(১৯৬৮)
ভরা দুপুর। শহরের অন্তত এ রাস্তায় লোকচলাচল বিরল। দু-একটা গাড়ি দ্রুত বেরিয়ে যায়। কখনো-বা একখানা স্কুটার।
রাস্তার ধারঘেঁষে ছোটমতো বাড়ি। সামনে পাকা মেঝের বারান্দা। সিঁড়ির দিক খোলা, তা নইলে নিচু রেলিংয়ে ঘেরা। সিঁড়ি দিয়ে নাবতেই সবুজ লন। এলোপাতাড়ি কিছু ফুলগাছ ও পাতাবাহার লাগানো তাতে।
বাড়ির বাঁ-ধারে কলতলা। কলতলার জন্যে বাঁধানো জায়গার একখানে গ্রিলের জালি দিয়ে পানি বেরুবার পথ করে দেওয়া। কল ভালো করে বন্ধ হয় না। টুপ্ টুপ্ শব্দ করে।
বাড়ির এদিকটা কিছু অগোছালোও। কলতলার পাশেই একটা বালতি। দড়ির ওপর টাঙ্গানো কিছু কাপড় শুকোতে দেওয়া। একপাশে কিছু ইটের গাদা। বিজলি-তারের ওপর একটা কাক বসেছে। দুপুরের খাঁ-খাঁ রোদে বোধহয় তারও ভালো লাগছে না। কাক উড়ে গেল।
একটা গাড়ির শব্দ। বাড়ির সামনে দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল। ভেতর থেকে ছিটকিনি খোলার শব্দ।
পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে আসে এক ভদ্রমহিলা। বয়েস তিরিশের কাছাকাছি। লাবণ্যের চেয়ে তার স্থির শান্ত দৃষ্টিই যেন বেশি মুগ্ধ করে। নাম হাসিনা, এ নাটকের মেজআপা। হাসিনা সবে স্নান করে এসেছে। চুলগুলো বাঁ-কাঁধের ওপর ফেলা। চিরুনি বুলোতে থাকে সে অজান্তেই। গাড়ির শব্দে পর্দা ঠেলে ঘাড়খানা কাৎ করে দেখে। না, যাকে সে আশা করছিল সে নয়। গাড়ি চলে যায়।
কাকটা বসেছে কলতলায়। ছিটিয়ে দেওয়া ভাত খুঁটছে মুরগি। কাকটা ভাগ বসাতে চায়। একটা মেয়ে এসে তাড়িয়ে দেয় কাকটা। মেয়েটির বয়েস ছয় বছর। নাম মিলি। সে ইটের গাদার দিকে এগিয়ে যায়। সেগুলো তুলে নিয়ে মনমতো সাজাতে থাকে।
স্কুটারের শব্দ। আবার দরজা খুলে যায়। উৎসুক দৃষ্টি এবার বারান্দার কাছাকাছি এসে গলা বাড়িয়ে দেখে। না কেউ আসেনি। এবার চুল বাঁধা হয়েছে। খোঁপায় হাত রেখে অন্য হাতে কাঁটা বসাতে দেখা যায়। একটা কাঁটা তখনো দাঁত দিয়ে চাপা।
হাসিনা আবার ফিরে যায়।
এবার স্কুটারের শব্দ। বেশ যেন ঘনিয়ে আসছে। তারপর পোঁ আওয়াজ করে ওটা থেমে যায়।
ভেতরের দৃশ্য। দরজা খুলে যায়। মামুলি সাজানো। নিচুমতো সোফা। সেন্টার টেবিল। একপাশে টেবিল। তাতে কিছু বইপত্র ছড়ানো। একটা টাইমপিস। অ্যাশট্রে, ফাউন্টেন পেনের কালি। একটা টেবিল ল্যাম্প। আরেকদিকে দেয়ালঘেঁষে শোকেস।
ভেতরটা ছোটবড় পুতুল আর খেলনায় সাজানো। ওপরে একটা ট্রানজিস্টর রেডিও। কিছু প্রসাধন দ্রব্য ও একপাশে ফুলদানি।
দরজা খুলতেই যে মেয়েটি ঢুকল, হাসিনার চাইতে বয়েসে ছোট। বাইশ থেকে চব্বিশ। হাসিখুশি, চঞ্চল, চটপটে স্বভাবের। চোখজোড়া যেন কোথাও একমুহূর্ত স্থির হবার উপায় নেই। তার চেহারায়, চালচলনে কেমন একটা স্বতঃস্ফূর্ত স্বাচ্ছন্দ্য। জীবনের কোনো সমস্যাই যেন স্পর্শ করেনি তাকে। নাটকে এ মেয়েটির নাম ডালিয়া। সদ্য বিয়ে হয়েছে। কাজেই পোশাক-আশাকে একটু সাজ-সজ্জার আড়ম্বর।
হাসিনা : (ঘড়ির দিকে দেখল। ঘড়িতে দুটো বেজে সাত মিনিটের কাছাকাছি।) বাব্বা, এলি তাহলে। ভেবেছিলাম বুঝি বাজারটাই মাথায় করে নিয়ে এলি।
ডালিয়া : (আধো হেসে কেমন নকল বিরক্তির সুরে) আমি না আপা। অমন লোককে নিয়ে কেউ বাজারে যায়। ঘুরে বেড়ানোই সার। তাও কী কম কথা শুনিয়েছে।
হাসিনা ছড়ানো প্যাকেটগুলো খুলে খুলে দেখছে। কোনোটায় শাড়ি, কোনোটায় ছিটকাপড়, কোনোটায় মাথার কাঁটা, চিরুনি, রঙিন সুতো, টিপ বুতাম।
হাসিনা : তা ওকে কোথায় ফেলে এলি?
ডালিয়া : আমি কী ফেলে আসব। আমাকেই উলটো ফেলে চলে গেল। বলল, কার সঙ্গে নাকি দেখা করার কথা। বলল তো এখুনি আসবে, কী জানি।
ডালিয়া শাড়ির আঁচলে কপাল মুছে নেয়।
হাসিনা : একদম ঘেমে গেছিস দেখছি।
পাখা খুলে দিলো।
ডালিয়া : আসলে তোর জন্যই আমাকে কথা শুনতে হলো মেজআপা। শাড়িটা কাজ করাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। খুঁজেই পেলাম না দোকান।
হাসিনা : কেন, তোকে তো লিখে দিয়েছিলাম।
ডালিয়া : (ভ্যানিটি ব্যাগে খোঁজা শুরু করে। আরো কিছু কাগজ বেরিয়ে আসে।) তা তো দিয়েছিলি। কোথায় গেছে ছাই, কী জানি। (অন্য আরেকটা কাগজে চোখ পড়ল) সেরেছে! উলের কাঁটা আনা হয়নি যে।
হাসিনা : তোর তো উলের কাঁটা ছিল।
ডালিয়া : আমার জন্যে থোড়াই, তুমিও যেমন। দেখ না একগাদা লিস্টি।
আবার আরেকটা কাগজ দেখাল।
না রে মেজআপা, আমাকে আবার ছুটতে হবে। (লিস্টিটা পড়ল, হাসিনা ঝুঁকে দেখে) হালকামতো, গোলাপি কিংবা ফিকে সবুজ – দুইগজ। জর্জেট। বেশি দাম যেন না হয়।
হাসিনা : (সোজা হয়ে বসে) তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে। এক রাজ্যি লোকের দায়। দুদিন বেড়াতে এসেছিস। একটু বস গপ্প করি, তা নয় –
ডালিয়া : না নিয়ে গেলে আমাকে আস্ত রাখবে ভেবেছিস। (হঠাৎ যেন কী মনে হয়) তুই তো চিনিস!
হাসিনা : কে রে?
ডালিয়া : মওদুদের বউ।
হাসিনা : (চোখ পাকিয়ে) রুবী!
ডালিয়া : হ্যাঁ হ্যাঁ। (ভঙ্গি করে দেখায়) কালো মোটামতো। যা ফ্যাশন করে, দেখলে গা জ্বলে যায়।
ডালিয়ার স্বামী ফারুকের প্রবেশ। লম্বা সুদর্শন যুবক। চোখে চশমা। কেমন যেন একটু স্বভাবগম্ভীর।
(সেদিকে তাকিয়ে) হলো দেখা?
ফারুক : কী করে হবে। তোমাদের সঙ্গে বাজারে বেরুলে কী আর –
ডালিয়া : যাক যাক, আর কথা শোনাতে হবে না। বছরে একদিন একটু সঙ্গে করে নিয়ে যেন মাথা কিনে ফেলেছেন। সারা বছর আপিস নিয়েই থাক। কি যে মাথামু- কর।
হাসিনা : তুই থাম না। (ফারুক কাগজে হাওয়া করতে থাকে) আপনি বরং হাত-মুখটা ধুয়ে নিন।
(উঠে গিয়ে তোয়ালে এনে দেয়) সাবান দেব?
ফারুক : না না। ঠিক আছে।
(যেতে যেতে)
ভালো কথা, আজকের বিকেলের টিকিট করলাম।
হাসিনা : সে কী?
ফারুক : না মেজআপা, সুবিধে হলো না। সকালের ট্রেনে বড় হ্যাঙ্গামা। তাছাড়া ছুটিও ফুরিয়ে এলো।
হাসিনা : তাহলে (ডালিয়াকে লক্ষ করে) তুইও তাড়াতাড়ি কর। আবার নাকি বাজারে যেতে হবে।
ডালিয়া : ঠিক বলেছিস। তুইও চল না।
হাসিনা : না রে, আমি গেলে এদিক সামলাবে কে?
মুখ মুছতে মুছতে ফারুকের প্রবেশ।
ফারুক : আবার বেরুচ্ছ নাকি।
ডালিয়া : হ্যাঁ, মানে যাব আর আসব। একটু নিয়ে যাবে?
ফারুক : (নিরাসক্ত হয়ে) (প্রস্থান) বেশ।
ডালিয়ার হাত থেকে একটা প্যাকেট পছে যায়। ওখানা তুলে নেয়। হাসিনাকে যেতে দেখে ডাকল।
ডালিয়া : মেজআপা কানের এই সেটটা কিনলাম।
হাসিনা : হুঁ। ভালোই তো। তোর ওই সোনা ভাঙ্গিয়ে হাতের দুগাছা চুড়ি বানিয়ে নিলেই পারতি।
ডালিয়া : ডিজাইন পেলাম না। (হঠাৎ কী মনে হওয়ায়) মেজআপা সেবার যে দেখলাম ওই বালা কোথায়। ডিজাইনটা আমার ভীষণ পছন্দ। দেখাও না।
হাসিনা : মাথা খারাপ! এখন অর্ডার দিয়ে এখন নিবি নাকি।
ডালিয়া : দেখে নিই। ওখানেই না হয় অর্ডার দেব। তেমন ভালো তো না, পারে তবু –
হাসিনা : সে কি সোজা কাজ। ট্রাঙ্ক নামাও, বাক্স নামাও।
ডালিয়া : আপামণি (জড়িয়ে ধরে)
হাসিনা : আচ্ছা, আচ্ছা। বাপরে বাপ চলো।
হাসিনার স্বামী কবীরের প্রবেশ। বয়েস চল্লিশের কাছাকাছি। রাশভারী, গম্ভীর। গোঁফ আছে। আধাপাকা চুল চোখে পড়ে। মোটাসোটা।
কবীর : (কাউকে দেখতে না পেয়ে) কই?
হাসিনা : (ভেতর থেকে) আসছি। চারভরি, ছ’ভরি যা খুশি দিতে পারিস। হালকা করে বানালে চার ভরিতেও চলে Ñ
কবীর : (বসল। ছড়ানো জিনিসপত্র দেখল। একটা-দুটো হাতে নিয়ে আবার রেখে দিলো) কই এসো, এসো শিগগির, সময় নেই।
(নেপথ্যে।)
হাসিনা : তুই দেখ আমি আসছি।
(বাইরে এলো) কী হলো?
কবীর : তোমাকে বললাম, চেকবই দিতে। দিলে জমাবই। এদিকে আজ ভাড়া না দিলেই চলছে না।
হাসিনা সেগুলো নিয়ে আসে।
ডালিয়া : (বেরিয়ে আসে। ভ্যানিটি ব্যাগের ডালা বন্ধ করতে দেখা যায়।) কোথায় যাচ্ছ দুলাভাই।
কবীর : ব্যাংকে।
ডালিয়া : সঙ্গে গাড়ি আছে?
কবীর : হ্যাঁ।
ডালিয়া : তাহলে দাও না আমাদের একটু ছেড়ে। কই এসো, শুনছ।
ফারুকের প্রবেশ। তাকে পারিপাটি দেখায়।
ফারুক : আবার এক্ষুনি?
ডালিয়া : বিকেলে আর সময় হবে কি? চলো চলো। আপা চলি। যাব আর আসব।
প্রথমে কবীর, পরে ফারুক ও তার পেছনে পেছনে ভ্যানিটি ব্যাগের ডালা বন্ধ করতে করতে ডালিয়ার প্রস্থান। গাড়ি স্টার্ট করার ও চলে যাওয়ার শব্দ।
Music and dissolve
দ্বিতীয় পর্ব
একই দৃশ্য। ঘরের ভেতর। পাশের ঘর থেকে সেজেগুজে বেরুতে দেখা যায় কবীরকে। শো-কেসের কাছে এসে কী যেন খুঁজতে দেখা যায়। হাসিনা সোফার ওপর প্রায় উপুড় হয়ে চুল খুলে বই পড়ছে।
কবীর : চিরুনিটা কই রাখলাম?
হাসিনা : (চোখ না তুলেই) ওখানেই তো ছিল। দেখ না।
কবীর চিরুনিটা খুঁজে পায়। ওটা পরিষ্কার করতে থাকে।
কবীর : তা তুমিও চলো। বসে কেন।
হাসিনা : (বইটা ভাঁজ করে হাই তুলে সোজা হয়ে বসে) কই যাব আবার!
কবীর : বাঃ, বললাম না, আজ এতদিন পর শওকতের সঙ্গে দেখা। (চিরুনিটা ব্যবহার না করে, রেখে দিয়ে কাছে এসে বসে) ওই যে ব্যাংকে চেক ভাঙাতে গিয়েছিলাম। শওকৎ না-হলে রক্ষে ছিল? আমি কি জানি ব্যাটা হচ্ছে এখন ব্যাংকের ম্যানেজার।
হাসিনা : সেখানেই যাচ্ছ নাকি?
কবীর : হ্যাঁ মানে, এতদিন পরে দেখা। চা খেতে ডাকল নিজে থেকে।
হাসিনা : কিন্তু আজ তো আবার ডালিয়ারা চলল।
কবীর : তা ওরা তো বিকেলের ট্রেনে যাচ্ছে। অসুবিধে কী। ওদের বিদেয় দিয়েই বেরুব না হয়।
হাসিনা : (প্রস্তাবে আপত্তি নেই। তবু নকল ঝামেলার ভান) তা না হয় যাব। এদিকে সাত-সতেরো ঝামেলা। যাই দেখি।
হাসিনা প্রস্থানের উদ্যোগ –
কবীর : (এবার চিরুনি হাতে নিয়ে চুল পাট করে নেয়) মিলি কই?
হাসিনা : কী জানি খেলছে আর কী। তোমার মেয়ে খেলা ছাড়া থাকবে। কই একটু দুপুরে ঘুমোবে, তা না। যতসব ছাইপাশ খেলা।
প্রস্থান।
কবীর : (সিগ্রেটের প্যাকেট থেকে সিগ্রেট বের করে। দেশলাই খুঁজে পাওয়া যায় না। সিগ্রেট খুলে চেপে ধরে টেবিলের কাছে দেশলাই খুঁজতে যায়) দেশলাইটা কই গেল আবার?
হাসিনা : (নেপথ্যে) কী বললে?
কবীর : না না, তোমাকে না। তাড়াতাড়ি করো। ওরাও এসে পড়বে আবার হুট করে।
হাসিনা : (আগমন) যাচ্ছি।
দরজায় হেলান দিয়ে চুলের গোছা পাকাতে থাকে দুহাতে। কেমন একটু সলজ্জ ভঙ্গি। (কবীর দেশলাই খুঁজে পায়। অগ্নি সংযোগ করে) আমার ভীষণ লজ্জা করে। তোমার বন্ধুর বউটি না জানি আবার কেমন সাজগোজ করে।
কবীর : (এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে) তুমি সাজলে পার।
কবীর খবরের কাগজটা মেলে ধরে আবার।
হাসিনা : সাজি না বটে। তবে সাজলে খুব খারাপ দেখাই না বুঝেছ।
কবীরের প্রতিক্রিয়া জানতে উৎসুক যেন। কিন্তু সাড়া না পেয়ে আবার ভেতরের কামরায় চলে যায়। কবীর শুধু চোখ তুলে তাকায়, তারপর কাগজে মন দেয় আবার।
হাসিনা ব্যস্ত হয়ে ছুটে আসে। টেবিলের কাগজপত্র খাঁটাঘাঁটি করে, দেরাজ খোলে। ওয়্যারড্রবের ডালা খুলতে যায়।
কবীর : কী?
হাসিনা : মানে, এই ইয়ে Ñ ইয়ে জোড়া পাচ্ছি না।
কবীর : ইয়ে মানে?
হাসিনা : রুলি জোড়া।
কবীর : (উঠে দাঁড়ায়) বলো কী?
হাসিনা : (প্রস্তরমূর্তির মতো পাশে কবীরকে ঝাঁকুনি নিয়ে বলে) হ্যাঁ, কী করি বলো তো। আমার কান্না পাচ্ছে।
কবীরকে কেমন চিন্তগ্রস্ত দেখায়। নিঃশব্দে পেছন ঘুরে দাঁড়ায়। সিগ্রেটে একটা টান দেয়, তারপর মৃদু পদক্ষেপে পায়চারি করতে থাকে।
কবীর : দেখ আছে কোথাও।
হাসিনা : (উৎকণ্ঠিত) সব তো তন্নতন্ন করে দেখলাম।
কবীর : তাহলে যাবে কোথায়।
(ঈষড়ংব ঁঢ়) কধনরৎ ্ ঐধংরহধ
কেউ এসেছিল?
হাসিনা : না তো।
কবীর : চমৎকার।
হাসিনা : ডিজাইনটা পছন্দ বলে ডালিয়া দেখছিল Ñ
কবীর : তারপর?
হাসিনা : তারপর তো তোমার ডাকাডাকি। মিলির চেঁচামেচি।
কবীর : (কবীরের পদচারণা দ্রুত। মনে হয় সেও উত্তেজিত খানিকটা…) কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না?
হাসিনা : কোথাও না।
কবীর : হুঁ। (একটু হেসে আবার) ডালিয়াকে জিজ্ঞেস করলে পারতে।
হাসিনা : তার আর ফুরসত পেলাম কই। ঝড়ের মতো তোমার সঙ্গে বেরিয়ে গেল না Ñ
হাসিনা শো-কেসের ওপর এক হাত রেখে ভর করে দাঁড়ায়। কবীর সোফায় ফিরে যায়। আবার কাগজখানা তুলে ধরে।
কবীর : অন্যায় কথা। এভাবে দিনদুপুরে ডাকাতি। আমার মনে হয় Ñ
হাসিনা : (যেন একটু ভরসা পায়) : কি, দেখেছ কোথাও?
কবীর : না না, সে কথা নয়।
কাগজের পৃষ্ঠার পরপর দুটি খবর তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
একটি : মদনপুরে দুঃসাহসিক ডাকাতি,
এক ব্যক্তি নিহত;
অন্যটি : চাঁদপুরের চুরি।
আজকাল ভীষণ চুরি হচ্ছে।
হাসিনা : হ্যাঁ? (প্রশ্নবোধক অর্থে হ্যাঁ)
কবীর : (কাগজ থেকে পড়ে শোনায়) দেখ না চাঁদপুরে ভদ্রবেশী এক চোর সিঁদ কেটে টাকা-পয়সা, অলঙ্কার নিয়ে উধাও। (কাগজটা ঠেলে দেয়। দেশলাই পড়ে যাওয়ায় ওখানা আবার আস্তে সিগ্রেটের বাক্সের ওপর রাখল।)
আজকাল কে যে কী, কিচ্ছু বোঝা যায় না।
হাসিনা : তার মানে, কার কথা বলছ?
কবীর : (চশমার কাচ পরিষ্কার করতে করতে) : না না, কারো কথা বলছি না।
উরংংড়ষাব ্ হবীঃ ংপবহব
তৃতীয় পাঠ
একই দৃশ্য। ডালিয়া আরো জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে দরজা ঠেলে ঢোকে।
ডালিয়া : মেজআপা।
হাসিনা : এলি?
ডালিয়া : দাও, দাও তো সুটকেসখানা। গুছিয়ে ফেলি।
(হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে) ও বাব্বা : সময়ও তো নেই।
হাসিনা : আজ যে খুব ঘন ঘন শপিং হচ্ছে। কী কিনলি আবার।
ডালিয়া : আর বলো না। মাথামু-ু সব। দশজনের দশরকম ফরমায়েশ Ñ
হাসিনা : (প্যাকেট দেখিয়ে) এগুলো কার?
ডালিয়া : আমার। দুটো শাড়ি নিয়ে নিলাম। ঘরে পরার মতো।
হাসিনা : দুহাতে টাকা ওড়াচ্ছিস, না।
ডালিয়া : আমার টাকা থোড়াই। পেয়ে গেলাম একখান থেকে।
হাসিনা : (একটু উৎকণ্ঠিত) কোত্থেকে?
ডালিয়া : আমি কী জানি। ওকেই জিজ্ঞেস করো।
হাসিনা : শওকৎ কোথায়?
ডালিয়া : আর বলো না। একটা না একটা কাজ থাকবেই। এচঙ-তে নাকি কী চিঠি পাঠাতে হবে।
হাসিনা : ভালো কথা, আমার রুলিগুলো দেখেছিস?
ডালিয়া : না তো। আমি তো তোমাকেই দিয়ে দিলাম।
হাসিনা : তাহলে তো ঘরেই থাকা উচিত ছিল।
ডালিয়া : বেশ হয়েছে। একটু শিক্ষা হোক। নিজের জিনিস নিজে গুছিয়ে রাখতে পারো না।
হাসিনা : (একটু আহত ও একটু রাগ) রাখলেইবা কী ভরসা।
ডালিয়া : তার মানে?
হাসিনা : না কিছু না। দেখিসনি তাহলে?
ডালিয়া : না। (সুটকেস দেখিয়ে) তুমি এগুলো ভরো। বড্ড নোংরা নোংরা লাগছে। বাথরুম থেকে আসি।
কবীরের প্রবেশ। কবীর হাসিনার মুখের দিকে তাকায়। কোনো কথা হয় না। কিছুক্ষণ পর Ñ
কবীর : জিজ্ঞেস করেছিলে?
হাসিনা : কাকে কী জিজ্ঞেস করেছিলাম?
কবীর : আহা, চটে যাচ্ছ কেন? মানে ডালিয়া দেখেছে?
হাসিনা : দেখেনি বলল।
কবীর : হুঁ। জানতাম।
এ ধরনের জবাবে যেন হাসিনা আতঙ্কিত। হঠাৎ সুটকেসের ডালাটা দপ করে বন্ধ করতে গিয়ে নিজের আঙুলেই ব্যথা পায়। তারপর তাকিয়ে থাকে কবীরের দিকে অভিমানহত দৃষ্টিতে।
ডালিয়া কই?
হাসিনা : (সুটকেস ছেড়ে দিয়ে জানালার গ্রিলে শক্ত করে ধরে) বাথরুমে।
কবীর ভেতরের কামরার দরজাটা আস্তে করে ভেজিয়ে দেয়। তারপর অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে একবার ডালিয়ার ফেলে রাখা ভ্যানিটি ব্যাগ আর আরেকবার হাসিনার দিকে তাকায়।
কবীর : দেখো না।
হাসিনা : কী?
কবীর কথা না বলে ভ্যানিটি ব্যাগের দিকে নির্দেশ করে। হাসিনা মন স্থির করতে পারে না। ওটা ছুঁতে গিয়েও ছেড়ে দেয়। তারপর আবার ধরে। খুলে ফেলে। কবীর তার পেছনে এসে দাঁড়ায়। চারদিক কেমন সন্ত্রস্ত হয়ে তাকায় হাসিনা, তারপর আবার ভ্যানিটি ব্যাগটা সপ্ করে বন্ধ করে দেয়।
কবীর : (নিচু স্বরে) খোল না।
হাসিনা : (সম্মতির প্রত্যাশায়) খুলব?
হাসিনা সেটা খুলে ফেলে।
কবীর : ভেতরটা দেখ।
হাসিনা : (উপুড় করে ফেলে) দুটো সেফটিপিন, একটা সেন্টের শিশি। কিছু কাগজপত্র বেরোয়।
কবীর : ওই পকেটে কী?
হাসিনা : (হাত দিয়ে বের করে অনেকগুলো দশ টাকা-পাঁচ টাকার নোট) টাকা?
কবীর : কত?
হাসিনা : কী জানি। অনেক।
ডালিয়া : (নেপথ্য) আপা।
হাসিনা : নাও, নাও (ব্যাগ আর টাকা কবীরের হাতে দিয়ে দেয়। কবীর সেগুলো যেনতেন প্রকারে পুরতে থাকে। ডালিয়ার প্রবেশ। একমুহূর্ত সে স্বম্ভিত। তারপর মিষ্টি হেসে ব্যাগটা কেড়ে নিতে যায়।)
ডালিয়া : আমার ব্যাগ ধরলেন কেন? বড় খুঁতখুঁতে স্বভাব তোমার বরটির। কই কিছু বলছ না কেন? ব্যাগ খুলে কই আমার সেন্টের শিশি। তারপর নিজেরই চোখে পড়ে। আরেকটু হলেই হারিয়েছিল।
ডালিয়া : বাক্সটা এগিয়ে দাও না মেজআপা। পরে কি ট্রেন ফেল করব।
হাসিনা কোনো কথা বলে না। ওর জিনিসগুলো যেমন খুশি ঠেসে ঠেসে রাখে। ফারুকের প্রবেশ। হাতে একখানা বর্ষাতি।
ফারুক : দেরি হয়ে গেল। ডালিয়া কই?
হাসিনা : ভেতরে।
কবীর : বর্ষাতি কিনলে নাকি?
হাসিনা : হ্যাঁ, মফস্বলে থাকি, বোঝেন তো Ñ
কবীর : সোনার ভরি কতো দেখলে?
ফারুক : (অতর্কিত প্রশ্নে বিব্রত বোধ করে)
সোনার ভরি – কী জানি?
কবীর : কী জানি মানে। সোনার দোকানে যাওনি।
ফারুক : হ্যাঁ, হ্যাঁ গিয়েছিলাম। ওর কী যেন অর্ডার দেবার ছিল।
কবীর : সেটা ভেবেই তো জিজ্ঞেস করলাম। সোনার দোকানে, সোনা কেনা-বেচা দুটোই হয়, হয় না?
ফারুক : তা তো বটেই।
কবীর : (হাসিনাকে লক্ষ করে) যাকগে ভেবে আর কী করবে। যা হবার হয়েছে। ওদের বিদায় দিয়ে আমরা বেরুই।
ফারুক : ও তাই তো আর সময় নেই। আমি বরং একটা স্কুটার ডেকে আনি।
প্রস্থান। কবীর ভেতরের কামরায় ঢুকল। ডালিয়ার প্রবেশ। বাইরে স্কুটারের শব্দ।
ফারুক : কই এসো, আর সময় নেই।
ফারুক সুটকেসটা তুলে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরই ডালিয়া সেজেগুজে বেরিয়ে আসে। হাসিনা নিশ্চল ভাবে দাঁড়িয়ে।
ডালিয়া : (বোনের কাছাকাছি এসে) চলি মেজআপা।
হাসিনা : (নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে) বালাজোড়া হারিয়েছে বলে আমার দুঃখ নেই। দুঃখ Ñ
ডালিয়া : আমি চলে যাচ্ছি বলে, না।
(হাসিনা তবু নিশ্চল)
তা, অমন করে আছ কেন। আবার আসব।
হাসিনা : না না, সে কথা নয়। ছেলেমানুষি করিস না ডালিয়া। সংসারের মানুষের ইজ্জতটাই সব।
কবীর বেরিয়ে আসে
(নেপথ্যে) ডালিয়া।
ডালিয়া : (জানালা দিয়ে দেখে নেয়। উহ্, কী হাঁকডাক। আসছি, আসছি। (কবীরের দিকে) দুলাভাই চলুন না। আপা চলো না।
কবীর : (কষ্টকৃত হাসি) না, আমার কাজ আছে।
ডালিয়া : আপা?
কবীর : ইচ্ছে করলে যেতে পারে। ওর পায়ে কেউ বেড়ি লাগিয়ে রাখেনি।
হাসিনা : না, থাক। শরীরটা ভালো নেই। তোরাই যা। (থেমে) তোকে আমি ছোটবেলা মানুষ করেছি। তুই আমার কাছে কখনো মিথ্যে বলিসনি।
ডালিয়া : (সে কথায় যেন মন নেই) আমার মনে হয় তোমার একটা কিছু দরকার। (ব্যাগ থেকে একটা মালা বের করে পরিয়ে দেয়) দেখি, দেখি চমৎকার মানাচ্ছে। তোমার কাছেই থাক। কই। দুষ্টু, মিলির সঙ্গেও দেখা হলো না।
যেন চেষ্টা করেও ওখানা মাথা থেকে খুলতে পারছে না। প্রস্থান। ওরা দুজনই জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে।
[স্কুটারের শব্দ]
কবীর : কী ভাবছ?
হাসিনা : (যেন অপ্রকৃতস্থ ছিল, কবীরের প্রশ্নে সম্বিত ফিরে আসে) কই কিছু না তো।
কবীর : মিথ্যে বড়াই করে কী হবে হাসি। ওটা কোথায় গেছে ভালো করেই জানো।
হাসিনা : (উৎকণ্ঠিত হয়ে রুদ্ধশ্বাসে) না, না Ñ
কবীর : হ্যাঁ হ্যাঁ। আজকাল সবই হয়।
দুজন জানালার কাছ থেকে সরে যেতে থাকে। প্রথমে কবীর। তার পেছন পেছন হাসিনা। হঠাৎ খুব ভীষণ চিৎকার শোনা যায় Ñ মা, মা
মিলি না?
হাসিনা : হ্যাঁ, কই মা-মিলি দুজনই দরজা খুলে বেরিয়ে আসে।
(Close) Kabir & Hasina
বাড়ির বাঁ-দিকের ওই জায়গা। সেখানে কিছু ইট সাজিয়ে একটা ঘর তৈরি করা হয়েছিল। সেই ঘরটি ভেঙে পড়েছে। একটা ইটের গাদায় ওর আঙুল মাথা আটকে। হাসিনা তাড়াতাড়ি ওদিকে দৌড়ে যায়।
হাসিনা : ওমা, কী হলো মামনি। উহ্ উহ্ ব্যথা পেয়েছ – কই, কই দেখি। (আদর করতে থাকে। মাটিতে বসে হাতে হাত বুলোতে থাকে) দেখেছ কা-, কেটে ফেলেছে।
কবীর : (ইটের টুকরোগুলো সরাতে থাকে। হঠাৎ একটা পুতুল তার গলায় সোনার বালাজোড়া চোখে পড়ে। আওয়াজ হয়। হাসিনার দিকে উদ্দেশ করে) দেখ, দেখ – দেখ তোমার মেয়ের কা-।
হাসিনা : (একমুহূর্ত স্তম্ভিত। কপালটা চেপে ধরে। মিলি আঙুলটা নিয়ে দাপাদাপি করে। ঠাস্ করে চড় মারে তাকে হাসিনা) বজ্জাত পাজি মেয়ে। কেন, কেন নিয়ে গিয়েছিলি না বলে?
কবীর : আহা কী করছ।
কবীর ও হাসিনার দৃষ্টি বিনিময়, এক মুহূর্ত নীরব।
হাসিনা : বেশ করেছি।
মিলি ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে। হতভম্বের মতো ওদিকে এগিয়ে যায়। বালাজোড়া তোলে।
কই দেখি। ইস্ কতটা কেটেছে আয় –
মিলিকে সঙ্গে নিয়ে চলে যায়।
কবীর : (বালাদুটো হাতে তুলে নিয়ে) নেবে না?
হাসিনা : (তির্যক দৃষ্টি ফেলে) কী ওগুলো।
কবীর : বালা।
হাসিনা : বালা নয়, এগুলো তোমার সন্দেহ। আমি চলি। হাত থেকে পড়ে যায় সেগুলো। হাসিনার সামনে। কলের লাইন থেকে টুপ্ টুপ্ করে জল পড়ছে। একটা কাক এলো তার ওপর। খুঁটে খুঁটে খেতে থাকে।
