চরিত্রলিপি
মোবারক গৃহস্বামী
নাসিম বানু গৃহকর্ত্রী
কবীর মোবারকের ভাগ্নে, বেকার যুবক
রুবী মোবারকের বড় মেয়ে
রীনা মোবারকের ছোট মেয়ে
মতিন মোবারকের ছেলে
কাসেম প্রতিবেশী, শিকারি
আবদুল কাসেমের ড্রাইভার
প্রথম দৃশ্য
একতলা বাড়ির বারান্দা। কিছু বেতের চেয়ার এবং মোড়া রাখা। এক ধারে লম্বা সাজানো ফুলের টব। কিছু টব আবার বারান্দার ছাদের সঙ্গে ঝোলানো। সেগুলোতে মানি-প্ল্যান্টের ঝাড়। বারান্দার মাঝামাঝি, ঘরে যাবার যে দরজা তাতে পর্দা। হাওয়ায় খানিকটা আন্দোলিত। দুহাতে হাঁটু জড়িয়ে একপাশে মোড়ায় বসে কবীর। বয়েস পঁচিশ-ছাব্বিশ। কিছুটা উদাস দৃষ্টি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। স্তিমিত আলোয় তাকে ভালো দেখা যায় না। তবে বোঝা যায়, চিন্তাগ্রস্ত। পর্দা সরিয়ে ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে আসে রুবী। বয়েস বাইশের কাছাকাছি। হাতে চায়ের কাপ।
রুবী : (দরজার মুখে মৃদু হোচট খেয়ে) ইস্, আরেকটু হলে গিয়েছিল কাপটা।
কবীর : (গলার শব্দে সচকিত হয়ে) কে? (পেছন ফিরে রুবীকে দেখে আশ্বস্ত হয়ে) ও।
রুবী : চা পড়ে গেল খানিকটা।
কবীর : কার চা?
রুবী : (এক হাতে মাঝখানের খান দুয়েক চেয়ার সরিয়ে, কাছে এসে) তোমার জন্যে বানিয়ে নিয়ে এলাম।
কবীর : (নির্লিপ্তভাবে) এ সময় তো চায়ের দরকার ছিল না।
রুবী ছিল না জানি। নিজের জন্যে বানিয়েছিলাম। ভাবলাম তোমাকেও এক কাপ দিই। (চায়ের কাপ রাখার জন্যে কোনো কিছুর খোঁজ করে না পেয়ে) কই ধরো। (কবীর হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপখানা নেয় ও অন্যমনস্কভাবে মৃদু চুমুক দেয়) চিনি লাগবে?
কবীর : (মাথা নেড়ে জানায়) না।
রুবী : (আঁচল দিয়ে মেঝের খানিকটা পরিষ্কার করে নিয়ে সেখানেই হাত-পা ছড়িয়ে বসে। তারপর আবার সেই আঁচল দিয়েই নিজের মুখের ওপর একটু হাওয়া করে নেয়) বেশ তো হাওয়া এখানে। ভেতরে দমবন্ধ হয়ে মরছিলাম।
কবীর : (চায়ের কাপ ছুঁতে ছুঁতে মৃদু সমর্থনের ভঙ্গিতে মাথা দোলায়) হুঁ।
রুবী : (উঠে দাঁড়ায়) একটু পাপড় দেব? ভেজে রেখেছিলাম।
কবীর : (তেমনি অন্যমনস্কভাবে) পাপড়? (কিছুক্ষণ থেমে) না, থাক।
রুবী : (আবার বসে পড়ে) বেশ থাক তাহলে। (টবের কাছে সরে গিয়ে রজনীগন্ধার ডালখানা নাকের কাছে এনে ঘ্রাণ নেয়। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে মানি-প্ল্যান্টের ঝুলে থাকা লতাখানা কোনো কিছুর সঙ্গে পেঁচিয়ে দেবার চেষ্টা করে। পারে না।) কথা বলছ না যে। (একটু থেমে নিয়ে) গিয়েছিলে?
কবীর : হুঁ।
রুবী : কী হলো? (রুবী বসল। আগ্রহে এগিয়ে এলো খানিকটা আরো।)
কবীর : কী আর হবে। ইন্টারভিউ দিলাম, ফিরে এলাম এই আর কী। যা হয় বরাবর।
রুবী : (হঠাৎ কেমন উদ্বিগ্ন। মাথার একটা ক্লিপ দাঁতে চেপে ধরে খোঁপা ঠিক করে নিতে নিতে) হতে হতেও হয় না, তাই না? এক একজনের ভাগ্যই এমন।
কবীর : (চায়ের কাপখানা নাবিয়ে রাখে) হবার লক্ষণ দেখলে কোথায় আবার। নতুন তো কিছু ঘটেনি।
রুবী : ওরকম তিরিক্ষি হয়ে আছ কেন?
কবীর : আজকাল আমার কথাই ওরকম শোনায়।
রুবী : (উঠে গিয়ে বারান্দার বাতি জ্বালায়) তবু একটু ভালো করে তো বলা যায়।
কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কোনো কথা নেই। কবীর কাপখানা তুলে নিয়ে আস্তে আস্তে চুমুক দেয়। চা শেষ করে আবার ওখানা নামিয়ে রাখে।
রুবী : (একটা মোড়া টেনে প্রায় ওর মুখোমুখি বসে) একটা কথা বলব, রাগ করবে না তো?
কবীর : বলো।
রুবী : তুমি ইন্টারভিউতে যাও-ও কেমন গবেটমার্কা হয়ে। কই একটু সেজেগুঁজে ধোপদুরস্ত হয়ে যাবে, তা না। মানে, রাগ করো না, পোশাক-আশাকটা একবারে ফেলনা নয় আজকাল। কী হয় একটা টাই-ফাই লাগিয়ে গেলে?
কবীর পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট বের করে। খালি দেখে ওখানা আস্তে করে ছুড়ে দেয়।
রুবী : কি, সিগ্রেট নেই?
কবীর : না, ঠিক আছে।
রুবী : (প্যাকেটখানা কুড়িয়ে নেয়। তারপর ভেতরের চাঁদি বার করে ওখানা মুড়তে থাকে আপনমনে) জানো মুখে যাই বলি, পুরুষ মানুষকে সিগ্রেট খেতে না দেখলে কেমন যেন মানায় না। আনিয়ে দিই?
কবীর : না।
রুবী : (কী মনে করে) দাঁড়াও আসছি (রুবী ভেতরে যায়। কবীর তার যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে মুখ সরিয়ে নেয়। কিছুক্ষণ পর রুবী ফিরে আসে ব্যাগ হাতে। দশটা টাকা বের করে বাড়িয়ে দেয় ওর দিকে) নাও, রাখ।
কবীর : কী করব?
রুবী : তুমি নিজেই আনিয়ে নিও না-হয়।
কবীর : না, দরকার নেই। সিগ্রেট বড় বেশি একটা শখ নেই আজকাল।
কবীর : (তখনো টাকাটা হাতে। যেন কোনো সদ্যুক্তির অভাবে ইতস্তত ভাব।) তাহলে অন্য কাজে আসবে। মানে, কাজকর্মে বাইরে যেতে হয়। কখন কী দরকার বলা তো যায় না। (একটু থেমে) তাছাড়া টাকা আমার। আমি দিচ্ছি।
কবীর : (যেন তার কথার প্রতিধ্বনি করে এবং খানিকটা চড়া গলায়) আমি দিচ্ছি, আমি দিচ্ছি। তুমি দেবে কেন? কেও কাউকে দেয় না।
রুবী : (ওর কথায় আহত হয়ে) দেয় না?
কবীর : না। নিছক স্বার্থ না থাকলে দেয় না।
রুবী : আমারই স্বার্থ নেই, জানো কেমন করে। থাকতেও তো পারে। (আড়চোখে তাকিয়ে) নাও রাখ।
একরকম জোর করে টাকাটা ওর পকেটে পুরে দেয়। কবীর বাধা দেয় না।
আত্মসম্মানে যদি বাধে, চুকিয়ে দিও না-হয় একদিন কড়ায়-গ-ায়।
কবীর : জানতাম নিতেই হবে। আসলে আমার সাহস নেই।
রুবী : সাহসের কথা উঠল আবার কিসে।
কবীর : কোনো কিছুর প্রতিবাদের সাহস নেই।
রুবী : প্রতিবাদ বলছ কেন। অন্যায় করেছি কিছু?
কবীর : তাতে প্রতিবাদ করব কেন। বরং কৃতজ্ঞই থাকা উচিত। কিন্তু কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তোমাকে যে খুশি করব, সে শক্তিটুকুও নেই।
রুবী : এতে আবার শক্তি লাগে নাকি। আর, আমাকে খুশি করার জন্যেই তো বলতে। মন থেকে তো আর বলতে না।
কবীর : বললেই কি আর কেউ বিশ্বাস করত?
রুবী : (মুখ নিচু করে) বলে দেখলেই পারতে। (একটু থেমে) না বলে ভালোই করেছ। তুমিই কি আর আমার কথা বিশ্বাস করতে।
কবীর : যেমন?
রুবী : না বলছিলাম, তোমার সঙ্গে দু’দ- বসে ভালো লাগে, বিশ্বাস করতে একথা বললে? করতে না। ভাবতে করুণা করছি।
কবীর : সেটাই তো স্বাভাবিক।
রুবী : তার চেয়ে যেমন চলছে চলুক, কী বলো?
কবীর : কেমন?
রুবী : এই যে, তুমি ভাবছ, আমি বিশ্বাস করছি না। আমি ভাবছি, তুমি বিশ্বাস করছ না। অথচ দুজনেই কিছু না কিছু ভাবছি।
কবীর : সেটাই তো ভালো।
রুবী : ভালো তো বললে। কিন্তু মনকে বোঝানোই দায়।
কবীর : সময় সবকিছুকেই সয়ে নেয়। তাছাড়া ততদিনে তোমার বিয়ে-থা হয়ে যাবে।
রুবী : কথাটা ইচ্ছে করেই খুব সহজভাবে বললে, তাই না?
কবীর : সহজ করে নেওয়াটাই কি ভালো নয়?
রুবী : সহজভাবে বলা আর সহজ করে নেওয়া কি এক কথা হলো। (খানিকক্ষণ থেমে) তাছাড়া মনের কী হবে?
কবীর : মন? ফুঁ, সব সয়ে যাবে একদিন ঠিক, দেখে নিও।
হর্নের এবং সে-সঙ্গে গাড়ি এসে থামার শব্দ। রুবীর বাবা, মোবারক ও মা নাসিমবানুর প্রবেশ। বারান্দায় আলাপরত কবীর ও রুবীর প্রতি তাদের অর্থপূর্ণ দৃষ্টি। রুবী খালি চায়ের পেয়ালা তুলে নিতে ব্যস্ত।
নাসিম : কার চা আবার?
রুবী : আমি বানিয়েছিলাম।
নাসিম : অসময়ে চা খাবার শখ হলো আবার কবে থেকে? (রুবী চায়ের কাপখানা নামিয়ে রাখে। মোবারক ও নাসিমবানু দুটো চেয়ার টেনে বসে।)
মোবারক : (কবীরের প্রতি) বাসায় বসে না থেকে মোয়াজ্জেম সাহেবের সঙ্গে দেখা করে এলে পারতে। পায়ের ওপর পা তুলে কদিন চলবে শুনি। চাকরি কেউ তো আর সেধে দেয় না। (টাইয়ের গেরো ঢিলে করে) কী হলো ইন্টারভিউয়ের?
কবীর : গিয়েছিলাম।
মোবারক : গিয়েছিলে তা তো জানি। হলো কী?
নাসিম : হবে আর কী, সেই পুরনো কাহিনি।
মোবারক : কিন্তু কেন। দুনিয়ার আর সবার হয়, তোমার হয় না কেন। তোমার সঙ্গে তো কারো শত্রুতা নেই।
নাসিম : চাকরি কি আর বেছে বেছে হয়। তোমার কথামতো মিউনিসিপ্যালিটিতে দরখাস্ত করলে হতো। চেনা লোক ছিল। না, তাতে আঁতে ঘা লাগল।
কবীর : কোয়ালিফিকেশন ছিল না।
নাসিম : তা থাকবে কেন। ওদিকেও তো আবার ফরসা।
রুবী : কোয়ালিফিকেশনের সংজ্ঞা সমাজে অনেক পালটে গেছে মা। মিছিমিছি (বুটের আওয়াজ শোনা যায়। সবাই তাকিয়ে দেখে। বন্দুক হাতে শিকারির পোশাক পরে কাসেমের প্রবেশ)।
মোবারক : আসুন, আসুন কাসেম সাহেব। কী খবর?
কাসেম : এই ফিরলেন নাকি? আমিও ফিরলাম এক্ষুনি। আপনাদের গাড়ির আওয়াজ শুনে এলাম। পাশাপাশি বাড়ি থাকার এই সুবিধে।
মোবারক : তা চলুন, বরং ভেতরে বসা যাক।
কাসেম : চলুন।
কাসেম, মোবারক এবং নাসিমবানুর প্রস্থান। রুবী এবং কবীর একা।
দ্বিতীয় দৃশ্য
ভেতরে বসবার ঘর। মাঝামাঝি জায়গায় জানালা। মোটামুটি পরিপাটি করে সাজানো। বসার জন্য সোফা। সেন্টার টেবিল। একপাশে শেল্ফে কিছু বইপত্র।
মোবারক : ভালো আর কই। একদ- শান্তি নেই। শক্ত-সমর্থ ছেলে বাড়িতে বেকার পড়ে। কোথাও যে লেগে পড়বে তার কোনো চাড় নেই। বলুন নিজের চেষ্টা না থাকলে, অন্যে কী করবে। দূর সম্পর্কের হলেও ভাগ্নে তো। বলতে পারি না কিছু।
কাসেম : তা তো ঠিকই। নিজের চেষ্টা ছাড়া হয় না।
মোবারক : না, না সেজন্যে নয়। যদ্দিন আছি। খাও-দাও, কেউ মানা করছে না। কিন্তু সারাজীবন তো আর এ দায় টানা যায় না।
নাসিম : আর একজন তো নয়। এক রাজ্যের মানুষ। দেশের আত্মীয়-স্বজনরা তো লেগেই আছে। আজ এটা, কাল ওটা। তার ওপর Ñ
মোবারক : যাক সেসব কথা। আপনি বসুন। একটু কাপড় ছেড়ে আসছি।
মোবারক ও নাসিমবানুর প্রস্থান। রুবীর বোন, রীনার প্রবেশ। বয়েস আঠারো-উনিশ।
কাসেম : এই যে রীনামনি, কী খবর?
রীনা : তার আগে আপনার খবর বলুন চাচা। কী শিকার পেলেন আজ?
কাসেম : তেমন কিছু পাইনি। আর গেলামই কোথায়। বাজিতপুর কি শিকারের জায়গা? হ্যাঁ যেতাম চরে, দেখতে Ñ
রীনা : তবু, শুনেছি আপনার খুব হাতযশ। শিকার ফস্কায় না কোনোমতে।
কাসেম : (পুলকিত হয়ে) তা বলতে পারো। আসল হচ্ছে সাধনা, লেগে থাকার অধ্যবসায়। হাতযশ কি আর একদিনে হয়েছে। যখন যেটা ধরেছি মনপ্রাণ দিয়ে আঁকড়ে ধরেছি। শিকারই বলো আর যাই বলো। লক্ষ্য আমার অব্যর্থ।
রীনা : তাহলে জঙ্গলের বাঘ-ভল্লুকদের দুর্দিন আসন্ন বলুন।
কাসেম : (এই শেষের উক্তির প্রচ্ছন্ন কটাক্ষে যদিও অপ্রসন্ন, তবু ব্যাপারটা হালকা করে নেবার চেষ্টায়) তা, তা বলতে পারো। পারো বইকী!
নাসিমবানুর প্রবেশ
নাসিম : কই কবীর কোথায়? আপনি একটু বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বলুন না। আমরা তো হদ্দ হয়ে গেলাম।
কাসেম : কই, ডাকুন না ওকে। একটু কথা বলি।
নাসিম : কবীর, কবীর।
কাসেম : (একটু ভেবে নিয়ে) আপাতত একটা কাজ বোধহয় করা যায়।
নাসিম : কী কাজ?
কবীরের প্রবেশ।
কাসেম : এক কাজ করুন না। দিন না আমার সঙ্গে লাগিয়ে। আমাকে তো হরদমই বাইরে যেতে হচ্ছে। কিছুদিন ঘোরাফেরা করলে আপনা থেকেই চটপটে হয়ে যাবে। দেখুন না, শিকার-টিকার এদিক-সেদিক যাই। এর সঙ্গে ওর সঙ্গে সাক্ষাৎ Ñ
রীনা : তাই বলে যাদের সঙ্গে আপনার অহরহ সাক্ষাৎ সেই বাঘ-ভল্লুকের হাতে আবার তুলে দেবেন না কবীরভাইকে।
নাসিম : আঃ! কী হচ্ছে রীনা, থাম তো। (কাসেমের প্রতি) তা যাক না আপনার সঙ্গে। ভালোই হয়। যাই চা দিতে বলি।
নাসিম ও রীনার প্রস্থান।
কবীর : দেখুন, আমি ঠিক বন্দুক চালাতে জানি না।
কাসেম : বন্দুক চালাতে জানো না, তাতে কী হয়েছে। মায়ের পেট থেকে পড়েই কি আর সবাই শেখে। কিছুদিন থাকো, দেখতে দেখতে আপনা থেকেই Ñ
কবীর : (আড়ষ্ট হয়ে এককোণে বসে) কিন্তু ততদিন কী কাজে আসব?
কাসেম : কী কাজে আসবে তা আমি কী করে বলব। এমনিতেই আমার লোকজন দরকার। সাজ-সরঞ্জাম, এটা-সেটা দেখাশুনা করা। কাজ কী আর একটা।
কবীর : আপনার সঙ্গে গেলে যদি চাকরি হয়, যাব।
চা-হাতে রুবীর প্রবেশ।
কাসেম : চাকরি হবে কি না কথা দিতে পাচ্ছি না। তবে, চেষ্টা করব। আর যদি না হয়, আমার সঙ্গে থাকবে খাবে-দাবে। চিন্তার কী।
রুবী চা টি-পয়ের ওপর রাখে।
রুবী : তাহলে আর গিয়ে কী লাভ? সেটা তো এখানেও হচ্ছে।
কাসেম : (চায়ের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে) চা? তা মন্দ না, খাওয়া যেতে পারে এক কাপ। (চুমুক দিয়ে সরিয়ে দেয় মুখভঙ্গি করে) চা-টা কড়া হয়েছে।
রুবী : তাহলে একটু দুধ দিই।
কাসেম : না, না। চা-টাই কড়া। অত কড়া চা আমার চলে না।
মোবারকের প্রবেশ।
কাসেম : (মোবারকের উপস্থিতি লক্ষ করে) না, বলছিলাম, চাকরি তো আর কেউ হাতে তুলে দেয় না। তার জন্যে নিজের চেষ্টা চাই। সাধনা চাই।
মোবারক : (মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়।)
কবীর : চেষ্টার আমি ত্রুটি করিনি।
কাসেম : তাহলে হয় না কেন?
রুবী : হয় না কারণ চাকরির জন্যে যেরকম তোষামুদি দরকার তা সবাইকে দিয়ে হয় না।
মোবারক : (ধমকের সুরে) আহ্ রুবী, তোমার চাচার সঙ্গে কথা বলছ তুমি!
রুবী : সবাই মিলে একজনের পেছনে এভাবে লাগার কী মানে হয় জানি না। যাও তো কবীরভাই, খামোকা দশজনের দশরকম লেকচার না শুনলেও চলবে।
কবীর : (খানিকটা বিব্রত। একবার রুবীর, তারপর কাসেম সাহেবের দিকে তাকিয়ে) না না, আপনার কথাই ঠিক। আপনার সঙ্গেই যাব। কিন্তু কখন?
কাসেম : সময়মতো আমি খবর দেব।
কবীরের প্রস্থান। পেছন পেছন রুবীর অনুগমন।
মোবারক : কিছু মনে করবেন না, মেয়েটা বড় অবাধ্য। (একটু থেমে নিয়ে) কই, কে আছিস কাপটা নিয়ে যা।
রীনার প্রবেশ।
রীনা : ডেকেছ?
মোবারক আঙুল দিয়ে কাসেম সাহেবের সামনে রাখা খালি কাপের দিকে নির্দেশ করে। রীনা ওখানা তুলে নিয়ে যেতে যেতেও দাঁড়িয়ে পড়ে। ওদের কথা শুনতে থাকে।
কাসেম : (কিছুটা উত্তেজিত) অবাধ্য, অবাধ্য হবে কেন? তার মানে শাসন হয় না।
মোবারক : আগে অমন ছিল না।
মোবারক একটা পত্রিকা তুলে নিয়ে তাতে মনোনিবেশ করে।
কাসেম : আমার বাড়িতে ওসব নেই। বিয়ে করিনি ঠিক, কিন্তু আমার কথার ওপর টুঁ শব্দ করার কারো সাহস নেই।
রীনা : বাড়িতে অমন বাঘা অ্যালসেশিয়ন থাকলে সবাইকে শাসানো যায়।
কাসেম : সেই বাঘা অ্যালসেশিয়ন বশ মানাতে পারলে ভেজা বেড়ালটি সেজে বসে থাকে।
রীনা : বলেন কি! অমন কুকুর বশ মানাবেন। ওটা দেখলেই যে ভয়ে আমার পিলে চমকায়।
কাসেম : তা বলতে পারো। কিন্তু আমার কাছে বাপু সবাই ঠান্ডা। হেঁকে বলব, তরতর করে লেজ গুটিয়ে বসে পড়বে।
রীনা : কোনোদিন অবাধ্য হয় না?
কাসেম : না। (যেন কথার খেই হারিয়ে) মানে ইয়ে করছি না Ñ তা না হলে এটা (বন্দুক দেখিয়ে) রয়েছে কেন?
কাসেমের প্রস্থান।
তৃতীয় দৃশ্য
একই স্থানে। এককোণে বসে কবীর পত্রিকার পাতা ওলটাচ্ছে, সন্তর্পণে। ভাবটা এমন যেন এটা তার অনধিকার চর্চা। মাথার চুল অবিন্যস্ত। শার্টের ওপরের দুটো বুতাম খোলা। নাসিমবানুকে ঢুকতে দেখে যেন আঁৎকে ওঠে। পত্রিকা রেখে দিয়ে সটান উঠে দাঁড়ায়।
নাসিম : তোমার না ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা ছিল। গিয়েছিলে?
কবীর : না তো।
নাসিম : (বসল) তা যাবে কেন। বারান্দায় বসে গপ্প না করে ততক্ষণে একবার ঘুরে এলেই পারতে। রোজই বলে দিতে হয় নাকি।
কবীর : এখন যাই তাহলে।
নাসিম : ডাক্তার তোমার জন্যে বসে কিনা।
কবীর : এখন তো সবে আটটা।
নাসিম : তাহলে দাঁড়িয়ে না থেকে, গেলেই পারো।
কবীর : যাচ্ছি।
প্রস্থানের উদ্যোগ করে Ñ
নাসিম : (আসন থেকে উঠে) দাঁড়াও। ছুটছ কোথায়? প্রেসক্রিপশন নিতে হবে না? (টেবিলের দেরাজ থেকে কাগজ বের করে ওর হাতে দেয়।) জিজ্ঞাসা করো ওইটাই চলবে, না নতুন ওষুধ দেবে।
কবীর : শরীরের কথা জিজ্ঞেস করলে কী বলব?
নাসিম : কী আর বলবে। বলো পায়ের ব্যথাটা আগের মতোই। রাতে ঘুম হয় না। ঘুমের কোনো ওষুধ দিতে পারলে ভালো হয়।
নাসিমবানুর প্রস্থান। কেমন টেনে-টেনে হাঁটে। নাসিমবানুর ছেলে মতিনের প্রবেশ। বয়েস বাইশের কাছাকাছি।
কবীর : আচ্ছা।
মতিন : বেরুচ্ছ নাকি কবীরভাই।
কবীর : হ্যাঁ।
মতিন : ভালোই হলো। লন্ড্রিতে আমার একটা কাপড় ছিল। পথেই পড়বে। আর Ñ আর কী যেন মনে করেছিলাম Ñ হ্যাঁ গোটা পাঁচেক সিগ্রেট নিয়ে এসো। চাকর-বাকরের হাতে পয়সা দিতে ভরসা হয় না। এই নাও লন্ড্রির রশিদ, এই টাকা।
লন্ড্রির রশিদ ও টাকা দেয়। মতিনের প্রস্থান। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দৌড়াতে দৌড়াতে এসে ঢোকে রীনা। হাতে একখানা খাম।
রীনা : কবীরভাই, প্লিজ একটু দাঁড়াও না। (চিঠিখানা হাতে তুলে দিয়ে) এখানা টিকিট লাগিয়ে জিপিও-তে ছেড়ে দিতে হবে।
কবীর : কি, চিঠি?
রীনা : (নিচু গলায়) আঃ! চেঁচিও না। তুমিও যে কী। আর, শোনো কোন রাস্তা দিয়ে যাবে?
কবীর : কেন?
রীনা : কাল মিনার্ভায় ম্যাটিনি শো-র দুটো টিকিট।
কবীর : দুটো কেন, রুবীও যাচ্ছে নাকি?
রীনা : না, না। ওর জন্যে আমি কেন টিকিট করতে যাবো। ইচ্ছে হয় নিজেই যেতে পারে। স্কলারশিপের টাকা পায়।
কবীর : আচ্ছা, আচ্ছা। দাও।
রীনা : (নিচু গলায় কাছে এসে) অন্য কাজ হোক না হোক, টিকিট কিন্তু আনা চাইই চাই। কেমন?
কবীর : আচ্ছা।
রীনা : (চারদিকে তাকিয়ে) কাউকে কিন্তু বলো না, চিঠি আর টিকিটের কথা। প্লিজ।
রীনার প্রস্থান। কবীর ওষুধের প্রেসক্রিশপন, লন্ড্রির রশিদ এবং চিঠি গুছিয়ে পকেটে রাখতে যায়। এমন সময় মন্থর গতিতে এসে ঢোকে রুবী। হাতে তার একখানা খোলা বই। কবীর তা লক্ষ করে না।
কবীর : (কাগজগুলো গুছিয়ে নিয়ে নিজের মনে-মনেই) মনে থাকলেই হয়। (হঠাৎ রুবীকে লক্ষ করে) তোমার দরকার নেই কোনো কিছুর?
রুবী : (একটু দূরে দেয়ালঘেঁষে দাঁড়িয়ে কবীরকে লক্ষ করতে থাকে) আছে। এসো, কাছে এসো।
কবীর : (অবাক হয়ে) কাছে আসব?
রুবী : হ্যাঁ।
কবীর শঙ্কিতচিত্তে কাছে এগিয়ে যায়। রুবী বই রেখে দিয়ে দুহাতে ওর শার্টের খোলা বুতাম লাগাতে থাকে।
চতুর্থ দৃশ্য
একই স্থান।
রীনা হাতে একখানা চিঠি নিয়ে ঢোকে। মতিন উৎকণ্ঠিত হয়ে ওখানা তার হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়।
মতিন : কার চিঠি দেখি।
রীনা : তোমার নয়।
মতিন : (চিঠির ঠিকানা দেখে ওখানা রীনাকে ফেরত দিয়ে) ও, আমি ভাবছিলাম লন্ডন থেকে আমার ভর্তির চিঠি এলো বুঝি। দিয়েছিলাম ছাড়তে কবীরভাইকে। ঠিকমতো ছাড়ল কিনা কে জানে।
রীনা : আমি নিজেই চিঠির জন্যে হয়রান।
মতিন : কাল তো একটা চিঠি পেলি। রোজ রোজ আসবে নাকি?
রীনা : তা অবশ্যি।
মতিনের প্রস্থান। মোবারকের প্রবেশ।
মোবারক : (রীনার হাতে চিঠি দেখতে পেয়ে) তোর হাতে কী?
রীনা : চিঠি।
মোবারক : (হাতে নিয়ে) দেখি কার।
রীনা : কবীরভাইয়ের বোধহয়।
মোবারক : (চিঠিখানা উঁচু করে আলোর সামনে ধরে। তারপর খামের এক ধার ছিঁড়তে থাকে। রীনা গভীর উৎকণ্ঠায় পেছনে দাঁড়িয়ে) সে আর নতুন কী। চাকরি হয়নি জানিয়ে দিয়েছে বোধহয়।
চিঠি পড়ে মোবারককে চিন্তাগ্রস্ত মনে হয়।
মোবারক : এ, এতো দেখছি Ñ কী বলে Ñ চাকরির চিঠি। একশ দশ টাকা, সর্বসাকল্যে একশ পঁচিশ। মফস্বলে ট্যুরে গেলে যাতায়াত ভাড়া আলাদা। (মুখ তুলে) কই, শুনছ?
রীনা : মাকে ডাকবো?
মোবারক : হ্যাঁ ডাকো।
রীনার প্রস্থান ও কিছুক্ষণ পর নাসিমবানুসহ পুনরায় আগমন।
চাকরির চিঠি।
নাসিম : কার চাকরি?
মোবারক : আর কার, আমার গুণধর ভাগ্নের। নাও, এবার আর টিকিটি পাবে না। এতদিন যাও দুটো কথা শুনতো, এখন বাছাধন হাতের নাগালের বাইরে।
নাসিম : (বসে) ও, বাবা। এও তো আচ্ছা জ্বালাতন। সকাল-সকাল অফিসের নাম করে ছুটবে আর ফিরবে সেই সন্ধে করে।
মোবারক : তা তো বটেই।
নাসিম : (একবার চোখ বুলিয়ে চিঠিখানা দেখে মোবারককে ফিরিয়ে দেয়। মোবারক ওখানা সামনের টেবিলে রাখে। তবু সেই তো বাপু, আমাদের ঘাড়ে চেপে খাওয়া। আমার তো মনে হয়, ওই একশ টাকার চাকরি করাও যা, না করাও তাই। তবু সকাল-বিকেল দুটো ছুটকো-ছাটকা কাজ করিয়ে নেওয়া যেত।
রীনা : আমার কী হবে। কবীরভাই না থাকলে আমাকে কলেজে দিয়ে আসবে কে?
(মতিনের প্রবেশ। মতিন শেল্ফে বই খুঁজতে যায়)
(মতিনের উদ্দেশে) জানো, কবীরভাই চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছে।
মতিন : (শেল্ফের বইখানা তুলেও তোলে না) বলিস কি! আমি তো আজ বাদে কাল লন্ডন চললাম। তোমাদের দেখাশোনা করার জন্য একটা লোক দরকার। আমার মনে হয় একটু বুঝিয়ে-সুজিয়ে বললে Ñ (মতিন আবার শেল্ফে দৃষ্টি নিবন্ধ করে। বই দেখতে থাকে। আসলে সে যেন তার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করতে চায়।)
নাসিম : হ্যাঁ আমিও সে কথাই বলি। এতদিন যখন গেছে, আর কিছুদিন থাক। ভালোমন্দ, কাজ একটা জুটবেই। রীনার কলেজ শেষ হয়ে যাক, তারপর আমরা না-হয় নিজেরাই দেখে-শুনে লাগিয়ে দেব কোথাও। (কী ভেবে) যাব বললেই তো যাওয়া হয় না। এতবড় পাতা সংসার।
মোবারক : তা না-হয় হলো। এদিকে যে আরেক সমস্যা।
নাসিম : কী?
মোবারক : ওকে আজ দেশের বাড়িতে পাঠাবো ভাবছিলাম। চিঠিও দিয়ে দিয়েছি সেইমতো। দেশের জমির ধান-পাটের যা দুটো টাকা সময়মতো না পাঠালে, আদায় হবে ভাবছ?
রীনা : সেটা কী করে হয়। বরং মতিনভাইকেই পাঠাও না।
মোবারক : একদিন-দুদিন দেরিতে এসে যাবে না কিছু। পরে না-হয় বলে দেওয়া যাবে। (মতিনের দিকে) আর তা না হলে তুই নিজেই ঘুরে আয় না দেশের বাড়ি থেকে একবার।
মতিন : (ওর হাতের বইখানা যেন পড়ে যাবার উপক্রম) আমি? ক্ষেপেছো? আমাকে ঠকিয়ে ফতুর করে দেবে না? থাক না কবীরভাই যেমন যাচ্ছিল বরাবর। (একখানা বই তুলে নিয়ে বেরিয়ে যায়)
রীনা : কিন্তু এ চিঠি?
মোবারক : আঃ! চিঠির কথা এখন না বললেই হয়। দেখিস, রুবী আবার জানতে না পারে।
নাসিম : শুধু তো যাবে আর আসবে। দুদিনের ব্যাপার। চাকরি করা না করা না-হয় পরে দেখা যাবে।
মোবারক : তাহলে তাই করো। এখন আর এসব জানিয়ে কাজ নেই। চিঠিখানা আমার কাছেই থাক।
টেবিল থেকে তুলে নিজের পকেটে রাখল।
নাসিম : দেখেছ, পাক্কা দুঘণ্টা। এখনো ফেরার নাম নেই। চাকরি না পেতেই এ অবস্থা। আর পেলে তো উলটো শিং গজাবে।
কার পায়ের শব্দ শোনা যায়। কবীর হনহন করে সামনে দিয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত।
মোবারক : কই যাচ্ছ, বসো।
কবীর দাঁড়িয়ে থাকে। বসে না।
(সুর বদলে) বসো না, বসো। আমরা তোমারই অপেক্ষা করছিলাম। (কবীর আড়ষ্ট হয়ে বসে) পাখাটা খুলে দেব? বাইরে থেকে ঘেমে এসেছে বেচারি।
কবীর : না, না। তার দরকার নেই।
মোবারক : তা তোমাকে যে একটু দেশের বাড়িতে যেতে হয় বাবা। ওই সেদিন বলছিলাম না। তুমি না গেলেই নয়।
কবীর : কবে?
মোবারক : রাতে একটা ট্রেন আছে। চট্ করে খেয়ে নাও। আর এই টাকা। (ব্যাগ থেকে বের করে দেয়।)
কবীর (টাকা গুনে দেখে) অত লাগবে না। বাকি টাকা কী হবে?
নাসিম : থাক না। হাতখরচ লাগবে না। কোথায় বিদেশবিভুঁয়ে যাবে। এদিক- সেদিক খরচ নেই।
কবীর : কিন্তু, কিন্তু Ñ
চারদিক তাকায় Ñ
মোবারক : হিসাবপত্র ঠিক করাই আছে। তুমি বাপু একটু বুঝেশুনে মাথা খাটিয়ে কাজ করো। আর তোমাকে কী বলব। তুমি তো জানোই। কই, একটা সুটকেস খালি করে কবীরের জিনিসগুলো গুছিয়ে দাও। ট্রেনের দেরি নেই।
হাতঘড়ি দেখতে দেখতে প্রস্থান।
পঞ্চম দৃশ্য
কবীরের ঘর। একধারে চৌকি পাতা আর তারই লাগোয়া ছোট একটি টেবিল। অন্য কোনো আসবাবপত্রের বালাই নেই। কিছু প্যাকিং বাক্স ও পুরনো কাগজপত্র স্তূপ করে রাখা। খালি কেরোসিনের টিন ও কিছু খালি বোতল ও টিন গাদা করা অন্যদিকে। আড়াআড়ি একটা দড়ি ঝুলছে। তাতে কবীরের কাপড়। কবীর বিছানার ওপর রাখা সুটকেসে কাপড় গোছাতে ব্যস্ত। এমন সময় রুবীর প্রবেশ। হাতে একটা প্যাকেট।
রুবী : কবীরভাই।
কবীর : হুঁ।
রুবী : কী ভাবছ?
কবীর : কই, কিছু না তো।
রুবী : নিশ্চয়ই কিছু ভাবছ।
কবীর : না। কী আর ভাবব।
(আবার কাপড় গুছোতে থাকে)
রুবী : (চৌকিতে বসল) কী হয়েছে তোমার?
কবীর : কী হবে!
রুবী : বলবে না?
কবীর : (কাপড় গুছানো ছেড়ে দিয়ে পাশে এসে বসে) জানো রুবী, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
রুবী : কী বুঝতে পারছ না?
কবীর : আমার যেন কেমন ভয় করছে।
রুবী : ভয়, ভয় করবে কেন?
কবীর : মানে বাড়িতে সবাই হঠাৎ এমন ভালো ব্যবহার করছে, মানে কিছু হয়নি তো?
রুবী : কী আবার হবে। তুমিও যেমন। চলো, তোমার ট্রেনের সময় হয়ে এলো। খাবারটা খেয়ে নাও। শোনো Ñ
কবীর : কী?
রুবী : (হাতের প্যাকেটখানা সুটকেসে ভরে দিয়ে) এটা থাক বরং তোমার সুটকেসেই।
কবীর : কী ওতে?
রুবী : কিছু না, কিছু সুজির হালুয়া। সকালে খেও। বাইরে পানিটানি খাবার দরকার নেই। দরকার হলে ডাব কিনে নিও। (কবীর তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে।)
কী, আমাকেও ভয় করছে? কী দেখছ?
কবীর : (চোখ নামিয়ে নেয়) কই, কিছু না। চলো।
ষষ্ঠ দৃশ্য
মোবারকের ঘর।
নাসিম : ওর তো পরশু ফেরবার কথা ছিল।
মোবারক : দেখ হয় তো এসে পড়বে এক্ষুনি। (ঘড়ি দেখে) কিছুক্ষণ আগেও একটা ট্রেন ছিল।
নাসিম : দুদিনের কথা বলে চারদিন হয়ে গেল। টাকা-পয়সা নিয়ে কোনো গোলমাল নয়তো?
মোবারক : কী যা-তা বলছ। মুখে যাই বলি, ছেলে অমন নয়। তাছাড়া অবাধ্য হবে কী করে। মুখফুটে কথা বলতে শুনেছ কোনোদিন। (কী ভেবে) চাকরির কথাটা জানিয়ে দিলেই হতো। খামোকা Ñ
নাসিম : তুমিই তো বললে Ñ
মোবারক : হ্যাঁ হ্যাঁ, বলেছিলাম বটে। তবু ব্যাপারটা বেমালুম চেপে যাওয়াটা কি ঠিক?
নাসিম : না না, ওসব ফন্দি-ফিকির আবার ঢুকিও না মাথায়। যা একজন দেখাশোনার, তাও থাকবে না। চাকরি তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না।
দরজায় কড়া নাগার শব্দ। কবীরের প্রবেশ। হাতে সুটকেস।
মোবারক : আরে এসো এসো। সব ঠিকঠাক তো। এতো দেরি যে।
কবীর : একদিন তো ওখানেই দেরি হয়ে গেল। কাল আসতে চেয়েছিলাম। একটুর জন্যে ট্রেন ধরতে পারিনি।
নাসিম : আমিও তাই বলি। এক কাপ চা দিই?
কবীর : চা, কাকে?
নাসিম : কেন, তোমাকে।
কবীর : না, দরকার নেই। বরং আপনাদের টাকার হিসাবটা (পকেট থেকে টাকার বান্ডিল বের করে।)
নাসিম : ওসব না-হয় পরেই হবে।
কবীর : তবু টাকা-পয়সার ব্যাপার। নিন (টাকার বান্ডিল মোবারকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে পুরো হিসাবটা পকেট থেকে আরেকখানা টুকরো কাগজ বের করে) লেখা আছে এতে।
মোবারক : (টাকার বান্ডিল নেড়েচেড়ে) তোমার কিছু দরকার থাকলে বলতে পারো।
কবীর : না না, আমার আর কী দরকার। খাচ্ছি-দাচ্ছি Ñ
মোবারক : আমিও সে কথাই বলি। (একটু ভেবে নিয়ে) ও ভালো কথা। কী যেন বলতে চেয়েছিলাম তোমাকে। রীনা, রীনা Ñ
রীনা : জি Ñ
মোবারক : কী একখানা চিঠি এসেছিল না কবীরের নামে।
রীনার প্রস্থান ও পরমুহূর্তেই চিঠিহাতে প্রবেশ।
মোবারক : বলছিলাম, মানে তুমিও গেলে, অমনি চিঠি এসে হাজির, তাই না? সমর্থনের আশায় রীনার দিকে তাকায়। রীনার কোনো ভাবান্তর লক্ষ করা যায় না
নাসিম : হ্যাঁ, একেই বলে গ্রহের ফের।
রীনা চিঠিখানা মোবারকের হাতে দেয়।
মোবারক : (একনজর দেখে নিয়ে ওখানা কবীরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে) এই নাও। (কবীর চিঠির ওপর চোখ বুলিয়ে নেয়। কোনো ভাবান্তর লক্ষ করা যায় না। যেন তার অজান্তে চিঠিখানা হাত থেকে গড়িয়ে পড়ে মাটিতে) ফেলে দিলে যে!
কবীর : এ চিঠির সার আমি জানি।
(রীনা চিরুনি এনে মাথাটা মায়ের কাছে এগিয়ে দেয়। নাসিমবানু তার কেশবিন্যাসে ব্যস্ত।)
মোবারক : (স্তম্ভিত) তুমি কেমন করে জানো? তুমি তো এই ট্রেনে ফিরলে।
কবীর : কেন যেন মন বলছিল, এ চাকরিটা লেগে গেলেও লেগে যেতে পারে। আসার পথে ওই অফিসের একজনের সঙ্গে দেখা হলো রাস্তায়। খবরটা সেই দিলো। (খানিকক্ষণ থেমে) চিঠিটা আগেই এসেছিল!
নাসিম : আগে মানে, বলতে চাও আমরা লুকিয়ে রেখেছিলাম?
কবীর : না Ñ
মোবারক : আর সত্যি কথা বলতে এ চাকরি তোমার পোষাতোও না। যা মাইনে, তা দিয়ে কী খেতে আর কী পরতে।
কবীর : তবু চাকরি যখন পেয়েছিলাম, গেলেই ভালো হতো।
মোবারক : ছাই ভালো হতো। না খেয়ে মরতে। ওসব ভাবনা তো ভাবতে হয়নি কোনোদিন। অন্যের ছায়ায় থেকেছ চিরকাল, বুঝবে কী করে?
রীনা : (কবীরকে) তাছাড়া আপনি চাকরিতে গেলে আমাকে কলেজে ছেড়ে আসবে কে? ভাইয়াও তো লন্ডন চলল।
মোবারক : ঘর দেখাশুনার জন্যও তো একজন চাই।
নাসিম : আমার মনে হয়, এসব আজেবাজে চাকরির ফিকিরে তোমার না থাকাই ভালো। তাছাড়া কাসেম সাহেবের সঙ্গে কথা হয়েছে ওঁর। কোনো কোম্পানির সাহেবকে নাকি চিঠি দিয়েছেন। দেখা যাক কী হয়।
মোবারক : আর তাছাড়া যদ্দিন কিছু না হচ্ছে, আমরা তো রয়েছিই। খাও-দাও। কাজ বলতে আর কী। আজকাল যা দিনকাল। পথে বসবে বুঝেছ।
নাসিম : যা করতে হয় ধীরেসুস্থে করা উচিত। তোমার ভাবনাটাই কী। আমিও তো আর মরে যাইনি।
কবীর : আমি চাকরির কথা ভাবছি না।
নাসিম : বললাম না, অমন কাঁচা ছেলে কবীর নয়।
কবীর : চাকরিতে আমার আগেই ওরা লোক নিয়ে নিয়েছে। দুদিন নাকি আমার জন্যে অপেক্ষা করেছিল। তারপর Ñ
চুলবাঁধা ছেড়ে নাসিম ও রীনা পরস্পরের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। তারপর দুজনই তাকায় মোবারকের দিকে।
মোবারক : (নড়েচড়ে বসে) তাই নাকি, তাই নাকি। তা, তা ভালোই বলতে হবে।
সমর্থনের আশায় নাসিম ও রীনার দিকে তাকায়। মা-মেয়ে এক ফাঁকে কবীরের দিকে তাকিয়ে চোখ নিচু করে চলে যায় ভেতরে।
কবীর : কিন্তু Ñ
মোবারক : কিন্তু-টিন্তু নেই। তারচেয়ে যেমন ছিলে থাক। বলছি তো সুবিধেমতো কিছু একটা দেখে দেওয়া যাবে যেন।
কবীর : কিন্তু এই মাইনেতে তো আরো অনেকের চলছে।
মোবারক : তা চলুক। তাদের কথা আলাদা। তাদের হয়তো মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই আছে। আমরা না থাকলে তোমার কি সে-ঠাঁইটাও জুটতো?
(চুপ করে থাকতে দেখে) জবাব দিচ্ছ না কেন, বলো?
কবীর : (যেন নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে) তাহলে কি কোনোকালেই চাকরি করে আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবো না?
মোবারক : পারা উচিত। আমরাও তাই চাই। কিন্তু ভালোমন্দ ভেবে দেখতে তো হবে। না বুঝেশুনে ঝাঁপ দিয়ে কী লাভ।
কবীর : তাহলে আমার বোধহয় আর কোনোকালেও কিছু হবে না।
মোবারক : (যেন সুযোগ পেয়ে খানিকটা গম্ভীর হয়ে) আমি তো ভবিতব্য নই, কেমন করে বলব। যা বলার বলেছি, এখন শোনা না শোনা তোমার ইচ্ছে।
হঠাৎ যেন নিজের ভবিষ্যৎ ভেবে কবীর আতঙ্কিত। কেমন অসহায় দৃষ্টি। মোবারক চোখ সরিয়ে নিয়ে একটা কাগজে মনোনিবেশ করে। কবীর দুহাতে নিজের বাসন আঁকড়ে ধরে যেন একটা ভরসা খোঁজার জন্যেই। উঠে দাঁড়ায়। পায়চারি করে খানিকক্ষণ। কিছুক্ষণ নিছক আত্মবিশ্বাসের অভাবেই যেন পরের কথাগুলো জড়িয়ে আসে।
কবীর : তাহলে, তাহলে আপনি যা বলছেন তাই বোধহয় ঠিক। এ চাকরি করে আর কী হতো। তাই না?
সমর্থনের আশায় মোবারকের দিকে তাকায়। মোবারক একবার দৃষ্টি বিনিময় করে চোখ নামিয়ে নেয়। কাগজে মন দেয় আবার। যেন কোনো প্রতিক্রিয়াই হয়নি তার এ কথায়।
সপ্তম দৃশ্য
মোবারকের বাড়ির বারান্দা। ভেতরে চেয়ারে বসে পা দুলিয়ে বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছে রীনা। এমন সময় কার বুটের শব্দ শোনা যায়।
রীনা : কাসেম চাচা, আসুন আসুন।
কাসেম : (নেপথ্যে) তোমরা সব ভালো?
রীনা : ভালো। আপনি। ওমা ওই অ্যালসেশিয়েনটা সঙ্গে করে এনেছেন। পালাই তাহলে। কুকুরে আমার ভীষণ ভয়।
শিকারির পোশাক পরিহিত অবস্থায় কাসেমের প্রবেশ। রীনা উঠে দাঁড়ায়। বসুন।
কাসেম : না, বসব না। ভয়, ভয় করবে কেন। অ্যালসেশিয়েনই হোক, আর যাই হোক, আমার কাছে বাপু সব ভেজা বেড়াল বনে থাকে।
রীনা : ওই দেখুন গেটের কাছে কেমন করে যেন দাঁড়িয়ে।
কাসেম : আসবে এক্ষুনি আসবে ডাকলেই। পায়ে মাথা ঘষবে। তুমি বসো। ভয়ের কিছু নেই। টাইগার, এদিকে এসো। এসো বলছি। টাইগার। আবদুল, আবদুল।
রীনা : আপনার ড্রাইভার আবদুলকে ডাকছেন? সে কি আর এখান থেকে শুনতে পাবে। কাউকে পাঠিয়ে দিই।
কাসেম : তাই দাও। টাইগার।
রীনার প্রস্থান ও খানিক পরে প্রবেশ।
রীনা : ডাকতে পাঠিয়েছি। চাচা আপনার টাইগার কিন্তু নট নড়ন-চড়ন। দেখুন না কেমন লেজ নাড়াচ্ছে। আমার ভয় করে কাছে সরে এলে
কাসেম : ভয় করবে কেন। ভয় কেন করবে।
আবদুলের প্রবেশ।
আবদুল : আমাকে ডেকেছিলেন স্যার।
কাসেম : টাইগার, টাইগারের কী হয়েছে? তখন থেকে ডাকছি।
আবদুল : কী জানি স্যার। কোনোদিন তো অমন করে না। আপনাকে স্যার সাংঘাতিক ভয় করে। ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না। চোখদুটো কেমন লাল দেখেছেন স্যার।
কাসেম : সব ঠিক হয়ে যাবে। আবদুল আমার ঘর থেকে চাবুক নিয়ে এসো তো।
রীনা : চাবুক দিয়ে কী করবেন?
কাসেম : (আবদুলকে) আঃ! তুমি দাঁড়িয়ে কেন। যা বলছি তাই করো। টাইগার। ইউ অয়্যার অলওয়েজ ভেরি সাবমিসিভ। ডু বিহেভ লাইক অ্যান ওবিডিয়েন্ট চ্যাপ। টাইগার আই অ্যাম ওয়ার্নিং ইউ Ñ
আবদুলের চাবুক হাতে প্রবেশ। রুবী এসে ঢোকে। রীনার কাছে এসে দাঁড়ায়। কাসেম চাবুকটা হাওয়ায় শপাং করে মেরে নিয়ে এক পা দুপা করে এগুতে থাকে।
আবদুল : (হাত ধরে ফেলে) কীরকম করে তাকিয়ে আছে দেখেছেন। দোহাই স্যার চাবুক মারবেন না।
রীনা : (রুবীকে) দেখছিস আপা, তখন থেকে দাঁড়িয়ে। এক পাও নড়ছে না। এতদিনের অনুগত টাইগার। চাচার কথা পর্যন্ত শুনছে না।
চিৎকার শুনে কবীর ছুটে আসে। তারপর সকলের অলক্ষে একধারে দাঁড়িয়ে পড়ে। রুবী একপলক দেখে নেয় তাকে।
কাসেম : (মঞ্চের এক প্রান্তে গিয়ে) টাইগার দিস ইজ মাই লাস্ট ওয়ার্নিং। এসো বলছি। সায়েস্তা কী করে করতে হয় আমি জানি। উঠে এসো, উঠে এসো। উঠবে না? ও. কে দেন ইউ হ্যাড ইট।
কাসেম একপা-দুপা করে এগিয়ে বেরিয়ে যায়। নেপথ্যে চাবুক মারার শব্দ পাওয়া যায়। সবাই সেদিকে তাকিয়ে থাকে।)
রীনা : আপা, ইস্। কীরকম করে মারছে টাইগারকে। চাচা আর এগুবেন না।
আবদুল : (নেপথ্যে) স্যার ও আপনাকে অ্যাটাক করবে। এভাবে আর মারবেন না স্যার।
কবীর একবার ব্যাপারটা উঁকি দিয়ে দেখে তারপর পিছিয়ে আসে। তাকে খানিকটা বিচলিত মনে হয়। পায়চারি করতে থাকে আপন মনে।
কাসেম : (নেপথ্যে) ডিজওবিডিয়েন্ট ক্রিয়েচার। আই উইল কিল ইউ। আমার বন্দুক কোথায়। আমার বন্দুক নিয়ে এসো।
আবদুল : (নেপথ্যে) স্যার, দেখুন, দেখুন। টাইগার চলে যাচ্ছে। টাইগার চলে যাচ্ছে স্যার।
কাসেম : (নেপথ্যে) চলে যাচ্ছে!
আবদুল : (নেপথ্যে) হ্যাঁ স্যার। আর বোধহয় ফিরবে না। চলে যাচ্ছে।
কাসেম : (নেপথ্যে) কণ্ঠস্বর মিলিয়ে আসছে। আমার বন্দুক কোথায়, আমার বন্দুক। না থাক আমি নিজেই যাচ্ছি। আমি নিজেই যাচ্ছি।
রীনা : (সরে এলো) দেখলি আপা। চোখের সামনে কী হয়ে গেলো। এতদিনের পোষা কুকুরটা কেমন করে চলে গেলো।
রুবী : (একনজর কবীরকে দেখে নেয়। কবীর তখনো পায়চারি করছে।) কুকুরের ধৈর্যের সীমা আছে রীনা। কোনো কোনো মানুষের তাও নেই।
কবীর রুবীর চোখে চোখ রাখে। যেন চমকে ওঠে। তারপর দাঁড়িয়ে যায়। রুবী রীনাকে সঙ্গে করে ওকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যায়।
অষ্টম দৃশ্য
মোবারকের ঘর। মোবারক ও নাসিম বসে। কবীরের প্রবেশ।
কবীর : আসি, আসি Ñ
মোবারক : তোমার আবার কী হলো।
কবীর : না না, কিছু হয়নি। (কী যেন বলতে চেয়েও থেমে যায়। তারপর প্রায় এক নিশ্বাসে শেষ করে) আমি যাচ্ছি।
নাসিম : যাচ্ছ, কোথায়?
কবীর : জানি না। এবার আমাকে বিদায় দিন।
নাসিম : বিদায় দেব! বিদায় দেব বললেই তো বিদায় দেওয়া যায় না। এতদিন নুন-নেমক খেলে, আমাদের সুবিধে-অসুবিধে দেখবে না?
মোবারক : (যেন ব্যাপারটার গুরুত্ব অনুধাবন করে। ওর মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। দুহাতে ওর কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে) পাগল হয়েছ কবীর, কোথায় যাবে। (ছেড়ে দিয়ে) কোথায় যাবে শুনি। মাথা গুজার আশ্রয় মিলবে না। ধুঁকে ধুঁকে মরবে এক মুঠো অন্নের জন্যে। একবার ভেবে দেখ।
কবীর : (ঘুরে দাঁড়ায়। সোজাসুজি তাকায় মোবারকের দিকে) ভেবে দেখেছি।
বেরিয়ে যায়। মোবারক ও নাসিমবানু পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। একখানা ঝুলি হাতে নিয়ে আবার এসে ঢোকে কবীর।
কবীর : (উঁবু হয়ে তার ক্যানভাস জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে যেন কাউকে লক্ষ না করেই বলে) চলি।
নাসিম : কবীর, ভেবে দেখ আরেকবার।
মোবারক : (উত্তেজিত) চলো। যা খুশি করুক। তুমি উত্তেজিত হয়ো না। আমরা বরং কাসেম সাহেবকে দেখে আসি।
মোবারক ও নাসিমবানুর প্রস্থান। প্রায় তার অলক্ষে এক সময় রুবী এসে ঢোকে। ঝুলিখানা কবীরের হাতে তুলে দেয়। ওর জামার একটা বুতাম লাগিয়ে দেয়। কেমন প্রসন্ন হাসি। রীনা একপাশে দাঁড়িয়ে দেখে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কবীর ও রুবী।
কবীর : (প্রায় অস্ফুট স্বরে) যাই।
রুবী কিছু বলে না। রীনার কাছে সরে আসে। কবীর বেরিয়ে যায়। দেখা যাবে জানালার দিকে সরে গিয়ে। মুখ বাড়িয়ে রুবী। তার পেছনটা দেখা যায়। গা-ঘেঁষে রীনা।
রীনা : তোর কথা ও শোনে। ওকে থেকে যেতে বল না।
রুবী : (ঘাড় ফিরিয়ে) না যাক, যেতে দে রীনা।
রুবী জানালা থেকে একটু পেছন সরে আসবে। দৃষ্টি যদিও জানালা বরাবর মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ায় সেটা দর্শকদের দৃষ্টিগোচর হবে। রীনা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে বোনের পাশে।
রুবী : (স্পষ্টলাইটে শুধু ওর মুখ ধরা পড়বে। যেন নিজের মনে বলে যাচ্ছে। ঠোঁট নড়ছে না। আগেই রেকর্ড করা সংলাপ বাজালে ভালো দেওয়া যায়। কথাগুলো নিচু স্বরে বলা এবং টানাটানা।) আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি তার ছায়াঘন দীর্ঘ যাত্রাপথ। তারপর আর ছায়া নেই। শুধু আলো। কেমন আলোয় আলোয় মিশে যাচ্ছে। বাইরে কি এতো, এতো আলো। তা তো জানতাম যা। আলোর ঢল নেমেছে। আর দেখা যাচ্ছে না। আলোতেই মিশে গেল। আগামী দিনের হাতছানি তাকে ডাকছে। ও আলোর মিছিলে যাবে। হয়তো সেখানে যাবার আমন্ত্রণ আমারও একদিন আসবে। নিশ্চয়ই আসবে।
এবার রুবী জানালা থেকে ফিরে দর্শকদের সামনে মুখ করে দাঁড়াবে। তার চোখ ছলছল।
রীনা : তুই কাঁদছিস।
রুবী : (চোখ মুছে নিয়ে হাসি ফুটিয়ে) কই, না তো।
সমাপ্ত
