বল না মেজাজ কার না খারাপ হয়, আমার, তোমার? ওটাত বাতির সুইচ নয় যে টুপ করে বন্ধ করে দিলে। পানির কলও নয়। এমনি মেজাজ খারাপের পালা যখন চলে, ভাল লাগে না কিচ্ছু। প্লেটে মিষ্টি সন্দেশ দিলেও সন্দেহ হয় ওটা বুঝি কুইনিনের তৈলি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মনে হয়, সেই সকাল থেকে ওঠা বক্ বক্ করে মাথা খাচ্ছে। আর আকাশের চাঁদ? সুন্দর না ছাই! ওটা যেন সেই তখন থেকে ভেংচি মারছে। না ইচ্ছে করে পড়তে। না কথা বলতে। গা-জ্বালা করে সোনামনি, খুকুমনি বলে তখন কেউ আদর করতে এলে। তাই না?
আমাদের ত তবু যেন তেমন মেজাজ। বাবলির দেখনি তোমরা। এই দেখলে ভাল, হেসে খেলে বেড়াচ্ছে। এই মুখ কাল করে। আর একবার বেঁকে বসলে কার সাদ্য থামায়। ধর না, এই সেদিন। বাবলির জন্য আনা হয়েছিল কাল পেন্সিল। ওখানা হাতে নিয়েই ও চটে আগুন।
বলে, আমি কাল সেজন্যই কি আমার জন্য কাল পেন্সিল আর অন্যদের জন্য লাল।
তার বাবা কত করে বুঝিয়ে বলেন, ওর দেখতে কাল হওয়ার সঙ্গে পেন্সিল কাল হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। বাবলি শোনে না। বলে, তাই যদি হবে তাহলে আমার লাল জুতোর জন্য লাল মোজা কেনা হল কেন? আসল রং-এর সঙ্গে রং মিলিয়েই কেনা হয়েছে পেন্সিল। সত্যি এ প্রশ্নের কি জবাব দেবেন তার বাবা।
ছুঁড়ে ফেলে দেয় পেন্সিল বাবলি। কিছু কাক বসেছিল পাশের একটা গাছের ডালে। তাদের আর খুশি ধরে না। বাবলির মেজাজ যত খারাপ হয় ততই তাদের লাভ। পেন্সিল দিয়ে করার কিছু নেই তাদের। কিন্তু এরপর খাবার টেবিলে বসে প্লেটের ভাতগুলো ছুঁড়ে মারবে সেকথা তারা হলফ করে বলতে পারে। হলও তাই। গ্রোগ্রাসে গিলল কাকের দল।
সেদিন বাবলি না পড়ল, না খেলতে গেল। না ঘুমুল। কিছুক্ষণ কাঁদল। কিন্তু কান্না কি আর চাট্টেখানি কথা। গলা ধরে আসে।
বিকেলে গ্লাসে করে এল দুধ। পা ছুঁড়ে গ্লাসটা দিল ভেঙ্গে। পড়ল দু’চার ঘা। তাতে মেজাজ হল আরও তিরিক্ষি। পরদিন স্কুলে গেল না। খেল না। সবাই ভেবে অস্থির। ডাক্তার ডাকা হল শেষটায়।
ডাক্তার জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে আপনার ছেলের?
তার বাবা বলে, কি জানি। কাল পেন্সিল পছন্দ নয়। পড়াশুনো পছন্দ নয়। দুধের গ্লাস পছন্দ নয়। এক কথায় কিছু পছন্দ নয়।
ডাক্তার বলেন এধরনের ‘পছন্দ নয়’ রোগের কোনো চিকিৎসার কতা তার জানা নেই।
বাবলির দাদী চিলেন আশেপাশেই। ডাক্তার যেতেই সবাইকে ডেকে বলেন, আগেই বলেছিলাম এসব হাতুড়ে ডাক্তার ডেক না। মেজাজের চিকিৎসাই করতে পারে না, তা সে কেমন ডাক্তার! বিলাত ফেরৎ ডাক্তার।
তাতেও কাজ হয় না।
বাবলির মেজাজটা আরও তিরিক্ষি হয়ে উঠেছে। সবাই ভাবছে কি করা যায়।
রাতে তার বাবার এক বন্ধু এলেন।
তাঁর সঙ্গেই পরামর্শ বসল। বাবা বললেন, আজকাল বাবলির কি যে হয়েছে। ওর মেজাজের জ্বালায় আমরা অস্থির। জানা আছে তোমার কোনো ভাল ডাক্তার?
বন্ধু হাত নেড়ে বলেন, ডাক্তার টাক্তার দিয়ে এসবের চিকিৎসা হবে না।
তবে?
আমার মেয়েরও ঐ দশা হয়েছিল। কত এ্যালোপেথি, হোমিওপেথি করলাম কিছুই হল না। তারপর কিছুতেই যখন কিছু হল না নিয়ে গেলাম শান্তাহারে।
সেখানে আবার কি?
আঃ সেকথাই বলছি। মেজাজের চিকিৎসার জন্য চমৎকার একটা স্কুল খোলা হয়েছে সেখানে। আমি বলি সেখানেই দিয়ে দাও।
যেই কথা, সেই কাজ।
পরদিনই ওর বাবা বাবলিকে নিয়ে গেলেন সেই ইস্কুলে। ভীষণ গোঁফওয়ালা, ভারি বদমেজাজি হেডমাস্টার। ঢুকতেই বলেন, আমি কিন্তু মেজাজি ছেলেমেয়েদের নি।
বাবা বলেন, আমিও ত সেজন্যেই এসেছি।
তা বেশ। কিন্তু টেস্ট দিতে হবে।
তার মানে?
তার মানে, যেমন তেমন মেজাজ হলে চলবে না। সত্যিকার বদমেজাজি হতে হবে।
তাহলে নিন টেস্ট।
এরপর হেডমাস্টার যা করে বসেন তা দেখে সবারই চক্ষু চড়কগাছ। হিড়্ হিড়্ করে বাবলিকে টেনে এনে ঠাস্ করে বসিয়ে দেন এক চড়।
বাবা বলেন, আহা হা কি করছেন। থামুন।
হেডমাস্টার তাঁকে থামিযে দিয়ে বলেন, বাধা দেবেন না। টেস্ট নিচ্ছি।
কারও বাধা দেবার দরকার হল না। বাবলি হেডমাস্টারের টেবিলে চড়ে বসে তাঁর পেপার ওয়েটটা এমন জোরে ছুঁড়ে মারল যে পাশের জানালার কাঁচ গুঁড়ো হয়ে যায়।
বাবা ওকে থামাতে চান। বলেন, ছি ছি একি করছিস বাবলি।
কিন্তু হেডমাস্টার প্রসন্ন। বলেন, বেশ বেশ। আপনার ছেলেকে আমি ভর্তি করব। এমনি ছেলেমেয়েদেরই আমি চাই।
সেই থেকে ঐ স্কুলে বাবলির শিক্ষা শুরু।
ক্লাশের মাস্টারগুলোও তেমনি। দেখলে রাগ আগলে রাখা মুশকিল। কেউ প্যাঁচা মুখো। কেউ টিকটিকে তালপাতার সিপাই। কারও ছাগলদাড়ি। ফার্স্ট পিরিয়ডে মাস্টার এসেই ওকে এক গ্লাস হরতিকির সরবৎ দিয়ে বলেন, খাও।
বাবলি বেঁকে বসে। বলে, না।
অমনি কিছু কিল চড়।
বাবলিও থামে না। গ্লাসটা ছুঁড়ে মারে। ওঠা ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়।
মাস্টার খুশী হন। বলেন, আহা হা থামছ কেন। আরও কিছু ভাঙতে চাও, ভাঙ্গতে পার। আমাদের কাছে বেলওয়ারি গ্লাস, চিনেমাটির প্লেট, কাচের চুড়ি অনেক কিছু আছে। ভাঙ্গবে?
বাবলি বলে, না সার। আজ আর পারব না। বড্ড ঘেমে গেছি।
পরদিন এলেন সেকেন্ড টিচার। শোনালেন, মেজাজ খারাপের গল্প।
বলরেন, এক ছিল রাজা। তার হাতগুলো ছিল হাতির শুঁড়ের মত।
চটে যায় বাবলি, হাতির শুঁড়ের মত আবার কারও হাত হয় না কি?
হয়।
না হয় না, তর্ক জুড়ে দেয় বাবলি।
একশ বার হয়।
একবারও হয় না।
গায়ের ঝাল মেটাতে না পেরে এক্সারসাইজ বুকের পাতাগুলো ছিঁড়ে একাকার করে বাবলি। তারপর ওগুলো ছড়িয়ে দেয় ক্লাশময়।
এ স্কুলে যেদিন থেকে এসেছে, ওর মেজাজটা ক্রমশই খারাপ হচ্ছে।
পড়াশুনা চলছে তেমনি। ক্লাশ ফাঁকি দেবারও উপায় নেই। আর শুধু ত পড়াশুনা নয় হাতে কলমে শিক্ষা।
যেমন সেদিন। ক্লামের শুরুতে সবাইকে দেওয়া হল একটা করে দেশলাই এর বাক্স।
মাস্টারের কড়া হুকুম, ওগুলেঅ যেন কেউ না জ্বালায়।
বদমেজাজি ছেলের দল কি আর তা শোনে।
শুরু হল তাদের মেজাজের প্রতিযোগিতা। আশ্চর্য, সবচেয়ে তাড়াতাড়ি ওগুলো জ্বালিয়ে সাবাড় করে সবচেয়ে বেশী নম্বর পেল বাবলি।
সে বছরই পরীক্ষার ফল বেরুল।
ভালই করেছিল। শুধু একটা বিসয়ে কম নম্বর পেল। মেজাজ খারাপের দর্জি এল। সার্ট-প্যান্টের মাপ নিল। তার কোনটার ঝুল বেশী। কোনটার আস্তিন ছোট। কোনটা গায়ে আঁটে না। ছেলেরা কাপড়চোপড় পেতেই যে যারটা হুড় হুড় করে ছিঁড়ে ফেলে। বাবলি করল এক মজার কাণ্ড। ছেলেরা যখন লেখতে ব্যস্ত এক ফাঁকে এর ওর জামা কাপড় বদলে নিযে নিজের মাপের সার্ট প্যান্ট খুঁজে পেয়ে গায়ে চড়াল। ভালই লাগল। এই মেজাজ খারাপের স্কুলে এসে মেজাজ খারাপের কথা মনেও হল না তার। আর সেই পেপারেই পেল কম নম্বর। কিন্তু সেটা পুষিয়ে গেল পরে।
রেজাল্ট বেরুতেই প্রগ্রেস রিপোর্টটা নিয়ে সোজা ছুটে আসে হেডমাস্টারের কামরায়। বলে, আমি এত কম নম্বর পেলাম যে।
বলেই প্রগ্রেস রিপোর্টখানা ছিঁড়ে কুটি কুটি করে ফেলে।
হেডমাস্টার কিছু বলেন না।
পরদিন বাবলির বাবা এসেছিলেন। হেডমাস্টার তাঁর সামনেই বললেন, আপনার ছেলেকে আমি গোল্ড মেড্যাল দেব। মেজাজ খারাপের পরীক্ষায় মেজাজ খারাপ করে প্রগ্রেস রিপোর্ট ছেঁড়ার নজির এই প্রথম। ওর সাফল্যে আমরা গর্বিত।
বাবা বলেন, তাত বুঝলাম। কিন্তু ওর মেজাজের কি হল?
হেডমাস্টার বলেন, আপনার লেছের পাল্লায় পড়ে আমাদের ভাঙ্গাচোরার খরচটা বড্ড বেড়েছে। পোষাচ্ছে না। তবে আপনার ছেলের মেজাজ আগের তুলনায় দশগুণ বেড়েছে সন্দেহ নেই। এমন মেধাবী ছেলে সচরাচর দেখা যায় না।
বাবা চমকে ওঠেন, মেজাজ বেড়েছে বলছেন। তাহলে তার চিকিৎসা হবে কবে?
হবে হবে। ঘাবড়াচ্ছেন কেন। আর একটি বছর। অপেক্ষা করুন। বিষে বিষক্ষয় এটাই হচ্ছে আমাদের নীতি। মানে মেজাজটাকে খারাপ করে করে যকন আর খারাপ হওয়ার জো নেই, তখুনই আসল চিকিৎসা।
বাবা সেদিনের মত বিদায় নেন।
নতুন ক্লাশ বসেছে।
এবারও ঠিক আগের মত হরতিকির সরবৎ এনে দেওয়া হল ওর সামনে। মাস্টার বলেন, খাও।
ওটা ছুঁড়েই দিচ্ছিল বাবলি।
মাস্টার বলেন, ছুঁড়ে ফেলতে পার, আপত্তি নেই। কিন্তু তার আগে একশ একষট্টি পর্যন্ত গুণতে হবে জোরে জোরে।
সে আর কতক্ষণ। কিছুক্ষণেই ভাঙ্গল গ্লাস্টা।
অন্যান্য ছেলেরা এক শ একষট্টিবার গুণতেই অস্থির। আর গোণা শেষ হয়ে গেলে তাদের রাগটা আপনা থেকে মাটি হয়ে আসে। শুধু বাবলির বেলায় কিছু হয় না।
অগত্যা হেডমাস্টারকে ডাকা হল। তিনি বললেন, বেশ শক্ত কেস দেখছি। বেশ ওকে এক হাজার একশ এগার বার গুণতে বলুন।
তাতেও কাজ হয় না।
শেষটায় এলেন আরেক নতুন টিচার। বলেন, এক কোটি বার ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ বানান লিখে আমাকে দেখিয়ে তারপর যা ইচ্চে কর। সেই থেকে রোজকে রোজ ক্লাশে যায় বাবলি। রিমকে রিম কাগজ শেষ হচ্ছে আর ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ লিখে যাচ্ছে।
এখনও এক কোটি বার শেষ হতে নিরানব্বুই লক্ষ বাকি।
হেডমাস্টার ওর বাবাকে একদিন ক্লাসে এনে দেখায়, দেখুন হরতিকির গ্লাসটা এখনও ওর সামনে রয়েছে।
সেই থেকে বাবলি স্কুলে যায় আর শুধু ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ লেখে।
মেজাজ জিনিসটা বোধ হয় কর্পুরের মত। বেশ টের পাচ্ছে কেমন যেন আগের মত উৎসাহ পাওয়া যায় না। ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’-এর ঠ্যালাতেই অস্থির।
ভয় হয পাছে মেজাজটা একদম লোপ না পায়। বাবাকে জিজ্ঞেস করে বাবলি, সত্যি সত্যি আমার মেজাজটা একদম মাঠে মারা যাবে না ত?
বাবা আশ্বস্ত করে বলেন, না না লিখে যাও।
সেই থেকে লিখে যাচ্ছে বাবলি।
বাবা খুশি, ফল ফলেছে। বিষে বিষক্ষয় শুরু হয়েছে। এখন আর বাবলিকে নিয়ে চিন্তা নেই।
