিক। মিনু, মিনু। কালই কি Ñ যাচ্ছিস।

মিনু      :         হ্যাঁ।

শহীদ    :         ইয়ে, একটা ভীষণ বিপদ হয়েছে মিনু।

মিনু      :         কিসের বিপদ?

শওকৎ  :         না, লোকটার, মানে যে লোকটার ওপর ভরসা, যার জন্য এতসব এলাহি কা-কারখানা, সে লোকটার কোনো পাত্তা নেই। (রুবির প্রবেশ। মিনুর কাছে এসে দাঁড়ায়।)

মিনু      :         তোমাদের সেই পার্টনার। বলো কী। না জেনেশুনে, খোঁজখবর না নিয়ে একদম এককথায় লোকটার হাতে অতগুলো টাকা তুলে দিলে। কী বুদ্ধির বহর। এই নিয়ে আবার ব্যবসা করবে। (প্রসঙ্গান্তর টেনে) দেখ খোঁজখবর করে। যা হবার তা তো হয়েছে। এ নিয়ে মন খারাপ করে কী করবে।

শহীদ    :         চলে যাচ্ছিস তোরা, না? রুবী।

রুবি      :         হুঁ।

শহীদ    :         রুবি, আমি তোকে বকেছি সবচেয়ে বেশি।

রুবি      :         দূর, তোমার বকাবকি। আমি ওসব থোড়াই গায়ে মাখি।

শওকৎ  :         এ অবস্থায় তোদের যাওয়া চলে না।

রুবি      :         যাওয়া চলে না মানে! যখন মর্জি Ñ বললে যাও, যখন মর্জি থাকো। দেখ জিনিসপত্র প্যাক হয়ে গেছে, টিকিট কাটা হয়েছে। কান্নাকাটি করে চোখের পানি ভাসিয়ে এলাম, আর এখন বলছ যাওয়া হবে না।

শহীদ    :         আমি যেতে দেব না।

রুবি      :         যেতে দেবে না। কেন? এটা অন্যায়। খুব অন্যায় আপা। যেতে দেবে না কেন? আমরা কী নাচের পুতুল। যখন যেমন খুশি নাচাবে।

মিনু      :         (শহীদ-শওকৎকে) সে কথা আরো আগে বলা উচিত ছিল ভাইয়া। বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিয়েছ। বাড়ি থেকে হাঁকিয়ে দেবার কথা বলেছ Ñ এখন আর এসব বললে চলে না। তাছাড়া বাড়িটা তো ছাড়তে হচ্ছেই।

শওকৎ  :         তা হোক। এ অবস্থায় তোদের যাওয়া চলে না। তুই বলেছিলি : নিঃস্ব, অসহায় হয়ে ভেঙে পড়লে এসো। আমরা আছি।

মিনু      :         সে কথা এখনো বলছি। তা তো আছিই।

শওকৎ  :         তাহলে? (সকলের অগোচরে মায়ের প্রবেশ)

রুবি      :         এতদূর এসে ফিরে যাওয়া যায় না ভাইয়া। ভাঙা ঘর জোড়া লাগানোর চেষ্টা করো কোন দাবিতে।

মা       :         এজন্যে যে, ওদের একটা দাবি আছে।

রুবি      :         ওরাই তোমাকে অপমান করেছিল সবচেয়ে বেশি মা।

মা       :         সেজন্যেই অনুতাপের বোঝাটাও ওদেরই বেশি করে বইতে হচ্ছে।

রুবি      :         মা, এরপরও তুমি বলছ?

মিনু      :         মা মা, কেন মা।

শহীদ    :         মা (মায়ের দিকে তাকাবে)

শওকৎ  :         মা (মায়ের দিকে তাকাবে)

মা       :         জানতাম। জীবনের সব বাঁধনই কাটাতে পারলাম, মায়ার বাঁধন ছাড়া। বুঝলাম।

রুবি      :         বুঝলাম মানে যাওয়া হচ্ছে না?

মা       :         জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে রেখে দে রুবি।

শওকৎ  :         (শহীদকে) হাঁ করে কী দেখছিস, সুটকেসগুলো তুলে ভেতরে নিয়ে যা। (শহীদ ভারি দুটো সুটকেস তুলে নিয়ে ভেতরে যায়।)

মা       :         (রুবিকে) ওকে এক কাপ চা বানিয়ে দে।

রুবি      :         চা বানিয়ে দে তো ভাইয়াকে।

মা       :         হ্যাঁ তুই। নিজের হাতে।

রুবি      :         কিন্তু মা, কেটলি তো প্যাক করে ফেলেছি।

মা       :         বার করে নে।

রুবি      :         ঠিক আছে।

                   (রুবির প্রস্থান। কিছুক্ষণ কোনো অ্যাকশান নেই। মোটামুটি যে যেখানে ছিল তেমনি থাকবে। তবে সবাই চিন্তাগ্রস্ত। সন্ধে হয়ে আসছে। একটু একটু করে অন্ধকার নামছে। তারপর এক সময় খুবই গাঢ় অন্ধকার। চা হাতে রুবির প্রবেশ। খুব আবছা আলোয় তার প্রোফাইল দেখে তাকে চেনা যাবে।

রুবি      :         কোথায় রাখব।

মা       :         বাতিটা জ্বালা। সন্ধে হয়ে এলো।

রুবি      :         (সুইচ টিপল) জ্বলছে না। বাতি ফিউজ হয়নি তো।

মিনু      :         (জানালা খুলল) কিছুটা বাইরের আলো ওর মুখে এসে পড়ে) কই, পাশের বাড়িতে তো জ্বলছে।

রুবি      :         গত মাসের ইলেকট্রিসিটির বিল দেওয়া হয়নি। বোধহয় লাইন কেটে দিয়েছে।

শওকৎ  :         তাই হবে।

                   [শওকৎ, রুবি সবাই মিনুর কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায়।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *