তবু অনন্য

রচনা : আনিস চৌধুরী

প্রযোজনা : সৈয়দ সিদ্দিক হোসেন

(সম্পূর্ণ টিভি নাটক)

মাঝারি আকারের কামরা। যেখানে বসা এবং খাবার ব্যবস্থা দুইই। খাবার টেবিল ছোট। চারজনের বসার উপযুক্ত। বসার অংশে হাতল দেওয়া দুটি সোফা সেটের আকারের চেয়ার। সে-সঙ্গে বেতের সেটের আরো একটি কী দুটি চেয়ার। ছোটমতো টেবিল মাঝখানে। বোঝা যাবে যথাসম্ভব ড্রয়িংরুমের আদল কোনোমতে টিকিয়ে রাখা। জিনিসপত্রের কোনো বাহুল্য নেই। যাও আছে তা অতি মামুলি, সচরাচর মধ্যবিত্ত বাড়িতে যেরকম দৃষ্টিগোচর হয়। হয়তো পাটের তৈরি কোনো শিকে কিংবা বাঁশের কাট আউট দেয়ালে টাঙ্গানোর উপযোগী। খালি পানিভর্তি বোতল ঝুলছে জানালার এক ধারে। সেখানে একটি দ্রুত বিস্তারশীল মানিপ্ল্যান্ট। বসার ঘর বা ড্রয়িংরুম অংশেই দৃষ্টিগোচর হতে পারে একটি বইয়ের শেল্ফ, একটি টাইমপিস আর দেয়ালের কোনো অংশে বাঁধানো ছবি। বয়েস পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি। সন্দেহ নেই, এ বাড়ির কোনো নিকট আত্মীয়। বসার এবং খাবার অংশে দুটি ঝুলে থাকা একসার লম্বা লম্বা ডেকোরেশন পিস (সুতো বা দড়িতে গাঁথা মালার মতো) দিয়ে আলাদা করা। চিকের মতো কাজ করবে। চিকের ভেতর দিয়েই দেখা যাবে রাশিদা, বয়েস পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। চোখে চশমা। টিফিন ক্যারিয়ারে সেকা রুটি ও ভাজি জাতীয় কিছু, কলা ইত্যাদি, সাজিয়ে রাখছে। পাশেই মুখ খোলা প্লাস্টিকের একটি বোতল। হয় ইতোমধ্যেই পানি ঢালা হয়েছে, অথবা হবে। লক্ষণীয় যে, শোবার ঘরের দরজা বসার অংশের দিকে। রাশিদা খাবার টেবিলে দাঁড়িয়ে কাজ করা অবস্থাতেই তার কন্যা রীতার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করবে। হাতের কাছে বা ধারেকাছে কোনো রেডিও থাকতে পারে। তাতে সময়সূচক ঘোষণা, এখন সকাল আটটা এমনও বলা যেতে পারে।

প্রথম দৃশ্য

রাশিদা   :         ঘুম ভাঙল? স্কুলে যেতে হবে না?

রীতা     :         যেতে হবে না মানে। স্কুল টাস্কটা শেষ করে নিই। এক মিনিট।

রাশিদা   :         রাতে মনে থাকে না।

                   রীতা নিরুত্তর।   

                   সেদিনের মতো বাস এসে ফিরে যাক। আমার কী।

রীতা     :         (দূর থেকে) আচ্ছা আচ্ছা।

এক ফাঁকে রীতাকে দেখা যাবে! বছর চোদ্দো-পনেরোর কিশোরী। স্কুলছাত্রী। ভেতরের দরজা ফাঁক করে মুহূর্তের জন্যে দেখা দেয়। আবার মিলিয়ে যায়। কলখোলার শব্দ। দরজায় কলিংবেল বাজে। রাশিদাকে প্লেট বাসন গোছাতে দেখা যায়।

রাশিদা   :         দেখ তো রীতা। চিঠি বোধহয়।

টুথব্রাশ মুখে রীতা দরজা খুলে দেয়।

রীতা     :         মা, আন্টি।

বলেই ভেতরে চলে যায়। রোকেয়ার প্রবেশ। রাশিদার চেয়ে বয়সে সামান্য বেশি। একটু ভারি গড়নের। রোকেয়া খাওয়ার টেবিলের দিকে চলে যায়।

রাশিদা   :         (তোয়ালেতে হাত মুছে নিয়ে) বুবু তুমি। সকাল সকাল কোত্থেকে?

রোকেয়া          :         আমার আবার সকাল-বিকেল। রোজই ভাবি আসব। কাজ আর ফুরোয় না। ঘরে-বাইরে দুদিকই সামলাতে হয়। রূপাকে কলেজে ছেড়ে দিয়ে এলাম। মেয়ে বড় হয়েছে। আজকাল আর একা ছেড়ে দিতে ভরসা হয় না।

রাশিদা   :         তা তো ঠিকই। তোমার তো তবু লক্ষ্মী মেয়ে। আমার নন্দিনীর তো ঘুমই ভাঙে না Ñ

ঠিক এসময় স্কুলের ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় এসে ঢোকে রীতা।

রীতা     :         আমি রেডি।

রাশিদা   :         (নকল ধমকের সুরে) রেডি না ছাই। এদিকে আয়। (একখানা তোয়ালে এনে ঘাড়ের পেছনটা মুছে দেয়। চিরুনি দিয়ে মাথা আঁচড়ে ক্লিপ এঁটে দেয়) দেখি!

রীতা ভেতরে যায়। চুলে ফিতে বেঁধে এসে যোগদান করে। পাশেরই চেয়ার টেনে নিয়ে রোকেয়া বসে। রীতা টেবিলে তার জন্যে রাখা প্রাতরাশের দিকে নজর দেয়।

রীতা     :         টোস্ট বিস্কুট খাব না।

রাশিদা   :         এটা খাব না, ওটা খাব না। কী খাবে বললেই হয়। বুবু তোমাকে চা দিই?

রোকেয়া          :         না থাক। সকাল থেকে অনেক হলো। মেয়েটা কী চায় দেখ।

রাশিদা   :         পাশের বাড়ি থেকে কাল লুচি পাঠিয়েছিল, মনেই ছিল না। দিই গরম করে?

রীতা টোস্ট বিস্কুট খাওয়া শেষ করে ঢকঢক করে পানি খায়।

রীতা     :         না মা। লাগবে না।

                   কী মনে হওয়ায় Ñ

রাশিদা   :         গরম করে বরং  টিফিনের সঙ্গে দিয়ে দিই।

রীতা     :         না, মা প্লিজ। যা দিয়েছ তাই শেষ করতে পারব না।

রোকেয়া          :         কোনো চিঠি এলো?

রাশিদা   :         না, কিসের চিঠি। আমার কথা ছেড়ে দাও বুবু। নিজের মেয়েটার একটা খবর নেওয়ার কথাও মনে হলো না ছমাস ধরে।

রাশিদা আবার গোছগাছ শুরু করে। চায়ের কেটলি ও দুখানা কাপ ছাড়া বাকি সব তুলে নেয়। তাকে অত্যন্ত ব্যস্ত দেখায়।

রোকেয়া          :         কথা ছিল, একটু বসো না।

রাশিদা   :         বসার কি উপায় আছে বুবু। কাজের লোক থাকত, এক কথা।

                   [রাশিদা বসল, কিন্তু ওই ফাঁকেও টেবিল মোছামুছি করে গেল।]

                   নাও বসলাম।

                   রীতা এসে ঢোকে। হাতে একগাদা বই। কী যেন খোঁজাখুঁজি করে।

রাশিদা   :                  আবার কী?

রীতা     :         অ্যালজেব্রা বইটা পাচ্ছি না।

রোকেয়া          :                  (রাশিদার হাতখানা নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নেয়) আমার খুব শিক্ষা হয়েছে রাশিদা। বাইরে থেকে মানুষকে চেনা যায় না। (রীতাকে লক্ষ করে) মা একটু ভেতরের ঘরে যাও তো।

রীতা     :         যাচ্ছি যাচ্ছি। তোমাদের কথা শুনতে বয়ে গেছে আমার।

রোকেয়া :         তোর সব কিছুর জন্য নিজেকে দায়ী মনে হয়। নিজের মামাতভাই, ছোটবেলা থেকে চিনি। ধরতে গেলে মাসুদের সঙ্গে তোর বিয়েটা তো আমিই দিলাম।

রাশিদা   :         যেতে দাও ওসব পুরনো কথা।     

রোকেয়া :         কাল আমার ভাশুর লন্ডন থেকে এলো। যা শুনলাম আর চিঠি লিখবে কোন মুখে। মাসুদ আবার বিয়ে করেছে ও দেশে।

রাশিদা   :         (উঠে দাঁড়ায়। কেমন ক্ষীণ অথচ কঠিন হাসি। চিকের অন্যদিক থেকে উদ্ভাসিত হয় রীতার মুখ। রীতা শুনতে পেয়েছে।) ও, কতদিন।

রোকেয়া :         ওসব জিজ্ঞেস করার মতো রুচি হলো না। শুনেছি মেয়েটার নাম ক্যাথি।

                   কাগজে একটা ছবিও বেরিয়েছিল। আমার ভাসুর দেখাল। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম (ব্যাগ খোঁজ করে)

রাশিদা   :         ব্যতিব্যস্ত হবার দরকার নেই। ছবি তোমার কাছেই থাক।

রীতা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। ক্যামেরা তাকে তাক করবে। রীতা মায়ের কাছে ছুটে এসে মুখ লুকোয়। রোকেয়া আলগোছে হাত বুলিয়ে দেয়।

রীতা     :         আমি স্কুলে যাব না।

                   রাশিদা আঁচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে দেয়।

রাশিদা   :         কার ওপর রাগ করে যাবি না। ও কি রাগ করার মতো মানুষ! একশবার যাবি।

রীতা ড্রয়িংরুম অংশে ছুটে আসে। দেয়ালের ছবির দিকে তাকায়। তারপর একখানা ফ্লাওয়ার ভাস কিংবা অ্যাশট্রে দিয়ে আঘাত করে। কাচ ভেঙে যায়। ইচ্ছেমতো বলপেন দিয়ে ছবির মুখে আঁকিবুকি আকে। তারপর মুখ ঢেকে বসে থাকে। রাশিদা, রোকেয়া কথা বলছে। ক্যামেরা এবার ওদের ওপর।

রাশিদা   :         বুবু এক মিনিট। কী হলো দেখে আসি।

রোকেয়া :         থাক, ওকে কিছু বলো না। মনে তো লাগবেই।

                   কিছুক্ষণ পর রাশিদা ফিরে আসে।

                   আবার মুখোমুখি বসে।

রাশিদা   :         কিছু না। একখানা ছবির কাচ ভেঙে গিয়েছিল।

                   রাশিদার আনত দৃষ্টি।

রোকেয়া :         অত ভেঙে পড়ার কিছু নেই।

রাশিদা   :         না না, ভেঙে পড়ব কেন। ছবির কাচভাঙার কথা বলছিলাম। পরিষ্কার করে দিয়ে এলাম।

রোকেয়া :         আমরা তো মরে যাইনি। অত উতলা হবার কিছু নেই।

রাশিদা   :         রীতা, আবার কোথায় গেল মেয়ে।

রীতার প্রবেশ। মার গা-ঘেঁষে দাঁড়ায়।

রোকেয়া :         অমন সুন্দর করে আঁচড়ে দিলো, আবার নষ্ট করে ফেললি।

রাশিদা আবার তার চুল ঠিক করে দিতে থাকে।

রাশিদা   :         চুলের দোষ কী। আমাদের আর কোনটাই নষ্ট হতে বাকি বুবু।

রীতা     :         আর যদি স্কুলে যেতে না পারি। যদি মাইনে না দেওয়া হয়।

রাশিদা   :         আর যদি লটারি জিতে যাই। লাখ টাকা পেয়ে যাই। যদি খুব বড়লোক হয়ে যাই।

মেয়েকে কাছে টেনে আদর করে। বাসের হর্ন।

রীতা     :         ওরকম হয় নাকি।

রাশিদা   :         কেন হবে না। এরকম হলে, ওরকমও হতে পারে। টিফিনটা মনে করে নিয়ে যাস।

রীতা ত্রস্তপদে প্রস্থান করে।

রাশিদা   :         (রোকেয়াকে) আগামী মাসে কী হবে তার ঠিক নেই। তোমার কাছে লুকোবার কিছু নেই। ব্যাংকে যা ছিল তাও শেষ। আর এদিকে মেয়েকে লটারির কথা বলছি।

রোকেয়া :         দেখ না দু-তিনমাস। তারপর দেখি কী হয়।

রাশিদা   :         তুমি দু-তিনমাস বলছ। আমি তো সতেরো বছর ঘর করলাম তোমার মামাত ভাইয়ের সঙ্গে। তিন মাসে নতুন আর কী হবে বুবু।

রোকেয়া :         মানুষের পদস্খলন হয়।

রাশিদা   :         মানুষ নয়। পুরুষ মানুষ বলো। মেয়েদের বেলায় তো পদস্খলন হয় না। লোকে ওটাকে উচ্ছন্নে যাওয়া বলে।

রোকেয়া :         বুঝি। তবু অত ভেঙে পড়লে চলে!

রাশিদা   :         (সোজা দৃষ্টি মেলে) না বুবু ভেঙে পড়িনি। প্রথম ধাক্কা সামলে নিতে একটু সময় লাগে এই যা। নিজেকে কোনোদিন তলিয়ে দেখিনি। নিজের শক্তি-সামর্থ্য কোনোটার কথাই জানি না Ñ

রোকেয়া :         এখন?

রাশিদা   :         ওই যে বললাম। এখন এ বাজিতে হারা যায় না। এতে একটাই নিয়ম। হয় জেত, না-হয় শেষ হয়ে যাও।

রোকেয়ার গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

রোকেয়া :         একটু স্থির হয়ে বসব তার উপায় নেই। গাড়ি এসে হাজির। আমাকে ছেড়ে আবার অফিসে ফিরে যাবে। ওদের নাকি ব্যাঙ্কক ফ্লাইটে কে আসছে আবার। আমার, এক ঝামেলা!

রাশিদা   :         বুবু, আমাকে একটু ছেড়ে দিতে পারবে। এক মিনিট Ñ

রোকেয়া :         কোথায়?

রাশিদা   :         অফিসপাড়ায়। ততক্ষণে এক কাপ চলুক। আমিও খাব। মাথাটা ধরে আছে। না করো না।

রাশিদা দুকাপে চা ঢালতে থাকে।

রোকেয়া :         আচ্ছা। দাও, অত করে বলছে যখন। বাস বাস।

রাশিদা   :         এক মিনিট। শুধু শাড়িখানা বদলে আসব।

রাশিদা চায়ের কাপ হাতে ভেতরের ঘরে যায়। কিছুক্ষণে শাড়ি পালটে ফিরে আসে।

রোকেয়া :         কিন্তু আজ, এখনই? মনটা ভালো হোক।

রাশিদা   :         (গাড়িতে উঠতে উঠতে বা সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে) ভাবছ এতবড় খবর শুনে কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিলাম না। পরে, পরে। ওসবের এখন সময় নেই। রাতে যদি সময় পাই চেষ্টা করে দেখব। কান্না পেলে কানব। ঘুম পেলে ঘুমিয়ে পড়ব।

দ্বিতীয় দৃশ্য

রাত। ড্রেসিং টেবিল। রাশিদা চুল আঁচড়াচ্ছেন। হঠাৎ করে ভেঙে পড়ে কান্নায়। রীতা প্রবেশ করে।

রীতা     :         মা।

রাশিদা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেন।

মা, চলো না আমরা রাজশাহীতে বাবুমামার ওখানে চলে যাই।

রাশিদা   :         তোর বাবুমামার তো নিজের সংসার আছে।

রীতা     :         তাতে কী? আমরা তো চিরকাল থাকছি না।

রাশিদা   :         তা হয় না মা। দুদিনের জন্য বেড়াতে গেলে তো সমস্যার সমাধান হবে না।  তাছাড়া তোর নানুও তো বাবুভাইয়ের বাসাতেই থাকেন। এর পরও আমরা দুজন গিয়ে উঠলে… ওদের দিকটাও তো ভাবতে হবে।

রীতা     :         মা…

রাশিদা   :         আমরা মা-মেয়েতে ভালোই থাকব দেখিস। কালকে চযধৎসধপু উবঢ়ঃ-এ স্যারের সঙ্গে দেখা করব ঠিক করেছি। চাকরি একটা পেয়ে যাবই। তখন আমাদের কোনো কষ্ট থাকবে না। তুই পড়বি, আমি চাকরি করব। যা অনেক রাত হয়ে গেছে, শুয়ে পড়গে।

রীতা     :         আমি তোমার কাছে শোব মা Ñ এ্যাঁ?

রাশিদা   :         পাগলি মেয়ে…

                   দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

                   তাতে লেখা :

                   নো ভ্যাকান্সি। নো ইন্টারভিউ প্লিজ।

                   রাশিদা মনস্থির করে ফেলে। কিছু না বলে সরে যায়।

রাশিদা   :         না থাক।

লিফ্টম্যান ভদ্রমহিলার মতিগতি বুঝতে অপারগ এরকম মুখভঙ্গি করে লিফটের দরজা বন্ধ করে দেয়।

দ্বিতীয় অফিস

দেখা যাবে রাশিদা কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছে।

কর্মকর্তা :         স্যরি, আপনাকে হেল্প করতে পারছি না। এখন তো ফিনান্সিয়াল ইয়ারের মাঝামাঝি। টাইট বাজেট। তবু অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে রাখুন। দেখব।

কর্মকর্তার টেলিফোন আসে। হ্যালো বলে মাউথপিসে হাত চাপা দিয়ে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে রাশিদার দিকে তাকায়।

কর্মকর্তা :         আচ্ছা –

রাশিদা বোঝে চলে যাবার ইঙ্গিত। সম্পূর্ণ দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে যায়।

তৃতীয় দৃশ্য

তৃতীয় অফিস

কাচের দরজা ঠেলে রাশিদাকে কোনো কামরায় ঢুকতে দেখা যাবে। কাচের দরজার ওপর কোম্পানির নাম ও কর্মকর্তার নাম সযতেœ লেখা : এম.ডি মেডিকেয়ার সাপ্লাইজ লিমিটেড। রাশিদা ভেতরে ঢুকলে এম.ডি একটি চিরকুট তুলে নিয়ে দেখে।

এম.ডি   :         রাশিদা সুলতানা আপনি? বসুন। ড. খান আমাকে টেলিফোন করেছিলেন। দাঁড়িয়ে থাকলেন কেন, বসুন। রাশিদা বসল।

রাশিদা   :         আমি জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করেছিলাম, উনি আপনার কাছে পাঠালেন।

এম.ডি. পাশের একটি টেলিফোনের বুতাম টিপে রিসিভার মুখের কাছে নেয়।

এম.ডি  :         আপনি একটু আসুন। (রাশিদাকে) ড. খান আপনার খুব প্রশংসা করলেন। দেখুন আমরা ঠিক যাকে বলে ওষুধ কোম্পানি নই। আমাদের কাজ হচ্ছে সাপ্লাই দেওয়া। কাজেই ঠিক সেরকম এক্সপিরিয়েন্স Ñ

                   জেনারেল ম্যানেজারের প্রবেশ বেশ দ্রুততার সঙ্গে। এম.ডি-র সামনে একটি ফাইল খুলে ধরে ও, আই সি। কী সাবজেক্ট, তো ফার্মেসি ছিল আপনার?

রাশিদা   :         স্যার ফার্মেসিতে অনার্স। জি।

এম.ডি. :         শেষ করেননি?

রাশিদা   :         না স্যার। বিয়ে হয়ে গেল। পাস কোর্স করেছি।

এম.ডি. :         কোথাও কাজ করেছেন এর আগে?

রাশিদা   :         না স্যার। তেমন দরকার হয়নি। এখন একটু কষ্টে আছি।

এখন একটু কষ্টে আছি কথাটা কিছুটা অসংলগ্ন শোনাবে। যথেষ্ট অস্পষ্টতার সঙ্গে বলবে

                   এম.ডি. জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে পরামর্শ করে কানে কানে। দুজন মাথা হেলায়।

এম.ডি. :         দেখুন, তেমন কিছু অফার করতে পারব না। অ্যাসিস্টেন্ট সুপারভাইজারের একটা কাজ আছে। পিওরলি টেম্পরারি। (জেনারেল ম্যানেজারকে) আমাদের ডি.এ. কত?

জেনারেল ম্যানেজার : সিক্সটিন অ্যান্ড হাফ পারসেন্ট।

এম.ডি. :         (টেবিল থেকে এক টুকরো স্লিপ প্যাডের কাগজ নেয় আর লিখে যেতে থাকে) আর কনভেন্স ফিফটিন পারসেন্ট, হাউস অ্যালাউন্স থার্টি ফাইভ, মেডিক্যাল টোয়েন্টি।

এম.ডি. স্লিপ প্যাডখানা রাশিদাকে দেখায়। (দ্রষ্টব্য : ক্যামেরায় দেখানো হবে না।)

এই হলো আপনার টোটাল। পোষাবে?

রাশিদা   :         আমার কোনো চয়েস নেই স্যার।

এম.ডি. :         প্রমোশনের কোনো চান্স নেই। অন্তত আগামী এক বছর। পরে অবশ্য Ñ

রাশিদা মাথা নিচু করে বেরিয়ে যেতে থাকে।

          বেস্ট অফ লাক।

রাশিদা ঘাড় ফেরায়। খানিকক্ষণের জন্যে মৃদু হাসি। সঙ্গে সঙ্গে মিলে যায়।

চতুর্থ দৃশ্য

অফিসে কর্মরত রাশিদা। দেখা যাবে ছোট ছোট প্লাস্টিকের ট্রে বা বাটিতে কিছু রাসায়নিক পদার্থ। সেগুলো যতেœর সঙ্গে পরীক্ষা করছে। একপাশে উঁচুমতো দেয়াল সংলগ্ন কাউন্টার। সেখানে বৈজ্ঞানিক নিক্তি এবং কাঠের তৈরি করা খোঁপের মধ্যে দাঁড় করানো অবস্থায় কিছু টেস্ট টিউব। সে-সঙ্গে কিছু রাসায়নিক দ্রব্যের বোতল। প্রত্যেকটি লেবেল সংবলিত। দেখা যাবে সেখানে কর্মরত একজন মহিলা টেকনিশিয়ান প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে এবং সেগুলো টুকে রাখছে কাগজে বা খাতায়। আর কিছুক্ষণ পরপর সেগুলো এসে হাজির করা হচ্ছে রাশিদার কাছে। রাশিদা প্রয়োজনবোধে টিক মার্ক করছে। প্রয়োজনবোধে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। কথাবার্তা শোনা যাবে না। দরকারও নেই। সামান্য মিউজিক থাকতে পারে। ঘড়ির কাঁটার গতি একটা অতিক্রম করছে দেখানো যায়। অর্থাৎ লাঞ্চ আওয়ার। মহিলা টেকনিশিয়ান যে নাকি সাদা অ্যাপ্রন পরিহিতা, নিজের অ্যাপ্রন খুলে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে দেয়। কামরা থেকে বেরিয়ে যায়। রাশিদা কিছুটা ক্লান্ত। চোখের চশমা সরায়। দু-আঙুলে চোখের ওপরটা দাবিয়ে নেয় একটু। চশমার কাচ পরিষ্কার করে। এমন সময় দরজা খুলে এসে ঢোকে তারেক। রাশিদা সচকিত হয়ে বসে। চশমা পরে নেয়। দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।

তারিক   :         না না, বসুন। আমি বস-টস নই। সামান্য কর্মচারী। আপনি বোধহয় গত সপ্তাহে জয়েন করলেন।

রাশিদা সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে।

রাশিদা   :         আমি অ্যাসিস্ট্যান্ট –

তারিক   :         বলতে হবে না, আমরা সব অ্যাসিস্টেন্টের দলে। সেজন্যেই গরজ করে এলাম।

                   [রাশিদার কোনো ভাবান্তর লক্ষ করা যায় না। ভদ্রতাসূচক সামান্য মৃদু হাসি ছাড়া।]

                   লাঞ্চে যাবেন না?

রাশিদা   :         দিনে তেমন খাই না। (ঘড়ির দিকে তাকিয়ে) আপনি খান। আলাপ হয়ে খুশি হলাম।

তারেক  :         তা খুশি হয়েছেন কি-না বোঝা যাচ্ছে না। ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমার অবশ্যি নাক গলানো উচিত নয়। খাওয়া-দাওয়াই যদি না করা হলো তবে আর চাকরি কেন।

রাশিদা   :         সংসারের দায়িত্ব থাকতে পারে।

তারেক :         তা অবশ্য পারে। (কী মনে হওয়ায়) এক মিনিট।

তারেক ত্বরিত গতিতে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। রাশিদার তেমন কিছু করার থাকে না। টেকনিশিয়ানের টেবিলের জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করে। দর্শকদের দিকে পেছন ফেরানো। এ অবস্থায় এসে ঢোকে পুনরায় তারেক। তার হাতে ট্রে। হাতে দুকাপ কফি এবং সামান্য স্ন্যাক জাতীয় কিছু।

তারেক  :         অন্তত এক কাপ কফি চলতে পারে।

রাশিদা   :         (ঘুরে দাঁড়ায়) আপনি আনলেন –

তারেক  :         না না। সেল্ফ সার্ভিস ক্যান্টিন। এমনিতেই দেওয়া হয়। চা বা কফি যার যা খুশি। তবে তার জন্যে কিছু কাটা যায়। কী আশ্চর্য, কেউ বলেনি আপনাকে –

রাশিদা   :         না তো!

তারেক  :         নতুন এসেছেন, জানবেন এক এক করে।

                   (তারেক স্যান্ডউইচ হাতে নিয়ে ওর দিকে বাড়িয়ে দেয়।)

                   নিন না একটা, প্লিজ।

রাশিদা   :         (ইতস্তত করে) না, ঠিক আছে।

তারেক  :         ঘরের তৈরি। প্রথমদিন বলছি। অন্তত –

রাশিদা   :         আচ্ছা, আর্দ্ধেকটা দিন।

                   তারেক তাই দেয়।

তারেক :         আমার আবার এসবে হয় না। কিছু খেয়ে নিই। কিন্তু তাতে হয় না। চারটাই হোক, পাঁচটাই হোক ঘরে গিয়ে না খেলে শান্তি নেই। ভেতো ভাঙালি বলতে পারেন। আপনি?

রাশিদা   :         কিছু খেয়ে নিলাম – এই যথেষ্ট।

তারেক :         তাহলে বাড়িতে রান্না-বান্নার পাঠ নেই বোধহয়।

রাশিদা   :         তা থাকবে না কেন। ঘর-সংসার থাকতে নেই?

তারেক :         আপনার ফ্যামিলি Ñ

রাশিদা   :         আমি আর আমার মেয়ে। ওর বাবা এখানে থাকে না।

তারেক :         আমার অবশ্য দু’ছেলেমেয়ে। একটি সাত, অন্যটি পাঁচ। মেয়ে বড়। আসুন না একদিন আলাপ হবে। তবে জয়েন্ট ফ্যামিলি তো নিজের খুব একটা say নেই – যা হয় আর কী। তার ওপর রিভব-এর অসুখ-বিসুখ। শান্তি নেই।

রাশিদা   :         চায়ের কাপের ওপর দুঃখ ঝরানো সহজ।

তারেক :         বেশ বলেন কিন্তু। (খানিকক্ষণ থেমে) আজ কিন্তু পার্টির কাছে যাবার ছিল। বেমালুম ভুলে বসে আছি।

রাশিদা   :         গেলেন না কেন। এখনো যেতে পারেন।

তারেক :         না, আজ আর যাবো না। ভালোই লাগল কথা বলে। আপনি তো বলবেন কাজে গাফিলতি।

রাশিদা   :         না, তা বলব কেন। বড়জোর খামখেয়ালিপনা। মালিকপক্ষ হলে বলতাম কর্তব্যে অবহেলা।

ঈঁঃ ঞড়

অফিস ছুটির সময়। ঘড়িতে পাঁচটা বাজা দেখানো যেতে পারে। মহিলা টেকনিশিয়ান অ্যাপ্রন খুলে ফেলে। খাতা এবং কিছু কাগজপত্রসহ রাশিদার টেবিলের কাছে আসে।

টেকনিশিয়ান      :         টেস্ট রিপোর্ট খাতায় বহঃৎু করেছি। আর এই সঙ্গের             পেপার Ñ

রাশিদা             :         থাক এগুলো।

টেকনিশিয়ান      :         আপনি আবার চেক করবেন নাকি?

                   রাশিদা কিছু বলে না। পেনসিল বা বলপেন তুলে টেবিলের ওপর মৃদু টোকা দিতে থাকে। মুখে মৃদু হাসি।

রাশিদা   :         দেখি Ñ (অর্থাৎ করতেও পারি এই অর্থে)

টেকনিশিয়ান কিছুটা অপ্রসন্ন। তার চেহারায় সুস্পষ্ট।

টেকনিশিয়ান      :         আপনার খুশি। (নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকায়) চলি ম্যাডাম। দেরি করলে স্টাফ কার চলে যাবে।

                    রাশিদা মৃদু মাথা হেলায়। তারপর কাজ করতে বসে যায়। বিকেল সাড়ে পাঁচ কিংবা পৌনে ছটা। তারেকের প্রবেশ।

রাশিদা   :         আপনি যাননি?

তারেক  :         না। আসলে চলেই গিয়েছিলাম। পরে মনে হলো আপনাকে স্টাফ কারেতে দেখলাম না। ফিরে এলাম।

রাশিদা   :         (কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টি ছড়িয়ে) ফিরে এলেন?

তারেক  :         হ্যাঁ। ভাবলাম একা একা যাবেন কী করে।

রাশিদা   :         তাহলে থেকেই যেতেন। গিয়ে ফিরে এলেন কেন। আপনি আমার সঙ্গে যাবেন রোজ? পৌঁছে দেবেন? দেরি করে অফিসে বসে থাকবেন?

তারেক  :         কোনটা ছেড়ে কোনটার কোনটার জবাব দেব। আপনার ওকালতি পড়া উচিত ছিল। মানুষের সদিচ্ছা বলেও একটা জিনিস আছে Ñ মানেন?

রাশিদা   :         একদিনের সদিচ্ছা দিয়ে কী হবে তারেক সাহেব। জীবন একদিনের নয়।

তারেক  :         সম্ভব হলে রোজই যেতাম। আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবেন। চলুন বেরিয়ে পড়ি।

– ঈঁঃ ঃড় –

                   রাস্তা। তারেক ও রাশিদা হাঁটছে। খুবই নিরিবিলি। মাঝে মাঝে সামান্য রসিকতা সম্ভবত। দুজনই হেসে ওঠে। এমন সময় গাড়ির হর্ন। দুজনই চমকে যায়। ম্যানেজিং ডাইরেক্টরের গাড়ি। ড্রাইভার-চালিত। গাড়ি থামল।

এম.ডি  :         কোথায় যাবেন। আরে তারেক সাহেবও দেখছি।

রাশিদা   :         বাসায়।

এম.ডি  :         (তারেককে) আর আপনি?

তারেক  :         (কিছুটা বিব্রত) যাব স্যার বাড়িতেই। ওকে একটু এগিয়ে দিচ্ছিলাম। আমরা হেঁটে চলে যাবো।

এম.ডি  :         না না, আসুন। দেখা যখন হয়েই গেল। আমি একটা কাজে গিয়েছিলাম। লাঞ্চের পর আর অফিসে যেতে পারিনি। এই ফিরছি।

রাশিদা   :         (তারেককে) যাবো? আপনি যান বরং Ñ

এম. ডি. :         না না, সে কী কথা। উঠে পড়–ন। এই সন্ধেবেলা Ñ

               তারেক সামনের আসনে, ইতস্তত করে পেছনের আসনে গিয়ে বসে রাশিদা।

                   (রাশিদাকে) কেমন লাগছে?

রাশিদা   :         চলে যাচ্ছে।

এম.ডি  :         নতুন এসেছেন। আপনারা একটু হেল্প করবেন যখন যেমন, দরকার। 

তারেক  :         অবশ্যি। আমি সে কথাই বলছিলাম ওঁকে। (এম.ডি-কে) আপনি তো স্যার ডানদিকে যাবেন, আমরা এখানেই Ñ

এম.ডি  :         কোনো অসুবিধে নেই। ইচ্ছে করলে Ñ

তারেক  :         না স্যার। ধন্যবাদ।

এম.ডি  :         অ্যাজ ইউ উইশ।

                             গাড়ি বাঁক নেয়। ওরা আবার হাঁটতে থাকে।

রাশিদা   :         যাবেনই যদি মাঝ পথে নেমে গেলেন কেন। আশ্চর্য মানুষ। ইচ্ছে আর ভয় দুটোই আছে। দুটো একসঙ্গে চলে না।

তারেক  :         ঠিক বলেছেন। আমার আত্মবিশ্বাস নেই। নিজের কাছেই নিজে হেরে যাই।

                   (হঠাৎ কী মনে হওয়ায়) আমার এক বন্ধুর গাড়ি আছে। চাইলে দেয় মাঝে মাঝে। যদি কিছু না মনে করেন একদিন লং ড্রাইভে যাই Ñ

রাশিদা   :         আমাকে নিয়ে ড্রাইভে যাবেন। আপনার বন্ধু থাকবে?

তারেক  :         হ্যাঁ… আমি তো ড্রাইভিং জানি না।

রাশিদা   :         তাহলে আপনার বন্ধুর সঙ্গেই যেতে পারি, আপনি কেন?

তারেক  :         না, মানে ব্যাপারটা আপনি ওভাবে নেবেন না।

এম.ডি  :         বন্ধুর গাড়ির কী দরকার। এমনি বেড়ানো যায় না।

                   দেখা যাবে ওরা হাঁটতে হাঁটতে কোনো পার্কের সামনে। সেখানে লেক বসার জায়গা দুইই।

রাশিদা   :         কেমন সুন্দর হাওয়া। ভারী সুন্দর জায়গা। বসা যায়, গপপ করা যায়। ইচ্ছে করলে ছবিও তোলা যায়। না কি ছবি তুলতেও জানেন না?

তারেক  :         তুলিনি কখনো। তবে চেষ্টা করলে পারব না কেন।

                                          ওরা হাঁটতে থাকে। থামে না।

রাশিদা   :         ছবি থাক। বসতে চাইলে আজ এখনো বসা যেত। তার জন্যে আগে থেকে দিন-তারিখ ঠিক করার দরকার হয় না।

তারেক  :         আজ Ñ মানে অনেক দেরি হয়ে গেল। বাসায় Ñ বোঝেন তো Ñ

রাশিদা   :         আমি বসতাম না মি. তারেক। দেখলাম। আপনার শখ যত ভয়ও তত। ওই বললাম না দুটো চলে না। একটা রাখুন, একটা ছাড়–ন। যাকগে আপনার সঙ্গে হাঁটা হলো, গাড়ি চড়া হলো, গপ্প গুজব হলো, এবার চলি। আমি, বাঁয়ে যাবো।

তারেক  :         যাবেন কী করে। সন্ধেবেলা Ñ

রাশিদা   :         যেমন করে রোজ যাই। কেমন করে জানি না। তবে যাই পায়ে হেঁটে। বাসে চড়ে, রিকশা চেপে Ñ যে-কোনো ভাবে। তবে      পৌঁছে যাই ঠিক ঠিকই। ভাববেন না।

                   রাশিদা বাঁয়ের রাস্তা নেয়। যাবার আগে আরেকবার ডাকে।

শুনুন।

তারেক  :         আমাকে বলছেন?

রাশিদা   :         বলছিলাম তেমন কিছু হলে হয়তো কাগজে দেখবেন। চলি।

 – ঈঁঃ ঃড় –

পঞ্চম দৃশ্য

তিন বছর পার হয়ে যায়। বাসায় ফিরে এসে রাশিদা টেবিলের ওপর একখানা প্যাকেট দেখতে পায়। খুলে দেখে তাতে কেক। ভেতরের ঘর থেকে এসে ঢোকে রীতা।

রাশিদা   :         কেক কিসের? কে দিয়ে গেল।

রীতা     :         রোকেয়া আন্টি।

রাশিদা   :         হঠাৎ!

রীতা     :         তা তো জানি না।

রীতা এক টুকরো মুখে পুরে। অন্য এক টুকরো প্লেটে তুলে মায়ের দিকে বাড়িয়ে দেয়।

রীতা     :         খেয়ে দেখো না। খুব মজা।

রাশিদা   :         জিজ্ঞেস করলি না তোর আন্টিকে হঠাৎ কেক পাঠালো কেন।

রীতা     :         বোধহয় রোববার আমার বার্থ ডে ছিল মনে করে।

রাশিদা   :         সেটা তিন বছর আগেও ছিল।

রীতা     :         নাও। (জোর করে মায়ের মুখে পুরে দেবার চেষ্টা করে। রাশিদা খায় না) তুমি বরং নিজেই আন্টিকে জিজ্ঞেস করে নিও।

রাশিদা   :         না মা, কিছু খাবার রুচি নেই। মাথাটা ধরে আছে।

দরজায় বেল। রোকেয়ার আগমন।

                   ভালোই হলো। তোমার কেকের কথা হচ্ছিল। রীতাকে জিজ্ঞেস করছিলাম হঠাৎ কী মনে করে Ñ

রোকেয়া :         হঠাৎ আবার কী। নিজের মনে করে দিতে পারি না।

রাশিদা   :         বুবু, দেখতে দেখতে সময় কেমন করে চলে যায় বোঝা যায় না। নিজে চাকরি করে তিন বছর ধরে সংগ্রাম চালাচ্ছি। মেয়েটাকে ম্যাট্রিক পাশ করিয়ে কলেজে পড়াচ্ছি। কে খোঁজ-খবর নিয়েছে বলো। তাই হঠাৎ করে কেউ এগিয়ে এলে নিজের মনকেই প্রশ্ন করি। সন্দেহ হয়।

রোকেয়া :         তুমি আগে এমন ছিলে না রাশিদা। আজকাল সব কিছুতেই মানুষকে সন্দেহ। আমরা তোমার পর না শত্রু Ñ

রাশিদা   :         না, তুমি পর হতে যাবে কেন। কিন্তু তুমি নিজেই সেদিন বলছিলে Ñ

রোকেয়া :         কী বলছিলাম Ñ

রাশিদা   :         বড় টানাটানি। তোমার মাত্র দুটো বাড়ি ভাড়া। তিন নম্বর চারমাস ধরে খালি। মডেল টাউনে ফ্ল্যাট কিনতে হচ্ছে। এদিকে রূপগঞ্জের জমিটার খাজনা বছর বছর Ñ

 রোকেয়া         :         হ্যাঁ, তা তো আছেই। তবু মাঝে মাঝে কি ইচ্ছে হয় না। মানুষের সাধ-আহ্লাদ হয় না। নাও, তর্ক করতে হবে না। আসলে মিষ্টি তোমারই খাওয়ানোর কথা। শুনলাম প্রমোশন হয়েছে চাকরিতে।

রাশিদা   :         ছাই প্রমোশন। তিন বছর ধরে গাধার মতো খাটছি। আসলে ওদের লোক ছিল না। বলল, আমাদের স্টোরটাও আপনি দেখুন। স্টোর অফিসার চাকরি নিয়ে দুবাই কেটে পড়েছে। অ্যাসিস্টেন্ট থেকে পুরো সুপারভাইজার Ñ এই যা। হ্যাঁ, যদি কোনোদিন ম্যানেজার-ট্যানেজার হতে পারতাম এক কথা Ñ

রোকেয়া :         তেমন ইচ্ছেও আছে নাকি?

রাশিদা   :         থাকবে না কেন। ইচ্ছের পাখে কে বেড়ি পরায়।

রোকেয়া :         অনেকদিন তো করলে। এখন ছেড়ে দিলেই কী।

রাশিদা   :         কিসের কথা বলছ?

রোকেয়া :         চাকরি।

রাশিদা   :         কী করব তাহলে?

রোকেয়া :         আমিও বলি, তোমার আর না করলেও চলে। যা হয়েছে, হয়েছে। এখন মিটমাট করে ফেল। মাসুদ আসছে আগামী মাসে।

রাশিদা   :         সে খবর জানানোর জন্যেই কি তাহলে সামান্য মিষ্টিমুখের ব্যবস্থা ছিল!  

রোকেয়া :         কথায় কথায় তোমার সন্দেহ।

রাশিদা   :         তুমি ভালো করেই জানো, তা সম্ভব নয় বুবু। ফিরে যাবার প্রশ্নই ওঠে না।

যেন নিজের প্রতিজ্ঞাটাকেই গেরো দিয়ে শক্ত করে ধরার মানসে খোঁপার চুল মুঠো করে ধরে। তারপর ওখানা ঠিক করে।

রোকেয়া :         তোমাকে বলিনি বোধহয়, ক্যাথির সঙ্গে ওর বনিবনা হলো না। অবশ্য হবে যে না তা আমি আগেই জানতাম। আমাকে তোমার কথা লিখেছে। জবাব পাঠাতে হবে।

রাশিদা   :         তোমাকে লিখেছে, তুমিই জবাব লিখে দাও।

রোকেয়া :         ভুল বোঝাবুঝি হয় সংসারে।

রাশিদা   :         তুমি জানো। ওটা ভুল বোঝাবুঝি ছিল না। ওর স্ত্রী-কন্যা বর্তমান ছিল।

রোকেয়া :         আমি তোমার ভালোর জন্যেই বললাম রাশিদা।

রাশিদা   :         সে আমি জানি।

রোকেয়া :         রীতাকে যে দেখছি না।

রাশিদা   :         আর কী, হবে কোথাও। যে বইয়ের পোকা।

রোকেয়া :         চলি, এখান থেকে আবার হাসপাতালে যাবো। আমার ভাসুর, যার কথা বলছিলাম, ওর আবার কাল থেকে হাই ব্লাড প্রেসার।

রাশিদা   :         কেকের জন্য অনেক ধন্যবাদ বুবু।

ষষ্ঠ দৃশ্য

অফিস দৃশ্য। জেনারেল ম্যানেজারের কক্ষ। জেনারেল ম্যানেজার কথাটি একটি কাঠের ফলকে, টেবিলের ওপর রাখা থাকতে পারে। রাশিদার প্রবেশ। হাতে কিছু কাগজপত্র।

রাশিদা   :         আমাকে ডেকেছিলেন স্যার।

জে.ম্যা. :         হ্যাঁ, বসুন। আপনার রিপোর্ট দেখলাম।

                   ইতোমধ্যে দু-একজন অফিসে ফাইলপত্র নিয়ে আসে। জেনারেল ম্যানেজার সেগুলো দ্রুত সই করে দেয়। এক ফাঁকে মাথা তুলে রাশিদার দিকে তাকায়।

                   একটু ফরংপঁংংরড়হ আছে।

এ সময় তেইশ-চব্বিশ বছরের ছিমছাম স্মার্ট এক ভদ্রমহিলা এসে ঢোকে। নাম লুসি।

জে. ম্যা. :         (লুসির দিকে তাকিয়ে) আসুন, আসুন।

                   [কয়েকবার বুতাম টেপে। কোনো সাড়া পাওয়া যায় না।]

                   আমার পি.এ-টি.এ নেই বোধহয়। তারপর, কী খবর?

লুসি     :         থ্যাঙ্ক ইউ, ভালো।

জে.ম্যা. :         খুব তাড়া নেই তো?

লুসি     :         না, কিছুক্ষণ বসতে পারব।

রাশিদা কাগজপত্র নিয়ে চলে যাবার উদ্যোগ করে।

জে.ম্যা. :         মিস রাশিদা, নাকি কী বলে ডাকব।

রাশিদা   :         যে নামে খুশি ডাকুন স্যার।

জে.ম্যা. :         (লুসিকে দেখিয়ে) আলাপ করিয়ে দিই। লুসি ইব্রাহিম, সোশ্যাল ওয়ার্ক করেন। আর ইনি আমাদের সুপারভাইজার কাম স্টোর অফিসার। (রাশিদাকে) আমার পি.এ-টি.এ কাউকে দেখছি না। দুটো কফি বানিয়ে দেওয়া যাবে Ñ

                   ওভ ুড়ঁ ফড়হ’ঃ সরহফ.

রাশিদা চলে যায়। কোনো ভাবান্তর লক্ষ করা যায় না।

জে.ম্যা. :         তারপর বলুন। আজকাল আর এদিকে পদার্পণ হয় না।

লুসি     :         বিশ্বাস করুন, সময় পাই না।

রাশিদা দুকাপ কফি নিয়ে ঢোকে। রেখে দেয়। লুসি মাথা নেড়ে ধন্যবাদ জানায়। জে. ম্যানেজার কিছু বলে না। রাশিদা চলে যাবার উদ্যোগ করে।

জে.ম্যা. :         ছ্যা Ñ এ কফি হয়েছে।

কলিংবেল বাজায়। রাশিদা ফিরে আসে।

রাশিদা   :         আমাকে কিছু বলছিলেন স্যার।

জে.ম্যা. :         কিছু হয়নি। একে কফি বানানো বলে। বদলে নিয়ে আসুন। আপনারটা মিস Ñ

লুসি     :         আমারটা ঠিক আছে।

রাশিদা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে যায়। তারপর দৃঢ়ভাবে জেনারেল ম্যানেজারের দিকে তাকায়।

রাশিদা   :         আমার সময় নেই। নিজে বানিয়ে নিন স্যার। কফি বানানোর জন্য এ অফিসে আমার চাকরি হয়নি।

জে.ম্যা. :         একটা কাপ বদলে দিতে আপনার প্রেস্টিজে লাগলো। ভুলে যাবেন না এখনো চাকরি করছেন।

রাশিদা চলে যায়। ম্যানেজার এবার টেলিফোনের বুতাম টিপে সম্ভবত তার পি.এ-কে পেয়ে যায়।

কোথায় থাকো? লাঞ্চ আওয়ার (ঘড়ি দেখে) Ñ অতক্ষণ লাগে কেন। শোন, আমার কফিটা নিয়ে আরেক কাপ কফি। কুইক।

জে.ম্যা. :         ইম্পারটিনেন্ট। চাকরি নেওয়ার সময় হাজারো অজুহাত। অবশ্য আমি নিতাম না। এম.ডি. নিজে রাজি হয়ে গেলেন। বোধহয় কোনো লাইন-টাইন ছিল। হ্যাঁ, তা কী বলছিলেন যেন Ñ

পিয়ন এসে এক কাপ কফি দিয়ে যায়। আগের কাপ নিয়ে যায়।

                   পি.এ. কোথায়?

পিওন   :         এম.ডি সাহেব ডিকটেশনে নিতে ডেকেছেন।

জে.ম্যা. :         যতসব!

লুসি     :         আমাদের ফ্যাশান শোর টিকেট। আপনি আসতে বলেছিলেন।

জে.ম্যা. :         ও, ইয়েস।

লুসি     :         (ব্যাগ খুলে টিকিটের বান্ডিল বার করে) কটা দেব। দশটা দিই Ñ

জে.ম্যা. :         দশটা বেশি হয়ে যাচ্ছে না।

লুসি     :         না স্যার, আপনার জন্যে বেশি নয়। আপনি ইচ্ছে করলেই পারেন।

জে.ম্যা. :         আসলে কী জানেন, ঃযধঃ ড়িসধহ মেজাজটা খারাপ করে দিয়ে গেল। কিছু মনে করবেন না।

লুসি     :         না না। মনে করব কেন। আমাকে তো কিছু বলেনি। তাহলে চলি স্যার। আরো দু-একটা পার্টির কাছে যেতে হবে।

জে.ম্যা. :         আপনি বরং এক কাজ করুন। কাল চেম্বারের লাঞ্চ আছে। আড়াইটার দিকে হোটেলে চলে আসুন। লোকজনের সঙ্গে আলাপও হবে। তারপর না হয় কোথাও বসে কফি-টফি অথবা সন্ধ্যাটা যদি ফ্রি থাকে Ñ

লুসি     :         পরে জানাব।

ওঠার উপক্রম করে

জে.ম্যা. :         পরে জানাবেন কেন?

লুসি     :         এমনি। Ñ বললাম, তারপর যদি আসতে না পারি।

জে.ম্যা. :         সেরকম সম্ভাবনাও আছে নাকি।

লুসি     :         কী করে বলি, সব কি নিজের ওপর নির্ভর করে? চলি স্যার।

লুসির প্রস্থান। জেনারেল ম্যানেজারকে সিগ্রেট ধরিয়ে দুবার টান দিতে দেখা যাবে। তারপর বিতৃষ্ণার সঙ্গে ওখানা অ্যাসস্ট্রেতে নিবিয়ে দেবে। জে. ম্যানেজার টেলিফোনের বুতাম টেপে।

জে.ম্যা. :         সুপারভাইজারকে পাঠাও।

রাশিদার প্রবেশ। আগের মতোই হাতে কাগজপত্র।

কী করেছেন এসব।

রাশিদা   :         কেন কোথাও কিছু ভুলভ্রান্তি Ñ

জে.ম্যা. :         (টেবিল চাপড় দিয়ে) ও হো, ভুলভ্রান্তির কথা বলছি না। এসব লেখার কী দরকার ছিল। (সুর পালটে) ওসব রাখুন। মাথা ঠান্ডা করে কাজ করুন। এ কী আপনি দেখছি এম.ডি-কেও কপি পাঠিয়েছেন।

রাশিদা   :         বরাবরই ওঁর কাছে কপি যায় Ñ

জে.ম্যা. :         (আবার সুর পালটে) কপি পাঠিয়েছেন ভালো। আমার কমেন্ট চাইবেন। আমি লিখে দেব। ওসব ছাড়–ন। কী জাানি আমার মাথা ঠিক ছিল না। অন্যায় হয়ে থাকলে আমি স্যরি। তবে এক হাতে তালি বাজে না।

রাশিদা   :         ইনভেন্টারি লিস্ট করতে গিয়ে ধরা পড়ল স্যার। খাতাপত্রের সঙ্গে স্টক মিলছে না। যেমন দেখুন (নিজের কাগজ বার করে) চার নং আইটেম টেট্রাসাইক্লিন খাতাপত্রে পাঁচ হাজার কেজি Ñ স্টকে পাওয়া যাচ্ছে তিন হাজার কে.জি.। প্যারাসিটামল আগস্টের পর থেকে রিসিভ করা হয়নি। অথচ পার্টিকে পুরো পেমেন্ট করা হয়েছে। তারপর Ñ

জে.ম্যা. :         এসব তো আপনার দেখার কথা নয়। অডিট পার্টি দেখবে। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে Ñ

রাশিদা   :         না না, আমি বিপ্লব করতে আসিনি। চাইলেও পারব না। যা চোখে পড়ল ঈধঁঃরড়হ করলাম।

জে.ম্যা. :         আপনাকে এসব কাজে সাহায্য করল কে।

রাশিদা   :         (ইতস্তত করে) ধরুন স্যার, আমি নিজেই খোঁজ-খবর নিয়েছি।

জে.ম্যা. :         রাবিশ। এই সেদিন এসে আপনি লায়েক বনে গেলেন। আমরা তো বসে বসে ঘাস কাটি না।

রাশিদা   :         স্যার বিশ্বাস করুন Ñ

জে.ম্যা. :         (ফাইল বন্ধ করে) আমি পরে আপনার সঙ্গে আলাপ করব। নতুন নতুন এরকম হয়। আপনার আগেও দু-চারজন চেষ্টা করেছে। রিপোর্ট লিখলে কিছু হয় না। ওসব প্রমাণ করা যায় না। (সুর পালটে, আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে যায়। পায়চারি করে) আপনিও  ধোওয়া তুলসী পাতা নন। আপনাকে একটা কথা বলব বলব ভাবছিলাম। অবশ্য ব্যক্তিগত ব্যাপার। তারেকের সঙ্গে আপনার মাখামাখি Ñ

রাশিদা   :         আমি এসব শুনে অভ্যস্ত নই। ভালো-মন্দ বোঝার বয়েস হয়েছে।

জে.ম্যা. :         আমি ভালোর জন্যেই বললাম। তাছাড়া Ñ

রাশিদা   :         তাছাড়া কী?

জে.ম্যা. :         আপনি জানেন আপনার একটা হিস্ট্রি আছে।

রাশিদা   :         হিস্ট্রি? (হাসে) হিস্ট্রি নেই এমন মানুষ আছে নাকি। আপনার কথা জানি না স্যার। তবে ওটা হিস্ট্রি নয়, দুর্ঘটনা। আমার কোনো হাত ছিলো না। কাজেই ওসব আলোচনা আমার ভালো লাগে না।

জে.ম্যা. :         অ্যাজ ইউ উইশ। আপনার ভালোর জন্যে বললাম। ফাইল থাক আমার কাছে, আপনি যেতে পারেন।

সপ্তম দৃশ্য

অফিসের ক্যান্টিনে তারেক এবং রাশিদা এক টেবিলে বসে। তারেক দুকাপ চা ও দুটো প্যাটিস নিয়ে আসে। নিন।

রাশিদা চা নিল।

কী হলো তারপর?

রাশিদা   :         ওই বাঁধাধরা গান। কার সঙ্গে মিশি না মিশি।

তারেক  :         (চায়ে চুমুক দেয়। দ্রুত চুমুক দেওয়ায় জিব পুড়েছে ভাব দেখিয়ে) আমার কথা বলল?

রাশিদা   :         হ্যাঁ।

তারেক  :         তবু আপনার এসব তর্কে না যাওয়াই ভালো ছিল। জাত নেকড়ে পারবেন না। (চার দিকে তাকিয়ে) অফিসের স্টাফ কার Ñ শুনেছি জি.এম-এর ভাইয়ের। মাসে মাসে ছত্রিশ হাজার টাকা করে নেয়। আরো কতদিকে পুকুরচুরি, কে জানে।

রাশিদা   :         আপনারা বলতে পারেন না?

তারেক  :         ওসব হয় না। ছেলেপুলে নিয়ে ঘর-সংসার করলে হয় না। তবে হ্যাঁ আপনার পড়ঁৎধমব-এর প্রশংসা করি। জানি তো সব। আমরা পুরুষ মানুষ হয়ে যা পারিনি, আপনি মেয়েমানুষ হয়ে দেখিয়ে দিলেন।

রাশিদা   :         হয়তো কিছু হবে না। মাঝখান থেকে চাকরিটাই যাবে।

দুজন ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে পড়ে। রাস্তা ধরে হাঁটে। একসময় পার্কে গিয়ে বসে।

তারেক  :         লোকটা কী পাজি জানেন না। কখন কী ফন্দি আঁটে। আপনার চাকরির ব্যাপারে বলল?

রাশিদা   :         না, তেমন করে বলেনি। তবে বলতে হয় না।

তারেক  :         একটা কথা বলি। তেমন যদি কিছু হয় Ñ বলছি না হবে Ñ মনে রাখবেন (নিজের দিকে দেখিয়ে) আপনার একজন শুভাকাক্সক্ষী আছে।

রাশিদা   :         চাকরি চলে গেলেও?

তারেক  :         বিশ্বাস হচ্ছে না?

রাশিদা   :         না, তা হবে না কেন। আপনি খুব ভাবেন আমার কথা Ñ

                   আমাকে এখন উঠতে হয় তারেক সাহেব। (ঘড়ি দেখে)।

তারেক  :         ভাবি বইকি। ভালো কথা, আপনার জন্য  একটা Ñ

পকেট থেকে ছোট্ট একটা কৌটো বার করে।

রাশিদা   :         কী এটা?

তারেক  :         একরকম বাম। মাথাটা ধরলে Ñ মনে হলো নিজে থেকে তো আর কিনবেন না।

রাশিদা   :         ধন্যবাদ। আসলেও মাথাটা ধরেছিল। কেমন জ্বরজ্বর ভাব।

                             রাশিদা তারেকের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।

তারেক  :         দেখি দেখি। (দেখেই ছেড়ে দেয়) কই না  তো।

রাশিদা   :         (হাত গুটিয়ে নেয়) জ্বর নেই। একটা জিনিস দেখলাম।

তারেক  :         কী দেখলেন?

রাশিদা   :         না থাক।

তারেক  :         থাকতে যাবে কেন, বলুন না।

রাশিদা   :         না, দেখলাম কত ভরসা। ধরতেই ছেড়ে দিলেন। ভয় পেলেন বোধহয়। ভালোই করেছেন।

তারেক  :         না না।

রাশিদা   :         অত সিরিয়াসলি নেবেন না। এমনি বললাম।

অষ্টম দৃশ্য

রাশিদা দরজা খুলল। লুসির প্রবেশ।

লুসি     :         আমাকে দেখে অবাক হচ্ছেন বোধহয়।

রাশিদা   :         আপনি Ñ ওই যে অফিসে দেখা হয়েছিল। তা আপনি তো এ বাড়িতে আসেননি কখনো।

লুসি     :         না। ঠিকানা আপনার অফিস থেকেই নিলাম। মেয়েমানুষ মেয়েমানুষের খোঁজ করছে, দিয়ে দিলো। থাক সে কথা। আমার জন্যে সেদিন আপনার অনেক হ্যানস্তা হলো বলে আমি দুঃখিত। আসলে আমি কফি-টফি খাইও না। মুখে মুখে বলি, ক্লায়েন্টদের খুশি রাখতে।

রাশিদা   :         না না, সে কথা ভেবে এত বিব্রত হচ্ছেন কেন?

লুসি     :         আপনাকে দেখে আমার সাহস হলো। ভরসা পেলাম। আপনি তো মুখের ওপর শুনিয়ে দিলেন। আমি হলে পারতাম না।

রাশিদা   :         না না, অত বাহবা দেবেন না। একেক সময় হয়ে যায়। ভালো করে বললে একবার কেন দশবারও করতে রাজি। কিন্তু কেউ যখন ভাবে তাদের কেনা গোলাম Ñ

লুসি     :         আপনি তবু তো পারেন। আমরা পারি না বলেই টিকিট বিক্রি করে সামান্য কমিশনের জন্যে এক অফিস থেকে অন্য অফিস হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াই। তাও কি পাই মনে করেন। ভালো মানুষ পেয়ে আমাদের ঠকাচ্ছে।

রাশিদা   :         ঠকাতে না দিলেই হয়।

লুসি     :         অনেকদিন পর সেটাই শিখলাম আপনার কাছে।

রাশিদা   :         কেউ কাউকে শেখায় না। হঠাৎ এক একটি মুহূর্ত আসে। তখন মন বিদ্রোহ করে। শেকল ভাঙতে চায়। হবার যখন আপনা থেকেই হবে। আপনাকে চা দিই Ñ রীতা দুকাপ চা মা।

লুসি     :         আবার চা Ñ না থাক, অন্যদিন।

                   (লুসি উঠে দাঁড়ায়। শেল্ফে রাখা বই দেখতে থাকে।) খুব ভালো ঈড়ষষবপঃরড়হ তো। পান কোথায়?

রাশিদা   :         পাই আর কই, জোগাড় হয়ে যায়। নিন না ইচ্ছে হলে।

লুসি     :         না না, আপনার সখের লাইব্রেরি নষ্ট করতে চাই না।

রাশিদা   :         আমার শখের বলে কিছু নেই।

লুসি     :         তবু।

রাশিদা   :         যা খুশি নিন। কোনো কিছু ধরে রাখা যায় না, বই তো দূরের কথা।

রীতা চা দিয়ে গেল।

লুসি     :         কে, আপনার মেয়ে? কী নাম?

রীতা পালিয়ে যায়।

রাশিদা   :         ও ওইরকমই। মানুষ দেখলে পালায়। রীতা।

লুসি চায়ে চুমুক দেয়।

                   একটা কথা জিজ্ঞেস করি। বিয়ে-থা করেননি কেন।

লুসি     :         তার আগে ছোট্ট একটা অনুরোধ, আপনি আমাকে তুমি বলবেন। কী জানি, এধরনের আবদার আর কারো কাছে করিনি এর আগে Ñ

রাশিদা   :         বেশ তো তাই হবে। তা বললে না বিয়ে হলো না কেন?

লুসি     :         হলো না আর কী। এসেছিলাম পড়াশুনো করতে। তাও শেষ করতে পারলাম না। আসতে না আসতেই পরিবারে অ্যাকসিডেন্ট। বাবা Ñ

রাশিদা   :         স্যরি Ñ

লুসি     :         সেই থেকেই টুকিটাকি কিছু করার চেষ্টা করছি। কি করব গোটা সংসারের দায়িত্ব। এতোদিন তো ছোট ভাইটাকে সঙ্গে রেখেছিলাম। গত মাসে ওকেও চাকরি নিয়ে নীলফামারি চলে যেতে হলো।

রাশিদা   :         তাহলে তো একদম একা।

লুসি     :         একদম।

রাশিদা   :         তাহলে যে-কোনো সময় চড়াও হয়ে যেতে পারি।

লুসি     :         তাহলে আজ যাই।

রাশিদা   :         আর ততদিনে যদি সংসারী হয়ে ওঠো।

লুসি     :         আর সংসার। ওসব বোধহয় কপালে নেই। এখন উঠি। যখন খুশি ডাকবেন। (কাগজে লিখে দিলো) এই রইল টেলিফোন Ñ

রাশিদা   :         তোমার?

লুসি     :         আমাদের ওপর তলার, তবে বললে ডেকে দেয়।

নবম দৃশ্য

রাশিদার বাসা।

রাশিদা এবং রোকেয়া আলাপরত।

রোকেয়া          :         সকালে পাশের বাড়িতে টেলিফোন করেছিলাম। বুঝলাম না টেলিফোন খারাপ, না বাড়িতে কেউ ছিল না।

রাশিদা   :         কেন, জরুরি কোনো খবর ছিল নাকি।

রোকেয়া          :         হ্যাঁ, মাসুদ ফিরেছে। এসেই তোমাদের খোঁজ-খবর করছিল। আপাতত আমার এখানে। ভাবলাম খবরটা জানিয়ে দিই।

রাশিদা   :         ও, এই ব্যাপার। তা কেমন আছি বলে দিলেই পারতে।

রোকেয়া          :         তা তো বলেছি। তবু একবার গিয়ে দেখা-সাক্ষাৎ করতে দোষ কী।

রাশিদা   :         আমাকে বলছ?

রোকেয়া          :         হ্যাঁ, মা-মেয়ে তোমাদের দুজনকেই।

রাশিদা   :         আমার কথা ভালো করেই জানো। তবে (ইতস্তত করে) রীতা ইচ্ছে করলে ওর বাবার সঙ্গে দেখা করে আসতে পারে, আমার আপত্তি নেই।

রীতা     :         না, তুমি না গেলে আমি যাব কেন। কিছুতেই না আন্টি।

রোকেয়া          :         শোন মেয়ের কথা। নিজের বাবা সম্পর্কে অমন করে বলতে হয়?

রীতা     :         বাবা, কিসের বাবা?

রাশিদা   :         রীতা।

রীতা     :         এতদিন কোথায় ছিল বাবাগিরি।

রোকেয়া          :         মেয়ে হিসেবে তোর ওপর তার দাবি নেই, তাই বলে?

রীতা     :         ওই লোকটার কথা বলবে না প্লিজ।

রোকেয়া          :         দেখা না করলে না করলি। তা বলে আমার বাসায় যেতেও তোর আপত্তি?

রীতা     :         (ইতস্তত করে) তা, তা আপত্তি থাকবে কেন। মাও যাবে?

রোকেয়া          :         আমি তো কখন থেকেই সাধাসাধি করছি।

রাশিদা   :         আমার কাজ আছে বুবু। রীতা যাক।

রীতা     :         তাহলে আমিও যাব না।

রাশিদা   :         ছি, অমন বলতে নেই। (মাথায় হাত বুলিয়ে) আন্টি বলেছে যখন যা না। কাল তো স্কুলও ছুটি।

রীতা     :         যেতে পারি এক শর্তে। ওই লোকটির সঙ্গে দেখা করব না। কথাও বলব না। তুমি আবার জোরাজুরি করবে না।

রোকেয়া          :         আমি জোরাজুরি করতে যাব কেন? মেয়ের কথা শোন। ইচ্ছে না হয়, বলিস না। (কিছুক্ষণ থেমে) আমাকে বারবার করে তোর কথা বলছিল।

রীতা     :         (উৎসুক হয়ে ওঠে) কী কথা আন্টি? মিথ্যে বলছ। কী জিজ্ঞেস করল শুনি!

রোকেয়া          :         আমার রীতা কত বড় হলো, কী পড়ে। নিশ্চয়ই খুব লক্ষ্মী মেয়ে Ñ এসব আর কী Ñ

রীতা     :         বলেছে না, হাতি।

রোকেয়া          :         সত্যি-মিথ্যে নিজে পরখ করে আয়।

রীতা     :         আবার বলছি আন্টি। যেতে পারি, কিন্তু ও বাড়িতে কারো সঙ্গে কথা বলব না। মিশব না, এক তুমি ছাড়া। যাব মা?

রাশিদা   :         যা। যাবি না কেন। বুবু তোকে নিজে থেকে নিতে এলো।

রীতা     :         তুমি তো যাচ্ছ না। একা একাই যাব?

রাশিদা   :         সব যাত্রায় সঙ্গী মেলে না মা। তুই যা। আন্টি কতক্ষণ থেকে বসে।

রীতা     :         ঠিক আছে। তোমরা দুজনেই যখন বারবার বলছ। তবে আমি কিন্তু মাকে ছেড়ে বেশিক্ষণ থাকব না।

রোকেয়া          :         আচ্ছা, আচ্ছা। তুই তৈরি থাকিস। আমি বিকেলে ফেরার পথে নিয়ে যাব।

দশম দৃশ্য

অফিসে রাশিদা কাজ করছে আগের মতো। টেকনিশিয়ান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। কাগজপত্র নিয়ে ব্যস্ত রাশিদা। তারেকের প্রবেশ।

তারেক :         আপনি কি খুব ব্যস্ত?

রাশিদা   :         না, কেন?

তারেক  :         কথা ছিল।

মহিলা টেকনিশিয়ান, আমি বরং যাই ম্যাডাম

রাশিদা   :         না না। ওই কথার জন্যে আপনার চলে যাবার দরকার নেই। তবে, হ্যাঁ অফিস তো ছুটি হয়ে এলো প্রায়, ঘড়ির দিকে তাকায়। পাঁচটা বাজতে চলে।

মহিলা টেকনিশিয়ান : যাই যাই?

রাশিদা   :         ঠিক আছে। আমাকে একটু বসতে হবে। (তারেককে) হ্যাঁ বলুন, এবার কী কথা Ñ

তারেক  :         না, আপনি বোধহয় আমাকে সরং ঁহফবৎংঃধহফ করেছেন।

রাশিদা   :         মোটেও না। (চশমা খুলে) আমার ধারণা ছিল আপনি আমাকে ংঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ করবেন।

তারেক :         দেখুন, আমার ছেলেমেয়ে, বউ-সংসার আছে।

রাশিদা   :         সেটা তো সাত বছর ধরেই ছিল।

তারেক  :         আমার ওপর প্রেসার আসছে।

রাশিদা   :         মানে আপনার কথা হচ্ছে : আমি আপনাকে মনেপ্রাণে সমর্থন করি। কিন্তু পারব না। আপনার লড়াই আপনি লড়ে যান। আমি মাপ চাই। এই তো?

তারেক  :         বলবেন আমার সাহস নেই, দৃঢ়তা নেই। কিন্তু বিশ্বাস করুন আপনার প্রতি Ñ

রাশিদা   :         ব্যস ব্যস। আর উচ্চারণ করবেন না। যার দৃঢ়তা নেই সে অন্যের কল্যাণাকাক্সক্ষী হবার কথা বলে কোন মুখে? আসলে আপনারা ভেবেছিলেন দুটো গলদ দেখিয়ে দিয়ে আমি জোয়ান আব আর্ক বনে যাব। তেমন ইচ্ছে আমার ছিল না।

তারেক  :         আমিও সে কথাই বলি। ওদের সঙ্গে পারবেন না। ওদের মেলা প্রভাব-প্রতিপত্তি। কোনটা টান দিতে গিয়ে কোনটা এসে পড়ে। বলেছি আপনার ভালোর জন্যেই।

রাশিদা   :         সবাই আমার ভালোর জন্যেই বলে। করেও ভালোর জন্যেই। অথচ ভালো আর হয় না।… তার ভয়ে ভয়ে থেকেও আমার কিছু হয়নি। বলব না, আমি সাহসী। তবু মাঝে মধ্যে কেমন করে যে অমন              দু-একটা কাজ করে ফেলি Ñ

তারেক  :         আমি অবশ্য বলে দিয়েছি আমি এসবের মধ্যে নেই।

রাশিদা   :         (হাসল) বলে দিয়েছেন। খুব ভালো করেছেন। কী দিলো, পুরস্কার-টুরস্কার দেবে না কিছু।

তারেক  :         ঠাট্টা করছেন।

রাশিদা   :         ঠাট্টা করবো কেন। চলুন অফিস ছুটি হয়ে গেল।

                   (দুজন বেরিয়ে আসে। অফিসের লনে কিছুক্ষণ পায়চারি করে। সেখানে সুন্দর ফুলের বাগান একধারে)

                   জানেন আমি কিন্তু আপস করে ফেলতে পারতাম।

তারেক  :         তাহলে তো আর কোনো হ্যাঙ্গামায় পড়তে হয় না।

রাশিদা   :         আমি খুব কম খেলায়ই জিতি। জিতিই না বলতে গেলে। তবু এটা জেতার ইচ্ছে হলো।

তারেক  :         এটা তো কোনো খেলা ছিল না।

রাশিদা   :         এক অর্থে হয়তো ঠিক বলেছেন। খেলার অন্য সঙ্গী দরকার। পেলাম না। তবে আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে ভালো হলো।

তারেক  :         তার মানে?

রাশিদা   :         কিছু না। দুটো বিপরীত স্বার্থ একাত্ম হতে পারে না।

তারেক  :         বিশ্বাস করুন আমি আপনার পাশে এসে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম।

রাশিদা   :         তারও দরকার ছিল না। ধারে কাছে থাকলেই হতো।

তারেক  :         ওরা আপনার প্রতি আমার দুর্বলতার কথা জানে বোধহয় সেটাই ভাঙিয়ে Ñ

রাশিদা ফুলের বাগানের কাছে যায়। বলছিলাম ঝোঁকের মাথায় চাকরি চলে গেলে করবেন কী।

রাশিদা   :         (অফিসের ফুলের বাগানে পায়চারি করে) আগেভাগে ভেবেই কী করব। চাকরি তো আর ছড়ানো-ছিটানো ফুল নয় যে, যে-কোনো একটা তুলে নেব। (একখানা তুলে নিয়ে খোঁপায় দিলো?)

ওরা অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে পড়ে।

তারিক   :         একা একাই ফিরবেন?

রাশিদা   :         তা কেন। ইচ্ছে করলে চলুন। সবুজ ঘাসে বসব। লেকের ঠান্ডা পানিতে পা ডোবাব। মুক্ত আকাশের দিকে তাকাব। কিন্তু তারেক সাহেব Ñ

তারেক  :         কিন্তু কী Ñ

রাশিদা   :         এ আরেক রাশিদা।

তারেক  :         তার মানে?

রাশিদা   :         কাল যাকে চিনতেন সে নয়। আরেকজন।

তারেক  :         আর আমি?

রাশিদা   :         আপনি? আপনিও আরেকজন। অন্তত আমার চোখে। কাল যাকে চিনতাম সে নয়। কিন্তু তাই বলে কি নতুন লোকের সঙ্গে আলাপ হয় না? চলুন।

একাদশ দৃশ্য

এম.ডি-র কামরা। জেনারেল ম্যানেজারের প্রবেশ। হাতে ফাইল। এম.ডিকে অতিশয় ব্যস্ত দেখা যাবে

জে.ম্যা. :         আমি বরং পরেই আসি।

এম.ডি  :         না না, বসুন। বলুন। পরে আরো ব্যস্ত হয়ে পড়ব।

জে.ম্যা. ফাইল বাড়িয়ে দেয়।

                   তা তো বুঝলাম। কিন্তু ঝঢ়বপরভরপ ঈযধৎমব-টা কী?

জে.ম্যা. :         কথা হচ্ছে স্যার ওঁকে যে কাজ দেওয়া হয়েছে তা না করে এর-ওর কাজে নাক গলাচ্ছেন। আমাদের স্টক তো সব সময়ই ব্রেক হচ্ছে। আমি নিজেও ওকে বলেছিলাম আপনার কাজ আপনি করুন। এসবের জন্যে বাইরের অডিট আছে।

এম.ডি  :         রিপোর্ট যখন একটা এসেছে, ইনকোয়ারি করে দেখতে দোষ কী।

জে.ম্যা. :         আমার মনে হয় বাইরের পার্টির প্ররোচনা ছিল।

এম.ডি  :         কী করে জানেন?

জে.ম্যা. :         স্যার উনি তারেক Ñ মানে আমাদের ঝধষবং-এর তারেককে সাক্ষী মেনেছিলেন। সেই তারেক কাল নিজে এসে ঝঃধঃবসবহঃ দিয়ে সব অস্বীকার করে গেছে। ঝঃধঃবসবহঃ-টা, স্যার ফাইলের সঙ্গে।              

[খুলে-দেখিয়ে দেয়।]

এম.ডি  :         তারও কারণ থাকতে পারে। আপনি বরং ওকে পাঠিয়ে দিন। ও ড়িঁষফ ষরশব ঃড় ঃধষশ ঃড় ঃযব ষধফু.

জে.ম্যা. :         স্যার, আমাদের তরফ থেকে কোনো প্রেসার ছিল না। আমাদের কী, কাজ করবেন মাইনে নেবেন!

এম.ডি  :         প্লিজ Ñ

জে.ম্যা. :         পাঠিয়ে দিচ্ছি স্যার।

রাশিদার প্রবেশ

এম.ডি  :         বসুন। (টেলিফোনের বুতাম টিপে) আমি ব্যস্ত থাকব। কোনো কল দেবেন না।

   টেবিল থেকে একখানা খামবদ্ধ চিঠি তুলে নিল।

                   আমার নামে একটা চিঠি। দেখলাম ঋৎড়স-এ আপনার নাম। খুলিনি।

রাশিদা   :         খুললেই বুঝতে পারবেন স্যার।

এম.ডি  :         না খুলেও বুঝতে পারি। আমার কাছে সাধারণত দু-ধরনের চিঠি আসে। চাকরিতে ঢোকার আর্জি জানিয়ে Ñ

রাশিদা   :         অথবা চাকরি ছাড়ার।

এম.ডি  :         সেরকমই অনুমান করেছিলাম। ওই ভয়েই খুলিনি। ছেড়ে দিচ্ছেন কেন?

রাশিদা   :         ছাড়তে চাইনি স্যার। চারদিক থেকে জালে আটকা পড়ে যাচ্ছি।

এম.ডি. :         জালে কেন আপনি আটকাবেন। ফেস করুন।

রাশিদা   :         করতে চেয়েছিলাম স্যার। রোজ থ্রেট আসছে। আজকেও টেবিলে দু-দুটো চিঠি Ñ

এম.ডি. :         কই দেখান তো।

রাশিদা   :         না থাক। ছিঁড়ে ফেলেছি।

এম.ডি. :         আপনি ওসব নিয়ে ভাববেন না।

রাশিদা   :         ওসব নিয়ে পরওয়া ছিল না। কিন্তু মেয়েটার কথা বলে যখন ভয় দেখায়, গুম করে ফেলার কথা বলে, ভয় পাই। পারি না। মেয়ের জন্যেই নিরুপায়।

এম.ডি. :         আমার নিজের মেয়ে আছে। আপনার অসুবিধে বুঝি। কী বলব বলুন। এক মিনিট (পার্স থেকে কার্ড বের করে উলটোপিঠে কী লিখে দেয়) Ñ একটা ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। রহমান আমার পুরনো বন্ধু। মাসদুয়েক ওরা একটা ফ্যাক্টরি করছে। আমার কথা বলবেন। আমি নিজেও টেলিফোন করে দেব। তাছাড়াও, যদি কখনো কাজে আসি Ñ (কার্ড দিলো)।

রাশিদা   :         নিশ্চয়ই। আপনজন মনে করেই আসব।

রাশিদা উঠে দাঁড়ায়। এসময় তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হবে এম.ডি-র সামনে রাখা অ্যাসট্রেতে একটি জ্বলন্ত সিগারের প্রতি। সিগারটি প্রায় পুড়ে ছাই।  [ঈষড়ংব ংযড়ঃ]

রাশিদা স্বগতোক্তি : তোমার জীবনও ছাই হয়ে গেল এমনি করে পুড়ে পুড়ে। শেষ সব শেষ।

রাশিদা   :         স্যার?

এম.ডি. :         কিছু বলবেন।

রাশিদা   :         আপনার চুরুট।

এম.ডি. :         কি নিবিয়ে দেব?

রাশিদা   :         না না, বলছিলাম। কথা বলতে বলতে সব পুড়ে ছাই। নিবে গেল বোধহয়।

এম.ডি. :         (তুলে নেয়। অ্যাসট্রেতে ছাই ফেলে দেখায়, এখনো আগুন আছে) না না। ঝেড়ে ফেললেই হলো। নিববে কেন। তবে আপনাকে কথা দিচ্ছি, এ নাটকের এখানেই শেষ না।

দ্বাদশ দৃশ্য

রোকেয়ার বাড়ি। ড্রয়িং রুম। সুন্দর করে সাজানো। মনে হয় যথেষ্ট বিত্তশালী। মাঝামাঝি জায়গায় একটা বেতের কাজ করা ফুলের ডিজাইনে জালি করা পার্টিশন। তারই আড়ালে থেকে রীতা লক্ষ করে অন্যদিকে খাবার টেবিল। সেখানে মাসুদ, রাকিব ও তার স্ত্রী এবং হালিম। রীতা তাদের কাউকে চেনে না। সুতরাং স্বাভাবিক ভীতি এবং কৌতূহল দুটোই।

রোকেয়া :         চা তোর ওই টেবিলে দিয়েছি।

রীতা     :         কোন টেবিলে?

রোকেয়া :         তোর বাবার সঙ্গে কারা কারা দেখা করতে এসেছে। সেখানেই আমরা সবাই বসব।

রীতা     :         (আড়চোখে তাকায়) ওই টেবিলে আমি যাবই না।

আবার পার্টিশনের ফাঁক দিয়ে লক্ষ করে।

রোকেয়া :         চিনিস তোর বাবাকে? বলব না। নিজে খুঁজে বার কর।

রীতা     :         জানি না। ছবি দেখেছিলাম একবার। দরকারও নেই চেনার।

রোকেয়া :         না চিনলে আর ভয়টা কী। যাবি না কেন? একটা কথা জিজ্ঞেস করি। রেস্তোরাঁয় কখনো যাসনি, যাসনি কারো সঙ্গে?

রীতা     :         তা যাব না কেন।

রোকেয়া :         তাহলে সেরকম মনে করলেই হয়। যেখানে একজন একজনকে চেনে না।

রীতা     :         এক টেবিলে বসলে চেনে।

রোকেয়া :         (পার্টিশনের এপাশ দেখেই পরিচয় করিয়ে দেয়) ওই যে লম্বামতো গোলগাল চেহারা মি. রাবিক আর সঙ্গে তার স্ত্রী। তোর বাবার সঙ্গে একসঙ্গে লন্ডনে ছিল। আর বাঁয়ে ওধারে প্রফেসর হালিম। তোর বাবার ক্লাস ফ্রেন্ড। আর Ñ আর আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম, তোর বাবার সঙ্গে আলাপ করবি না।

রীতা গভীর আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ করে টেবিলের মাথায় উপবিষ্ট ভদ্রলোক অর্থাৎ মাসুদকে। মোটামুটি সুদর্শন। ঢিলে-ঢালা জামা-কাপড় পরা। চোখে চশমা। বয়েস পঁয়তাল্লিশ বা তদূর্ধ্ব।

রীতা     :         ঠিক আছে। বলছ যখন চলো।

রোকেয়া :         দাঁড়াও। শাড়িটা বদলে নিই। চলো চুলটাও আঁচড়ে নিই। আয়।

দুজনে ভেতরে যায়।

– ঈঁঃ ঃড় –

খাবারের টেবিল। রীতা ও রোকেয়া তাদের নির্ধারিত শূন্য চেয়ারে গিয়ে বসে। ঠিক কাউকে লক্ষ না করে সবার দিকে হাত ঘুরিয়ে ত্বরিতগতিতে সালাম করে নেয় রীতা। বোঝা যাবে একটু আগে কোনো কিছু আলাপ হচ্ছিল। ওদের আগমনে ভাঁটা পড়ল।

রোকেয়া :         (মাসুদকে) তোমরা ঢেলে নিলেই পারতে। চাও বোধহয় ঠান্ডা হয়ে গেল।

হালিম   :         না না। সবাই একসঙ্গে খাব সেটাই তো আনন্দ।

রোকেয়া সবাইকে কোয়ার্টার প্লেট ও ন্যাপকিন দেয়। মাসুদের ন্যাপকিন বাদ পড়ে যায়। কিন্তু হাতের কাছে অতিরিক্ত কোনো ন্যাপকিন দেখা যায় না।

রোকেয়া :         তুমি তো আবার লন্ডনফেরত মানুষ। ন্যাপকিন না হলে চলে না।

রীতা উঠে গিয়ে দ্রুত গাতিতে নিজেরখানা মাসুদকে দিয়ে আসে। দৌড়ে ফিরে আসতে চায়। মাসুদ ওর হাত ধরার চেষ্টা করে। রীতা মৃদু করে হাত সরিয়ে নিয়ে নিজের আসনে চলে আসে।

মাসুদ    :         রীতা না?

রীতা     :         (রোকেয়ার কানে কানে) বলে দাও, আন্টি আমি কেউ না।

অন্যরা চা পানে ব্যস্ত এবং সে ফাঁকে আলাপ-আলোচনা।

প্রফেসর হালিম   :         আমরা বরং ওদিকটায় বসি। হালিম, রাকিব ওরা সোফা সেটে

                                      এসে বসে।

রোকেয়া          :         আমিও একটু ঘুরে আসি। রীতা তুই থাক।

যাবার সময় রোকেয়া পিতা এবং কন্যাকে লক্ষ করে, মনে হয় যেন ইচ্ছে করেই ও তাদের নিবিড় হবার সুযোগ করে দেয়। মাসুদ চেয়ার থেকে উঠে আসে। রীতার পেছনে দাঁড়ায়। মাথায় হাত রাখে। রীতা ছিটকে সরিয়ে দেয়। মাসুদ এবার সোফায় অন্যদের সঙ্গে এসে যোগদান করে। দেখা যায় একজন একজন করে ওরা বিদায় নেয়। রীতা দুহাতে মুখ ঢেকে আগের জায়গায় বসে থাকে। (রোকেয়া এসে ঢোকে)

মাসুদ    :         রোকেয়া মেয়েটাকে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দাও।

নিজের বুকের কাছে হাত রেখে। আমার ওষুধ কি ওঘরে?

 রোকেয়া         :         (ব্যতিব্যস্ত) দিচ্ছি। কি, খারাপ লাগছে?

হঠাৎ মুখ থেকে হাত নামিয়ে চমকে যায় রীতা। দেখে রোকেয়াকে সঙ্গে নিয়ে মাসুদ ভেতরের ঘরে যাবার উপক্রম করে।

মাসুদ    :         আমি ভেতরে যাই। নিয়ে নেব। রুকু রাত হয়ে যাচ্ছে। ওকে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দাও।

রোকেয়া :         দেব। তা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।

মাসুদ    :         যা বলি করো।

মাসুদ ভেতরে চলে যায়। রীতা পেছন পেছন দৌড়ে আসে। তারপর এক জায়গায় এসে স্থির হয়ে যায়। দ্বিধাগ্রস্ত। রোকেয়া ফিরে আসে।

রীতা     :         আন্টি। কি রকম করছিল যেন। কি, শরীর খারাপ?

রোকেয়া :         ছিল। তবে ওরকম আগে দেখিনি। তুই বসবি না যাবি? আমি বরং ডাক্তারকে টেলিফোন করি।

রীতা     :         (চিন্তাগ্রস্ত) কী হয় আন্টি, ব্যথা করে?

রোকেয়া :         বোধহয়।

রীতা     :         মা তো জানে না।

রোকেয়া :         জানলেই বা কী। তোর মা কি আসবে?

                   রীতা না-সূচক মাথা নাড়ে।

রীতা     :         মার দোষ কী।

রোকেয়া :         তুই যাবি? গাড়ি তৈরি।

রীতা     :         যাব। কিন্তু কারো শরীর খারাপ। এভাবে চলে যাওয়া কি ঠিক?

রোকেয়া :         কার শরীর খারাপের কথা বলছিস। (রীতা আঙুল দিয়ে ভেতরের ঘর দেখায়।)

                   লোকটির নাম নেই?

রীতা     :         আন্টি Ñ

জনৈক গৃহপরিচারিকা রোকেয়াকে ডাকতে আসে। ইঙ্গিতে কথা হয়।

রোকেয়া :         আমি যাই। আমাকে ডাকছে বোধহয়।

রীতা     :         আন্টি আমার মনে হয় আমি এখন যাব না।

রোকেয়া :         তোর বাবা বলছে তোর মা ভাবনা করবে।

রীতা     :         আঃ, যাব না বলেছি। হাসপাতালে রোগী দেখলে বসতে হয় না? পরে যাব। পনেরো মিনিট আধ ঘণ্টা এক ঘণ্টা পরে, যাও। (কানে কানে) ওষুধ খাওয়াও। যাও।

একরকম ঠেলে পাঠিয়ে দেয় ভেতরে। রীতাকে খুবই চিন্তাগ্রস্ত মনে হয়। পত্রপত্রিকা দেখে মনোনিবেশ করতে পারে না। উঁকি মেরে ভেতরে কিছু দেখার চেষ্টা করে। আবার এসে বসে।

রীতা     :         (ব্যস্ত হয়ে) এখন কেমন?

রোকেয়া :         রোগ কি এত তাড়াতাড়ি ভালো হয়?

– ঈঁঃ ঃড় –

ভেতরের ঘর। সেখানে খাটে মাসুদ ঘুমিয়ে। রোকেয়াকে সঙ্গে নিয়ে রীতা এসে ঢোকে।

রীতা     :         (কানে কানে) এদিককার বাতিটা বুজিয়ে দাও না। চোখে লাগবে। আমি বসি। (ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে) খবরদার বলবে না।

রোকেয়া :         কী বলব না। (মৃদু হাসি) ও বুঝেছি।

রীতা     :         আন্টি ডাক্তারকে আরেকবার ফোন করো না।

রীতা পাশের আরাম চেয়ারে গিয়ে বসে সন্তর্পণে। একটা খবরের কাগজ তুলে নিয়ে মৃদু হাওয়া করে মাসুদকে। এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। মাসুদের ঘুম ভেঙে যায়। মাথার কাছে রোকেয়া।

রোকেয়া :         এখন কেমন লাগছে?

মাসুদ    :         ভালো। এত করে বললাম, মেয়েটাকে পাঠাওনি।

রোকেয়া :         আমি তো তখন থেকে সাধছি। না যেতে চাইলে কী করব। দেখ না ঘুমিয়ে পড়েছে।

মাসুদ    :         ঘুমিয়ে পড়েছে। ঠিক জানো?

রোকেয়া :         হ্যাঁ। তুমি আবার উঠলে কেন।

                   মাসুদ বিছানা থেকে উঠে রীতার কাছে যায়। পাশে বসে। কী মনে করে মাথায় হাত দিতে চেয়েও দেয় না।

মাসুদ    :         থাক ওকে ঘুমুতে দাও। 

ত্রয়োদশ দৃশ্য

নিজের বাড়ি। রাশিদা ও রীতা।

রাশিদা   :         বললি না তো কেমন দেখলি।

রীতা     :         আমি কী আর দেখেছি নাকি বসে বসে? (এক সময় সুর পালটে গম্ভীর হয়ে) আসলে শরীর ভালো ছিল না।

রাশিদা   :         খুব তো দরদ। প্রথমে বললি যাবি না। তারপর তো ফেরারই নাম নেই। গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লি।

রীতা     :         (মাকে জড়িয়ে ধরে) আসলে আমি থাকতে চাইনি।

রাশিদা   :         (মেয়েকে লক্ষ করে) কিছুটা রহস্য করে Ñ চলেও আসতে চাসনি।

রীতা     :         সেটা কী করে জানো?

রাশিদা   :         মা হলে সব জানতে হয়। (থেমে গিয়ে) তোকে নিতে গাড়ি আসবে।

রীতা     :         কে বলল?

রাশিদা   :         বুবু পাশের বাড়ি টেলিফোন করেছিল। ওরা এসে জানিয়ে গেল।

রীতা     :         যাব আমি? (অনুমতি চাওয়ার অর্থে)

রাশিদা   :         যাবি না?

রীতা     :         (ইতস্তত করে) শুধু তুমি যদি বলো।

রাশিদা   :         আমি না করতে যাব কেন। হাজার হোক নিজের বাবা।

রীতা     :         ছাই বাবা। এতোদিন খোঁজ-খবর নেওয়ার নাম নেই।

রাশিদা   :         সে কথা নিজে জিজ্ঞেস করে নিলেই হয়।

রীতা     :         তা জিজ্ঞেস না করে ছাড়ব ভাবছ। একশবার করব। (কী মনে হওয়ায়) মা, মা Ñ মা, আমার মনে হয় একটা ব্যথা আছে দারুণ। কাল খুব ছটফট করতে দেখলাম। হয়েছিল আগে কখনো?

রাশিদা   :         কার কথা বলছিস। ও। জিজ্ঞেস করলেই পারতি।

রীতা     :         করব ভাবছিলাম। লজ্জা করছিল। (কী মনে হওয়ায়) গাড়ি আসবে, তা তুমি তো এক কাজ করতে পার। বেরুবে না তুমি Ñ

রাশিদা   :         হ্যাঁ।

রীতা     :         কোনদিকে যাবে?

রাশিদা   :         তার কী ঠিক আছে। কলাবাগান, সেখান থেকে লালমাটিয়া। সেখান থেকে মীরপুর।

রীতা     :         ও।

রাশিদা   :         কেন?

রীতা     :         বলছিলাম কী, তুমি ওই গাড়িতেই তো যেতে পার আমার সঙ্গে। গাড়ি একটা যখন আসছেই তোমাকেও পৌঁছে দিতে পারে।

রাশিদা   :         না না। আমাকে পৌঁছে দেবার কাজ নেই। তোর যাওয়ার তুই যা।

রীতা     :         এই দেখ Ñ তুমি রাগ করছ। তাহলে আমি যাব না।

রাশিদা   :         ফের ওই কথা। যা তৈরি হয়ে নে।

চতুর্দশ দৃশ্য

কোনো রেস্তোরাঁয়। রীতা এবং মাসুদ। ওরা দুজন এক টেবিলে। বেয়ারা এসে মেন্যু দিয়ে যায়। ওরা দেখে। মাঝে মধ্যে কথাবার্তা হয়। শোনা যাবে না। পরিবর্তে রেস্তোরাঁর মৃদু বাজনা। রীতার লাজুক লাজুক ভাব। মুখ নিচু করে থাকে। মাসুদ অর্ডার দেখে। আইটেম সম্পর্কে মাসুদ মেয়ের অভিমত চায়। কখনো মাথা হেলিয়ে সম্মত বা কখনো মাথা দুলিয়ে না করে। কিছুক্ষণ পর দেখা যাবে প্রচুর জিনিস টেবিলে আসতে শুরু করে। একটির পর একটি। রীতা বিস্ময় ও তৃপ্তির সঙ্গে লক্ষ করে। কোন কোন আইটেম কোন দিকে দেওয়া হবে জিজ্ঞেস করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাসুদ বেয়ারাকে রীতার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। বেয়ারা সেভাবে খাবার পরিবেশন করে। রীতা কথা বলে। এবার তার কথা শোনা যাবে।

রীতা     :         আর লাগবে না। এতো খাবে কে?

মাসুদ    :         (নিজের কপাল বরাবর আঙুল উঁচু করে রীতার দিকে নির্দেশ করে) তুমি।

রীতা     :         (নির্মল হাসি। অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে। নিজের দিকে আঙুল দিয়ে দেখায়) আমি, পাগল!

                   [হঠাৎ কী মনে হওয়ায় রীতা অনেকগুলো আইটেম মাসুদের প্লেটে তুলে দেয়।]

মাসুদ    :         আমাকে খেতে হবে Ñ এই সব?

                   (রীতা কৌতুকের সঙ্গে মাথা নেড়ে জানায়) Ñ হ্যাঁ তাই।       

                   ও. কে. কন্যার যেমন হুকুম!

– ঈঁঃ ঃড় –

পঞ্চদশ দৃশ্য

কাপড়ের দোকান। কোনো সংলাপের প্রয়োজন নেই। রীতা কাপড় দেখছে। শাড়ি-ফ্রক অন্যান্য পোশাক ইত্যাদি। ইঙ্গিতে দু-একবার বাবার সম্মতি চায়। মাসুদ হাত নেড়ে জানায় যা খুশি। বেশ কিছু শাড়ি ও জামা-কাপড় কিনে প্রফুল্লচিত্তে বেরিয়ে আসে রীতা।

প্রসাধনীর দোকান। বেশ কিছু পাউডার, সেন্ট ইত্যাদি দেখানো হয়। রীতা যেন মনস্থির করতে পারে না। মাসুদ পারফিউমের একখানা শিশি তুলে নেয়। সংলাপ শোনা যাবে।

মাসুদ    :         (রীতাকে) এটা পছন্দ?

রীতা     :         (হাতে নেয়। শুঁকে দেখে) ইস্ । পারফিউম মায়ের খুব পছন্দ। কিন্তু অত দাম!

মাসুদ    :         (দোকানদারকে) এটাও দিন।

রীতা     :         মাকে সবাই নাকি পারফিউম কুইন বলতো।

মাসুদ    :         (মাথা নাড়ে) হুঁ। (হাসল) কিন্তু কুইনের কী পছন্দ হবে?

রীতা     :         হবে না আবার। আর তাছাড়া (ইতস্তত) আজকাল তো যায়ও না তেমন কোথাও। ভালো শাড়ি-টাড়িও নেই।

মাসুদ হঠাৎ চোখের চশমা নামায়। রুমালে মুখ মুছে নেয়। বোঝা যায় না এটা কোনো অনুভূতি, না স্বাভাবিক তাড়না। প্রচুর প্যাকেটসহ দুজন গাড়িতে ওঠে। রীতা খুশি খুশি। দুজনে একসঙ্গে বসে। নিজের বাড়ির কাছে এসে রীতা নামে। মাসুদও নামে। কিন্তু ভেতরে ঢোকে না। বাড়ির দরজার ভেতর থেকে রীতা হাত নেড়ে দেখায়। দরজা বন্ধ হয়ে যায়। মাসুদ কী ভাবে। কিছুক্ষণ পায়চারি করে। তারপর নিজের গাড়িতে ওঠে।

ষোড়শ দৃশ্য

নিজের বাসার ভেতরের দৃশ্য। দেখা যাবে রীতা অজস্র প্যাকেট নিয়ে ঢোকে। তারপর সেগুলো বিছানায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখে। এরপর একসময় কী মনে হওয়ায় তাস কাটার মতো জিনিসগুলো দুভাগে ভাগ করা শুরু করে। মাঝে মাঝে সন্দেহ নিরসনের জন্যে প্যাকেটের কোনো কোনোটার মুখ খুলে দেখে।

রীতা     :         আমার, মার

                   মার, আমার

                   আমার

                   আমার

                   আমার, মার

                   আমার না, মার

                   আমার, মার

                   আমার।

রীতা নিজের জন্য বরাদ্দ জিনিসগুলো তুলে নিয়ে যায়। আবার ফিরে আসে মায়ের জন্যে রাখা জিনিসের দিকে। বিশেষ করে কিছু শাড়ি ও পারফিউম সুন্দর করে থরে থরে সাজিয়ে রাখে। রীতা উদ্গ্রীব হয়ে অপেক্ষা করে। একবার-দুবার বাইরে উঁকি দেয়। এ সময় মায়ের পদধ্বনি শোনা যায়। রীতা বেরিয়ে আসে। তার পথ রোধ করে।

রীতা     :         না, হুট করে ঢুকবে না।

রাশিদা   :         (বিস্মিত) পথ ছাড়। আল্লাদি। ঢুকব না কেন।

রীতা     :         চোখ বন্ধ কর। সারপ্রাইজ আছে।

রাশিদা   :         কিসের সারপ্রাইজ আবার।

রীতা নেমেই মায়ের পেছন থেকে দুচোখে হাত রেখে মাকে ঠেলতে ঠেলতে বেডরুমে নিয়ে যায়।

রাশিদা   :         পড়ে যাব না? এ কী ধরনের অসভ্যতা হচ্ছে।

          বিছানার কাছে এনে দাঁড় করায়।

রীতা     :         এবার চোখ খোলো।

রাশিদা চোখ খোলে। তার বিছানায় থরে থরে সাজানো জিনিস দেখতে পায়। বুঝতে পারে। রীতা তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে কৌতুকের সঙ্গে।

রাশিদা   :         এগুলো কার?

রীতা     :         যার বিছানায় তার। তোমার।

রাশিদা   :         সরিয়ে নিয়ে যা।

রীতা     :         (খানিকটা অভিমানের সুরে) সরিয়ে নিয়ে যাব Ñ কেন?

রাশিদা   :         কোনো কেন নেই। আমি বলছি। রাখতে হয় নিজের ঘরে রেখে আয়।

রীতা     :         (নিরুপায় হয়ে ওগুলো তুলে নিতে উদ্যত) তার মানে তুমি নেবে না। একটাও না?

রাশিদা   :         অত কথা জানি না। ভালো লাগছে না। রোদে রোদে ঘুরে ক্লান্ত। একটু বিশ্রাম নেব। এগুলো সরিয়ে নে।

রীতা     :         (তাড়াতাড়ি তুলে নেয়) ঠিক আছে। জানতাম।

– ঈঁঃ ঃড় –

রীতার নিজের কামরা। রীতা শাড়ি বার করে নিজের ওপর মেলে ধরে। ঘুরে ঘুরে দেখে। তারপর একসময় নিরুৎসাহ হয়ে রেখে দেয়। তাকে  চিন্তাগ্রস্ত দেখায়। জানালার মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর এক সময় ধীরে ধীরে মায়ের শয়নকক্ষে আসে।

রাশিদার শয়নকক্ষ। রীতা সাবধানে শিয়রের কাছে বসে। আস্তে করে মাথার ওপর হাত বুলোতে থাকে। প্রথম প্রথম রাশিদা টের পায় না। একসময় চোখ মেলে তাকায়। মুগ্ধ দৃষ্টিতে রীতাকে দেখে। ওর হাত নিজের কপালের ওপর দৃঢ় করে ধরে রাখে।

রাশিদা   :         তুই!

                   রীতা জবাব দেয় না সে প্রশ্নের। মায়ের চুলে আঙুল চালিয়ে দেয়।

রীতা     :         কী অবস্থা করেছ চুলের দেখ তো। ওঠ, আমি আঁচড়ে দিচ্ছি। (নিজেই ওঠে চিরুনি নিয়ে আসে)। ওঠ তো মা একটু।

রাশিদা বিছানার ওপর উঠে বসে। পেছনে থেকে রীতা চুল আঁচড়াতে থাকে।

রাশিদা   :         (মেয়েকে নিরস্ত করার চেষ্টা করে) উঃ, থাক লাগছে। যা আর লাগবে না।

নিজেই পেছনের চুল দুহাতে গোছা করে খোঁপা তৈরি করে নেয়। তাও আবার মায়ের কাছে ঘন হয়ে এসে বসে।

রীতা     :         কী যে তোমার জিদ।

রাশিদা   :         কিসের জিদ দেখলি আবার আমার Ñ

রীতা     :         মানি একটা লোক অন্যায় করেছে। তাই বলে Ñ

রাশিদা   :         (উঠে দাঁড়ায়) আমার কাছে সুপারিশের দরকার নেই। ভালো-মন্দ আমি বুঝি। এতগুলো বছর কাটল, আর কটা দিন যাবে না?

                   রীতা মায়ের কাছাকাছি যায়। জড়িয়ে ধরে।

রীতা     :         তা যাবে না কেন। কিন্তু মা, মানুষ একবার অন্যায় করে। দুবার। বারবারই কি করে। আমি তো খারাপ কিছু দেখি না। হ্যাঁ, তোমার সম্বন্ধে যদি কিছু বলত, আমি ছেড়ে কথা বলতাম ভেবেছ।

রাশিদা   :         এক একজনের ভালো লাগাটা এক এক রকম। তুই গায়ে পড়ে সুপারিশ করছিস কেন।

রীতা     :         তাহলে আমাকেও বলতে দাও। এতগুলো বছর ক্রমাগত কষ্ট করেছ মা। কিন্তু এটাকে জীবন কাটানো বলে না। শীতে কেঁপেছি, আধপেটা চলেছি। অন্যের সামনে মাথা নিচু করে চলেছি। জানো না মা, কতদিন বালিশে মাথা গুঁজে কেঁদেছি।

রাশিদা   :         (আলাদা হয়ে সরে আসে) এতদিন কষ্ট করেছিস, করেছিস। এখন ভালো দিনের মুখ দেখবি। আনন্দ-আহ্লাদে থাকবি। কে মানা করছে।

                   (আবার মাকে জড়িয়ে ধরে)

রীতা     :         আমি তো তোমাকে বাদ দিয়ে কিছু করতে চাই না।

রাশিদা   :         সবাইকে নিয়ে সুখ বা দুঃখ কোনোটাই হয় না।

রীতা     :         মা Ñ তোমাদের দুজনের কথা জানি না। কিন্তু বিশ্বাস কর, লোকটার মধ্যে খারাপ কিছু দেখি না। বাঘ-ভাল্লুক নয় Ñ

রাশিদা   :         আমাকে নতুন করে চেনাচ্ছিস?

রীতা     :         না, না। তুমি হয়তো ভাবছ আমি বানিয়ে বলছি। লোকটা ভালো চায়।

রাশিদা   :         কার ভালো?

রীতা     :         (আমতা আমতা করে) আমার Ñ আমাদের। সবার।

রাশিদা   :         বুবু বলল সামনের মাস থেকে নাকি তোর বাবা তোকে কলেজ হোস্টেলে দিচ্ছে।

রীতা     :         তুমি না বললে তো আর আমি যাব না।

রাশিদা   :         আমি না বলতে যাব কেন। (দীর্ঘশ্বাস) একরকম ভালোই হলো। যখন চাকরি ছিল এক কথা। এখন এই সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাই।

রীতা     :         আমি চলে গেলে তুমি কী করবে মা।

রাশিদা   :         ও তোকে তো বলাই হয়নি। তোর লুসি আন্টি Ñ মনে নেই একবার এসেছিল আমাদের এখানে Ñ সেই কবে থেকে সাধাসাধি করছে ওর সঙ্গে যেন গিয়ে থাকি। ভাবছি মন্দ কী। ছোট বাড়ি, দুজনের বেশ চলে যাবে। আর তুই না থাকলে এতো চালচুলো দিয়ে হবেই কী। পড়ে থাকব কোথাও।

রীতা     :         যাব বললেই হলো। কী করবে শুনি?

রাশিদা   :         কী করব, ঠিক করিনি। দেখি। লুসিতো ছোটখাট টুকটাক কিছু করে। ওর সঙ্গে ভিড়ে যাব না হয়। দেখব ভেবে। অতসব নিয়ে তোর চিন্তা করতে হবে না।

রীতা     :         তা হয় না মা। তোমাকে ছেড়ে আমি যাব না, যাব না।

রাশিদা   :         দেখ মা, মেয়েদের খুঁটি কোনোদিন ছাড়তে নেই।

রীতা     :         সবে একটু সুখের মুখ দেখব ভেবেছিলাম। অমনি না করে বসলে মা।

রাশিদা   :         তোকে ছেড়ে থেকে আমার কষ্ট হবে না ভাবছিস? কষ্ট হবে। কিন্তু হয়তো সেই কষ্ট আজ হোক, কাল হোক। চিরকাল তো তোকে সঙ্গ দিতে পারছি না। তবে হ্যাঁ, মা-মেয়েতে আরো কিছুদিন কাটানো যেত। (মেয়েকে আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে) খেলাটা একটু আগেই সাঙ্গ হলো। (মাথায় হাত রেখে) দুঃখ করিস না মা। দুঃখ করিস না।

সপ্তদশ দৃশ্য

লুসির ঘর। লুসি ছোটমতো একটি কামরায় বসে। সেখানে খান-দুয়েক কাঠের চেয়ার। টেবিলে কিছু ফাইলপত্র। মেঝের ওপর গাদা করে রাখা কিছু কাপড়ের প্যাকেট। রাশিদার প্রবেশ।

রাশিদা   :         দেখে এলাম ভেতরটা। ভালোই তো। এটা বুঝি অফিসঘর।

লুসি     :         বাসা আর অফিস যাই বলেন। যা ব্যবসা, তার আবার অফিস। এই টুকিটাকি এটাসেটা করে কোনোমতে টিকে থাকা। ভাবছি আপনার অসুবিধে না হলেই হয়।

রাশিদা   :         আমার অসুবিধে হতে যাবে কেন? দিব্যি রাজার হালে আছি। বরং তোমার ঘাড়ে চেপে Ñ

লুসি     :         ফের অমন কথা যেন না শুনি। একা একা এখানে পড়ে থেকে দমবদ্ধ হয়ে আসছিল আর উলটো আমার কষ্টের কথা বলছেন। আপনাকে পেয়ে তো বর্তে গেলাম।

রাশিদা   :         বেশ ওসব নিয়ে কিছু বলব না। কিন্তু তোমার অফিসঘরটা তো গুদাম বানিয়ে রেখেছে।

          রাশিদা জিনিসপত্র গুছাতে শুরু করে।

লুসি     :         কী করব আমাকে দিয়ে হয় না।

রাশিদা   :         কাজের মানুষদের ওরকমই হয়।

লুসি     :         কাজ না হাতি। ঘোরাফেরাই সার। এখানকার জিনিস ওখানে, ওখানকার জিনিস এখানে সাপ্লাই দেওয়া। গার্মেন্টের কারবার তো। সবাই তো সব জিনিস বানায় না। কার কখন কোন জিনিসটা দরকার, তার জন্যে তাকে তাকে থাকা, আর সেইমতো অর্ডার বুক করা। তার ওপর দু-চার পয়সা যা কমিশন।

রাশিদা   :         তাহলে তো ভালোই। দুদিকের কমিশনে মন্দ হয় না।

লুসি     :         চলে যায় আর কী। তবে বড় ঘোরায়।

রাশিদা   :         পার্টি তোমাদের দিয়ে করায় কেন, নিজেরাও তো করতে পারে Ñ

লুসি     :         তা আবার করে না ভাবছেন, তাও করে। সে জন্যেই তো কাকে কার অর্ডার দিলাম জানতে দিই না। তবু এলাইনে বড় কম্পিটিশন। ব্যবসা ভালো চলছে দেখলেই আরেকজন এসে বাগড়া দিয়ে বলবে, আমার কাছ থেকে নিন। আরো কমে দেব।

রাশিদা   :         মজা তো!

লুসি     :         আর বলবেন না।

বাইরে কে কড়া নাড়ে।

কে? ও আসুন হাশেম মিঞা।

হাসেম মিঞার প্রবেশ। সঙ্গে কাপড়ের গাট্টি।

হাশেম   :         (দেখিয়ে দেয়) এই হলো টি-শার্ট, আর এই প্যান্টের লট।                গুনে নিন এক হাজার শার্ট, বারশো প্যান্ট Ñ

লুসি     :         কিন্তু হাশেম মিঞা, এ তো কথার খেলাপ হয়ে গেল। আর বাকি পাঁচশো, পাঁচশো কী হবে।

হাশেম   :         কাল সকালের আগে দেওয়া যাবে না। কারিগর নেই। আমি চলি।

হাশেম মিঞার বিদায়। লুসি টেবিলের ওপর রাখা হাতঘণ্টা বাজায়।

লুসি     :         মুন্না, ও মুন্না।

মুন্না      :         হ্যাঁ Ñ

মুন্নার প্রবেশ

লুসি     :         এগুলো পার্টির কাছে দিয়ে এসো এখুনি।

প্যাক করা তৈরি কাপড়ের বান্ডিল দেখিয়ে দেয়। মুন্না এক একটা করে সরিয়ে নিয়ে যেতে থাকে।

লুসি     :         বলবে, বাকি কালকের আগে পারব না।

মুন্না      :         আচ্ছা।

লুসি     :         (ভাউচার কাটতে থাকে) ভাউচার নিয়ে যাও। বলবে আগের বিল পাইনি। একটা বেবি নিয়ে চলে যাও সোজা উর্দু বাজার। ঠিকানা মনে আছে তো।

মুন্না      :         জি, মনে আছে।

মুন্নার প্রস্থান

রাশিদা   :         একবার ভেবেছিলাম লটকে পড়ব এ ব্যবসায়। এখন যা ভেজাল দেখছি, আমাকে দিয়ে হবে না। ঠকিয়ে ভূত বানিয়ে ছাড়বে।

লুসি     :         তা অত তাড়াহুড়োই বা কিসের। আপনি কি সাগরে পড়েছেন করতে চাইলে আপনার চাকরি ঠেকায় কে।

রাশিদা   :         হয়তো কিছু একটা জুটবে। চাকরি ছাড়ার দিন এম.ডি. একখানা কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন আমার নাম করে বলবেন। কিছু একটা হবে।

লুসি     :         তারপর?

রাশিদা   :         আসলে রহমান সাহেবদের ফ্যাক্টরি পুরোপুরি কাজ শুরু করেনি। ভরসা তো দিয়েছে, দেখি।

লুসি     :         তবে আর কী।

রাশিদা   :         তবু একেবারে হাত গুটিয়ে বসে থাকার মতো অবস্থাও তো নয়।

লুসি     :         (কী ভাবে) ভালো কথা, ওরিয়েন্টাল জুটমিলের মালিক মোবারক আহমদ একজনের কথা বলছিলেন। কিছু না ওর ছেলেটাকে একটু দেখাশোনা করা দিনের বেলা। আর সেই ফাঁকে কিছু পড়ানো। ভারি দুরন্ত ছেলে কিন্তু।

রাশিদা   :         মনে হয় না আমাকে দিয়ে মাস্টারি হবে। তবে যতদিন কিছু না              হয় Ñ

লুসি     :         আপনি বলেই বললাম। তবে গেলে ওই শর্তেই যাবেন Ñ যখন খুশি ছেড়ে দিলেন।

রাশিদা   :         ওরকম হলে যাওয়া যায়। যতদিন করলাম, করলাম। না করলাম, না করলাম। বেকার মানুষদের এটাই সুবিধে। যেমন কোনো বাঁধাধরা চাকরি নেই, তেমনি কোনো চাকরিতে বাঁধা পড়ে থাকারও দায়-দায়িত্ব নেই।

অষ্টাদশ দৃশ্য

দেখা যাবে জনাকীর্ণ রাস্তায় ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে রাশিদা। ঘর্মাক্ত কলেবর। মাঝে মাঝে রুমালে মুখ মুছে নিচ্ছে। তীরবেগে গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে। রিকশা-বাস কোনোটাই থামছে না অনুরোধ সত্ত্বেও।

গাড়ি থামানোর চেষ্টা। হাত দেখাবে। এর ওপর দু-একটি ঝবয়ঁবহপব দেখানো যায়। রাশিদা আবার হাঁটা শুরু করে। রাস্তার বাঁ-ধারের ফুটপাতে এসে থামে। সেখানে সোজা কাটাকুটি করেছে আরেকটি রাস্তা। ট্রাফিক লাইট বন্ধ থাকায় রাশিদাকে থামতে হয়। সে রাস্তা পার হয়ে অন্যদিকে যাবে। পেছন থেকে একটি গাড়ি এসে ফুটপাতের সাইড ঘেঁষে জোরে এসে থামে। তাতে মাসুদ এবং রীতা। রীতা গলা বাড়িয়ে মাকে লক্ষ করে জোর গলায় ডাকে।

রীতা     :         মা মা Ñ

                   রীতা পেছনের দরজা খুলে দিয়ে মাসুদের দিকে তাকায়। মাসুদ মাথা নোয়ায়। রীতা দরজা খুলে বসে থাকে।

রীতা     :         এসো মা, বসো।

                   রাশিদা গাড়ির জানালার দিকে এগিয়ে যায়। মেয়ের মুখখানা আদর করে দুহাতে। পেছনে ট্রাফিক পুলিশের সিগন্যাল Ñ এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ।

রাশিদা   :         (ওরা যেদিকে যাচ্ছিল সেদিকেই দেখিয়ে দিয়ে) তোদের রাস্তা এদিকে।

[গাড়ি স্টার্ট নেয়। রাশিদা নিজেই পেছনের দরজা বন্ধ করে দেয়। এবার রাস্তার অন্যদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। আর আমার ওদিকে। গাড়ি বেরিয়ে যায়। রাশিদাকে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। ট্রাফিক সিগন্যাল বদলায়। আর সে-সঙ্গে জেব্রা ক্রসিংয়ে পা বাড়ায় রাশিদা। রাস্তা অতিক্রম করার দৃশ্যে ংযড়ঃ ফ্রিজ হয়ে যায়।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *