এ্যালবাম

আনিস চৌধুরী

বাংলা একাডেমী : ঢাকা

প্রথম অভিনয় রজনী

১৫ই নভেম্বর, ১৯৫৭

কাটরাক্ হল, করাচি

ইস্ট বেঙ্গল কালচারাল সোসাইটির উদ্যোগে মঞ্চস্থ

চরিত্র                           ভূমিকায়

ইনাম                           কামাল হায়দর

কাইউম                        রফিকুল ইসলাম

কলিম                          জামান আলী খান

মুস্তাফা                         বাদল সরকার

মকবুল                         রুমী

লিলি                            রিজিয়া সুলতানা

রুবী                            রানী সরকার

নাসিম বানু                      রেখা

আনোয়ার                      বদর চৌধুরী

মীনু                            আনার

রতন                           মুজাহিদ

টাইপিস্ট মাজেদুর রহমান

আবদুল  আলী হোসেন

চরিত্রলিপি

ইনাম    অধ্যাপক

কাইউম বেকার যুবক (ইনামের রুমমেট)

কলিম   ইনামের বন্ধু (বেকার যুবক)

মকবুল  ইনামের প্রাক্তন ছাত্র

আনোয়ার         ইনামের ছাত্র ও মুস্তাফার ছেলে

মুস্তাফা  ব্যবসায়ী

আবদুল  চাকর

রতন    মকবুলের ছেলে (বছর পাঁচেক বয়স)

লিলি     মুস্তাফার মেয়ে

রুবী      মকবুলের স্ত্রী

নাসিম বানু        মুস্তাফার স্ত্রী

মীনু      কলিমের মেয়ে (বছর আটেক বয়স)

টাইপিস্ট পুরুষ বা মেয়ে কর্মচারী

প্রথম পর্ব

মেসের কামরা। মোটামুটি সাজানো। পাশাপাশি দুখানা খাট ও খান দুয়েক চেয়ার। ইনামের টেবিলে কিছু বইপত্র ও একখানা টাইমপিস। একধারে বইয়ের তাক। তাতে একগাদা বই। কাইউমের খাটের সঙ্গে ছোটমতো টেবিল। তাতে চিরুনি, আয়না ও অন্যান্য প্রসাধন দ্রব্য! এককোণে দড়িতে কিছু কাপড়-চোপড় ঝোলানো। ঘরের একপাশে ট্রাঙ্ক ও স্যুটকেস। দেয়ালে ক্যালেন্ডার। ইনাম চেয়ারে বসে বই পড়ছে। কাইউম বিছানায় উঁবু হয়ে চিঠি লিখছে।

কাইউম :         সংশয়-সঙ্কুল বানানটা জানেন?

ইনাম    :         উঁ, কী?

কাইউম :         না, থাক। তার চেয়ে বলুন তো, কিংকর্তব্যবিমূঢ় লিখতে ড-য় শূন্য ড়, না ঢ-য় শূন্য ঢ়?

দরজায় করাঘাত

ইনাম    :         কে?

কাইউম :         বোধহয় আমার কাছে এসেছে। সেই যে বলেছিলাম চা-বাগানের ফ্রেন্ড। দেখেই ইম্প্রেস্ড। (শার্ট গায়ে দিতে দিতে) চাকরিটা হয়েই গেল বোধহয়। যাক, তবু একটা হিল্লে হলো। (সার্ট গায়ে দিয়ে) কী বলেন, টাই পরব? অবিশ্যি আজকাল বুশ শার্টেই চলে। তবু সায়েব-সুবো মানুষÑ

দরজায় করাঘাত

ইনাম    :         শোনো!

কাইউম :         আহ্হা! আবার পিছু ডাকলেন! কী, বলুন।

ইনাম    :         মহাভৃঙ্গরাজ তেলটা মেখে চুলটা একটু পাট করে নাও।

কাইউম :         এ্যাঁ! ও, মন্দ বলেননি।

কাইউম বাক্স থেকে তেলের শিশি বার করে। স্যুটকেস ও বেডিং হাতে কলিমের প্রবেশ। কাইউম হতাশ

ইনাম    :         আরে তুমি দেখছি, কী ব্যাপার এত রাতে?

কলিম   :         রাত কোথায়? সবে তো সাড়ে এগারো। গ্রিনউইচ টাইম ধরলে তো আরো কম –

কলিম সিগ্রেট ধরিয়ে ইনামকে দেয়। কাইউম হাত বাড়িয়ে নেয়।

কাইউম :         আমাদেরই অফার করা উচিত ছিল।

ইনাম    :         তারপর? কী ব্যাপার – হঠাৎ?

কলিম   :         এ হলো যাকে বলে অ্যাটাচমেন্ট। মেজমামা চিঠি দিয়েছিল ওখানে গিয়ে উঠতে। ভাবলাম, দূর ছাই! একগাদা বাচ্চা-কাচ্চা – একটুও শান্তি পাব না। তার চেয়ে ইনামই ভালো। বাড়ির সুখ মেসে নাই-বা থাকল – একটা স্যাটিসফ্যাকশন তো আছে!

ইনাম    :         খুঁজে বার করলে কেমন করে?

কলিম   :         আরে খুঁজে বার করা সে যেন মস্তবড় কাজ আর কী। ইচ্ছে থাকলে – (একটু থামল) অবিশ্যি অন্য জায়গায় ওঠা যেত। এই তো র‌্যাঙ্কিনদের ফার্মের বড় সায়েব বলল, চলুন আমার ওখানেই ডিনার সেরে ফেলবেন। বললাম, পাগল – ইনাম তাহলে আস্ত রাখবে?

ইনাম    :         চাকরি-টাকরি নিয়ে এলে?

কলিম   :         চাকরি? ইউ মিন পারপেচ্যুয়াল স্লেভারি, ক্ষেপেছে? মাস্টারিই ধরলে শেষ পর্যন্ত? এমন ফিউচার নিয়ে শেষ পর্যন্ত কিনা –

ইনাম    :         ফিউচারের কথা ছাড়ো, ওটা এখন পাস্ট। তোমার খাবার ব্যবস্থা করতে হয় Ñ

কলিম   :         না না, কিছু দরকার নেই। কিছু করতে হবে না। খাওয়ায় একদম রুচি নেই। বরং কিছু সিগ্রেট আনতে হয় ধারে-কাছে দোকান আছে তো?

কাইউম :         তা আপনি যাবেন কেন? আনিয়ে দিচ্ছি –

কলিম   :         (ইনামকে) ইয়ে, মানে চেঞ্জ-টেঞ্জ তেমন নেই। দশ টাকার খুচরো হবে?

ইনাম    :         না।

কলিম   :         আচ্ছা, একটা টাকাই দাও তাহলে।

ইনাম    :         (কাইউমকে উদ্দেশ করে) গিবনের বইখানা বার কর তো।

কাইউম :         কত পৃষ্ঠা?

ইনাম    :         তা কি মনে আছে ছাই? দ্যাখ না –

কলিম   :         গিবনের বই! তা দিয়ে কী হবে? (কাইউম বই থেকে টাকা বার করে কলিমকে দেয়) বইয়ের ভেতর টাকা রাখ? বাক্স-পেটরা নেই?

ইনাম    :         ওটা নিরাপদ।

কলিম   :         মানে?

ইনাম    :         চুরি হওয়ার ভয় কম। খুঁজে পেতে পেতেও সময় লাগে।

কলিম   :         ও, তাই! ভাবছ, বই চুরি হতে পারে না?

ইনাম    :         আগামী দশ বছরে তো তার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না।

কলিম   :         কেন?

ইনাম    :         যা শিক্ষার প্রসার, দশ বছরের আগে কী আর জ্ঞান-পিপাসু তস্কর বই খুঁজতে শেল্ফে আসবে?

কলিম   :         তাহলে দশ বছর পর কী করবে?

ইনাম    :         তখন? তখন না-হয় একটা মর্দ অ্যালসেশিয়ান শেল্ফের সঙ্গে বেঁধে রাখা যাবে।

কলিম   :         কী জানি, তোমার ব্যাপার-স্যাপার কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকছে। আচ্ছা যাই সিগ্রেটটা নিয়ে আসি।

কাইউম :         আহ্-হা, আপনি যাবেন কেন?

কলিম   :         চাকর-টাকর আছে নাকি?

কাইউম :         চাকর Ñ তা আছে একটা। কিন্তু ও বেটাছেলে আবার গেছে ওর মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে। দিন না আমিই যাই।

কলিম   :         আবার আপনাকে কষ্ট দেব?

কাইউম :         তাতে কী, আপনি হাজার হলেও গেস্ট।

ইনাম    :         তাছাড়া লাভেরও সম্ভাবনা।

কাইউম :         লাভ? লাভ কী বলছেন?

ইনাম    :         এ কি আর আমি বলি Ñ বলিয়েরাই বলে।

কলিম   :         (ইনামকে উদ্দেশ্য করে) না না, এ কি বলছ? ছিঃ ছিঃ Ñ এটা কিন্তু তোমার অন্যায়।

ইনাম    :         ন্যায়-অন্যায়ের আবার কী দেখলে? পয়সা-কড়ির ব্যাপার, এতে উৎসাহিত হওয়াই তো উচিত।

কাইউম :         বলতে চান পয়সা দিয়ে কিনে আমি সিগ্রেট খাই না?

ইনাম    :         হয়তো খাও। কিন্তু সে স্মরণীয় মুহূর্ত চাক্ষুষ দেখার সুযোগ আমার হয়নি।

কাইউম :         হয়েছে হয়েছে। জানা আছে। কে যে কী, তা সব জানা আছে।

                                        প্রস্থান

কলিম   :         তোমাদের মধ্যে কী বনিবনা নেই? সম্পর্কটা যেন –

ইনাম    :         ব্যাকরণে না বাঁধলে বলতাম, স্বামী-স্ত্রীর মতো মধুর।

কলিম   :         আচ্ছা, এই যে অমন করে বলো ভদ্দর লোককে, একটু বাধে না তোমার!

ইনাম    :         প্রথম প্রথম বাধত। এখন সয়ে গেছে।

কলিম   :         তবু অমন করে কী বলা উচিত?

ইনাম    :         মাঝখানে বড় বেশি ভদ্র হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু দেখলাম, যত বেশি ভদ্র হওয়া যায়, বিপদটাও তত বেশি।

কলিম   :         কী রকম?

ইনাম    :         ওই যে দেখছ টেবিলের ওপর যে চিরুনির দাঁত-ভাঙা, ওটা আমার। যে তেলের শিশি খালি হতে চলেছে ওটাও। এগুলো হচ্ছে সর্বজনীন ব্যবহারের জন্য।

কলিম   :         উনি কিছু কেনেন না নাকি?

ইনাম    :         কেন কিনবেন না? খুব কেনেন! এর চেয়ে আরো ভালো ভালো জিনিস কেনেন।

কলিম   :         তাহলে?

ইনাম    :         সেগুলো তাঁর বাক্সে সুন্দর করে থরে থরে সাজানো থাকে। দেখলে মনে হয় যেন একটা স্টেশনারি শপ।

কলিম   :         তাহলে আর কী? ও যেমন তোমারগুলো ‘ইউজ’ করে, তুমিও তেমনি পালটা ওরগুলো ‘ইউজ’ করবে।

ইনাম    :         সে গুড়ে বালি!

কলিম   :         কেন?

ইনাম    :         সেদিকে তিনি হুঁশিয়ার। বাক্সে সবসময় একটা সাত লিভারের তালা ঝুলছে। কিন্তু বলো, সাত লিভারের তালা খোলার বিদ্যে কি আর কোনোদিন শিখেছি? অবিশ্যি এগুলো যেদিন ফুরিয়ে যায়, সেদিন অগত্যা ভদ্রলোককে বাধ্য হয়েই বাক্সটা খুলতে হয়। বাক্স থেকে মাথা তুলতেই দেখবে আর এক চেহারা। চেনাই যাবে না। ক্রিমম-িত গাল, পরিপাটি চুল, গন্ধ তেল ভুর-ভুর করছে –

কলিম   :         ভালো রুমমেট পেয়েছ, যা হোক। (কী ভেবে) হ্যাঁ-ভালো কথা, তাহলে তো তোমার টাকা-পয়সাগুলো অত কেয়ারলেস্লি রাখা উচিত নয়। এসব লোক আবার –

ইনাম    :         না, সে ভয় নেই।

কলিম   :         নেই কেন?

ইনাম    :         না, মধ্যবিত্ত পয়সা দিয়ে কেনা জিনিস চুরি করলেও সরাসরি পয়সা চুরি করে, এমন অপবাদ সচরাচর শোনা যায় না।

কাইউমের প্রবেশ

কলিম   :         এই যে –

কাইউম :         কাছের দোকানে পেলাম না। একটু দেরি হয়ে গেল।

কলিম   :         ভালই হলো। ততক্ষণ আমরা বসে খানিকটা পরচর্চা করলাম।

কাইউম :         আমার ‘এগেন্স্টে’ বললেন তো! জানি। সবাইকেই বলেন। দাঁড়ান আপনার সঙ্গে আগে ফ্যামিলিয়ার হয়ে নিই Ñ বলবখন  সব। শুনলেই বুঝতে পারবেন –

কলিম   :         না না – আমাকে আবার এসবের মধ্যে জড়ানো কেন?

ইনাম    :         তাতে কী? তুমি তো আর যেচে আসছ না। তেমন যদি মুখরোচক কাহিনি শোনা যায় Ñ মন্দ কী?

কাইউম :         বুঝলেন, অত করি সায়েব। কিন্তু যার জন্য চুরি, সে-ই বলে চোর।

কলিম   :         কেন, কী হলো আবার? কিছু বলেছেন নাকি?

কাইউম :         বলছেন না আবার কখন? সব সময়ই বলছেন। এই তো আপনি আসবার একটু আগে Ñ

ইনাম    :         থামলে কেন? বলো, বলো Ñ কী বলছিলাম, বলো।

কাইউম :         বলবই তো! ভয় করি নাকি কাউকে? বুঝলেন সায়েব, যা ইচ্ছে তাই বলে গেলেন। একটু বাধল না মুখে। অথচ দোষের মধ্যে কি করেছিলাম Ñ না, এত রাতে অতটা রাস্তা হেঁটে গিয়ে দুখিলি পান এনেছিলাম।

কলিম   :         পয়সাটা বুঝি ওঁরই ছিল।

কাইউম :         তা থাকলইবা। তাতে কি আর নাম লেখা ছিল? আর দুটো পয়সা যদি নিয়েই থাকি, ভাবেন হিসাবে রাখিনি? সব নোটবুকে লেখা আছে। হুঁ, অত ইয়ে ভাববেন না। আরে না-হয় এখন সে-রকম নেই – আগে কোম্পানিতে চাকরিটা হয়ে যাক্ না।

ইনাম    :         কথাটা রূপকথার গল্পের মতো মনে হয়। যেন কতবার কোথায় শুনেছি –

কাইউম :         দেখলেন দুচোখে দেখতে পারেন না। আমি একটা ভাল চাকরি পাব – এটা উনি কখনও সহ্য করতে পারেন না।

কলিম   :         না না, সে কী কথা। আপনি ভালো চাকরি পাবেন, এ তো সুখের কথা। সবাই তাই চায়।

কাইউম :         সব কপাল Ñ বুঝলেন। বড় মামা ধরা বললেন – দেশের বাড়িতে থাক, খেত-খামার দেখবি। কাজ তো কিছু নয় Ñ শুধু মুরুব্বিয়ানা, মানে আমাদেরই আবার বিরাট প্রোপার্টি কি-না – মায়ের সাইডে। শুনলাম না। মাথায় খেয়াল চাপল শহরে চাকরি করব।

ইনাম    :         আর একটা কথাও বলো সেইসঙ্গে। শহরে যাব আর একটা ভালো মানুষের ঘাড়ে চেপে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকব।

কলিম   :         না না, থাক। এসব আলোচনা থাক। লোকে কী ভাববে?

কাইউম :         যে তুলেছে তাকেই বলুন না – (এক গ্লাস দুধ নিয়ে চাকরের প্রবেশ। চাকর কাইউমের সামনে এসে দাঁড়ায়) আমার দিকে হাঁ করে কী দেখছিস? ওদিকে রাখ –

                  দুধ রেখে চাকরের প্রস্থান।

ইনাম    :         (কাইউমকে) নাও, খাও। মাঝে মাঝে খাওয়া ভালো, স্বাস্থ্য ভালো থাকে।

কাইউম :         শুনলেন, কেমন ইনসাল্ট করছেন?

কলিম   :         আঃ, তাতে কী – খান না।

ইনাম    :         ক্যালসিয়াম, প্রোটিন তোমার কমে আসছে। তাই রাত-দিন খিটখিট করো। দুধটা বরং তুমিই খাও।

কাইউম :         খাওয়া না খাওয়া বড় কথা নয় – দরকার হলে কুইনাইনও –

কলিম   :         তবে আর কী, খেয়ে নিন।

কাইউম :         খাচ্ছি বটে। এনেছ যখন স্পয়েল করে কী লাভ। (চুমুক দিয়ে) কিন্তু ভাববেন না এসব ফ্রি। সব খাতায় লেখা আছে। (চুমুক দিয়ে) না, আজকাল বড় পানি দিচ্ছে Ñ (চুমুক দিয়ে) দূর, একেবারে জ্বাল হয়নি। আবদুল আবদুল!

আবদুল  :         (নেপথ্যে) যাই সায়েব –

কাইউম :         জানেন আজকাল চাকর-বাকরগুলো যা হয়েছে –

কলিম   :         আর বলবেন না –

আবদুলের প্রবেশ।

কাইউম :         এই যে – এই ব্যাটা, দুধ জ্বাল দিয়েছিলি?

আবুদল  :         হ্যাঁ সায়েব।

কাইউম :         কতক্ষণ?

আবদুল  :         অনেকক্ষণ –

কলিম   :         অনেকক্ষণ কী হে। ক’মিনিটি –

আবদুল  :         সাহেব, আমরা মুখ্যু-সুখ্যু মানুষ – অত কি মিনিট-ফিনিটের হিসেব জানি? তাহলে কি আর পাকের কাজ করতে আসি?

কাইউম :         চুপ কর ব্যাটা বেয়াদব? আবার মুখে মুখে কথা! (কলিমকে দেখিয়ে) ব্যাটা কার সঙ্গে কথা বলছিস জানিস? দুধে পানি মিশিয়েছিলি?

আবদুল  :         সে-কী কথা সাহেব? আমি কেন দুধে পানি মেশাতে যাব?

কাইউম :         ও! ব্যাটা একেবারে আকাশ থেকে পড়ছে। যেন কিচ্ছু জানে না। মনে করিস কিছু টের পাই না – না? বাবা – আমার চোখে ধুলো দেওয়া অত সহজ নয়। (কলিমের দিকে তাকিয়ে) কী করে জানেন? অর্ধেকটা দুধ নিজে খেয়ে অর্ধেকটা পানি মিশিয়ে জ্বাল দেয়।

আবদুল  :         তওবা, তওবা! কী যে বলেন সায়েব।

কাইউম :         কোনো কথা নয়! অর্ধেক দুধের দাম হিসেব করে, সব পয়সা মাইনে থেকে কেটে রাখব বুঝ্লি?

আবদুল  :         সাহেব! গরিব মানুষ, একেবারে মারা পড়ব।

কাইউম :         ও! গরিব মানুষ! আর সায়েবদের পয়সা বুঝি আকাশ থেকে উড়ে আসে? না ঘরের মধ্যে পয়সার একটা গাছ আছে যে টোকা দিলেই ঝন্ঝন্ করে ঝরে পড়বে।

ইনাম    :         ও যখন এত করে বলছে, দাও না – এবারের মতো মাফ করে।

কলিম   :         হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই দিন। গরিব মানুষ –

কাইউম :         আচ্ছা যা, এখন যা, পরে দেখা যাবে। (চাকর প্রস্থানোদ্যত) আরে শোন! খবরদার! ফের যদি এরকম দেখি, তাহলে তোকে আমি পুলিশে দেব – বুঝলি? (চাকরের প্রস্থান। কলিমের দিকে তাকিয়ে) এসব ব্যাপারে আবার আমি ভয়ানক স্ট্রিক্ট – বুঝলেন? (একটু থেমে) কিন্তু কী করব – একা কী করব? যাক, আমার কী?

কলিম   :         (সিগ্রেট ধরাতে ধরাতে) কী যে এক বদভ্যাস করেছিলাম –

কাইউম :         বদভ্যাসটা কি আমারও ছিল।

কলিম   :         আরে আরে ভুলেই গিয়েছিলাম – নিন।

প্যাকেট বাড়িয়ে দিতেই কাইউম সিগ্রেট তুলে নেয়।

ইনাম    :         আমারও কিন্তু একটা বদভ্যাস আছে।

কলিম ইনামকে সিগ্রেট দিতে যায়।

ইনাম    :         না – অন্য এক বদভ্যাস।

কলিম   :         তাই নাকি? সে আবার কী?

ইনাম    :         রাত বেশি হলে বাতি নিবিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।

কলিম   :         ও!

[কলিম ঘড়ি দেখে। বারোটার কাছাকাছি বেডিং খুলে নিয়ে কাইউমের পাশেই মাটিতে একটা বিছানা করে নেয়। সকলে শোবার আয়োজন করতে থাকে।]

দ্বিতীয় পর্ব

একই দৃশ্য মেস ঘর। কলিম বেরুবার উপক্রম করে। মাথার চুল পাট করে শেষবারের মতো একবার আয়নার নজর বুলিয়ে নেয়।

কাইউম :         আরে আরে, কই চললেন?

কলিম   :         এখন আর ডাকাডাকি করবেন না। এমনিতেই দেরি হয়ে গেল। দেখুন কলারটা ঠিক আছে তো।

কাইউম :         (আবেদনপত্র লিখছে। চোখ তুলে) দেখুন না বড়জোর এক মিনিট। লিখছি (পড়ল) অ্যাঁ অ্যাঁ – Under these circumstances may I hope and pray that my case would receive your utmost consideration.

কলিম   :         কী বললেন, কী কনসিডারেশন?

কাইউম :         আটমোস্ট –

কলিম   :         বেশ বেশ, নিচে লিখুন – ডেটেড্’। জানেন তো কোনদিকে লিখতে হয়? (কাইউম দেখাল) হ্যাঁ। আমি চলি। ডিফিকাল্টি হলে আমাকে বলবেন। ভালো কথা, র‌্যাঙ্কিন্সে দরখাস্ত করছেন না? দাঁড়ান দাঁড়ান, সেখানে আবার আমার –

কাইউম :         কেউ আছে নাকি জানাশোনা? বসুন না বসুন। (চাবি দিয়ে বাক্স খুলে সিগারেট বার করে। একটা কলিমকে দেয়) তাহলে একটু সুপারিশ –

কলিম   :         (অন্যমনস্কভাবে সিগারেট ধরাবার চেষ্টা করে। দেশলাইয়ের কাঠি নিবে যায়) দাঁড়ান। দেখছি এসব ছোটখাট ব্যাপার। মানে প্রেস্টিজের ব্যাপার তো। আচ্ছা, ফিলিপসের সঙ্গে আমার তো লাঞ্চে দেখা হচ্ছে। দেখবখন, ঠিক ঠিক লিখেছেন তো। বাড়িয়ে লেখেননি তো। (একটু থেমে আবার দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে সিগারেট ধরায়) করি, মানুষের জন্য অনেক করি। কিন্তু এই সেবার, ধরুন না ইয়ে এসে ধরল Ñ একটু বলে দিন। বলেও দিলাম। শেষটায় ক্যাশ নিয়ে পালাল। ওজন্যই আজকাল Ñ আচ্ছা ভালো কথা, কানিংহাম এলে বলবেন আজ আমি বড় ব্যস্ত।

কাইউম :         কী, কার কথা বললেন?

কলিম   :         কানিংহাম। চিনবেন না। ইন্টারন্যাশন্যাল জুট ট্রেডিংয়ের মালিক। ওঁর একবার আসবার কথা আছে কি না  আমার খোঁজে –

কাইউম :         আপনার দেখছি বেশি বড় বড় লোকের সঙ্গে আলাপ।

কলিম জবাব দেয় না। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বেরিয়ে যায়। আবদুলের প্রবেশ।

কাইউম :         চক্কর মারছ কেন – ব্যাপার কী?

আবদুল  :         দেশলাই খুঁজছি হুজুর।

কাইউম :         দেশলাই দিয়ে কী করবি ব্যাটা। গাঁজা ধরেছিস নাকি?

আবদুল  :         না হুজুর। তওবা তওবা। কী-যে বলেন। চুলো ধরাব।

কাইউম :         আচ্ছা (পকেট থেকে বার করে) নে। ধরিয়ে আবার দিস।

চাকর চলে যাওয়ার উদ্যোগ করে

কাইউম :         শোন। দে, দে তো।

আবদুল  :         জ্যা –

চাকর দেশলাই ফিরিয়ে দেয়।

কাইউম :         গুণে রেখেছি। সাতাশটা কাঠি। একটা গেলে যেন ছাব্বিশটা ফেরত পাই। হ্যাঁ আমার কাছে ওসব চলবে না। দেশলাইয়ের কাঠি মেরে – হাঁ করে দেখছ কী – ওই বিন্দু বিন্দুতেই, যাকে বলে কিনা, সাগর হয় বুঝলি না। আমার চোখে ধূলো দিতে যাস নে, যা।

দরজায় করাঘাত। বই হাতে এক যুবকের প্রবেশ। মুস্তফার ছেলে। নাম আনোয়ার।

আনোয়ার         :         স্যার আছেন?

কাইউম :         আঃ মর। আবার কে। (দরজা খুলে) কাকে চাওয়া হচ্ছে?

আনোয়ার         :         স্যারের কাছে এসেছিলাম।

কাইউম :         কারণ?

আনোয়ার বই নামিয়ে রাখে। রুমাল দিয়ে মুখ মোছে।

আনোয়ার         :         আপনি নিশ্চয়ই স্যারের বন্ধু?

কাইউম :         হ্যাঁ, কেন?

আনোয়ার         :         তাহলে তো আপনাকে বলতে বাধা নেই। আপনি একটু দয়া করলে –

কাইউম :         অত ঢাক্ ঢাক্ গুড় গুড় কেন। যা বলার চট্পট্ বল।

আনোয়ার         :         না বলছিলাম কী Ñ ইতিহাসের সেকেন্ড পেপারটা একটু –

কাইউম :         না না, ওসব শুনব না। আরে বাবা আমি তো চিনি। আর এসো না। বলেছ বলেছ। মৌচাকে ঢিল দিতে এসেছ। সরে পড়ো।

আনোয়ার         :         আপনি একটু বললেই –

কাইউম :         তা হয়। বললে করবে নিশ্চয়ই। কিন্তু অন প্রিন্সিপল এসব করি না, বুঝেছ? আজ এরকম দেখছ বটে, কিন্তু চা-বাগানের কাজটা হয়ে গেলে –

আনোয়ার         :         লাইফটা তাহলে একবারে স্পয়েল হয়ে গেল।

কাইউম :         আহ্-হা তাই নাকি। কেন কেন?

আনোয়ার         :         (গম্ভীর হওয়ার ভান করে) জানতাম এসব বৃথা। আমার ভবিষ্যৎ বলে কিছু থাকল না।

কাইউম :         কেন, ভবিষ্যৎ থাকবে না কেন?

আনোয়ার         :         কী করে থাকবে। আমিই থাকব না। ভবিষ্যৎ থাকবে কেমন করে?

কাইউম :         কী অসুবিধের কথা। আর কোনো উপায় নেই?

আনোয়ার         :         না। (কাইউমের দিকে তির্যক দৃষ্টি ফেলে এবং তার ভাবান্তর লক্ষ করে) একটা কথা বলি। আপনারা তো এক্সপ্রেরিয়েন্সড্ লোক। কোনটা কম কষ্টের বলুন তো। রেললাইন, সায়ানাইড না ফাঁসী?

কাইউম :         কী সর্বনাশ! আত্মহত্যার কথা ভাবছ?

আনোয়ার         :         ভাবছি।

কাইউম :         কিন্তু তোমাকে কি কোনো রকমেই রক্ষা করা যায় না?

আনোয়ার         :         গেলেই তা কে করছে?

কাইউম :         কী যে বিপদে ফেল। আরে বাপু তোমার সাথে জানা নেই, শোনা নেই। নামটা পর্যন্ত জানি না। বেছে বেছে আমার কাছেই আস। এসব ষড়যন্ত্র আমি বুঝি না ভেবেছ। খুব বুঝি। হার্ট দুর্বল। জানো তো ভয়ের কথা বললেই Ñ কী যে ফ্যাসাদ বাধাও!

আনোয়ার         :         (খোলা অবস্থায় নাম-ঠিকানা লেখা একটা খাম ও আবেদনপত্র দেখে) আচ্ছা আপনার চিঠিটা ডাকে দিতে হবে না? আমি তো রেল-স্টেশনের দিকেই যাচ্ছি। মরবার আগে একটা উপকার করে যাই।

কাইউম :         চিঠি! আমার! কই দেখলে? ওটা তো অ্যাপ্লিকেশন। অবশ্যি ওই একই কথা। কী বলছিলে, ডাকে দিতে চাও, কিন্তু তুমি আত্মহত্যা করবে বললে যে –

আনোয়ার         :         আগে আপনার চিঠি ডাকে ফেলব। তারপর –

কাইউম :         না না। এ কী করে হয়। এ কী করে হয়। তোমাকে যে বাঁচাতেই হয়।

আনোয়ার         :         তা’হলে আমার সেকেন্ড পেপারটা।

কাইউম :         কী করব বাপু। জেনে শুনে তো তোমাকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিতে পারি না। কিছু একটা করতেই হয়।

আনোয়ার প্রসন্ন। চিঠিখানা তুলে নেয় বিছানা থেকে।

আনোয়ার         :         চিঠি আমি নিজে থেকে ডাকে ফেলব। ভাববেন না।

কাইউম :         তা ভালো। মনে করে ফেল। কিন্তু একটা টিকিট।

আনোয়ার         :         কী যে লজ্জা দেন। সামান্য কপয়সার টিকিট।

কাইউম :         হবে হবে, যাও। বলি না, কিন্তু তোমাকে দেখেই কেমন মায়া হলো। ওটা কিন্তু ডাকে ফেল। বোঝ তো দেশে চেঞ্জ পাওয়া যায় না, সব আস্ত নোট। হ্যাঁ ভালো কথা ঘুষ-টুষ দিচ্ছ না তো?

আনোয়ার         :         ছি ছি! কী যে বলেন। আপনি আমার গুরুজন।

                      আনোয়ারের প্রস্থান।

কাইউম :         তাই ভালো। একটা টিকিটের পয়সা বাঁচল। আজকালকার বাজারে এ ও কি কম। ছোঁড়া আবার কাউকে বলে না বসে।

হঠাৎ ইনামের প্রবেশ।

ইনাম    :         এসব কী শুরু করেছ বলো তো?

কাইউম :         কেন কেন! কী হলো আবার?

ইনাম    :         আমার স্টুডেন্ট ওদেরও রেহাই দাও না। ভাগ্যিস চোখে চোখে পড়েছিল।

কাইউম :         চিঠি তাকে দিতে বলেছি। ওতে অন্যায়ের কী দেখরেন।

ইনাম    :         নাও নাও হয়েছে। আমাকেও না ডুবিয়ে ছাড়বে না। দরকার হলে আমার কাছে টিকিটের পয়সা চাইলেই হতো।

ইনাম খবরের কাগজ পড়া শুরু করে। হঠাৎ কাইউমকে কাপড়-চোপড় গোছাতে দেখা যায়।

কাইউম :         বেশ। কথাটা সোজা করে বললেই হয়। আমার জন্য জাত যাচ্ছে, হ্যান হচ্ছে, ত্যান হচ্ছে। আর এক মুহূর্তও নয়। জিনিস-পত্র কাঁধে চাপিয়ে এখুনি চলে যাব।

বাক্সের ওপর বিছানা গাদা করে বসে পড়ে।

ইনাম    :         অপেক্ষা কিসের? বললে চলে যাচ্ছ?

কাইউম :         তবে, তবে কি আবার থাকব ভেবেছেন। আলবৎ যাব। কটা পয়সার জন্য অমন করলেন। তার চেয়ে –

ইনাম    :         বসে আছ কেন? (ঘড়ি দেখে) এখনো গেলে লোকাল ট্রেনটা পাবে।

কাইউম খানিকক্ষণ পায়চারি করে।

কাইউম :         দিন, দিন তাহলে।

ইনাম    :         কী দেব?

কাইউম :         কী দেবেন আবার! ট্রেনের ভাড়াটা লাগবে না? না সব শ্বশুর বাড়ির লোক। আপদ বিদেয় হলেই তো বাঁচেন। ভাববেন না। সব পেয়ে যাবেন। টি, এম, ও করে পাঠাব।

কলিমের প্রবেশ। কাইউমের বাঁধা বিছানাপত্র দেখল।

কলিম   :         আরে, বিছানা কার আবার?

কাইউম :         চলে যাচ্ছি। ভালোই হলো, এসে গেলেন।

কলিম   :         চলে যাচ্ছেন Ñ এখন কি যাবেন মশাই। বারোটা ঘণ্টা অপেক্ষা করুন।

ইনাম    :         বার ঘণ্টা কেন?

কলিম   :         আছে হে আছে। সব কি আর বলতে পারি।

কাইউম :         (ইনামের প্রতি ইঙ্গিত করে) একদম দেখতে পারেন না। চলুন এসব ডিসকাশন প্রাইভেটলি করাই ভালো।

কলিম   :         তাই চলুন। (যাবার আগে ইনামকে লক্ষ করে) প্রফেসর, হীরে চিনলে না। চটিয়ে দিলে। ভালো করলে না, আখেরে প্রস্তাবে।

ইনাম    :         এসব বিদ্যায় আমি সিদ্ধহস্ত। তেমন প্রয়োজন হলে চাটুকারিতার ময়ূর সিংহাসনে বসিয়ে তোমাকে খোশামোদ করব। সময় আসুক –

কাইউম চলে যাওয়ার উদ্যোগ করে। কলিমকে যাকে।

কাইউম :         চলে আসুন, চলে আসুন। হুঁ শুনলেন তো? কথাটার ধাঁচ বুঝলেন না সায়েব। ওই যে বললাম। কাউকে দেখতে পারেন না। সবাই চক্ষুশূল।

                  দুইজনের প্রস্থান।

ইনাম    :         আবদুল।

আবদুল  :         হুজুর –

ইনাম    :         কী রান্না হলো রে আজ?

আবদুল  :         পুঁইশাক আর চিংড়িমাছ। রাতের ডাল তো রয়েছেই।

ইনাম    :         আজ আবার বাজার করিসনি তো?

আবদুল  :         না।

ইনাম    :         সে-ই ভালো। ওঁৎ পেতে আছি বুঝলি।

আবদুল  :         হুজুর –

ইনাম    :         কিছু খাবার পাঠাবার কথা আছে আজ, দেখি। বুঝলি না, আহা আমি তো আর চেয়ে নিচ্ছি না। পুরোন স্টুডেন্ট মকবুল নিচে যেচে দিচ্ছে। মন্দ কী। পয়সাটাও বাঁচে।

দরজায় শব্দ।

ইনাম    :         দেখ দেখ ওই এলো বুঝি তরকারি নিয়ে। আবদুল একটা প্লেট –

আবদুল প্লেট নিয়ে এলো। মুস্তফা টিফিন-কেরিয়ার হাতে হন্তদন্ত হয়ে ঢোকে।

আবদুল  :         তরকারি এনেছেন বুঝি-

মুস্তফা   :         তরকারি, তরকারি কী হে। তরকারি আমি আনব কি! হ্যাঁ, আচ্ছা বেয়াদপ তোমার চাকর। ব্যাটা মাফ চেয়ে নে।

ইনাম    :         আপনাকে অন্য কেউ মনে করছে হয়তো।

মুস্তফা   :         করলেই বা। তাই বলে কথা নেই, বার্তা নেই –

ইনাম    :         তা আপনার হাতেই টিফিন-ক্যারিয়ার কেন শুনি?

মুস্তফা   :         শোন বলছি। আঃ বেটাছেলে আচ্ছা বেয়াদপ তো। দাঁড়িয়ে শুনিস কী? শোন একটু গোপনেই বলি।

ইনাম    :         বলুন বলুন।

মুস্তাফা  :         দেখ হে, ব্যাংকে আমার বিশ্বাস নেই। বুঝলে না। বেচাকেনা যা হয় তা নিয়ে আসি।

ইনাম    :         টিফিন-ক্যারিয়ার কেন?

মুস্তাফা  :         বুঝলে না দুপুরে খাবার আসে। আর রাতে ওতেই টাকা-পয়সাগুলো নেবার সুবিধে। কোনো ব্যাটা সন্দেহ করে না। যা সব পকেটমার ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ইনাম    :         তা ভালোই করছেন। তা হঠাৎ কী মনে করে।

মুস্তাফা  :         দেখ প্রফেসার, জীবনে পয়সা-কড়ি অনেক কামাই করেছি। ওতে আর শখ নেই। কিন্তু দেশের যা অবস্থা তাতে একটা ভালো ইন্ডাস্ট্রি না করলে চলে না। কাল কী স্বপ্ন দেখলাম জানো। দেশ আমাকে বলছে, মুস্তাফা তুমি ছিনিমিনি করে জীবনটা নষ্ট করো না। দেশ তোমাকে চায়, দেশ তোমাকে চায়। তোমার যে অনেক দায়িত্ব, অনেক কাজ।

ইনাম    :         তা সত্যি, আপনার অনেক দায়িত্ব। অনেক কাজ। তাহলে আপনাকে ধরে রাখা উচিত নয়।

মুস্তাফা  :         ঠিক কথা বলেছ। ঠিক কথা বলেছ। আমার অনেক কাজ। দেশ আমাকে ডাকছে। আমি যাই।

          মুস্তাফার প্রস্থান।

তৃতীয় পর্ব

মুস্তাফার বাড়ি। ছিমছাম গোছানো। একপাশে আয়রন সেফ। মনোরম আসবাবপত্র গ্রামোফোন রেকর্ড বাজছে। লিলি মৃদু পা দুলিয়ে তাল ঠুকছে। আনোয়ারের প্রবেশ। হাতে দুটো প্যাকেট।

আনোয়ার         :         সাংঘাতিক ব্যাপার!

লিলি     :         (রেকর্ড বন্ধ করে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়) কেন কী হলো আবার।

আনোয়ার         :         আর বলিস কেন। তোর কথা শুনতে গিয়েই যত ফ্যাসাদ।

লিলি     :         বা-রে, আমি আবার কী করলাম?

আনোয়ার         :         কী করলম মানে। আমারই ভুল। হ্যাঁ, মেয়ে মানুষের কথায় যেন নাচতে যাও Ñ এখন বোঝ। এখন করি কী? কাপড়গুলো তো নিয়ে এলাম। টাকা চাচ্ছে দোকানদার। অনেক বলেকয়ে বুঝিয়েছি, বাপু আজ সন্ধ্যায় দিয়ে দেব। কিন্তু বললে কী হয়। ব্যাটা কাবুলিওয়ালা! ছাড়বে কেন?

লিলি     :         তাইতো এখন উপায়?

ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়ে।

আনোয়ার         :         ওসব চালাকি চলবে না। টাকার ব্যবস্থা করতেই হবে। তখন তো খুব বললি, কোট-প্যান্ট বানাও, স্যুট বানাও, শাড়ি কেন – পয়সার একটা হিল্লে হয়ে যাবে। পাঁচশো টাকা এখন পাবি কই শুনি?

লিলি     :         কেন, বাবা –

আনোয়ার         :         ওরে বাবা। ও আমাকে দিয়ে হবে না। ভালো কথা ওই লোহার আলমারিতে কী?

লিলি     :         টাকা।

আনোয়ার         :         কিছু একটা করতেই হয়। তুই দরজাটা ভেজিয়ে দে তো। আহা অন্যায় তো কিছু করছি না। শুধু আমার নয়, বাবারও তো কাপড় আছে।

লিলি দরজা ভেজিয়ে দেয়।

লিলি     :         কিন্তু খুলবে কী করে?

আনোয়ার         :         শেল্ফে এই ডুপ্লিকেট চাবিগুলো ছিল। তারই একটা Ñ

আনোয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কোনোমতেই তালা খোলে না। লিলি দাঁড়িয়ে দেখে। এবার আরেকখানা রেকর্ড বাজাতে যায়। আনোয়ার রেগে গিয়ে ওটা বন্ধ করে দেয় এবং আবার তালা খোলার কাজে মন দেয়।

আনোয়ার         :         লিলি টর্চলাইটা নিয়ে যায় তো। (লিলি টর্চলাইট নিয়ে আসে। আনোয়ারের হাতে চাবির গোছা) না, কোনোমতে লাগছে না। তালা চেঞ্জ করেছে, বুঝলি।

লিলি     :         শুধু তালা। আলমারিটাই চেঞ্জ করল কি না কে জানে। যদি এক্স-রে করে দেখা যেত।

আনোয়ার         :         আচ্ছা এত টাকা দিয়ে বাবা করে কী।

লিলি     :         কী জানি। বোধহয় গুণধর পুত্রের জন্য –

আনোয়ার         :         যা যা। আদর সোহাগের বেলায় তো তুই। যেন রাজকন্যে। ফুটুনি দেখলে গা জ্বালা করে।

নাসিম বানুর প্রবেশ।

নাসিম বানু        :         টর্চ নিয় কী করছিস তোরা?

আনোয়ার         :         কই না। আমরা তো পেনসিল খুঁজছি।

                               হঠাৎ হাত থেকে চাবি পড়ে যায়।

নাসিম বানু :      পেনসিল! তা চাবি কিসের?

লিলি     :         তালার। কিন্তু একদম অকেজো।

নাসিম বানু :      তার মানে।

লিলি     :         (চাঁবিখানা তুলে নিয়ে) তুমি নাও মা। তোমার চাবির রিং-এ অপদার্থটাকে আশ্রয় দিও।

নাসিম বানু :      বড় বেয়াদপ হয়েছিস।

নামিবানু চাবির তোড়া এ কাঁধ থেকে ও কাঁধে রাখেন।

আনোয়ার         :         আচ্ছা মা। তোমার যতগুলো চাবি ততগুলো বাক্স আছে তো?

নাসিম বানু :      আসুক তোমার বাবা। হয় তোর একদিন, না হয় আমার। কী আস্পর্ধা। মা, না তোদের ইয়ার!

লিলি     :         মা Ñ

নাসিম বানু        :         মুখ দেখতে ইচ্ছে করে না পোড়াকপালি মেয়ের।

লিলি     :         মা, আমরা গম্ভীর হলাম।

আনোয়ার         :         তোমার বাধ্য হলাম। তোমার বকুনি খেলাম। এবার আমাদের কথা শোন।

নাসিম বানু        :         তোদের মতো বজ্জাতদের সঙ্গে কথা বলতেও রুচি হয় না;

আনোয়ার         :         হয় মা, হয়। ওটা তোমার রাগের কথা মা।

লিলি     :         আর রাগের সময় কারইবা মাথা ঠিক থাকে।

               গম্ভীর মুখে নাসিম বানুর প্রস্থান।

আনোয়ার         :         হয়েছে। একটা কথা ভাবছি। জানিস লিলি টাকা তো শেষ পর্যন্ত আমরাই পাচ্ছি। কিছু খসালে ক্ষতি কী?

লিলি     :         তা’ছাড়া সম্পত্তির ভবিষ্যৎ মালিক যখন আমরাই।

আনোয়ার         :         হুঁ ঠিক বলেছিস। আজই বাবাকে ব্যাপারটা খুলে বলতে হয়।

লিলি     :         কী বলবে?

আনোয়ার         :         বলব, পাঁচশো টাকা দাও।

মুস্তাফার প্রবেশ।

মুস্তাফা  :         কিরে, লেখাপড়া নেই। কী হচ্ছে দুটিতে মিলে।

লিলি     :         কাকস্য পরিবেদনা বানানটা শিখিছি। আনোয়ার আবার বাংলায় মস্ত প-িত কি না।

মুস্তাফা  :         ওটা আবার কী?

লিলি     :         একটা শক্ত বানান।

মুস্তাফা  :         ও, (আনোয়ারের দিকে তাকিয়ে) আর তুই?

আনোয়ার         :         আমি লর্ড ওয়েলেস্লির সৎকাজর ফিরিস্তি ভাবছি।

লিলি     :         তোমাকে একটা কথা বলি বাবা।

মুস্তাফা  :         কী কথা আবার Ñ

লিলি     :         (আনোয়ারের দিকে তাকিয়ে) তুমিই বলো।

আনোয়ার         :         বাবা আমাদের পাঁচশো টাকা দরকার।

মুস্তাফা  :         অ্যাঁ, পাঁচশো টাকা! বলিস কী।

লিলি     :         সত্যি সত্যি তো, টাকা আর তুমি দিচ্ছ না।

মুস্তাফা  :         তার মানে?

আনোয়ার         :         ধরতে গেলে আপাতত তুমিই দিচ্ছ। কিন্তু আমাদের হিসেব থেকে পরে নিয়ে নিলেই চুকে গেল।

মুস্তাফা  :         কী বলছিস। কিছু বুঝতে পারছি না।

আনোয়ার         :         (লিলিকে) তুই বলো না Ñ

লিলি     :         না না, তুমিই বলো।

আনোয়ার         :         আমি (আমতা আমতা করে) আমি বলব Ñ মানে ধরতে গেলে তোমার বংশে আমরা দুজনই সব।

আনোয়ার         :         ভবিষ্যতে যখন সম্পত্তির হিসাব-নিকাশ হবে Ñ

মুস্তাফা  :         হিসাব-নিকাশ। হিসাব-নিকাশ মানে?

আনোয়ার         :         মানুষের জন্ম-মৃত্যুর কি ঠিক-ঠিকানা আছে? আজ আছি, কাল নেই। আবার যদি বলার সুযোগ না হয়, তাই।

মুস্তাফা  :         অ্যাঁ?

আনোয়ার         :         এখন টাকাটা দাও। পরে না-হয় পাঁচশো টাকা কম করে দিও।

মুস্তাফা  :         কম করে দেব!

লিলি     :         হ্যাঁ ওরকমই হবে।

মুস্তাফা  :         আমি কিছু বুঝতে পারছি না।

লিলি     :         লোহার আলমারি খুলে দাও। দোকানদারের পাওনা মিটিয়ে দিই। আনোয়ার খুলতে পারল নাকি না Ñ

মুস্তাফা  :         তার মানে তোরা আলমারি খুলে টাকা সরিয়েছিস! কই, শুনলে? গুণধর ছেলের কীর্তি শোন। কোথায় তুমি পাটরানী। তুমি তো জরদা আর পান গিলেই গেলে। তোমার ছেলেমেয়েরা Ñ

আনোয়ার         :         বাবা হিসাব করলে কিছু কমই হয়। আমরা একটু বাড়িয়ে বললাম। কিছু কম দিলেও চলবে।

মুস্তাফা  :         কী বলছিস তোরা? এখন টাকা দেব, তারপর হিসাব থেকে বাদ দেব। না বাপু, মাথা খারাপ না করে ছাড়বে না দেখছি।

লিলি     :         মানুষের জন্ম-মৃত্যুর কথা কেউ বলতে পারে? এই আছি, এই নেই।

মুস্তাফা  :         বুঝেছি বুড়ো মরুক আর দশ ভূতে মিলে সম্পত্তি লুটুক। তা আমি হতে দেব না। সে আশায় থেকে না বাছাধনরা।

আনোয়ার         :         আমাদের কথাটাই তুমি শুনলে না। বলছিলাম কী, এখন পাওনাটা মিটিয়ে দাও। পরে পাঁচশো টাকা কম করে দিও।

মুস্তাফা  :         কই শুনছ। সর্বনাশ। লিলির মা। ঘরে আমার শত্রু। বাইরে শত্রু। ওরে আমি দুধ দিয়ে সাপ পুষেছি।

লিলি     :         বাবা। মানুষকে সাপ বললে সাপের অমর্যাদা হয়।

মুস্তাফা  :         চুপ করো। বজ্জাত পাজি মেয়ে। আসকারা পেয়ে মাথায় উঠেছে সব। কই শুনছ Ñ

পানদানি ও জাঁতি হাতে নাসিমবানুর প্রবেশ।

নাসিমবানু         :         পান না তোমার মু-ু। বয়েস যত বাড়ছে বুদ্ধিসুদ্ধিও লোপ পেতে বসেছে তোমার। কতবার বলি সাঁচি পান নিয়ে এসো।

মুস্তাফা  :         তোমার পানের চিন্তা। সারাজীবন তো ঘাস-পাতা চিবুলে একবার এদিকে কা- দেখ।

নাসিমবানু         :         বুকের ব্যথাটা বাড়ল বুঝি।

মুস্তাফা  :         চুলোয় যাক ব্যথা। সিঁদ কেটে নিয়ে গেল Ñ আমার সব লুটে নিল।

নাসিমবানু         :         কে?

মুস্তাফা  :         কে। আবারও জিজ্ঞেস করছ কে? (লিলির দিকে) এই হারামজাদি এদিকে আয়। বল, তোর মায়ের সামনে বল, কত টাকা সরিয়েছিস। কসম খেয়ে বল।

লিলি     :         টাকা তো আমরা এক পয়সাও সরাইনি।

মুস্তাফা  :         সব মিথ্যে কথা। নিশ্চয়ই সরিয়েছিস। আলবৎ সরিয়েছিস।

নাসিমবানু         :         যাই, আমার আবার চুলোয় রান্না চড়ানো।

                        প্রস্থান।

লিলি     :         বাবা টাকা দাও না। মাত্র তো চারশো চৌষুট্টি টাকা!

মুস্তাফা  :         কী করবি টাকা দিয়ে? সত্যি করে বলো কিছু করব না, নইলে এই হান্টার দেখেছ?

আনোয়ার         :         প্যাকেট খুলল। অন্যান্য কাপড়-চোপড়ের সঙ্গে তাতে একটা গরম শেরওয়ানি, দুটো পাঞ্জাবি একটি’ চাদর ও একটি হাতছড়ি।

মুস্তাফা  :         এর মানে? এসব কী।

লিলি     :         তোমার কাপড়-চোপড়।

ম্স্তুাফা  :         আমার কাপড়-চোপড়। আমার? কেন কেন? কী কা-?

লিলি     :         (মুরুব্বিয়ানা চালে) টাকা রোজগার কর যখন, যা-তা পরার কোনো মানে হয় না।

মুস্তাফা  :         কী হয় না হয়, তার কৈফিয়ৎ তোদের কাছে দিতে হবে?

                                শেরওয়ানি হাতে নিয়ে।

মুস্তাফা  :         এমন কা- দেখিণি। গজ কত করে Ñ

আনোয়ার         :         সাতাশ টাকাতেই দিলো। চেনাশোনা ছিল কিনা Ñ

লিলি     :         সেলাইও দেড়শো টাকায় হয়ে গেল।

মুস্তাফা  :         হয়ে গেল! ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে বলল কে। আরে আমার যাতনা আমি বুঝি না। মইজুদ্দিনের দোকানে গেলে সস্তায় মিলত। তা নইলে এত টাকাই বা লাগবে কেন?

লিলি     :         তোমাকে তো জানি বাবা। আমাদের দুটো কাপড় না বানিয়ে দিয়ে একা তুমি এ কাপড় কখনো পরতে পারো? তুমি আমাদের কত ভালোবাস তা কি আর জানি না। সেজন্যই তো আনোয়ারকে বাধ্য হয়ে একটা কোট, চারটে শার্ট, দুটো প্যান্ট তৈরি করতে হলো। আর সে সঙ্গে আমাকেও কী যেনÑ

আনোয়ার         :         চারটে শাড়ি, দুটো ব্লাউজ।

লিলি     :         আমার কিন্তু একদম ইচ্ছা ছিল না। দায়ে পড়েই Ñ

মুস্তাফা  :         এতক্ষণে  সব বোঝা গেল। না, আমার জাত না খুইয়ে ছাড়বে না দেখছি। কী সাহস! হাঁ করে দেখছিস কী? খেসারত দিতেই হবে। দোকানদারকে কাল অফিসে দেখা করতে বলিস। সেখানেই চুকিয়ে দেব। কিন্তু খবরদার ভবিষ্যতে Ñ

লিলি     :         তাতে কী। ওটা তো আমাদের টাকা থেকেই যাচ্ছে।

মুস্তাফা  :         তোদের টাকা। তোদের টাকা আবার কিসের। এক পাইও দেব না। পোকায় কাটবে তাও ভালো। হুঁ! যা বের হ।

আনোয়ার ও লিলির প্রস্থান। মুস্তাফা শেরওয়ানি গায়ে দিলো। একটু হাসি ফুটল মুখে। হাতে ছড়ি নিয়ে পামশু জোড়া পরল। বাইরে দরজায় করাঘাত। কলিমের প্রবেশ।

কলিম   :         একি, আপনি বাইরে যাচ্ছেন নাকি Ñ

মুস্তাফা  :         বাইরে, বাইরে যাওয়ার কী দেখলেন আবার?

কলিম   :         না। ভালো কাপড়-চোপড় পরতে দেখলাম কিনা।

মুস্তাফা  :         দেখাদেখির কী আছে। এতো সচরাচরই পরি। হ্যাঁ জানেন সাহেব কত করে গজ? তেত্রিশ টাকা। জানাশোনা ছিল বলে দেড়শোতেই সেলাই হলো।

কলিম   :         চমৎকার! সত্যি কী সস্তা।

মুস্তাফা  :         সস্তা! এটা সস্তা হলো। সাহেব (কানে কানে) ছেলেমেয়ে ফন্দি এঁটে বানিয়ে দিলো। নইলে কি আর পরা যেত। এ তো ভালো, কী বলেন।

কলিম   :         তা তো বটেই। আপনার ছেলেমেয়েরা দেখছি খুব সুবিবেচক।

মুস্তাফা  :         ওই সবেমাত্র দুটি। ছেলে আর মেয়ে Ñ যাই বলুন।

কলিম   :         বোঝা গেল না। দুটিই বুঝি ছেলে Ñ

মুস্তাফা  :         আঃ আপনি যে কী। মেয়ে আমার বড় সোহাগিনী।

কলিম   :         যাক, কাজের কথায় আসা যাক। কাল ভেবে দেখলাম আমার আরো অফার ছিল, বুঝলেন। রাজি হলাম না। করা যায়, যাবে না কেন। মাড়ওয়ারি পার্টনার শিবুরাম ঠনঠনিয়া বলছিল আসুন হামি বিজনেস করিবে Ñ

মুস্তাফা  :         করিবে না সাহেব। ওসব খপ্পরে কখনো যাবেন না। আর আপনার কলিয়ারি, এত কাঁচা টাকা! সাবধান, এদের সঙ্গে কারবার করার চেয়ে সায়েবের বাচ্চার সঙ্গেও করা ভালো।

কলিম   :         তাও ছিল। র‌্যাঙ্কিন ছিল, কানিংহাম ছিল। কিন্তু কোথায় যেন ভরসা পাই না, বুঝলেন। কনফিডেন্সের অভাব। লাখ-বেলাখের ব্যবসা Ñ

মুস্তাফা  :         তা তো সত্যি কথা। প্যাট্রনাইজ ওর কান্ট্রি, কথায় বলে না। আরে, আামি আপনার মনের কথা যতটা বুঝি Ñ দুঃখ যতটা বুঝি Ñ

কলিম   :         কী যে লজ্জা দেন। আপনারা সায়েব আমাদের এক হাটে কিনে আর এক হাটে Ñ

আনোয়ারের প্রবেশ।

কলিম   :         (আনোয়ারকে দেখিয়ে) এটি বুঝি আপনার ছেলে?

মুস্তাফা  :         ইয়ে Ñ যাই বলুন। পড়াশুনা করে না একদম।

কলিম   :         খারাপ কথা। খুব খারাপ কথা। এস বাবা, কী নাম তোমার?

আনোয়ার         :         রোল নম্বর ফিফটি সেভেন, পিটার্স কলেজ। আপনি কে?

কলিম   :         আমি কে? বলুন (মুস্তাফার দিকে তাকিয়ে) কী বলি?

মুস্তাফা  :         আজকালকার ছেলে। দেখুন না কেমন ঘাড় বাঁকা।

আনোয়ার         :         (খাতা খুঁজতে খুঁজতে) আপনাকে দেখে কিন্তু বিজনেসম্যান মনে হয় না।

কলিম   :         কী মনে হয়?

আনোয়ার         :         ক্যানভাসার।

কলিম   :         অ্যাঁ!

আনোয়ার         :         ভদ্রলোক নাম জিজ্ঞেস করে না। তবু আপনার যখন ঔৎসুক্য, খাতাটা দিলাম, নিন।

খাতাটা দিলো।

কলিম   :         কী করব?

আনোয়ার         :         নামটা দেখে নিন। কৌতূহল মিটবে।

            আনোয়ারের প্রস্থান।

মুস্তাফা  :         এদের জন্য আমার মাথা কাটা গেল। মাপ করবেন। কিছু মনে করবেন না যেন। এমন পাগলাটে ছেলে আমার।

কলিম   :         না না। তার জন্য কী হয়েছে। তাছাড়া যখন আপনার পার্টনার হতে চলেছি।

মুস্তাফা  :         তাহলে, এই পাঁচ হাজার টাকার চেকটা রাখুন। কালই Ñ

কলিম   :         সে আর বলতে হবে না। মনে করুন আজ থেকেই কাজে লেগে গেলাম Ñ

মুস্তাফা  :         আচ্ছা।

কলিম   :         ভালো কথা Ñ কিছু পয়সা দিতে পারেন?

মুস্তাফা  :         সে আবার কী হবে?

কলিম   :         বাসভাড়া। নইলে ভাঙ্গাবো কোথায়? আর Ñ

                   [লিলির প্রবেশ]

লিলি     :         বাবা কলেজে যাচ্ছি।

মুস্তাফা  :         (কলিমের দিকে চেয়ে) তাহলে ওই কথাই রইল Ñ

লিলি     :         আমি কলেজে যাচ্ছি।

কলিম   :         ওই যে শুনুন, আপনার স্ত্রী বোধহয় কী বলতে চাইছেন। উনি কলেজে যাচ্ছেন।

মুস্তাফা  :         আমার স্ত্রী কলেজে যাচ্ছেন? সায়েব ও আমার স্ত্রী নয়, মেয়ে।

কলিম   :         আপনার মেয়ে? ভালোই।

মুস্তাফা  :         ভালোটা আবার কী দেখলেন?

কলিম   :         ভালো। ভালো। আপনার মেয়ে কলেজে যায়, সে ভালো Ñ

লিলি     :         বাবা লোকট কী পাগল?

মুস্তাফা  :         না। বিজনেসম্যান।

লিলি     :         ও।

লিলির প্রস্থান। মুস্তফা ও কলিম দুজনেই ওর দিকে তাকিয়ে থাকে।

চতুর্থ পর্ব

[মুস্তাফার চেম্বার। ছোটখাট অফিস। টাইপরাইটারে একজনকে টাইপ করতে দেখা যাবে। কলিমের প্রবেশ।]

কলিম   :         (ঘড়ির দিকে তাকিয়ে) মুস্তফা সাহেব আসেননি? (কেউ জবাব দিলো না) অথচ দশটা বাজতে চলল (তবু নিরুত্তর। টাইপিস্টের কাছে গিয়ে) বাঃ, চমৎকার স্পিড তো আপনার।

টাইপিস্ট :         (আঙুলের মোড়া ভেঙে) কী বললেন স্পিড, এই মাইনেতে যে এই করি, সেই যথেষ্ট।

কলিম   :         তা তো বটেই। প্রমোশন হওয়া দরকার।

টাইপিস্ট :         আপনার সঙ্গে তো খুব দহরম-মহরম। একটু যদি সুপরিশ           করেন Ñ

কলিম   :         সে আর বলতে হবে না। গুণী লোক দেখলেই চিনি। কিন্তু মুস্তাফা সাহেব Ñ

টাইপিস্ট :         (কাগজপত্র গুছিয়ে) ওই এলেন বোধহয় (কাজে বসল) উইথ্ রেফারেন্স টু ইওর লেটার Ñ

                   [লিলির প্রবেশ। কলিমকে দেখে খানিকটা অপ্রতিভ। একটা চেয়ার টেনে বসে। তারপর ওটা একটু দূরে সরিয়ে দেয়। দুজনেই চুপাচাপ]

কলিম   :         (অযথা ঘড়ি দেখে এবং লিলির ঘড়ির দিকে তাকিয়ে) না, আমার ঘড়িটাই স্লো কে জানে।

                   [লিলি নিরুত্তর। খাতা বার করে কী দেখতে থাকে]

লিলি     :         (টাইপিস্টের দিকে তাকিয়ে) বাবা কোথায়?

টাইপিস্ট :         ওঁর এখুনি আসার কথা।

কলিম   :         (আবার ঘড়ি দেখে) না একটু ফাস্ট, তাই বা কে জানে!

লিলি     :         কোথাও খুনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে নাকি?

কলিম   :         খুন! তার মানে?

লিলি     :         অত অ্যাকুরেট টাইম আর কিসে লাগে?

কলিম   :         দেখ বয়সে তুমি Ñ তুমি Ñ আমার Ñ

লিলি     :         ছোট না বড়, সেটা আপনি জানেন না Ñ ওসব কথা রাখুন।

কলিম   :         জানো তোমার বাবা আমার পার্টনার।

লিলি     :         জানি।

কলিম   :         ইঁচড়ে পাকা মেয়ের সাথে কথা বলাই অন্যায়!

লিলি     :         (টাইপিস্টের কাছে গিয়ে) টাইপিং শিখতে কদিন লাগে?

টাইপিস্ট :         তা আপনি ইচ্ছে করলে আর লাগালাগির কী আছে। স্পর্শ করলেই যাকে বলে Ñ

কলিম   :         ডিপেন্ডস অন প্র্যাকটিস Ñ

লিলি     :         তা তো করেই। আপনার কলিয়ারির খবর কী?

কলিম   :         কলিয়ারির আবার খবর কী। কলিয়ারি থেকে কয়লা ওঠে।

লিলি     :         ওঠে বলেই তো জানি। কিন্তু আপনার কলিয়ারিতেও? শুনলাম বাবার কাছে থেকে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে কাজেও নেমেছেন Ñ

কলিম   :         পাঁচ হাজার Ñ পাঁচ হাজার আবার একটা টাকা হলো নাকি? ওটা শুধু প্রিপারেশন, আসল কাজ তো এখনো বাকি।

লিলি     :         আরও নেবার মতলব আছে নাকি?

কলিম   :         আমি ভয়ানক অপমান বোধ করছি। তোমার বাবা এলেই এর একটা হেস্তনেস্ত Ñ

মুস্তাফার প্রবেশ। দু’জনকেই দেখল।

মুস্তফা   :         (মেয়ের দিকে তাকিয়ে) কী রে, তুই আফিসে কেন?

লিলি     :         মাইনে দেবার লাস্ট ডেট আজ।

মুস্তাফা  :         ও। আরে, আপনি Ñ তা কতক্ষণ ধরে বসে আছেন?

লিলি     :         বলা মুশকিল।

মুস্তাফা  :         কেন। এতে আবার মুশকিলের কী হলো?

লিলি     :         ওঁর ঘড়ি স্লো না ফাস্ট বুঝতে পারছেন না।

কলিম   :         আপনার মেয়ে কি বড্ড ইন্টেলিজেন্ট।

মুস্তাফা  :         হুঁ।

লিলি     :         হঠাৎ একেবারে উলটো সুর যে!

কলিম   :         আরে চালাক-চতুর, সে আমি দেখলেই বলতে পারি। পড়াশুনো করালে Ñ

লিলি     :         বাবা টাকাটা দাও তো, চলি তোমার পার্টনারের তোষামোদ শুনলে মাথা খারাপ হয়ে যেতে পারে।

মুস্তাফার টাকা দিলো।

কলিম   :         আশ্চর্য। যাই বলুন সত্যি মেয়ে-ভাগ্য আপনার অপূর্ব।

লিলি     :         চলি। নিজের প্রশংসা বারবার শুনলে তা সত্যি বলেও মনে হতে পারে।

প্রস্থান

মুস্তাফা  :         (টাইপিস্টকে ডেকে) কাগজগুলো টাইপ হয়েছে? কই দেখি। (টাইপ দেখে) হুঁ, এটা টাইপ হলো? এত কাটাকুটি হয়েছে কেন? তাছাড়া আপনি বড় স্লো।

কলিম   :         আমিও তো সেই কথা বলতে যাচ্ছিলাম। শুধু শুধু ওয়েস্টেজ। (কাগজখানা হাতে নিয়ে) না না, কোনো কাজের নয়। আজই জবাব দিয়ে দিন।

মুস্তাফা  :         তাই দিতাম। অনেক দিন কাজ করেছে কিনা। (টাইপিস্টকে) আচ্ছা তুমি এখন যাও। কাজের কথায় আসা যাক। কদ্দুর হলো?

কলিম   :         সবঠিক কিছু ভাববেন না। কালই আমি পার্টি’র সঙ্গে কথাবার্তা সেরে নিয়ে Ñ

মুস্তাফা  :         একটা কথা বলছিলাম। কিছু মনে করবেন না। সেলটা তেমন ভাল যাচ্ছে না। কিছু টাকা যদি বন্দোবস্ত করতে পারেন Ñ

কলিম   :         টাকা। অবশ্যি পারি। যদিও সব ইনভেস্টমেন্টে রয়েছে। তবে ঠুনঠুনওয়ালাকে বললে Ñ

মুস্তাফা  :         না না, ওসবের দরকার নেই।

কলিম   :         আমিও তাই বলি Ñ

হন্তদন্ত হয়ে ফইউমের প্রবেশ।

কাইউম :         সর্বনাশ হয়েছে! (কলিমের মুখ শুকিয়ে যায়) কী গরু খোঁজাটাই না খুঁজছি। শুনলাম আপনি এখানে। কী হবে বলুন Ñ একেবারে নর্বনাশ!

কলিম   :         তার মানে Ñ

কাউইম :         হেরে গেছি মশাই Ñ দশ হাজারের স্বপ্ন গেল।

মুস্তাফা  :         কিসের দশ হাজার Ñ

কলিম   :         না না, কিছু না। বিজনেস লসের কথা বলেছে বোধহয়। কলিয়ারিতে Ñ

কাইউম :         লস বলে লস, ক্রসওয়ার্ডটা জিতে গেলে কে ঠেকাতো বলুন Ñ

কলিম   :         আহ, গাধা কোথাকার থাম তো।

কাইউম :         আপনি আমাকে গাধা বললেন?

কলিম   :         আলবৎ বলব।

কাইউম :         তা তো বলবেনই। বলবেনই। শেষটায় আপনিও ঠকালেন।

মুস্তাফা  :         ঠকানোর কথা আবার কী হচ্ছে?

কলিম   :         না না, ঠকাঠকি কিছু নয়। ও বোধহয় Ñ

কাইউম :         বোধহয় Ñ মানে Ñ আর কোনো আশা নেই। রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে।

কলিম   :         যাও, যাও তো। ঘ্যান্ ঘ্যান্ করো না। যা বোঝ না, তাই করতে আস।

মুস্তাফা  :         আমি কিছু বুঝতে পারছি না। ক্রসওয়ার্ড Ñ দশ হাজার টাকার          স্বপ্ন Ñ

কাইউম :         আপনিই বলুন। দুঃসংবাদ হলে কী দিতে নেই Ñ ওই তো আমাদের একমাত্র ভরসা। জানেন ওই দশ হাজার পেলে আমরা দুজনে Ñ

মুস্তাফা  :         আপনার দুজনে মানে?

কাইউম :         কেন কলিম সাহেব বলেননি বুঝি?

কলিম   :         দেখুন। ওর মাথায় একটু ছিট। ওর কথায় আমল দেবে না।

কাইউম :         খবরদার। মিথ্যে বলবেন না। বড় শক্ড হব। সুইসাইডও করে বসতে পারি। জানেন Ñ

মুস্তাফা গম্ভীর হয়।

মুস্তাফা  :         (চিন্তাগ্রস্ত) হুঁ। তাহলে Ñ

কলিম   :         এই দেখুন। আপনি আবার কী ভাবনা শুরু করলেন।

মুস্তাফা  :         আচ্ছা, আপনার কলিয়ারিটা কোথায়?

কলিম   :         কলিয়ারি এই তো কাছেই Ñ না Ñ মানে মাইল ষাটেক হবে।

মুস্তাফা  :         চলুন। কাল ওটা দেখে আসি।

কলিম   :         চলুন। তা ভালই। তা কালই, যাবেন। ষাট মাইল কি কম কথা।

মুস্তাফা  :         তা হোক, সে ব্যবস্থা আমি করব। তাহলে ওই কথা রইল।

মুস্তাফার প্রস্থান।

কাইউম :         আপনার কলিয়ারি মানে বুঝতে পারলাম না Ñ

কলিম   :         মাটি করেছ! উজবুক কোথাকার। সব প- হলো।

কাইউম :         দেখুন। ভালো করে কথা বলবেন। প- করেছি মানে।

কলিম   :         থামুন আপনার সঙ্গে আর একমুহূর্তও নয় মশাই Ñ ব্যাপারটাই মাটি করলেন।

কাইউম :         ও লোক ঠকাচ্ছিলেন। তা বললেই হতো। আরে সে কত দেখেছি। সহ্য করে যাচ্ছি। আর যখন ঠকাচ্ছেন আমার কী মাথা ব্যথা। পুলিশ আপনার ঘাড় মটকাবে। কী আশ্চর্য, আগে বললেই পারতেন।

কলিম   :         হয়েছে, হয়েছে। চলুন। আর ঝামেলা বাড়িয়ে কাজ নেই।

দুজনে যাবার উদ্যোগ করে।

পঞ্চম পর্ব

মেসঘর। একই দৃশ্য। কোনো পরিবর্তন নেই।

ইনাম    :         কী, এত সকালে উদয় হলে যে?

আনোয়ার         :         স্যার ইতিহাসের খাতাটা Ñ

ইনাম    :         খবর তো জানতেই পাবে। উতলা হয়ে কী লাভ আগে থেকে।

আনোয়ার         :         কোশ্চেন ঠিকই অ্যানসার করেছিলাম স্যার। তবে কী না পেপারটা এবার ছিলও বড় স্ট্রিক্ট।

ইনাম    :         বই-কেতাবের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে আফশোস করতে হতো না।

আনোয়ার         :         তবে কী স্যার সত্যি সত্যি ফেল করে গেলাম!

ইনাম    :         তোমার যখন এত দৃঢ় ধারণা, হয়তো তাই হয়ে থাকবে। আমার কাছে ধরনা দিয়ে কিছু হবে না Ñ

আনোয়ার         :         কয়েকটা নম্বর বাড়িয়ে দিলেই ভালো করতেন।

ইনাম    :         কেন ভয় আছে নাকি Ñ

আনোয়ার         :         না, ভয় আর কী। তবে আমার তেমন এসেও যায় না। কিছু। আপনাদের মতো আধপেটা খেয়ে মাস্টারি করার জন্য তো পড়ছি না, স্যার।

ইনাম    :         যে রকম তেড়ে কথা বলছ, মনে হচ্ছে টাকা-পয়সার ফেলাছড়ি।

আনোয়ার         :         তা একটু-আধটু তো আছেই। ইচ্ছে করলে কী আর, অপরাধ নেবেন না স্যার, আপনাদের মতো দু-একটা মাস্টার রাখতে পারি না Ñ যাক ভাল। (সিগারেটের প্যাকেট বার করে) চলে?

                (নিজেও ধরায়।)

ইনাম    :         চলে। অত সহজে আমাকে অপমান করা যায় না।

আনোয়ার         :         ও, তাই নাকি Ñ

ইনাম    :         তুমি যে আমাকে অপমান করতে পারলে না Ñ এতে কিন্তু তোমারই সবচেয়ে বড় অপমান হলো।

সিগারেট এবার অ্যাশট্রেতে বুঁজিয়ে দেয়।

আনোয়ার         :         কী ভাবছেন বলুন তো? দেখা যাবে, দেখা যাবে। দুদিন পর এ শর্মার কাছেই আসতে হবে Ñ

ইনাম    :         কেন জানতে পারি?

আনোয়ার         :         হতে পারে Ñ টাকার জন্যই হাত পাততে আসতে হবে।

ইনাম    :         সেরকম দুর্দিন দেখা দিক, তখন ভাবা যাবে। হাত যদি তখন পাতিই, হয়তো তুমি দিয়েই বসবে।

আনোয়ার         :         অমন কাঁচা ছেলে পাননি, বুঝেছেন?

ইনাম    :         অন্তত আমার পেপারে তুমি যে যথেষ্ট কাঁচা, তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই Ñ

কাইউমের প্রবেশ।

আনোয়ার         :         (কাইউমকে দেখেই) কী আর বাকি আছে Ñ আপনার এই বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করুন। সেদিন ক’ পয়সা ঘুস নিতে ছাড়েনি Ñ

কাইউম :         কী বললে, আমি ঘুস নিয়েছি! সামলে কথা বলো, মুখ সামলে Ñ

ইনাম    :         সে তোমরা জানো।

আনোয়ার         :         জানবে না কেন। আপনার কিছু জানতে বাকি আছে। ছাত্রদের কাছ থেকে আপনিও ঘুস নিতে ওস্তাদ।

ইনাম    :         বয়সে তুমি ছোট। তাই কথাবার্তায় তুমি অসংযম। তবু এসব বলো না।

আনোয়ার         :         কেন বলব না। সত্যি কথাই তো বলছি।

কাইউম :         চুপ করো। ভয়ানক অপমান করব কিন্তু। যা তা বলো না।

কাইউম :         আছে কটা পয়সা? (ইনাম জবাব দিলো না, কাইউম একটা পুরোন হাত-ঘড়ি বার করে আনোয়ারকে দিলো) দাঁড়াও, নাও। নাও, এটাই নাও। বিক্রি করে পয়সাটা চুকিয়ে নিও।

আনোয়ার         :         ওসব বিনি পয়সাও কেউ নেয় না।

তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ফেরত দিলো।

কাইউম :         শাট্ আপ!

ইনাম    :         আঃ থামো তো! অবোধ জীবের ওপর রাগ করে কী লাভ। (আনোয়ারকে) মাথা ঠান্ডা করে ওখানটায় বসো। ঘণ্টাআধেক বিশ্রাম করে না হয় চলে যেও।

কাইউম :         আধ ঘণ্টা কেন Ñ এখুনি বেরিয়ে যাক্।

আনোয়ার         :         তাই যাচ্ছি Ñ

কাইউম :         যাও, চুলোয় যাও।

আনোয়ার প্রস্থানোদ্যত। আস্তিন গুটিয়ে ফিরে আসে।

আনোয়ার         :         কী বললেন Ñ

কাইউম :         বললাম, ধুলোয় যাও।

আনোয়ার         :         তার মানে?

কাইউম :         যেখানে ধুলো, সেখানে, রাস্তায় Ñ

আনোয়ারের প্রস্থান।

কাইউম :         অ্যাঁ, কী তেজ Ñ যা-যা চুলোয়, যা আলবৎ যা Ñ

কলিমের প্রবেশ।

কলিম   :         এই যে সাহেব। যত নষ্টের মূল হলেন আপনি Ñ

ইনাম    :         তারপর তোমার বিজনেসের খবর কী Ñ

কলিম   :         আচ্ছা প্রফেসর Ñ তুমি তো অভিজ্ঞ লোক। আচ্ছা Ñ যা নেই Ñ তা আছে বলে বিশ্বাস করানো যায় না Ñ

ইনাম    :         হ্যাঁ, যাবে না কেন। খুব যায়। যেমন তোমার টাকা। সত্যি সত্যি তোমার তো এক পয়সাও নেই। কিন্তু লোকে কি আর তাই ভাবে।

কলিম   :         একটা কলিয়ারি কি তবে পাওয়া যায়?

ইনাম    :         সে কী কথা হে! কলিয়ারি আবার কী করে পাওয়া যায় Ñ

কলিম   :         যেতেই হবে। নইলে আমার সর্বনাশ।

ইনাম    :         বলো কী?

কাইউম :         জিনিসটা আর একটু ছোট হলে ম্যানেজ করা যেত।

কলিম   :         আঃ, রাখুন। আপনিই তো সর্বনাশের মূল।

কাইউম :         আমি? আমি সর্বনাশের মূল। লাভের ভেতর দশ হাজার টাকা তো পেলামই না। আবার বড় বড় কথা। আপনাকে চিনতে বাকি নেই। আঘাত পেয়েছি আপনার ব্যবহারে। আমি আপনাকে সোনা মনে করেছি।

কলিম   :         তা করেছেন তো করেছেন। ভালো করেছেন। কেমিক্যালকেও আজকাল অনেকে তাই মনে করে Ñ চেনাও যায় না। কিন্তু কলিয়ারি একটা চাই Ñ কিছু একটা উপায় ঠাওরাতে হয়।

ইনাম    :         এক কাজ করো Ñ

কলিম   :         কিছু ভেবেছ নাকি?

ইনাম    :         ম্যাপটা নিয়ে এসো Ñ

ম্যাপ আনল।

ইনাম    :         এই দেখ। এই এখান থেকে শুরু করে এসব জায়গায় হলো কয়লার খনি।

কলিম   :         কিন্তু তাতে আমার কী লাভ। প্রমাণ করা চাই যে তার একটা আমার Ñ

কাইউম :         কেন, কেন। প্রমাণের কী দরকার। আমাদেরই তো। আমাদের নয়, তবে আবার কার? রক্ত দিয়ে, পানি দিয়ে, কে গড়ে তুলল এসব।

ইনাম    :         এসব কথায় কলিয়ারি নিজের বলে প্রমাণ করা যায় না?

কলিম উঠে দাঁড়ায়। একমুহূর্ত কী যেন ভাবে। কপালটা চেপে ধরে দুহাতে। ইনামের কাছে এসে বসে। পকেট থেকে একটা কী বার করে।

কলিম   :         না, শোন এক কাজ করো। এ চেকটা রাখ তো।

ইনাম    :         হঠাৎ কী ব্যাপার! এটা দিয়ে করব কী?

কলিম   :         মুস্তাফা সাহেব এলে দিয়ে দিও। নেগোসিয়েশনে বনল না কী না, তাই টাকাটা ফিরিয়ে দিচ্ছি।

কাইউম :         পাঁচ হাজার টাকা ফিরিয়ে দিলেন? অ্যাঁ! আপনি একটা ইয়ে Ñ

কলম    :         আরে পাঁচ হাজার একটা টাকা হলো?

কাইউম :         হলো, হলো। খুব চিনেছি আপনাকে। নিজের তো হলো না। আমারও সব মাটি করলেন। খামোকা আপনার সঙ্গে ঘুরে সময় নষ্ট।

কলিম   :         আচ্ছা চলি। আমাকে এখুনি বেরুতে হবে।

ইনাম    :         এখুনি?

কলিম   :         না না। অনেকদিন তো থাকলাম। আর তাছাড়া Ñ

ইনাম    :         কেন, তোমার তখাকথিত বড়লোক কোনো বন্ধু ধরে বসলে?

এক মুহূর্ত অপ্রতিভ মনে হলো। প্রকৃতিস্থ হয়ে।

কলিম   :         বড়লোক বন্ধু। ও, র‌্যাংকিনের কথা বলছ। সেখানে থাকা যেত, কিন্তু কেমন যেন ভাল দেখায় না Ñ

ইনাম    :         নিজে তো ভবঘুরের মতো কাটাচ্ছ। মেয়েটার জন্যই যত দুর্ভাবনা।

কলিম   :         যাই, আমার জিনিসগুলো রইল। বিকেলে লোক পাঠিয়ে আনিয়ে নেব।

কাইউম :         বিকেলে আনিয়ে নেবেন? বিকেলে আমরা কেউ থাকব না। যেতে হয় এখুনি যান না। আমি তো এখুনি বেরুচ্ছি। আজ আবার ইন্টারভিউ। চাকরিটা হলে কোন্ শালা আপনার পেছনে ঘোরে Ñ

ইনাম    :         না না। আমি থাকব। লোক পাঠিও।

কলিমের প্রস্থান।

কাইউম :         মাথাটা যে কী হয়েছে Ñ

ইনাম    :         এই যে বললে দেরি হয়ে যাচ্ছে Ñ

কাইউম :         সার্টিফিকেট নিতে হবে না Ñ আপনাকে তো বললাম। জোগাড় করে দিতে পারলেন না। শুধু কথায় ওস্তাদ। কাজের বেলায় Ñ সব ব্যাটাকেই চিনলাম Ñ হুঁ।

কাইউমের প্রস্থান ও মুস্তাফার প্রবেশ।

ইনাম    :         আসুন, আসুন।

মুস্তাফা  :         না, বসব না। তোমার সেই ধড়িবাজ বন্ধুটির খোঁজ নিতে এসেছি।

ইনাম    :         কার কথা বলছেন?

মুস্তাফা  :         পালিয়েছে তো? জানতাম Ñ

ইনাম    :         আপনার যা দরকার সেটি পেলেই তো হলো। নিন Ñ

চেক দিল।

মুস্তাফা  :         আমি অমন লোক! টের পেয়েই ব্যাংকে খবর দিয়েছিলাম। ভাগ্যিস বলে রেখেছিলাম। তবে ভদ্রলোককে দেখে কিন্তু তেমন মনে হয়নি।

ইনাম    :         মনে কী আপনাকে দেখেও হয় যে আপনি দু-তিন বছর আগে একশর বেশি গুনতে ভুল করে বসতেন। তারই আজ কী অবস্থা Ñ

মুস্তাফা  :         দুটো টাকা হয়েছে বলে ছোটলোকদের আর হিংসের সীমা নেই।

ইনাম    :         কেউ আপনাকে হিংসে করেনি Ñ হিংসে করে কী লাভ?

মুস্তাফা  :         তবে Ñ তবে Ñ

ইনাম    :         যা করা উচিত, সেটা কি আর কেউ করতে সাহস পায় এ সমাজে! সমালোচনার মুখ বন্ধ করার জন্য এমন কত চেক কাটতে হয় আপনাকে Ñ

মুস্তাফা  :         কী যা তা বলছ।

ইনাম    :         গুণগ্রাহীদের সঙ্গে তো অহরহই কাটছে। অপ্রিয় ভাষণ কখনো শোনেননি।

ইনাম    :         সেটা মিথ্যা আমিও জানি, যেমন আপনি এখন জেনেছেন। অথচ ওই লোকটা যদি বলে বসত, কাল বাজারে যে চাল বিক্রি করেছেন Ñ তার প্রমাণ তার কাছে আছে, তাহলে অমন কত চেক আপনার হাত দিয়ে বেরিয়ে আসত। আসত না?

মুস্তফা   :         এখন বুঝতে পারছি। পুলিশে দেয়াই ভালো ছিল।

ইনাম    :         এটাই তো এদের মাহাত্ম্য। জীবনে এত ভুলের পরেও একদিন কোন মুহূর্তে একা জীবনকে খতিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। আপনি কি তা কোনোদিন করেছেন Ñ না করবেন।

মুস্তাফা  :         আরে সোজাসুজি সাহায্য চাইলেই হতো।

ইনাম    :         আপনি যে এতবড় হাতেমতাই তা তো দেশের লোক এখনো জানে না Ñ

মুস্তাফা  :         কী খপ্পরে পড়েছিলাম বলো তো? বড্ড বাঁচা বেঁচেছি।

ইনাম    :         তা তো বাঁচলেনই। যাক আপনার ভাবনা-চিন্তার অবসান হলো। এখন কাজে মন দিন।

মুস্তাফা  :         হ্যাঁ, তা দিচ্ছি। চেকটা ঠিক আছে তো? আমার আরো একটা কাজ ছিল। আমি বলছিলাম কী Ñ এমনিতে যাই হোক, তোমার বন্ধুটি কিন্তু ছিল বেশ চালাক-চতুর। আর আমার, তোমাকে বলতে বাধা কী, সবই তো জানো, রকমারী ব্যবসা। কে কাকে ঠকাচ্ছে না Ñ বলো। ওকে পেলে কিন্তু মন্দ হতো না।

ইনাম    :         আপনার অপরিসীম করুণা দেখছি।

মুস্তাফা  :         তা যাই বলো। তোমাদের মতো অত সাহিত্যের ভাষা বুঝি না। সচ্চরিত্রবান লোক দিয়ে আমার কী দরকার? লাখ-বেলাখের ব্যাপার, বোঝই তো। কিছু নয় Ñ একটু হুঁশিয়াার থাকা চাই।

ইনাম    :         কিন্তু চালাক-চতুর লোকটি যখন আপনার ব্যবসার মূল সূত্রটি জানবে, তখন আপনার পাত্তা থাকবে কোথায়?

মুস্তাফা  :         থাকবে, থাকবে। সে কলকাঠি আমার হাতে। ঘুঘু বারবার ধান খায় না।

ইনাম    :         অব্যবার চাল খেতে পারে। আর আপনার যখন চালেরই ব্যবসা।

মুস্তাফা  :         দেখ, অত বুজরুকি ভালো লাগে না। যা খুশি তা বলছ। আরে বাপু তুমিই কী সিদ্ধপুরুষ।

ইনাম    :         আমার কথা ছেড়ে দিন। দুটো বড় কথা বলার সুযোগ পেলাম। বলে দিলাম।

মুস্তাফা  :         তা বলো। আপত্তি নেই। আর তোমরা যখন বলো, সে তো আমার ভালোর জন্যই।

ইনাম    :         কী ব্যাপার! আপনার মত কি ঘণ্টায় ঘণ্টায় বদলায়।

মুস্তাফা  :         ভালো কথা, আমার ছেলে Ñ

ইনাম    :         কিছুক্ষণ আগে এসেছিল। নম্বর বাড়াবার সুপারিশ নিয়ে Ñ

মুস্তাফা  :         তাই নাকি? তা কী বললে তুমি।

ইনাম    :         কী বলেছি। সে কথা কী আর এতক্ষণ আপনাকে না বলে ছেড়েছে।

মুস্তাফা  :         তা বেশ করেছে। নিজ থেকে বলতে গেল কেন বলো তো। আমিই তো ছিলাম।

ইনাম    :         এবার আপনি আবার বলবেন নাকি?

মুস্তাফা  :         না, বলাবলির আর কী আছে। কী যে পাগলেটে ছেলে। না জানি কী বলতে কী বলেছে। সে তো জানা কথাই।

ইনাম    :         কী Ñ

মুস্তাফা  :         না, দুটো নম্বর যখন Ñ

ইনাম    :         আমিও সে কথাই বলছিলাম, দুটো নম্বরের জন্য মন খারাপ করে কী লাভ। বরং অন্য বছর Ñ

মুস্তাফা  :         অন্য বছর? বেশ তো নম্বর না বাড়াও ছেলেকে অন্য কলেজে পড়াব। একটা বছর না হয় গেলই।

ইনাম    :         আপনি এক বছর বলছেন। এখন এক একটা যুগ মানুষের চলে যাচ্ছে। তাদের জীবনে অন্য কলেজ নেই। তারা তো শাসিয়ে ভাগ্যের কিছু করতে পারে না। দুঃখ করবেন না। ওই এক পেপারে ফেল করলেও আপনার ছেলের গায়ে কেউ আঁচড় দেবে না। তাছাড়া ম্যানেজিং-কমিটিতে যখন Ñ

মুস্তাফা  :         ভালো কথা মনে করিয়ে দিয়েছ। তাহলে প্রিন্সিপালের বাসাতেই যাই, কী বলো?

ইনাম    :         হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই যান।

মুস্তাফা  :         মাঝে মাঝে কী যে ভালো বুদ্ধি খেলে তোমার Ñ কাজটা কিন্তু তোমাকে দিয়েও হতো। খামোকা রোদে হাঁটালে তো।

ইনাম    :         কষ্ট করতে শিখুন। নিজের ছেলের জন্য তোয়াজ করতে যাচ্ছেন। তার জন্য কষ্ট করবেন না Ñ

মুস্তাফা  :         তা তো বটেই।

ইনাম    :         তবে আর কী। আর বয়েসই আপনার কী এমন হয়েছে।

মুস্তাফা  :         তা কত মনে হয় Ñ

ইনাম    :         কত আর Ñ

মুস্তাফা  :         আমিও তাই বলি। তাহলে তাই করি। এক গ্লাস পানি খাওয়াতে পার Ñ

ইনাম    :         এত রোদে যাচ্ছেন, একটু সরবত খান।

ইনাম ভেতরে গিয়ে এক গ্লাস সরবত নিয়ে আসে।

মুস্তাফা  :         দাও। (চুমুক দিয়ে) আচ্ছা তুমি এত ভালো হয়েও এত বেয়াড়া কেন বলো তো?

ইনাম    :         খবরদার। এসব দর্শনের কথা। এসব ভাবতে যাচ্ছেন কেন? তাহলে আপনার বিজনেস একেবারে প- হবে।

মুস্তাফা  :         তাই নাকি! বেশ, বেশ, সেই ভালো Ñ

ষষ্ঠ পর্ব

রুবীর ঘর :         রুবী লিলির বান্ধবী এবং মকবুলের স্ত্রী। নিুমধ্যবিত্ত পরিবেশ। ঘরের আসবাবপত্রও গোছগাছে অনটনের চিহ্ন।

লিলি     :         কাল কলেজ থেকে পিকনিকে যাচ্ছি।

রুবী      :         বেশ তো ভাল কথা।

লিলি     :         অথচ যেতে একদম ভালো লাগে না।

রুবী      :         সে কী কথা।

লিলি     :         চাঁদার কথা বললে সবাই পিছিয়ে যায়। গরিবদের সংখ্যা যেমন হু-হু করে বাড়ছে।

রুবী      :         বাড়ছে না Ñ বাড়ছে তো? বাড়বেই।

লিলি     :         মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছে করে (স্মেলিং সল্ট শুঁকে নিয়ে) আমরা যদি সব গরিব হয়ে পড়ি।

রুবী      :         তা মন্দ হয় না।

লিলি     :         শাড়িটা কবে কিনলি? কেমন কমদামি মনে হচ্ছে। বড় ভুল করিস। জর্জেট কিনলেই হয়। কলেজে থাকতে Ñ

রুবি      :         জর্জেট, অনেক দাম।

লিলি     :         দাম না হাতি। ওকে আবার দাম বলে নাকি। এটা তো ডলিরা সেদিন পঞ্চাশ টাকায় নিয়ে এলো।

রুবী      :         পঞ্চাশ টাকা Ñ

লিলি     :         না তা কেন? একদম বিনি পয়সায় দেবে। তোদের এসব বুঝি না। গরিব, গরিব, শুনি অথচ দেখি বেশ চলছে। কোনো জিনিসের অভাব তো মনে হয় না Ñ

রুবী      :         থাক। ওসব তুমি বুঝবে না। অনেক বড়লোক এসব বুঝতে গিয়ে মাথা খারাপ করেছে। তোমার বুঝে আর কাজ নেই। কী যেন বলবে বলেছিলে?

লিলি     :         কী যেন বলব Ñ হ্যাঁ, মাথাটা একদম কী যে হয়েছে আজকাল।

মকবুলের প্রবেশ। একবার উঁকি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম।

লিলি     :         কে?

রুবী      :         থাক থাক। আর ভনিতা করতে হবে না Ñ ঘরে কোনো বাঘ-ভল্লুক নেই। এসো। আচ্ছা মানুষ যা হোক তুমি! সারাটা দুপুর ঘরে আসার সময় হলো না একবার।

মকবুল  :         এই দেখ তুমি আবার খামোকা রাগ করে বসলে। আচ্ছা বলো, এই কাঠফাটা রোদে কেউ শখ করে ঘুরে বেড়ায়।

রুবী      :         (লিলির দিকে তাকিয়ে) পুরুষ মানুষের ধাতই ওই। অজুহাত একটা না একটা থাকবেই।

মকবুল  :         (লিলিকে) দেখুন তো আপনি বলুন, কোথায় ঘরে এসে বসে একটু নিরিবিলি জিরোব, তা না রাতদিন এখানে-সেখানে ছুটাছুটি। কেউ কী শখ করে করে? কুলি-মজুরদের নিয়ে কাজ Ñ সেখানে কি ঘড়ি দেখে সব হয়।

লিলি     :         কী জানি বাপু, তোদের ধরনই দেখছি আলাদা, খাওয়ার আবার মানুষের সময় হয় না, কখনো শুনিনি।

মকবুল  :         আরে, শুধু সময় হয় না বলছেন? অনেকদিন আবার সময় হলে পয়সাটা পর্যন্ত থাকে না। এই তো ধরুন না আজ Ñ

রুবী      :         আঃ থাম তো। তোমাকে নিয়ে পারা যাবে না। যা মুখে আসে ফস। করে বলে ফেল। দুঃখ-কষ্ট হলেই কি তা গলা ফাটিয়ে বলতে হবে? নাও Ñ কাপড় ছাড় গিয়ে।

মকবুল  :         হ্যাঁ যাই। আমাকে আবার বেরুতে হবে এখুনি।

রুবী      :         এই এলে আবার কোথায় যাবে?

মকবুলের প্রস্থান।

মকবুল  :         (নেপথ্যে) বড় জরুরি। নইলে কী আর বেরোই! ততক্ষণে কাপড়টা ছেড়ে আসি।

রুবী      :         বুঝলে ভাই এই রকমই। একদ- বাড়িতে স্থির থাকতে পারে না। কাজ নেই বলে কি সংসারের কোনো দায়িত্ব নেই।

লিলি     :         সত্যি বড় দুঃখ হয় তোর জন্য। শেষটায় তোর কী না Ñ

রুবী      :         অমন কথা মুখে আনতে নেই। ওর দিকটাও তো দেখতে হবে। এক তরফা দোষ দিয়ে কী লাভ? কী না বলি, যখন যা মুখে আসছে। মুখ বুঁজে সব সহ্য করে।

লিলি     :         কথা বলাই মুশকিল। বললাম তো তোর ভালোর জন্যই।

রুবী      :         (যেন সে কথায় কান দিলো না। গলার হার দেখিয়ে) এদিকে সংসার চলে না। অথচ কী দরকার ছিল এটার বলো তো? ঝোঁক চাপল মাথায়, দুশো টাকা দিয়ে এটা নিয়ে এলো। এ মানুষের ওপর কেউ কখনো রাগ করে থাকতে পারে? তুই পারতিস?

লিলি     :         তোরা তাহলে সুখেই আছিস। অথচ আমি ভাবতাম Ñ

রুবী      :         দেখি চায়ের পানি চড়িয়েছিলাম। কী যে হয়েছে চুলোয়, একদম আঁচ হচ্ছে না। হাওয়া করতে করতে হাত ব্যথা হয়ে গেল।

লিলি     :         থাক না, চা আবার কী হবে।

রুবী      :         গরিবের বাড়িতে শুকনো এক কাপ চা খেলে জাত যাবে না Ñ

রুবীর প্রস্থান।

লিলি     :         গাড়ি নিয়ে আসবে বলেছিলাম। এত দেরি হচ্ছে কেন?

চায়ের কাপ হাতে রুবীর প্রবেশ।

রুবী      :         চা তো নয়, শুধু গরম পানি। তোমার মুখে রুচবে কী না কে জানে? (লিলি একচুমুক মুখে দিয়ে কাপটা মৃদু ঠেলে দেয়। চিরুনি দিয়ে চুলের জট ছাড়াতে ছাড়াতে) বজ্জাত ছেলেটাও যে কোথায় গেল। রাত-দিন টো-টো। একদম বাপের স্বভাব। তুমি ভাই বসো। আমি আসছিÑ

রুবীর প্রবেশ। মকবুলের প্রবেশ Ñ মকবুল কাপড় গুছিয়ে সেগুলো একটা সুটকেসে রাখে। কী মনে করে হঠাৎ লিলির কাছে এসে বসে।

মকবুল  :         আপনারা বুঝি খুব বড়লোক?

লিলি     :         (একটু সরে বসে) কী মানুষ আপনি? ওদিকে বসুন না পোড়া কপাল, কেন যে এসেছিলাম!

মকবুল  :         (ওর গয়না দেখিয়ে) এসব বুঝি সোনার?

লিলি     :         মাগো, কী বলছে!

মকবুল  :         না না, নেব না। আপনি আমার স্ত্রীর পরিচিতা। আমার বাড়িতে এসেছেন! আমি আবার চুরি করব ভাবছেন? তাছাড়া সোনা Ñ কে জানে খামোকা জেলে গিয়ে মরি আর কী?

লিলি     :         আপনি কেমনতর লোক। কেমন ঘুটঘুট করে তাকাচ্ছেন?

মকবুল  :         বলবেন না। আরে, এমন কী আর ছিলাম। হয়ে গেছি। দুত্তোর, যা পয়সা পাই তাতে কি আর চলে?

মকবুল উঠে পড়ে ও সুটকেস হাতে বেরুবার উদ্যোগ নেয়। রুবীর প্রবেশ।

রুবী      :         কোথায় চললে?

মকবুল  :         যাই। আজ আবার একটু ভালো খাবার আছে। (লিলির দিকে তাকিয়ে) আমার বুড়ো নানি, বুঝলেন কিনা, আপনাদের মতোই বড়লোক, অনেক টাকা, কিছুদিন হলো মারা গেছেন। আজ চল্লিশা। শুনলাম খাওয়া-দাওয়া হবে।

লিলি     :         এমন করেই চলে নাকি আপনার?

মকবুল  :         প্রায় সেরকমই। পয়সা পেলাম খেলাম Ñ না পেলাম তো Ñ

রুবী      :         এমন করে আমাকে ছেড়ে খেতে কষ্ট হয় না তোমার?

লিলি     :         সত্যিই তো। আপনাকে কেন যে পুলিশ ধরে না।

মকবুল  :         হাঃ হাঃ, পুলিশ Ñ ধরবে, ধরবে। একদিন ধরবেই। চলি।

যেতে যেতে আবার ফিরে আসে।

মকবুল  :         কিছু পয়সা বার করে রুবীকে দেয়) গাঁজার পয়সা। বড় মানুষকে আদর-যতœ করো।

রুবী      :         কখন ফিরবে তুমি?

মকবুল  :         (গানের ছন্দে) ফিরিব ফিরিব করি,

                    বুঝি ফেরা হয় না সখী।

        মকবুলের প্রস্থান।

লিলি     :         একটা স্টুপিড।

হাত থেকে কিছু কাগজ পড়ে যায়।

রুবী      :         ওগুলো কী?

লিলি     :         চ্যারিটি শো হবে। তার টিকিট, দেখে কী করবি ভাই। তোর তো কেনার মুরোদ হবে না Ñ

বাইরে হট্টগোল ও চিৎকার শোনা যায়। সে সঙ্গে গাড়ির হর্ন। লিলি ও রুবী সচকিত। রতনের প্রবেশ। তার পেছনে ইনাম ও আনোয়ার।

রতন    :         (কান্নাজড়িত কণ্ঠে) মা, মাÑ

রুবী ছুটে এসে ছেলেকে কোলে জড়িয়ে নেয়। ইনাম রতনের মুখে হাত রাখে। ওকে কথা বলতে দেয় না, রতনের মৃদু কান্নার আওয়াজ। ইনাম রতনকে ধরতে যায়। রতন আরো জোরে মাকে জড়িয়ে ধরে। লিলি উঠে দাঁড়ায়।

রুবী      :         কী হলো, আপনি অমন করে তাকিয়ে কী দেখছেন?

ইনাম    :         তোমাকে।

রুবী      :         (কান্নায় ভেঙে পড়ার উপক্রম) বলুন না, চুপ করে থাকবেন না। বালাই ষাট (ছেলেকে বুকে জড়িয়ে) তুই কাঁদছিস কেন? কী হলো (লিলিকে) লিলি, কেউ কিছু বলে না কেন?

লিলি কোনো জবাব না দিয়ে একটা চেয়ারে বসে আবার। আনোয়ার অপরাধীর মতো পেছনে দাঁড়িয়েছিল। এবার সেও যেন বিগলিত।

আনোয়ার         :         (কিছুটা ভয় ও আশঙ্কাজড়িত কণ্ঠে) আমি চলি স্যার, আমি চলি। এখানে আমি খাকতে পারব না। এক মুহূর্তও নয়।

ইনাম    :         (হুঙ্কার দিয়ে) না, তুমি কোথাও যাবে না Ñ এখানেই থাকবে। অত কাপুরুষ তুমি, আমি জানতাম না।

রুবী      :         কী হলো?

ইনাম    :         অধীর হয়ো না। জানি তোমার বুকের জোর। বুকে পাথর বেঁধে সংসার চালিয়েছ। অনেক আঘাতকে আঘাত মনে করনি। কিন্তু বোধহয় তুমিও সইতে পারবে না। হাজার হলেও মানুষ তো।

লিলি     :         কী হলো আবার?

ইনাম    :         আমার দুঃখ তোমার চেয়ে কম নয়। জানো ও একদিন ক্লাসের সেরা ছাত্র ছিল। তবু কী যে হলো Ñ

রুবী      :         আপনি এসব কী বলছেন?

ইনাম    :         সত্যি বলছি। মকবুল নেই। ও গাড়িচাপা Ñ

রুবী কেঁদে ওঠে। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে।

রুবী      :         (রতনকে দেখিয়ে) আমার ছেলের কী হবে? বলুন না Ñ

লিলি     :         এ অবস্থায় ছেলেকে বোর্ডিংয়ে দেয়াই ভালো। সত্যি, কে যে চাপা দিলো।

ইনাম    :         (একটু থেমে) তাকে দেখলে তুমি সহজেই চিনতে পারবে। কই, এসো। বলো Ñ

আনোয়ার         :         আমি পারব না। আমাকে মাপ করুন।

ইনাম    :         পারতেই হবে তোমাকে। একটা মৃত্যুই বড় নয় আনোয়ার। সত্যকে মেনে নেয়ার ক্ষমতাই বড়। বলো Ñ

আনোয়ার         :         (লিলিকে) বোন, আমিই অপরাধী। আমি নিজে থেকে Ñ

রুবী      :         কেন, কেন Ñ তুমি এমন করলে। আমার স্বামী তোমাদের কী ক্ষতি করেছিল?

লিলি     :         বোধহয় ভালো করে রাস্তা ক্রস করতে পারেনি।

আনোয়ার         :         তুই চুপ কর। বাবা আর তুই মিলেই আমার সর্বনাশ করেছিস।

লিলি     :         কোর্টে গেলে ফাইন তো দিতেই হবে। বলছিলাম কিছু টাকা           দিয়ে Ñ

রুবী      :         সাত রাজার ধন দিয়ে অমন একজন নিয়ে এসো। আমি সারা জীবন তোমার বাঁদি হয়ে থাকব।

আনোয়ার         :         বোন, অধীর হয়ো না। এ ইচ্ছাকৃত অপরাধ নয়। তবু তোমার অসহিষ্ণুতা বুঝি।

রুবী      :         (আনোয়ারের দিকে ইঙ্গিত করে) আমি ওর মুখ দেখব না। ওকে চলে যেতে বলুন।

ইনাম    :         এ কী কথা! এটা কী মায়ের কথা, স্ত্রীর কথা হলো Ñ (রতনকে কাছে টেনে এনে) ওর কথা ভেবো না। ওর লেখাপড়ার ভার আমার ওপর।

লিলি     :         আমার তো মনে হয়, আমার চলে যাওয়াই ভালো। যা গোলমাল!

আনোয়ার         :         (রুবীর দিকে এগিয়ে যায়) আমি যাব না। আমাকে ভালো করে দেখ! ক্ষমা করতে না পার, অন্তত প্রতিহিংসা নাও। তবু ভালো করে দেখ। চেয়ে দেখ।

আনোয়ার কেঁদে ফেলে।

রুবী      :         ও কাঁদছে। আমার বিশ্বাস হয় না। বড়লোকরা কাঁদতে পারে!

আনোয়ার         :         আমি বড়লোক নই। আমি তোমাদের মতই।

লিলি     :         আমি যাই বাবা।

চ্যারিটি শোর টিকিট তুলে নিয়ে প্রস্থান।

আনোয়ার         :         (ইনামকে জড়িয়ে) আপনি আমার ওই দুটো নম্বর বাড়ালে মনুষ্যত্বের এত বড় শিক্ষাটা আমি কিছুতেই পেতাম না। রুবী, বোন Ñ

রতন মাকে হাওয়া করতে থাকে। আনোয়ার এগুতে যায়। ইনাম বাধা দেয়।

ইনাম    :         থাক, ওদের বিরক্ত করো না। এ আঘাতটা সইতে দাও। চলো হাসপাতালে যাই।

সপ্তম পর্ব

                   মুস্তফার চেম্বার। কলিমকে সঙ্গে নিয়ে টাইপিস্টের প্রবেশ। মুস্তাফা বসে কাজ করছে। কলিমের মুখে লম্বা সিগারেট হোলডার, তাতে জ্বলন্ত সিগারেট। হাতে সৌখিন ছড়ি।

টাইপিস্ট :         (কলিমকে দেখিয়ে মুস্তাফাকে) আসতে কি আর চান। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। একরকম জোর করেই নিয়ে এলাম স্যার।

মুস্তাফা  :         (কলিমকে) বসুন। জানেন বোধহয় আপনাকে আমি কদিন থেকে পইপই করে খুঁজে বেড়াচ্ছি।

কলিম   :         (কথা শুনতে পায়নি এমন ভান করে চেয়ারে এক পা তুলে ছড়িখানা ছাদের দিকে তুলে) আপনার বিম মনে হচ্ছে গর্জন কাঠের। কিউবিক ফুট কত করে? (মুস্তাফা জবাব দেয় না। একবার চোখ তুলে তাকায়। তারপর আবার কাজে মন দেয়। কলিম এবার একটা জানালার কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়) উইনডোগুলো কি ফোর বাই থ্রি। বড় ছোট মনে হচ্ছে?

মুস্তাফা  :         হঠাৎ নতুন করে এসব আপনার চোখে পড়ছে নাকি? জরুরি কথার জন্য আপনাকে ডেকেছি, বসুন।

 কলিম  :         (বসল) বেশ জরুরি কথাটাই শোনা যাক। আমার আবার তেমন সময় নেই।

মুস্তাফা  :         সময় নেই! কম করে হলেও বছর তিনেকের ভোগান্তি থেকে বাঁচিয়ে দিলাম। জানেন, ওই চেকটার জন্য আপনাকে কত দুর্ভোগ পোহাতে হতো?

কলিম   :         সেটা তো আপনি পেয়ে গেছেন।

মুস্তাফা  :         পাব তো বটেই। আপনাদের মতো ধড়িবাজদের সঙ্গে পাল্লা দেয়াই আমার কাজ।

কলিম   :         ধড়িবাজ বলে আদালতে প্রমাণ করতে না পারলে মানহানির কেস হয়, জানেন?

মুস্তাফা  :         হয়েছে, হয়েছে। আমাকে আর আইন শেখাতে হবে না। আপনাকে আমার হয়ে কাজ করতে হবে।

কলিম   :         আমাকে! কী কাজ?

মুস্তফা   :         জানি, ইনাম আপনার বিশিষ্ট বন্ধু। কিন্তু এটা আমার মান-সম্মানের কথা। নইলে তাকে বিপদে ফেলার ইচ্ছে ছিল না।

কলিম   :         আপনার কথা বুঝতে পারছি না।

মুস্তাফা  :         খুবই সোজা। আপনাকে কিছুই করতে হবে না। যারা একবার আমাকে চটিয়েছে, তাদের রেহাই নেই। নম্বর না বাড়াক তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু এমনসব কথাবার্তা বলেছে, যেগুলো আমি বরদাস্ত করতে রাজি নই। আরো হয়ত অনেকের কাছে বলে বেড়াচ্ছে। আমি ওর মুখ বন্ধ করব।

কলিম   :         আপনার সাত-সতেরো বিজনেসের ব্যাপার ফাঁস করে বসে, এটাই বুঝি আপনার ভয়। ভারী অন্যায় কথা তো। তা ওর মুখ বন্ধ করবেন কেমন করে?

মুস্তাফা  :         সে কলকাঠি আমার হাতে। আমি বলি শুনুন। (পকেট থেকে চেক বার করে দেখায়) বেয়ারার চেক, যে কেউ ভাঙাতে পারে।

চেকখানা দেখিয়ে আবার পকেটে রাখে।

কলিম   :         পাঁচ হাজার টাকা আমাকে দিচ্ছেন নাকি?

মুস্তাফা  :         দিতে পারি, কিন্তু অত সহজে নয়। এটা ইনামের পকেটে কিংবা তার বইপত্রের ভেতর কোথাও রেখে দিতে হবে।

কলিম   :         তারপর?

মুস্তাফা  :         তারপরের ব্যাপারটা খুবই সোজা। আমি সুযোগ বুঝে সেদিনেই তল্লাশি নেব। তারপর হাতে-নাতে ধরব। না না, কোনো বিপদ ঘটবে না আপনার বন্ধুর। কিছু লোকজন দেখবে। ব্যাপারটা একটু জানাজানি হবে, এই যা।

কলিম   :         কিন্তু তা দিয়ে কি প্রমাণ করতে চান আপনি?

মুস্তাফা  :         প্রমাণ Ñ সে সব ভেবে রেখেছি। আনোয়ারকে দিয়ে চেকটা সরিয়েছে নম্বর বাড়াবে এই লোভ দেখিয়ে, বুঝলেন না?

কলিম   :         এসব কাজের জন্য আপনার অফিসে কোনো ঝানু লোক নেই নাকি?

মুস্তাফা  :         আমার যা বলার বললাম। করা না করা আপনার খুশি। তাছাড়া আপনার ব্যাপারটা এখনো অনেকদূর গড়াতে পারে। আপনি মিথ্যে বলে আমাকে প্রতারণার চেষ্টা করেছিলেন, সে প্রমাণও আছে।

কলিম   :         তাহলে মামলা-মোকদ্দমা করুন। এ জন্যই আমাকে ডেকেছিলেন, আশা করি।

মুস্তাফা  :         শুনুন, শুনুন, এই আপনাদের দোষ। কোনোদিন পুরো কথাটা না শুনে Ñ বুঝলেন, সেদিন নিজ থেকে ইনামকে বললাম, কী হয়েছে বাপু Ñ কাঁচা বয়স, ঝোঁকের মাথায় একটা ভুল না-হয় করেই ফেলেছে। আমি তো পাষ- নই। (আড়চোখে চেয়ে নিয়ে। যেন কলিমের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য) বললাম, কলিমকে একটু খবর দাও। আমার সাত-সতেরো বিজনেসের কোথাও লেগে থাকুক। কিন্তু কী বলল, জানেন?

কলিম   :         কী বলল?

মুস্তাফা  :         বলবে আবার কী? বলল চাকরি-বাকরি ওকে দেবেন না। জানেন ধড়িবাজ, তবু আপনার মতিভ্রম। (একটু থেমে কলিমের গায়ে হাত রেখে) আমিও বলি, আপনার সঙ্গে ইনামের অত দহরম-মহরমই বা কিসের? ও চাকরি করছে, দুটো পয়সা আনছে। আপনার চাকরি নেই। আপনি বেকার। চট্ করে আপনার একটা কিছু হয়ে যাক, তা ও বরদাস্ত করবে কেন?

কলিম   :         না না। সে যাই হোক, কিন্তু আমি শেষটায় Ñ

মুস্তফা   :         বেশ, যা খুশি আপনার। পরে বলবেন না ইচ্ছে করে আপনার সর্বনাশ করলাম। শুনেছি আপনার একটা বাচ্চামেয়েও আছে। যা দিনকাল, জেল থেকে ফিরে এসে যদি দেখেন, আপনার মেয়ে শুকিয়ে Ñ

কলিম   :         (উত্তেজিত হয়ে) কে বলল আমার মেয়ের কথা Ñ

মুস্তাফা  :         সব খবর জানি। মেয়েটাকে গ্রাম থেকে আনতে হলো বলেই মেস ছাড়লেন, সে আমি জানি নে?

কলিম   :         (গলার স্বর নামিয়ে) হ্যাঁ, এ্যাদ্দিন দেশের বাড়িতেই ছিল। কী করব থাকতে চায় না একদ-। বউ না থাকলে এমন হয়। ওর মা যদি বেঁচে থাকত। দেখেছেন মীনুকে Ñ

মুস্তাফা  :         না দেখিনি। তবে যদি জেলে যেতে হয় আপনাকে, তা ফিরে এসে আপনার মেয়ে Ñ

কলিম   :         থামুন!

খানিকক্ষণ ব্যতিব্যস্ত হয়ে পায়চারি করতে থাকে। হঠাৎ এক সময় মুস্তাফার কাছে এগিয়ে যায়।

কলিম   :         দিন, চেকটা দিন তো।

মুস্তাফা  :         (টাইপিস্টকে) হিসাবটা খাতায় তুলে চেকটা কলিম সাহেবকে দিয়ে দিও। হ্যাঁ আর শোন, তাহলে ওই কথাই রইল। আমি কালই লোকজন নিয়ে Ñ

                 মুস্তাফার প্রস্থান।

টাইপিস্ট :         সায়েব, আপনাকে ভালো লোক বলে ভেবেছিলাম।

টাইপিস্ট চেক এনে দিলো। কলিম ওখানা নিল।

কলিম   :         আমিও ভেবেছিলাম, আপনি ভালো টাইপ জানেন। কিন্তু দেখলেন তো জানাজানিতে কিছু এসে যায় না।

লিলির প্রবেশ। টাইপিস্টের প্রস্থান।

কলিম   :         আসুন। আসুন।

লিলি     :         না, বাবার কাছে এসেছিলাম। চলি।

কলিম   :         বসুন, বসুন। আমি চায়ের অপেক্ষা করছি।

লিলি     :         তা, আমি কী করব!

কলিম   :         বসে দুটো কথা বললেন। অমন ইঁচড়েপাকা মেয়ের সঙ্গে কথা বলাও অন্যায়।

কলিম   :         আমার মতো লোফারদের ওই তো মজা। কাল যেটা সত্যি মনে হয়েছে, আজ সেটা মিথ্যে হয়ে যায়।

লিলি     :         কথাটা বলতে আপনার বাধল না?

কলিম   :         বাধবে কেন, বলবেন গর্হিত, বলবেন অন্যায়। আরে ন্যায়-অন্যায়ের বালাই তো অনেক আগেই চুকেছে।

লিলি     :         হয়েছে, হয়েছে, কথার জুড়ি আপনার পাওয়া যাবে না। তর্ক করে কেউ আপনার সঙ্গে পারবে? আমার আরো কাজ আছে। আপনার মতো আজকের সঙ্গে Ñ

কলিম   :         আমাকে অকেজো বললেন? (পকেটে হাত রেখে) জানেন, এর ভেতরে কী আছে! দেখলে আপনাকেও স্বীকার করতে হতো আমি কী কাজের মানুষ।

লিলি     :         আপনার এসব হেঁয়ালি কথা আমি কোনোদিন বুঝি না। আপনাকেও বলি এসব ছেড়ে একটা কিছু করলেই পারেন।

কলিম   :         এসব মানে?

লিলি     :         না, বাবার কাছে ঘোরাফেরা না করে একটা চাকরি-বাকরি কিছু Ñ বাবার কাছে শুনলাম আপনার মেয়ের কথা। নিয়ে আসুন না একদিন, দেখব। কোথায় থাকে?

কলিম   :         কী মুশকিল। এসব পারিবারিক সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করছেন! এ্যাদ্দিন তো দেশের বাড়িতেই ছিল। ওর এক চাচির কাছে। এমন কান্না জুড়ে দিলো, বাধ্য হয়ে মেস ছাড়তে হলো। বাড়ি নিতে হলো এখানে। বলুন কী সব ঝামেলা।

লিলি     :         তাই নাকি? কে দেখাশোনা করে?

কলিম   :         কেন, আমাকে কি খুব অযোগ্য মনে হয়?

চা-হাতে একজনের প্রবেশ।

টাইপিস্ট :         (কলিকে) ওই যে স্যার, চা এসে গেল Ñ

লিলি     :         চলি আপনার তো চা এসে গেল।

কলিম   :         চলবে?

লিলি     :         না ধন্যবাদ। তাছাড়া আমার আবার পার্টি আছে।

কলিম   :         খবরদার, খবরদার। তাহলে এসব খেয়ে খিদে নষ্ট করে কাজ নেই। আমাকেও বেরুতে হবে।

লিলি     :         কোথায় যাবেন আবার?

কলিম   :         বিজনেস সিক্রেট বলতে পারব না।

লিলি     :         আপনার সিক্রেট নিয়ে আপনি থাকুন। আমি চলি।

লিলির প্রস্থান। কলিম টাইপিস্টের কাছে যায়। টাইপিস্ট চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

কলিম   :         কাজ করুন, কাজ করুন Ñ

টাইপিস্ট :         আপনাকে সায়েব, কারো চিনতে বাকি নেই। নেহাৎ সায়েবের সঙ্গে খাতির। এই আকাশে চড়ান Ñ

কলিম   :         আর এই পাতালে নামাই। এ সব কি আর আমি করি Ñ

টাইপিস্ট :         তবে কে করে?

কলিম   :         (ওপরের দিকে ছড়ি দেখিয়ে) হিজ হাইনেস, দি কপাল। (চায়ের কাপখানা টাইপিস্টের হাতে তুলে দিয়ে) নিন খান।

টাইপিস্ট :         কেন, চা খাবেন না?

কলিম   :         চা, আপনিও যে কি! মেয়েটা বোধহয় আজ সারাদিন কিছু খায়নি। কখন ফিরব তাও জানি না। নিন খান।

টাইপিস্ট :         আপনার জন্য চা অথচ আমি Ñ

কলিম   :         ওই যে বললাম, হিজ হাইনেস দি কপাল। আপনি এর কী করবেন!

টাইপিস্ট :         স্যার লোকটা আপনি, নেহাৎ খারাপ ছিলেন না।

চায়ের চুমুক দিলো।

কলিম   :         ও, কে, চিয়ার ইউ, টা Ñ টা Ñ

                                                  প্রস্থান।

অষ্টম পর্ব

মেসঘর  :         ইনাম শেভ শেষ করে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছছে। বইখাতা হাতে আনোয়ারের প্রবেশ। দুর্ঘটনায় ‘শকে’র দরুণ আনোয়ারের মস্তিষ্ক বিকৃতির লক্ষণ। তার কথাবার্তায় সেটা সুস্পষ্ট।

ইনাম    :         (আয়না থেকে মুখ তুলে) এসো।

আনোয়ার কোনো কথা না বলে বিছানায় গিয়ে বসে। তাকে বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে হবে।

আনোয়ার         :         (হঠাৎ যাবার উপক্রম করে) চলি Ñ

ইনাম    :         কী ব্যাপার? এই এলে, এই বলছ চলি। অ্যাকসিডেন্টের কেসটার কিছু হলো?

আনোয়ার         :         কী বললেন স্যার? অ্যাকসিডেন্ট কার?

ইনাম    :         আশ্চর্য। জিজ্ঞেস করছ কার?

আনোয়ার         :         টাইটানিক জাহাজের নাম শুনেছেন স্যার? শুনেছেন নিশ্চয়ই, অনেক পুরান কথা।

ইনাম    :         হঠাৎ টাইটানিক জাহাজের কথা বলছ?

আনোয়ার         :         (নিশ্চল পাথরের মতো চোখ দুটো দূরের দিকে স্থির করে) সেদিন ছিল উৎসবমুখর রাত। চারদিকে নাচ-গান, হই-হল্লা। জাহাজ হঠাৎ এসে লাগে বরফের একটা চাঁইয়ের সঙ্গে। কেউ জানল না। মুহূর্তে কী হয়ে গেল। কী বীভৎস মৃত্যু Ñ আশঙ্কার চাউনি সকলের চোখে। কী আর্তনাদ।

ইনাম    :         (কাছে গিয়ে ওর গায়ে হাত দিয়ে) এসব কী বলছ তুমি! টাইটানিকের কথা মনে পড়ল কেন?

আনোয়ার         :         (যেন সে কথা শোনে না) তারপর স্যার, আপনার মনে আছে Ñ একশ বারো নম্বর ডাউন ট্রেন যেবার ধাক্কা খেল মালগাড়ির সঙ্গে। আমি তখন ছোট। শুনেছি স্যার Ñ

                   Ñ একশ’ ষোলোজন সঙ্গে সঙ্গেই মারা গিয়েছিল। আরো যে          কত Ñ

ইনাম    :         (ঝাঁকুনি দিয়ে) এসব কী বলছ?

আনোয়ার         :         কী বললেন? কই আমি কিছু বলছিলাম? (আবার অন্যমনস্ক) কী আশ্চর্য! আমার কলেজে যাবার কথা ছিল। কটা বাজল?

ইনাম    :         তুমি এখানটায় চুপ করে বস তো।

আনোয়ার         :         আমার, বুঝলেন স্যার, স্টিয়ারিং ঠিকই ছিল। ব্রেকটাই শুধু, কেমন যেন অথচ, আশ্চর্য কী করে যে হলো স্যার! আমি সত্যি (গলা ভেঙে আসে) একটা লোক খুন করে ফেললাম।

ইনাম    :         কী সব প্রলাপ বকছ। তুমি কিছু করনি। দুর্ঘটনায় কারো হাত নেই।

আনোয়ার         :         বলছিল, শুনলেন না স্যার, সাতরাজার ধন দিয়েও অমন একজনকে পাওয়া যায় না। সাতরাজার ধন Ñ সেভেন কিংস এডওয়ার্ড দি ফার্স্ট থেকে সেভেন্থ Ñ

ইনাম    :         কী হলো তোমার? কী সব বকছ। শরীর খারাপ লাগছে? শুয়ে পড়, শুয়ে পড় তো এখানটায়?

খাটের কাছে নিয়ে এলো।

আনোয়ার         :         কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে। অ্যাঁ, ছাড়–ন, ছাড়–ন। আমাকে যেতে হবে না ক্লাসে? (হঠাৎ ইনামকে জড়িয়ে ধরে) চুপ্ চুপ্ ওই যে গাড়ি আসছে। এবার আমি চলি।

বাইরে গাড়ির শব্দ। কাইউমের প্রবেশ। কাইউম ঢুকতে যাবে এমন সময় সামনা-সামনি আনোয়ারের সঙ্গে দেখা। কাইউম কিছু বলে না। শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। আনোয়ারের প্রস্থান।

কাইউম :         (আনোয়ার চলে যাওয়ার পর) কেমন গট্ গট্ করে চলে গেল দেখলেন? দেমাকটা আছে ঠিকই। আরে বাপু, ত্ইু যে অমন রেকলেস ড্রাইভ করে লোক মারলি Ñ তোর ইহকাল আর পরকালটা র্ঝঝরে হলো না? ছেলে নিয়ে মকবুলের স্ত্রী দাঁড়াবে এখন কোথায়? সেটা ভাবলি না একবার?

ইনাম    :         সবকিছু কি এভাবে ঠিক? ব্যাপারটা দুঃখজনক। কিন্তু ওই যে অনুতপ্ত নয়, তা কী করে জানো?

কাইউম :         খুব জানা আছে। আপনার চোখে অন্য সবারই সাত খুন মাপ। কেবল আমার বেলাতেই উলটো। আজ না হয় এমন দেখেছেন। মরে গেলেও কেউ খবর নিতে আসবে না। কিন্তু একদিন তো          ছিল Ñ

ইনাম    :         বলো, বলো Ñ

কাইউম :         আপনাকে বলা যা, দেওয়ালকেও বলা তাই।

ইনাম    :         দেওয়ালেরও অনেক সময় কান থাকে শুনেছি। বলোনা?

কাইউম :         লোকে তো কোনোদিনই ভালোটা দেখল না Ñ সবাই বলে হাড়কিপ্টে Ñ

ইনাম    :         সবাই বলাতে কী এসে-যায়?

কাইউম :         থাক থাক, আপনি এখন আবার ভালো মানুষ হয়ে গেলেন দেখছি। আপনিই কি বলতে ছেড়েছেন। খুব বলেছেন! (কলিমের প্রবেশ। কলিমকে দেখে) এই তো আপনিই বলুন না?

কলিম   :         কী ব্যাপার, হঠাৎ আমাকে Ñ

কাইউম :         আপনার সঙ্গে তো কথা বলাই অন্যায়। যাবার সময় একবার দেখাও করে গেলেন না। না-হয় ভালো আশ্রয় জুটেছে। তাই বলে কি ভুলেও আসতে নেই? অকৃতজ্ঞ সায়েব আর কাকে বলে?

কলিম   :         না, কাজের ঝামেলায় Ñ

কাইউম :         থামুন থামুন, ওসব বাজে কথা। হ্যাঁ, তা তো বলবেনই। দেখছেন কী না, লোকটা অপদার্থ। কাজকর্ম জোটে না।

ইনাম    :         আঃ, থাম তো Ñ

কাইউম :         (হঠাৎ খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে) আরে এমন কী আর ছিলাম! লোকে বলত অমন সুখী পরিবার হয় না। কোলে-পিঠে ভাইবোন মানুষ হলাম। বোনটি বেঁচে থাকলে Ñ

কলিম   :         কেন আপনার বোন Ñ

কাইউম :         এক রকম অনিচ্ছায় বিয়ে হলো। সকলে বলল, টাকা-পয়সাওয়ালা মানুষ। বুঝলেন সেই যে শ্বশুরবাড়ি গেল Ñ সাত বছর আর ফিরল না। একটা বর্বর মাতালের সঙ্গে হেসেখেলে সাত বছর ঘর করা Ñ ভেবে দেখুন। (একটু থেমে) যে মরে তার আর কী জ্বালা।

বলে, বাক্স থেকে কিছু জিনিস বার করে পুঁতির মালা, পুতুল, ফুলদানি ইত্যাদি।

ইনাম    :         হঠাৎ একি শুরু করলে?

কাইউম :         পরের দায় সারাজীবন আগলে থাকব নাকি? (পুতুলটা দেখিয়ে) জানেন, আমার বোনের ছিল। বলল, রেখে দে। আর কোনো স্মৃতি নেই। আর এই মালাটা Ñ

কলিম   :         বড় ইন্টারেস্টিং Ñ তো! শোনা যাক Ñ

কাইউম :         আপনার কাছে তো ইন্টারেস্টিং মনে হবেই। মায়া-মমতা কী জিনিস তা তো জানলেন না।

কলিম   :         মালার কথা কী যেন বলছিলেন?

কাইউম :         দায় একে বলে না তো কাকে বলে। আরে নিজের চালচুলো নেই, তার ওপর আবদার শুনুন Ñ আমার আবার বউ হবে আর তার গলায় Ñ

ইনাম    :         (কাপড়-চোপড় পরতে গেল) এতে অবাক হবার কী আছে?

কাইউম :         আপনার তো ওই স্বভাব গেল না। আর হবেই যদি তা আপনার হলো না কেন?

কলিম   :         মালাটা কে দিলো বললেন না?

কাইউম :         মেয়ে মানুষ ছাড়া এমন শখ হয় কারও? তবু বুঝলেন, ভাবতাম Ñ এমনও তো হতে পারে Ñ বোনটি বেঁচে আছে। একদিন সে ঠিকই আসবে। যেন আমিই ভুল শুনেছি। কিন্তু সেদিনের ঘটনার পর Ñ

ইনাম    :         মকবুলের কথা বলছ Ñ সত্যি কেমন করে যে কী হয়ে গেল।

কাইউম :         আরে মরে গেল সে তো ভালোই। তার আর কী, এই মায়া জিনিসটাই খারাপ। আর নয়, আর নয়। অনেকদিন রেখেছি। এখন এসব গেলেই বাঁচি, (কলিমকে উদ্দেশ করে) দেখছেন কী, নিন। আরে না নেবেন তো নেবার লোকের অভাব আছে? আপনাকেই বা দিতে যাচ্ছে কে? আপনার বাচ্চা মেয়েটার কথা পাড়ল তাই Ñ

কলিম   :         বেশ, অত যখন বলেছেন পুতুলটাই দিন। মীনুকে দেব।

পুতুলটা নিল।

কাইউম :         এটা নিয়ে কী হবে, দেখেছেন ভাঙা। একি আজকের কেনা। মেলায় কিনেছিলাম। তখন আমি Ñ

কলিম   :         তা হোক। এটাই দিন। অমন নিখুঁত জিনিস হলে আপনার কাছে কে চাইত? বাজার থেকে কিনে নিলেই হতো।

ইনাম    :         আমি চলি। আমার আবার কলেজে পাওয়া দরকার। দশটা বাজে বোধহয়।

কলিম   :         ও হ্যাঁ, তবে তো যাওয়াই উচিত (ঘড়ি দেখে) না দশটার বেশি। সোয়া দশ।

           ইনামের প্রস্থান।

কাইউম :         একটা কথা বলুন তো, আপনাকেই বলি।

কলিম   :         বলুন।

কাইউম :         আমাকে খুব ছোটলোক মনে হয়, তাই না?

কলিম কথা বলে না। ওর ঘাড়ে হাত রেখে মাথা নাড়ে। কলিম প্যাকেট থেকে সিগারেট বার করতে যায়, কাইউম বাধা দেয়।

কাইউম :         না না, এ্যাদ্দিন এখানে ছিলেন অন্য কথা। এখন আর সেটি হচ্ছে না। চাকরটা দুদ- বাড়িতে থাকে না। যাই, আমিই যাই সিগ্রেট নিয়ে আসি।

কলিম   :         কী দরকার ছিল মিছিমিছি। তা দেরি করবেন না আবার!

কাইউমের প্রস্থান। কলিম এবার গিবনের বইটা শেল্ফ থেকে বার করে আনে। মঞ্চের সামনে এগিয়ে যায় এবং জোরে জোরে বইয়ের নামোচ্চারণ করে।

কলিম   :         ঞযব উবপষরহব ধহফ ঋধষষ ড়ভ ঃযব জড়সধহ ঊসঢ়রৎব. নু ঊফধিৎফ এরননড়হ.

                   [এবার পকেটে হাত দেয়। চেক বার করে তা খুলে দেখে। তারপর সেটা বইয়ের ভেতর রাখে। বই টেবিলের ওপর রাখে। খুবই চিন্তাগ্রস্ত দেখায়। কিছুক্ষণ পায়চারি করার পর আবার বই তুলে নেয়। বই খুলে আবার চেক বার করে দাঁড়িয়ে থাকে। পরে আবার চেকটা বার করে নিজের পকেটে রেখে দেয়]

কলিম   :         (ভেঙে পড়ে) না না, এ আমি পারব না।

কাইউমের প্রবেশ।

কাইউম :         কী পারবেন না?

টাইপিস্ট :         সব ঠিক তো, জানি আপনি কাজের লোক। সায়েব এখুনি লোকজন নিয়ে Ñ

কলিম হঠাৎ টাইপিস্টকে টেনে বাইরে নিয়ে যায়।

কলিম   :         যাও বোরোও। তোমার সায়েবকে আসতে হবে না। আমিই আসছি।

কাইউম :         আহা-হা, করেন কি! বলা নেই, কওয়া নেই, গায়ে হাত তুললেন। কে এই ভদ্রলোক?

কলিম   :         আপনি কি আর সব্বাইকে চেনেন। কানিংহামকে চেনেন, র‌্যাংকিন্সকে?

কাইউম :         না তো।

কলিম   :         সেই বলছিলাম, চিনে আর কী হবে? জানাশোনার অন্ত নেই। ধরুন, এদের মতোই কেউ।

কাইউম :         কী জানি। আমি তো হদ্দ হয়ে গেছি। আপনাকে কোনদিন বুঝলাম না। যার যার চরকায় সে সে তেল দিক। আমার জেনে কাজ কী। তা চললেন নাকি?

কলিম   :         হ্যাঁ! জরুরি কাজ। জানেন তো জরুরি কাজের শেষ নেই আমার। আর হয় তো শিগগির দেখা হবে না।

কাইউম :         বলেন কি, তা পৃথিবীটাই এরকম। যে যার আপন কাজ নিয়ে          ব্যস্ত। কে কার ধার ধারে? দেখা হলেই কী, হয়তো চিনতেই পারবেন না। (থেমে) পুতুলটা নেবেন বললেন যে Ñ

কলিম   :         ও হ্যাঁ দিন। শুনুন এরপর দেখা হলে, সত্যি হয় তো না চেনার ভান করব।

কাইউম :         তা তো করবেনই, কারণ Ñ

কলিম   :         কারণ তদ্দিনে হয় তো আমাকে আপনি সত্যি সত্যি চিনে ফেলবেন। তা আমি চাই না। চলি Ñ

         কলিমের প্রস্থান।

নবম পর্ব

মুস্তাফার ঘর। মীনুর প্রবেশ। হাতে একটা ভাঙা খেলনা। লিলি পাউডারপাফ গালে লাগিয়ে চেহারাটা পরখ করে নিচ্ছে। সামনে একটা শেড দেয়া বাতি।

মীনু      :         এটা কিনবেন?

লিলি     :         কী?

মীনু      :         আমার বাবা একটা পুতুল এনে দিয়েছিল না! সেইটে কিনবেন?

লিলি     :         কিনে কী করব, আমার কি বয়স আছে পুতুল খেলার? ওটা তুমি বিক্রি করে দিচ্ছ কেন?

মীনু      :         আমার বুঝি খিদে পায় না? কখন বাবা বেরিয়ে গেছে।

লিলি     :         তোমার বাবা রোজ বেরিয়ে যান?

মীনু      :         হ্যাঁ Ñ

বসতে যায়।

লিলি     :         না, এটার ওপর বসো না। তোমার ফ্রক কী নোংরা!

মীনু      :         নেবেন না বুঝি? আমি যাই তাহলে।

লিলির জন্য চা ও খাবার এলো। মীনু তাকিয়ে দেখছিল।

লিলি     :         (একটা টোস্ট মুখে দিয়ে) কী করবে পয়সা দিয়ে, বললে না তো।

মীনু      :         বা রে! পয়সা ছাড়া খেতে দেবে কে?

লিলি     :         তুমি বুঝি কিছু খাওনি। নাও।

মীনু      :         উহুঁ! ওরকম করে খাব কেন? আপনি পুতুলটা নিলেন না। একটা পুতুল কিনলে কী আর হয়?

লিলি     :         কই দেখি দাও তো। বলল, বেশ তো (নেড়ে চেড়ে দেখে) ও ভাঙা, তাই বলো।

মীনু      :         ভাঙা, তাহলে কম পয়সাই দিন।

লিলি     :         আচ্ছা দেব। তার আগে বলো তোমার মা কোথায়?

মীনু      :         মা তো নেই। কবে মারা গেছেন!

লিলি     :         আর বাবা বুঝি তোমাকে ছেড়ে বাইরে পালিয়ে থাকে?

মীনু      :         পালিয়ে থাকবে কেন? কাজ করতে হয় না? কাজ না করলে কেউ পয়সা দেয়! পুতুল না নিলে আপনি পয়সা দিতেন? আচ্ছা,বড় খিদে পেয়েছে, যাই।

লিলি মীনুকে কাছে টেনে নেয়।

মীনু      :         আপনি যে বললেন আমার ফ্রক নোংরা?

লিলি ছেড়ে দেয়।

লিলি     :         আমার কাছে থাকবে তুমি?

মীনু      :         কেন?

লিলি     :         কেন, খুব আদর করব। পুতুল কিনে দেব।

মীনু      :         না।

লিলি     :         কেন, আমাকে ভালো লাগে না?

মীনু      :         লাগে। কিন্তু আপনি তো আমার মা’র মতন নন?

লিলি     :         যদি তাই হই।

মীনু      :         যদি আমার কেমন করে হবেন? পয়সাটা দিন। আমি যাই।

লিলি     :         যদি তোমার মা হই। আমাকে ভালোবাসবে না?

মীনু      :         ধ্যাৎ।

হঠাৎ কলিমের প্রবেশ।

কলিম   :         কিছু মনে করো না। না বলে ঢুকে পড়লাম। বজ্জাত সেয়েটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। দুষ্টু, তুই এখানে কী করছিস?

মীনু      :         পুতুল বিক্রি করতে এসেছি।

কলিম   :         কী কা-। খাসনি বুঝি? চল চল।

মীনু      :         বলে কী জান? বলে তোমার মা হলে Ñ

কলিম   :         হোঃ! হোঃ!

লিলি     :         হাসির কী হলো Ñ

কলিম   :         এত ঔদার্য কোথায় শিখলে? একেবারে মা বনার শখ!

লিলি     :         কেন, আমি কি একেবারেই অযোগ্য?

কলিম   :         দেখ Ñ

লিলি     :         ওকে দেখে আমার কিন্তু বড্ড মায়া হয়। আপনি জোর করে নিয়ে যাবেন না কি?

কলিম   :         কেন, আমি কাউকে ভালোবাসতে পারি না বলে আপনার বিশ্বাস?

কলিম   :         কেন, পারবে না কেন? তোমার যোগ্যতার আমি সন্দেহ করেছি?

লিলি     :         তবে Ñ

কলিম   :         না, বলছিলাম ও বিদ্যেটা তো তোমারই একচেটিয়া নয়। আমি বিপতœীক। কিন্তু সেজন্য নতুন কনে আনার শখ নেই। আর তা’ছাড়া Ñ

লিলি     :         তাছাড়া কী?

কলিম   :         ওরকম ছেলেমেয়ে দেখলে দয়া উথলে ওঠা, ও তো তোমাদের ফ্যাশান।

লিলি     :         ফ্যাশান?

কলিম   :         ওসব ছাড়ো। ও সাময়িক দুর্বলতা। আমার মেয়ের জন্য অতটা বাড়াবাড়ি কিন্তু ভালো দেখাবে না।

লিলি     :         মনে হচ্ছে এখনো আপনার রাগ নামেনি Ñ

কলিম   :         রাগ, রাগ করব কেন? তোমাকে সদুপদেশ দিচ্ছি।

মীনু      :         চলো না বাবা Ñ

কলিম   :         হ্যাঁ যাই। কই পুতুলটা দাও তো। ওসব মাথাখারাপ না করে একটা ঝানু বিজনেসম্যান ধরে বিয়ে করো।

লিলি     :         থাক, আপনাকে বক্তৃতা দিতে হবে না Ñ

কলিম   :         কই, পুতুলটা দাও তো।

লিলি     :         কেন দেব? পয়সা দিয়ে কেনা। যা আমি কিনি ফেরত দিই না Ñ

কলিম   :         আমি পয়সা ফেরত দিচ্ছি।

লিলি     :         না। এক টাকা দাম, না-রে ছুড়ি!

কলিম   :         দেখলে! এরকম না হলে তোমাকে মানায়! কী প্রচ- ভুল করে বসেছিলে। এটাই তো স্বাভাবিক, ওই দুটো চোখে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠলে এত সুন্দর আর বড়লোক দেখায় তোমাকে?

লিলি     :         চুপ করুন।

কলিম   :         আমি চুপ করছি। কিন্তু জানো, এক টাকায় পুতুল কেনার মতো মানুষের মন কেনা যায় না। সে একশ’ হাজারেও নয়। এসব অস্বাভাবিক মহানুভবতা শরতের শিশির বিন্দুর মতো। ও থাকে না। মুছে যায়।

লিলি     :         চুপ করুন বলছি।

কলিম   :         আর কখনো শোনার অবকাশ হবে না। মানুষ হিসেবে তোমার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু হঠাৎ ভালো হয়ে যাওয়া বলে কোনো জিনিস নেই। একদিন শখ করে একজনকে খাইয়ে দেওয়ার আনন্দ, সে আলাদা কথা। একটা গরিবের ঘরে আধপেটা খেয়ে কাটাতে পারবে? পারবে না। তোমার ওই চেহারা মলিন হয়ে আসবে। চোখেমুখে রুক্ষতা ফুটে উঠবে, আর Ñ

লিলি     :         না না, আপনি চুপ করুন! আমি শুনতে চাই না।

কলিম   :         আমি চলি। তোমার বাবা এলেন বুঝি। ওর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই সরে পড়তে চাই। বেশ, ফিরিয়ে না দাও, কেনা পুতুলটা কি মাটিতে পড়ে থাকবে? জানো ওটা Ñ

লিলি     :         থাক।

কলিম   :         আমরা চলি।

মীনুর হাত ধরে কলিমের প্রস্থান।

লিলি     :         যান না। কেউ ধরে রাখেনি আপনাদের?

মুস্তাফার প্রবেশ। সঙ্গে নাসিমাবানু।

মুস্তাফা  :         এই যে মা, বলছিলাম জানিস, আহা তুমিই বলো না Ñ

নাসিমবানু         :         মা, আজ বিকেলে একটু সেজেগুজে থাকিস Ñ

লিলি     :         কেন?

মুস্তাফা  :         আহা, কেন আবার কী? রায়পুরের বেগম সাহেবা তোকে দেখতে আসবেন। সৎ পাত্রেই দিচ্ছি মা।

নাসিমবানু         :         জমি-জমা মিলিয়ে, মা, ওদের অনেক সম্পত্তি। রাজকন্যের মতো থাকবি।

লিলি     :         (মাকে জড়িয়ে ধরল) মা Ñ

নাসিমবানু         :         কিরে?

লিলি     :         মা, আমরা অদ্ভুত জীব। আমরা বুঝি কোনোদিন কারো চোখে বদলাতে পারি না।

মুস্তাফা  :         বদলাবার আবার কী কথা হলো রে?

নাসিমবানু         :         তুমি যাও তো। কেন মন ভরছে না বুঝি?

লিলি     :         মন। আমাদের আবার মন আছে নাকি? অত টাকা-পয়সা, জায়গা-জমিতে মন ভরবে না? তারপর রাজকন্যের মতো থাকব। তোমার মন ভরেছে তো?

নাসিমবানু         :         তোর সুখেই আমার সুখ। তুই যেখানে সুখে থাকবি Ñ

নাসিমবানু পুতুলটা মাড়িয়ে গেল।

লিলি     :         মা মা, ওটা মাড়িয়ে দিলে তো?

নাসিমবানু         :         (পুতুলটা তুলে নিয়ে) এটা আবার কী? তোর কি এখনো পুতুল খেলার বয়েস? [লিলি কেঁদে ওঠে]

নাসিমবানু         :         কী হলো?

লিলি     :         (দুমড়নো পুতুলটা হাতে নিয়ে) না মা, কিছু হয়নি। এবার তুমি চিরকালের মতো সুখী করে গেলে। আর কোনো দুঃখ আমার          নেই Ñ

নাসিমবানু         :         এ সব কী বলছিস?

লিলি     :         ঠিক কথা বলছি মা। একটা না একটা তো আমাদের লোকসান দিতেই হবে। দুটো আমরা পেতে পারি না। অর্থ-যশ আর মন এ দুটো কোনোদিন পাশাপাশি দাঁড়াতে পারে না। অর্থ-যশই মেনে নিলাম। ওটাই যে তোমার শিক্ষা। মন আবার একটা জিনিস! ও তো পুতুলের মতো ঠুন্কো Ñ

নাসিমবানু         :         লিলি!

লিলি     :         কেন তুমি খুমি হওনি? কত বুদ্ধিমতী মেয়ে আমি তোমার।

লিলি     :         কোথায় যাচ্ছ? শোন, আমার কথা শেষ হয়নি।

নাসিমবানু         :         আমি শুনছি বলো।

লিলি     :         বিয়েটা শিগগির ঠিক করো। শোন, জড়োয়া গয়নার একটি ক্যাটালগ নিয়ে এসো। আমাকে সব বাছতে হবে না?

নাসিমবানু         :         এখন কী হবে?

লিলি     :         এখনই চাই। মা, আমি বড়লোকের মেয়ে। জড়োয়া গয়না আমি গা ভরে নেব। দামের জন্য কী আছে? আর শোন Ñ

নাসিমবানু         :         কী হলো? তুই কী পাগল হয়ে গেলি?

লিলি     :         সত্যি কথা বললে তোমরা পাগল বলো। অদ্ভুত তোমাদের রীতি। যা বলি তা করো মা। গয়নার ক্যাটালগ আন। আমি মন ভরে দেখি। আর শোন মা Ñ

নাসিমবানু         :         কী মা।

লিলি     :         একটা কাজলদানি এনো সে সঙ্গে। সাজতে হবে না। তোমাদের সকলের মনের মতো।

নাসিমবানুর প্রস্থান ও কিছুক্ষণ পরে কাজলদানি হাতে প্রবেশ। নাসিমবানু এককোণে দাঁড়িয়ে। লিলি একমুহূর্ত কী ভাবে। তারপর একটা মোমবাতি জ্বালায়। তার ওপর ধরে কাজলদানি। কিন্তু সেটাও যেন মনঃপুত হয় না। ওটা রেখে দেয়। মোমবাতি জ্বলতে থাকে। গয়নার ক্যাটালগ থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে মোমবাতির আগুনে ধরায়। নাসিমবানু সেদিকে ছুটে যান।

নাসিমবানু         :         এই, কী হচ্ছে ও-সব?

লিলি     :         উত্তেজিত এমন একটা লাল লকলকে জড়োয়া তৈরি করে আমার গলায় দিতে পারো না? মা, কী সুন্দর দেখ!

নাসিমবানু বাতি ছিনিয়ে নিয়ে যান।

নাসিমবানু         :         ওগো শুনছ! তোমার মেয়ের যেন কী হলো, শিগগির ডাক্তার ডাক।

মুস্তাফা  :         কী মুশকিল। ডাক্তার। একটা ’বিজনেস ডিল’ হচ্ছিল। আচ্ছা, বলছ যখন।

নাসিমবানু মেয়েকে সঙ্গে করে আস্তে বেরুতে থাকেন চুলে হাত বুলাতে বুলাতে। পেছনে মুস্তাফা। লিলি কান্নায় ভেঙে পড়ে।

দশম পর্ব

রাত [ইনামের ঘর। ইনামকে রুবীর সঙ্গে কথা বলতে দেখা যাবে।]

ইনাম    :         না, তা তো বুঝলাম। কিন্তু চলবে কী করে? তোমার জন্য ভাবনা ছিল না। কিন্তু এই অনাথ ছেলেটাকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াবে শুনি?

রুবী      :         সারাজীবন যে একাই আপনাকে এ ভার সইতে হবে তার কী কথা আছে?

ইনাম    :         সারাজীবন আবার পেলে কোথায়? আর একে সওয়া বলে? যা করা উচিত ছিল তার বেশি তো কিছুই করিনি।

রুবী      :         আর কারো কি কোনো দায়িত্ব নেই? শ্বশুরবাড়ির লোকেরা একবার খোঁজও নিল না। কেন, আপনার কী দায়?

ইনাম    :         আবার ওই এক কথা। ছেলেটাকে নিয়ে পথে দাঁড়াবে আর তা আমাকে দেখতে বলো? না-হয় নিজে ঘর-সংসার করিনি; কিন্তু আমার ছেলে যদি এমন বিপদে পড়ত তুমি পারতে তাকে ঠেলে দিতে?

রুবী      :         মাঝে মাঝে আপনাকে বড় অদ্ভুত মনে হয়। মনে হয় Ñ

ইনাম    :         হয়েছে হয়েছে। কার সাধ্যি তোমার সঙ্গে কথায় পেরে ওঠে। যা করা উচিত ছিল, তার আর হয়ে উঠল কই? একেই সামান্য চাকরি।

রুবী      :         সত্যিই তো, আপনার বন্ধুটিই কেমন! সারাজীবন ঘাড়ে বসেই থাকবেন নাকি, একটা কিছু করলেই পারেন। একা ক’জনের দায়িত্ব আপনি নেবেন, শুনি?

ইনাম    :         কাইউমের কথা বলছ? (হঠাৎ যেন ক্ষুব্ধ হলো) তা ওর জন্য অন্যের মাথা ব্যথা কেন? সে আমি বুঝব। এই যে দিনের পর দিন লোকটা মুখ বুঝে গঞ্জনা সয়ে যাচ্ছে, সেটা বুঝি কিছু না। মুখে যাই বলি আমার আজ কিছু একটা হলে আর কাউকে পাব না রতনের মা। ও আমার আত্মীয়ের চেয়েও বড়।

রুবী      :         সত্যিই তো, আপনার ব্যাপারে নাক গলানোর আমার কী দরকার। নিছক দায়ে পড়ে আজ এর ওর কাছে হাত পাততে হচ্ছে। এ পোড়া কপালে আরো যে কত ভোগান্তি Ñ

ইনাম    :         না, না, কিছু মনে করো না। আকজাল মাথাটা কেমন যেন ঠিক থাকে না। হয়তো আমার ভালোর জন্যই বলছ। কিন্তু Ñ

রুবী      :         ভালো কথা, আপনার টাকাটা নিয়ে এসেছিলাম Ñ

রুবী টাকা দিতে গেল।

ইনাম    :         টাকা দিতে এসেছ! না না, সে কী কথা। চলবে কী করে?

রুবী      :         সে ভাবনা আমার। না পারি গতর খেটেও কী দুটো পয়সা রোজগার করতে পারব না? সত্যিই তো আপনাকেই বা সারা জীবন এ বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে কেন?

ইনাম    :         তুমি আবার রাগ করে বসলে। অথচ তোমাকে আঘাত দেবার ইচ্ছে মোটেও ছিল না। জান, দুমাস ধরে মাইনে পাইনি। কাইউমের পুরোন ঘড়িখানা বিক্রি করে কিছু টাক পাওয়া গিয়েছিল। তা দিয়েই চলছে।

রুবী      :         সে টাকা থেকেই বুঝি আমাকে সাহায্য করলেন?

ইনাম    :         তখন আমার হাতে আর টাকা কই, তাছাড়া Ñ

রুবী      :         আমারই অন্যায় হয়েছে। আপনার বন্ধুকে আমি বুঝতে পারিনি। তাই স্বার্থপরের মতো কথা বললাম। আমাকে মাপ করুন।

ইনাম    :         তাকে তুমি চেন না। চিনলে অমন কথা বলতে না। তোমাকে টাকা দিয়েছি শুনলে ও হয়ত রাগ করবে। কিন্তু সে টাকা তোমার কাছে থেকে ফেরত নিয়েছি জানলে আমাকে আস্ত রাখবে না। তাকে তুমি চেন না রতনের মা। ও টাকা বরং তুমি রাখ।

রুবী টাকা নিল।

রুবী      :         আবার বলছি কিছু মনে করবেন না।

ইনাম    :         এমনও তো হতে পারে, তুমি সত্যি কথা বলছ। কিন্তু Ñ

হঠাৎ আনোয়ারের প্রবেশ। উসকো-খুসকো চুল। হাতে একতাড়া নোট। আনোয়ারের হাতে টাকা দেখে রুবী ও ইনাম দুজনই নিষ্পলক নেত্রে তাকিয়ে থাকে।

আনোয়ার         :         কী দেখছেন। বিশ্বাস হচ্ছে না? পাঁচ হাজার টাকা।

ইনাম    :         টাকা তুমি কোথায় পেলে?

আনোয়ার         :         টাকা? কোথায় পেলাম। না না, আমি বলতে পারব না। তা জেনে কী দরকার? (রুবীকে দেখে) নিন। আপনি বলেছিলেন সাত রাজার ধন। কিন্তু সে আমি কোথায় পাব? এটাই নিন। না না, ফিরিয়ে দেবেন না।

রুবী অপ্রকৃতস্থের মতো টাকা নিল।

আনোয়ার         :         বাঃ! একবার গুনেও দেখলেন না? বিশ্বাস করে ফেললেন। ঠকাতেও তো পারি। (রুবীর মুখের দিকে তাকাল) না না ঠকাইনি, ঠকাইনি।

রুবী      :         কী করব আমি টাকা দিয়ে?

টাকা ফিরিয়ে দিলো।

আনোয়ার         :         কী জানি, কী করবেন। জেনে আমার লাভ? (ইনামের দিকে তাকিয়ে) ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না স্যার? সাত রাজার ধন! না, সে আমি পাব কোথায়?

ইনাম    :         টাকা কোথায় পেলে বললে না তো?

আনোয়ার         :         (রুবীকে দেখিয়ে) স্যার, নিচ্ছেন না কেন? স্যার, বিশ্বাস করুন, এর বেশি পেলাম না। যা ছিল সব এনেছি।

ইনাম    :         তুমি সিন্দুক ভেঙেছ।

আনোয়ার         :         (ভেঙে পড়ল) অন্যায় করেছি বলে রাগ করবেন। তা করুন। কিন্তু স্যার একটা মানুষ খুনের চেয়েও কী এটা বড় অন্যায়। তা নিশ্চয়ই নয়। আমি যাই। (ইনামের দিকে তাকিয়ে) আপনি অমন করে তাকাচ্ছেন কেন? না, আমি চুরি করিনি। যাই, কাইউমকে বলবেন না, বুঝেছেন। আমি যাই Ñ

আনোয়ার         :         (টাকা তুলে নিয়ে) নেবেন না মানে। এখন আর তা হয় না। সবাই জেনে গেছে।

রুবী      :         না, টাকা আমি নেব না। ফিরিয়ে নিয়ে যাও।

ইনাম    :         টাকাটা যেখানে ছিল সেখানে রেখে এসো।

আনোয়ার         :         তার মানে? তাহলে আমি বাঁচব কী করে। স্যার, একটা মানুষ খুন করলাম। যার যা ঋণ তা শোধ দিতে হবে না?

রুবী চোখ ঢেকে ফেলল।

ইনাম    :         যা বলি, তার কর। এভাবে ঋণ শোধ হয় না।

আনোয়ার         :         ঋণ শোধ হয় না, তবে? ভেবেছেন আমার হাতকড়া পড়বে? পড়–ক না, এছাড়া আমার যে বাঁচার উপায় ছিল না স্যার। (রুবীকে) নিন। আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। আমাকে বাঁচতে দিন, প্রতিদানে কিছুই দিতে পারি নি ভাবলে Ñ

ইনাম    :         যদি উনি তোমাকে ক্ষমা করে থাকেন।

আনোয়ার         :         না না, উনি ক্ষমা করবেন না, উনি ক্ষমা করতে জানেন না।

রুবী      :         (ওর হাতে ধরল) জানি বস মনে আছে একদিন তুমি বলেছিলে তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখতে? বলেছিলে ক্ষমা করতে না পার প্রতিহিংসা নাও। আজ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো, ক্ষমা করেছি না প্রতিহিংসা নিচ্ছি।

আনোয়ার তাকাল। ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি নিয়ে তাকাল রুবী। মৃদু হাসি ফুটল রুবীর মুখে।

আনোয়ার         :         আপনি সত্যি আমাকে ক্ষমা করছেন?

রুবী      :         তোমার বোন কি এত ছোটলোক যে এখনও তোমাকে ক্ষমা না করে থাকতে পারে। তাই তোমার মনে হয়?

আনোয়ার         :         (ওর হাতটা চেপে ধরল) ক্ষমা করলেন? আমার গা ছুঁয়ে বলুন।

রুবী      :         (ইনামের দিকে তাকিয়ে রুবী কাঁদ কাঁদ হয়ে পড়ল) আমি যাই। বসে বসে কী দেখছেন? পাগল হয়ে যাক, তাই চান? কিছু না পারেন দুটো কথা বুঝিয়ে বলতে দোষ কি, আমি চলি।

                    রুবীর প্রস্থান।

আনোয়ার         :         আরে চললেন নাকি?

ইনাম    :         যা বলি, ভালো ছেলের মতো টাকা ঘরে রেখে এস।

আনোয়ার         :         কিন্তু।

ইনাম    :         কোনো কিন্তু নয়। যাও, তোমার এত অধঃপতন, ছিঃ ছিঃ Ñ

টাকা তুলে নিল।

আনোয়ার         :         সত্যি আমাকে ক্ষমা করেছে তো?

ইনাম মাথা নাড়ল।

ইনাম    :         এখনো যদি সে কথা না বোঝ জীবনে কোনদিন তা বুঝবে না। যাও।

টাকার তোড়া তুলে নিয়ে আনোয়ারা আস্তে আস্তে মাথা নিচু করে বেরিয়ে যায়। খানিকক্ষণ পরে কাইউমের প্রবেশ। ওকে দেখেই ইনাম বই নিয়ে বসে

কাইউম :         (জুতো ও মোজা খুলতে খুলতে) বুঝলেন, ইন্টারভিউতে যা যা জিজ্ঞেস করল, সবই বললাম। কিন্তু ব্যাংকিং নেই কী না। যাক, কদিন নিশ্চিন্ত হয়ে জিরোই। তারপর আবার দেখা যাবে। একদিন কী ঘোরাটাই ঘুরেছি।

ইনাম    :         নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকবে কেন? কদিন এভাবে থাকবে আর, শোন।

কাইউম :         আ-আমাকে বলছেন?

ইনাম    :         তবে আর কাকে বলছি, যার যার পথ সে দেখুক। অন্য লোকের মাথা ব্যথা, আমি ক্যান করি, ক্যান করি। সত্যই, তুমি আমার কে, সারাজীবন তোমাকে পেলে পুষে মানুষ করতে হবে! কী দায় আমার শুনি?

কাইউম :         আপনি এমন করে মুখের ওপর বলে বসলেন?

ইনাম    :         তবে কী ভেবেছ? বইয়ের রাজ্যে ডুবে কোনো দুর্লভ রতœ আহরণ করেছি বলে ভাব। কৈশোর থেকে যৌবন, যৌবন থেকে প্রৌঢ়ত্ব, তারপর পঙ্গুত্ব, এই নিয়েই থাকতে হবে, বল? শখ কি আমার হয় না, নিজের একটা ঘর-বাড়ি, ছোট সংসার! আমার কি মন বলে কিছু মনে নেই?

কাইউম :         তা আমাকে বলছেন কেন? যেন আপনার সব কিছুর জন্য আমিই দায়ী। যা খুশি করুন। অত দেমাক দেখাচ্ছেন কেন?

কাইউম বিছানায় গেল। শোবার প্রস্তুতি।

ইনাম    :         তাই করব, কিসের অত মায়া-দরদ। তোমাদের জন্য কী আমার মাথাব্যথা। যত ঘনিষ্ট হও ততই বাঁধন শক্ত হয়ে আসে। এখুনি মুক্তি চাই নইলে Ñ

কাইউম শোয়া থেকে উঠে বসে।

কাইউম :         এগুলো সব বইয়ের কথা। আমি কখনো বইপত্রের ধারেও যাই না। আরে সায়েব, বেশি জ্ঞানলাভের এই দোষ, ভাবনা-চিন্তা করে কী লাভ? চলতে দিন।

এবার চীৎ হয়ে ঘুমায়, চাদর টেনে নিয়ে।

ইনাম    :         না, তা আর হয় না। ঠিক করেছি কালই আমি দেশে চলে যাব। চাকরি ছেড়ে দেব। অতদিন যখন চলল, আর ক’টা দিন চলবে না। জীর্ণ-পুরনো, জীবনের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে নতুন করে Ñ

কাইউম :         তা আমাদের ছেড়ে যদি শাস্তি পান, যান। ভয় দেখাচ্ছেন কেন? ভারী তো, চলে গেলে ভাবছেন বানের জলে ভেসে পড়ব। অত না।

কাইউমের চোখ বুজে আসে।

ইনাম    :         না না, রাগের কথা নয়। এ হয় না কাইউম। কেন এর দুঃখ, ওর অভিযোগ আর নালিশ আমাকে শুনতে হবে? কেন? একদিন ভেবেছিলাম বইয়ের রাজ্যে ডুবে থেকে ভুলে থাকব Ñ সব দুঃখ-যাতনা। এখন দেখছি সেখানে থেকেও চোখ তুলে তাকাতে হয়। এ আমার সহ্য হয় না। এত গ্লানি, পরশ্রীকাতরতা, এত হিংসা দ্বেষ, বেদনা Ñ

কাইউম :         (ঘুমুতে ঘুমুতে জড়ান কন্ঠে) কত দেখলাম Ñ আরে জীবনকে এড়িয়ে গিয়ে কে আবার সুখ পেল। যেতে চান, যান। আমার কী Ñ

ইনাম    :         কালই যেতে চাই। তোমার জন্য দুঃখ যে হয় না, তা নয়। কিন্তু বোঝ তো। (ইনাম কাইউমের কাছে গিয়ে দেখলে কাইউম ঘুমিয়ে পড়েছে) ও কী ঘুমিয়ে পড়লে? ভালোই হলো। তোমার কাছে থেকে এমনিতে বিদায় নিতে কষ্ট হতো। ভালই হলো। কাল সকালের গাড়িতেই Ñ

আলো নিবে আসে।

একাদশ পর্ব

ইনামের ঘর। সকালবেলা। পর্দা উঠতেই দেখা যাবে ইনাম কাপড়-চোপড় গোছাতে ব্যস্ত। একপাশে একটা বেডিং ও স্যুটকেস। কিছু       শিশি-বোতল নেড়েচেড়ে দেখে। কিন্তু কাজের মনে না হওয়ায় সেগুলো রেখে দেয়। ড্রয়ার খুলে দরকারি কাগজ-পত্র খোঁজ করে। বইয়ের শেল্ফ থেকে দু-চারটে বই নিয়ে স্যুটকেস রাখে। কাইউম তখনো ঘুমিয়ে। কখনও একটু এপাশ-ওপাশ করছে। কখনো চাদরটা একটু টেনে নিচ্ছে। টেবিলে ঘড়ির টিক্টিক্ শব্দ। হারিকেন প্রায় নিবুনিবু। ইনাম জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে স্যুটকেস হাতে নেয়। ওটা নাবিয়ে কাইউমের কাছে এসে দাঁড়ায়। হারিকেনটা একটু বাড়িয়ে নিয়ে ওর মুখের দিকে তাকায়! ও তখনো ঘুমিয়ে।

ইনাম    :         বিশ্বাস করো। এমন আমি চাইনি। কখনো ভাবিনি এভাবে চলে যেতে হবে। (কিছুক্ষণ বিরতির পর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে) কী করে বলব,Ñ আমাকে যেতে দাও। তা আমি পারব না। (স্যুটকেস হাতে নিয়ে একটু করে এগিয়ে যায় আবার ফিরে আসে) কিন্তু কাল ও খাবে কী। (মানিব্যাগ থেকে পয়সা বার করে কাইউমের বালিশের কাছে রাখে) থাক্, টাকা ক’টা থাক্।

দূরে পাঁচটা বাজার ক্ষীণ শব্দ শোনা যাবে। ইনাম আরেকবার তাকায় কাইউমের দিকে। তারপর এগিয়ে যায়। রুবী এসে ঢোকে। সঙ্গে তার ছেলে রতন। রতনের হাতে বই, ইনাম যেন ভুত দেখে।

রুবী      :         কোথায় যাচ্ছেন?

ইনাম    :         কে?

রুবী      :         আমি।

কাইউমের আড়মোড়া দিয়ে আবার পাশ ফিরে ঘুমায়।

ইনাম    :         তুমি, এত সকালে Ñ

রুবী      :         জানতাম, এ সময় না এলে আপনাকে পাব না। কোথায় যাচ্ছেন। আপনার যাওয়া হবে না। কোথায় যাচ্ছেন। আপনার যাওয়া হবে না। সুটকেস নাবিয়ে রাখুন।

ইনাম    :         (স্বর চড়িয়ে) কেন, যাওয়া হবে না। আমি যাবই। তুমি, তুমি কাল বিকেলে নিজেই বলেছ রতনের মা, আমার একটা ছোট্ট, নিজের মনের মতো ছোট্ট সংসার চাই। এখুনি ভুলে গেলে? না, যেতে আমাকে হবেই।

কাইউম চোখ কচলে বিছানায় উঠে বসে। কিন্তু কিছু বলে না।

রুবী      :         না, ভুলিনি। মনে আছে। আর সেজন্যই সকাল সকাল ছুটে এলাম। কাল সারারাত ভেবেছি।

ইনাম    :         কী ভাবলে।

রুবী      :         এক সংসার থেকে পালিয়ে আর এক সংসার গড়া যায় না। যে দুঃখ, গ্লানির ভয় আপনাকে ঘরছাড়া করছে সে কি অন্য কোথাও নেই? এতদিনের ভালোবাসা, øেহ আর প্রীতির যে পরিবেশ, শুধু মাত্র একটি দিনের খেয়াল তাকে আপনি ছেড়ে চলে যাবেন Ñ

কাইউম দৌড়ে ইনামের হাত থেকে সুটকেস নিতে যায়। ইনাম সেটা আরো জোরে আঁকড়ে ধরে।

ইনাম    :         (রুবীকে) এই দুঃখ, দারিদ্র্য, পরশ্রীকাতরতা এসব আমি Ñ

রুবী      :         আপনি এত ভীরু, এসবের ভয়ে আপনি আড়ষ্ট! একথা আপনিও বোঝেন, এ যাওয়ায় আপনার মনের অনুমোদন নেই।

ইনাম    :         কী করে জান সে কথা?

রুবী      :         জানি, মেয়ে মানুষেরা অনেক কিছু জানে। হৃদয়ের ভাষা জেনে নিতে তাদের ভুল হয় না।

রুবী      :         যদি আবার সুখী হন। আর যদি না হন। এটা কি জুয়াড়ির কথা হলো না? সে সুখ এখানেও হতে পারে। স্বার্থপরতায় কোনো সুখ নেই।

ইনাম    :         না না। তুমি বুঝবে না, রতনের মা, জীবনের এই শূন্যতাকে Ñ

রুবী      :         না না। তুমি বুঝবে না, রতনের মা, জীবনের এই শূন্যতাকে Ñ

রুবী      :         শূন্যতা কি আপনার একার? আমার সামনে দাঁড়িয়ে এ কথা বলতে পারছেন? আমার কথা একবার ভাবুন। এটি (রতনকে দেখিয়ে) ছাড়া আমার আর কে আছে বলুন। তবু আমি কি কলসি গলায় বেঁধে ডুবতে গেছি। বলুন, চুপ করে আছেন কেন? সুখ, ও শুধু কথার কথা। জীবনের সকল রূঢ়তা-রুক্ষতার ভেতর হেসে খেলে যাওয়ার নামই সুখ।

ইনাম    :         (সুটকেস নাবিয়ে রাখে) হয়ত তুমি যা বলেছ তাই ঠিক। কিন্তু Ñ

রুবী      :         আর যদি যেতে হয় কাপুরুষের মতো কেন? হয়ত ভীরুতারও ক্ষমা আছে। কিন্তু যে ভীরুতাÑদিনের আলোয় চোখ মেলে তাকাতে পারে না, অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে চায় Ñ তাকে কেউ ক্ষমা করে না।

ইনাম    :         তুমি ভাবো, আমি ওকে (কাইউমের দেখিয়ে) জানিয়ে যাব? গলা ফাটিয়ে বলব, আমি যাই। না, সে আমাকে দিয়ে হবে না।

রুবী      :         না হোক। আপনার যাওয়া হবে না। একটা কাজ এখনও বাকি Ñ

কাইউমের শেল্ফের কাছে যায়। সেখানে দু-চারটে বই ছাড়া সব খালি। টেবিলের ওপর কিছু খালি প্যাকেট। নিজের বালিশের তলায় কিছু টাকা এবং খুচরো দেখতে পেয়ে সেগুলো ছুঁড়ে ফেলে দেয় কাইউম। তারপর খাটে এসে বসে।

ইনাম    :         (রুবীকে) কী কাজের কথা বলছ?

রুবী      :         মনে আছে আপনি একদিন বলেছিলেন, এ ছেলের জন্য আমাকে ভাবতে হবে না। ওর লেখাপড়ার ভার আপনার। আজ ওর হাতেখড়ি দিন। বড়Ñবড় আশা করে এসেছে আমার রতন। পারবেন ওর অত ভরসা, এত উৎসাহ-উদ্দীপনাকে পায়ে দলে চলে যেতে? যদি পারেন যান। ও রইল, আমি চলি।

রুবীর প্রস্থান। ইনাম কিছুক্ষণ নিষ্পলক নেত্রে তাকিয়ে থাকে রুবীর গমন পথের দিকে। সকাল হয়। কাইউম বাতি বুঁজিয়ে দেয়। রতন করুণ চোখ নিয়ে ইনামের শার্ট ধরে একটু ঝাঁকুনি দেয়। ইনাম স্যুটকেস নাবিয়ে রেখে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে। রতন এবার বইয়ের পাতা খুলে ওর হাত ধরে টানে। ইনাম কথা বলে না। রতন যন্ত্রচালিতের মতো এসে বসে। ইনাম ওর চিবুকে হাত বুলিয়ে বইখানা খুলে ধরে। রতনের মুখে হাসি।

ইনাম    :         (রতনকে) পড়। বল, স্বরে ‘অ’।

রতন কথা বলে না।

ইনাম    :         স্বরে ‘অ’ –

কাইউম দরজার কাছে রাখা সুটকেস তুলে ভেতরে নিয়ে আসে। রতন ও কাইউমের মুখে হাসি বিনিময়।

রতন    :         ‘ছলে অ’ –

ইনাম চোখ তুলে কাইউমের দিকে তাকায়। যেন চশমা জোড়া খুঁজে পায় না। কাইউম টেবিল থেকে ওখানা তুলে এনে ওর হাতে দেয়। ইনামের মুখে মৃদু হাসি। কাইউম বেডিং তুলে এনে খাটের ওপর রাখে। খুলে বিছানা পাততে যায়। তারপর তাকায় ইনামের দিকে যেন সম্মতির অপেক্ষায়। ইনাম মৃদু হাসি হেসে যেন তারই সম্মতি দেয়। তারপর পড়াতে শুরু করে।

ইনাম    :         স্বরে অ –

রতন    :         ‘ছলে অ’ –

ইনাম    :         স্বরে আ –

কাইউম চুল পাট করে গায়ে শার্ট চড়ায়। কী খেয়াল হওয়ায় রতনের গালে টোকা দেয়। রতন আব্দারের সুরে শব্দ করে ওঠে। তারপর অতি আব্দারেই যেন ওর গায়ে মস্ত ঘুসি বাগিয়ে দেয়। কাইউম সুটকেস থেকে ইনামের বইপত্র বার করে শেল্ফে রাখা শুরু করে

ইনাম    :         বল, স্বরে ‘অ’ স্বরে ‘আ’-

রতন    :         ‘ছলে অ-ছলে আ’।

য ব নি কা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *