যখন সুরভী

মূল – আনিস চৌধুরী

 বেতার নাট্যরূপ – সৈয়দ মোয়াজ্জম হোসেন

প্রযোজনা : মাসুদুল হাসান

কেয়া    :         আমি কি সেই কেয়া? এক যুগ আগের উচ্ছলা কেয়া, যে কেয়া একদিন কথায় কথায় হাসির ফোয়ারা তুলত, মিষ্টি কলতানে বাড়ি মুখর করে রাখত। প্রজাপতির ডানার মতো ভ্রুকুটি কাঁপিয়ে আবেগে উৎসারিত হতো সেই কেয়া আজ কোথায়? কোন অজানা অন্ধকারে হারিয়ে গেছে সে? এক যুগ আগের সেই রূপ কি আজকের এই চেহারায় খুঁজে পাওয়া যাবে না?

Narr : যেমন মেঘলা আকাশের কাছে আলোর আবদার জানিয়ে লাভ নেই, তেমনি লাভ নেই তার বিষণœদৃষ্টি চেহারার কাছে উৎফুল্ল হওয়ায় বাসনা জানিয়ে। এটুকু বোঝা যায় মুখভার করা ভাবটি হঠাৎ কোনো মানসিক দ্বন্দ্বের নিস্তেজ ছায়াময় অন্ধকার নয়, যা অতর্কিত কোনো উল্লাসের আলোয় কেটে যাবে।

কেয়া    :         কিন্তু এটাই কি সত্যি? একদিন যা মুহূর্তের খণ্ড অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়া মনে হয়েছে, আজ তা জীবনের একটি অখ- রূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবু মন প্রশ্ন করে – স্থির আকাশের মতোই কি এর অবস্থান? অবিচল পাহাড়ের মতোই কি এর অটল গাম্ভীর্য? কিন্তু চাঁদের জ্যোৎস্না-ধোয়া অরণ্যের হাসিকে কী করে অস্বীকার করব? জানি, সেটা স্থায়ী সত্য নয়। নয় অমর তার জীবন।

Narr : তাই একে লোক দেখানো চটক বলে অভিহিত করা যেতে পারে। কারণ এ হাসির ছটা কেটে গেলেই আবার গাঢ় হয়ে বসবে নৈরাশ্যের ছায়া।  আর সে ছায়ার ম্লানগম্ভীর ও রহস্যময় যে আদল ফুটে ওঠে, ওটাই কেয়ার আসল রূপ হয়তো। কারণ, সে রূপের প্রতিফলন তার সারা দেহে – মনে।

কেয়া    :         তবু আমার কোনো অনুযোগ নেই। নেই কোনো অভিযোগ। আমি জানি – মন আমার নিরাসক্ত হলেও শাসন করার প্রকৃতি হারায়নি, তবু তার শাসন অবজ্ঞা করেই আমি সংসার চালাই। হাজারো কাজের ভিড়ে মনোরম করে হাসি। অতিথি আপ্যায়ন করি। তৃপ্তির সঙ্গে চা ঢালি। কিন্তু তারপর…? …তারপর যখন ভয়াবহ রাত্রি নামে, সংসারের ঝামেলা শেষ হয়, নিজের বিবরে ফিরে আসি। স্পষ্ট অনুভব করি, দেহে ক্লান্তির বন্যা নাবছে। তবু… তবু শুধু জ্বলতে থাকে এ চোখ দুটো। শ্বাপদের চোখের মতো। অথই অন্ধকারে প্রত্যাশা করি একটু মুক্তির আলো। অথচ… (দীর্ঘশ্বাস)

Narr : অথচ জীবনের দিগন্তে অন্ধকারের আনাগোনা। কোনোদিন দরজার ফাঁক দিয়ে শোবার ঘরে একপ্রস্থ আলো দেখে চমকে ওঠে কেয়া। বিছানা ছেড়ে উঠে। কিন্তু না, তাকে অন্ধকার থেকে মুক্তি দেবার জন্যে কোনো অলৌকিক আলো নয়, বাথরুমের আলো জ্বলছিল ওটা। ওটা নিবিয়ে দিয়ে আবার ঘুমুতে যায় কেয়া। তারপর বিছানায় ফিরে এসে নিজেকে নিজেই নিরন্তর প্রশ্ন করে। কেয়া নিজেও জানে না, ওই অন্ধকারের দিগন্তপ্রসারী বাহু তার অচেতন মনকে কখন ঘুমের জাদুতে এক সময় অসাড় করে দেয়। এমনি করে একটি রাতের মুক্তি। একটি দিনের সূচনা। কিন্তু কেন? স্বামী বরকতের মনেও প্রশ্ন জাগে। সেদিন সকালের চায়ের টেবিলে ওকে ডাকলো বরকত।

বরকত  :         কেয়া

কেয়া    :         আসছি, কী হলো – চিনি কম হয়েছে?

বরকত  :         না। ইয়ে… তুমি চা খেলে না?

কেয়া    :         আমি তো রোজই পরে খাই।

বরকত  :         তা তো খাও! তবু আজ…

কেয়া    :         আমি এখনো মুখ ধুইনি।

বরকত  :         তা চট্ করে ধুয়ে এসো না।

কেয়া    :         তুমি খেয়ে নাও তো। আমার কাজ আছে।

বরকত  :         না Ñ এসো।

কেয়া    :         এখনো ছেলেমানুষি করার সময় আমার আছে বলে তুমি বিশ্বাস করো কী করে?

বরকত  :         ও! হ্যাঁ। আচ্ছা… যাও।

Narr : এরপর আর কথা চলে না। নিজের বাচাল ইচ্ছেটাকে স্মরণ করতে হয় বরকতের। কিন্তু রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনের অপরূপ উদ্ভাসের হাতছানিকে সে এড়াবে কী করে। তা কোনো কোনোদিন জোর করেই পাশে বসায় ওকে। বলে –

বরকত  :         তুমি যেন কেমন হয়ে যাচ্ছ কেয়া।

কেয়া    :         তাই নাকি? কই আমি তো কিছু বুঝতে পারি না।

বরকত  :         তুমি সেই আগের মতো নেই।

কেয়া    :         তা কেমন ছিলাম আগে?

বরকত  :         কেয়া। ওই ছবিটির দিকে তাকিয়ে দ্যাখো।

কেয়া    :         কী দেখবো?

বরকত  :         মনে পড়ে Ñ বিয়ের তিন মাস পর তোমার-আমার এই ছবিটা তুলেছিলাম?

কেয়া    :         মনে আছে।

বরকত  :         ছবিটা সত্যিই সুন্দর হয়েছিল।

কেয়া    :         তা ওই ছবিটার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছ না কী?

বরকত  :         না, না। তবু মনে হয়, বেশ মিষ্টি দেখাচ্ছিল তোমাকে।

কেয়া    :         সে তো এক যুগ আগেকার।

বরকত  :         জানি। তবু –

কেয়া    :         যাক, আর বক্ বক্ করতে হবে না। আমি চললাম।

বরকত  :         তবু… চলে গেলে। জানি। এই ‘তবু’ আমার অতৃপ্ত তৃষ্ণার জালা কেমন করে বলব, এই তবুর কী ভীষণ সাধ, কী ভীষণ দাবি। ওই ছবির মতো না হোক, একদিন কি একটু সাজগোজ করে পরিপাটি হয়ে চায়ের টেবিলে বসে, মিষ্টি হেসে বলতে পার না কেয়া, তোমাকে ক’চামচ চিনি দেব?

Narr : কিন্তু হৃদয়ের সুপ্ত ইচ্ছে একটা দীর্ঘশ্বাসের কাতরোক্তি জানিয়ে সেদিনের মতোই শেষ হয়ে যায়। বরকত অফিসে চলে গেলে কেয়া নিজেও ভাবে, তার মনে আবেগ বলে কিছু নেই কেন?

সে তো নিছকই যান্ত্রিক তাড়নায় কাজ করে যায়, অথচ জীবন একটু কিছু বেশি আশা করে। শুধু দায়িত্ব নয়, দায়িত্বের সঙ্গে একটু হৃদয়ের উত্তাপ, অথচ সে উত্তাপ তো কবেই ফুরিয়েছে।

আজ নতুন করে সে ইতিহাস মন্থন করে লাভ নেই। তার সুদীর্ঘ বত্রিশ বছর জীবনে যে ক্লান্তি, যে ব্যর্থতার তিক্ততা, হঠাৎ সে তার কিছু করতে পারে না। হঠাৎ করে পুরনো খোলসটা বদলে নিয়ে নতুন সাজে প্রলুব্ধ করতে পারে না কাউকে?

বরকত  :         সেই জন্যেই তো মনে প্রশ্ন ওঠে Ñ কেমন করে জীবনের ধারা বদলায়, কেমন করে মৃত্যু ঘটে আনন্দের? কে, কে দেবে এর উত্তর? কে করবে জবাবদিহি? তবু মাঝে মাঝে মনে হয় Ñ সেই পুরনো দিনের স্মৃতিচারণের মাঝে হয়তো কিছুটা স্বস্তি, কিছুটা তৃপ্তি মিশে আছে। শুধু মনে করতে পারি না, কোথায় এর সূচনা হয়েছিল, কেমন করে, কোনোদিন জীবনের আঙিনায় ছাতিয়ে পড়েছিল এ আনন্দের নিবিড় ছোঁয়াচ।

কেয়া    :         এ কেমন শীতের আর্তি, যা আমার মনকে বরফের মতো জমাট শীতলতার অচেতন অনুভূতিতে ডুবিয়ে ফেলেছে। কে, কে দায়ী এর জন্যে? …আমি? কিন্তু বিয়ে করে এ সংসারে যখন এসেছিলাম অনেক বসন্তের স্বপ্ন আমারও ছিল। আমার মনের অঙ্গনে নীড় বেঁধেছিল অনেক কুসুমিত আকাক্সক্ষা। কথার মুখরতায় সে আকাঙ্ক্ষা নিবেদন করেছি বারবার। ওঁকে বলেছি –

কেয়া    :         আজ কিন্তু সকাল-সকাল ফিরে এসো।

বরকত  :         কেন, হঠাৎ?

কেয়া    :         এমনি, একটু বাইরে যাব।

বরকত  :         (হাসি) ও, তাই বলো, আমি ভেবেছিলাম না জানি কী? তা আজ তো পারব না।

কেয়া    :         পারবে না কেন?

বরকত  :         মানে, একটু সিনেমায় যাব ঠিক করেছিলাম। পুরনো বন্ধু হঠাৎ ধরে বসল কিনা, তাই।

কেয়া    :         ও

বরকত  :         ইয়ে… আর একদিন না হয়…

কেয়া    :         না, না, তাতে কী… আচ্ছা এসো। আমি যাই, দেখি কী কী রান্না করা যায়।

বরকত  :         এই তো মড়ড়ফ মরৎষ, আচ্ছা চলি। কেমন?

কেয়া    :         হুঁ।

Narr : তবু মনকে প্রবোধ দিয়েছে কেয়া। ওর ব্যক্তিগত একটা-দুটো সখ পূরণে বাধা দেবে না। যদিও, একান্ত হয়ে নিবীড় হয়ে দুজনে একসাথে কোনো সিনেমায় গিয়ে ছবি দেখে কোনো রেস্তোরাঁয় খেয়ে, কিছু অলস মুহূর্ত কাটিয়ে বাড়ি ফেরার কথা সেও ভেবেছিল। কিন্তু একান্তভাবে একটি দিন উপহার দেবার সময় হয়নি বরকতের। আবার কোনোদিন নিজেই বাজারে গিয়ে কেয়া কিনেছে হালকা কমলা রঙের পর্দার কাপড়। বাড়ি ফিরে জিজ্ঞেস করেছে বরকত…

বরকত  :         কিনলে না কী?

কেয়া    :         হ্যাঁ।

বরকত  :         হঠাৎ?

কেয়া    :         পর্দাগুলো পালটাবো।

বরকত  :         বেশ তো ছিল। হঠাৎ পালটানোর সখ হলো কেন?

কেয়া    :         (বাষ্পাচ্ছন্ন হয়ে) কী বললে?

বরকত  :         না বললাম, আগেরগুলোতেই তো চলে যাচ্ছিল।

কেয়া    :         মনের মতো করে সাজাব। তুমি চাও না?

বরকত  :         দেয়াশলাইটা কোথায় যে রাখলাম।

কেয়া    :         হঠাৎ দেয়াশলাইয়ের কথা কেন?

বরকত  :         সিগ্রেট ধরাব। ও, ওই যে টেবিলের ওপর। (সিগ্রেট ধরায়) বাইরের দরজাটা একটু ভেজিয়ে রেখো।

কেয়া    :         কেন আজও কি রাত করে ফিরবে নাকি?

বরকত  :         হ্যাঁ, তা কথায় কথায় এত কৈফিয়ত চাইছ কেন? একটু তাস পিটতে যাব এই যা Ñ

কেয়া    :         ও।

Narr : কিন্তু পরদিন ব্যাপারটা একটু বিশ্রীরকমই দাঁড়িয়েছিল, অফিসে যেতে যেতে ফিরে আসে বরকত। বলে Ñ

বরকত  :         কিছু টাকা হবে?

কেয়া    :         টাকা?

বরকত  :         হ্যাঁ – গোটা দশেক টাকা দাও তো?

কেয়া    :         টাকা – টাকা তো নেই।

বরকত  :         নেই।

কেয়া    :         টাকা যা ছিল তা তো পর্দা কিনতেই শেষ হয়ে গেল।

বরকত  :         বেশ হয়েছে। ওসব লাটসাহেবিআনার কোনো মানে হয়? আমাকে দেখছি ফতুর করে ছাড়বে।

কেয়া    :         আমি তোমাকে…

 বরকত :         ইস্ দেরি হয়ে গেছে। যাচ্ছি।

Narr : আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায়নি বরকত। কোনো কথাই ফোটেনি কেয়ার মুখে। সেইদিনই সে আবিষ্কার করেছিল, তার ব্যক্তিত্ব শুধু অসার এক দম্ভ! যাকে টিকিয়ে রাখার জন্য এতটুকু প্রতিবাদের ঝড় উঠল না। ত্রিভুবন মথিত হলো না। বরং কাঠগড়ায় দোষী আসামির মতো মুখ নিচু করেই থাকল।

এমনি করে তার ছোটবড় বাসনাকে যে ধমকে, ভয় দেখিয়ে পর্যুদস্ত করছে বরকত। আর কেয়াও দিনে দিনে বুঝে নিয়েছে তার গণ্ডি।

কেয়া    :         আমার ইচ্ছের যেন কোনো দাম নেই এ সংসারে। ইচ্ছের ছায়ায় আমার অস্তিত্ব যেন ভয় পাচ্ছে বারবার। কিন্তু ও। …ভুল আমারই। ও তো বলেইছিল কোনো বাঁধাধরা নিয়মের শাসন ওর অসহ্য। ও বলেছে…

বরকত  :         না ভুলই করেছি।

কেয়া    :         কী রকম?

বরকত  :         আগের ছন্নছাড়া জীবনটাই অনেক ভালো ছিল। রাত করে ফিরতাম, দুপুর করে যেতাম, বেলা করে ঘুমোতাম…।

কেয়া    :         …ও! 

কেয়া    :         সেটা বুঝে নিয়েই আমার নীরব সম্মতির ছাড়পত্র অনেকদিন আগেই দিয়ে রেখেছি ওকে। আর সেজন্যেই এ নিয়ে অকারণ তিক্ততার ঝড় তোলার আগ্রহ আমার হয়ইনি কখনো। অসুবিধা কী। একদিন আমি নিজেও অভ্যস্ত হয়ে যাব বলেই তো ভেবেছি!

Narr : তাই সে ভেবে নিয়েছে বরকতের আচরণ সহজাত হৃদয়ের তাড়নায় উদ্বুদ্ধ! সেখানে বাদ সাধতে যাওয়া। বিকেলে অফিস করে ফিরলেই বরকতের চোখ দেখে বোঝা যায়, কী এক সীমাহীন ব্যস্ততায় ওটা মুহুর্মুহু চঞ্চল। এমনকি সারাদিনের খাটুনি কর্মব্যস্ততা Ñ এ যেন তার মুক্তির ক্ষণটি অর্জনের উদ্দেশ্যেই নিবেদিত। এমনকি বরকত যখন ফেরে, তখনো সে আমেজ কাটে না।

শুধু রূপ দিয়ে, দেহের আমন্ত্রণ দিয়ে তার আকাশচারী মনকে বাঁধতে ইচ্ছে করে না কেয়ার। করলেও ওটা মিছিমিছি পাখা ঝাপটে মরবে। তার চেয়ে যেমন চলছে চলুক। কোনো কোনো দিন নিজেই সোয়েটারটা এগিয়ে দিয়ে বলে :

কেয়া    :         ও কী ঠান্ডা লাগবে যে। এটা নিয়ে যাও সঙ্গে।

বরকত  :         সোয়েটার? দাও!

Narr : কোনো কোনো দিন চা ঢেলে দিতে দিতেই মনে করিয়ে দেয় Ñ (চা ঢালার শব্দ)

কেয়া    :         কী ব্যাপার Ñ সময় হচ্ছে না?

বরকত  :         উহ্… কিসের!

কেয়া    :         বা-রে- আজ না চ্যারিটি ফুটবল খেলা দেখতে যাওয়ার কথা ছিল তোমার?

বরকত  :         হ্যাঁ – হ্যাঁ –

কেয়া    :         দুটো টিমই নাকি খুব স্ট্রং শুনেছি।

বরকত  :         হ্যাঁ। তা বটে।

কেয়া    :         আরম্ভ হতে তো আর বেশি দেরি নেই।

বরকত  :         হ্যাঁ।… আরে আর মাত্র দশ মিনিট। উহ্। (চায়ে চুমুক দেবার শব্দ) চললাম।

Narr : এ সময়টা নিঃসঙ্গ কাটে কেয়ার। আশ্চর্য এ নিঃসঙ্গতা। কেমন অবচেতন, কেমন অসাড়, কেমন নিস্পৃহ। সব মিলিয়ে কেমন যেন অনুভূতিহীন একটা অনুভুতি। নির্লিপ্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, যেন জীবনকে সুখ, দুঃখ, আনন্দ-ক্লেশ হাজারো তারার ভিড়ে বিলীন। তার কোনো একটাকে আলাদা করে খুঁজে নেয়ার সাধ্য নেই।

আজকাল সন্ধে হলেই বরকতকে বাইরে পাঠানোর ব্যাকুল তাড়ানায় ব্যতিব্যস্ত হয় কেয়া। তা না হলে যেন সংসারের সুস্পষ্ট নিয়মের ধারাই ব্যহত হয়। বারান্দায় বরকতকে নিরূপদ্রব বসে থাকতে দেখে সেদিন কেমন অবাকই হয় ও । বলে…

কেয়া    :         কী আশ্চর্য। এখনো যাওনি?

বরকত  :         হুম।

কেয়া    :         কী হুম। আজ না তোমার কোন নাটকে যাবার কথা ছিল?

বরকত  :         না। ভালো লাগছে না। মাথাটা ধরেছে।

কেয়া    :         মাথা ধরেছে। কই দেখি জ্বর-টর নয় তো?

বরকত  :         না না, জ্বর নয়।

কেয়া    :         তবু ভালো (চধঁংব)! যাই কাজ করি গিয়ে।  

বরকত  :         শোন কেয়া, এখন আবার কী কাজ?

কেয়া    :         বা-রে রান্না-বান্না করতে হবে না?

বরকত  :         এই সন্ধেবেলা রান্না!

কেয়া    :         না, মানে সব তৈরি করি গিয়ে…! উহ্ কত কী করতে হবে।

Narr : অকারণেই রান্নাঘরে যায় ও। ব্যস্ততার ঝড় তোলে। যাক নিয়মের রাজ্যে এই ভীষণ বিশৃঙ্খলা না-হয় একটা দিন সহ্য করবে। কালই ভালো হয়ে উঠবে বরকত। অস্বস্তির হাত থেকে মুক্তি পাবে তখন কেয়া।

কিন্তু কী আশ্চর্য, তিন-তিনটে দিন এমনি বারান্দায় আরাম কেদারায় বসে কাটিয়েছিল বরকত।  একবার ভাবে জিজ্ঞেস করবে। কেমন যেন সঙ্কোচ হয়। কেমন বিব্রত বোধ করে। কেয়া ভাবে…

কেয়া    :         (স্বগত) তাহলে আজ এতদিন পরে এই যথেচ্ছ জীবনের স্রোতে গা ভাসিয়ে কি ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে? না কি, ওর উৎসাইটাই নিদারুণ হতাশায় ভুগছে? হয়তো তাই কিংবা হয়তো নয়। হয়তো রোববারের বিকেলেই আবার ওর মন ছটফট করে উঠবে। ঘরে মন টিকবে না কোনোমতেই। 

Narr : কিন্তু রোববার বিকেলেও তেমনি খবরের কাগজটা সামনে নিয়ে বসে বরকত। নিজেকেই যেন নিজে বিশ্বাস করতে পারে না কেয়া। কাছে গিয়ে বলে Ñ

কেয়া    :         বাইরে যাবে না?

বরকত  :         না।

কেয়া    :         রোববারে যে দাবা খেলতে যেতে!

বরকত  :         (কাগজটা ভাঁজ করে রাখতে রাখতে) যার ওখানে দাবা খেলতে যেতাম, সে নিজেই এখন মাত।

কেয়া    :         কী রকম?

বরকত  :         একজন তাকে একেবারে মাৎ করে দিয়েছে।

কেয়া    :         সে বুঝি খুব ভালো খেলোয়াড়?

বরকত  :         তা তো বটেই Ñ নইলে মাত করবে কী করে। এমন খেলাই খেলছে যে, দাবার ছক ঘুঁটি ছাড়াই তার রাজামন্ত্রী কিস্তি সব খতম।

কেয়া    :         সে আবার কেমন দাবার ছক, ঘুঁটি নেই অথচ Ñ

বরকত  :         আরে বুঝলে না Ñ সে বিয়ে করেছে। বউয়ের আঁচল ছেড়ে আর নড়তেই চায় না।

কেয়া    :         ও, তাহলে তোমার উপায় কী?

বরকত  :         আর কী।

কেয়া    :         একটা ছবিটবি না-হয় দেখে এসো।

বরকত  :         না, ওই একই গল্প। একই কাহিনি আর কাহাতক ভালো লাগে বলো।

কেয়া    :         তবু সময় তো কাটে।

বরকত  :         তা কাটে। তবে ওই ভিড়ে দাঁড়িয়ে টিকিট কেনার ধৈর্য নেই।

Narr    :         ভেবেই পায় না কেয়া আর কী করতে বলবে তাকে। কেমন করে তার ভালো লাগার পথ বাতলে দেবে। তাছাড়া আরো একটা ভয়। এমন নিবিড়    অন্তরঙ্গ নিরলস হয়ে মুখোমুখি তারা বসেনি এক যুগ। নিজের মনের ওপর বিশ্বাস নেই। আস্থা নেই তার। কেয়ার গম্ভীর চেহারার মুখোশটি যদি আজ কান্নায় বিপর্যস্ত হয়। সে যদি আবেগে মথিত হয়ে মেয়েলি কান্না জুড়ে দেয়।

না, বরকত অতটা অমানুষ নয়। ওই তো আলোয়ান গায়ে চাপিয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা পকেটে তুলে নিয়ে বাইরে বেরুবার উপক্রম করছে। স্বস্তির নিশ^াস ছাড়ে কেয়া।

যাক নিয়মের চাকাটা চলতে শুরু করেছে আবারও। এখন শান্তি, অবারিত শান্তি। মোড়াটা টেনে নিয়ে বাইরে এসে বসে কেয়া।

কুয়াশা পড়েছে। দূরের পথ-ঘাট চেনা যায় না। হঠাৎ কার পায়ের আওয়াজ শোনা যায়। চমকে ওঠে কেয়া।

কেয়া    :         আমি -।

বরকত  :         হুঁ…।

কেয়া    :         তোমার হাতে ওটা কী?

বরকত  :         এটা একটা চারা। রজনীগন্ধার চারা

কেয়া    :         রজনীগন্ধা, কী হবে ওটা দিয়ে?

বরকত  :         দাঁড়াও বলছি। শোনো, কানে কানে বলি Ñ বাগান করব। মনে পড়ে Ñ অনেকদিন আগে আমাকে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা আনতে বলেছিলে।

কেয়া    :         বলেছিলাম নাকি?

বরকত  :         হ্যাঁ।

কেয়া    :         কবে বলেছিলাম, এখনো মনে রেখেছ। তা এখন রজনীগন্ধা দিয়ে কী হবে?

বরকত  :         তোমার হাতটা এখনো সেই আগের মতোই নরম রয়েছে তো বেশ।

কেয়া    :         ছাড় – কাজ আছে।

বরকত  :         না। – শোন, আমার আর বাইরে যেতে ভালো লাগে না কেয়া।

কেয়া    :         উহ্! তুমি…

বরকত  :         আচ্ছা কেয়া, রজনীগন্ধা ফুটতে কতদিন?

কেয়া    :         কী জানি?

বরকত  :         তোমাদের বাড়িতে রজনীগন্ধা ছিল না?

কেয়া    :         ছিল হয়তো। আমার মনে হয় এ ফুল ফুটতে বোধহয় এক ঋতু লাগে।

বরকত  :         বেশ একটা কেন Ñ ঋতুর পর ঋতু অপেক্ষা আমি করব।

কেয়া    :         তুমি?

বরকত  :         হ্যাঁ কেয়া, আমি।

কেয়া    :         দ্যাখ ওই ছবিটা দ্যাখ।

বরকত  :         সত্যি ওই ছবির মতোই তুমি আজও সুন্দর।

কেয়া    :         তোমার পাশে বলেই সুন্দর।

Narr : অন্ধকারে নিজের মুখ দেখা যায় না। তবু কেয়া জানে, নিদারুণ হতাশা আর বেদনার ছায়া রাতের কুয়াশাজালের মতোই মিশে যাচ্ছে। সেই এক যুগ আগেকার ফ্রেমেবাঁধা ছবির মতো একটি মেয়ে, তার মন-সায়র থেকে জেগে উঠছে ধীরে ধীরে। তেমনি মোহময় পুলকিত দৃষ্টি নিয়ে। বয়সের শাসন তাকে এতটুকু স্পর্শ করতে পারেনি।

কেয়া    :         আমি জানি Ñ তোমার রজনীগন্ধা ফোটার অনেক অনেক আগে আমার মনের একটি নিবিড় ইচ্ছা সুরভিতে ভরে উঠবে। আর তার জন্যে এক ঋতু অপেক্ষা করার দরকার হবে না।

বরকত  :         কেয়া

কেয়া    :         কী?

বরকত  :         আবার বোধহয় আমরা জীবন ফিরে পেলাম।

কেয়া    :         আমারও তাই মনে হয়।

বরকত  :         উহ্!

কেয়া    :         কী হলো। বরকত  :         কিছু না! ভালো লাগছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *