চেহারা

এ নাটকের অন্যতম মুখ্য চরিত্র বেবী নামের মেয়েদের যে যেখানেই থাকুক।

নাটকটি প্রথম টেলিভিশনে অভিনীত হয়। মঞ্চোপযোগী করার কারণে স্থানবিশেষে সামান্য পরিবর্তন করতে হয়েছে।

দ্রষ্টব্য :

ভুলবশত পরবর্তী পর্যায়ে চরিত্রলিপিতে কোয়েলের উল্লেখ নেই। কোয়েল চান্দু শেখের আশ্রিতা। বয়সে যুবতী। অনুরূপভাবে ড্রাইভার চরিত্রটিও ওই তালিকায় সংযোজিত হবে।

‘অন্যান্য ভূমিকায়’ যাদের নাম দেখানো হয়েছে তাদের অধিকাংশই চতুর্থ দৃশ্যে বেবীর জন্মদিনে আমন্ত্রিত অতিথি।

প্রথম অভিনয়

বাংলাদেশ টেলিভিশন

৩ জুলাই, ১৯৭৭

চরিত্র    ভূমিকায়

ইফতেখার        আবুল হায়াত

শওকৎ  ফখরুল হাসান বৈরাগী

হালিম   আবদুল আজিজ

তালুকদার         শেখ ফজলুল রহমান

হাসান   কাজি মকসুদুল হক

আনওয়ার         আফজাল হোসেন

তারেক  রাইসুল ইসলাম আসাদ

চান্দু শেখ         কাজি মেহফুজুল হক

সহচরবৃন্দ         আবদুস সাত্তার

          দেলয়ার হোসেন দিলু

          নুর হোসেন

পুলিশ ইন্সপেক্টর  আলি ইমাম

পুলিশ কনস্টবল  জামিলুর রহমান

বেবী     সুবর্ণা মুস্তাফা

সকিনা   রেখা আহমদ

সাহানা   সামিয়া পারভিন

কোয়েল রুবিনা

রীতা     জলি নাসরিন

রীতার মা অমিতা বসু

অন্যান্য ভূমিকায় : আলি আশরাফ, শিখা হাসান, লাভলি ইয়াসমিন, মিলি ইয়াসমিন, আইভি আহমদ, পারভিন ইসলাম, সৈয়দ মোহাম্মদ চান্দু ও আবুল কাসেম।

প্রযোজনা : আতিকুল হক চৌধুরী।

চরিত্রলিপি

ইফতেখার       – চল্লিশোর্ধ্ব- কনসাল্টিং ফার্মের মালিক

শওকৎ  – যুবক – ইফতেখারের একান্ত সহকারী

হালিম   – চল্লিশোর্ধ্ব- ইফতেখারের অনুগ্রহপ্রার্থী

তালুকদার

হাসান   – যুবক – তালুকদারের ভাগ্নে, চাকরিপ্রার্থী

আনওয়ার         – বছর বাইশেক – ইফতেখারের আত্মীয়

তারেক  – আনওয়ারের সমবয়েসি – ইফতেখারের পুত্র

চান্দু শেখ         – মাঝবয়েসি – গুন্ডা সর্দার

প্রথম সহচর      – যুবক – চান্দু শেখের অনুগামীদ্বয়

দ্বিতীয় সহচর

পুলিশ ইন্সপেক্টর 

পুলিশ কনস্টবল  – দুজন

সকিনা   – ত্রিশোর্ধ্ব- ইফতেখারের স্ত্রী

বেবী     – তেরো-চৌদ্দ – ইফতেখারের কন্যা

সাহানা   – যুবতী – শওকতের ভগ্নি

রীতা     – বেবীর সমবয়েসি – বেবীর সহপাঠিনী

রীতার মা – মাঝবয়েসি    

ঝিয়ের মেয়ে      – আট-নয়

মঞ্চ পরিকল্পনা

আগাগোড়া মঞ্চ এভাবে পরিকল্পিত যে, সবকটি দৃশ্যেই তা প্রযোজ্য। আলাদাভাবে দৃশ্য পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। মৌলিক দৃশ্যপটের সামান্য হেরফের করেই পৃথক পৃথক দৃশ্যের উপযোগী করে নেয়া যাবে। মনে মনে মঞ্চটি তিন ভাগে ভাগ করে নিতে হবে।

মঞ্চের প্রথম অংশ

(দোতলা বাড়ি। নিচের তলায় ভেতরের ঘরে ওপরে ওঠার সিঁড়ি।)

মঞ্চের প্রথম তৃতীয়াংশে (ডানদিক থেকে) কাঠের ফ্রেম, প্লাইউড বা হার্ডবোর্ড দিয়ে আড়াই ফুট উঁচু প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দোতলার বারান্দা বোঝানো হবে। প্ল্যাটফর্ম রেলিং দিয়ে ঘেরা। পূর্বে বর্ণিত সিঁড়ি বামদিকে। প্ল্যাটফর্মের যে অংশ দৃশ্যগোচর সেটুকু ভরাট দেয়ালের মতো এবং তাতে ইটের মতো ডিজাইন আঁকা।

প্ল্যাটফর্মের সামনে ছ’ইঞ্চি মতো জায়গা ছেড়ে দিয়ে প্রায় তিন ফুট উঁচু হালকা পার্টিশন। কাঠের ফ্রেমের ওপর কাপড় দেয়া। পার্টিশন তিন ভাগে বিভক্ত এবং প্রত্যেকটি ভাগ ভাঁজযোগ্য। ভাঁজ না করে সোজাসুজি মেলে ধরলে মঞ্চের প্রায় অর্ধেকটা চলে যায়। পার্টিশনের সর্বডান অংশটি খালি। প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানে পেপার কাট আউট বা ডিজাইন লাগানোর ব্যবস্থা থাকবে। মধ্যভাগে দরজা এবং শেষভাগে শিক দেয়া জানালা। পার্টিশনের সামনে মঞ্চের ডানদিক ঘেঁষে সমান্তরাল করে রাখা ডিভ্যান। ডিভ্যানের ডানমাথায় সমকোণ করে রাখা কিছু হাতলহীন চেয়ার বা টুল। সামনে ছোট টেবিল। সেখানে একটি টেলিফোন।

মঞ্চের দ্বিতীয়াংশ

তেমন কিছু নেই। পার্টিশন মেলে ধরলে জায়গাটা ঢাকা পড়ে যাবে। পার্টিশনের দরজা দৃশ্যগোচর হবে।

মঞ্চের শেষ তৃতীয়াংশ

সবচেয়ে বামে মঞ্চের শেষ তৃতীয়াংশে দুটো চেয়ার একটি টেবিল উঁচুমতো। চেয়ার একটা ডানদিকে মুখ করা। অন্যটি দর্শকদের দিকে। মঞ্চের পেছনে ব্যাক স্ক্রিন। টানটান করে লাগানো। পেছন থেকে আলো ফেলার ব্যবস্থা থাকবে।

প্রথম দৃশ্য

পার্টিশন প্রায় লম্বালম্বি করে মেলে ধরা যাতে প্ল্যাটফর্ম অর্থাৎ দু’তলা ঢাকা পড়ে। কাগজের কাট আউট বা হাতে-আঁকা বই-পুস্তকের ডিজাইন পার্টিশনের প্রথম অংশ (ডান থেকে) টাঙ্গিয়ে দিতে হবে। ডিভ্যানের সঙ্গের আসনেই ইফতেখার। পাশেই কাগজপত্রহাতে শওকৎ। অন্যরা ডিভ্যানে বা বাড়তি আসনে।

স্টেজের সর্ববাম দিক (যেখানে চেয়ার-টেবিল রাখা) প্রায় অন্ধকার। ব্যাক স্ক্রিনে সকালবেলার উপযোগী ঈষৎ হলুদ-নীলাভ আলো ব্যবহার করা যেতে পারে।

ইফতেখার        :         (চোখ না তুলে, ফাইলে কলম বুলিয়ে) সব ফিক্সড্ ডিপোজিটে রেখেছ?

শওকৎ  :         না স্যার, শুধু ওই টাকাটা। বাকি কারেন্ট অ্যাকাউন্টে। এখানে একটা, আর এখানে Ñ

           ইফতেখার সই করতে থাকে।

ইফতেখার        :         অত চেক কেন?

শওকৎ  :         সামনে তিনদিন ছুটি। সোমবারের মধ্যেই পেমেন্ট করতে হবে।

ইফতেখার        :         এসব অফিসে করিয়ে নিলেই পারতে।

শওকৎ  :         কাগজপত্র তৈরি ছিল না।

          হালিমের প্রবেশ।

ইফতেখার        :         (চোখ তুলে) হালিম সাহেব কী মনে করে। (শওকৎ চেকবই খুলে ধরে বসে থাকে) আসুন, আসুন। (হালিম বসে। এ-সময় ইফতেখারের অলক্ষে তালুকদার সঙ্গে তার ভাগ্নে হাসানকে নিয়ে ঢোকে।)

হালিম   :         এলাম স্যার। রোববার ছাড়া তো আর অন্য কোনোদিন ধরা যায় না।

তালুকদার         :         আপনিও অফিসে ব্যস্ত থাকেন।

ইফতেখার        :         (আবার চেক সই করতে থাকে) কে তালুকদার সাহেব? তা অবশ্যি ঠিকই বলেছেন! মানে, ঝামেলা কী একটা। এত কাজের প্রেশার। বাড়িটাই অফিস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তালুকদার         :         আমি অবশ্যি বেশিক্ষণ বসব না স্যার।

ইফতেখার        :         (চেক সই থামিয়ে) কিছু বলবেন?

তালুকদার         :         (সঙ্গের ছেলেটিকে দেখিয়ে) আপনাকে বলেছিলাম স্যার এ ছেলেটির কথা। আমার দূর সম্পর্কের ভাগ্নে (হাসানের প্রতি) কিছু আদব-কায়দা শেখ। সালাম কর (হাসান যন্ত্রচালিতের মতো উঠে দাঁড়িয়ে পা ধরে সালাম করে। তারপর বসে পড়ে।) মোটামুটি যে-কাজে দেবেন ঠিক পেরে যাবে।

ইফতেখার        :         (হঠাৎ কলম তুলে নিয়ে) তার মানে?

শওকৎ  :         (বুঝতে না পেরে) জি, স্যার –

ইফতেখার        :         সাড়ে বারো পারসেন্ট দিচ্ছ কী করে। তাহলে মার্জিন থাকছে কি?

শওকৎ  :         থাকছে স্যার। তবে আমরা আগে যা ক্যালকুলেট করেছিলাম তার চেয়ে কম।

ইফতেখার        :         দেখ আমাদের কনসালট্যান্সি ফার্ম – এক পারসেন্ট এদিক-সেদিক হলে বিজনেস হবে কী দিয়ে। (আবার ফাইল দেখে) এ ফিগার ‘কোট’ করতে বলল কে। না, তোমাকে দিয়ে হবে না।

শওকৎ  :         এ ফিগার আপনি ‘কোট’ করতে বলেছিলেন।

ইফতেখার        :         আমি – আমি বলেছিলাম। মিথ্যে কথা।

শওকৎ  :         (আহত বোধ করে) মিথ্যে বলতে যাব কেন?

ইফতেখার        :         মিথ্যে বলো না?

শওকৎ  :         কখনো কখনো বলি না, তা নয়। তবে আপনার সঙ্গে কখনো বলেছি, মনে পড়ে না।

ইফতেখার        :         আবার তর্ক! নিজের অপরাধ স্বীকার করবে না। (ফাইল বন্ধ করে সজোরে টেবিলে নিক্ষেপ করে) কী, কিছু বলছ না কেন, গবেটের মতো দাঁড়িয়ে।

শওকৎ  :         কী বলব স্যার। চাকরি করতে গেলে সব সইতে হয়।

ইফতেখার        :         মানে?

শওকৎ  :         কোথায় স্যার – রোববারে নিজের কাজকর্ম ছেড়ে ছুটে এলাম – উলটো অন্যের দোষে গালমন্দ শুনছি। কিছু একটা জোগাড় করতে পারলে চলে যেতাম।

ইফতেখার        :         চলে যেতে বলল কে?

শওকৎ  :         না, যাব বললেই যেতে পারছি কই? মাঝে মাঝে ভাবি ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে হলো কী।

ইফতেখার        :         ইংরেজিতে অনার্স ছিল?

তালুকদার         :         (হাসানের প্রতি ইঙ্গিত করে) যার কথা আপনাকে বলেছিলাম স্যার, আমার ভাগ্নে হাসান। তারও স্যোসিওলজিতে অনার্স ছিল।

হাসান উঠে দাঁড়ায়।

ইফতেখার        :         (হাত নেড়ে হাসানকে বসতে বলে) তাই নাকি?

তালুকদার         :         সার্টিফিকেট সঙ্গে নিয়ে এসেছি। যদি বলেন দেখাই –

ইফতেখার        :         না থাক। (শওকৎকে) ইংরেজিতে অনার্স ছিল?

শওকৎ  :         (খানিকটা গর্ববোধ করে) হাই সেকেন্ড ক্লাস।

ইফতেখার        :         তাই নাকি। আগে তো কখনো বলনি। জানো, লিটারেচারে আমার শখ ছিল। একসময় কবিতাও লিখতাম।

শওকৎ  :         আমি এখনো লিখি।

হালিম   :         তাহলে তো আপনার এডুকেশন লাইনে যাওয়া উচিত ছিল।    (এ-মন্তব্যের প্রতি কেউ ভ্রƒক্ষেপ করে না। তালুকদার অগত্যা খবরের কাগজ খুলে ধরে)

ইফতেখার        :         (আবার ফাইলে মনোসংযোগ করে) এগুলো?

শওকৎ  :         এগুলো আগের রেফারেন্স স্যার।

ইফতেখার টেলিফোন ধরেও রেখে দেয়। এসময় টিনের বিবর্ণ সুটকেস হাতে একটি যুবকের প্রবেশ। বয়েস বাইশের কাছাকাছি। বোঝা যায় শহরে নতুন। পোশাক-আশাকে দৈন্য লক্ষণীয়। কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে চারদিকে তাকায়। সুটকেস নাবিয়ে রাখে।

হালিম   :         কাকে চাই?

আনওয়ার         :         মানে এটা কি ইফতেখার মাহমুদ সাহেবের Ñ

ইফতেখার চোখ তুলে তাকায় মুহূর্তের জন্যে। কিছু বলে না। ফাইলে মনোনিবেশ করে। শওকৎ একটা চেয়ার নিয়ে পাশে এসে বসে এবং প্রয়োজনীয় বিষয়াদি বোঝাতে থাকে।

তালুকদার         :         এ যে দেখছি একেবারে সুটকেস হাতে। বিছানা আননি? লোটা কম্বল?

অভ্যাগতদের দু-চারজন সরবে হেসে ওঠে। ইফতেখার ভাবান্তরহীন Ñ

হালিম   :         এসেছ কার কাছে সেটা তো বলবে Ñ

আনওয়ার         :         ইফতেখার সাহেব আমার আত্মীয় হন।

তালুকদার         :         (রসিকতা করে) ও, তাই নাকি। কেমন আত্মীয়?

আনওয়ার কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে। চারদিক তাকিয়ে নিয়ে তালুকদারকে ইফতেখার বলে ভুল করে এবং পা ধরে সালাম করতে যায়।

আনওয়ার         :         আপনি আমাদের আত্মীয় হন। বাবা সঙ্গে চিঠি দিয়েছেন।

তালুকদার         :         না বাবা, আমি তোমাকে চিনি না শুনি না। আমি কারও          আত্মীয়-টাত্মীয় নই।

হালিম   :         আপনিও তো আচ্ছা লোক। আপনি যাকে খুঁজছেন (ইফতেখারের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে) ওই যে। স্যারকে বলুন। (আনওয়ার সেদিকে এগুতে যায়। হালিম নিরস্ত করে) আহা, বললাম বলে কি ঝাঁপ দিয়ে পড়বেন? দেখছেন না কাজ করছেন।

ইফতেখার চোখ তোলে। কোনো ভাবান্তর লক্ষ করা যায় না। এসময় বাড়ির চাকর কাসেম আলী ট্রেতে চা সাজিয়ে নিয়ে আসে এক এক করে সবাইকে দেয়। আনওয়ারকে একনজর দেখে চা না দেয়াই সংগত মনে করে। আনওয়ার অস্বস্তির সঙ্গে বসে পড়ে।

তালুকদার         :         কই হে, একটু চিনি দাও।

                   আজকাল লিকারটা একটু হালকা মনে হচ্ছে না কাসেম আলী। বলি স্পেশ্যাল চা-টাই বানাও? না Ñ

কাসেম আলী     :         ইস্পেশাল চা।

হালিম   :         তাও ভালো।

ইফতেখার        :         (ফাইল দেখে শওকৎকে) না না, এটা কেমন করে হয়। বললেই লিখে দেবে। তোমার কমনসেন্স নেই। (জোরে ফাইল রেখে দিয়ে) কেন, হোয়াই? (আনওয়ার লাফিয়ে ওঠে।)

তালুকদার         :         (আনওয়ারকে নিরস্ত করে) আরে বাপু তোমাকে নয়। তুমি অত দাপাদাপি করছ কেন।

শওকৎ  :         আমি বোর্ডের ডিসিশন অনুযায়ী করেছি।

ইফতেখার        :         তোমার ঠিক মনে হয়েছিল?

শওকৎ  :         না।

ইফতেখার        :         নিজের কনশাসের বিরুদ্ধে কাজ করবে তাই বলে?

শওকৎ  :         না করে কী উপায়। আমি তো অন্যদের হুকুমের গোলাম।

                   এসময় শওকৎ উঠে গিয়ে আনওয়ারের পাশে বসে। কপালের ঘাম মোছে। আনওয়ার তাকে কাছে দেখতে পেয়ে পকেটের চিঠিখানা বার করে দেখায়। এ-সময় ইফতেখার টেলিফোনে একটা নম্বর চেষ্টা করতে থাকে। বোঝা যায় নম্বরটা এনগেজ্ড।

আনওয়ার         :         (চিঠি দেখিয়ে) বলব?

শওকৎ  :         বলুন। নিজের কথা নিজে সাহস করে বলুন। (ইফতেখার টেলিফোন নিয়ে অতিশয় ব্যস্ত সেটা লক্ষ করে একটু চাপা গলায়) আমার কথাই ধরুন না। নিজের কথা সাহস করে বলতে পারিনি বলে এত বছর এখানে পড়ে Ñ

আনওয়ার         :         আসলে উনি আমাদের আত্মীয়।

শওকৎ  :         (চাপা অথচ জোর গলায়) সে কথা তাঁকে বলুন।

আনওয়ার         :         কী বলে ডাকব?

শওকৎ  :         আমরা তো সবাই ‘স্যার’ বলেই ডাকি।

আনওয়ার উঠে দাঁড়ায়।

আনওয়ার         :         (শওকৎকে) বলব? (এবার ইফতেখারকে) স্যার, আমি আপনার আত্মীয়ই হই।

ইফতেখার হাত নেড়ে আনওারকে বসতে বলে। আনওয়ার চোখ নিচু করে বসে পড়ে।

তালুকদার         :         স্যার, আমার এই ভাগ্নে হাসানের কথা বলেছিলাম। একবার অ্যাপ্রেন্টিস অফিসার করে নিলে কাজ ঠিক বুঝে নেবে।

ইফতেখার        :         চট্ করে তো কিছু বলা যাবে না। দেখি।

তালুকদার         :         আমার মনে হয় স্যার, আপনি নিজে বললে কেউ ফেলতে পারবে না। একবার পাঠিয়ে দিই নেক্সট উইকে? (হাসানকে)

                   এই বলো না, নিজের কথা নিজে বলো Ñ

আনওয়ার         :         (কথাটি তাকে লক্ষ করে বলা হয়েছে মনে করে) বলে দেখব? বলব?

শওকৎ  :         নিশ্চয়ই বলবেন। আলবৎ বলবেন।

পাশে রাখা পত্রিকাখানা তুলে নিয়ে ইফতেখার ওখানা মেলে ধরে। শওকৎ ফাইল গুছিয়ে চলে যাবার উদ্যোগ করে। যাবার আগে আনওয়ারকে ইঙ্গিতে ইফতেখারের কথা বলে দিয়ে যায়। ভাবখানা : এই সুযোগ। এই বেলা যা বলার বলে ফেল।

তালুকদার         :         তাহলে আজ উঠি স্যার।

ইফতেখার মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

হালিম   :         (তালুকদারের দিকে চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে) স্যার আজ ভয়ানক ব্যস্ত। আমি বরং (ওঠার উপক্রম করে) – তালুকদার সাহেব আপনি তো ওদিক দিয়েই যাবেন। চলুন –

তালুকদার         :         চলুন। তা স্যার ব্যাপারটা একটু দেখবেন। (হাসানের প্রতি) এই হতভাগা আয় –

ইফতেখার খবরের কাগজে মনোনিবেশ করে। শুধু একবার চোখ তুলে তাকায়। কিছু বলে না। তালুকদার হাসানকে নিয়ে চলে যায়। হাসান প্রথম ইতস্তত করে। তারপর সেও চলে যায়।

আনওয়ার         :         স্যার!

                   (ইফতেখার কাগজের ভাঁজ পালটায়। প্রতিক্রিয়া শূন্য) স্যার, আমি আপনার আতœীয়ই হই। আমি চর কাসিমপুর গ্রামের হাজিপাড়ার বাদশা মিয়ার ছেলে। বাবা বলেন, আপনি সম্পর্কে আমাদের Ñ

ইফতেখার        :         (কাগজ ভাঁজ করে রাখে। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে আনওয়ারের দিকে। তারপর টেবিলে করাঘাত করে কাকে ডাকে) কে আছিস?

কাসেম আলীর প্রবেশ।

কাসেম  :         হুজুর Ñ

ইফতেখার        :         (আনওয়ারের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে) এক কাপ চা।

                   আনওয়ার কিছু করার খুঁজে পায় না। পায়ের দিকে তাকায়। জুতোর ফিতের দিকে দৃষ্টি দেয়। ফিতে টাইট করতে থাকে। ইফতেখার আড় ভাঙে। জানালার কাছে যায়। বাইরে তাকায়। তারপর স্বস্থানে ফিরে আসে। চা আসে। ইফতেখারের সামনে রাখা হলে হাত নেড়ে আনওয়ারকে দিতে বলে। কাসেম আলী টি-পয় তুলে এনে আনওয়ারের সামনে চা হাজির করে।

আনওয়ার         :         বাবা একটা চিঠি দিয়েছিলেন। পড়ি? লিখেছেন Ñ লিখেছেন (খাম ছিঁড়তে অসুবিধে হওয়ায়) ভালো করে লাগায়নি কিনা স্যার। এই যে, এই যে Ñ লিখেছেন, আমি পড়ছি Ñ পাক জনাবেষু, হাজার হাজার সালামবাদ আরজ এই যে আপনার স্মরণ থাকিতে পারে যে, চরকাসিমপুরের হাজিপাড়ার বাদশা মিঞা আপানার আত্মীয়-বিশেষ। আপনার বেহশত-নসিব পিতা আমাকে বাল্যকালে সবিশেষ আদর করিতেন। আজ অভাবে-অনটনে নিজের পরিচয় দিতে পারি না। বিগত বন্যায় সর্বস্ব হারাইয়া আজ আমরা পথে বসিবার উপক্রম। নিরুপায় হইয়া আমার পুত্র মহম্মদ আনওয়ার আহমদকে আপনার নিকট পাঠাইলাম। তাহার কলেজের খরচ চালাইব এমন সাধ্য নাই। আমি. আমি Ñ

ইফতেখার        :         আগে চা খাও, তারপর পড়।

আনওয়ার         :         জি –

ইফতেখার        :         আগে চা খাও।

(আনওয়ার চা খায়। হাতের কনুই দিয়ে মুখ মুছে নিয়ে চিঠিটা খুলে ধরে সম্মতির আশায়) পড়।

আনওয়ার         :         আজ নিরুপায় হইয়া আমার পুত্র Ñ এটা তো পড়েছি Ñ হ্যাঁ Ñ তাহার পড়ার খরচ চালাইব এমন সাধ্য নাই। নিজ পুত্রজ্ঞান করিয়া যদি তাহার লেখারপড়ার কোনোরূপ সুবন্দোবস্ত হয় এই আশায় আনু মিয়াকে (ইফতেখারের দিকে তাকিয়ে নিয়ে) আনু মিয়া মানে, ওটা আমার ডাক নাম স্যার Ñ এই আশায় আনু মিয়াকে আপনার হেফাজতে পাঠাইতেছি। বিশেষ আর কী লিখিব। আল্লাহর রহমতে কোনো প্রকারে দিন গুজরান হইতেছে। আমি, আমি –

                   (আলো স্মিমিত হয়)

দ্বিতীয় দৃশ্য

পার্টিশনের সর্ব ডানদিকের অংশ গুটিয়ে এমন করে রাখতে হবে যে, প্ল্যাটফর্ম (অর্থাৎ দোতলার বারান্দা) এবং সিঁড়ি দুষ্টিগোচর হয়। আনওয়ার ডিভ্যানে বসে আয়নার সামনে চুল আঁচড়াতে থাকে। সামনেই টিনের বাক্স। ওপরতলার বারান্দায় বেবীর আবির্ভাব।

বেবী     :         নিচের ঘরে কে?

                   (কোনো সাড়া নেই)

                   বা রে, কোনো কথা বলছে না কেন। এ্যাই।

                   (আনওয়ার উঠে দাঁড়ায়। এদিক-ওদিক চাওয়া-চাওয়ি করে। কাউকে দেখতে না পেয়ে আবার বসে পড়ে।) এ্যাই তুমি বোবা নাকি? (বল ছুড়ে মারে) দাও, দাও। (আনওয়ার না বুঝে মৃদু হাসার চেষ্টা করে। অন্যদিকে তাকায়।)

                   ওদিকে দেখছ কী। এদিকে দেখ।

                   (আনওয়ার বেবীকে দেখতে পায়। বেবী নিচে নেবে আসে।)

                   তুমি কে?

আনওয়ার         :         আমি।

বেবী     :         ‘আমি’, ‘আমি’ কে। ‘আমি’ কারও নাম হয় না কি?

আনওয়ার         :         আমি চরকাসিমপুর থেকে এসেছি।

বেবী     :         সেটা কোথায়?

আনওয়ার         :         ঈশ্বরদী থেকে ট্রেনে গেলে Ñ

বেবী     :         ট্রেনে গেলে! ট্রেনে যাচ্ছে কে তোমাদের ওখানে। তোমাকে জানি না শুনি না। (খানিকক্ষণ থেমে) এ্যাই তোমার নাম নেই? বলছ না কেন?

আনওয়ার         :         সবাই আনু বলে ডাকে।

বেবী     :         আনু! আনু একটা নাম হলো নাকি?

আনওয়ার         :         ভালো নাম মোহাম্মদ আনওয়ার আহমদ।

বেবী     :         বলতে গেলে কী?

আনওয়ার         :         (প্রায় এক নিশ্বাসে) আমি আত্মীয় হই।

বেবী     :         কার?

আনওয়ার         :         তোমাদের।

বেবীর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হয়। আনওয়ার চোখ নাবিয়ে নেয়। দূরের চেয়ারে অত্যন্ত জড়োসড়ো হয়ে বসে।

বেবী     :         তুমি, তুমি! তুমি বলছ কেন? (চিৎকার) মা, মা Ñ মা Ñ

                   (কেউ সাড়া দেয় না)

আনওয়ার         :         ‘আপনি’ বলব?

বেবী     :         বলবে না? বাড়িসুদ্ধ সবাই বলে।

                   হতে পারো। এ বাড়ির আত্মীয় হতে পারো। আমার নও। জানি না, নামও শুনিনি কোনোদিন। (ডাকে) শোনো শোনো Ñ

আনওয়ার         :         জি –

আনওয়ার এবার বেবীর কাছাকাছি এসে বসে।

বেবী     :         ইস তোমরা গরিব, না?

আনওয়ার         :         আগে আমাদের অবস্থা ভালো ছিল।

বেবী     :         এখন গরিব তো? এ্যাই ওদিকে সরে বসো। (মুখ ঘুরিয়ে)

                   উহ্, কী তেল মাখ মাথায়! ভালো তেল মাখতে পারো না? (আনওয়ার সরে যায়। টেবিলে বই ধরতে যায়) বই ধরছ কেন? এখানে বসে বসে কী করছিলে?

আনওয়ার বই রেখে দেয়।

আনওয়ার         :         মাথা আঁচড়াচ্ছিলাম।

বেবী     :         (ঘুরে ঘুরে দেখে) টেরিও কাট দেখছি।

                   বেবীর হঠাৎ মনে হয় আনওয়ার ওর খুবই কাছে এসে সোফায় বসে পড়েছে। এটা মনঃপুত হয় না) আরে আরে, এখানে বসেছ যে।

আনওয়ার         :         বসব না?

বেবী     :         কেন বসবে? না, আলবৎ বসবে না আমার চেয়ারে।

আনওয়ার         :         (দাঁড়িয়ে পড়ে) ঠিক আছে।

বেবী     :         (একসঙ্গে জোরে কয়েকবার ওর নাম ধরে ডাকে) আনু, আনু, আনু Ñ আনু Ñ

আনওয়ার         :         জি Ñ

বেবী     :         এমনি। ডেকে দেখলাম। বসো বসো।

                   (আনওয়ার দূরে সরে বসতে চায়। বেবী তাকে আগের জায়গায় বসতে বলে।)

                   বসো বসো, এখানেই বসো।

                   (আনওয়ার বসে)

                   আমাদের একটা সার্ভেন্ট ছিল। দেখি, দেখি মুখটা ঘোরাও তো। (আনওয়ার মুখ ঘোরায়) না না, ওর মতো না। আমাদের না একটা দারোয়ান ছিল। কতকটা তোমার মতো। না অত কালো নয়। ও-না ভারী হাসাতে পারত। (কী মনে করে আপাদমস্তক দেখে নেয়।) এই দাঁড়াও, দাঁড়াও তো। জুতোর ফিতে বাঁধনি কেন?

আনওয়ার         :         (জুতোর ফিতে টাইট করে) মানে ছিঁড়ে গেছে কিনা – (বেবী খানিকক্ষণ পায়চারি করে। তারপর শেল্ফ থেকে পিংপংয়ের একটা ব্যাট তুলে নেয়। নিজের হাতেই তা দিয়ে তুমুল জোরে চাপড় দেয়। আনওয়ার চমকে ওঠে) এই, তুমি খেলতে পারো, পিংপং?

আনওয়ার         :         (মাথা নাড়ে)

বেবী     :         ক্যারম?

আনওয়ার         :         (মাথা নাড়ে)

বেবী     :         লুডো, বাগাডোলে?

                   (আনওয়ার মাথা নাড়ে। বেবি আরেকবার ব্যাট দিয়ে নিজের হাতে চাপড় দেয় Ñ সজোরে)

                   কী পারো, ঘণ্টা?

আনওয়ার         :         আমি Ñ আমি (আঙুল গুনতে থাকে) ডা-গুলি, কবাটি, ছক্কা খেলতে পারি।

বেবী     :         এ্যাই, এ্যাই Ñ

আনওয়ার         :         (তটস্থ হয়ে) জি –

বেবী     :         (বল তুলে নিয়ে ওর দিকে ছুড়ে মারে) ধর, ধর তো।

                   (ছুটোছুটি করতে থাকে বেবী। আনওয়ার একবার চেষ্টা করে আনাড়ির মতো, পারে না।) পারলে না তো? দূর তুমি কোনো কাজের না (বেবী পড়ে যায়)।

আনওয়ার         :         পা মচকে যায়নি তো?

বেবী     :         (অধৈর্য চিৎকার) উহ্ ব্যথা, ব্যথা – মা গো।

আনওয়ার         :         (কিংকর্তব্যবিমূঢ়) কাউকে ডাকব?

বেবী     :         (কাঁদো কাঁদো সুরে) ডাকবে কেন, তোমার হাত নেই?

আনওয়ার         :         (নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে) আমার হাত ময়লা কিনা। ট্রেন জার্নি করে এসেছি।

বেবী     :         (কতকটা মায়াকান্নার ভঙ্গিতে) আমাকে ধর। এ্যাই ধর, ধর। (আনওয়ারকে তুলতে চেষ্টা করে) গায়ে জোর নেই? কী মানুষ বাবা। উলটো তুমি হ্যাঁচকা টান দিলে কেন? (বেবী হাত ছাড়িয়ে নেয়) উহ্ মা গো।

আনওয়ার         :         না, মানে হঠাৎ হয়ে গেছে।

বেবী     :         (তখনো মাটিতে বসে) হঠাৎ হবে কেন। কেন, কেন, কেন?

ওপরতলা থেকে ইফতেখারের স্ত্রী সকিনা বানুর প্রবেশ।

সকিনা   :         ওমা, একি? তুই মাটিতে!

বেবী     :         (মায়াকান্নার সুরে টেনে টেনে বলে) ব্যথা দিয়েছে। (প্রথমে হাত নিজের পায়ে বুলোতে থাকে। তারপর আঙুল ঘোরাতে ঘোরাতে আনওয়ারের দিকে নির্দেশ করে) ওই যে।

আনওয়ার         :         (অপ্রতিভ) আমি! কখন?

সকিনা   :         বাড়িতে পা পড়তে না পড়তেই! (সকিনা নিচু হয়ে বেবীর ব্যথার জায়গা দেখার চেষ্টা করে) তখনই বলেছিলাম, জানা নেই শোনা নেই, সাতকুলে নাম শুনিনি, এসব আপদ বাড়িতে এনো না। কার কথা কে শোনে।

আনওয়ার         :         (আত্মপক্ষ সমর্থনের ব্যর্থ চেষ্টায়) আপনি বিশ্বাস করুন।

সকিনা   :         যাও, কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করো না তো।

বেবী     :         (হঠাৎ কণ্ঠস্বর নাবিয়ে নিচু গলায়) না না। নিজেই পড়ে গিয়েছিলাম। (হঠাৎ কী মনে করে দুষ্টুমির ভঙ্গিতে) মা, ও হাসছে কেন?

আনওয়ার         :         আমি হাসলাম কই?

বেবী     :         না হাসলে ভালো করেছ। কানতে পারো না? ব্যথা পেলাম। (মুখ ভেংচিয়ে আনওয়ারের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে) আবার বলছে আত্মীয় Ñ ‘আত্মীয় Ñ ’আমি তোমাদের আত্মীয় হই’। এমন আত্মীয় আমার Ñ চাই না। ঘোড়ার ডিমের আত্মীয়।

অ্যান্টিসেপ্টিকের শিশি ও তুলো হাতে সকিনার প্রবেশ।

সকিনা   :         (আনোয়ারকে) হাঁ করে দেখছ কী। (ওষুধের শিশি তুলে দিয়ে) এটা ধর। নাম কী?

আনওয়ার         :         জি, আনু।

সকিনা   :         (বেবীর ব্যথার জায়গায় ওষুধ লাগাতে থাকে) লাগছে? কেটেও গেছে দেখছি।

আনওয়ার         :         (সকিনাকে) আমি আপনাদের একরকম আত্মীয়।

সকিনা   :         জানি, জানি। আর, আত্মীয়-আত্মীয় বলতে হবে না। সাতজন্মে দেখিনি Ñ এখন হয়ে গেল আত্মীয়। গরজের নাম বাবাজি। শার্ট বদলাও না?

আনওয়ার         :         মানে জার্নি করে এলাম কিনা। বিকেলে ধুয়ে দেব।

সকিনা   :         আর শার্ট নেই?

আনওয়ার         :         না, মানে –

সকিনা   :         কতদিন থাকবে?

পায়ের ওপর তুলো চেপে ধরে।

আনওয়ার         :         ম্যাট্রিক পাশ করেছি। ইচ্ছে, কলেজে ভর্তি হব।

সকিনা   :         তাহলে তো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। কলেজ, কলেজ করে হবে কী? পাশ করে চাকরি করবে? কেন দেশে কাজ জোটাতে পারলে না?

আনওয়ার         :         বাবা বললেন – অবশ্যি আপনি যদি বলেন।

সকিনা   :         না বাবা, আমি আবার কী বলতে কী বলব। এসেছ যখন থাক। খাও। পড়াশুনো যে কী হবে তা তো জানা আছে। (বেবীকে) কই ব্যথা পাচ্ছিস?

                   (আনওয়ারকে) আমি পারি না। একটু জোরে টান তো। (আনওয়ার পায়ের পাতা ধরে ঝাঁকুনি দেয়।)

বেবী     :         (চিৎকার) মা গো!

সকিনা   :         থাক থাক। তোমার আর কাজ নেই। (নিজেই টেনে তোলার চেষ্টা করে) কই ওঠ। (বেবী ওঠে না)

বেবী     :         (আনওয়ারকে) ও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী করে। ধরতে পারে না?

আনওয়ার         :         (অপ্রস্তুত হয়ে) আমাকে বললে – আমি

                   (বেবী আনওয়ারের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়)

বেবী     :         তোল। উহ্ – উহ্।

                   (আনওয়ার টেনে তোলে। সকিনা বিরক্ত হয়ে দেখে শিশি তুলে নেয়)

                   (হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে) এখন ব্যথা নেই।

সকিনা   :         এই যে একটু আগে বললি ব্যথা।

বেবী     :         তখন বলেছি, বলেছি।

                   (সকিনার প্রস্থান। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে থাকে। আনওয়ারকে লক্ষ করে) এ্যাই ধরো না, ধরো। আমি পড়ে যাব।

                   (আনওয়ার হাত বাড়ায়। বেবী সরে যায়। হঠাৎ দুহাতে মাথা চেপে ধরে বেবী) মা গো –

আনওয়ার         :         কী হলো?

বেবী     :         কী হবে আবার। ব্যথা, ব্যথা বোঝ না?

আনওয়ার         :         হঠাৎ মাথায় ব্যথা?

বেবী     :         হঠাৎ! হঠাৎ কে বলল। (গলা নাবিয়ে) প্রায়ই হয়।

আনওয়ার         :         আমাকে আগে তো বলনি।

বেবী     :         ইস্, কী আমার দরদিরে। সব ওকে বলতে হবে।

                   (নকল রাগের ভান করে মাথা চেপে ধরে মার্চ করার ভঙ্গিতে বেরিয়ে যায়। আলো স্তিমিত হয়।)

তৃতীয় দৃশ্য

বাঁ-দিকের টেবিলে আনওয়ারকে পড়তে দেখা যাবে। এ-সময় ডানদিকের অংশ কিছুটা অন্ধকার। পার্টিশনের সর্ব ডানদিকের অংশের ডিজাইনটি বদলে যাবে। মূল্যবান সামগ্রী রাখা কাটআউট বা ডিজাইন লাগানো হবে এবার। অ্যাকশন গোড়ায় টেবিলের ধারে কাছে। ইফতেখার, বেবী, শওকৎ প্রমুখের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত স্টেজে অ্যাকশন বিস্তৃত হবে এবং ডানদিকের অংশ আলোকিত হবে।

সকিনা   :         একেবারে দু-দুুুটো বাতি জ্বলছে। কেন, একটাতে হয় না?

সুইচের কাছে এসে নিবিয়ে দেয়।

আনওয়ার         :         একটু অসুবিধে হচ্ছিল দেখতে। কলেজের কিছু হোম-ওয়ার্ক ছিল।

সকিনা   :         (নিরাপদ দূরত্বে চেয়ার টেনে বসে) বিকেলে এসে করলেই পার। লাইট জ্বালিয়েছ সেজন্যে নয়। বেশি আলোতে কাজ করা এমনিতেও ভালো নয়।

আনওয়ার         :         (কাগজপত্র গুটিয়ে রাখতে যায়) তাহলে থাক।

সকিনা   :         কী?

আনওয়ার         :         কাল করব।

সকিনা   :         পড়তে না করল কে? পরে বলবে আপনার জন্যে ফেল করে গেলাম। লেখাপড়া করো আপত্তি করি না। তা তুমি দেখছি তারেকের ঘরটা দখল করে বসলে। এখানেই পড়বে নাকি?

আনওয়ার         :         আপনি যা বলেন। তাহলে বরং ড্রয়িংরুমে গিয়ে পড়ি।

সকিনা   :         না না, যেখানে আছ সেখানেই থাক। খামোকা হাসাহাসি হবে। সেখানে কে কখন এসে পড়ে ঠিক নেই। (সকিনার প্রস্থান। আনওয়ার পড়াশুনোয় মন দেয়। পেছন থেকে ইফতেখার এসে ঢোকে।)

ইফতেখার        :         পড়াশুনো করছ?

আনওয়ার         :         (আঁতকে ওঠে) জি –

ইফতেখার        :         মন দিয়ে পড়ো তো?

আনওয়ার         :         (দাঁড়িয়ে যায়) চেষ্টা করি –

ইফতেখার        :         চেষ্টা করলেই হলো। কিন্তু তোমাকে আজকাল সন্ধেবেলা দেখি না কেন। কোচিং ক্লাসে যাও নাকি?

আনওয়ার         :         না, মানে –

ইফতেখার        :         তাহলে আড্ডা দিচ্ছ?

আনওয়ার         :         না, বিশ্বাস করুন (আমতা আমতা করে বলে) বিকেলে Ñ বিকেলে একটা ছোটখাট ট্যুশানি করি।

ইফতেখার        :         ট্যুইশানি কর! ট্যুইশনির কী দরকার?

আনওয়ার         :         মানে একটু টাকা-পয়সার টানাটানি – আপনারা যথেষ্ট দিচ্ছেন, সেজন্য বলছি না –

ইফতেখার        :         তা তোমার অসুবিধে হচ্ছে বললেই পারতে। কলেজের মাইনে দিয়েছ?

আনওয়ার         :         দিয়েছি। শুধু গেল দুমাসের বাকি।

ইফতেখার        :         বাকি কেন?

আনওয়ার         :         দেশে কিছু টাকা পাঠাতে হলো।

ইফতেখার        :         আমাকে বললে না কেন?

আনওয়ার         :         সবসময়ই তো দিচ্ছেন। যখন যা দরকার পাচ্ছি। কোন কিছুর তো অসুবিধে নেই।

ইফতেখার        :         আমার একটা দায়িত্ব আছে। কাল আমার সঙ্গে দেখা করো। দেশের চিঠিপত্র পাও?

আনওয়ার         :         জি –

ইফতেখার        :         কী লিখেছে?

আনওয়ার         :         এবার ফসল ভালো হয়নি। নদীর ভাঙনে ধানি-জমি নষ্ট হয়েছে। বাবা আপনাকে সালাম জানিয়েছেন।

ইফতেখার        :         তা ওসব ভেবে আর কী হবে। পড়াশুনো করো ভালো করে। দেখ আমাদের সবাইকে যার যার কাজ করে যেতে হবে। তুমি এসেছ পড়তে। পয়সার ধান্ধায় থাকলে পড়বে কেমন করে?

আনওয়ার         :         ট্যুইশনি করলে আমার সুবিধে হয়।

ইফতেখার        :         সুবিধে হয়, করো। কিন্তু পড়াশুনোর ক্ষতি করে নয়। আমি থাকি হাজারো ঝামেলায়। দরকার হয় শওকৎকে বলতে পারো। কাল আমার সঙ্গে দেখা করো।

আনওয়ার বেরিয়ে যায়। একা দাঁড়িয়ে থাকে ইফতেখার। এসময় ফাইল হাতে এসে ঢোকে শওকৎ।

ইফতেখার        :         এই যে নাম করতেই এসে হাজির। আবার কী-

শওকৎ  :         হেড ক্লার্কের কেসটা –

ইফতেখার        :         ও, কেসটার কী?

শওকৎ  :         না, মানে স্যার একেবারে চাকরি থেকে না সরিয়ে-

ইফতেখার        :         সুপারিশ করতে এসেছ?

শওকৎ  :         স্যার, ওর বাড়িতে একগাদা ছেলেমেয়ে –

ইফতেখার        :         এতোই দরকার ছিল আমার কাছে চাইলেই পারত।

                   ক্যাশ ভাঙতে গেল কেন? উলটো আবার ওকালতি করতে এসেছ।

শওকৎ  :         ঠিক আছে স্যার। কাল সাসপেনশন অর্ডারটা ইস্যু করিয়ে দেব। চলি।

                   (যাবার উদ্যোগ করে)

ইফতেখার        :         শোন। অত দেমাক দেখাচ্ছ কেন? তুমি ইস্যু করার কে। কই, এনেছ?

শওকৎ কাগজখানা এগিয়ে দেয় ফাইলসুদ্ধ।

শওকৎ  :         হ্যাঁ স্যার। এই যে। আপনার একটা সই দরকার।

                   (ইফতেখার কী মনে করে কাগজখানা নিবিষ্টচিত্তে দেখে। তারপর ফাইল থেকে তুলে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে।)

                   (অভিভূত হয়ে) স্যার। ওদের গোটা পরিবার চিরজীবন আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে।

ইফতেখার        :         বাজে বকো না। কেউ কারও কাছে কৃতজ্ঞ থাকে না। (ইফতেখার সিগ্রেট বার করে মুখে দেয়। দেশলাই খোঁজ করে। পকেটে পায় না।) শওকৎ?

শওকৎ  :         স্যার।

ইফতেখার        :         দেশলাই।

শওকৎ পকেট হাতড়ে দেশলাই বার করে ইফতেখারের সিগ্রেটে অগ্নি-সংযোগ করতে যায় Ñ

                   তুমি কি সুখী? (প্রশ্নের আকস্মিকতায় শওকৎ স্তম্ভিত। জ্বলন্ত কাঠি হাতে অবচেনতের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।)

শওকৎ  :         (জ্বলন্ত কাঠি ফেলে দিয়ে) নিশ্চয়ই। নিশ্চয়ই।

আবার দেশলাই জ্বালিয়ে ইফতেখারের দিকে যায়। এবার অগ্নি-সংযোগ করতে পারে না। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

ইফতেখার        :         কোথায় জ্বালাচ্ছি? (এবার শওকৎ ঠিক ঠিক সিগ্রেটে আগুন ধরিয়ে দেয়। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে) মিথ্যুক কোথাকার।

শওকৎ আস্তে আস্তে বেরিয়ে যায়। ইফতেখার খানিকক্ষণ পায়চারি করে। নিঃশব্দে এসে ঢোকে আনওয়ার। ইফতেখার লক্ষ করে তাকে। কিছু বলে না। তারপর এক সময় ইফতেখারও বেরিয়ে যায়। আনওয়ার বই খুলে পড়তে বসে। পা টিপে টিপে এসে ঢোকে বেবী।

বেবী     :         আনু, আনু –

আনওয়ার         :         (থতমত খেয়ে) হ্যাঁ –

বেবী     :         (বই দেখিয়ে) আমাকে পড়াও না।

আনওয়ার         :         আমি পড়াব?

বেবী     :         কেন, তুমি তো পড়াও। রীতাদের বাড়িতে যাও, তা যেন আমি জানি না?

আনওয়ার         :         দুর, ও তো ট্যুইশনির জন্যে।

বেবী     :         ও তোমাকে নারকেলের নাড়ু খাওয়ায়নি?

আনওয়ার         :         সে তো গেল মঙ্গলবার।

বেবী     :         সেদিন যে জিলিপি আনালো।

আনওয়ার         :         আনালোই বা এক-আধদিন। তুমি জানো কী করে?

বেবী     :         আমি জানি। আমি সব জানি। ওই যে হ্যাংলা মেয়েটা ধিঙ্গিমতো। কেমন ঘুরে ঘুরে তাকায়। ন্যাকা কোথাকার!

আনওয়ার         :         আমি অত ভালো করে দেখিনি।

বেবী     :         তা দেখবে কেমন করে। সামনের তিনটে দাঁত নেই।

আনওয়ার         :         দাঁত নেই মানে – দিব্যি দাঁত আছে।

বেবী     :         তবে যে বললে ভালো করে দেখনি। খুব ভালো করে দেখেছ। জানো, ওর ঠোঁটে একটা তিল আছে।

আনওয়ার         :         তা থাকতে পারে। অত কাছ থেকে দেখিনি।

বেবী     :         মিথ্যুক কোথাকার।

আনওয়ার         :         এই শোন, বেবী –

বেবী     :         আমাকে নাম ধরে ডাকলে কেন?

আনওয়ার         :         হঠাৎ এসে গেল।

বেবী     :         হঠাৎ এসে যাবে কেন? আমার তো আসে না।

আনওয়ার         :         তাহলে কী বলে ডাকব?

বেবী     :         কিচ্ছু বলে ডাকবে না। তোমার ডাকার দরকারটা কী? ডাকো না ওকে Ñ রীতা, রীতু, রীতুমণি বলে। আমাকে কিচ্ছু ডাকবে না।

                   (সকিনার প্রবেশ)

সকিনা   :         ডাকাডাকির আবার কী হলো?

বেবী     :         (আনওয়ারের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে তাকে চটাবার মানসে) আমাকে নাম ধরে ডাকছিল। এমনিতেও যখন যা মুখে আসে বলে।

সকিনা   :         সত্যি বলছিস? তোমার আচ্ছা আস্পর্ধা।

আনওয়ার         :         বিশ্বাস করুন, কিচ্ছু বলিনি।

সকিনা   :         না, বলোনি। যুধিষ্ঠির। লোকজন বেছে বেছে তোমার পেছনে লাগে কিনা। এই পোড়ামুখী, চুপ করে কেন, বলো না।

বেবী     :         (আবার আনওয়ারের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে) Ñ বলব?

সকিনা   :         হ্যাঁ।

বেবী     :         বলল, বেবী তুমি একটা খারাপ মেয়ে। তুমি দেখতে কালো। ছুঁচোর মতো।

সকিনা   :         তোর সামনে বলল, আর তুই শুনে গেলি!

আনওয়ার         :         আশ্চর্য, আমি –

                   (বলার সুযোগ পায় না।)

বেবী     :         আরও কত কী – আমার নাকি সামনের দুটো দাঁত নেই। আমার চোখ দুটো নাকি ইঁদুরের মতো।

সকিনা   :         তুই হাঁ করে শুনলি।

বেবী     :         (কৌতুকের ভঙ্গিতে আনওয়ারের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে) তবে আর কী করব। যদিও রাগ হচ্ছিল।

আনওয়ার         :         দেখুন আমি এসব কিচ্ছুই –

সকিনা   :         থাম। তোমাকে পষ্টাপষ্টি একটা কথা বলি। এ বাড়িতে থাকছ, খাচ্ছ-দাচ্ছ আপত্তি নেই। কিন্তু আর কারো ব্যাপারে নাক গলাতে এসো না, বুঝেছ?

আনওয়ার         :         ও-ই তো আমার সঙ্গে কথা বলতে এলো।

সকিনা   :         কেমনতর লোক তুমি। ‘ও-ই’ মানে কী? ওর একটা নাম নেই?

আনওয়ার         :         নাম বলতে না করেছে।

সকিনা   :         কে?

আনওয়ার         :         (বেবীকে দেখিয়ে) জিজ্ঞেস করুন।

বেবী     :         আচ্ছা মা, আমি না করতে পারি? তুমি আমাকে বেবী, ববি, বুবি, যখন যা খুশি ডাক Ñ কই আমি রাগ করি? কই ডেকে দেখুক না একবার?

সকিনা   :         না, অনেক হয়েছে। আর ডাকাডাকির দরকার নেই। আর আমি এটাও বুঝি না। (আনওয়ারের প্রতি) তোমার সঙ্গে ওর বয়সের পার্থক্যটা দেখতে হবে না? তুমি হলে বুড়ো ধাড়ি, আর ও এতটুকু দুধের বাচ্চা।

বেবী     :         আমি বললাম এমনি বসে আছ, পড়াটা বুঝিয়ে দাও –

সকিনা   :         তাহলেই হয়েছি আর লোক পেলি না। (প্রসঙ্গান্তর টেনে আনওয়ারকে লক্ষ করে) পড়াও, না পড়াও তোমার খুশি। তা তোমার একটা কা-জ্ঞান থাকা উচিত। কাল সারারাত বাথরুমের কলের শব্দে ঘুমোতে পারিনি।

আনওয়ার         :         আমি কল খুলিনি।

সকিনা   :         তাহলে খুলল কে। জিন-পরী এসে খুলে দিয়ে গেল?

বেবী     :         জানো না কি হয়েছিল?

সকিনা   :         কী?

বেবী     :         (চোখ বড় বড় করে) কাল রাতে দেখি কি জানো, ইয়া লম্বা এক জিন এসে ধড়াস করে বাথরুমের দরজা দিয়ে ঢুকল। তারপর গোঁৎ গোঁৎ করে পানি গিলে খেল। বলল, খবরদার কলের মুখ বন্ধ করো না। যতবার খুশি আসব।

সকিনা   :         তোর যতসব আজগুবি কথা।

বেবী     :         আমি নিজে দেখলাম।

সকিনা   :         কী আমার লক্ষ্মী মেয়ে, দেখে তুই ভয়ে কেঁদে উঠলি না?

বেবী     :         কেমন করে কাঁদব। আজব ব্যাপার, আয়নার সামনে গিয়ে দেখি জিনটা অবিকল আমার মতো। এখন বলো, নিজেকে দেখে নিজে ভয় পাওয়া যায়?

সকিনা   :         তাই বলো। তুই কাল খুলেছিলি। সে-কথা বললেই হতো। যতসব। দেখি রান্নাঘরে বোধহয় কী পুড়ছে।

                   সকিনার প্রস্থান।

বেবী     :         মিথ্যুক।

আনওয়ার         :         কে মিথ্যুক?

বেবী     :         আরে বাবা কেউ না। আমি, আমি – আমি একটা মস্তবড় মিথ্যুক। একজনকে বাঁচাতে গিয়ে রাজ্যের মিথ্যে বলে ফেললাম।

আনওয়ার         :         না বললেই পারতে। বলো কেন?

বেবী     :         বলি কেন Ñ কী জানি, কেন বলি। কেন বলি জানো?

আনওয়ার         :         (উৎকণ্ঠিত হয়ে) কেন?

বেবী     :         এমনি।

                   (আলো স্মিমিত হয়)

চতুর্থ দৃশ্য

(দ্বিতীয় দৃশ্যের অনুরূপ)

সাহানা   :         ওরা কি সব ওপরে?

আনওয়ার         :         হ্যাঁ।

সাহানা   :         (প্যাকেটখানা দেখিয়ে) এটা Ñ (প্রশ্নটার ধরন হলো প্যাকেটখানা নিয়ে কী করব বা কোথায় রাখব। সংলাপ বলার সময় একথা মনে রাখতে হবে।)

আনওয়ার         :         ওপরে নিয়ে যান।

সাহানা   :         (যেতে যেতে ফিরে আসে) আপনি, আপনাকে এ বাড়িতে আগে –

আনওয়ার         :         আগে ছিলাম না।

সাহানা   :         ও। কী হন ওঁরা আপনার? বাব্বা, একটু বসি। (আনওয়ার পাখা খোলে। সাহানা বসে।)

আনওয়ার         :         কী হন জানি না। তবে বাবা বলেন আমি ওদের আত্মীয়।

সাহানা   :         কেমন আত্মীয়?

আনওয়ার         :         তা তো জানি না। দূরের না কাছের তাও জানি না। এমনকি আদৌ আত্মীয় কিনা Ñ যাকগে ওসব কথা। তা আপনাকে কিছু দিতে বলি। চা কিংবা Ñ

সাহানা   :         না থাক। আমি নিজেই নিতে পারি।

আনওয়ার         :         এতে মাইন্ড করার কী হলো? আপনার নিজের বাড়িতে গেলেও বোধহয় আপনি তাই বলতেন।

সাহানা   :         আমার নিজের বাড়ি নেই।

আনওয়ার         :         যে বাসায় থাকেন, সেটা?

সাহানা   :         ওটা ভাইয়ের বাসা।

আনওয়ার         :         ওই এক কথাই।

সাহানা   :         এক কথা নয়। ভাই নিজের। বাসাটা নয়।

আনওয়ার         :         আমার অবশ্যি নিজের পরের কারও বাসাই নেই।

সাহানা   :         বললেন যে এখানে থাকি।

আনওয়ার         :         হ্যাঁ, এখানেই থাকি। বাবা পাঠিয়েছেন পড়াশোনা করতে।

সাহানা   :         দেশে থাকলেন না কেন?

আনওয়ার         :         এবার বন্যায় আমাদের ভীষণ –

সাহানা   :         থাক থাক, আর বলতে হবে না। খুব অভাব-অসুবিধায় রয়েছেন। জায়গা-জমি নষ্ট হয়েছে, এই তো?

আনওয়ার         :         আপনি জানেন কী করে?

সাহানা   :         এসব তো নতুন শুনছি না। তবে আমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারবেন না।

আনওয়ার         :         নিশ্চয়ই খুব একটা দুঃখের কাহিনি শোনাবেন।

সাহানা   :         কাহিনিটা দুঃখের কিনা জানি না। ঘটনাটা দুঃস্বপ্নের মতো। সার্ভে ডিপার্টমেন্টে চাকরি করতেন আমার স্বামী –

আনওয়ার         :         আপনার বিয়ে হয়েছিল নাকি?

সাহানা   :         ওই পর্যন্ত। ঘর-সংসার হয়ে উঠেনি। বিয়ের পরদিনই ওকে যেতে হয়েছিল সন্দীপে জরুরি কাজে। ওই শেষ যাওয়া।

আনওয়ার         :         কেন, কোনো দুর্ঘটনা –

সাহানা   :         কেমন করে বলব, শুধু এটুকু জানি ছাড়ার এক ঘণ্টার মধ্যে সাইক্লোনের মুখে পড়ল লঞ্চ। যাত্রীদের একজনও ফিরে এলো না।

আনওয়ার         :         আমি সত্যি দুঃখিত।

সাহানা   :         আপনি আর দুঃখ করে কী করবেন! আমিই করতে পারছি না।

আনওয়ার         :         একটা কথা বলি, যদি কিছু মনে না করেন –

সাহানা   :         বলুন না।

আনওয়ার         :         না বলছিলাম আপনি আবার বিয়ে করলেই তো পারেন।

সাহানা   :         পারি। কিন্তু সে যদি বেঁচে থাকে, কোনদিন ফিরে আসে –

আনওয়ার         :         সে ভরসায় বসে থাকবেন?

সাহানা   :         সবাই তো সে কথা বলে।

আনওয়ার         :         আপনি?

সাহানা   :         আমি, দেখুন আমি ঠিক এসব ভাবতে পারি না। (ঘড়ি দেখে) আরে, দেখুন তো সেই কখন থেকে বসে আছি। ওরা সব কই?

আনওয়ার         :         ওপরে। যান না।

সাহানা   :         (প্যাকেটখানা তুলে নেয়) আপনি যাবেন না?

আনওয়ার         :         না। আমাকে ডাকেনি। আর তাছাড়া আমি এসবে যাই না।

সাহানা ওপরে চলে যায়। হঠাৎ জোর চিৎকার ও দাপাদাপির শব্দ শোনা যায়। আনওয়ার দুহাতে কান ঢাকার চেষ্টা করে। বেবী নেবে আসে সিঁড়ি দিয়ে।

বেবী     :         এখানে বসে কেন?

আনওয়ার         :         (একটা বই টেনে নিয়ে) পড়ছি।

বেবী বই কেড়ে নিয়ে বন্ধ করে দেয়।

বেবী     :         এখন পড়তে হবে না। ইস্ আমার জন্মদিন আর ইনি কিনা বসে বসে পড়বেন।

আনওয়ার         :         তাহলে কী করব?

বেবী     :         তোমার কখনো জন্মদিন হয়নি? কোনোদিন জন্মদিন দেখনি?

আনওয়ার         :         না।

বেবী     :         চলো ওপরে।

আনওয়ার         :         আমি এখানেই থাকব।

বেবী     :         না। চলো।

                                  বেবী শার্ট ধরে টানাটানি করে।

আনওয়ার         :         আমার শার্ট ছিঁড়ে যাচ্ছে।

                                    বেবী হাত ছেড়ে দেয়।

বেবী     :         থাক থাক। আসতে হবে না।

বেবী চলে যায়। একটা প্লেট হাতে কিছু খাবার নিয়ে সাহানা নেবে আসে।

সাহানা   :         (ডালমুট খেতে খেতে) নেবেন?

আনওয়ার         :         না।

সাহানা   :         নিন না!

আনওয়ার         :         থাক।

সাহানা   :         আমার মনে হয় আপনার এখানে ঠিক মন টিকছে না।

আনওয়ার         :         কী বললেন?

সাহানা   :         বললাম, বোধহয় এখানে মন বসছে না। (মুখে কিছু ডালমুট ফেলে এবং সে-সঙ্গে আনওয়ারের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে) মেয়েটা আপনাকে খুব জ্বালায়।

আনওয়ার         :         না। ছেলে মানুষ, ওরকম করেই থাকে।

সাহানা   :         এতোই যদি বোঝেন তাহলে গেলেন না কেন? বেচারি কতো সাধাসাধি করছিল।

আনওয়ার         :         কোথায়, ওর জন্মদিনে? আমি গেলে কী দিতাম বলুন?

সাহানা   :         কিছু নাই-বা দিলেন, তবুও খুশি হতো।

আনওয়ার         :         (নিজের কাপড়-চোপড় লক্ষ করে) তাছাড়া এরকম কাপড়-চোপড় না যাওয়াই ভালো।

আনওয়ার বইপত্র ঘাঁটতে শুরু করে।

সাহানা   :         এখন আবার পড়তে বসবেন নাকি?

আনওয়ার         :         মানে কী আর করব বলুন Ñ

সাহানা   :         কথা বলবেন না? তাহলে আমি এলাম কেন?

আনওয়ার         :         আমার সঙ্গে কথা বলে কি ভালো লাগবে? কথা বলার লোক তো ওপরে ছিল।

সাহানা   :         আমার যদি ইচ্ছে না করে?

আনওয়ার         :         ইচ্ছে না করলে বলবেন না।

আবার বই নিয়ে বসে।

সাহানা   :         আমার কি মনে হয় জানেন?

আনওয়ার         :         কী?

সাহানা উঠে দাঁড়ায়। পায়চারি করতে থাকে।

সাহানা   :         আপনার এখানে লেখাপড়া হবে না।

আনওয়ার         :         (চমকে উঠে) কী করে বুঝলেন?

সাহানা   :         কী জানি, আমার তো তাই মনে হয়। কেমন রেজাল্ট করলেন গেল পরীক্ষায়?

আনওয়ার         :         খুব খারাপ। প্র্যাকটিক্যালে ফেল করেছি।

                   (ওপরতলার সিঁড়ি থেকে খানিকটা ঝুঁকে ওদের লক্ষ করে বেবী)

বেবী     :         (সাহানাকে) আপনাকে ডাকছে।

সাহানা   :         যাই। আরেকদিন সময় পেলে আসব।

আনওয়ার         :         আসবেন।

                               সাহানা যেতে যেতে থমকে দাঁড়ায়।

সাহানা   :         কেউ আপনাকে একটা প্লেট এনে দিলে পারত।

সাহানা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকে। শব্দ করে প্লেট হাতে বেবী নাবতে থাকে। এবার ওর পরণে শাড়ি।

বেবী     :         এ্যাই Ñ

আনওয়ার         :         কী?

বেবী     :         কিছু বলছ না যে Ñ

আনওয়ার         :         কী বলব?

বেবী     :         দেখছ না শাড়ি পরেছি। কেমন লেডি লেডি লাগছে, না? মনে হয় আমি ক্লাস নাইনে পড়ি?

আনওয়ার কিছু বলে না।

বেবী     :         (প্লেট বাড়িয়ে দেয়) খাও।

আনওয়ার         :         কেন?

বেবী     :         কেন আবার কী। আমি বলছি।

আনওয়ার         :         তুমি বললেই খাব?

                   (সামান্য কিছু তুলে নেয় পরম অনিচ্ছায়)

                   এটাও একরকম জবরদস্তি।

বেবী     :         (একটা সন্দেশ তুলে দেয়) এটা নাও।

আনওয়ার         :         ওটা না নিলে চলবে না?

বেবী     :         না।

আনওয়ার         :         (ওর হাত থেকে না নিয়ে গোটা প্লেটখানা তুলে নেয়।)

                   আর?

বেবী     :         আর আবার কী। দাও, দাও প্লেটটা দাও।

আনওয়ার         :         দেব?

বেবী একরকম জোর করে কেড়ে নেয় প্লেট। তারপর ওখানা সশব্দে ঠাস করে ছুড়ে মারে। প্লেট ভেঙে যায়।

বেবী     :         আত্মীয়, আত্মীয়। কেমন আত্মীয়? একটু দোয়া করতে পারো না, একটু ভালো কথা বলতে পারো না।

শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে গলা ভেঙে আসবে বেবীর।

আনওয়ার         :         (খুব বিব্রত বোধ করে) আমার, আমার সে-কথা মনে হয়নি।

সকিনা   :         (নেপথ্যে, ওপর থেকে) শব্দ, শব্দ কিসের?

বেবী     :         (মুখ ভেংচিয়ে) আমার সে-কথা মনে হয়নি। হবে কেন?

সিঁড়ি দিয়ে সকিনা নেবে আসে।

সকিনা   :         (প্লেটের টুকরো তুলে নিয়ে) প্লেট ভাঙল কে?

বেবী     :         আবার কে (আনওয়ারকে দেখিয়ে) ওই যে সোহাগের আত্মীয়।

আনওয়ার         :         দেখুন তো আমি ভাঙলাম কখন। আমি প্লেট ভাঙিনি।

বেবী     :         (কাছে গিয়ে) প্লেট ভাঙবে কেন, ওতো প্লেট ভাঙেনা। অন্য জিনিস ভাঙে।

সকিনা   :         কী জিনিস আবার?

বেবী     :         (বেবী চুলের ফিতে, ক্লিপ টেনে টেনে ছুড়ে ফেলতে থাকে আর বলতে থাকে) কী জিনিস ভাঙে (চুলের ফিতে খুলে) ওকেই জিজ্ঞেস করো। (গলার মালা টেনে ছিঁড়ে ফেলে। আনওয়ারের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করে বেবী তেজের সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যেতে থাকে। আলো স্মিমিত হয়।

পঞ্চম দৃশ্য

প্রায় তৃতীয় দৃশ্যের অনুরূপ। সকিনাকে টেবিলে খেতে দেখা যাবে। টেবিলে খাবার সামগ্রী। তৃতীয় দৃশ্যের মতোই গোড়ায় অ্যাকশন টেবিলের ধারেকাছে। পরে সমগ্র স্টেজ জুড়ে।

ইফতেখার        :         আনওয়ারকে দেখছি না। (ঘড়ি দেখে) কোথায় গেল এতো রাতে?

সকিনা   :         সে খবর আমি জানব কি করে? যার যখন খুশি আসবে। কচি খোকা তো নয় যে, আঁচলে বেঁধে রাখব।

ইফতেখার        :         না, তা বলছি না। লেখাপড়া করতে এসেছে। গরিবের ছেলে। পরে একটা কথা থেকে যাবে।

সকিনা   :         না করেছে কে? পড়াশোনা করলেই পারে।

ইফতেখার        :         ঘর-সংসারের কাজও করাচ্ছ নাকি?

সকিনা   :         করে একেবারে ভাসিয়ে দিচ্ছে! বাড়ির আর দশজনের মতো। তবু যদি নিজে থেকে এসে বলত, বুঝতাম।

ইফতেখার        :         সেদিন দেখলাম বাজার করে ফিরছে। পরশু রেশনের           দোকানে Ñ

সকিনা   :         ওটুকু ঘরের কাজ করলে জাত যায় না।

ইফতেখার        :         জাত যায় না, জানি। তবে শুধু আনু কেনো। ও এসেছে লেখাপড়া করতে।

সকিনা   :         বেশ এবার থেকে তোমার নবাবপুত্তুর ভাগ্নেকে ঘরে বসিয়ে রেখে আমিই যাব বাজারে, হলো তো?

ইফতেখার        :         রাগ করো না। কাজের লোক না থাকত, অন্য কথা।

সকিনা   :         কেন তারেক থাকতে করেনি সংসারের টুকটাক কাজ! না, নিজের ছেলের বেলায় অন্য নিয়ম?

ইফতেখার        :         তারেক! ওর নাম নিও না তো।’

সকিনা   :         নিজের ছেলে!

ইফতেখার        :         ওর জন্যে কারও কাছে মুখ দেখাবার জো নেই। একটা দাগি আসামি আর তোমার ছেলের মধ্যে তফাৎটা কই, শুনি। পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে। অমন ছেলে থাকা না থাকা সমান।

সকিনা   :         বাপ হয়ে তোমার করণীয় কিছু নেই।

ইফতেখার        :         করণীয়! করণীয় যা ছিল তার চেয়ে ঢের বেশি করেছি।

                                         উঠে দাঁড়ায়, পায়চারি করতে থাকে।

                   অন্ধকারে যদি কাউকে বলো সামনে দেয়াল। যেও না হোঁচট খাবে, শুনবে না। তার চেয়ে তাকে হোঁচট খেতে দাও, আঘাত পেতে দাও। (আবার টেবিলে এসো বসে)

সকিনা   :         তবু তুমি তাকে ফেরাতে পার।

ইফতেখার        :         যে ফেরার সে আপনা থেকেই ফেরে। (থেমে নিয়ে) শুনেছি মাঝে মাঝে আসে এ বাড়িত গা-ঢাকা দেয় রাতের অন্ধকারে। তোমার সঙ্গে দেখা হয়?

                   অন্যমনষ্ক হয়ে প্লেট সরিয়ে দেয়।

সকিনা   :         খাবে না?

ইফতেখার        :         না। ও কি খুব শুকিয়ে গেছে?

সকিনা জবাব দেয় না। মাথা নিচু করে খেতে থাকে। এসময় আনওয়ার এসে ঢোকে।

আনওয়ার         :         কাপড় পেলাম না। লন্ড্রি বন্ধ।

ইফতেখার        :         কার কাপড়?

সকিনা   :         বাসার। সব কথায় অতো জেরার কী দরকার?

ইফতেখার        :         ও। (আনওয়ারকে) তা আর দেরি না করে তুমিও হাত ধুয়ে বসে পড়ো।

সকিনা   :         ও আমার এখানে খায় নাকি?

ইফতেখার        :         তবে কোথায় খায়?

সকিনা   :         যেখানে খাবার সেখানে খায়। তোমাকে ভাবতে হবে না। কফি দিতে বলব?

ইফতেখার        :         (উঠে পড়ে) না।

                                        ইফতেখারের প্রস্থান।

সকিনা   :         কই লন্ড্রির রশিদটা দাও। তোমাকে আর আনতে হবে না। দেখি পড়াশোনা করে কত উলটে দাও।

আনওয়ার         :         আমি তো কিছু বলিনি। যখন যা বলছেন করছি।

সকিনা   :         করো?

আনওয়ার         :         করি। করা উচিত। আমি বোধহয় মামিমা অন্যদের তুলনায় একটু কমই করি। বলেন তো বেবীকেও পড়াতে পারি।

সকিনা   :         থাক থাক, আর মমতা দেখাতে হবে না। পড়াবে কী, শেখাবে তো ভুল উচ্চারণ। কাজ নেই। নিজের চরকায় তেল দাও।

আনওয়ার         :         মানা করলে পড়াব না। ও নিজে থেকেই সেদিন বলছিল কিনা। আপনি খাচ্ছেন। আমার মনে হয় এখন আমার যাওয়া উচিত। না আমি বলছিলাম, থাকি, খাই-দাই যখন Ñ

সকিনা   :         (প্লেটের গ্লাসের পানিতে হাত ধুয়ে নেয়) এত বিচার বিবেচনা তো আগে দেখিনি। (রুষ্ট হয়ে) বাজে বকো না। তোমার মতো আট-দশটা লোক আমার এখানে সকাল-সন্ধে খাচ্ছে, বুঝেছ। উলটো আবার খোটা দিচ্ছ। মনে কর, বুঝি না? নিছক বলে বেড়াচ্ছ আত্মীয় সেজন্যে কিছু বলি না। (আনওয়ার যাওয়ার উদ্যোগ করে) শোনো। তোমার একটা চিঠি ছিল।

আনওয়ার         :         দিন।

সকিনা   :         (তাকের দিকে দেখায়) ওই যে। কী লেখা আছে খুলে দেখ।

আনওয়ার         :         (চিঠিখানা তুলে নিয়ে) খোলাই আছে। বোধহয় আগেই কেউ খুলেছিল।

সকিনা   :         তার মানে?

আনওয়ার         :         না, কিছু না। এমনি বললাম।

সকিনা   :         (আনওয়ারকে পড়তে দেখে) নিশ্চয়ই আমাদের সম্বন্ধে যা-তা লিখে পাঠাও।

আনওয়ার         :         আপনাদের সম্বন্ধে লিখতে যাব কেন?

সকিনা   :         তাহলে ওই কথার মানে কী Ñ

আনওয়ার         :         ওই কথা মানে?

সকিনা   :         অসুবিধে হলেও চালিয়ে নাও।

আনওয়ার         :         ও, ওটা আপনাদের কথা নয়। আমার নিজের অসুবিধের কথা। বাবা লিখেছেন অসুবিধে হলেও চালিয়ে নিতে।

সকিনা   :         তোমার আবার কিসের অসুবিধে? খাচ্ছ-দাচ্ছ Ñ

আনওয়ার         :         না, সেরকম অসুবিধে নয়। মানে আপনাদের এখানে             থাকা-খাওয়ার কোনো অসুবিধের কথা নয়।

সকিনা   :         থাক থাক, আর বাহবা গাইতে হবে না। খুব তো লাগাও কথা।

আনওয়ার         :         কই, আমি তো কখনও কিছু বলিনি Ñ

সকিনা   :         না, আমি তো কিছু বলিনি। এমনিতে হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে আসে, না? যতসব Ñ

সকিনা উঠে দাঁড়ায় ও ভেতরে যায়। ইফতেখারের প্রবেশ। আনওয়ার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে। ইফতেখার তা লক্ষ করে।

ইফতেখার        :         কী হলো, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছ কেন?

আনওয়ার         :         না, মানে একটু Ñ

ইফতেখার        :         (চটে যায়) না একটু মানে কী Ñ কী হয়েছিল বলবে তো।

আনওয়ার         :         সাইকেল থেকে পড়ে ব্যথা পেয়েছিলাম।

ইফতেখার        :         দেখি দেখি (আনওয়ার প্যান্টের ভাঁজ তুলে দেখায়। ডানপায়ে ছোট করে ব্যান্ডেজ বাঁধা) কবে পড়ে গিয়েছিলে?

আনওয়ার         :         পরশু।

ইফতেখার        :         আমাকে বলনি কেন। কিছু লাগিয়েছ?

আনওয়ার         :         ডিসপেন্সারিতে গিয়েছিলাম। ওষুধ দিয়েছে।

                   (আনওয়ার প্যান্টের ভাঁজ ফেলে দিয়ে খুঁড়িয়ে চলে যেতে থাকে। ইফতেখার একদৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে।)

ইফতেখার        :         আনু Ñ

আনওয়ার         :         জি Ñ

ইফতেখার        :         এদিকে এসো।

আনওয়ার সামনে এগিয়ে আসে। ইফতেখার নিষ্পলক-দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে।

আনওয়ার         :         কিছু বলবেন?

                   (ইফতেখার ওর চিবুকখানা তুলে নিয়ে অর্থবোধক দৃষ্টিতে চোখাচোখি তাকায়।)

ইফতেখার        :         ব্যথা সত্যি সত্যি পায়ে, না?

আনওয়ার         :         (মাথা নিচু করে ফিসফিসে গলায়) পায়ে।

                   (ইফতেখার চিন্তাক্লিষ্ট মনে মন্থরগতিতে ভেতরে চলে যায়। সকিনার প্রবেশ। কোনো কথা হয় না খানিকক্ষণ। কাসেম আলী এসে ঢোকে।)

কাসেম  :         আপনারে ডাকতাছেন।

সকিনা   :         কে?

কাসেম  :         আমাগো অফিসের ‘অ্যাসিসটেন’ (অ্যাসিসট্যান্ট অর্থে)

আনওয়ার         :         ও শওকৎ সাহেব। কোথায়?

কাসেম  :         বাইর ঘরে। বলে জলদি আছে।

সকিনা   :         এতো রাতে তোমার ডাক পড়ল কেন?

আনওয়ার         :         কী জানি, আমি তো কাউকে Ñ

সকিনা   :         পাখা গজাচ্ছে আস্তে আস্তে। আগে তো এত ইয়ার দোস্ত দেখিনি।

আনওয়ার         :         তাহলে চলে যেতে বলি। এই কাসেম Ñ

কাসেম  :         জ্যা।

সকিনা   :         চলে যেতে বলবে কেন? আর বললেই যেন চলে যাবে।

আনওয়ার         :         (কাসেমকে) আচ্ছা তুমি যাও, আমি আসছি।

কাসেম  :         কওন লাগবো না। আমি বসাইয়া রাখছি।

                    কাসেমের প্রস্থান।

সকিনা   :         আর শোন, কথা শেষ হলে গেট বন্ধ করে দিও, বুঝেছ? আর যদি আড্ডা দিয়ে মন না ভরে তবে তোমার ইয়ার দোস্তের সঙ্গেই বাইরে কাটিয়ে দিও। অত রাতে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করো না। এটা হোটেল নয়।

আনওয়ার         :         জি।

আলো স্তিমিত হয়। দ্রষ্টব্য : কাসেমের উচ্চারণে ধপপবহঃ : গ্রাম্য থাকবে।

ষষ্ঠ দৃশ্য

প্রথম দৃশ্যের মতোই পার্টিশনখানা প্রায় লম্বালম্বি করে মেলে ধরা। ডিভ্যানে এবার মামুলি চাদর বিছানো। পার্টিশনের প্রথম অংশে ডিজাইন পরিবর্তন। কাটআউটের সাহায্যে ড্রেসিং টেবিল তৈরি করে এখানে জুড়ে দিতে হবে। আনওয়ারকে               বাঁ-দিকের টেবিলে বসে থাকতে দেখা যাবে। ব্যাক স্ক্রিনে রাতের ইফেক্ট।

আনওয়ার         :         হঠাৎ এতো রাতে, কী ব্যাপার?

শওকৎ  :         (ঘড়ি দেখে) এসে গেছেন। বাঁচালেন। বড় দুর্ভাবনায় ছিলাম। দাঁড়িয়ে কেন, বসুন।

আনওয়ার         :         (বসল) বসছি। তো কী ব্যাপার?

শওকৎ  :         আরে বলবেন না। বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ ঘণ্টাখানেক আগে আমাকে ডেকে বললেন রাতের গাড়িতেই ইশ্বরদি যেতে হবে। ওখানে ফার্মের কিছু কাজ ‘সাফার’ করছে। বললেন, তুমি নিজে গিয়ে একবার দেখে এসো।

আনওয়ার         :         আপনার ওপর দেখছি খুব ভরসা।

শওকৎ  :         হ্যাঁ টাকা-পয়সার ব্যাপারে সবাইকে Ñ বুঝতেই পারছেন।

আনওয়ার         :         তা আমাকে কী করতে হবে?

শওকৎ  :         অসুবিধে না হলে একটু রাতটা থেকে যাবেন। ঘরে দ্বিতীয় পুরুষ মানুষটি নেই। আমি অবশ্যি সে অসুবিধের কথা বলছিলাম। উনি আপনার কথা বললেন।

আনওয়ার         :         উনি মানে?

শওকৎ  :         ইফতেখার সাহেব নিজে। বললেন, কী সমস্যা। এক রাতের ব্যাপার। আনু গিয়ে থাকবে। কেন, আপনাকে বলেননি?

আনওয়ার         :         না তো।

শওকৎ  :         ভুলে গেছেন বোধহয়। আর মনে থাকবেই বা কেমন করে। একটুকু শান্তি থাকলো তো। ছেলে থেকেও নেই। লোফারের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। (কিছুক্ষণ থেমে) বড় দুঃখ হয় জানেন, ইফতেখার সাহেব লোকটা ভালো অথচ Ñ

আনওয়ার         :         আমারও তাই মনে হয়।

শওকৎ  :         মনে হয় কি! আমি তো দেখছি। সবসময় ডাইরেক্টলি অ্যাপ্রোচ করুন। ভায়া মিডিয়া যাবেন না। আর আপনি তো সায়েব আত্মীয় মানুষ।

আনওয়ার         :         আমার আর তাঁর কাছে কী দরকার বলুন। খেতে পারছি, পরতে পারছি, মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই পেয়েছি এই তো যথেষ্ট। আপনার ট্রেন কখন?

শওকৎ  :         (ঘড়ি দেখে) সময় মোটেও নেই। আমি তো তৈরি। শুধু আপনার অপেক্ষা ছিল।

সাহানার প্রবেশ। হাতে মাফলার-সোয়েটার।

সাহানা   :         এসে গেছেন দেখছি।

আনওয়ার         :         শওকৎ সাহেব যেরকম জরুরি তলব পাঠালেন ভাবলাম না জানি কী।

সাহানা   :         এখন নিশ্চয়ই পস্তাচ্ছেন।

শওকৎ  :         ওসব ঝগড়াঝাটি পরে। সময় নেই। চলি তাহলে।

                   (শওকতের প্রস্থান) সাহানা দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসে। সোয়েটার ও মাফলার দেয়। আনওয়ার একটা পত্রিকা নিয়ে বসে।)

সাহানা   :         কী ব্যাপার, খুব মুষড়ে পড়েছেন মনে হয়।

আনওয়ার         :         না তো!

সাহানা   :         মনে হয় আপনাকে এভাবে ডেকে না পাঠালে কোনোদিন এদিকে পা পড়ত না। তাই না?

আনওয়ার         :         আসব আসব ভেবেছি অথচ (কী যেন মনে হওয়ায়) আপনাদের বাসা-ই তো চিনতাম না Ñ

সাহানা   :         চিনতে চাইলেই চেনা যায়।

আনওয়ার         :         তবু আসা হলো।

সাহানা   :         ইচ্ছে করে তো আসেননি।

আনওয়ার         :         আসা-যাওয়া এভাবেই হয়।

সাহানা   :         খুব তাড়াতাড়ি ঘুমোন নাকি?

আনওয়ার         :         না। তেমন তাড়াতাড়ি আর কই। (পত্রিকা গুটিয়ে রেখে) আমাকে এখানে কী করতে হবে?

সাহানা   :         জেগে জেগে আমাকে পাহারা দেবেন।

আনওয়ার         :         বাঘ-ভল্লুকের ভয় আছে নাকি?

সাহানা   :         না, ভয় মানুষের।

আনওয়ার         :         তাহলে আবার উলটো আমাকে ডাকতে গেলেন কেন?

সাহানা   :         মানুষ দিয়ে মানুষ খেদাতে। তাছাড়া কথা বলারও একটা লোক দরকার।

আনওয়ার         :         (আবার পত্রিকা তুলে নেয়) আমার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগবে না।

সাহানা   :         কী করে জানলেন?

আনওয়ার         :         মানে, আমি মেয়েদের সঙ্গে তেমন মিশিনি। কেমন করে কী বলতে হয় Ñ জানি না।

সাহানা   :         (আনওয়ারের হাতের পত্রিকা দেখিয়ে) তাহলে অত পড়েন কী?

আনওয়ার         :         (চোখ না তুলেই) পড়ি না।

সাহানা   :         তাহলে এতক্ষণ কী করছিলেন?

আনওয়ার         :         আপনার সঙ্গে চোখাচোখি হবার ভয়ে বসেছিলাম।

সাহানা   :         আপনার আবার কিসের ভয়?

আনওয়ার         :         জানি না।

সাহানা   :         সেদিন ইফতেখার সাহেবের বাসায় কথা বলতে গিয়ে আপনাকে কেমন নার্ভাস দেখাচ্ছিল। বোধহয় আরেকজনের বাসায় সেজন্যে।

আনওয়ার         :         আজও তো আমি আরেকজনের বাসায়। জানেন, আমাকে কারও না কারও বাসায় বসেই কথা বলতে হবে। নিজের বাসা কোনোদিন হবে না।

সাহানা   :         কেন?

আনওয়ার         :         কথাটা খুব দুঃখের সঙ্গে বলছি না।

সাহানা   :         আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

আনওয়ার         :         করুন।

সাহানা   :         আজকে এসময়, মানে রাতে এখানে না এলে কী করতেন?

আনওয়ার         :         ওই বাসায় থাকতাম।

সাহানা   :         সেটা কি বলার মতো কথা হলো? তা তো থাকতেনই। (একটু থেমে) কী ভাবতেন?

আনওয়ার         :         ভাবতাম কতদিন থাকতে হবে এভাবে অন্যের গলগ্রহ হয়ে Ñ

সাহানা   :         আপনার আত্মমর্যাদায় বাধে কোথাও থাকতে, তাই না।

আনওয়ার         :         না, ঠিক তা নয়। মানে Ñ

সাহানা   :         আমার মনে হয় ওই বাড়ির লোকেরা আপনাকে মানুষ মনে করে না।

আনওয়ার         :         ওদের কথা আলাদা করে বলছেন কেন। হয়তো অনেকেই করে না। আমি আর কজনকেই চিনি।

সাহানা   :         আপনার মতো মানুষ দেখলে আমার রাগ হয়। যে নিজের ভালোটা বোঝে না।

আনওয়ার         :         বুঝি।

সাহানা   :         বোঝেন, তাহলে নিজের ভালোটা চান না কেন?

আনওয়ার         :         চাই। হয় না। বুঝলেন?

সাহানা   :         অন্য কেউ আপনার ভালো চাইতে পারে, বিশ্বাস করেন না?

আনওয়ার         :         না না, তা বিশ্বাস করব না কেন। আপনি মিছিমিছি আমার কথা ভাববেন না।

সাহানা   :         আমার জায়গায় হলে আপনি ভাবতেন না?

আনওয়ার         :         কী জানি। আপনি ঘুমোতে যান।

সাহানা   :         আমি বসে কথা বলছি বলে তো কোনো ক্ষতি হচ্ছে না আপনার।

আনওয়ার         :         না, ক্ষতি হবে কেন। না বলছিলাম কষ্ট করে বসে থাকতে হচ্ছে।

সাহানা   :         আপনি সত্যি কোনো মহিলার সঙ্গে মেশেননি।

আনওয়ার         :         মায়ের সঙ্গে মিশেছি।

সাহানা   :         মায়ের সঙ্গে মিশেছেন সে তো ছোটবেলায়।

আনওয়ার         :         না, এখনো মিশি। আচ্ছা, আমাকে এখানে ডেকে আনার খুব দরকার ছিল?

সাহানা   :         বলেছি তো, একা বাড়ি, কেউ ছিল না সেজন্যে। অসুবিধে হলে চলে যান না।

আনওয়ার         :         না, সেজন্যে নয়। ঠিক সেরকম মনে করে বলিনি।

সাহানা   :         কখন কী মনে করে বলেন, আপনিই জানেন। বসুন। আসছি।

সাহানার প্রস্থান। আনওয়ার কিছু করার পায় না। পত্রিকাখানা তুলে নিয়ে অবাার চোখ বুলাতে থাকে। কিছুক্ষণ পর চা হতে সাহানার প্রবেশ।

আনওয়ার         :         চা কেন হঠাৎ

সাহানা   :         খাবেন তাই।

আনওয়ার         :         চায়ের অভ্যেস নেই। জিজ্ঞেস করে আনলেই পারতেন।

সাহানা   :         সংসারে সবসময় সবকিছু জিজ্ঞেস করে, অনুমতি নিয়ে কি করা যায়? যেমন ধরুন Ñ

সাহানা চায়ের কাপ থেকে চায়ের একটা পাতা চামচ দিয়ে তুলে দেয়।

আনওয়ার         :         যেমন কী?

সাহানা   :         না থাক। আরেকদিন বলা যাবে।

আনওয়ার         :         ইচ্ছে করলে একেবারে না-ও বলতে পারেন।

সাহানা   :         মিছিমিছি রাগ করেন। ইচ্ছে করলেই সমসময় সবকথা বলা যায়? আপনি পারেন?

আনওয়ার         :         (হঠাৎ স্বর নামিয়ে টানা গলায়) আপনি হয়তো বিশ্বাস করবেন না, আপনি যেরকম ভাবেন সেরকম কেউ ভাবেনি আমার             জন্যে Ñ

সাহানা   :         তা-ও ভালো, মনে রেখেছেন। ওই বাড়িতে থেকে আপনার কী যে হয়েছে। সবাইকে সন্দেহ। সবাই আপনাকে করুণা করে বলে আপনার ধারণা। সে ভয়েই তো ছাই কিছু গুছিয়ে বলতে পারি না। বললেই বলবেন ওই দেখ আমাকে করুণা করছে।

আনওয়ার         :         তাহলে আর কবে বলবেন। কোনোদিন বলা হবে না।

সাহানা   :         হবে না কেন। আপনি কি আর চিরকাল ইফতেখার সাহেবের বাড়িতে পড়ে থাকবেন? কক্ষনো না।

আনওয়ার         :         তখন বলবেন।

সাহানা   :         (স্বপ্নালু দৃষ্টি ছড়িয়ে) তখন? তখন হয়তো আমার দরকার হবে না।

আনওয়ার         :         কী দরকার হবে না?

সাহানা   :         (খানিকটা সলজ্জ) কী, তা আমি কি জানি!

আনওয়ার         :         তবে যে বললেন।

সাহানা   :         এমনি বললাম। সব কথারই কি মানে হয়। (ঘড়ি দেখে) সর্বনাশ কটা বাজে খেয়াল আছে। ভোর হতে চলল।

আনওয়ার         :         তাই তো।

সাহানা   :         আমি বরং বিছানাটা পেতে দিই। ঘুমিয়ে পড়–ন।

আনওয়ার         :         পাগল, এ সময় তো আমি উঠে পড়ি।

সাহানা   :         আজ আর নাইবা উঠলেন।

আনওয়ার         :         না উঠলে লোকটা যে ফেরত যাবে। দুধ দিয়ে যায় কিনা। আমি নিজে দরজা খুলে দিই।

সাহানা   :         ও দায়িত্বটা আপনার ঘাড়ে চাপাল কে? ও বাড়িতে আর লোক নেই?

আনওয়ার         :         কেউ চাপায়নি। চাকর-বাকরদের রাতদিন ফুট-ফরমাশ খাটতে হয়। আমিই বলে-কয়ে নিলাম। এমনিতেও সকাল-সকাল উঠি। (খানিকক্ষণ থেমে) আর তাছাড়া বুঝলেন না, খাই-দাই থাকি যখন, একটু করলামই। তাতে নিজেরও তৃপ্তি। (আবার থেমে নিয়ে) তবে একটা কথা Ñ

সাহানা   :         কী?

আনওয়ার         :         আমি ঠিক এভাবে আগে কারও সঙ্গে কথা বলিনি। দরজা খুলতে না হলে আরও বসা যেত।

সাহানা   :         সেরকম ব্যবস্থা করে এলেই পারতেন।

আনওয়ার         :         তখন জানতাম না আপনার সঙ্গে দেখা হবে। কথা বলার ইচ্ছে হবে। যাই।

আনওয়ার যাওয়ার উদ্যোগ করে।

সাহানা   :         শুনুন।

আনওয়ার         :         জি।

সাহানা   :         (শার্টের বোতাম লাগাতে গিয়ে) ওমা, নিচের বোতামটা তো নেই। টেকে দেব?

আনওয়ার         :         (শার্টের কলার উঁচিয়ে গলা ঢেকে) ওতেই চলবে। একটা লাগিয়ে দিয়েছেন ওই যথেষ্ট। চলি। (যেতে যেতে ফিরে আসে) শুনুন। মানে, আজ তো সময় হলো না। মাঝে মাঝে যদি আসি Ñ

সাহানা   :         মাঝে মাঝে কেন, যখন খুশি আসবেন।

আনওয়ার         :         আসব?

সাহানা   :         (দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হয়) আসবেন না?

আনওয়ার         :         (ফিসফিস গলায়) আসব।

                   (আনওয়ার চলে যাওয়ার উদ্যোগ করে)

সাহানা   :         একটু দাঁড়ান।

আনওয়ার         :         (এগিয়ে আসে) কিছু বলবেন?

সাহানা   :         (মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকায়, তারপর সলজ্জ মাথা নিচু করে ফেলে) না, এমনি।

আলো স্তিমিত হয়।

সপ্তম দৃশ্য

পার্টিশন লম্বালম্বি করে মেলে ধরা। পূর্বোক্ত ডিজাইন পরিবর্তিত হয়ে এবার একটি হারমোনিয়াম এবং দুটি তবলার কাটআউট সে জায়গায় ঝুলবে। ডিভ্যানের চাদর পালটে ফেলা যেতে পারে। ঘরে ইতস্তত ছড়ানো কার্ডবোর্ডের তৈরি কিছু বাক্স এবং ট্রাঙ্ক। চান্দু শেখকে ডিভ্যানে বসে থাকতে দেখা যাবে।

প্রথম সহচর      :         সত্যি বলেন তো ওস্তাদ এসব ছেলে-ছোকরাকে দলে ভেড়ানোই ভুল। কখন যে কী মতিগতি হয় বোঝা মুশকিল।

চান্দু শেখ         :         তুই শালা ব-কলম। নইলে বুঝতি হাওয়া বদলেছে। সেদিন আর নেই। এখন ছুরিচাক্কু দেখিয়ে ডা-াবাজি করে সব কাজ হয় না। হিম্মতের সঙ্গে সঙ্গে আক্কেলও চাই।

প্রথম সহচর      :         তা বুঝলাম। কিন্তু ওস্তাদ আমরা তো মরে যাইনি। আমরা তো ছিলাম।

চান্দু শেখ         :         এই দেখ, খামোকা হুজ্জত। তোদের কাজ আলাদা। ওদের আলাদা। কখন মাল এল গেল, কে কখন মাঝখান থেকে বাগড়া দিলো দেখতে হবে না। ওরা ভদ্দরলোকের ছেলে। যখন যেখানে খুশি ঘুরে বেড়াক, কোনো ব্যাটা সন্দেহ করবে না। তোরা তো শালা দাগি আসামি। তিন মাইল দূর থেকে তোদের দেখলে লোকজন ঘেউ ঘেউ করে ওঠে।

দ্বিতীয় সহচর     :         তা মানলাম। কিন্তু আখেরে ফলটা দেখতে হবে না। এই যে ব্যাটা ভদ্দরলোকের বাচ্চাটাকে পাঠালে, সে তো কলা দেখিয়ে দিলো। শেষটায় বেইমানি করেনি তো?

চান্দু শেখ         :         বেইমানি করবে চান্দু শেখের সঙ্গে? জানে না নাফরমানির কী সাজা। আর খানিকক্ষণ দেখে নে। তারপর গায়েবানা জানাজা পড়িয়ে মসজিদে ওর নাম করে সিন্নি পাঠিয়ে দিস।

চান্দু শেখ         :         কই রে কোয়েল, ও কোয়েল কোয়েলিয়া Ñ

কোয়েল :         আমাকে ডেকেছ ওস্তাদ।

                   (চান্দু শেখের আশ্রিতা কোয়েল এসে ঢোকে। বয়েস বাইশ-চব্বিশ। সুশ্রী দেহের অধিকারিণী। মনে হবে সাজগোজ করে এলো)

চান্দু শেখ         :         কী করছিলি?

কোয়েল :         বসেছিলাম।

চান্দু শেখ         :         কার জন্যে?

কোয়েল :         তোমার জন্যে।

চান্দু শেখ         :         আমার জন্যে। (হো হো করে হেসে ওঠে) আমার জন্যে বসেছিল কোয়েলিয়া। হবেও-বা। রোজ বসে থাকিস।

কোয়েল :         অন্যদিনের কথা জানি না। আজ বসেছিলাম।

চান্দু শেখ         :         আজ তোকে বড্ড খুশি খুশি দেখাচ্ছে কোয়েল।

কোয়েল :         দেখাবে না, তুমি যে অনেক সুখে রেখেছ।

চান্দু শেখ         :         তা ঠিক। তা না হলে জীবনে ছিল কী বল, ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া। মানি, তোর রূপের চটক ছিল। এখানেও তো রাজরানীর হালেই রয়েছিস। সবই ভাগ্যের ফের।

কোয়েল :         ভাগ্যের কথা বলো না ওস্তাদ। তোমারও বড় কপাল জোর। ফাঁসির দড়ি না হলেও দ্বীপান্তর বা নিদেনপক্ষে হাজত বাস কেউ ঠেকাতে পারতো!

চান্দু শেখ         :         তার মানে?

কোয়েল :         মানে তুমি ঠিকই জানো। আড়ালে-আবডালে কজনকে গায়েব করেছ জানি না। তবে এমনিতেই যা জানি, তাতেও তোমাকে যে-কোনো সময় দুর্ভোগ পোহাতে হতে পারে।

চান্দু শেখ         :         আবার সেই পুরনো খোটা। বলতে চাস তোর বাবাকে খুন করেছি।

কোয়েল :         করেছ কিনা, তুমি ভালো জান।

চান্দু শেখ         :         আর যদি করেই থাকি কি প্রমাণ আছে তোর কাছে?

কোয়েল :         এখন সে-কথা থাক। এতদিন যখন সেটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করিনি হয়তো এখন করব না। কথার কথা বললাম।

চান্দু শেখ         :         আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস?

কোয়েল :         চান্দু শেখ Ñ

চান্দু শেখ         :         কী?

কোয়েল :         আস্তানা ভেঙে ফেল।

চান্দু শেখ         :         কিসের জন্যে। তোর কথায়? মেয়েমানুষের কথায়?

কোয়েল :         কতোদিন তুমি মিথ্যে খুনের অভিযোগে ওদের এভাবে ধরে রাখবে। কোন অধিকারে?

চান্দু শেখ         :         (চটে যায়) অধিকার-অনধিকারের কৈফিয়ত দিতে হবে তোর কাছে? ভালো হবে না বলছি।

কোয়েল :         যা হয়েছে তার চেয়ে আর কী মন্দ হবে। নিজের কথা বলছি না। ওদের কথা (কিছুক্ষণ থেমে) তুমি চাও না ওরা ঘরে ফিরে যাক। ওদের রেহাই দাও।

চান্দু শেখ         :         আরে, তাতে তোর কী? তোকে মাথায় তুলে নাচবে?

কোয়েল :         লাভ নেই। এমনি। ওরা ঘরে ফিরে গেলেই ভালো মানুষ হয়ে যাবে এমন কথা নেই, তবু Ñ

চান্দু শেখ         :         তোর মাথাব্যথা কেন? ওদের তুই চিনিস না কোয়েল। হাতের কাছে পেলে নিজের বাপের বুকে ছুরি বসিয়ে দিতেও দ্বিধা করবে না।

কোয়েল :         কিন্তু চিরদিন তো ওরা এমন ছিল না। কলম ছেড়ে ছুরি ধরাতে ওদের কে শিখিয়েছে বলতে পার ওস্তাদ। (একটু থেমে নিয়ে) এ দুঃস্বপ্ন ভেঙে গেলে ওরা আবার কলম ধরবে, এ আমি বলে রাখছি। কলমের ধার ছুরির চেয়ে তীক্ষè, তা জানো ওস্তাদ?

                   (আলো স্তিমিত হয়)

অষ্টম দৃশ্য

তৃতীয় দৃশ্যের অনুরূপ দৃশ্যসজ্জা। স্টেজের বাঁ-দিক অন্ধকার। ব্যাক স্ক্রিনে সকাল বেলার ইফেক্ট। ডিভ্যানের চাদর বদলে ফেলা যেতে পারে।

তারেক  :         (চিৎ হয়ে শোওয়া অবস্থাতেই) দিব্যি আরামে আছ হে। তা কী করা হয়? লেখাপড়া করো, না?

আনওয়ার         :         হ্যাঁ, মানে আমরা আবার তোমাদের সম্পর্কে আত্মীয়। তাই বাবা বললেন দেশে তো লেখাপড়ার সুবিধে নেই।

তারেক  :         আত্মীয়, হ্যাঁ Ñ আত্মীয় (হো হো করে হাসে) হবেও বা (গম্ভীর হয়) আত্মীয়-স্বজন আর কজনকেই বা চিনি। দেশে পড়াশোনার অসুবিধে বলে এখানে এসেছ। পড়ো পড়ো, ভালো। আমার তো পোষাল না।

আনওয়ার         :         পড়াশোনা কি একেবারেই ছেড়ে দিয়েছ? তা হলে করো কী?

তারেক  :         (চট করে লাফিয়ে বসে) কোমর থেকে রিভলভার খেলাচ্ছলে উঁচিয়ে ধরে ওর সামনে) এটা চেনো?

আনওয়ার         :         (বিস্মিত হয়ে) তার মানে তুমি Ñ এপথে এলে কেমন করে?

তারেক  :         এলাম কী করে, অত কথা শুনে কী করবে। চাল বোঝ চাল Ñ দাবার চাল? চাল ভুল হয়ে গেল। বা বলতে পার হিসেবের একটু গোলমাল। হঠাৎ বড়লোক হবার শখ। টাকার নেশা।             লাখ-বেলাখের স্বপ্ন। পড়াশোনা না করে গাড়ি, বাড়ি, টাকা হয়নি? দেখনি অমন কাউকে!

আনওয়ার         :         তোমার বাবার তো কোনোটারই অভাব ছিল না।

তারেক  :         ছিল না এবং আজও নেই। তোমাকে বোঝাতেও পারব না। আমার চারপাশে সবই ছিল। তবু একসময় সব বদলে যেতে দেখলাম। যেন আমিই পড়ে রইলাম স্থির নিশ্চল জগদ্দল পাথরের মতো। তখনই ইচ্ছে হলো, চার দেয়ালের গ-ি থেকে বেরিয়ে আসি।

আনওয়ার         :         তাই বেরিয়ে এলে?

তারেক  :         হ্যাঁ। অসহিষ্ণু হয়ে উঠলাম। কখন বিশ থেকে বাইশ, বাইশ থেকে চব্বিশ, ছাব্বিশ, তিরিশ বছর অপেক্ষায় বসে থাকতে ইচ্ছে করল না। তখুনি গোটা জগৎটাকে চাইলাম নিজের হাতের মুঠোয় (খানিকক্ষণ থেমে) আজ মাঝপথে এসে তরী ভেড়ানোর উপায় নেই। চাইলেও ফিরতে দেবে না ওরা।

আনওয়ার         :         ওরা কারা?

তারেক  :         যারা একদিন আমাকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম-আয়েশের মেকি স্বপ্ন দেখিয়েছিল।

আনওয়ার         :         বেরিয়ে যেতে চেয়েছিলে, গোটা পৃথিবী ছিল। মানুষ ছিল। তাদের সঙ্গী হতে পারতে।

তারেক  :         তাই হতে চাই। বিশ্বাস করো তাই চাই। কিন্তু ওরা যেতে দেয় না।

আনওয়ার         :         কারা?

তারেক  :         যারা থেকে যেতে চায়। থেকে যাওয়া ছাড়া যাদের গত্যন্তর নেই। রক্তের দাগ যাদের হাতে।

আনওয়ার         :         তবু একবার চেষ্টা করলে পারতে Ñ

তারেক  :         সে চেষ্টা করেছিল সেলিম।

আনওয়ার         :         কে সে?

তারেক  :         আমার মতোই একজন।

তারেক  :         ওর লাশ পাওয়া গেল ঝিলের ধারে। (খানিকক্ষণ থেমে) জানো, অবাক লাগে কে কোথায় আমরা ছিটকে এলাম। তোমার এখানে থাকবার কথা নয়, অথচ তুমি থাকছ। এটা আমার ঘর, অথচ আমি আশ্রয়হীন।

আনওয়ার         :         আমি চাই তুমি বেরিয়ে আস। ঘরে ফিরে আস। তুমি ফিরে না এলে নিজের কাছে নিজেকে বড্ড অপরাধ মনে হবে।

তারেক  :         ফিরে হয়তো একদিন আসব আনু। এ পৃথিবী বদলাবে। আমি একে একে ওদের সবাইকে পরাস্ত করব। কিন্তু ততদিন কি থাকবে আমার? কিসের আশায় বেঁচে থাকব?

আনওয়ার         :         সব মানুষেরই একটা স্বপ্ন থাকে। সেটাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। তুমি তো ইচ্ছে করলে আবার স্বপ্ন দেখতে পার। সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

তারেক  :         হয়তো তোমার কথাই ঠিক। কী জানি। সকাল হয়েছে। খানিকক্ষণ পর  আমি চলে যাব আনু। পড়ে থাকবে এই ঘর, বিছানা, এই মধুময় পরিবেশ। ঘুরে বেড়াব ভীরু পলাতকের মতো। নিজের বাড়িতে এলাম। অথচ কাউকে জানিয়ে যেতে পারলাম না। কারো সঙ্গে দেখা হলো না।

তারেক জামার বোতাম ঠিক করতে থাকে।

আনওয়ার         :         এখনই যাবে নাকি। কিছুক্ষণ থাক। তোমাকে এক কাপ চা দিই।

তারেক  :         না। সকাল হয়ে এলো। আমার যাওয়া দরকার। তাছাড়া যে কাজে এসেছিলাম সেটাও তো হলো না।

আনওয়ার         :         কী কাজ?

তারেক  :         আমি ইচ্ছে করে আসিনি। আমাকে পাঠানো হয়েছিল।

আনওয়ার         :         পাঠানো হয়েছিল মানে?

তারেক  :         শুনলে মিছিমিছি কষ্ট পাবে, থাক। ওদের বিশ হাজার টাকার দরকার ছিল।

আনওয়ার         :         ওদের মানে, ও বুঝেছি। তা সেটা কি এখান থেকেই নেবার কথা ছিল?

তারেক  :         কোথাও না পেলে অগত্যা এ বাড়ি থেকেই Ñ যেতে দাও ওসব।

আনওয়ার         :         এখন কী করবে?

তারেক  :         জানি না। তুমি বড় ভালো ছেলে। তোমাকে একটা কথা বলি। না থাক।

তারেক যাবার উপক্রম করে।

আনওয়ার         :         যাচ্ছ?

তারেক  :         হ্যাঁ।

আনওয়ার         :         আবার কবে আসবে?

তারেক  :         জানি না। বেঁচে থাকলে দেখা হবেই।

আলো স্তিমিত হয়।

নবম দৃশ্য

সপ্তম দৃশ্যের অনুরূপ মঞ্চসজ্জা। ব্যাক স্ক্রিনে রাতের ইফেক্ট দেখানো যেতে পারে।

কোয়েল :         কে?

তারেক  :         ওস্তাদ নেই তো?

কোয়েল :         বাব্বা চমকে উঠেছিলাম। না, ও তো বেরিয়ে গেল। কোথায় ছিলে কাল সারাদিন সারারাত? ওস্তাদের কাজ হলো?

তারেক  :         আমাকে দিয়ে আর কিছু হবে না। কোকিল।

কোয়েল :         কোকিল নয়, কোয়েল।

তারেক  :         ওই এক কথাই। বিশ্বাস করো, চেষ্টার ত্রুটি করিনি।

কোয়েল :         আমাকে না বলে সে কথা ওস্তাদকে বলো।

তারেক  :         ওস্তাদকে বলা আর তোমাকে বলাতে তফাৎটা কোথায়? তোমরা একই টাকার দুপিঠ। (কিছুক্ষণ কী ভেবে নিয়ে) বেশ আছ তোমরা দুটিতে। তবে একদিন কড়ায়-গ-ায় সব চুকিয়ে দিতে হবে। এমনিতে পার পাবে না কেউ বলে দিলাম।

কোয়েল :         হঠাৎ আমাকে এসব বলছ যে।

তারেক  :         তুমি যে ওর বাঁজা মেয়েমানুষ। তোমাকে বলব না তো কাকে বলব? (খানিকক্ষণ থেমে প্রসঙ্গান্তর টেনে) আসলে আমি ক্লান্ত কোয়েল।

কোয়েল :         ক্লান্ত সবাই। যার ভালো না লাগে সে এপথ ছেড়ে দিলেই পারে।

তারেক  :         পারে। আমিও পারতাম। পারি না শুধু প্রাণের ভয়ে।

কোয়েল :         প্রাণের ভয় আমার নেই? ভয় তোমার একার?

তারেক  :         তুমি পালাতে চাও?

কোয়েল :         চাইলে আগেই পালাতাম। পালিয়ে লাভ নেই।

তারেক  :         তা থাকবে কেন। তোমরাই তো জিইয়ে রেখেছ এ আস্তানা।

কোয়েল :         আমি চলে গেলে এ আস্তানা থাকবে না জানলে আমি আজই চলে যাই।

তারেক  :         কিন্তু আমার কী হবে কোয়েল, আমি যে ওস্তাদের টাকা জোগাড় করতে পারিনি।

কোয়েল :         বলো কি! অগত্যা ইফতেখার সাহেবের কাছে হাত পাতলেই পারতে। নিজের ছেলের বিপদের কথা ভেবে নিশ্চয়ই নিরাশ করতেন না।

তারেক  :         গিয়েছিলাম। নিজের বাড়িতে ঢুকেছি চোরের মতো গা ঢাকা দিয়ে।

কোয়েল :         তাহলে টাকাটা আনতে পারলে না কেন?

তারেক  :         জানি না কোয়েল। হয়তো জোর করেই নিতে পারতাম। হয়তো তাও দরকার হতো না। চাইলেই পেতাম। কিন্তু কোনোমতেই পারলাম না। দিনের পর দিন একটা ঘৃণ্য মানুষের ইচ্ছের ক্রীতদাস হয়ে থাকতে মন চাইল না।

কোয়েল :         (হেসে উঠল)

তারেক  :         হাসছ কেন?

কোয়েল :         তাহলে খালি হাতেই ফিরে এলে?

তারেক  :         আমি এসব পারি না কোয়েল, সত্যি পারি না। আমার কোনো কিছুর দরকার নেই। ধন-সম্পদ, বৈভব, প্রতিপত্তি কোনো কিছুই নয়। আমি এসব থেকে মুক্তি চাই। বাবার øেহ চাই, মায়ের আদর চাই। বোনের ভালোবাসা চাই। আস্তানা নয়, ঘর চাই Ñ

কোয়েল :         কার কাছে আবেদন করছ?

তারেক  :         কার কাছে করতে হবে?

কোয়েল :         সেটা জানলে এতদিন আমার আর্জিটা কবে জানিয়ে রাখতাম। তবে কথা কী জানো, ছুটি একদিন না একদিন সবাই পাবে। তবে এক একজনের ছুটির ধারা এক একরকম।

তারেক  :         আচ্ছা কোয়েল তুমি তো ওস্তাদের অনেক কিছু জান। ওস্তাদ তোমাকে অনেক কিছু বলে। আমার নামে নাকি বারোটা কেস ঝুলছে একথা সত্য?

কোয়েল :         সত্যি-মিথ্যের ধার ধারে না কেউ এ জগতে। ওসব যাচাই করতে যেও না।

তারেক  :         আমি, আমি নিজে গিয়ে যদি ধরা দিই Ñ

কোয়েল :         তোমার খুশি।

তারেক  :         (কী মনে করে, প্রসঙ্গান্তর টেনে) আচ্ছা কোয়েল আমার না হয় ভীমরতি ধরেছিল। কিন্তু তোমার মতো সরলমতি মেয়ে এ পথে পা বাড়ালে কেন?

কোয়েল :         পা বাড়াইনি। এটা একটা অবস্থা তারেক।

তারেক  :         এ অবস্থার অবসান চাও না?

কোয়েল :         আমি, তুমি আমরা সবাই একই সুতোয় বাঁধা তারেক। একজন সরে গেলে সুতোয় টান পড়ে। যে এই সুতো ধরে বসে, সে তা চায় না। চান্দু শেখের জায়গায় হলে হয়তো তুমিও চাইতে না।

তারেক  :         (অন্যমনস্ক) কী বললে?

কোয়েল :         আর চান্দু শেখ তো নিছকই একটি ব্যক্তি নয়। একটি বিশেষ সমাজের প্রতিভু। সে সমাজ থেকে আমরা মুক্তি না পেলে কেবলই এক বাঁধন থেকে অন্য বাঁধনে জড়িয়ে পড়ব। আচ্ছা তারেক, মানুষ তো ভুল থেকে শেখে। তুমি আমি আমরা কি পারি না সব লোভ আর লালসার ঊর্ধ্বে সুন্দর মহৎ জীবনের স্বপ্ন দেখতে? (খানিকক্ষণ থেমে) কী, কিছু বলছ না যে?

তারেক  :         (তারেককে এ সময় অত্যন্ত চঞ্চল ও অসহিষ্ণু মনে হবে। সে দ্রুত পায়চারি করতে থাকে) কোয়েল!

কোয়েল :         কী?

তারেক  :         কাল থেকে আমার পেটে তেমন কিছু পড়েনি। দিতে পার কিছু?

কোয়েল :         এতক্ষণ বলনি কেন। বসো আসছি।

                   (তারেক এ অবসরে ঘরময় পায়চারি করতে থাকে। এক সময় দেয়ালে টাঙ্গানো চান্দু শেখের একটা ছবির সামনে এসে দাঁড়ায়। চান্দু শেখের ক্রূর মূর্তি ও ধূর্ত হাসি তাকে আতঙ্কিত করে। কোয়েল পেছনে থেকে প্লেটে কিছু খাবার সাজিয়ে নিয়ে ঢোকে) যা ছিল ঘরে। নাও।

তারেক  :         (দ্বিধাগ্রস্ত চিত্তে প্লেটখানা হাতে নিয়ে) জানো, আমি কারো কাছে কোনোদিন চেয়ে খাইনি।

কোয়েল :         (গ্লাসে পানি ঢালতে থাকে) সে তুমি না বললেও বুঝতে অসুবিধে হয় না। খাও।

তারেক  :         খাব? চান্দু শেখ যদি রাগ করে?

কোয়েল :         চান্দু শেখ রাগ করতে যাবে কোন দুঃখে? আর ওর রাগের আমি থোড়াই পরোয়া করি।

                   (চান্দু শেখের প্রবেশ)

চান্দু শেখ         :         তা তো করবেই না। এখন তো সবার প্রয়োজন ফুরিয়ে এসেছে। (তারেককে, স্বর চড়িয়ে) যে কাজের জন্য পাঠিয়েছিলাম তার কী হলো?

কোয়েল :         সে সব কথা পরে। এখন ওকে খেতে দাও।

চান্দু শেখ         :         খেতে দাও! (হ্যাঁচকা টানে তারেককে খাবার পাত থেকে তুলে আনে) আসল কাজের হদিস নেই। উলটো মহব্বতের খেলা জমিয়ে তুলছ চাঁন!

কোয়েল :         থামো, যা-তা বকো না। ওকে ছেড়ে দাও।

চান্দু শেখ         :         (এক হাতে তারেককে ধরে রেখে) না, ওর সঙ্গে আমার          হিসেব-নিকেশ আছে।

কোয়েল :         সে-রকম হিসেব-নিকেশ তোমার সঙ্গেও আমার আছে।

চান্দু শেখ         :         (তারেককে ধরে রেখে) তার মানে?

কোয়েল :         সময় আসুক। জানতে পারবে।

                                 আলো স্তিমিত হয়।

দশম দৃশ্য

(নবম দৃশ্যের অনুরূপ)

তারেক  :         ওস্তাদ আমাকে ছেড়ে দাও। আমাকে দিয়ে এসব কাজ হবে না।

চান্দু শেখ         :         এতদিন হলো কী করে?

তারেক  :         জানি না।

কোয়েল :         ওকে ছেড়ে দাও চান্দু শেখ।

চান্দু শেখ         :         (ছেড়ে দিয়ে) ছেড়ে দেব? বেশ ছেড়ে দিলাম। তারপর বলিস না কোয়েল, কে ওর লাশ ফেলে গেল।

তারেক  :         ওস্তাদ তুমি আমাকে মারবে?

চান্দু শেখ         :         না, আদর করব।

কোয়েল :         ওসব বিপজ্জনক খেলা খেলতে যেও না ওস্তাদ। খামোকাই         ঝুট-ঝামেলায় পড়বে।

চান্দু শেখ         :         এর আগে তো পড়িনি।

কোয়েল :         কারণ তখন কোয়েল তোমার সঙ্গে ছিল।

চান্দু শেখ         :         কেন, কেটে পড়ার মতলব করছিস নাকি?

কোয়েল :         ওস্তাদ এখানে কেউ সারাজীবনের ঠিকে নিয়ে আসেনি। আর যখন কাজ ফুরোয়, চলে যাবে।

চান্দু শেখ         :         তোরও কাজ ফুরিয়েছে নাকি?

কোয়েল :         না, একটা কাজ এখনো বাকি। ওই যে বলছিলাম, একটা হিসেবের বোঝাপড়া।

চান্দু শেখ         :         কী বলছিস তুই। আমার সঙ্গে আবার কিসের বোঝাপড়া?

কোয়েল :         নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্যই মারা পড়লে তুমি। (হঠাৎ চান্দু শেখের গলার প্রতি দৃষ্টি বিদ্ধ হয়। তারপর একসময় এগিয়ে এসে ওর সোনার চেনখানা ধরে ফেলে) এটা আমার বাবার। প্রাণে না মরলে বাবা এটা হাতছাড়া করত না। আরো প্রমাণ চাই?

চান্দু শেখ         :         হাত সরা বলছি।

চান্দু শেখ ওকে ছিটকে ফেলে দেয়। কোয়েল পড়ে যায়।

তারেক  :         ওস্তাদ!

কেউ সে কথায় ভ্রƒক্ষেপ করে না।

কোয়েল :         (উঠে দাঁড়ায়) মারবে আমাকে। (হেসে ওঠে) এত সহজেই বোঝাপড়াটা হয়ে যাচ্ছে। ভালো। জানো মানুষ কখনো কখনো বড় অসহায়, বড় দুর্বল। আবার অন্য সময় পরম সাহসী, পরম শক্তিশালী। (্এক পা দুপা করে এগিয়ে গিয়ে চেনখানা টেনে ছিঁড়ে ফেলে কোয়েল। চান্দু শেখ প্রথমে ব্যথায় গলায় হাত দেয়। তারপর ক্ষিপ্ত হয়ে চেনখানা উদ্ধার করতে চায়, পারে না। কোয়েল ওখানা তারেকের হাতে ছুড়ে দেয়) (তারেককে) খোল, খোল তো ওই লকেটটা। (তারেক খুলে ফেলে। একটি ছোট্ট মেয়ের ছবি তাতে) এখনো চিনতে অসুবিধে হচ্ছে? নাও             (ওস্তাদের দিকে ছুড়ে ফেলে) সেদিনের ওই মেয়েটি, যাকে তার বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছিলে, তার সঙ্গে আজকের কোয়েলের চেহারা মিলিয়ে মনের খেদ মিটিয়ে নাও। (উত্তেজনায় কোয়েল কাঁপতে থাকে। ঘনঘন নিশ্বাস পড়ে) প্রমাণ, তুমি আবার প্রমাণ চাও! যে প্রমাণ গলায় ঝুলিয়ে ঘুরছিলে সেটা ফাঁসির দড়ি হয়ে ঝোলেনি সেটাই পরম সৌভাগ্য ওস্তাদ।

চান্দু শেখ         :         কবে ফাঁসির দড়ি ঝুলবে সে আশায় রয়েছিস?

কোয়েল :         ক্ষতি কি! মানুষের আশা থাকতে নেই? তোমার আশা নেই? চলো তারেক।

কোয়েল তারেককে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে যাবার উপক্রম করে।

চান্দু শেখ         :         না, কোথাও যেতে হবে না।

প্রথম সহচর দৌড়ে এসে ঢোকে।

প্রথম সহচর      :         ওস্তাদ সর্বনাশ হয়েছে। মালের গাড়ি নিয়ে সরে পড়েছে।

চান্দু শেখ         :         বলিস কি! জাহাজঘাটে কে ছিল?

দ্বিতীয় সহচর     :         আমরা সবাই ছিলাম। জাহাজের কাপ্তানকে মালপানি খাইয়ে হুঁশিয়ারির সঙ্গে নাবিয়েছিলাম। কেউ দেখতে পায়নি। কালু মিঞা আর কাসেম আলী বলল, তোরা যা। আমরা ওস্তাদের কাছে আসছি।

চান্দু শেখ         :         তারপর?

দ্বিতীয় সহচর     :         তারপর আর কী। এই মাত্র খবর পেলাম কেটে পড়েছে। ওস্তাদ পুরো মাল নিয়ে লা-পাত্তা। সুতোর এ চালান বাজারে ছাড়তে পারলে কম করে হলেও নগদ দেড় লাখ টাকা।

চান্দু শেখ         :         আমার সঙ্গে বেইমানি? চল্ (চান্দু শেখ দেয়ালের কোনে রাখা বন্দুক তুলে নেয়। দ্বিতীয় সহচর ছুটে আসে।)

দ্বিতীয় সহচর     :         (চান্দু শেখকে ধরে ফেলে) এসব পাগলামি করো না ওস্তাদ। খামোকা হইচই বাঁধবে। আশেপাশে পুলিশ ঘুরে বেড়াচ্ছে।

চান্দু শেখ         :         ঘুরে বেড়াক। আমি আজ এর একটা হিল্লে না করে ছাড়ব না।

প্রথম সহচর      :         ওস্তাদ, আমরা সবাই বিপদে পড়ে যাব।

চান্দু শেখ         :         বিপদের কী বাকি আছে। (প্রথম সহচরকে) চলো। (যেতে যেতে ফিরে আসে। দ্বিতীয় সহচারকে) তুই এখানে থাক, ওদের ওপর চোখ রাখ। কোয়েল, আমাকে বিপদে ফেলে কেউ প্রাণে বাঁচবে, এ দুরাশা। (প্রথম সহচরকে নিয়ে চান্দু শেখের প্রস্থান। দ্বিতীয় সহচর ঘরে থেকে যায়। অনেকক্ষণ কোনো অ্যাকশন নেই। তারেক কোয়েলের কাছে এসে বসে।)

তারেক  :         আমাদের কী হবে? আমরা কী করব?

কোয়েল :         কিছু একটা হবে তারেক। ঘড়ির কাঁটার মতো আমরা অপেক্ষা করব। আমরা এখন ইচ্ছে করলেও কিছু ঘটাতে পারব না। কিছু ঘটলেও ঠেকাতে পারব না।

তারেক  :         তা ঠিক।

কোয়েল :         আমি শুধু সময় গুনছি (লকেট লাগানো গলার মালা তুলে নিয়ে ঘড়ির দোলকের মতো দোলাতে থাকে) সময়ের সঙ্গে মানুষের বড্ড মিল। মানুষের মতো সেও এক সময় ফুরোয়।

তারেক  :         ফুরিয়েই শেষ?

কোয়েল :         শেষ হাতে যাবে কেন? আমি তো কতবার ফুরিয়েছি। কতবার নিবেছি। শেষ হইনি। আবার জ্বলে উঠেছি।

তারেক  :         বললে যে, সময় ফুরোয়।

কোয়েল :         হ্যাঁ, সময় ফুরোয়। কারো কারো জন্যে ফুরোয়। কারো কারো জন্যে আবার নতুন করে শুরু হয়। (বাইরে হইচই শোনা যায়। আহত অবস্থায় প্রথম সহচরের কাঁধে ভর করে চান্দু শেখ এসে ঢোকে। দ্বিতীয় সহচর, যে এতক্ষণ চুপচাপ বসেছিল ওস্তাদের সামনে এগিয়ে যায়। ধরাধরি করে বসায় দুজন।)

চান্দু শেখ         :         (দুহাত দিয়ে পা চেপে ধরে। ক্ষতস্থানে রক্ত) কোয়েল, কোয়েল আমার পা। আমি যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছি।

প্রথম সহচর      :         কেমন করে, কেমন করে ব্যথা পেলে ওস্তাদ।

দ্বিতীয় সহচর     :         জানি না। অন্ধকারে একটা গুলি এসে লাগল পায়ে। সেখানেই পড়ে গেল ওস্তাদ। আমি কোনোরকম ধরাধরি করে আনলাম।

কোয়েল হাতপাখা নিয়ে হাওয়া করতে থাকে।

চান্দু শেখ         :         (যন্ত্রণায় কাতর) কোয়েল আমার পা। আমার পা। আমি যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছি। আমাকে, আমাকে ধর। আমার কী হবে?

প্রথম ও দ্বিতীয় সহচর পরিচর্যায় ব্যস্ত। তারা পায়ে একটা ব্যা-েজ বাঁধে। কোয়েল গভীর মনোযোগের সঙ্গে ক্ষতস্থান দেখে।

কোয়েল :         কিছু হয়নি। মারা যাওনি ওস্তাদ। তুমি আবার বেঁচে গেলে। তবে সম্ভবত, সম্ভবত Ñ

চান্দু শেখ         :         সম্ভবত কী?

কোয়েল :         নিচের আর্দ্ধেকটা কেটে ফেলে দিতে হবে। ওই পা নিয়ে আর দাঁড়াতে হবে না।

চান্দু শেখ         :         (ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে) তবে? না না, কোয়েল তা হয় না। সারা জীবন আমি লাঠি হাতে অসহায়ের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে পারব না। তার চেয়ে তুই যেমন চেয়েছিলি আমাকে মেরে ফেল, কোয়েল। মেরে ফেলো।

কোয়েল :         মুক্তি সহজে পাওয়া যায় না ওস্তাদ। দেখলে তো আমরা চাইলাম পেলাম না। তুমি চাইছ পাচ্ছ না। তার জন্য সারা জীবন সাধনা করেও তীর্থের কাকের মতো বসে থাকতে হয়। তবে শুরু হলে তার শেষ আছে। ওই যে বললাম মানুষের মতো সময়ও একসময় ফুরিয়ে আসে।

পুলিশের প্রবেশ। একজন ইন্সপেক্টর ও দুজন কনস্টেবল।

পুলিশ   :         (কোয়েল ও তারেককে দেখে) আপনাদের সবাইকে যেতে হবে আমাদের সঙ্গে।

কোয়েল :         যেতে হবে? আমরা তো যেতেই চেয়েছিলাম।

কোয়েল হাসতে থাকে। এক সময় তারেকও তার সঙ্গে যোগ দেয়।

ইন্সপেক্টর         :         কী ব্যাপার? কী দেখছ? ভয় করছে?

চান্দু শেখ         :         আজ আমার সত্যি ভয় করছে ইন্সপেক্টর। দেখছেন না ওরা কীভাবে হাসছে।

ইন্সপেক্টর         :         মানুষের হাসি দেখলে ভয় হয় এমন তো শুনিনি।

চান্দু শেখ         :         এ হাসি আমি সইতে পারছি না। থাম কোয়েল। আমার ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে।

কোয়েল :         জ্বলতে দাও। তোমার ভেতরে আগুন ছিল ওস্তাদ। যে আগুন আলো দিতে পারত। কিন্তু তুমি তো নিজের আগুনে নিজে জ্বললে। জ্বালালে সবাইকে। তুমি পারলে না জঞ্জাল পুড়িয়ে ছাই করে দিতে। পারলে না সে আগুনে নিজে খাঁটি হতে, আমাদের খাঁটি করতে। বড্ড হাসি পায় ওস্তাদ। ভাগ্যের কী প্রহসন।

আলো স্তিমিত হয়।

একাদশ দৃশ

(মঞ্চসজ্জা দ্বিতীয় দৃশ্যের অনুরূপ)

ড্রাইভার :         বুবুমণি আমাকে ডেকেছিলেন। আজ কোথায় নিয়ে যেতে হবে?

বেবী     :         ড্রাইভারভাই, তার আগে একটা কথা বলতে হবে।

ড্রাইভার :         কী কথা?

বেবী     :         আমাদের আনুভাই কোথায় যায় জানো?

ড্রাইভার :         কোথায় আবার, কলেজে। মাঠে-ময়দানে যায়, দোকানে যায়। শওকৎ সাহেবের ওখানেও যায়।

বেবী     :         দূর সে তো আমিও জানি। বিকেলে কোথায় যায়?

ড্রাইভার :         তা তো জানি না। তবে হ্যাঁ, একদিন আমাকে বলেছিল, বলেছিল কাশিপুর লেনে নাবিয়ে দাও। ওইদিকে যাচ্ছিলাম কিনা।

বেবী     :         জায়গাটা চেন?

ড্রাইভার :         খুঁজে বার করতে পারব।

বেবী     :         ওই কাশিপুর লেনে আমাকে নিয়ে যাবে?

ড্রাইভার :         তোমাকে নিয়ে যাব কেমন করে? শেষটায় বকুনি খাই আর কী। বিকেলে তো তোমাকে পার্কে নিয়ে যাবার কথা।

বেবী     :         না, আনুভাই যেখানে যায় সেখানে যাব।

ড্রাইভার :         ও তো সেখানে পড়াতে যায়।

বেবী     :         আমিও যাব। দেখেছ তুমি কাকে পড়ায়?

ড্রাইভার :         যে মেয়েটা দরজা খুলে দিলো সেই হবে। তোমারই মতো। না না তোমার মতো অমন সুন্দর না।

বেবী     :         সত্যি বলছ? বানিযে বলছ না তো?

ড্রাইভার :         না না।

বেবী     :         তুমি বসো আমি রেডি হয়ে আসছি। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে পার্কে নিয়ে যাচ্ছ।

বেবীর প্রস্থান। আনওয়ারের প্রবেশ।

ড্রাইভার :         অনেকদিন বাঁচবেন স্যার। আপনার কথা হচ্ছিল।

আনওয়ার         :         আমার কথা?

ড্রাইভার :         বুবুমনি জিজ্ঞেস করছিল বিকেলে আপনি কোথায় যান?

আনওয়ার         :         তারপর?

ড্রাইভার :         আমি বলতে চাইনি।

আনওয়ার         :         অথচ কথাটা বার করে নিল এই তো। তা তুমি কী বললে?

ড্রাইভার :         আমি আর কি বললো। আপনি যে পড়াতে যান বুবুমনি ঠিক ধরে ফেলেছে।

আনওয়ার         :         বললেই পারতে বাড়ি চিনি না।

ড্রাইভার :         সেটাই তো বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বুবুমণির জেরার চোটে Ñ

আনওয়ার         :         সেটাও বলে ফেলেছ?

বেবী     :         (নেপথ্যে) ড্রাইভার ভাই, ড্রাইভার ভাই।

ড্রাইভার :         আমাকে ডাকছে। চলি স্যার।

আলো স্তিমিত হয়।

দ্বাদশ দৃশ্য

প্রায় ষষ্ঠ দৃশ্যের অনুরূপ। পার্টিশনের প্রথম অংশের ডিজাইন পরিবর্তিত হবে। বাংলা ক্যালেন্ডার এবং হাতের এম্ব্রয়ডারি করা বাঁধানো ফ্রেমের নকশা কাট আউটে তৈরি করে লাগিয়ে দিতে হবে এবার। রীতা এবং বেবী মঞ্চের বাঁ-ধারে রাখা চেয়ারে বসে কথা বলবে।

রীতা     :         তোমাকে তো চিনলাম না।

বেবী     :         তুমি রীতা না?

রীতা     :         হ্যাঁ।

বেবী     :         আমি তোমাকে চিনি। তুমি ক্লাস এইটে পড়। আনুভাই তোমাকে পড়ায়।

রীতা     :         এতসব জানলে কী করে?

বেবী     :         (আত্মপ্রসাদের সুরে) জানি।

ভেতর থেকে রীতার মা বেরিয়ে আসে।

রীতার মা :         গাড়ি করে কে এলো, তুমি?

বেবী     :         হ্যাঁ।

বাইরে হর্নের আওয়াজ এবং লোকজনের চিৎকার শোনা যাবে।

রীতার মা :         গাড়িটা তোমাদের? একটু সরিয়ে রাখতে বলো মা। একেবারে গলির মুখে কিনা। রিকশা-গাড়ি চলতে পারছে না।

বেবী     :         বলে দিচ্ছি। ড্রাইভারভাই গাড়িটা একটু সরাতে হবে।

রীতার মা :         সরু গলি তো। মানুষ হাঁটবারই জায়গা নেই। গাড়ি-ঘোড়া তো দূরের কথা। (একটু থেমে) তা তুমি বুঝি রীতার সঙ্গে পড়ো?

বেবী     :         না রীতার সঙ্গে নয়। এক ক্লাসে।

রীতার মা :         তোমাকে একটু সরবত দিই?

বেবী     :         না।

রীতার মা :         বেলের সরবত।

বেবী     :         জি-না। বেলের, ঘোলের, আমের, দুধের, কলার কোনোটাই না। (রীতাকে) ওসব আনুভাইকে খাওয়াও।

রীতার মা :         তাহলে মুড়ি খাও।

মুড়ি এনে দেয়।

                   কোরা নারকেল আর চিনি মাখানো। একটু মুখে দাও মা।

বেবী     :         (খানিকটা মুড়ি তুলে নিয়ে রীতাকে) আমি বসব না। তোমার সঙ্গে দুটো কথা বলে চলে যাব। আনুভাই তোমাদের বাসায় আসে কেন?

রীতা     :         বা রে, আমাকে পড়ায়।

বেবী     :         তা, আমাকে না পড়িয়ে তোমাকে পড়াতে যাবে কেন?

রীতা     :         সেকথা আমি কেমন করে বলব।

বেবী     :         আনুভাই কাল থেকে আসবে না।

রীতা     :         (কাঁদো কাঁদো স্বরে) কেন? কেন আসবে না?

বেবী     :         তুমিই বা কাঁদতে যাবে কেন?

রীতা     :         (চোখ মুছে নিয়ে) আমি কাঁদিনি। কাঁদতে আমার বয়ে গেছে।

বেবী     :         তাহলে সেদিন মোরব্বা খাইয়েছিলে কেন?

রীতা     :         কে বলল?

বেবী     :         তার আগের দিন সেমাই খাইয়েছিলে। খাওয়াওনি? মিথ্যে বলো না। জানো, এক একটা মিথ্যে বললে আশি বছর আয়ু কমে যায়।

রীতা     :         (ভয় পেয়ে) সবটা তো খায়নি। আর্দ্ধেকটা খেয়েছে।

বেবী     :         তা খাক। আর্দ্ধেকটাই বা খাওয়াতে যাবে কেন?

রীতা     :         খাওয়ালে কোনো দোষ হয়?

বেবী     :         নিশ্চয়ই হয়। আমার আত্মীয়, আমার আত্মীয়কে তুমি খাওয়াবে কেন?

রীতা     :         ইস্, আত্মীয়। আত্মীয় হলে পড়াতে আসে কেন? আরো একটা ট্যুইশানি করে জানো?

বেবী     :         জানো কাকে পড়ায়, ছেলে না মেয়ে?

রীতা     :         না তো, তবে আমার মনে হয় মেয়েই হবে।

বেবী     :         আমাকে জেনে বলবে?

রীতা     :         বলব।

বেবী     :         তাহলে ঠিক আছে। তোমার সঙ্গে আমার ভাব হয়ে গেল। তুমি আমাকে সব খবর দেবে। তোমাকে পড়াক আনুভাই, আপত্তি নেই। আর কোথায় যায় বললে? দেখো তো যদি মেয়ে হয়, হিংসুটে কি না। আর নাম, ওর নামটাও জানিও।

রীতা     :         আমি তোমাকে সব জানাব।

বেবী     :         তাহলে তোমাকে একটা খবর দিই। জানো আনুভাই সাহানা আপাদের বাসায়ও যায়।

রীতা     :         সাহানা আবার কে?

বেবী     :         তুমি চিনবে না। ওর ভাই অফিসে কাজ করে।

রীতা     :         ওখানে আবার যায় কেন? তুমি মানা করে দিলেই পার।

বেবী     :         ইস, আমার কথা শুনতে বয়ে গেছে। থাক না, শুধু আমার সম্বন্ধে কিছু না বললেই হলো।

রীতা     :         তোমার সম্বন্ধে বলে?

বেবী     :         তাহলে কি তোমার সম্বন্ধে বলবে?

রীতা     :         ওরা আমার তোমার কারো সম্পর্কেই বলে না। নিজেদের কথা বলে।

বেবী     :         কী কথা, তুমি একবার জিজ্ঞেস করো তো, কায়দা করে।

রীতা     :         না বাবা, কী বলব কী ভেবে বসবে। কাজ নেই। (একটু থেকে নিয়ে) আচ্ছা ওদের মধ্যে খুব ভাব, না?

বেবী     :         ওদের মধ্যে মানে?

রীতা     :         এই তোমার সাহানা আপা আর আনুভাইয়ের মধ্যে।

বেবী     :         হবেও বা। আমি কি জানি। একবার জিজ্ঞেস করে দেখ না। বলতে যেওনা আমার কাছ থেকে শুনেছ।

রীতা     :         তাহলে উলটো জানতে চাইবে না কেমন করে জানলাম?

বেবী     :         থাক তাহলে দরকার নেই। তবে সাহানা আপা মেয়েটা তো খারাপ নয়। (কিছুক্ষণ থেমে) আসলে তুমি যে মোরব্বা-সেমাই খাওয়াও, শুধু শুধু।

রীতা     :         আমি কি কিছু মনে করে খাওয়াই? এমনি খাওয়াই।

বেবী     :         থাকগে এসব বড়দের ব্যাপারে আমাদের না থাকাই ভালো।

রীতা     :         ঠিক বলেছ। সেই ভালো।

বেবী     :         তোমার মাকে বলো আমি সরবত খাব।

রীতা     :         কিসের সরবত?

বেবী     :         বেলের, ঘোলের, দুধের, আমের একটা হলেই হলো।

আলো স্তিমিত হয়।

ত্রয়োদশ দৃশ্য

(মঞ্চসজ্জা দ্বিতীয় দৃশ্যের অনুরূপ)

আনওয়ার         :         সেদিন রীতাদের বাড়িতে গিয়েছিলে?

বেবী     :         যাই না যাই তোমার কী। তোমাকে বলে যেতে হবে?

আনওয়ার         :         সেজন্যে নয়। তুমি নাকি বলেছ আমি ওখানে আর যাব না।

বেবী     :         তা তো যাবেই না।

আনওয়ার         :         (বই বন্ধ করে) কেন যাব না? তুমি বললেই হলো?

বেবী     :         আলবৎ। আমি বললেই হয়। এ বাড়িতে আমি যা বলি তাই হয়।

আনওয়ার         :         (আমতা আমতা করে) তা যারা যারা এ বাড়ির, তারা তোমার হুকুমে খাটুকগে। আমি এ বাড়ির কেউ নই।

বেবী     :         ব্যস, তুমি ওখানে যাবে না।

আনওয়ার         :         কেন যাব না?

বেবী     :         (হঠাৎ স্বর পরিবর্তন করে) ওদের বাড়ির সামনে গাড়ি রাখলে রাস্তা আটকে থাকে।

আনওয়ার         :         আমি গাড়ি নিয়ে যাই না।

বেবী     :         একদিন গিয়েছিলে।

আনওয়ার         :         সেদিন বৃষ্টি ছিল।

বেবী     :         এমনিতেও যাবার দরকার নেই। কেন যাও?

আনওয়ার         :         পড়িয়ে পয়সা পাই সেজন্যে।

বেবী     :         পয়সা দরকার বলো না কেন?

আনওয়ার         :         কাকে বলব। পাড়া-পড়শিকে ডেকে বলব?

বেবী     :         (অত্যন্ত সোহাগের সুরে) কেন আমাকে বলবে। আমি বলে দেব।

আনওয়ার         :         না না, কোনো দরকার নেই। বলতে হয় আমিই ইফতেখার সাহেবকে বলতে পারি।

কাসেম আলীর প্রবেশ।

কাসেম  :         বুবুমণি আপনাকে ডাকছেন।

বেবী     :         কে?

কাসেম  :         সাহেব, চেম্বারে।

বেবী     :         আমাকে, ভারি মজা তো। আচ্ছা শুনে আসি। মনে থাকবে, ওখানে যাবে না। (কী ভেবে নিয়ে) দাঁড়াও, দাঁড়াও। যেতে পার যেতে পার। রীতা মেয়েটা ভালোই। কিন্তু তাই বলে তুমি পারভিনদের ওখানে যাবে না। যদি যাও, যদি যাও, আমি ওই মেয়েটার চুল ছিঁড়ে ফেলব।

কাসেম  :         আসেন বুবুমণি।

বেবীর প্রস্থান এবং সে-সঙ্গে কাসেম আলীর। কিছুক্ষণ পর শওকতের প্রবেশ।

শওকৎ  :         আরে, এই যে। আসব নাকি?

আনওয়ার         :         আসুন, আসুন। সেদিনের পর তো আর দেখাই হলো না।

শওকৎ  :         রোজই আসব ভাবি Ñ

আনওয়ার         :         আপনি তো ব্যস্ত থাকেন। কাজেরও তো শেষ নেই।

শওকৎ  :         আসলেও তাই। আমি তো সব সময়ই বলি, স্যার আমাকে বিদেয় দিন।

আনওয়ার         :         তবু তো রয়ে গেলেন।

শওকৎ  :         হুঁ, সেই তো দেখুন না। না না করে বারো বছর কেটে গেল। (খানিকক্ষণ থেমে) জানেন সাহানা মানে আমার বোন বলে, যতই চেঁচাও, যতই গর্জাও, তোমার নিস্তার নেই।

আনওয়ার         :         আমার মনে হয় ছাড়তে চাইলে একবার সাহস করে Ñ

শওকৎ  :         সাহসটাই তো নেই। সাহস নেই। একটা কথা বলব, রাগ করবেন না তো?

আনওয়ার         :         না না, বলুন।

শওকৎ  :         যা কিছু করার, সাহস ফুরোবার আগেই করুন। আমার মতো বসে থাকবেন না।

কাসেম আলীর প্রবেশ। কাসেম আলী এবার কোনো কথা বলবে না। শুধু ইঙ্গিতে জানাবে শওকৎকে ডাকা হয়েছে।

                   ওই দেখুন আবার ডাক পড়েছে।

                   (ফাইলপত্র গুছিয়ে নিয়ে শওকৎ বেরিয়ে যায় এবং প্রায় একই সঙ্গে বেবী এসে ঢোকে। এবার খানিকটা বিষণœ চেহারা। কিছুক্ষণ কথা নেই।)

আনওয়ার         :         কী হয়েছে, কিছু বলছ না যে?

বেবী     :         আনুভাই সব কথা পালটে নিলাম। তুমি যেখানে খুশি যেতে পার। আমার কী। তুমি জাহান্নামে যাও।

আনওয়ার         :         হঠাৎ তুমি রাগ করে বসলে?

বেবী     :         আমি রাগ করলে করলাম। তোমার কী?

আনওয়ার         :         না, তুমি তো আমার ভালোর জন্যেই বলেছ।

বেবী     :         আমি কারো ভালো-মন্দের জন্যে বলি না। কেন বলতে যাব। তুমি আমার আত্মীয়?

আনওয়ার         :         তবে কী?

বেবী     :         আমি কী জানি। আমি কারও কিছু না।

আনওয়ার         :         কারো কিছু না মানে। এই বললে তোমার হুকুমে সবাই চলে, বাড়িসুদ্ধ। বলোনি?

বেবী     :         বলেছিলাম। তোমাকে রাগাবার জন্যে বলেছিলাম।

আনওয়ার         :         ও।

বেবী     :         আর তাছাড়া আমি থাকছি না বেশিদিন।

আনওয়ার         :         থাকছ না মানে?

বেবী     :         চলে যাচ্ছি।

আনওয়ার         :         কোথায়? ফিরে আসবে নিশ্চয়ই?

বেবী     :         আর আসব না। আমি চলে গেলেই তো সবাই খুশি।

আনওয়ার         :         সেটা কি করে জানলে?

বেবী     :         আমি যে জ্বালাই।

আনওয়ার         :         আমি ওসব গায়ে মাখি না।

বেবী     :         (চারদিক চেয়ে নিয়ে) একটা কথা বলি। কাউকে বলবে না তো?

আনওয়ার         :         না, আমি আর কাকে বলব।

বেবী     :         শোন, শোন, আস্তে আস্তে বলি। আমাকে না বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

আনওয়ার         :         বাইরে মানে?

বেবী     :         আমি কী জানি। আমাকে ডেকে বলল, তোমাকে পড়াশোনার জন্যে আমরা বিদেশে পাঠাচ্ছি।

আনওয়ার         :         ইফতেখার সাহেব নিজে বললেন?

বেবী     :         (হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ে)

আনওয়ার         :         তা যাচ্ছ কোথায়?

বেবী     :         ভ্যাঙ্কুভার বলে একটা জায়গা আছে কানাডায়, সেখানে। সেখানকার হাসপাতালে আবার আমার মামা কাজ করেন কিনা। মামার সঙ্গেই থাকব।

আনওয়ার         :         তাহলে তো ভারী মজা। কবে যাচ্ছ?

বেবী     :         পরশু। মজা না ছাই। আমি থোড়াই যেতে চাই। (হঠাৎ কী ভেবে) তোমাকেই বললাম। এখনো কেউ জানে না। রীতা শুনলে তো কেঁদেই ভাসিয়ে দেবে। যাই আমার অনেক কাজ।

বেবীর প্রস্থান। শওকতের প্রবেশ। খানিকক্ষণ কোন কথা নেই। শওকৎ কী খুঁজতে থাকে।

শওকৎ  :         দেখুন আবার বিরক্ত করতে এলাম। একটা কাগজ ফেলে যাইনি তো। (না পেয়ে) থাক, হবে কোথাও। আজকাল আমার কিছু মনে থাকে না। তাছাড়া ইফতেখার সাহেবের যা মেজাজ। করবেই বা কী। একে তো নানা চিন্তা, তারপর মেয়েটিকে             নিয়ে Ñ

আনওয়ার         :         মেয়েটিকে নিয়ে আবার কী। শুনলাম পড়াশোনার জন্যে বিদেশে যাচ্ছে।

শওকৎ  :         (গলা নাবিয়ে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে) ও আপনি জানেন না বোধহয়?

আনওয়ার         :         কিসের কথা বলছেন?

শওকৎ  :         কাউকে বলবেন না। ফ্যামিলি সিক্রেট কিনা। বেবী যাচ্ছে অপারেশনের জন্যে।

আনওয়ার         :         অপারেশন। কিন্তু Ñ

শওকৎ  :         মানে, এ আজকের কথা নয়। পাঁচ বছর বয়েস থেকেই কমপ্লেন। এখন তো কম। যদি দেখতেন। এক একদিন সে কী চিৎকার। প্রথমে তো কেউ সন্দেহ করেনি ব্রেইন টিউমার। এখানে তো কিছু হলো না। তাই শেষ চেষ্টা। পড়াশোনার নাম করে          ভুলিয়ে-ভালিয়ে পাঠাতে হচ্ছে।

আনওয়ার         :         দেখবে কে ওখানে?

শওকৎ  :         সেদিক দিয়ে অসুবিধে হবে না। ওর মামা নিজেই ভ্যাঙ্কুভার হাসপাতালের সার্জন।

আনওয়ার         :         কী আশ্চর্য। কোনোদিন কল্পনাও করিনি। বেবী তো কখনো মাথাব্যথার কথা বলেনি। অবশ্যি দেখেছি কখনো কখনো মাথায় হাত দিয়ে ঝিম ধরে বসে থাকতে।

শওকৎ  :         ও, ওরকমই। আজকাল মাথাব্যথা হলে নিজের ঘরেই খিল দিয়ে পড়ে থাকে। বড় চাপা স্বভাবের কিনা। যাক ভালো ভালোয় সেরে গেলেই হয়।

আনওয়ার         :         শওকৎ সাহেব, বেবী ভালো হয়ে যাবে তো?

শওকৎ  :         আমরা তো তাই আশা করি। (কিছুক্ষণ কোনো কথা হয় না। শওকৎ ফাইলগুলো গুছিয়ে নেয়) মানুষ তো শুধু আশাই করতে পারে। কী বলেন?

আলো স্তিমিত হয়।

চতুর্দশ দৃশ্য

(অষ্টম দৃশ্যের অনুরূপ মঞ্চসজ্জা)

বেবী     :         আনুভাই, আনুভাই।

আনওয়ার         :         কে?

বেবী     :         আমি, আমি।

আনওয়ার         :         তুমি হঠাৎ এত ভোরে!

বেবী     :         মনে নেই আজ সাতাশে এপ্রিল।

আনওয়ার         :         সাতাশে এপ্রিল, তাতে কী হয়েছে?

বেবী     :         তোমার যদি কিছু মনে থাকে। আজ আমার যাবার দিন।

আনওয়ার         :         বলো কী, আজ? বাকি কাউকে দেখছি না যে।

বেবী     :         ওরা সব ওপরে।

আনওয়ার         :         ওপরে কী করছে?

বেবী     :         কাঁদছে।

আনওয়ার         :         কেন?

বেবী     :         চলে যাচ্ছি বলে। কান্নাকাটির কী আছে বলো। নিজেরাই পাঠাচ্ছে লেখাপড়ার জন্যে বাইরে। আমি বলেছিলাম?

আনওয়ার         :         আদুরে মেয়ে তো। দূরে যাচ্ছ। বাপ-মার খারাপ লাগবেই।

বেবী     :         তোমার খারাপ লাগছে না? জানি, জানি একটুও লাগছে না। আনুভাই, তোমার এখানে বসি?

আনওয়ার         :         বসো না। দাঁড়াও, বিছানাটা ঠিক করে দিই।

বেবী     :         না না, কিছু ঠিক করতে হবে না। তুমি পরে বলবে বেবী একটু বসলও না। (ঘড়ি দেখে) জানো বেশিক্ষণ সময় নেই।          দশ-পনেরো মিনিট পরেই চলে যাব।

আনওয়ার         :         তাহলে আর বসে কী হবে?

বেবী     :         ওই যে বললাম। বলবে মেয়েটা কোনোদিন এসে বসল না। কথা বলল না। খালি দেমাক দেখিয়ে গেল।

আনওয়ার         :         তোমার দেমাক কে বলল।

বেবী     :         তুমি বলো না?

আনওয়ার         :         (না-সূচক মাথা নাড়ল)

বেবী     :         তাহলে কী বলো?

আনওয়ার         :         কিছু না।

বেবী     :         ভালো-মন্দ কিছু একটা বললেই তো পারো আনুভাই। মেয়েটা দেমাকি, মেয়েটা বজ্জাত, পাজি, আহাম্মক।

আনওয়ার         :         ছি ছি।

বেবী     :         ছি ছি করো না তো।

আনওয়ার         :         তুমি না খুব তাড়াতাড়ি রেগে যাও।

বেবী     :         আজ আর রাগ করব না।

আনওয়ার         :         চলে যাচ্ছ বলে?

বেবী     :         (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) হ্যাঁ। রাগ দেখাব কাকে?

আনওয়ার         :         কী এটা?

বেবী     :         (প্যাকেট খুলে দেখাল) জানো আনুভাই যেদিন প্রথম এসেছিলে তোমার শার্টখানা দেখে বড্ড হাসি পেয়েছিল। সেই থেকে ভেবেছি তোমাকে একটা শার্ট কিনে দেব।

আনওয়ার         :         নিয়েই এসেছ দেখছি। কাকে দিয়ে কেনালে?

বেবী     :         পরো, পরো না।

আনওয়ার         :         পরব? এখুনি?

বেবী     :         বা রে, আমি তো চলেই যাচ্ছি। আমার সামনেই পরো।

আনওয়ার         :         (শার্ট গায়ে চাপায়। শার্ট সাইজে ছোট হয়) দেখেছ হাত কত ছোট?

বেবী     :         (মুখ টিপে হাসে)

আনওয়ার         :         হাসছ?

বেবী     :         (হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায়। আনওয়ারকে শার্ট খুলতে দেখে) থাক থাক, থাক না। খুলো না। আমি যতক্ষণ না যাই পরে থাকো।

আনওয়ার         :         তা, তাহলে আমি তোমাকে কিছু দিলাম না কেন?

বেবী     :         দিতে চাইলে দিলেই পারতে।

আনওয়ার         :         মানে, তোমার কী পছন্দ না জেনে Ñ

বেবী     :         কলম, বই একটা কিছু দিলেই হতো।

আনওয়ার         :         তোমার যদি পছন্দ না হতো।

বেবী     :         তাতে কী। তোমার দেবার দিতে। কার কী পছন্দ হলো না হলো জেনে কী লাভ (গাড়ির হর্ন বাজে) যাই।

আনওয়ার         :         আমি আসব?

বেবী     :         না না, এয়ারপোর্ট গিয়ে তোমার কাজ নেই।

আনওয়ার         :         গিয়ে চিঠি লিখবে তো?

বেবী     :         লিখব। কিন্তু তুমি যদি না লেখ।

আনওয়ার         :         লিখব না কেন?

বেবী     :         থাক লিখো না। তোমার খবর আমাকে রীতাই দেবে।

                   (হঠাৎ মেজাজ পরিবর্তন হয়) না লিখো না। আমি চাই না কেউ আমার কথা লিখুক। কেউ আমার কথা ভাবুক। কেউ আমার কথা মনে রাখুক।

আলো স্তিমিত।

পঞ্চদশ দৃশ্য

আগের দৃশ্যের অনুরূপ। তবে ডিভ্যানটি পুরোপুরি খাট হিসেবে ব্যবহৃত হবে। সেজন্য দুটি বালিশ, কম্বল ইত্যাদি প্রয়োজন। বসার জন্য অতিরিক্ত একটি আসন থাকতে পারে। পার্টিশনের সর্ব ডানদিকের ডিজাইনটি আবার বদলে যাবে। সংবলিত ডিজাইন লাগানো যেতে পারে। ঝি’র মেয়ের আগমন স্পটলাইটে এবং আনওয়ারের চলে যাওয়ার দৃশ্যটি মঞ্চ অন্ধকার করে ব্যাক স্ক্রিনে ছায়া ফেলে দেখানো যেতে পারে।

ইফতেখার        :         (কম্বল টেনে নিয়ে) আজ কি খুব শীত?

                   ইফতেখার বসার চেষ্টা করে)

শওকৎ  :         একটু। না স্যার, আপনি বসার চেষ্টা করবেন না।

ইফতেখার শুয়ে পড়ে।

ইফতেখার        :         আমি বসব না। দাঁড়াব না। হাঁটব না। তাহলে আমি কী করব শওকৎ? আমার কথাটা একবার ভেবে দেখ।

শওকৎ  :         ওটা হয় স্যার। কাজের প্রেশারে শরীর ভেঙে পড়েছিল। ও কিছু নয়। একটু বিশ্রাম আর সময়মতো খাওয়া-দাওয়া করলে আমার তো মনে হয় Ñ

ইফতেখার        :         (শওকতের কথার পুনরাবৃত্তি করে) আমার তো মনে হয় Ñ তোমার কী মনে হয়? থামলে কেন?

শওকৎ  :         সত্যি কথা বলতে, প্রথম যেদিন আপনি মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন স্যার, আমরা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। এখন তো আপনি দিব্যি সুস্থ। এ মাসটা ছুটিতে থেকে Ñ

ইফতেখার        :         ছুটি। আর কত ছুটি নিতে বলো? কাজকর্ম সব শিকেয় উঠবে!

শওকৎ  :         অফিস নিয়ে ভাবেন না। একরকম চলেই যাবে।

ইফতেখার        :         (কথাগুলো খুব টেনে টেনে বলা হবে। গলার স্বর ক্রমশ জড়িয়ে আসে) তা ঠিকই বলেছ, একরকম চলেই যাবে। (কিছুক্ষণ বিরতি) কারো জন্যে কিছু ঠেকে থাকে না।

ইফতেখারের চোখ বুজে আসে। অনেকক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ নেই। শওকৎ মাথার বালিশ ঠিক করে দেয়। এ সময় দরজা খোলার শব্দ হয়। দুধের গ্লাস হাতে সকিনার প্রবেশ। শওকৎ ইঙ্গিতে আওয়াজ করতে মানা করে। সকিনা টেবিলের ওপর দুধ রেখে দূরে সরে আসে। শওকৎ সকিনার কাছে আসে। শওকৎ সকিনার কাছে। দুজনের মধ্যে প্রায় ফিসফিসে গলায় কথা হয়।

সকিনা   :         ঘুমুলেন কখন?

শওকৎ  :         এই তো আপনি আসার কিছুক্ষণ আগে। কথা বলতে বলতেই ঘুমিয়ে পড়লেন।

সকিনা   :         আজকাল একদম জেগে থাকতে পারেন না।

শওকৎ  :         আমার তো মনে হয় শরীরের এ অবস্থায় যত বিশ্রাম নেওয়া যায় ততই ভালো।

সকিনা   :         বিশ্রাম না ছাই। খানিকক্ষণ চোখ লাগানো তারপর আবার যে কে সেই। সারাদিন এক চিন্তা। সংসার চলবে কেমন করে, বিজনেস দেখবে কে Ñ

শওকৎ  :         আমাকেও সে কথা বলছিলেন। আমি বললাম আপনি ভাববেন না। ও একরকম চলেই যাবে।

সকিনা   :         তবু তুমি ছিলে বলে ভরসা।

শওকৎ  :         না না। সে কথা বলছেন কেন। এ তো আমার কর্তব্য।

সকিনা   :         কর্তব্যের কথা কজন মনে রাখে?

শওকৎ  :         আর তা ছাড়া অল্প কিছুদিন। তারেক সাহেব ফিরে এলে ও নিজেই সামলে নিতে পারবে। মাসখানেকের মধ্যেই ছাড়া পেয়ে যাবে শুনেছি। ওর এগেনস্টে নাকি কোনো চার্জ পাওয়া যায়নি। তবু কপালে ভোগান্তি ছিল Ñ

সকিনা   :         জানি না; আমি কিছু ভাবতে পারি না। মেয়েটাও যদি থাকত এ সময়।

শওকৎ  :         কোনো চিঠি পেয়েছেন?

সকিনা   :         ডাক্তাররা আশা দিচ্ছে। এখন কী হয় বাবা দেখ।

শওকৎ  :         না না, তাহলে আর চিন্তার কারণ নেই। আর তাছাড়া বেবীর মামাই যখন ওই হাসপাতালের সার্জন, তখন সেবার ত্রুটি হবে না।

সকিনা   :         সে ভরসাতেই তো পাঠানো। তা নইলে মেয়েটাকে বিদেশ বিভুঁইয়ে ছেড়ে কি শান্তি ছিল। (দুধের গ্লাস ঢেকে রেখে) আমি একটু ওদিকে যাই। জেগে উঠলে আমাকে খবর দিও।

                   (সকিনার প্রস্থান। শওকৎ পা টিপে টিপে ঘরে পায়চারি করে। জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়। ইফতেখার নড়ে ওঠে। কিছুক্ষণ নীরবতার পর)

ইফতেখার        :         চারদিক এত শান্ত কেন? লোকজন নেই। কারো সাড়াশব্দ নেই। তোমরা সব কোথায়?

শওকৎ  :         (এগিয়ে এসে) আমরা এখানেই রয়েছি।

ইফতেখার        :         তাহলে সাড়াশব্দ পাচ্ছি না কেন। তোমরা কি সব রাবারের সোল পায়ে ঘুরছ?

শওকৎ  :         আপনার অসুস্থ শরীর। মিছিমিছি শব্দ করা উচিত নয়।

ইফতেখার        :         (জানালার পাট বন্ধ দেখে) অসুস্থ শরীর। আমার জন্যে          আলো-হাওয়া চলাচল করবে না? গাছের পাতা নড়বে না। পাখিরা ডানা মেলবে না? তোমরা শক্ত পায়ে হাঁটবে না?

শওকৎ  :         কিছুদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে।

ইফতেখার        :         (উঠে বসে। জানালা খুলে বাইরে তাকায়) দেখেছ গাছের ডালে একটা পাতা নেই। সব ঝড়ে পড়েছে। (শওকৎকে) জানো, মানুষের ইচ্ছে আর আকাক্সক্ষারাও এমনি করে ঝরে যায়। শুকনো পাতার মতো।

সকিনার প্রবেশ। টেবিলের কাছে এসে দুধের ঢাকনা নাবিয়ে দেয়।

সকিনা   :         দুধটা খেয়ে নাও।

ইফতেখার        :         এখন না, পরে।

সকিনা   :         পরে আবার কেন? (কী ভেবে) ঠিক আছে যেমন তোমার ইচ্ছে।

ইফতেখার        :         আজ কী বার?

সকিনা   :         কেন?

ইফতেখার        :         বেবীর কোনো চিঠি আসেনি?

সকিনা   :         সে দিনই তো এলো।

ইফতেখার        :         আমাকে তো বলোনি।

সকিনা   :         বা রে, তোমার সামনেই তো এলো।

ইফতেখার        :         ও, তা হতে পারে। আমার আজকাল কিছু মনে থাকে না। তা আমার কথা কিছু লিখেছিল?

সকিনা   :         বাড়ির সবার কথাই লিখেছিল।

ইফতেখার        :         ওদের কাউকে দেখি না কেন?

সকিনা   :         ওদের কাউকে মানে?

ইফতেখার        :         যারা আমার অফিসে আসত, বাড়িতে ধাওয়া করত।

সকিনা   :         আসবে, সময় পেলে আসবে। কার এত ছুটি আছে বলো। যার যার কাজ নেই?

ইফতেখার        :         কারো ছুটি নেই? আমার যে এত অফুরন্ত ছুটি।

সকিনা   :         এখন ঘুমোও।

ইফতেখার        :         (বিছানায় ঢলে পড়ে। তারপর এক সময় ধড়ফড় করে উঠে বসে) শব্দ, কিসের শব্দ?

সকিনা   :         কই কিছু না তো।

ইফতেখার        :         (বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে ধরা গলায় আস্তে আস্তে বলতে থাকে) না না, একটা শব্দ আমি শুনছি। গাছের ঝরাপাতার কথা বলেছিলাম, সে পাতার ওপরে পায়ের শব্দ। বেবী যাওয়ার পর এরকম শব্দ আমি শুনিনি। (সকিনাকে) তুমি বুঝবে না। যে বাড়িতে বর্ষা নেই, শীত নেই, বসন্ত নেই সে বাড়িতে এ শব্দের মর্ম কেউ বুঝবে না।

                   (ইফেতেখার উঠে দাঁড়ায়। জানালা খোলে। এ সময় একটি মেয়েকে আস্তে আস্তে জানালার বাইরে যাওয়া-আসা করতে দেখা যাবে। ব্যাক স্ক্রিনে ডালপালা শোভিত গাছের ছায়া পড়বে।) মেয়েটা কে? ওকে ডাক।

সকিনা   :         ও তো আমাদের বাড়ির ঝিয়ের মেয়ে।

                   (সকিনা দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। মেয়েটিকে জোরে জোরে ডাকতে থাকে।)

                   এই শোন শোন। (মেয়েটি কোনো সাড়া দেয় না।)

ইফতেখার        :         (ফিরে এসে শওকৎকে) জানো, ও মরা পাতার ওপর দিয়ে হেঁটে গেল। ওর পায়ে জুতো নেই। তোমাদের মতো রাবারের সোল নেই। জানো, ওই শব্দই আমি শুনতে চেয়েছি কতদিন। কতদিন কান পেতে থেকেছি। ওকে ডাক। (দেখা যাবে মেয়েটিকে হাত ধরে টানাটানি করা সত্ত্বেও সে হেঁটে চলে যেতে থাকে। সকিনা ফিরে আসে।)

সকিনা   :         আসতে চাইল না।

ইফতেখার        :         আসতে চাইল না! কেউ আসতে চায় না। সবাই চলে যেতে চায়। (প্রসঙ্গান্তর টেনে) থাক কাজ নেই। যেতে দাও। কাউকে ধরে রাখা যায় না সকিনা। আমি শুধু ওকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম শব্দ করে, এই শুকনো মরা পাতা দলে যাবার মতো জোর কেমন করে পেল। আমি যদি পারতাম। দূর থেকে দেখেছি সেই যথেষ্ট। থাক ওকে যেতে দাও।

শওকৎ  :         আমি তাহলে চলি স্যার। ফাইলগুলো অফিসে দিয়ে আসতে হবে।

ইফতেখার        :         যাবে, তা যাও। ভালো কথা, আনু, আনুকে দেখছি না। একবার পাঠিয়ে দিও তো।

শওকৎ  :         ঠিক আছে স্যার। পাঠিয়ে দেব।

                                                          শওকতের প্রস্থান।

সকিনা   :         ও ফিরলে তো পাঠাব। কখন যায়, কখন আসে। ঠিক পড়াশোনায়ও তেমন মন নেই। আমিও কিছু বলি না। নিজের ছেলে হতো, এক কথা। পর পরই।

আনওয়ারের প্রবেশ।

আনওয়ার         :         আমাকে ডেকেছিলেন?

ইফতেখার        :         বসো। (কিছুক্ষণ থেমে) আমি অসুস্থ।

আনওয়ার         :         সেজন্যেই আসি না। শুধু শুধু বিরক্ত করব।

ইফতেখার        :         (প্রসঙ্গান্তর টেনে) রেজাল্ট বেরিয়েছে?

আনওয়ার         :         (হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ে)

ইফতেখার        :         কেমন করেছ?

আনওয়ার জবাব দেয় না।

ইফতেখার        :         (বিছানায় উঠে বসে) জবাব দিচ্ছ না কেন?

আনওয়ার         :         পাশ করিনি।

ইফতেখার        :         পাশ করনি? (একটু থেমে) আমি জানতাম। আমি, আমি জানতাম। আমি সে জন্যে তৈরি ছিলাম।

আনওয়ার         :         আমি তাহলে এখন যাই।

ইফতেখার        :         (হ্যাঁ-না কিছু বলে না)

সকিনা   :         দুধটা খেয়ে নিও। (গ্লাস ধরে) গরম করে দেব?

ইফতেখার        :         না। (সকিনার প্রস্থান) আনওয়ার যাবার উদ্যোগ নেয়। (ইফতেখার থামিয়ে দেয়) তুমি বসো।

আনওয়ার         :         আমাকে কিছু বলবেন?

ইফতেখার        :         ওরা সব গেছে? দরজাটা বন্ধ করে দাও। (খানিকক্ষণ কোনো কথা হয় না। এক সময় ইফতেখার উঠে দাঁড়ায়। জানালার কাছে যায়। আনওয়ারকে কাছে ডাকে।) কিছু দেখছ?

আনওয়ার         :         (জানালার বাইরে দেখার চেষ্টা করে) কই, না তো?

ইফতেখার        :         দেখছ না, সবুজ ঘাসের ওপর এক রাজ্যের পাতা। ঝরে পড়া মরা পাতায় ছেয়ে সবটুকু। জানো আনু কিছুক্ষণ আগে একটা মেয়ে খালি পায়ে আওয়াজ করে ওগুলো মাড়িয়ে চলে গেল। কেউ ওকে ধরে রাখতে পারল না। ও কারো ডাকে সাড়া দিলো না। আনু, তুমি ওই মেয়েটার মতো শব্দ করে পা ফেলে চলে যেতে পারো না? (ইফতেখার দুহাতে মাথা চেপে ধরে) না, না এসব কী বলছি। আমার কিছু বলার নেই আনু।

আনওয়ার         :         আপনি শুয়ে পড়–ন।

ইফতেখার        :         হ্যাঁ, শুয়ে পড়ব। আমার বালিশের তলায় একটি খাম পাবে। নিয়ে এসো।

আনওয়ার         :         (খাম বের করে) এইটা?

ইফতেখার        :         দাও। (আনওয়ার চিঠিখানা দেয়) কাল রাত জেগে লিখেছি। অসুস্থ শরীর। জানি না কী লিখতে কী লিখেছি। (খানিকক্ষণ      নিস্তব্ধতা) পরশু তোমার পরীক্ষার ফল বেরুল। অথচ তুমি এলে না। আমি অনুমান করেছিলাম। এ বাড়িতে তোমার কিছু হবে না আনু। (আবার নিস্তব্ধতা) হয় না, কারো ওপর নির্ভর করে হয় না। নিজে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়। (হঠাৎ সচকিত হয়ে) চিঠিটা তোমার বাবাকে দিও।

                   (ইফতেখার চিঠিখানা আনওয়ারকে দেয় এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চেয়ে নেয়)

                   তার চেয়ে বরং তোমাকে একবার পড়ে শোনাই। পড়ব?

আনওয়ার         :         পড়–ন।

ইফতেখার        :         (কাঁপা গলায়) প্রিয় বাদশা মিঞা। আপনি বড় আশা করিয়া আপনার প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র মোহাম্মদ আনওয়ার আহমদকে আমার নিকট আমার নিকট পাঠাইয়াছিলেন Ñ

আনওয়ার         :         আগে দুধটা খেয়ে নিন।

ইফতেখার        :         (দুধের গ্লাসের দিকে তাকায়। তারপর ওখানা হাতে তুলে নেয়।) ও, হ্যাঁ।

আনওয়ার         :         এখন পড়–ন।

ইফতেখার        :         আবার শুরু থেকে পড়ব?

আনওয়ার         :         না না, ওখান থেকেই পড়–ন।

ইফতেখার        :         ও হ্যাঁ Ñ আমার নিকট পাঠাইয়াছিলেন। (মাঝখানে থেমে) চিঠিটা ডাকে পাঠিয়ে দেব। না, থাক তুমি বরং হাতে হাতে দিয়ে দিও। হ্যাঁ, কোথায় পড়ছিলাম Ñ বড় আশা করিয়া আমার নিকট পাঠাইয়াছিলেন। জানি না কেন আপনার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইল না। জানি না কাহার দোষ। একমাত্র নিয়তিই একদিন এ প্রশ্নের মীমাংসা করিবে। সন্দেহ নাই আমি আমার কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হইয়াছি। অতএব সর্বদিক বিবেচনা করিয়া দেখিলাম আপনার পুত্র আপনার গৃহে ফিরিয়া যাক, ইহাই সর্বোত্তম।

                   (আনওয়ার উঠে দাঁড়ায়। ধীরে দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। তারপর আস্তে দরজাখানা ভেজিয়ে দেয়। ইফতেখার লক্ষ করে না।)

                   কেননা ভাবিয়া দেখিলাম, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরিয়া যাওয়াই মঙ্গল। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরিয়া যাওয়াই প্রকৃষ্ট। আমার গাফিলতির জন্যে আপনার বরাবরে মাফ চাহিতেছি। আর     বিশেষ Ñ

                   (ইফতেখার চোখ তুলে তাকায়। কাউকে দেখতে পায় না। চিঠিখানা হাত থেকে লুটিয়ে পড়ে। হাওয়ায় আন্দোলিত হয়ে গড়িয়ে যেতে থাকে। মঞ্চ প্রায় অন্ধকার। স্পটলাইট ইফতেখারে মুখের ওপর স্থির হয়।)

য ব নি কা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *