নীল কমল

সকাল বেলা। প্রাতরাশের আয়োজন। দোতলার সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে যে লাউঞ্জ সেখানেই লম্বা টেবিল পাতা। ছ’জনের বসার ব্যবস্থা। টেবিলের সিঁড়ির কাছের মাথায় বসবে গৃহকর্তা জাফর করিম। বয়েস পঁয়তাল্লিশ-ঊর্ধ্ব। আসনটি বর্তমানে খালি। লম্বালম্বিভাবে স্বামীর আসনের বাঁ-দিকের আসনটি স্ত্রী রোকেয়া করিমের। ত্রিশোর্ধ্ব। অন্যান্য আসনে বাড়ির অন্যেরা। দৃশ্যের গোড়ায় দেখা যাবে, কেবল স্ত্রী রোকেয়া উপবিষ্ট। টেবিলে প্রাতরাশের বিভিন্ন উপকরণ ও প্লেট, কাঁটা চামুচ ইত্যাদি সাজানো। রান্নাঘর থেকে লাউঞ্জে ঢোকার জন্য ¯িপ্রং লাগানো যে-দরজা সেটা দিয়ে বাড়ির কাজের মেয়ে পান্না, বিশ-বাইশ বছর, আসা-যাওয়া করে। কখনো তার হাতে দুধ, দুধের গ্লাস, কখনো মাখন, কখনো কাটা ফল, কখনো অমলেট। বিদ্যুৎচালিত টোস্টারটি রোকেয়ার সামনেই রাখা। সে প্রয়োজনমতো ওখানা ব্যবহার করে। জ্যাম-জেলির বোতলও তার হাতের কাছেই রাখা। মাঝে মাঝে নিজের আসন থেকে উঠে গিয়ে তাকে যার যার প্লেটে পরিবেশন করতে দেখা যাবে। সিঁড়ির মুখের ওপর একটি দেয়ালঘড়ি। ওপর তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে আসে ছেলে বাবলু বেশ আওয়াজ করে। বছর নয়-দশ। চোখে পুরু চশমা। বই এবং খাতাপত্র-সংবলিত মোটা ব্যাগ কাঁধে ঝোলানো। স্কুল-ইউনিফর্ম পরা। পনেরো-ষোলো বছরের রীনা নেমে আসে ধীরপায়ে। পরনে নাইলন জাতীয় শাড়ি। পনি টেল করে বাঁধা চুল। হাতে একখানা কমিক বা কোনো পত্রিকা। ওখানা পড়তে পড়তেই নামে। টেবিলের অন্য মাথায় তার নির্দিষ্ট আসনে বসে। বাবলু মায়ের সঙ্গের আসনটিতে বসতে চায়।

রোকেয়া          :         (বাবলুকে) না না। এখানে না। যাও নিজের জায়গায়। এখানে আঙ্কল বসবে।

বাবলু    :         (তবু বসে পড়ে) আঙ্কল আসুক তো।

রোকেয়া          :         (মুখের ওপর আঙুল তুলে) ফের মুখে মুখে তর্ক। (শাসনের ভঙ্গিতে) যা বলি করো। যাও।

বাবলু অনিচ্ছাসত্বে এক পা দুপা করে এবার উল্টোদিকের একখানা চেয়ারে গিয়ে বসে। টোস্টার থেকে রুটি টোস্ট হয়ে বেরোয়। রোকেয়া উঠে গিয়ে মাখন লাগিয়ে ওখানা বাবলুর প্লেটে দেয়। এসময় পান্না ডিম নিয়ে আসে।

বাবলু    :         (আহ্লাদি সুরে। মুখ সিটকে) না, ডিম খাবো না।

রোকেয়া          :         দুধটা খেয়ে নে তাহলে।

বাবলু    :         এখন না, রাতে।

রোকেয়া          :         (রীনাকে। রীনা এখনো কমিক পড়ছে) তোকে কী দেব?

রীনা     :         আমাকে? (এ সময় পান্না বাবলুর প্রত্যাখ্যাত ডিমের প্লেট নিয়ে আসে) না। শুধু টোস্ট আর জ্যাম Ñ ব্যস।

পান্না রোকেয়ার কাছে ফিরে আসে। ডিমের প্লেট রেখে দেয়।

রোকেয়া          :         জানি না। হাওয়া খেয়ে থাক।

(টোস্টে জ্যাম লাগিয়ে দেয়। পান্না এসব রীনার সামনে রেখে আসে।) পরে কলেজে গিয়ে খিদে খিদে করে চেঁচিও না। (পান্না চলে যায়। রোকেয়া নিজে টোস্টে কামড় দেয়। তার আগেই কী মনে হয়ে যায়। পান্নাকে ডাকে।)

পান্না। শোন।

নিজেই পান্নার অনুসরণ করে দরজা দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে।

বাবলু    :         আপা কমিকটা দাও না।

রীনা     :         না, এসব তোর পড়ার নয়।

বাবলু    :         আমি শুধু সুপারম্যানেরটা দেখব।

রীনা     :         এখন কোনোটা দেখতে হবে না। যাও।

এ সময় ওপর থেকে দুলারি নেমে আসে। বয়েস বাইশ কী বিশ। পরনে পাটভাঙা নীল শাড়ি। হালকা মেকআপ। কপালে ছোট টিপ। পায়ে স্যান্ডেল-শু। সদ্য স্নান করা, মাঝে ব্যাগ থেকে চিরুনি এনে চুল আঁচড়ে খানিকটা ঝাঁকুনি দেয়। তারপর দুহাতে আবার চুল গুঁছিয়ে ছড়িয়ে দুলারি রীনার পাশের আসনে বসে। এসেই রীনার কমিক বইয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। রীনা তার দিকে কমিকটা বাড়িয়ে দেয়। একসময় কমিক বই বন্ধ করে।

রীনা     :         একটা কথা বলি আন্টি।

দুলারি    :         (সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায়। মুখে কৌতুক)

রীনা     :         তোমাকে দারুণ লাগছে।  

দুলারি    :         (সোজা হয়ে বসে) যাঃ পাজি। (মনে মনে খুশি দেখায় যদিও)।

রোকেয়া রান্নাঘর থেকে ফিরে আসে। দুলারির দিকে রুটি বাড়িয়ে দেয়। দুলারি দুটি রুটি তুলে নেয়।

রোকেয়া          :         মাখন দিই?

দুলারি    :         স্লাইট। (নিজের টোস্ট বাড়িয়ে দেয়। রোকেয়া মাখন লাগিয়ে দেয়)

রোকেয়া          :         (রীনার দিকে তাকিয়ে) এটা কীরকম অসভ্যতা হচ্ছে। রাখ কমিক।

রীনা কমিক রেখে দিয়ে খাবারে মনোনিবেশ করে।

(বাবলুর দিকে তাকিয়ে) তুই কী খাবি।

বাবলু    :         আন্টি যা খায়।

রোকেয়া          :         তাহলে আন্টির সাগরেদ বনে যাও।

বাবলু    :         নিচু গলায় যিধঃ’ং সাগরেদ?

রোকেয়া          :         জানি না।

এ সময় ঢুকতে দেখা যাবে ডাক্তার নিসার করিমকে। সাতাশ-আটাশ বছর বয়েস। সুদর্শন, লম্বা। গায়ে সাদা অ্যাপ্রন। স্টেথোস গলায়। হাসিখুশি মুখ।

বাবলু    :         (ডাক্তার নিসার করিমকে দেখে চিৎকার করে) আঙ্কল।

সকলে ডাক্তারের দিকে তাকায়। ডাক্তার রোকেয়ার পাশের আসনে বসে।

রোকেয়া          :         আসুন ডাক্তার সাহেব। আটটায় ঘুম ভাঙলে রোগীদের সেবা হবে কখন।

নিসার    :         আটটা! (নিজের ঘড়ির দিকে তাকায়। তারপর উঁকি দিয়ে রীনার ঘড়ির সঙ্গে মেলাতে চায়। ওর হাতখানা নিজের কাছে টেনে নেয়।) দেখি তোরটায় কত।

রীনা     :         (হাত সরিয়ে নেয়) আমারটা ঠিক নেই।

নিসার    :         ঠিক নেই; তাহলে পরিস কেন?

রীনা     :         স্টাইল।

এসময় গৃহকর্তা জাফর করিম ওপর থেকে নামে। শ্লথগতি। পাজামা-পাঞ্জাবি পরনে। চোখে চশমা। দেখলেই বোঝা যায় একটু রাশভারি গোছের মানুষ। রোকেয়া তাকে দেখে, কিন্তু কিছু বলে না। জাফর নিজের আসনে এসে বসে।

জাফর   :         কাল জানি না, শেষের দিকে একটু জ্বরজ্বর লাগছিল।

নিসার    :         (খেতে খেতেই এক ফাঁকে ওর একখানা হাত তুলে নিয়ে পাল্স দেখে) না Ñ তেমন তো কিছু না। একদম নরমাল।

জাফর   :         ডাক্তারের মন্তব্যে প্রসন্ন? নরমাল হলেই ভালো। কী খাব আমি?

রোকেয়া          :         কী খাবে আবার। রোজ যা খাও। তোমার ডিম দেব?

জাফর   :         (নিসারের দিকে তাকায়) খাব?

নিসার    :         খাওনি তো এ উইকে? তাহলে একটা চলতে পারে। তবে হড় ভধঃ.

রোকেয়া          :         নারকেলের নাড়– বানিয়েছিলাম। ছেলেপুলেরা তো নাক সিটকায়। দেব তোমার ভাইকে।

নিসার    :         না না। নারকেলে হাই কলেস্টরল।

বাবলু    :         আমি খেতে পারি আঙ্কল?

নিসার    :         তুমি গোটা বাড়ি খেতে পার।

পান্না এসে ঢোকে কাগজ হাতে। দুলারি ওর কাছ থেকে নিয়ে নেয় ওখানা।

রীনা     :         দেখি না আন্টি।

দুলারি    :         দাঁড়া, দাঁড়া। দিচ্ছি।

রোকেয়া দূর থেকে লক্ষ করে। ধীরস্থিরভাবে রুটিতে জ্যাম লাগায়। মুখে কামড় দেয়।

রোকেয়া          :         দুটোর একটা করো। হয় পড়ো, না-হয় খাও।

দুলারি    :         (কাগজের কোনো একটি পৃষ্ঠার প্রতি মনোনিবেশ করে) কী ভরবষফরহম করে Ñ

                            রীনার অন্যের ভরবষফরহম নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না।

রোকেয়া          :         এসব কী বলা হচ্ছে আন্টিকে। বয়সে তোর বড় না?

রীনা     :         বড় না হাতি।

দুলারি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে উঠে পড়ে। কাগজখানা এনে জাফরকে দেয়।

দুলারি    :         কাগজ ভাইয়া।

রোকেয়া          :         কী হলো, আর খাবি না?

দুলারি    :         (আদরের ভঙ্গিতে রোকেয়ার গলা জড়িয়ে) না ভাবি, ইচ্ছে করছে না। আর সময়ও নেই।

রোকেয়া          :         সময় নেই, এতক্ষণ করিস কী।

দুলারি    :         (রীনাকে দেখিয়ে) ওই পাজিটাকে জিজ্ঞেস করো। নিজে উঠবেন দেরি করে। তারপর সব কিছুতে সর্দারি। জানো, আজ পুরো পঁয়তাল্লিশ মিনিট দাঁড়িয়েছিলাম বাথরুমের জন্যে।

জাফর   :         আসলে তোদের সকালে ওঠার অভ্যেস নেই। একটু ভোর করে উঠলে সবই সময়মতো হয়।

নিসার    :         ভোরে উঠবে। জিজ্ঞেস করো ওদের, সূর্যের মুখ দেখেছে কখনো?

দুলারি    :         সূর্যের মুখ না দেখি, তোমার মুখটা তো দেখি। সেটাইবা কম কী?

রীনা     :         খবরদার আঙ্কলকে যা-তা বলবে না।

দুলারি    :         ইস্, আমার আঙ্কলওয়ালি।

রোকেয়া          :         (কাগজ পড়ছে দেখে জাফরকে) তোমার কী হলো। তাড়াতাড়ি করো। ধনুমামাদের আনতে হবে না? গাড়ির কাউকে বলেছ?

জাফর   :         বলে তো রেখেছিলাম মকসুদকে। বলল ও পাঠাবে। নাকি আরেকবার মনে করিয়ে দেব।

রোকেয়া          :         বসে আছে তোমার জন্যে। বেরিয়ে পড়েছে এতক্ষণে।

জাফর   :         যাই, তবু একবার দেখে আসি।

জাফর সিঁড়ি বেয়ে ওপর তলায় যেতে থাকে।

রোকেয়া          :         তুই তো বড় ভাইয়ার সঙ্গে গেলেই পারিস। নামিয়ে দিত ইউনিভার্সিটি।

দুলারি    :         না ভাবি। কাজ নেই। আমার একদিকে আর ভাইয়ার অন্যদিকে। শেষটায় দুজনই মারা পড়ব।

দুলারি ত্বরিতগতিতে বেরিয়ে যেতে থাকে। রীনাও উঠে  পড়ে।

রোকেয়া          :         তোদের রেসের ঘোড়া হয়ে জন্মালেই ভালো হতো। একদ- মিলে থাকতে পারিস না। কেবল দাপাদাপি। (দুলারিকে) দাঁড়া এক মিনিট।

ত্বরিতগতিতে রান্নাঘরে যায়। প্লেটে করে কী নিয়ে এসে চামুচ দিয়ে খাওয়াতে যায়।

রোকেয়া          :         কিছু পুডিং বানিয়েছিলাম। দেখ তো কেমন হলো। কিছু তো খাস না। এদিকে আয়। হাঁ কর।

দুলারি তাই করে। রোকেয়া খাইয়ে দেয়। কিছুটা ওর কাপড়ে পড়ে।

দুলারি    :         (নকল রাগের ভঙ্গিতে) দিলে তো সব নষ্ট করে।

রোকেয়া          :         (নিজের আঁচল দিয়েই মুছে দেয়। আবার গ্লাসের পানি ঢেলে আঁচল ভিজিয়ে মুছে দেয়) যা যা। কিছু হয়নি।

দুলারি    :         যাই।

জাফর   :         গেলাম না। গাড়ি এলে ভালো। না হলে কিছু একটা করতে হবে। এনগেজড। পরে আরেকবার দেখব।

কেটলি থেকে চা ঢালতে গেল। রোকেয়া কেটলির উত্তাপ দেখে নেয়।

রোকেয়া          :         না না। ঠান্ডা চা খেতে হবে না। পান্না জলদি করে দুকাপ চা। নিসার তোমাকেও এক কাপ দিই। (জাফর তখনো কাগজ পড়ছে। কাগজে তার মুখ ঢাকা।)

রোকেয়া          :         সরাও তো। সারাদিন মুখের ওপর কাগজ, কী থাকে আল্লাই জানে।

নিসার    :         না ভাবি, চা থাক। আজ ওয়ার্ডে বড় কাজ।

জাফর   :         (নিসারকে) একটা কাজ পারবি। ডক্টর আলমের সঙ্গে একটা ধঢ়ঢ়ড়রহঃসবহঃ দরকার ছিল।

নিসার    :         কার, তোমার জন্যে?

রোকেয়া          :         না, আমাদের ধনুমামা। ভালো নাম মনিরুজ্জামান। আমরা তো ধনুমামাই বলি। বেচারির শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। চিকিৎসার জন্যে আসছে। আলসার ছিল। এখন তো শুনছি কিডনিরও ট্রাবল। জানি না।

নিসার    :         দেখেছি আমি?

রোকেয়া          :         দেখবে না কেন। বছর দু’ আগে তো একবার এলো না। তোমরা অবশ্য তখন এ কামরায় ছিলে না।

নিসার    :         হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। করেন কী।

দুলারি   :         ওই আগে যা করতো। ব্রোকারি। খুব একটা  তেমন সুবিধে হয় মনে হয় না। অভাব-অনটন লেগেই আছে। ছেলেদুটো বাইরে। শুনেছি খোঁজ-খবরও নেয় না।

নিসার    :         দেখি। ডক্টর আলমকে ধরতে পারলে হয়। কবে দরকার?

জাফর   :         যত তাড়াতাড়ি হয়। তবে আজ তো হবে না।

দুলারি   :         দাও ভাই একটু করে। নিজের মামা না হলেও ওই একজনই। আর তো কেউ নেই। আর এখানে থাকলে তুমিও একটু দেখে দিতে পারবে মাঝে মধ্যে।

নিসার    :         আমি? সবে হাতেখড়ি। (উঠতে উদ্যত) ঠিক আছে।

যেতে যেতে কী মনে হওয়ায় বাবলুর কাছে

নিসার    :         বাবলু ভিটামিন দিয়েছিলাম, আছে?

বাবলু    :         হ্যাঁ আঙ্কল।

নিসার    :         হ্যাঁ আঙ্কল। ধরা পড়ে গেলে। এতদিন আছে কী করে। ও তো দু’সপ্তাহ আগে ফুরিয়ে যাবার কথা।

দুলারি   :         আজকাল প্রায়ই চোখের ঈড়সঢ়ষধরহ করে।

নিসার    :         ঞঠ বন্ধ করে দাও। ঠিক হয়ে যাবে।

বাবলু    :         আমি মোটেও ঞঠ দেখি না।

জাফর   :         মনে হয় ওর চোখটা আরেকবার দেখিয়ে নিলে হয়। দু’বছরেও আর চশমা বদলানো হয়নি।

পান্না     :         (জাফরকে) টেলিফোন।

নিসার    :         আমার সঙ্গে যেতে পারে আজ সন্ধেয়। ডক্টর মোতালিবের চেম্বারে দেখিয়ে দেব।

বাবলু    :         আজ না আঙ্কল।

নিসার    :         আজ কী?

বাবলু নিসারকে কানে কানে কী বলে।

নিসার    :         সিরিয়াস ব্যাপার। আজ নিউজিল্যান্ড-ইংল্যান্ডের খেলা। চোখের কোনো চান্স নেই। চোখ ক্রিকেট দেখবে।

বাবলু    :         আঙ্কল আমার অসুবিধে হয় না।

নিসার    :         ভালো, ভাবি আজ দুপুরে আসছি না।

রোকেয়া          :         কত যে আসেন? ভারি নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। পান্না টিফিন বক্সটা সঙ্গে দিয়ে দে।

নিসার    :         থাক না। টিফিন নিয়ে কী করব। কখন কোথায় থাকি। তাছাড়া ক্যান্টিন তো রয়েছেই।

দুলারি   :         কোনো দরকার নেই ক্যান্টিনে ছাইপাশ খাবার।

নিসার    :         ভাবছি, ডাক্তারিটা আমি না পড়ে তুমি পড়লেই পারতে।

দুলারি   :         যাও তো আর ডাক্তারি ফলাতে হবে না।

নিসার বেরিয়ে যায়। রোকেয়া রুটি ও অন্যান্য খাবার ভালো করে প্লেটে রাখে। পান্না দাঁড়িয়ে। জাফর আবার দোতালা থেকে নেবে আসে।

রোকেয়া          :         (পান্নাকে) নিয়ে যা। তোরা ঝটপট খেয়ে নে। (জাফরকে দেখে) কী হলো কী বলল টেলিফোনে।

জাফর   :         ওই আর কী। গাড়ি ওয়ার্কশপে। হবে না। দেখি কী করা যায়। (সিগ্রেট ধরিয়ে) তোমার মামা থাকবে কতদিন।

রোকেয়া :         তা কী করে বলব। গতবার তো আড়াইমাস ছিল। এবারও হয়তো মাসখানেক। মামীকে সঙ্গে নিয়ে আসছে।

জাফর   :         তাহলে তো লং টার্ম প্রোগ্রাম। আগে তো দুলারি, নিসার ছিল না। জায়গা হবে কী করে?

রোকেয়া          :         ওসব নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না। যা করার আমি করব।

জাফর   :         তাহলে নিজের ঘরটা খালি করে দিতে বলো নিসারকে।

দুলারি   :         না না। ডাক্তার মানুষ। ওকে বিরক্ত করা কেন। ওপরেই ব্যবস্থা করে দেব।

জাফর   :         যাই, তোমার মামাকে আনার ব্যবস্থা করতে হবে আমার।

জাফর কাগজ হাতে উঠে পড়ে। দুলারি এসে ঢোকে আবার। চেয়ার থেকে নিজের ব্যাগ তুলে নেয়।

দুলারি    :         ব্যাগখানা ফেলে গিয়েছিলাম।

রোকেয়া :         দেখি দেখি, চুল দিয়ে তো এখনো পানি গড়িয়ে পড়ছে। (নিজের আঁচল দিয়ে মুছে দেয়) এতবড় ধিঙ্গি মেয়ে।

দুলারি    :         (ঢেঁকুর তোলে) আছে কিছু?

রোকেয়া :         কিছু মানে?

দুলারি    :         সকাল সকাল কী সব মিষ্টি-ফিষ্টি খাওয়ালে। মুখটা কেমন করছে।

রোকেয়া :         নে। এলাচি (বলে মুখে পুরে দেয় আরো কিছু হাতে তুলে দিয়ে) রাখ না তোর কাছেই।

ঈঁঃ ঞড়

ওপর তলার ঘরে একধারে খাট পাতা। দেয়ালের অন্য ধারে প্রায় সবটুকু জুড়েই ওয়ার্ডরোব ও দেরাজ। কিন্তু কোনোটাতে কোনো চাবি নেই। চেয়ারে বসে আলাপ করছে ধনুমামা ও রোকেয়া। ধনুমামা খাটের কাছাকাছি। তার স্ত্রী বছর দশেকের ছোট। কিছু স্যুটকেস ও অন্যবিধ জিনিসপত্র ছড়ানো।

রোকেয়া :         আপনাদের কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো ধনুমামা?

মামী     :         না, ঠিক আছে।

মামা     :         (সিগারেট পেপারে তামাক পুরে সিগ্রেট বানায়, তারপর ওখানা ধারায়।) গেলবার তোমাদের নিচের ঘরটায় ছিলাম। দক্ষিণ খোলা। রহফবঢ়বহফবহঃ কামরা। সঙ্গে বাথরুম। যখন খুশি এলাম। যখন খুশি গেলাম।

রোকেয়া :         এখনো যখন খুশি আসুন যান। অসুবিধে কি!

মামা     :         আজকাল ওপর-নিচ করতেও পারি না। হয়ও না। যাক, তোমাদের দয়া।

রোকেয়া :         ছি ছি। দয়া কী বলছেন ধনুমামা। নিচের কামরা খালি থাকলে তো সেখানেই ব্যবস্থা করতাম। ওঁর ছোটভাই নিসার গতবার ডাক্তারি পাশ করল। ও-ই থাকছে। ডাক্তার মানুষ, বোঝেন না, কখন হুট করে কোন রোগী এসে গেল। কোথায় কোন রাত-বিরাতে ডাক পড়ল।

মামা     :         তা আগেরবার তো দেখিনি।

রোকেয়া :         দেখবেন কী করে। আমার শাশুড়ি বেঁচে ছিলেন। তখন তাঁর সঙ্গেই থাকত। শাশুড়ি চলে যাবার পর রীনার বাবাই বলল, চলে আস। আলাদা বাড়িতে থেকে কী হবে। আর আমারও তো সত্যি কথা বলতে আপন বলতে সংসারে আর কেউ নেই।

মামা     :         ও।

রোকেয়া :         (হঠাৎ মামার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হয়) না, আপনারা আছেন। তবে ধারেকাছে তো আর কেউ নেই। (একটু থেমে নিয়ে) আপনার কোনো অসুবিধে হবে না মামা। কামরার সঙ্গে বাথরুম নেই। তবে ড্রয়িং রুমেরটা ব্যবহার করতে পারেন। ইচ্ছে করলে আমাদেরটাও ইউজ করলেন।

মামা     :         (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) ঠিক আছে। ম্যানেজ করে নেব।

রোকেয়া :         তবে আমি বলি কী, এখন আপনার দরকার বিশ্রাম। ছোটাছুটি তো সারাজীবনই করলেন। একদিকে কিন্তু ভালো হলো। ঘরটা একধারে হওয়ায় নিরিবিলি। কেউ বিরক্ত করে না। আমি একটু নিচে থেকে আসছি মামা।

রোকেয়া চলে যায়। মামা ও মামী আলাপরত।

মামা     :         কীরকম বোঝ?

মামী     :         ভালোই তো। মন্দ কী।

মামা     :         গতবার তবু একটু হাত-পা ছড়িয়ে ছিলাম। চিঠি লিখে জানালাম, তবু ব্যবস্থা করা গেল না। কামরায় একটা বাথরুম পর্যন্ত নেই। আরে, তোদের একটা বিচার-বিবেচনা হলো না।

মামী     :         ওসব নিয়ে অত ভাবনার কী আছে। রোকেয়া তো বলেই গেল দরকার হলে ওদের বাথরুম আছে, ড্রয়িং রুমেরটা আছে। প্রত্যেকেরই সুবিধে-অসুবিধে থাকে।

মামা     :         তোমার তো চিরকালই ওই স্বভাব। আমি যা বলি সবসময় তার উলটো বলবে।

মামী     :         উলটো-সোজা জানি না। তবে কথায় কথায় লোকের পেছনে লাগা আমার স্বভাব নয়।

এ সময় পাশ দিয়ে একবার উঁকি দিয়ে বেরিয়ে গেল নিসার। কারো মধ্যে কোনো বাক্যালাপ হলো না।

নিসার    :         ভাবি (অর্থাৎ ভাবিকে প্রত্যাশা করে)। ও স্যরি।  [চলে যায়]

মামা     :         কে।

মামী     :         বোধহয় রীনার ছোটমামা। ওই যার কথা বলল। ডাক্তার নিসার।

মামা     :         আমাকে দেখে তো কিছু বলল না।

মামী     :         হঠাৎ করে তোমাকে দেখে কেমন করে চিনবে। প্রয়োজন মনে করলে নিজেই গিয়ে আলাপ করে নিতে পারতে।

মামা     :         যাই বলো। ওই ছোকরাকে আমার ভালো লাগল না।

মামী     :         তোমার সব ব্যাপারেই অযথা সন্দেহ। আমি তো দোষের কিছু দেখি না।

এ সময় দুলারি এসে ঢোকে এবং এসে আগের মতোই অপ্রস্তুত হয়।

দুলারি    :         ভাবিকে দেখছি না।

মামী     :         তোমার ভাইও এসেছিল খুঁজতে।

দুলারি    :         ও।

মামী     :         বসো না।

আড়ষ্ট হয়ে বসে।

মামা     :         কী পড়?

দুলারি    :         জি, আমি য়ুনিভার্সিটিতে। জার্নালিজম অনার্স, থার্ড ইয়ারে।

মামা     :         ভালো।

 রোকেয়ার প্রবেশ।

রোকেয়া :         (মামাকে দেখিয়ে) আমার মামা।

দুলারি    :         আলাপ হলো। ভাবি, তোমাকে খুঁজছিলাম।

রোকেয়া :         একটু যে এসে গপ্প করব মামা তার উপায় নেই। কী জন্য খুঁজছিলি?

দুলারি    :         একটা শাড়ি নেব। চন্দনাদের ওখানে যেতে হবে।

রোকেয়া :         ওখানে আবার কী।

দুলারি    :         ওমা, তোমরা জানো না ওদের ওয়েডিং এনিভারসারি। কবে থেকে বলে রেখেছে।

রোকেয়া :         তা বেছে নিয়ে নে। তার জন্যে আমাকে যেতে হবে নাকি।

দুলারি    :         বাঃ, তোমার আলমারি তুমি খুলে দেবে না।

রোকেয়া :         (চাবি দিলো) আমি পারব না। ধনুমামার সঙ্গে কথা বলছি, যা খুশি বার করে নে। যা।

দুলারি চলে যায় চাবিহাতে।

মামা     :         তা রুকু ঘরবাড়ি কিছু করলি?

রোকেয়া :         না। আর হলো কই। করব বললেই তো করা হয় না। টাকা হয় তো জমি হয় না। জমি হয় তো Ñ

মামা     :         তোমাদের যে তিনকাঠা জমি ছিল তেজপুরে। কী হলো?

রোকেয়া :         ওটা তো বিক্রি করে দিলাম।

মামা     :         কাকে দিয়ে করালি?

রোকেয়া :         কাকে দিয়ে আবার। নিসারই করে দিলো।

মামা     :         তোরাও যেমন। আমাকে একটু খবর দিলে কী দোষ ছিল। যার কাজ তাকে সাজে।

রোকেয়া :         তাড়াহুড়োয় হলো। আপনি থাকলে তো ভালোই হতো। তবে ডাক্তার হলে কী হবে, এমনিতে দারুণ চটপটে। বাব্বা, লোকও কম চেনে না। দুদিনের মধ্যে ব্যবস্থা হয়ে গেল। আসলে রীনার বাবা বকুল হাউজিং সোসাইটিতে একটা প্লটের জন্য অ্যাপ্লাই করেছিল। চট করে টাকাটা জোগাড় করতে হলো।

মামা     :         আমার সঙ্গে পরামর্শ করে নিলে হতো না। দামও ভালো পেতি।

রোকেয়া :         ও তো বলে ভালোই পেয়েছে।

মামা     :         তোমরা কী করে জানো উচিত দাম পেয়েছ।

রোকেয়া :         জানি না। তবে তেমন হলে তো জানতাম।

মামা     :         জানি না বললে তো হবে না। সংসারের ভালো-মন্দ দেখতে হবে না। আমি বলছি না, আমি সাধু। বলছি আপন মানুষ। আপন মানুষও করে। পর করে না। ঘর ভাঙে আপন মানুষ। নাকি, ঠিক বলিনি।

রোকেয়া :         কী জানি মামা। আমরা তেমন ভাবি না। নিজের ভাইবোন আর ওদের মধ্যে তফাৎটাই বা কী।

মামা     :         যার নিজের ভাই, তার ভাই। যার নিজের বোন, তার বোন। তোর ছেলেমেয়ের স্বার্থ দেখতে হবে না।

রোকেয়া :         মামা আপনি বেড়াতে এসেছেন খুশি হয়েছি। আমি এ-সংসারে বৌ হওয়া অবধি ওদের দেখে আসছি। এরকম করে বললে আমি কষ্ট পাই।

মামা     :         ঠিক আছে, কষ্ট পেলে বলব না। বলি তোর ভালোর জন্যেই।

রোকেয়া :         যাই আপনাদের জন্যে চা নিয়ে আসি।

দেখা যাবে মামী স্যুটকেস ইত্যাদি খুলে জিনিসপত্র বার করছে। কাপড়-চোপড়ের সঙ্গে কিছু ফাইল ও কাগজপত্রও বেরিয়ে আসে। রোকেয়া চা নিয়ে ঢোকে।

মামী     :         (রোকেয়াকে দেখে) কোথায় রাখব এগুলো।

রোকেয়া :         (দেরাজ টেনে খুলে দেখায়) ওয়ার্ডরোব আছে। দেরাজ আছে। যেখানে খুশি।

মামা কাগজ ও ফাইলগুলো আলাদা করে গুছিয়ে এক জায়গায় জড়ো করে। তারপর দেরাজের কাছে যায়।

মামা     :         (পরপর তিনটে দেরাজ খুলে দেখিয়ে) সব খোলা। চাবি নেই?

রোকেয়া :         (চায়ের কাপে চা-চিনি ইত্যাদি মিশিয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে) কী জানি। বোধহয় নেই। থাকলেও দরকার হয় না। দরজা বন্ধ থাকে। আপনি নিশ্চিন্তে রাখতে পারবেন মামা।

মামা     :         না না। ওসব আমাকে শিখিও না। সিকিওরিটি নিয়ে কোনো পড়সঢ়ৎড়সরংব নেই। তাছাড়া ছেলেপুলের ঘর।

রোকেয়া :         (আহত হয়) যে ঘরে ছেলেপুলে নেই, সে ঘর কি নিরাপদ?

মামা     :         মিছিমিছি রাগ করলে কী করব। আমি ঠেকে শিখেছি। আমার এই ফাইল-কাগজপত্র দেখছিস Ñ সবগুলো ডকুমেন্ট Ñ দলিল। জমি, বাড়ি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির।

রোকেয়া :         কাল চাবিওয়ালা ডেকে চাবি বানিয়ে দেব। আজ রাতটা সবুর করুন। মামা চা খান। মামী Ñ

দুজনকে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দেয়।

মামা     :         (চায়ের কাপ হাতে তুলে নিয়ে) নিজের কাছে চাবি থাকলে একটু নিশ্চিন্ত বোধ করা যায়। এই আর কী? এসব দলিল খোয়া গেলে পাব কোথায়। আর তুই তো জানিস, আমার ঠিক আছে। কাজের ধান্ধায় একবার বেরুলে কখন যাই, কখন ফিরি।

রোকেয়া চায়ের কাপ তুলে নেয়। নিচে থেকে নিসারের গলায় ভাবী ডাক শোনা যায়।

রোকেয়া :         ওই কথা রইল তাহলে। চাবিওয়ালা ডেকে দেব। যাই। নিসার বোধহয় ডাকছে।

রাস্তা বরাবর হাঁটছে জাফর করিম ও ধনুমামা। দুজনকেই বেশ ক্লান্ত মনে হয়। জাফর ঘড়ি দেখে।

জাফর   :         আপনি বোধহয় হাঁপিয়ে গেলেন। কী জানি এমন তো হয় না। আজ কিছুই চোখে পড়ছে না। (বেবি-ট্যাক্সি দেখতে পেয়ে) অ্যাই যাবে?

বেবি-ট্যাক্সি        :         কই?

জাফর   :         সারকুলার রোড।

বেবি-ট্যাক্সি        :         না স্যার।

জাফর   :         যাবে না কেন। এ তো দেখি মগের মুল্লুক।

বেবি-ট্যাক্সি        :         করুম কী। ত্যাল নাই। অদ্দুর যাব না।

বেবি-ট্যাক্সি চলে গেল।

মামা     :         এসব অজুহাত। বুঝলে না। না যাবার মতলব।

জাফর   :         কী আর করা। হেঁটেই যেতে হবে।

মামা     :         চলো।

জাফর   :         আজকাল আমি নিজেও পারি না। অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে উঠি।

মামা     :         তোমার তো গাড়ি ছিল।

জাফর   :         তা তো ছিল! বিক্রি করে দিয়েই এ দশা। না করেই বা কী করি। রুকুর কাছে শুনেছেন বোধহয় একটা জমির জন্য অ্যাপ্লাই করেছিলাম। টাকাটা দিতে হলো।

মামা     :         তা বোধহয় ঠিক করনি। আজকাল গাড়ি না হলে চলে না। একটা কথা জিজ্ঞেস করি কিছু মনে করো না। বিক্রি করে পেলে কত।

জাফর   :         গাড়ির কন্ডিশন তো খুব একটা ভালো ছিল না। সাড়ে সাঁইত্রিশ। প্রথমে তো পঁয়ত্রিশ বলেছিল। আসলে নেসারই ঠিক করল। ওর জানাশোনা ছিল।

মামা     :         কী গাড়ি। কোন মডেল।

জাফর   :         ডাটসুন। আটষট্টি সালের।

মামা     :         কম পেয়েছে। নির্ঘাত ঠকিয়েছে। কম করে হলেও ষাট হাজার পাওয়া উচিত ছিল। আচ্ছা ষাট না হোক পঞ্চাশই সই।

জাফর   :         আপনার গাড়ির কারবারও আছে নাকি মামা।

মামা     :         নেই। তবে তেমন পার্টি পেলে সেল-পারচেস করি। এই দেখ না, গত মাসে ইকরাম সাহেবের মানে ওমেগা জুট মিলের এমডি Ñ কারটি বিক্রি করিয়ে দিলাম না বাষট্টি হাজারে। একে পঁয়ত্রিশ সালের মডেল, তাও টায়ার পুরনো।

জাফর   :         তা হবে। তবে নিসার কি আর বাজার যাচাই না করে ছেড়েছে।

মামা     :         করেনি বলব না। তবে না দেখেশুনে বলিইবা কী করে?

জাফর   :         কী বলবেন।

মামা     :         বাজার দেখে বলতে হবে না? হুট করে তো একটা কিছু বলা যায় না। এখনকার মার্কেট দেখি তারপর Ñ

জাফর   :         ছাড়–ন মামা। দু-পাঁচ হাজারে কী এসে যায়। সময়মতো যে টাকাটা পেলাম এই বড়।

মামা     :         না না, কথা সেটা নয়। যদি ঠকে থাক খদ্দেরকে পাকড়াও করব। আমাকে নাম-ঠিকানা দিও।

জাফর   :         ঠকাবে কী। তার সই করা রশিদেই টাকার পরিমাণ লেখা আছে।

মামা     :         রশিদ আবার একটা জিনিস হলো। একটা রশিদ এনে দিলেই হলো। কটা রশিদ চাও, কত টাকার, কার প্যাডে চাও, এক্ষুনি দিচ্ছি।

জাফর   :         কী জানি। ওসব নিয়ে কখনো ভাবিনি। নিন চেম্বারে এসে গেলাম। ডাক্তারকে কী বলবেন ঠিক করে বলুন। সঙ্গে রিপোর্টের কাগজগুলো আছে তো।

মামা     :         হ্যাঁ আছে। ভাবিনি বললে হবে না। ভাবতে হয়। আমরা অনেক সময় ঠকে যাই। নিজের কারণে, অন্যের কারণে। নিজের লোকরাও ঠকায়, ঠকায় না?

জাফর   :         ঠকাবে না কেন।

ঈঁঃ ঞড়

ডাক্তার মাহবুবুল আলমের চেম্বার। বেশ কিছু রোগী অপেক্ষমাণ। জাফরকে দেখে অ্যাপ্রন গায়ে ডাক্তারের একজন সহকারী অভ্যর্থনা জানায়।

সহকারী :         আসুন জাফর সাহেব। একটু বসতে হবে যে।

জাফর   :         আমাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল।

সহকারী :         জানি। নিসার সাহেব নিজে কথা বলে রেখেছেন, আপনার কোনো মামা-শ্বশুর বোধহয় Ñ

জাফর   :         ইনি।

সহকারী :         ও আচ্ছা। ডাক্তার সাহেবকে হঠাৎ একটা ইমারজেন্সি কলে যেতে হলো। এক্ষুনি এসে যাবেন।

মামা     :         নাকি কাল আসব?

জাফর   :         না না। একবার মিস করলে আর ধরতে পারবেন না। নিসার বলে কয়ে করিয়েছে। আমার মনে হয় এদিকটায় এসে বসুন। একটু ঠান্ডা।

মামা জায়গা পরিবর্তন করে জাফরের পাশে এসে বসে।

কী রকম, খারাপ ফিল করছেন না  তো?

মামা     :         আর খারাপ আর ভালো। আমার এরকম ছিল না। সাবুর কথা মনে আছে তোমার?

জাফর   :         হ্যাঁ, থাকবে না কেন। আপনার ভাগ্নে।

মামা     :         হ্যাঁ ভাগ্নে। চাকরি দিলাম। গদিতে বসালাম। ভালো মাইনে। ফ্রি থাকা-খাওয়া-দাওয়া, তারপরও টুকটাক তো আছেই। কিন্তু কী হলো শেষটায়।

জাফর   :         কী।

মামা     :         ডুবিয়ে দিলো না। ক্যাশ থেকে দশ হাজার টাকা নিয়ে ভেগে পড়ল। সেই থেকে শরীর-মন দুটোই ভেঙে পড়েছে। আর উৎসাহ পাই না। কী করবে বলো, নিজের লোককেও বিশ্বাস করা যায় না।

ডাক্তারের আগমন। দর্শনপ্রার্থীরা প্রায় সবাই উঠে দাঁড়ায়। ডাক্তার তাদের বসতে বলে। তারপর একসময় জাফরের কাছে যায়।

ডাক্তার  :         অনেকক্ষণ বসে বোধহয়।

জাফর   :         না না। কিছুক্ষণ হলো। ইনি আমার মামা-শ্বশুর। নিসার আপনাকে এর কথাই বলেছিল। একটু ভালো করে দেখে দিলে Ñ

ডাক্তার  :         নিশ্চয়ই। আগের রোগীদের বিদেয় করে দিই। তারপর ধীরেসুস্থে ভালো করে দেখব আপনার রোগীকে।

ডাক্তার ভেতরের চেম্বারে চলে যায়।

মামা     :         ভিজিট কত।

জাফর   :         ওসব নিয়ে আপনাকে মাথা ঘামাতে হবে না। আর নিসার বলে রেখেছে। ডাক্তাররা আবার ডাক্তারদের পেশেন্টদের কাছ থেকে নেয়ই  কিনা কে জানে।

মামা     :         না না, যদি দিতে হয়, একটা আইডিয়া থাকলে ভালো হতো না।

জাফর   :         না মামা, আপনি দেবেন কেন। মাথা খারাপ!

মামা     :         আসলে কী জানো বাবা। টাকা-পয়সার ব্যাপারে আমি সব সময় ক্লিন থাকতে চাই। যার যা ন্যায্য তাকে তা দেব। আমার যা ন্যায্য তা কড়া-ক্রান্তি গুনে নেব।

জাফরের দৃষ্টি বিদ্ধ হয় ক্লিনিকে রাখা একটি পোস্টারের প্রতি। প্রথমত পোস্টারের ওপরের অংশ পধসবৎধ-র পষড়ংব ঁঢ়-এ দেখা যাবে। প্রাথমিক ক্যান্সার দেখা দিলে কখনো উপেক্ষা করবেন না। সময় থাকতে সাবধান হন। তার পরে ক্যামরা নিচের দিকে সরে আসবে। এবার ধরা পড়বে শেষের অংশ। ক্যান্সার প্রতিরোধ সমিতি। এ সময় ডাক্তারের সহকারী মামার কাছে আসে।

সহকারী :         স্যার, আপনার রিপোর্টগুলো দিন।

মামা সঙ্গের সব কাগজপত্র ও রিপোর্ট হস্তান্তর করে। সহকারী একটা একটা করে মিলিয়ে ফেলে। এক্স-রে, ইসিজি, ইউরিন?

মামা     :         সবগুলো দিয়েছি।

সহকারী :         ও অচ্ছা। এগুলো দিয়ে আসি। আর দুটো রোগী, তারপরই স্যার আপনার।

জাফর   :         আপনি বলতে চান গাড়িতে আমার আরো বেশি টাকা পাওয়া উচিত ছিল।

মামা     :         উচিত তো ছিল। আর বেশি টাকা দেওয়া হয়েছে। তুমি পাওনি।

জাফর   :         আপনি কী বলছেন?

এ সময় একজন অপেক্ষমাণ রোগী মাথা ঘুরে পড়ে যায়। সহকারী ছুটে আসে। তাকে ধরে ক্লিনিকের ভেতর নিয়ে যায়। রোগীর সঙ্গে সম্ভবত তার ভাই। বয়স বাইশ-তেইশ। কিছুক্ষণ পরে সহকারী বেরিয়ে আসে। সঙ্গী তার সাথে কথা বলে।

(দ্রষ্টব্য : এখানে লক্ষণীয় যে, দুটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া সমান্তরালভাবে দেখানো হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংলাপ এক পক্ষের প্রতি হলেও তা অন্যের বেলাতেও প্রযোজ্য হবে। অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে এ অংশটির অভিনয় ও চিত্রায়ণ প্রয়োজন।)

সঙ্গী     :         (সহকারীকে) এই প্রথম। এরকম কখনো শুনিনি।

মামা     :         আমি কি আর না জেনেশুনে বলি।

সহকারী :         এমনি দুকথা বলে দিলাম তা তো নয়।

সঙ্গী     :         এখন কী রকম মনে করেন।

মামা     :         এসব সিরিয়াস ব্যাপার।

সঙ্গী     :         কিছু একটা করুন কাইন্ডলি

মামা     :         তুমি আমাকে যখন বলেছ, কিছু একটা না করে ছাড়ব না।

সঙ্গী     :         এরকম কোনোদিন হয়নি।

সহকারী :         হয়নি বলে যে হবে না তা তো বলা যায় না।

জাফর   :         আমি ভাবতেও পারি না।

সহকারী :         আমরা পুরো ইনভেস্টিগেশন করব।

মামা     :         ভেতরের পাটর্স না দেখে তো আর বাইরেরটা দেখে বলার উপায় নেই। দেখেশুনে বলতে হয়।

জাফর   :         তা তো বটেই।

সঙ্গী     :         টাকার জন্য ভাবছি না। টাকা গেলে টাকা আসে, কিন্তু Ñ

মামা     :         মানুষের বিশ্বাস বোধটাই বড়।

সহকারী :         মনের জোরটাই বড়। মনের জোর না থাকলে সার্ভাইব করা মুশকিল ছিল। বাড়িতে চোখে চোখে রাখতে হবে। কী হয় আপনার।

জাফর   :         ভাই। চিন্তা করো মামা আপন ভাই।

সহকারী :         আপনি বসুন। একটু ঘুমাচ্ছেন।

সঙ্গী     :         আমি অপেক্ষা করব। যতক্ষণ বলে বসব।

জাফর   :         আপনি দেখুন। অপেক্ষা করতে হয় করব।

সহকারী এবার মামা ও জাফরের কাছে আসে।

সহকারী :         স্যার, আপনার পেশেন্ট।

জাফর   :         মামা যান। আপনাকে ডাকছে।

মামা ভেতরে গেল।

জাফর ও সঙ্গী এখন পাশাপাশি। আর কোনো দর্শনপ্রার্থী নেই।

জাফর   :         কে ছিল। আপনার ভাই।

সঙ্গী     :         হ্যাঁ, সংসারে ওই আমার সব। আর কেউ নেই। হাজার হলেও মায়ের পেটের ভাই।

জাফর   :         (অন্যমনস্ক) কী বললেন।

সঙ্গী     :         বললাম, হাজার হলেও মায়ের পেটের ভাই। আপনি বুঝবেন না।

জাফর   :         বুঝব না কেন। অবশ্যই বুঝব। মায়ের পেটের ভাই কী জিনিস বুঝব না?

ঈঁঃ ঃড়

ধনুমামার ঘরের দরজা ও আলমারির জন্য চাবি তৈরি হয়েছে। চাবিওয়ালা চাবি লাগিয়ে দেখছে। প্রয়োজনমতো খাঁজ কাটছে। সাবধানতার সঙ্গে কাজ তদারক করছে ধনুমামা। একপর্যায়ে চাবিওয়ালা চাবি বানানো শেষ করে তা ধনুমামার হাতে অর্পণ করে। দেখা যায় প্রতিটি দরজার এবং আলমারিতে তৈরি করা চাবি ঝোলানো।

চাবিওয়ালা        :         (ধনুমামাকে) একবার দেখে নিন স্যার।

ধনুমামা এক একটা করে দেরাজ পরীক্ষা করে। চাবি ঘুরিয়ে খোলে এবং বন্ধ করে।

মামা     :         (কোনো একটি চাবি ঘোরাতে অসুবিধে হওয়ায়) না, এটা তো খুলছে না। কী চাবি দিলে।

চাবিওয়ালা উঠে এসে দু-একবার চেষ্টা করতেই দেরাজ খুলে যায়। মামা সন্তুষ্ট হয়। চাবিওয়ালা জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখে। মেঝেতে পড়ে থাকা একটি চাবি তার নিজের চাবির গোছায় রাখতে যায়।

মামা     :         ওটা বাড়তি চাবি না?

চাবিওয়ালা        :         এক্সট্রা চাবি। আপনার কাজে লাগবে না।

মামা     :         কাজে লাগুক আর না লাগুক। রেখে যাও। ফালতু চাবি বলে দেরাজের ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে যাবে, তা তো হয় না।

চাবিওয়ালা        :         (বিরক্তির সঙ্গে চাবি দেয়) রাখতে চান রাখুন।

                   মামীর প্রবেশ

মামী     :         কী, তৈরি হলো চাবি?

মামা     :         তা তো হলো। একটা বাড়তি চাবি নিয়ে যাচ্ছিল ফেরত চেয়ে নিলাম। বুঝলে না, দেরাজের চাবি। কখন কার হাতে চলে যায়।

চাবিওয়ালা        :         (পুরো চাবির গোছা দেখিয়ে) ইচ্ছে করলে পুরো চাবির গোছাটাই রেখে দিতে পারেন স্যার। নিজের অন্যের সব দেরাজই খুলতে পারবেন।

চাবিওয়ালা চলে যায়। মামা রেগে যায়, কিন্তু কিছু বলে না।

মামী     :         উহ্, চাবি চাবি করে মরছিলে। হলো তো এবার।

মামা     :         কী জানি, দু সেটে ডুপ্লিকেট বানিয়ে নিয়ে গেল কি না। তা তো আর চোখে চোখে রাখতে পারি না।

মামা এবার তার দলিল-কাগজপত্র-ফাইল ইত্যাদি দেরাজে ভরতে থাকে এবং চাবি লাগাতে থাকে।

মামী     :         তোমার যত আজগুবি সন্দেহ।

মামা কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে বসে। মনে হয় কিছুটা ক্লান্ত। শার্ট খুলে নেয়।

মামা     :         গোসলের গরম পানি দিতে বলেছিলাম। দেখ তো কী হলো।

মামী     :         পান্নাকে তো বলেছিলাম। বলল, একটু দেরি হবে। ছোট সাহেবের জন্যে পানি গরম হচ্ছে।

মামা     :         ছোট সাহেব আবার কে?

মামী     :         ডাক্তার, ডাক্তার নিসার।

মামা     :         ও। নাঃ, জাফর আমাদের দেখছে না। আগে সকাল-বিকেল খোঁজ নিত।

মামী     :         সেটা বলো কী করে। যা করার সবই তো করছে। আর আবার কেমন করে দেখবে?

মামা     :         মানি সবই করছে। তবে আগের মতো নয়।

মামী     :         মানুষ সব সময় একরকম থাকে নাকি।

মামা     :         আগে ছোটবড় সব ব্যাপারে পরামর্শ করত। ডাকত।

মামী     :         দরকার হয়নি, করেনি, ডাকেনি। দরকার হলে ডাকবে।

মামা     :         আর ডাকবে। দেখছ না ওই ডাক্তার আর তার বোন কী নাম যেন Ñ দুলারি Ñ কেমন হাত করে ফেলেছে। জমিজমা আমাকে দিয়ে বিক্রি করালে দুটো কমিশন পাই Ñ জাফর জানে না? আসলে ভাইবোন মিলে ওর মাথা খাচ্ছে।

মামী     :         না জেনেশুনে যা-তা বলো না তো।

মামা     :         তুমি জানো না। ওরা লাল বাতি না জ্বালিয়ে ছাড়বে না। ওদের খপ্পর থেকে বাঁচাতে হবে।

মামী     :         কী করবে শুনি?

মামা     :         তুমি বুঝবে না। কিছু না, শুধু এদিককার তাস ওদিক। আর ওদিককার তাস এদিক।

মামী     :         এসব কথা আমার ভালো লাগে না। আমি যাই।

মামীর প্রস্থান। রোকেয়ার প্রবেশ।

রোকেয়া :         দেরাজের তালা-চাবিগুলো দেখে নিয়েছেন তো?  ঠিক আছে?

মামা     :         (নিরাসক্ত ভাব) কাজ চলে যাবে।

রোকেয়া :         নিজে দাঁড়িয়ে দেখে নিয়েছেন তো। ব্যাটাছেলেরা সুযোগ পেলেই ফাঁকি দেয়। (নিজেই দেরাজে চাবি লাগিয়ে পরীক্ষা করে) ঠিকমতো লাগে তো।

(দ্রষ্টব্য : চাবির ওপর ঈষড়ংব ঁঢ় ংযড়ঃ হবে।)

মামা     :         তা লাগে।

রোকেয়া :         ভালো। আমি চলি মামা। আমাকে আবার দুলারিকে সঙ্গে নিয়ে জাফরের এখানে যেতে হবে। কী কাপড়-চোপড় সেলাই করতে হবে। আপনার কিছু দরকার নেই তো।

মামা     :         না দরকার, মানে একটু গরম পানি চেয়েছিলাম।

রোকেয়া :         সে কী, কাউকে বললেই হতো।

মামা     :         কাকে বলব। তোর মামী কাজের মেয়েটাকে বলেছিল। মুখের ওপর শুনিয়ে দিলো Ñ ছোট সাবের পানি গরম হচ্ছে। তাছাড়া বাথরুমেও পানি ছিল না।

রোকেয়া :         হ্যাঁ, ওর একটু তাড়াহুড়ো ছিল বোধহয়। বাথরুমে পানি নেই তাতে কী। আমাদেরটায় চলে যেতেন। আপনার পানি পাঠিয়ে দিচ্ছি এক্ষুনি।

রোকেয়া নেবে যায়। ওপরে দাঁড়িয়ে দেখতে পায় মামা রোকেয়া নিসারের টাই ঠিক করে দিচ্ছে।

রোকেয়া :         দাঁড়াও। টাইটা তো ঠিক করো। হুট করে চলে গেলেই হলো।

                   নিসার গলা বাড়িয়ে দেয়। রোকেয়া নট ঠিক করে দেয়।

মামা     :         এসো এসো অফিস থেকে এই ফিরলে নাকি।

জাফর   :         হ্যাঁ, এই তো। তা কী আর।

মামা     :         খোঁজ নিয়ে আসলাম আজ।

ঈঁঃ ঃড়

জাফর এবং ধনুমামাকে ড্রয়িংরুমে বসে আলাপ করতে দেখা যাবে। ড্রয়িংরুম মামুলিভাবে সাজানো। একধারে শোকেস। তাতে রকমারি জিনিস। সে সঙ্গে গাড়ির কিছু মিনি মডেল।

জাফর   :         আপনি নিজে গিয়েছিলেন?

মামা     :         তবে আর কী বলছি। তরিকুল ছেলেবেলার বন্ধু। বড়মতো দোকান, কার কর্নার, দেখেছ বোধহয়। স্টেশন রোডে ওই যে, মানে ওদের গাড়ির কেনা-বেচার কারবার আর কী।

জাফর   :         কী বলল?

মামা     :         সে অনেক কথা। ছাড়তেই চায় না। এ-গল্প সে-গল্প। তা তোমার গাড়ির কথা তুলতেই বলল, দাও। এক্ষুনি ষাট হাজার ক্যাশ ডাউন করছি।

জাফর   :         বলেন কী মামা!

মামা     :         এক কাজ করো তো। যে গাড়িটা কিনেছিল তার ঠিকানাটা দাও। আমি নিজে গিয়ে একবার কথা বলে আসব।

জাফর   :         ঠিকানা তো জানি না।

মামা     :         ওই রশিদ হলেই বলবে। ওতেই ঠিকানা পাব।

জাফর   :         দাঁড়ান দিচ্ছি। এক মিনিট।

জাফর ভেতরে গেল এবং কিছুক্ষণ পর রশিদ নিয়ে বেরিয়ে এলো।

জাফর   :         (রশিদ দিলো) ঠিকানা লিখে দেব?

মামা     :         দরকার নেই। অরিজিন্যালটাই থাক। (ভাঁজ করে পকেটে রেখে দিলো। একটু থেমে নিয়ে) বয়েস তো কম হলো না। পৃথিবীটা দেখতে বাকি নেই। কাকে বিশ্বাস করবে, বলো?

জাফর   :         ঠিক কথা মামা। তবে না জেনেশুনে কাকেই বা সন্দেহ করব।

                    রোকেয়া এসে ঢুকল। সোফায় বসল।

রোকেয়া :         (জাফরকে) কাল সন্ধেয় কোনো কাজ আছে?

জাফর   :         না কেন?

রোকেয়া :         চল না, একটু মেডিক্যাল কলেজে যাই।

জাফর   :         সেখানে কেন?

রোকেয়া :         ডক্টরস ক্লাবে ফাংশনে ডেকেছে নিসার। ভালো ভালো আর্টিস্ট আসছে। যাবে নাকি। আপনিও চলুন না মামা।

জাফর   :         বাদ দাও। অত সময় বসে থাকা পোষায় না।

রোকেয়া :         মামা ?

মামা     :         গানটান বুঝিটুঝি না। আর এ বয়েসে ভালোও লাগে না।

                   রীনা এসে ঢোকে।

রীনা     :         তোমার ক্যালকুলেটর নিতে পারি?

জাফর মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। রীনা ভেতর থেকে ক্যালকুলেটর সংগ্রহ করে আবার ড্রয়িংরুম দিয়ে বেরিয়ে যেতে থাকে। বাবলু এ সময় মায়ের কাছে এসে বসে।

রোকেয়া :         রীনা, কাল ভ্যারাইটিতে যাবি?

রীনা     :         আঙ্কলের ফাংশন তো। আমি যাব না।

রোকেয়া :         কেন, কী হলো তোর আবার।

রীনা     :         আঙ্কল তো আমাকেও একটা কার্ড দিতে পারত।

রোকেয়া :         বেচারি কষ্ট করে দুটো জোগাড় করেছে। সেই বেশি। একটা আমার, আরেকটা তোর বাবার জন্যে। ভালো কথা, দুলারি ফেরেনি?

রীনা     :         আন্টির দেরি হবে। ইউনিভার্সিটিতে কাজ আছে।

বাবলু    :         মা, আমি যাব আঙ্কলের ফাংশনে।

রোকেয়া :         না। কেউ যাবে না। যাও পড়াশুনো করো গে।

মামা     :         যাই। পাশের ক্লিনিক থেকে একটু ঘুরে আসি। ব্লাড প্রেসারটা চেক করিয়ে আসি।

জাফর   :         খেয়ে যান। এই দুপুরে কোথায় ছুটবেন। নাসির আসুক। দেখে দেবে।

মামা     :         না থাক। দেরি হলে তোমরা খেয়ে নিও। আমি পরে খাব।

রোকেয়া :         কী ব্যাপার, আজ যে তাড়াতাড়ি ফিরে এলে।

জাফর   :         মন-মেজাজ ভালো নেই। শরীরের কী দোষ?

রোকেয়া :         হঠাৎ মন খারাপ হলো কেন।

জাফর   :         তোমার ধনুমামা বলছিল গাড়িটায় কম টাকা পেয়েছি। বড্ড ঠকা ঠকেছি।

রোকেয়া :         আগের গাড়ি। মামা বলল আর অমনি ভাবনায় পড়ে গেলে। বেচারি নিসার যা পেরেছে করেছে। ওকে দোষ দিয়ে কী লাভ।

জাফর   :         তোমার মামা বলে কম করে হলেও ওই গাড়িতে ষাট হাজার পাওয়া উচিত ছিল। ওর জানাশোনা কার-ডিলার বলেছে।

রোকেয়া :         পাওয়া উচিত বলে কী হবে। পাও তো নি।

(দ্রষ্টব্য : জাফর উঠে গিয়ে শোকেসে রাখা মোটরগাড়ির একখানা মিনি মডেল নিয়ে তার চাকা ঘোরাতে থাকবে। ঘটনাটি ঈষড়ংব ঁঢ়-এ দেখানো হবে।)

জাফর   :         কথা তো সেটাই। মানে Ñ (খানিকটা ইতস্তত) ধরো টাকাটা দেওয়া হলো, অথচ আমার হাতে এলো না।

রোকেয়া :         (উঠে দাঁড়ায়) এ কিরকম কথা বলছ।

জাফর   :         যা শুনি তাই বলছি। আর নিজেও তো দেখছি খরচের বহর। এত নতুন জামা-কাপড় আনে কোত্থেকে।

রোকেয়া :         কেন ইন্টার্নশিপ করে টাকা পায় না? তাছাড়া দু-চারজন করে রোগীও তো দেখছে।

জাফর   :         তোমাদেরও যেমন বোঝায় তেমনি বোঝ।

রোকেয়া :         কী হয়েছে বল তো, যা খুশি বলছ। নিজের ভাই। একটা বিচার-বিবেচনাও তো থাকা চাই।

রীনার প্রবেশ। সঙ্গে বাবুল। রীনা ক্যালকুলেটর রেখে দেয়।

রীনা     :         হলো না। বোধহয় ব্যাটারি নেই। আগাগোড়া হিসাবেই ভুল।

বাবলু    :         আমি কাল সকালে আঙ্কলের সঙ্গে যাব।

জাফর   :         কোথায়?

বাবলু    :         আঙ্কল বলেছে চশমা বদলে দেবে।

জাফর   :         এখন না পরে। টাকা লাগবে না?

বাবলু    :         না, আঙ্কল বলেছে চশমা কিনে দেবে।

                   পান্নার প্রবেশ

পান্না     :         খাইতে আসেন। টেবিলে লাগানো হইসে।

রোকেয়া :         মামা-মামীদের খবর দে।

পান্না     :         তেনারা পরে খাইব।

আগের মতো যে যার জায়গায় খাবার টেবিলের চারপাশে বসে যায়। কেবল দুলারি নিসার, মামা এবং মামী অনুপস্থিত। পান্না একখানা চিঠি দিয়ে যায় রীনার হাতে।

জাফর   :         কার চিঠি।

রীনা     :         ডক্টর নিসার করিম আঙ্কলের।

জাফর   :         দেখি দেখি। (হাতে নেয়। উলটে-পালটে দেখে, কিন্তু (খোলে না) ব্যাংকের চিঠি দেখছি।

রোকেয়া :         রেখে দাও। তুমি নাড়াচাড়া করছ কেন।

জাফর   :         দেখব?

রোকেয়া :         (চিঠি কেড়ে নেয়) আরেকজনের জিনিস তুমি দেখবে কেন?

এ সময় নিসার এসে ঢোকে। যথাস্থানে এসে বসে। তাকে রীতিমতো প্রসন্ন মনে হয়।

বাবলু    :         আঙ্কলের চিঠি আছে।

নিসার    :         কই? দেখি।

রোকেয়া চিঠি দেয়। চিঠি খুলে পড়ে হাসে। তারপর ছিঁড়ে ফেলে। সবাই লক্ষ করে।

জাফর   :         প্র্যাকটিস কেমন হচ্ছে।

নিসার    :         না। সবই খয়রাতি পেশেন্ট। এমনিতে বসি বসতে হয় বলে।

জাফর   :         প্র্যাকটিস হচ্ছে না, তবু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে যাচ্ছিস।

নিসার    :         ও, ওই চিঠি। নতুন জমা না দিলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেবে তার নোটিশ।

জাফর   :         চিঠি ছিঁড়ে ফেললি কেন?

নিসার    :         কী করব, এসব নোটিশের বোঝা বাড়িয়ে।

জাফর   :         নিসার।

নিসার    :         জি।

জাফর   :         দুটো-চারটে পয়সা জীবনে বড় নয়। সততা বড়। বড় অনেস্টি।

নিসার    :         আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। হঠাৎ কেউ কিছু বলেছে না কি।

জাফর   :         বলতে যাবে কেন। নিজেই দেখছি।

নিসার    :         সেরকম কিছু হয়নি ভাইয়া। আমি বরং সকলের তুলনায় কমই নিই। হ্যাঁ, কাল তালুকদাররা এসেছিল। ব্যাটা তো মেলা পয়সার মালিক। তাও ফি চাইতেই বলে কিনা আপনি জাফর সাহেবের ভাই। আমি বললাম, তাতে কী হয়েছে? যেটা প্রাপ্য সেটা দেবেন না?

জাফর   :         আমি তোর প্র্যাকটিসের কথা বলছি না।

নিসার    :         আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি কাউকে ঠকিয়ে পয়সা নিই কেউ বলতে পারবে না।

জাফর   :         ঠকিয়ে পয়সা নেওয়া আর পয়সা নিয়ে ঠকানো একই কথা। আমি বলছি না। লোকজন বলছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে বলছে। ওদের মুখ কেমন করে বন্ধ করবি।

নিসার    :         ভাইয়া আমি Ñ

জাফর   :         গাড়িটা আরো বেশি টাকায় বিক্রি হয়েছিল।

নিসার    :         আমি গাড়ি বিক্রি করে তোমাকে ঠকিয়েছি। কম পয়সা দিয়েছি Ñ

জাফর   :         তাতে কিছু ছিল না। দিতাম, চাইলে আমিই দিতাম। প্রথমে বিশ্বাস হয়নি, ধনুমামা আমার চোখ খুলে দিলেন।

নিসার    :         যদি জোরগলায় বলি অন্যায় সন্দেহ করছ, লাভ নেই। সততার কাজ ওভাবে বোঝানো যায় না। চাপাবাজি করে, টেবিল চাপড়ে কোনোভাবেই না।

জাফর   :         আমি বলতে চাইনি।

রোকেয়া :         তুমি থামবে?

জাফর   :         থামবো কেন। তোমাদের পেছনে টাকা না  ঢেলে নিজের জন্যেও খরচ করতে পারতাম। হতে পারত কিছু বাড়তি সুখ, কিছু স্বাচ্ছন্দ্য। হয়তো এ চাকরি নিয়ে পড়ে থাকতে হতো না।

নিসার ন্যাপকিনে মুখ মুছে নিল। খাবার ছেড়ে দিলো।

রোকেয়া :         তোমার কী হয়েছে বলো তো?

নিসার    :         না না, ভাবি। বলে ভালোই হয়েছে। অযথা মনে যন্ত্রণা পুষে কী লাভ।

                             উঠে পড়ার উপক্রম করে

রোকেয়া :         খাবি না?

নিসার    :         না খাবার টেবিলে আর দেখা হবে না। রীনা এ সুযোগে ইচ্ছে করলে একটা ফেয়ারওয়েল স্পিচও দিতে পারতি।

রীনা     :         (কান্নায় ভেঙে পড়ে) আঙ্কল।

রীনা দ্রুত টেবিল ছেড়ে উঠে যায়। বাবলুও তার অনুসরণ করে।

জাফর   :         (কিছুটা ইতস্তত) ফেয়ারওয়েলের কথা ওঠে কেন। আমি থাকা   না-থাকার কথা বলিনি।

রোকেয়া :         তোমার কি মাথা খারাপ। আমি ভেবে পাই না তোমাকে কে কি বলল তা নিয়ে বাড়ি মাথায় করে তুলবে। কাকে ঠকাচ্ছে না। খুব তো ঠকানোর গপ্প হচ্ছে। তুমি ঠকাওনি?

নিসার রোকেয়ার হাতে মৃদু চাপ দিয়ে তাকে নিরস্ত হতে বলে চলে যায়।

জাফর   :         আমি কাউকে ঠকাইনি।

নিসার    :         নিজে ঠকেছ, সে কথা জোরগলায় প্রচার করে তারচেয়ে বেশি ঠকিয়েছ। তোমার কাছে বড় হলো, মানুষ হলো আর আজ এক কথায় তাকে খারিজ করে দিলে।

জাফর   :         সত্যি না হলে নিজেই বলুক।

রোকেয়া :         কিসের জন্যে বলবে। বললেই তুমি বিশ্বাস করবে। না বললে ফাঁসিয়ে দেবে?

জাফর   :         তোমার মামা বলল।

রোকেয়া :         মামা বলল, মামা বলল। মামার কথা কি বেদ বাক্য

                                                এসময় নিসার আবার আসে।

নিসার    :         (একটা রিপোর্ট হাতে) ভাবি এটা কথা তোমার ব্লাডে ইউসোনোফিল একটু বেশি। ওষুধ লিখে দিয়েছি।

রোকেয়া :         ওসবের দরকার নেই।

নিসার    :         তুমি একজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছ।

                             নিসার চলে যায়

জাফর   :         ও কী, চলে যাবে নাকি?

রোকেয়া :         তুমি কী আশা করেছিলে? আমি নিজে হলেও কি থাকতাম?

ঈঁঃ ঃড়

রোকেয়াদের বেডরুম। দেখা যাবে জাফর লম্বা হয়ে বেডল্যাম্প জ্বালিয়ে পত্রিকা পড়ছে। হাতে সিগ্রেট ধরানো। রোকেয়া আলমারি খুলে শাড়ি, জামা-কাপড় স্তূপ করে রাখে বিছানায়। তারপর আবার সেগুলো এক এক করে আলমরিতে সাজাতে থাকে।

জাফর   :         হঠাৎ এই কাপড়-চোপড় নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়া কেন।

রোকেয়া :         আর বলো না, দুলারি ওর কাপড়গুলো তাড়াহুড়ো করে বার করে নিয়ে কি অবস্থা করে রেখেছে দেখ। সব ল-ভ-।

জাফর   :         হঠাৎ দুলারি শাড়ি কাপড় আলাদা করে নিল কেন।

রোকেয়া :         তা আমি কী জানি। বলল ভাবি আমারগুলো বের করে দিন। নিজের স্যুটকেসেই রাখব।

জাফর   :         আশ্চর্য।

রোকেয়া :         বলে সেদিন আলমারি খুলে দেখলাম তোমার একটা চেইন। পরার ইচ্ছে হলো। আমি বললাম, পরলি না কেন।

জাফর   :         কী বলল।

রোকেয়া :         বলল, না পরে ভালোই করেছি। কবে আবার কী সন্দেহ করে বসতে।

জাফর   :         ঠিক আছে। যার যার জিনিস তার কাছেই থাকা ভালো।

রোকেয়া :         তোমার আবার সব ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি। নিজের বোনকেও ছাড়ো না দেখছি। আগে তো এরকম ছিলে না।

জাফর   :         ঠেকে শিখেছি।

এক সময় দেখা যাবে আলমারির কোনো শেল্ফ থেকে কিছু টাকা বার করে গুনতে শুরু করে রোকেয়া। জাফর লক্ষ করে।

জাফর   :         হঠাৎ টাকা গুনছেন।

রোকেয়া :         আচ্ছা তেজপুরের জমি বিক্রি করে আমার হাতে কত দিয়েছিল?

জাফর   :         তা তো মনে নেই। খরচ তো তুমিই করেছ।

রোকেয়া :         তা তো করছি। (নোটের বান্ডিল হাতে নিয়ে) কেমন হালকা হালকা লাগছে। কী জানি বাপু। মাথায় কিছু আসছে না।

টাকার বান্ডিল যথাস্থানে রেখে দেয়। আবার দেখা যাবে রোকেয়া শাড়ি-কাপড় গুছিয়ে রাখতে ব্যস্ত। এক সময় কী যেন দ্রুত খুঁজতে থাকবে।

রোকেয়া :         শুনছ, শুনছ। আমার হীরের কানের দুল ছিল না, তার একটা পাওয়া যাচ্ছে না।

জাফর   :         (নিরাসক্ত ভাবে) দেখ হবে কোথাও।

রোকেয়া :         না। কোথাও নেই। কী, ব্যাপার কী। কী হচ্ছে এসব?

জাফর   :         চাকর-বাকরদের ওপর সন্দেহ?

রোকেয়া :         চাকর-বাকরদের ওপর সন্দেহ হবে কেন। ওরা আমার বেডরুমেই আসে না।

এসময় দরজায় টোকা পড়ে। ধনুমামা এসে ঢোকে। হাতে তোয়ালে-সাবান।

মামা     :         তোমাদের বাথরুমটা একটু ইউজ করতে পারি। কোনোটা খালি নেই। একটু হাত-মুখ ধুবো।

          জাফর উঠে বসে।

জাফর   :         নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই।

ধনুমামা বাথরুমে যায়। এ সময় মামী এসে ঢোকে।

মামী     :         তোমার মামা কি বাথরুমে।

রোকেয়া :         হ্যাঁ।

মামী     :         (কাপড়-চোপড় ছড়ানো অবস্থায় দেখে) কী ব্যাপার? কাপড়-চোপড় বিছানায় ছড়ানো।

রোকেয়া :         (মামীর হাত ধরে বিছানায় বসায়) এ বাড়িতে ভূতের উপদ্রব হয়েছে। আমার কানের একটা দুল পাচ্ছি না।

মামী     :         আমরা মা তোমার বেডরুমে আসি না।

জাফর   :         না না। ছি ছি। এসব কী বলছেন।

এসময় মুখ মুছতে মুছতে মামা বেরিয়ে এসে যোগদান করে।

মামী     :         (আমাকে) রোকেয়া কানের দুল পাচ্ছে না।

মামা     :         কাকে কী বলবি। আমার নিজের ভাগ্নে সাবু ক্যাশের টাকা নিয়ে চলে গেল। তা তোর আলমারির কি ডুপ্লিকেট চাবি ছিল?

রোকেয়া :         থাকতে পারে। ওসব কী আর মনে আছে।

মামা     :         আমি এমনি বলি না। বড় কষ্টে বলি রে, বড় কষ্টে বলি।

                             মামা-মামী বেরিয়ে যায়

রোকেয়া :         পান্না, পান্না।

          পান্না আসে।

পান্না     :         জি বেগম সাহেব।

রোকেয়া :         দুলারিকে ডাক।

পান্না     :         উনি তো আসে নাই। রীনা আফার সঙ্গে কোনো নাটক দেখবার গেল।

রোকেয়া :         আচ্ছা যা। এলে পাঠিয়ে দিস। তোমার মেয়েটাও উড়নচ-ি হয়ে যাচ্ছে সব সময় কথায় কথায় আন্টি আন্টি।

                                                             দুলারির প্রবেশ।

রীনা     :         গেলে না মা। দারুণ নাটক। টপ্ কাস্ট।

রোকেয়া :         নাটক আর দেখতে হবে না। এমনিতেই যে নাটক দেখছি। (রীনাকে) যা কাপড়-চোপড় বদলে আয়। একশবার বলেছি বাইরে থেকে এসেই কাপড় বদলাবি।

রীনা     :         যাই। যাই।

রীনা চলে যায়। কিছুক্ষণ পরে দুলারি আসে।

দুলারি    :         আমাকে ডাকছিলে?

রোকেয়া :         হ্যাঁ, দুলারি আমার কানের একটা দুল পাওয়া যাচ্ছে না।

দুলারি    :         ভাগ্যিস আমি সেদিন নিজের কাপড়-চোপড়গুলো সরিয়ে নিলাম।

রোকেয়া :         সেটা আর কেমন করে বলব কখন গেল। আজ গোছগাছ করতে গিয়ে চোখে পড়ল। আমি তোর ভাইয়ের মতো নই।                 কারণে-অকারণে লোককে সন্দেহ করি না।

দুলারি    :         সে কথা আমাকে বলার মানে।

রোকেয়া :         এমনি বললাম। তবে এখন আর বলেই কী হবে।

দুলারি    :         তুমি কি আমাকে উপলক্ষ করে বলছ।

রোকেয়া :         না না, তা কেন বলব। তবে জিজ্ঞেস করতে তো কোনো দোষ নেই।

দুলারি    :         তাছাড়া আমি যখন মাঝে মধ্যে তোমার আলমারিও খুলেছি। পুলিশে খবর দেবে?

রোকেয়া :         রসিকতা করছিস?

দুলারি    :         রসিকতা করব কেন?

রোকেয়া :         আমার মনে কি দুঃখ জানিস? তোদের কোনোদিন আপন ছাড়া পর ভাবিনি।

দুলারি    :         ওটাই তো মস্ত ভুল করেছ। ওই জন্যেই তো পুলিশে খবর দাও।

ঙঁঃ ঃড়

কাসেম আলী বলে এক ভদ্রলোক দরজায় বেল বাজায়। জাফর বেরিয়ে আসে।

কাসেম  :         এটা কি মি. জাফর করিমের বাসা?

জাফর   :         হ্যাঁ, কিন্তু আপনাকে Ñ

কাসেম  :         দেখুন আমাকে আপনার চেনার কথা নয়। চিনবেন আপনার ভাই ডক্টর নিসার। কোথায় তিনি?

জাফর   :         এখন তো এখানে থাকেন না।

কাসেম  :         এখানে থাকেন না তো কোথায় থাকেন। আপনি তো ওর বড়ভাই।

জাফর   :         হ্যাঁ।

কাসেম  :         এসব কী শুনছি। গাড়ি বিক্রি করে আপনি কি আমার মাথা কিনে নিয়েছেন।

জাফর   :         আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

কাসেম  :         আপনার এক লোক সেদিন এসে জিজ্ঞেস করে গেল কত টাকা দিয়েছি। ওয়েল, কত দিয়েছি সেটা আমি অন্য পার্টিকে বলতে বাধ্য নই। রিসিপ্টে লেখা আছে। সমস্যাটা কী। বাই দি বাই, উনি কি ইনকাম ট্যাক্সের লোক।

জাফর   :         না। আমার মামা-শ্বশুর। না, দামটা যাচাই করে দেখছিলেন।

কাসেম  :         বিশ্বাস করুন শুধু ডক্টর নিসারের কথায় থার্টি এইট থাউজেন্ড দিয়েছি। আপনারা তো আমাকে বলেননি কার। গাড়ি দুবার অ্যাকসিডেন্ট করেছে। দুবার ইঞ্জিন ডাউন করেছি। আপনারা ঠকিয়েছেন।

জাফর   :         কিন্তু আমরা শুনেছি বাজারে গাড়ি Ñ

কাসেম  :         ঠিক কথা, আরো বেশি দামে বিক্রি হয়। আপনাদের এই রদ্দি অ্যাকসিডেন্ট করা গাড়ি নয়। ভেতরের স্টিয়ারিং খারাপ, ক্লাচ খারাপ, ব্রেক লাইনিং নেই। চান তো এখুনি ফেরত নিতে পারেন। ওই লক্কড় মার্কা গাড়ির জন্যে অন্য কেউ হলে পনেরো হাজারও দিত না। সত্যি কথা বলতে আপনার ভাইটি হ্যাজ চিটেড মি। তার সঙ্গে একটু বোঝাপড়া দরকার।

জাফর   :         আমরা দুঃখিত। ব্যাপারটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকবে। ওর দোষ নেই।

কাসেম  :         তাহলে সে কথা বলুন। স্বীকার করুন। দু-দশ হাজার তো আমার কিছু এসে যায় না। আমরা বিজনেসম্যান, প্রেসটিজটা বড় কথা।

                   কাসেম আলী চলে যায়। রোকেয়া দাঁড়িয়ে শুনছিল।

জাফর   :         শুনলে?

রোকেয়া :         হুঁ। তবে না শুনলেও আমার সন্দেহ ছিল না।

জাফর   :         নিসার থাকে কোথায়?

রোকেয়া :         শুনেছি শ্যামলী ফ্ল্যাট নিয়েছে। আমাকে তো ঠিকানা দিয়ে যায়নি। বোধহয় রীনা জানে। ওকে টেলিফোন করে শুনেছি। কিন্তু কেন।

জাফর   :         কেমন বিশ্রি ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেল। তাকে সমস্ত ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে না পারলে কষ্টের সীমা থাকবে না।

রোকেয়া :         পৃথিবীতে যার যার কষ্ট নিয়েই আমাদের চলতে হয়। কারো কিছু করার নেই। তুমি ঠকেছ। ঠকিয়েছ। অন্যরাও ঠকেছে। ঠকাবে। এ থেকে পরিত্রাণ নেই।

জাফর   :         ঞযধঃ নষবংংবফ মবহঃষবসধহ তোমার মামা কোথায়?

রোকেয়া :         এখন চটাচটি করে কী হবে। তোমার যাওয়া উচিত ছিল।

জাফর   :         আমার সঙ্গে উচিতছিল? আমি বলেছিলাম গিয়ে গোয়েন্দাগিরি করো?

রোকেয়া :         তুমি বলনি। তার দরকার ছিল।

জাফর   :         কী দরকার?

রোকেয়া :         দরকার ছিল তোমার আস্থাভাজন হবার। ভবিষ্যতে ব্যবসা পাবার আশায়।

জাফর   :         তাই বলে ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাইকে লেলিয়ে দেবে। (কিছুক্ষণ থেমে) আর তুমি Ñ তুমিও তো দুলারিকে বলতে ছাড়নি।

রোকেয়া :         অন্যায় করেছি। কিন্তু এক অন্যায় দিয়ে তো আরেক অন্যায় মোচন হয় না।

জাফর   :         তবু তোমার মামার কাছে অতটা আশা করিনি।

রোকেয়া :         ওসব কথা ছাড়। নিসারই কি আশা করেছিল তুমি অতটা নিচে নামবে। দুলারি কি ভেবেছিল আমি তার কাছে কৈফয়ত চাইব। মামার আর আমাদের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই।

জাফর   :         কোথায় তলিয়ে গেল আমাদের বিশ্বাস। চেতনা, মমত্ববোধ।

রোকেয়া :         সেজন্য এখন আপসোস করে কী হবে।

জাফর   :         আবার কী আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া যায় না।

 রোকেয়া         :         না। গেলেও সন্দেহের গোখরো সাপটার কী করবে। ওটা যে ক্রমাগতই তাড়া করে বেড়াবে।

জাফর   :         (দীর্ঘশ্বাস) হুঁ। যাই। ঘুরে আসি। মাথাটা কেমন ধরেছে।

                   দেখা যাবে জাফর সিঁড়ি দিয়ে ওপরতলা থেকে নামতে থাকবে।

বেডরুমে অর্ধশায়িত অবস্থায় রোকেয়া। হাতে একখানা বইধরা। কিন্তু মন বসছে না। কেমন চিন্তাগ্রস্ত। বিছানার পাশেই টেবিল ক্লক। সন্ধ্যা সাতটা বাজে ঘড়িতে। এমন সময় রীনা ছুটে আসে।

রীনা     :         মা মা, আন্টি।

রোকেয়া :         (সচকিত হয়ে উঠে বসে) কই কই।

রীনা     :         কী জানি, এসেই কাপড় গুছোচ্ছে। পাঠিয়ে দেব?

রোকেয়া :         হ্যাঁ, পাঠিয়ে দে।

রোকেয়া :         দুলারি কোথায় তুই। সারাদিন এলি না। আমি চিন্তায় চিন্তায় অস্থির।

দুলারি    :         জানি, রাগ করবে ভাবি। তোমাদের না বলেই হোস্টেলে সিট নিয়ে নিলাম। ভাবছিলাম জিনিসপত্রগুলো নিয়ে যাব।

রোকেয়া :         কী একটা বললাম, রাগ করলি অমনি।

দুলারি    :         বাড়ি ছাড়ার কথা নয় ভাবি। তাহলে তো নিসারের ওখানেও যেতে পারতাম। বড় ফ্ল্যাট নিয়েছে। আসতেও বলেছিল। গেলাম না।

রোকেয়া :         তাহলে সেখানে গেলেই পারতি। তবু হোস্টেল থেকে ভালো ছিল।

দুলারি    :         এই ভাইয়ের সঙ্গে থাকা গেল না। অন্য ভাইয়ের সঙ্গে পারব তার কী ভরসা।

রোকেয়া :         তবু কেমন কথা হলো। হোস্টেলে থাকবি।

দুলারি    :         (সলজ্জ ভঙ্গিতে) দোয়া করো যেন বেশিদিন থাকতে না হয়। (একটু থেমে গিয়ে) কামালকে তো চেন?

রোকেয়া :         তোদের সঙ্গে পড়ত, সেই?

দুলারি    :         হ্যাঁ, ওর বাবা-মার পছন্দ হয়েছে আমাকে। এখন শুধু তোমাদের আশীর্বাদ। আপত্তি নেই তো?

রোকেয়া :         তোর সুখই আমাদের সুখ। তুই সুখী Ñ

দুলারি    :         সুখে আমি তোমাদের এখানেও ছিলাম।

রোকেয়া :         আমি জিজ্ঞেস করছি, কামালকে ভালোবেসে তুই সুখী?

দুলারি    :         ভালোবাসা-টালোবাসা জানি না। একটু নিরাপত্তা, সামান্য আশ্রয় আর কিছু স্নেহ-মমতার জন্যেই মেয়েরা কাঙাল। এগুলোই তাদের কাছে ভালোবাসা।

রোকেয়া :         কোন মুখে বলব জানি না। ওই কানের দুলটা নিচের দেরাজে শাড়ির ভাঁজে ছিল। (ক্ষাণিকক্ষণ তার ভাবান্তর লক্ষ না করে) কই কিছু বললি না যে।

দুলারি    :         (মৃদু হাসল) কী বলব। কোনো কিছু আর এখন বিশ্বাস হতে চায় না। কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে জানি না। কী করে বলব, হয়তো সত্যি সত্যি পাওনি। আবার মন রক্ষার জন্যে বলছ।

রোকেয়া :         তাহলে তোকে এনে দেখাই। দাঁড়া মা। (রোকেয়া উঠে দাঁড়ায়। বেডরুমের আলমারি থেকে দুলের বাক্স বার করে। দুল ওর কানে পরাতে যায়।) আমার কাছ থেকে কিছু তো একটা নিবি। একবার ছাড়া জীবনে কাউকে কখনো সন্দেহ করিনি। বল মিথ্যে সন্দেহটা সারা জীবন পুষে কী করব। ওটা আমার আশীর্বাদ হয়ে তোর কানে ঠাঁই থাক।

দুলারি    :         তোমার মিথ্যে সন্দেহ আমার কানে দুলবে চিরকাল Ñ ভালো লাগবে?

রোকেয়া নিরস্ত হয়। দুল বাক্সে রেখে দেয়।

রোকেয়া :         না রে না। তবে থাক দুলারি।

দুলারি    :         মানুষ অনেক সময় না দিয়েও ভালোবাসে। আর না পেয়েও খুশি হয়।

এসময় ত্বরিতগতিতে রীনা এসে ঢোকে। দুলারিকে জাপ্টে ধরে।

রীনা     :         আন্টি তুমি কিন্তু যাবে না। আমি নিজে তোমার জন্যে ন্যুডলস বানিয়েছি। না খেয়ে গেলে জন্মেও কথা বলব না।

রীনা দুলারির হাত ধরে টানে।

দুলারি    :         পান্নাকে আমার জিনিসগুলো গুছাতে বলেছিলাম, কী হলো?

রীনা     :         আগে আমার সঙ্গে চলো। তারপর অন্য কথা।

দুলারি    :         আচ্ছা আচ্ছা। যাই চল।

রীনা     :         মা তুমিও যাবে। আমি আন্টিকে নিয়ে যাচ্ছি।

রোকেয়া :         তোরা যা। আমি তোর বাবা এলে পরে যাব।

                   দুলারি ও রীনা হাত ধরাধরি করে সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকে। ধনুমামার কামরা। দেখা যাবে সেখানে তার জিনিসপত্র বাঁধা অবস্থায়। আলমারির দেরাজ খোলা। প্রতিটি দেরাজে চাবি লাগানো। ধনুমামা একটা স্যুটকেসের তালা বন্ধ করে জিরিয়ে নিচ্ছে। এমন সময় রোকেয়া এসে ঢোকে।

রোকেয়া :         আজই যাচ্ছেন।

মামা     :         হ্যাঁ। ভেবেছিলাম থাকব আরো কিছুদিন। হলো না। কাল বাদশা মিঞার চিঠি পেলাম। আমাদের ওখানে নতুন পার্টি কিছু জায়গা-জমি কিনতে যায়। জুটমিল বসাবে। এসময় থাকলে একটা কিছু ধান্ধা হয় বুঝিস তো। যাচ্ছি, জাফর জানে তো?

রোকেয়া :         হ্যাঁ জানে। টেলিফোন করেছিল। বলেছে আপনাকে স্টেশনে দিয়ে আসবে।

মামী     :         অনেকদিন থাকলাম। কষ্ট দিয়ে গেলাম।

রোকেয়া :         না না, কষ্ট কিসের। ধনুমামা চিকিৎসার জন্যে এলেন। চিকিৎসা করে গেলেন।

মামা     :         আর চিকিৎসা। এ বয়েসে আর কী হবে। তা আর কাউকে তো দেখছি না।

রোকেয়া :         ছেলেমেয়েরা এখনো ফেরেনি। তাছাড়া আর কাকে দেখবেন আশা করেছিলেন। আসার দিন যাদের দেখেছিলেন যাবার দিন তাদের দেখতে না পেয়ে কি দুঃখ হচ্ছে?

মামা     :         না বাড়িটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।

মামী     :         শুনলাম দুলারিও চলে গেল।

রোকেয়া :         আমরা যে শেষ পর্যন্ত থেকে যেতে পারলাম সেটিই বড় কথা।

মামী     :         কেন, কেন তোমরা থাকবে না কেন। তোমাদের বাড়িঘর।

রোকেয়া :         অনেক সময় উলটোও হয়। যাদের থাকার তাদের ঠাঁই জোটে না।

মামা     :         আমি অবশ্য নিজের আর পরের বাড়ি বলে কোনো তফাৎ করি না। তা না হলে তোদের সবকিছু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতাম।

রোকেয়া :         আপনি কিছু দেখাননি। আমরাও কিছু দেখিনি। বরং আপনিই বোধহয় দেখে গেলেন।

মামা     :         দেখ রুকু, তোরা আপনজন। তোদের কষ্ট আমি যতটা বুঝি, অন্যরা ততটা বুঝবে?

রোকেয়া :         যাদের স্বার্থ দেখার লোক নেই, তারা কি সুখে থাকে না। আমরা কি এতদিন থাকিনি।

মামা     :         কী বললাম আর কী শুনলি। নিজের ভালো-মন্দটা বুঝতে হবে না।

রোকেয়া :         এখন বাড়িতে ভালো আর মন্দ বলে কোনোটাই নেই মামা। যেমন ছিলাম যদি তেমন থাকতে পারতাম।

মামা     :         আমি তোদের কথা ভেবেই সব কিছু করেছি।

রোকেয়া :         একজনের কাজ আরেকজন বোঝে না।

মামা     :         উপকার করেও আজকাল মানুষের মন পাওয়া যায় না।

রোকেয়া :         সেটাই তো আমার দুঃখ। বাইরে হর্নের শব্দ শোনা যায়।

মামা     :         কই তুমি কোথায়? জিনিসপত্রগুলো কাউকে নিয়ে যেতে বলো। জাফর এসে গেল বোধহয়।

মামী এসে ঢোকে। মামা শেষবারের মতো  আলমারিতে কিছু ফেলে গেল কিনা দেখে নিল।

মামী     :         পান্না আসছে।

মামা     :         (রোকেয়াকে) ভালো কথা। আমি দেরাজগুলো খুলে রেখেছি। চাবি ওইসঙ্গে লাগানো।

রোকেয়া :         মামা একটা উপকার করবেন। ওই চাবিগুলো দয়া করে নিয়ে যাবেন।

মামা     :         কী করব আমি চাবি নিয়ে।

রোকেয়া :         জানি না। এ বাড়িতে দেরাজে দেরাজে চাবির দরকার নেই মামা। আমরা একটু খোলামেলা থাকতে চাই। আগে ওই চাবিগুলো ছিল না। আমরা ছিলাম। অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছি। আজ চাবি আছে, আপনি দয়া করে নিয়ে যান আপনার চাবি। নিচে হর্নের শব্দ শোনা যায়। রোকেয়া বেরিয়ে যায়। মামা স্যুটকেস তুলতে উদ্যত। ক্যামেরা তড়ড়স করে এবং একাধিক চাবি ও চাবির সুতোয় জড়ানো অন্য চাবির ঈষড়ংব ঁঢ় নেবে। পর্দা জুড়ে চাবি দেখা যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *