মানচিত্র

প্রথম অভিনয় রজনী

৮ এপ্রিল, ১৯৫৬কাটরাক্ হল, করাচি

ইস্ট বেঙ্গল কালচারাল সোসাইটির উদ্যোগে মঞ্চস্থ
নাটকে অভিনয় করেন :
মজিদ স্কুলশিক্ষক মজিবুর রহমান খান
কলিম স্কুলশিক্ষক এ. বি. এ. লতিফ
মনসুর হেডমাস্টার আফতাবুদ্দিন আহমদ
ইয়াকুব জমিদার জাফর করিম
নায়েব আতোয়ার হোসেন খান
আমিন মজিদের ছেলে রফিকুল ইসলাম
কামাল মজিদের ভাগ্নে নজিবুল হক
লালু মজিদের চাকর মোতাহার আহমদ
মমিন ইয়াকুবের চাকর আবুল হোসেন
আবদুল্লাহ দর্জি কাজী আবদুল হামিদ
করিম ডাক্তার আশরাফ উদ্দীন আহমদ
ডাকঘরের কেরানি মোহাম্মদ ইসমাইল
মরিয়ম মজিদের বউ সুরাইয়া আহমদ
রানু মজিদের বড় মেয়ে মমতাজ হক
পারু মজিদের ছোট মেয়ে রোকেয়া সুলতানা
রোকেয়া আমিনের বউ আনিসা খাতুন
পরিচালনা : অধ্যাপক মুজিবুর রহমান খান

১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর ঢাকায়, পুনরায় ডিসেম্বরে করাচিতে এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শতবার্ষিকী উৎসবে, ওই বৎসর, কলকাতায় অভিনীত। ১৯৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে পুনরায় ঢাকায় মঞ্চস্থ। পরবর্তীকালে বাংলাদেশে সর্বাধিক মঞ্চস্থ নাটক হিসেবে পরিগণিত।

প্রথম দৃশ্য
মজিদ মাস্টারের ঘর। মামুলি সাজানো। দেয়ালে বাংলা ক্যালেন্ডার। ইকবাল, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের ছবি। তাকে কিছু বইপত্র। টেবিলে ছড়ানো পরীক্ষার খাতা। একপাশে খাট রাখা।

মজিদ : (পরীক্ষার খাতা দেখছে) না, আগাগোড়া ভুল! কী যে হয়েছে আজকাল ছেলেরা। একটা অক্ষর যদি শুদ্ধ হতো। (গা মুড়ি দেয়। হাই তোলে) লালু, লালু কই গেলি।
লালুর প্রবেশ।
লালু : জ্যা।
মজিদ : থাকে তো একছিলিম তামাক সাজা তো বাবা ভালো করে। ক’টা বাজলো কে জানে
মরিয়মের প্রবেশ।
মরিয়ম : হলো তোমার খাতা দেখা?
মজিদ : হলো আর কই – অর্ধেকেরও বেশি পড়ে।
মরিয়ম : তা তো হলো, কিন্তু আজ কি বাজার হবে না? সেই সকাল থেকে চুলো জ্বলছে।
মজিদ : জানোই আমার দেরি হবে। তা লালুকে পাঠিয়ে দিলেই পারতে, সকাল সকাল মাছ-তরকারিটা একটু দেখেশুনে আনতে পারতো।
মরিয়ম : সে তো জানি। কিন্তু বাজার তো আর এমনি আসবে না। কাল থেকে বলছি একটু দ্যাখ – তোমার হুঁশ থাকলে তো। এমন মানুষ দেখিনি বাবা, চুরি না ডাকাতি? পাওনা টাকা, তাও চাইতে লজ্জা! যা খুশি করগে –
পারুল : (নেপথ্যে) ডাল পুড়ে গেল।
মরিয়ম : যাই পোড়ারমুখী – আমার হয়েছে যত জ্বালা।
মরিয়মের প্রস্থান।
মজিদ : তাই তো টাকা –
মরিয়ম বেরিয়ে যাচ্ছে এমন সময় কলিম মাস্টারকে ঢুকতে দেখা যাবে। ঢুকেই সে থমকে দাঁড়াল! মজিদ কিছু লক্ষ করলে না।
কলিম : (নেপথ্যে। কেশে নিয়ে) কই, আছ নাকি?
মজিদ : চলে এসো, চলে এসো। (কলিমের প্রবেশ) দেখ কলিম, আসবে তো সোজা চলে আসবে। ওসব থিয়েটারি ঢং আমার ভালো লাগে না।
কলিম : না, না – মানে কী যে – পরিবার পাঁচজন নিয়ে ঘর কর – আমার মতো তো নও যে চাল নেই, চুলো নেই। তাই –
মজিদ : নাও রাখ, ওসব কথা ঢের শুনেছি। বিয়ে-শাদি করোনি বেশ করেছ – স্বর্গসুখ হে, স্বর্গসুখ! একলা মানুষ – কীভাবে সকাল হয় কীভাবে সন্ধ্যা হয় টেরও পাও না। আর আমার – (হুঁকো হাতে লালুর প্রবেশ) দে দে, বড় মাস্টারকে দে। নাও কলকে ঝলসে নাও!
লালুর প্রস্থান।
কলিম : কী রকম দেখছ?
মজিদ : আর বলো না – পাতায় পাতায়, লাইনে লাইনে ভুল! আর হবে না কেন – সারাটা বছর বইয়ের সঙ্গে টুঁ সম্পর্কটি আছে?
কলিম : তোমার তবু ইতিহাস, না পারি আন্দাজেই সব। কিন্তু ভূগোলের বেলায় তো আর সেটি চলে না। বলো, এখন কায়রোকে যদি সিংহলের রাজধানী করতে হয়।
মজিদ : থামো থামো (একটা খাতা বার করে) এ – এ – না – হ্যাঁ – এই – এই যে। দেখ হে দেখ, কী সব রত্নচূড়ামণি। লিখেছে ‘চাণক্যের পুত্র শিবাজী, পানিপথের তৃতীয় সমরে চন্দ্রগুপ্তের নিকট পরাজিত হইয়া মেসিডনে চলিয়া যান।’ এখন বলো করবেটা কী?
কলিম : অন্ধকার, অন্ধকার। ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
পারুলের প্রবেশ।
পারুল : মা বলেছে, যে কথাটা বলে গেছে সে কথাটার কী হলো?
মজিদ : আরে হ্যাঁ, ভালো কথা। কিছু শুনলে পয়সা-কড়ি কিছু দেবে, না অমনি ঝোলাবে?
কলিম : (হেসে) আমরা ইতিহাস-ভূগোল নিয়ে লড়াই করি আর ওদিকে হাঁড়িতে চাল নেই।
মজিদ : বুঝতেই পারছ। আজ মাসের দশ তারিখ, একটা পয়সা দেবার নাম নেই। কী কুক্ষণেই যে মাস্টারি করতে এসেছিলাম।
কলিম : দেখ, কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। দেবে দেবে তো রোজই শুনছি।
মজিদ : তা বলো রোজ রোজ এই দিকদারি কেন? না দেবে বাবা পষ্ট বলে দাও – অত প্যাঁচের কথা কেন?
কলিম : প্যাঁচের কথা বলবে না কেন শুনি? ওই তোমাদের পেয়ারের হেডমাস্টার দেখছ দু‘বেলা তেল দিচ্ছে সেক্রেটারির বাসায়। বন্দে মিয়া কাল গিয়েছিল –
মজিদ : আচ্ছা, তারপর?
কলিম : তারপর আর কি! সেক্রেটারি বললে, – এক তারিখে দেব বলে কি স্ট্যাম্পে চুক্তি করেছি? ‘ইন ডিউ কোর্স’ দেব।
মজিদ : ডিউ কোর্স! ডিউ কোর্স মানে জানে? জানে তো – শুধু রেস কোর্স।
পারুলের প্রবেশ।
পারুল : তোমাকে ডাকে।
মজিদ : আসি আসি যা। – (পারুলের প্রস্থান) দেখ, এদিকে কা– বাজার করব তার পয়সাটাও নেই। হবে নাকি তোমার কাছে কিছু?
কলিম : আমারও – দাঁড়াও দেখছি (মানিব্যাগ ঘেঁটৈ) নাও তোমার বরাত ভালো। দুটাকায় হবে?
মজিদ : হবে মানে! হওয়াতেই হবে। দাও দাও।(ঘেঁটে নিয়ে) আর বলো তোমাকেই বা কাহাতক বিরক্ত করি।
কলিম : হয়েছে হয়েছে, ওসব কথা ছাড় তো। ছাত্র চরিয়ে তুমিও খাও, আমিও খাই। ওসব বলে লাভ আছে ভায়া। আচ্ছা তুমি যাও বাজারে, আমি বরং উঠি।
মজিদ : বসো বসো, একসঙ্গেই বেরুচ্ছি। (মজিদ ভেতরে যায়। কলিম হুঁকোটা তুলে নেয়। তামাক নেবানো দেখে রেখে দেয়। থলি হাতে মজিদের প্রবেশ) নাও, চলো চলো। এমনিতেই বেলা অনেক হলো আজ।
মরিয়ম : (নেপথ্যে) ওরে পারুল, তোর বাবাকে বলে দে, ভালো দেখে এক পোয়া পটল আনতে – সেদিনের মতো পচা যেন না হয়।
মজিদ : আচ্ছা, আচ্ছা।
মজিদ ও কলিমের প্রস্থান। রানুর প্রবেশ। বইয়ের তাক থেকে একটা খালি টিন বার করে –
রানু : পারু, ও পারু।
তেঁতুল খেতে খেতে পারুলের প্রবেশ।
পারু : মাগো, কী গলা।
রানু : আবার তেঁতুল। হতচ্ছাড়ি রাতে খক-খক করে কাশবে আর সারাদিন ছাইপাশ সব খেয়ে বেড়াবে। কী ডাইনি মেয়ে রে বাবা। জন্মে দেখিনি।
পারু : আর নিজে?
রানু : সুইটা যে কাল নিলি – রেখেছিস কোথায় শুনি? না তেঁতুলের মতো সেটাও গিলেছিস?
পারু : ইস, পরে যে আমার হাত থেকে কেড়ে নিলে – সেটা আর মনে নেই, না?
আমিনের প্রবেশ। হাতে খাতা, বই। মুখে সিগারেট।
আমিন : বাবা কই রে?
রানু : কলেজ পালিয়েছ তো?
আমিন : যা যা, বাজে বকিস না। কী আমার গুরুজন রে। পারু, বাবা কই রে?
পারু : সেই যে ফোর্থ টিচার এসেছিল, তখনই তো বেরিয়ে গেল।
আমিন : (রানুকে) বই ঘাঁটছিস যে?
রানু : বই ঘাঁটতে বয়ে গেছে আমার -। সুই খুঁজছি।
আমিন : সুই-ফুই এখানে নেই। যা তো এখান থেকে, যা।
রানু : ওঃ একেবারে যেন লাট সাহেব। আয়রে পারু আমরা যাই।
রানু ও পারুর প্রস্থান। মরিয়মের প্রবেশ। পেছনে নতমুখে লালুর প্রবেশ।
মরিয়ম : কী কুক্ষণেই যে পেটে ধরেছিলাম। যেমন হয়েছে ছেলে, তেমনি হয়েছে মেয়েগুলো। হাড়হাভাতের মতো চাট্টে গিলতে পারলেই হলো।
আমিন : কী হয়েছে মা?
মরিয়ম : হবে আর কি! তোমাদের গুণ-কীর্তন। কারও যদি মায়া-দরদ থাকে এ বাড়িতে। যে জিনিস কেনো – সেই সেদিন সাবান এলো – গেল কোথায়? ডানা মেলে তো উধাও হয়নি। (আঁচল থেকে আধুলি বার করে লালুকে দেয়) নাও যা খুশি করগে –
লালু : বাংলা সাবান আনুম বিবিসাব?
মরিয়ম : যা হয় আন্ – অত বকতে পারিনে (আমিনকে দেখে) কী রে এই যে কলেজ গেলি –
আমিন : বাঃ ক্লাস না থাকলেও বসে বসে ভ্যারা-া ভাজব নাকি?
মরিয়ম : সে তো রোজই শুনছি। পারু –
পারু : (নেপথ্যে) কী মা?
মরিয়ম : পাখাটা আন তো – (পাখা-হাতে পারুর প্রবেশ) এতবড় সংসার একা মানুষটাকে দেখতে হচ্ছে। গাধার মতো রাতদিন খেটে যাচ্ছে কিসের আশায়? তোরা মানুষ হবি –
আমিন : আমি কি না করেছি? রোজই তোমার ওই এক কথা।
মরিয়ম : তবু যদি তোদের বুদ্ধিশুদ্ধি হয়। দু-দুবার পরীক্ষা দিলি বাবা – সবই কপাল। করিম ডাক্তারের ছেলেটা চোখের সামনে দেখতে দেখতে পাশ করে গেল।
আমিন : ছ’মাস হয়ে গেল বই কেনা হলো না। পড়ালেখা তো আর গাছে ধরে না। বই কেনার কথা বললেই বাবার এক কথা, দেখি কী হয়।
মরিয়ম : উনি কী পারতে এ কথা বলেন – এত বড় সংসারটা কিসে চলে শুনি? এতগুলো লোক, এ সামান্য টাকায় কার কী হয়। তবু তোরা যদি অবুঝ হোস!
মরিয়মের প্রস্থান।
আমিন : রানু, রানু –
রানুর প্রবেশ।
রানু : কি! সারা বাড়িটা যেন মাথায় করে তুলছে।
আমিন : আমার শার্ট শুকিয়েছে?
রানু : কী শার্ট?
আমন : কী শার্ট মানে? একশোবার করে বলে গেলাম শার্টটা ধুয়ে রাখতে – সে কথা কারো কানে গেলে তো, এখন আমি কী পরে যাই।
রানু : না গেলে কী ক্ষতিটা কার হবে শুনি?
আমিন : তোর মতো প্যাঁচামুখো হয়ে আমি তো আর বসে থাকতে পারি না।
রানু : হয়েছে হয়েছে। কী চেহারার বড়াই! গুণ নেই, তবু যদি রূপ থাকত। তখন থেকে শুনছে সাবান নেই –
আমিন : কী আছে শুনি এ বাড়িতে? সাবান নেই, পয়সা নেই, হ্যান নেই, ত্যান নেই –
পারুর প্রবেশ।
পারু : মা কাঁদছে।
আমিন : (বিরক্ত হয়ে) তা – তা – আমি কী করব। আমি কী বলেছি?
রানু : ধার করে সাবান আনতে পাঠাল – সবই দেখল, তবু ন্যাকামো। অত ফুটুনি কিসের? নিজের যখন মুরোদ হবে তখন ওসব বড় বড় কথা মানায়। তার আগে-
পারু : বাবা মাইনেও পায়নি।
আমিন : সে আর নতুন কথা কী? আমার যখন কোনো কিছুর দরকার – কতই অজুহাত। মাইনে পায়নি, টাকা কেটেছে, বাজারে ধার, আর সবার বেলায় উলটো –
পারুর প্রস্থান।
মরিয়ম : (নেপথ্যে) এ বাড়ির সব যে ওর শত্রু –
রানু : আর কেউ হলে লজ্জায় মরে যেত।
আমিন : থাক, থাক। মায়ে-মেয়েতে মিলে আর দরদ দেখাতে হবে না – খুব হয়েছে। আমি চললাম।
দৌড়ে পারুর প্রবেশ।
পারু : মা বলেছে খেয়ে যেতে –
আমিন : না, আমি খাব না।
আমিনের প্রস্থান।
রানু : শার্টটা তো শুকিয়েই এসেছিল – একটু আর তর সইল না।
মরিয়মের প্রবেশ।
মরিয়ম : আচ্ছা, মনে করে কি আর একটা কাজও তোরা করতে পারিস না। সকাল সকাল ধুয়ে দিলে কী হতো, জাত যেত? তোরাও কম জ্বালাস না রানু।
বাজারের থলি হাতে মজিদের প্রবেশ।
মজিদ : (পারুকে) নে তো মা, নে রাখ। আর কি কিছু কেনবার জো আছে পারুর মা। যেখানে হাত দাও, সেখানেই আগুন।
মরিয়ম : ঘরেই তোমার কিনা শান্তি!
মজিদ : কেন, কী হলো আবার?
মরিয়ম : হবে আবার কী। সবই আমার নসিব।
মজিদ : আহা, কী হয়েছে বলবে তো?
মরিয়ম : বলব আবার কি! পোড়া কপাল নিয়ে এসেছিলাম, পোড়া কপাল নিয়েই যেতে হবে। যেখানে নিজে না দেখব সেখানেই একটা কিছু অনাসৃষ্টি। আমি একা কদিক সামলাই। এই ভরা দুপুরে না খেয়ে বেরিয়ে গেল, পিত্তি পড়বে না!
মজিদ : কে, আমিন? তা না খেয়েই বেরিয়ে গেল। এত করে বলি পারুর মা, যা হয় দুটো ডালভাত সকাল সকাল রেঁধে দিও, কলেজের সময় –
মরিয়ম : তোমার যত ঢঙের কথা। রান্না আবার কোনদিন হয় না শুনি? তোমার বাজারের মুখ দেখলে তো সারাদিন উপোস থাকতে হয়। শার্ট ধোয়া হয়নি, তাইতে রাগ করে খেল না। আর একতরফা ওকেই বা দোষ দিয়ে কী লাভ? বছর গড়িয়ে গেল – বই নেই, খাতা নেই। না কুলোয় ছেলেকে কলেজে পাঠাবার শখই বা কেন?
মজিদ : না না, শখ নয় পারুর মা, শখ নয়। নিজের জীবনটা এমন করে কাটল বলে ছেলের জীবনটাও কি মাটি হবে?
মরিয়ম : তার কী-ই বা বাকি শুনি?
মজিদ : কষ্টের কথা তো আমি অস্বীকার করছি না পারুর মা। কিন্তু তাই বলে হাল ছেড়ে বসে থাকলে তো হয় না। নিজেরও একটু চেষ্টা চাই।
[পারু থলি খুলে মাছ বের করে]
পারু : ওমা, ইলিশ – আমি কিন্তু ভাজা মাছ খাব মা!
মরিয়ম : (ঈষৎ রাগের ভান করে পারুর গালে টোকা দিয়ে) খাবে না, কত যে লক্ষ্মী মেয়ে তুমি! নাও ওঠো – যা হবার হবে।
মরিয়ম ও পারুর প্রস্থান।
মজিদ : না যাই, একটু ডুব দিয়ে আসি। পারু আমার গামছাটা দে তো মা। আর একটু তেল –
মরিয়ম : (নেপথ্যে) উঠোনে শুকোতে দিয়েছি, দিয়ে আয় পারু। আর তেলের বাটি দেখ রান্নাঘরে।

মজিদ জামা খুলতে থাকে। তোয়ালে আর তেলের বাটি নিয়ে পারুর প্রবেশ। মজিদ তেল মাখার উপক্রম করতেই পর্দা পড়বে অথবা পর্দা না ফেলে আলো স্তিমিত করা হবে।

দ্বিতীয় দৃশ্য

ইয়াকুব মিয়ার বৈঠকখানা। আগের দৃশ্যের সামান্য পুনর্বিন্যাস করে খাটে চাদর বিছানো। হেলান দেয়ার জন্য বালিশ রাখা। সামনে একটা টিনের ক্যাশবাক্স। ইয়াকুব মিয়াকে হুঁকো খেতে দেখা যাবে। টেবিল একপাশে রাখা।

ইয়াকুব : কই কোথায় -?
চাকর : কাকে চাই হুজুর –
ইয়াকুব : হুজুরের ব্যাটা নায়েব কই?
চাকর : তিনি এক্ষুনি এলেন বলে।
ইয়াকুব : এলেন বলে। দেখ তো ওকি হাতির পিঠে চড়ে আসছে –
[হিসেবের খাতা বগলে নায়েবের প্রবেশ]
নায়েব : হুজুর –
ইয়াকুব : তখন থেকে যে ষাঁড়ের মতো গলা চেঁচিয়ে মরছি – কানে যাচ্ছে না? আফিং গিলেছ?
নায়েব : হুজুরের পাজামার ফিতে লাগাচ্ছিলাম।
ইয়াকুব : হুঁ –
নায়েব : হুজুর, কদমপুরের হিসেবটা –
ইয়াকুব : দর্জির কী হলো?
নায়েব : হুজুর, খবর আমি ঠিক সময়ে পাঠিয়েছি। ব্যাটারা আবার নগদ মুনাফা ছেড়ে এক পা-ও নড়তে চায় না। তবে হুজুরের কথা যখন বলেছি, তখন কী আর না এসে পারবে।
ইয়াকুব : দেখ নায়েব, ওসব হাট-বাজারের দর্জিতে আমার চলবে না। স্যুট-প্যান্ট কাটা দর্জি চাই, বুঝলে?
নায়েব : তা আর বলতে হবে না হুজুর। কপাল মন্দ, তাইতে চন্দনপুরে এসে দোকান করেছে। নইলে আবদুল্লাহ মিয়ার কাঁচি – লোকে কথায় বলে ও তো কাঁচি ছোঁবে না। চাপকান, কামিজ তো চোখ বুঁজেই কাটে। নইলে সাধে আবদুল্লাহর এত তোয়াজ।
[কাঁচি হাতে আবদুল্লাহ দর্জির প্রবেশ। কপালে কাঁচি ঠেকিয়ে ইয়াকুব মিয়াকে সেলাম জানায়]
দর্জি : সেলাম হই হুজুর।
ইয়াকুব : কাঁচি ঠেকিয়ে সেলাম করছ। তুমি তো আচ্ছা বেয়াদপ হে।
দর্জি : হুজুর অপরাধ নেবেন না। অধম হাতের চেয়ে আমার কাঁচির জোর অনেক বেশি, তাই –
ইয়াকুব : থামো।
[দর্জি ফিতে বার করে ইয়াকুব মিয়ার পেটের মাপ নিতে যায়]
ইয়াকুব : না, তোমার আস্পর্ধা তো কম নয়। বলা নেই, কওয়া নেই অমনি খপ্ করে এসে ফিতে চাপালে।
দর্জি : এই আস্পর্ধাটা না হলে যে হুজুর কবে রুজি বন্ধ হয়ে যেত। অবিশ্যি হুজুর যদি ইচ্ছে করেন অনুমানেই কাটব –
ইয়াকুব : কী কাটবে? কাটবেটা কী শুনি – তোমার মাথা না আমার মু-ু?
দর্জি : হুজুর আমার কাঁচিতে কী আর সে ধার আছে –
ইয়াকুব : নায়েব, ওকে কাজের কথাটা বুঝিয়ে বিদেয় কর তো।
নায়েব : দিচ্ছি হুজুর, এক্ষুনি বুঝিয়ে দিচ্ছি। মানে কী – কাজটা তেমন কিছু নয় আবদুল্লাহ মিয়া – এই যে ক্যাশ বাক্সটা দেখছ, এটার একটা গেলাপ চাই।
দর্জি : (মাপ নিয়ে) দুই গজ সাত গিরা –
ইয়াকুব : আর কিছু বলোনি নায়েব?
নায়েব : বলছি হুজুর, বলছি। দেখো ওপরে থাকবে স্যাটিন –
দর্জি : স্যাটিন –
নায়েব : হ্যাঁ হ্যাঁ স্যাটিন, স্যাটিন – মাঝে মাঝে হুজুর হাত বুলোবেন।
ইয়াকুব : বাস হয়ে গেল?
নায়েব : (একটু ভেবে) ও হ্যাঁ, দেখ গেলাফটা লেপের মতো তুলোভরা থাকবে। হুজুরের ইচ্ছে ক্যাশ বাক্সটা বালিশের মতো মাথায় দিয়ে ঘুমোন – বুঝেছ ওপরে স্যাটিন –
[দর্জি আবার মাপ নেয়]
দর্জি : ঝালর থাকবে না?
নায়েব : হুজুর ঝালর থাকবে না?
ইয়াকুব : ঝালর থাকবে না – নূপুর থাকবে না! মাথায় নিয়ে নাচব? না, তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না নায়েব।
নায়েব : হুজুর তাহলে –
ইয়াকুব : তাহলে, তাহলে আবার কী?
নায়েব : সেই ভালো, ঝালর কেন থাকবে। ওহে আবদুল্লাহ মিয়া ঝালর দরকার নেই, বুঝেছ? আর ওসব ফ্যাশন-ফুশন হুজুরের আবার পছন্দ নয়। হুজুর চান কাজ।
[দর্জি পকেট থেকে নোট বই বার করে হিসাব করতে থাকে]
দর্জি : লাল শালু তিন গজ আড়াই টাকা করে তিন দু’গুণে ছ’টাকা আর দেড় টাকা, সাড়ে সাত টাকা – স্যাটিন হলো গে – তুলো হলো গে – সব মিলিয়ে সোয়া সাতাশ টাকা। তবে হুজুরের কাজ যখন, পাইগ-া আর ধরব না। সাতাশ টাকাই সই। (নায়েবকে) তাহলে –
নায়েব : আবার তাহলে কী? হুজুরের কাজ – সে টাকার জন্য ভাবনা কেন হে? কাজ কর, দেখি, তারপর তো।
দর্জি : হুজুরের কাজ বলেই যত ভাবনা। তাহলে নায়েব মশায় চলি। চলি হুজুর, সেলাম।
দর্জির প্রস্থান।
ইয়াকুব : ওর স্বভাবটা আমার পছন্দ হলো না নায়েব। বড় বেশি কথা বলে – একটু সাবধান করে দিও।
নায়েব : হুজুর কদমপুরের খাজনাটা –
ইয়াকুব : আদায় কত?
নায়েব : খাজনা চাইতে গেলেই প্রজারা বলে –
ইয়াকুব : প্রজারা কী বলে সে কথা শুনে কাজ নেই। আমি কী বলি সেটা প্রজাদের বলেছ?
নায়েব : বলেছি হুজুর –
ইয়াকুব : তারপর?
নায়েব : বলে, টাকার কি গাছ দিয়েছি?
ইয়াকুব : বুঝেছি, থাম। ভেবেছিলাম আদায়ের কাজটা তোমার ওপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হব। নাঃ কিছু হবে না তোমাকে দিয়ে।
নায়েব : (ভেবে নিয়ে) হুজুর –
ইয়াকুব : আবার কী বলবে?
নায়েব : একটা বুুদ্ধি মাথায় এসেছে হুজুর। ব্যাটাদের আচ্ছা জব্দ করা যায়। গেলেই টাকা নেই। হুজুর গাঁয়ের শক্ত-সমর্থ লোক সবাই শহরে কাজ করে। মাসে মাসে তারা টাকা পাঠায় –
ইয়াকুব : তাতে তোমার খাজনা আদায় হবে?
নায়েব : হবে হুজুর হবে। এই কার কার নামে টাকা এলো – সেটা হুজুর – মানে কি পোস্টম্যানকে কিছু দিয়ে নামটা সহজেই জানা যায়। তারপর লিস্টি মিলিয়ে পাকড়াও করলে –
ইয়াকুব : তা মন্দ বলোনি, তা মন্দ বলনি। তা হলে দেখ কপাল ঠুকে –
নায়েব : হে-হে-হে। তা আর বলতে হবে না। আমি কাল থেকেই – আরে হেড মাস্টার সাহেব যে, আসুন আসুন।
মনসুরের প্রবেশ।
মনসুর : আদাব স্যার। দাও দাও হে নায়েব পাখাটা দাও। রোদটা মাথায় করে এসেছি। আঃ তবু শান্তি। স্যারের ঘরটা বেশ ঠান্ডা। প্রাণটা জুড়িয়ে যায়।
ইয়াকুব : মতলবটা কী শুনি?
মনসুর : মতলব – স্যার?
ইয়াকুব : হ্যাঁ হে হ্যাঁ। মতলব না থাকলে তোমার মুখে কোনোদিন খই ফোটে? তা কী মনে করে –
মনসুর : কী বলছেন স্যার? আপনার নুন-নেমক খাই। মতলব ছাড়া কি আসতে পারি না? ছেলে পড়ানো চাকরি, ফুরসত কই? ভাবলাম যাই, একবার স্যারের কাছে দর্শন দিয়ে আসি।
ইয়াকুব : আসল কাজটার কতদূর?
মনসুর : স্যার (নায়েবের দিকে চেয়ে আমতা আমতা করে) বলছিলাম কী স্যারের খাস কামরায় –
ইয়াকুব : কথাটা গোপনে বলবে এই তো? তা নায়েব, তুমি বরং কদমপুরের খাজনার হিসাবটা মেলাও।
নায়েব : হুজুর সে আর আপনাকে বলতে হবে না। হিসাব মেলানোই আছে। শুধু পাকা খাতায় –
ইয়াকুব : তাই বলে তুমি যে এখানেই জেঁকে বসলে হে! যাও তো যাও। মুহুরির ঘরে বসে মাথা ঠান্ডা করে হিসাবগুলো দেখ। আমি ততক্ষণে –
নায়েবের প্রস্থান।
ইয়াকুব : হুঁ, এবার কাজের কথায় এস মাস্টার।
মনসুর : স্যার, অর্ধেক ছেলেরই বেতন বাকি। ফাইনের ভয় দেখিয়ে আদায় করেছি। তা স্যার, যা ইকোনমিক ক্রাইসিস –
ইয়াকুব : ওসব হক্কি-চক্কি রাখ। সবসুদ্ধ হলো কত?
মনসুর : দুশো তিরাশি টাকা সাত –
ইয়াকুব : বাস বাস, পাই-গ-ার হিসাব কে চাইছে। এনেছ কই দাও।
মনসুর : এই – এই স্যার –
টাকা-থলি হাতে তুলে দেয়।
ইয়াকুব : স্কুলের হিসাবের খাতাপত্র ঠিক রেখেছ তো?
মনসুর : তা আর বলতে স্যার। আয় নেই এক পয়সা। সব ব্যয়। এই যেমন ধরুন না স্যার – স্কুল মেরামত, ফ্রি স্টাইপেন্ডশিপ, সাজ-সরঞ্জাম কেনা – তা স্যার, সে-দিক দিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। হিসাব একদম পাকা।
ইয়াকুব : হুঁ – ।
নায়েব : কদমপুরের খাজনাটা একেবারে তৈরি। হুজুর যদি একবার চোখ বুলিয়ে নেন।
ইয়াকুব : (হঠাৎ সুর পালটে) হ্যাঁ কী বলছিলে মাস্টার কাল যেতে হবে তোমাদের সভায় – না? না গেলে চলবে না?
মনসুর : (কথাটার আঁচ করতে না পেরে) সভা কিসের সভা –
ইয়াকুব : (চোখ টিপল) তুমি একটা আস্ত গবেট, গাধা –
মনসুর : ও হ্যাঁ হ্যাঁ। মনে পড়েছে সভা – সভাই তো বটে। হ্যাঁ স্যার, আপনাকে প্রেজেন্ট থাকতেই হবে। ছেলেরা আপনাকে মালা দিতে চায়। বড় আশা করে আছে। আপনি না গেলে যে স্যার ওদের বুক ভেঙে যাবে।
ইয়াকুব : কী যে ঝঞ্ঝাট বাধাও মাস্টার। আমার আবার সময় কই। তবে ছেলেরা যখন অত করে বলছে – কী বল নায়েব?
নায়েব : তা হুজুর, ছেলেরা আপনাকে দেখতে চায় – আপনি না গেলে চলবে কেমন করে? আর হাজার হলেও এ তো আপনারই স্কুল। এই স্কুলের জন্য হুজুরের ত্যাগের সীমা নেই। সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে হুজুর আজ রিক্তহস্ত, নিঃস্ব –
মনসুর : তাহলে আমি বরং উঠি স্যার –
ইয়াকুব : হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি বরং এসো (মনসুরের প্রস্থান) শোন নায়েব, এই টাকা ক’টা ক্যাশে তুলে রেখে দাও তো।
নায়েব : হুজুর আজ আবার আদায় হলো কখন?
ইয়াকুব : আঃ থামো নায়েব। সব ব্যাপারে নাক গলানো পছন্দ করি না। যা বলি তাই কর।
নায়েব : যেমন ইচ্ছে হুজুরের।
[টাকা নিয়ে নায়েবের প্রস্থান। বাইরে কিছু চ্যাঁচামিচি শোনা যাবে]
ইয়াকুব : আঃ কে আছিস?
চাকরের প্রবেশ।
চাকর : হুজুর।
ইয়াকুব : গোলমাল কিসের?
চাকর : আমি বলেছি হুজুর কারও সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না। তবু কী আস্পর্দা! বলে, দেখা না করে এক পা নড়ব না।
ইয়াকুব : বটে – পাঠিয়ে দেতো – এত তেজ কার দেখি।
[মজিদ ও কলিমের প্রবেশ]
মজিদ ও
কলিম : আদাব হুজুর –
ইয়াকুব : কী চাই?
মজিদ : বড় বিপদে পড়ে –
কলিম : বিপদে না পড়লে এ সময় হুজুরকে বিরক্ত করতাম না।
ইয়াকুব : কিন্তু তোমাদের তো –
মজিদ : আমরা আপনারাই স্কুলের মাস্টার।
ইয়াকুব : ও আচ্ছা – হ্যাঁ হ্যাঁ, তা মনে পড়েছে। তা আমার কাছে কী দরকার?
কলিম : হুজুর আমাদের মাইনে বাকি। আড়াই মাস থেকে একটা পয়সার নাম-গন্ধ নেই।
মজিদ : মাসের দশ তারিখ। ছেলেপুলের সংসার, সবে তো কটি টাকা। সময়মতো না পেলে –
কলিম : হুজুর স্কুলের গরিব মাস্টারদের ওপর একটু কৃপা না করলে আমরা যাই কোথায়?
ইয়াকুব : দেখ মাস্টাররা তাহলে খুলেই বলি। প্যাঁচের কথা আমার ভালো লাগে না। স্কুল করেছি বলে কি মাথা বেচে দিয়েছি।
কলিম : হুজুর স্কুল না করলে গরিবের ছেলেপুলেরা যে উচ্ছন্নে যেত –
ইয়াকুব : তাই যেত, সেটাই ভালো ছিল। খাল কেটে কুমির এনেছি। আরে আমাকে কী শেখাবে মাস্টার! এই চাষাভুষোর ছেলেরা দু’কলম পড়ে আজ বাদে কাল চোখ রাঙাতে আসবে, সে আর আমি জানি না – খুব জানি।
কলিম : হুজুর টাকার এক পিঠ দেখলে চলবে কেন। উলটো পিঠটাও দেখা চাই।
মজিদ : কিন্তু আপনি যদি দয়া না করেন তাহলে যে আমাদের পথে বসতে হবে।
ইয়াকুব : দয়া, দয়া, এটা কী দানছত্র! আরে মাইনে বাকি – আদায় না হলে কী ঘরের পয়সা এনে তোমাদের উদর ভরতে হবে। এই তো হেডমাস্টারের মুখে শুনলাম, ছেলেরা ঠিকমতো মাইনে দিচ্ছে না। স্কুলের যা আয় সে তো স্কুলেই থাকছে। আমি তো আর এক পয়সা নিচ্ছি না।
কলিম : না হুজুর, সে কথা কি আমরা বলেছি।
ইয়াকুব : ওদিকে খাজনার আদায় ভালো নয়, ওরে কে আছিস?
চাকরের প্রবেশ।
চাকর : হুজুর –
ইয়াকুব : নায়েবকে খবর পাঠা।
চাকরের প্রস্থান ও নায়েবের প্রবেশ।
নায়েব : আমাকে ডেকেছেন হুজুর?
ইয়াকুব : হ্যাঁ, শোন নায়েব – এরা বলছে ওদের নাকি ভারী কষ্ট। সংসার চলে না। বিশটা করে টাকা দিয়ে দাও বুঝেছ। আর শোন, বিকেলে একটু তহশিলে যাব। গাড়ি তৈরি রাখতে বলে দিও।
নায়েব : হ্যাঁ হুজুর, গাড়ি ঠিক তৈরি থাকবে।
কলিম : কিন্তু হুজুর, আমাদের যে আড়াই মাসের মাইনে –
ইয়াকুবের প্রস্থান। কলিম ও মজিদ সেলাম করল। ইয়াকুব সেদিকে নজর দেয় না।
নায়েব : কত! পুরো বিশ টাকাই নেবে? আহা হ্যাঁ, জিজ্ঞেস করছি বলে কি ভাবছ, দেব না? দেব দেব, পুরো বিশ টাকাই দেব।
কলিম : কিন্তু বিশ টাকায় কী হয় নায়েব সাহেব?
নায়েব : কী হয় তার আমি কী জানি। গাঁজা হতে পারে আফিং – হ্যাঁ – হ্যাঁ – হওয়াতে জানলে কত কিছু হয় মাস্টার। এ্যাঁ – এই নাও। (কলিম ও মজিদ টাকা নিল) থাম থাম, দাও দাও। টাকাগুলো দাও তো দেখি। (টাকা ফেরত দিলো) আমিও যেমন, আস্ত নোট দিয়ে কী করবে। উচ্ছে আর চিংড়ি বাজার করবে, তা আস্ত নোট কেন? তার চেয়ে ভাঙা টাকাই নাও, এ্যাঁ।
মজিদ : তাই দাও।
নায়েব : এ্যাঁ, এই সতেরো-আঠারো-উনিশ, আহ্-হা আর গুনছো কি! উনিশ টাকা।
কলিম : উনিশ টাকা?
নায়েব : হ্যাঁ, উনিশ টাকা। এক টাকা কমিশন, এমনিতে তো এক পাই বকশিশ দেবে না। তাইতে এক টাকা কমিশন।
মজিদ : কমিশন?
নায়েব : হ্যাঁ, কমিশন ওটা দিতেই হয়।
কলিম : ওটা দিতেই হয়?
নায়েব : হ্যাঁ, ওটা দিতেই হয়।
মজিদ : আচ্ছা বেশ, চলো কলিম ভায়া –
কলিম : চলো।

    [পর্দা পড়বে অথবা আলো স্তিমিত হবে]

তৃতীয় দৃশ্য

মজিদ মাস্টারের বাড়ি। সামান্য পুনর্বিন্যাস করে প্রথম দৃশ্যের পরিকল্পনায় ফিরে যেতে হবে। টেবিল আগের মতোই থাকবে এক ধারে। খাটের চাদর বদলে যাবে। খাটে বসে মরিয়ম কী একটা সেলাই করে। বাইরে থেকে দৌড়ে পারুর প্রবেশ।
পারু : মা, মা –
মরিয়ম : কিরে কী? উঃ কী দস্যি মেয়ে রে বাবা, আর একটু হলেই সুঁই ফুটতো হাতে – কী হয়েছে?
পারু : কে যেন আসছে –
মরিয়ম : কে আসছে আবার। [সুটকেস হাতে কামালের প্রবেশ] ওমা, কামাল তুমি! (কামাল মরিয়মকে সালাম করে) থাক থাক বাবা, এমনিতেই বেঁচে থাক। এদিকে দেখ তোমার বোনের কা-। এসে বলছে, মা কে যেন আসছে। বসো বাবা বসো। (কামাল বসে) আর ওরই বা দোষ কী বাবা, ভুল করেও গরিব মামার একটু খোঁজ নাও না।
কামাল : কী যে বলেন মামীমা। কতবারই আসি আসি ভেবেছি – তা পড়াশোনার ঝামেলায় ছুটি পেলে তো ছাই।
মরিয়ম : তা ভালো আছ তো বাবা?
কামাল : জি, এই আছি আপনাদের দোয়ায় একরকম।
মরিয়ম : তা হঠাৎ কী মনে করে?
কামাল : হ্যাঁ, হঠাৎই বটে। আর কি! চাকরির ফিকির – (পারুলকে দেখে) কই এসো তো, কী নাম তোমার শুনি। (পারু মায়ের কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায়) সেই কবে এতটুকু দেখেছি –
মরিয়ম : যা না – নিজের লোক দেখলে তোমার যত লজ্জা। পাড়া ঘুরে বেড়াতে বলো, এক্ষুনি ছুটবে (পারু আরও লাজ্জা পায়) যা তো পারু লালুকে স্যুটকেসটা নিয়ে যেতে বল। আর শোন –
পারুর কানে কানে কী যেন বলে। পারু বয়স্কা মহিলার ভঙ্গিতে হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে বেরিয়ে যায়।
কামাল : মামা কই?
মরিয়ম : ওঁর কথা আর বলো না। সারাদিন তো স্কুলের ফিকির, কী জানি, হবে কোথাও। না তাস পিটতে গেল কে জানে। ইয়ার বন্ধু তো আর কম নেই। (পারু এসে মরিয়মের কানে কানে কী বলে) তা বাবা তুমি বসো আমি ওদিকটা একটু দেখি।
মরিয়মের প্রস্থান। মরিয়মের পেছনে পেছনে পারু বেরিয়ে যাচ্ছিল। কামাল তাকে ডাকে।
কামাল : এই শোন শোন – (কামাল উঠে গিয়ে পারুকে ধরে নিজের কাছে টেনে নেয়) কী নাম তোমার? বলো, বলো, নাম কী – হ্যাঁ?
পারু : আপনার নাম কী?
কামাল : আমার নাম? আমার নাম ওই তো মামীমার মুখে শুনলে না, ওইটেই আমার নাম। এবার বলো দেখি, তোমার নাম কী?
পারু : ওই তো ওই যে মার মুখে শুনলেন না – ওইটাই আমার নাম।
কামাল : আরে, তুমি যে আমাকে কথার প্যাঁচে হারিয়ে দিলে। তোমার তো খুব বুদ্ধি আছে।
পারু : আমাদের বাসায় কারও বুদ্ধি নেই।
কামাল : কে বলেছে নেই?
পারু : আপা বলে আমার বুদ্ধি নেই, ভাইয়া বলে আপনার বুদ্ধি নেই, বাবা বলে ভাইয়ার বুদ্ধি নেই, আর মা বলে বাবার বুদ্ধি নেই।
কামাল : না না। আর কারও বুদ্ধি থাক আর না থাক, তোমার আছে। খুব আছে।
পারু : সত্যি?
কামাল : সত্যি।
পারু : তাহলে আপা কেন বলে –
কামাল : তোমার আপা মিছে কথা বলে, সে ভারী দুষ্টু।
পারু : (হঠাৎ বয়স্কা মহিলার ভঙ্গিতে) তাহলে বলি শুনুন। আপা আমাকে ফটো দেখতে দেয় না।
কামাল : কিসের ফটো?
পারু : ফটো আবার কিসের! ফটো চেনেন না?
কামাল : হ্যাঁ হ্যাঁ, চিনি – বলো –
পারু : মাকে বলবেন না তো –
কামাল : না না, বলো –
পারু : আপার স্যুটকেসে না একটা ফটো আছে – খাতার ভেতর লুকিয়ে রেখেছে – আপা করে কী সেইটে বারবার দেখে – আমি দেখতে চাইলেই বলে, যা-না এখান থেকে।
কামাল : তোমার আপার ফটো?
পারু : দূর, আপার ফটো কেন হবে? একটা লোকের।
কামাল : কার?
পারু : কার, আমি তা কী জানি? (হঠাৎ কামালের মুখের দিকে চোখ পড়তেই ভালো করে দেখে নিয়ে) হ্যাঁ ঠিক আপনার মতো – এইখানটায় ঠিক একই রকম আর এই যে –
রানু : (নেপথ্যে) পারু। (পারু জিভ কেটে ঠোঁটে আঙুল দেয়) এই পারু শোন না।
পারু : কী?
রানু : (নেপথ্যে) এই চা-টা নিয়ে যা না।
পারু : কেন, আমি কেন? তোমার বুঝি হাত নেই?
রানু : (নেপথ্যে) দেখ পারু, যা বলছি শোন – নইলে কিন্তু এক্ষুনি –
কামাল : হয়েছে হয়েছে। ঝগড়া নয়, ঝগড়া নয়। দাঁড়াও ওখানটায় দাঁড়াও। আমি চোখ বুঁজে চায়ের কাপটা নিয়েই সরে পড়ব।
[চায়ের কাপ হাতে রানুর প্রবেশ]
রানু : কোথায় যে রাখি – যা না পারু ছোট টেবিলটা নিয়ে আয়।
কামাল : টেবিল? টেবিল কী হবে? এত বড় বড় দুটো হাত রয়েছে, আবার টেবিল কেন? ওঃ আমিও যেমন – লজ্জায় তুমি যে চোখ বুঁজে আছ সেটাও দেখিনি। হাত যে আছে, না দেখে তা বুঝবেই বা কেমন করে?
কামাল চা নিল।
পারু : ইস্, ও আবার লজ্জা করে নাকি। ওটা ঢং।
রানু : চুপ! বড় কথা শিখেছ, না?
মরিয়ম : (নেপথ্যে) পারু –
পারু : যাই মা।
পারুর প্রস্থান।
কামাল : (ঘুরে বসে) তাহলে আমি কী নীরব দর্শক হয়েই থাকব? বেশ –
রানু : বা রে, কী আবার বলব?
কামাল : বেশ আরম্ভটা আমিই করি। (চায়ে চুমুক দিয়ে) তা চা’টা মন্দ তৈরি করোনি।
রানু : আমার তৈরি করতে বয়ে গেছে।
কামাল : বটে, তা তাই বলে দাঁড়িয়েই থাকবে নাকি। বসো – চেয়ারটা দূরে সরিয়ে নিয়েই বসো না হয়।
রানু : উঃ বাবা রে বাবা, বসছি, কী বলবে বলো, আমার যেন আর কাজ নেই।
কামাল : কেন এ কাজটা কী অপছন্দ?
রানু : কোনটা?
কামাল : এই আমার সঙ্গে বসে দুদ- কথা বলা? কেমন আছ শুনি। ইস কতদিন পরে দেখছি তোমাকে।
রানু : কতই না মনে পড়ে –
কামাল : কী করি বলো। পড়াশুনোর হাঙ্গামায় সময় পেলাম কই? তবু যা, ভালোয় ভালোয় পরীক্ষাটা চুকলো।
রানু : তারপর?
কামাল : তারপর!
তারপর এলো গণৎকার
গণনায় রাজা চমৎকার
টাকা ঝনঝন ঝনৎকার
বাজায়ে সে গেল চলে।
রানু : হয়েছে, ওসব কবিতা রাখ।
কামাল : বেশ কবিতা থাক – গদ্যেই আসা যাক। একটা কথা বলি?
রানু : কী কথা?
কামাল : রাগ করবে না তো?
রানু : শুনি তো আগে –
কামাল : দুলজোড়া বড় মানিয়েছে –
রানু : না হলে বলে পুরুষজাত! মিছে কথা বলার ওস্তাদ। দুল না থাকলে শাড়িখানা মানাতো। শাড়ি না হলে খোঁপার ফুল – নইলে নইলে –
কামাল : নইলে কী বলো না?
রানু : চা’টা কি পড়েই থাকবে?
কামাল : থাক না –
রানু : বেশ তবে থাক। আমি চলি –
কামাল : খবরদার, চলি মানে! তাহলে এখুনি বেডিং নিয়ে পগারপার।
রানু : ইস, কথা শোন – যেন আমার জন্যই এসেছেন।
কামাল : যদি বলি তাই –
রানু : তাহলে বলব বানানো কথা – ডাহা মিথ্যে।
কামাল : শোনো রানু মিথ্যে যে দু-চারটে বলি না তা নয়। যেমন দুলজোড়া সত্যি মানায়নি তোমাকে – সেটা মিথ্যে। কিন্তু একটা সত্যি কথাও আছে। সেটা তোমাকে বলিনি।
রানু : বলো তাহলে –
কামাল : বলব?
কামাল : অনেক বছর আগে যে-কথাটা বলেছিলাম একদিন – মনে আছে? সেটা কিন্তু সত্যি।
রানু : সত্যি না হাতি।
কামাল : সব কথাই অমন করে উড়িয়ে দাও কেন রানু? কত কল্পনা করেছি। কত সব হিজিবিজি কথা সে সব। চাকরিটা যদি হয়ে যায় –
রানু : তবে কী –
কামাল : তবে, তোমার কানের ওই দুলজোড়া বদলে দেব। বাসন্তী রঙের শাড়ি কিনে দিয়ে কাছে এনে বসাব। খোঁপায় বকুল ফুলের মালা জড়িয়ে দিয়ে তোমাকে দেখব। আর কেউ না – ছোট্ট একটা সংসার – কেবলই দুজন।
রানু : আমি চলি, কত কাজ পড়ে আছে।
কামাল : একটু বসো না।
রানু : মাথায় একটু বুদ্ধি থাকলে তো – কী ভাববে মা বলো তো। যাই, এ্যাঁ?
[রানুর প্রস্থান। কামাল একটা বই নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে। মরিয়মের প্রবেশ।]
মরিয়ম : তা হাত-মুখ ধোবে না বাবা!
কামাল : হবে ক্ষণ তাড়াহুড়ো কিসের।
মরিয়ম : কী চাকরি নিয়ে এলে?
কামাল : ও, সে কথা তো বলিনি। চাকরি তেমন কিছু নয়, মাস্টারি। হাত গুটিয়ে বসে থাকার চাইতে দুটো পয়সা পেলে মন্দ কী?
মরিয়ম : তা ঠিকই – বলেছ। আমার আমিনটার যদি সুবুদ্ধি হতো!
কামাল : ও কোথায়, ওকে দেখলাম না তো?
মরিয়ম : কী জানি কোথায়? বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে তো?
[আমিনের প্রবেশ]
কামাল : আরে এসো, এসো – তোমার কথাই বলছিলাম।
আমিন : তুমি কোত্থেকে?
কামাল : বসো, বসো –
আমিন : না বসব না, সময় নেই। তা কী করো আজকাল?
কামাল : সবে তো পরীক্ষা চুকলো।
আমিন : আছ বেশ। পাশ-টাশ দিলে। আমার তো এসব ধাতে পোষাল না। আচ্ছা –
আমিনের প্রস্থান।
মরিয়ম : শুনলে তো বাবা –
কামাল : ও তো ছাত্র খুব ভালো ছিল। আজকাল পড়াশোনা করে না নাকি?
মরিয়ম : আড্ডা দিয়েই সময় পায় না, আর পড়বে কখন? তা বাবা, কোন স্কুলে চাকরি নিয়ে এলে?
কামাল : মডার্ন হাইস্কুলে।
মরিয়ম : তোমার মামা তো ওখানেই।
কামাল : কেন, উনি আনন্দময়ী স্কুলে –
মরিয়ম : সে চাকরি কবে ছেড়েছেন।
কামাল : ভালোই হলো – মামা-ভাগ্নে একসঙ্গেই মাস্টারি করা যাবে।
মরিয়ম : স্কুল না আর কিছু। তোমার মামার আড়াই মাসের মাইনে বাকি – আজ তো গেছে সেক্রেটারির বাসায়। কী হবে কে জানে।
কামাল : তাই নাকি? কাগজে তো বিজ্ঞাপন দিয়েছে দেড়শ টাকা বেতন। আর কি-ই বা করি মামীমা, চাকরি একটা করতেই হবে – ভালো আর মন্দ। নইলে বসে বসে খাওয়াবে কে?
মরিয়ম : তা তো সত্যি কথা বাবা।
লালুর প্রবেশ।
লালু : দ্যাহেন দুইজনে কী শুরু করছে।
মরিয়ম : কী হয়েছে রে?
লালু : লাগাইছে মারামারি।
স্যুটকেসটা নিয়ে লালুর প্রস্থান।
মরিয়ম : তোমার বোনদের কা-। হতচ্ছাড়িদের জ্বালায় যদি কোথাও স্থির হয়ে বসতে পারি। দেখি আবার চুলোচুলি লেগেছে বোধহয় –
মরিয়মের প্রস্থান। খেলার পোশাক পরে আমিনের প্রবেশ।
কামাল : কোথায় চললে –
আমিন : আজ যে মোমিন মেমোরিয়াল শিল্ডের ফাইনাল খেলা। যাবে নাকি হে, ভালো ছেলে?
কামাল : এই এলাম – তায় আবার ট্রেনজার্নি।
আমিন : ভালো, ভালো। তোমরা ননীর পুতুল। তোমাদের কি ওসব সাজে। আচ্ছা, তাহলে নাক ডাকিয়ে ঘুমোও তুমি। আর শোনো –
কামাল : এ্যাঁ –
আমিন : পার তো একটু ক্যাস্টর অয়েল খেয়ে নিও বুঝেছ?
[পর্দা পড়বে অথবা আলো স্তিমিত হবে]

চতুর্থ দৃশ্য

খাট সরিয়ে নিয়ে পূর্ব দৃশ্যের সামান্য পুনর্বিন্যাস করে স্কুলঘর দেখাতে হবে। হেডমাস্টারের কামরা। দেয়ালে মানচিত্র, ক্যালেন্ডার ও টেবিলে কিছু খাতা-পত্র ইত্যাদি। মজিদ ও কলিমের প্রবেশ।
মনসুর : কী ব্যাপার বলুন তো। একমাস হতে চলল, খাতা দেখা শেষ হলো না?
মজিদ : স্কুলের এ খাটুনির পর কাহাতক আর পারা যায়। ইচ্ছে করে যে ফেলে রাখিনি, সে তো আপনি ভালো করেই জানেন।
মনসুর : আমি কী জানি কী জানি না, সে কথা তুলে লাভ আছে? জানি তো অনেক কিছু – নাড়ি-নক্ষত্র সব কিছু জনি। ঘোড়া ডিঙিয়ে কে কোথায় ঘাস খায় সে খবরও আমার জানা। ওসব ঘেঁটে কাজ নেই।
কলিম : কাছাকাছি ঘাস পাওয়া গেলে কেউ কী আর ঘোড়া ডিঙ্গোতে যায়!
মনসুর : আমারই হয়েছে ভুল। লাটাইয়ের সুতো ছেড়ে দিয়েছি – এখন ভুগতেই হবে। আগে থেকে স্ট্রিক্ট হলে ক্যালাসনেস হতো না।
কলিম : স্ট্রিক্ট তো আমাদেরও হওয়া উচিত। আড়াই মাসের মাইনে বাকি।
মনসুর : ওই এক কথা। আরে বাকি সে কী আমি অস্বীকার করেছি – কষ্ট কী আর আমার হচ্ছে না? কিন্তু তাই বলে সেক্রেটারির বাসায় ধরনা দিয়ে এর বিরুদ্ধে ওর বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে! ভাবছেন মনসুর সোজা লোক, ভাজা মাছটি উলটো করে খেতে জানে না। আরে, মতলব আমি জানি না? মনসুরকে তাড়াও, আমাদের পথটা পরিষ্কার হোক – এই তো?
মজিদ : আপনি অন্যায় সন্দেহ করছেন। আমরা শুধু বেতনের কথা –
মনসুর : ন্যায্য কথা বললেই সেটা অন্যায়! সতেরো বছর এই করে করে চুল পাকালাম। কার ভেতর কী আছে সেটা ঠিক বলে দিতে পারি।
কলিম : নিঃসন্দেহে আপনি অভিজ্ঞ লোক।
মনসুর : দেখুন কলিম সাহেব, আমার একটু বিশেষ কথা আছে ওঁর সঙ্গে, আপনি –
কলিম : বাইরে যেতে হবে? আচ্ছা বেশ –
কলিমের প্রস্থান
মনসুর : মজিদ সাহেব, কাজের কথায় আসা যাক। সেক্রেটারির বাসায় ধরনা দিয়ে টাকা নিয়েছেন, বেশ করেছেন। স্কুলের মান-ইজ্জত যেটুকু ছিল সেটুকু তো গেলই – তার জন্যও আমি কিছু বলি না। আর আমার বিরুদ্ধে উসকানি, তার পরওয়া আমি করি না।
মজিদ : বিশ্বাস করুন, আপনার বিরুদ্ধে একটা কথাও উচ্চারণ করিনি –
মনসুর : রাখুন রাখুন, আর ভেজা বেড়ালটি সাজতে হবে না। সব খবর পাই, সব খবর পাই। আরে চাকরি – চাকরির পরওয়া কী আমি করি। নিছক স্কুলের জন্য মমতা জন্মে গেছে তাই।
মজিদ : সে তো বটেই।
মনসুর : দেখুন মজিদ সাহেব আপনাকেও দোষ দিয়ে লাভ নেই। আপনার যা বয়েস তাতে –
মজিদ : সে সবই কপালের লিখন। যদ্দিন আছি ঘানি টানতেই হবে।
মনসুর : না না, টানতে হবে না, টানতে হবে না। সে ব্যবস্থাই আমি করেছি –
মজিদ : সে আপনার দয়া।
মনসুর : আপনাকে আর আমাদের দরকার নেই।
মজিদ : (যেন আকাশ থেকে পড়ে) দরকার নেই?
মনসুর : না।
মজিদ : আমাকে দরকার নেই!
মনসুর : আমি কলিমকেও জবাব দিতাম। কিন্তু ওকে আমার দরকার। ওর বয়স কম, উদ্যমী – ভাবছি এ যাত্রা ওয়ার্নিং দিয়ে ছেড়ে দেব। যে জঘন্য কাজ আপনারা করেছেন আর তুলনা হয় না।
মজিদ : আমি খাতাগুলো কালই দেখে নিয়ে দেব।
মনসুর : না না, ওগুলো আর দেখে দিতে হবে না – আর দেখে দিতে হবে না। খাতা পাঠিয়ে দেবেন। আর কেউ দেখে দেখবেক্ষণ।
মজিদ : কথাটা তখন ঠিক বলিনি। এমনিই বলছিলাম। আসলে কি-ই আর কাজ – কী আর ক্লান্তি – স্কুলের সময়ের পরও বেশ তো সময় পাই। খাতাগুলো আজই দেখা শেষ হয়ে যাবে।
মনসুর : কী সব বাজে বকছেন। আপনাকে আর চাকরি করতে হবে না।
মজিদ : আমার অপরাধ?
মনসুর : আপনার মতো অথর্ব অশ্বত্থ গাছ জিইয়ে রেখে কোনো লাভ আছে? শুধু লোকসান। আমি নতুন চারা লাগাব। পুরনো অকর্মণ্য লোক নিয়ে আমার চলবে না। এটা চ্যারিটেবল্ ডিসপেন্সারি নয় – স্কুল, বুঝলেন?
মজিদ : দেখুন আমার বিরাট সংসার – ছেলে, মেয়ে, বউ। আমি বেকার হলে ওদের যে পথে বসতে হবে। ছেলেটা – ছেলেটাও মানুষ হয়নি। আপনি বোধহয় এসব জানেন না – মানে আমার পরিবারিক সব সমস্যার কথা। কেমন করে জানবেন? আমিও কী আর কোনদিন বলেছি।
মনসুর : জানি আপনি বিবাহিত। আপনি এক পুত্র ও দুই কন্যার পিতা। সেজন্য আমি দুঃখিত।
মজিদ : আমি কি একেবারেই পড়াতে পারি না?
মনসুর : এখনো কিছু কিছু পারেন – কদিন পর আর পারবেন না।
মজিদ : আপনি সবই জানেন মনসুর সাহেব। এ বয়সে আমি কী করব – কোথায় যাব? ভিক্ষে করব? কেমন করে করতে হয় তাও জানি না। আপনি দয়া করুন। দেখুন মাইনে কমিয়ে – খুব কমিয়েও কি আমাকে রাখা যায় না?
মনসুর : আপনি বৃথা বিরক্ত করছেন। ব্যাপারটা বোঝাপড়া শেষ হয়ে গেছে। অর্ডারের ওপর সেক্রেটারির সিগনেচার হয়ে গেছে। আর তাছাড়া আমরা আজই নতুন লোকের ইন্টারভিউ নিচ্ছি।
ইয়াকুব ও নায়েবের প্রবেশ।
মনসুর : আরে আরে কী সৌভাগ্য! স্যার আপনি। তা একবার খবর পাঠিয়ে দিলে আমি নিজেই যেতাম, এতটা কষ্ট করে –
নায়েব : হেডমাস্টার, স্কুল যে হুজুরের প্রাণ। আজ আদায়ের দিন ছিল। হুজুর তহশিলে গেলেন না – বললেন, ‘নায়েব, টাকাটাই কি সব? ওসব মায়া হে মায়া – ও তো দুদিনের -।’
মনসুর : তাও বলে দিতে হবে, আমি জানি না? তিল তিল করে তাঁর রক্ত দিয়ে গড়া এ স্কুল।
ইয়াকুব : হেডমাস্টার, আমার ইচ্ছে স্কুলটাকে বড় করি, কী বলো?
মনসুর : তা স্যার যা বলেছেন। ছাত্রদের যা অসুবিধে অ্যাকোমোডেশন হচ্ছে না। তা পাশের জমিটায় দুটো চালাঘর তুললে মন্দ হয় না।
ইয়াকুব : আঃ, তুমি ভাবছ শুধু দুটো চালাঘর তুললেই স্কুল বড় হবে? সেরকম বড় নয় মনসুর। আদর্শ আর ঐতিহ্যের দিকে থেকে বড়।
নায়েব : নতুন চালাঘর তুলতে গেলে পয়সা লাগবে সে-ভেবে কিন্তু হুজুর বলেননি।
মনসুর : না না, সে কী কখনো সম্ভব? স্যার আপনি বসুন। আমি ওদিক যাই একটু। মালা দেবার আয়োজনটা –
ইয়াকুব : কী যে সব ঝঞ্ঝাট বাধাও –
মনসুরের প্রস্থান।
মজিদ : হুজুর –
ইয়াকুব : আবার কী?
মজিদ : আমি তো কোনো অন্যায় করিনি হুজুর। আমার চাকরিটা গেলে কী উপায় হবে? হুজুর আপনি যদি একটু দয়া করেন – আমি গরিব মাস্টার – আমার ওপর অবিচার করলে –
ইয়াকুব : দেখ মাস্টার, স্কুলের ব্যাপারে মনসুরের কাজে আমি হস্তক্ষেপ করি না। ও যা করেছে ভালোর জন্যই করেছে।
মজিদ : কিন্তু হুজুর
ইয়াকুব : তুমি তো আচ্ছা বেয়াদপ হে! তোমার চাকরির ফরিয়াদ শুনতে আমি এখানে আসিনি।
মনসুরের প্রবেশ।
মনুসর : আপনি তো আচ্ছা লোক সাহেব, স্পষ্ট বলে দিয়েছি। তারপরও আবার স্যারকে বিরক্ত করা। ভাবছেন ইনিয়ে-বিনিয়ে কথা বলে স্যারের মন ভেজাবেন, না? আমি তো বলেই দিয়েছি – আপনাকে দিয়ে আমার আর চলবে না। মাইনে কড়ি যা বাকি আছে তা আপনাকে চুকিয়ে দেয়া হবে। অবিশ্যি, যা আপনি করেছেন তাতে করে বকেয়া মাইনের কথাও কন্সিডার করা উচিত নয়। তবু আমি ভেবে দেখব –
মজিদ : মনসুর সাহেব, জীবনের সব কিছু থেকে যখন বঞ্চিত হয়েছি – তখন এ সহানুভূতিতেও কাজ নেই। বকেয়া মাইনের জন্য আমি আসব না।
মনসুর : সে আপনার ইচ্ছে। না আসেন ‘পুওর ফান্ডে’ দিয়ে দেব – তবু একটা মহৎ কাজে লাগবে।
[মজিদ চলে যাওয়ার উপক্রম করে]
নায়েব : ওকি মাস্টার উঠছ, হুজুরকে একটা সালাম পর্যন্ত করলে না?
মজিদ : অন্তত ওই একটা কাজ না করে যে বিদায় নিতে পারছি, এটাই একমাত্র সান্ত¡না নায়েব। তোমার হুজুরকে বলো, পনেরোটা বছর শুধু ঘাড় নিচু করেই চলেছি – আর নয়। তোমার হুজুরের তোষামুদের অভাব নেই, লিস্টিতে একজন না-হয় বাদই পড়ল।
মজিদের প্রস্থান।
নায়েব : হুজুর, শুনলেন মাস্টারের লেকচার।
দরজায় মালাহাতে গুটিকয়েক ছেলেকে দেখা যায়।
মনসুর : আয় আয়। স্যারের কাছে আবার লজ্জা কী?
ছেলেদের প্রবেশ। ইয়াকুবকে গলায় মালা দিলে সকলে হাততালি দেয়।
ইয়াকুব : হেডমাস্টার তোমার মনবাঞ্ছা পূর্ণ হোক। এবার তাহলে উঠি।
মনসুর : স্যার, আজ নতুন ক্যান্ডিডেটের ইন্টারভিউ আপনার সামনে নিলে ভালো হতো না?
ইয়াকুব : কিন্তু যা করবে তাড়াতাড়ি – আমার ওদিকে আবার অনেক কাজ।
মনসুর : তা স্যার নতুন লোক। হয়তো পথ চিনতে পারেনি। এক্ষুনি এসে পড়বে। (দরজায় টোকা) কে?
কামাল : মডার্ন হাইস্কুলের সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করতে পারি?
মনসুর : ও আপনি বুঝি নতুন ক্যান্ডিডেট? আসুন, বসুন বসুন। ইনি হলেন স্কুলের সেক্রেটারি – আর সেক্রেটারি বলি কেন – এক কথায় এ স্কুলের সর্বস্ব।
কামাল হাত তুলে সালাম করে।
ইয়াকুব : তা দেখেশুনে মনে হয় একেবারে কাঁচা। এ লাইনে কাজ করেছ কখনো?
কামাল : তা ঠিক স্কুলের কাজ করিনি, তবে ট্যুইশানি করেছি। আর তাছাড়া আমার সম্বন্ধে কিছু জানতে হলে মামা তো রয়েছেন।
মনসুর : আপনার মামা আবার কে?
কামাল : মজিদ সাহেব। কই তাঁকে তো দেখছি না?
নায়েব : ভালো, ভালো। মজিদ মাস্টার গেলো বটে, কিন্তু বংশের রক্ত তো রয়ে গেল। সুচ হয়ে ঢুকল কিন্তু বেরুবে ফাল হয়ে। দেখলেন হুজুর, একেই বলে ভাগ্যের ফের।
কামাল : কী বললেন, মামা কি এ স্কুলে কাজ করবেন না?
মনসুর : চাকরি করতে এসেছেন, না মামার খবর জানতে এসেছেন? আপনার কোয়ালিফিকেশন?
কামাল : এ বছর বি-এ পাশ করেছি। বরাবরই আমার রেকর্ড ভালো। নিু প্রাইমারি থেকে বৃত্তি পেয়ে আসছি।
ইয়াকুব : তা বেশ করেছ, কিন্তু পড়াতে পারবে?
কামাল : সুযোগ দিলে চেষ্টার ত্রুটি করব না।
নায়েব : সবাই ও কথা বলে।
ইয়াকুব কানে কানে হেডমাস্টারকে কিছু বলে।
ইয়াকুব : হ্যাঁ, তোমাকে ট্রাই করতে আপত্তি নেই। তাছাড়া উদ্যমী আর কর্মঠ লোকেরই আমার প্রয়োজন। মাইনে কড়ির ব্যাপারটা মনসুর তুমিই –
মনসুর : সে আমি বুঝিয়ে বলব – তার জন্য চিন্তা করতে হবে না।
ইয়াকুব : তাহলে আমি উঠি।
মনসুর : এক গ্লাস ঠান্ডা সরবত দেব স্যার?
ইয়াকুব : না হে না, আর একদিন হবে। হাতে আমার অনেক কাজ। চলি হে নায়েব –
নায়েব : চলুন হুজুর –
প্রস্থান।
পর্দা পড়বে অথবা আলো স্তিমিত হবে।

পঞ্চম দৃশ্য
পূর্ব দৃশ্যের পুনর্বিন্যাস করে মজিদ মাস্টারের ঘর। টিমটিম করে হ্যারিকেন জ্বলছে। হতাশাপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে বসে মজিদ মাস্টার। সামনের টেবিলে কিছু খাতাপত্র। দু-একটা নিচে পড়ে। এমন সময় মরিয়মের প্রবেশ।
মরিয়ম : ওমা কখন এলে? একটু সাড়াশব্দ নেই, কাউকে ডাকলেই পারতে – বাতিটা জ্বলছে না – (বাতিটা নেড়ে) তেল নেই নাকি?
মজিদ : পারুর মা, থাক, আলো থাক। এমনিতে বেশ লাগছে –
মরিয়ম : কী হলো তোমার! শরীর খারাপ করেনি তো?
মজিদ : (মাথা নাড়ে)
মরিয়ম : তা কাউকে ডেকে নিলে কি এক কাপ চা দিতে পারত না। মেয়েগুলোও এমন।
মজিদ : পারুর মা!
মরিয়ম : কি!
মজিদ : হাতে কি তোমার কাজ?
মরিয়ম : চুলোয় যাক কাজ? (মজিদের পাশে এসে বসে) না, তোমাকে দেখে ভালো মনে হচ্ছে না। সেই বুকের বেদনাটা বাড়েনি তো?
মজিদ : না পারুর মা, এ পোড়ার শরীরে কী আর অসুখ ধরে –
মরিয়ম : যা হাড়ভাঙা খাটুনি। তার ওপর আবার সংসারের এই যন্ত্রণা। দেখো তো কা-, খাতাগুলো সব মাটিতে পড়ে –
[খাতা তুলতে যায়]
মজিদ : আমিন ফিরেছে?
মরিয়ম : অমন সোনার চাঁদ ছেলে কিনা, সন্ধে সন্ধে বাড়ি ফিরবে।
মজিদ : একটা কিছু উপায় বলতে পারো পারুর মা।
মরিয়ম : কিসের উপায়?
মজিদ : না থাক সে কথা। হেঁসেলঘরে বসেই তোমার জীবনটা কাটল, না? জীবনে সুখ-শান্তি কিছুই তো পেলে না। আচ্ছা, পারুর মা তোমার কি কোনো সাধ নেই?
মরিয়ম : কীসব বলছ, সাধ আমার আবার কী – খোদা করুন সব বেঁচে থাক, ছেলেমেয়েরা সব মানুষ হোক। আর কতকাল এমনি হাড়ভাঙা খাটুনি চলবে তোমার। ছেলেটা যদি একটু মানুষ হতো – এতবড় সংসার – [কান্না]
মজিদ : কাঁদছ – এখনই!
মরিয়ম : কী জানি আর পারিনে। সুখ-শান্তি পেলে না একটু – সবই কপাল।
মজিদ : পারুর মা, তবু কিছু বলতে ইচ্ছে হয় না তোমার কোনোদিন?
মরিয়ম : কী আবার?
মজিদ : যদি কিছু বলার থাকে বলে ফেলো পারুর মা। না, না, তুমি গয়না চাইবে না, বিছে-হার চাইবে না – সে আমি জানি। তবু এই ছোট্ট সংসারে একটা-দুটো শান্তির কথা যদি থাকে তো বলো –
মরিয়ম : কী সব বলছ?
মজিদ : সত্যি কথাই তো, কী সব বলছি। এ সংসারে আবার সুখ-শান্তি কি! ভাবছিলাম খবরটা কেমন করে বলি। জানো পারুর মা, কাল থেকে আমার ছুটি।
মরিয়ম : কিসের ছুটি গো –
মজিদ : আমার চাকরিটা চলে গেল পারুর মা।
মরিয়ম : কি! কে এমন সর্বনাশ করল গো! কারো তো তুমি ক্ষতি করোনি। [কান্না]
মজিদ : না, তা করিনি, কারো ক্ষতি করিনি। জানি তুমি কাঁদবে – এ কান্না আমি কোনোদিন থামাতে পারব, সে ভরসাও নেই।
মরিয়ম : তাহলে কী হবে বলো না গো – এ সংসার – এতবড় সংসার –
মজিদ : কী হবে! ওরা বলে আমার বয়স বেশি, আর আমাকে দিয়ে চলবে না। ওদেরই বা কী দোষ। পেতলের পুরনো কলসি, টেপ খেয়ে খেয়ে আর কিছু নেই – সেটা রেখে কী লাভ?
পারুর প্রবেশ।
পারু : বাবা বাবা।
মজিদ : আয় মা, আয়, কাছে আয়। চুলে একটু তেলও পড়েনি।
পারু : বাবা যে কী বলে – রোজ রোজ তেল দেয় নাকি?
মজিদ : দেয় না?
পারু : কখ্খনো না। বাবা একটা কথা শোনো।
মজিদ : বলো মা –
পারু : না বাবা, কানে কানে।
পারু কানের কাছে মুখ আনে।
মজিদ : হ্যাঁ মা হ্যাঁ, তুই বৃত্তি পেলে কোনো দুঃখ থাকবে না। খুব ভালো করে পড়তে হবে তার জন্যে – তবে না ভালো মেয়ে হবি।
মরিয়ম : কত না ভালো মেয়ে হবে। আদর দিয়ে দিয়ে তো সবাই মাথা খেয়েছ।
পারু : যাও না করলে নেই। তোমার আদর আমি চাইও না – বাবা আছে। বাবার কাছে ঘেঁষে আসে।
মরিয়ম : ওই দেখ একটু বললাম, তাতেই ফুলে কলাগাছ। আয় লক্ষ্মীছাড়ি (পারুকে নিজের কাছে টেনে নেয়) চুলের ছিরি দেখ, যেন বনমানুষ।
পারু : আমি বনমানুষ হলে তুমি?
মজিদ : ছি! তর্ক করে না। যাও তো মা, পড়তে বস গে, এ্যাঁ।
পারু : যাই বাবা, হ্যারিকেনটা নিয়ে যাই।
হ্যারিকেন নিতে যায়।
মরিয়ম : দেখ তো। আরেকটু হলেই চিমনিটা ভেঙ্গেছিল আর কী –
হ্যারিকেন নিয়ে পারুর প্রস্থান।
পারু : (নেপথ্যে)
বাবু কহিলেন, ‘বুঝেছ উপেন, এ জমি লইব কিনে।’
কহিলাম আমি, ‘তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই।
আমিনের প্রবেশ।
আমিন : ঘর অন্ধকার যে। কে? ও বাবা।
চলে যাওয়ার উপক্রম।
মরিয়ম : কই যাচ্ছিস?
আমিন : কই আবার, পাশের ঘরে। অন্ধকারে বসে কী করব।
মরিয়ম : আমিন? চিরকাল এমন করে তুমি পাশ কাটিয়ে গেছ। ভাবছ তুমি ধরাছোঁয়ার বাইরে। এদিকে এসো – কথা আছে।
আমিন : তার মানে? আমি আবার কী করলাম, বললাম আলো নেই –
মজিদ : মা পারু, হ্যারিকেনটা দিয়ে যা তো।
হ্যারিকেন রেখে দিয়ে পারুর প্রস্থান।
মরিয়ম : আচ্ছা এ সংসারের প্রতি তোর কি এতটুকু মায়া-দরদ নেই – তুই কী হয়েছিস বল তো?
আমিন : সবার যেমন থাকে আমারও তেমনি আছে। তা বাইরে থেকে এলাম। একটু হাতমুখ ধুয়ে বসি। তারপর না-হয় যা বলার বলো।
মরিয়ম : যা বলার তাই বলছি। রোজ তোকে এ কথা বলতে যাব না। আজ না-হয় তোর নিয়মের একটু ব্যতিক্রমই হলো। আর কেউ তোকে কোনোদিন জোর করে বসতে বলবে না।
আমিন : বেশ বলো।
মজিদ : পারুর মা, ছেলে ঘরে এসেছে। ওকে একটু নিরিবিলি বসতে দাও। আচ্ছা তুমি বরং রান্নাঘরে যাও, আমি কথা বলছি ওর সঙ্গে –
মরিয়মের প্রস্থান।
আমিন : হকি খেলার রেজাল্ট জানো বাবা? তোমাদের স্কুল একদম কাৎ – আরে একটা সেন্টার ফরোয়ার্ড নেই –
মজিদ : ওটা আর আমার স্কুল নয়।
আমিন : কেন? কেন?
মজিদ : তোকে আমি কোনো দিন কোনো কিছু বলিনি বাবা। বলব সে যোগ্যতাও আমার ছিল না। না পেরেছি সময়মতো বই কিনে দিতে, না কলেজের মাইনে দিতে –
আমিন : কই, বইয়ের কথা নিয়ে আমি কিছু বলেছি? সংসারের অভাব – যা মাইনে পাও তা দিয়ে ভদ্রলোকের সংসার চলে!
মজিদ : কিন্তু আজ আর সে সম্বলটুকুও নেই বাবা।
আমিন : তার মানে?
মজিদ : আমি বেকার।
আমিন : চাকরি গেছে?
মজিদ : এতবড় সংসার কী করে চলবে? আমাকে কি পথে দাঁড়াতে বলিস? শোন বাবা, এ সংসারে দুঃখ-কষ্ট তুই কিছু কম পাস্নি – কিন্তু তুই তো জানিস ইচ্ছে করে কেউ তোকে কোনোদিন দুঃখ দেয়নি।
আমিন : হঠাৎ ওসব কথা যে। ও বুঝেছি, আমি এবার রোজগার করি আর সবাই বসে বসে খাক। পষ্টাপষ্টি সে কথা বললেই হয়।
মজিদ : না বাবা আমার জন্যে নয়, এখনো দুটো হাত আছে। কিছু না-হয় গতর খাটিয়ে কি চালাতে পারব না? আমি শুধু বলছিলাম তুই মানুষ হলে সংসারের দুঃখটা ঘুচত –
আমিন : একরাজ্যি মানুষের বোঝা বয়ে বেড়াতে আমি পারব না।
মজিদ : চিরটা কাল ওরা বোঝা হয়ে থাকবে না।
আমিন : চিরকাল তো আর আমিও থাকব না। আমাকে রেহাই দাও তোমরা – আমার মতো করে থাকতে দাও আমাকে।
মজিদ : বেশ, তোর যেমন খুশি তেমনি থাকিস তুই বাবা। কেউ কিছু তোকে বলবে না। কিন্তু রানু, পারু ওদের ভবিষ্যৎটাও তো দেখতে হবে।
আমিন : যার যার ভবিষ্যৎ সে সে দেখবে।
মজিদ : তুই যদি অবুঝ হস্ বাবা।
মরিয়ম : কাকে কী বলছ? বুড়ো বাপ যে খেটে খেটে মরল সে চিন্তা কি আর আছে ওর? বড় হলো ইয়ার বন্ধু –
আমিন : হুঁ, তোমার যেমন কথা। আমাকে কী করতে হবে শুনি। সংসার চালাতে হবে? কেন, কিসের জন্যে – আমার কাছে আবার কার কী দাবি! আমি তো একটা হতচ্ছাড়া নিষ্কর্মা –
মরিয়ম : তাই যেন চিরকাল তুই থাকিস।
মজিদ : পারুর মা, ও না তোমার ছেলে। এমন কথা তুমি বলতে পারলে।
আমিন : চাকরি – অমন চাকরি থেকেই বা কী হয়েছিল কার, যে চলে গেলেই পস্তাতে হবে। আমার জন্য কাউকে ভাবতে হবে না। কপাল তো আগেই পুড়েছি। একটা আস্তানা – সে কোথাও খুঁজে নেব।
মরিয়ম : আর কোনো দায়িত্ব তোর নেই?
আমিন : দায়িত্ব – আমার? না, আমার কোনো দায়িত্ব নেই।
মরিয়ম : মনে রাখিস, কথাটা যেন মনে থাকে। অ্যাদ্দিন বাদে বুঝেছি, পেটে করে সাপ পুষেছিলাম। আমি বেঁচে থাকতে এ বাড়ির কেউ ওর মুখ দেখবে না –
মজিদ : আঃ পারুর মা!
মরিয়ম : তুমি থামো তো। কিসের অত দাপট শুনি! তিল তিল করে সর্বস্ব দিয়ে কী পেলে শুনি? জোগাতে পারলে ছেলের মন? বাপ তো নয়, যেন কেনা চাকর। কী না শুনিয়েছে – শুধু জুতো মারতে বাকি। বাড়িসুদ্ধ না খেয়ে মরবে, তবু ভালো। আমি গলা টিপে এক এক করে মেরে ফেলব। তবু ওর মুখ দেখতে দেব না কাউকে! দূর হ, দুর হ আমার সামনে থেকে। নেমক হারাম – মূর্ছা যায়।
মজিদ : আরে আরে, কী হলো কী হলো। রানু, পারু একটু পানি শিগগির –
আমিন : বাবা, আমি পানি আনছি বাবা –
মজিদ : আমিন তুই!
রানু ও পারুর প্রবেশ।
আমিন : হ্যাঁ বাবা, আমি। বাবা তুমি আমাকে কোনোদিন শাস্তি দাও না কেন? কেন, বাবা কেন?
আমিন ভেঙে পড়ে। মজিদ বুকে টেনে নেয় ছেলেকে। আলো স্তিমিত হয়।

ষষ্ঠ দৃশ্য
একই দৃশ্য : মজিদের বাড়ি। বাজারে থলিহাতে কলিমের প্রবেশ।
মজিদ : এসো – এসো। তোমার কাছে যাব ভেবেছিলাম, ভালোই হলো।
কলিম : কী করি বলো। তুমি যাবার পর আর সে আনন্দও নেই। নতুন সব ছেলে-ছোকরা মাস্টার। ওদের সঙ্গে আড্ডা দিই কী করে বলো। (পারুর প্রবেশ) আরে এই যে মা, এসো তো। (পারু আসতেই ওর হাতে বাজারের থলি তুলে দেয়) এটা মার কাছে দিয়ে এসো তো লক্ষ্মীমণি।
[অর্থপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে পারু মজিদের দিকে তাকায়]
মজিদ : রোজ রোজ কী যে কা- করো।
কলিম : দেখ তো, মেয়ে কথা শোনে না। ভারী দুষ্টু তো। যাও নিয়ে যাও। [পারু থলি তুলতে যায়]
কলিম : না না, তুমি পারবে না। চাকর-টাকর কাউকে –
মজিদ : চাকর – বিদেয় করে দিয়েছি। না দিয়েই বা কী করি, এমনিতেই চলে না।
কলিম : তা ভালোই করেছ। (পারুকে) এসো তো মা দুজনে ধরাধরি করে নিয়ে যাই। আর হ্যাঁ, মাকে বলো দুপুরে এখানেই খাব, কেমন?
পারু : আচ্ছা
[কলিম থলিটা খানিকদূর এগিয়ে দিয়ে আসে]
কলিম : হ্যাঁ, তা যা বলতে এসেছিলাম। এই ইয়ে তুমি একটা আপিল করলে পারতে না?
মজিদ : আপিল, সে আবার কী হবে?
কলিম : কী হবে মানে? চাকরি খতম বললেই খতম হয়ে গেল? কথাটা ম্যানেজিং-কমিটির কানে আসুক, একটা ডিসিশন হবে তো।
মজিদ : তুমিও যেমন, ম্যানিজিং-কমিটি মানে তো নগর আলী। টিম্বার মার্চেন্ট সালামত মিয়া, যার নামে-বেনামের ব্যবসা। আর হলোগে তোমার ওই, কী যেন নামটা –
কলিম : ওসমান শেখ।
মজিদ : ওসমান শেখ, এক নম্বরের ব্ল্যাক মার্কেটিয়ার। এই তো কমিটি। ওসবে কিছু হবে না। সবই এক গোয়ালের গরু।
কলিম : কিন্তু এতবড় অন্যায় করে যাবে আর সেটা হজম করে যাবে – এটা কি মগের মুল্লুক?
মজিদ : কী আর করবে? আমার মতো সাধারণ একজন স্কুলমাস্টার, তার চাকরি যাওয়াটা ন্যায় কী অন্যায়, সে নিয়ে কে মাথা ঘামাবে বলো?
কলিম : তা মিথ্যে বলোনি।
মজিদ : নিজের জন্য ভাবি না। বাকি কটা বছর যেমন করেই হোক কাটবে। ছেলেপুলেদের জন্যই যত ভাবনা।
কলিম : অনেকদিন থেকে একটা কথা বলব বলব ভাবছি। আর তোমাকে বলবই বা কী, অন্ধ তো নই। নিজের চোখেই দেখছি। এমন করে কাঁহাতক চলে। আপনজন মনে করে কখনো যদি একটু-আধটু কিছু করার সুযোগ দাও।
মজিদ : যেন সুযোগের অপেক্ষায় রেখেছ। হরদমই তো করছ। এই ফাটা কপাল নিয়েও বরাত আমার ভালো। নইলে তোমার মতো লোকের দেখা পাব, জন্মেও ভেবেছি! সবাই যখন ফিরিয়ে দেয়, ব্যর্থতায় যখন বুক ভরে ওঠে – জানি, সেই হতাশা আর গ্লানির ভেতর তুমিই শুধু একমাত্র নিশ্চিত আশ্বাস। আচ্ছা, বলো তো কেন – কিসের এত টান?
কলিম : কী ছেলেমানুষের মতো কথা বলছ। তোমরা না থাকলে এই ছন্নছাড়া জীবনের আশ্রয়টাই বা কী ছিল? আমি তো কোনোদিন তোমাদের পর ভাবিনি।
মজিদ : সে জানি কলিম। মুখের ভাষায় না বললে কী আর মনের ভাষাও বুঝি না।
কলিম : যাও যা হয়েছে, আর ভাবনা করে কাজ নেই। তবে আপিলটা করে দেখতে পারতে।
মজিদ : না কলিম! ঘেন্না ধরে গেছে। আর মাস্টারি করব না – তার চেয়ে মুটেগিরিও ভালো। ভাবছি, শহরে গিয়ে একটা কোনো কিছু –
কলিম : আঃ, অত উতলা হচ্ছ কেন? আমরা পাঁচজন আছি – একটা ব্যবস্থা হবে না?
মজিদ : পাঁচজন কেন বলছ। থাকার মধ্যে শুধু ওই একজনই – তুমি।
কলিম : তবু হুট করে শহরে চলে যাওয়াটাই কি ভালো?
মজিদ : যা হয় একটা কিছু করতেই হবে। বাড়িতে তো আর সাত রাজার ধন নেই, বসে বসে খাবো। শহরে গেলে কিছু একটা হবেই –
কলিম : দেখো। আচ্ছা –
ওঠার উপক্রম করে –
মজিদ : উঠছ যে? খাবে বললে না –
কলিম : না, যাই একটু কাজ আছে, সেরে আসি। আর খাওয়ারই বা তাড়াহুড়া কিসের – সবে তো এগারোটা। এই এলাম বলে –
কলিমের প্রস্থান। মরিয়মের প্রবেশ।
মজিদ : আঃ তুমি আবার উঠে এলে কেন? এমনিতেই শরীর ভালো না।
মরিয়ম : আর শরীর। মনে শান্তি নেই একবিন্দু। তার আবার শরীর। মেয়েটারও একটা গতি হলো না।
মজিদ : কার কথা বলছ?
মরিয়ম : মেয়ে আবার কী তোমার গ-া গ-া। কার কথা আবার বলছি। বয়েস হলোত মেয়ের বিয়ে-থা’র ব্যবস্থা করবে না?
মজিদ : ওঃ রানু – রানুর বিয়ে! তা মনের মতো ছেলেই-বা কই? গরিবের সংসার – টাকা থাকলে না-হয় চিন্তা ছিল না।
মরিয়ম : কামাল এসেছিল কাল বিকেলে।
মজিদ : ও তাই নাকি? তা কী বলল, স্কুল কেমন লাগছে?
মরিয়ম : আমার যেন খেয়েদেয়ে কাজ নেই স্কুলের গপ্প করব। তুমিও যেমন। (একটু থেমে নিয়ে) তা, স্বভাব-চরিত্র তো ভালোই, দেখতেও এমন আর কী খারাপ। তোমার মেয়ের জন্য তো আর রাজপুত্র জুটবে না।
মজিদ : তা কামাল –
মরিয়ম : হ্যাঁ গো হ্যাঁ, লজ্জার মাথা খেয়ে কাল বলেই ফেলল – মামীমা অমত করলে চলবে না –
মজিদ : তা মন্দ বলোনি পারুর মা, মানাবে ভালো। কিন্তু বিয়ে বললেই তো বিয়ে হয় না। টাকার ব্যবস্থা চাই তো –
মরিয়ম : সেই ভেবে ভেবেই তো ঘুম হয় না।
মজিদ : ভেবে আর কী হবে। না যাই, একবার ঘুরে আসি চট্ করে –
মরিয়ম : এই ভরা দুপুরে আবার কোথায় ছুটছ?
মজিদ : করিম বক্সের দোকানে একট লোক নেবার কথা আছে –
দেখি গে –
মরিয়ম : সে কী? দোকানের কাজের আবার তুমি কী জানো?
মজিদ : আরে এর ভেতর আবার জানাজানিটা দেখলে কোথায়? ভারী তো মুদির দোকানের হিসাবপত্রগুলো ঠিক রাখা। জমা আর রোজকার খরচ কত – বাস,এই হিসাবটা হলেই হলো। পেলে মন্দ হয় না পারুর মা। ঝঞ্ঝাট নেই, হাঙ্গামা নেই। নিরিবিলি নিজের কাজ করে যাও।
মরিয়ম : যা ভালো বোঝ কর।
মজিদ : যা দিনকাল, চাকরির বাজার তো আগুন। দেখ এতক্ষণে ভিড় লেগে গেছে। তবে করিম বক্স চেনা লোক, সহজে কী ঠেলতে পারবে?
মরিয়ম : তাহলে বের হও – ফিরতে আবার দেরি করো না যেন –
মজিদ : না, না দেরি হবে না।
মজিদের প্রস্থান।
রানু : (নেপথ্যে) মা, নুনের হাঁড়িটা কই –
মরিয়ম : যাই, তুই পাবি না। শিকেয় তোলা। একটা সরাতে গিয়ে আরেকটা ভাঙবি।
মরিয়মের প্রস্থান। একটু পরে একপায়ে লাফিয়ে খেলা করতে করতে পারুর প্রবেশ। সঙ্গে কামাল।
কামাল : শোনো, শোনো।
পারু : মা, কামালভাই।
কামাল : খবরদার অমন বাড়ি মাথায় করে তুললে আমি কিন্তু চললাম। এ্যাঁ, এই নাও।
কিছু চকোলেট দেয়।
পারু : এটা কী চকোলেট। অতগুলো আমি খাব? যাই আপাকে একটা দিয়ে আসি।
কামাল : না না, ওগুলো আপাকে দিতে হবে না, ওগুলো সব তোমার। কিন্তু অমনি না – একটা কাজ করে দিতে হবে।
কামাল : (কানে কানে কিছু বলল) ঠিক তো?
পারু : মা যদি কিছু বলে?
কামাল : বা রে, মা জানবে কেমন করে? চট্ করে খবরটা দিয়েই চলে আসবে। পারবে না?
পারু : আচ্ছা।
পারুর প্রস্থান। রানুর প্রবেশ।
রানু : বাব্বারে বাবা। এসেই অমনি তলব – একটু আর তর সইছিল না?
কামাল : না মানে ইয়ে, আমার এক্ষুনি আবার উঠতে হবে তো। হাতে বেশি সময় নেই। অনেক কাজ –
রানু : সে তো ঠিকই। সময় তো থাকবেই না, স্কুলের মস্তবড় মাস্টার। কতো কাজ –
কামাল : ব্যাপার কী বলো তো? তুমি কি ঝগড়া করবে বলে কোমর বেঁধে এসেছ?
রানু : পাগল – তাও কখনো পারি? হাজার হলেও –
কামাল : হাজার হলেও কী, বলো না।
রানু : ধ্যেৎ! তুমি একটা কী বলো তো? কাল মাকে ও-কথা বলতে গেলে কেন?
কামাল : বাঃ, না বলে করি কী? এখানে থাকা হতো, সে অন্য কথা। চলেই যখন যাচ্ছি –
রানু : চলে যাচ্ছ মানে?
কামাল : না গিয়ে উপায়? মর্যাদা নিয়ে এখানে চাকরি করা চলে? আসলে স্কুল তো নয় বাপের জমিদারি। যাচ্ছেতাই কা- চলছে সব।
রানু : তোমরা সকলে বাধা দিলে পারো।
কামাল : এই তিনটা মাস সে চেষ্টাই করেছি। কিন্তু একা তুমি কী করবে? স্কুলের জন্য ইয়াকুব মিয়ার কেন এই অন্তহীন দরদ তাও জানি। কিন্তু গলা ফাটিয়ে বলো, কেউ বিশ্বাস করবে না। কাগজে ছাপাতে দাও – কেউ ছাপবে না। তাই –
রানু : তাই কী?
কামাল : ভাবছি এ চরম ব্যর্থতার দিনগুলোই সব নয়। এরপরও দিন আছে। সেদিন – সেদিন শুধু আমি নই রানু, আমার মতো আরো অনেকে আসবে। তাদের সকলের দুর্বার শক্তির কাছে ওদের একদিন পরাজয় মানতে হবে।
রানু : চাকরি তাহলে ছেড়েই দিচ্ছ?
কামাল : ছেড়ে না দিলে ওরাই ছাড়াতো। একটা ছুতো বার করতে কতক্ষণ?
রানু : কী করবে তাহলে?
কামাল : ভেবেছিলাম মাস্টারি আর করব না। মনে হলো সেও এক রকম পরাজয়, সে পরাজয় মেনে নিলে নিজের মনকে প্রবোধ দেবার আর কিছু থাকে না। আপাতত দিনাজপুরে একটা চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা –
রানু : কিন্তু –
কামাল : ভাবছ যদি সেটাও যায়। যেতে পারে। কিন্তু শান্তি কোথায় বলতে পারো রানু! সামান্য দুমুঠো অন্নের সংস্থান যদ্দিন না হয় তদ্দিন একশ্রেণির মানুষ আমাদের ভাগ্য নিয়ে চিরকালই এমনি খেলা খেলে চলবে –
রানু : এর কি শেষ নেই?
কামাল : অমন নৈরাশ্যবাদী আমি নই। বলবে, এ আমার স্বপ্ন। কিন্তু জানি, এ স্বপ্ন একদিন সফল হবে।
পারুর প্রবেশ।
পারু : মা বলেছে কোথাও না যেতে, অনেক কথা আছে।
কামাল : (ঘড়ির দিকে তাকায়) এ্যাঁ – ওরে বাবা বারোটা! আর সময় নেই – এবার উঠতে হয়।
পারু : কথা না শুনে গেলে মা বলেছে খুব রাগ করবে –
কামাল : কী কথা – তা আরেকদিন। (রানুর দিকে তাকায়)
রানু : আমি কী জানি। আমি তো বসতে বলিনি।
পারু : (চেঁচিয়ে) মা কামালভাই চলে যাচ্ছে।
কামাল : আরে চুপ চুপ – দেখ তো দুষ্টু মেয়ের কা- –
মরিয়মের প্রবেশ
মরিয়ম : দেখ তো, কোথায় ছুটবে আবার এই দুপুরে। চাট্টে ডাল-ভাত যা হয় খেয়ে নিও। আমারও বাবা যে শরীর, কোথায় কে এল-গেল কিছুই দেখতে পারি না।
রানুর প্রস্থান।
কামাল : না, আজ থাক মামীমা। আরেকদিন হবে।
মরিয়ম : না বাবা, সে হয় না – এই দুপুরবেলা –
পারু : মা কামালভাই আপাকে বলছিল কোথায় চলে যাচ্ছে।
কামাল একটু লজ্জা পায়।
মরিয়ম : (পারুকে) তুই যা তো বাপু। এখানে থেকে খালি কথার মধ্যে কথা বলবে। বড়দের কথায় তোর কী দরকার। যা উঠোনে গিয়ে খেলগে (পারুর প্রস্থান) আবার কই যাচ্ছ?
কামাল : না মামীমা, দিনাজপুর একটা চাকরি পেতে পারি। ঠিক নেই কিছু। তবে –
মরিয়ম : কবে পর্যন্ত যাবে?
কামাল : তা গেলে তো সামনের মাসেই যেতে হয়।
মরিয়ম : এরপর ছুটি-ফুটি তো পাবে না।
কামাল : চাকরিতে জয়েন করেই আবার ছুটি পাব? ভাবছিলাম – ভাবছিলাম –
আমতা আমতা করে –
মরিয়ম : জানোই তো বাবা, যা হয় ভালোয় ভালোয় মেয়েটার একটা গতি হলে তোমার মামার দুর্ভাবনা কমে। একটা কথা বাবা, তোমাকে বললেই আর কী – এক পয়সা দেবার মুরোদ কিন্তু আমাদের নেই –
কামাল : একতরফাই বললেন। আর আমিই বা কোন লাট সাহেবের ছেলে। তাহলে মামীমা আজ চলি।
মরিয়ম : না বাবা, তা হয় না। দুপুরবেলা খালিপেটে ফিরে যাবে, একটু বসো।
মরিয়মের প্রস্থান। পারুর প্রবেশ।
পারু : একটা কথা বুঝেছি বলব না। একটা কথা –
কামাল : কী কথা?
পারু : ও বাবা, আপা তাহলে আস্ত রাখবে না। একটা কথা –
কামাল : বলোই না –
পারু : বলোব না।
কামাল : বেশ, তাহলে তোমার সঙ্গে আড়ি।
পারু : বলব?
কামাল : না থাক, আর বলতে হবে না।
পারু : রাগ করলেন? না না, বলছি বলছি –
[পারু কামালের কানে কানে কিছু বলে]
কামাল : আচ্ছা দুষ্টু হয়েছ তুমি। দাঁড়াও মামীমাকে বলছি (পারু দৌড়ে বেরিয়ে যায়) পারু, পারু –
[কামাল পারুর পিছু ধাওয়া করে। একটু পরে প্রায় একই সঙ্গে বাইরের দিক থেকে মজিদের এবং ভেতর থেকে মরিয়মের প্রবেশ]
মরিয়ম : কিছু হলো?
মজিদ : পারুর মা, চাকরি গেছে বলে আজ সবাই এমন পায়ে পায়ে ঠেলছে। জানে কিনা আজ আর সেদিন নেই। মান-সম্মানের কথা থাক, সে দিনই গেছে। কিন্তু তাই বলে মুখের ওপর যা-তা শুনিয়ে দেবে?
মরিয়ম : কেন কী হলো আবার?
মজিদ : আমি ইতিহাসের মাস্টার – আমি অংকের কী জানি! পনেরো বছর চাকরি করে শেষটায় এ-ও শুনতে হলো পারুর মা। নাও না নাও – তোমার মর্জি। তাই বলে অমন করে গলাধাক্কা দেয়। মুখের ওপর বলে দিলো মাস্টার লাভ-লোকসানের হিসাব, এতো বড় কঠিন ব্যাপার – যাকে তাকে তো নিতে পারি না।
মরিয়ম : তাই বলে তো বিদ্যে ধুয়ে যাবে না – অন্যের মুখের কথায় কী এসে যায়?
মজিদ : পারু মা। আর একদ-ও এখানে নয় – কালই আমি শহরে যাব।
মরিয়ম : শহরে যাবে, সে কী?
মজিদ : না না পারুর মা, আর আমাকে বারণ করো না। যেতে আমাকে হবেই। আর সেখানে কেই-বা চিনবে – যা খুশি করো।
মরিয়ম : আমার যেন কেমন ভালো লাগে না বাপু। বিদেশবিভুঁইয়ে কোথায় গিয়ে থাকবে। কোথায় খাবে –
মজিদ : তোমার যত উদ্ভট ভাবনা। বাড়ির বাইরে কি আর কেউ যায় না। কোথায় থাকবো? ফুটপাতেই যদি পড়ে থাকি, কেউ জানবে না পারুর মা যে, তোমার সেবা-যতেœ গড়া মানুষটি ধুলোয় লুুটোচ্ছে। ভুল করেও কেউ ভাববে না মডার্ন হাইস্কুলের মাস্টার, যে একদিন ইতিহাস পড়াতো, তার এতটুকু ঠাঁই মিলল না এতবড় শহরে।
মরিয়ম : যাবেই যখন যাও। সবাই এক এক করে ছেড়ে যাও। পোড়া কপাল নিয়ে আমিই শুধু পড়ে থাকি।
মজিদ : তোমাদের ছেড়ে যেতে আমিই কী চাই। কিন্তু চোখের সামনে না খেয়ে মরবে তাই দেখতে বলো!
মরিয়ম : কালই যাবে?
মজিদ : হ্যাঁ, কাল সকালের ট্রেনটাই ধরব। সংসারটা তোমার ওপর ছেড়ে যাচ্ছি। ওদের একটু দেখো। তুমি ছাড়া আর কে দেখবে বলো –
[পারুর প্রবেশ]
পারু : বাবা খেতে আসবে না? কখন থেকে আমরা বসে আছি।
মজিদ : যাই মা যাই।
মরিয়ম : কামাল বসেছে?
পারু : কখন থেকে বসে আছে মা, তুমি খাবে না?
মরিয়ম : না রে না, যা তো। আর জ্বালাস না।
মজিদ : কী অত ভাবছ বল তো। বিপদ কি কারো আসে না? একটুকুতেই মুষড়ে গেলে চলে? নাও চলো, আবার কবে সবাই একসঙ্গে –
মরিয়ম : দোহাই তোমার ওকথা মুখে এনো না।
মজিদ : আচ্ছা, আচ্ছা –
পারু : চলো না বাবা – আমার বুঝি ক্ষিদে পায় না।
মজিদ : চল্ মা চল –
আলো স্তিমিত হয়।

সপ্তম দৃশ্য
[একই দৃশ্য মজিদের বাড়ি। মরিয়ম শুয়ে আছে। পারু বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে]
রানু : দে তো জানালাটা বন্ধ করে – যা বৃষ্টির ছাঁট আসছে।
[পারু জানালা বন্ধ করে দেয়]
পারু : মা ঘুমুচ্ছে।
রানু : চুপ। জোরে কথা বলিস না। শোন পারু, সেই যে লাল ওষুধের শিশিটা –
পারু : হ্যাঁ –
রানু : তোর তো না বুঝেই সব কথায় হ্যাঁ। কোনো শিশি – কালকের ওইটে নয়, আজকের যেটা আনল সেইটে –
পারু : নিয়ে আসি?
[পারু বেরিয়ে যায়। একটু পরে লাল ওষুধের শিশি নিয়ে ঢোকে]
রানু : শোন, ঘুম থেকে উঠলে এক দাগ খাইয়ে দিস। কোথাও পালাস না যেন। বসে বসে একটু হাওয়া করিস। দেখি বার্লির কী হলো।
পারু : (পাখা করতে গিয়ে) হাত ব্যথা করছে তো –
রানু : এটুকু কাজ করতে কেমন করে মেয়ে, দেখো না।
পারু : বলেছি করব না? ওষুধ খাওয়াতে গেলে তখন তো আর হাওয়া করতে পারব না –
রানু : তখন না করলেই চলবে।
[রানু বেরিয়ে যায়। পারু বসে বসে বাতাস করতে থাকে]
মরিয়ম : আঃ (ওঠার উপক্রম)।
[পারু ওষুধ ঢালতে যায়। কী যেন ভাবে। ওষুধ ঢালে না। গালে হাত দিয়ে বসে ভাবতে থাকে। বার্লি নিয়ে রানুর প্রবেশ]
রানু : একদাগ ওষুধ খাওয়াতে এক যুগ লাগে তোমার। একটা কাজ যদি গুছিয়ে করতে পারিস।
পারু : আপা, ওইটুকু ওইটুকু করে রোজ না দিয়ে সবটা দিলে কী হয়?
রানু : তা না হলে বলে তোর বুদ্ধি। (মরিয়মের ওঠার উপক্রম) উঠো না মা। নাও ওধুষটা ঢক্ করে খেয়ে নাও তো।
মরিয়ম : তোর বাবা ফিরল না –
রানু : অত ভাবছ কেন মা। শহরে একটু-আধটু দেরি হয়ই।
মরিয়ম : শহরে ওঁর কে আছে যে চাট্টে মনে করে খেতে দেবে।
রানু : এবার বার্লিটা খেয়ে নাও তো মা, একটুও চিনি দিইনি। নাও খেয়ে নাও।
[মুখ বিকৃত করে কোনোমতে বার্লিটা খেয়ে নেয় মরিয়ম। রানু এক গ্লাস পানি নিয়ে এগিয়ে আসে। পানি খাওয়া শেষে আঁচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে দেয়।]
মরিয়ম : আমিন ফেরেনি?
রানু : চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেছে। ফিরবে’খন তুমি অত ভেবো না মা।
মরিয়ম : জানালাটা বন্ধ কেন? খুলে দে না। একটু আলো-বাতাস –
রানু : বৃষ্টি পড়ছে যে বাইরে –
মরিয়ম : কাপড়গুলো সব তুলেছিস? আমিনের শার্টটা ভিজছে না তো? কত করে বলি মনে করে – আঃ, কী পরে ও বাইরে যাবে?
রানু : (মাথায় হাত দিয়ে) ইস্ জ্বরে একদম কপাল পুড়ে যাচ্ছে। যা তো পারু বালতিটা নিয়ে আয়। মাথাটা ধুইয়ে দিই। আচ্ছা থাক তুই পারবি না।
পারু : খুব পারব।
রানু : তার চেয়ে এক কাজ কর। করিম ডাক্তারের বাড়ি থেকে ঘুরে আায়। যা তো লক্ষ্মীটি, দৌড়ে খবর দিয়ে আয় – যাবি আর আসবি।
পারু বেরিয়ে যায়। রানু মরিয়মের মাথায় পট্টি দিতে থাকে।
মরিয়ম : পারু, পারু কই গেল?
রানু : কোথাও না মা। উঠোনে খেলছে।
মরিয়ম : খেলছে – খেলছে!
রানু : তুমি একটু ঘুমুতে চেষ্টা করো তো মা। কথা বললে শরীর আরো খারাপ করবে।
মরিয়ম : সবাই এক এক করে চলে গেল। তোর বাবাও।
রানু : কী যে বলো মা। সবাই তো রয়েছি আমরা – বাবাও এসে পড়বে।
মরিয়ম : তিন তিনটে মাস, একটা খোঁজ-খবর নেই। আমাকে কী বোঝাচ্ছিস মা? ও রাগ করে চলে গেল। দেখিস, আর কোনোদিক ফিরবে না।
পারু এসে ঢোকে, রানু তার কাছে যায়।
পারু : ডাক্তার বলল, ওষুধ তো দিয়েছি – আবার কী? আমার কি আর রুগী নেই? কত করে বললাম মায়ের এত জ্বর –
রানু : একটা কাজও যদি হয় তোকে দিয়ে।
পারু : আমি যেন বলিনি। বলে কী যে, হাসপাতালে নিয়ে যাও না – পয়সা লাগবে না। এলে ভিজেট দেবে কোত্থেকে? পয়সা আছে?
রানু : আচ্ছা, ছোটলোক তো, পয়সাটা কোনোদিন পায়নি? ইস একদম ভিজে গেছিস। নে ফ্রকটা ছেড়ে আয়।
রানু কমলালেবুর খোসা ছাড়াতে থাকে। পারু আস্তে আস্তে মায়ের কাছে এসে দাঁড়ায়। মরিয়ম বিছানায় ছটফট করতে থাকে।
পারু : মা, মা, মা – আপা! মা যেন কেমন করছে।
রানু : কী রে কী হয়েছে? মা, মা মা – যা তো কলিম চাচাকে ডেকে নিয়ে আয় শিগগির – বলবি –
পারু দৌড়ে বেরিয়ে যায়। রানু কী করবে ভেবে পায় না। আমিনের প্রবেশ।
আমিন : মার জ্বর কেমন রে? দেখি দেখি সর তো। তাই তো হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। যা তো শিগগির একটু গরম পানি – (রানু বেরিয়ে যায়) মা, মাগো মা – জানো মা, আমি একটা চাকরি পেয়েছি, চাকরি। (উঠে পায়চারি করে) মা, আমি একটা চাকরি পেয়েছি। মা চাকরি – মা – (চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে দেয়) ভালোই হলো, এ সংসারে থেকে কী হতো।
[গরম পানি হাতে রানুর প্রবেশ]
রানু : (পানির বোতল রেখে দিয়ে) মা, মা গো –
[পারুর প্রবেশ]
পারু : কী হয়েছে আপা? বলো না মার কী হয়েছে? আঃ বলো না। মা – মা – মা – মা – মা – (কান্না)
[রানু বাইরে যায়। কলিমের সঙ্গে ডাক্তারের প্রবেশ]
কলিম : আসুন ডাক্তার সাহেব।
ডাক্তার : (একটু দেখে) টু লেট, টু লেট। এসব কেসে আগে থেকে প্রিকশান নিতে হয়।
কলিম : আপনাকে তো সময়মতোই খবর পাঠানো হয়েছিল।
ডাক্তার : এতো কোবরেজি নয়, বললেন আর চলে এলাম। আমার তো আরো রুগী আছে। আচ্ছা চলি –
কলিম : কত ভিজিট দিতে হবে আপনাকে?
ডাক্তার : ভিজিট তো ফিক্সড। তবে পেশেন্ট যখন এক্সপায়ার করেছে, তখন, ইয়ে – কনসালটেশন ফি-টাই শুধু দিন।
কলিম : আপনার কনসালটেশন ফি কত?
ডাক্তার : পনেরো টাকা।
কলিম : এই নিন।
[টাকা দেয়]
ডাক্তার : ধন্যবাদ। আচ্ছা চলি –
কলিম : আসুন।
ডাক্তারের প্রস্থান।
কলিম : (আমিনের মাথায় হাত রেখে) ছিঃ বাবা, অমন ভেঙে পড়লে চলে। তুমি অমন ভেঙে পড়লে ওদের কী হবে ভেবে দেখ তো।
আলো স্তিমিত হয়।

অষ্টম দৃশ্য
পোস্ট অফিসের বারান্দা।
হার্ডবোর্ডের ‘কাট-আউট’ তৈরি করে ডাকঘরের কাউন্টার, চিঠি ফেলার বাক্স ইত্যাদি তৈরি করা যেতে পারে। আগের দৃশ্যের খাট সরিয়ে ফেলতে হবে। টেবিল থাকবে কাউন্টারের পেছনে। লাইনে দাঁড়িয়ে লোকজন খাম পোস্ট-কার্ড কিনছে। লাইনে সকলের শেষে আমিন। এককোণে মাটিতে বসে মজিদ মাস্টার। চেহারায় পরিবর্তন লক্ষণীয়। মুখে দাড়ি, চোখে নড়বড়ে ফ্রেমের চশমা। তার কাজ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে লোকজনের চিঠিপত্র লিখে দেওয়া। সামনে রাখা কাল টিনের বাক্স এবং বাক্সের ওপর কিচু খাম, ডাকটিকিট, মনি-অর্ডার ফরম, কিছু সাদা কাগজ, এবং দোয়াত-কলম। পাশে একটি ছাতা।
একটু দূরে একজন জুতো পালিশের কাজে ব্যস্ত। ধারেকাছেই পান-সিগ্রেট নিয়ে বসে আরেকজন। তার কাছ থেকে কেউ কেউ পান-সিগ্রেট কিনছে।
লোকজন আস্তে আস্তে কাজ সেরে চলে যায়। ভিড় ফাঁকা হয়।
আমিন পকেট থেকে লেখা চিঠি বার করে খামে পোরে। ঠিকানা লিখতে গিয়ে দেখে কলমে কালি নেই। হঠাৎ মজিদ মাস্টারের দোয়াত-কলমের দিকে নজর পড়ে। আমিন তাকে দেখে চিনতে পারে না।
আমিন : দেখহে, তোমার কলমটা একটু দিতে পার?
মজিদ কালি-কলম এগিয়ে দেয়। আমিন লিখতে থাকে। দু-একবার কলম ঝাড়া দেয়। কয়েক ফোঁটা কালি মজিদের গায়ে পড়ে। আমিন লক্ষ করে না। মজিদ লক্ষ করেও কিছু বলে না। লেখা শেষ করে আমিন কলম ফিরিয়ে দেয়।
আমিন : এই নাও তোমার – (মজিদের গায়ে কলমের কালি পড়েছে লক্ষ করে) তোমার গায়ে কালি পড়ল, না? কিছু মনে করো না। আমি দেখিনি – (কিছুদূর গিয়ে ফিরে আসে) দেখি – (পানওয়ালা মনে করল তাকে ডাকা হয়েছে। তাড়াতাড়ি সিগারেট দিতে যায়। আমিন বিরক্তির সঙ্গে হাত নেড়ে তা প্রত্যাখ্যান করে) খুব বেশি পড়েনি তো?
মজিদ : না না, তার জন্য কী, একটু ধুয়ে নিলেই চলবে।
আমিন : হ্যাঁ হ্যাঁ, তা তো বটেই। (মজিদের পাশে বসে সুর পালটে) এ শহরে কবছর ধরে আপনি?
মজিদ : অনেক বছর।
আমিন : কী জানি, কেন জানি না, আপনার চেহারার সঙ্গে বড্ড মিল তাঁর।
মজিদ : কত লোকের সঙ্গেই কত লোকের চেহারা মেলে –
অন্যমনস্ক হয়ে কাগজে কী যেন লিখতে শুরু করে
আমিন : তা তো বটেই। দেখি দেখি কী লিখলেন – ‘পারু’? দেখি দেখি।
মজিদ কাগজের টুকরো ছিঁড়ে ফেলে।
মজিদ : ও কিছু নয়। এমনি লিখে ফেললাম।
আমিন : (মজিদের পরিচয় সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে) বাবা! বাবা, এখনো তুমি লুকোচুরি করবে! মমতা বলে তোমার কিছু নেই?
মজিদ : আছে রে আছে। আমি তো পাথর দিয়ে গড়া নই।
আমিন : এ পাঁচটা বছর তোমাকে কেমন করে খুঁজে বেড়িয়েছি বাবা, তা যদি জানতে –
মজিদ : (আমিনের হাতে নতুন ঘড়ি দেখে) নতুন ঘড়ি কিনেছিস বাবা – নতুন ঘড়ি। তোর একটা হাতঘড়ির বড় শখ ছিল না?
আমিন : হ্যাঁ বাবা, কিন্তু সে শখ এখন আর নেই। চলো বাবা।
মজিদ : কোথায়?
আমিন : বাড়িতে।
মজিদ : ক্ষেপেছিস? আমি আর ফিরে যাই।
আমিন : এতদিন পর তোমাকে পেয়েছি। তোমার একটু সেবা করতে দেবে না। কেন দেবে না বাবা – আমার শখ মেটাতে চাও না তুমি? না বাবা! তোমাকে না নিয়ে আমি এক পা নড়ব না।
মজিদ : আমাকে জোর করিস না। এই তো বেশ আছি – বেশ আছি।
আমিন : এতো তোমার অভিমান।
মজিদ : মনে আছে একদিন তুই বলেছিলি, আমাকে আমার মতো করে থাকতে দাও। তুই ঠিকই বলেছিলি বাবা। আমি আজ তাই চাই।
আমিন : কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে দুটো পয়সার জন্যে এমনি করে তুমি পথে পথে ঘুরে বেড়াবে? না, না আমি কিছুতেই হতে দেব না।
মজিদ : সে হয় না বাবা, সে হয় না। ওরে তুই কী বুঝবি – সবকিছু ছেড়ে কেমন করে মানিয়ে নিলাম এ জীবন। সে কী তুই বুঝবি রে। কতবার ভেবেছি পারব না রে, পারব না।
আমিন : না, আজও তোমাকে তা পারতে হবে না। কেন বাবা, এই কবছরে কী আমরা একেবারেই পর হয়ে গেলাম? চলো বাবা – কোনো অসুবিধে হবে না তোমার। পুরো একটা কামরা ছেড়ে দেব তোমাকে। আবার তোমাকে নিয়ে গড়ে উঠবে নতুন জীবন।
মজিদ : কিন্তু –
আমিন : না, কোনো কিন্তু আমি শুনব না। এত সাধ্য-সাধনা করে তোমাকে পেয়েছি, পেয়ে আবার হারাব? বাবা, আমি অকতৃজ্ঞ। তাই বলে এতটুকু সেবার অধিকার কী আমার নেই?
মজিদ : তুই বুঝবি না বাবা, এই চাপা আগুন জ্বলে উঠলে আমি সইতে পারব না রে, সইতে পারব না।
আমিন : খুব পারবে। যেতে তোমাকে হবেই। (খানিকক্ষণ দুপক্ষে কোনো কথা নেই) বাবা –
মজিদ : কী রে?
আমিন : না বাবা, কিছু না। কতদিন তোমাকে এমন করে ডাকিনি। বাবা, আমি তোমার অবাধ্য ছেলে। জানি, তোমার দাবি কোনোদিন মেটাতে পারিনি। তাই আজ তুমিও আমার দাবি মেটাতে চাও না। তুমি আমাকে হেলায় ফিরিয়ে দিচ্ছ। কিন্তু আজ শুধু আমি একা নই, আরো একজন যে তোমার পথ চেয়ে বসে আছে। তোমাকে একটিবার সালাম করতে পারল না বলে সে অভাগীর দুঃখের সীমা নেই। সে তো তোমার কাছে কোনো দোষ করেনি বাবা।
মজিদ : কে? কার কথা বলছিস?
আমিন : ছেলের বউকে দেখতে ইচ্ছে করে না তোমার?
মজিদ : আমিন, তুই বিয়ে করেছিস?
আমিন : হ্যাঁ, বাবা।
মজিদ : ওরে, ওরে আমি দেখব। আমি দেখব। একটি বারের জন্যে হলেও আমি আমার মাকে দেখব। একটিবার, শুধু একটিবার।
আমিন : চলো বাবা।
মজিদ : চলো, কিন্তু আমার জিনিসগুলো –
আমিন : আমি তুলে নিচ্ছি। (আমিন লেখার সাজ-সরঞ্জাম ও অন্যান্য জিনিস গুছিয়ে নেয়) বাবা –
মজিদ : কী রে?
আমিন : সত্যি করে বলো তো ছেলের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না তোমার? আচ্ছা বাবা। এতদিন একবারও আমাদের জন্যে মন তোমার –
মজিদ : আমিন।
আমিন : এবার তুমি হুকুম চালাবে, আমি শুনব, তোমার এই অবাধ্য ছেলেটিকে যত খুশি শাসন করো। করবে না? দাঁড়াও বাবা, একটা রিকশা ডাকি। না, ওখানে তো রিকশাও নেই। চলো খানিকদূরে এগিয়েই যাওয়া যাক।
আলো স্তিমিত হয়।

নবম দৃশ্য

মজিদের বাড়ির দৃশ্যের সামান্য পরিবর্তন। মোটামুটি গোছানো। মজিদ মাস্টারের বাড়ির চেয়ে অনেক বেশি পরিপাটি। অনেক বেশি সচ্ছল পরিবেশ।

মজিদ : মা তোর বড় কষ্ট পেয়ে গেল রে – বুঝি একটু সেবা-যতœও মিলল না।
আমিন : চেষ্টার কিছুমাত্র ত্রুটি করিনি বাবা। কলিম চাচা নিজে এসে সব দেখাশোনা করেছেন। যাক, যা হবার হয়ে গেছে। ও নিয়ে ভেবে তো আর লাভ নেই বাবা।
মজিদ : না, ভেবে আর কী হবে।
আমিন : একটা কথা জানো। পারু কিন্তু পড়াশুনায় খুব ভালো হয়েছে, ডিস্ট্রিক্ট স্কলারশিপ পেয়েছে –
মজিদ : স্কালারশিপ পেয়েছে?
আমিন : রানু তো এখন পাকা গিন্নি। সবসময় পারুকে চোখে চোখে রাখছে। বলছিলাম আমার কাছে থাক। তা রানু ছাড়ল না। আর কামালও ওর পড়াশুনার দিকে খুব কেয়ার নিচ্ছে।
মজিদ : ওদের চিঠিপত্র পাস?
আমিন : হ্যাঁ, ওদেরও আসবার কথা আছে – সামনের আশ্বিনে। রানু, পারু ওদের নিয়ে আসব।
মজিদ : চন্দনপুরের বাড়িটা কী ছেড়েই দিলি বাবা?
আমিন : না ছেড়ে উপায়। নিজেই চলে এলাম, আর কে দেখাশোনা করে বলো।
মজিদ : তা তো সত্যি। ও বাড়িতে এখন আর কী আছে, শুধু ভূতের আস্তানা।
আমিন : বাবা একটা কথা বলি?
মজিদ : কি রে?
আমিন : তোমার জীবনের সব লাঞ্ছনা আমারই জন্যে।
মজিদ : না রে, না। মনেপ্রাণে শুধু এই চেয়েছি – তোরা মানুষ হ। এই তো আমার সবচেয়ে বড় সুখ রে – আর কোনো সুখ আমি চাইনি। কেবল সুখ দেখে যেতে পারল না তোর মা। বড় সাধ ছিল তোর মায়ের। তুই বিয়ে করবি। বউ আনবি।
আমিন : বাবা পাশের কামরাটা গুছিয়ে দিতে বলি (ভেতরের দিকে বউকে লক্ষ করে) শোন, ওই ঘরে একটা খাট পেতে দাও। ছোটমতো চেবিলটাও দিও। আর একটা ধোওয়া চাদর – কাউকে বলো ঝুলটা ঝেড়ে দিক।
মজিদ : অত হ্যাঙ্গামা করতে যাওয়া কেন রে! আমি বুড়ো মানুষ – বড় তেষ্টা পেয়েছে। এক গ্লাস পানি।
আমিন : শুনছ এক গ্লাস পানি। তার চেয়ে একটা ডাবই কেটে দিই –
মজিদ : না রে না, যা বলি শোন।
আমিন : তোমার খাবার-দাবারের জোগাড় করতে বলি বাবা। কী যে সব ছাইপাশ খেয়ে বেড়িয়েছ এতদিন।
[পানির গ্লাস নিয়ে আমিনের স্ত্রী রোকেয়ার প্রবেশ। মজিদকে সালাম করে। পানি খাওয়া হলে রোকেয়ার প্রস্থান]
আমিন : বাবা –
মজিদ : উঁ –
আমিন : আমার কেমন যেন ভয় হয় বাবা। ভয় হয়, তুমি আবার কখন এমনি করে ফাঁকি দিয়ে চলে যাবে। বাবা কথা দাও তোমার এই অকৃতজ্ঞ অপদার্থ ছেলেটিকে ছেড়ে কোথাও যাবে না।
মজিদ : আজও তুই তেমনি ছেলেমানুষটি আছিস। আমি বুড়ো মানুষ। তোদের সুখের সংসারে আবার আরেকজনের বোঝা কেন? তোদের জীবনের নতুন হালখাতায় এ পুরনো ঋণ কেন? বেশ তো আছিস। মানিয়ে যাবে রে একদিন। নতুন জীবন নতুন মানুষ আসবে, নতুন করে বাঁচবে। সেখানে আমি কেন রে? আমার সেখানে ঠাঁই নেই। মনে আছে, ছেলেবেলায় সেই কবিতাটা পড়িয়েছিলাম।
ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
আমার সোনার ধানে যে সংসার আজ ভরে উঠেছে, সেখানে আমার ঠাঁই কোথায়? আমাকে কেন জড়ানো। আমার আর কদিন?
আমিন : ওসব আমি জানি না বাবা। আমি কিছু শুনব না –
মজিদ : জানি, কেন যেন এ বয়েসে আর আশ্রয় করে থাকতে মন চায় না। পাল তোলা নৌকোর মতো ভেসে যেতে ইচ্ছে করে, সেও এক আনন্দ।
আমিন : বাবা জীবনে তোমার কাছে অনেক কিছু চেয়েছি, তুমি দাওনি। দিতে পারোনি বলে। আজ হাতে পেতে তোমার কাছে চাইতে এসেছি, আজও ফিরিয়ে দেবে? (কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা) বেশ –
মজিদ : না রে না, সে কথা নয়।
আমিন : বাস, বাবা। আর কোনো কথা নয় – আর কিছু বলো না। পারলে এবার তোমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে? শুধু এ কথাটাই শুনতে চেয়েছিলাম। আচ্ছা বাবা, তুমি একটু আরাম করে বস। আমি এক্ষুনি বাজার থেকে ফিরে আসছি। শোন –
আমিনের প্রস্থান। পাখা হাতে রোকেয়ার প্রবেশ। রোকেয়া মজিদকে বাতাস করতে থাকে
মজিদ : না মা, তুমি বসো। হাওয়া করতে হবে না।
রোকেয়া : এতটা বছর কেটে গেল। শ্বশুর-শাশুড়ির মুখ দেখতে পেলাম না। কী কপাল নিয়েই যে এসেছিলাম। এতটা দিন গেল বাবা, ছেলের বউকে দেখার ইচ্ছে একবারও হলো না। এবার কিন্তু আপনাকে সহজে ছাড়ছি না –
মজিদ : তুমি দেখছি মা আমার পাগলাটে ছেলেরই জুড়ি। ও সে কথাই বলছিল। বৌমা – বলছিল আর কোথাও আমাকে যেতে দেবে না –
রোকেয়া : সত্যিই তো, ওর বুঝি দুঃখ হয় না। এবার কিন্তু বেশ কটা দিন আপনাকে বেড়িয়ে যেতে হবে। কাজের ক্ষতি হোক, অন্তত তিন-চারটে দিন কাটিয়ে যেতেই হবে।
মজিদ : কী বললে মা?
রোকেয়া : বেশি দিন তো নয়। তিন-চারটে দিন। তাও কি থাকতে নেই? আমরা কি বাবা পর?
মজিদ : তিন-চারটে দিন – মাত্র তিন-চারটে দিন। হ্যাঁ মা, তুমি ঠিকই বলেছ, আমিনটা ওই রকমই। শুনল না বৌমা, ও শুনল না। কত করে বললাম। তবু কী বলল জানো।
রোকেয়া : কী বাবা?
মজিদ : থাক সে কথা শুনে কাজ নেই।
রোকেয়া : যাই বাবা আপনার খাবারটা নিয়ে আসি।
[রোকেয়ার প্রস্থান]
মজিদ : ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
খাবার নিয়ে রোকেয়ার প্রবেশ।
রোকেয়া : বাবা, আপনি খেতে বসুন। ওর কিছু ঠিক নেই, কখন ফিরবে কে জানে।
মজিদ : এসব আবার কেন?
রোকেয়া : এসব আবার কী। ঘরে যা ছিল – কোনো কিছুই তো তৈরি করিনি। আপনি খেতে বসুন বাবা, আমি আসছি।
মজিদ : হ্যাঁ মা, তাই যাও – হ্যাঁ, শোনো, আমিন কোথায় গেল?
রোকেয়া : ও তো বাজারে ছুটল।
রোকেয়ার প্রস্থান।
মজিদ : ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়াছে ভরি।
খাবার ঢেকে রেখে নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখে মজিদ বেরিয়ে যায়।

[দ্রষ্টব্য : এ দৃশ্যে মজিদ মাস্টারের প্রস্থান খুব ধীরে ধীরে দেখাতে হবে। যেন তার যাওয়া উভয় সংকটের কথা ভেবে দ্বিধাগ্রস্ত। তবু নিজের স্বকীয়তা ও নিজের অটল বিশ্বাসের কথা স্মরণ করেই তাকে চলে যেতে হচ্ছে। চোখেমুখে সে অনুভূতি থাকা চাই। ভালো হয় এ দৃশ্যে মঞ্চ অন্ধকার করে যদি মজিদ মাস্টারের গমনের সমস্ত প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট লাইটে দেখানো যায়। মনে রাখতে হবে, খাবার ঢেকে রাখা থেকে শুরু করে, নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়া এবং দ্বিধাগ্রস্ত মনে যাওয়ার ব্যাপারটা যথাসম্ভব মন্থর গতিতে এগিয়ে যাওয়া চাই।]

য ব নি কা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *