সেই মেহগিনি দরজা ঠেলে ভেতরে আসতেই এক প্রলুব্ধকর আমন্ত্রণ কথা বলে ওঠে, আসুন।
দরজার হাল্কা পীতাভ পর্দা কেঁপে ওঠে। বাইরে তখন কোনো ফাল্গুন সন্ধের উদ্দাম হাওয়া। খোলা দরজায় তার দুরন্তপনাই এবার এলোমেলো পর্দার আড়ালে সরীসৃপের মতো জড়িয়ে ধরে কাকে। আড়াল করে রাখে। এবার দরজাটা ভেজিয়ে দেয় জাহেদী। আমন্ত্রণকারিণীর মুখোমুখি দাঁড়ায় এসে। আশ্চর্য নিটোল, ঢলঢলে একখানা মুখ। খুব কি সুন্দর? তবু সেই খুব-সুন্দর-নয় মুখের আদলে অঢেল মায়ার ব্যঞ্জনা। ভুজঙ্গ ভুরু ছেয়ে ফেলার মতো এন্তার চুল। আর সে চুলের উৎপাত থেকে চোখ দুটোকে বাঁচাতে গিয়ে অহরহ চঞ্চল একগুচ্ছ বর্শা-তীক্ষè আঙ্গুল।
এই মোহাবিষ্ট রূপই বুঝি খানিকক্ষণ তাকে হতবাক করে রেখেছিল। উচ্ছ্বাস আর অনুরাগ অভিভূত করে ফেলেছিল দেহ-মন। তবু নিজেকে সামলে নিল জাহেদী। প্রতি-সম্ভাষণের মৃদু হাসি ফুটিয়ে অনুগতের মতো তার পেছনে পেছন গেল। এ বাড়িতে এই তার প্রথম। তাও এসেছে বন্ধুর পীড়াপীড়িতে। নইলে এ বাড়ির সাজ-সৌষ্ঠব, এ বাড়ির মানুষ সবাই কেমন চোখ ধাঁধানো। চোখ ঝলসে দেওয়া।
ভেতরে বড়মতো টেবিল। কাল্চে-রক্ত-রং। জালির কাজ করা চাদর বিছানো তাতে। তার ওপর কয়েকটা ফুলদানী। এক পাশে শো-কেস। চীনে মাটির পুতুল, ছোট বড় সোভেনির জাপানী পাখা আর প্লাস্টিকের লতানো ফুল। ধার ঘেঁষেই বইয়ের শেল্ফ। জ্ঞানের ভিড়ে তিলধারণের জায়গা নেই। ঠাঁসাঠাঁসি বই। কোনোটা গত মহাযুদ্ধের প্রাঞ্জল কাহিনী। কিছু পৃথিবীর ইতিহাসের ওপর দশভল্যুম পা-িত্য। দেয়ালে কোনো এক খ্যাতনামা শিল্পীর ক্যানভাস। কেবল আর্টের অজুহাতে নিন্দনীয় হয়নি, এমনি নারীদেহের সুষম লজ্জা যার বিষয়বস্তু।
দেয়ালের আরেক পাশে বড় ঘড়ির জ্যোৎস্না-রং দোলকে সময় দুলছে। তা সত্ত্বেও শো-কেসের ওপর বাড়তি আরেকখানা টাইমপিস্। খুব বনিবনা নেই। তা বোঝা যায় বড় ঘড়ির মিষ্টি ঝঙ্কারের কিছু পরই সুরেল বাজনায় টাইমপিস্টা প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে যখন।
বেশ বড়মতো বাড়ি। হলঘরের সঙ্গেই সামনে পেছনে আরো কতগুলো কামরা। নির্লিপ্ত কণ্ঠস্বর ভেসে আসে সেখান থেকে কখনও সখনও। কখনও পর্দার ওদিকে ছায়ার মতো একটি কি দুটি মূর্তি জেগে ওঠে। আবার অদৃশ্য হয় পর মুহূর্তেই।
সব মিলিয়ে আধো-রং, আধো-কল্পনার মেজাজে ঢাকা এ বাড়ি। আজ সেখানেই জাহেদীর আমন্ত্রণ।
কার্পেটের ওপর একটা সাদা বেড়াল দর্পিত পা ফেলে চলে গেল। যেন বেড়াল নয়। এ বাড়ির শুভ্র, পরিপুষ্ট কোনো অহমিকা।
দেখতে দেখতে একসময় টেবিলটা ছেয়ে গেল কাঁটা চামচ আর প্লেটে। চায়ের পেয়ালার মিষ্টি আওয়াজ। ঝন করে হাত থেকে চামচ পড়ে যাওয়ার লজ্জায় আরক্ত সেই আমন্ত্রণকারিণী কথা বলেন আবার, কি যে হয়েছে ছাই। সব কাজেই এমন।
বড় প্লেটে সিঙ্গাড়া, কোয়ার্টার প্লেটে নাশপাতি, ছোট বউলে কিছু মিষ্টি। সন্ধের অহেতুক চা-পানের বুভুক্ষা জাগিয়ে তোলার বিনীত আয়োজন।
প্রয়োজনের বেশি আয়োজন নেই। কথা নেই। শব্দ নেই। যন্ত্রচালিতের মতো কতগুলো উদাস দৃষ্টি হাত বাড়ায়। কেউ খেল। কেউ ছুঁলো শুধু। কিন্তু হৈ চৈ নেই। তারা জানে, এ বাড়িতে খাবার টেবিলে হৈ চৈ পছন্দ নয়। খাবার প্রশংসা করে বাহবা পাওয়া যায় না। জানে, এখানকার যেমন নিঃশব্দ আসন, যেমন চেয়ারের তলায় রবারের আবরণী, তেমনি এখানকার আচরণ, ভঙ্গি আর ভাবের জগতে একটি বিনা-আওয়াজের সম্ভ্রম।
ভদ্রমহিলা ঘুরে ঘুরে তদারক করেন। কারও চায়ের কাপে চিনি দিতে যান। একটি বিনয়ের প্রত্যাখ্যান তাঁকে নিস্তর করে। কেউ খুশির মাথা দুলিয়ে আন্দাজ বাৎলে দেয়।
ঘড়ির কাঁটা চলছে। বাইরের র্শির্শি হাওয়ায় কেঁপে ওঠে আইভি লতার ঝাড়। ঝোঁকের মাথায় কে বুঝি অতর্কিতে ভেতরের ঘরে রেডিওর স্বরটা দিয়েছিল চড়িয়ে। কিন্তু তা খানিকক্ষণের জন্যেই। তারপর সবকিছু আবার চলে নিয়মের কড়া মাপজোকে। সবাই নিয়মের দাস। এ বাড়ি। এ বাড়ির লোকজন। ঘড়ি। এবং বোধহয় সকলের মন।
চা-পর্বের পর যারা আলাপের স্রোতটা আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়, একটি অনবদ্য সন্ধেকে চায় মুখর করে রাখতে তাদের জন্যে লনে চেয়ার পাতা। সেখানে তারা দু’জন চারজন জটপাকিয়ে এন্তার কথার খই ফোটাতে পারে। বড় লন। ঘেঁষাঘেঁষি নেই। তাছাড়া একটি আরক্ত হাসি বা উচ্ছ্বাসের কথা ধার করার উগ্র কান নিয়ে কেউ উত্ত্যক্ত করতে আসে না। দু’চারজন তখনও হলঘরে বসে।
মহসীন বেরিয়ে এলো জাহেদীকে সঙ্গে করে। তার দুর্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। কোথায় এ বাড়ির সম্ভ্রম ক্ষুণœ হয়, কোথায় মচ্মচে জুতোর আওয়াজ বিশ্রী হয়ে ওঠে, কোথায় পর্দার পাট জোরে টানা হয়, সে দুশ্চিন্তা।
এক কোণে নিমগাছের গা-ঘেঁষে পাশাপাশি দুটো টেবিল। তারই একখানা ঘিরে বসে তারা দু’জন। জাহেদী কথা বলে না। তার বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি তখনও। মহসীন সেটা লক্ষ করে। একখানা সিগারেট ধরায়। এ বাড়িতে তাকে আনার গৌরবে উচ্ছ্বসিত আরামের ধোঁওয়া জাহেদীর মুখে চোখে।
তারপর বলে, কেমন লাগল?
কি?
এই যে আজকের ব্যাপার-স্যাপার। কেমন লাগল কোহিনুর বেগমকে?
তিনি কে?
প্রথম ঢুকতেই যাঁকে দেখলে।
জাহেদীর মুখে কোনো কথা সরে না। চোখ নাবিয়ে নেয়।
কিন্তু আজকের উপলক্ষ?
পল বিশ্বাস বুঝি খুশির মাতলামিতেই গলা বড়িয়ে বলে, আজকের উপলক্ষ?
রিটায়ার্ড ডি এস পি রওনাক খান গোঁফের ওপর আদরের আঙ্গুল বুলিয়ে জানায়, এ বাড়িতে উপলক্ষের কোনো দরকার হয়েছিল কোনোদিন, যে আজ হবে!
আসল কথাও তাই।
লিস্টি ধরে যাদের ডাকা, তারাই আসে। কখনও সে লিস্টি থেকে বাদও যায় কারও নাম। কখনও বা দু’একটা নতুন নাম সংযোজন হয়। স্বামী-স্ত্রী যুগ্মভাবেই আমন্ত্রিত হয়।
ব্যাচেলারদের ক্ষেত্রে একজন সঙ্গে থাকলে ক্ষতি নেই। এটা যেন তাদের পত্মী-হীনতার ‘কনসেলাশন’ প্রাইজ।
আলাপের স্রোত যখন একবার চলে, আর কিছু মনে থাকে না। মনে থাকে না আপিসের খাটুনি, বাড়ির দূরত্ব বা সময়ের দুর্ভাবনা। এমনি নেশা এ বাড়ির। প্রিমরোজ ভিলার। সব নেশা যেমন রোজ হয় না, এও তেমনি। অনেক যতেœ আর ভালো লাগিয়ে তোলা ইচ্ছের এই চারা গাছটি রোজ কুঁড়ি ফোটায় না।
দিনক্ষণ ভেবে চিন্তেই কোনো এক সন্ধেয় অতর্কিতে এমনি চায়ের আসর ডাকেন কোহিনুর বেগম। তাতেই কথার ফাঁকে ফাঁকে রিলিফের কথা পাড়েন বা নতুন নাটকের মহড়া দিলে কেমন হয় জানতে চান। কখনও কখনও ফল হয়। কখনও কখনও আলোচনা, আলোচনাই থেকে যায়।
কিন্তু আজকের এ আয়োজন কোনো বারওয়ারি আয়োজন নয়। বছরের এ দিনটি অনেকেরই মনে আছে। অন্তত কোহিনুর বেগমের যারা অন্তরঙ্গ তাদের তো বটেই। তারা জানে, কোহিনুর বেগমের এই অভিনব সাজসজ্জা, আসলে কোনো অতীত স্মৃতির রোমন্থন। যেদিন এই বাড়িতে নববধূ হয়ে এসেছিলেন সেদিনের স্মরণেই ধন্য আজকার এ সন্ধে।
জাহেদী ঘড়ি দেখে বলে, অনেক রাত হলো।
মহসীন গা এলিয়ে বসেছে। বলে, তাতে কি। তোমার তো অফিস ছুটি।
না, সেজন্যে নয়।
তবে?
এই অযাচিত, অপ্রত্যাশিত আনন্দের ধাক্কাটা যেন আর সহ্য করতে পারছে না জাহেদী। তৃপ্তির বুদ্বুদ্ কয়েকটা উত্তাল ঢেউ-এর সঙ্গে মেশার আগেই অপূর্ণ প্রসাদনের আমেজ নিয়ে ফিরে যেতে পারলেই যেন ভালো। সিঁড়ির ওপরের জালের মুখোশ দেওয়া আলোয় একরাশ ঝিঁ ঝিঁ পোকা জড়ো হয়েছে। আর সে আলোর ছটাতেই একটা ছায়া নিবিড় হয়ে জেগে ওঠে লনের ঘাসে।
জাহেদী পেছন ফিরে দেখে। শুধু ছায়া নয়, ছায়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা মিষ্টি সৌরভ আর সুবাস। আর একটু উত্তেজনার শিহরণ।
কোহিনুর বেগম কখন তরতর করে সিঁড়ি ভেঙে এসেছেন দেখতেও পায়নি। বোধহয় এরকমই ভালো। তা না হলে রহস্যঘন-বিস্ময়ের পুরো স্বাদটা পেত না। কতক্ষণ তন্ময় হয়ে বসেছিল মনে নেই। একসময় মহসীন তটস্থ হয়ে বলে, একটু সরে বসো।
এক মুখ হাসি নিয়ে এসে উপস্থিত স্বয়ং কোহিনুর বেগম। জাহেদী তার চেয়ারখানা নিয়ে একটু সরে না বসলে যেন তাদের নিবিড়তার ব্যুহ ভেদ করতে পারবেন না।
কোহিনুর বেগমই কথা বলেন, না থাক।
না না, বসুন।
নিজের চেয়ার ছেড়ে দিয়ে বলে জাহেদী।
বোধহয় তার অনুরোধে আকুতি ছিল খানিকটা। কোহিনুর বেগম চেষ্টা করেও যা উপেক্ষা করতে পারেন না।
শাড়ির আঁচল সামলে নিয়ে সত্যি সত্যি একটা চেয়ার টেনে বসেন।
হাতে তার একটা দলিত চাঁপা। কেবলই কুঁড়িগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে ঘাসের ওপর একাকার করতে থাকেন।
একসময় বলে ওঠেন, জানেন অনেকদিন ধরে ভাবছি আয়োজন করব। ডাকব। হয়ে ওঠেনি। অবশ্যি আজকের কথা আলাদা।
মহসীন প্রসন্ন হয়ে বলে, জানি। সুখী হোক আপনাদের দাম্পত্য জীবন।
যেন বিজলী চমকানোর মতো ভয় পেয়েছেন কোহিনুর বেগম। তবু মিষ্টি হেসে বলেন, ধন্যবাদ।
তারপর আবার থেমে বলেন, উনি তো এবারও আসতে পারলেন না।
মনে মনে একটা কৌতূহলের প্রশ্ন উঁকি দিলেও সম্বরণ করতে হয় জাহেদীকে।
মহসীন মামুলিভাবেই জিজ্ঞেস করে, উনি তো এখনও দেশের বাইরে?
হ্যাঁ।
কোহিনুর বেগমের চপল চোখের দৃষ্টিই বলে দেয়, তিনি এ প্রসঙ্গের অবতারণা চান না। সুযোগ এলো। সিঁড়ির ওপর একটা আহ্বানের সাড়া লক্ষ করে সেদিকে তাকিয়ে বলেন, ফোন এসেছে বোধহয়। আমি যাই।
জাহেদীর খারাপই লাগছিল। সামান্য সঙ্গলাভের সুযোগ এত তাড়াতাড়ি শেষ হতে বসেছে দেখে।
কিন্তু সিঁড়ির সে শব্দটি ফিরে এসে জানায়, না কিছু না। রোস্তমজী দুঃখ করে বলেছেন আসতে পারলেন না।
কোহিনুর বেগম এসে বসেন আবার। বলেন, দেখুন পাট ওঠার সময় হলো। আর এখন কিনা মনে পড়ল রোস্তমজীর। আচ্ছা লোক বটে।
মৃদু আলাপের সূত্র প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ফিস্ফিসে গলাও তেমন শোনা যায় না। বেশ রাত হয়ে থাকবে।
নিছক ভদ্রতার তাড়নাতেই যেন বলতে হয় মহসীনকে, তাহলে আমরাও উঠি।
না না, বসুন না। বসুন। কী হয়েছে? বাস পাবেন না, সে ভয়?
না, আমার জন্যে নয়।
অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় মহসীন জাহেদীর দিকে।
কোহিনুর বেগম বোঝেন। আর বুঝেই পরের প্রশ্নটি করেন, কোথায় থাকেন উনি?
সঙ্গের মানুষটির প্রতি এই এতক্ষণে উৎকণ্ঠা দেখাবার সময় পেলেন যেন কোহিনুর বেগম।
মহসীনই তার হয়ে জবাব দেয়, তা বেশ দূরই বলতে হবে। এয়ারপোর্টের কাছাকাছি। দু’ঘণ্টা পরপর বাস। ভারি ঝামেলা।
কোহিনুর বেগম বোধহয় একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। চেয়ারের একটা হাতল শক্ত করে ধরেন। মনে হয় চেয়ারের হাতল নয়, বিস্মৃত কোনো অতীতকে প্রাণপণ আঁকড়ে ধরে রাখতে চান।
তারপর একেবারে অপ্রত্যাশিত ভাবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, পৌঁছে দেবার জন্যে গাড়ির অভাব নেই। সায়গল রাতে এয়ারপোর্টেই থাকেন। বলব নাকি?
সম্মতির অপেক্ষা করতে হয় না।
তার আগেই দেখা গেল কার সঙ্গে কথা বলছেন। সায়গল নিশ্চয়ই। চোখে সাদা রিমের চশমা। ছিপছিপে গড়ন। মুখে পাইপ।
যেন একটা পাথরের কুঁচি গুঁড়ো করবেন এমনি করে জুতোর গোড়ালি ঘষে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর একসময় একমুখ ধোঁওয়া ছেড়ে বলেন, নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।
সায়গাল তার পার্শ্ববর্তিনীকে জিজ্ঞেস করেন, কি বলো ইশরাত?
ইশরাত জাহান কিছু বলেন না। একটু রাগই হয়েছিল বোধহয়। কিন্তু ভদ্রতার পীড়াপীড়িতে তাঁর কুঁচকানো চোখ জোড়া এমন সুন্দর হলো, আর দাঁতের পাটি শক্ত করে খুললেও এমন হাসি বিচ্ছুরিত হলো, কোহিনুর বেগম খুশি না হয়ে পারেন না।
তবু ছাড়েন না ইশরাত জাহান।
বলেন, আপনার রিলেশান নাকি?
না তো।
কোহিনুর বেগম অপ্রতিভ হওয়ার মেয়ে নন।
বলেন, এইত একটু আগে আলাপ হলো। থাকেন এয়ারপোর্টের কাছাকাছি। ওখানে দু’ঘণ্টা পরপর বাস। বড্ড ঝামেলা।
ইশরাত জাহান আশ্চর্য হওয়ার ভান করেন, আজকাল বাস সার্ভিস হয়েছে নাকি?
সায়গল রেগে যান। বলেন, সে আর নতুন কথা কি। দুনিয়ার কোনো খবরই রাখ না দেখছি।
ইশরাত জাহান কি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করেছিলেন? না। বরং যেন তাঁকে একটু প্রফুল্লই দেখাল। স্বামীর কাছ থেকে এ ধরনের নিষ্পাপ ঔদাসীন্যের অভিযোগ শুনতে ভালোই লাগে।
সায়গল কাজের মানুষ। এত বছর এ শহরে গাড়ি করে ঘুরে বেড়িয়েছেন। একবার এক দু’তলা বাসের সঙ্গে এক্সিডেন্টও হয়েছিল কবে যেন। ইন্সিওরেন্স কোম্পানির পয়সায় সারিয়ে নিতে হয়েছিল। সে দুর্ঘটনার সময় সায়গল-গিন্নীও সঙ্গে ছিলেন। অথচ ইশরাত জাহান জানেন না এয়ারপোর্টে যাবার জন্য বাস হয়েছে। যে বাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রতীক্ষা করতে হয়।
শুধু ইশরাত জাহানই নন। সায়গলেরও যে পৃথিবীর তুচ্ছতম জিনিসগুলো জানবার কোনো দায় নেই, কোনো ঔৎসুক্য নেই, ইশরাত জাহান জামদানি শাড়ির আঁচলে তাঁর গোলাপি মুখটা মুছে আরও রক্তাভ করে কতবার কতজনকে শুনিয়েছেন সে কথা।
জানেন সায়গল বড্ড বেখেয়ালি।
সে কেমন, জিজ্ঞেস করেন কোহিনুর বেগম।
কাল তিন তিনবার ওর অফিস থেকে লোক এলো। অথচ একদম হুঁশ নেই।
কেন, কি হয়েছিল?
ও বড্ড কেলেঙ্কারী। ওমা, বলিনি বুঝি আপনাকে সে কথা।
তারপর কোহিনুর বেগমের দ্বিতীয় প্রশ্নের প্রতীক্ষা না করেই গড়গড়িয়ে বকে যান ইশরাত জাহান, ওদের মস্ত অফিস। নানা ধরনের লোকজন। ভালোমন্দ কি আর কারও চেহারায় লেখা থাকে। দেখতে সবাইকে সাধুপুরুষ মনে হয়। আর সায়গলও তেমনি লোক। হবসন্স সাহেব যেন ভুল করতে পারেন না।
ইশরাত জাহান এতক্ষণে যেন একটা সহিষ্ণু শ্রোতা পেয়েছেন।
বলেই চলেন, ছিল এমনিতে ভালো স্মার্ট ছেলে। বাবাও নাকি কোনো নেটিভ স্টেটের চিফ্ মিনিস্টারের পি. এ. ছিলেন। সে ছেলে এমন কা- বাধিয়ে বসবে কে ভেবেছিল।
সায়গল ওদিকে আর ক’জনের সঙ্গে আলাপ সেরে ফিরে আসেন। কিছুটা কথা বোধহয় তাঁর কানে গিয়ে থাকবে। বললেন, থাক থাক। ওসব আলোচনা করে কাজ নেই।
কোহিনুর বেগমকে বিরক্ত করছ কেন? বেশ রাত হলো, চলো।
তারপর প্রায় কাউকে উদ্দেশ্য না করেই যেন বলেন, কার যেন যাবার কথা ছিল?
জাহেদী কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল।
কোহিনুর বেগম বললেন, ইনি। ইনিই যাবেন আপনাদের সঙ্গে।
একবার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে নিস্পৃহ হয়ে বলেন, গাড়ি ওখানে রাখা। আমি আসছি।
কিন্তু তার আগেই একটা অদ্ভুত কা- করে ফেলে জাহেদী। সকলের সামনেই মুখোমুখি জিজ্ঞেস করে বসে কোহিনুর বেগমকে, আবার কখন হচ্ছে?
কী?
এই – এই ধরনের জলসা।
কোহিনুর বেগম হেসে খুন।
সায়গল বলেন, একে জলসা বলে নাকি। এ হচ্ছে যাকে ইংরেজিতে বলা চলে গেট টুগেদার।
একেবারে নিরাশ করেননি কোহিনুর বেগম।
বলেন, আবার ডাকব আপনাদের। তিনি এসে পড়–ন।
এই ‘তিনি’টি কে, জানবার বড় উদগ্র আগ্রহ। কিন্তু তার আগেই তার অসহিষ্ণু চিত্ত তাকে দিয়ে অন্য এক আবদার জানায়।
জাহেদী বলে, মাঝে মাঝে তো বেড়াতে বেড়াতে এ রাস্তা দিয়ে আসি –
বেশ তো, আসবেন। বেড়াতে বেড়াতে কেন। এমনিতেই আসুন না। মহসীন তো আসে। সঙ্গে চলে আসবেন।
ততক্ষণে গাড়ি স্টার্ট নিয়েছে। সায়গলকে হাত নেড়ে বিদায় জানান কোহিনুর বেগম। বোধহয় কী যেন বললেনও। কিন্তু গাড়ির র্থ র্থ কাঁপুনির আওয়াজে শোনা যায় না সে কথা।
সায়গল তাঁর বৌকে সঙ্গে নিয়ে বসেন। পেছনের আসনে জাহেদী।
সায়গল আজ বড় আস্তে আস্তে চালান। গাড়ি চালানো নয়, যেন চালাবার নাম করে পায়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া। ইশরাত জাহান রিয়ার গ্লাসে ঠোঁটটা বাঁকিয়ে লিপস্টিকের মাপজোক দেখেন, মাথার খোঁপায় মৃদু চাপ দিয়ে চুলগুলোকে প্রকৃতস্থ করেন। তারপর বলেন, এত আস্তে কেন?
আস্তে কই। থার্টিতে রয়েছি। আর তাড়াহুড়ো করেই কি লাভ। কোনো মেলট্রেন তো ফেল হচ্ছে না।
বলতে গিয়েই মনে হয় পেছনের সদ্য পরিচিত অবাঞ্ছিত যাত্রীটির কথা।
সায়গল ঘাড় না ফিরিয়েই প্রশ্ন করেন, কোন ফার্মে চাকরি করো?
আমাকে বলছেন?
ইশরাত জাহান হেসে বলেন, তবে কি আমাকে বলছেন। আমার কি ফার্মে চাকরি করার বয়েস আছে।
জাহেদী জবাব দেয়, ম্যাকব্রাইড ইন্সিওরেন্সে।
সায়গল চমকে ওঠেন, ম্যাকব্রাইডে গেলে কেমন করে?
এতোটা অবাক হওয়ার কী থাকতে পারে বোঝে না জাহেদী। বলে, কাগজে অ্যাডভার্টাইজ করেছিল। আমি –
সায়গলের আওয়াজ ভারি হয়ে আসে, কোন স্কেলে ফিক্স করছে তোমাকে?
একশ পঁচিশ – দুশো পঞ্চাশ।
পুওর স্টার্ট।
ইশরাত জাহানের বোধহয় আর তর সইছিল না।
বললেন, সায়গলের সঙ্গে সরাসরি দেখা করলেন না কেন।
হবসন্স তো নামে ‘বস’। আসল অফিসের চাবিকাঠি ওরই হাতে।
তার সদ্য চাকরি পাওয়া অফিসের বড় কর্তার সঙ্গে গাড়িতে বসে বাড়ি ফেরার কথা ভেবে কেমন বিব্রত বোধ করে জাহেদী। ইনি শুধু সায়গল নয়। ম্যাকব্রাইডের চারশ পঁচাত্তর জন নর-নারীর অন্নদাতা।
তেমন ইচ্ছে হলে বোধহয় একবার ডেকেও পাঠাতেন সায়গল।
অথচ জাহেদী তাঁর নাম শোনেনি। কামরা দেখেনি। তবু অনুমান করতে কষ্ট হয় না সায়গলের কামরার ভয় লাগানো পুরু কার্পেট পদদলিত করে, নিঃশব্দে বুজে আসা দরজার অন্তরালে মুখোমুখি বসতে হতো তাকে। আর সে অবসরে বড় কঠিন আর তীক্ষè হয়ে মহাজব্দ করার প্রশ্নগুলো যেন কে এক করে ছুড়তেন সায়গাল। আর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার রিজভি পেন্সিলে খচ্ খচ্ করে তা লিখে নিয়ে ঠোঁট ওল্টাত।
ম্যাকব্রাইড কোম্পানির চাকরিতে টেকা চাট্টিখানি কথা নয় – রিজভি নিজেই সে কথা তাকে বলেছিল।
বলেছিল, এখন তো নিলাম। তিনমাস পর ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার নিজে আপনার ফাইল দেখবেন। তারপর গ্রেড।
আর তারপর, জিজ্ঞেস করেছিল জাহেদী।
তারপর প্রবেশন দু’বছর।
আর প্রবেশন শেষ হলে?
এই নতুন চাকুরের অতি ঔৎসুক্যে বুঝি ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছিল রিজভির। বলল, প্রবেশন শেষ করুন। পরের কথা পরে। একি আপনার দেশী কোম্পানি। এখানে বড় কথা ইফিসিয়ান্সি। টিকে যেতে পারলে, আর বরাত যদি ভালো থাকে, কে বলতে পারে হয়তো নাইরোবি, মোম্বাসাতে পোস্টিং। নগদের ওপর চারশো টাকা এ্যালাউন্স।
একটু থেমে নিয়ে আবার বলেছিল, কাজ করুন, হার্ড লেবার।
যদি পার্টস থাকে, একদিন না একদিন ধরা পড়বেই, বুঝেছেন।
আজ সেই ম্যাকব্রাইড কোম্পানির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে এক গাড়িতে যাচ্ছে।
আর যা হোক প্রথম পরিচয়ে না জেনে হলেও সায়গল যে নিজে হাতে দরজা খুলে তাকে বসতে বলেছেন অন্তত এ সুবাদে তার ওপর তেমন কড়া হয়তো হতে পারবেন না।
হয়তো প্রবেশনের মেয়াদটাও কমিয়ে দিতে পারেন।
সায়গল যেতে যেতেই জিজ্ঞেস করেন, কার রিকমেন্ডেশন নিয়ে এসেছিলে?
না, কারও রিকমেন্ডেশন আনিনি।
স্ট্রেঞ্জ। এতো সহজে চাকরি পেলে কি করে।
কোনো জবাব দিতে পারেনি জাহেদী।
কিন্তু কি যেন একটা আত্মগোপন করতে চায়! একেবারে কারও সুপারিশ নিয়ে আসেনি, কথাটা কি ঠিক হলো। সায়গলও কি আর একদিন জানতে পারবেন না। কিন্তু সে কথা কেমন করে বলা যায়।
মহসীন নিজে ওর হাতে একখানা চিঠি দিয়ে বলেছিল, সোজা রিজভির কাছে দিস। আর কোনো ভায়া-মিডিয়া নয়।
প্রথমে একটু আপত্তি করছিল জাহেদী, কিন্তু –
এতে কোনো কিন্তু নেই।
আবার বার বার করে বলে দিয়েছিল, দেখিস সায়গলের হাতে যেন না পড়ে চিঠি। বড় স্ট্রিক্ট। রিজভির লোক জানলে বিপদ। নাকানি চুবানি না খাইয়ে ছাড়বে না।
তারপর আবার একটু থেমে বলেছিল, অবশ্যি জানলেও ক্ষতি নেই। কোহিনুর বেগমের চিঠি অবজ্ঞা করবে এমন সাহস সায়গলের নেই। রিজভিও সেটা জানে।
সায়গল খানিকক্ষণ থেমে আবার বলেন, কোনোব্রাঞ্চে দিয়েছে তোমাকে?
জি. এ. ফোর এ্যাডমিনিস্ট্রশেন।
ইশরাত জাহান জিজ্ঞেস করেন, ওটা তো তোমারই আন্ডারে, না?
স্ত্রীর এমন একটা স্থুল প্রশ্নে বিরক্ত বোধ না করে পারেন না। তারপর গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিতে দিতে বলেন, আবার নতুন করে বলতে হবে নাকি। জি. এ. ফোর কেন, এ্যাডমিনিস্ট্রিশনের গোটাটাই আমার হাতে। আর আমাকে ডিঙ্গিয়ে ম্যাকব্রাইড কোম্পানির ছায়া মাড়াতে পারবে না কেউ, সেও বলে দিচ্ছি।
কথাটা তারই প্রতি এক প্রচ্ছন্ন হুমকি কিনা, বোঝে না জাহেদী। কিন্তু ততক্ষণে গাড়ি থেমেছে। এবার নিজেই দরজা খুলে বেরিয়ে আসে জাহেদী। তারপর সামনে এগিয়ে কর্তব্য বোধের তাড়নায় বিগলিত হয়ে নিবেদন করে, আপনাকে বড্ড কষ্ট দিলাম স্যার।
ম্যাকব্রাইড কোম্পানির ডেপুটি জেনারেল তার কৃতজ্ঞতার স্বীকারোক্তি শোনবার সময়টুকু দিতে পারলেন না। তার আগেই মহা ক্ষিপ্রতায় গর্জনশীল গাড়ি কিছু পেট্রল আর কিছু ধোঁওয়ার তুচ্ছতা ছড়িয়ে দিয়ে রাস্তার বাঁক ঘুরল।
দুই
পুলকিত বিস্ময়ের মেঘ যতই কেটে যেতে থাকে, ততই অবাক হয় জাহেদী। হঠাৎ কেমন যেন নিজের কাছেই নিজেকে অসহ্য মনে হয়।
তার অর্থহীন জীবনের গতানুগতিক স্বাভাবিক ধারাটাই আজ ভয়ানক হোঁচট খেয়েছে। নিয়মের চাকাটা অহেতুক মোড় ঘুরছে। অথচ এসব কিছুই হতো না যদি যেমন চলছিল, তেমনি চলত। কোনো প্রয়োজন ছিল না সেদিন তার পতঙ্গ বাসনাকে এক মুঠো আলোর সামনে ছুড়ে দেওয়ার। শখ করে তাকে সেদিন সঙ্গে নিয়ে বিপদেই ফলেছেন মহসীন।
এরপর যখন অফিসে যাবে, যখন সায়গলের সঙ্গে দেখা হবে – কেমন হবে সে সাক্ষাৎকারের পর্বটি, কৌতূহলী মনে সে প্রশ্নের কোনো মীমাংসা হয় না।
এমনও হতে পারে, সায়গলের মনেই থাকবে না এসব। একটা দুঃস্বপ্নের মতো কাল রাতের অতর্কিত সাক্ষাতের কথা মনেই থাকবে না। অথবা থাকলেও না চেনারই ভান করবে। মাহমুদ আনওয়ার সায়গলের মতো অমন একজন জাঁদরেল লোক কেন শুধু শুধু ডেকে পাঠাবেন তাকে। সামান্য গ্রেড ফোরের অফিস এ্যাসিস্টেন্ট।
আবার মনে হয় সায়গালের কাছে সে তো বড়জোর অফিসের নগণ্য ফাইলের তুচ্ছতা। তাকে নিয়ে মাথাব্যথাই হবে কেন তাঁর।
তবে মনের দিক থেকে মোটামুটি একটা সঙ্কল্প ঠিক করে নিয়েছে জাহেদী। সায়গল আর তার বিচরণ ক্ষেত্রের মাঝখানে বৈষম্যের দেয়ালটা এবার থেকে হবে পাকা পোক্ত। এবং সেটাই উচিৎ। যে বাড়িতে সায়গলের অবাধ বিচরণ, হয়তো সেখানে তার অনুপ্রবেশও দোষণীয়। আগ্রহ আর আকাক্সক্ষার লোভ করতে হবে এবার থেকে যথাসম্ভব সংযত। আর কোনোদিনই যাবে না প্রিমরোজ ভিলাতে।
কোনোদিনই তাকে গাড়িতে করে পৌঁছে দেবার বায়না তুলে বিব্রত করবে না কাউকে। কোহিনুর বেগমের মুগ্ধ আচরণ আর বিহ্বল দৃষ্টি যদি তাকে প্রলুব্ধ করে, তার বাসনা আন্দোলিত করে, তবু নয়।
পরদিন যথারীতি কাজ করেছে অফিসে। প্রিমরোজ ভিলায় তার স্বর্গীয় ক’টি মুহূর্তের স্মৃতির স্বাদ যদিও তখন মনের আনাচে কানাচে জেগে। এক নিবিড় বিস্ময়ের মতোই সায়গলও কি সে কথাই ভাবছেন?
সিঁড়ির কাছে হঠাৎ চোখাচোখি হয়ে যায়।
একবার ভুরু কুঁচকে তাকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলেন সায়গল, কাল রাতে তোমাকে কি –
জাহেদী তাঁকে কথা শেষ করতে দেয় না। তার আগেই জবাব দেয়, হ্যাঁ, স্যার।
আই সি। কোন সেকশন কাজ করো বলছিলে?
সার আমি জি. এ. ফোর, এ্যাডমিনিস্ট্রেশনে অফিস এ্যাসিস্টেন্ট।
লাঞ্চের পর দেখা করো।
বুক র্দু র্দু করছিল।
লাঞ্চের পর দেখা করতে এল।
কাল রাতের দেখা মানুষটি যেন কুয়াশা-জাল থেকে বেরিয়ে এসে এখন নির্দয় অনুভূতির অগ্নিকু । তাঁর চশমার কাচ এতো পরিষ্কার, কোনো ছায়াই পড়ে না তাতে। চুলের কোথাও কোথাও পাক ধরছে। তবু সযতেœ পাট করা।
সায়গলের কামরা, যেন নিছকই একটি কামরা নয়। সুশৃঙ্খল আর সুনিপুণতার কড়া লৌহদুর্গ। কাগজের তাড়াগুলো গোছগাছ করা। গাঢ় নীল রং-এর কুশনে সুন্দর করে থরে থরে সাজানো পিনগুলো যেন সফল চাকুরের সাফল্যের জ্বলজ্বলে তারা।
সায়গল একনজর আড় চোখে তাকিয়ে নিয়ে বলেন, বসো। তারপর বলেন, ডিকটেশন নাও।
শর্টহ্যান্ড কপি নিয়ে আসিনি স্যার।
কেন নিয়ে আসোনি?
তারপর নিজেই দেরাজ থেকে একখানা বার করে তার দিকে ছুড়ে দিয়ে বলেন, নাও।
সায়গল বলতে থাকেন : আইভরি স্টিমশিপ্ কোম্পানির ‘ফায়ার’ কেসটা। কোম্পানির রায়। খেসারতের হার। ম্যাকব্রাইড কোম্পানির আদ্যোপান্ত ইতিহাস।
ডিকটেশন নয়। যেন দু’নালা বন্দুকে বুনো হাঁস শিকারের ছররা।
একসময় থেমে গিয়ে বলেন, নিয়েছ?
আমতা আমতা করে জাহেদী, হ্যাঁ স্যার। টাইপ করব?
না। পরে করো।
এবার পাইপে খানিকটা তামাক পুরে নিয়ে ওখানা জ্বালিয়ে তুচ্ছতার ধূম্রকু-লী ছড়িয়ে দিয়ে বলেন, দরজাটা বন্ধ করো।
জাহেদী গিয়ে দরজা বন্ধ করে।
এরপর কোনো আদেশ আসবে তারই অপেক্ষা।
খানিকক্ষণ কথা নেই। শুধু বন্ বন্ পাখা ঘোরার শব্দ। তারপর শিকারীর দুর্জ্ঞেয় স্বর যেন সন্দেহের পাখিটাকে এতেঠ ক্ষণে ঠিক নিশানা করে ফেলেছে।
বলেন, ও বাড়িতে কেন গিয়েছিলে?
জাহেদী জানে, এ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা নি®প্রয়োজন।
সায়গল প্রিমরোজ ভিলার কথা বলছেন।
আমার এক বন্ধুর সঙ্গে গিয়েছিলাম, স্যার।
ওদের তুমি চিনতে?
না।
তারপর কি মনে করে নিজেই কৈফিয়ৎ দেবার চেষ্টা করেন।
আমি অবশ্যি যাই, সে অন্য কারণে। ওরা আমাদের পুরনো ক্লায়েন্ট। ওদের অধিকাংশ বীমা আমাদের কাছে। কিন্তু তুমি গিয়েছিলে কেন?
এবার জাহেদী রীতিমতো সন্ত্রস্ত।
আর যাব না স্যার।
স্বরটা একটু নিচু করে বলেন সায়গল, যাওয়া না যাওয়া তোমার ইচ্ছে। কিন্তু একটা কথা –
সায়গল কী যেন একটা খুঁজছিলেন পাইপ পরিষ্কার করার জন্যে। ওখানা কাগজের তাড়া থেকে বার করে তুলে দেয় জাহেদী।
বিনীত ধন্যবাদ জানিয়ে আবার শুরু করেন সায়গল, আমি তোমার মতো বয়েসে কাজ করতাম। পরিশ্রম করতাম। ক্লিয়ারিং এজেন্সিতে ত্রিশ টাকা মাইনেতে চাকরি করতাম। একদিনে উঠিনি। সাতাশ বছর লেগে আছি।
স্যার, আমি অফিসের সময় কোথাও যাই না।
অফিসের সময়ের পরও আমি কাজ করতাম। মুদিখানায় খাতা লিখতাম। ট্যুইশানি করতাম। আমার ফাদার ‘পুওর’ ছিলেন। তাছাড়া –
এ সময় টেলিফোন বেজে ওঠে।
জাহেদী উঠতে চায়। সায়গল হাত নেড়ে তাকে বসতে বলেন।
টেলিফোনে কথা সেরে আবার পাইপ ধরান।
জাহেদী আবার বলে, স্যার আমি তাহলে আর ও বাসায় যাব না।
সায়গল একটু হাসলেন যেন। ঠিক হাসি যদি বলা যায় তার ভ্রƒ-কুঞ্চন শিথিল হওয়াকে।
না আমি করিনি। তবে যেখানেই যাও, প্রথমে দেখতে হবে সুবিধেটা কি! তা নইলে খামোকা সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।
একটু থামেন সায়গল। যেন খেই হারিয়ে ফেলেছেন। তাই তাঁর কৈফিয়ৎ-এর পুনরাবৃত্তি করে বলেন, আমি যাই তাঁরা পুরনো ক্লায়েন্ট বলে। আরও অনেকের বাসায় যাই।
আবার টেলিফোন বেজে ওঠে।
সায়গল ওখানা তুলে নিয়ে একহাত দিয়ে চেপে ধরেন। তারপর বলেন, যা ডিকটেশন দিলাম, তা টাইপ করো না।
আকাশ থেকে পড়ে যেন জাহেদী।
করব না স্যার?
না।
কারণ যদি করো, আর ভুল ধরা পড়ে চাকরিতে রাখা যাবে না। তার চেয়ে ভালো, টাইপ করো না। আর শোনো –
বলুন স্যার।
কাপড়ে একটু স্টার্চ দিও। পোশাক-আশাকে ঢিলেমি আমার দু’চোখের বিষ।
সায়গলের কামরা থেকে বেরিয়ে কেমন অবাকই হয়েছিল জাহেদী। এক এক সময় মনে হয়েছে এই অর্থহীন সদুপদেশ যেন প্রচ্ছন্ন কোনো মনঃবেদনার ব্যর্থ আক্ষেপ। বোধহয় সায়গল তাঁর সেই আক্ষেপের ভাষাকে কোম্পানিসুলভ পারদর্শিতার চাতুর্যে আড়াল করলেন। অন্তত সেরকমই মনে হয়েছে তার।
সায়গলের আজকের আচার-ব্যবহারটাই যেন কেমন খাপছাড়া। সায়গলদের মতো লোকদের কোনো অজুহাতের দরকার হয় না। আর তাছাড়া অজুহাতের অভাবই হয়েছিল কোথায়। তাঁর সেই তড়বড়ে অশ্বগতি বক্তব্য টুকটাক লিখে নিয়ে নির্ভুল টাইপ করা কোনোমতেই সম্ভব ছিল না।
তখন ওই কাগজটাই হতে পারত তার মৃত্যু-সনদ। কিন্তু চাকরিহীনতার সাক্ষাৎ মৃত্যুদ-ের হাত থেকে বাঁচাতে গেলেন কেন সায়গল।
তার কি কোনো কারণ ছিল?
সে কারণ আর যাই হোক, অফিসের কেউ জানে না।
ক্যাশিয়ার কাওয়াসজী বলে, আপনার তো বড় ভাগ্য বলতে হবে। সায়গালের কামরায় গিয়ে আমরা গলদঘর্ম হয়ে যাই। আর আপনি কী করে অক্ষত দেহে বেরিয়ে এলেন?
অফিসের হেড ক্লার্ক রোজারিও বলে দিয়েছিল ডিকটেশন?
তারপর!
আমি তো লিখে গেলাম। ভুল-ভাল শুদ্ধ।
টাইপ করে দেখালেন?
না তো। বললেন, টাইপ করে কাজ নেই।
আশ্চর্য!
কাওয়াসজী বলে, আশ্চর্য হবার কিছু নেই। আপনি সুনজরে পড়েছেন। আমাদের ডিঙ্গিয়ে উঠে যাবেন একদিন র্ত র্ত করে বলে দিচ্ছি।
ফোঁড়ন কাটে রোজারিও, সায়গলকে হাতে রাখলে আর পায় কে। আপনি খামোকাই কনফার্মেশন নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলেন। আপনিও যে কি? সায়গলের সুনজর কনফার্মেশনের বাবা। চা খাওয়ান মশাই।
কেবল ক্লেমস অফিসার শওকৎ একমতো হয় না। বলে, ধাপ্পাবাজিতে বিশ্বাস করবেন না। এসব জারিজুরি আমার জানা আছে। বুঝলেন, আপনার মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাওয়ার মতলব। দেখে নেবেন, বলে দিলাম।
ইতিমধ্যে চা এসে যায়।
অফিসে সকলের চোখেই ওর কদর বেড়েছে যেন। শওকৎ-এর মতো দু’একজন লোক থাকবেই, যারা কারও কোনো ভালোতেই বিশ্বাস করে না। তাদের বিশ্বাস করানোও যায় না।
তবু চা খাওয়ার পর জাহেদী শওকৎ-এর সঙ্গেই গিয়ে বসে।
বলে, তাহলে আপনার মনে হয়, মতলব একটা আছে।
টেবিল চাপড়ে বলে শওকৎ, নিশ্চয়ই আছে। আমি জানি না? এই নিয়ে পাঁচবার চাকরি বদল করলাম। আরে, আমার মতো লোক কি সায়গলের ধার ধারে।
তারপর স্বরটা নাবিয়ে ওর কানের কাছে এসে বলে, আসলে সায়গল আমাকে সহ্য করতে পারে না। কিন্তু কি করবে বলুন। ‘ক্লেনস্’-এর কাজ সবাই বোঝে না। কাওয়াসজী এতক্ষণ কথা বলেনি।
তার ধৈর্যের বাঁধ বুঝি ভেঙ্গে আসার উপক্রম। খাতা থেকে মুখ তুলে বলে, ওটাই আপনার গোঁ। আপনি থোড়াই আমাদের কাজ বোঝেন?
শওকৎ চটে যায়, আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে যাওয়াই বিপদ। আপনাদের, যাকে বলে, ফাইল-ঘেষাঁ মেন্টালিটি। আমি কি সাধে রয়েছি। এসব কোম্পানির পরওয়া করি থোড়াই।
কাওয়াসজী ছাড়ে না।
সে তো অনেক বছর ধরে শুনছি।
শওকৎ পকেট থেকে একতাড়া কাগজ বার করে বলে, বলছি বটে। কিন্তু এ বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ নয়। দু’তিনটা ‘অফার’ পকেটে না নিয়ে এসব বলি ভাবছেন! আর দুটো মাস সবুর করব। তারপর এসপার কি ওসপার।
লাঞ্চ-বিরতি শেষ হয়।
কিন্তু কোনোমতেই কাজে মন বসে না।
সায়গলের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের নানা ব্যাখ্যা হয়েছে এবং হবে। লক্ষ করেছে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম ফাইল এসেছে আজ।
এক ফাঁকে আবার এসে বসে রোজারিও। মাথায় তার গুটিকয় চুল অবশিষ্ট। বত্রিশ বছর ধরে এক নাগাড়ে কাজ করছে এ কোম্পানিতে।
জাহেদী টাইপরাইটারে কার্বন চড়াতে চড়াতে বলে, আপনার ওই ফাইলটা এক্ষুনি ফেরত দিচ্ছি মিঃ রোজারিও।
কিন্তু সে কথায় তেমন আগ্রহ নেই।
রোজারিও বলে, বেশ তো, তা না হয় দেবেন। কনফিডেন্সিয়ালি একটা কথা বলি।
বলুন।
মোম্বাসার ব্রাঞ্চ অফিসে একটা এক্সিকিউটিভের পোস্ট খালি আছে।
কিন্তু –
জাহেদী আমতা আমতা করে।
কিন্তু আবার কি। ঝুলে পড়–ন। গিয়ে ধরুন, সার আমার ওই পোস্টিংটা করিয়ে দিন। এসবই কনফিডেন্সিয়াল ইনফরমেশন। দিতে বারণ। তবু দিলাম।
আমার কথা শুনতে যাবেন কেন।
রোজারিও চটে যায়, ওই তো আপনাদের দোষ। শুনবেন না কেন। একবার বলেই দেখুন।
তারপর গলাটা নাবিয়ে ওর মুখের কাছে মুখ এনে বলে, আমার কেস্টাও একটু সুবিধে হলে –
আপনার আবার কি কেস্?
বলুন, আর ক’বছর চাকরি। দুটো ইনক্রিমেন্ট যদি –
আমি বললে কি ঠিক হবে?
ওভাবে বতে যাবেন কেন? এ-কথা সে কথার ফাঁকে বলবেন।
আচ্ছা। যদি আবার কখনও ডাকেন।
সে তো বটেই। ডাকবেন ঠিকই, দেখে নেবেন।
বলতে বলতে রোজারিওর চোখে একটা নি®প্রভ আলোর দ্যুতি ফুটে ওঠে। কিন্তু সে ক্ষণিকের জন্যে।
তিন
অফিসি ঝামেলায় প্রায় ভুলেই গিয়েছিল কোহিনুর বেগমের কথা। সেই স্বপ্নরাত্রির কথা। তবু তার আমেজ ভুলবার নয়। স্টেশনের দূরগামী সিগন্যাল চোখে না পড়লেও যেমন এক অস্পষ্ট মায়া জন্মায়, এও কতকটা তেমনি।
মহসীনের সঙ্গেও দেখা হয়নি। সে কোনো এক ক্লিয়ারিং অফিসের সুপারভাইজার। রেসের ঘোড়ার মতো ছুটে বেড়ানোই তার কাজ। তবু অসীম ব্যস্ততার ক্ষুরধার অশ্বও একদিন ক্লান্ত হয়। মহসীনও হয়ে থাকবে। তাই হঠাৎ রাত এগারটায় সে এসে হাজির।
বলে, চলো সেকেন্ড শো দেখে আসি।
জাহেদী যত না অবাক হয় তাকে দেখে, তার চেয়ে বেশি অবাক হয় তার প্রস্তাব শুনে।
বলে, পাগল। এখন ছবি কোথায়।
দু’খানা টিকিট দেখিয়ে বলে মহসীন, চলোই না। ছবি টবি আর কি? খানিকক্ষণ বসে কাটানো।
সেদিন হঠাৎ করে তাকে প্রিমরোজের বাড়িতে ফেলে গিয়ে, পরমুখাপেক্ষী হওয়ার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে মহসীনই ফেলেছিল। সে নীরব ক্ষোভের জ্বালা কাটিয়ে উঠতে পারেনি জাহেদী। তার সেদিনকার অসহায় অবস্থা আর্তনাদের মতো বিলাপ করে ওঠে। হা-হুঁতাশ করে ওঠে আহত অভিমান।
কিন্তু মহসীনের সঙ্গে দেখা হওয়ার পরমুহূর্তেই বোঝে জাহেদী, অনুযোগের ধুপছায়ায় আজকের হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশ যেন কোনোমতেই ঘোলাটে করা যায় না।
অথচ নিজেই সে কথা শুধোয় মহসীন, সেদিন রাতে ফিরতে অসুবিধে হয়নি তো। আমি আরেকজনের সঙ্গে চলে গিয়েছিলাম। যাবার সময় বলে যেতে পারিনি।
একটি ক্ষিপ্ত, সংক্ষিপ্ত জবাবে জানায় জাহেদী, না।
অথচ মহসীনের বিরুদ্ধে তার অনুযোগই বা কিসের। তার দিগন্তবিস্তারী পরিচয়ের পরিধি যে তারই কল্যাণে। যেন তার জরাজীর্ণ জীবন – যেখানে জোয়ার নেই, ভাটা নেই, উত্থান নেই, পতন নেই – সেখান থেকে তুলে এনে সম্ভাবনার উজ্জ্বল স্বর্ণবলয় সেই দেখিয়েছে তাকে। সেজন্যে জাহেদীর কৃতজ্ঞই থাকা উচিৎ। কৃতজ্ঞতার সুযোগ – তাও সেই দিয়েছে। নইলে এ জীবনে, আর কী ছিল। কী ছিল চাইবার। কী ছিল কামনা করার।
এ কথা, সে কথা, সব কথাই হয়। একটি কথাই হয় না। একটি প্রসঙ্গই যেন পরম কাতরতায় মনে মনে গলে মোম হয়ে যায়। সেই গলন্ত মোমের ছোঁয়াচ হয়ত পেয়েছে দু’জনই। তবু তার উল্লেখ নেই। বোধহয় সবচেয়ে অনুভূতিশীল প্রসঙ্গের বেলায় এমনি হয়। সেটা অনুল্লেখিতই থাকে। জীবনের ধারাই এমন। অযুত কথার রাজ্যে, একটি কথাই সেখানে অকাল বসন্তের দুর্লভ রজনীগন্ধা। তাকে না যায় ছোঁয়া, না যায় ধরা। আকাক্সক্ষা তাকে কামনা করে। বাসনা তাকে ঘিরে ঘনীভূত হয়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। নাগাল পাওয়া যায় না তার। সে মেঘে মেঘে কুয়াশার আবরণী নিয়ে এক দুরূহ পর্বতমালার অনাস্বাদিত চূড়ার মতো থাকে অপরাজেয় হয়ে।
মাঠে গিয়ে বসে দু’জন। জিরোবার ছল করে। কিন্তু মুক্ত আকাশ আর একটু হাওয়ার মাখামাখি যেন কি বিপর্যয় ঘটিয়ে দেয়।
মহসীন বলে, কিছু ভালো লাগছে না।
কেন?
কি জানি।
এক টুকরো ঘাস ছিঁড়ে নিয়ে চিবুতে থাকে মহসীন। বলে, মানুষ কী ভাবে আর কী হয়।
জাহেদী যেন এই গূঢ় তথ্যটি বোঝে না।
তার মানে?
মহসীন যে মোটেও অপ্রস্তুত নয়, আরেকটি চতুর মিথ্যে তার দোহাই দেয়।
বলে, কেন এই যে বলেছিলাম যাব সিনেমায়। যাওয়া হলো না।
তাতে কি। ভালোই তো লাগছে।
মহসীন প্রতিবাদ করে।
আমার ভালো লাগছে না। কী মনে হয় জানো? অর্জন করার চিন্তাটাই সুখ। সত্যিকার অর্জনে সুখ নেই।
তখুনি মনে হয়েছে, এবার ইঙ্গিতের তরণী ঠিকই তার প্রার্থিত তীরভূমিতে গিয়ে নোঙ্গর করবে। সেই বাঞ্ছিত প্রসঙ্গে। ভালোই হবে। এ কথা সে কথার ভাবনায় দোলায়িত হয়ে মিথ্যে কসরৎ করতে হবে না আর। কিন্তু মহসীন কি তার মনের কথা বুঝতে পেরেই পদে পদে তাকে জব্দ করার অঙ্গীকার নিয়েছে।
পরের কথাতেই তা সুস্পষ্ট।
মহসীন বলে, যেমন মনে করো, একদিন ভাবতাম একটা ভালো চাকরি, একটু স্বাচ্ছন্দ্য ছাড়া জীবনে আর কোনোকিছুর দরকার নেই। আজ কিন্তু মনে হয় দরকারে লিস্টিটা কোনোদিনই পূরণ হবার নয়। আকাক্সক্ষা একটা সিঁড়ি। যার শেষধাপে কোনোমতেই পৌঁছানো যায় না।
বেশ রাত হয়েছে।
পরে একটা চায়ের দোকানে বসেছিল তারা দু’জন। জাহেদী নির্জীবের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, দেখেছ, কি ভীষণ জ্যোৎস্না। আরও বেড়াবে নাকি?
মহসীনের মনঃপুত হলো না।
দুঃ ছাই। জ্যোৎস্না দেখলে আমার কেমন ভয় করে।
ভয় করে?
সত্যি তাই। অন্ধকারে নিজের ভাবনার চোরাগলি চোখে পড়ে না। জ্যোৎস্নায় সেগুলো কেমন মায়াময় হয়ে ওঠে। আমার ভালো লাগে না।
জাহেদী নিরাশ হয়ে বলে, তাহলে চলো।
চলো।
সেদিন স্পষ্ট অনুভব করেছে জাহেদী একটা দুঃসহ জ্বালা তাকে তিল তিল দগ্ধ করছে। সে তার কী করবে। সে জ্বালা যখন এসেছিল, বলে কয়ে আসেনি। এমনি এসেছে।
যেতে যেতে পকেট থেকে ওর চাবির তোড়া আঙুলের ডগায় ঘুরিয়ে নিয়ে বলে, তোমার কি খুব ঘুম পেয়েছে।
না তো। কেন?
যাবে?
কথাটা শেষ না করলেও যেন তার অর্থ বুঝতে কষ্ট হয় না।
তবু জিজ্ঞেস করে জাহেদী, কোথায়?
প্রিন্সেস স্ট্রিটে।
এতো রাতে?
যেন একটু মনক্ষুণœই হয় মহসীন, কেন শহরে কার্ফিউ লেগেছে নাকি?
না না, সে কথা বলিনি।
তাহলে চলো। বেশ নিরিবিলি রাস্তা। আমার ভালো লাগে।
জাহেদী দ্বিরুক্তি করে না। করে লাভ নেই জেনেই।
পাইন সারির তলায় চাঁদের আলোয় তৈরি ছায়ার ঝালর মাড়িয়ে মাড়িয়ে মনে হয়েছে জাহেদীর – এ যেন কোনো আকাক্সক্ষণীয় স্বপ্নরাজ্যের দিকে যাত্রা।
মহসীন একটা দুটোই কথা বলে।
ভারি কষ্ট দিলাম তোমাকে, না?
ক্ষমাপ্রার্থনার ভঙ্গিতে দুটো হাত তার হাতের মুঠোয় এনে বিনয়ের আকুতি জানায়।
জাহেদী বলে, না।
যেতে যেতে চোখে পড়ে বাঁ দিকের সেই বাড়ি। সে বাড়ির সিংহদ্বার।
যেখানে দাঁড়িয়ে থেকে কোহিনুর বেগম সবাইকে বিনীত সম্ভাষণে মোহিত করেছিলেন। তাঁর মায়া-মুগ্ধ রূপের দেমাকে মাতিয়ে তুলেছিলেন এক দুর্লভ সন্ধে।
মহসীন নয়। যেন তার অজান্তে চোখ দুটো পিপাসিত দৃষ্টি মেলে ওই বাড়ির দিকে তাকিয়ে নীরব আকুতির সুরে বলে, কোহিনুর বেগম এখন কী করছেন কে জানে?
আবার খানিকক্ষণ থেমে বলে, জানো কোহিনুর বেগম যদি জানতেন, রাত-বেরাতে তার বাড়ির কাছ দিয়ে এমন করে ঘুরে বেড়াচ্ছি, কী ভাবতেন বলো তো?
জাহেদী কোনো সদুত্তর খুঁজে পায় না।
মহসীন নিজেই তার জবাব দেয়, স্রেফ পাগল বলতেন। স্রেফ পাগল।
চার
সায়গল সেদিন, আবার সকাল সকাল ডেকে পাঠান জাহেদীকে। অফিসের কলগুঞ্জন আর কলগুঞ্জন থাকে না। ওটা এখন অস্বস্তিকর আলোচনার বিষয়বস্তু। দু’দিন হয়নি চাকরিতে কনফারমেশন হয়নি, তবু তার কি তোয়াজ।
ভীষণ অস্বস্তি জাহেদীর। জানে এ ধরনের সাক্ষাৎকারে কোনো লাভ নেই। কোনো ভাগ্যের প্রসন্ন শিকে ছিঁড়বে না। না, ইচ্ছে করেই সায়গল তাকে অফিসের দশজনের চক্ষুশূল করে তুলছেন। এটা কি তাঁর উচিৎ হচ্ছে? এক কলমের খোঁচার সায়গল তার দুটো ইনক্রিমেন্ট দিতে পারেন। কম ঝামেলার সেকশনে বদলি করতে পারেন। কিন্তু জীবন তো আর সায়গলের একদিনের আকস্মিক অনুগ্রহ নয়। ওটা অনির্দিষ্টকালের। সায়গল অমর নন। তাঁর মৃত্যুর আগেই তাঁর ক্ষমতার মৃত্যু হতে পারে। এ অশুভ চিন্তা, সন্দেহ নেই। কিন্তু অশুভ চিন্তার নেশা যে সায়গলই ক’দিন ধরে তার মাথায় ঢুকিয়েছেন। জাহেদীর কি দোষ?
তাছাড়া এসব অনুগ্রহ যেমন মুহূর্তের উচ্ছ্বাস নিয়ে আসে, মুহূর্তের উচ্ছ্বাস নিয়েই বাষ্প হয়ে যায়। তার জন্যে একটি নির্ভরশীল চাকরি, নিরাপদ-ভবিষ্যৎ, ভদ্রগোছের সংস্থান চিরদিনের মতো কি নিশ্চিত করে যেতে পারেন সায়গল।
অফিসের কনফিডেন্সিয়াল স্টেনো ডলি ক্রুজ দাঁড়িয়ে ছিল। এতো দিন চোখ তুলে তাকাবারই সাহস হয়নি। আজ সায়গলের কৃপাই যেন তাকে সাহস জুগিয়েছে। মাথা সোজা করে তাকাতে পারছে। এতো দিন টেবিলের চারপাশে এক তোড়া কাগজ, একটা পিনকুশন আর কয়েকটা জরুরি লাল ফিতের ফাইল ছাড়া কিছুই দেখেনি এ চোখে। আজ সে নয়। তার বাড়তি সাহসটাই যেন দৃষ্টিকে করে তুলেছে প্রগল্ভ। জাহেদী আজ চোখ তুলে তাকাতে পারে। কখনও আবেগে কণ্ঠনিঃসৃত হঠাৎ একটি গানের কলি উৎসারিত হলে সেজন্যে দ্বিধাগ্রস্ত হয় না। মোটামুটি সব অধিকারের ছাড়পত্রই যেন তার মিলেছে। মাথার ওপর বন্ বন্ করে ঘুরছিল পাখাটা। কেমন শীত শীত করছিল।
বেশ সাহস করেই ভদ্র অথচ চড়া গলায় বলতে পেরেছে কমিয়ে দেবো পাখাটা?
ক্যাশিয়ার কাওয়াসজী তার ত্রিশ বছরের শ্রান্ত করুণ দৃষ্টি ছুড়ে বলে, দিন। আপনার যদি অসুবিধে না হয়, দিন।
অবশ্যি অধিকারের ক্ষেত্রে জীবনে এগুলোর কোনো দাম নেই, কোনো মূল্য নেই। পাখার গতি মন্থর বা দ্রুত করায় নেই কোনো বাহাদুরি। তবু এমনি করেই অধিকারের চারাগাছ বুঝি কুঁড়ি মেলে। একদিনে নয়। থেকে থেকে এমনি করে।
ডলি ক্রুজ তখনও দাঁড়িয়ে। না, না, দাঁড়িয়ে নয়। সে চেয়ার নিয়ে ততক্ষণে বসেছে পাশে এসে।
উঠতে যাচ্ছিল জাহেদী।
ডলি ক্রুজ বলল, বসুন। দু’মিনিট এদিক সেদিক হলে এসে যাবে না কিছু।
জাহেদী প্রতিবাদ করে, তবু –
আমি তো এই মাত্র এলাম। বাইরের পার্টির সঙ্গে কথা বলছেন টেলিফোনে।
ডলি ক্রুজ আশ্বস্ত করে তাকে।
দু’কাপ চা এসে যায় এরই মধ্যে।
জাহেদী অবাক হয়, তার মানে, আপনি চা খাওয়াচ্ছেন নাকি?
হ্যাঁ, কি হয়েছে।
এর আগে এতো কাছে বসে, এতো পাশাপাশি আর কখনও দেখেনি ডলি ক্রুজকে। কথা বলা তো দূরের কথা।
ভালো লাগছে আজ ডলি ক্রুজকে দেখে। সরু আঙ্গুলের ডগা দিয়ে ও কপালের একগুচ্ছ চুল সরিয়ে নেয়। তাকিয়ে থাকে জাহেদী। যে আঙ্গুল ব্যবসা বাণিজ্যের হিসেবের অঙ্ক তুলতে অভ্যস্ত, সে আঙ্গুলেরও কি একটা সুললিত বর্ণনা হতে পারে না। ঠিক কোনো উপমা আসছে না মনে। কিরো’র বইয়ে এ ধরনের আঙ্গুলের কি বর্ণনা?
আর চোখ। যেন এক জোড়া ক্লান্তির ঘুম। স্বপ্ন দেখাই মানায় এ চোখে, অফিসের ফাইলপত্র নয়।
জাহেদী বলে, হঠাৎ চা আনতে গেলেন কেন?
কী হয়েছে। আমার নিজেরও তো ইচ্ছে করছিল।
স্পষ্ট বোঝা যায়, কিছু উৎসুক দৃষ্টি এই সামান্য আপাতমধুর দৃশ্যের অবতারণায় আহত। নিছক ভদ্রতার খাতিরেই যেন কিছু বলা যায় না।
ডলি ক্রুজের চা নয়, ভালো লাগে ওর বিশিষ্ট ভঙ্গিতে কেটলি ধরাটাই। ভালো লাগে যখন নিষ্পাপ বাষ্পের ধোঁয়ায় ওর মুখটা খুব কাছে এসে ঘেমে ওঠে।
ডলি ক্রুজ অন্তহীন কথার পাড়ি জমাতে চায়। কিন্তু সে সুযোগ কই। এতোগুলো ক্ষুধার্ত নেকড়ে-চোখ দৃষ্টির আড়ালে যেন খুঁজে পেতে এক একটা কথা বলতে হয়।
চা খাওয়া শেষ হয়েছে। ডলি ক্রুজ আদ্ধেকটা খেয়েই ছেড়ে দেয়।
কি, খেলেন না?
একটা নির্মল কটাক্ষ হেনে বলে ডলি ক্রুজ, চা একটা অজুহাত। আসলে সময় কাটাবার ফন্দি। একটু জিরোতে পারলে যেন বাঁচি। জানেন না ওই একনাগাড়ে টাইপ করতে করতে আঙ্গুলের কড়া ধরে ওঠে।
সে আলোচনা নিছকই রসিকতার পর্যায়ে টেনে এনে বলে জাহেদী, সেজন্যেই চার আনা পয়সা খেসারত দেবেন নাকি রোজ রোজ?
ডলি ক্রুজ বলে, মন্দ কি। সামান্য পুঁজিতে এর চেয়ে বেশি লাভের প্রত্যাশা করতে নেই।
তারপর তার চোখজোড়া মৃদু কৌতুকে আন্দোলিত হয়ে বলে, কই বললেন না তো। করতে আছে?
এবার আরেকবার তলব আসে সায়গলের কাছ থেকে।
ডলি ক্রুজ ওঠার উপক্রম করে। বলে, বাব্বা যান যান।
আপনাকে দু’দ- স্বস্তির সঙ্গে বসতে দেবে না। মাঝখান থেকে আমার চাকরিটা খেয়ে দেবেন না আবার।
জাহেদীও উঠে দাঁড়ায়। বলে, রোজ রোজ চা খাওয়াবেন বলে লোভ দেখালেন। তারপরও পারি?
সায়গল তাকে বসতে বলে দু’চারটে কাগজে সই করেন। চোখ না তুলেই বলেন, তুমি যেন কোন সেকশনে।
এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো একই প্রশ্ন।
আর একই জবাব জাহেদীর, জি. এ. ফোর – এ্যাডমিনিস্ট্রেশনে স্যার।
উত্তম। কাজ বোঝ?
চেষ্টার ত্রুটি করি না সার।
তাঁর তেজের সাক্ষরে পাতলা একটা কাগজ একটু ছিঁড়ে যায়। সায়গল কৃত্রিম রহস্য করে বলেন, পুরনো কথা। ত্রুটি কেউ করে না, তবু হয়। লস্ হয়। কোম্পানি লালবাতি জ্বালায়। লোক ছাঁটাই হয়।
জাহেদীকে চুপ করে থাকতে দেখে বলেন, কিছু বলছ না যে?
তা তো ঠিকই সার।
একসময় থেমে বলেন সায়গল, আমি তোমার কনফিডেন্সিয়াল রিপোর্ট দেখব। তারপর –
কথাটা শেষ না করেই পাইপে অগ্নিসংযোগ করেন।
বলেন, জানো আসল কথা উদ্যম। সেদিন ও বাড়িতে গিয়েছিলে, তোমাকে লিফ্ট দিয়েছিলাম। কেন, জানো?
না স্যার।
যদি জানতাম এখানে কাজ করো, দিতাম না।
আমি নিজে ইচ্ছে করে আসিনি। কোহিনুর বেগম বললেন তাই।
ভালো করেছ। তোমাকে আমার ভালো লাগুক আর নাই লাগুক, প্রিন্সিপ্যালটাই বড় কথা। আমার অফিসের চাকুরেদের আমি লিফ্ট দিই না। তেমন অসুবিধে হলে তোমাকে বাসের ভাড়া নিতে বলতাম।
যেন সে কথার মোড় ঘোরাবার জন্যেই বলে জাহেদী, আমি কিন্তু সে কথা কাউকে বলিনি স্যার।
চেয়ার থেকে লাফিয়ে ওঠেন সায়গল, কেন, বলোনি কেন। ভাবো, আমি ভয় করি! না বলাটাই তোমার কাপুরুষতা।
ক্রিং করে বেল বাজান।
চাপরাশি ছুটে আসে।
তলব দেন, এডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার, এ্যাকাউন্ট্যান্ট, ক্যাশিয়ার, ডাক সবাইকে।
জাহেদী অতটা কল্পনা করেনি।
একে একে সবাই এসে ঢোকে।
সাধারণত এমন করে সবাইকে একসঙ্গে ডেকে পাঠান না সায়গল।
এ্যাকাউন্ট্যান্ট বলে, স্যার রিটার্নটা তৈরি করে উঠতে পারিনি।
সায়গল যেন সবাইকে খুঁচিয়ে একটা অর্থহীন আনন্দে বিগলিত। পাইপে ধোঁওয়া ছেড়ে বলেন, শেষ করে উঠতে পারেননি, ভালো কথা। আপনার ইনক্রিমেন্টটাও সময়মতো রিকমেন্ড করে উঠতে পারব না।
হেড ক্লার্ক, ক্যাশিয়ার জরুরি ফাইল হাতে নিয়ে এসেছিল। তাদের সবাইকে নিরস্ত করে বলেন, আমি আপনাদের সেজন্যে ডাকিনি।
তারপর জাহেদীকে দেখিয়ে বলেন, একে চেনেন?
এ্যাকাউন্ট্যান্ট বলে, চিনব না কেন সার, স্মার্ট ছেলে।
সায়গল বলেন, সেটা আপনার ধারণা, না আমাকে খুশি করার জন্যে বলছেন?
এ্যাকাউন্ট্যান্ট জবাব দেয়, না স্যার। আপনাকে খুশি করার জন্যে কেন বলব। কাজকর্ম দেখে –
কাজকর্ম মানে। কী কাজ দেখেছেন?
এবার বেশ একটু বিপদেই পড়তে হয এ্যাকাউন্ট্যান্টকে।
ঠিক আমার সেকশন তো নয়, স্যার –
সায়গল তাকে কথা শেষ করতে দেন না, বুঝেছি। আপনারা ভালোমতো নজর দিচ্ছেন না। আমি ওর কাজের রিপোর্ট চাই সাত দিনের ভেতর।
পরের ঘটনা আরও আকস্মিক।
সায়গল বলেন, আপনারা বসুন।
দেরাজ থেকে ফিতে দিয়ে বাঁধা কাগজের বাক্স বের করেন। তাতে একখানা কেক।
জাহেদীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, কাটো।
হেড ক্লার্ক রোজারিও বিব্রত বোধ করে। বোধহয় তাদের উপস্থিতি পছন্দ করবেন না সায়গল মনে করেই বলে, আমরা তাহলে চলি স্যার।
সায়গল হাত নেড়ে বসতে বলেন, দ্যাটস্ অলরাইট। আজ আমার বার্থ ডে। হঠাৎ মনে হলো কিনা!
এ ধরনের আপ্যায়ন এর আগে হয়নি।
সায়গলের আগে মিঃ টার্নার ছিলেন। তাঁর ফেয়ারওয়েল পার্টিতে একবার কেক খাওয়ানো হয়েছিল।
সায়গল বলেন, আমি উঠেছি, তবে একদিনে উঠিনি। আমার ফাদার ‘পুওর’ ছিলেন। কোনো ব্যাংকিং ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা, প্রিন্সিপ্যাল। আদর্শ।
জাহেদীকে ইতস্তত করতে দেখে বলেন, নাও নাও। তারপর বাকি সবাইকে পাঠিয়ে দিও।
এ্যাকাউন্ট্যান্ট অন্যদের সঙ্গে ফিস্ফিসে গলায় কী পরামর্শ করে বলে, তাহলে স্যার আমাদেরও কিছু –
না না, ওসব দরকার নেই। হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম। সেদিন এক বাসায় গিয়েছিলাম। বেশ রাত হয়েছিল। দেখলাম এ স্ট্র্যান্ডেড। গাড়ি পাচ্ছে না। ছেড়ে দিয়ে এলাম। এতে অন্যায়ের কিছু আছে?
ক্যাশিয়ার চা গিলে বলে, না এতে অন্যায়ের আর কি আছে। আপনার মহানুভবতা –
সায়গল আবার চটে যান, রাবিশ। বাজে কথা। আমার কোনো মহানুভবতা নেই। আমার স্ত্রী বরং মহানুভব।
প্রসঙ্গত যেন একটা গপ্প মনে পড়ে যায়। রসিয়ে সে কথা বলতে থাকেন, আমি একবার একটা হরিণ শিকার করেছিলাম। পায়ে লেগেছিল। আমার স্ত্রী তিনমাস ওটার শুশ্রƒষা করেছিলেন। বাঁচেনি। যাকগে –
হঠাৎ সায়গল ঘড়ির দিকে তাকান।
বলেন, তাহলে আপনারা আসুন। পনেরো মিনিট সময় নষ্ট হলো। আপনাদের সবাইকে ওভারটাইম করতে হবে।
এ্যাকাউন্ট্যান্ট যেন কী বলতে যায়।
তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, সায়গল, ওয়ান মাস্ট পে ফর অল গুড থিংস ইন লাইফ। যান, কাজে লেগে পড়ুন।
জাহেদীও ওঠার উপক্রম করে।
সায়গল বললেন, তুমি বসো। তোমাকে যেতে বলিনি।
সবাই চলে গেলে কপালে হাত রাখেন সায়গল।
এক মুহূর্ত তাকে বড় অসহায় দেখায়। কাতর দৃষ্টি মেলে প্রায় অস্পষ্ট স্বরে বলেন, আমার যেন কেমন লাগছে।
জাহেদী উৎকণ্ঠিত।
ডাক্তার ডাকব স্যার?
না। বরং পাখাটা তেজ করে দাও। কাউকে আসতে দিও না।
কতক্ষণ এভাবে কাটল মনে নেই। তারপর একসময় দেরাজ থেকে একটা খাম বার করে খস্খস্ করে ঠিকানা লিখে ওখানা বাড়িয়ে দেন।
চিঠিখানা দিয়ে আসতে পারবে?
কোথায় স্যার।
প্রিন্সেস স্ট্রিটে।
কাকে?
পকেটে রাখ। ওপরে নাম লেখা আছে।
ওখানা পকেটে পুরতে গিয়ে রীতিমতো ঘেমে উঠছিল জাহেদীর হাত।
সায়গল বলেন, এখন যেতে পার। ভালো কথা, পার যদি যাবার পথে বিকেলেই দিয়ে এসো।
পাঁচ
সায়গল বলেছেন পুরনো ক্লায়েন্ট। তাদের সঙ্গে সাত-সতেরো ব্যবসা। সব কাজ সবাইকে দিয়ে সম্ভব নয়। বিশ্বস্ত লোকের সহায়তা চেয়েছেন বোধহয়।
কিন্তু এতো কেউ থাকতে তাকে কেন। আর তেমন জরুরি ব্যাপারে শোফার হাঁকানো গাড়ি দিয়ে যেতেই কতক্ষণ।
মাত্র একদিনের, বা বলা যায় একসন্ধের পরিচয়। পরিচয়ও ঠিক নয়। বরং বলা যায় আলাপ। ভিড়ের একজন হয়ে যাকে দেখেছে, তাকে মনে রাখবার মতো এমন কিছু দায় ঘটেনি কোহিনুর বেগমের।
হ্যাঁ হ্যাঁ। একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন বটে, কতটুকু চিনি দেবো আপনার চায়ে।
ব্যস ওইটুকু।
তবু মাঝে মাঝে রজত-শুভ্র চাঁদের মতো স্নিগ্ধ হয়ে ভেসে ওঠে তাঁর মুখম-ল। বড্ড ঝুঁকে কথা বলছিলেন। বোধহয় ভদ্রতার বাড়াবাড়ি সেটা। যা পাওয়া যায় না, হাত বাড়ালে যাকে ছোঁয়া যায় না সে চাঁদ যেমন মিছিমিছি পূর্ণিমার লোভ জাগায়। বোধহয় এসব নিছকই তার কল্পনা। আদব কায়দার বাল্যশিক্ষায় যা লেখা, তারই অনুসরণ করেছেন মাত্র কোহিনুর বেগম।
তাঁর বাড়ির হলঘরেই একটা ছবি দেখেছিল। কোনো এক যুবরাজের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন কোহিনুর বেগম। ছবিটা অনেক দিন আগের তোলা। সোনালী ফ্রেমে বাঁধানো।
যুবরাজদের জন্যে হয়ত এ হাতের ছোঁয়া কিছুই নয়। মামুলি ব্যাপার। এমন কত ছুঁয়েছেন। কত তার হিসেব নেই।
অথচ কোহিনুর বেগমের হাতের ছোঁয়ায় যদি সে পারত স্পর্শধন্য হতে!
সেই কোহিনুর বেগমের কাছেই পৌঁছে দিতে হবে আজ এ চিঠিখানা প্রিমরোজ ভিলায়। গাড়ি ছাড়া পায়ে হেঁটে যাবার অধিকার যেখানে একমাত্র কাগজের হকার আর যে দুধের জোগান দেয়, তার। তবু তাকে যেতে হবে। সিংহদরজায় প্রস্তরমূর্তি দারওয়ানটা, হকচকিয়ে দিয়ে বলতে হবে, আমি এসেছি।
কিন্তু ‘আমি এসেছি’ কথাটা যথেষ্ট নয়। কারও কারও জন্যে হয়তো যথেষ্ট। আবার কারও কারও জন্যে আদৌ সেটা কোনো পরিচয় নয়।
একবার ভেবেছিল প্রিমরোজ ভিলায় যাবার আগে মহসীনকে সঙ্গে নিয়ে যাবে। তার ভরসার সঙ্গী। বড় গেট থেকে ছোট গেট : সেখান থেকে অন্দর মহল যাবার ছাড়পত্র সেই দেবে। কেউ বাধা দেবে না সদর দরজায় মহসীনকে। তার চলার ভঙ্গি, বলার ভঙ্গিই বলে দেবে, এ মানুষের পরিচয় দরকার নেই। এ মানুষ ঢের কদরের মানুষ।
কিন্তু সায়গল বলেছিলেন, বিকেলে যাবার সময় দিয়ে আসতে। ব্যাপারটা গোপনীয় নিশ্চয়ই। কোনো বিশেষ ব্যবসাসংক্রান্তও হতে পারে।
নতুন চাকরিতে পাকা হওয়ার আগে এমনি সব অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। নিয়মের সিঁড়ি ভেঙ্গে সাফল্যের চূড়ায় ওঠা যায় না সবসময়। ডিঙ্গিয়ে যেতে হয়। আর সে সুযোগই বোধহয় দিয়েছেন সায়গল।
কিন্তু প্রিমরোজ ভিলার গেটের কাছে এসে পা সরে না জাহেদীর। বিকেলের পড়ন্ত রোদেও বাইরে থেকে বাড়িটাকে মন হয় নিঝুমপুরীর মতো। কামিনী ফুলের ঝাড় দেয়াল টপকে থোক থোক সৌরভের আমোদ ছড়ায়। কৃষ্ণচূড়াও আছে। কিন্তু সেটা গুচ্ছ গুচ্ছ আক্ষেপের মতো যেন অনেক উঁচুতে থেকে আকাশ ছুঁতে চায়। আর কিছু লতাগাছ দেয়াল বেয়ে সাপের ফণার মতো এঁকে বেঁকে পথচারীকে যেন বুঝিয়ে দিতে চায় নীরব বিষের কোনো জ্বালা।
ভেতর থেকে গেট খুলে যায়। বুড়ো দারওয়ান আপাদমস্তক দেখে তাকে।
তার চাউনিটাই একটা বিরক্তিকর অস্বস্তির জিজ্ঞাসা। যে জিজ্ঞাসায় ভাষার চেয়ে দৃষ্টির তেজ প্রখর।
মামুলি ভাবেই বলে জাহেদী, কোহিনুর বেগম আছেন?
প্রশ্ন না করলেও যেন অশীতিপর বৃদ্ধ বোঝে, এখানে পথশ্রান্তে কেউ হঠাৎ একগ্লাস পানির তৃষ্ণা নিয়ে আসে না। কামিনী ফুলের এক তোড়া সৌরভ বগলদাবা করতেও নয়।
তারা ওপর তলায় ঘুম-ঘুম চোখ মহিলার বিকেলের পরিচর্যা শেষের মাহেন্দ্রক্ষণে বিঘœ ঘটাতেই আসে।
অগত্যা নেবে আসতে হয় কোহিনুর বেগমকেই স্বয়ং। কখনও খোলামেলা একরাশ চুল নিয়ে। কখনও পীতাভ শাড়ির সঙ্গে মেরুন রং-এর ব্লাউজটা থাকে। রং মিলিয়ে, রুচি মিলিয়ে পরিচর্যার আগেই তবলায় মৃদু ঘায়ের মতো আওয়াজ তুলে তাঁর লঘুচরণ সিঁড়ি ভাঙ্গতে থাকে।
দারওয়ান নিজে থেকে তাকে বসবার ঘরে নিয়ে এলো। সেদিনের সেই ঘর। ঠিক তেমনি কালচে রং-এর টেবিল। তেমনি ছিমছাম গোছানো। কিন্তু দিনের আলোয় বাড়িটা বড় বেশি নাক-উঁচু মনে হয়। রাতের অন্ধকারে কার্পেটের রং, দেয়ালের হাল্কা নীলাভ প্রলেপ বোঝা যায়নি। বিকেলের পড়ন্ত রোদে মনে হয়, গৃহকর্ত্রী যেন বড় বেশি করে অস্ফুট ভাষায় তার দেমাকের কথা জানিয়ে দিচ্ছেন। নিরুপদ্রব, সুশৃঙ্খল জীবনের বাহাদুরি সরবে ঘোষণার জন্য চক্চকে তক্তকে করে রেখেছেন আসবাবপত্র। স্ফটিক-স্বচ্ছ করে রেখেছেন শো-কেসের কাচ। সেখানে চীনে মাটির চারটে পুতুল। সার্কাসের মেয়েদের মতো এক পা তুলে নাচার ভঙ্গিতে উদ্দাম। কোথায় মিষ্টি মধুর ঝঙ্কারে পাঁচটা বাজার শব্দ হয়।
বারান্দার পিঁজরায় আবল তাবল বকছে ময়না পাখি।
বেছে বেছে কুশন দেওয়া একটি চেয়ারের আড়ালে কু-লী পাকিয়ে বসেছে বরফশুভ্র একটি বেড়াল।
অথচ এই সোনালী বিকেল, ঝিরঝিরে হাওয়ায় খুব দামী ড্রয়িং রুমে বসে বলবার কোনো কথাই নেই তার। কোহিনুর বেগম যতই সেজেগুজে আসুন তার চোখের ভুরু যতই ক্ষুরধার আর বঙ্কিম হোক, কাজলের রং যতই তৃষিত হোক, বলবার কিছুই নেই।
আর কোহিনুর বেগম হয়ত সত্যি সত্যি চিনবেনও না তাকে। সায়গলের বরাত দিয়েই চেনাতে হবে।
তার নিজের অস্তিত্ব খানিকটা পাইন গাছের তলায় একটা অবহেলিত ক্যাকটাসের মতো । পাইন গাছ ছিল বলেই যাকে চেনা যায়। নইলে বৃথাই তার নিজস্ব সত্তার অহঙ্কার।
কোহিনুর বেগম আসেন পুরো আধ ঘণ্টা বসিয়ে। ভেতর থেকে দরজা খুলে যায়। কই, আজ তার সাজ-সজ্জাটা যেন অনেক স্তিমিত। তবু সব মিলিয়ে ভালোই লাগছে। কালবোশেখীর আকাশের গাঢ় রং ধার করেছেন তাঁর শাড়িতে। সঙ্গে ফিকে জলপাই-রং ব্লাউজ। অবিন্যস্ত কয়েকটি চুলের নিষ্ঠুরতায় রেখাঙ্কিত চিবুক। বোধহয় ঘুমিয়ে উঠেছেন একটু আগে। বালিশে পিষ্ট হয়েছিল ওই একগুচ্ছ চুল। আর কিছু এলোমেলো হয়ে তাঁর অনিন্দ্যকান্তি মুখটাকে ঊর্ণনাভের মতো জড়িয়ে স্বপ্নময় করে তোলে। কোনো কথা না বলেও অপলক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালোই লাগে।
কিন্তু অতো সময় কই কোহিনুর বেগমের।
আস্তে করে সোফায় একটু কাৎ হয়ে বলেন, আপনাকে দেখেছি এর আগে?
জাহেদী বিনয়াবনত হয়ে বলে, এর আগে একদিন এসেছিলাম।
কই মনে পড়ছে না তো।
সেই সন্দেহটাই করেছিল জাহেদী।
মহসীনের সঙ্গে সেদিন সন্ধেয় এসেছিলাম।
হঠাৎ কেমন লজ্জায়, উৎকণ্ঠায়, দ্বিধায় আরক্ত হয়ে বলেন, কি কা- বলুন তো! এ তো সেদিনের কথা। আজকাল ছাই কিচ্ছু মনে থাকে না।
এবার তার সাহসটাকে নিজেই যেন ভরসার একটা খুঁটি দিয়েছেন কোহিনুর বেগম।
তাই বলে যায় অনর্গল, আপনিই সেদিন মি: সায়গলের সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন আমাকে গাড়িতে করে।
ও তাই বলুন। তা মনে থাকবে না কেন। কোনো অসুবিধে হয়নি তো বাড়ি ফিরতে?
না।
এবার পকেট থেকে চিঠিখানা বার করে বাড়িয়ে দেয়।
বলে, মি: সায়গল আমাকে পাঠিয়েছেন। এখানা দিতে বলেছেন আপনাকে।
কেমন দ্বিধাজড়িত অথচ সহজ অভ্যস্ত সুরে বলেন, কিসের চিঠি আবার!
কোহিনুর বেগম ওখানা তুলে নেন।
তেমন কোনো আগ্রহই দেখান না। ভ্যানিটি ব্যাগে রাখেন।
বলতে যাচ্ছিল জাহেদী, কোনো জবাব প্রত্যাশা করে কিনা। কিন্তু তার সুযোগ না দিয়েই বলেন কোহিনুর বেগম, ভালো করে বসুন। হাত পা গুটিয়ে কেন।
তার আগেই পর্দা ঠেলে যাকে বেরিয়ে আসতে দেখল, অবাক না হয়ে পারেনি জাহেদী।
হাতে একখানা স্ক্রু ড্রাইভার। রীতিমতো গলদঘর্ম। বোঝা যায় এতক্ষণ কাজ করছিল।
মহসীন বলল, আপনার রেডিওর দুটো ভাল্ব্ই খারাপ।
জাহেদী কিছু বলার আগেই কোহিনুর বেগম বলেন, আপনি কি সারাক্ষণই বসে ওই করছিলেন? ভালো মিস্ত্রি জুটেছে যা হোক। আমি পড়ে পড়ে ঘুমিয়েছি। তা কেউ চা দিয়েছিল?
মহসীনও কম অবাক হয় না। তবু কোনো কথা হলো না, পরস্পর নীরব সম্ভাষণ ছাড়া।
তারপর নিজে থেকেই তার কাছাকাছি এসে বসে মহসীন। যেন ব্যাপারটাকে সেও সহজ করতে চায়, তা আসবে আমাকে বলনি কেন। দুপুর থেকে একা একা –
কোহিনুর বেগম বলেন, বেশ হয়েছে। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে গেলে ওই হয়। কী বলেন?
সমর্থনের আশায় এবার জাহেদীর দিকে তাকান।
যেন জাহেদী নিজে নয়, তার শিষ্টাচারই তাকে দিয়ে বলায়, তা তো বটেই।
কিন্তু কোথায় একটা সন্দেহ খচ্খচ্ করে ওঠে। প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে আসল ফুলের বাহার মোচনের মতো একটা সাজানো অজুহাত নাতো!
অবশ্যি এক্ষেত্রে তা নাও হতে পারে। তবু।
ওঠার উপক্রম করেন কোহিনুর বেগম। বলেন, আপনারা বসুন। চা দিতে বলি।
কোহিনুর বেগম চলে যেতেই রুমালে কপাল মুছে নিয়ে বলে মহসীন, বুঝেছ এ এক বিশ্রী ঝামেলা। কথা দিয়েছিলাম, ফেলতে তো আর পারি না।
পরের প্রশ্নটি যেন নির্বোধের মতোই করে বসে জাহেদী, ঠিক হলো রেডিও?
আরে ওকি একদিনে ঠিক হবার। একটা দুটো পার্টস? অনেক কিছু বদলাতে হবে।
জাহেদী চুপ করে থাকে।
মহসীন বলে, কান মলেছি, এরপর থেকে এসব ঝামেলায় আর যাব না। একি যেমন তেমন কাজ।
চা আসার আগেই আবার ফিরে আসেন কোহিনুর বেগম। এবার বেশ গম্ভীর মনে হয় তাকে। বোধহয় সায়গলের ওই চিঠি। কী লিখেছেন সায়গল। কোনো পাওনা টাকার তাগিদ? কোনো দুঃসংবাদ?
আশ্চর্য, কোহিনুর বেগম সে প্রসঙ্গ একবারও তোলেন না। শুধু বলেন, চা দেয়নি বুঝি এখনও?
মহসীন উঠে দাঁড়ায়। বলে, চলো আমিও বেরিয়ে পড়ি তোমার সঙ্গে।
খানিকক্ষণ অবচেতনের মতো বসে থাকেন কোহিনুর বেগম।
জাহেদী তার কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায়।
কিছু বলব?
তড়িতাহতের মতো বলেন, কাকে?
সায়গলকে।
মৃদু হেসে বলেন, না না। কিছু বলতে হবে না। আমি জানার পরে।
কিন্তু এবারকার হাসি যেন তাঁর আগের তুলনায় অনেক বেশি ম্লান, অনেক কষ্টকৃত।
মহসীন দরজার বাইরে অপেক্ষা করছিল।
ডাকল, এসো এসো। আমাকে আবার আরেক জায়গায় ছুটতে হবে।
কোহিনুর বেগম গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বলেন, ভালো করে কথাও বলতে পারিনি। কিছু মনে করবেন না। আরেকদিন আসবেন। হঠাৎ কেমন যেন মাথাটা ধরেছে।
ছয়
সায়গলের ওখানে নতুন করে ডাক পড়েনি। নিজেও সায়গল খোঁজ করেননি চিঠির কথা। অথচ দেখা হলে কী বলতে হবে, শুরু থেকে শেষ অবধি ভেবে রেখেছিল। বলবে, সত্যিকার কষ্ট করেছে। বিকেলে কোনোকিছু না পেয়ে পায়ে হেঁটেই গিয়েছে প্রিন্সেস স্ট্রিটে, বলবে।
এ্যাডমিনিস্ট্রেশন আলাদা সেকশন। সায়গলের কামরা ঘুরে যেতে হয়। দেখল সেদিন তাঁর কামরার নাম – ফলকের পাশে লেখা – ‘আউট’।
বোধহয় বেশ কিছুদিন ধরেই সায়গল বাইরে। আশ্চর্য জানতেও পারেনি। অবশ্যি হোমরা চোমরাদের কাজ তার জানবার নয়। এ নিয়ে উৎসাহ প্রকাশ করেও লাভ নেই।
কন্ফিডেন্সিয়াল স্টেনো ডলি ক্রুজ বোধহয় ব্যাপারটা আঁচ করে থাকবে। ডেকে জিজ্ঞেস করে, মি: সায়গলের সঙ্গে দেখা করার জন্যে ছটফট করছেন নাকি?
কথাটায় রাগ করার কিছুই নেই। তবু এক প্রচ্ছন্ন উপহাসের কটাক্ষ। জাহেদী বলে, আমার দেখা করার কি দরকার বলুন। যখন খুশি তিনিই তো ডেকে পাঠান।
ডলি ক্রুজ তার পাঁচটা আঙ্গুলের নখে রং-এর তারতম্য লক্ষ করতে করতে বলে, তাহলে নিশ্চিন্তে ঘুমুতে পারেন এখন।
ঘুমুব! আর এমনি এমনি পয়সা দেবে কোম্পানি?
দুষ্টুমির হাসি ডলি ক্রুজের চোখে মুখে, আমাকে তো দিচ্ছে। অফিসে এসে হাজিরা দিতে হয়, এই যা। কাজ-কর্ম তো কিছু নেই।
জাহেদী বলে, কিছু করলেই পারেন।
মুখ বাঁকায় ডলি ক্রুজ, আমি আর কারও কাজ করতে যাব কেন? এ্যাকাউন্ট্যান্ট চোখ টাটায় জানি। কিন্তু আমি ভেবেছেন ছেলেমানুষ? ডেকে পাঠালে বলি, কন্ফিডেন্সিয়াল কাজ দিয়ে গেছেন। সেগুলো দেখছি।
ভালোই আছেন তাহলে।
শেষের কথায় কেমন আক্ষেপের সুর জাহেদীর।
ডলি ক্রুজের পরের প্রস্তাব আশাতীত।
বলে, এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আলাপ করাটা কি ভালো। তার চেয়ে চলুন আমার ওখানে। এক কাপ চা খাওয়া যাক।
জাহেদী ইতস্তত করে। বলে, আপনিও যেমন। আপনার সঙ্গে একা বসে বসে চা খেতে দেখলে অফিসের লোক আস্ত রাখবে ভাবছেন?
ডলি ক্রুজ হেসে ওঠে, আপনি আচ্ছা ছেলেমানুষ। বাঃ অফিসের কাজ থাকতে পারে না? আমি তো এ্যাকাউন্ট্যান্টকে ডেকে পাঠাই। হেড ক্লার্ককে ডাকি। তারা সবাই বেশি মাইনে পায়। তাই বলে না করে দেখুন তো।
তা আপনি হয়ত পারেন। মাঝখান থেকে আমার চাকরিটা খেয়ে কি লাভ?
ডলি ক্রুজ বেল টিপে চা আনতে বলে।
আপনিও যেমন। চাকরি খাবে কে?
আমার মতো অধস্তন কেরানির চাকরি যে কোনো লোকের কথায় যেতে পারে।
তার ঘুর্ণায়মান চেয়ারে কাৎ হয়ে বসে বলে ডলি ক্রুজ তা পারে বৈ কি। কিন্তু সেই ‘ডিসমিস’-এর চিঠিটা। টাইপ করবে কে শুনি।
কেন, আপনি?
তাছাড়া আবার কে!
তাতে চাকরি রক্ষা পাবে কেমন করে?
বাঃ ধরুন ভুল করে আপনার বদলে আর কারও নাম টাইপ হয়ে গেল।
সে ভুল পরে ধরা পড়বে।
তখন দুঃখিত হবো।
চা এসে যায় ততক্ষণে।
একসময় থেমে ডলি ক্রুজ বলে, মি: সায়গল আপনাকে বলেননি।
কী?
যে বাইরে যাচ্ছেন।
না তো।
অবশ্যি ব্যাপারটা কন্ফিডেন্সিয়াল, সাবধান করে দিয়ে বলে ডলি ক্রুজ।
তারপর চামচ তুলে নিয়ে বলে, ক’চামচ চিনি?
দেড়।
আবার শুরু করে ডলি ক্রুজ, হ্যাঁ যা বলছিলাম। প্যাসিফিকে একটা চার্টার্ড জাহাজে আগুন লেগেছে। আমাদের এখানে বীমা করা। ওটা নিয়ে ইনকোয়ারি হবে লন্ডনে।
তাহলে তো বেশ দেরিই হবে ফিরতে মি: সায়গলের।
হ্যাঁ। তারপর সেখান থেকে আবার জেনেভা যাবার কথা।
ও।
খানিকক্ষণ কোনো কথা নেই।
মাঝে মাঝে মনে হয় এই আপাতদৃষ্টি বাচাল মেয়েটির হয়তো করার কিছু নেই। ‘পেরি মেসনে’র বইখানা শেষ হয়েছে। শেষ হয়েছে কম্প্যাক্ট থেকে পাউডার ঘষে গাল আর পরিমিতো লিপস্টিকে ঠোঁট চটকদার করার কাজ। বোধহয় কোনো বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে টেলিফোন-আলাপের পর্বও ইতি। সুতরাং অফুরন্ত সময়। সময় কাটাবার একটা অজুহাত।
ডলি ক্রুজ নিজের কথা বলে না। হঠাৎ হা-হুঁতাশের সুরে হৃদয় র্দু র্দু করা ভালোবাসার একটা গৎ শুনিয়ে দেয় না। রূপের দ্যুতিতে প্রলুব্ধ করে বটে, কিন্তু হৃদয়ের আমন্ত্রণে মোহিত করে না। আর মোহিত করার যদি কেউ থেকেও থাকে, তবে সে আর যেই হোক, জাহেদী নয়।
চায়ের কাপ শেষ করে জাহেদী বলে, এখন আমি উঠি।
যাবেন, তা বেশ যান।
কাচের দরজা খুলে বেরুবার আগেই আবার ডাক পড়ে তার।
শুনুন।
কি?
ক’টা ফাইল তার হাতে তুলে দেয় ডলি ক্রুজ। অবাক হয় জাহেদী।
আপনিও কাজের হুকুম দিচ্ছেন নাকি?
না না, হেসে বলে ডলি ক্রুজ, একগুচ্ছ অজুহাত দিচ্ছি। অফিসে রসালো আলোচনার কথা মনে করেই। এবার যান।
সেদিন হাতে খুব কাজ ছিল না।
ক্যাশিয়ার কাওয়াসজী বলল, আজ বুঝি আপনার ওই কামরায় ডাক পড়েছিল।
হ্যাঁ।
কন্ফিডেন্সিয়াল কাজ বুঝি।
নকল ঝামেলার ভান করে বলে, আর বলবেন না। সায়গলও আর লোক পেলেন না।
এ্যাকাউন্ট্যান্ট বলে, উইকলি রিটার্ন না তো? তাহলে বলবেন। গতবার একটা ভুল ধরেছিলেন। আর যায় কোথায়। দশ টাকা কাট্।
না না, ওসব কিছু নয়।
কাওয়াসজী তাকে নিরস্ত করে, আপনিও যেমন। কন্ফিডেন্সিয়াল কাজের ফিরিস্তি আপনাকে দেবেন কী করে, শুনি। আপনাদের একটু বুদ্ধিশুদ্ধি হলো না।
আমতা আমতা করে এ্যাকাউন্ট্যান্ট, না না। আমিও তাই ভাবছিলাম। মিস ডলি ক্রুজের ওখানেই বসেছিলেন বোধহয়।
চমকে যায় জাহেদী, হ্যাঁ। আপনি দেখলেন কখন?
না দেখিনি। দু’কাপ চা যেতে দেখলাম কিনা। নিছক অনুমান।
জাহেদী কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু মন বসে না। আজকের সমস্ত আবহাওয়াটাই কেমন গুমোট। কেমন মন খারাপ করা। আর সবচেয়ে অসহনীয় যেন সায়গলের অনুপস্থিতি। ভদ্রলোক যতই চেঁচান, বকুন, তবু তার আপাত নিষ্ঠুর আচরণে স্বস্তির একটা আশ্বাস। সে মহীরুহ। যে মহীরুহের তলায় বসে ছায়া না পেলেও নিরাপদ আশ্রয় মেলে।
হঠাৎ কার গলা শুনে আঁৎকে ওঠে। নারী কণ্ঠ। সবাই সন্ত্রস্ত।
গোলমাল শোনা যায় ডলি ক্রুজের কামরার কাছাকাছি।
জাহেদী সেদিকেই এগিয়ে যায়। দ্রুত গতিতে দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসে সেখান থেকে কে যেন। প্রথমে চিনতে পারেনি জাহেদী।
ভদ্রমহিলা এবার প্রায় তার মুখোমুখি। মিসেস সায়গল। ডলি ক্রুজ যেন কী বলার চেষ্টা করে। ইশরাত জাহান শোনেন না। গলা চড়িয়ে বলেন, আমি এসব মোটেও বিশ্বাস করি না। আসলে সব ওই মেয়েটার কারসাজি। তা না হলে লন্ডন থেকে জেনেভা যাবার কি দরকার পড়ল।
ডলি ক্রুজ নিঃশব্দে নিজে কামরায় ফিরে যায়।
জাহেদীর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই যেন খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে যান ইশরাত জাহান। তারপর সামলে নিয়ে বলেন, তুমিই সেদিন ছিলে না গাড়িতে?
হ্যাঁ।
তবে তো তুমি জানো। বলো তো, সায়গলের এমন কী কাজ পড়ল হঠাৎ বাইরে যাবার।
মোটামুটি ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে জাহেদী শান্ত কণ্ঠে বলে, আপনি হয়তো মিথ্যে সন্দেহ করছেন।
চটে ওঠেন ইশরাত জাহান, মিথ্যে সন্দেহ করছি। কই এর আগেও তো কত ইনকোয়ারি হয়েছে। তখন তো যায়নি।
কথা বলতে বলতে ইশরাত জাহান ওর টেবিলের কাছাকাছি চলে আসেন।
সায়গল ও তাঁর পতœীকে কেন্দ্র করে অফিসে কলগুঞ্জন উঠেছে, বেশ বোঝা যায়।
জাহেদী একখানা চেয়ার বাড়িয়ে দিয়ে বলে, বসুন না।
এবার বোধহয় নিজেই ব্যাপারটা বোঝেন ইশরাত জাহান। আর যা হোক এ ধরনের আলোচনা এতগুলো লোকের সামনে নিশ্চয়ই মুখরোচক নয়।
বলেন, না, এখানে বসব না। তার চেয়ে কাউকে বলো সায়গলের কামরাটা খুলে দিক।
যেন খানিকটা স্বস্তিই পেলেন সায়গলের কামরায় এসে। জাহেদী পাখা ছেড়ে দেয়। কাওয়াসজী এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত পাঠায়।
ইশরাত জাহান এবার একটু গা এলিয়ে দিয়ে বসেন। বলেন, ঘরটা বেশ নিরিবিলি।
এবার জাহেদীর কথা বলার পালা।
বলে, মি: সায়গল তো আপনাকে বলেই গেছেন।
তা তো গেছেন। কিন্তু কোথায় কোথায় যাবে তা বলেননি।
তারপর একটু থেমে আবার বলেন ইশরাত জাহান, আমি ওর গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম এয়ারপোর্টে দিয়ে আসব। রাস্তায় দেরি হয়ে গেল। কি বিশ্রী কা- বলো তো!
তাহলে সোজা এয়ারপোর্টে গেলেই পারতেন।
সেটাই ভালো হতো। ভাবলাম অফিসে এসেই ধরব। দুটো চেক সই করিয়ে নেব। চেক বই আবার থাকে ওর অফিসের দেরাজে। আমাকে বোধহয় বিশ্বাস করে না।
সায়গলের অবর্তমানে, কলুষিত আক্রমণ থেকে তাঁকে বাঁচানোর একচেটিয়া দায়িত্ব যেন আজ জাহেদীরই।
জাহেদী বলে, ছি ছি এসব কী বলছেন।
কেমন ধরে আসে ইশরাত জাহানের কণ্ঠস্বর, আসলে আমার চেহারা ভালো নয় কিনা।
জাহেদী কিছু বলে না। কাওয়াসজীর পাঠানো শরবতের গ্লাসে অভিমানের বাষ্প জমছে।
ইশরাত জাহান আবার একটু থেমে বলেন, তুমি ছেলেমানুষ। আমাকে কী শেখাবে।
এবার সোজাসুজি তার দিকে তাকিয়েই কথাগুলো বলেন। জাহেদীও অপলক নেত্রে স্থিরদৃষ্টি নিয়ে তাঁকে দেখে।
ইশরাত জাহান যদি তাঁর অনুভূতির তাড়নায় সে কথা বলে থাকেন, মিথ্যে বলেননি। যদি সেটা তাঁর উপলব্ধি হয়, তাও মিথ্যে নয়। বয়েসের দাগ আঁচড় কেটেছে ঠিকই। তার চেয়েও বড় কথা তাঁর সন্দিগ্ধ দৃষ্টি। বোধহয় যেটা মানুষের খুঁত ধরতে অসহিষ্ণু পিঁপড়ের মতো অযথা হয়রান। বয়েসকালে হয়ত জৌলুস ছিল। ছিল দেহসৌষ্ঠব। কিন্তু কপালের ভুুরু কুঞ্চিত। মুখের দু’পাশে বিরক্তির গাঢ় রেখা। বোধহয় ইশরাত জাহান আজ হাসতে চাইলেও, সে হাসি কৃত্রিম রাগের মতোই দেখায়।
তাঁর আগের কথার রেশ টেনে নিয়ে জাহেদী বলে, আর সে কথা বললে মি: সায়গলই কি রাজপুত্র?
সে তুমি জানো না। ও পুরুষ মানুষ। ওদের বংশে নতুন নয়। আমি ছাড়া কেউ ধোপে ঠেকেনি। বড় সায়গল, মেজ সায়গল, শুনবে তাদের কা কারখানা? না থাক, বলে কাজ নেই। ওসব শোনাতে গেলে রাত ভোর হয়ে যাবে।
ইশরাত জাহান থামলেন।
অফিস ছুটি হয়ে গিয়েছিল। উঠি উঠি করছিল জাহেদী।
ইশরাত জাহান বাধা যেন বুঝতে পেরেছেন সে কথা। জিজ্ঞেস করেন, কোথাও যাবে নাকি?
যাবার তেমন জায়গা ছিল না।
তাই বলতে হলো, কেন, যেতে হবে কোথাও, আপনার সঙ্গে।
না না। সে কথা নয়।
তারপর আবার নিজের মনেই কী যেন ভাবেন।
বলেন, ভালো কথা মনে হয়েছে। চলো বাসায় চলো। আমি ভালো আইসক্রিম বানাই। খাওয়াব। কেন, সায়গল তোমাকে বলেননি?
কী বলবে জাহেদী খুঁজে পায় না।
কেমন অভিমানের সুরে ইশরাত জাহানের কণ্ঠে, তা যে বলবে না জানতাম। অথচ, আমি নিজে ওর মুখে প্রশংসা শুনেছি।
তাহলে তো নিশ্চয়ই ভালো হবে।
আমাকে খুশি করার জন্যে বলছ?
না না। তা বলব কেন।
বেশ চলো তাহলে।
যেতে যেতেই বলেন, অফিসের লোকজনদের ঘরে ডাকা মোটেই পছন্দ নয় সায়গলের। আমি ডেকেছি শুনলে ক্ষেপেও যেতে পারে।
দমে যায় জাহেদী।
বলে, তবে থাক না।
না না। থাকবে কেন? শখ করে দুটো লোককে ডাকার অধিকার আমার নেই?
জাহেদী স্পষ্ট অনুভব করে সায়গল-গিন্নী নিঃসঙ্গ। অন্তত বিশেষ করে আজ। আসলে তাঁর মনে অনেক বিক্ষুব্ধ ঝড়। তারই ঝাপটায় সহিষ্ণুতার কপাট থর থর। কাউকে কিছু বলবেন কাউকে কিছু শোনাবেন সেটাই বড় কথা। বড় কথা, কথা বলা। বলে ঝরে ঝরে অবসন্ন হওয়া। বলার ক্লান্তিতে না পাওয়ার ক্ষোভ মেটানো। একজন শ্রোতার দরকার। এবং জাহেদী সে শ্রোতা।
সায়গলের বাড়ি এর আগে দেখেনি। ছোট্ট টিলের ওপর খয়েরি রং-এর বাংলো। চারধার ঘিরে সবুজ ঘাসের মনোরম সতরঞ্চি। ফাঁকে ফাঁকে হলিহক আর ক্যালেনডুলার সার। তারই মাঝে আলতা চরণের মতো ইটের সরু রাস্তা। যে রাস্তাটি মিশেছে বারান্দার সিঁড়ি বরাবর।
ইশরাত জাহান জিজ্ঞেস করেন, কোথায় বসবে, ভেতরে না বারান্দায়।
বাইরেই ভালো লাগছিল বেশি।
বলল, এখানেই বসা যাক না। অবশ্যি আপনার যদি আপত্তি না থাকে।
ইশরাত জাহান বলেন, তাহলে আমাকে কিছু সময় দিতে হবে।
তার কৌতূহলী চোখের জবাবটাও দিলেন তার পরপরই; এখানটায় বসলে আমার ইচ্ছে করে ফিকে সবুজ শাড়ি পড়তে। বেশ লাগে। মনে হয়, আমি যেন সবুজ লনের সঙ্গে একাত্ম।
সায়গল-গিন্নীর কবিত্ববোধ বা রসবোধ যাই থাক, সাজ পরিবর্তনে পরিবেশের তারতম্য হওয়ার বিশেষ কোনো লক্ষণ দেখা গেল না।
তবু বলতে হয়, নিশ্চয়ই। যান না কাপড় ছেড়ে আসুন। ভালোই লাগছে বসতে এখানে।
খুব দেরি করলেন না ইশরাত জাহান। যেন তাঁর জামা-কাপড় তাঁর উদগ্র বাসনা চরিতার্থের জন্য আগে থেকেই তৈরি।
আইসক্রিম এলো।
ইশরাত জাহান খেলেন না। জাহেদীর দিকে বাড়িয়ে দিলেন প্লেটটা।
ডাক্তাররা তাদের রোগীর ওপর ওষুধের প্রতিক্রিয়া যেভাবে লক্ষ করে, তেমনি নিবিষ্ট হয়ে দেখছিলেন মিসেস সায়গল।
জাহেদীর অস্বস্তির সীমা নেই।
ইশরাত জাহান বলেন, খুব মিষ্টি কি?
না।
একটু একটু পেপারমেন্টের স্বাদ পাচ্ছ না?
হ্যাঁ।
ওটা আমার স্পেশ্যালিটি। না খেলে বোঝা যায় না। যেন নিছক খুশি করার জন্যেই বলে জাহেদী, সত্যি অপূর্ব।
সন্তুষ্ট হন ইশরাত জাহান।
বলেন, ভালো। মাঝে মাঝে খাওয়াব। মাঝে মাঝে লোকজনদের খাওয়াতে আমার ভালোই লাগে। কিন্তু আমার আবার অন্যদের মতো ভড়ং নেই।
কাদের কথা বলছেন?
প্রিন্সেস স্ট্রিটে কোহিনুর বেগমের ওখানে গিয়েছিলে না তুমি সেদিন?
হ্যাঁ।
হো হো করে হেসে ওঠেন ইসরাত জাহান, অবশ্যি মুখে কিছু বলেনি। তবে সায়গল জানে, আরও অনেকে জানে ওটা নাকি ছিল তাদের বিয়ে-বার্ষিকী।
জাহেদী অবাক হয়।
বলে, কাদের বিয়ে-বার্ষিকী?
কেন, কোহিনুর বেগমের কথা জানো না।
না তো।
মানে, পরচর্চা আমার ভালোও লাগে না। করিও না। কিন্তু তাই বলে অমন লোক-দেখানো স্বভাবও আমার নয়।
ঘটনাটা সবিস্তারে বলার জন্যে যেন তাঁর তর সইছিল না। বললেন, সে আমরাও অস্বীকার করি না। মানে ইমতিয়াজ আবার সায়গলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ভালো ইঞ্জিনিয়ার। গিয়েছিল আমেরিকায় বছর দু’একের জন্য। বিয়ের পরপরই।
কি মনে করে পাশে রাখা খালি প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলেন, আরেকটা আইসক্রিম দেবো?
না।
বুঝেছি আসলে ভালো হয়নি। সেজন্যে গরজ দেখাচ্ছ না।
না না, ভালো হয়েছে। এমন আইসক্রিম বিশ্বাস করুন, আমি খাইনি কখনও। বলুন না, কী বলছিলেন।
খেই হারিয়ে ফেলেন ইশরাত জাহান।
জাহেদী মনে করিয়ে দেয়, মি: ইমতিয়াজে কথা বলছিলেন। বিদেশে গিয়েছিলেন –
হ্যাঁ হ্যাঁ। তারপর কোহিনুর বেগমও গেল।
তারপর?
বছরখানেক পর ফিরে এসে কোহিনুর বেগম আমাদের শুনিয়ে বলল, এখান থেকে চলে যাচ্ছে।
জানো, সায়গল তো ফেয়ারওয়েল পার্টি দিয়ে বসল। কিন্তু বছর গড়ায়, কই কোহিনুর বেগমের যাবার নাম নেই।
এবার কণ্ঠস্বর নাবিয়ে বলেন, আসলে আমার কি মনে হয় জানো। ইমতিয়াজ আর ফিরবে না।
অবাক হয় জাহেদী, তাহলে বিয়ে-বার্ষিকী কেন?
সে কথাই তো বলছি। ওসব লোক-দেখানো। কোহিনুর বেগম হয়ত আমাদের বিশ্বাস করাতে চায় একদিন আসবেই ইমতিয়াজ। তুমিই বলো অন্তরের টানই যেখানে নেই, সেখানে ভড়ং কেন। অবশ্যি কোহিনুর বেগমের পয়সা কড়ির অভাব নেই। বাপের প্রচুর পয়সা। একমাত্র কন্যা। ভাই থাকেন জাপানে।
যেন সমস্ত বংশপরিচয় তার নখাগ্রে।
ইশরাত জাহানের চোখে মুখে আত্মসন্তুষ্টির ভাব। মনে হয় যেন এই নকল বানানো জগতের ইতিবৃত্ত গলা উঁচিয়ে সবাইকে শুনিয়ে দিতে পারলে খুশি হন তিনি।
অথচ জাহেদী যেন খানিকটা ব্যথিতই হয় কোহিনুর বেগমের এই আপাত ভাগ্যবিপর্যয়ের কাহিনী শুনে। ভেসে ওঠে তাঁর করুণ-বিষাদ মুখখানা।
সন্ধে হয়ে আসছিল।
ইশরাত জাহান বলেন, আসলে কি জানো। ওই ভদ্রমহিলাকে আমি দু’চোখে দেখতে পারি না।
কেন?
আমার মনে হয় –
পরের কথাটা কেমন আমতা আমতা করে বলেন, ও সায়গলের ওপরও কেমন জাদু করেছে। সায়গলের মুখে ওর অনর্গল প্রশংসা।
জাহেদী নিরুত্তাপ হয়ে বলে, বোধহয় বন্ধুপতœী, তাই।
বাজে কথা। সায়গল, আমি তোমাকে ঠিক বলে দিচ্ছি, কোনো মতলব নিয়ে গেছে। কোহিনুর বেগমের হয়ে ইমতিয়াজের কাছে ওকালতি করতে। নইলে জেনেভায় তার কি কাজ।
ইমতিয়াজ কি এখন জেনেভায়?
সে তো অনেক বছর। আমেরিকা থেকে ফিরে চাকরি নিয়ে গিয়েছিল সেখানে। আমার কি মনে হয় জান, ইমতিয়াজ ওখানেই ঘর-সংসার পাতার মতলবে। কি জানি অনেকরকম কানাঘুষো শুনি। যাকগে এসব পরচর্চা আমার পছন্দ হয় না –
ইশরাত জাহান যেন নিজেই কথা বলার ক্লান্তিতে হাঁপিয়ে ওঠেন।
প্রসঙ্গ পরিবর্তনের জন্যে বলে জাহেদী, সত্যি ভারি সুন্দর আপনার লনটা।
তুমি সুন্দর বলছ। কিন্তু সায়গল বলে কেমন ন্যাড়া ন্যাড়া। মুশকিল কি জানো, আমার পছন্দের সঙ্গে ওর পছন্দ একদম মেলে না।
এ সময় টেলিফোন বেজে ওঠে।
ইশরাত জাহানকে কে ডাকছে।
আজকের এই অর্থহীন সন্ধের অবসান কামনা জাহেদীও করছিল। যেন তার আগেই একটা হিল্লে হয়ে গেল।
জাহেদী বলে, তাহলে আমি চলি।
কথাটা ইশরাত জাহান শুনলেন কিনা বোঝা গেল না।
ভেতর থেকেই বললেন, এসো।
সাত
সায়গল ফিরে এলেন ঠিক সাতাশ দিন পর।
এতদিন অফিসটাই যেন অফিস ছিল না। যে অফিস সকাল আটটায় সুবোধ বালকের মতো একনিষ্ঠ হতো, তাতে যেন ঢিলেমির ক্লান্তি। বড় ঘড়িতে দশটা বাজলেও আদ্ধেক লোক আসে না। রিসেপশন হলের ক্যালেন্ডারের পাতা ছেঁড়া হয় না। এসব সায়গল থাকলে সম্ভব হতো না।
তাঁর বিচার এ যুগের। জেট যুগের। নোটানুটির ধার ধারেন না। সন্দেহ হলেই ডেকে পাঠান। সিদ্ধান্ত যেন তাঁর নখাগ্রে।
কারও মাইনে কমান। তেমনি পুলকিত হয়ে কারও একটা ইনক্রিমেন্ট দেন। তাঁর এই টানাপোড়নের নীতি গা-সহা হয়ে গেছে সকলের। একসময় যারা বীতশ্রদ্ধ তারাই আবার অন্য সময় একটু পুরস্কারের আনন্দে তাঁর সম্বন্ধে উচ্ছ্বসিত।
এ্যাকাউন্ট্যান্ট আর ক্যাশিয়ার কাজের ফিরিস্তি নিয়ে বচসা করে না। ডলি ক্রুজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে আলাপে মুখরিত টেলিফোনটাকে ‘এনগেজড’-এর দুঃসহ যন্ত্রণায় ধরে রাখে না। নিয়মের চাকাটাই যেন তাঁর উপস্থিতিতে গতিমুখর।
সায়গল সেদিন এসেই দু’জনকে বরখাস্তের হুমকি দিলেন। তিনজনের নামে ওয়ার্নিং ইস্যু হলো। তেমনি এলো কাজের বাহাদুরির জন্য একটি অথর্ব স্টেনোর পনেরো টাকা বেতন বৃদ্ধির আদেশ।
অফিসে তাঁর শাসনের মূল মন্ত্রটাই যেন এমনি ধারার। কোথাও টান, কোথাও ছাড়। কিছু দাও, কিছু নাও।
অফিসের চেহারাই ফিরে যায়। ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় চলে কাজ। তাঁর জাদুমন্ত্রের পরশে সবাই সচকিত। কর্তব্যপরায়ণ, শৃঙ্খলাবদ্ধ।
কিন্তু সায়গলের নিজের নিষ্ঠার জগৎ যেন হঠাৎ নানা ঘাতপ্রতিঘাতে বিক্ষুব্ধ। তাঁর কর্মনৈপুণ্য, ক্লান্তির নিশ্বাস ফেলতে চায়। সবাইকে তিনি শাসন করছেন। অথচ তাঁকে শাসন করার, করে বশে আনার কেউ নেই।
নিজের ওপর বিশ্বাসটাই কেমন শিথিল। ব্যক্তিত্বের দম্ভ পরাস্ত। কোথায় যেন একটা প্রতিশ্রুতি রক্ষার অপারগতা তাঁর মনের সবটুকু জোর কেড়ে নিয়েছে।
স্তূপাকার ফাইল পড়ে থাকে টেবিলে। ফ্লাস্ক থেকে অযথা পরপর দু’কাপ কফি ঢেলে খান। খোলা জানালা বরাবর তাকিয়ে থাকেন।
কৃষ্ণচূড়ার পালে ডালে আগুন লেগেছে, অনুভব করেন। অনুভব করেন, তাঁর এই জানালার বাইরেই ঋতু-বৈচিত্র্য। নিথর শীতের পর বুঝি বসন্ত এসেছিল। তারপর আজ এই নবপল্লবিত বৃক্ষ শাখা। নবপল্লবিত! কিন্তু যেমন করে সব ক্লেদ বিমর্ষ, অনুতাপের পর ফিরে আসে হর্ষ, আনন্দ আর উল্লাস তেমন কি মানুষের জীবনেও ঘটে। বোধহয় না। তাঁর নিজের জীবনে ঘটেনি।
অন্তত আরও একজনের কথা জানেন। তার জীবনেও না।
এবার একটা কাজেই ঢুকেছিল জাহেদী। কোনো ছুতো নিয়ে নয়। ইন্ডেন্টিং-এর কাগজটা সই করিয়ে আজকের ডাক ধরাবে।
সায়গল তাকিয়েও দেখেন না। প্রসারিত হাতে দূর থেকে ফাইলখানা সই করে তেমনি উদাস হয়ে বসে থাকেন কলম গুটিয়ে।
জাহেদী চলে যাচ্ছিল।
দরজা ঠেলে বেরুবার আগে একমুহূর্ত ফিরে দাঁড়ায়।
বলে, স্যার।
সম্বিৎ ফিরে আসে সায়গলের।
বলেন, ও তুমি। কিছু বলবে?
আপনার শরীর কি ভালো নেই।
কে বলল তোমাকে? গর্জে ওঠেন সায়গল।
কেউ বলেনি।
তবে?
অনুমান করছিলাম।
অনুমান করছিলাম, তার কথার পুনরাবৃত্তি করে বলেন, মানুষের মনের ভেতর সিঁধ কাটতে শিখলে কবে? যাও, এসব বাজে প্রশ্ন করো না।
বোধহয় তাঁর স্বভাবসুলভ আক্রোশেই আরেক কাপ কপি ঢালতে যাচ্ছিলেন। কাপটা তুলতেও পারেন না। ওটা পড়ে যায় হাত থেকে।
ছুটে যায় জাহেদী।
বলে, স্যার আপনার হাত কাঁপছে।
এবার যেন সায়গল অনেক স্তিমিত।
সন্ত্রস্ত হয়ে বলেন, হাত কাঁপছে, না? তা হবে। মাঝে মাঝে এরকম হয়।
সায়গলের অনুরোধের অপেক্ষা না করেই একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে জাহেদী।
সায়গল খানিকক্ষণ হেলান দিয়ে একপাশে কাত হয়ে থাকেন। যেন ক্লান্তির ঘুম তাঁর চোখ জুড়ে। প্রায় অস্ফুট মৃদু স্বরে বলেন, পাশের জানালাটা বন্ধ করে দাও।
একটু বাতাস হলে ভালো হতো না?
না। আর শোনো, বাড়েিত একটা টেলিফোন করে আমার পৌঁছুবার খবরটা জানিয়ে দাও।
আশ্চর্য তাহলে কি বাড়িতেও একবার খবর দেননি। কর্তব্যপরায়ণ সায়গলের পক্ষে অবশ্যি বিচিত্র নয়। মিছিমিছি অফিসের সময় নষ্ট হবে মনে করে হয়তো সোজা এয়ারপোর্ট থেকে ছুটে এসেছেন। সঙ্গের জিনিসপত্র হয়তো গাড়িতেই রাখা।
টেলিফোন তুলে নিয়ে জাহেদী বলে, মিসেস সায়গলকে আসতে বলব স্যার?
না। শুধু খবরটা দাও।
ইশরাত জাহানকে পাওয়া যায় না।
জাহেদী জানায়, মিসেস সায়গল বাসায় নেই স্যার।
এবার আর কোনো অজুহাত নেই বসে থাকার। মায়া-মমতার, মৌলিকতার ধার ধারেন না সায়গল। তবু তাঁকে একা ছেড়ে যেতে মন সরছিল না জাহেদীর। আবার সায়গলকে ভরসাও নেই। একটু সুস্থ হয়ে হয়ত বুলডগের মতো চেঁচিয়ে উঠবেন।
অগত্যা চেয়ার ছেড়ে মৃদুস্বরে বলে, এবার যাই স্যার।
যাও।
যাই যাই করেও যাওয়া হয় না।
সায়গল যেন মাথাটাও সোজা রাখতে পারেন না। টেবিলে ডান হাত পেতে নিয়ে তার ওপর মাথা গুঁজে পড়ে থাকেন।
জাহেদী বলে, সার আপনার বোধহয় বাসায় যাওয়া উচিৎ।
সে কথার কোনো জবাব নেই।
ঠিকই ধরেছে জাহেদী, সায়গল সায়গলই। অন্য সময় হলে বোধহয় হুঙ্কার করেই উঠতেন। এবার বুঝি সে শক্তিও অবশিষ্ট নেই।
তবু মৃদু অথচ দৃঢ়স্বরে তাঁকে বলতে শোনা যায়, নিজের কাজ করো। যাও। এসব মেয়েলি অভ্যেস আমার মোটেই পছন্দ নয়।
আসলে সায়গলের ভয়, দেহযন্ত্রণার নয়। তাঁর ব্যক্তিত্বহানির। তাঁর এই দুর্বল-চিত্ত, দুর্বল-দেহের অজুহাতে কেউ তাঁকে দুটো মন-গলানো কথা শুনিয়ে যাবে, সে ধাঁচেরই নন তিনি। তার চেয়ে ভালো ক্লান্তি নাবুক দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আর যখন কিছুই করবার থাকবে না, মহাকালের অতন্দ্র-প্রহরী তাঁকে নিয়ে যা খুশি করুন। পাঠিয়ে দিন কোনো সনাতন ক্লিনিকে কিম্বা তুলে দিন চিরবিশ্রামের কোলে।
একরকম অনিচ্ছা সত্ত্বেই বেরিয়ে আসতে হয় জাহেদীকে। সায়গলের সঙ্গে তর্ক করা বৃথা।
তবুও একটু স্বস্তি পেল না বেরিয়ে এসে।
কিছু যে একটা ঘটবে সেটা যেন বোঝা গিয়েছিল সায়গলের হাবভাব দেখেই। ঘণ্টা আধেক পর কাওয়াসজী ছুটে আসে। নাভিশ্বাসে বলতে থাকে, মি: সায়গল কলাপ্স করছেন। কলাপ্স করছেন।
জাহেদী দরজা খুলে ঢোকে।
টেবিলে মাথা এলিয়ে শুয়ে। কোনো সাড়াশব্দ নেই। দু’চারজন মাথায় ঠান্ডা বরফ দেবার চেষ্টা করছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তার এসে যায়। ম্যানেজিং ডাইরেক্টার মি: হফম্যান এসেছিলেন নিজে কোম্পানির ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে। ডাক্তার পরীক্ষা করে বলে, একিউট কেস অব একজস্শন। ভীষণ খাটুনির ফল। এখুনি হাসপাতালে পাঠাবার ব্যবস্থা করুন।
আত্মীয় নয়, ঠিক তার শুভাকাক্সক্ষীও ফাঁকে বলা যায় কিনা সন্দেহ, তাঁর সম্পর্কে আজ তার হঠাৎ এমন করে মন খারাপ করল কেন। কোনোমতেই কাজে মন বসল না।
হাসপাতালে গিয়েছিল সন্ধেয়। অফিসের আরও ক’জন ছিল।
কিন্তু কি আশ্চর্য, যাঁকে সবাই সেখানে দেখবে বলে আশা করেছিল তিনি এলেন না। এলেন না ইশরাত জাহান।
কাওয়াসজী নিজে গিয়েছিল ট্যাক্সি করে তাঁর বাড়ি।
ইশরাত জাহান সব শুনে বললেন, ডাক্তার কী বলল?
ডাক্তার বলল, ওর এখন পূর্ণ বিশ্রাম দরকার।
তাহলে তো ঠিকই করেছেন আপনারা হাসপাতালে ভর্তি করে।
কাওয়াসজী ট্যাক্সি ছাড়েনি। গাড়ির স্তিমিত স্টার্ট শোনা যায় তখনও।
ইশরাত জাহান বলেন, কার গাড়ি?
আমার ট্যাক্সি।
ছেড়ে দিন না।
না আপনি যদি হাসপাতালে যান, সে কথা মনে করে –
কাওয়াসজীর কথায় হো হো করে হেসে ওঠেন ইশরাত জাহান, আমি হাসপাতালে যাব। পাগল! আর গেলে তো নিজের গাড়িই রয়েছে।
কাওয়াসজী যেন তাঁর কথা বুঝে উঠতে পারে না।
ইশরাত জাহান আবার বলেন, এমনিতেই আমার রাতে ঘুম হয় না। কি যে বলেন আপনারা!
সবাই তাঁর কথা শুনে অবাক।
কাওয়াসজী সে কথাই এসে শোনায় : নিজের স্বামীর অসুখ। আর আমার মুখের ওপর বলে দিলেন, হাসপাতালে যাব – পাগল!
রিজভি অবাক হয়, আশ্চর্য! এমন কথা আমি শুনিনি কখনও।
শুধু তাই নয়। তার চেয়েও তাদের বিস্মিত করেছিল কাওয়াসজীর মুখে শোনা আরেকটি ঘটনা।
ইশরাত জাহান বলেছিলেন কাওয়াসজীকে, বসুন না একটু।
কাওয়াসজী বলে, না থাক। আমি বরং হাসপাতালে ফিরে যাই।
তা যাবেন। তার আগে একটা আইসক্রিম খেয়ে যান।
আইসক্রিম?
হ্যাঁ, অবাক হওয়ার কী আছে। বাজারের জিনিস নয়। আমি লেডিজ হোম জার্নাল থেকে টুকে রেখেছি ‘রেসিপি’।
কাওয়াসজীর মতো শান্ত সুবোধ লোকটির কণ্ঠ দিয়েও সেদিন এক প্রগাঢ় ঘৃণা ও ধিক্কার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
একটু বিরক্তির সুরেই বলে, মাপ করবেন। এটা আইসক্রিম খাওয়ার সময় নয়।
একটু নিরাশ হন ইশরাত জাহান।
বলেন, আপনি বুঝি এসব কথা আবার বানিয়ে বানিয়ে বলতে যাবেন সায়গলকে। তা বলুন আপত্তি নেই।
এক মুহূর্ত বিমূঢ়ের মতো কী ভাবতে থাকেন ইশরাত জাহান।
তারপর কাওয়াসজীকে যেতে দেখে তার পেছন পেছন ছুটে আসেন। বলেন, আপনার কথাই ঠিক। আমার এসব ভাবনা চিন্তা মনে ঠাঁই দেওয়া উচিৎ নয়। তাই না?
খানিকক্ষণ সম্মতির অপেক্ষায় থেকে আবার শুরু করেন, আসলে আমার কী হয়েছে জানেন। আমার ভীষণ ভয় করে। হাসপাতালের ধারে কাছে যাওয়ার নাম শুনলে থরথর করে কাঁপি।
কাওয়াসজীর ট্যাক্সি ছেড়ে দেয়।
বারান্দায় কিছুক্ষণ অর্থহীনভাবে পায়চারি করেন ইশরাত জাহান। তারপর ঘরে ঢোকেন।
অনুভব করেন কাওয়াসজী চলে যাওয়ার পর একটা নিদারুণ শূন্যতা। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত চিন্তা। হাসপাতালে রুগ্ণ স্বামী। নিথর রাত্রি। হঠাৎ এক পশলা বাতাসে হাস্নাহেনার তৃষিত সৌরভ। বারান্দায় নিজের ছায়া দেখেই কেমন আঁৎকে ওঠেন। ভীষণ নিঃসঙ্গ মনে হয়।
একবার সেতারখানা হাতে নেন। না না। ওটা আর এ বয়েসে মানায় না। পুরনো গদ্ দিয়ে মন ভোলানো যায় না। তাতে জ্বালাটাই আরও বাড়ে বরং। সারি সারি বই সাজানো তাকে। কিন্তু একটাও মনমতো নয়। সদর দরজার কাছে দারোয়ানটা ঢুকছে।
রাত বারোটা বাজতে চলে। সেও একসময় টুপ করে বারান্দার বাতি নিবিয়ে ঘুমিয়ে পড়বে।
ইশরাত জাহানের ভয় হয়। জীবনে অনেকদিন পর অনুভব করেন, বাঁচার জন্যে তাঁর একটা নোঙ্গর থাকা উচিৎ ছিল। আজ এই অশান্তির নিস্তব্ধতা ভঙ্গের জন্য তাঁর নিজের রক্তের একটি টুকটুকে আদরের কুঁড়ি থাকলে, সেই বাড়ি মাথায় করে তুলত। আর সেই মিষ্টি হৈ-হট্টগোলে সব, সব জ্বালা মিটে যেত মনের।
তারপর আর পারা যায় না।
একসময় ভীরু হাতে টেলিফোনখানা তুলে নিয়ে হাসপাতালের নম্বর ডায়াল করেন। তারপর বলেন, দিন তো নিউ কেবিন। হ্যালো, মি: সায়গল, মি: মাহমুদ আনওয়ার সায়গলকে চাই। কী বললেন, কথা হবে না। ডাক্তারের বারণ? আচ্ছা, আচ্ছা। বেশ। শুনুন – ও কি লাইন কেটে গেল নাকি।
হতভম্বের মতো টেলিফোনখানা ধরে বসে থাকেন ইশরাত জাহান।
আট
খবরটা বোধহয় কী করে পৌঁছেছিল কোহিনুর বেগমের কাছেও। তিনি নিজেই একদিন ডেকে পাঠান জাহেদীকে। শুধু তাকেই। এবার কোনো পার্টি বা নৈশভোজে আর দশজনের ভিড়ের একজন হিসেবে নয়। কোহিনুর বেগমের কাছ থেকে এ ধরনের আমন্ত্রণ অপ্রত্যাশিত।
আবার এও হতে পারে যে, এক একজন মানুষই বুঝি পৃথিবীতে এমনিতর। বাইরে দেখে তাদের ভেতরটা আঁচ করা যায় না কোনোমতেই। অন্তরে গভীর দুঃখ ও হতাশার গ্লানি নিয়েও তারা হাসির প্লাবন ছড়িয়ে দিতে পারে। তাদের অসহিষ্ণু হৃদয়ের স্পন্দন যদিও নীলিম বিস্তৃত, তাদের বাইরের মুখোশ তেমনি শান্ত, সমাহিত। একটি চোখের পলকে বা ভুুরুর কুঞ্চনেও ভুল করে অশান্ত হৃদয়ের হা-হুতাশ ধরা পড়ে না। বরং কেমন একটা নির্লিপ্ত উদাস দৃষ্টির ভাষাই শুধু তারা ব্যাপ্ত করে।
কিন্তু এত যে সদা শান্ত, সংযত কোহিনুর বেগম, তাঁর চোখটাও আজ নিবু নিবু মোমবাতির মতো জ্বলজ্বল করে ওঠে। উৎকণ্ঠার ঘন ছায়া নেবে আসে।
যথারীতি চা এসে গিয়েছিল।
সেই আগের মতো নিপুণ হাতে গরম কেটলিতে ন্যাপকিন জড়িয়ে আস্তে আস্তে চা ঢালতে থাকেন। পরিমিত দুধ আর চিনি মেশান। তারপর ওখানা বাড়িয়ে দেন জাহেদীর দিকে। বোঝা যায় কোহিনুর বেগমের মনটাই আজ বিপর্যস্ত। কেবল একটি অভ্যেসের তাড়নাই যেন তাঁকে দিয়ে এসব করিয়ে নিচ্ছে। নইলে নিজের দিক থেকে বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই।
সামনের এক সার সোফা ছেড়ে উঠে গিয়ে অতবড় হলঘরে অবজ্ঞার এক বিন্দু হয়ে বসেন দেয়াল ঘেঁষে। টেনে নেন মামুলি একখানা চেয়ার। ইচ্ছে করেই যেন জ্বালান না দুগ্ধ-ফেন-নিভ শেড্ দেওয়া বাতি।
তারপর মৃদুস্বরে বলেন, অফিসে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন কেন?
জাহেদীর মনে হয় যেন এতদিন পর সত্যি তার কাছে কেউ ভরসা ও বিশ্বাসের মর্যাদা চেয়েছে। বীমা কোম্পানির অবজ্ঞার কোনো কর্মচারী হিসেবে নয়। সায়গলের কাছের একজন হিসেবে।
পূর্বাপর ঘটনা বলে জাহেদী।
একটু বাড়াবাড়িই হয়ে গিয়েছিল বোধহয়। প্রশ্নটা করে নিজেই কেমন বিব্রত বোধ করে জাহেদী।
বলে, যাবেন হাসপাতালে একবার?
কেমন অবিশ্বাসের হাসি হাসেন কোহিনুর বেগম।
আমি। কেন? আমি যাব কেন?
যেন তার নির্বুদ্ধিতার আঘাতেই আহত হয়ে বলে জাহেদী, এমনি বলছিলাম।
এক মুহূর্ত কিছু বলেন না কোহিনুর বেগম।
জাহেদীরও কিছু বলার নেই। কেমন রাগই হয় যেন।
হঠাৎ মনে হয় সেও বুঝি কোহিনুর বেগমের নিছক শখ চরিতার্থের উপকরণ মাত্র। সেও আর দশজনের মতো কোহিনুর বেগম ডেকে ডেকে আলাপ করেন, তাদের কাছে বসিয়ে গপ্প করেন। মাপজোকের চা ঢেলে নিপুণ হাতে পরিবেশন করেন। এতে নতুনত্ব নেই। অভিনবত্ব নেই কিছু।
জাহেদীকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করে তাঁর উদ্বিগ্নতার কথা বলবেন, দুরাশা মাত্র।
বরং মনে হলো সেদিন কথা বলার একটি লোকের প্রয়োজন হয়েছিল তাঁর। আর সে প্রয়োজনে তৃষ্ণা মেটাতেই তাকে ডাকা। এ তৃষ্ণা সাময়িক। এ তৃষ্ণা তাঁর ভাবালু চিত্তের একটি অহেতুক কালক্ষেপণের তাড়না।
হঠাৎ একসময় উঠে দাঁড়ান কোহিনুর বেগম।
বলেন, বসুন। আসছি।
ঘড়ির দোলক দুলছে। দামী বুক-কেসের জ্ঞানগর্ভ বই পা-িত্যের অহঙ্কার দেখাচ্ছে। অথচ সামনে এক কাপ চা ছাড়া আর কিছুই নেই। অল্প অল্প করে চুমুক দিয়েও শেষ হয়ে যায়। ভুল হয়েছে জাহেদীরই।
কোহিনুর বেগমের উঠে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেও বলতে পারত, আমি বরং চলি। হয়তো এটাই আশা করেছিলেন, কোহিনুর বেগম। শুধু মুখ ফুটে বলেননি। এই যা। বুঝে নিতে হয়।
ছি ছি কাঁদে না।
কণ্ঠস্বর শুনে অবাক হয় জাহেদী। কণ্ঠস্বরের অধিকারী কাউকে লক্ষ করা গেল না।
ছি ছি কাঁদে না।
খাঁচায় একটা ময়না পাখি নখ দিয়ে কি খুঁটছে। কণ্ঠস্বর তারই। শেখানো কোনো বুলি। কিন্তু পৃথিবীতে শেখাবার আর কি কোনো বুলি ছিল না। আর কাঁদবার লোকই বা কে আছে এ বাড়িতে।
আলো ঝলমল, বন্ধুবান্ধব পরিবেষ্টিত মধুর পরিবেশ যেখানে শুধু একটি ইচ্ছের ইঙ্গিত, সেখানে কাঁদার লোক কই। কিন্তু সে প্রশ্ন মনে মনেই থেকে যায়। অন্ধকার হয়ে আসছে। কে যেন সাবধানে এগিয়ে আসে। চোখ তোলার আগেই তার ছায়াটা এসে পড়ে দরজায়।
না অন্য কেউ নয়। এ বাড়িরই কেউ। তার খালি চায়ের কাপটা তুলে নিতে এসেছে।
কোহিনুর বেগম ফের যখন নেবে এলেন, তখন সন্ধে উত্তীর্ণ। তৃতীয়ার চাঁদ আকাশে। মলিন, পা-ুর।
যেন ভুলেই গিয়েছিলেন এতক্ষণ তার অস্তিত্ব। তাঁর ম্লান হাসির খানিকটা আমেজ তুলে ধরে বলেন, ওমা বসিয়ে রেখেছি আপনাকে, সে কথা একদম মনে নেই।
পরের কৈফিয়ৎটা নিজেই দেন, আজকাল আমার এমনই হচ্ছে জানেন। বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, কি ভাবতে ভাবতে।
সঞ্চিত অভিমানের বাঁধ ভাঙ্গল না। বিদ্রোহ করল না। এমনকি একটা হিংস্র ভদ্রতাসূচক প্রতিবাদও বেরিয়ে এলো না জাহেদীর মুখ দিয়ে।
বরং উল্টো বলল, তাতে কী হয়েছে। আমি আপনার ময়না পাখি দেখছিলাম।
কি মনে করে খাঁচার দিকে এগিয়ে দরজাটা খুলে দেন। যে আঙ্গুলে তাঁর হীরে বসানো আংটি তারই ওপর এসে ঠাঁই নেয় ওটা।
মৃদু আদর বুলোতে বুলোতে বলেন কোহিনুর বেগম, সায়গল এনে দিয়েছিল। বলেছিল, ভালো জাতের।
তারপর একটু থেমে আবার বলেন, বেশ কথা বলতে শিখেছে দেখেছেন।
হ্যাঁ, শুনলাম!
যেন ব্যাপারটা ভারি বিস্ময়কর।
কোহিনুর বেগম বলেন, তা আজেবাজে কথাও বলে মেলা।
পাখিটা যেন স্বস্তি পায় না। খানিকক্ষণ পাখা ঝাপটে আবার আশ্রয় নেয় খাঁচায়।
পরের কথাটার জন্য প্রস্তুত ছিল না জাহেদী।
কোহিনুর বেগম হঠাৎ করেই বললেন, আমার কারণেই তাঁর এই দুর্দশা।
কার কথা বলছেন?
আর কার, সায়গলের।
কেন, কী হয়েছে।
বলুন তো কী দরকার ছিল, এই ধনুর্ভঙ্গপণের। কী দরকার ছিল ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর।
কই তেমন কিছু শুনিনি তো।
বাইরে গিয়েছিলেন সায়গল, জানেন না?
হ্যাঁ, জানি।
পরের কথাটা যেন দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বলতে চাইলেন। কিন্তু শত চেষ্টাতেও যেন ভরসার সুর ফুটে উঠে না।
বলেন, যে আসবে না, তাকে জোর করে ফিরিয়ে আনার কোনো মানে হয় না। চেষ্টা করার দোষের কিছু নেই। কিন্তু সায়গল আসলে ছেলে-মানুষ। সোজা কথাটা বোঝেন না, আমি যাকে ফেরাতে পারিনি, সায়গল তাকে কেমন করে ফেরাবেন।
ইশরাত জাহান কোহিনুর বেগমের প্রবাসী স্বামীর কথা বলেছিলেন। বোধহয় সে ঘটনাই। তবু ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করতে ভদ্রতায় বাধছিল।
কোহিনুর বেগম বলেই চলেন, তার জন্যে সায়গলের মন খারাপের কী আছে। কই আমাকে দেখে তা মনে হয়।
জাহেদী বলে, সে রকম কোনো কিছু তো বলেননি সায়গল।
এসব কি রাষ্ট্র করে বেড়াবার। আর বলেই কি লাভ? কিন্তু লোকটা, মানে আপনােেদর সায়গল বড় একগুঁয়ে। আমার শান্তি, আমার সুখ – এটাই নাকি তাঁর কাম্য। অথচ – অথচ?
থামতে থামতেই আবার বলেন, আমার সুখের অভাবটা কোথায় বলুন তো। স্বামী বিদেশে কারও থাকে না? তাতে কী হয়েছে।
যেন সাহস পেয়েই কৌতূহলী হয় জাহেদী, সায়গল কি তাঁকে ফেরাতে চেষ্টা করেছিলেন?
একবার? বহুবার।
যেন নিজের বিপর্যয়ের কাহিনী একটা প্রশান্তির ছাঁচে ঢেলে সহজ ও স্বাভাবিক করে এনেছেন। অন্তত আর দশজনকে সে কথাই বিশ্বাস করাতে চান।
কোহিনুর বেগমই আবার মুখ খোলেন, সায়গল বলেন আমার এ অবস্থা নাকি তাঁর ভালো লাগে না।
মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি থাকবেই, বলে জাহেদী।
মৃদু হেসে নিয়ে বলেন কোহিনুর বেগম, সহানুভূতি মহত্ত্বের লক্ষণ। কিন্তু সহানুভূতি দিয়ে তো মানুষ বাঁচতে পারে না। আর সায়গলকে আমি সে কথাই বোঝাতে চেয়েছি।
জাহেদী বলে, তবু তিনি আপনার একজন কল্যাণাকাক্সক্ষী, একথা মানতেই হবে।
সে কথা ঠিক, কিন্তু কী হলো। নিজেই তো দেখলেন। সম্বিৎ ফিরে আসে কোহিনুর বেগমের।
নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, যাকগে এসব কি বাজে বকছি। আপনার মেলা দেরি করিয়ে দিলাম। হঠাৎ কি মনে করে আবার বলেন, এক মিনিট বসবেন?
হ্যাঁ। কেন?
তখন রাগের মাথায় বলেছিলাম যাব না। আসলে হাসপাতালে যাব বলেই ডেকে পাঠিয়েছিলাম আপনােেক। যাবেন নিয়ে?
নিশ্চয়ই।
এবার আর দেরি করেন না কোহিনুর বেগম।
গাড়িতে চড়তে চড়তে বলেন, আপনাকে সঙ্গে নেওয়ার আরও একটা মতলব আছে।
সেটা কি?
কেবিনে গিয়ে দেখে আসতে হবে, আর কেউ আছে কিনা। তাহলে আমি যাব না।
আর কেউ মানে?
ধরুন, মিসেস সায়গল।
তিনি যাবেন না বলেছেন।
ওটা হয়তো আমাকে সেখানে টেনে আনার একটা টোপ। সায়গলকে নিয়ে কত কথাই বলে বেড়িয়েছেন আমার সম্বন্ধে।
তাহলে প্রতিবাদ করেন না কেন?
কেমন অবিশ্বাসের হাসি হেসে বলেন, প্রতিবাদ! কী করে জানেন সবটুকুই মিথ্যে। যা রটেছে তার কিছুটা সত্যিও তো হতে পারে।
কোহিনুর বেগম যেন আজ তার কাছে দুরতিক্রম্য কোনো নক্ষত্রের মতো দুর্বোধ্য। বসন্তের কিশলয়ের মতো অসহিষ্ণু। কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের মতো স্তিমিত।
গাড়িতে যেতে যেতে বলেন, ওই দিনের পর কিন্তু সায়গলের সঙ্গে আর আমার দেখা হয়নি।
নয়
তিনতলার ওপরের তেরো নম্বর কেবিনে ঠাঁই মিলেছিল সায়গলের। ডক্টর মোজাম্মেলের স্পেশ্যাল ওয়ার্ডে।
দরজার কাছে এসে এক মুহূর্ত দাঁড়ান কোহিনুর বেগম। উদ্বিগ্ন ডাক্তার ও তার পেছন পেছন ইঞ্জেকশনের সরঞ্জাম হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসে নার্স।
ডাক্তার দরজায় কোহিনুর বেগমকে লক্ষ করে। তারপর কাছে এসে বলে, এ কি আপনাদের পেসেন্ট?
কোহিনুর বেগম চোখ চাওয়া-চাওয়ি করেন।
তারপর বলেন, হ্যাঁ।
ডাক্তার উৎকণ্ঠাভরে তাকায়।
বলে, দেখুন ওঁর অবস্থা এখনও খুব নরম্যাল বলা চলে না। খুব শক্ড। বেশিক্ষণ থাকবেন না।
ভেতরে ঢুকে সায়গলকে দেখে কিন্তু সে কথা মনে হয়নি। মাথার দিকে দুটো বালিশ গুঁজে একটা খবরের কাগজ মেলে ধরেন।
ওদের দু’জনকে ঢুকতে দেখে কাগজখানা মুড়ে রেখে দেন। কোহিনুর বেগম গিয়ে বসেন পাশের একটি চেয়ার টেনে নিয়ে দেয়াল ঘেঁষে। তাঁর দৃষ্টি যেন সরাসরি সায়গলের দিকে নয়। খানিকটা তির্যক।
জাহেদী দাঁড়িয়ে থাকে পায়ের দিকে।
সায়গল সেদিকেই তাকিয়ে বলেন, গোটা অফিসটাই আজ হাসপাতালে বসেছে নাকি।
ঠিক সে কথার মর্মার্থ উদ্ধার করতে পারে না জাহেদী। সায়গল বলেন, তোমাকে নিয়ে সাতাশজন হলো।
জাহেদী মাথা নিচু করে থাকে। বলে, আমি ইচ্ছে করে আসিনি, স্যার। কোহিনুর বেগম নিয়ে এলেন।
ইচ্ছে করে যে কেউ আসেনি – আসে না, তা জানি। ইচ্ছে করে আমিও আসিনি।
কেমন একটা ক্ষোভের সুর সায়গলের।
এবার কথা বলেন কোহিনুর বেগম, ইচ্ছে করে কেউ আসে না এটা বলা ভুল। সবাই একরকম নয়।
কার কথা বলছ?
সবার কথাই। মানুষের সম্বন্ধে অমন ধারণা করার কোনো মানে হয় না।
সাগয়ল নিজের কথায় নিজেই বিব্রত।
তাই তার রেশ টেনে বলেন, তোমার কথা বলিনি।
জানি।
অফিসের লোকজন আমাকে দেখতে আসবে কেন। তাদের সঙ্গে আমার সম্পর্কটাই বা কি –
কোহিনুর বেগম ছাড়নে না।
বলেন, কেউ কেউ হয়তো সত্যিকার সহানুভূতি নিয়েই এসেছে।
কথাটা যেন বিশ্বাস হয় না সায়গলের।
কি জানি হতে পারে।
আবার বলেন কোহিনুর বেগম, অফিসের লোক থাক। নিজের লোকজনই বা কতটুকু খোঁজ রাখে।
সরাসরি জেরা করে বসেন সায়গল, আমার স্ত্রীর কথা বলছ?
জাহেদী রীতিমতো বিব্রত বোধ করে। এই অসহ্য পরিস্থিতির উত্তাপ যেন পীড়া দেয় তাকেই সবচেয়ে বেশি। না পারে ভক্তির অতিশয়োক্তি দেখাতে। না পারে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতে। না পারে চট্ করে কেটে পড়তে। এ উভয় সঙ্কট। আর কোহিনুর বেগম যেন জেনেশুনেই তাকে এ বিপদে ফেলছেন। এক এক ধরনের লোক এসব পারে। তারা হাসপাতালে রোগীর বালিশ উঁচু করে দেয়। পাখাটা মন্থর করে। অকারণেই কাগজ নেড়ে মাথায় হাওয়া দেয়। চাদরটা টেনে দিয়ে বলে, ঠান্ডা লাগাবেন না। অথবা মুরুব্বিয়ানা চালে বলে, চুপ করে শুয়ে থাকুন তো। কথা বলবেন না।
এসবের কোনো কিছুই সে পারে না।
আসলে আজকের এ নাটকে সে গৌণ চরিত্র। সে অর্থহীন একটা দৃশ্য সম্ভার। সে সহানুভূতির দর্শক, মর্মপীড়নের সাক্ষী, সূক্ষ্ম বেদনার লিপিকার। তার নিজের কোনো ভূমিকা নেই। সে নায়ক নয়, নায়িকা নয়। বড়জোর নায়ক-নায়িকার প্রয়োজনের একটি উপকরণ।
রাত বাড়ছে। হাসপাতালের বাতি জ্বলছে একটু টুকরো আক্ষেপের মতো। জীবনের সায়াহ্নের সঙ্গে যেন হাসপাতালের এই ক্ষণটি মেলে।
বড়ই মর্মান্তিক আর করুণ। নিষ্ঠুর ও হৃদয়হীন।
সায়গল বললেন, তুমি একটু বাইরে যাও।
কথাটা যদিও একটু রূঢ় মনে হয়, তবু জাহেদী কৃতজ্ঞ।
জাহেদীকে বেরিয়ে যেতে দেখে কোহিনুর বেগম বলেন, দেরি করবেন না। আমি একা একা ফিরব কেমন করে?
জাহেদী চলে গেলে আবার হেলান দিয়ে বসেন সায়গল। চাদরটা টেনে নিয়ে বলেন, জানতাম তুমি আসবে।
কোহিনুর বেগমের মুখে কথা নেই। হাসপাতালের সেই স্তিমিত আলোয় নিবদ্ধ তাঁর দৃষ্টি। যত উদাস, যত উদ্ভ্রান্ত, ততই যেন সৌন্দর্যের মায়াজাল তাঁকে ঘিরে।
সায়গলই আবার কথা বলেন, দেখা হয়েছিল তার সঙ্গে।
তারপর?
কেমন করে গুছিয়ে বলবেন তার ভাষা খুঁজে পান না। বড় বড় হিসেব মেলাতে যাঁর জুড়ি নেই, পাঁচশো লোকের শাসনের যিনি প্রায় দ-মু- কর্তা, তিনি জানেন না কোহিনুর বেগমের জন্যে তাঁর ব্যর্থ চেষ্টার কথাটা কেমন করে পাড়বেন।
নির্মম যন্ত্রণায় আহত তাঁর কণ্ঠস্বর।
বলেন, কোহিনুর আমি তোমাকে বড়াই করে বলে গিয়েছিলাম এবার তাকে ফেরাবই। এবার অন্যবারের মতো হবে না। মনে আছে?
হ্যাঁ। জাহেদীর কাছে পাঠানো আপনার চিঠিতে সে কথাই লেখা ছিল।
প্রশ্ন করেন সায়গল, বিশ্বাস করোনি সে কথা?
না। আপনার ওপর বিশ্বাস ঠিকই ছিল। কিন্তু –
এক মুহূর্ত চুপ করে থাকেন। তারপর একে একে গোটা কাহিনীটাই বলেন সায়গল :
লন্ডন থেকে ফিরে গিয়েছিলেন জেনেভায় দু’দিনে জন্যে। দেখাও হয়েছিল ইমতিয়াজের সঙ্গে। কোনো এক সুইস ইনজিনিয়ারিং ফার্মের বড় চাকুরে।
ইমতিয়াজ তাঁকে দেখে অবাক।
বলল, হঠাৎ?
তারপর বন্ধুত্বের আতিশয্যে সেদিনই নিমন্ত্রণ করে বসেছিল নিজের বাড়িতে।
বলেছিল, হোটেলে উঠলে কেন। চলো আমার এখানে।
সায়গল সে কথায় আমল দেননি। হেসে বলেছিলেন, ওসব ঝামেলা করে কাজ নেই।
তারপর ভূমিকা না করেই বলেন, আমি এসেছিলাম একটা কাজের কথা বলতে। অনেক দিন তো হলো, এবার ফিরে এসো। আর কোনো দায় না থাক সামাজিক দায় তো একটা আছে।
ইমতিয়াজ যেন বুঝতে পারে না। অথবা হয়তো বুঝেও না বোঝার ভান করে।
বলে, কিসের কথা বলছ।
যে সায়গল কোনো মানুষের কাছে বিনয়াবনত হবার নন, হঠাৎ উচ্ছ্বাসের বন্যার উথলে পড়ার নন, সেই সায়গলই তার দুটো হাত জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, আমি কারও হয়ে দুতিয়ালি করতে আসিনি। তবু –
ইমতিয়াজ টেলিভিশনে কোনো উত্তেজনাময় রোমাঞ্চকর সিরিজ দেখছিল।
বলল, ওসবের মধ্যে আমি আর নেই।
উঠে গিয়ে চট করে টেলিভিশনটা বন্ধ করে দেন সায়গল। তারপর তার চোখে চোখ রেখে বলেন, তার ভালোমন্দ কোনো খবরই কি জানতে চাও না।
না।
শাসিয়ে উঠেছিলেন সায়গল, তবে বিয়ে করেছিলে কেন?
ইমতিয়াজ হেসে বলেছিল, যখন করেছিলাম, তখন করেছিলাম। একদিন যা সত্যি ছিল অনাদিকাল তা সত্যি হতে যাবে কেন?
যেন কথাবলার ক্লান্তিতেই থামতে হয় এবার সায়গলকে।
কোহিনুর বেগম যেন জ্বলে ওঠেন, আমাকে নিয়ে এভাবে অপদস্থ করার কি দরকার ছিল। এ চূড়ান্ত অপমানের কথা বলার জন্যেই কি –
কথাটা শেষ কতে পারেন না। যেন জড়িয়ে যায় কোথায়।
সায়গলের চোখেও কেমন শূন্যতা।
বলেন, না না। অপমান করিনি। তোমাকে জিতিয়ে দিতে পারব না, সে কথা ভাবতেই কেমন লেগেছে। তাই অমন অলক্ষুণে মিথ্যে কথাটা বলতে বাধল না আমার একবারও।
কী বলেছিলেন? প্রশ্ন করেন কোহিনুর বেগম।
সত্যিই তো কেমন করে বলতে পারলেন সায়গল, এতবড় একটা মিথ্যে – একবারও কি তাঁর অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠেনি।
মনে আছে, ইমতিয়াজ বিয়ারের দুটো বোতল এনে রেখেছিল। একটা ঢেলে নিয়ে অন্যটা বাড়িয়ে দিয়েছিল সায়গলের দিকে।
সায়গল প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, না অভ্যেস নেই।
তারপর ওঠার উপক্রম করে বলেছিলেন, তার ভালোমন্দ কোনো খবরেই তোমার উৎসাহ নেই জানি। তবু শুনলে অবাক হবে, বছর বছর তোমাদের বিয়ে-বার্ষিকীর পার্টি হতো।
উত্তম।
আবার সায়গলই প্রশ্ন করেন, শেষ কতদিন আগে চিঠি পেয়েছিলে?
ইমতিয়াজ নিস্পৃহ হয়ে বলে, জেরা করছ নাকি?
না, এমনি জিজ্ঞেস করছি।
এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে বলে, কি জানি বোধহয় বছর দু’ হবে।
এখন কোহিনুর বেগম কোথায় তা জানো?
না। বরং কোনো আগ্রহও নেই।
আর কোনো কথা বলেননি সায়গল। শুধু দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলেছিলেন, হয়তো এটা শুনলেও তোমার কিছু এসে যায় না যে কোহিনুর বেগম বেঁচে নেই।
এক মুহূর্ত নিশ্চল মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে ইমতিয়াজ। যেন এতটা সেও আশা করেনি।
খানিকক্ষণ আগের দেমাকের মানুষটা যেন মোমের মতো ঝরতে শুরু করেছে। সায়গলের হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলে, এমন মর্মান্তিক ঘটনা শুনব আশা করিনি। কিন্তু কি আশ্চর্য। ও মারা গেল কেন?
মিথ্যে ভাষণের গ্লানি তাঁকে দগ্ধ করে পলে পলে। র্দু র্দু করে ওঠে বুক। তবু নিজেকে সামলে নেন সায়গল।
বলেন, কি জানি। শুনেছি হার্ট এ্যাটাক হয়েছিল।
দু’হাতে মাথাটা চেপে ধরে ইমতিয়াজ। তার অন্তরের অন্তস্তলে কোথাও একটু বেদনার আমেজ উদ্বেলিত হয়েছিল কিনা জানেন না সায়গল।
ইমতিয়াজই কথা বলল, ভালোই হলো জেনে গেলাম। দু’দিন পরে এলে আর দেখা পেতে না।
কেন?
আপাতত মেক্সিকোতে একটা চাকরি পেয়েছি। এখানকার পাট তুলে চললাম।
তারপর আবার একটু থেমে আবার বলে, থেকে যাওনা আর রাতটা এখানে।
সজোরে পোর্টফোলিও ব্যাগখানা তুলে নিয়ে বলেন সায়গল, না। তার আর দরকার নেই।
সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছিলেন।
আর কিছু মনে নেই। শুধু মনে আছে সেদিন ভীষণ শীত পড়েছিল জেনেভায়। বাইরে তুষার-বৃষ্টি। সায়গলের মনে হয়েছে বাইরের এই দুর্যোগের সঙ্গে নিশ্চয়ই তাঁর মনের কোথাও একটা সুনিবিড় আত্মীয়তা। একটা নির্মম মৃত্যুর হিমশীতল ছোঁয়া যদি আজ তাকে নিথর করে দিতে পারত! দরদ আর সহানুভূতির সবটুকু যদি আজ টুকরো টুকরো বরফের মতো অসাড় হয়ে পড়ে থাকত, কি ক্ষতি ছিল। কারও জন্যে প্রয়োজন হতো না তার মিথ্যে-ভাষণের। কারও মন রাখার গরজে বিদগ্ধ হতে হতো না অনুশোচনায়।
কোহিনুর বেগমের চোখজোড়া সাহসের মিথ্যে একটা বড়াই দেখিয়েই মুহূর্তে নিবু নিবু হয়ে ওঠে। কেমন নির্জীব হয়ে পড়েন। তাঁর দৃষ্টিতে কেমন একটা শূন্যতার হাহাকার। নিজের বিশ্বাসের শেষ সম্বল হারিয়ে আজ নিজেই যেন নিজের কাছে অপরাধী। ক্ষীণ বিশ্বাস ছিল একদিন ইমতিয়াজ ফিরবে। সেই বিশ্বাসই তাঁকে দিয়েছিল ক্ষোভ। আজ সে ক্ষোভটুকুও নেই।
যেন সায়গলের কথার পুনরাবৃত্তি করেই বলেন কোহিনুর বেগম, মরে গেছি বলেছেন। ভালোই করেছেন।
সায়গল নিজেও বোঝেন, নিজের আত্মম্ভরিতা আর মুঢ়তার এই উপাখ্যান না শোনালেও পারতেন। কোহিনুর বেগমের জন্যে তাঁর অন্তর্জ্বালার এটা কোনো অগ্নিপরীক্ষা ছিল না। সারা জীবন যার শুভাকাক্সক্ষী বলে বড়াই করেছেন, কী করে তার সম্পর্কে একটা জঘন্য মিথ্যে বলতে বাধল না। বুক র্দু র্দু করল না। আর এ মিথ্যে এমনই, যা লুকিয়ে রাখার নয়। একদিন তো জানাজানি হবেই। সেদিন কত বড় প্রবঞ্চক আর ভ- মনে হবে তাঁকে। পরম তিক্ততা ও জ্বালার বেদনাই বোধহয় তাঁকে অসহিষ্ণু করে তুলেছিল। কিন্তু ভুলে গিয়েছিলেন এ দিয়ে কোহিনুর বেগমের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা প্রতিপন্ন হবে না। তাঁর নীরব ঈর্ষার মূঢ়তাই ধরা পড়বে।
আজ দেহ ও মন দুইই অবসন্ন। নইলে, আজ এ মুহূর্তে তিনি চিৎকার করে বলতে পারতেন, তাঁর হৃদয়ের গভীরে কোহিনুর বেগমের জন্যে চাঁপা কলির মতো একগুচ্ছ সুরভিত বাসনা, যা কোনোদিনই পুষ্পিত হতে পারেনি, এ উক্তি সে তাড়না থেকেই। কোহিনুর বেগম কি এ সামান্য কথাটাও বোঝেন না।
কোহিনুর বেগমের পলকহীন দৃষ্টির দিকে তাকাতে তাঁর ভয়। তাই মাথাটা নাবিয়ে নেন।
খানিকক্ষণ থেমে উদাসকণ্ঠে আবার প্রশ্ন করেন কোহিনুর বেগম, সে কথাই যদি বললেন, তাহলে তাকে ফিরে আসতে সাধাসাধি করলেন কেন।
আশ্চর্য ইমতিয়াজও তার এ্যাপার্টমেন্টে বসে ঠিক এ কথাই জিজ্ঞেস করছিল।
জবাবে বলেছিলেন সায়গল, বাজিয়ে দেখলাম। কোহিনুর বেগম বেঁচে থাকলে কি করতে সেটাই জানতে বাসনা হয়েছিল।
কোহিনুর বেগম আগের প্রশ্নেরই রেশ টেনে বলেন, কী বলল সে কথা শুনে?
ইমতিয়াজ আমার হাত দুটো ধরে বারবার ওই এক কথাই বলল, আপনি এমন একটা মর্মান্তিক খবর শোনালেন।
কোহিনুর বেগম ওঠার উপক্রম করেন। বলেন, ভালো। তাহলে আমাকে এই জেতানোর খবরটাই দিতে চেয়েছিলেন।
সায়গল কথা বলতে পারেন না। আমতা আমতা করেন, জানি না। কিসে কি হয়ে গেল। সারা জীবন তোমাকে অপমানের নাগপাশে বেঁধে রাখবে কেউ – এ আমার সহ্য হলো না।
তাহলে সত্যি সত্যি আমাকে মেরে ফেলেন না কেন?
কোহিনুর তুমি এ কথা বলতে পারলে।
বাঃ, এতে অন্যায়ের কী হলো, কাল্পনিক পরিণতিটা বাস্তবে সত্যি হলে নাটকটা কি আরো ভালো জমে না?
মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলেন সায়গল, যদি এ কথা বলে আমাকে শাস্তি দিতে চাও, দাও। অস্বীকার করব না, আমারও স্বার্থ ছিল।
সেটা কি রকম?
সায়গলের ক্লান্ত চোখ দুটো যেন এক অপূর্ব জ্যোতিতে দীপ্ত হয়ে ওঠে। ধরা গলায় বলেন, এ ঘটনার পর আমার কাছে, তুমি কারও প্রতীক্ষার কণ্ঠলগ্ন মণিহার হয়ে রইলে না। তোমাকে আমি নতুন করে আরেক নারী হিসেবে কল্পনা করতে পাারি।
রোষান্বিত দৃষ্টি হেনে বলেন কোহিনুর বেগম, তাতে আপনার লাভ? ভুলে যাবেন না, ব্যক্তিগত জীবনে আপনি দায়মুক্ত নন। আপনি বিবাহিত।
মাথা নিচু করে নেন সায়গল। যেন সে দৃষ্টির জ্বালা সইতে পারেন না। মৃদুস্বরে বলেন, জানি। কিন্তু আকাক্সক্ষা, আমার আকাক্সক্ষার কী হবে?
কিছুই হবে না। কিছুই হয় না।
কোহিনুর বেগম দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে বলেন, চলি। আপনার সত্যি মাথা খারাপ হয়েছে।
সায়গল যেন নিজের মনেই বিড় বিড় করতে থাকেন, আমি একে ভালোবাসা বলব না কোহিনুর। ওটার এ সংসারে কোনো উত্তাপ নেই। ওটা ভস্মীভূত অঙ্গার। তবু কি জানো, মানুষের মনটাই তার এক নম্বর শত্রু। রীতিনীতি, সমাজের নিয়ম কানুনের দেয়াল সবকিছুই টপকে যেতে চায় –
তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলেন কোহিনুর বেগম, টপকে গেলে হোঁচট খাবার ভয় থাকবেই। সেটা জানা কথা।
তা জানি। তবু ইমতিয়াজের কাছে বানানো আমার এ মিথ্যেটা যদি ছেলেমানুষি উচ্ছ্বাসও হয় তার কি কোনো দাম নেই?
না। এ ধরনের মিথ্যে বলার কোনো অধিকার আপনার ছিল না। আর আপনার সন্তুষ্টির জন্যে আমি উদ্বন্ধনে আত্মহত্যাও করব না, এটাও জেনে রাখুন।
যেন নিজের ওপরই নিজে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন সায়গল। বলেন, জানি তা জানি। তুমি ওকেই ভালোবাসো।
সেটাই তো স্বাভাবিক।
সে কথার কোনো জবাব দেন না সায়গল।
কোহিনুর বেগম বলে, আপনার কাপুরুষতার জন্যে আমার মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে। ছি, ছি।
জাহেদী এসে পড়ায় তাঁর কথা শেষ হয় না।
সায়গল হতাশার সুরে বলেন, না হয়, না হয় আমি ইমতিয়াজকে আবার লিখব।
মুখের ওপর জবাব দেন কোহিনুর বেগম, সে আমিও লিখতে পারি। সেজন্যে আপনার দুর্ভাবনার দরকার নেই।
কোহিনুর বেগমকে দরজা ঠেলে যেতে দেখে সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন সায়গল। আকুলভাবে জিজ্ঞেস করেন, আবার কবে দেখা হবে।
তার কি খুব একটা প্রয়োজন?
তারপর শানিত দৃষ্টি ছুড়ে বলেন কোহিনুর বেগম, না, আর কোনোদিন দেখা হবে না।
অবচেতনের মতো বালিশ গুঁজে পড়ে থাকেন সায়গল।
কোহিনুর বেগমের সেদিকে দৃষ্টি নেই। জাহেদীর দিকে তাকিয়ে বলেন, চলুন এবার যাওয়া যাক।
আবার তাঁর সেই মিষ্টি মিষ্টি হাসি।
জাহেদী বলে, খুব দেরি করিনি তো।
না না। কিছুই দেরি হয়নি।
যেতে যেতে জিজ্ঞেস করে জাহেদী, কাল আবার আসব?
কেন?
হাসপাতালে যাবেন না?
না। তার আর দরকার নেই। আপনাদের সায়গলকে আপনারাই দেখাশোনা করুন এবার থেকে।
দশ
সায়গল যেদিন হাসপাতাল থেকে ফিরে এলেন, যেন অন্য মানুষ। আগের চেয়ে শীর্ণকায়। অনেক বেশি পরিশ্রান্ত। যে চোখের শাসনের সবাইকে পর্যুদস্ত রাখতেন, সে চোখের দৃষ্টিও কেমন ঘোলাটে। কেমন ভাবলেশহীন।
যেন শুধু দেহের নয়, জীবনের কোনো একটা ভীষণ বিশ্বাসের জায়গায় চরম আঘাতের অসুখটাই তাঁকে কাতর করেছে বেশি।
কিন্তু চিরাচরিত অভ্যেসের তাগিদেই হোক, আর যে কারণেই হোক, অফিস তখনও চলছে পুরনো নিয়ম-কানুন আর রেওয়াজের আইন মেনে।
এখনও সায়গলকে করিডরে দেখলে সবাই দু’পাশে সরে দাঁড়ায়। ফিস্ফিসে গলায় কথা বলে।
ব্যাপারটা বোধহয় প্রথম লক্ষ করেছিল ক্যাশিয়ার কাওয়াসজী।
এক গাদা কাগজ হাতে নিয়ে বেরিয়ে এসে বলে ক্যাশিয়ারকে, এমন অদ্ভুত ব্যাপার দেখিনি।
নিছকই মামুলি প্রসঙ্গ মনে করে ফাইল থেকে মাথা তোলারও প্রয়োজন মনে করে না এ্যাকাউন্ট্যান্ট। নিষ্পৃহ হয়ে বলে, কী ব্যাপার?
সায়গল চোখ বুজেই কাগজপত্র সই করে দিলেন। একবার টুঁ জিজ্ঞেসটি পর্যন্ত করলেন না।
এবার এ্যাকাউন্ট্যান্ট কলম নাবিয়ে রেখে বলে, বলেন কি। আগের স্টেটমেন্টও দেখতে চাননি?
না। একটি কথাও বলেনি।
ব্যাপারটা বলবে কিনা ভাবছিল কাওয়াসজী।
নিজের কাছেই বিশ্বাস হয়নি। সায়গল ওরকম কোনোদিন করেননি। ওরকম কেউ তাঁকে কোনোদিন করতে দেখেনি।
কাওয়াসজী বলেন, না, আপনি বললে বিশ্বাস করবেন না।
মানে?
মানে আমি কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে বেরুতে যাচ্ছি। আমাকে কাছে ডেকে বললেন, তোমাকে কোথায় দেখেছি যেন!
দু’লাখ টাকার গরমিলেও বোধহয় এতটা আতঙ্কিত হতো না এ্যাকাউন্ট্যান্ট।
তাহলে আপনি যা বলছেন তাতে তো –
কথা শেষ না করে শুধু গভীর শঙ্কার ভাব বিনিময় করে তারা দু’জন।
কাওয়াসজীর মুখের জ্বলন্ত সিগারেট ফুরিয়ে এসেছিল। মুখে ওটার জ্বালা অনুভব করে দাঁড়িয়ে ওঠে।
বলে, যাকগে ওসব নিয়ে আমাদের ভেবে কী লাভ।
ব্যাপারটা হয়ত গড়াতো এভাবেই।
কিন্তু ওই জাহাজের ব্যাপার নিয়ে ‘ইনকোয়ারি’ শেষ হয়নি তখনও। লন্ডন থেকে মি: লেসলি আর্থারটন এলেন প্লেনে করে।
খবরটা আগেই পৌঁছে দিয়েছিল সায়গলের কাছে ডলি ক্রুজ, সার হেড কোয়ার্টার থেকে লোক আসছে। কালকে বিকেলের ফ্লাইটে।
সায়গল কোনো কথা বলেন না। ডলি ক্রুজের হাত থেকে টেলিগ্রামখানা নিয়ে রেখে দেন টেবিলে। তারপর তাকে চলে যেতে ইঙ্গিত করেন।
এমন একটি খবরের যে উত্তেজনা তার কিছুই প্রকাশ পেল না তাঁর ব্যবহারে। এতটুকু চাঞ্চল্যের জোয়ারেও হলেন না উদ্বেলিত।
কাওয়াসজী আর রিজভি দু’জনেই এসেছিল।
বলল, স্যার কাল হেড কোয়ার্টার থেকে লোক আসছে। কোনো রিপোর্ট তৈরি করতে হবে নাতো। বলেন তো আমরা বাড়তি সময় বসে খেটেখুটে শেষ করে দি।
সায়গল প্রথমে মাথা নেড়ে জানান, না।
যেন আত্মবিস্মৃতির অন্ধকার থেকে মুক্তি পাননি তখনও। যখন পেলেন ব্যস্ত হয়ে বলেন, কিসের রিপোর্ট আবার। না না। তোমরা বাড়ি যাও।
অন্তত সেদিনের তাঁর এই ঔদার্য তাদের দু’জনের কারও কাছেই ভালো লাগেনি।
খোদ সদর দপ্তর থেকে লোক আসবে, তার জন্যে সায়গলের এতটুকু ভাবনাচিন্তা হলো না। আশ্চর্য। তার চেয়েও আশ্চর্য, এমনকি এয়ারপোর্টেও গেলেন না নিজে।
ট্যাক্সি নিয়ে গিয়েছিল এ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার জাভেদ। সেই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে।
হাঁপাতে হাঁপাতে সায়গলের কামরায় ঢুকে এসে জানায়, স্যার আর্থারটন এসে গেছেন।
সায়গল বলেন, তিনি আবার কে?
এ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার, এহেন প্রশ্নে রাগ না করে পারে না।
বলে, স্যার হেড কোয়ার্টারের লোক, এটাই কি যথেষ্ট নয়?
না।
ওঁকে কী করতে বলব?
বসতে বলো।
আমতা আমতা করে জাভেদ বলে, স্যার সোজাসুজি আপনার রুমে নিয়ে এলে ভালো হতো না।
সায়গল জবাব দেন না। বলেন, আমি কেস্টা ভালো করে দেখিনি এখনো।
মি: আর্থারটানের বোধহয় তর সইছিল না। নিজেই এসে ঢোকেন তাঁর কামরায় অনুরোধের অপেক্ষা না করেই। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসেন।
বসার আগে যেন নিছক ভদ্রতার খাতিরেই দায়সারা গোছের হাত-মেলানো পর্ব শেষ হয়।
বাইরে থেকে অনেকেই শুনতে পায়, আর্থারটনের বাঁজখাই গলা : আমি আধঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি, তুমি আমাকে রিসিভ পর্যন্ত করলে না।
সায়গল নির্বিকার। কোনো জবাব দেন না।
আর্থারটন মোটা একখানা ফাইল বার করে বলেন, সে যাকগে। লেট আস টক বিজনেস। ওই জাহাজের ক্লেমের কেস সেট্ল হয়েছে?
সায়গল নিরুত্তর।
আর্থারটন ব্যাপারটার গুরুত্ব দেখিয়ে বলেন, বোধহয় তুমি কেসটা ভালো করে তলিয়ে দেখোনি। কোম্পানির পয়সায় তোমাকে লন্ডনে পাঠানো হলো, অথচ কিছু করলে না। উল্টো ইউরোপ ঘুরে এলে। এতদিনে ব্যাপারটা সুরাহা হয়ে যাওয়া উচিত ছিল।
তারপর খানিকক্ষণ থেমে নিয়ে আবার বলেন আর্থারটন, অন্তত তোমার মতো সিনিয়ার অফিসারের কাছ থেকে আমি আরো তৎপরতা আশা করেছিলাম।
সায়গল জানালার দিকে মুখ বাড়িয়ে।
কী মনে করে আর্থারটন হাতের কাগজপত্র গুটিয়ে পোর্টফোলিও ব্যাগে রাখেন। তারপর বলেন, আই অ্যাম সরি। তুমি কি আপসেট। তোমার কি এ মাইনেতে পোষাচ্ছে না? কিছু করতে পারি আমি?
সায়গল আর্থারটনের হাতখানা চেপে ধরেন। ওটা র্থ র্থ করে কাঁপতে থাকে। না না, সারা দেহটাই যেন এক অপারগতা ও লজ্জার বিদ্রƒপে শিহরিত। ছল ছল করে ওঠে সায়গলের চোখ।
বলেন, আমি রিজাইন করব।
আর্থারটন অবাক হন, রিজাইন করবে! কিন্তু কেন?
সায়গল বলেন, আমি রিজাইন করব আর্থারটন। আমাকে দিয়ে আর কোনো কাজ হবে না। ক্লেম শোধ করলেও যেমন প্যাসিফিকের জাহাজ পুনরুদ্ধার করা যাবে না, তেমনি মাইনে বাড়ালেও আমাকে দিয়ে আর কিছু হবে না। ওই জাহাজের যেমন সময় এসেছিল, আমারও এসেছে। জাহাজটাকেও তুলতে পারবে না। পারবে না আমাকেও। আমরা দু’জনই আবর্জনা।
আর্থারটন শক্ত করে ধরেন তাঁর পোর্টফোলিও ব্যাগ। তারপর উঠে দাঁড়ান। বলেন, খুবই দুঃখিত। মনে হচ্ছে ভীষণ আঘাত পেয়েছ। অলরাইট তোমাকে জোরাজুরি করব না। বেস্ট অব লাক।
তারপর ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে যান।
পরদিন অফিসের নোটিশ বোর্ড আর গুটিকয় কাগজে বড় বড় করে ছাপা হয়েছিল :
ম্যাকব্রাইড বীমা কোম্পানির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মাহমুদ আনওয়ার সায়গল আমাদের চাকরিতে বহাল নেই। কোনো প্রতিষ্ঠান তাঁর সঙ্গে ব্যবসায়িক আলোচনা বা চুক্তি করলে তা তাঁরা নিজের দায়িত্বেই করবেন। কোম্পানি তার জন্য দায়ী থাকবে না।
তলায় বীমা কোম্পানির এটর্নির স্বাক্ষর।
এগারো
যে সায়গল ষোলো বছর বয়সে এ্যাকাউন্টেন্সির কাজ শিখে নিছক অধ্যবসায়ের জোরেই উঠেছিলেন আজ, এক কলমের খোঁচায় তাঁর চাকরি নেই। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে তাঁর পদচ্যুতি নয়, যেন মৃত্যুর খবরটাই জানিয়ে দেওয়া হলো।
হঠাৎ দুর্জ্ঞেয় ভাগ্যের রূঢ় হাত ছিনিয়ে নিয়ে গেল সায়গলকে। শুধু সায়গলকে নয়। তাঁর সারা জগৎটাকে। সেই আদিগন্ত সবুজ ঘাসের লনে বসে আইসক্রিম খাওয়াতেন যে ইশরাত জাহান, তাঁর মুখের দিকে তাকাতেও কেমন মায়া হয়। আজ এতদিন পর সায়গলকে একান্তভাবে ঘরের চার দেয়ালের মাঝখানে পেয়ে বুঝতে পেরেছেন ইশরাত জাহান, বীমা কোম্পানির একদা প্রভাবশালী লোকটি আজ একেবারেই নিঃস্ব। রিক্ত।
ইশরাত জাহান কোথাও যান না। ঘরেই থাকেন। সায়গল বিকেলে বসেন বারান্দায়। হাতে এখনও একটা খবরের কাগজ, এখনও একটা পত্রিকা। যেন বেদনা, অবমাননা আর হতাশার এক ধূম্রজাল তাঁকে ঘিরে। অবশ্যি সে ঘোরও কাটত মাঝে মাঝে। যেন স্বপ্নরাজ্য থেকে হঠাৎ জেগে উঠতেন। বলতেন, ক’টা বাজে?
ঘড়ি এনে দেখান ইশরাত জাহান, এগারোটা।
তাহলে আমি এখানে বসে কেন। খুব বেশি ঘুমিয়েছি নাকি?
না তো।
তবে অফিসে যেতে বলোনি কেন?
ইশরাত জাহান অবাক হন। বলেন, অফিস মানে। তুমি তো অফিস করছ না।
তারপর যে কাগজটা এতক্ষণ মেলে ধরেছিলেন, তারই একটি খবরের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষিত হয় তাঁর।
উত্তেজিত হয়ে ইশরাত জাহানকে ডেকে বলেন, চাকরিটা গেল তাহলে শেষ পর্যন্ত। কিন্তু আমি কি ওদের ঠকিয়েছি। এক কানা কড়ি পাই-এর হিসেব ভুল হয়েছে কখনও। বললাম, আর অমনি ছাড়িয়ে দিলো। এ কেমন বিচার।
তার জবাব ইশরাত জাহান কি জানেন। অথবা মনে মনে তাঁর ঘনীভূত সন্দেহের জবাবটা ঠিকই জানা আছে। বলেন, আমি কি জানি। চাকরি তো তুমিই ছেড়েছ।
এরই মধ্যে দেখা করতে আসে কাওয়াসজী আর রিজভি। সঙ্গে আরো দু’চারজন। কেউ কেউ তার অনুপস্থিতিতে আক্ষেপের সুর তোলে।
সায়গল যেন শুনেও শোনেন না।
বারান্দায় বসে থাকেন হাত-পা ছড়িয়ে।
ইশরাত জাহানই কথা বলেন।
কাওয়াসজী বলে, ওরকম মুনিব আর আমরা পাব না।
রিজভি বলে, হয়তো বললে বিশ্বাস করবেন না। এতদিন ধরে তো দেখছি। হিসেবে তাঁর কোনোদিন এক চুল এদিক সেদিক হতে দেখিনি।
তারপর দূর থেকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থেকে তারা চলে যায়।
সায়গলের মুখে টুঁ শব্দটি নেই।
জাহেদীও গিয়েছিল একদিন।
সায়গল কিন্তু তাকে দেখে চিনলেন।
বললেন, কখন এলে?
এই তো স্যার।
ভ্রƒ কুঁচকে জিজ্ঞেস করেন সায়গল, অফিস কামাই করে?
আমতা আমতা করে জাহেদী, ঠিক তা নয়। অফিসের কাজেই যাচ্ছিলাম এদিক দিয়ে। ভাবলাম –
মুখ ফিরিয়ে নেন সায়গল, তাহলে কথা বলব না। অফিস ফাঁকি দেওয়া আমি দু’চোখে দেখতে পারি না। নিজে কোনোদিন ফাঁকি দিইনি। কাউকে দিতে দেখলেও সহ্য হয় না।
তবু আরো কিছুক্ষণ বসে জাহেদী। মিসেস সায়গল যেন আজকাল আগের মতো আর কথা বলেন না।
জাহেদী জিজ্ঞেস করে, কি আপনিও যে চুপ করে।
ইশরাত জাহান বলেন, না না। এই ভালো। বেশি কথা বলতাম, তারই শাস্তি আজ হাতে-নাতে।
সায়গল একটু নড়ে বসেন। কী যেন বলতে চেয়েও বলেন না। তাঁর কণ্ঠস্বর আড়ষ্ট।
জাহেদী উঠতে যাচ্ছিল।
ইশরাত জাহান তাকে একপাশে ডেকে নিয়ে বলেন, কাল আমরা চলে যাচ্ছি।
কোথায়?
আপাতত দেশের বাড়িতে। আর তাছাড়া –
বাড়ির দিকে কেমন মোহাবিষ্ট দৃষ্টি মেলে বলেন, নিজের বাড়ি তো নয়। কতদিন থাকব বলো। অফিসের কোয়ার্টার। নতুন ম্যানেজার সেই কবে থেকে পীড়াপীড়ি করছে।
সায়গলদের যাবার খবর শুনে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে জাহেদী। বলে, তাহলে আর দেখা হবে না?
কি জানি।
কি মনে করে ইশরাত জাহান তাকে বসতে বলেন আবার।
এক গ্লাস শরবত হাতে ফিরে আসেন। বলেন, আর কিছু দিতে পারছি না ভাই।
হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা নিতে নিতে বলে জাহেদী, এসবের কোনো দরকার ছিল না।
আহত অভিমান কোথায় যেন বুকের গভীর নিষ্ফল কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। মনে পড়ে কতদিন অফিসের কাজের ফাঁকে এ বাড়িতে বসে কোনো এক বাচাল ভদ্রমহিলার সুখ-দুঃখের গপ্প শুনেছে।
অফিস থেকে ফিরে এসে তাকে দেখে কখনও অবাক হয়েছেন সায়গল। কখনও ভ্রƒক্ষেপও করেননি। তবু ভালো লেগেছে।
আজ তার সে আশ্রয়টুকুও ফুরোল।
ইশরাত জাহান পর্দা ঠেলে আবার বেরিয়ে আসেন। এবার হাতে এক তাড়া কাগজ আর কিছু ফাইল।
জাহেদীর দিকে সেগুলো এগিয়ে দিয়ে বলেন, ওঁর অফিসের। ফিরিয়ে দিও।
যেন ফাইলের বোঝা নয়, বিদায়ের বোঝাটাই সেদিন অস্বাভাবিক ভারি মনে হলো। হাত কাঁপছিল জাহেদীর। ইশরাত জাহান বলেন, কাল সকালের গাড়িতেই আমরা যাচ্ছি।
তারপর একমুহূর্ত থেমে টানা দীর্ঘশ্বাস তুলে বলেন, খবরের কাগজে ছাপিয়ে এমন অপমান করার কোনো দরকার ছিল না তোমাদের কোম্পানির। দেখা হলে বলে দিও নতুন ম্যানেজারকে।
‘তোমাদের অফিস’ কথাটা যেন ভীষণ বিদ্রƒপের কটাক্ষের মতো শোনাল।
জাহেদী প্রতিবাদ করতে পারত।
বলতে পারত, আমাদের অফিস কেন বলছেন! আমি সামান্য কর্মচারী বই কিছু নই। কোনোদিন তার বেশি ছিলাম না। হয়তো হবোও না।
কিন্তু কাকে বলবে সে কথা।
মিসেস সায়গল তখন নেই। অন্ধকার হয়ে আসছে। তখনও আলো জ্বলেনি। যেন মনে মনে এই আলোহীনতাই প্রত্যাশা করছিল জাহেদী।
বারান্দা পেরিয়ে গেলে মুখোমুখি আরেকবার দেখা হয়ে যায় সায়গলের সঙ্গে। আর বিদায়ের ক্ষণটি হয় অযাচিত দুঃখ-ভারাক্রান্ত।
তা না করে ফাইলগুলো নিয়ে আস্তে আস্তে এক ফাঁকে সন্তর্পণে বেরিয়ে পড়ে জাহেদী।
বারো
ম্যাকব্রাইডের নতুন ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আসার পর, অফিসে কাজ বেড়েছে মেলা। সায়গলের উত্তরাধিকারী অথর্ব কেউ নন, এটা প্রমাণ করতে চেষ্টার ত্রুটি নেই। অফিসে অনেকক্ষণ থাকেন। সে সঙ্গে অন্যদেরও থাকতে হয়।
আগের মতো বিকেল করে ফেরা হয় না জাহেদীর। কোনোদিন সন্ধে হয়, কোনোদিন রাত। অফিসের অপরিসীম ক্লান্তির পর কারও সঙ্গে দেখা করার উৎসাহ থাকে না ইচ্ছে থাকলেও।
মহসীনের সঙ্গে দেখা হয়নি সেও যেন এক যুগ। সেই কবে সিনেমা দেখার নাম করে অনেক রাত ঘুরে বেড়িয়েছিল তারা দু’জন।
সেদিন অফিস থেকে ফিরে এসেই চোখে পড়ে একখানা চিঠি। তার নামে। পরিচিত হস্তাক্ষর। চিঠিখানা খুলে ফেলে তখনি। মহসীন লিখেছে :
প্রিয়বরেষু,
হঠাৎ এ চিঠি দেখে অবাক হচ্ছো নিশ্চয়ই। চিঠি না লিখে দেখাও করতে পারতাম। কিন্তু এসব কথা মুখে বলার চাইতে চিঠিতে লিখে জানানোই সহজ।
ভণিতা করে লাভ নেই। কাজের কথা বলি।
মনে আছে বোধহয় কোহিনুর বেগমের একটা রেডিও ঠিক করতে নিয়েছিলাম। সত্যি কথা বলতে কি আমি এসবের তেমন কিছু বুঝি না। যদিও তখন ভান করেছিলাম জানি বলে।
ওটা আমার ওখানে রাখা। সম্ভব হলে ওঁকে ফিরিয়ে দিও। আমি লজ্জায় আর মুখ দেখাতে পারব না।
ইতি
তোমার মহসীন
চিঠিখানার যেমন আকস্মিক শুরু, তেমনি আকস্মিক সমাপ্তি।
খানিকক্ষণ হতভম্বের মতো ওখানা নিয়ে বসে থাকে জাহেদী।
মনে পড়ে মহসীনই তাকে প্রথম প্রিমরোজ ভিলায় নিয়ে গিয়েছিল।
অথচ প্রিমরোজ ভিলায় যারা সাধারণত সানন্দে অভ্যর্থিত, মহসীন তাদের পর্যায়ে পড়ে না। না পদমর্যাদায়, না তথাকথিত আভিজাত্যের মাপকাঠিতে। তবু কোহিনুর বেগম সব অনুষ্ঠানেই তাকে ডাকতেন মনে করে।
মহসীনই একদিন বলেছিল তার সঙ্গে কোহিনুর বেগমের পরিচয়ের কাহিনী।
তাঁদের বিয়ের কিছুদিন পর ইমতিয়াজই সঙ্গে করে এনেছিল তাকে। পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছিল, আমাদের দেশের ছেলে। কখনও কিছু অসুবিধে হলে বলো। আমি তো অফিসের কাজ নিয়েই ব্যস্ত।
সায় দিয়ে বলেছিল মহসীন, নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। যখন খুশি ডাকবেন। খবর পাঠালেই আমি হাজির।
অবশ্যি তেমন প্রয়োজন কোহিনুর বেগমের হয়নি প্রথম প্রথম। কিন্তু বিদেশ থেকে ফিরে এসে গোটা সংসারটাই সামলাতে হয় তাঁকে। কাজের ঝামেলায় যখন হাঁপিয়ে উঠেছেন, তখনই মনে হয়েছে মহসীনের কথা।
সরাসরি তার অফিসে টেলিফোন করে বলেছেন, ভাই আজ বিকেলে একটু আসতে হবে।
নিশ্চয়ই আসব, সঙ্গে সঙ্গে এসেছে জবাব।
কখনও বা কোহিনুর বেগম আবদার করেন, আপনাকে এক্ষুনি যেতে হবে আমার সঙ্গে।
কোথায়?
একটু দর্জির দোকানে।
আবার কখনও বাজারে নিয়ে গিয়ে বলেন, দেখুন তো কেমন এ পর্দার কাপড়?
চমৎকার।
আর দ্বিরুক্তি করেন না কোহিনুর বেগম।
বলেন, ভালোই। আপনাদের দশজনের পছন্দ হলেই হলো। আমার নিজের আবার ভালো মন্দ কি।
কোহিনুর বেগমের এ প্রশংসা যেন অকুণ্ঠ নয়। অন্তত তাই মনে করে একটু ক্ষুণœই হয়েছে মহসীন। তাকে একজন হিসেবে নয়, দশজনের ভেতর ফেলে যেন যথাযোগ্য সম্মানের মর্যাদা দেননি কোহিনুর বেগম।
কিন্তু এ নিয়ে বচসা চলে না। শুধু একটা নীরব আক্ষেপকে ঠাঁই দিতে হয় মনের গোপনেই।
তবু অফিসের ছুটি পেলেই ছুটে আসে মহসীন। গপ্প করতে করতে রাত হয়ে যায় মেলা। কোহিনুর বেগম না মনে করিয়ে দিলে ওঠার কথা মনেই থাকে না কোনো কোনোদিন।
এ যে কি ধরনের আকর্ষণ, মহসীন সেটা নিজেও বোঝে না। আবার অনেক সময় মনে হয়, না বোঝার আনন্দটাই যেন বেশ। দায়হীন, ঝামেলাহীন।
এক একদিন ভয়ে ভয়ে বলে, আপনি সেদিন লাল রং-এর যে শাড়িটা পরেছিলেন –
হেসে জিজ্ঞেস করেন কোহিনুর বেগম, কেন?
আমার খুব ভালো লেগেছিল। আরেকটা কথা বলব, রাগ করবেন না তো?
মাথা হেলিয়ে বলেন কোহিনুর বেগম, রাগ করব কেন? বলুন না।
আমতা আমতা করে বলে, আমি রোজ রোজ যে আসি –
তার মুখের কথা কেড়ে নিয়েই জবাব দেন কোহিনুর বেগম, ওমা কি হয়েছে তাতে। আগে রোস্তমজীরা আসত। রওনাক খান আসেন তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে। কি হয়েছে তাতে?
প্রসঙ্গ সেখানেই শেষ হয়।
কোনো রোববার সকাল সকাল এসে ধরনা দেয় মহসীন। তখুনি হয়তো বেরুবার উপক্রম করেন কোহিনুর বেগম।
নিরাশ হয়ে বলে মহসীন, তাহলে আমি যাই। আপনি তো বেরুচ্ছেন।
তাতে কি, বসুন না।
কেমন ভীষণ লজ্জায় সে আড়ষ্ট। বলে, না থাক।
তবু জোরাজুরি করেন কোহিনুর বেগম, না কেন। বসুন।
তারপর কি যেন মনে হয়ে যায় তাঁর। বলেন, ভালো কথা দেখুন না আমার রেডিওটা। কাল থেকে কাজ করছে না।
যেন এতক্ষণ সে বাড়িতে বসতে দেওয়ার একটা চমৎকার অজুহাত দিয়েছেন কোহিনুর বেগম।
কোহিনুর বেগম বেরিয়ে যান। ঘণ্টাখানেক পর ফিরে এসে দেখেন সত্যি সত্যি রেডিওটা নিয়ে তখনও লেগে মহসীন।
কোহিনুর বেগম ঝুঁকে পড়ে বলেন, সত্যি আপনাকে মিছিমিছি কষ্ট দিলাম।
যেন ভালোই লাগে এ ধরনের প্রশস্তি শুনতে।
কিন্তু কোনোমতেই বশে আনা যায় না অবাধ্য রেডিওটাকে। গলদঘর্ম হয়ে বলে, কাল আবার আসব।
বেশ তো আসুন না।
জাহেদী জিজ্ঞেস করেছিল, আচ্ছা এভাবে পরের কাজ করে কী লাভ?
চটেই গিয়েছিল বোধহয় মহসীন মনে মনে।
বলেছিল, লাভ আর কি? লাভ কিছু নয়। লাভ, আনন্দ।
জাহেদী ছাড়ে না।
বলে, আসলে এটা বোধহয় এক ধরনের দুর্বলতা।
যেন তার প্রতি একটা ভীষণ কটাক্ষ করেছে কেউ।
মহসীন বলে, দুর্বলতা মানে?
পাল্টা প্রশ্ন জাহেদীর, তাহলে রোজ রোজ প্রিমরোজ ভিলায় যাও কেন?
যেন কোনো সদুত্তরই খুঁজে পায় না মহসীন।
ইতস্তত করে বলে, যাই কথা বলতে ভালো লাগে এজন্যে।
চিঠিখানা পেয়ে সেদিনই ছুটে গিয়েছিল মহসীনের সঙ্গে দেখা করতে। বাড়িতে পাওয়া গেল না। কিন্তু ফেরার পথে রাস্তায় দেখা হয়ে গেল দু’বন্ধুর।
মাথা নিচু করে শুধোয় মহসীন আমার চিঠি পেয়েছ?
হ্যাঁ। সেজন্যেই তো এলাম।
কাছাকাছি একখানা চায়ের দোকান ছিল।
সেখানে বসে আবার সেই পুরনো কথাই জিজ্ঞেস করেছিল জাহেদী, এত ঘন ঘন প্রিমরোজ ভিলায় যাও কেন?
আর তার একই জবাব দিয়েছিল মহসীন, ভালো লাগে বলে।
কী রকম ভালো লাগা?
ভালো লাগা, ভালো লাগাই। এর কোনো রকমভেদ নেই।
তারপর আস্তে আস্তে নিজের চিন্তার জটটা যেন নিজেই খুলে দিয়ে বলে মহসীন, সত্যি জানি না কোহিনুর বেগমকে আমার কী চোখে দেখা উচিৎ। কী চোখে দেখি। তবু জানি এ সবেরই একদিন শেষ হবে।
জেরা করেছিল জাহেদী, শেষ হবে কেন?
আস্তে আস্তে বলেছিল মহসীন, কোহিনুর বেগমই একদিন হাঁপিয়ে উঠবেন।
সেদিনের প্রতীক্ষা করছ?
জাহেদীর অতর্কিত প্রশ্নে ওর বিভ্রান্তির ঘোর কাটে। বলে, তাও করছি না। তাঁর চোখে আমি কাজের একটা অজুহাত। তার বেশি কিছু নই। কোনোদিন হবো না। তবু কেন জানি না, ওঁকে খুশি দেখলে, আমার খুশি লাগে। ওঁর মন খারাপ হলে, আমার মন খারাপ হয়।
খানিকক্ষণ কথা বলেনি কেউ।
তারপর নিজেই আবার বলে মহসীন, ঠিকই বলেছ। আমার ও বাসায় আর যাওয়া উচিত নয়। আর যাবও না। সেজন্যেই তো ওই চিঠি।
যদি জিজ্ঞেস করেন তোমার কথা?
করবেন না।
তবু যদি করেন।
বলো, দেখা হয়নি।
সেটা কেমন হবে।
কিছুই হবে না। আমার মতো ভক্ত তাঁর অচিরেই জুটবে। আকাশের নক্ষত্রমালা থেকে একটা উল্কাপি- খসে পড়লে নক্ষত্রমালার সৌন্দর্যহানি হয় না। আকাশ, আকাশই থাকে।
একসময় জাহেদীর হাতদুটো জড়িয়ে ধরে বেদনার্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে মহসীন।
তারপর আস্তে আস্তে বলে, আমি যাব না তাঁর কাছে, অন্য কারণে। সেদিন আমি তাঁকে কাঁদতে দেখেছি।
কাঁদতে দেখেছ, অবাক হয় জাহেদী।
হ্যাঁ। আমি দেখা করতে গিয়েছিলাম। বলে পাঠালেন বসতে। তারপর যখন নেবে এলেন মনে হলো চোখ মুছে এসেছেন। কাজল পরেছিলেন বোধহয় তা গোপন করার জন্যেই। তবু তাঁর চোখের কোণে জমাট অশ্রুকণা দেখেছিলাম। আমার ভারি দুঃখ হয়েছিল বিশ্বাস করো। জানি তাঁর এ মর্মযাতনার কিছুই করতে পারব না। এমনকি পারব না সহানুভূতির ভাষা শোনাতেও।
বলেই চলেছে মহসীন, তাঁর হাস্যোজ্জ্বল জীবনে নিজেকে তাঁর একজন অনুরক্ত হিসেবে ভালোই লেগেছে এতদিন। কিন্তু সেদিন তাঁর বেদনাহত চোখের দৃষ্টি আমাকে পীড়া দিলো। নিজেরই কেমন লাগল। আমি ও বাড়িতে আর যাব না।
এরপর আর দেখা হয়নি মহসীনের সঙ্গে জাহেদীর।
তেরো
বোধহয় এভাবেই একটা ইতির রেখা টানা দরকার ছিল। একটু নিষ্ঠুর হয়েছেন, রূঢ় হয়েছেন তাঁর আচরণে। কিন্তু জীবনে একটু রূঢ়তারও দরকার। মোমের পুতুল হলে চলে না। ভালো লাগার অঙ্কুরগুলো সমূলে উৎপাটিত করতে হলে এমনি আকস্মিক ঝড়ের দাপট দরকার। তাই করেছেন তিনি। এ নিয়ে ভণিতা নি®প্রয়োজন। অর্থহীন, ছলছল চোখে নিজের দুর্বলতার উচ্ছ্বাসে ভেঙ্গে পড়া।
সায়গল কী ভাবলেন, কে জানে। হয়তো ভেবেছেন, পৃথিবীটাই অকৃতজ্ঞ। এ অকৃতজ্ঞ পৃথিবীতে তাঁর ভরসার লোক একটিও নেই। নেই বিশ্বাসের একটি মহীরুহও, যার সুশীতল ছায়ায় জিরোতে পারেন।
অথচ কি করেছিলেন সায়গল! অন্যায় তো কিছু করেননি। তাঁর একটি কুসুমিত আকাক্সক্ষাকে শুধু বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছেন। শুধু তাঁর আকাক্সক্ষাকেই নয়, আকাক্সক্ষার অতি কাম্য মানুষটিকে। অথচ তাঁর আন্তরিকতার, তাঁর শুভবুদ্ধির কোনো স্বীকৃতিই মিলল না। বিলীন হয়েছে তাঁর সুরভিত দিন। ঢলে পড়েছে ভাগ্যের স্বর্ণোজ্জ্বল সূর্য। তা নিয়ে দুঃখ ছিল না। সে দুঃখকেও হয়তো ঠাঁই দিতে পারতেন না। অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেই বিচারপতির আসনে বসে যেন যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের নির্মম শাস্তি দিলেন।
যেদিন সায়গলকে দেখতে গিয়েছিলেন সেদিন হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এসে এসব কথা নিজেও ভেবেছেন কোহিনুর বেগম। ভেবে মর্মাহত হয়েছেন। আবার সে সঙ্গে মনে হয়েছে মঞ্চের নাটকের যেমন, জীবনের নাটকেরও যবনিকাপাত এমনি করেই হয়। তা যতই হৃদয়স্পর্শী, আর যতই করুণ হোক। সবকিছুরই পরিসমাপ্তি ঘটে। অবশ্যি ইচ্ছে করলে তা না করে, একই ঘটনার জের টানা যায় সারা জীবন। কিন্তু তাতে দুঃখই বাড়ে। যাতনা বাড়ে।
এতদিন এসব কথা মনে হয়নি। হেসেখেলে কেটেছে। কখনও নৈরাশ্যের কালোছায়া নেবে এলেও উজ্জ্বল হাসির স্পন্দনে আত্মগোপন করেছেন তা। জানতে দেননি কাউকে।
কিন্তু আর যেন পেরে ওঠেন না। তাঁরও ক্লান্তি এসেছে। আজ যেন চূড়ান্ত হিসেব-নিকেশের পালা। তাঁর ভাগ্যনিয়ন্তা জীবনের খাতা খুলে ধরেছে। লাভ-লোকসানের ফিরিস্তি জানতে চায়। সে দায় এতদিন এড়ানো গেছে। এখন বুঝি তা আর সম্ভব নয়।
কী করবার ছিল তাঁর।
প্রেম ও প্রত্যাখ্যান দুটোই পেয়েছেন। শুধু বুঝতে পারেননি, কোনটা আসল কোনটা নকল। কোনটা মেকি, কোনটা ফাঁকি।
সায়গল যদি তাঁকে ভুল বুঝেই থাকেন, তাঁরও বোঝা উচিত কোহিনুর বেগমও ভুলের পঙ্কিলে আকণ্ঠ নিমগ্ন। তাঁর জীবন তো আর দশজনের মতো হয়নি। বিয়ে করে সংসারের সুখ শান্তি জোটেনি। ইমতিয়াজের সঙ্গে বিয়েটাই বুঝি ছিল একটা প্রহসন।
অবশ্যি এ নিয়ে এখন আর কোনো অনুযোগ চলে না। কোহিনুর বেগম জানেন, প্রেমের বাঁধন যতদিন থাকে, ততদিনই তা দুর্জয়। আবার সে বাঁধন যখন একবার ছিন্ন হয়, শত চেষ্টাতেও তাকে আর জুড়ে দেওয়া যায় না। দোষ স্খালনের যত চেষ্টাই করুন সায়গল, তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে, কল্পিত শাস্তির দ- দিয়ে এতটুকু ভুল করেননি কোহিনুর বেগম।
মনে পড়ে মধুর স্বপ্নের আমেজে যখন ছিলেন নিবিষ্ট, ভালোমন্দ বোঝারও বয়েস যখন হয়নি অথচ কোনো আকাক্সিক্ষত পুরুষকে পেলে নিজেকে সমর্পণের রোমাঞ্চিত শিহরণ যখন স্নায়ুতে স্নায়ুতে, তখনই সায়গল তাঁকে ঠেলে দিয়েছিলেন ইমতিয়াজের হাতে। হয়তো তাঁর মঙ্গলাকাক্সক্ষী হিসেবেই।
বনেদি পরিবারে জন্ম কোহিনুর বেগমের। বাপ-মা দু’জনকে হারিয়ে ছোটবেলায় মানুষ হয়েছেন মেজমামার কাছে। তাঁরাও নিঃসন্তান। সুতরাং আদর আহ্লাদের অভাব হয়নি এতটুকু। ছোটবেলা থেকেই জানতেন মামার বিষয় সম্পত্তির মালিকানা তিনিই করবেন। বাপেরও পয়সার অভাব ছিল না। আজ তাঁদের কেউ বেঁচে নেই। তবু মনে পড়ে মেজমামার কাছে প্রায় আসতে দেখেছিলেন সায়গলকে। কৃশ দেহ লাজুক একটি যুবককে।
সায়গলের বাবাকে চিনতেন মেজমামা। বোধহয় সে সুবাদেই আসা-যাওয়া। তখন সবে ম্যাকব্রাইডের চাকরিতে ঢুকেছেন সায়গল। মেজমামা সবসময়ই বলতেন, বলো তো কাউকে বলে দিই। আমি হ্যারল্ডকে চিনি।
হফম্যানের আগে হ্যারল্ড ম্যানেজিং ডাইরেক্টার ছিলেন।
অথচ ওই লাজুক আর উদ্ধত যুবক মুখের ওপর শুনিয়ে দিত, না কারও সুপারিশ নিয়ে চাকরি করব না। সে আমার ধাতে সইবে না।
তা নিয়ে আর কোনোদিন আলোচনা হয়নি সায়গলের সঙ্গে। মেজমামাও তোলেননি।
কি জানি সেদিনের সেই উদ্ধত লাজুক সায়গলকে দেখে কী মনে হয়েছিল কোহিনুর বেগমের। বোধহয় মনে হয়েছিল, বড় দম্ভ তাঁর। কারও কাছে কোনো জিনিস হাত পেতে চাওয়ার মানুষ তিনি নন।
এমনি সময় এলো তাঁর জীবনে ইমতিয়াজ, ঔজ্জ্বল্য ও প্রতিভার স্বাক্ষর নিয়ে। নিয়ে সাফল্যের হাসি।
বয়েসে ছোট হলেও সব ব্যাপারেই পরামর্শ নেন মেজমামা সায়গলের। বোধহয় তাঁর মতামতের প্রতি সত্যিকার শ্রদ্ধা ছিল।
ইমতিয়াজের প্রসঙ্গ তুললেন একদিন তিনিই।
বললেন, কেমন হবে পাত্র হিসেবে?
সায়গল নিস্পৃহ হয়ে জবাব দিয়েছিলেন, ভালোই তো।
নিঃশব্দে দরজার কাছে এসে লুকিয়ে সে কথা শুনেছেন কোহিনুর বেগম। বোধহয় একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল সেদিন।
আর কি কোনো জবাব দেবার ছিল না সায়গলের?
মেজমামা উঠে গেলে কোহিনুর বেগম নিজেই তা নিয়ে জেরা করেছেন সায়গলকে। তাঁর চোখে চোখ রেখে বলেছেন ‘ভালোই তো’ বললেন যে।
ভালো বলব না, হেসে বলেছিলেন সায়গল, ভালো চেহারা, ভালো চাকরি। আর কী চাই!
সরাসরি আবার প্রশ্ন করেছিলেন কোহিনুর বেগম, কেন আর কিছুই দরকার হয় না।
বড় মূঢ়ের মতো শোনাল সায়গলকে সেদিনের জবাব।
তাঁর স্থূল মন কি একটিবারও বোঝে না আরও কিছুর দরকার হতে পারে। হৃদয়ের ক্ষুধা অত সহজে মেটে না।
সেদিন বেশিক্ষণ বসেননি সায়গল। বোধহয় প্রসঙ্গটাই ভালো লাগেনি তাঁর। নিজেও ভেবে আকুল কি এমন অন্যায় করেছেন তিনি। একজন কর্মক্ষম সৎপাত্রের ঘর করুন কোহিনুর বেগম, এমন ইচ্ছে প্রকাশে বিরাগভাজন হওয়ার কি থাকতে পারে।
না অন্যকিছু আশা করেছিলেন কোহিনুর বেগম? তাহলে সে কথা বলেননি কেন। আজ তাঁর সজল ছল ছল চোখ যতই মর্মস্পর্শী হোক, সময় নেই।
হুট্ করে উঠে পড়েছিনে সায়গল।
তবু জীবনে যা গেল তা নিয়ে আক্ষেপ না করে, যা এলো তাই মেনে নিয়েছিলেন মনে মনে। চিরকালই তাঁর এমন হয়েছে। যা পেয়েছেন আঁকড়ে ধরেছেন পরম আশীর্বাদের মতো।
ইমতিয়াজের সঙ্গে তাঁর জীবনের দিনগুলো রূপকথার স্বপ্নের মতো। জীবনের সব দ্বন্দ্ব দ্বিধা কাটিয়ে পরিপূর্ণ সমর্পণের সংকল্প নিয়েই ঘর করতে এসেছিলেন কোহিনুর বেগম।
ইমতিয়াজেরও জীবনের বিপুল শূন্যতায় যেন মিলেছে একটি শান্ত, নিবিড় আশ্রয়। অন্তত ইমতিয়াজের আচরণে সে কথাই মনে হয়েছিল সেদিন।
কোনো ধূসর সন্ধেয়, নববধূর লজ্জায় আরক্ত হয়ে আস্তে আস্তে যখন এসে বসতেন ইমতিয়াজের পাশে, স্পষ্ট অনুভব করেছেন তার চোখের পলক পড়ছে না। তারই ফাঁকে ফাঁকে নিজের সাফল্যের কথা শুনিয়েছে ইমতিয়াজ উঁচু গলায়। তার সম্ভাবনাময় জীবনের ফিরিস্তি দিয়েছে। আকাশচুম্বী প্রতিশ্রুতির কথা পেড়েছে। সবকিছুতেই ছিল বোধহয় তার আতিশয্য।
কিছুদিন পরই গিয়েছিলেন স্বামীর সঙ্গে বিদেশে। হ্যাঁ, সে ক’টি দিন সুখেরই ছিল। এক মুহূর্ত স্বস্তি দেয়নি তাঁকে ইমতিয়াজ। আজ এখানে কাল সেখানে। হাস্যকলোচ্ছ্বাস মুখরিত দিন। সমুদ্রের উত্তাল হাওয়ায় এলোমেলো আঁচলের ছবি ধরে রেখেছে ক্যামেরায়। নায়াগ্রা জলপ্রপাতে দেখেছে সোনালী সূর্যের বিচ্ছুরণ। কনসার্টে নিয়ে গিয়ে বসেছে বাহুলগ্ন হয়ে।
সে বছরই এক সুইস ফার্মে চাকরি পেয়েছেল ইমতিয়াজ। হপ্তাখানেকেই নতুন চাকরিতে ঢুকতে হবে।
ইমতিয়াজ তাঁর গালে টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, কি টিকবে তোমার মন বিদেশ-বিভূঁইয়ে।
কেন টিকবে না?
তাহলে তো ভালোই।
তারপরই প্রস্তাব করেছিল ইমতিয়াজ, তাহলে একেবারে সব গুটিয়ে চলে এসো। নতুন জায়গায় যাচ্ছি। গুছিয়ে নিতে সময় লাগবে। ততদিন তুমি বরং ঘুরে এসো দেশ থেকে।
কেমন হতাশ হয়ে যান কোহিনুর বেগম।
বলেন, একা যাব। তুমি আসবে না।
আশ্বস্ত করে বলেছিল ইমতিয়াজ, আমি যাই কি করে বলো তো, লক্ষ্মীটি। সবে নতুন চাকরি।
আর কোনো প্রতিবাদ করেননি কোহিনুর বেগম। যদিও ব্যাপারটা আদৌ ভালো লাগেনি। নতুন জায়গায় বাড়ি না পেলেও কোনো হোটেলে দিন কাটাতে পারতেন তাঁরা। তাছাড়া দেশের বাড়িতে টানই বা কি তাঁর এমন।
একা একাই বিমানবন্দরে এসেছিলেন কোহিনুর বেগম। ইমতিয়াজ বলেছিল, সে অফিস হয়ে আসবে। কাজকর্ম বুঝিয়ে দিতে হচ্ছে। ভয়ানক ব্যস্ত।
ইমতিয়াজ এসেছিল ঠিকই, প্লেন ছাড়ার আগে।
মুখটা খুব কাছে নিয়ে বলেছিল, বড় জোর তো ক’মাস। তারপর তোমার সংসারের পালা।
ঠিক বিচ্ছেদ-বেদনা বোধহয় তাঁরও সইছিল না। বললেন, অতদিন?
অতদিন কোথায়? দেখতে দেখতে চলে যাবে। একটা পছন্দমতো বাড়ি পেলেই আনিয়ে নেব তোমাকে।
একবার ইচ্ছে হয়েছিল যাবার আগে আলিঙ্গনের নিবিড়তায় তাঁর যাবার মুহূর্তটাকে স্মরণীয় করে যান। কিন্তু পারলেন না। কোথায় যেন বাধো বাধো ঠেকল।
তাঁর চিবুকখানা স্পর্শ করে হেসে বলেছিল ইমতিয়াজ, বড় লোভনীয় দেখাচ্ছে তোমাকে। আরো মিষ্টি হয়ে এসো।
ছলছল করে আসে তাঁর চোখ। আরেকবার প্লেন থেকে গলা বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করেন। লোকের ভিড়ে চেনা যায় না। না, না ওই তো। একি, কার সঙ্গে কথা বলছে ইমতিয়াজ? স্বর্ণকেশী একটি মেয়ে আনন্দে আর উচ্ছ্বাসে ঢলে পড়ছে তার গায়। ইমতিয়াজের হাতখানা ওর কটিদেশ বেষ্টন করে।
একবার মনে হয় এ সবই তাঁর দেখার ভুল। আবার মনে হয়, ইমতিয়াজের অফিসের কেউ। বিদেশে অন্তরঙ্গতার রূপটাই বুঝি একটু অতিশয়োক্তির দোষে দুষ্ট। তা নিয়ে মন খারাপের কোনো মানে হয় না। নিজের অপরিণামদর্শিতার জন্যে নিজের ওপরই কোহিনুর বেগমের ভীষণ রাগ হয়েছিল।
তাঁর এই হঠাৎ করে চলে আসার ব্যাপারটি সায়গলের কিন্তু ভালো লাগেনি। এয়ারপোর্টে নিতে এসেছিলেন।
বললেন, এ কি তুমি একা যে?
সহজ হয়েই বলেন কোহিনুর বেগম, ও আসতে পারল না। নতুন চাকরি কিনা তাই।
ও।
গাড়িতে যেতে যেতে বলেন সায়গল, কবে ফিরে যাচ্ছ?
কেন, আসতে আসতেই বিদায় দিতে চান নাকি?
না না, সে-কথা নয়।
কোহিনুর বেগম বলেন, যাক সেসব। আপনার কী খবর বলুন।
আমার খবর? আমার আবার কী খবর?
শুনলাম বিয়ে করেছেন।
হ্যাঁ।
একটু গম্ভীর হয়ে পড়েছিলেন কোহিনুর বেগম। তারপর সঙ্গে সঙ্গে সামলে নেন। বলেন, কই একটা কার্ডও তো পাঠালেন না।
পাঠালে কি তুমি পরের প্লেনে এসে বিয়ে খেয়ে যেতে।
তবু –
তারপর আবার থেমে বলেন কোহিনুর বেগম, বউ দেখাচ্ছেন কবে?
সময় হলে দেখবে। লুকিয়ে রাখার মতো কিছু নয়।
কিছুক্ষণ দু’জনের কেউ কথা বলেন না।
এবার কোহিনুর বেগমই আবার বলেন, ভালোই করেছেন বিয়ে করে।
সায়গল জবাব দেন, সত্যি তাই। আমার আকাক্সক্ষার উদ্গ্রীব হাত বড্ড বেশি লম্বা হয়ে কি যেন ছুঁতে চাইছিল।
তাই বুঝি তাকে শান্তি দিলেন, জিজ্ঞেস করেন কোহিনুর বেগম।
সায়গল নিরুত্তর।
তারপর পরই কেমন তির্যক প্রশ্ন হানেন কোহিনুর বেগম, আপনারও আকাক্সক্ষা বলে কোনোকিছু ছিল নাকি।
ছিল।
কী রকম?
শান্ত কণ্ঠে জবাব দেন সায়গল, সে আকাক্সক্ষার কথা শুনে আর কী করবে?
খুব দেরি হয়ে গেছে, না?
খুব।
তারপর তাঁর প্রায় নিঃসঙ্গ জীবনে, আত্মীয়তার বন্ধনেও যিনি কেউ নন, সামাজিক ছাড়পত্রও যার নেই, সেই সায়গলই শনিবার রোববার করে খোঁজ নিয়েছেন। প্রিমরোজ ভিলায় নিজে এসে জিজ্ঞেস করেছেন অসুবিধের কথা।
অসুখ বিসুখ হলে ডাক্তার ডেকে দিয়েছেন।
এমন মানুষের কাছে ঋণ শোধ হবার নয়। আর যখন হবার নয়, তখন আত্মগ্লানির যাতনায় দগ্ধ হয়ে কি লাভ? বরং একবারেই তার পরিসমাপ্তি ঘটুক।
বড়জোর সায়গল তাঁকে ভাববেন অকৃতজ্ঞ। ভাবুন। তা ভেবে যদি সায়গল শান্তি পান, তবে সেটাই হবে কোহিনুর বেগমের একমাত্র সান্ত¡না।
সব আকাক্সক্ষা পূরণ হয় না। স্বপ্নসাধ মেটে না। তবু মনের গোপনে সবই থাকে। সব স্মৃতিই।
ইমতিয়াজকে যে কথা বলে এসেছিলেন সায়গল, এক্ষুনি ইচ্ছে করলে একটা উচ্ছ্বাসের চিঠি লিখে সে রহস্যের সমাধান করতে পারেন কোহিনুর বেগম। কিন্তু সায়গল হয়তো নিজেই তাঁর অপরিণামদর্শিতার কথা বুঝে থাকবেন। হয়তো ক্ষমা প্রার্থনা করে লিখেছেন চিঠি ইতিমধ্যেই।
আর সত্যি সত্যি যদি আজ ইমতিয়াজের মন বেঁকে বসে, একটি সামান্য চিঠির কি সাধ্য যে তাকে ঘরমুখো করে। কোহিনুর বেগমের বেঁচে থাকা আর না থাকাটা ইমতিয়াজের কাছে নিশ্চয়ই অর্থহীন; আশ্চর্য সায়গল যে কথাটা বোঝেন, কোহিনুর বেগম তা বোঝেন না কেন।
কই এলো না তো ইমতিয়াজের প্রতিশ্রুত চিঠি। এলো না নতুন ঘরবাঁধার আমন্ত্রণ।
প্রথম প্রথম একটু কাতর হয়েছিলেন। হতে হয় বলেই। মায়া জিনিসটাই এমন। পোষা বেড়ালটাও যদি তাঁর ডাক অগ্রাহ্য করে প্রিমরোজ ভিলার গেট দিয়ে বেরিয়ে যেত, নিশ্চয়ই অস্বস্তিবোধ করতেন কোহিনুর বেগম।
আর আজ এতদিন পর যে ঝামেলা চিরদিনের মতো অন্তর্হিত বলে নিশ্চিন্ত যে ইমতিয়াজ, তাকে তাঁর বেঁচে থাকার খবর দিয়ে বিব্রত করা কেন।
অবশ্যি সরাসরি আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের রেখাও টানতে পারেন। পারেন, আইন-আদালতের আশ্রয় নিতে। কিন্তু তাতে কী লাভ। ভরণপোষণের দয়াপ্রার্থী হয়ে সারা জীবন বেঁচে থাকার গঞ্জনাটাই কি কম। তার চেয়ে যেমন চলছে চলুক।
এখানেই থাকতে পারতেন – প্রিমরোজ ভিলায়। তাঁর পোষা বেড়াল, আদরের ময়না পাখি নিয়ে। কিন্তু তাঁর চেনা মহলের কী করবেন। তাদের সান্নিধ্য, তাদের কলগুঞ্জন, তাদের অনুদার-ভাষণের হাত থেকে রেহাই পাবেন কেমন করে। নিছক ভদ্রতার খাতিরেই হয়ত কিছু বলে না তারা কোহিনুর বেগমের সামনাসামনি। তবু তাদের সন্দেহের ঘোর যে কাটে না, তা জানেন। ভালো করেই জানেন আড়ালে আব্ডালে ফিসফিসে গলায় তাদের অনুযোগ : দেখো দেখো মেয়েটির কি দুর্দশা। স্বামীর মন পেয়েও পেল না!
আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন কোহিনুর বেগম। অনেক অজুহাত দেখিয়েছেন। ঘটা করে প্রমাণ করেছেন সব ঠিকই আছে। কিন্তু অজুহাতের শেকলে বেঁধে চিরকাল টেনে নেওয়া যায় না জীবনকে। একদিন ধরা পড়তেই হয়। তার আগেই সরে যেতে চান তাঁর পরিম-ল থেকে। অন্তত আর কিছু না হোক, একটু মুক্তির স্বাদ। একটু পট পরিবর্তন। যারা তাঁকে এখনও মনে রেখেছে ভুলে যাক তারা এক এক করে। ভুলে যাক প্রিমরোজ ভিলার কথা। তাঁর কথা।
তারপর?
সময়ে সবকিছুরই উদ্ভব, সময়ে সবকিছুরই লয়। কিছুটা, সময় চান মাত্র। চিরকাল আত্মগোপন করে থাকতে যাবেন কেন? তাঁর চেনা মহল তাঁকে যখন ভুলে যাবে আবার ফিরে আসবেন সন্তর্পণে এই প্রিমরোজ ভিলায়। দরকার হলে আবার ছেড়ে চলে যাবেন। তারপরও যদি অতি অনুরক্তদের কেউ তাঁর খোঁজখবর করতে আসে আসুক। একবার দু’বার চেষ্টা করেই তারা ক্ষান্ত দেবে।
তখন গেটে দারওয়ান থাকবে না। বড় ঘরের আলো জ্বলবে না। আইভি লতা দেয়ালের গা বেয়ে উঠে পথভ্রান্ত কারও মনে অকারণ আমন্ত্রণের নেশা জাগাবে না।
আর সায়গল?
মনে হয় না আর কোনোদিন এ ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারবেন। নিজেই নিজের অনুশোচনায় দগ্ধ। মায়া জিনিসটাই এমন। সায়গলের জন্যে মন তাঁর কেমন করবে, তা ঠিক। লোকটার কোনো দোষ ছিল না। কিন্তু যে নিজেই আগুনে পুড়ছে তাকে বাঁচাবেন কী করে?
বড় ঘড়িতে একটা বাজার সময়সঙ্কেত। এত রাত এমন করে জেগে কাটাননি কখনও। বাতি নিবিয়ে দিয়ে বিছানায় গিয়েও ঘুম হলো না।
পিঁজরার ময়না পাখির পাখা ঝাপটানির শব্দ পেলেন। বোধহয় তাঁর অন্তরের যাতনা আজ তাকে স্পর্শ করে থাকবে।
যাবার আগে এ বাড়ির ঝি’র কাছে রেখে যাবেন ময়না পাখিটা। সে কিছুদিন ‘ছি ছি কেঁদো না’, ‘ছি ছি কেঁদো না’ করে করে চেঁচাক।
তারপর আপনিই একদিন শান্ত হয়ে যাবে।
চোদ্দ
সায়গলরা চলে যাবার পর কোহিনুর বেগমের ওখানে যাবার কথা তার বড় বেশি একটা মনে হয়নি। তেমন প্রয়োজনও বোধ করেনি। কিন্তু কোহিনুর বেগম নিজেই একদিন ডেকে পাঠান জাহেদীকে। এ কথা সে কথার পর জিজ্ঞেস করেন, সায়গলরা নাকি চলে গেলেন?
জাহেদীর রাগ হয়।
বলে, সে কথা আমিও শুনেছি।
ঠিক এ ধরনের একটা নিস্পৃহ জবাব যেন আশা করেননি কোহিনুর বেগম। আশা করেছিলেন তার কিছু বেশি। যেন এই চলে যাওয়ার আগে, নাটকীয় কিছু ঘটেছিল কিনা জানতে চেয়েছিলেন সেটাই। কিন্তু কেমন করে বলবেন সে কথা। সে কথা কাউকে জিজ্ঞেস করা যায় না।
তার মুখ যেন অযাচিত বেদনায় ছায়া-ক্লিষ্ট, চোখের পাতা ভারি। কোনোমতেই সহজ আর সরল হতে পারছেন না। নিজে কাছেই যেন নিজের খুঁতখুঁতে মনটা ধরা পড়ার ভয়।
তবু নিজেকে সামলে নিয়ে একসময় বলেন, যাবার সময় একটু বলে গেলে কী হতো!
বোধহয় আপনি বিব্রত বোধ করবেন, সেজন্যেই –
যেন নিজের মনে মনেই একটা ভীষণ তর্কের বাজি হেরে গিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন কোহিনুর বেগম। জাহেদীর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলেন, আমি বিব্রত বোধ করব কেন। আমার বিব্রত বোধ করার কি আছে?
জবাবে অনেক কিছুই বলা যেত।
কিন্তু তার প্রয়োজন হলো না।
নিজে থেকেই আবার শুরু করেন কোহিনুর বেগম, অমন বড়াই করার কি মানে হয় বলতে পারেন?
কী রকম বড়াই?
মানুষের মন ফেরাবার বড়াই।
পরের কথাগুলো বলতে গিয়ে যেন তাঁর গলা ধরে আসে।
আমি আমার বিশ্বাসের জগৎটাকে নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম। অন্যায় তো কিছু করিনি। ভালো হোক মন্দ হোক, কল্পনার জগৎটাই ছিল আমার একমাত্র সম্বল।
পরম সাহসে তীক্ষèধার হয়ে প্রশ্ন করে জাহেদী, সেটার জন্যে সায়গলের কী দোষ?
না না, দোষ কিছু নেই। সায়গল আমার ভালো চাইত। অনেক অনেক বেশি ভালো। জীবনে একমাত্র সেই আমার ভালোমন্দর খবর নিত। শুধু একমাত্র সে-ই জানত আমার মিথ্যে প্রহসনের জগৎটা ফানুষের মতোই অন্তঃসারশূন্য। ও ছাড়া আমার আর কেউ ছিল না। আমি নিঃস্ব, একা।
কোহিনুর বেগমকে যেন আজ থামানো যাবে না। বহুদিনের সঞ্চিত অভিমানের ক্ষোভ আজ বাঁধনহারা।
বলেই চলেছেন : সায়গলই আমার মনের অত কিছু খবর রাখত। আসলে লোকটা ভ-। ওর অফিসি গাম্ভীর্যটা লোক-দেখানো। আসলে আমার কাছে ও চিরকালই, অশান্ত-হৃদয় এক কোমলপ্রাণ পুরুষ।
সায়গলই একদিন তাঁকে বলেছিলেন, কোহিনুর বেগম এই প্রাচীন দুর্লভ নামটি তোমায় কে দিয়েছিল জানি না। কিন্তু তুমি মূল্যবান একটুকরো পাথরই রয়ে গেলে। পাথর পরশমণি হলো না। তুমি দুর্জয় ইচ্ছের দুর্লঙ্ঘ গিরিচূড়া। পিপাসার পীযূষধারা নও।
কোহিনুর বেগম স্মৃতির রোমন্থন করেন।
একদিন তাঁকে কাছে ডেকে বলেছিলেন সায়গল, কোহিনুর আমার আর কিছু করার নেই। আমি এখন ফুরিয়ে গেছি। তোমাকে ভুলেই গিয়েছিলাম। অন্তত সে চেষ্টাই করেছি। কতদিনই বা তোমার সঙ্গে আমার পরিচয়! মানুষ যে বয়েসে কল্পনার নানা রঙ্গীন সুতোয় আশা-আকাক্সক্ষার জাল বোনে, সে বয়েসে তোমার সান্নিধ্য পেয়েও পাইনি। তুমি হঠাৎ একদিন এসেছ নক্ষত্রচ্যুত এক উল্কাপি-ের মতো। তারপরই আমার সব কিছু যেন এক উত্তাল জোয়ারে হলো আন্দোলিত। জানতাম তোমাকে পাবার স্বপ্ন বাতুলতা। সে কথা মনে করেই পা বাড়াইনি। কিন্তু সে তো শুধু এই ভরসায়, তুমি সুখে ছিলে।
কোহিনুর বেগম প্রশ্ন করেছিলেন, কে বলল আমি সুখে নেই।
সায়গল বলেছিলেন, আমারও সে ধারণাই ছিল। কেমন করে জানি না একদিন হঠাৎ মনে হলো, আমরা সবাই সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য ও শান্তির পাল তুলে বসে আছি। একমাত্র তুমিই ছিন্নপাল তরণীর মতো ভাটার দিকে চলেছ। তখনি মনটা কেমন করে ওঠে।
কোহিনুর বেগম জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনার বন্ধু, মানে আমার স্বামী ইমতিয়াজ আমাকে ছেড়ে আছে বলে আপনার দুঃখ হচ্ছে বুঝি। কিন্তু এ সমস্যা কি আর কারও জীবনে আসে না?
মৃদু হেসে তার জবাবে বলেছিলেন সায়গল, কি জানি। হয়তো আসে, হয়তো আসে না। তবে তাদের কপাল ভালো। তাদের নিয়ে দুর্ভাবনা করার একজন সায়গল নেই।
কোহিনুর বেগমও হেসেই বলেছিলেন, আপনি তো আপনার বন্ধুটিকে খুব চিনতেন। সন্দেহ করেছিলাম কখনও?
না, করিনি।
তাহলে?
সে কথাই ভাবছি।
ভাবছেন আজ বসে কোহিনুর বেগমও। টুকরো টুকরো স্মৃতি ছায়া ফেলে তাঁর মনে।
সায়গলই বায়না ধরেন, চলো একটু বেড়িয়ে আসি।
গাড়িতে বসে তাঁর ডান হাতটা মুঠো করে ধরে বলেছিলেন, জানো এমন কত রাত তোমাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে চেয়েছি।
সঙ্গে সঙ্গে কৌতূহলী প্রশ্ন ছোড়েন কোহিনুর বেগম, কেন? কেন,
কি জানি। কোনো কারণ নেই। যদিও জানি আমি তোমাকে কিছু দিতে পারব না।
নিজেকে সামলে নিয়ে বলেছিলেন কোহিনুর বেগম, তা জানি। তবু আমাদের এমন করে ঘোরাফেরা করতে দেখলে দশজন দশকথা বলবে।
তাও জানি।
আকাশে চাঁদ ছিল না। শহর ছাড়িয়ে অনেক দূর এসে পড়েছে গাড়ি। পিচঢালা রাস্তা শেষ হয়ে এখন কাঁকরের পথ। দূরে উঁচুনিচু পাহাড়ের সারি। ভালো করে দেখা যায় না। জঙ্গলে ঢাকা। সেদিন ভীষণ গরম পড়েছিল। সন্ধে হতেই শান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দিয়ে বইতে শুরু করে ফুরফুরে হাওয়া। আর সেই হাওয়ার স্পর্শে কেমন স্বপ্নময় হয়ে ওঠে সবকিছু। গাঢ় আকাশে একরাশ শুভ্র বকুলের মতো ছড়ানো তারার আলো।
কোহিনুর বেগম বলেছিলেন, একটা কথা বলবেন?
বলো।
কী বলে একে?
কোনটাকে?
এই যে আমার জন্যে আপনার এ আকুলতা। যা অর্থহীন, যা উদ্ভ্রান্ত।
কী জানি। আকাশের তারাটার নাম জানো, পাল্টা জিজ্ঞেস করেছিলেন সায়গল।
নাতো। কেন?
নাম জানো না। তবুও জানো ওটা তারা-ই। ওটা চাঁদ নয়। সূর্য নয়! মেঘ নয়। কুয়াশা নয়। তেমনি –
সায়গলের কথা যেন মাঝপথে প্রতিহত ঝর্ণার মতো থেমে গিয়েছিল।
কোহিনুর বেগমের কৌতূহল মেটে না। জিজ্ঞেস করেন, তেমনি কী – বললেন না।
তেমনি আমার অনুভূতি। এ যাই হোক। ভালো হোক, মন্দ হোক, ছলনা নয়। বঞ্চনা নয়। এ ভালো লাগা। কুশল চাওয়া ও কামনা করা।
কিন্তু সেটা কি আপনার উচিৎ?
উচিৎ অনুচিতের প্রশ্ন থাক। তোমার মতো একটি মেয়ের জীবনে যা ঘটছে তাই কি উচিৎ?
গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন কোহিনুর বেগম, কী জানি।
সায়গল বলেছিলেন, তোমার চেয়ে অনেকবেশি অশান্তি আমার। যে পুরুষ তোমাকে নিবিড়ভাবে ভালোবাসতে পারত, সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘর বাঁধতে পারত, কেবল সেই পারত আমার এই অশান্ত হৃদয়কে চরম শাস্তি দিতে।
সেটা কী রকম, জিজ্ঞেস করেন কোহিনুর বেগম।
আমার চেয়েও যদি সে অনেক, অনেক বেশি ভালোবাসতে পারত তোমাকে, তাহলে সে ঈর্ষাই আমার অসহিষ্ণুতাকে বশে আনতে পারত। কিন্তু তা তো হলো না।
আবার একটু থেমে নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন সায়গল, আচ্ছা কোহিনুর।
বলুন।
তুমি আবার প্রেম করতে পার না?
পারি।
না না। ঠাট্টা নয়।
আমি কি ঠাট্টা করছি। সত্যি কথাই বলছি। তবে এরপর আর প্রেম করব না। বরং একটু পথভ্রষ্ট হব। গুঞ্জন উঠুক। আমি বয়ে যাব। আর তাতে আপনার হিংসে হবে না?
হবে।
তাহলে তাই করব।
যেন মরিয়া হয়েই আরেকবার শুধোন সায়গল, আচ্ছা ইমতিয়াজের কথা বুঝি ভুলে যেতে পার না? ও যদি তোমায় চিরকাল ঠকায়।
ঠকাতে দিন। মুক্তি আমি ওকে দেবো না।
কিন্তু জোর করে মনকে বেঁধে রাখা যায় না কোহিনুর।
জানি। তবু লোকে জানুক, আমাদের বিয়ে-বার্ষিকীটা সত্যি সত্যি কি মর্মান্তিক প্রহসন, জানুক। সেও জানুক। আমি শান্তি না পেলে, ওকেই বা শান্তি দিতে যাব কেন। যতই ভুলে থাকার চেষ্টা করুক, মনের কোথাও কাঁটার মতো একটি স্মৃতি ওকে মথিত করবেই। করুক।
আমি চেষ্টা করব কোহিনুর? বিগলিত হয়ে বলেছিলেন সায়গল।
কী চেষ্টা।
ওকে ফেরাতে?
পারবেন না।
পারলে তুমি খুশি হও?
খুশি-অখুশির প্রশ্ন নয়। ও এখন আমার নিছক সামাজিক প্রয়োজনের ছাড়পত্র। হয়ত আমার জন্যেও ঠিক ততটা নয়, যতটা আর দশজনের জন্যে, সমাজের জন্যে ওকে দরকার।
আমি তাহলে সে চেষ্টাই করব।
এ আপনার অর্থহীন পাগলামী।
না, দেখো এবার আমি শূন্য হাতে ফিরে আসব না।
যদি ফেরাতে না পারেন?
তাহলে তার ফেরার পথটাই বন্ধ করে দিয়ে যাব চিরকালের জন্যে, রহস্য করে বলেছিলেন সায়গল।
কুৎসা রটনা করবেন আমার সম্বন্ধে?
সে কথা জেনে তোমার লাভ?
যেন কোহিনুর বেগমই মোহ ভঙ্গ করেন। বলেন, রাত অনেক হয়েছে, ফিরে চলুন।
চলো।
যেতে যেতে কটাক্ষ করে জিজ্ঞেস করেন কোহিনুর বেগম, বাড়িতে কী বলবে আপনাকে?
কেন?
এই যে রাত করে ফিরলেন। নিশ্চয়ই একটা ঠুনকো অজুহাত দেবেন।
কি জানি ভেবে দেখিনি।
প্রিমরোজ ভিলায় তাকে নাবিয়ে দিতে গিয়ে একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে ছিলেন সায়গল।
কোহিনুর বেগম জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিছু বলবেন?
না, ভাবছি এ নাটকের পরিণতি কি, কোথায়?
সে কথা আমিও ভাবছি, বলে র্ত র্ত করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে পড়েন কোহিনুর বেগম ওপর তলায়।
সত্যিই তো আজ এতদিন পর এসব কথা কেন তাঁর মনে পড়ছে হঠাৎ। এরপর তো সায়গল দেখাও করে এলেন ইমতিয়াজের সঙ্গে। তার ফিরে আসার পথটাও বন্ধ করে এলেন চিরদিনের মতো। তাহলে, তাহলে সে কথাটাই কি বলতে চেয়েছিলেন সায়গল সেদিন প্রকারান্তরে?
কোহিনুর বেগমের ভাবনায় ছেদ পড়ে। এতক্ষণ তন্ময় হয়েছিলেন। ভুলেই গিয়েছিলেন আর কেউ তাঁর সামনে বসে।
জাহেদী বলল, আমার আর এ অফিসে মন টিকছে না। কি জানি, সবকিছু কেমন জট পাকিয়ে গেল। সায়গল বোধহয় আর কোনোদিনই সুস্থ হবেন না। কিছু মনে রাখতে পারেন না আজকাল।
হো হো করে হেসে ওঠেন কোহিনুর বেগম।
হাসলেন যে।
হাসব না। বেঁচে গেল। মনে রাখতে না পারাটাই সুখ। আত্মবিস্মৃতিই সন্তুষ্টি। দেখবেন, সায়গলের এখন থেকে আর কোনো দুঃখ থাকবে না।
তারপর একসময় বলেন, আমিও আর এখানে থাকব না।
কোথায় যাবেন?
তা জানি না। যা ভেবেছিলাম তার তো কিছুই হলো না।
তার মানে?
কোহিনুর বেগম বলেন, তার মানে তাই। এবার নিষ্কৃতি চাই। ভাবছি বাইরে কোথাও গিয়ে কিছুদিন কাটিয়ে আসি।
এ বাড়ি ছেড়ে দেবেন, আতঙ্কিত হয়ে ওঠে জাহেদী।
না না। ছাড়ব কেন। ঘুরে ফিরে আমাকে যে এখানেই আসতে হবে। শুধু কিছুদিনের জন্য একটু স্বস্তি। কিছু শান্তি। ভালোই হবে, কি বলেন?
জাহেদী ভেবেছিল কথাটা জিজ্ঞেস করতে সাহস হবে না। অথবা হয়তো চটে যাবেন কোহিনুর বেগম। তা চটুন। আজ হৃদ্যতার বন্যায় আপ্লুত তাঁর মনের কাছে একটা অনধিকার চর্চা না হয় হলোই।
জিজ্ঞেস করল, সারা জীবন কি এমনি একা একাই কাটাবেন?
কি জানি, একটাই তো জীবন। তাকে নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করা কেন।
জাহেদী ওঠার উপক্রম করে।
কোহিনুর বেগম বলে, দু’মিনিট বসুন। আর বোধহয় শিগগির দেখা হবে না।
তার মানে?
কাল চলে যাচ্ছি।
কোথায়?
আপাতত কোনো শৈলনিবাস। তারপর –
যেন প্রশ্নটার জবাব নিজেই জানেন না। তার কাছেই জিজ্ঞেস করেন কোহিনুর বেগম।
পনেরো
কালের মহাসমুদ্রে একটি যুগ – সে আর কি। অথচ মানুষের জীবনে একটি মুহূর্তই দুর্লভ। আর একটি যুগ? সে তো অগাধ বিপুল, নিরবয়ব। কিছু স্মৃতির মুকুল ঝরে যায়। কিছু থাকে। যা থাকে, তার জ্বালাই দুর্বিষহ। কিন্তু দুর্বিষহ হলেও, সে জ্বালার বিষ একদিন ক্ষয়ে ক্ষয়ে হয় নিস্তেজ।
তবু কোনো প্রিয়-বাসনা, কোনো অতৃপ্ত সাধের উত্তাপ যেন একেবারে মুছে যায় না।
ছায়া ছায়া স্বপ্নের মতো সেসব দিন তো কবেই গেছে। তবু আজ কেন মনে পড়ছে সে কথা জাহেদীর?
কবে সে এক ভীরু সুপারিশপত্র নিয়ে ঢুকেছিল ম্যাকব্রাইডে। তারপর সেখান থেকে এক সওদাগরী অফিসে। সে চাকরি ছেড়ে এখন এক ব্যাঙ্কে। এমন কিছু অসাধ্য সাধন করতে হয়নি। ছক বাঁধা জীবনে দুর্জ্ঞেয় ভাগ্যবিধাতা দাবার ঘুঁটির মতো যেখানে এনে তাকে মাৎ করেছেন সেখানেই আছে সে। অবশ্য সবার বেলায় এমন হয় না। হয়তো কাওয়াসজীর বেলায় হয়নি – এখনও সে চাকরিই করছে। রিজভি হয়তো রিটায়ার করেছে। ডলি ক্রুজ? নিশ্চয়ই বিয়ে থা করে সংসারী হয়েছে। কী জানি আজ তাদের কারও কারও চেহারাই ভালো করে মনে পড়ে না। ছায়া মিছিলের মতো তারা শুধু মায়ার সুরভি ছড়ায়।
অফিসের গাড়ি এসে তাকে তুলে নেবার কথা ছিল।
‘কাফে ডি ল্যুক্স’ – দুপুরে খাবার ভদ্রগোছের এই একমাত্র রেস্তোরাঁ আবিষ্কার করেছে জাহেদী। অফিস থেকে একটু দূরে। গাড়ি এসে দিয়ে যায়, নিয়ে যায়। অসুবিধে হয় না।
হাত-ঘড়িটা একবার দেখে জাহেদী, গাড়ি আজ আটকা পড়েছে কোথাও নিশ্চয়ই। সচরাচর এমন হয় না। আর হয় না বলেই এভাবে লাঞ্চের পর হাত পা গুটিয়ে স্মৃতির রোমন্থনের সুযোগও হয় না।
কাচের জানালার বাইরে ব্যস্তবাগিশ জগৎটা যেন অনেক, অনেকদিন দেখেনি চোখ মেলে। হন্ হন্ করে ছুটে চলেছে নারী পুরুষের ভিড়। সময় নেই তাদের। লালবাতির আগেই তারা রাস্তা পেরুতে চায়। নীলবাতির আগেই তারা গাড়ি ছোটায়। ল্যাম্প পোস্টে হেলান দিয়ে একটা লোক বেহালা বাজায়। রোজই দেখতে পায় তাকে। একমাত্র তারই বোধহয় তাড়াহুড়ো নেই। হঠাৎ কিছু পাবার তাড়না নেই। হঠাৎ কিছু হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। লোকটা বোধহয় অন্ধ।
সিগ্রেট ধরিয়ে এক কাপ তৃপ্তির চা খেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে জাহেদী। এখনি তাকে ছুটতে হবে আবার এক ক্লায়েন্টের কাছে।
কে যেন তাকে সেলাম করে।
হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসা তাই অফিসে শিক্ষানবিশ জুনিয়র এ্যাসিস্ট্যান্ট।
বলে, স্যার গাড়িটা স্টার্ট নিচ্ছে না। সে খবর দিতে এলাম।
জাহেদী সে কথার জবাব না দিয়ে বলে, যে রিটার্নটা তৈরি করতে দিয়েছিলাম শেষ করেছ?
আমতা আমতা করে ছেলেটি, না স্যার। কাল হয়ে যাবে।
জাহেদী বলে, কাল হয়ে যাবে। ছোটখাট একটা কাজ করতেই ঘেমে তোমরা অস্থির। অথচ আমাদের সময় এমন ছিল না। ম্যাকব্রাইড ছেড়েছি একযুগ তবু সায়গলের মতো –
বোধহয় উচ্ছ্বাসের বশেই বলে যাচ্ছিল। এবার থামল।
তাই তো, কাকে সে সায়গলের কথা বলছে।
বাইশ বছরের এক তরুণ চাকুরেকে। সে কী বুঝবে। কী সাধ্য তার? নিছকই উলুবনে মুক্তো ছড়ানো।
আজ এতদিন পর তার হঠাৎ কেন মনে পড়ে সায়গলের কথা। কিন্তু সায়গল তো শুধু কোনো এক কোম্পানির ভূতপূর্ব বড় চাকুরে নয়। সায়গল তার জীবনের স্মরণীয় স্তম্ভ। তাকে ভুলবে কেমন করে।
কিন্তু অত্যাশ্চর্য ঘটনাটি ঘটল সেদিনই।
অফিসে গিয়ে শুনতে পায় কে তার দর্শনপ্রার্থী। এসময় জাহেদীর সঙ্গে দেখা হবার কথা নয়। সেজন্যই বোধহয় সামান্য একটু বচসার সূত্রপাত।
কাচের দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসে জাহেদী নিজেই।
তারপর অভিভূতো মতো বলে, আপনি!
সত্যি এ কেমন করে হয়। মানুষের কল্পনার স্বপ্নসাধ কি ভাগ্যনিয়ন্তা এমনি নিষ্ঠুর রূঢ়তায় ভেঙ্গে খানখান করে দেন। তার সামনে যে দাঁড়িয়ে সে যে ছিন্নমূল অতীতের এক অসহ্য বেদনা।
পরনে ছেঁড়া শার্ট আর পাতলুন। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি। একজোড়া চশমা, তাও সুতো দিয়ে জড়ানো। এই সে সায়গল, যার দিকে তাকিয়ে থেকে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হতো। দেহের বয়েসের সঙ্গে যেন জুটেছে মনের বয়েস। দুটো মিলে সায়গল এক বিধ্বস্ত, অশোভন, কদাকার এক স্নেহ ও প্রীতির আকাক্সক্ষণীয় রূপ।
জাহেদী বলল, আপনি ভেতরে আসুন। বসুন।
অফিসের এক রাজ্যি লোক দাঁড়িয়ে দেখছিল। যেন এই অপ্রীতিকর নাটকের একটি অর্থহীন দৃশ্যে তারা স্তম্ভিত।
সায়গলকে কী কথা জিজ্ঞেস করবে? কেমন করে হবে তার অবতারণা। তাঁকে আঘাত দেওয়া চলবে না। অবমাননা করা চলবে না। বাড়াবাড়ি করে তাঁর ব্যক্তিত্বকে মর্মাহত করা যাবে না।
জাহেদী বলল, পাখাটা খুলে দেবো?
সে কথার জবাব না দিয়ে সায়গল বলেন, দেখো তো, আমার কি খুব জ্বর।
সেই শীর্ণ, ভেজা হাতখানা তুলে নিয়ে জাহেদী অনুভব করে, এক অসহ্য উত্তাপ যেন তার হৃদয়ের জ্বালাটাই ধরিয়ে দেয়।
জাহেদী বলে, তাই তো। ডাক্তার ডাকব?
সায়গল মাথা নাড়েন, না না।
তারপর বলে, কেমন করে খুঁজে পেলেন এ জায়গা?
প্রাচীন বাহাদুরির বিস্মিত দম্ভে এক মুহূর্ত উদ্ভাসিত তাঁর চোখমুখ।
সায়গল বলেন, আমি তোমার চেয়েও বড় বড় ক্লায়েন্টদের খুঁজে বার করেছি জাহেদী। সে তুলনায় এ কাজ কিছু নয়।
টেলিফোন বেজে ওঠে। ওটা তুলে নেয় বটে জাহেদী। তবে আলাপের বিস্তার লঘু করে। অফিসের ফাইলে যারা সই নিতে এসেছিল নিরস্ত করে তাদেরও।
সে আজ এতদিন পর তার পুরনো মধুর জীবনের স্বাদ পেয়েছে। সে স্বাদের তৃপ্তি পুরোপুরিই নেবে।
এক মুহূর্ত কথা বলে না জাহেদী। কথা বলেন না সায়গল।
তাঁরও কি আজ এতদিন পরে এই স্নিগ্ধ ঠান্ডা ঘরে বসে হঠাৎ মনে হয়েছে এত সহানুভূতি, এত ভালোবাসা যেন এক যুগ পাননি।
নিজেই এক কাপ কফি এগিয়ে দিয়ে বলে জাহেদী, নিন।
মিসেস সায়গল কোথায়?
মূঢ়ের মতো একটা প্রশ্ন হঠাৎ যেন হকচকিয়ে দেয় সায়গলকে। পেয়ালাটা প্লেটে ঝন্ ঝন্ করে কেঁপে ওঠে, এক নির্বোধ কান্নার মতো।
সায়গল ওখানা নাবিয়ে রেখে বলেন, শোনোনি –
যেন এরপর না বললেও চলে।
তবু জবাব দেয় জাহেদী, না শুনিনি।
জানালার দিকে দৃষ্টি মেলে বলতে থাকেন সায়গল, কি জানি ইশরাত জাহান বলল, তার শরীর ভালো যাচ্ছে না। তোমার মতোই শুধোলাম, ডাক্তার ডাকব?
বলল, ডাক্তার ডাকতে হবে কেন, আমি কি মরতে বসেছি। জানো তো তার কথার ধরনটাই ছিল এরকম।
তারপর?
তারপর, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন সায়গল, তার মিথ্যে গর্বটাই সত্যি হলো। পরদিন সকালে তোমাদের মিসেস সায়গল আর চোখ খোলেননি।
সায়গল ওঠার উপক্রম করেন। বলেন, ক’টা বাজে?
সাড়ে পাঁচটা।
তাহলে আমাকে উঠতে হয়।
সে কি, কোথায় যাবেন?
আমি তো এখানে থাকি না।
তবে এসেছিলেন কেন?
সায়গল যেন সে কথার কোনো সদুত্তর দিতে পারেন না।
বলেন, এসেছিলাম, এসেছিলাম কেন তাও জানিনে জাহেদী। বোধহয় ভেবেছিলাম একবার দেখা করব। আজ বিকেলে পশ্চিমের একটা প্লেন ছাড়ছে তোমাদের এখান থেকে, শুনেছি সে প্লেনে একজন যাত্রীর যাওয়ার কথা।
কার?
হ্যাঁ। জাহেদীর সন্দেহটাই ঠিক। সায়গল আজ সত্যি সত্যি কোহিনুর বেগমকেই দেখতে এসেছিলেন।
সায়গলের কাছেই শোনা : এবার লম্বা পাড়ি দেবেন কোহিনুর বেগম। তাঁর কোনো আত্মীয়ের ওখানে উঠবেন। ফিরবেন কি-না জানেন না। কিন্তু সে খবর পেলেন কেমন করে সায়গল। নাকি কোহিনুর বেগম নিজে থেকেই লিখে জানিয়েছেন সে কথা! আর খবর পেয়েই হাসপাতালের বেড থেকে ছুটে এসেছেন সায়গল।
জাহেদী জিজ্ঞেস করে, দেখা করতে যাননি।
না।
এবার যেন কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সায়গল, আমাকে এ অবস্থায় যেতে বলো। কি বলতেন কোহিনুর বেগম আমাকে দেখলে।
কোনো কথাই আর হয় না। সন্ধে হয়ে আসে।
বোধহয় সারা অফিসটাই ততক্ষণে ফাঁকা।
জাহেদী জিজ্ঞেস করে, আবার ট্রেনে করে ফিরে যাবেন অতদূর?
হ্যাঁ, ফিরে আবার ওই হাসপাতালে যাব।
তার চেয়ে এখানে থাকলে ভালো হতো না?
না, না। আমাকে সাধাসাধি করো না। যেতেই হবে আমাকে কিষাণপুর হাসপাতালের পঁয়ত্রিশ নম্বর বেডে।
এরপর একটু থেমে বলেন, আমাকে একটু স্টেশনে নাবিয়ে দেবে?
জাহেদী তাঁকে সঙ্গে করে বেরিয়ে পড়ে।
একটা ভিড়ের কামরায় চেপে বসেন সায়গল। তারপর গলা বাড়িয়ে বলেন, শুধু তুমি আছ জেনেই এলাম। আমার সব কথাই তুমি জানো।
তাঁর চোখদুটো সজল হয়ে আসে। তখনও জাহেদীর হাতখানা তাঁর হাতে মুঠো করে ধরা।
জাহেদী বলে, এখনও সময় আছে নেবে পড়–ন।
সায়গল ম্লান হাসি হেসে বলেন, সময় নেই। সত্যি সত্যি নেই। শুধু এটুকু কামনা করো ওই হাসপাতালের বেডে গিয়ে যেন পৌঁছুতে পারি। আর, আর সে সময় যদি না হয়, এ দেখাই শেষ। ঘণ্টাধ্বনি বাজিয়ে কলমুখরিত ট্রেনখানা ছেড়ে দিলো ঠিক তখনি।
