সৈয়দ শামসুল হক
আনিস চৌধুরীর সঙ্গে আমার শেষ দেখা তাঁর মৃত্যুর মাত্রই দু’দিন আগে। আমাদের এক আড্ডার জায়গায় সেদিন আমি একা বসে আছি। দুপুর দুটো হয়ে গেছে। দেখলাম আনিস চৌধুরী দরোজা ঠেলে ঢুকছেন। নিশ্চয় কোথাও থেকে তেতেপুড়ে ভরদুপুরে ফিরছেন। উঠে গিয়ে তাঁকে আমার টেবিলে ডেকে আনলাম। আমার দিকে চকিতে একবার তাকিয়ে বসে পড়লেন তিনি। তাঁর স্বভাব, কারো দিকে বেশিক্ষন চোখ ফেলে রাখেন না, যেন ওই একটুখানি দেকার মধ্যেই অনেকখানি দেখে দিনেত পারেন তিনি। আজ আর আমার দিকে ফিরে তাকালেন না। কথাও কিছু শুরু করলেন না। বরাবর দেখেছি তাঁর কথা বলার ছবিটি বড় সুন্দর। কথা বলেন নিচুগলায়, ছোট ছোট বাক্যে। শব্দের পরতে পরতে থাকে মিষ্টি হাসি। আর কেউ হলে বলতাম এটি লাজুক মানুষের ধরন। আনিস চৌধুরীর বেলায় তা বলা যাবে না। সৌজন্য ঝরে পড়তো তাঁর সকল আচরণে। তাঁর উচ্চারণেও ছিলো সেই সৌজন্য।
আজ তিনি চুপ করেই রইলেন। মনে হরো, কোনো কারণে ক্ষুন্ন হয়েছেন। কারো কাছে নিশ্চয় একটা আঘাত পেয়েছে এসেছেন। এতে অবশ্য অবাক হবার কিছু নেই। আনিস চৌধুরী আঘাত পেতেন সহজে। মানুষের কাছে প্রত্যাশা করতেন অনেক, তাই সামান্য ত্র“টি বিচ্যুতিও তাঁকে খুব আহত করতো। বললাম, কিছু খাবেন? তিনি মাথা নাড়লেন। আবারও জিগ্যেস করলাম। তিনি যেন বিরক্তই হলেন। অচিরে নিজেই বুঝলেন একটু রূঢ়ই হয়ে গেছে তাঁর ব্যবহার। এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো তাঁর ঠোঁটে। বললেন, বেশ, একটা ড্রিংকস বলুন। Ñ লাঞ্চ করবেন না? Ñ না, বাসায় ফিরো যাবো। Ñ এখানেই খান না? আমার সঙ্গে? Ñ আজ থাক। আপনার ভাবী অপেক্ষা করছেন। এরপর আর কোনো কথা নয়। তিনি নীরব। আমিও। অন্য দিন হলে কত আলাপই না হতো আমাদের। এই আড্ডায় বসে কতদিনই না তাঁর সঙ্গে কত কথা হয়েছে। সাহিত্যের কথা। রাজনীতির কথা। বোধহয় আমি ছিলাম তাঁর পছন্দের সেই বিরল একজন মানুষ যার সঙ্গে তিনি কথা কইতে অফুরান ছিলেন। আমার সঙ্গে আলাপে তিনি আমারই লেখা নিয়ে ফিরে ফিরে কথা বলতেন। নিজের লেখার কথা কখনোই বলতেন না। এদিকে আমি নিজে আমার লেখা নিয়ে সাক্ষাত আলোচনাটা সবসয় এড়িয়ে যাই। ব্যাপরটাকে তখন চাপান দেবার জন্যে আমি তাঁর লেখার কথা উত্থাপন করলেই, বরাবর দেখেছি, তিনি অপ্রতিভ হয়ে পড়তেন। কুণ্ঠিত হয়ে পড়তেন। এটাও ছিলো তাঁর স্বভাবসুন্দর এক সৌজন্যবোধ যে, নিজের বিষয় দশখানা করে বলতে নেই।
শেষের সেই সাক্ষাতে, সেই দুপুর বেলায়, আজ মনে পড়ে, একটি সাধারণ দুটি বাক্য ছাড়া তাঁর সঙ্গে আমার আর কোনো কথাই হয়নি। ড্রিংকসটা দ্রুত শেষ করে উঠে গেলেন তিনি। বিদায় নেবার সময় বরাবর আমার হাত ধরে খুব ঝাঁকাতেন। সেদিন তাঁর হাতে ভিন্ন এক স্পর্শ আমি এখন মনে করে উঠতে পারছি। যেন আমার হাতে বইছিলো তাজা বিদ্যুত! বিদায় নেবার জন্যে হাতটা ধরেই িিতন যেন ধাক্কা খেলেন, গুটিয়ে নিলেন হাত। তারপর দ্রুত বেরিয়ে গেলেন।
পরদিন হরতাল ছিলো। পরপর দু’দিনের হরতাল। নিশ্চল নিস্তব্ধ রাজধানী। হরতাল শেষে মাত্রই আমরা দিনের বেতরে প্রবেশ করবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছি, এমন সময় টেলিফোন পেলাম। আনিস চৌধুরী আর নেই। রাতের শেষ মুহূর্তে তাঁর শেষ নিঃশ্বাসটি চিরদিনের মতো মিলিয়ে গেছে। তাঁর ধানমন্ডির বাড়িতে ছুটে গেলাম তক্ষুনি। গিয়ে দেখি, শুয়ে আছেন তিনি। গায়ে সেই তাঁর বরাবর পছন্দের হাফ হাওয়াই শার্ট। বালিশের পামের মুড়ে রাখা ভারী ফ্রেমের চশমাজোড়া। যেন এইমাত্র ঘুমোতে গেছেন। নাম ধরে ডেকে উঠলেই সাড়া দেবেন। কিন্তু এ বিভ্রম মুহূর্তের মাত্র। মৃতকেও যে কখনো কখনো জীবন্ত মনে হয়, সে জীবিতেরই জীবন-বিভ্রম ছাড়া আর কিছু নয়।
আনিস চৌধুরীর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিলো কবে?
দিন তারিখ তো মনে থাকে না মানুষের, মানুষটাই মনে থাকে শুধু। মনে থাকে আঘাত পেলে, আর মনে থাকে ভালোবাসলে। আনিস চৌধুরীকে আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম, কিশোর বয়সে তিনিও ছিলেন আমার এক হিরো। যখন লিখতে শুরু করি, তিনি আমাকে বয়সের ব্যবধান সত্বেও দিয়েছেন তাঁর বন্ধুত্ব। তখন অগ্রজ যাঁদের সঙ্গে আমর নিত্য ওঠাবসা, তাঁদের ভেতরে একমাত্র আনিস চৌধুরীই আমাকে গ্রহণ করেন সমকক্ষ বোধে।
আজ পেছন ফিরে দেখি, বারো তেরো বছর বয়স থেকে শুরু হয় স্কুলের পড়ার বাইরে আমার বই পত্রিকা তুমুল উৎসাহে পড়া। আমাদের বাড়িতে আসে আজাদ পত্রিকা। সে পত্রিকায় মুকুলের মহফিলের পাতা, সাহিত্যের পাতা আর ঈদসংখ্যা আমি দু’চোখ ভরে গিয়েছিল তখন। মিল্লাত আর ইত্তেহাদ-ও পড়ছি। মিল্লাতের পাতায় জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষ স্কেচমালা বেরোচ্ছে। দুর্ভিক্ষ তো নিজেই দেখেছি। জয়নুরে আঁকা মনের মধ্যে জায়গা করে নিচ্ছে। কামরুল হাসানের পোস্টকার্ড তখন পেয়ে গেছি। মুকুল সেনা গঠিত হয়েছে, আমি কামরুলভাইকে চিঠি লিখেছি Ñ মুকুরের মহফিলের সদস্য হিসেবে আমিও একজন মুকুল সেনা কিনা? কামরুল ভাই লিখলেন, অবশ্যই, তুমিও মুকুল সেনা বৈকি! আর সেই পোস্টকার্ডের উলটোপিঠে ছবি এঁকে দিয়েছেন তিনি। এক বালকের ছবি। আমারই কি ছবি? তার নিচে তিনি লিখেছেন Ñ তুমি যে ভালো ছেলে সেটা কথায় ও কাজে সবসময় প্রমাণ করতে চেষ্টা করবে। পরিবারের বাইরে এতখানি স্নেহ সেই আমার প্রথম পাওয়।
তখন আজাদ ঈদসংখ্যার পাতায় পড়লাম শওকত ওসমানের উপন্যাস Ñ বনি আদম। কলকাতার ময়দানে জনসভার দৃশ্য দিয়ে শুরু সে উপন্যাস। বালক হারিসের সঙ্গে আমিও সেদিন সামিল হয়ে গেলাম সে জনসভায়্ আরেকজনের একটি উপন্যাসের কথা মনে পড়ছে, নাম মনে নেই, লেখকের নামটি যে ছাপা হয়েছিলো, আজও স্পষ্ট চোখে ভাসছে Ñ আবুল কালাম শামসুদ্দিন (বরিশাল) ব্র্যাকেটে ওই বরিশাল কথাটির জন্যেই নামটা মনে গেঁথে যায়। অনেক পরে একদিন এঁকে আমি জানব খুব কাছে থেকে Ñ তখন তিনি নামের ঈষৎ হেরফের ঘটিয়ে হয়েছেন Ñ শামসুদ্দিন আবুল কালাম। পড়ছি আবু রুশদকেও ঈদসংখ্যায়। তাঁর গল্প জয়নাবের বোন বিলকিস। সেই দু’বোন আমার স্বপেনÍ মধ্যে ঠিকানা করে নেয়। আবুল হোসেনের কবিতা মেহেদির জন্যে Ñ এর দুটি পঙক্তি মনের মধ্যে গেঁথে যায় সেই বয়সেই Ñ মেয়ে তোমার সরাও বাহু দুটি, বাহু তো নয়, শেকল যেন! ভুলতে পারি না ছেলেমানুষ আমার সেই খটকার জন্যে Ñ বাহু কী করে শেকল হয়! মজা পাই আবুল মনসুর আহমদের ফুড কনফারেন্স পড়ে। শেরে বাংলার নাম তখন আকাশে বাতাসে। আবুল মনসুর লিখলেন হাতি-এ-বাংলা, চুহা-এ-বাংলার কাথা! দুর্ভিক্ষের স্মৃতি তখনো সদ্য আমার মনে। ফুড কনফারেন্সের বিদ্রুপ আমি ওই বয়সেও মর্মে মর্মে টের পাই। সাহিত্যপাঠের সেই নবীন আনন্দ, সে কি ভোলা যায়?
সবচেযে না- ভোলা দুটি লেখা আর দু’জন লেখক- ফজলে লোহানি, আনিস চৌধুরী ) দু’জনেই গল্প লিখেছেন। লোহানি লিখেছেন এক বিদেশী সাহেবের কাছে ছবি বিক্রি করতে গিয়ে তাকে ঠকানোর গল্প, আর আনিস চৌধুরী লিখেছেন জন্মদিনে উপহার পাওয়া না পাওয়া নিয়ে। শাদা চামড়ার ইংরেজ সাহেবকে বাঙালি এক কিশোর মহা ঠকান ঠকিয়েছে, এটা যেন ইংরেজের ওপর বাঙালিরই এক বেজায় টেক্কা! আর, আনিস চৌধুরীর কাছে পাই প্রথম সেই সংবাদ যে, আমাদের জন্মদিন আছে, আর সেটা পালন করবার মতো একটি দিন, আর উপহার না পেলে দিনটাই হয় মাটি-মাটি!
এর কিছুদিন পরেই পাকিস্তান হলো, কুড়িগ্রাম থেকে আমি নির্বান্ধব পুরী ঢাকায় চলে এলাম স্কুলের ক্লাশ নাইনের ছাত্র। পরেপরেই বেরুতে শুরু হলো ‘অগত্যা’ পত্রিকা। সেই পত্রিকাটিই প্রথম পত্রিকা যে আমাদের বাঙালিসত্বাকে বোধের ভেতরে রেখে জিন্না লিয়াকত নাজিমুদ্দিন আর তাবৎ পাকিস্তান প্রেমিকদের কুপোকাত করতে লাগলো সরস সব লেখা দিয়ে। আমি স্কুলে যাই, পাঠ্যবই যতটা না পড়ি, তারচেয়ে বেশি পড়ি বাইরের বই। আর গোগ্রাসে গিলি অগত্যা পত্রিকা। ওই পত্রিকার কয়েকজন লেখক তখন আমার দিনরাত দখল করে নেন Ñ ফজরৈ লোহানি, মুস্তাফা নুরউল ইসলাম, মাহবুব জামাল জাহেদী, আনিস চৌধুরী। আজাদ ঈদসংখ্যার সেই লোহানি! সেই আনিস চৌধুরী! ও^দের একবার চোখে দেখবার জন্যে প্রাণ আকুল হয়ে ওঠে। নিজেও ওঁদের মতো লেখার জন্যে আমার বালকের হাত অস্থির হয়ে পড়ে।
সব কিছুরই সময় আছে। বালক আমি সময়কে তাড়া দিয়ে এগিয়ে নিতে চাই। একদিন এক গল্প লিখে অগত্যার ইসলামপুর আপিসে যাই। নগদ ইচ্ছে, ওই লেখকদের চোখে দেখবো, আর Ñ যদি সাহসে কুলোয় Ñ আমার লেখাটি ওঁদের হাতে দিয়ে আসবো। বিকেল থেকে সন্ধ্যেরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করি আপিসের তালাবন্ধ দরোজায়। রাত বাড়তে থাকে। ওঁরা আসেন না। আমিও এতটা রাত বাড়ির বাইরে থাকতে সাহস পাই না। দারোয়ানের হাতেই গল্পটা দিয়ে চলে আসি।
বিস্ময়ের বিস্ময়, মাস দুই পরে বেরোলো অগত্যার বিশেষ সংখ্যা Ñ প্রায় আড়াইশ পাতার। অসাধারণ সংখ্যা অগত্যা Ñ এই নামে বেরোলো। ভেতরের পাতা খুলেই দেখি আমার গল্পটি ছাপা হয়েছে। উনিশশ একান্ন সাল। আমার তখন ষোলো বছর বয়স। সে যে কী আনন্দ আমার, আজও ভুলতে পারিনি। বুভুক্ষ আমি এক রাতের মধ্যে পড়ে শেষ করলাম পুরো পত্রিকা। আর পত্রিকার সেই সংখ্যাতেই একটি উপন্যাসের শুরুর বাক্য আমার মনের মধ্যে অনবরত দোল খেতে লাগলো Ñ ‘নাসিম বানুর হাতে তৈজসপত্র ভাঙে নি একটাও, এটা সাতচল্লিশ বছর চার মাস সতেরো দিনের একটা চক্রবৃদ্ধি অহমিকা।’ উপন্যাসের নাম ‘প্রশ্ন জাগে’, লেখকের নাম Ñ আনিস চৌধুরী। উপন্যাসের নায়িকার নাম নাসিম বানু, তার বয়সের অমন কষে বার করা হিসেব সাতচল্লিশ বছর চার মাস সতেরো দিন Ñ এ যেমন আগে কখনো কারো লেখায় পাইনি, তেমনি জীবনে একটিও তৈজস না ভাঙার উল্লেখটা বড় রকমে চমকে দিয়ে যায় আমাকে। তখনো ভালো করে বুঝিনি, সেই তৈজসই নাসিম বানুর হাতে একদিন ভাঙবে, ভাঙবে তার জীবন, আর জীবনেরই প্রতীক হয়ে উঠবে তৈজস।
সেই নাসিম বানু হয় যাঁর কলমে, সেই আনিস চৌধুরীর সঙ্গে আমার পরিচয় এরও বছর দু’তিন পরে। ফজলে লোহানিই আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর Ñ বংশাল রোডে সংবাদ পত্রিকার আপিসে। লোহানি সেখানে কাজ করতেন। আনিস চৌধুরীও করতেন। লোহানির কাছেই শুনেছিলাম, আনিস চৌধুরীর ব্যস্ততা অনেক। ইউনিভার্সিটিতে বিজ্ঞাপন পড়ছেন, পত্রিকায় গল্প লিখছেন, সাংবাদিকতা করছেন, আর যেটুকু সময় তারপরও হাতে পাচ্ছেন Ñ গীটার বাজাচ্ছেন! লোহানি ঠাট্টা করে বলতেন, সারাদিনের পর ক্লান্ত হয়ে রাতে বাড়ি ফিরেই আনিস তাক থেকে পেড়ে নেয় গীটার, বাজায় ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর প্রভু’, রোজই এই গানটা বাজায়, তবে তার ভাত খাবার মতো মন সুস্থির হয়!
ভেবেছিলাম আনিস চৌধুরী লোহানির মতোই খুব হৈচৈ করা মানুষ হবেন। তার বদলে দেখলাম খুব ঠান্ডা, খুবই স্বল্পভাষী, মুখে সবসময় ঙ্খলিত এক টুকরো হাসিমাখা একজনেক। লোহানি বললেন, এই সেই আনিস, যে নরম শব্দটা যথেষ্ট নরম বোঝাতে ও-কার দিয়ে লেখে Ñ নরোম! বোতামকে ছোট্ট বোঝাতে লেখে Ñ বুতোম! সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় রাঙা হয়ে যেতে দেখলাম আনিস চৌধুরীকে। ছোট্ট করে তিনি ধমক দিয়ে উঠলেন, আঃ লোহানি! স্বরটা এখনো আমার কানে লেগে আছে। প্রাণের বন্ধু, কিশোরবেলা থেকে বন্ধু, সেই কলকাতা থেকে বন্ধু, তার জন্যে ধমকটিতেও আনিস চৌধুরীর সৌজন্য আমি ঝরে পড়তে দেখি সেদিন। আজ বলতে পারি, ওই সৌজন্যবোধটাই ছিলো আনিস চৌধুরীর ব্যক্তি-মূল কাঠামো।
বোধহয় ও থেকেই এক ধরনের নম্রতাও তাঁর চনার ব্যক্তিত্বে, তাঁর লেখার স্তবকে স্তবকে এসে যায়। এই নম্রতাকে আরেক নামে চিহ্নিত করা যেতে পারে Ñ রোমান্টিকতা। তাঁর গল্প উপন্যাসের পরতে পরতে, চরিত্র গঠনে, কাহিনী সংস্থাপনে, এর অনিবার্য টানে বাক্য গঠনেও, আমরা আবিষ্কার করি তাঁর রোমান্টিক মন। রোমান্টিক কথাটার বাংলা কী করা যাবে Ñ আবেগ-বিধুর? সেই বিধুরতা, কল্পনার সেই বিধুর যাত্রাই, আমার মনে হয়, আনিস চৌধুরীর কথাসাহিত্যের প্রধান সুর।
বালক বয়সেই তিনি লিখতে শুরু করেন। ছোটদের পাতায় ছোটদের জন্যেই তাঁর প্রতম দিককার লেখা। শুধু কি লেখা? মুকুলের মহফিল আর মুকুল সেনা সংগঠনেও তিনি ছিলেন ব্যস্ত এক কর্মী। এরই ধারাবাহিকতায় মঞ্চে তিনি অভিনয়ও করেন Ñ সম্ভবত জীবনে ওই একবারই Ñ কলকাতার পার্ক সার্কাসে মুকুলের মহফিলের উদ্যোগে শিরাজদ্দৌলা নাটকে তিনি শিরাজের ভূমিকায় নামেন, এটা লোহানির মুখে শুনেছি। আর লোহানির তো স্বভাবই ছিলো ঠাট্টা করা। লোহানি বলতেন, সেই নাটক যখন চলছে, ঢিল এসে পড়লো আনিসের কপালে, একেবারে নবাবী উষ্ণীষের ওপর। ভাগ্যিস ঢিলটা ছিলো কাগজের! ঢিলটা কি লোহানিই ছুঁড়েছিলেন? এ কথার উত্তরে লোহানি বলতেন, এত ভালো অভিনয় করেছিলো আনিস যে ঢিল না ছুঁড়লে থামানো যেতো না, তোমরা লেখক আনিসকে আজ না পেয়ে তাহলে পেতে অভিনেতা আনিসকে!
ওই সময়ে আনিস চৌধুরী বড়দের জন্যে তাঁর প্রথম কলম ধরেন। তিনি লিখে ফেলেন আস্ত একখানা উপন্যাস। সেটি তিনি নিজের খরচেই ছাপতে শুরু করেন। ছাপা দু’তিন ফর্মা হয়েছে, এমন সময় হয়ে গেলো দেশভাগ, ছাপা বন্ধ হয়ে গেলো। আনিস চৌধুরী চলে এলেন ঢাকা। আর সে উপন্যাস বই হয়ে বেরোয়নি। ছাপা ফর্মাগুলো নষ্ট হয়ে যায়, পাণ্ডুলিপিও একদিন হারিয়ে যায়। পরে, বহুবার দেখেছি, সে উপন্যাসের জন্যে আনিস চৌধুরীকে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে। দীর্ঘশ্বাসের ব্যাপারটা বোধহয় ওই উপন্যাসের নামের ভেতরেই ছিলো। নাম ছিলো-ভাঙা ভাঙা দিন।
নামটা এখন যখন আমার মনে পড়ে, কৌতূহল হয় Ñ আনিস চৌধুরীর কাছে দিন কেন ভাঙা ভাঙা মনে হয়েছিলো? সে কি দেশভাগ হয়ে যাচ্ছে বলে? কলকাতা তাঁকে ও অনেক মুসলিমকে অচিরেই ছেড়ে আসতে হবে বলে? যদি তাই হয়, তবে সেই দীর্ঘশ্বাসটিও ভাঙতে ভাঙতে হারিয়েই গেছে, আর তা ফিরে আসেনি আনিস চৌধুরীর আর কোনো লেখায়। দেশভাগের মর্মান্তিক বাস্তবতা আর ঢাকা চলে আসবার পর স্থিতির অনিশ্চয়তা, পিতার অকাল মৃত্যু ও বাস্তব পৃথিবীতে তাঁর টিকে থাকবার লড়াই Ñ এসবই যেন আনিস চৌধুরী তাঁর লেখার বাইরে পতিত রেখে দেন। বিপরীতে, তাঁর কথাসাহিত্যে তিনি এমন এক ভুবন গড়ে তোলেন যা রোমান্টিকতায় বিধুর। বাস্তবতাকে একেক লেখক একেকভাবে উপস্থিত করেন সাহিত্যে, আনিস চৌধুরী হয়তো ভেবেছেন অনুপস্থিতিটাই উপস্থিতির দ্যোতক হয়ে উঠবে তাঁর রচনায়।
প্রথম বয়সে আমি লেখক আনিস চৌধুরীর অনেকগুলো অভ্যেস মুগ্ধ হয়ে লক্ষ্য করতাম। তিনি গল্প লিখতেন পত্রিকা আপিসের নিউজপ্রিন্টের ছোট ছোট প্যাডে। তখনও বলপয়েন্ট কলম আসেনি। লিখতে হতো নিবের কলম কালির দোয়াতে চুবিযে। আনিস চৌধুরী ছিলেন শৌখিন মানুষ। এ শৌখিন পরিচয় পাই Ñ লেখার জন্যে ফাউন্টেন পেন তিনি কিনেছিলেন। তখনকার এত অভাবের মধ্যেও টাকা জমিয়ে পাঁচটাকা দামের! তখনকার দিনে পাঁচ টাকাই কত টাকা! প্যাডে খুব বড় বড় অক্ষরে গল্প লিখতেন তিনি। একেক পৃষ্ঠায় মাত্রই তিনটি কি চারটি বাক্য। তাঁর গল্প প্রায়ই হতো বইয়ে ছাপলে তিন কি চার পৃষ্ঠায়। কিন্তু ওই বড়বড় করে লেখার দরুন একেকটা গল্পের পাণ্ডুলিপি আনিস চৌধুরীর হাতে দাঁড়াতো চল্লিশ পঞ্চাশ পৃষ্ঠার! গল্প তিনি লিখতেন এক বসাতেই, ওই তাঁর অভ্যেস ছিলো Ñ এটাও তাঁর মুখে শুনেছি। গল্পই ছিলো তাঁর কথাসাহিত্যের মূল হাত। উপন্যাস যে লিখেছেন, আজ ফিরে দেখি, সেসবও গল্পেরই দীর্ঘ সংস্করণ মাত্র Ñ বস্তুত বড় গল্পই।
অনেক পরে নাটকও লিখেছেন আনিস চৌধুরী। নাটকের এই সম্ভাবনাটি তাঁর গল্প-উপন্যাসেই আমরা আজ লক্ষ করতে পারবো। চমৎকার সংলাপ দিয়ে তিনি গল্প সাজিয়ে তুলতেন। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিয়ে তিনি যান চাকরিতে, বেতারে সেখানে সংবাদ বিভাগের একজন সম্পাদক হয়ে। সেই করাচিতেই বাঙালি সমাজের অনুরোধে, তাদের বার্ষিক উৎসবে যে নাটক হয়, আনিস চৌধুরী তার জন্যে একটি নাটক লিখে দিতে রাজী হন। লেখেন Ñ মানচিত্র। তারপর Ñ অ্যালবাম। মঞ্চের জন্যে এই দুটি নাকট ছাড়াও তিনি বেতারের জন্যে পরে আরো কয়েকটি নাটক লেখেন।
মঞ্চের ওই নাটক দুটির সাক্ষাতে আমরা আবিষ্কার করি গল্প- লেখক আনিস চৌধুরী আর নাট্যকার আনিস চৌধুরী, এই দুই মানুষের, দুই কলমের এক মৌলিক ভিন্নতা। যে রোমান্টিক বিধুরতা কথাসাহিত্যে আনিস চৌধুরীর, নাটকে তা নেই। নাটকে তিনি কঠিন বাস্তবকে নিষ্করুণ আলো ফেলে দেখিয়েছেন। কাহিনী নির্মাণে আনিস চৌধুরী তাঁর কথাসাহিত্যে হন কল্পনার আকাশে উড্ডীন, নাটকে তিনি নেমে আসেন মাটিতে এবং হন বাস্তবতার বুকে পদাতিক। আমার দুঃখ হয়, নাটকে যে তাঁর আসল সিদ্ধি আসবার সম্ভাবনা ছিলো, তিনি নিজেই তার দরোজাটি বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
কেন দিয়েছিলেন? আমি তাঁর খুব কাছে থেকে দেখেছি। করাচি ভ্রমণকালে আমি তাঁর আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠি Ñ সম্ভবত, আমিও পর্যটক, তিনিও প্রবাসী, এই দুই সত্য আমাদের আরো কাছে এনে দয়, তারপর তিনি বদলি হয়ে চট্টগ্রামে এলেন। সেখানেও আমার নিরন্তর যাওয়া পড়লো। বহুদিন করাচিতে থাকবার কারণে আনিস চৌধুরী পত্রিকা ও প্রকাশকদের পরিচয় হারিয়ে ফেলেছিলেন। আমি তাঁর জন্যে লেখা ও লেখা প্রকাশের মধ্যবর্তী মানুষ হয়ে উঠি সানন্দে। আমাদের সম্পর্ক আরো নিবিড় হয়ে ওঠে।
এই নিবিড় পরিচয় থেকেই আমি এখন বলতে পারি, দিনে দিনে অভিমানী হয়ে পড়ছিলেন তিনি। পত্রিকা সম্পাদকের প্রতি অভিমান। প্রকাশকদের প্রতি অভিমান। পাঠকদের প্রতি অভিমান। এক অভিমান থেকে দ্বিতীয় অভিমান। তা থেকে তৃতীয়। সবটা মিলিয়ে এক চিকিৎসা-অতীত অভিমানে তিনি নুব্জ হয়ে পড়েন। তাঁর মনে হতে থাকে, পত্রিকার সম্পাদকেরা নতুন লেখকদের পেয়ে আগের লেখকদের ভুলে গেছেন, ভুলে গেছেন সেইসব লেখকদের যাঁরা একদিন এ দেশে আধুনিক সাহিত্যের বুনিয়াদ গড়ে তুলেছিলেন। আনিস চৌধুরী যতই স্বল্পভাষী হন, তিনি আমাকে অন্তত এটুকু বলতে কুণ্ঠিত হতেন না যে তিনিও তাঁদেরই একজন। তাঁর মনে হতে থাকে, প্রকাশকের কাছে কেন তাঁকে যেতে হবে? কেন তারাই তাঁকে খুঁজে বের করবে না। ফলে তাঁর অনেক পাণ্ডুলিপিই অপ্রকাশিত থেকে যেতে শুরু করে। অভিমান আরো ঘন হয়ে পড়ে। তাঁর লেখার পরিমাণও কমে যেতে থাকে। বন্ধুদেরও তিনি এড়িয়ে যেতে শুরু করেন। কিন্তু পাঠক? আনিস চৌধুরী দেখতে পান, তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন করতে পাঠকেরাও ব্যর্থ। আমি তাঁকে বলতাম Ñ যে দেশে বঙ্গবন্ধুই মূল্যায়ন হয় না, সে দেশে আপনি আমি তো পরের কথা। তিনি বলতেন, রাজনীতি নষ্ট দুষ্ট বলে কি সাহিত্যকেও তা হতে হবে? সাহিত্যই তো একটি জাতির চিন্তা-সুস্থতার শেষ আশ্রয়স্থল।
আজ আনিস চৌধুরী নেই। আজ তাঁর উপন্যাসগুলো নিয়ে সমগ্র সংস্করণ প্রকাশ করবার জন্যেও কারো উদ্যোগ নেই। এগিয়ে আসতে হলো তাঁরই একমাত্র সন্তান লুভা নাহিদ চৌধুরীকে। আমি দেখেছি, কী কষ্ট করেই না লুভাকে উদ্ধার করতে হয়েছে পাণ্ডুলিপি আর পুরনো বই। ‘ভাঙা ভাঙা দিন’ তো আর পাওয়াই গেলো না, সন্দেহ হয়, আরো দু’একটি রচনা হয়তো বাইরেই রয়ে গেলো খুঁজে না পাবার দরুণ। আনিস চৌধুরীও সময় পাননি, সেই মানসিক স্থিরতাও পাননি যে নিজের লেখাগুলো গুছিয়ে রেখে যাবেন। জীবনের কোন কাজটাই বা গুছিয়ে রেখে আমরা বিদায় নিতে পারি? সব কাজই শেষ পর্যন্ত পড়েই থাকে, ছড়িয়ে থাকে। সাহিত্য ও এক সময় কীটেরই খাদ্য হয়ে যায় Ñ যায় কি? না, যেতে দেয়া যায়?
আনিস চৌধুরীর সবগুলো উপন্যাস নিয়ে সমগ্র সংস্করণ প্রকাশ করবার দরকারটা লুভা দেখেছেন, আমি তো দেখিই। তাঁর রচনাকে নতুন করে নতুন সময়ে পাঠকের কাছে উপস্থিত করবার দরকার আছে আমাদেরই প্রয়োজনে। বাংলাদেশে আজকের যে সাহিত্য, তার আধুনিকতার আদিতে যাঁরা জলসেচ করেছেন, বীজ পবন করেছেন, তাঁদের না জানলে আজকের সাহিত্যকে জানাটাই যে অসম্পূর্ণ হয়ে থাকবে। উপন্যাসকে আমি বলি সৃষ্টিশীল সাংবাদিকতা। এ সংবাদ একটি সময়ের মানুষের ভেতর-ভূগোলের। সেই সংবাদটিও আমরা পাবো সেদিনের অনেকের সঙ্গে আনিস চৌধুরীর গল্প-উপন্যাসেও। তাই তাঁকে আমাদের আজ আবার পড়ে দেখতেই হবে। মানুষ মরণশীল, শিল্প তো নয়। তাই ব্যক্তি আনিস চৌধুরী চলে যাবার পরও তাঁর সাহিত্য আছে। এই আছেটাকে সত্য করে তোলার জন্যেই তাঁর উপন্যাস সমগ্রের এই গ্রন্থনা ও প্রকাশনা।
সৈয়দ শামসুল হক
১লা ফেব্র“য়ারি ২০০৬ ঢাকা
