এতক্ষণ প্ল্যাটফর্মে এক সঙ্গেই ছিল মনি। রাতের ট্রেন। অসম্ভব ঠ্যালাঠেলি আর ভিড়। একেবারে চোখে চোখে রাখা সম্ভব হয়নি। পেয়ারা কেনার লোভে ফেরিওয়ালার পেছন পেছন গিয়েছিল। সে আর নতুন কি! বরাবরই মুনি একটু হুজগে ছেলে। এটা সেটা দেখলেই কেনার বাতিক। তা হক। সবাই জানে কাজের সময় সে ঠিক ঠিক হাজির। মনি যে কাঁটায় কাঁটায় ট্রেনের কামরায় উঠে বসবে, তাতে কারও সন্দেহ ছিল না।
অথচ কাণ্ডটা সেদিনই ঘটল। ট্রেন ছেড়ে দিল।
কিন্তু মনির পাত্তা নেই।
বরকত সাহেব একবার চেন টানার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু জিনিসপত্রের ভিড়ে কোথায় চেন আর কোথায় কি। আর টেনেই বা কি লাভ। যদি অন্য কোনো কামরায় উঠে থাকে। বরং পরের স্টেশনে নেমে খোঁজ করলেই চলবে। মনির মা-ত প্রায় কান্নাই জুড়ে দিলেন। অনেক করে বোঝালেন বরকত সাহেব, অমন কাঁচা লেছে নয়। সত্যি সত্যি যদি ট্রেনটা ফেল করে থাকে, পরের ট্রেনে ঠিকই ফিরবে। দুর্ভাবনার কিছু নেই।
একে একে সবাই নাবল ট্রেন থেকে। মনির পাত্তা নেই। নিজে স্টেশন মাস্টারের কাছে তার পাঠালেন বরকত সাহেব। আর খোঁজাখুঁজিও কম হলনা। কেউ কেউ বলল, এভাবে আর হবে না। বরং কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে দিন। পুরস্কার ঘোষণা করুন।
বরকত সাহেব মনস্থির করতে পারেন না। কাগজে তাহলে একটা ছবি ছাপতে হয়। আর বাড়িতে মনির একটাই ছবি। ছেঁড়া গেঞ্জি গায়ে। রাগ করেই ছেঁড়া গেঞ্জি পরে ছবি তুলেছিল ওর শখের লাল জামাটা শুকোয়নি বলে। কাগজে যদি ওরকম একটা ছবি ছাপান হয় সবাই বলবে, দেখ দেখ বাপটা কি কিপটে। ছেলেকে ছেঁড়া গেঞ্জি পরিয়ে রাখে। বাধ্য হয়ে ঐ ছেঁড়া গেঞ্জি গায়ের ছবিটাই ছাপিয়ে দিতে হল কাগজের নিরুদ্দেশ বিজ্ঞাপনে। ফিরে আসার জন্য মনিকে অনুরোধ জানানো হল।
কিছুই ভাল লাগে না বরকত সাহেবের। আহারে রুচি নেই। লোকজন খোঁজ খবরদারি করতে আসে। পাড়াপড়শিরা নানা পরামর্শ দেয়। কেউ কেউ বিচিত্র সব কাহিনী শোনায়।
পাড়ার বড় মুদির দোকানের মালিক রজব আলী আসে। তার এক চোখ কানা। তবু লাঠি ঠুকে ঠুকে সে ঠিক হাজির।
বরকত হাসেব ভেবেছিলেন বোধ হয় কোনো পাওনার তাগিদেই এসেছে লোকটা।
রজব আলী হেসে বলে, না না সে জন্যে আসিনি।
তবে?
ফিস্ফিসে গলায় বলে রজব আলী, আমার মনে হয় আমি মনিকে দেখেছি।
লাফিয়ে ওঠেন বরকত সাহেব, দেখেছ মানে। কোথায়, কবে দেখেছ?
রজব আলী বলে, আমি সিঁড়ি দিয়ে নাবছিলাম কাল সন্ধ্যায়! এমন সময় একটা ছায় ছায়া অন্ধকার দেখলাম।
কেমন করে জান সেটা মনির ছায়া?
ছায়াটা ওর মতই বেঁটেখাটো ছিল, সগৌরবে জানিয়ে দেয় রজব আল্
ীবরকত সাহবে সন্তুষ্ট হন না। বলেন, আসল লোকত আর দেখনি। শুধু ছায়া দেখেছ।
রজব আলীর যে এক চোখ খারাপ, ভাল করে দেখতে পায় না। সে কথাটাই জানিয়ে দিয়ে বলে, আমি ওরকমই দেখি। ছায়া দেখেই লোক চিনে ফেলি। আর লোকই কেন, ছায়া দেখে দিব্যি বলে দিতে পারি কোনটা সজনে গাছ, কোনটা তেঁতুলে আর কোনটা বট গাছ।
বরকত সাহেব বলেন, না না এ খবর কোনো কাজে আসবে না।
আরও লোকজন ছিল সেদিন। ছিল কাগজের হকার ভোলা, স্কুলের বংলা টিচার রকীবুদ্দিন, সাইকলে দোকানের মিস্ত্রী কালু শেখ। তারা সমস্বরে রজব আলীকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ওরকম ছায়ার কথা শুনে কি হবে। চেহারাটা কাল না ফরসা, চুলটা সোজা না বাঁকা সিঁথি করা, গায়ের জামায় চারটে না ছটা বোতাম এসব না বললে কি করে বোঝা যাবে?
রজব আলী একটু চিন্তা করে বলে, আমাদের মনিত বেশ ফর্সা। ছায়াটাও ওরকমই মনে হয়েছিল কিন্তু।
তার কথা মেষ হবার আগেই চিটার রকীবুদ্দিন গম্ভীর হয়ে বলে, আসলে আমার ব্যাপারটা আগেই বোঝা উচিৎ ছিল। আপনাকে সময়মত খবর দিলে এ কাণ্ডটা ঘটত না।
বরকত সাহেব উৎকণ্ঠিত হয়ে বলেন, সে রকম কোন আভাস পেয়েছিলেন নাকি?
রকীবুদ্দিন চোখ বড় বড় করে বলেন, সে কথাইত বলছি। ফার্স্ট টারমিন্যাল পরীক্ষায় বাংলায় যখন ও পঁচাশ নম্বর পেল তখনই আমরা বোঝা উচিত ছিল।
সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। বাংলায় পঁচাশি নম্বর পাওয়ার সঙ্গে মনির নিরুদ্দেশ হবার যে কি সম্পর্ক, বুঝতে পারে না।
রকীবুদ্দিন বলেন, আসলে রচনার নম্বর পেয়েইত বাংলায় অত লাভ করল। গরু, কচুরিপানা, বা ভম্রণ কাহিনী যে কোনটার ওপর লিখতে বলেছিলাম রচনা। মনি কিনা সব ছেড়ে ভ্রমণ কাহিনীর ওপরই লিখল। মনে মনে আগেই বোধ হয় সব ঠিক করা ছিল। খাসা রচনা। আমারত পড়ে চক্ষুস্থির। এখন মনে হচ্ছে আগে থেকেই বাড়ি পালাবার মতলব ছিল। তা না হলে এমন হাত খুলবে কি করে।
তারপর আবার একটু থেমে রকীবুদ্দিন বলেন, দেখবেন ও সহজে ফিরবে না।
এরকম আরও অনেকেই শোনাল নিত্য নতুন কাহিনী।
কাগজের হকার ভোলা নাকি জানালায় আড়চোখে দেখেছে একটা খবর দেখে মনিকে একদিন ভীষণ উত্তেজিত হতে। খবরটা ছিল সাইকেল যোগে কারও বিশ্বভ্রমণের কাহিনী। তারপর সেই নাকি আবার আরেকদিন দেখেছেন তাকে এক সাইকেলের দোকানে। সুতরাং Ñ এমনি আরও কত কি!
বরকত সাহেব কথা বলেন না। তাঁর ভাবনা কমে না। মুখভার করে বসে থাকেন। চায়ের কাপটা পড়েই থাকে সামনে।
ঠিক এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
একঘর মানুষকে অবাক করে হন্ হন্ করে এসে ঢোকে মনি।
বরকত সাহেবের মুখে কথা ফোটে না।
যারা মনির নিরুদ্দেশ হবার কারণ বাংলাতে এসেছিল তারাও এতটা আশা করেনি। এভাবে হঠাৎ না বলে কয়ে এসে মনি যেন তাদের ভয়ানক নিরাশ করেছে।
বরকত সাহেবের মুখ আবার হাসিতে উজ্জ্বল। সবাই উঁচু গলায় শুনিয়ে বলেন, কই তোমরা না বলেছিলে মনি সহজে ফিরবে না। এখন? তোমাদের এসব আজগুবি গপপে কান দেওয়াই উচিৎ নয়।
তারপর নিজেই উঠে গিয়ে খবরা দিতে যান ভিতরে।
সে আসরে সবাই ছঁকে ধরে মনিকে।
রকীবুদ্দিন বলেন, আর দুটো দিন থেকে গেলেই পারতে বাপু। খামাখা আমাদের এমন নাজেহাল করলে তোমার বাবার কাছে।
মনি বলে, সে রকম ইচ্ছেই তার ছিল, মানে সেদিন রাতে ট্রেন ফেল করে সে ধরল পরের আরেকটি ট্রেন। কিন্তু কপালই খারাপ বলতে হবে। ঐ ট্রেন নাকি আবার পলাশপুর গামেনা। সোজা কুড়িগ্রাম চলে যায়। কুড়িগ্রাম নেবে পরের দিন দুপুরের আগে কোন ট্রেন নেই! ওয়েটিং রুমে রাতটা কাটিয়ে পরের দিন প্যাসেঞ্জার ট্রেনটা ঠিকই ধরেছিল সে। কিন্তু আবার এক কাণ্ড। কোন জংশন লাইনে একটা মালগাড়ি পড়ে যাওয়ায় ট্রেন তের ঘণটা লেট। আবার এল কুড়িগ্রাম ফিরে।
সেখানে তার মামাত ভাই রন্টুর সঙ্গে দেখা। রন্টু তাকে দেখে অবাক। বলল, আরে তুমি যে!
রুন্টুই জানাল, তারা কুড়িগ্রামে থাকে। ধরে বসল দুটো দিন থেকে যাবার জন্য।
আপত্তি করেছিল মনি প্রথমে।
রন্টু সে কথায় আমল দেয় না। বলে, কি আর হয়েছে। চিঠি লিখলে তাও তিনদিনের আগে পৌঁছুবে না। বরং দুটো দিন সে কাটিয়েই যাক। মোটামুটি একটা অ্যাডভেঞ্চার হয়ে যাবে।
রকীবুদ্দিন এটুকু শুনেই বলেন, তাহলে তাই করলে পারতে।
মনি তার থলে থেকে একটা কাগজ বার করে। তাতে তার গেঞ্জি পরা ছবি ছাপা নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন। সেটা দেখিয়ে বলে, এরকম একটা বিশ্রী ছবি ছাপার পর আমার আর থাকা চলে। লোকজন দেখলেই বা কি বলবে। ছবির ভয়েইত ফিরে আসতে হল তাড়াতাড়ি। এবার ছাপা হয়েছে যথেষ্ট। হয়ত সকলের চোখে পড়েনি। দেরি করলে আবার যে ঐ ছেঁড়া গেঞ্জি পরা ছবিটা ছাপা হত কাগজে আরেক দিন।
রকীবুদ্দিন তাহলে ভুলে কিছু বলেন নি। মনি নিরুদ্দেশ হত ঠিকই অন্তত আরও কিছু দিনের জন্যে। যত নষ্টের মূল আসলে ঐ ছেঁড়া গেঞ্জি পরা ছবিটা। একটা ভাল শার্ট পরা ছবি ছাপা হলে, তাড়াহুড়ো করে ফিরে আসার কোনো গরজই হত না মনির। আর বরকত সাহেবের কাছে তাদের নাকালও হতে হত না এমন করে।
কেউ কোনদিন তাঁর ভুল ধরেনি। তিনি যা বলেছেন তা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে। বরকত সাহবে একটা বাজে ছবি ছাঁপিয়ে তাঁকে মিথ্যেবাদী বানালেন।
তাঁরা এবার আগে থেকেই চাঁদা করে মনির একখানা ভাল ছবি তুলে রাখবেন। বলাত যায় না পরের বার ঐ ছবিখানা যদি কাজে লাগে। মনি যদি আবার নিরুদ্দেশ হয়।
আর তখন যদি কাগজে ওরকম একটা ছবি ছাপানো হয় মনের দুঃখে হ্টু করে বাড়ি ফিরে আসতে হবে না মনিকে, হলপ করে বলতে পারেন রকীবুদ্দিন।
আর বরকত সাহেবও বুঝবেন রকীবুদ্দিনের কথা ফেলবার মত নয়!
১৪২২ সালে ৫ম হেনরীর মৃত্যু হলে তাঁর ৯ মাসের শিশু সন্তান সিংহাসনে বসলেন। তার মা ২১ বছর বয়সের তরুণী ক্যাথারিনের কোলে বসেই শিশু রাজার রাজ্যাভিষক হয় বলে ইতিহাসে তিনি ব্রিসলেটের শিশু রাজা বলে পরিচিতি হলেন। তাঁর অপর পরিচয় ৬ষ্ঠ হেনরী।
